Showing posts with label Meghsumari. Show all posts
Showing posts with label Meghsumari. Show all posts

Monday, June 1, 2026

এদেশের প্রতিটি শহর

এদেশের প্রতিটি শহর
গড়ে কিছু মানুষ যাদের
চোখে সেই শহরের জ্বর।
 
কেউ বা পাহারা দেয় প্ল্যাটফর্ম, ময়দান,
কেউ হেঁটে পাড়ি দেয় রাষ্ট্রপতি ভবন,
কেউ বা চায়ের ভাঁড়ে
হঠাৎ কপাল খুঁড়ে
বেবাক চালিয়ে যায় তিন আঙুলে স্টেনগান।
কেউ বা দাঁড়িয়ে থাকে উদাসীন, ঝিম মেরে,
কেউ বা সাংবাদিক প্রলাপে দেয়াল ভরে
                  মানবাধিকার আর তদন্তকমিশন
                  নিখোঁজ মেয়ের নাম
                  ভুয়ো দলিলের দাম
                  বিধায়ক-আবাসের রাতগুলো ফাঁস করে।
কেউ বা ব্যাঙ্কে গিয়ে তিন লাখ ধার চায়,
কেউ বা পুলিশ-জিপ দেখে পেছন নাচায়,
কোর্টের গেটে কেউ শোনায় শেষবিচার
বিচারক আমলা ও মন্ত্রী সান্ত্রীদের
কেউ বা নগ্ন হয়ে না দেখিয়ে ছাড়ে না
বীভৎস রাত ভরে দয়া তার স্বামীদের।
কেউ বা একলা খুব, বারোমাস শীতে কাঁপে,
রাতের বিজন পথে যেচে সখ্যতা চায়,
কেউ বা ধর্মপ্রাণ, হঠাৎই মোড়ের কাছে,
আকাশ প্রণাম করে গলিতে পালিয়ে যায়।
 
দেশভরা এই মানুষেরা
নাগরিকদের কাছে নিজেদের ইতিহাস
                  জানাতে দেখায় এক দেশ
বাঁচার দ্বন্দ্বে জর্জর।

৪.২.৮৩

 

ভাষাস্মৃতি

অনুভব, তবু নিরেট, হয়ত দেয়াল! খনি বলেছিল।
ড্রিল কর, গোঁজো বিস্ফোরক টিউবগুলো প্রশ্নের,
কাঁচা আকরশক্তিতে ভরা ওয়াগন আনো বর্তমানে।
 
মেলাও ভাবনার প্রতিশত! বলেছিল ধাতুশাল।
কিছু উৎপ্রেরক, কিছু শুদ্ধিকারক, কিছু দেয়
প্রয়োজনমত দৃঢ়তা, নমনীয়তা আর সহ্য ক্ষমতা।
চুল্লিটা জ্বলছে জীবনের!
জ্বলছে মাথায় বেঁচে থাকা, অভিশপ্ত বেঁচে থাকা।
আরেকটা নতুন চুল্লি চার্জ কর লড়াইয়ের তার উত্তাপের কাঁটায়
মিশেল গড় সত্ত্বার!
 
হেসেছিল কামারশাল দেড়শো মোটরের গর্জন ছাপিয়ে।
পাঞ্চিং নোজটারও দরকার পড়ে হে!
রকমারি হাতুড়ির! আবার কুল্যান্টেরও মাঝে মাঝে!
 
নির্মাণ কথা বলেছিল। সাথে এসেম্বলি-লাইন।
গঠন! সংগঠন গড়ে তোল রক্তের সঞ্চারে ও অভিসারে!
কাঠামো, তার জ্যামিতি ঘিরে গ্রন্থনা,
গতির কোষ ও প্রবাহ শরীরে; স্বাধিকার অথবা ক্ষমতার,
শিক্ষা অথবা ভালোবাসার, গানের,
অথবা নিছক দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাওয়ার সংগঠন!
 
তোমরাও তো কথা বলেছিলে! রুজিখেকো যন্ত্রগুলি!
বলেছিলে অমলিন কতকাল শীতাতপ নিয়ন্ত্রণে থাকবে?
গড়ছ কেন্দ্রীয় কম্যান্ড, বিপুল হিসেবনিকেশের,
বৈজ্ঞানিকদের ব্যক্তিগত সচিব, কোনোদিন
গড়বে চকখড়ির ভায়োলিন, ব্ল্যাকবোর্ডের পিয়ানোকর্ডিয়ন
স্কুলে যাবে পৃথিবীর শেষ শিশুটিও।
শেখাতে চেয়েছিলে তোমরাও
সংহত গণিত, কত জরুরি ক্রিয়ার!
 
