Wednesday, June 3, 2026

নতুন শতকে লাল ঝান্ডা

লাল ঝান্ডার গল্পগুলো
সমতলের,
পাহাড়েরও
             বসতগুলোয়
         নতুন শতকে বাড়ছে।
বিপর্যয়ের ভাঙা গম্বুজ
ইতিহাসের,
হৃদয়েরও,
              পিছনে ঠেলে
          রোদের নজর কাড়ছে।
 
একটা কথা মনে রাখার
গোড়া থেকেই
বলত ঝান্ডা,
               শাসককুলের
              নতুন যুগটা ধাপ্পা।
ধনকুবেরের রক্ষী হয়ে
জাগবে ফের
ধর্মধ্বজা
               দাঙ্গাবাজরা
        দেখবে সাপের পাঁচ পা।
 
সময়টা খুব কঠিন, অথচ
প্রযুক্তিরও
বিস্ময়কাল;
             ছাড়াচ্ছি বসে
         রুটির ডেয়ো পিঁপড়ে।
ঠিক এখনই ঝান্ডার লাল
আলো করছে
নতুন মুখ,
              ধন-দম্ভের
           চালটা দিচ্ছে বিগড়ে।
 
৪.৬.২৬

রাস্তা

কিভাবে যে রাস্তাগুলোর শুরু আর শেষ বারবার বদলাতে থাকে! যেমন এই দাদরমন্ডির রাস্তাটা। সরু রাস্তাটা প্রথমে একজনের বৈধব্য থেকে শুরু হয়েছিল। সিনিয়র সহকর্মীর স্ত্রী - তাদের বৌদি। পাঁচ মেয়ের তিনটিকে তখনো পার করা বাকি। সেই বৌদিকে তাঁর মৃত স্বামীর পরিচিত জাতভাইয়ের মৃত্যুতে সে-পরিবারে যেতে হবে। কাকে পাবেন সঙ্গী? অগত্যা শ্যামল দেব - দেববাবু।

এসব যাওয়াগুলোও তো দরকারি, বলুন? সম্পর্কগুলো জিইয়ে রাখা দরকারি। সেখানেও তো আরেক সদ্য বিধবা। দুঃখের ভাগ দেওয়া-নেওয়ায় কাছাকাছি আসে মানুষ। কথায় কথায় ছেলে-মেয়েগুলোর ভবিষ্যতের কথা চলে আসে। তিন মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধগুলোর খোঁজও তো এভাবেই পাওয়া যেতে পারে। স্টেশন ছাড়িয়ে বাঁদিক, তারপর ডানদিকে বেঁকে রাস্তাটা রকমারি দোকানপাটের ঘিঞ্জি হয়ে উঠে গেছে পশ্চিম দরওয়াজায়। প্রাচীন শহরের প্রবেশদ্বার।

কেমন অদ্ভুত, না? যেন ভর বিকেলে শহরের বাইরে থেকে ভিতরে ঢুকছে তারা। হাজার হোক পাতানো বৌদি, সমবয়সী, পাশাপাশি হাঁটা যায় না। দূরত্ব রেখে হাঁটতে হয়। সামনে চলা মাঝবয়সী নারীটিকে যেন সবাইকে আশ্বস্ত করতে করতে এগোতে হয়ঃ একা আছি, একবারও কাউকে কাদা ছেটানোরও সুযোগ দিচ্ছি না যে নিজের দুর্ভাগ্যের লৌহ-বলয়টা ভুলে থাকতে স্বামীর বন্ধুর পাশাপাশি কথা বলতে বলতে হাঁটছি। নাঃ, একাই হাঁটছি দেখ!  

