Monday, June 8, 2026

কমরেড ইজরাইল

আজ ৫ই নভেম্বর কমরেড ইজরাইলের জন্মদিন। তাঁকে স্মরণ করার ব্যক্তিগত কারণ এই যে ১৯৯৭ সালে তাঁর হাতেই আমার কবিতার বই সমুদ্র দুভাবে ডাকের আবরণ উন্মোচিত হয়েছিল। তবে সামাজিক কারণটা তার চেয়ে অনেক বড়। তিনি শ্রমিক শ্রেণীর লেখক। শ্রমিক পরিবারেই জন্ম, শ্রমিক হিসেবেই শুরু করেছিলেন জীবন, প্রথাগত শিক্ষায় খুব বেশি দূর এগোতে পারেন নি, তবে কারুর না কারুর সাহায্য, সান্নিধ্য, গুরুমন্ত্র ও প্রশিক্ষণে লেখক জীবন শুরু করতে পেরেছিলেন।

তাঁর সঙ্গে আমার মোটমাট দেখা মাত্র তিনবার। চারবার হয়ে থাকলেও চতুর্থটা মনে নেই। প্রথম আলাপ পাটনায়। সালটা বোধহয় ১৯৯৪, সিআইটিইউ-এর সর্বভারতীয় সম্মেলন উপলক্ষে। আমি ভলান্টিয়ারে ছিলাম। কোথাও কোনো একটা ঘরে, সে-ঘরে সেসময় পাটনার খ্যাতনামা ডাক্তার এ কে দত্তও ছিলেন, বোধহয় কবি আলোক ধন্বাই আমাকে কমরেড ইজরাইলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাঁর নম্র ব্যক্তিত্বে খুবই আকর্ষণ অনুভব করেছিলাম।

তাই, তারপর কোনো একটা কাজে যখন কলকাতায় গেলাম, তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে, স্বাধীনতার দপ্তরে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করব বলে। সেখানে খবর পেলাম তিনি নিজের বাসস্থানে চলে গেছেন। পাশেই কোথাও একটা হোস্টেল বা মেসের বাড়ি ছিল। তাতে কয়েক (চার? পাঁচ?) তলা (বোধহয় লিফটে) উঠে একটা ছোট্টো ঘরে পৌঁছোলাম। বাঁদিকের আর ডানদিকের দেয়ালে সাঁটিয়ে দুটো সিঙ্গল খাটের বিছানা। মাঝখানে, সামনের জানলা ঘেঁষে একটা (বা হয়তো ছোটো ছোটো দুটো) টেবল আর একটা চেয়ার। কমরেড ইজরাইল বাঁদিকের বিছানায় ছিলেন। আর

ডানদিকের বিছানায় ছিলেন কমরেড ইন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়। তাঁকে চিনতাম। কেননা কিছুদিন আগেই, অর্থাৎ ১৯৯৪এর ডিসেম্বরে, কলকাতা বাংলা সাহিত্য সম্মেলন ১৪০১এ বিহারের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম। বস্তুতঃ, পূর্ণেন্দু মুখোপাধ্যায় তাঁর প্রাপ্য নিমন্ত্রণটা আমাকে পাস-অন করেছিলেন। তাই ইন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের স্বাক্ষরিত নিমন্ত্রণপত্র পেয়েছিলাম এবং জানতাম যে তিনি পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক।

সেই সাক্ষাতে কমরেড ইজরাইল আমাকে হাতে লেখা একটি কবিতা দিলেন। মহারাষ্ট্র বিধানসভার নাগপুর অধিবেশন উপলক্ষে স্থানীয় আদিবাসীদের মিছিল, পুলিসের আক্রমণে ছত্রভঙ্গ হয়েছিল এবং তাতে বহু মানুষ পদপিষ্ট হয়ে মারা যান। সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ত্রিপুরার তৎকালীন সংস্কৃতি মন্ত্রী কবি অনিল সরকার একটি কবিতা লিখে পাঠিয়েছিলেন। ইজরায়েল আমাকে দিয়ে বললেন, আলোককে দিয়ে হিন্দিতে অনুবাদ করিয়ে আমাকে পাঠিয়ে দিন, স্বাধীনতায় দেব। পাটনায় ফিরে বহুবার বললাম আলোকজিকে। যা ওনার স্বভাব, এধরণের কোনো কাজে বসানো কঠিন। শেষে, আমিই যেমন পারি, অনুবাদ করে পাঠিয়ে দিলাম। ইজরায়েলজিকে লিখে দিলাম, আলোক ধন্বার নয়, আমার করা, আপনি সেভাবেই দেখবেন। জানি না, স্বাধীনতায় ছাপা হয়েছিল কিনা।