দাঁড়াও হে তোমরা!
এত ভীড় কবিতায় ধরা কি সম্ভব?
আপাততঃ পরিবহণের দিকে যাই।
ক্রীতদাসবাহী জাহাজের খোলেও একটা ভুগোল
আজ তার রক্তের ইতিহাস হয়ে আছে।
 
গুরুজনেরা ধমকেছিলেন, বলি, টিঁকবে তো?
যা গড়তে চাইছ?
বলি, রক্ষণাবেক্ষণ আর যোগান! ভুলে গেলে?
ভুলে গেলে যে ঘুমের জন্য লাগে গ্যাংম্যান?
বর্ণমালার জন্য টার্বাইন আর জলাধারের কর্মীদল?
গোধুলির জন্য প্রহরী?
আর নীলকন্ঠ কম্পোজিটর যে বন্ধুত্বের ডায়ালটা গড়ে প্রতিদিন?
বলি ওই যে জীর্ণ হয়না কখনো, আগুনে পোড়ে না,
ওটারও তেল লাগে, গ্রিজ!
বলগুলো বদলাতে হয় মাঝে মাঝে বেদনারও বেয়ারিংয়ের
নইলে শক্তির না দিয়ে নিছক প্যাঁচাল হয়ে ফেঁসে যায়।
 
অফিস বলেছিল, এমনিতেই একটু বেশি বলি, নতুন কী বলি?
সময়ের ডাইরি রাখা যদি ঠিক মত হয়
কথা আর কাজের ফারাকে জীবনে কম লাগে ঘুণ।
ঝুঠো শিলমোহর ছাপিয়ে আয়না হয়ে ওঠে দস্তাবেজ। 

তাও তো পূর্ণতা নেই! রক্তের পুঞ্জিভূত ধুলোয়
ঋতুদের বিভাজনরেখা অস্পষ্ট করছিল কর্মহীনতা, বেকারি।
 
সবশেষে কথা বলেছিল চাষ।
দেশটা দুধ হয় হে, দুধ! পরিশ্রমী সংকল্পের শিষে!
চুপ করে শোনো তার নীরব উৎসার!
 
কবিতা কি শুনেছিল?
 
৩১.৮.১৯৯১

 

 

ভারতবর্ষ বাড়ছে

আমার এক স্বাধীনচেতা মায়ের বিয়ে
কালো বলে যখন এক
দোজবরের সাথে হয়েছিল
তখন যারা ওই কালো ডানপিটে মেয়ের
দুঃখের ঘর ভেঙে দিতে
লিখেছিল বেনামি উড়ো চিঠি,
বেশ্যা বলতে ছাড়ে নি
তাদেরই আজ রমরমা।
 
ভারতবর্ষ তাই বাড়ছে
তিরতির করছে বাড়,
রক্তের ভিতরে অজানা কোষপুঞ্জের মত
কোন দিকে কতটা হবে বিকৃত বিস্ফার
কবে ফিরব নদীর কাছে
মাটির কাছে
প্রশ্ন কোরো না।
 
কোথায় কী নতুন প্রসঙ্গ ঢুকছে প্রাচীন গীতিকায়
কেমনভাবে ঢুকছে
মিশতে হবে হাওয়ায়;
ওবি ভ্যান শুধু অকুস্থলে ঘোরে।
 
৯০-এর দশক

দ্বিধা

হদ্দ কাজ-পাগলী মেয়ের
কাব্যপাঠে করলে এমন ভর!
দ্বিধা! তোমায় চিনলাম!
শিল্পে না হও, সততায় সুন্দর!
 