ভিড়ের মধ্যে বারবার ভাবীজীকে হারিয়ে ফেলছিল শ্যামল। যে বাড়িতে যাচ্ছে সে বাড়ি তো সে চেনেই না। ভাবীজীই চেনেন। তবে হ্যাঁ, যাওয়ার গরজটা তারও। একই অফিসের চাকুরে যে বৌদির মৃত স্বামী, সে আর সেই মানুষটা, যার মৃত্যুতে তার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে যাচ্ছে। যদিও আগে মতো সহজ নয়, তবু পরিবারে গেলেই তো বোঝা যাবে বিধবা স্ত্রী অনুকম্পায় চাকরি পেতে চান কিনা, যোগ্যতা কী, সম্পত্তির পরিমাণ, দায়ের পরিমাণ  

পশ্চিম দরোয়াজার ভাঙা, নোনাধরা প্রাচীন ইঁটের চিহ্নটার কাছে পশ্চিমমুখো দাঁড়ালে, অর্থাৎ, প্রাচীন শহরটাকে নিজের শহর ভেবে, রিপ ভ্যান উইঙ্কলের মতো দীর্ঘ সময়কালের ঘুম ভাঙার মত করে দাঁড়ালে, ডানদিকে বাঁক নিয়েছে এক ঐতিহাসিক রাস্তা, যে পথে পাটলিপুত্রের আকর্ষণে হুয়েন সাং থেকে রাজলক্ষ্মীর আকর্ষণে শ্রীকান্ত অব্দি এসেছে অস্তগামী সূর্যের আলোয়, গঙ্গার শোভা দেখতে দেখতে। আর বাঁদিকে?

বাঁদিকে দাদরমন্ডির রাস্তাটা পেরোলে এই পঞ্চাশ বছর আগেও ভাবীজীর মৃত স্বামী বলতেন বাজারের বাইরে এসে বাড়িঘর বলতে ছিল না। খড়ে ছাওয়া মাটির বাড়ি একসার, কোনোটাতে বিজলি-বাতি নেই গরমের রাতে সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে প্ল্যাটফর্মে আর ওভারব্রিজে চাদর পেতে শুত, সারারাত ক্যাঁচরম্যাঁচর করে সব্জি, আনাজ বোঝাই গরুর গাড়িগুলো গ্রাম থেকে এসে ঢুকত মন্ডিতে।

আমাদের বাবারা ছোটো ছোটো ব্যবসায় ছিলেন, সন্ধ্যায় ফিরে এসে ঠাকুমার কোঁচড়ে ঢেলে দিতেন দিনের আয়, তারপর তা থেকে ঠাকুমা সবাইকে এক এক টাকা দিতেন আগামি দিনের হাতখরচে। এই বসতির পরে ছিল বিস্তীর্ণ জলাভূমি, খুংখার ডাকাতদের এলাকা। আর জলাভূমির পর? তা তো সেভাবে কেউ জানত না সেসময়। শোনা যেত যে ইংরেজরা মাটিতে খোঁড়াখুঁড়ি করে কীসব যেন পেয়েছে, পুরোনো পাথরের মূর্তি, থাম, ঘরবাড়ি

দাদুদেরও আগে তো নতুন বসানো রেললাইন দুভাগ করে ফেলেছে অঞ্চলটাকে। সময়ও ভাগ হয়ে গেছে রেললাইনের ওপারের খবর আর এপারের খবরে। এপারেই খবর জন্মাচ্ছে রোজ, ইংরেজদের শহরে। তাই ওপার থেকে কেউ এসে থাকলেও, গ্রাম্য মানুষ । সেই সুদূর অতীতের, সম্রাটের প্রাসাদ থেকে আসা কোনো রাজকর্মচারীর, সৈন্যদলের, শ্রমণের কোনো জনশ্রুতি অবশিষ্ট নেই।

