Showing posts with label Sirir mukhe ghor. Show all posts
Showing posts with label Sirir mukhe ghor. Show all posts

Wednesday, July 14, 2021

উত্তরণ

             অত বড় তো নয়ই, কোনো ছোটো গাড়িও গলির ভিতর ঢোকে না। তাই গলির ছেলে তিনটে যখন ছুটে এসে, “কাকী, বিরাট গাড়িতে করে এসেছে। আপনার নাম বলে, বাড়ি জানতে চাইছিল… আসছে” খবর দিয়ে আবার ছুটে চলে গেল গাড়ির বহর দেখতে, সাবিত্রীও কাগজপত্র সরিয়ে বাইরের দরজায় গিয়ে মুখ বার করে বাঁদিকে তাকাল।

গলির মুখে চারজন। একজন ধোপদুরস্ত সাদা খাদির কুর্তাপায়জামা, আরেকজন একটু সাধারণ কুর্তাপায়জামা আর বাকি দুজন জিন্স; একজন গেঞ্জি, একজন শার্ট। ওই সাধারণ কুর্তাপায়জামাটিকে দেখেই চমকে উঠল সাবিত্রী।

ওই তো মেডিয়েটর ছিল!

 

তিন বছর আগেকার কথা। একদিন রাতে দোকান বন্ধ করে সাবিত্রীর স্বামী শ্যামবাহাদুর বাড়ি ফিরল না। সারা রাত ফিরল না। আশেপাশের দোকানের মালিক, যাদের টেলিফোন নম্বর বাড়িতে ছিল, তাদের কাছে ফোন করে কোনো হদিশ পাওয়া গেল না। পরের দিন সকালে দোকানের কাছে গিয়ে, আশে পাশের কর্মচারীদের জিজ্ঞেস করেও কোনো তথ্য পেল না। বাড়িতে মানুষ বলতে বুড়ি শ্বাশুড়ি, সাবিত্রীর শিশুপুত্র, যে এখনো স্কুলে যাওয়া শুরু করে নি আর সাবিত্রী। অগত্যা,  নিজের উদ্ভ্রান্ত অবস্থাটা চোখমুখ, উস্কোখুস্কো চুল থেকে সরিয়ে শ্বাশুড়িকে সান্ত্বনা দিল। ছেলেকে তাঁর জিম্মায় রেখে পুলিস থানায় খবর দিতে বেরোবে, তখনই ফোন এল। ছুটে ফোনটা ধরল সাবিত্রী। অচেনা কন্ঠস্বর, হুমকি তারপর তার স্বামীর কন্ঠস্বর…।

 

টাকা! সে তো জানেও না তার স্বামী টাকা কোথায় রাখে! আর অত টাকা! সে জানে না অথচ কিডন্যাপাররা জানে তার স্বামী দশ লাখ টাকার মালিক! বা হয়তো এই বাড়িটার দাম যোগ করে! কে জানে। ওরা বলছে পুলিসে খবর দিলে প্রাণের আশঙ্কা। কিন্তু তাহলে কাকে খবর দেবে সে?

 

কিন্তু খবর তো দিতেই হবে! সবচেয়ে আগে নিজের বাপের বাড়িতে দাদার মোবাইলে খবর দিল। ওরা বলল ওরা আসছে এক্ষুণি, কোথাও না বেরোতে। কিন্তু সাবিত্রীর কে জানে কেন মনে হল তাকে বেরোতেই হবে। নইলে স্বামীকে ফেরাতে অসফল হবে সে। একটু পরেই ঘরটা ভরে উঠবে মানুষজনে। তখন সে হারিয়ে যাবে। আর তাহলে হারিয়ে যাবে তার স্বামী – তার ছেলে! কেন হারিয়ে যাবে? হারিয়ে যাওয়া মানে?

 

জানতো না। কিন্তু সে বেরিয়ে গেল। এই এলাকার থানাটাও তো সে তখন চেনে না। কখনো প্রয়োজন হয় নি। বড় রাস্তায় উঠে, অপরিচিত দুএকজনকে, যতটা পারা যায় স্বাভাবিক কন্ঠস্বরে জিজ্ঞেস করে করে থানায় পৌঁছোলো। বড়বাবু বয়স্ক বিচক্ষণ লোক। সামনের চেয়ারে মহিলাটির উদ্ভ্রান্তের মত এসে ধপ করে বসে পড়া আর মাথা নিচু করে চুপ থাকা দেখে প্রথমে ভিতর দিকে হাঁক দিয়ে এক গ্লাস জল আনতে বললেন। মহিলাটি গ্লাস খালি করে দিল ঢকঢক করে। তার মানে বিপর্যয়েও আত্মস্থ থাকতে জানে।

 

-   কী হয়েছে বলুন তো! (মহিলা চুপ করে আছেন দেখে একটু ইতস্ততঃ করে) কেউ পুলিসকে না বলার জন্য সাবধান করে থাকলেও না বললে কি চলবে? আপনিই ভেবে দেখুন।

ব্যাস। ওষুধ পড়ার মত কাজ হল। মহিলা গড়গড় করে যা কিছু বলা সম্ভব বলে গেলেন।

 

তারপর তো সে এক কাহিনী। ওই বড়বাবুই, হয়তো নিজের মেয়ের বয়সী বলে মায়ায় পড়ে লাগাতার সাহায্য করে গেলেন। পনেরো কুড়ি দিন পরেও যখন বিশেষ কিছু কাজ হল না, তখন ওই বড়বাবুই সদুপদেশ দিলেন, গলির সবাইকে, অন্ততঃ যারা যারা সই করতে রাজি হয় তাদের সবাইকে দিয়ে সই করিয়ে একটা গণ-আর্জি দিতে সিনিয়র এসপিকে। মহিলা আয়োগের ঠিকানা বলে দিলেন। পাড়ার একটি ছেলে, উঠতি নেতা, মাঝে মধ্যেই থানায়, সরকারি দপ্তরগুলোয় ছুটোছুটি করে, তাকে ধমক দিয়ে বললেন পীড়িতা মহিলা ও আরো কয়েকজনকে নিয়ে বড় নেতাদের কাছে যেতে, পুলিস বীট করা সাংবাদিকদের বললেন ইস্যুটাকে হাইলাইট করতে। কিছু আর বাকি রাখলেন না।

 

ওদিকে সাবিত্রীর বাপের বাড়ির মানুষেরা তো ভয় পেয়েই অস্থির! দাদাকে তো বেশি চিন্তিত মনে হল এই ভয়ে যে টাকাটা না তাদের ঘর থেকে গুনতে হয়।

 

আর সাবিত্রী। এত জায়গায় গেল, এত ছুটোছুটি করল তিন মাস যে ধীরে ধীরে কখন যে উদ্ভ্রান্ত ভাবটা উবে গেল, তার বদলে এল একটা সামাজিক কর্মীর মনোভাব, যেন তার স্বামী কিডন্যাপ্‌ড্‌ নয়, অন্য কেউ, যার জন্য সে অক্লান্ত চেষ্টা চালিয়ে চলেছে, কেননা এটাই তার জীবনের কাজ। থানার বড়বাবুও অবাক হয়ে যাচ্ছিলেন মহিলাটির আত্মসংযম, জেদ আর প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অলিগলিতে চলার ক্ষমতা দেখে।

 

শেষে একটা ডীল হল। যে টাকার ডীল হল সেটা তার আয়ত্তের মধ্যে ছিল। নিজের গয়না বেচে আর বাজার থেকে কিছু ধারকর্জ উঠিয়ে পাওয়া গেল। বাড়ির লোকেদের কিচ্ছু বলল না এই ডীলের বিষয়ে। সবাই জানল যে দোকানের রোজগার নেই - বাড়ির খরচ, শ্বাশুড়ির চিকিৎসা, ছেলের পড়াশুনো ইত্যাদিতেই যাচ্ছে টাকাগুলো। ডীলটা হল কেননা, পুলিস পৌঁছে গিয়েছিল কিডন্যাপারদের ঘাড়ের ওপর। কিন্তু সোজা ঝাঁপিয়ে পড়লে ভিক্টিমের প্রাণসংশয় হতে পারে, তাই পুলিস নেপথ্যে রইল।

আর ডীল চলাকালীনই সাবিত্রী প্রথম দেখেছিল এই মেডিয়েটরটিকে। যে এখন আরো তিনজনের সাথে গলিতে এগিয়ে আসছে।

 

কী করবে সাবিত্রী? শ্যামবাহাদুর দোকান বন্ধ করে দিয়েছে আজকাল। মদ খাওয়াও ছেড়ে দিয়েছে। সেদিন রাতে দোকান থেকে ফেরার পর মদের ঠেকে যদি না যেত, হয়তো ঘটতই না ঘটনাটা।… একটা আয়ুর্বেদিক ওষুধ কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউটরশিপ নিয়েছে – সকাল থেকে রাত অব্দি ঘোরে একজন কর্মচারিকে স্কুটারের পিছনে বসিয়ে। প্রথমে বলেছিল চলে যাবে কোডারমা। ওখানে নতুন করে জীবন গড়বে। আত্মীয়স্বজনেরা আছে। সাবিত্রী রাজি হয় নি।

 

বস্তুতঃ সাবিত্রীও এখন একটা স্কুলে কাজ করে। আর তাছাড়া আয়েষাদিদির কাজগুলো তো আছেই। আয়েষা খানম মহিলা আয়োগের সদস্যা। তার সাথে পরিচয় হয়েছিল সেই প্রথমবার মহিলা আয়োগের চেয়ারম্যানের সাথে দেখা করতে যাওয়ার দিন। এখন ভালো বন্ধুত্ব। আয়েষা তাকে আয়োগের অফিসসংক্রান্ত নানারকম কাজ দেন। সে বেশ সুষ্ঠুভাবে সেগুলো করে। শুধু সেটুকুই নয়। বলতে গেলে সে এখন এই পাড়ার সর্বজনপরিচিত সামাজিক কর্মী। সবার কাজে লাগতে এগিয়ে থাকে।

 

কী করবে সাবিত্রী? ওরা আসছে কেন? হঠাৎ বুকটা কেঁপে উঠল তার বহুদিন পর। ছেলে হস্টেলে থেকে পড়াশুনো করছে রাঁচিতে। যদিও প্রায় অসম্ভব, তবু, তার কিছু হয় নি তো?