থাকো প্রথম প্রণয়-নিবেদনের স্বরে
আবিষ্কারের অনির্ণয়ের বন্ধ ঘরে
অনিশ্চিতের ঠিকানাতে ওড়াও চিঠি।
 
জীবনসাথীর কুড়িয়ে দিঠি
সেও চলেছে ক্লান্ত সাঁঝের
বীথিতে তার শব্দ-দোলন,
কাটাকুটি, মনন-প্রয়াস
 
দিনযাপনের বাচালতার
কঠোর অনভ্যাস।
দ্বিধা! নও সত্যে, তবু স্বভাবে সুন্দর।  
 
পাটনা
১৬.৯.২০০৩

সে ও তার চেয়ার

সে নয় তার চেয়ার বলছে!
সে তো সবার সাথেই চলছে!
যেথায় বলবে, যেতে রাজি।
চেয়ারটাই তো আসল পাজি!
চেয়ার হল রাষ্ট্রযন্ত্র।
সে তো বরং সমাজতন্ত্র!
 
কিন্তু চেয়ার দেয় মাইনে।
চেয়ার-স্ত্রোত্র আছে আইনে।
চেয়ার বাঁচিয়ে যে সাহায্য
করতে বলবে হোক অন্যায্য
সব সে তোমার জন্য করবে;
পকেট থেকে চাঁদা ভরবে।
 
চেয়ার গেলে খাবে কী সে?
জর্জর এই বাঁধন-বিষে
কোথায় যাবে পায় না কূল
চেয়ারটি তার চক্ষুশূল!
 
৩১.৭.২০০৫এর কাছাকাছি

 

Monday, October 20, 2025

১৯৭৫ মে

রাতের আলোয় জেগে আছে জনহীন ধানবাদ আউটার রেলব্রিজ
ইয়ার্ডের দশটা ইঞ্জিনের ধোঁয়া উড়ে যাচ্ছে ব্রিজ ভরে ১৯৭৫এর বৈশাখি আকাশে
রং-ওঠা পাতলুন, ছোটভাইয়ের জামা পরে হেঁটে যাচ্ছেন পূর্ণেন্দু মুখার্জি
ব্রিজের এপার থেকে ওপার
 
এশিয়ার হাওয়ায় ফুলে উঠছে তাঁর জামা, তাঁর চুল ওলটপালট,
মাথায় নতুন খবর আরেকটা দ্বীপ মুক্ত হল,
কালকের দিন আরো উজ্জ্বল হবে পৃথিবী আরো কিছুটা এগোল
ব্রিজের এপার থেকে ওপার
 
এগিয়ে যাচ্ছে রাত
মাটির নিচে কোথাও ফিউজের আগুন এগোচ্ছে ডিনামাইটের দিকে
পৃথিবীর কয়েক লক্ষ ইঞ্জিনে নতুন কয়লা ভরা হল
 
এই মুহুর্ত্তে
হিমালয়ের গর্ভ থেকে আরো কিছুটা প্রাগৈতিহাসিক হিম জল
                           বেরিয়ে নেমে আসলো সমতলে বঙ্গোপসাগরের পথে
 
এই মুহুর্ত্তে শহরের ছোট্ট কোনো ঘরে
তাড়াতাড়ি তৈরি হচ্ছে প্যাম্ফলেটের মুসাবিদা
কোথাও দশ জন হয়ত মিলিত শপথ নিয়ে চলে গেল দশ দিকে
ব্রিজের এপার থেকে ওপার
 
১৯৭৫

 

২৭ ডাউন

রাতের সমুদ্রের ভয়াবহ সুন্দর সম্মোহন থেকে পরিচালক
আমার কোনো সমালোচনা
ফেরাতে পারবে না তোমার রক্ত মাংস হাড়
তোমার দুঃস্বপ্ন,
জীবনের প্রবাহকে ছোঁওয়ার তোমার অসফল করুণ কিন্তু কাব্যময় প্রয়াস।
 
তোমার ফিল্মের কয়েকটি দৃশ্যপ্রবাহ
বদলে দিলেও
বদলে যাবে না তোমার নায়কের নিয়তি।
 
তবু অপরাধীরা এখনো রয়েছে চারদিকে।
আর তুমি নিজেকে অপরাধী করে
তাদের লুকিয়ে রাখলে।
আমাদের বোঝাপড়া তাদের সাথে।
 
তোমার মৃত্যু, তোমার ফিল্ম, তোমার নায়কের কুৎসিত নিয়তি
আমাদের ও তাদের মাঝখানে
তাজা রক্তে মাখামাখি
পরিত্যক্ত বধ্যভূমি!
আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে তারাই জহ্লাদ।
 
কেন আর্ট গ্যালারি এত অপ্রাসঙ্গিক?
কেন ভেনাস? হাস্যকরভাবে আজও ভেনাস একদিকে
ও অন্যদিকে
এ্যাসিডপোড়া নারীদেহের বিলাস?
কেন ট্রেনের সংগীতে
মেশিন বেশি প্রবল মানুষের থেকে?
কেন সন্ধ্যা এত প্রাকৃতিক?
সেতু প্রাকৃতিক?
ট্রেনের জানলায় ধাবমান টেলিগ্রাফের তার প্রাকৃতিক?
এমনকি মানুষের প্রবাহ প্রাকৃতিক?
কত শতকের রক্তঘাম লুকিয়ে তবে প্রাকৃতিক?
 
