Monday, June 8, 2026

কমরেড ইজরাইল

আজ ৫ই নভেম্বর কমরেড ইজরাইলের জন্মদিন। তাঁকে স্মরণ করার ব্যক্তিগত কারণ এই যে ১৯৯৭ সালে তাঁর হাতেই আমার কবিতার বই সমুদ্র দুভাবে ডাকের আবরণ উন্মোচিত হয়েছিল। তবে সামাজিক কারণটা তার চেয়ে অনেক বড়। তিনি শ্রমিক শ্রেণীর লেখক। শ্রমিক পরিবারেই জন্ম, শ্রমিক হিসেবেই শুরু করেছিলেন জীবন, প্রথাগত শিক্ষায় খুব বেশি দূর এগোতে পারেন নি, তবে কারুর না কারুর সাহায্য, সান্নিধ্য, গুরুমন্ত্র ও প্রশিক্ষণে লেখক জীবন শুরু করতে পেরেছিলেন।

তাঁর সঙ্গে আমার মোটমাট দেখা মাত্র তিনবার। চারবার হয়ে থাকলেও চতুর্থটা মনে নেই। প্রথম আলাপ পাটনায়। সালটা বোধহয় ১৯৯৪, সিআইটিইউ-এর সর্বভারতীয় সম্মেলন উপলক্ষে। আমি ভলান্টিয়ারে ছিলাম। কোথাও কোনো একটা ঘরে, সে-ঘরে সেসময় পাটনার খ্যাতনামা ডাক্তার এ কে দত্তও ছিলেন, বোধহয় কবি আলোক ধন্বাই আমাকে কমরেড ইজরাইলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাঁর নম্র ব্যক্তিত্বে খুবই আকর্ষণ অনুভব করেছিলাম।

তাই, তারপর কোনো একটা কাজে যখন কলকাতায় গেলাম, তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে, স্বাধীনতার দপ্তরে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করব বলে। সেখানে খবর পেলাম তিনি নিজের বাসস্থানে চলে গেছেন। পাশেই কোথাও একটা হোস্টেল বা মেসের বাড়ি ছিল। তাতে কয়েক (চার? পাঁচ?) তলা (বোধহয় লিফটে) উঠে একটা ছোট্টো ঘরে পৌঁছোলাম। বাঁদিকের আর ডানদিকের দেয়ালে সাঁটিয়ে দুটো সিঙ্গল খাটের বিছানা। মাঝখানে, সামনের জানলা ঘেঁষে একটা (বা হয়তো ছোটো ছোটো দুটো) টেবল আর একটা চেয়ার। কমরেড ইজরাইল বাঁদিকের বিছানায় ছিলেন। আর

ডানদিকের বিছানায় ছিলেন কমরেড ইন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়। তাঁকে চিনতাম। কেননা কিছুদিন আগেই, অর্থাৎ ১৯৯৪এর ডিসেম্বরে, কলকাতা বাংলা সাহিত্য সম্মেলন ১৪০১এ বিহারের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম। বস্তুতঃ, পূর্ণেন্দু মুখোপাধ্যায় তাঁর প্রাপ্য নিমন্ত্রণটা আমাকে পাস-অন করেছিলেন। তাই ইন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের স্বাক্ষরিত নিমন্ত্রণপত্র পেয়েছিলাম এবং জানতাম যে তিনি পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক।

সেই সাক্ষাতে কমরেড ইজরাইল আমাকে হাতে লেখা একটি কবিতা দিলেন। মহারাষ্ট্র বিধানসভার নাগপুর অধিবেশন উপলক্ষে স্থানীয় আদিবাসীদের মিছিল, পুলিসের আক্রমণে ছত্রভঙ্গ হয়েছিল এবং তাতে বহু মানুষ পদপিষ্ট হয়ে মারা যান। সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ত্রিপুরার তৎকালীন সংস্কৃতি মন্ত্রী কবি অনিল সরকার একটি কবিতা লিখে পাঠিয়েছিলেন। ইজরায়েল আমাকে দিয়ে বললেন, আলোককে দিয়ে হিন্দিতে অনুবাদ করিয়ে আমাকে পাঠিয়ে দিন, স্বাধীনতায় দেব। পাটনায় ফিরে বহুবার বললাম আলোকজিকে। যা ওনার স্বভাব, এধরণের কোনো কাজে বসানো কঠিন। শেষে, আমিই যেমন পারি, অনুবাদ করে পাঠিয়ে দিলাম। ইজরায়েলজিকে লিখে দিলাম, আলোক ধন্বার নয়, আমার করা, আপনি সেভাবেই দেখবেন। জানি না, স্বাধীনতায় ছাপা হয়েছিল কিনা।

তারপরের দেখার কথা তো এর আগে ফেসবুকে ছবিসুদ্ধু পোস্ট করেছি। ১৯৯৭ সাল। কবি দীপন মিত্র, কবি অনির্বাণ দত্ত এবং আরো অনেকের উদ্যোগে পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সঙ্ঘের স্থানীয় (কলকাতা?) শাখার তরফ থেকে আমার সমুদ্র দুভাবে ডাকের আবরণ উন্মোচন অনুষ্ঠান। একমাত্র আলোক ধন্বাই তাতে ছিলেন না। তিনি দিল্লিতে। নইলে, দীপন ছাড়াও নীলুদি, তাঁর ছেলে সঞ্জয়, শাহিদ, একরাম, কলকাতা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আরো অন্যান্য পরিচিত বয়স্ক এবং সমবয়সী কমরেড ! কমরেড ইন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়, কমরেড জিয়াদ আলি । সেই বোধহয় ইজরাইলের সঙ্গে শেষ দেখা।

