Monday, June 1, 2026

এদেশের প্রতিটি শহর

এদেশের প্রতিটি শহর
গড়ে কিছু মানুষ যাদের
চোখে সেই শহরের জ্বর।
 
কেউ বা পাহারা দেয় প্ল্যাটফর্ম, ময়দান,
কেউ হেঁটে পাড়ি দেয় রাষ্ট্রপতি ভবন,
কেউ বা চায়ের ভাঁড়ে
হঠাৎ কপাল খুঁড়ে
বেবাক চালিয়ে যায় তিন আঙুলে স্টেনগান।
কেউ বা দাঁড়িয়ে থাকে উদাসীন, ঝিম মেরে,
কেউ বা সাংবাদিক প্রলাপে দেয়াল ভরে
                  মানবাধিকার আর তদন্তকমিশন
                  নিখোঁজ মেয়ের নাম
                  ভুয়ো দলিলের দাম
                  বিধায়ক-আবাসের রাতগুলো ফাঁস করে।
কেউ বা ব্যাঙ্কে গিয়ে তিন লাখ ধার চায়,
কেউ বা পুলিশ-জিপ দেখে পেছন নাচায়,
কোর্টের গেটে কেউ শোনায় শেষবিচার
বিচারক আমলা ও মন্ত্রী সান্ত্রীদের
কেউ বা নগ্ন হয়ে না দেখিয়ে ছাড়ে না
বীভৎস রাত ভরে দয়া তার স্বামীদের।
কেউ বা একলা খুব, বারোমাস শীতে কাঁপে,
রাতের বিজন পথে যেচে সখ্যতা চায়,
কেউ বা ধর্মপ্রাণ, হঠাৎই মোড়ের কাছে,
আকাশ প্রণাম করে গলিতে পালিয়ে যায়।
 
দেশভরা এই মানুষেরা
নাগরিকদের কাছে নিজেদের ইতিহাস
                  জানাতে দেখায় এক দেশ
বাঁচার দ্বন্দ্বে জর্জর।

৪.২.৮৩

 

ভাষাস্মৃতি

অনুভব, তবু নিরেট, হয়ত দেয়াল! খনি বলেছিল।
ড্রিল কর, গোঁজো বিস্ফোরক টিউবগুলো প্রশ্নের,
কাঁচা আকরশক্তিতে ভরা ওয়াগন আনো বর্তমানে।
 
মেলাও ভাবনার প্রতিশত! বলেছিল ধাতুশাল।
কিছু উৎপ্রেরক, কিছু শুদ্ধিকারক, কিছু দেয়
প্রয়োজনমত দৃঢ়তা, নমনীয়তা আর সহ্য ক্ষমতা।
চুল্লিটা জ্বলছে জীবনের!
জ্বলছে মাথায় বেঁচে থাকা, অভিশপ্ত বেঁচে থাকা।
আরেকটা নতুন চুল্লি চার্জ কর লড়াইয়ের তার উত্তাপের কাঁটায়
মিশেল গড় সত্ত্বার!
 
হেসেছিল কামারশাল দেড়শো মোটরের গর্জন ছাপিয়ে।
পাঞ্চিং নোজটারও দরকার পড়ে হে!
রকমারি হাতুড়ির! আবার কুল্যান্টেরও মাঝে মাঝে!
 
নির্মাণ কথা বলেছিল। সাথে এসেম্বলি-লাইন।
গঠন! সংগঠন গড়ে তোল রক্তের সঞ্চারে ও অভিসারে!
কাঠামো, তার জ্যামিতি ঘিরে গ্রন্থনা,
গতির কোষ ও প্রবাহ শরীরে; স্বাধিকার অথবা ক্ষমতার,
শিক্ষা অথবা ভালোবাসার, গানের,
অথবা নিছক দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাওয়ার সংগঠন!
 
তোমরাও তো কথা বলেছিলে! রুজিখেকো যন্ত্রগুলি!
বলেছিলে অমলিন কতকাল শীতাতপ নিয়ন্ত্রণে থাকবে?
গড়ছ কেন্দ্রীয় কম্যান্ড, বিপুল হিসেবনিকেশের,
বৈজ্ঞানিকদের ব্যক্তিগত সচিব, কোনোদিন
গড়বে চকখড়ির ভায়োলিন, ব্ল্যাকবোর্ডের পিয়ানোকর্ডিয়ন
স্কুলে যাবে পৃথিবীর শেষ শিশুটিও।
শেখাতে চেয়েছিলে তোমরাও
সংহত গণিত, কত জরুরি ক্রিয়ার!
 
