Wednesday, October 5, 2022

তিওয়ারি বম্‌হনা

 এই যে এত লোক, এত স্ত্রী-পুরুষ এত কথা বলছে কামরাটায়, সে কিছুতেই এতে নিজেকে শামিল করতে চাইছে না। জানলার গরাদে চোখকান গেঁথে বুঁদ হয়ে থাকতে চাইছে বাইরের দৃশ্যে আর সুরে। ভিতরের কথাবার্তা, হই-হট্টগোল যেন ছন্দ ভেঙে দিচ্ছে তার অন্তরে উৎসারিত হতে চাওয়া কবিতার। শব্দগুলো রূপ নিতে নিতেও হারিয়ে যাচ্ছে।  

পকেটে সাতশো টাকা নিয়ে বেরোবার সময় মাকে শুধু বলেছিল দুচারদিন একটু ঘুরে আসবেকোথায়? দেখি! হতে পারে  জব্বলপুর! পাটনা থেকে কোলকাতা ট্রেনভাড়া আঠেরো টাকা। জব্বলপুর, খুব বেশি হবে তো তিরিশ! সাতশো টাকায় তো পুরো পশ্চিম ভারত হতে পারে! মাকে কি আর এটা বলা যায়? বলা যায় যে পূর্বতট ধরে কন্যাকুমারী অব্দি তো সে গেছে, এবার আগে মধ্যপ্রদেশে ঘুরে তারপর পশ্চিম তট ধরে যতদূর পারবে যাবে, দেখাই যাক? আর, তা ভাবলে, সে না বললেও মা জানে নিজের ছেলেকে, যে একবার বেরুতে পারলে আর ফেরার নাম নিতে চায়না!

অনুপপুরে একটা ট্রেনে চেপেছে সকালে, এখন দুপুর। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল গ্যাংম্যানদের দল কাজ করছে অন্য ট্র্যাকটায় লাগাতার। তাদের পিছনে বড় গাছের সারি। গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে দূরের পাহাড় অব্দি ক্ষেত। ক্ষেতে কাজ করছে মেয়েরা আর তাদের গাওয়া গান এসে আছড়ে পড়ছে ট্রেনের ভিতরে। তিওয়ারি বম্‌হ্‌না……’ ছাড়া বাকি শব্দ স্পষ্ট হলনা। তবে না বোঝার মত গান নয়। গ্রামের যে ব্রাহ্মণঘরের ছোকরাটা, সে আমায় বিরক্ত করছে গানের প্রসঙ্গটা পরিচিত। বড়ে গোলামের একটা ঠুমরিও তো আছে, তার কাছে যে এলপি রেকর্ডটা আছে, তার দ্বিতীয় গানটাই তো কঙ্কড় মার জগায়ো বম্‌হনা কে ছোরা

 

কিন্তু তার সমস্যা হল এখন যে ওই অদৃশ্য গান গাইতে থাকা নারীরা তাকে বিচলিত করে দিল। নারীসঙ্গহীন যুবক সে, তার পুরো শরীরটাই ধীরে ধীরে নারীসঙ্গের জন্য উন্মুখ হয়ে, আরো উদ্বেল করার বদলে রুখে দিল তার চেতনার কাব্যপ্রয়াস। হয়ত এক বড় পল্লীকবি বা গণঘনিষ্ঠ কবির কাছে এটিই একটি কবিতার বা গানের বিষয় হতে পারত। ট্রেনে সফরকারী এক শহুরে যুবকের নাম-না-জানা গ্রাম্য বালার প্রতি প্রেমনিবেদন! কিন্তু তার জন্য যেটা প্রয়োজন ছিল সেটা তার নেই।

দ্বিধাহীন বলিষ্ঠ রোমান্টিকতা শুধু অন্তর্মুখী প্রেমিকমন আর নিসর্গের ছবি দিয়ে গড়া যায় না। কিসে গড়া যায়, তা তখন অব্দি আমি জানিনা। আমাকে দ্বিধাবিভক্ত করে বিমর্ষ করে দিচ্ছে আমার শরীরের যৌনউদ্রেক, সে ভাবল।  