তবে হ্যাঁ, চতুর্থ দেখার একটা অন্য গল্প আছে। তখন নীলুদি, কমরেড নলিনী তিওয়ারি (জনবাদী মহিলা সমিতি, বিহারের রাজ্য কোষাধ্যক্ষ) বাংলা ও রুশীয় ভাষা শিখে মনের আনন্দে অনুবাদ করে চলেছেন। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের বিদ্যুৎলতা করলেন, সোমেন চন্দের বেশ কয়েকটি গল্পের অনুবাদ করলেন, আমার ক্যালেন্ডার করলেন। ব্রেখটের গ্যালিলিওকে সংক্ষিপ্ত একাঙ্ক রূপ দিয়েছিলেন প্রবীর দত্ত। তাঁর লিখিত অনুমতি নিয়ে অনুবাদ করলেন গ্যালিলিও। জনবাদী সাংস্কৃতিক মোর্চার পাটনা শাখা প্রেরণার উদ্যমে সে নাটক অভিনীত হল বেশ কয়েকবার এবং যথেষ্ট জনপ্রিয় হল। তারপরই খবর পেলাম, কলকাতায় অরুণ মুখোপাধ্যায় ধরেছেন ইজরাইলের উপন্যাস রোশনরোশন আমার পড়া আর অরুণ মুখোপাধ্যায়ের জগন্নাথ আমার দেখা। লু শুনের ট্রু স্টোরি অফ আহ কিউও পড়া। নীলুদিকে বললাম,অনুবাদটা ধরুন, জমে যাবে। বাংলা নাট্যরূপের পাণ্ডুলিপি এবং অনুমতিপত্র আনিয়ে অনুবাদ শুরু করে দিলেন। অনুবাদ হল। কিন্তু জমল আর না। কেননা, ততদিনে প্রেরণা সাময়িকভাবে উদ্যমহীন হয়ে পড়েছিল। ভালো ভালো বেশ কয়েকটি ছেলে চলে গেছে মুম্বই, সিনেমায় যাবে।

নীলুদি চলে যাওয়ার কিছুদিন আগেই তাঁর পান্ডুলিপিগুলো আনিয়ে ছাপানোর কাজ শুরু করেছিলাম। কিন্তু তিনি হঠাৎ আমাকে আইসক্রিম না খাইয়ে চলে যাওয়ায় মুদ্রিত রোশনটা আর দেখাতে পারলাম না।   

পাটনার মহিলা অটোচালকেরা


বিহারের রাজধানী পাটনা শহরে কিছুদিন যাবৎ মহিলারা অটোচালকের কাজে যোগ দিয়েছেন। শুনতে রীতিমত দুঃসাহসিক। সাধারণ ঘরের মহিলাদের পুরো একটা দলকে অটোচালক হবার জন্য উৎসাহিত করার এই চমকপ্রদ কাজটা করেছেন সি.আই.টি.ইউ.এর পরিচালনাধীন পাটনা জেলা অটোচালক সঙ্ঘের নেতৃবৃন্দ। শুধু এই পথে নিজেদের পরিবারের অন্নসংস্থান খুঁজতে উৎসাহিত করা নয়, চালকের কাজে তাদেরকে প্রশিক্ষিত করা, ট্রেনার নিযুক্ত করে, বিশেষ কোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে মার্শাল আর্টসেও তাদের কুশল করে তোলা, সরকার ও প্রশাসনের সাথে কথা বলে তাদের লাইসেন্স পাওয়ানোর ব্যবস্থা করা, পাটনা জাংশনের প্রিপেড অটো স্ট্যান্ডে তাদের জায়গা করিয়ে দেওয়া… এই সমস্ত কাজে এগিয়ে এসেছে পাটনা জেলা অটোরিকশা চালক সঙ্ঘ। এঁরাও সংগঠনের সদস্য হয়েছেন। কয়েকজনের মধ্যেকার নেতৃত্বের সুষুপ্ত ক্ষমতা জেগে ওঠার জায়গা পেয়েছে। এঁদের মধ্যে অনেকেই ১২ই ডিসেম্বর ২০১৩য় দিল্লীতে শ্রমিক সংগঠনগুলোর পার্লামেন্ট মার্চে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

এই মহিলাদের কয়েকজনের ‘জবানবন্দী’, সম্মেলন উপলক্ষে প্রকাশিত বিহার স্টেট অটোচালক সঙ্ঘের স্মরণিকায় ছেপেছে। তারই সংক্ষিপ্ত রূপ বাংলায় নিচে দেওয়া হল। ছবি যে কটা পেয়েছি, সেগুলো যোগাড় করে দিয়েছেন অটোচালক সঙ্ঘের নেতা রাজকুমার ঝা, চুন্নু সিং এবং নবীন মিশ্র।

 

কাঞ্চন দেবী

আমি কাঞ্চন দেবী। পিতার নাম কেশব মাহাতো। জন্ম হয়েছিল নালন্দা জেলার চন্ডী থানান্তর্গত ধর্মপুর গ্রামে। পাঁচ বোন আর এক ভাইয়ের মধ্যে আমি সবচে’ ছোটো। পরিবারের অবস্থা ভালো ছিলো না। তাই আমার বিয়েতে বাবা বেশি খরচ করতে পারেন নি। ১৯৯৮ সালে নালন্দা জেলার হিলসা থানান্তর্গত উগন বিগহা গ্রামের নিবাসী মোসমাত চন্দেশ্বরী দেবীর বড় ছেলে রাম সিংএর সাথে আমার বিয়ে হয়। শ্বশুরবাড়ীর পরিবারও সাধারণ ছিল। শ্বাশুড়ি গ্রাম ছেড়ে এসে থাকতেন পাটনার বাহাদুরপুর হাউসিং কলোনিতে। তিন ছেলের মুখে তিনি অন্ন জোটাতেন ঘরে ঘরে বাসন মেজে। শিক্ষা পায়নি বলে বড় হয়ে ছেলেগুলো মজুরি করা শুরু করেছিল। আমার স্বামী প্লাম্বারের কাজ করতেন কিন্তু মদের নেশায় পরিবারের ভরনপোষণ করতে ছিলেন অক্ষম। বাধ্য হয়ে আমাকেও ঘরে ঘরে ঝিয়ের কাজ ধরতে হয়েছিল। ধীরে ধীরে তিন মেয়ে হল আমার। আজ বড় মেয়ে ১২ বছরের, তার পরেরটি ১০ আর সবচেয়ে ছোটোটি ছয় বছরের। শ্বাশুড়ির পরিবার আর আমাদের পরিবার আগেই আলাদা হয়ে গিয়েছিল।

