Wednesday, March 25, 2026

গুরুদেবের পাটনায় আগমন

[লেখাটা ১৭ই মার্চ ইংরেজিতে দিয়েছিলাম ফেসবুকে। তখনই মনে হয়েছিল বাংলায়ও দেওয়া উচিৎ। আজ একটু খালি ছিলাম, গুগল ট্রান্সলেটে ফেলে একটু এডিট করে নিলাম। মনে তো হলো যান্ত্রিক অনুবাদ বিশেষ কিছু গোলযোগ সৃষ্টি করে নি। আপনারাও পড়ে দেখুন।]

গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবারই পাটনা এসেছিলেন। সেটা ছিল ১৯৩৬ সালের ১৬ই মার্চ। তখন তাঁর ৭৬ বছর বয়সবার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছেন। মহাত্মা গান্ধী তাঁকে তাঁর ভঙ্গুর স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে সফর না করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন সে পরামর্শ উপেক্ষা করে তিনি এই সফর করছিলেন বিশ্বভারতীর জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। বলাবাহুল্য, বহুদিন ধরে লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল

পাটনা অবশ্য তাঁর এই সফরের একমাত্র গন্তব্য ছিল না। ১৯৩৬ সালের (মার্চ-এপ্রিল) বিশ্বভারতীর বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে যে, গুরুদেব ১৬ই মার্চ পাটনায়, ১৮ই মার্চ এলাহাবাদে, ২১শে মার্চ লাহোরে এবং ২৫শে মার্চ দিল্লিতে পৌঁছোন(প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় তাঁর রবীন্দ্রজীবনী গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, দিল্লি থেকে গুরুদেব ২৯শে মার্চ মীরাটও সফর করেন এবং সেখান থেকে পুনরায় দিল্লিতে ফিরে আসেন)। ১লা এপ্রিল দিল্লি ত্যাগ করে তিনি শান্তিনিকেতনে (বোলপুর) ফিরে আসেন।

অবশ্যই, তিনি এই সফরে একা যাননি। তাঁর সঙ্গে ছিল একটি নাট্যদল, যারা তাঁর রচিত নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা মঞ্চস্থ করার দায়িত্বে ছিল। যেমনটি রবীন্দ্রজীবনী (উপরে উল্লিখিত) গ্রন্থে বলা হয়েছেকলকাতায় অভিনব আঙ্গিকে পুনর্সৃষ্ট নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদার বিপুল সাফল্যের পর"বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, উত্তর ভারতের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে এই নৃত্যনাট্যটি মঞ্চস্থ করা হবে; এই সফরের উদ্দেশ্য হবে শান্তিনিকেতনের শিল্প-শিক্ষার আদর্শের প্রচার এবং আংশিকভাবে বিশ্বভারতীর শূন্য ভাণ্ডার পূর্ণ করা।"

১৬ই মার্চ রবীন্দ্রনাথ তাঁর দলবলসহ বাঁকিপুর জংশনে (তৎকালে পাটনা জংশনের এটাই নাম ছিল) এসে পৌঁছান। তখন সকাল আনুমানিক সাড়ে সাতটা। ট্রেনটি সম্ভবত দানাপুর ফাস্ট প্যাসেঞ্জার ছিল, যা বোলপুর হয়ে, অর্থাৎ হাওড়া-পাটনা লুপ লাইনে আসত। গুরুদেবকে অভ্যর্থনা করার উদ্দেশ্যে চার দিন আগেই এখানে একটি অভ্যর্থনা কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

১২ই মার্চ তারিখের 'বিহার হেরাল্ড' পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, অভ্যর্থনা কমিটির সদস্য হিসেবে ছিলেন জনাব মো. আব্দুল আজিজ (শিক্ষামন্ত্রী), জনাব সুলতান আহমেদ (পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য), শ্রী সচ্চিদানন্দ সিনহা (প্রখ্যাত ব্যারিস্টার), শ্রী পি. কে. সেন (বরিষ্ঠ ব্যারিস্টার), রায়বাহাদুর এম. এন. রায়, শ্রী বৈকুণ্ঠ নাথ মিত্র, শ্রী মুরলি মনোহর প্রসাদ (সম্পাদক, 'সার্চলাইট'), শ্রী রাজেন্দ্র প্রসাদ (তিনি তখন পাটনার মেয়র ছিলেন; তবে শহরের বাইরে থাকায়, শুধুমাত্র এই উদ্দেশ্যেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাটনায় ফিরে এসেছিলেন) এবং হাতুয়া ও সুরজপুরার মহারাজগণ।

