Monday, June 8, 2026

পান খায়ে সঁইয়া হমারো

পান খায়ে সঁইয়া হমারো,
সাঁওলি সুরতিয়া হোঁঠ লাল লাল
হায় হায় মলমল কা কুর্তা
মলমল কে কুর্তে পে ছিঁট লাল লাল

শৈলেন্দ্রের কথা আর শঙ্কর-জয়কিশনের সুরে এই গানটি গেয়েছিলেন আশা ভোঁসলে। ফিল্ম তিসরি কসমএর এই গানে ঠোঁট মিলিয়ে নেচেছিলেন ওয়াহিদা রহমান।

গানের কথা খড়িবোলি হিন্দি হলেও যে অঞ্চলের সংস্কৃতিকে ভিত্তি করে ফিল্মটি তৈরি হয়েছিল বা ফণীশ্বরনাথ রেণুর মূল গল্প মারে গয়ে গুলফাম রচিত হয়েছিল, সেটি উত্তর বিহারের প্রত্যন্ত পূর্বাঞ্চল, প্রধানতঃ মৈথিলী এবং অঙ্গিকাভাষী অঞ্চল।

আবার, খইকে পান বনারসওয়ালা গানের কথাতেই আছে বনারস, উত্তর প্রদেশের পূর্বাঞ্চল, পশ্চিম বিহারের লাগোয়া। বেনারসের প্রধান ভাষা ভোজপুরির একটি রূপ, কাশিকা ভোজপুরি। ভোজপুরি বিহার ও উত্তর প্রদেশের বড় একটি ভৌগোলিক ক্ষেত্রের ভাষা।

অর্থাৎ, পান আমাদের প্রদেশ বিহারে সর্বত্র বিরাজমান।

প্রশ্নঃ আচ্ছা, বাঙালিদের বিয়েতে শুভদৃষ্টির আগে কন্যা পানপাতায় মুখ ঢেকে থাকে, তেমনকি বিহারেও হয়?

উত্তরঃ না বিহারে কন্যা পানপাতায় মুখ ঢাকে না। তবে বিয়ের দিন বরের পান খাওয়ার বা তাকে পান খাওয়ানোর একটা রেওয়াজ আছে। বাংলার লাগোয়া যে অঞ্চলগুলো, সেখানে পানের ব্যবহার বেশি। যেমন পুরো মিথিলাঞ্চলে, দ্বারভাঙা, মধুবনি, সাহারসা থেকে পূর্ণিয়া, কাটিহার অব্দি অতিথি আপ্যায়নের প্রতীকী বস্তু তিনটে পান, মাছ, মাখানা। পূর্ণিয়ার একটি গ্রামে বৈবাহিক মেলা হয়। ছেলেরা মেলায় মেয়ে পছন্দ করে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। সে প্রস্তাবের ভাষা হল পান। ছেলেটি পছন্দ হওয়া মেয়েকে এক খিলি পান দেয়। মেয়ে পান খেলে বোঝা যায় যে সে প্রস্তাবটা গ্রহণ করেছে।

 

তবে এসব ছাড়ুন। পান তো আর শুধু বিহারের বা ভারতের নয়, পুরো পূর্ব এশিয়ার মুখশুদ্ধি এবং নেশা। আর হ্যাঁ, ওষুধও। মা, ঠাকুমাদের মুখে পানপাতার গুণাগুণের বর্ণনা তো সবাই শুনেছেন। এমনকি পানের বোঁটা, যাতে করে একটু চুন উঠিয়ে মুখে দেওয়া যায়, সে বোঁটারও একটি বিশেষ ব্যবহার আছে। হয়তো আফ্রিকারও কোনো কোনো দেশে এর ব্যবহার আছে! জানি না।

বরং পান খাওয়া যাক এক এক খিলি। কোন পান খাবেন? এই পাটনায় পানের দোকানে চার রকমের পান পাওয়া যায়। একটা দেশি, অর্থাৎ সাধারণ পান যা সব জায়গায় পাওয়া যায়; ঝাঁজ আছে। দ্বিতীয়টা মগহি। হলদেটে সবুজ রঙের ছোটো পাতলা পানপাতা। ঝাঁজ নেই। কুলীন পান। বাবুরা খান; ক্ষুদে ক্ষুদে চারটে পাতা মুড়ে কাঠিতে গেঁথে এক খিলি হয়। তৃতীয় বাংলা পাতা বা মিঠা পাতা। যদিও সবচেয়ে ঝাঁজ পাতাটাও বাংলা পাতা আর মিষ্টি পাতাটাও বাংলা পাতা। কিন্তু মিঠাটাই বাংলাপাতা নামে প্রচলিত। এরপর বেনারসি পাতা। শৌখীন। বিহারের পানখোরদের নিয়মিত অভ্যাসের নয়। এ পাতা সেই দোকানে থাকে যেখানে শখের পান বেশি বিক্রি হয় পঁচিশ টাকার, পঞ্চাশ টাকার, একশো টাকার, হাজারটা মশলা ভরা পান, সোনারূপোর পাত দিয়ে মোড়া পান । রোজকার অভ্যাসের জর্দা-পানে, বা সাদাসিধে পান-সুপুরি-চুনে-খয়েরে পকেটের সামর্থ্য অনুযায়ী সাধারণ পাতা বা মগহি পাতা চলে।

আসামের মত কাঁচা সুপুরির চল নেই এখানে। শুকনো সুপুরির দুরকম কুচি থাকে, মোটা আর মিহি। সুপুরির আরো তিনটে রকম থাকে, ভেজা, সেদ্ধ এবং ভাজা।