শ্বাশুড়িমা ভিতরের ঘরে কাতরাচ্ছেন, শব্দ শোনা যাচ্ছে।

যাই হয়ে থাকুক, সামনাসামনি দাঁড়াতে হবে। সাবিত্রী পুরো শরীরটা দরজা থেকে বার করে যাতে দূর থেকে দেখা যায় সেভাবে দাঁড়ালো। ওরা এসে পড়েছে। এখন কাউকে ফোন করতে যাওয়া ভূল হবে!

 

দশ হাত দূর থেকেই চারজন নমষ্কার করতে শুরু করলো। নমষ্কারের কী বহর!

-   ম্যাডাম, আপনার সাথেই দেখা করতে এসেছি। (ধোপদুরস্ত বলল; সাবিত্রী মুখে না চেনার ভাব দেখে মেডিয়েটর পরিচয় করিয়ে দিল)

-   ইনি মাননীয় প্রিয়রঞ্জন অশোক, … দলের জেলা সভাপতি।

-   ও। নমষ্কার। (কেন এসেছে জিজ্ঞেস করলে উত্তেজনা আর আশঙ্কা ধরা পড়ে যেতে পারে, সাবিত্রী ভাবল) আসুন। বসুন ভিতরে এসে!

 

ভিতরে এসে বসল ওরা। দুজন খাটের ওপর, সাবিত্রীর কাগজপত্রগুলোর পাশে, আর দুজন দুটো প্লাস্টিকের চেয়ারে। সাবিত্রীর জন্য একটা স্টুল বাঁচছে দেখে জিন্সগেঞ্জি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আপনি এই চেয়ারে বসুন ম্যাডাম” বলে চেয়ারটা ঠেলে এগিয়ে স্টুলটা নিজের দিকে টেনে নিল।

 

-   (মাথাটাকে সম্পূর্ণ ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করতে করতে হাতের মোবাইলটা চেপে ধরল; সেসব দিনে তার মোবাইল-টোবাইল ছিল না, শ্যামবাহাদুরের মোবাইল ছিল শ্যামবাহাদুরের কাছে; পরে পুলিস বলেছিল ওই মোবাইল থেকেই নাকি কিডন্যাপাররা ফোন করেছিল প্রথম) আপনারা চা খাবেন তো। একটু বসুন, ব্যবস্থা করে আসি।

-   (আবার হাতজোড়) না ম্যাডাম, প্লীজ! একটা জরুরী কথা বলেই আমরা চলে যাব।

 

তখনি একটা ফোন কল আসে সাবিত্রীর মোবাইলে। সাবিত্রী কানে লাগায় ফোনটা। থানার সেই বড়বাবু। “ওরা পৌঁছে গেছে আপনার বাড়িতে?” সাবিত্রী আন্দাজ করতে পারে। বড়বাবু তো আর তার আত্মীয়স্বজনের পৌঁছনো নিয়ে চিন্তিত হবেন না। ছোট্টো করে “হুঁ” জানায়। “কী ধৃষ্টতা দেখুন। হারামজাদা। ওই অশোকই ছিল কিডন্যাপিংটার রিংলীডার। এখন ঠিকেদারী আর নেতাগিরি ধরেছে।… সাবধানে থাকবেন”। আবার একটা ছোট্টো “হুঁ” বলে ফোনটা কেটে দিল। তারপর সোজা চোখে ধোপদুরস্তের দিকে তাকাল।

 

-   (উৎকন্ঠা চেপে) জরুরি কথা!

-   একটা প্রস্তাব।

-   !!!

-   দেখুন আমাদের পার্টির জনমত বলছে যে এই পুরো এলাকায় আজ আপনি সবচেয়ে জনপ্রিয় মহিলা। মানুষ আপনাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে। যুবা কর্মী, হিম্মত রয়েছে, সবার কাজে কর্মে সব সময় এগিয়ে থাকেন। তাই আমাদের পার্টির তরফ থেকে আমরা আপনাকে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করাতে চাই। আমরা পুরো ভরসা নিয়ে এসেছি যে আপনি না করবেন না।

-   !!!

-   আপনি জিতবেন। এখন যিনি ওয়ার্ড কাউন্সিলর, তাঁর যে কিছুই করার মানসিকতাটুকুও নেই তা এখানকার জনতা বুঝে গেছে। আপনার স্বামীর কিডন্যাপিংএর সময় কী হল? উনি একবারও গেলেন আইজি, ডিআইজি বা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে? এমনকি সিনিওর এসপির কাছেও আপনি নিজে গেলেন। মহিলা আয়োগে গেলেন। আয়েষাজী সাহায্য করলেন। আর থানার বড়বাবু, বিচক্ষণ ব্যক্তি, উনি আপনাকে পথ দেখালেন। (সাবিত্রী ইষৎ ভীত, বিস্মিত এবং কিছুটা চমৎকৃতও হয়ে উঠছিলঃ সমস্ত খবর নখদর্পণে লোকটার, আর নিজেরই করা অপরাধটার কথা বলতে গিয়ে গলাটা একবার কাঁপলনা পর্যন্ত!) এক্ষুণি সম্মতি চাইছি না আপনার। ভেবে নিন। শ্যামবাহাদুরজীর অনুমতি নিয়ে নিন। আমাদের ভারতীয় সমাজে এই অনুমতিটাও তো জরুরি। ঘরে শ্বাশুড়িমাও আছেন। কিন্তু ম্যাডাম, (আবার হাতজোড় করে) আমাদের নিরাশ করবেন না, এই অনুরোধ!

………

এবার আমাদের অনুমতি দিন। আপনার সময় কিছুটা নষ্ট করলাম ক্ষমা করবেন।… চা খাব না বলেছি, তবে একটু জল খাওয়াতে পারেন; খুব তেষ্টা পেয়েছে।

 

সাবিত্রী জল আনতে ভিতরে যায়। একটা জগে জল আর ট্রেতে চারটে গেলাস নিয়ে ঘরে ঢোকার মুখে চকিতে দেখে নেয় চারদিক, বিশেষকরে খাটের একদিকে রাখা কাগজপত্রগুলো। নাঃ, ছোঁয়নি কিছু। যেমন ছিল তেমনই বসে আছে চারজন।

 

ওরা বেরিয়ে যায়। জিন্সগেঞ্জি আবার চেয়ার আর টুলটা যথাস্থানে ঘুরিয়ে রেখে যায়। সাবিত্রী দরজা অব্দি গিয়ে ওদের যাওয়ার পথটা দেখতে থাকে। তারপর দরজাটা বন্ধ করে যায় নিজের শোবার ঘরে।

 

আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সকালের মুখ। চান হয় নি। কপালে টিপটাও নেই। সাবিত্রী চুলটায় চিরুনি বোলায়, সামনের দিকটায় ইষৎ। দেরাজ থেকে টিপের স্ট্রিপগুলো বার করে একটা বড় মেরুন টিপ পছন্দ করে। মুখটা আয়নার আরো সামনে নিয়ে গিয়ে কপালে টিপটা জায়গামত সাঁটায়। তারপর চিবুক উঠিয়ে গলায় পরা সরু সোনার হারটা দেখে।

এই হারটা সদ্য কিনে দিয়েছে শ্যামবাহাদুর। এখনো তিন বছর আগে নেওয়া ধারকর্জগুলো পুরোটা শোধ হয় নি। দোকান বেচার টাকা পুরোটাই লেগেছে নতুন ব্যবসায়। তবু, বৌয়ের একদম খালি গলা যেন অপরাধবোধ জাগিয়ে তুলছিল শ্যামবাহাদুরের মধ্যে। আর তার বৌ কি যে সে মানুষ! গলিতে, মোড়ে তার বৌয়েরই প্রশংসা। আর সত্যি তো, সাবিত্রী ঝাঁপিয়ে না পড়লে, অবলা হয়ে ঘরে বসে থাকলে শ্যামবাহাদুর প্রাণে বাঁচতো কি না সন্দেহ।

 

এই হারটা তার বড় পুরষ্কার! তার নতুন জীবনের প্রতি তার স্বামীর অকুন্ঠ সমর্থন! সাবিত্রী ভাবে। তখনি তার নিঃশ্বাসে ভাপালো, অস্পষ্ট হয়ে ওঠে আয়নায় তার মুখ। আঁচল দিয়ে ঘষে ঘষে আয়নাটা পরিষ্কার করে সাবিত্রী। নিজের মুখটা স্পষ্ট করে তার ওপর চোখ রাখে।

সত্যিই কি কোনো বৃহত্তর জীবন তাকে ডাকছে? নাকি প্রতিশোধের একটা সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে? কিন্তু সে জানে যে সেটা সৎপথে সম্ভব নয়। তাহলে ভালোবাসা? তার প্রতি মানুষজনের শ্রদ্ধা? কাকে জিজ্ঞেস করবে সে? দারোগাসাহেবকে, আয়েষাদিদিকে, না তার স্বামীকে?