সব জায়গাতেই লোকালয় শুরু হওয়ার মুখে কিছু দোকানপাট থাকে। এখানেও হয়তো ছিল। তবে এই জমজমাট বাজার রেললাইন তৈরি হওয়ার পরেই বসেছে। আর এই রাস্তা দিয়েই হাঁটছে শ্যামল। একটু এগিয়ে ভাবীজী। পশ্চিম দরওয়াজায় অশোক রাজপথে উঠে ডান দিকে এগিয়ে গেল দুজনে। পাঁচ মেয়ের মা হয়েও ভাবীজী যে ভালো হাঁটতে পারেন, বুঝে গেল শ্যামল। পাদরি কি হাবেলি ছাড়িয়ে এগিয়ে চলেছেন জোরকদমে।  

যখন নতুন ফ্ল্যাটটা বুকিং করেছিল তখন তার সামর্থ্যের মধ্যে শহরের দুমাথায় ফ্ল্যাট পাওয়া যাচ্ছিল। এদিকে, অর্থাৎ রেললাইনের দক্ষিণতরফের পূর্বদিকে কঙ্কড়বাগ, ভুতনাথ ছাড়িয়ে। অথবা, পশ্চিম দিকে, অর্থাৎ ইংরেজকালের শহরে বেলি রোড বা দীঘা রোড ধরে নগরায়নের শেষ প্রান্তে। সে পূর্বদিকটাই বাছল কেননা পূর্বদিক বলতে তার মনে ছিল সাবেক শহর, ভিড়, জমজমাট সন্ধ্যেরাত, পুরোনো স্মৃতি।

ফ্ল্যাটে ঢোকার পর জানল রাস্তায় উঠে অটোরিক্সায় সোজা চলে যাওয়া যায় গুলজারবাগ বাজার। তখন তো লেভেলক্রসিংএর ওপর পুল হয় নি। বন্ধ থাকলেও পেরিয়ে দুমিনিট হেঁটে ঢুকে পড়া যায় বাজারে। অন্ততঃ রোববারে তো যাওয়াই যায়। সেই শুরু করল রোববারে যাওয়া। শাকসব্জি, মাছ-মাংস-ডিম, এমনকি চাল-ডাল-মশলা আর শীতের দিনে গুড়ও আনতে শুরু করল গুলজারবাগ বাজার থেকে। তখনই প্রথম একবার পশ্চিম দরওয়াজা অব্দি গিয়ে চিনল দাদরমন্ডির রাস্তাটা।

ভাবীজীর পিছন পিছন অশোক রাজপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছে অনেকটা দূর। এবার উনি বাঁদিকে বাঁক নিলেন। আরো কিছু দূর হাঁটার পর একটা বাড়ির বাইরের দরজার সামনের তিন ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠে পিছনে তাকালেন, দেববাবু আসছেন তো? শ্যামল একটু পিছনেই ছিল, হাত ওঠালো। ভাবীজী পর্দা সরিয়ে ভিতরে ঢুকলেন। শ্যামলও ভিতরে ঢুকে, সামনে বসে থাকা ভদ্রমহিলাকে হাত জোড় করে নমস্কার করল।

টি. এন. সিং -এর নামে সিং থাকলেও সে যে রাজপুত নয় এটুকু সে জানত। কিন্তু জানত না যে সে বেনে, নইলে মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুঃখে অংশীদার করতে বা হতে কেন আসতেন? তার না হয় একটা দায় থাকতে পারত, অফিসার হওয়ার আগে অব্দি টি. এন. সিং তাদের খুব সক্রিয় সদস্য ছিলেন; অফিসার হওয়ার পরও তাদেরকে সবরকম সাহায্য করে গেছেন। বেনেদের একটা ব্যাপার দেখেছে, তাদের নারীমহল কিন্তু পুরুষসমাজের সামনে অত্যন্ত সপ্রতিভ। সদ্য বিধবা ভদ্রমহিলা তার নমস্কারের জবাব শোকের মধ্যেও সপ্রতিভভাবে দিলেন।