কেন শৈশবের সব ট্রেন
                  এত নিরুদ্দেশগামী?
কেন শৈশবের সব ছবি
                  এত বিষন্ন, অসহায়?
 
কেন ধর্মের কুষ্ঠ আর কুষ্ঠের ধর্মে ভরা একটা শহর
আজও সূর্য পায়
নদী পায়
রুপোলী ঝিলিক, নীল আকাশ আর প্রাচীনত্বের
                                    বাদামী দৃঢ়তা পায়?
 
কেন এত বিচ্ছিন্ন মুখ, এত ভয়ধরানো ভাবে অর্থহীন কথা
ও কালযাপন
লোকাল ট্রেনে, রানিংরুমে, হোটেলে চত্বরে?
 
কেন এ সবকিছু যা ভেঙেচুরে অন্য কিছু হয়ে উঠতে পারতো
তা হয়ে ওঠেনি
                           কেন? কেন?
এসব ফিল্মটার ব্যাপার শুধু নয়
এসব এমনই রয়েছে আমাদের দিনযাপনে আজও
কেন?
 
২৭শে জুলাই ১৯৮৪

Sunday, October 13, 2024

ভুবনেশ্বর - ২৩.৮.১১

ফোনটা পকেটে বাজছে – তুমি ডাকছ;
নতুন শহরে মেঘ। 
কী করলে সারাদিন? কিছু খেয়েছ?
নতুন শহরে বৃষ্টি।
ঝাপসা হল কন্ঠস্বর, দূরত্ব;
নতুন শহরে সন্ধ্যা।
ব্যাস্ততার নৈশ-জলছবি,
আরেকবার ফোনটা বাজার অপেক্ষা।

কাল ভোরবেলা ওঠার চেষ্টা করব।
পিছনের গলিপথ দিয়ে পৌঁছোবো আজ দেখা মাঠটায়।
অপেক্ষা করব ফুটবল পায়ে পায়ে কিশোরদের আসার।
তাদের সামনে রেখে পিছনের বিশাল জলমিনারটার ছবি নেব।
আশা করি ছবিটা ভালো হবে।

Monday, September 30, 2024

স্মৃতি সংগঠিত হও

যদি বল জ্যোৎস্না রাত
চাইব দিদিদের ছায়ায় ভরা জোড়া-ছাতের
 সেই সফেন গুঞ্জন
যার শহর ছিনিয়ে নিয়েছে দেশভাগ।
জ্যোৎস্নায় যে ট্রেনটা গতি কমিয়ে থামল
তার ভিতরে-বাইরের জমজমাট
ঘরে ফেরা ঘামের
অথবা ঘরছাড়া রুটির গন্ধ
টুপটাপ ছড়িয়ে পড়ছে এদিক ওদিক
একটি লন্ঠন ইঞ্জিনের দিকে যাচ্ছে …
যদি বল জ্যোৎস্না রাত
আমি ওই ট্রেনের শূন্য কামরায় সটান শুয়ে
দুপুরের গলিটা ভাবব 
যাতে খেলনাওয়ালা সবুজ করে তুলত
সেই প্রশ্নগুলো যা আমাদের
উত্তরের নিচে পিষছে, অনির্দিষ্ট কোমলতা হয়ে।

২৫.৭.১৯৯৭

Sunday, February 18, 2024

শীতে বৃষ্টি

যেন অগুন্‌তি ঘাড়েচর্বি টেকো, যানজটে স্থির,
রাতপথে সোনালি আলোয় একপ্রস্থ ঘ্যাম গাড়ির অধীর!
মাঝে মধ্যে গামছা ঝাড়ছে ট্রাক
মহাকাশ অনির্বচনীয়। ভারত গিয়েছিল, এবারে পাক। 