জুন ২০১২য় আমার শ্বাশুড়ি মারা গেলেন। লিভারের অসুখে আমার স্বামী মারা গেলেন ২০১৩র ২৬শে ফেব্রুয়ারী। পরিবারের খাইখরচে সে বিশেষ কিছু দিতে পারতো না, শুধু নিজের সংকল্পের জোরে বাচ্চা তিনটেকে প্রাইভেট স্কুলে পড়াচ্ছিলাম, কিন্তু তার মারা যাওয়াতে ভীষণ একা হয়ে পড়লাম। ঝিয়ের কাজে দিন চলছিল না। তখনই পাশের ঘরের মঞ্জু কুমারী খবরের কাগজে পাটনা জেলা অটোরিকশা চালক সঙ্ঘের একটা বিজ্ঞাপন পড়ে আমাকে খবর দিল। অটোরিকশা চালক সঙ্ঘের সচিব নবীন কুমার মিশ্রা নাকি মেয়েদের অটো চালাবার ট্রেনিং দিচ্ছেন। আমিও তাতে শামিল হয়ে গেলাম। উনিই ট্রেনিং দিলেন, লাইসেন্স যোগাড় করে দিলেন। ব্যাঙ্ক অফ বড়োদা থেকে ঋণের ব্যবস্থা করিয়ে দিলেন। যে বাড়িগুলোয় আমি ঝিয়ের কাজ করতাম তাঁরাও আমাকে কিছু কিছু অর্থসাহায্য দিলেন অটো কিনতে। ১৮ই আগস্ট ২০১৩ থেকে আমি পাটনা জাংশনের প্রিপেড অটোস্ট্যান্ড থেকে অটো চালাচ্ছি। সকাল ছটা থেকে সন্ধ্যে ছটা অব্দি স্ট্যান্ডে থাকি। সারাদিনে তিন-চার ফেরির সওয়ারি জুটে যায়। তেল আর স্ট্যান্ডের খরচ কেটে ২০০-২৫০ টাকা বাঁচে। ব্যাঙ্কের ঋণ ফেরাতে ১০০ টাকা প্রতিদিন দিতে হয়। অটোর মেন্টেনেন্সের জন্য ৫০ টাকা আলাদা করে রাখি। এভাবে ১০০ টাকা থাকে নিজের আর বাচ্চাদের খাইখরচের। চলে না। বাড়িতে থাকতে পারি না বলে বাচ্চাদেরও সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু মানুষেরা, সঙ্ঘের সাথীরা আশ্বাস দিয়েছেন যে দিন বদলাবে – সেই ভরসায় বাঁচছি। 

নবীন মিশ্র স্যার, রাজকুমার ঝা স্যার (এঁরা স্যার বলতে মানা করেন কিন্তু আমার স্যার বলতেই ভালো লাগে) এবং আরো সমস্ত নেতারা আমাদের পথ দেখাচ্ছেন। আমাদের সংগঠন তৈরি হয়েছে – অটোরিকশা চালক সঙ্ঘের মহিলা উপসমিতি। আমার মধ্য সেই সংগঠনে কাজ করারও রুচি জেগেছে।  

 

পিঙ্কী দেবী

আমার নাম পিঙ্কী দেবী। মার নাম সী কুমারী দেবী। বাবার নাম বিজয় কুমার। আমার হাসব্যান্ড কুক। তাঁর নাম শ্যাম নারায়ণ প্রসাদ। পরিবারের খরচ চলছিল না বলে ভাবছিলামই যে কিছু করা উচিৎ আমার কিন্তু পারছিলাম না। তখনই খবরের কাগজে দেখলাম যে পাটনা জেলা অটোরিকশা চালক সঙ্ঘ নিখরচায় মহিলাদের অটো চালানোর ট্রেনিং দিচ্ছে। নবীন কুমার মিশ্র নামে একজনের মোবাইল নম্বরও দেওয়া ছিল। রাত ভর ভাবলাম। স্বামী এবং সন্তানদেরও বোঝালাম যে কাজ করাটাও জরুরী আর সন্তানদের ভালো শিক্ষাদীক্ষার ব্যবস্থা করাটাও মা-বাপের টাস্ক। তারা রাজী হয়ে গেল।

নির্ধারিত দিনে আমি ভেটেরিনারী কলেজ ময়দানে পৌঁছোলাম। দেখলাম অনেক মহিলা ট্রেনিং নিচ্ছেন। আমার মনেও বিশ্বাস জাগলো। আমিও ট্রেনিং নিলাম।

মাঝে সঙ্ঘের নেতারা আমাদের সমঝদারী, সাহস আর বিশ্বাস বাড়াতে সভার আয়োজন করতেন। সেই সব সভায় মহিলা নেত্রী অনিতা দ্বিবেদী, সিটু নেতা অরুণ কুমার মিশ্র, শঙ্কর সাহ, চুন্নু সিং এবং আরো অনেকে আশ্বাস দিতেন যে আমাদের এগিয়ে চলার পথে কোনো রকম বাধা বা ঝুঁকি এলে সঙ্ঘ আর ইউনিয়ন আমাদের পাশে থাকবে। তাঁরাই লাইসেন্স করিয়ে দিলেন, ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ পাওয়ালেন, কোন গাড়িটা ভালো সেসব বোঝানো, কম্পানির সাথে কথা বলা… সব করলেন। আমরা অনুভব করলাম যে ইউনিয়নের লোকেরা আমাদের পরিবারের সদস্যের মত।