ভাবীজিকে আস্তে করে জিজ্ঞেস করল শ্যামল, এটা কোন রাস্তা? কেন? খাজেকলাঁ! এই রাস্তাটাই তো সোজা খাজেকলাঁ ঘাটে চলে গেছে! টি. এন. সিং -এর স্ত্রী শ্যামলের প্রশ্নের অর্থটা না বুঝে বললেন, হ্যাঁ, ওই ঘাটেই কাজ হয়েছে। শ্যামলের মাথায় অন্য চিন্তা ঢুকে পড়ল। বাঁশ ঘাটের কাছে গঙ্গা আধমাইল দূরে সরে যাওয়ায় লোকেদের মড়া পোড়াতে অসুবিধা হয়, অতোখানি পথ ঘাস-মাটি-কাদা-ইঁটের ওপর দিয়ে মড়া কাঁধে হাঁটতে হয়। ইলেকট্রিকটা ইচ্ছে করে খারাপ করে রাখে কাঠের ব্যাপারি আর ব্যবস্থাপকের যোগসাজশ। অগত্যা একটাই ঘাটে সবাই যেতে চায় গুলবি ঘাট। কিন্তু সে ঘাটে পৌঁছোবার রাস্তা খুব সরু। খাজেকলাঁ ঘাটে যাওয়ার চওড়া পরিষ্কার রাস্তাটা দেখে মনে এল তাহলে এদিককার লোকেদের জন্য এটা ভালো বিকল্প।

গুলজারবাগ বাজারে যাওয়ার রাস্তাটা একটা বড় নালার ওপর দিয়ে গেছে। মরশুমে ওই নালার দুধারেও বসে পড়ে ডাঁটিসুদ্ধু গোছা গোছা টাটকা শাপলা ফুল, সারা গায়ে ক্ষুদিপানা লেগে থাকা টাটকা ওঠানো পানিফল । শাপলা ফুলের ডাঁটির চচ্চড়ি কী দারুণ লাগে! ছোটোবেলায় কয়েকবার বাবা বাড়িতে এনেছে। মায়ের হাতের সেই চচ্চড়ির স্বাদ মনে পড়ল শ্যামলের। আর পানিফলের তো কথাই নেই, তার জিভে জলদুনিয়ার রাজা। কাঁচা খাও, সেদ্ধ খাও, পিষে মিষ্টি বানাও । এই ভাবীজীও দারুণ রান্না করেন পানিফলের তরকারি।  

আর সেই জায়গাটাই সে ভুল করল কয়েক বছর পর। তখন তাদের বাড়ির দিকের রাস্তাটায় নতুন উড়ালপুল তৈরি হচ্ছে। বর্ষাকালে রোজ সন্ধ্যারাতে অনেকখানি জলে ডোবা ঘুরপথে টলমল করতে করতে যায় বড়ো চাকার অটোগুলো। একটু বেশি বাঁদিক হয়ে অপোজিট সাইডকে পাস দিতে গেলেই উল্টোবে। তার ওপর সঙ্গে থাকেন পঁচাত্তর বছরের এক কমরেড, রেবতীবাবু। শ্যামলকে তার বাড়ির সামনে নামিয়ে নই সড়ক অব্দি যান। গুড়হাট্টায় তাঁর বাড়ি।

সেদিন সে নিজেই প্রস্তাব দিল, আমার আপনার জন্য ভয় করে কমরেড। চলুন আজকে অশোক রাজপথ দিয়ে যাই। আমি পশ্চিম দরওয়াজায় নেমে যাবো, আপনি সোজা গুড়হাট্টায় বাড়ির সামনেই নামবেন। তিনি জিজ্ঞেসও করলেন, আপনার অসুবিধে হবে না তো? তাচ্ছিল্যের সঙ্গে নাঃ বলে রাত নটায় টিপ টিপ বৃষ্টির মধ্যে পশ্চিম দরওয়াজায় নেমে এগিয়ে গেল। দাদরমন্ডির রাস্তায় নেমে হাঁটু জল। দোকানপাট বন্ধ তাই অন্ধকার।