নিজ পাড়াটিরো গল্প অঘটন ঘটে গেলে জানি।
যদিও বলতে দেশ,
মানচিত্র কল্প গড়ে বেশ;
কবি বটি গুগ্‌ল কোন ছার!
তবু যদি চাও আরো কিছু শ্যামল উদ্ভাস
নক্ষত্র, সাগর, ঘাস
বলে যাও, তারিফ করবে এই খাক্‌সার।

ছন্দে বেয়াদপি? জানি।
মাফ করো বীণাপাণি!
সব নিয়েই যে ভিজছি
ঝিলিমিলি ট্রাফিক, রেডিও মির্চি।

রকমারি চলছে পিশাচসিদ্ধি!
বাগদাদে, আহমেদাবাদে,
মানুষ মরলো, তার কতগুণ বিষবৃদ্ধি
মগজে, শাসকদের প্রসাদপুলকে,
এই মর্ত্যলোকে,
তার খতিয়ান
আঙুলে জ্বলছে শেষটান। 

বৃষ্টি।
শীতে বৃষ্টি।

২০০৯ -১০ 

রাণার মৃত্যুতে

কুয়াশা তো চিরকাল দৃষ্টিকে আসক্তি দেয় বেশি।
দাম্ভিকের রসায়ন নয়। নৈসর্গিক।
পৃথিবীর ঘাম
কার্বনের ব্যস্ততার কাছে ডাকে।
 
কোনো যুক্তি কুয়াশার সাথে কখনো হারে নি তবু
রাণার মৃত্যুতে সোভিয়েত পতনের ভূমিকা অনিবার্য ভাবায়

 
কত বিবর্ণ আত্মসংহার এই আঠেরো বছরে
বিকৃতির অভিসার, অন্তরালে
হতো কি?
             জীবনের শিশুপাঠে যদি
পৃথিবীর একভাগ স্থলের মতো ওই অভিধা, প্রাণোষ্ণক,
ডাকতো, চলে এসো, আরো প্রশ্নে, অনুধাবনে, আত্মপরিচয়ে, একসাথে …?
 
ডাকতো অনুশীলনে;
অনুশীলনেরই কথা বলি আশা ও নিরাশার কাটাতে এ্যালকোহলিক
কুয়াশাই তবু চিরকাল দৃষ্টিকে আসক্তি দেয় বেশি।

আঠেরো বছরে
ভ্রাতৃঘাতী আত্মপরিচয়ে, সগৌরবে
ক্ষুদ্রতর হয়ে চলেছে মানুষ।

২৩.৬.২০০৮

Friday, December 29, 2023

চলছেই

চলছেই। 

            থেমে আছে এমন

অশথের দুপুরও বলবে না। 

প্রতিদিনই

দেশটা,

রাজধানীতে, জেলায়,

মহকুমায়, তহশীলে,

হাত, মাথা বা পায়ের তাগিদে।

চোখের তাগিদেও, 

                      অবশ্যই। 

অগুনতি যুথবদ্ধ পথচলা

হ্রস্ব কিম্বা দীর্ঘ কোনো কোনোটির

সাড়া

গুহাচিত্রে, হোমাগ্নিতে,

অন্ধকূপে,

           পাগলা হাতির গর্জনে।


আমের বোলে এবছরেও

ভারি হচ্ছে হিন্দের কলম।

 

বিদর্ভের

গোয়ারি মানুষেরা

যে পথ বেয়ে বিধানসভার 

সামনে এসেছিল

সে পথটি কি প্রহেলিকা?

শাসনের তন্ত্রটি,

শক্ত মোটা পরতের ভিতরে পরত,

তার ভিতরে গ্রন্থিপিন্ড, জীবিত ঘিন্‌ঘিনে।

মাছি ঘুরছে, মরছে,

জমছে বহুশতক ধরে।


৮.৩.১৯৯৫




Monday, December 25, 2023

ব্রীজের এপার থেকে ওপার

রাতের আলোয় জেগে আছে জনহীন ধানবাদ আউটার রেলব্রিজ
ইয়ার্ডের দশটা ইঞ্জিনের ধোঁয়া উড়ে যাচ্ছে ব্রিজ ভরে ১৯৭৫এর বৈশাখি আকাশে
রং-ওঠা পাতলুন, ছোটভাইয়ের জামা পরে হেঁটে যাচ্ছেন পূর্ণেন্দু মুখার্জি
ব্রিজের এপার থেকে ওপার …