ব্যারিস্টার প্রফুল্ল রঞ্জন দাস (দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের অনুজ), যিনি গুরুদেবের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তিনি ১৬ তারিখ সকালে রেল স্টেশনে উপস্থিত থাকতে পারবেন না বলে অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন কারণ হিসেবে তিনি কিছু জরুরি কাজের ব্যস্ততার কথা উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু সত্তরের দশকে, কমার্স কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ অধ্যাপক জি. সি. সামন্ত, শ্রী দাসের তৎকালীন ব্যক্তিগত সচিব শ্রী ডি. এন. সরকারকে উদ্ধৃত করে বলতেন যে, শ্রী দাস সেদিন ঠিকই স্টেশনে পৌঁছেছিলেন।

বিশ্বভারতীর বার্ষিক প্রতিবেদনে লিপিবদ্ধ আছে যে, পাটনা স্টেশনে পৌঁছানোর পর কবিকে এক বিশাল ও উৎসাহী জনতা অভ্যর্থনা জানিয়েছিল যদিও সেই ভিড় সামলানো বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল; কার্যত শহরের সকল বিশিষ্ট ব্যক্তিই সেদিন শহরের পক্ষ থেকে তাঁকে স্বাগত জানাতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এবং যেমনটা প্রত্যাশিত ছিল, শ্রী পি. আর. দাসই ফ্রেজার রোডে অবস্থিত তাঁর নিজ বাসভবনে* গুরুদেবের থাকার যাবতীয় ব্যবস্থা করেছিলেন।

'রবীন্দ্র জীবনী' গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, ১৬ই এবং ১৭ই উভয় দিনই 'এলফিনস্টোন পিকচার হাউস'-এ নৃত্যনাট্য 'চিত্রাঙ্গদা' মঞ্চস্থ হয়েছিল। 'সার্চলাইট' পত্রিকা ১৮ই মার্চ তারিখে ১৬ তারিখের (সোমবার) পরিবেশনার একটি পর্যালোচনা প্রকাশ করেছিলপ্রশংসায় পঞ্চমুখ সেই পর্যালোচনায় পত্রিকাটি লিখেছিল:

চিত্রাঙ্গদা মঞ্চায়ন

নোমুগ্ধকর সঙ্গীত: চমৎকার নৃত্যশৈলী

সোমবার সন্ধ্যায় 'এলফিনস্টোন পিকচার হাউস'-এ শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থীদের করা, ড. ঠাকুরের 'চিত্রাঙ্গদা' নৃত্যনাট্যটির পরিবেশনা এক বিরল অভিজ্ঞতার সুযোগ করে দিয়েছিলমনোমুগ্ধকর সঙ্গীত, চমৎকার নৃত্যশৈলী এবং কাব্যিক ছন্দের জাদুকরী আবেশে দর্শকরা টানা দুই ঘণ্টা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বসেছিলেন। সঙ্গীত ও নৃত্যের মাধ্যমে রূপায়িত সেই ঝলমলে কবিতার ভুবনে, যা সৌন্দর্যের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল, দর্শকরা যেন এক পরম আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিলেন। কোনো কোনো মুহূর্তে অনুভূতিটা ছিল ঠিক এমন যেন শরীরের ছন্দময় সঞ্চালনের মধ্য দিয়ে সাবলীলভাবে প্রবাহিত সঙ্গীতের উন্মত্ত ঢেউয়ের ওপর ভর করে তাঁরা ভেসে চলেছেন। নাটকের মূল বিষয় ছিল যৌনচেতনার জাগরণ; এর উৎস ছিল পৌরাণিক, ভাষা ছিল রবীন্দ্রনাথের এবং সমগ্র নাটকের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য প্রকাশিত হয়েছিল নৃত্যের দৃশ্যগত ভাষার মধ্য দিয়ে। যখন চিত্রাঙ্গদা অন্তরের গভীর থেকে ভেসে আসা আহ্বানের গান গায়, মদনদেবের কাছে সৌন্দর্যের বর প্রার্থনা করে এবং নিজের রূপান্তরের পরমানন্দে বিভোর হয়ে নৃত্য করে তখন তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতিটি সঞ্চালন যেন মৌখিক শব্দের মতোই সুষ্পষ্টভাবে ভাব প্রকাশ করে চলে। অর্জুনের প্রতিরোধ, তার আত্মসমর্পণ, রূপান্তরের পর প্রাপ্ত শারীরিক সৌন্দর্যের মূর্ত প্রতীক চিত্রাঙ্গদার মোহজাল থেকে তার মুক্তিলাভ এবং পরিশেষে প্রকৃত চিত্রাঙ্গদার সাথে আধ্যাত্মিক মিলনের মাধ্যমে নিজেকে পুনরায় খুঁজে পাওয়া এই সবকিছুই নৃত্যের ভাষায় প্রতীকী রূপে প্রকাশিত হয়েছিল। সেই পরিবেশনার প্রভাব ছিল এতটাই জাদুকরী যে, যারা সেদিন দর্শকাসনে উপস্থিত ছিলেন, তাদের স্মৃতিতে সেই রেশ দীর্ঘকাল ধরে অনুরণিত হতে থাকবে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঞ্চালনের মধ্য দিয়ে আত্মার অন্তর্জ্বালাকে রূপায়িত করার যে ভারতীয় নৃত্যশৈলী তার পুনরুজ্জীবন হলো ভারতীয় নবজাগরণে রবীন্দ্রনাথের বহু অবদানের অন্যতম। শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থীরা সঙ্গীত, চারুকলা এবং নাট্যকলায় যে প্রশিক্ষণ লাভ করছেমঞ্চে তার এমন এক প্রাণবন্ত ও নান্দনিক রূপ ফুটে উঠেছিল যে, এ কথা বলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা জাগে না যে, ড. রবীন্দ্রনাথ নৃত্যকলাকে এক অনন্য উচ্চতায় উন্নীত করছেন এবং তাকে তার যোগ্য স্থানে এবং এক উন্নততর ব্যবস্থার অধীনে সে যে স্থান অধিকার করেছিল, ঠিক সেই স্থানেই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করছে

সেই সন্ধ্যার আরেকটি অনবদ্য আকর্ষণ ছিল মঞ্চে কবির উপস্থিতি। তাঁর সুদৃশ্য ব্যক্তিত্ব সমগ্র পরিবেশনায় এক বিশেষ মাত্রা যোগ করেছিল। তাঁকে দেখে কোনো সাধারণ মানুষ বলে মনে হচ্ছিল না; বরং মনে হচ্ছিল তিনি যেন সংগীত ও কাব্যের চেতনারই এক মূর্ত প্রতীক। আর তাঁর আবৃত্তি যা ছিল ধীর, সংযত ও সুরময় তা শ্রোতাদের মনে গভীর অনুপ্রেরণা জাগিয়েছিল

১৭ তারিখ সন্ধ্যায়, পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (P.U.) ক্যাম্পাসে অবস্থিত 'হুইলার সিনেট হল'-এ রবীন্দ্রনাথের সম্মানে একটি সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। ১৮ই মার্চ 'বিহার হেরাল্ড' পত্রিকায় এ বিষয়ে প্রকাশিত হয়:

ঠাকুরকে বিপুল সংবর্ধনা

সিনেট হলে জনসভা

পাটনা,১৭ই মার্চ

আজ সন্ধ্যায় হুইলার সিনেট হলে মহান কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে একটি সংবর্ধনাপত্র ও একটি মানপত্র (অর্থের থলি) প্রদান করা হয়, সভাঘর কানায় কানায় ভরে গিয়েছিল; মেঝের ওপর কিংবা গ্যালারিতে কোথাও এক ইঞ্চি জায়গাও খালি ছিল না।  গত দুদিন ধরে কবি 'এলফিনস্টোন' প্রেক্ষাগৃহে পাটনার জনসাধারণকে তাঁর পরিবেশনার মাধ্যমে বিমল আনন্দ দান করছিলেন। জনসমাবেশ দেখে মনে হচ্ছিল যেন আর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই আয়োজকরা অনুষ্ঠানটি সংক্ষিপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। যদিও পাটনা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার কোর্টনি টেরেল স্বয়ং সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, তবুও তিনি অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করার জন্য শ্রী সচ্চিদানন্দ সিনহার নাম প্রস্তাব করলেন। স্যার সুলতান আহমদ প্রস্তাবটি সমর্থন করলেন। উপস্থিত সকলেই এতে সম্মতি জানালেন; কারণ বিহারের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে শ্রী সিনহার একটি অনন্য ও বিশিষ্ট স্থান আছে। সভাপতির ভাষণে শ্রী সিনহা বললেন, “…ড. ঠাকুরকে স্বাগত জানানো পাটনার জনসাধারণের জন্য এক পরম সৌভাগ্যের বিষয়। উপলক্ষটি ড. ঠাকুরকে সম্মানিত করার চেয়ে বরং আমাদের নিজেদেরই সম্মানিত করার এক সুযোগ; কারণ এই পরম ক্ষণটি এমন এক মহান কবিকে স্বাগত জানানোর, যিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও স্বীকৃতি অর্জন করেছেন এবং ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে ভারতের সাংস্কৃতিক মানকে সমুন্নত করেছেন…”

মাননীয় সৈয়দ আব্দুল আজিজ কর্তৃক পঠিত অভিনন্দন-লিপিতে বলা হয়েছিল:

...আপনার প্রথম আগমনের এই শুভলগ্নে, আমরা পাটনার নাগরিকবৃন্দযারা সমাজের সকল স্তরের প্রতিনিধিত্ব করছি আমাদের গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ আপনাকে এই স্বাগত-সম্বর্ধনাপত্রটি নিবেদন করার অনুমতি প্রার্থনা করছি...

আমরা অনুভব করি যে, দেশ ও বিশ্বের কল্যাণে আপনি যা কিছু করেছেন, তার প্রতিদানস্বরূপ আমাদের কর্তব্য হলো আপনার প্রতি আমাদের সশ্রদ্ধ ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা...

আপনি দীর্ঘজীবী হোন এবং আমাদের মাঝে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকুন; আর যে আদর্শ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আপনি হৃদয়ে লালন করেন, তা যেন মানুষের হৃদয়ে জয়লাভ করে...

সম্বর্ধনাপত্রটি পাঠ শেষে, সভার সভাপতি শ্রী সচ্চিদানন্দ সিনহা পাটনার জনসাধারণের পক্ষ থেকে বিশ্বভারতী-র উদ্দেশ্যে কবিকে ১,১১১ টাকার একটি থলি উপহার হিসেবে প্রদান করেন। পরিশেষে গুরুদেব উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জানান

বিহার হেরাল্ডএর প্রতিবেদনে ড. ঠাকুরের প্রত্যুত্তর শিরোনামে উল্লেখ করা হয়েছে, ড. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রবল করতালির মধ্যে প্রত্যুত্তর দিতে উঠে দাঁড়ালেন; কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর জনতার কোলাহলে প্রায় হারিয়েই গিয়েছিল জনতা তাদের অতি-উচ্ছ্বাসে কিছুটা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছিল। তিনি বললেন যে, ধন্যবাদ জ্ঞাপনের ক্ষেত্রে যদি তাঁর প্রকাশভঙ্গিতে কোনো কার্পণ্য থেকে থাকে, তবে তা তাঁর বার্ধক্যজনিত অনিবার্য অক্ষমতা বা দৈন্যের কারণেই ঘটেছে, যার জন্য শ্রোতাদের তাঁর প্রতি কিছুটা সহৃদয় হওয়া উচিত...