যদি এগোয়, শেষ অঙ্কে কে কার প্রতিশোধ নেবে? সে, তার জীবনে তিন বছর আগে আসা দুর্যোগের? নাকি এক দুর্বৃত্ত রাষ্ট্রশক্তি, বিগত তিন বছর ধরে তার এক নতুন, সংগ্রামী পথে চলার চেষ্টার? আর তাহলে যে অকুন্ঠ ভালোবাসা আজ আছে, তার আর শ্যামবাহাদুরের মধ্যে, সেটাও কি কাল থাকবে?   

 

 

 

 

 

 

টিট্টিভ

          অমরকন্টক। দুই নদীর উৎসমুখ।

পূর্বদিকে সোন। উৎসমুখটা তো মন্দিরের কব্জায়। মন্দিরের ভিতর থেকে কিছুদূর গিয়ে ক্ষীণ ধারা সোজা সাড়ে তিনশো ফুট নিচে নেমেছে (উপুড় হয়ে শুয়ে সেখানে ঠোঁট নিয়ে গিয়ে জল খেয়েছি, ভাবতে পারো?)। বিন্ধের পাহাড়শ্রেণী এঁকেবেঁকে পেরোতে পেরোতে, রাস্তায় জলধারা সংগ্রহ করতে করতে শেষে বিহারে, কোইল্‌ওয়রের কাছে গঙ্গায় মিশেছে। 

আর পশ্চিমদিকে নর্মদা। জঙ্গলে যেখানে ঝরনা হয়ে নামছে তার পিছনে একটা ছোট্টো গুহা ছিল, অবশ্য সিনেমার মত নয়, ভিতরে কোথাও যায় না, একটা পুজোর জায়গা ছিল; গিয়েছিলাম সেখানে – জলের পর্দার ভিতর দিয়ে শালবন, কেমন দেখতে লেগেছিল অবশ্য মনে নেই। নদীটি প্রথম থেকেই গায়েগতরে সোন থেকে বেশি। সাতপুরা পাহাড়শ্রেণী ঠিক ওভাবেই পেরোতে পেরোতে, বরং নিজের এলাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী হতে হতে শেষে গুজরাটে। সোজা সমুদ্রেই গিয়ে পড়ে বোধহয়! আরবসাগরে? ছিয়াত্তরের ফেব্রুয়ারিতে সন্ধ্যায় বাস থেকে নামার সময় ঠিক মনে পড়ে নি।

সত্যি বলতে, কোনো নদীর কথাই মনে ছিল না তখন। মনে ছিল শুধু ওই ছেলেটির কথা। সকালে জব্বলপুর বাসস্ট্যান্ডে, প্রতিবাস-একটাকা-মজুরির-বদলে-সওয়ারি-ডাকা যে বাচ্চা ছেলেটির সস্নেহ থাপ্পড় পড়ছিল বাসটার গায়ে, “যা রে বুঢ়ি মাই, কাশি টাশি বন্ধ কর এবার! সওয়ারি ফুল! স্টার্ট নে আর বেরিয়ে যা!… অমরকন্টক! অমরকন্টক! ক্র্যাকমেল! আসুন! আসুন! 

এর বয়সেরই বাচ্চা ছেলের পুরো একটা দল দেখেছিলাম আগের দিন ধুঁয়াধার জলপ্রপাতে। আমরা এপারে, ওরা ওপারে। মার্চ মাস, নদীর ধারা শীর্ণ; হয়ত পাথরে পাথরে টপকে ওপারে চলে গেছে। চিৎকার করে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ছিল, চারআনার সিকি ফেলুন প্রপাতের নিচে। লোকে ফেলছিল, যেখানে জল পড়ছে ধোঁয়া হয়ে – ওরা ঝাঁপ দিয়ে পড়ছিল সিকির সাথে সাথে, জলে ডুব দিয়ে উঠিয়ে আনছিল।

একেই কি বলে জীবনের সাথে মরণখেলা? অমরকন্টকে নেমে মনে ছিল সেই ছেলেগুলোও।

পুরো রাস্তায় ‘বুঢ়ি মাই’ কোথাও বেগড়বাঁই করেনি। নিজের লজ্ঝড় শরীরে গোঁ গোঁ শব্দ তুলতে তুলতে পার করেছে, সাতপুরার ভিতর দিয়ে দীর্ঘ উপত্যকাপথ। মাঝে মধ্যে নির্জন পাহাড়তলিতে থেমেছে। দূরের লোকালয়গুলোতে যাওয়ার জন্য দু’একজন স্থানীয় সওয়ারিকে নামিয়েছে।

অমরকন্টকে পৌঁছে বাস যেখানে নামাল, তার পাশেই সন্ধ্যারাতের ভাঙাহাট। একটা ভাতরুটির দোকান। চা’ও পাওয়া যায়। ফর্সা মোটা মহিলাটি বললেন, সামনেই মন্দির, ওরা জায়গা দিয়ে দেবে। চোখে পড়ল একটি ফুটফুটে সুন্দরী কিশোরী ভিতরে খাটে বসে লেখাপড়া করছে। সেই এসে চা করে দিল।

মন্দিরের পুজারীজি একটা আস্ত ভাঙা ঘর দিলেন। ঘরের মেঝে ওপড়ানো, একটা বন্ধ জানলা, একটা বাল্ব, ছ’ফুট বাই ন’ফুট দেয়াল। কম্বল আর বাক্স রেখে ফিরে গেলাম দোকানে।

মা রুটি করছিলেন; সেই মেয়েটিই, সুমন, শালপাতার দোনায় আলুর তরকারি আর রুটি এনে রাখল বেঞ্চের ওপর। মেয়েটির মুখের দিকে তাকালাম। মনে পড়ল পারুল বোনের কথা। দেখব নাকি এক্ষুণি ভেড়াঘাটের ওই ছেলেদের দলটাকে, আর বাসস্ট্যান্ডের ওই ছেলেটাকে! ঢুকবে ওরা রাতের নিশুতি পেরিয়ে দোকানে?

রাত্রে মন্দিরের ওই ঘর থেকে জানলা টপকে জংগলে নেমেছিলাম একবার। উপরে তাকিয়ে অজস্র তারার ঝাঁকের যেন শিশিরে ভিজবার শব্দ শুনলাম, মুড়ি দুধে ভিজতে থাকলে যেমন হয়।

শেষরাত। ছুট দিলাম। অনেকখানি শালবনের চড়াই উৎরাই পেরোতে আলো ফুটতে শুরু করল। যখন পৌঁছোলাম!… এ কোথায় পৌঁছোলাম! আদিগন্ত বিস্তৃত জমাট কালো সমুদ্রের তরঙ্গরাজি! এই তাহলে বিন্ধ্য পর্বতমালা? আর তার শেষ প্রান্ত থেকে এক লাফে আকাশ বিকীর্ণ করে ঝলসে উঠছে সাদা সুর্য! যেহেতু ধুলো নেই, মেঘ নেই তাই আকাশে কোথাও লাল, গোলাপি, কমলার বর্ণবিচ্ছুরণও নেই।

ফিরছিলাম। হঠাৎ ঘাসের ওপর দেখি নৃত্যরত একটি টিট্টিভ! …

একটু পরে বাস আসবে শহডোল হয়ে অনুপপুর যাওয়ার। হাতে বাক্স, কাঁধে কম্বল, পৌঁছোলাম দোকানটায়, জলখাবার খেতে। সুমন পড়ছে। নাঃ, ভাইগুলো আসার সময় পায় নি।

যদি ভাইগুলো আসত? ধুঁয়াধার থেকে নিয়ে এসে মেয়েটির কোঁচড়ে ঢালত কয়েক মুঠো ভেজা নুড়ি? জব্বলপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে কিনে নিয়ে আসত লজেন্স? নাকি মেয়েটিই যাবে কোনোদিন?

দেখা তো হয়েছিলই। কে কাকে কিভাবে চিনেছিল? নাকি আদৌ চেনেনি?