ওঁরা আমাকে কামকাজী মহিলার জাতীয় কর্মশালায় প্রশিক্ষণ নিতে বললেন। আমাকে উৎসাহ দিয়ে ওড়িশা পাঠালেন। সারা দেশের মহিলাদের সাথে মিশে আমার মধ্যে একটা দায়িত্বের বোধ জাগলো। সংকল্প নিলাম যে আমিও মহিলাদের স্বার্থে কাজ করব।

১৭ই নভেম্বর ২০১৩য় পাটনা জেলা অটোরিকশা চালক সঙ্ঘের সম্মেলন হল যাতে মহিলা উপসমিতি গঠন করা হল। আমি ওই উপসমিতির কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হয়েছি।

   

সরিতা পান্ডে

আমি পেশায় শিক্ষিকা ছিলাম। আমার স্বামী একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে সেল্‌সম্যানের কাজ করেন। পরিবারের সাথে আমি আনন্দে ছিলাম। শিক্ষিকা হিসেবে শিশুদের পড়াতে আমার ভালো লাগতো। কিন্তু সমাজের জন্য চিন্তা করা আর সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করা আমার পছন্দের একটা ব্যাপার ছিল। যখন খবরের কাগজে আমি মহিলা অটোচালক ট্রেনিংএর বিজ্ঞাপনটা দেখলাম, মনে হল বিহারের জন্য এটা নতুন কিছু এবং আর্থিক বা পারিবারিক দিক থেকে প্রতাড়িত মহিলাদের জন্য নিজের পায়ে দাঁড়াবার একটা সোনার সুযোগ। তখনই অটোচালক সঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক রাজকুমার ঝা আর নবীন কুমার মিশ্রর সাথে আমি দেখা করলাম। দেখা করে আমার সাহস আরো বাড়ল। লার্নিং লাইসেন্স আর ট্রেনিংএর পর্ব শুরু হল। তারই সাথে আত্মরক্ষার জন্য আমাদের ক্যারাটে আর তাইকোন্ডোর ট্রেনিং দেওয়া হল। আর আজ আমাদের অটো জোর গতিতে রাস্তায় দৌড়োচ্ছে।

বিহারের প্রতিনিধি হয়ে ওড়িশার পুরীতে ওয়ার্কশপে গিয়েছিলাম। নিজের রাজ্যে অটোরিকশা চালক সঙ্ঘের নেতৃত্বেও আমি নির্বাচিত হয়েছি। ভবিষ্যতে আমি নারীদের এগোবার পথে সাহায্য করতে চাই।

        

অনিতা দেবী

আমি অনিতা দেবী, নিজের অভিজ্ঞতার কথা আপনাদের বলছি। প্রথম প্রথম অটো চালাতে আমার ভালো লাগতো না। কিন্তু এখন অটো চালাতে আর তার রোজগারে নিজের পরিবারের প্রয়োজন পুরো করতে পেরে আমি গর্বিত।

আগে আমি চাকরি করতাম। অকারণে ওপরওয়ালার বকুনি শুনতে হত সারাদিন। খুব দুঃখ পেতাম ওরকম অপমানজনক ব্যবহার পেয়ে।

খবরটা পড়ে প্রথমে বিশ্বাসই হতে চায়নি। আমার স্বামী রাকেশ কুমার আমায় নিয়ে গেলেন ভেটেরিনারী কলেজ গ্রাউন্ডে। ট্রেনিং নিতে শুরু করলাম। মাঝেমধ্যে সভা হত, আমাদের চেতনায় সমৃদ্ধি আনতে। নেহা কুমারী আমাদের মার্শাল আর্ট শেখাতেন।…

একদিন অটো চালাবার সময় হঠাৎ মাথা ঘুরে গেল আর স্টিয়ারিং ঘুরে যাওয়াতে উল্টে গেল অটোটা। ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিস দৌড়ে এসে গাড়িটাকে দাঁড় করালো, আমায় উঠিয়ে গাড়িতে বসালো আর আমার স্বামীকে ফোন করলো। রাস্তায় যেতে থাকা অনেক অটোচালক দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাঁরা আমাকে সাহস দিলেন। পুলিসের আর অটোচালক ভাইদের সাহায্য আমি কখনো ভুলবো না। পরিবারেও এমন ব্যবহার পাওয়া যায়না। এই ঘটনার পর তো আমি ভয় শব্দটাই ভুলে গেছি।

 

গুড়িয়া সিন্‌হা

সঙ্ঘের মাননীয় পদকর্তা এবং সদস্যরা যেভাবে সাহস দেখিয়ে আমাদের মত নারীদের সঙ্গে থেকেছেন তার জন্য আমি গুড়িয়া সিনহা আপনাদের সবাইকে নমস্কার জানাচ্ছি।

যেদিন থেকে আমরা, নারীরা রাস্তায় অটো চালাচ্ছি, রাজ্যের পুলিস, প্রশাসন, এবং আম জনতার কাছ থেকে সর্বক্ষণ সহযোগিতা, সহানুভুতি আর প্রশংসা পাচ্ছি। অটোচালকদের মধ্যেও ৯৫% আমাদের সাথে সহযোগিতা করছেন। কিন্তু কিছু এমনও চালক আছেন যাঁরা আমাদের প্রতি অভদ্র ভাষা ব্যবহার করেন। তাঁদের এ ব্যবহার আমায় কষ্ট দেয়। প্রয়োজনে আমি সেই সব চালকদের নাম আর গাড়ির নম্বরও বলতে পারি। তাদেরও আমি এ কথাটা বলে দিয়েছি।