তিনি তাঁর রচিত দুটি বা তিনটি ছোট কবিতাও আবৃত্তি করেন। কবিতাগুলো আবৃত্তি করার পূর্বে তিনি শ্রোতাদের প্রতি বাংলা ভাষা শেখার এবং এর সমৃদ্ধ সাহিত্যের সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য একটি আহ্বানও জানান।

বিশ্বভারতী নিউজ-এ উত্তর ভারত সফরের প্রতিবেদনটি সারসংক্ষেপ প্রকাশিত হওয়ার সময়, সফরে প্রাপ্ত অনুদানের অর্থের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশিত হয়েছিল। প্রাপ্ত অর্থরাশির মধ্যে তিনটি অনুদান পাটনা থেকে এসেছে বলে প্রতীয়মান হয়। জনসাধারণের পক্ষ থেকে প্রদত্ত ১,১১১ টাকার অনুদানের পাশাপাশি, গুরুদেব শ্রী পি. আর. দাসের কাছ থেকে ৫০০ টাকা এবং ড. এস. ঘোষালের কাছ থেকে ১০০ টাকা অনুদান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। সর্বশেষ উল্লিখিত ব্যক্তিটি সম্ভবত আমাদের পরিচিত ডঃ শরদিন্দু মোহন ঘোষাল (গরিবের ডাক্তার এবং পরবর্তীকালে বিহারের বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি), যিনি ততদিনে পিএমসিএইচ-এর অ্যানাটমি বিভাগে নিযুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন।

১৮ তারিখে গুরুদেব এলাহাবাদে ছিলেন। দিল্লিতে গান্ধীজি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। সফর শুরুর আগে তিনি গুরুদেবকে শারীরিক অসুস্থতার ঝুঁকি নিয়ে বোলপুর থেকে না বেরোবার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আশ্বাসও দিয়েছিলেন যে তিনি বিশ্ব-ভারতীর জন্য ৬০,০০০/- টাকা অনুদানের ব্যবস্থা করে দেবেন। তিনি তাঁর আশ্বাস রক্ষা করেন এবং দিল্লিতে গুরুদেবকে অনুদানে সংগ্রহ করা ৬০,০০০/- টাকা প্রদান করেন। তিনি আবারও গুরুদেবকে এই সফরে আর অগ্রসর না হওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।

দিল্লিতেই গুরুদেব তাঁর পরামর্শে র্ণপাত করেন এবং বোলপুরে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

--------------------------------

* পাটনার ফ্রেজার রোডে একসময় যেখানে টাইমস অফ ইন্ডিয়ার অফিস ছিল, সেই অফিসের পাশের দক্ষিণমুখী গলিতে শান্তিনিকেতন নামের বাংলো বাড়িটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। এটা পরিতাপের বিষয় যে এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটি, যেখানে রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, প্রখ্যাত সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরও অনেকে সেই দিনগুলিতে থাকতেন, আজ জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

[বিহার বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডঃ (ক্যাপ্টেন) ডি. কে. সিনহার তৈরি করা পিপিটি-র পাঠ্যের সহায়তায়]

২৫.৩.২৬



Saturday, March 21, 2026

হাতুড়ির দফা

ন্যায়ের দেবীর আর বাঁধা নেই চোখ,
সস্নেহে মারেন সেটি তারাজু হেলিয়ে
যখনি বাদীর দিকে থাকে ধনপতি,
অথবা রাজ-ভকিল ঢোকে চোথা নিয়ে।
 
চোখের পট্টিটা কালো পরেছে পুলিশ,
দেখতে পায় না আর দুর্বৃত্ত বা দোষী
রাজবৃত্ত বহির্ভূত চিহ্নিত যে-জন,
তাদেরকে বাঁধতেই শেষ হয় রশি।
 
পুলিশের লাঠি পেয়েছেন বিচারক,
সুবিচার-যক্ষপ্রশ্ন থেকে মুক্ত মন
লাঠিটা ঘেঁটে পাকায় আইনের প্যাঁচ;
গারদে বিচারহীন ফুরোয় জীবন।  

হাতুড়ি বিচারকের, অনাদৃত ছিল,
রাজসভাধ্যক্ষ তুলে নিয়েছেন তোফা
বলেছেন স্বদেশের ভক্তিরসার্ণবে
সংবিধান নয়, সব হাতুড়ির দফা।
  