এশিয়ার হাওয়ায় ফুলে উঠছে তাঁর জামা, তাঁর চুল ওলটপালট,
মাথায় নতুন খবর – আরেকটা দ্বীপ মুক্ত হল,
কালকের দিন আরো উজ্জ্বল হবে – পৃথিবী আরো কিছুটা এগোল
ব্রিজের এপার থেকে ওপার …

এগিয়ে যাচ্ছে রাত –
মাটির নিচে কোথাও ফিউজের আগুন এগোচ্ছে ডিনামাইটের দিকে
পৃথিবীর কয়েক লক্ষ ইঞ্জিনে নতুন কয়লা ভরা হল

এই মুহুর্ত্তে …
হিমালয়ের গর্ভ থেকে আরো কিছুটা প্রাগৈতিহাসিক হিম জল
        বেরিয়ে নেমে আসলো সমতলে বঙ্গোপসাগরের পথে

এই মুহুর্ত্তে শহরের ছোট্ট কোনো ঘরে
তাড়াতাড়ি তৈরি হচ্ছে প্যাম্ফলেটের মুসাবিদা –
কোথাও দশ জন হয়ত মিলিত শপথ নিয়ে চলে গেল দশ দিকে
ব্রিজের এপার থেকে ওপার …


[১৯৭৫ সালের একটা লেখা একটা ছেঁড়া কাগজের বান্ডিলে পেলাম।]




Saturday, December 2, 2023

মরুভূমি

তোমার মরুভূমি তোমায় ডাকে?
যেমন আমায় আমার মরুভূমি
ডানা ঝাপটালেই, জনে-বিহনে
দাঁতে কিচকিচ তামস ধুলোর
 
কী ডাক! অথচ অতল নীরব!
 
ঢেউও তুলবেনা সে অভিমানী,
আমরা গেলে, দেবেনা সাড় তবু
অন্তরে ক্ষীণ দ্যুতি, চাপা কূজন
অপরিণতির। ঠাসা ভূস্তরের
স্থির চাউনি, নিজের অপলাপ,
অনেক ব্যাহত জীবনাভিসার,
মরীচিকায় তার ভুতুড়ে ক্ষয়। 

কী জেদ! যেন অসময় ভালো!
 
২১.৫.৯৫    



নৈঃশব্দের কোলাহল

বেনালিম সমুদ্রতীর থেকে মাডগাঁওয়ের জন্য বেরিয়ে শেষরাতে,
অজানা গ্রামে ঢুকেই হঠাৎ চারদিক থেকে এগোন শুরু করেছিল 
একরাশ কুকুরের গর্জন; অন্ধকারে একটাই বাল্ব জ্বলছিল এক 
বারান্দায়, দেখলাম স্কুলবাড়ি – গেট খুলে মেঝেতে গিয়ে বসলাম।
হেডমাস্টারের বন্ধ ঘরে ঘড়ি বেজে উঠল – রাত তিনটে। …

কোঙ্কণি ভাষার সে গ্রাম এ দেশেরই এক অঞ্চল, যে দেশটাকে 
নতুন করে গড়ার কথায়, আমার ভাষার কাটাকুটিতে ভরা কাগজে
সুদূর গঙ্গাতীরের শহরে আমার ছোট ঘরটা ভরিয়ে রেখেছিলাম।
এটাও বাস্তব যে ভাষারই দূরত্বে, ঈষৎ ভয়ও করছিল আমার –
এক্ষুনি বেরিয়ে এল বোধহয় চোর মারতে দু’দশটা দোনলা। …

বোধহয় ভয়টারই জন্য শুনতে পারছিলাম না সেই অদ্ভুত শব্দ, যেন
বাড়ির ভিতসুদ্ধু জালে টানছিল কারা – মাছ আর গুল্মে ভরা জাল।
বস্তুতঃ স্কুলবাড়িটাকেই টানছিল, পুরোনো, কত প্রজন্মের ছাত্ররা, যারা 
ছড়িয়ে পড়েছিল জীবনে; স্বপ্ন ও স্মৃতি একসাথে টানছিল প্রতিটা ইঁট।