___________________

পিছনের ব্যালকনিতে রোদ

 রোদ বলতে রোদ! শীতকালে দক্ষিণায়নে সূর্য! আর তার ভরা রোদ পিঠের ওপর। এই রোদটুকু এই ফ্ল্যাটবাড়ির সবচেয়ে বড় পাওনা। “কিন্তু পাওনা হলে কী হবে। প্রথম বেশ কয়েক বছর তো বসতেই ভয় করত। এই বুঝি পিছনের বড়বাড়ি থেকে চাকর নালিশ নিয়ে আসে – কেন বসেছ!”

প্রতিমা বলেন তাঁর বান্ধবীকে, “প্রায় সে রকমই ব্যাপার ছিল ভাই। না, মানে আমাদের সাথে কিছু নয়, কিন্তু পরিস্থিতিটা বোঝ। বলতে গেলে একটা গ্রাম ছিল পাড়াটা। গ্রামের মুখিয়া না হোক, মুখপাত্রও না হোক, কিন্তু ধনবলে আর কুকীর্ত্তির দৌলতে এই বড়বাড়ি আর তার মালিক ছিল পাড়ার মুখ। মানে, এখনও আছে, তবে এখন অন্যরকম। সেসময় তো কোথায় ফ্ল্যাট কিনেছি বললে প্রথম প্রশ্ন করত ‘ওখানেই ওমুকের বাড়ি না? ওখানে কেন নিলেন?’ বোঝো ঠ্যালা! যা সাধ্যে কুলোয় তার মধ্যেই তো ব্যাবস্থা করতে হত মাথা গোঁজার একটা ঠাঁইয়ের! ওরও তো বয়স হচ্ছে। তখন না করলে আর বোধহয় হতই না!”

-      কুকীর্ত্তির কথা কী বললে?

-      সে লম্বা রহস্যময় ফিরিস্তি। (গলাটা নামিয়ে)জুয়ার ঠেক, মদের ব্যাবসা, বন্দুকের চোরাচালান, হয়ত দু’একটা খুনটুনও …

-      সে কি!

-      তবে আমাদের সাথে কক্ষনো খারাপ ব্যবহার করেনি ওদের বাড়ির কেউ। বাড়ির মেয়েরা ছাদে এলে আমার ছেলেটার সাথে হেসে কথা বলত, ডাকত নিজেদের বাড়িতে। বরং, শহরের ভালো ভালো পাড়ায় রাতের দিকে রংবাজি, ছিনতাই, মেয়েদের দেখে টিটকিরি এসবের ঝামেলা বাড়লেও আমাদের পাড়ার গলিটায় কখনো কিচ্ছু হয়নি। সেটাও ওই বড়বাড়ির দৌলতে।

                *                 *                 *         

-      সে আপনি বলছেন বলুন! কিন্তু বিল্ডার যেভাবে ঠকিয়েছে আমাদের! জল নিকাশির ব্যবস্থায় কারচুপি, জেনারেটরে কারচুপি, পার্কিং স্পেসে কারচুপি… সমস্যাগুলো প্রতিদিন ফেস করতে করতে তো নাজেহাল হয়ে যেতে হচ্ছে! আপনারা বলছেন এসোসিয়েশন, কী করল এসোসিয়েশন এতদিনে? আবার তার ওপর এই হাঙ্গামা! এতো বাড়তে বাড়তে এক্কেবারে খুনোখুনিতে দাঁড়াবে। আমার গিন্নি তো ফ্ল্যাট বিক্রি করে চলে যাওয়ার কথা বলছে।

মিটিং চলছিল ফ্ল্যাটমালিকদের এসোসিয়েশনের। বিল্ডার আসবে বলেও আসেনি। ফ্ল্যাটমালিকদেরও
অনেকেই আসেনি। মিটিংএর এজেন্ডা তিনটে।

১। ফ্ল্যাট সংখ্যা ৪০৫এর ছোটো ছেলেকে বড়বাড়ির মেজছেলে বেধড়ক পিটিয়ে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে, তার একটা বিহিত করা।

২। জলনিকাশির ব্যবস্থার এপ্রুভড প্ল্যানে দশইঞ্চির পাইপ বড়রাস্তা অব্দি টেনে নিয়ে গিয়ে বড়নালার সাথে মেলানোর কথা ছিল, কিন্তু বিল্ডার সহজ পন্থা নিয়েছে – পিছন দিকে পাইপ টেনে নিয়ে পঞ্চায়তী নালায় ফেলেছে – নালা উপচে পড়ে ডুবিয়ে দিয়েছে আশেপাশের বাড়ির একতলার মেঝে; তার একটা তাৎক্ষণিক বিহিত করা কেননা গ্রামের লোকেরা মারমুখি হয়ে আছে, বড়বাড়ির বড়মালিক রিভলবার হাতে নিয়ে এসে শাসিয়ে দিয়ে গেছে।

৩। ফ্ল্যাটবাড়ির বাচ্চাদের ছাতে খেলতে মানা করা কেননা বড়বাড়ি থেকে নালিশ এসেছে যে ওরা ঢিলপাটকেল ছোঁড়াছুঁড়ি করে যার দু’একটা বড়বাড়ির উঠোনে গিয়ে পড়েছে। নিচে, বেসমেন্টে খেললেও বাচ্চাদের মানা করা যে বেশি হাল্লা যেন না হয়, কেননা তাহলে বড়মালিকের ঘুমের ব্যাঘাত হয়।

এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ভিন্ন রাজ্যে সরকারি আমলা। উৎসাহী মানুষ। সবাইকার পিলে চমকালেন, “আরেকটা এজেন্ডা রাখুন, এবারের হোলিতে বিকেলে আমরা বড়মালিকের সঙ্গে আবির খেলতে যাব। সবাই যাব!” 

                *                 *                 *          

এ এক্কেবারে অবস্থান ধর্মঘট। বিল্ডারের বাড়ির সামনে সকাল থেকে ছুটি নিয়ে বসে আছে ফ্ল্যাটমালিকেরা। বাড়িতে বিল্ডার নেই, পুরুষমানুষও কেউ নেই। কাজেই বাড়ির বাইরেই ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকা অথবা বসা। শুধু মিডিয়া কভারেজেরই যা কমতি।

-      এটা কোনো সমাধান নয়। মিছিমিছি ছুটি গেল একদিনের। দুটো বাজতে চলল। আদৌ আসবে কিনা কে জানে।

-      কী করতেন বলুন। অফিসে তো এতবার গেলাম। দেখা পাওয়া যায়না। যা কিছু ঘোঁট পাকিয়ে গেছে, বড়মালিককে কী বুঝিয়েছে, জলনিকাশির পাইপ বসাতে গ্রামবাসীদের কী বুঝিয়েছে…

-      কত পাউচ দেসি ঠররা না বিলিতি খাইয়েছে…

-      আমরা কিছুই জানিনা। ফ্ল্যাট কিনেছি, তার ভোগান্তি তো আমাদেরই ভুগতে হবে। কিন্তু বিল্ডার গিয়ে দাঁড়ালে অন্ততঃ ওকে সাক্ষী রেখে কিছু চুক্তি তো করা যাবে গ্রামের মানুষের সাথে!

-      বড়বাড়িকে বোঝানোর দায়িত্বও ওনার অনেকটাই বর্তায়।

-      আজ এখানে প্রেসিডেন্ট কেন এলেননা?

-      উনি অন্য রাজ্যে থাকেন, ছুটিছাটায় আসেন। সরকারি আমলা। এই সামান্য ব্যাপারে ছুটি নিয়ে কেন এলেননা এটা অবান্তর প্রশ্ন।

-      তা উনি যে প্রস্তাবটা দিলেন, হোলিতে বড়বাড়িতে যাওয়ার…

সেক্রেটারি এতক্ষণে মুখ খুললেন। ইনশিওরেন্সের চাকুরে। ঠান্ডা মাথা। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলতে সচেষ্ট থাকেন। সবসময় মাঝামাঝি একটা রাস্তা বার করেন। ওনার বিশ্বাস যে সময়ের সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে।

“দেখুন, আসল ব্যাপারটা বুঝুন। এই এলাকায় এটা এখনও অব্দি একমাত্র এপার্টমেন্ট। পাড়ার ভিতর দিকে গিয়ে দেখবেন পঁচানব্বই পার্সেন্ট কয়েক পুরুষ ধরে এই পাড়ার স্থায়ী বাসিন্দা। আগে মাটির বাড়ি ছিল, এখন কেউ কেউ পাকা তুলেছে, দোতলাও তুলেছে। বেশির ভাগ এক জাতের, সেটাও একটা দিক। আমরা হঠাৎ উটকো কতগুলো লোক কতগুলো পায়রার খোপের মালিক হয়ে জুড়ে এসে বসেছি। একটা স্বাভাবিক অস্বীকারের মনোভাব কাজ করছে দুদিক থেকেই। আমরাও ওদের সাথে মিশি না, ওরাও আমাদের সাথে মেশে না। মাঝখানের এই দেয়ালটা তো ভাঙতে হবেই। প্রেসিডেন্ট সেদিন যে প্রস্তাবটা দিলেন, যদিও কোনো সিদ্ধান্ত হলনা, আমি মনে করি সঠিক প্রস্তাব। এখন আমরা যা করছি, নালাটা পরিষ্কার করেছি, বাচ্চাদের ছাতে খেলা বন্ধ করিয়েছি, মারপিটের ব্যাপারটা একটা মিটমাট হয়ে গেছে… সে সব চলুক, কিন্তু হোলির ওই প্রোগ্রামটা হওয়া উচিৎ। শত্রুতা করে তো আর বেঁচে থাকা যায় না। বন্ধুত্বের জন্য হাতটা আমাদেরই সামনে বাড়াতে হবে।”

সন্ধ্যাবেলায় প্রতিমার শ্বাশুড়ি জিজ্ঞেস করলেন ছেলেকে, “কী হল রে! দেখা পেলি বিল্ডারের?”