২২.৩.২৬

Thursday, March 19, 2026

দেড়তলা

বড়োই পছন্দ ওই দেড়তলাগুলো
গাড়িঘরের ওপরে, দোতলা মাথায়
সকলেই জানে ভবঘুরে বসবাস
সস্তার চাকরি কিম্বা সেটুকুও নেই
ফালতু কব্‌তে করে গিটার বাজায়
জানিনা হতেও পারে সন্দেহজনক
নেশা করতে দেখিনি ভাগিয়ে দিতাম
 
পৃথিবীর শহরের দেড়তলাগুলো
ডাকে সান্ধ্য ঠেক হতে সৃজনসখ্যের
রাতে মোর নারী ক্রোড়ে প্রণয়কূজনে
এক ঘরে খাটো ছাত জানলা হেঁসেল
শিশুর হাঁটি-পা এ্যাই দরজা খুলো না
এসবেই লেখালিখি সি-মেজরে স্ট্রামিং
না থাকলে দুবন্ধুর প্রেমেরও আস্তানা

কমভাড়া দেড়তলা নিখাদ নিবিড়
খামোখার প্রাণোল্লাসে মগ্ন সুরারোপ
 
২০.৩.২৬

 

Friday, March 13, 2026

বাঙ্গলাদেশের ভাষা আন্দোলনের সাথে যুক্ত জীবনের এক স্মরণীয় অধ্যায় - এ. কে. রায়

অনেকদিনের কথা। প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। দিন তারিখ মনে নেই। কিন্তু ঘটনাগুলো মনে আছে। ছবির মত ভেসে উঠলো। সংযোগ ছিল একুশে ফেব্রুয়ারী উযাপন। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। বাঙ্গলাদেশের ভাষা ন্দোলনের এক অবিস্মরণীয় দিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা বাঙ্গলাভাষার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রা দিয়েছিলখন নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান। প্রাণ দিয়ে অঙ্কুর গেড়েছিল আজকের বাংলাদেশে(বিহারের ধানবাদে প্রবাসী বাঙালী সং ঠিক করলো ২১শে ফেব্রুয়ারী মানাবে) তার সাথে এক সেমিনারও হবেটা বিষয় রবীন্দ্রনাথের সেই কথা, মাতৃভাষা ও মাতৃদুগ্ধ। হিরাপুরেহরিমন্দিরে চর্চার মধ্যে হঠাৎ সামনে চলে এলো সেই ঘটনাগুলো যেটাকে বাদ দিয়ে মার পক্ষে ২১শে ফেব্রুয়ারীর বর্ণনা করা হয়তো অসম্পূর্ণ।

সেই সময়টা আমরা স্কুল থেকে সদ্য পাশ করেছি। পূর্ব পাকিস্তানের রাজশাহী জেলার নওগাঁ মহকুমার কে. ডি. হাইস্কুল। সরকারী এবং খুব নামী হাইস্কুল ছিল সেটা অনেক ভাল ছাত্র পা করেছে সেই স্কুল থেকে। তার মধ্যে একজন হুমায়ুন কবীর ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী ছিলেনতখনও পাসপোর্ট ভিসা হয় নি। এপার বাংলা ওপার বাংলামধ্যে অবাধ আসা যাওয়া। অনেকের মনের মধ্যে বিভাজনটাও পাকা ন। পাকরে কলকাতার পাশে বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন পরিচালিত বিদ্যামন্দিরে ভর্তি হয়েছি। কি যেন ছুটি ছিল, ফিরেছি ঘরেবন্ধুবান্ধবের সাথে স্কুলের বারান্দায় বসে গল্প করছি। আলোচনার বিষয়ও ভাষা আন্দোলন জিন্না সাহেব ঢাকায় এসে বলে গেছেন, "উর্দুস্তানী চাহিয়ে"। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে। মানতে হবে এটাকে। এখন কি হবে? ঐ সময় পাকিস্তানে জিন্নার উপর কথা বলার লোক নাই নেতাদের মধ্যে। কিন্তু ছাত্ররা সেটা মানবে কেন। সময় ১১টা নাগাদ। ছাত্ররা স্কুলে আসতে