গাড্‌রওয়ারা স্টেশন এল সন্ধ্যায়। অভ্যেসমত সে প্ল্যাটফর্মে নেমে দাঁড়িয়েছিল। ট্রেনটা ছাড়ার মুখে দেখল সাধারণ আধময়লা রঙের সালোয়ারকামিজ পরা, হৃষ্টপুষ্ট, ইষৎ খাটো এক যুবতী তাড়াহুড়ো করে কামরায় চাপল। ওই অন্ধকারেও স্পষ্ট বোঝা গেল মেয়েটি অন্ধ। নিচে রয়ে গেল তার সাথে আসা বাবা-কাকাগোছের দুতিনজন মানুষ। সেও উঠল, ট্রেনটা হুইসিল দিয়ে এগোতেই।

ট্রেনের ভিতর মাত্র কয়েকটি আলো জ্বলছে। যে কুপেটায় তারা বসেছে সেটা প্রায় পুরোপুরিই অন্ধকার। বসে থাকা চেহারাগুলোয় চোখ বোলাতে বোলাতে হঠাৎ সে খেয়াল করল ওই মেয়েটিও এখানেই; সামনের বেঞ্চের জানলার ধারে বসে আছে। এদিকে ছয় ওদিকে ছয় অর্থাৎ বারোজনের মধ্যে ওই একটিই মেয়ে। এবার মনে এক নতুন দ্বন্দ শুরু হল। চেহারা, পোষাক-আষাক, টুপি, পাগড়ি, খোলামাথা খুঁটিয়ে দেখে তার মনে হল সে ছাড়া বাকি দশজনই এদিককার গ্রাম-কসবার মানুষ। দুজনের পাগড়ি রাজস্থানী। সবাই যুবক অথবা মধ্যবয়সী। তারা কি লোভের চোখে দেখছে মেয়েটিকে? গরীবঘরের মেয়ে বলে কি একটু-গায়ে-ঢলে-পড়া-যায়, গা-ঘষে-নেওয়া-যায় ইত্যাদি ভাবছে তারা? সে সমব্যাথী হয়ে গেল মেয়েটির। যেন এক্ষুণি কেউ কিছু করলে রুখে দাঁড়াবে!

 

কিন্তু কিছুই হলনা। সবাই নিজের মধ্যে মগ্ন, কেউ কেউ ঝিমোচ্ছে। ট্রেনটা ভুপাল পৌঁছোবে কাল ভোরবেলা। নিজেকে সে ফিরিয়ে নিয়ে গেল দুপুরের দৃশ্যটায়। ক্ষেতের জল বেয়ে ভেসে আসা সমবেত নারীকন্ঠের গানে। এত বড় দেশটার বিশাল হৃদয় যেন এই মধ্যপ্রদেশ। কঠোর, শ্যামল, তরঙ্গায়িত বিস্তৃতি। বড় বড় পুষ্ট ছোলার দানার মত হিন্দি উচ্চারণ। এখনও-আরো-অনেককিছু-খুঁজে-পাওয়া-বাকি ধরণের প্রধান-অপ্রধান অতীতচিহ্ন ছড়ানো বিভিন্ন জায়গায়। এত মন কাড়ে এর ভিতরে ভিতরে ট্রেন-বাসের যাতায়াত!  অথবা থেকে যাওয়া কোথাও কোনো ছোটো জনবসতে! এক নারীর সাথে ঘর বাঁধা! সকালে বেরুবার মুখে তার ডাক শোনা পিছন থেকে। রাতে তার সবল কালো জঙ্ঘায় ঠোঁট ছোঁয়ানো! 