১৭ই নভেম্বর ২০১৩য় বিহার স্টেট অটোচালক সঙ্ঘের দ্বিতীয় রাজ্য সম্মেলনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেলাম। সম্মেলনে যোগেন্দ্র প্রসাদ সিং, মঞ্জুল কুমার দাস, শঙ্কর সাহ আর রাজ কুমার ঝাএর বক্তৃতা আর রিপোর্ট থেকে সিটু আর সঙ্ঘের উদ্দেশ্য এবং কার্য্যক্রম সম্পর্কে অনেক কিছু জানলাম। রাজ্য কমিটিতে সরিতা পান্ডেকে সহ-সভাপতি এবং আমাকে সম্পাদক নির্বাচিত করা হল। তারপর পাটনা জেলা অটোরিকশা চালক সঙ্ঘের মহিলা উপসমিতি তৈরি হল যাতে আমাকে সভাপতি আর সরিতা পান্ডেকে সাধারণ সম্পাদক করা হল। এটা গৌরবের কথা।

আমি সংকল্প নিচ্ছি যে পুরুষ কমরেডদের সাথে কাঁধ মিলিয়ে চলার সাহস যুগিয়ে রাখব, ভালো লীডার হওয়ার চেষ্টা করব আর সিটু ও সঙ্ঘের সাথে থেকে সমাজে মহিলাদের অবস্থা ভালো করার জন্য লড়বো, নিজেদের ওপর হতে থাকা অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নারীদের সাহায্য করবো।

 

নেহা ভার্মা

আমি একজন বেকার যুবতী ছিলাম। শ্বশুরবাড়ির আর্থিক অবস্থা ভালো ছিলো না। তবে বিয়ের আগে থেকেই আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল, কেননা বাপের বাড়িতে চারচাকা আর দুই চাকা, দুটোই আছে। তাই মাথায় এই কথাটা এল যে যদি অটোরিকশা চালক সঙ্ঘের রাজকুমার ঝা আর নবীন মিশ্রর সাথে যোগাযোগ করি তাহলে পরিবারের আর্থিক অবস্থা পাল্টাতে পারে, রুজিরুটির ব্যবস্থা হতে পারে। একদিন রাষ্ট্রীয় সাহারা খবরের কাগজে রাজকুমার ঝাএর মোবাইল নম্বর পেলাম। ওঁদের সাথে যোগাযোগ করলাম। ওঁরা অফিসে ডাকলেন। আমার শ্বশুরমশাইএর নাম অশোক কুমার ভার্মা। তাঁর সাথে সিটু অফিসে গিয়ে আমি সিটুর সদস্য হলাম। তারপর রাজকুমার ঝা আর নবীন মিশ্রর সহযোগিতায় ইউকো ব্যাঙ্ক, ফ্রেজার রোড থেকে লোনের ব্যবস্থা হল আর লীডার অটোমোবাইল থেকে মাহিন্দ্রা আলফা অটো। ড্রাইভিং লাইসেন্স তো আমার চারচাকার ছিল, ইচ্ছেও ছিল স্কর্পিও বা বোলেরো নেওয়ার কিন্তু আর্থিক সঙ্গতি না থাকার কারণে অটো নিলাম। আপনাদের আশীর্বাদ থাকলে, ইচ্ছে আছে একদিন স্কর্পিও চালাবো।

 

রিঙ্কু দেবী

আমার নাম রিঙ্কু দেবী। ম্যাট্রিক পাশ। তিনটে মেয়ে আছে। আগে রান্না করার কাজ করতাম, মাইনে তিন হাজারের কাছাকাছি ছিল। মহিলাদের অটো চালানো শেখানো হচ্ছে… পড়ে আমার ভালো লাগলো। ভাবলাম এটা নতুন ধরণের কাজ। স্বামী কে জিজ্ঞেস করলাম। সে রাজী হয়ে গেল। প্রথম দিন ট্রেনিংএ গিয়ে আমার বিশেষ ভালো লাগলো না। আবার ভাবলাম যে তিন মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও তো ভাবতে হবে! বাড়ির অবস্থা ভালো নয়! তাই শেষ অব্দি অটো চালানো শিখলাম।

পাড়ার লোকেরা রোজ আমায় যেতে দেখে বলতো যে অটো চালানো শুধু পুরুষদের কাজ। তাই আমার কাছে এটা একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ালো।

যেদিন খবরের কাগজে আমার ছবি ছাপলো প্রথম সেদিন বাড়ির আর পাড়ার সবাই খুব খুশী হল।

অটো চালাতে যখন নতুন নতুন বেরোতাম তখন কিছু কিছু যেমন ভালো অভিজ্ঞতা হত, কিছু কিছু খারাপ অভিজ্ঞতাও হত। সেসব উপেক্ষা করে আজ আমি প্রীপেড চালাচ্ছি – সবার সহযোগিতা পাচ্ছি। বাড়িতে বেশি টাকা আনতে পারছি।

নবীন মিশ্র স্যার, রাজকুমার ঝা আর সিটুর অন্য নেতারা বরাবর আমাদের সাহায্য করছেন। তাঁদের দেখানো পথে আমিও সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করতে চাই, যাতে অন্যান্য নারীদের জীবন বদলাতে পারে।

 