-      হুঁহ, অত সহজ! বিকেলে খবর পেলাম, দিল্লি চলে গেছে। ভাঁওতা আর কি। এসেছে হয়ত রাতে। যা হোক, বিল্ডারের বাবার সাথে দেখা হল। অবশ্য ও লোকটাও বিশেষ সুবিধের মনে হলনা।

প্রতিমা রান্নাঘর থেকে চা নিয়ে আসতে আসতে বলল, “তবে? কী লাভ হল?”

-      লাভ তো হলই। আশেপাশের লোক জানল বিল্ডারটা কী চীজ! বিল্ডারের কাজেও সুনামের তো দরকার আছে। আর যেখানে সে নিজে পরিবার নিয়ে থাকে! একটা চাপের সৃষ্টি হল। আমার বিশ্বাস যে আমাদের পরের মিটিংটায় বিল্ডার আসবে। কেন গিয়েছিলেন, আমার ফ্যামিলিকে বিরক্ত করেছিলেন, চাইলে অনেক কিছু করতে পারি ইত্যাদি ভুজুংভাজুং দেবে তবে কিছু কাজে সুরাহা ও করবে। দেখা যাক!

-      তা তোরা নাকি ঠিক করেছিস হোলির দিন ওদের বাড়িতে যাবি? (পিছন দিকে ইশারা করেন)

-      ঠিক করিনি। একটা প্রস্তাব এসেছে।

-      আবার ৩০২ এর ভদ্রলোক এসে সাবধান করে দিয়ে গেলেন যে ভুলেও যেন এসব না করা হয়।

প্রতিমা ভিতরের ঘরের দিকে যাচ্ছিল। ছেলের হোমটাস্কগুলো বাকি আছে। ঘুরে দাঁড়ালো, “উনি আবার কী বলবেন। সেদিনের ঘটনাটায় ওনার ছেলের দোষ কম ছিল না। এমনি এমনি মাথা ফাটেনি। ওদের পুরো পরিবারেরই ধারণাটা ওই… যে বলে না? ‘লফঙ্গাকে ভগবানও ভয় পায়’… ওই টাইপের। কিছু কিছু এ টাইপের লোক সবজায়গাতেই থাকে।

-      আঃ, আস্তে বল না!

-      (গলাটা নামিয়ে) ইতরের মত কথা বল, দুদশটা গালি রাখ মুখের ডগায়, ব্যাস্‌ সবাই সমীহ করে চলবে। বাবা, মা, ছোটো ছেলে সবার এক অ্যাটিচুড। শুধু বড় ছেলেটা একটু অন্য রকম।… আমার তো মনে হয় একদম সঠিক প্রস্তাব। যাওয়া উচিৎ তোমাদের হোলির দিন!

-      (হাসতে হাসতে) আর যদি লাঠি নিয়ে তাড়া করে?

-      করুক! লোকে বুঝবে ওরা আদত ছ্যাঁচড়। পরবের দিনেরও মর্যাদা বোঝেনা!  

                 *                 *                 *               

          হোলির সন্ধ্যায় বড়বাড়ির দরজায় গিয়ে কড়া নাড়ার সময় দেখা গেল সাকুল্যে চারজন মানুষ। প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি আর দুজন। ট্রেজারারও আসেনি। বড়বাড়ির ছোটো দরজা খুলল।

          ঢুকেই বড়মালিকের পায়ে আবির দিয়ে প্রণাম। সেক্রেটারির ইশারাটা বুঝল প্রেসিডেন্ট এবং বাকি দুজন। কথাবার্তা হল। পুয়া, দহিবড়া, নারিয়লছুহাড়ার মুখশুদ্ধি, চা, সিগারেট। অনেক দার্শনিক তত্ত্ব আলোচনা হল। দেখা গেল বড়মালিক ওশোর একনিষ্ঠ পাঠক। বৌদ্ধদর্শনে রুচি আছে। চেনস্মোকার। আর আগন্তুকদের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চেনার ক্ষমতা রাখেন।  

-      কী বলবেন, সেক্রেটারি সাহেব! কাজটা ভালো হল কিনা?

-      জবরদস্ত! একেই বলে ট্যাকটিক্যাল এডভান্টেজ! সঠিক প্রস্তাব ছিল আপনার। কেউ বুঝল না সেটার গুরুত্ব।

-      ঠিক আছে, আমরা চারজন গেলাম তো! চলুন বড়রাস্তায় একটু হেঁটে আসা যাক। একটা পান খেলে হয়। পেটটা আইঢাই করছে। অনেক দার্শনিক তত্ত্ব শুনলাম তো! হজমের গোলমাল না হয়ে যায়।

-      লোকটি সত্যিই পড়াশুনো করে, না কি শোনা কথা ঝাড়ছে?

-      পড়াশুনো ছাড়া আর করবে কী এখন? নিজে ভদ্রলোক বুড়ো হয়ে গেছেন। ওনার যে ফিল্ডগুলো ছিল সেখানে নতুন কম্পিটিটর চলে এসেছে। ছেলেগুলোর সে বুদ্ধি নেই, ছাঁটু রংবাজি ছাড়া আর কিছু জানে না।

-      উনিতো সৎসঙ্গ, ভজন-কীর্ত্তনেরও ব্যাবস্থা করান প্রতি বছর। আসলে ধর্মতত্ত্ব সবসময় অর্থতত্ত্বের খোলস!

-      তবে একটা কথা কি জানেন? ঠিক ওনার জন্য বলছি না, তবে ওনার কথায় মনে এল, আসলে বেশির ভাগ মানুষেরই পুরো জীবনটা লেগে যায় বুঝতে যে, যে জীবনটা সে বাঁচল এতদিন সেটা তার নিজের জীবন ছিল না। তার শত্রুর দেওয়া ছিল।

-      তার মানে কী বলতে চান? এই সব ক্রাইম করে টাকার পাহাড়ের ওপর বসে যে অ্যায়্যাশী করছে সে নিছক একজন বেচারা, নিরুপায়, বিভ্রমের শিকার…

-      শুনতে গান্ধীবাদী মনে হচ্ছে কিন্তু কথাটা এক অর্থে সত্যি। তাবলে…

-      আচ্ছা এবার ছাড়ুন ওসব দার্শনিক কচকচি। কাজের কথায় আসুন। শুনলেন তো। মালিকের বড়মেয়ের বিয়ে। কার্ড পাঠাবেন। আমি তো থাকব না। আগেই ক্ষমা চেয়ে নিলাম। আপনারা যাবেন কিন্তু নিশ্চই।

……………………

কিছুদিন পরেই বড়বাড়িতে মেয়ের বিয়ে হল। মেয়েটি ছাতে এসে প্রতিমাকে বার বার করে অনুরোধ করেছিল ছেলেকে নিয়ে বিয়েতে আসতে। শ্বাশুড়ি একটু খুঁতখুঁত করা সত্ত্বেও প্রতিমা ছেলেকে নিয়ে স্বামীর সাথে গেল বিয়েবাড়িতে। বাড়ির মেয়েরা কী খুশি! হাত ধরে দুজনকে টেনে নিয়ে গেল ভিতর বাড়িতে। প্রতিমার স্বামী বাইরেই খাওয়ার জায়গায় ফ্ল্যাটের অন্য কয়েকজনের সাথে বসল। রাত্রে ফিরতে শ্বাশুড়ি শশঙ্কিত গলায় ওদের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলেন।

-      আপনি ভাবতেও পারবেন না মা, কত আদরযত্ন করল ওরা। আপনার নাতিকে তো ছাড়তেই চায়না। ওদের ভিতরের ঘরেই খাবার সাজিয়ে এনে দিল, আপনার জন্য আলাদা করে মিষ্টি দিয়ে দিল…

-      খাইয়েছে ভালো। তবে শুরুতেই ওই মেজ ছেলেটা…

-      কী? কিছু করেছে নাকি?

-      নাঃ, করেনি কিছু। এমনি কথাবার্ত্তা বলছে, তারই মধ্যে হঠাৎ কোথা থেকে পিস্তলের গল্প এনে ফেলল। আসলে আমাদের টেবিলে ওর এক বন্ধুও ছিল। তাকেই দেখাচ্ছিল। তারপর আমাদের হাতেও দিয়ে দেখাল নতুন কেনা ওর চাইনিজ পিস্তল! কত হাল্কা, কত দূরে চোট করতে পারে! অবশ্য বিশেষকিছু নাও হতে পারে। ওর তো ওটাই জীবন! ওসব জিনিষ ছাড়া আর কী নিয়েই বা কথা বলবে!