সে টান জানত না, জালের মধ্যিখানে গিয়ে, বসে সিগারেট টানছে
একটি ভিনভাষী – আরবসাগরের নুনে শক্ত প্যান্ট, চামড়ায়, চুলে
বালি আর শঙ্খবীজ, ঠোঁটে তারাদের বিদায়স্পর্শ! … ভুল করে
ঢুকেও পড়তে পারে তাদের স্মৃতিতে, স্বপ্নে, স্কুলবাড়িটার সাথে।

অন্ধকার ছিল গভীর ও উদগ্রীব! যেন কোনো মহাকাব্যের শেষ ক’টি 
পংক্তি লেখা হচ্ছে কোথাও! আকাশে মেঘের ছোট ছোট অনুজ্জ্বল স্তবক 
ভেসে আসছিল, একটু পরে এক বর্ণাঢ্য, মহান ভোরের জন্ম দিতে।




Wednesday, October 25, 2023

অদ্বিতীয় মাইকেল

মাইকেল মধুকবি? হবেনকি দত্তমহাশয়?
প্রমোটারি মন্দ কিসে? হবে তারও নিষ্পত্তি নিশ্চয়।
গুরুতত্ত্বে, দেহতত্ত্বে আপামর শিক্ষিত সমাজ
ইংরেজির দাস; হিন্দি, প্রাণপথ্য সিঞ্চনে দরাজ!
করো দেখি বিনির্মাণ ভাষাপথ, ধ্বনিপথে আঁকো
সমুদ্রে, শরণার্থীতে বিহঙ্গম গড়ো রিক্ত-সাঁকো।
রূপ নয় অরূপেই তবু ভিন্ন কিছু ধাতু পাবে,
যন্ত্রবৃন্দ করোটিতে রোদকীর্ণ স্থাপত্য জাগাবে।
শঙ্খে লৌহে এ নাবিকীর পূর্ব-এশীয় প্রকৃতি;
বাঁধতে পারো কি কাঁটাতারে সম্ভবের পরিমিতি?
যা হবে, যেভাবে তার প্রতিভাষী, গূঢ় প্রতিধ্বনি
ওই শব্দস্পন্দে যেন লিখে চলে প্রবল সিম্ফনি।
এই উপমহাদ্বীপে স্বাধীনতা স্বদেশবহুল!
তারি পর্বে খুঁজি বাংলা, ভেঙেগড়া, সময়সঙ্কুল।

২৬.১.২০০৫

 


Monday, October 16, 2023

রুদ্রজী

এ শহর সেদিন সত্ত্বায়

অনেক বেশি উজ্জীবিত ছিল। 

কবিদের বাড়ি ছিল তীর্থের মতন

এ গলি সে গলি পেরিয়ে,

কাঠচেরাই কিম্বা ট্রেডলের শব্দ চিনে চিনে,

জবাগাছের ডালটা সরিয়ে খোলা দরজার

কড়া নাড়া আরে এস এস!

পরে যাঁরা ইতিহাস হলেন সে কবিরা

লেখকেরা কিম্বা অনুবাদকেরা

সেদিন এ শহরের ভাষায় বসন্ত বাঁধছিলেন।


আপনিও তাঁদেরই মধ্যে ছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয়;

সবাই ছড়িয়ে পড়ল 

                         সময়ে কিম্বা সত্ত্বায়

আপনি রয়ে গেলেন।

ধীরে ধীরে

কষে বাঁধল আপনাকে পরিবারের

জটিলতা, রোজকার রুটির চাবুক।


                                           লড়ে চললেন;

সূর্যউপাসকের শরীর ছিল আপনার,

সাইকেল চালিয়ে যেতেন, প্রুফ দেখে ফিরতেন

অনেক রাতে

কবিতার আসরে আপনি বিস্মৃতি হয়ে পড়ছিলেন।


কেন যেন সবসময় মনে হয় আমি দেখতে পাচ্ছি

বৃষ্টির রাত এগারোটা, ফোঁটাগুলো চিকচিক করছে রাস্তার আলোয়,

ঈষৎ দূরে দীর্ঘদেহী আপনি 

ভেজা ঘিয়ে পাঞ্জাবির ভিতরে ন্যুব্জ কাঁধ, 

সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছেন, 

হঠাৎ কিছুতে জড়িয়ে পড়ে গেলেন,

দপ করে আগুন জ্বলল এক ঝলক শেষ!

দিন আগেই তো বেরিয়েছিল প্রায় তিন দশক পর 

একটি সংগ্রহ আপনার!