মেয়েটি বেশ গল্প জুড়ে দিয়েছে আশেপাশের যাত্রীদের সাথে। এদিককার কিনারে বসা ক্যাপ পরা লোকটি প্রশ্ন করছিল, “…তা আপনার বাবা, মা, ভাইয়েরা আপনাকে একা ছাড়লেন কি করে? চোখে দেখতে পান না আপনি, আর যা দিনকাল হয়েছে আজকাল! মেয়েটি মিষ্টি করে হাসল, নিজের শহরে পথ চলতে তো আমার বিশেষ অসুবিধা হয়না। জন্ম থেকেই আমি অন্ধ। হ্যাঁ, প্রথম সফরে বেরিয়েছি। বাবাই ভরসা দিলেন। বললেন, নিজের ওপর ভরসা রাখ। আর এটা জানবি যে সফরে মানুষজন ভালোই হয় সাধারণতঃ।

সে চমকে উঠল কথাটায়। এত গভীর বিশ্বাস তার পিতার? যে সফরে মানুষজন ভালোই হয় সাধারণতঃ? কী করে হল? এই বিশ্বাসটার ভিত্তি কি দেশের সমাজ, না দিগন্তের সাথে ছুটে চলা ট্রেনের সফর, না মেয়েটির অন্ধত্ব?

এভাবে কখনো সে ভাবে নি। সত্যিই তো! মানুষের সবচেয়ে বড় ভালোত্ব তো তার সামাজিকতায়! সমাজকে ভাঙে শ্রেণীস্বার্থ, শোষণের প্রয়োজন তাই একদিন শোষিতেরাও চেনে তাদের নিজেদের শ্রেণীস্বার্থ কিন্তু সে পথেই তো তারা নতুন সমাজ গড়তে সংগ্রাম করে, যে সমাজ আরো বেশি ভালোত্ব দিয়ে তৈরি, যেখানে শোষণ নেই!

আর ট্রেনে যারা সফর করছে তারা বেশির ভাগ তো সেই ভালোত্বে ভরা মানুষ, দুএকজন দুর্বৃত্ত যদি থাকেও, এরা তাদেরকে দেখে নেবে না?

আবার যেন কানে দুপুরের সেই গানটা ভেসে এল। তিওয়ারি বম্‌হনা বা তার ছোরা ওই ক্ষেতেও সহজে যেতে হিম্মত করবে না, যদিও গানের প্রচ্ছন্ন শ্লেষটা তারা প্রতি মুহূর্তে টের পাচ্ছে, এই ট্রেনেও ঢুকলে বেশী বেগড়বাঁই করার চেষ্টা করবে না। দূর পাল্লার সফরে এমনিতেও শ্রেণীর ফারাকগুলো কমিয়ে না আনলে চলে না। ভালোত্বে ভরা মানুষ তো এখানেও ভালোই ব্যবহার করবে, জানলা থেকে প্রথম চায়ের খুরিটা হাতে নিয়ে তিওয়ারিজির দিকেই এগিয়ে দেবে! এটা তো আর তার দালান নয় যে নেবে না? নিতেই হবে তাকে। দিগন্তও যে চলছে ট্রেনের সাথে সাথে!

আর মেয়েটির অন্ধত্ব? সবার করুণা? সবার প্রতিরোধী শক্তি? এ্যাই, একটা অন্ধ মেয়ের সাথে কেন এমন করছিস? ? অর্থাৎ, মেয়েটা অন্ধ না হলে দিব্যি করা যেত? তার শরীর, তার সত্ত্বা লঙ্ঘন করা যেত? নাঃ, এসব পাতিবুর্জোয়া করুণা। মানুষের ভালোত্ব কারো অন্ধত্বের দোহাই দিয়ে চলে না।

মনে পড়ল মেয়েটির বলা আগের কথাটা, বাবা বললেন, নিজের ওপর ভরসা রাখ।মেয়েটির দিকে মন দিয়ে তাকাল সে। অন্ধকারেও অনুভব করল মেয়েটির ভরসা আছে নিজের ওপর। একবার সে তাকিয়ে নিল বাঁদিক, ডানদিক। কেউ তাকে দেখছে না তো মেয়েটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে বলে?

আর তখনই তার মনে জাগল মোক্ষম প্রশ্নটা, তার ভরসা আছে, নিজের ওপর? আবার কানে ভেসে এল দুপুরের গানটা। তিওয়ারি বম্‌হনা …’ যেন তাকেই ঠোনা দিচ্ছে মেয়েগুলো। ক্ষেতে নুয়ে ধানের চারাগুলো জলে হাত ডুবিয়ে পুঁততে পুঁততে ঘাড় বেঁকিয়ে তার দিকে তাকাচ্ছে, হাসছে। 

No comments:

Post a Comment