-      বরকে কেমন দেখলি।

-      সে তো ভালোই মনে হল। নিজেদের ব্যবসা আছে। আর, অনেক পুরোনো পরিচিতের সাথে দেখাও হল। ওদের এই বিয়েতে দেখব ভাবিনি। অবশ্য ওরা আর কী করবে। থাকতে তো আমাদেরই হবে। টেনশনটাও আমাদেরই থাকবে।

               *                 *                 *            

          মাঠে বিরাট জনসভা। শুধু এই পাড়া নয় আশেপাশের পাড়ার লোকজনেরাও উপস্থিত। সরকারের নির্দেশ এসেছে। এসব নাকি প্রতিবন্ধিত জমি। ইংরেজ আমলের আইন। সুপ্রীম কোর্টেরও রায় আছে এবিষয়ে পনের বছর আগের। কেউ জানে না আইনটা কী। রায়টা কী নিয়ে। কোনদিক থেকে কতখানি জমি প্রতিবন্ধিত। কিন্তু হাল্লা উঠে গেছে। বিধায়কজীকে ডাকা হয়েছে। পার্ষদ এসেছেন। এপার্টমেন্টের সেক্রেটারি, ট্রেজারারও পৌঁছেছেন ব্যাপারখানা বুঝতে। আর নতুন যারা জমি কিনে বাড়ি তৈরি করেছে বা করছে তাদের তো মাথায় হাত! আর তাদেরই সংখ্যা বেশি হয়ে উঠেছে গত দশ বছরে। সামনে যে আরেকটা এপার্টমেন্ট উঠছিল, তার বিল্ডার তো শোনা গেল কাজ বন্দই করে দিয়েছে।  

একটা সংগ্রাম সমিতি তৈরি হবে। সভার পরিচালনা করার জন্য সভাপতি মন্ডলীর নামের ঘোষণা করা হচ্ছে। সেক্রেটারি এগিয়ে গিয়ে প্রস্তাব দিলেন বড়বাড়ির বড়মালিকের নামটাও শামিল করা হোক।

-      কিন্তু তিনি তো এ সভায় আসেননি।

-      তাতে কী? সভাপতিমন্ডলী তো সংগ্রাম সমিতির জন্য, স্থায়ী। তাতে উনিও থাকবেন!

প্রস্তাব স্বীকৃত হল। “এর বেশি এখানে আমাদের কিছু করার নেই, এরপর দুই পার্টির কম্পিটিশন, আমাদের ভাগ্যে যা আছে তা তো হবেই”, সেক্রেটারি ট্রেজারারকে বললেন, “আমাদের আসল কাজটা করতে হবে কর্পোরেশনের অফিসে। সাধারণ আবেদন করে হোক বা আরটিআই করে হোক, ফ্ল্যাটবাড়ির আসল নকশাটা বার করাতে হবে। শুনছি সেটাও নাকি ঠিকমত পাশ করান হয়নি। চলুন, আজকের ছুটিটা তো গেলই, ওদিকেও একবার ঘুরে আসি। আমার একজন পরিচিত উকিল আছেন। তাঁর সাথেও একটু আলোচনা সেরে নেওয়া যাবে। কী বলেন!”

          ………………………………

          প্রতিমা কাপড় মেলতে এসেছে পিছনের ব্যালকনিতে।

এবারে পুজো দেরিতে এল তাই এখনই ব্যালকনির ভিতরে রোদ। দুপুরটা মিঠেও নয়, ভালো তাত। “ছেলে কী করছে আজকাল?” প্রশ্নটা শুনে প্রতিমা চোখ উঠিয়ে দেখল বড়বাড়ির বড়মালিকের স্ত্রী। বাড়িতে পুরুষদেরই রমরমা। বড়মালিক, তার তিন ছেলে; এমনকি বড়ছেলের দেড়ফুটিয়া বাচ্চা, সেও মাস্তান। এদের ছাড়া সচরাচর মেয়েদের দেখা মেলে ছাতে, উঠোনে। কিন্তু এই মহিলাকে বেশি দেখা যায় না। মেয়েরা কলেজে লেখাপড়া করছে, ভিতরে যাই থাক ওপরে একটা সপ্রতিভতা আছে। এই মহিলা একেবারেই গ্রাম্য। চোখে পড়লেও চোখে পড়েন না কেননা যে চেনেনা সে কাজের লোক মনে করবে।

-      ছেলে তো এখন কলেজে, গ্র্যাজুএশন করছে।

-      বিএ?

-      বিএসসি (মহিলার মুখ দেখে) ওই বিএ-ই।

-      আর একটা মেয়েও আছে না তোমার?

-      হ্যাঁ! ও সাত ক্লাসে যাবে এবার।

-      বাঃ।… সেই বিয়ের সময় এসেছিলে আমাদের বাড়িতে। তাই না? পারলে একদিন এস! আমার যে যাওয়া হবেনা তোমার বাড়িতে তা তো জানোই।

-      আসব! আপনি যখন বলছেন নিশ্চই আসব।

-      তোমার শ্বাশুড়িকে দেখছি না!

-      শ্বাশুড়ি তো মারা গেলেন তিন বছর আগে!

-      ওঃ। কে জানে, শুনেছিলাম বোধহয়, ভুলে গেছি।… তোমার এই, কী যেন বলে…?

-      ব্যালকনি!

-      হ্যাঁ, বড় সুন্দর!

-      বাঃ, আপনার তো ওই বিশাল ছাত, ভরা রোদ!

-      তবু, তোমার ওই ছোট্টো ঘেরা জায়গাটুকু! যখনই দেখি, গিয়ে বসতে ইচ্ছে হয়। কতবার ভেবেছি, ওখানে বসে তোমার শ্বাশুড়ির সাথে গল্প করব। সে আর হল না।

মহিলা সিঁড়ির দিকে চলে যান। সিঁড়িঘরের ওপাশে বিশাল ডিশ এন্টেনা। মেজছেলে জেলটেল ঘুরে এসে এখন কেব্‌লের ব্যবসা আরম্ভ করেছে। ফ্ল্যাটবাড়ির সবাই তার গ্রাহক। গ্রিলের বাইরে টাঙানো তারের ওপর ভেজা হাতদুটো রেখে রোদের মিঠেকড়া তাতটা অনুভব করে প্রতিমা।






 

Wednesday, May 26, 2021

দেরী

            প্রতিদিনের মত বিকেল গাঢ় হতেই সে ছটফট করে উঠল। নোংরা দাগধরা ঘরটায় দেয়ালের দিকে মুখ করে বসে কাজ করতে করতে হঠাৎ এক উদ্দীপক বোধের সঞ্চার তাকে ঘুরে তাকাতে বাধ্য করল। সে দেখল জানলার বাইরে – দূরে বিজ্ঞান কলেজের পরিসংখ্যান বিভাগের ছাতের কার্নিশে ডিসেম্বরের রোদ সোনালি হয়ে এসেছে। মুখটা তার বড় বড় পাতার ছায়ায় ভরে গেল।

যেখানে সে কাজ করে সে জায়গাটা একটা দোতলা বাড়ির নিচের তলা। রয়েছে একটা বড় হলঘর, দুটো ছোটো ছোটো ঘর আর দুফালি বারান্দা। তার মধ্যেই কর্মচারী গোটা পঞ্চাশেক। দুপুর অব্দি দেড়শ দুশ লোকের কোলাহলে ভরে থাকে জায়গাটা। টিফিনের পর থেকে ছুটি অব্দি নিঃশব্দে কাজকর্ম চলে। জানলাগুলো বন্দ থাকে সারাদিন, বিশেষকরে এই শীতকালে। কেননা ঠান্ডা হাওয়া দেয় খুব, আর অপেক্ষাকৃত বয়স্ক ও বৃদ্ধ কর্মচারিদের তাতে অসুস্থ হয়ে পড়ার ভয় থাকে। এবং অন্যান্য ঋতুতেও। গ্রীষ্মের গরম শুকনো ধুলো হাওয়া, বসন্তের ও শরতের দ্রুত হাওয়াবদল তথা বর্ষার রোগসমূহ – কোনোটাই দুর্বল দেহের পক্ষে সহ্য করা কঠিন।

তবু মাঝে মাঝে খোলে জানলাগুলো যেমন আজ। হয়ত কারো ইচ্ছে হয়েছিল বাইরে তাকাবার, হয়ত তরুণতর কর্মচারিদের কেউ বন্ধুকে দেখাতে চেয়েছিল কলেজ থেকে বেরিয়ে আসা মেয়েদের দলটা অথবা হয়ত কেউ পানের পিক ফেলার জন্য খুলেছিল (জানলার নিচের চৌকাঠগুলি কফ আর থুথুর কালচে দাগে ভরে থাকে) তারপর বন্ধ করতে ভুলে গেছে।