১৯.৩.১৯৯৫





Monday, October 2, 2023

নদীতীরে

নদীর অসুখ নদীর নয়,
দু’তীর ভরা বাসিন্দাদের বেঁচে থাকার মুখ।

নিসর্গ থেকে এত পেয়েছে মানুষ,
বলতে পারো লড়েই, কোটি বছর, তবু,
সেই কারণেই, বন্যা এবং খরাও আজ
ঋতুর নয়, বাঁধ প্রকল্পে ভুল,
সেচ বিভাগের চুরি,
সংসদের কানুন আর মালিককূলের লোভ।
নদীর মাথায় শকুন, সেও মাটিরই অসুখ।

নদীর অসুখ অন্যরকম, মাটির মত নয়।
মানুষ আগে নদীর নাম রাখে,
তারপর সেই নামে
চিনিয়ে দেয় মাটি, তার মুখর জীবন।

সব মাটির নদী আছে প্রতিদিনের –
তৃষ্ণানিবারণে, স্নানে, শ্রমের পর গানে,
ফসল কাটতে কাটতে দেওয়া কাস্তেগুলোর শানে,
বুকের ভাষার, হাতের পর হাতের প্রয়োজনে। তাই
নদীর অসুখ বলতে পারো মানুষেরই
নামের কোঁদল, গানের বেসুর, শানে গলদ,
ভাষায় অপহৃত, হাতের প্রয়োজন।

সারাদিনের ব্যস্ততায় একটু ছুটি পেয়ে
আমরা এই মাটি আর নদীর মিলে আসি।

মেঘলা আলো পিছলে নামে ভেজা গুঁড়ির গায়ে।
নরম সময় চড়ুই পাখির বুকের মত গরম।
আমরা দুজন বসে থাকি পুরোনো এক ভাঙা দালান খুঁজে।
সামনে যায় বৃষ্টিকণার ঈষদচ্ছ অযুত ঘোড়সওয়ার
ফেনিল করে নদীর সবুজ বুক।

এই অবসর চিরকালীন – কতক্ষণের চিরকাল?
কোন দেশের এই অবসর? কোন যুদ্ধের পরের?
কোন ক্লান্তির পরের? তোমার মুখের দিকে তাকাই।
তোমার মুখটা এত প্রিয়। না হতো যদি?
প্রশ্ন করো,
“দেরি করলে কেন!” ... 
কিভাবে আসতাম। ঘড়ি স্পষ্ট নয়।
গুলিবিদ্ধ রক্তও ভুল সময় দেয় যখন,
জখম দাগে মাথায়, শিশুর হাসিমুখ।

২১শে জুলাই ১৯৮৫



Tuesday, July 18, 2023

বন্ধুত্ব

হয়ত কথা আমারই ছিল খারাপ। 
রাগে ক্ষোভে হাঁকল বন্ধু, “বেরো”! 
আমিও ক্ষেপে বেরিয়ে গেলাম পথে। 
সিঁড়ি ভেঙে দু'পা গিয়েই রোদ।

রাস্তা, বাজার, পানদোকানে আয়না –
সেলফি দেখি পৃথিবীর চালচিত্রে।

এগোবো? আরো দু'পা?
                          পা ফেলতেই রাত।
সারাটা রাত, অনুশোচনায় দগ্ধ। 
সারাটা রাত, ফাঁকা টিনের শব্দ।

জীবন বড় রূঢ় - বাঁকা হাসল। 
“ফিরতে হবে”, বলে আয়না কাশল।



Thursday, March 23, 2023

বিকেলে এসো

তোমার হাতেই হাত দশ-জনার।
সংগঠনের ডাকে
টালবাহানার আগে   
ভেবো তাদের নাম-ধাম-সংসার।  
 
এগারো দশও হয়, হতেই পারে।
তাবলে বন্ধুমুখ
হারিয়ে যাবে? অসুখ  
ভীড় না হওয়ার চেষ্টাতেই তো সারে!
 
না যদি আসো, এড়িয়ে যাও,
দুপুরে রোজ সাথে
খাওয়া রুটির স্বাদে,
বুকের তেতো, কষাবে মুখটাও।
 
না এলে সবাই একটু হারব।
এলে সভার শেষে
ছড়িয়ে রুমাল পেতে
ইয়ারির মুড়ি জম্পেশ করে মাখব।     

২৬.৯.৮৫/২৩.৪.২২/২১.৩.২৩