তারপরের দেখার কথা তো এর আগে ফেসবুকে ছবিসুদ্ধু পোস্ট করেছি। ১৯৯৭ সাল। কবি দীপন মিত্র, কবি অনির্বাণ দত্ত এবং আরো অনেকের উদ্যোগে পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সঙ্ঘের স্থানীয় (কলকাতা?) শাখার তরফ থেকে আমার সমুদ্র দুভাবে ডাকের আবরণ উন্মোচন অনুষ্ঠান। একমাত্র আলোক ধন্বাই তাতে ছিলেন না। তিনি দিল্লিতে। নইলে, দীপন ছাড়াও নীলুদি, তাঁর ছেলে সঞ্জয়, শাহিদ, একরাম, কলকাতা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আরো অন্যান্য পরিচিত বয়স্ক এবং সমবয়সী কমরেড ! কমরেড ইন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়, কমরেড জিয়াদ আলি । সেই বোধহয় ইজরাইলের সঙ্গে শেষ দেখা।

তবে হ্যাঁ, চতুর্থ দেখার একটা অন্য গল্প আছে। তখন নীলুদি, কমরেড নলিনী তিওয়ারি (জনবাদী মহিলা সমিতি, বিহারের রাজ্য কোষাধ্যক্ষ) বাংলা ও রুশীয় ভাষা শিখে মনের আনন্দে অনুবাদ করে চলেছেন। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের বিদ্যুৎলতা করলেন, সোমেন চন্দের বেশ কয়েকটি গল্পের অনুবাদ করলেন, আমার ক্যালেন্ডার করলেন। ব্রেখটের গ্যালিলিওকে সংক্ষিপ্ত একাঙ্ক রূপ দিয়েছিলেন প্রবীর দত্ত। তাঁর লিখিত অনুমতি নিয়ে অনুবাদ করলেন গ্যালিলিও। জনবাদী সাংস্কৃতিক মোর্চার পাটনা শাখা প্রেরণার উদ্যমে সে নাটক অভিনীত হল বেশ কয়েকবার এবং যথেষ্ট জনপ্রিয় হল। তারপরই খবর পেলাম, কলকাতায় অরুণ মুখোপাধ্যায় ধরেছেন ইজরাইলের উপন্যাস রোশনরোশন আমার পড়া আর অরুণ মুখোপাধ্যায়ের জগন্নাথ আমার দেখা। লু শুনের ট্রু স্টোরি অফ আহ কিউও পড়া। নীলুদিকে বললাম,অনুবাদটা ধরুন, জমে যাবে। বাংলা নাট্যরূপের পাণ্ডুলিপি এবং অনুমতিপত্র আনিয়ে অনুবাদ শুরু করে দিলেন। অনুবাদ হল। কিন্তু জমল আর না। কেননা, ততদিনে প্রেরণা সাময়িকভাবে উদ্যমহীন হয়ে পড়েছিল। ভালো ভালো বেশ কয়েকটি ছেলে চলে গেছে মুম্বই, সিনেমায় যাবে।

নীলুদি চলে যাওয়ার কিছুদিন আগেই তাঁর পান্ডুলিপিগুলো আনিয়ে ছাপানোর কাজ শুরু করেছিলাম। কিন্তু তিনি হঠাৎ আমাকে আইসক্রিম না খাইয়ে চলে যাওয়ায় মুদ্রিত রোশনটা আর দেখাতে পারলাম না।   

No comments:

Post a Comment