বিভা কুমারী

আমি, বিভা কুমারী, সাধারণ পরিবারে প্রতিপালিত হয়েছি। কঙ্কড়বাগ কলোনিতে থাকি। তিন সন্তান। স্বামী টিউশন পড়ান, তাতে কিছু আয় হয়, বাচ্চাদের লেখাপড়া চলে। আয় বাড়ানোর উপায় ভাবছিলাম। তারই মাঝে পেপারে অটোরিকশার বিষয়ে পড়লাম। দুতিনটে মোবাইল নম্বর দেওয়া ছিল। যে নম্বরে যোগাযোগ হল সে নম্বরটা ছিল রাজকুমার ঝা’জীর। আমাকে সবকথা বুঝিয়ে বললেন। ট্রেনিং, লাইসেন্স, লোন, অটো কেনা… । যেমন যেমন নির্দেশ পেলাম করতে থাকলাম। আজ, এত কম দিনে আমার কাছে লাইসেন্স আছে, ব্যাঙ্ক থেকে লোনে অটো কেনা হয়ে গেছে। এসব অবিশ্বাস্য লাগতো। সাধারণ জনতার মত আমরা এঁদের কাছে এসেছিলাম।

আজ আমাদের আত্মশক্তি অনেক বেড়েছে। সিটু নেতাদের সহযোগিতা থাকছে লাগাতার।

 

শোভা কুমারী

আমি শোভা কুমারী। আমার জন্ম খুব গরীব পরিবারে হয়েছিল। বাবা রিকশা চালাতেন আর মা ঘরে ঘরে ঝিয়ের কাজ করতেন। যেমন তেমন করে আমাকে বাবা আটক্লাস অব্দি পড়াতে পেরেছিলেন। বিয়ে হল। স্বামীও রিকশা চালান। অবস্থার খুব একটা হেরফের হলনা। এরই মাঝে দুটো বাচ্চারও জন্ম দিলাম। বাচ্চাদুটোর খাওয়াপরা আর পড়াশুনোর ব্যবস্থা করতে পারছিলাম না। কোনো ভাবে সেলাই শিখলাম। সেলাই করে কিছু আয় হত। একদিন খবরের কাগজে মহিলাদের নিখরচায় অটোচালানো শেখানো হবে। সেদিনই রেডিও মির্চিতেও অটোট্রেনিংএর বিষয়ে বলা হল। তখনই মনে মনে সংকল্প নিলাম যে অটোচালানো আমায় শিখতেই হবে, যাতে বাচ্চাদের লেখাপড়া শেখাতে পারি। স্বামীকে বলায় উনি আমাকে সাহায্য করলেন। ওনার সাথেই আমি ট্রেনিংএর জায়গায় গেলাম। নবীন মিশ্র স্যারের সাথে দেখা হল। অনেক সাহায্য করলেন উনি। ওনার মেয়ে নেহা কুমারী আমাদের মার্শাল আর্টের ট্রেনিং দিতেন।

কিন্তু তিন মাস কঠোর পরিশ্রমের পর যখন নিজের টেম্পো কেনার প্রশ্ন উঠল তখন ভীষণ নিরাশ হয়ে পড়লাম। কেননা, ভয় জাগল যে গরীব পরিবারের বৌকে ব্যাঙ্ক লোন দেবে কিসের ভিত্তিতে। আমার কাছে পয়সাও ছিল না আর গ্যারান্টার হবার মতও কেউ ছিল না। তবু, মিশ্র স্যারের সহযোগিতায় সে লোনও আমরা পেলাম। লোন নেওয়ার আগে জমা করার ছিল ২০,০০০ টাকা। আমার কাছে ১৫,০০০ ছিল। ৫০০০ টাকা বাজার থেকে ধার করে জমা দিয়ে তবে লোন পেলাম। অটো কেনা হল। এখন আমি স্বনির্ভর। বাড়িতে আমি, আমার স্বামী, আমার বাবা, আমার এক ছেলে আর এক মেয়ে। আমার বাচ্চারা লেখাপড়ার সাথে সাথে আমার কাজেও সাহায্য করে। কেননা তারা জানে তাদের বাবা-মা তাদের ভবিষ্যতের জন্য প্রচুর পরিশ্রম করছে।

অটোচালানো শেখার সময় মাঝে মধ্যে ট্রেনিং পেতে থাকা মহিলাদের নিয়ে সভা হত। তাতে আমাদের সাহস যোগানো হত। আমরা সঙ্ঘের সদস্যতাও গ্রহণ করলাম। বিহার স্টেট অটোচালক সংঘ আর সিটুর নেতারা, অনিতা দ্বিবেদী, অরুণ কুমার মিশ্র, রাজকুমার ঝা, বিজলি প্রসাদ, শঙ্কর সাহ সবাই আমাদের পথ দেখিয়েছেন, পরিবারের সদস্যের মত আমাদের আপন করে নিয়েছেন তাই আমাদের মন থেকে ভয় আর আশঙ্কা দূরে সরে গেছে।

 

∞∞∞∞∞∞∞∞∞∞∞∞∞∞∞  

পান খায়ে সঁইয়া হমারো

পান খায়ে সঁইয়া হমারো,
সাঁওলি সুরতিয়া হোঁঠ লাল লাল
হায় হায় মলমল কা কুর্তা
মলমল কে কুর্তে পে ছিঁট লাল লাল

শৈলেন্দ্রের কথা আর শঙ্কর-জয়কিশনের সুরে এই গানটি গেয়েছিলেন আশা ভোঁসলে। ফিল্ম তিসরি কসমএর এই গানে ঠোঁট মিলিয়ে নেচেছিলেন ওয়াহিদা রহমান।

গানের কথা খড়িবোলি হিন্দি হলেও যে অঞ্চলের সংস্কৃতিকে ভিত্তি করে ফিল্মটি তৈরি হয়েছিল বা ফণীশ্বরনাথ রেণুর মূল গল্প মারে গয়ে গুলফাম রচিত হয়েছিল, সেটি উত্তর বিহারের প্রত্যন্ত পূর্বাঞ্চল, প্রধানতঃ মৈথিলী এবং অঙ্গিকাভাষী অঞ্চল।

আবার, খইকে পান বনারসওয়ালা গানের কথাতেই আছে বনারস, উত্তর প্রদেশের পূর্বাঞ্চল, পশ্চিম বিহারের লাগোয়া। বেনারসের প্রধান ভাষা ভোজপুরির একটি রূপ, কাশিকা ভোজপুরি। ভোজপুরি বিহার ও উত্তর প্রদেশের বড় একটি ভৌগোলিক ক্ষেত্রের ভাষা।

অর্থাৎ, পান আমাদের প্রদেশ বিহারে সর্বত্র বিরাজমান।

প্রশ্নঃ আচ্ছা, বাঙালিদের বিয়েতে শুভদৃষ্টির আগে কন্যা পানপাতায় মুখ ঢেকে থাকে, তেমনকি বিহারেও হয়?