দুপুর পড়ে এলে বাইরের রাস্তার কোলাহল মাঝে মধ্যে ভিতরে ঢুকে পড়ে জানান দিয়ে যায় যে দিন শেষ হতে চলল। দিনভর জ্বলতে থাকা বাল্বের আলোগুলো ক্লান্ত আর ম্লান মনে হয়। দূরে কোনো কোনায় বহুক্ষণ ধরে চলতে থাকা একটা কথার গুঞ্জন ধীরে ধীরে স্পষ্ট স্পষ্টতর হয়ে উঠে হঠাৎ দমকা হাসির ধাক্কায় ফেটে পড়ে। ঘর ভরে ঠাট্টামস্করার একটা পালা চলে কিছুক্ষণ। অমুকের পুংসত্ব নিয়ে সন্দেহ, অমুকের বৌকে অন্যের কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব, কাকে কোন গলির মোড়ে বেশি রাতে দেখা গিয়েছিল, কাকে লাল্টুস বলে ম্যানেজার নিজের ঘরে বসিয়ে রাখে সারাদিন, তার প্যান্ট খুলে দেখা যেতে পারে তার ‘কুমারীত্ব’ বজায় আছে কি না – ইত্যাকার কথার বাহক শব্দগুলো, বছরের মার খেয়ে কালসিটে পড়া দেওয়ালে, টেবিলে, কাগজপত্রে, আলমারিগুলোয় আর চোখেমুখে ঘষটা খেয়ে হারিয়ে যায়। নৈঃশব্দ আবার ভারি হয়ে নেমে আসে তারপর।

সে এখানেই কাজ করে তিন বছর হল। আপাততঃ এই ঘরে, দেওয়ালের দিকে মুখ করে বসে। সামনে ধুলোটে জাবদা লেজারটা খোলা; এখনো কিছু কাজ বাকি।

উঠে দাঁড়াল সে। তার উদ্বিগ্ন মুখ দেখে মনে হবে, কিছু একটা এই মুহুর্তে তার করার আছে অথচ দেরি হয়ে যাচ্ছে। পেচ্ছাপ করতে গেল। ছোট্টো জানলাটা দিয়ে বাইরে তাকাতে দেখল একটা বাস যাচ্ছে। সোনালি রোদে ঝকঝক করে উঠল তার ছাদ। আবার উদ্বেগ আর উৎকন্ঠার দুটো বড় ছায়া খেলল তার মুখে। বড় হলঘরটা পেরিয়ে নিজের টেবিলে আসার সময় দেওয়ালঘড়িটার দিকে তাকাল। কাজের সময় শেষ হতে এখনো এক ঘন্টা বাকি।

নিজের টেবিলে এসে সে খোলা লেজারটার দিকে তাকাল। তারপর ম্যানেজারের ঘরের দিকে। আবার লেজারের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কোঁচকাল। একটু পরেই সহজ হয়ে উঠল তার মুখ। বদলটা সামান্য। কেউ বুঝল না মাঝের কয়েকটি মুহুর্তে ঢেউ ভাঙা লবণাক্ত জলস্রোত বালির ওপর এগিয়ে গেল অনেকদূর, হয়ত এখানে এই ঘরটায় ঢুকে তার গোড়ালি ভিজিয়ে দিয়ে গেল।

লেজার ও দেরাজ বন্ধ করে সে ছিটকে বেরিয়ে এল দপ্তর থেকে। অনুমতি দূরের কথা, কাউকে বলল না পর্যন্ত্য – এত বেশি ছিল তার ভিতরে নিজের প্রতি ক্ষোভ।

সাইকেলটা নিল না যে! নাঃ, পরে এসে নেবে। তার মন স্থির – এই তো কাছেই যাওয়ার। কাছেই তার এক বন্ধুর বাড়ি। ওখানে পৌঁছতে পারলেই তার কাজ হয়ে যাবে।

বাঁদিকের ফুটপাথ ধরে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। মুখটা ইষৎ ম্লান – যদি সত্যিই দেরি হয়ে গিয়ে থাকে? একটু এগিয়ে বাঁদিকে একটা গলি। চায়ের দোকান, মানুষজন, কিছু তার পরিচিত। কিন্তু আপাততঃ সে ভীষণভাবে আত্মমগ্ন, মাথা নিচু, দাড়িতে হাত, লোকে বুঝবে নিশ্চই, তাকে অযথা ডেকে দেরি করিয়ে দেবে না।

যদিও এধরণের ব্যবহার, কেউ ডাকলেও এড়িয়ে যাওয়া সে সহজে করতে পারে না। এক বিচিত্র মনস্থিতির জন্ম হয় তার ভিতর। ‘যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে? যদি কাল সকালে ও বা আমি আর না থাকি? একটা অপরাধবোধ থেকে যাবে।  কিন্তু নাঃ এরকম চিন্তা করছি কেন? পরিচয়ের বৃত্তের বাইরে কত মৃত্যু তো হচ্ছে প্রতি মুহুর্তে! তারা সকলে আমারই বয়সের সাথে যুক্ত এক অপরিচয়ের বয়স! যেন অস্তিত্বের শিরাউপশিরায় জড়িয়ে থাকা ছিন্ন অসমাপ্ত কিছু শিরা।…’  বস্তুতঃ এধরণের চিন্তার কোনো মাথামুন্ডু নেই। তবু এইসবই চিন্তা করে সে কষ্ট পেতে থাকে।

গলি পেরিয়ে আবার একটা রাস্তা। আকাশের আলো কমছে। কুয়াশার একটা পাতলা স্তর নামতে শুরু করেছে শহরের ওপর। বাঁদিকে একটা ক্যাম্পাসে ঢোকার গেট। এবার সে দৌড় লাগাল ভিতরে। ঠিক তখনইঃ-

-      আরে, তুই এখানে?

-      এখানে তো প্রায় রোজই আসি! আমার এক বন্ধু থাকেন সামনের ফ্ল্যাটবাড়িটায়। তুই?

-      আর বলিস না। আমাদের কোম্পানির জোনাল ম্যানেজার থাকে এখানে। একটু তেল লাগাতে এসেছি রে। প্রদীপটা, তুই চিনিস তো, কবে থেকে বলছে ওর ভাইয়ের একটা চাকরি করে দিতে…। চল্‌, একটু চা খাই কোথাও বসে। অনেকদিন পর দেখা হল।

-      পাঁচ মিনিট দাঁড়া। বরং ওই সামনের চায়ের দোকানটায় বোস না গিয়ে। আমি শুধু খোঁজ নিয়ে আসছি বন্ধুটি আছে কিনা। তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে কথা বলা যাবে।

-      চল আমিও যাই!

-      না, না দরকার নেই, তুই বোস না গিয়ে! আমি এক্ষুণি আসছি।

সিঁড়ির কাছে পৌঁছে সে একবার আড়চোখে পিছনে তাকাল। এতদিন পর দেখা হওয়া সহপাঠিটি একা একা রাস্তার দিকে এগোচ্ছে ধীরে ধীরে। একটু লজ্জিত বোধ করল সে। কিন্তু উপায় নেই। সহপাঠিটি বুঝবে না তার উৎকন্ঠা। তিনতলায় বন্ধুর ফ্ল্যাটটার কাছে আর দাঁড়াল না সে। লাফিয়ে লাফিয়ে উঠে পড়ল একেবারে ছাদে। বিরাট ছাদ। দৌড়ে সে পশ্চিমের কার্নিশের কাছে গেল।

আঃ! সাফল্যের একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস তার ফুসফুস নিংড়ে বেরিয়ে এল। আনন্দের অন্তরঙ্গ আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল তার মুখ। না, দেরি হয়নি তার। দূর অব্দি ছড়ান শহর – ফাঁকে ফোকরে গাছগাছালি। হর্নের আর ঘন্টির আওয়াজ, কোলাহল নিচ থেকে উঠে আসছে। এক ঝাঁক শালিক মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল। তাদের কিচিরমিচিরের এক পশলা বৃষ্টি হল তার মাথার চুলে, কাঁধে, কোটের ভাঁজে। দূরে এক সার বক শহর পরিক্রমা করে চলেছে। সামনের দুটো শিরিষ গাছের গা ভরা কূজন। একটা দলছুট টিয়া অকস্মাৎ খুব নিচ দিয়ে উড়ে ডাকতে ডাকতে চলে গেল।

না, দেরি হয় নি। ওই তো তালগাছটার পিছনে এখনো প্রায় পুরোটাই দেখা যাচ্ছে লাল, এক্কেবারে গাঢ় লাল আজকের সূর্যটা। তৃপ্তিতে চোখ বুঁজে এল তার। চরাচরে ব্যাপ্ত সন্ধ্যার গুঞ্জরণে অনুরণিত তাকে জড়িয়ে ধরল সূর্যাস্তের বাতাস। 



_________________________

সুগন্ধী তেল

            শেষ রক্তরাগ, রাজপথের খাড়া উঁচু গাছগুলির চুড়োয়। নিচে চৈত্রের অন্ধকার জড়িয়ে ধরছে গুঁড়ি। ছেঁড়া, ফ্যাকাশে কাপড়ে এক অতিশীর্ণ বৃদ্ধা, হাতে একটা পুঁটলি নিয়ে আসছিলেন; হঠাৎ হোঁচট খেয়ে ঠিকরে পড়ে গেলেন ফুটপাথের ওপর। ক্ষীণ ঝনঝন শব্দে শিশি বা কাঁচের জিনিষ ভাঙবার শব্দ শোনা গেল।