ঠিক ঐ শাপলাফুল বসার জায়গাটা আন্দাজ করে, জলের নিচে আরসিসির শক্ত, সমতল ছোঁয়াটা আন্দাজ করতে করতে পেচ্ছাপ করতে এগোলো। এক পা এগোলো ভুল আর ভুস্‌ - দ্রুতবেগে বইতে থাকা বর্ষার ভরা নালায় ডুবল। কী ভাগ্যিস, আর্কিমিডিসের সূত্র অনুযায়ী সেই মুহূর্তে তাকে উপরে ঠেলল জল আর তার রিফ্লেক্স বলল বাঁহাত জমি ছোঁবে। তাই ছুঁলো আর সেটা নরম কাদাটে নয়, আরসিসিরই একটা ভাঙা অংশ। সজোরে আঁকড়ে আরেকটা হাত দিয়ে ঠিক কালভার্টের ওপরটা ধরল আর উঠে এল ওপরে।

সারা গায়ে, মাথায় পাঁক। কাঁধের ব্যাগের ভিতরে জল, তার মধ্যে ভাসছে মোবাইল আর তোলা কিছু টাকা। ডাইরি, কাগজপত্র তো আছেই। বাড়ি যাবে কী করে? ভাগ্যিস পুরো বাজারটা বন্ধ। ভাবতে ভাবতেই দেখল অদূরে একটা বাল্বের আলোয় কয়েকজন ধুতি-কুর্তা বসে আছে; বাজার পঞ্চায়েতের কেউকেটারা মনে হয়। সন্তর্পণে এগোতে এগোতে জল গোড়ালি অব্দি নামল। তখনই দেখল পাশে রাস্তার কলটা। চটি তো নালাতেই রয়ে গেছে। মাথা, মুখ, শখ করে পরা হাফ পাঞ্জাবি, পাজামা, ব্যাগের ওপরটা যতটা সম্ভব ধুয়ে ইচ্ছে করে এগোলো মজলিসটার দিকে।

সরজি, কটা বাজছে বলুন তো! সবার চাউনিতে বুঝে গেল সে কাকভেজা বুঝলেও, নালায় ডুব দিয়ে এসেছে কেউ বোঝে নি। নিশ্চিন্ত হয়ে, নটা চল্লিশ বাজে শুনে নিয়ে। অটো না পাওয়া গেলেও ক্ষতি নেই। এখান থেকে বহুবার হেঁটে বাড়ি গেছে; এই যা, পায়ে চটি নেই। এমন ধোঁকা দিল তার প্রিয় রাস্তাটা? ভাবীজি পরে শুনে বলেছিলেন, ওমা, এ বাড়িতে এলেন না কেন? এখানেই স্নান-টান করে বাড়ি যেতেন। এখানেই খেয়ে শুয়েও থাকতে পারতেন! ধ্যাৎ। ঐরকম সময়ে বাড়ি, স্ত্রী-সন্তানের মুখ সবচেয়ে বেশি টানে।

কিন্তু রাস্তাটাকে ঐ দুঃস্বপ্নের রাতে বেঁধে রাখা চলবে না। প্রাচীন শহরের প্রাচীন পশ্চিম প্রবেশদ্বার থেকে প্রাচীনতর লুপ্ত রাজদরবারের দিকে যাওয়া বাজারপথ বলে কথা। তার প্রিয় রাস্তা। কয়েক সপ্তাহ পরেই একদিন ছুটি নেওয়ার ছিল। একটু বেলা করে দুটো থলে হাতে নিয়ে অনেক বাজার করল। তারপর যেই ব্যাঙ্কের ব্রাঞ্চটার সামনে এসে দাঁড়ালো, হঠাৎ দেখল রামকুমারী। জাতে বলে ডোম, তবে না-ও হতে পারে। আজকাল অনেককিছু চলে। পার্টটাইম সাফাই কর্মচারি। চাকরির সময় সাহায্য করেছিল তাই তার ভক্ত বলতে গেলে। বরটা পক্ষাঘাতগ্রস্ত। দুই মেয়ে, এক ছেলে।

প্রণাম করে বলল, আসুন না স্যার ব্রাঞ্চে!