দাঁড়াও হে তোমরা!
এত ভীড় কবিতায় ধরা কি সম্ভব?
আপাততঃ পরিবহণের দিকে যাই।
ক্রীতদাসবাহী জাহাজের খোলেও একটা ভুগোল
আজ তার রক্তের ইতিহাস হয়ে আছে।
 
গুরুজনেরা ধমকেছিলেন, বলি, টিঁকবে তো?
যা গড়তে চাইছ?
বলি, রক্ষণাবেক্ষণ আর যোগান! ভুলে গেলে?
ভুলে গেলে যে ঘুমের জন্য লাগে গ্যাংম্যান?
বর্ণমালার জন্য টার্বাইন আর জলাধারের কর্মীদল?
গোধুলির জন্য প্রহরী?
আর নীলকন্ঠ কম্পোজিটর যে বন্ধুত্বের ডায়ালটা গড়ে প্রতিদিন?
বলি ওই যে জীর্ণ হয়না কখনো, আগুনে পোড়ে না,
ওটারও তেল লাগে, গ্রিজ!
বলগুলো বদলাতে হয় মাঝে মাঝে বেদনারও বেয়ারিংয়ের
নইলে শক্তির না দিয়ে নিছক প্যাঁচাল হয়ে ফেঁসে যায়।
 
অফিস বলেছিল, এমনিতেই একটু বেশি বলি, নতুন কী বলি?
সময়ের ডাইরি রাখা যদি ঠিক মত হয়
কথা আর কাজের ফারাকে জীবনে কম লাগে ঘুণ।
ঝুঠো শিলমোহর ছাপিয়ে আয়না হয়ে ওঠে দস্তাবেজ। 

তাও তো পূর্ণতা নেই! রক্তের পুঞ্জিভূত ধুলোয়
ঋতুদের বিভাজনরেখা অস্পষ্ট করছিল কর্মহীনতা, বেকারি।
 
সবশেষে কথা বলেছিল চাষ।
দেশটা দুধ হয় হে, দুধ! পরিশ্রমী সংকল্পের শিষে!
চুপ করে শোনো তার নীরব উৎসার!
 
কবিতা কি শুনেছিল?
 
৩১.৮.১৯৯১

 

 

ভারতবর্ষ বাড়ছে

আমার এক স্বাধীনচেতা মায়ের বিয়ে
কালো বলে যখন এক
দোজবরের সাথে হয়েছিল
তখন যারা ওই কালো ডানপিটে মেয়ের
দুঃখের ঘর ভেঙে দিতে
লিখেছিল বেনামি উড়ো চিঠি,
বেশ্যা বলতে ছাড়ে নি
তাদেরই আজ রমরমা।
 
ভারতবর্ষ তাই বাড়ছে
তিরতির করছে বাড়,
রক্তের ভিতরে অজানা কোষপুঞ্জের মত
কোন দিকে কতটা হবে বিকৃত বিস্ফার
কবে ফিরব নদীর কাছে
মাটির কাছে
প্রশ্ন কোরো না।
 
কোথায় কী নতুন প্রসঙ্গ ঢুকছে প্রাচীন গীতিকায়
কেমনভাবে ঢুকছে
মিশতে হবে হাওয়ায়;
ওবি ভ্যান শুধু অকুস্থলে ঘোরে।
 
৯০-এর দশক

দ্বিধা

হদ্দ কাজ-পাগলী মেয়ের
কাব্যপাঠে করলে এমন ভর!
দ্বিধা! তোমায় চিনলাম!
শিল্পে না হও, সততায় সুন্দর!
 
থাকো প্রথম প্রণয়-নিবেদনের স্বরে
আবিষ্কারের অনির্ণয়ের বন্ধ ঘরে
অনিশ্চিতের ঠিকানাতে ওড়াও চিঠি।
 
জীবনসাথীর কুড়িয়ে দিঠি
সেও চলেছে ক্লান্ত সাঁঝের
বীথিতে তার শব্দ-দোলন,
কাটাকুটি, মনন-প্রয়াস
 
দিনযাপনের বাচালতার
কঠোর অনভ্যাস।
দ্বিধা! নও সত্যে, তবু স্বভাবে সুন্দর।  
 
পাটনা
১৬.৯.২০০৩

সে ও তার চেয়ার

সে নয় তার চেয়ার বলছে!
সে তো সবার সাথেই চলছে!
যেথায় বলবে, যেতে রাজি।
চেয়ারটাই তো আসল পাজি!
চেয়ার হল রাষ্ট্রযন্ত্র।
সে তো বরং সমাজতন্ত্র!
 
কিন্তু চেয়ার দেয় মাইনে।
চেয়ার-স্ত্রোত্র আছে আইনে।
চেয়ার বাঁচিয়ে যে সাহায্য
করতে বলবে হোক অন্যায্য
সব সে তোমার জন্য করবে;
পকেট থেকে চাঁদা ভরবে।
 
চেয়ার গেলে খাবে কী সে?
জর্জর এই বাঁধন-বিষে
কোথায় যাবে পায় না কূল
চেয়ারটি তার চক্ষুশূল!
 
৩১.৭.২০০৫এর কাছাকাছি