লেগেছে। ক্লাসে না ঢুকে তারা মাদের কাছে ভীড় করলো। কি করা উচিত। আশেপাশে সব স্কুল বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবী নিয়ে হরতাল করেছে। কিন্তুটা সরকারী স্কুল। এর প্রেসিডেন্ট এস.ডি.ও. স্বয়ং র সেক্রেটারী টাউন মুসলিম লিগের সেক্রেটারী এবং উকিল সিরাজ মিয়াঁ। এখানেখনও ধর্মঘট হয় নি। শক্ত মানা। তাছাড়া হেডমাস্টার কুণ্ডুবাবুর সাথে সিরাজ মিয়াঁ স্বয়ং স্কুলে এসে বসে গেছেন যাতে কেউ এদিক ওদিক না করতে পারে। ছাত্রদের আমরা কি বলেছিলাম এদিন পরে সব মনে নাই, কিন্ত তার মধ্যে একটা কথা ছাত্রদের খুব মনে ধরেছিললে আজও মনে আছে। "আমাদের রাইট নিয়ে ফাইট করতে হবে।" এরপর আর কি থা। ছেলেরা হৈ হৈ করে বেরিয়ে আসলো। যা কোনদিন হয় নি তাই হল। কে.ডি. হাইস্কুলে ধর্মঘট হয়ে গেল।

রাস্তাতেই সিরাজ মিয়াঁ রাগান্বিত ভাবে আমাদের রলেন। এটা তোমাদেরই কাজ। দেখাচ্ছি মজা। আগুন নিয়ে খেলা করছো। তোমাদের বাবাদের বলছি। সংযো বশে আমরা যারাসেছিলাম তাদের অনেকেরই বাবা উকিল ছিলেন এবং সিরাজ মিয়াঁর সাথী। মাদের বাড়ীতেও উনি অনেকবার এসেছেন। সুতরাংনার বকাটাকে অত গম্ভীর ভাবে নিই নি। বাড়ী ফিরতেই দেখলাম বাবা কোর্ট থেকে ফিরে এসেছেন। জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে কার সিরাজ মিয়াঁ উত্তেজিতয়েনেক অভিযোগ করছিল। বাড়ীতে কি এক অনুষ্ঠান হচ্ছিল। অনেক লোকের সমাগম। আমি সংক্ষেপে ঘটনাটা বলে কেবল খেতে বসেছি হঠাৎ বাইরে কিছু শব্দ হ। পায়ের বুটের শব্দ এবং ফৌজী হুকুমের আওয়া। বাবা আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন। পুলিশ এসেছে আমাকে খুঁজতে। বেরিয়ে দেখি বিশাল ফোর্সের সাথে দারোগা, ইন্সপেক্ট, এস. ডি. পি.. গোটা বাড়ী ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। তল্লাসী নিবে। খুব গরম মেজাজ। আমাকে নিয়ে এস. ডি. পি.. চললো স্কুলে। সে এক দৃশ্য। চারিদিকে ভীড়। হেডমাস্টারকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন সে মাকে দেখেছে কিনা ছেলেদের উত্তেজিত করতে। কি কথা হল জানিনা। আমাকে নিয়ে এসে হাজতেন্ধ করে দেওয়া হল। এই ভাবে আমার আরেক বন্ধুকে গ্রেপ্তার করে থানাতে না হল। আমাদের মনের মধ্যে ভয়েথেকে উত্তেজনা বেশি। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। নতুন অনুভূতি।