নিজের ব্যক্তিগত পানের বাটায় যে যেমন রাখুক, দোকানে চুন এবং খয়ের, শুকনো বা গুঁড়ো নয়, গোলা থাকে। কাঁসার বা স্টীলের পাত্রে। মাঝেমধ্যে চুন ঘষার বা খয়েরের প্রলেপ দেওয়ার পিতলের কাঠিটা পাত্রে আঘাত করে। টুংটাং বেজে ওঠে পাত্রটা। গ্রীষ্মের ঘাম চোখে ঢুকলে চোখ জ্বালা করে; চোখ বন্ধ করে বালিয়াড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে সেই শব্দটা কানে এলে বোঝা যায়, প্রাণ জুড়াতে পানের দোকান আছে কাছে।

এদিকে মোটামুটি দুটো কম্পানির জর্দা চলে। একটা প্রভাত জর্দা, মুজফফরপুরে কারখানা। আরেকটা বাবা জর্দা, দিল্লির কম্পানি। দুটোরই আলাদা আলাদা নম্বরের জর্দা আছে, নেশা ধরানোর জোর অনুসারে। তার খুশবু আছে। এছাড়া আলাদা করে কিমামের প্রলেপ লাগিয়ে নেওয়া যায় দোকানদারকে বলে। দোক্তার খুব বেশি চল নেই। তবে কিছু কিছু দোকান, দেয়ালে আয়না নয়, আয়না দিয়ে দেয়াল করা একটু বড়, বেনারসি নামে খ্যাত দোকান, নিজেদের হাতে কোটা তামাক রাখে, জর্দা বা দোক্তা যাই বলুন, আর বেনারসি পান পাতায় সাজিয়ে গোলাপজল ছিটিয়ে দেয়।

ছট পরব জানেন তো? বিহারের সবচেয়ে বড় পরব। মুম্বই থেকে কলকাতা আর বেঙ্গালুরু থেকে দিল্লি অব্দি মেতে ওঠে আজকাল। সেই ছঠি মইয়ার দৌরায় (ডালায়) বিভিন্ন ফলের সঙ্গে পানপাতা এবং সুপুরি এবং কর্পূর অপরিহার্য উপাদান। বজরঙ্গবলীকেও পান-সুপুরি দিয়ে বলতে হয় মুখ মিষ্টি করো। পানের মালা পরালে তিনি নাকি মনোকামনা পুরো করেন। আর বাড়ি থেকে নিগেটিভিটি দূর করার জন্য পানপাতায় কর্পূর জ্বালিয়ে রাখা তো অশুভের বিরুদ্ধে অব্যর্থ শরসন্ধান! শরীরের কতরকম উপকার যে করে পান, তা হিন্দি গুগল বলবে, বিভিন্ন হিন্দি খবরের কাগজের আধ্যাত্মিক জ্ঞান-সংক্রান্ত পৃষ্ঠাগুলো বলবে। 

আজকালকার নতুন প্রজন্ম অবশ্য পান কম খায়। সেটা রোজগারের নতুন বাজারের দায়। মুখ পরিষ্কার রাখতে হবে, দাঁত ঝকঝকে রাখতে হবে । তাই পানের উপাদান পিষে তৈরি পানপরাগ টাইপের মুখশুদ্ধি অথবা জর্দা মেশানো গুটকা বেশি চলে। সিগরেট চলে। আর নেশার জগতটাও তো আরো বেশি অস্বাস্থ্যকর দিকে যাচ্ছে। কিন্তু সেগুলোর কোনোটাই পানের বিকল্প হতে পারে না।

এটা ঠিক যে বিহারে বিয়ের ভোজের পর হাতে হাতে পানের খিলি এগিয়ে দেওয়ার পরম্পরা, অন্ততঃ পাটনা শহরে দেখিনি। উত্তর বিহারের গ্রামাঞ্চলে থাকতেও পারে। আর পরম্পরা যে নেই তার কারণ, পানপাতার ধর্মীয় বা ঔষধীয় ব্যবহার থাকলেও পান খাওয়ার সংস্কৃতিটা বিহারে সাধারণতঃ তামাক-সেবনের সংস্কৃতির অঙ্গ। পান খাওয়া মানে পান-জর্দা খাওয়া। ঈষৎ মেজাজ আনার জন্য খাওয়া। গা-গরম করার জন্য খাওয়া। সাদামাটা পান-সুপুরি-চুন-খয়ের, বা মৌরি-পান, মিষ্টি-পান কম লোকে খায়। কখনো কখনো, শখে খায়। যারা রোজ খায়, নিয়ম করে দিনে পাঁচ-ছয় বার খায়, তারা জর্দা-পান খায়।

ইউটিউব খুলে সার্চ করলে পান নিয়ে গানও পেয়ে যাবেন বিহারের ভাষায়। তবে ঐসব আজকালকার অটোটিউনড গানগুলো মাধুর্যহীন।

পান একটা এটিচ্যুড, একটা আচরণভঙ্গি। অবশ্যই তার মধ্যে একটা সামন্ততান্ত্রিক পৌরূষএর মেজাজ আছে, কিন্তু একটা, যাকে বলে ক্যয়ফিয়ত আছে। বাংলা কৈফিয়ত নয়। মূল আরবি শব্দটা সঙ্গীতের রসানুভূতির যে মুগ্ধ, আত্মবিভোর অবস্থাটা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, সেই ক্যয়ফিয়ত আনে মনে। সে আপনি গানই শুনুন আর অঙ্কই করুন, তাড়াহুড়ো বলে কিছু থাকবে না চিন্তায়। সুরের প্রত্যেকটি কাজে বা গণিতের প্রত্যেকটি ফাংশনে যে ঠহরাও দরকার সেটা পানের রস সঞ্চারিত করবে মাথায়।

সিগরেট শেষ হয়। মদও শেষ হয়। পান শেষ হয় না। থেকে যায়।  

No comments:

Post a Comment