-       দেখছিস না, দুহাতে বাজারের থলে?

-       তাতে কী হয়েছে।

-       না, এখন যাবো না।

-       ঠিক আছে, তাহলে একটু চা খান।

শ্যামল সাধারণতঃ না করে কিন্তু আজ হঠাৎ সেদিনের কথাটা মনে পড়ে গেল। বৃষ্টির রাতে রাস্তাটা তাকে বেইজ্জত করেছিল। আজ রোদে ভরা আশ্বিনের সকাল।

-       ঠিক আছে, খাবো। তুইও খাবি তো?

একটু অপ্রতিভ হয়ে বলল রামকুমারী, ঠিক আছে স্যার। এই যে, দুটো চা দিন তো!

-       আয়, বসি।

-       আসুন না ছায়ায় বসবেন। চড়া রোদ্দুর এখানে।

-       নাঃ, এখানেই ঠিক আছে। তোর রোদ্দুর লাগছে?

-       না।

-       তাহলে বস। 

চা ওয়ালা দুটো চা দিয়ে গেল। শ্যামল ঘরসংসারের গল্প করছিল রামকুমারীর সঙ্গে কিন্তু মনটা তার দুষ্টু ছেলের আয়নার মতো, রোদ্দুরে মাঝবয়সী নারীটির ঘর্মাক্ত হাসিমুখ প্রতিফলিত করছিল সেদিনের অন্ধকারে। জলে ডোবা রাস্তাটার চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছিল। 

 

৩.৬.২৬

Monday, June 1, 2026

এদেশের প্রতিটি শহর

এদেশের প্রতিটি শহর
গড়ে কিছু মানুষ যাদের
চোখে সেই শহরের জ্বর।
 
কেউ বা পাহারা দেয় প্ল্যাটফর্ম, ময়দান,
কেউ হেঁটে পাড়ি দেয় রাষ্ট্রপতি ভবন,
কেউ বা চায়ের ভাঁড়ে
হঠাৎ কপাল খুঁড়ে
বেবাক চালিয়ে যায় তিন আঙুলে স্টেনগান।
কেউ বা দাঁড়িয়ে থাকে উদাসীন, ঝিম মেরে,
কেউ বা সাংবাদিক প্রলাপে দেয়াল ভরে
                  মানবাধিকার আর তদন্তকমিশন
                  নিখোঁজ মেয়ের নাম
                  ভুয়ো দলিলের দাম
                  বিধায়ক-আবাসের রাতগুলো ফাঁস করে।
কেউ বা ব্যাঙ্কে গিয়ে তিন লাখ ধার চায়,
কেউ বা পুলিশ-জিপ দেখে পেছন নাচায়,
কোর্টের গেটে কেউ শোনায় শেষবিচার
বিচারক আমলা ও মন্ত্রী সান্ত্রীদের
কেউ বা নগ্ন হয়ে না দেখিয়ে ছাড়ে না
বীভৎস রাত ভরে দয়া তার স্বামীদের।
কেউ বা একলা খুব, বারোমাস শীতে কাঁপে,
রাতের বিজন পথে যেচে সখ্যতা চায়,
কেউ বা ধর্মপ্রাণ, হঠাৎই মোড়ের কাছে,
আকাশ প্রণাম করে গলিতে পালিয়ে যায়।
 
দেশভরা এই মানুষেরা
নাগরিকদের কাছে নিজেদের ইতিহাস
                  জানাতে দেখায় এক দেশ
বাঁচার দ্বন্দ্বে জর্জর।