উত্তরঃ না বিহারে কন্যা পানপাতায় মুখ ঢাকে না। তবে বিয়ের দিন বরের পান খাওয়ার বা তাকে পান খাওয়ানোর একটা রেওয়াজ আছে। বাংলার লাগোয়া যে অঞ্চলগুলো, সেখানে পানের ব্যবহার বেশি। যেমন পুরো মিথিলাঞ্চলে, দ্বারভাঙা, মধুবনি, সাহারসা থেকে পূর্ণিয়া, কাটিহার অব্দি অতিথি আপ্যায়নের প্রতীকী বস্তু তিনটে পান, মাছ, মাখানা। পূর্ণিয়ার একটি গ্রামে বৈবাহিক মেলা হয়। ছেলেরা মেলায় মেয়ে পছন্দ করে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। সে প্রস্তাবের ভাষা হল পান। ছেলেটি পছন্দ হওয়া মেয়েকে এক খিলি পান দেয়। মেয়ে পান খেলে বোঝা যায় যে সে প্রস্তাবটা গ্রহণ করেছে।

 

তবে এসব ছাড়ুন। পান তো আর শুধু বিহারের বা ভারতের নয়, পুরো পূর্ব এশিয়ার মুখশুদ্ধি এবং নেশা। আর হ্যাঁ, ওষুধও। মা, ঠাকুমাদের মুখে পানপাতার গুণাগুণের বর্ণনা তো সবাই শুনেছেন। এমনকি পানের বোঁটা, যাতে করে একটু চুন উঠিয়ে মুখে দেওয়া যায়, সে বোঁটারও একটি বিশেষ ব্যবহার আছে। হয়তো আফ্রিকারও কোনো কোনো দেশে এর ব্যবহার আছে! জানি না।

বরং পান খাওয়া যাক এক এক খিলি। কোন পান খাবেন? এই পাটনায় পানের দোকানে চার রকমের পান পাওয়া যায়। একটা দেশি, অর্থাৎ সাধারণ পান যা সব জায়গায় পাওয়া যায়; ঝাঁজ আছে। দ্বিতীয়টা মগহি। হলদেটে সবুজ রঙের ছোটো পাতলা পানপাতা। ঝাঁজ নেই। কুলীন পান। বাবুরা খান; ক্ষুদে ক্ষুদে চারটে পাতা মুড়ে কাঠিতে গেঁথে এক খিলি হয়। তৃতীয় বাংলা পাতা বা মিঠা পাতা। যদিও সবচেয়ে ঝাঁজ পাতাটাও বাংলা পাতা আর মিষ্টি পাতাটাও বাংলা পাতা। কিন্তু মিঠাটাই বাংলাপাতা নামে প্রচলিত। এরপর বেনারসি পাতা। শৌখীন। বিহারের পানখোরদের নিয়মিত অভ্যাসের নয়। এ পাতা সেই দোকানে থাকে যেখানে শখের পান বেশি বিক্রি হয় পঁচিশ টাকার, পঞ্চাশ টাকার, একশো টাকার, হাজারটা মশলা ভরা পান, সোনারূপোর পাত দিয়ে মোড়া পান । রোজকার অভ্যাসের জর্দা-পানে, বা সাদাসিধে পান-সুপুরি-চুনে-খয়েরে পকেটের সামর্থ্য অনুযায়ী সাধারণ পাতা বা মগহি পাতা চলে।

আসামের মত কাঁচা সুপুরির চল নেই এখানে। শুকনো সুপুরির দুরকম কুচি থাকে, মোটা আর মিহি। সুপুরির আরো তিনটে রকম থাকে, ভেজা, সেদ্ধ এবং ভাজা।

নিজের ব্যক্তিগত পানের বাটায় যে যেমন রাখুক, দোকানে চুন এবং খয়ের, শুকনো বা গুঁড়ো নয়, গোলা থাকে। কাঁসার বা স্টীলের পাত্রে। মাঝেমধ্যে চুন ঘষার বা খয়েরের প্রলেপ দেওয়ার পিতলের কাঠিটা পাত্রে আঘাত করে। টুংটাং বেজে ওঠে পাত্রটা। গ্রীষ্মের ঘাম চোখে ঢুকলে চোখ জ্বালা করে; চোখ বন্ধ করে বালিয়াড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে সেই শব্দটা কানে এলে বোঝা যায়, প্রাণ জুড়াতে পানের দোকান আছে কাছে।

এদিকে মোটামুটি দুটো কম্পানির জর্দা চলে। একটা প্রভাত জর্দা, মুজফফরপুরে কারখানা। আরেকটা বাবা জর্দা, দিল্লির কম্পানি। দুটোরই আলাদা আলাদা নম্বরের জর্দা আছে, নেশা ধরানোর জোর অনুসারে। তার খুশবু আছে। এছাড়া আলাদা করে কিমামের প্রলেপ লাগিয়ে নেওয়া যায় দোকানদারকে বলে। দোক্তার খুব বেশি চল নেই। তবে কিছু কিছু দোকান, দেয়ালে আয়না নয়, আয়না দিয়ে দেয়াল করা একটু বড়, বেনারসি নামে খ্যাত দোকান, নিজেদের হাতে কোটা তামাক রাখে, জর্দা বা দোক্তা যাই বলুন, আর বেনারসি পান পাতায় সাজিয়ে গোলাপজল ছিটিয়ে দেয়।