এগিয়ে কাছে যেতে দেখলাম বৃদ্ধা উঠে বসেছেন আর কী যেন কুড়োচ্ছেন দ্রুত। ঝুঁকে অন্ধকারে তীব্র একটা সুগন্ধ পেয়ে ঠাহর করে দেখলাম পাথরের ওপর তরল কিছু একটা ছড়ান। বুঝলাম তেল, সুগন্ধী তেল। পাথরের খাঁজে খাঁজে ছড়িয়ে পড়ছে আর ধুলোয় শুষে যাচ্ছে। অদূরে রাস্তার আলোগুলো জ্বলে উঠেছিল। আলো মানে সাবেক টাংস্টেন বাল্ব – ঘটনাটা ১৯৭৬এর। সে আলোয় চকচক করছিল কাঁচের ভাঙা টুকরোগুলি।

বৃদ্ধার বাঁ হাঁটু কেটে গিয়েছিল। ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরছিল ফোঁটা ফোঁটা। কিন্তু ভ্রুক্ষেপ না করে তিনি হামলে পড়েছিলেন তেলের ওপর। দু’হাতে কাচিয়ে তুলছিলেন ওই মাটিমাখা তেল আর মাথায় মুছে চলেছিলেন। মাঝে মাঝে বিড় বিড় করছিলেন কিছু। ব্যস্তভাবে হাত বাড়িয়ে থামাচ্ছিলেন পাথরের খাঁজে খাঁজে বয়ে চলা তেলের ক্ষীণ ধারাগুলি। জরাগ্রস্ত দু’হাতের ত্বক শুকিয়ে ফেটে আঁশ হয়ে গেছে – হাল্কা আলোয় তা তুষারের মত চকচক করছিল।

কী ঘটছে চোখের সামনে দেখতে পেয়েও আমি অভ্যাসবশতঃ জিজ্ঞেস করলাম, “কী হল?”

শরীর রুগ্ন, চুল হলদেটে সাদা, সিঁথির কাছটা ফাঁকা – বৃদ্ধা মাথা না তুলেই বিড় বিড় করে উঠলেন, “খুব দামী তেল ছিল! ঠান্ডা তিল তেল, পুরো এক টাকার।…সেই কোন বাজার থেকে ফিরছি! কোথাও কিছু হল না আর এখানে এই ফাঁকা রাস্তায়…! চোখে দেখতে পাই না ভালো করে। এত দামী তেল! অসুস্থ মানুষ!”

 

হাতদুটো একবারের জন্যও তেল কাচানো থামায় নি। আমি ওনার পিছন থেকে পাথরটা (যেটায় হোঁচট খেয়ে বৃদ্ধা পড়েছিলেন) তুলে পাশে ফেলে দিলাম। কাঁচের টুকরোগুলো দেখে দেখে তুলে মুঠোয় করে রাস্তার কিনারে ফেলতে ফেলতে বললাম, “উঠে পড়ুন এবার। আর তোলা যাবে না ওই তেল। লাভের মধ্যে হাতে কাঁচ ফুটে…”

আমার কথা শেষ না হতেই উনি একবার শিউরে উঠে বাঁ হাতটা নিজের চোখের সামনে আনলেন। দেখলাম করতলে একটা গভীর ক্ষত, তা থেকে রক্ত আর তেলের বুদবুদ বেরিয়ে আসছে। কড়ে আঙুলের কাছে দেখা যাচ্ছে কাঁচের টুকরোটা। বৃদ্ধা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন হাতখানি। “দেখ তো, এখনো লেগে আছে নাকি কাঁচটা!” দিনের ব্যস্ততায় কাউকে সময় জিজ্ঞেস করার মত করে কথাটা বলে প্রথমবার চোখ তুললেন।

সহজ ও স্থির দুটো চোখ। অসহায়, কাতর বা অস্থির কোনো ভাব নেই। যেন এসব তো লেগেই আছে রোজকার!

ক্ষতস্থানে হাত দেবার আগে এক মুহূর্তের দ্বিধা!… গরম রক্তের নিজস্ব একটা প্রভাব পড়ে শরীরে – একটা জান্তব শিহরণ জাগে। হাঁটু মুড়ে বসে পড়লাম ওনার, বসে থাকা ছোট্ট শরীরের কাছে আসতে। 

          হঠাৎ মনে হল, জরা ও ব্যাধিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও কত দুর্মূল্য এই রক্ত! এই ক’ফোঁটার মানে হয়ত নাতিটার রুজিরুটির কোনো ব্যবস্থা হল কিনা দেখে যেতে পারা, কর্পোরেশন বস্তি ভেঙে দেওয়ার পরের মাঘী-রাত কয়েকটি টিঁকে দেখে যেতে পারা যে নতুন কোনো ঘর খাড়া করা গেল কি না কোথাও!…

 

          ক্ষতস্থানটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে পরখ করে বললাম, “না, কাঁচ নেই”। কড়ে আঙুলের কাছে লেগে থাকা কাঁচের টুকরোটা ফেলে দিলাম। শেষে রক্তস্পর্শে জেগে ওঠা এক দুর্বোধ্য আত্মীয়তার পুরো জোর খাটিয়ে বললাম, “অব উঠ্‌ যা মাই!” কিন্তু বৃদ্ধা কোনো উত্তর না দিয়ে হাত ছাড়িয়ে আবার ঝুঁকে পড়লেন তেলের ওপর।

          তাঁর মুখে কোনো কথা ছিল না। তবু ওই, মাথায় তেল বোলানো দেখে মনে হল বৃদ্ধা যেন নিজের আশি বছরের, নানা অশান্তি ও দুর্যোগ ভোগা শরীরটাকে বলছেন, “নে রে অলক্ষুণে নে! যেটুকু পারিস এর থেকেই নে। কত কি যে দাবী করিস দিনরাত! কোত্থেকে মেটাবো আমি!”… বোধহয় সবারই এমন হয়। বয়স বাড়লে শরীরটা শরীরেরই ভিতরে এক প্রতিপালিত অসুস্থ জন্তু হয়ে কখনো ঘ্যানঘ্যান কখনো চাপা গরগর করতে থাকে সারাটা সময়। আমি যদি ওই বয়সে আদৌ পৌঁছই তখন এদেশের স্বাধীনতার বয়স কত হবে?

 

          আর তেল কাচাতে না পেরে বৃদ্ধা এবার নিজেই ওঠার তোড়জোড় করছিলেন। আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম। কিন্তু হাত ধরলেন না তিনি। করতলের ভরও দিলেন না মাটির ওপর। রক্তমাখা বাঁ হাতে পুঁটুলিটা ধরে, হাঁটুর ওপর কনুইয়ের ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তেলজবজবে ডান হাতটা আলগা করে সামনে ধরে রাখা। মাথায় আর মুছবার জায়গা নেই। কপাল বেয়ে চুঁইছে তেল আর মাটি। তবু, বোধহয় কোনো নাতির ছোটো মেয়ের অনেকদিন-তেল-না-পড়া রুক্ষ মাথাটা মনে পড়েছে!

          বৃদ্ধা দাঁড়াতে তাঁর মাথাটা আমার বুকের কাছ অব্দি এল। তৈলাক্ত হয়ে চকচক করছিল দূর থেকে ভেসে আসা আলোয়। সুগন্ধের ঝোঁকাটা তীব্র হয়ে নাকে এসে লাগল।

 

          প্রথম বসন্ত কবে এসেছিল এই শরীরে! এই হলদেটে সাদা মাথাটা তখন আরেকটু উঁচু, আরেকটু বড় আর কালো ও সতেজ। এই রাজপথে তখন এঁর বা এঁর কোনো পূর্বপুরুষের ছায়াও পড়েনি। হয় কোনো গ্রামে অথবা শহরের পুরোনো দিকের কোনো পাড়ায় কিশোরী থেকে যুবতী হয়ে উঠছেন! এই রাজপথ তখন আরো সরু। হয়তো পাথরবসানো। ইংরেজ রাজপুরুষদের বাংলো আর সরকারি দপ্তরের মাঝ দিয়ে ফিটন আর ঘোড়ার শব্দে মুখর! মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী নামের মানুষটি তখন দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরেছেন। সুরাটে আছেন নাকি মোতিহারিতে এসেছেন!…

 

          তখন কত দাম পড়ত আধশিশি সুগন্ধী তিল তেলের?

          আমি তখন কত পেতাম দিনে, রোজগেরে জোয়ান থাকলে? কারো মাথা নিশ্চই থাকতো আমার বুকের এত কাছে? সে কে? এমনই তো হত তার বয়স, এখন!

          অন্ধকারে, তীব্র মাদক সুগন্ধের এক অদৃশ্য গুল্মের মধ্যে আমায় দাঁড় করিয়ে বৃদ্ধা, ডান হাতটা সামনে প্রসারিত রেখে ধীরে ধীরে চলে গেলেন।