৪.২.৮৩

 

ভাষাস্মৃতি

অনুভব, তবু নিরেট, হয়ত দেয়াল! খনি বলেছিল।
ড্রিল কর, গোঁজো বিস্ফোরক টিউবগুলো প্রশ্নের,
কাঁচা আকরশক্তিতে ভরা ওয়াগন আনো বর্তমানে।
 
মেলাও ভাবনার প্রতিশত! বলেছিল ধাতুশাল।
কিছু উৎপ্রেরক, কিছু শুদ্ধিকারক, কিছু দেয়
প্রয়োজনমত দৃঢ়তা, নমনীয়তা আর সহ্য ক্ষমতা।
চুল্লিটা জ্বলছে জীবনের!
জ্বলছে মাথায় বেঁচে থাকা, অভিশপ্ত বেঁচে থাকা।
আরেকটা নতুন চুল্লি চার্জ কর লড়াইয়ের তার উত্তাপের কাঁটায়
মিশেল গড় সত্ত্বার!
 
হেসেছিল কামারশাল দেড়শো মোটরের গর্জন ছাপিয়ে।
পাঞ্চিং নোজটারও দরকার পড়ে হে!
রকমারি হাতুড়ির! আবার কুল্যান্টেরও মাঝে মাঝে!
 
নির্মাণ কথা বলেছিল। সাথে এসেম্বলি-লাইন।
গঠন! সংগঠন গড়ে তোল রক্তের সঞ্চারে ও অভিসারে!
কাঠামো, তার জ্যামিতি ঘিরে গ্রন্থনা,
গতির কোষ ও প্রবাহ শরীরে; স্বাধিকার অথবা ক্ষমতার,
শিক্ষা অথবা ভালোবাসার, গানের,
অথবা নিছক দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাওয়ার সংগঠন!
 
তোমরাও তো কথা বলেছিলে! রুজিখেকো যন্ত্রগুলি!
বলেছিলে অমলিন কতকাল শীতাতপ নিয়ন্ত্রণে থাকবে?
গড়ছ কেন্দ্রীয় কম্যান্ড, বিপুল হিসেবনিকেশের,
বৈজ্ঞানিকদের ব্যক্তিগত সচিব, কোনোদিন
গড়বে চকখড়ির ভায়োলিন, ব্ল্যাকবোর্ডের পিয়ানোকর্ডিয়ন
স্কুলে যাবে পৃথিবীর শেষ শিশুটিও।
শেখাতে চেয়েছিলে তোমরাও
সংহত গণিত, কত জরুরি ক্রিয়ার!
 
দাঁড়াও হে তোমরা!
এত ভীড় কবিতায় ধরা কি সম্ভব?
আপাততঃ পরিবহণের দিকে যাই।
ক্রীতদাসবাহী জাহাজের খোলেও একটা ভুগোল
আজ তার রক্তের ইতিহাস হয়ে আছে।
 
গুরুজনেরা ধমকেছিলেন, বলি, টিঁকবে তো?
যা গড়তে চাইছ?
বলি, রক্ষণাবেক্ষণ আর যোগান! ভুলে গেলে?
ভুলে গেলে যে ঘুমের জন্য লাগে গ্যাংম্যান?
বর্ণমালার জন্য টার্বাইন আর জলাধারের কর্মীদল?
গোধুলির জন্য প্রহরী?
আর নীলকন্ঠ কম্পোজিটর যে বন্ধুত্বের ডায়ালটা গড়ে প্রতিদিন?
বলি ওই যে জীর্ণ হয়না কখনো, আগুনে পোড়ে না,
ওটারও তেল লাগে, গ্রিজ!
বলগুলো বদলাতে হয় মাঝে মাঝে বেদনারও বেয়ারিংয়ের
নইলে শক্তির না দিয়ে নিছক প্যাঁচাল হয়ে ফেঁসে যায়।
 