ছট পরব জানেন তো? বিহারের সবচেয়ে বড় পরব। মুম্বই থেকে কলকাতা আর বেঙ্গালুরু থেকে দিল্লি অব্দি মেতে ওঠে আজকাল। সেই ছঠি মইয়ার দৌরায় (ডালায়) বিভিন্ন ফলের সঙ্গে পানপাতা এবং সুপুরি এবং কর্পূর অপরিহার্য উপাদান। বজরঙ্গবলীকেও পান-সুপুরি দিয়ে বলতে হয় মুখ মিষ্টি করো। পানের মালা পরালে তিনি নাকি মনোকামনা পুরো করেন। আর বাড়ি থেকে নিগেটিভিটি দূর করার জন্য পানপাতায় কর্পূর জ্বালিয়ে রাখা তো অশুভের বিরুদ্ধে অব্যর্থ শরসন্ধান! শরীরের কতরকম উপকার যে করে পান, তা হিন্দি গুগল বলবে, বিভিন্ন হিন্দি খবরের কাগজের আধ্যাত্মিক জ্ঞান-সংক্রান্ত পৃষ্ঠাগুলো বলবে। 

আজকালকার নতুন প্রজন্ম অবশ্য পান কম খায়। সেটা রোজগারের নতুন বাজারের দায়। মুখ পরিষ্কার রাখতে হবে, দাঁত ঝকঝকে রাখতে হবে । তাই পানের উপাদান পিষে তৈরি পানপরাগ টাইপের মুখশুদ্ধি অথবা জর্দা মেশানো গুটকা বেশি চলে। সিগরেট চলে। আর নেশার জগতটাও তো আরো বেশি অস্বাস্থ্যকর দিকে যাচ্ছে। কিন্তু সেগুলোর কোনোটাই পানের বিকল্প হতে পারে না।

এটা ঠিক যে বিহারে বিয়ের ভোজের পর হাতে হাতে পানের খিলি এগিয়ে দেওয়ার পরম্পরা, অন্ততঃ পাটনা শহরে দেখিনি। উত্তর বিহারের গ্রামাঞ্চলে থাকতেও পারে। আর পরম্পরা যে নেই তার কারণ, পানপাতার ধর্মীয় বা ঔষধীয় ব্যবহার থাকলেও পান খাওয়ার সংস্কৃতিটা বিহারে সাধারণতঃ তামাক-সেবনের সংস্কৃতির অঙ্গ। পান খাওয়া মানে পান-জর্দা খাওয়া। ঈষৎ মেজাজ আনার জন্য খাওয়া। গা-গরম করার জন্য খাওয়া। সাদামাটা পান-সুপুরি-চুন-খয়ের, বা মৌরি-পান, মিষ্টি-পান কম লোকে খায়। কখনো কখনো, শখে খায়। যারা রোজ খায়, নিয়ম করে দিনে পাঁচ-ছয় বার খায়, তারা জর্দা-পান খায়।

ইউটিউব খুলে সার্চ করলে পান নিয়ে গানও পেয়ে যাবেন বিহারের ভাষায়। তবে ঐসব আজকালকার অটোটিউনড গানগুলো মাধুর্যহীন।

পান একটা এটিচ্যুড, একটা আচরণভঙ্গি। অবশ্যই তার মধ্যে একটা সামন্ততান্ত্রিক পৌরূষএর মেজাজ আছে, কিন্তু একটা, যাকে বলে ক্যয়ফিয়ত আছে। বাংলা কৈফিয়ত নয়। মূল আরবি শব্দটা সঙ্গীতের রসানুভূতির যে মুগ্ধ, আত্মবিভোর অবস্থাটা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, সেই ক্যয়ফিয়ত আনে মনে। সে আপনি গানই শুনুন আর অঙ্কই করুন, তাড়াহুড়ো বলে কিছু থাকবে না চিন্তায়। সুরের প্রত্যেকটি কাজে বা গণিতের প্রত্যেকটি ফাংশনে যে ঠহরাও দরকার সেটা পানের রস সঞ্চারিত করবে মাথায়।

সিগরেট শেষ হয়। মদও শেষ হয়। পান শেষ হয় না। থেকে যায়।  

চাহনি

খুব বেশি হলে নিজের শহরটার সন্ধ্যারাতে
গলিতে ঢোকার আগে কবেকার চকিত চাহনি
এর বেশি দৌড় হয় নি কাব্যের রহস্য আখ্যানে
গর্বোন্নত কারো গ্রীবাভঙ্গিমায় পিছলেছে আলো
প্রাচীন নায়িকাদের বরং দাপটে খুঁজেছি নাট্যে
চাতুর্য্যে, জবাবি শঠতায়, রাতে নগর প্রাকারে
তবে সে চাহনি ভিখনাপাহাড়িতে বা মিঠাপুরে
জ্বালিয়েছে প্রতি বার, স্মৃতি বলতে পারেনি সে কে
কেনই বা তাকালো ওভাবে, স্মিত হাতছানি হয়ে
বহু শতকের সিগরেটে আচ্ছন্নতা কাটিয়েছি
ভেবেছি দেখা তো হবে নিশ্চয়ই দিনে মুখোমুখি
কথালাপে বুঝে নেব কেন দৃষ্টি তার মনে হয়
সমাপতিত দৃষ্টি আরো অনেক যাপিত যুগের
হয়তো মুহুর্মুহু ভাঙার শব্দ হবে চারদিকে 

৯.৬.২৬