অফিস বলেছিল, এমনিতেই একটু বেশি বলি, নতুন কী বলি?
সময়ের ডাইরি রাখা যদি ঠিক মত হয়
কথা আর কাজের ফারাকে জীবনে কম লাগে ঘুণ।
ঝুঠো শিলমোহর ছাপিয়ে আয়না হয়ে ওঠে দস্তাবেজ। 

তাও তো পূর্ণতা নেই! রক্তের পুঞ্জিভূত ধুলোয়
ঋতুদের বিভাজনরেখা অস্পষ্ট করছিল কর্মহীনতা, বেকারি।
 
সবশেষে কথা বলেছিল চাষ।
দেশটা দুধ হয় হে, দুধ! পরিশ্রমী সংকল্পের শিষে!
চুপ করে শোনো তার নীরব উৎসার!
 
কবিতা কি শুনেছিল?
 
৩১.৮.১৯৯১

 

 

ভারতবর্ষ বাড়ছে

আমার এক স্বাধীনচেতা মায়ের বিয়ে
কালো বলে যখন এক
দোজবরের সাথে হয়েছিল
তখন যারা ওই কালো ডানপিটে মেয়ের
দুঃখের ঘর ভেঙে দিতে
লিখেছিল বেনামি উড়ো চিঠি,
বেশ্যা বলতে ছাড়ে নি
তাদেরই আজ রমরমা।
 
ভারতবর্ষ তাই বাড়ছে
তিরতির করছে বাড়,
রক্তের ভিতরে অজানা কোষপুঞ্জের মত
কোন দিকে কতটা হবে বিকৃত বিস্ফার
কবে ফিরব নদীর কাছে
মাটির কাছে
প্রশ্ন কোরো না।
 
কোথায় কী নতুন প্রসঙ্গ ঢুকছে প্রাচীন গীতিকায়
কেমনভাবে ঢুকছে
মিশতে হবে হাওয়ায়;
ওবি ভ্যান শুধু অকুস্থলে ঘোরে।
 
৯০-এর দশক

দ্বিধা

হদ্দ কাজ-পাগলী মেয়ের
কাব্যপাঠে করলে এমন ভর!
দ্বিধা! তোমায় চিনলাম!
শিল্পে না হও, সততায় সুন্দর!
 
থাকো প্রথম প্রণয়-নিবেদনের স্বরে
আবিষ্কারের অনির্ণয়ের বন্ধ ঘরে
অনিশ্চিতের ঠিকানাতে ওড়াও চিঠি।
 
জীবনসাথীর কুড়িয়ে দিঠি
সেও চলেছে ক্লান্ত সাঁঝের
বীথিতে তার শব্দ-দোলন,
কাটাকুটি, মনন-প্রয়াস
 
দিনযাপনের বাচালতার
কঠোর অনভ্যাস।
দ্বিধা! নও সত্যে, তবু স্বভাবে সুন্দর।  
 
পাটনা
১৬.৯.২০০৩

সে ও তার চেয়ার

সে নয় তার চেয়ার বলছে!
সে তো সবার সাথেই চলছে!
যেথায় বলবে, যেতে রাজি।
চেয়ারটাই তো আসল পাজি!
চেয়ার হল রাষ্ট্রযন্ত্র।
সে তো বরং সমাজতন্ত্র!
 
কিন্তু চেয়ার দেয় মাইনে।
চেয়ার-স্ত্রোত্র আছে আইনে।
চেয়ার বাঁচিয়ে যে সাহায্য
করতে বলবে হোক অন্যায্য
সব সে তোমার জন্য করবে;
পকেট থেকে চাঁদা ভরবে।
 
চেয়ার গেলে খাবে কী সে?
জর্জর এই বাঁধন-বিষে
কোথায় যাবে পায় না কূল
চেয়ারটি তার চক্ষুশূল!
 
৩১.৭.২০০৫এর কাছাকাছি