স্কুলে ধর্মঘটের ফল যাই হো না কেন গ্রেপ্তারির প্রতিক্রিয়া ল শহরে প্রচন্ডমুহূর্তের মধ্যে ভাষা আন্দোলন এবং পুলিশী দমনের চর্চা চারিদিকে ছড়িয়ে গেল। পুলিশ আমাদের নিয়ে যেখানেই যাচ্ছে লোকে ভীড়রে দাঁড়িয়ে দেখছে। শহরে এই প্রথ গ্রেপ্তারী। রাষ্ট্রভাষা কি হওয়া উচিত সবাই যেন তার চর্চায় লেগে গেল। সব থেকে বড় কথা এতে থানাঅচ্ছুতা থালো না। আমরা হাজতে বসে শুনছি, শহরের লোকেরা যাদের অনেকেই পরিচিত, ছে এবং ভাষা এবং আমাদের গ্রেপ্তারী নিয়েই বিতর্ক চলছে। তারপরে দারোগা পুলিরাও চর্চায় লেগে গেল। (দেখলাম ভাষা একটা জিনি যেটা সবাইকেই মুখর করে তোলে। যারা উর্দুর পক্ষে তাদের বক্তব্য উর্দু মুসলমানের ভাষা আর পাকিস্তান মুসলিম রাষ্ট্র সুতরাং উর্দু রাষ্ট্রভাষা হবে। বাংলা হিন্দু ভাষা। তাই রাষ্ট্রভাষা হতে পারে না। যারা বাংলার পক্ষে তাদের কথা ভাষার কোন ধর্ম হয়না। সব ধর্মেরই লোক সব ভাষা বলতে পারে। তারা সব বাংলাভাষা বলে, তার মানে তারা কি সব হিন্দু? খাঁটি মুসলমান হতে গেলে কি এখন তাদের উর্দু শিখতে হবে? হাজতে বসে বসে এই তর্কবিতর্ক শুনে মজাই লাগছিল, বিশেষ রে যখন মনে হচ্ছিল বেশির ভাগ পুলিদারোগাও বাংলার পক্ষে, এবং এটা নিয়ে খামাখা আমাদের গ্রেপ্তারীর বিপক্ষে। এই ভিতরের সমর্থনের জন্য আমাদের আর কোন অসুবিধা হল না। বাড়ী থেকে খাবার বিছানা আসলো। আরাম করে রাত্রি কাটালাম। থানা থেকে আমরা জানতেও পারলাম যে সকালেই ছেড়ে দিবে।

কিন্তু রাত্রির মধ্যে ঘটনা হয়ে গেঅন্যরকম। পাকিস্তান রেডিও ঘোষণা করলো সমস্ত ভাষা আন্দোলনই ভারত থেকে পাঠানো হিন্দু যুবকদের কান্ড যা দুজনেতাত্তেজক পর্চা বিতর কালে ধরা পড়েছে। ঢাকার কাগজে ফলাও করে বের হল পাকিস্তানকে ধ্বংরাবিশা ষড়যন্ত্রের" কথা। মুখ্যমন্ত্রীর বেতার ভাষণও হয়ে গে উপর। কলকাতার কাগজে খবর বের হল, হিন্দু ছাত্রেওপর পাকিস্তান সরকারের অত্যাচারের নমুনা হিসাবে। এর পর ছেড়ে দেবার প্রশ্নই আসে না। খুবই বিপদজনক বন্দী হিসাবে বিশাল ফৌজের সাথে আমাদের রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলে দশ নম্বর সেলের ওয়ার্ডে পাঠানো হল। নেক সিপাইএর মধ্যে আমাদের মত দুই হাফপ্যান্ট পরা ছেলেকে দেখতে লোকপচে পড়লো

আমাদের পাড়া, হাইস্কুল, কোর্ট খুব কাছাকাছি। এখন নওগাঁ জেলা শহর। তখন ছিল মহকুমা। আমাদের পাড়াতেই ছিল এস.ডি.পি.ও.-র অফিস এবং আবাস। এস.ডি.পি.ও. সিলেট থেকে আসাদ্বাস্তু। নতুন আসা তাই হিন্দু বিশেষ করে ভারবিদ্বেষী। গরম মেজাজ কিন্তু তার পরিবার ছিল বিপরীতএরই মধ্যে বাড়ীতে মায়ের কাছে প্রায়ই আসতেন। মাদের গ্রেপ্তারের রে পাড়াতে এস.ডি.পি.ও.-কে প্রায় সামাজিক বয়কটের মধ্যে পড়তে হয়েছিল। হিন্দু মুসলমান দুই পক্ষ থেকেইকত গভীর সম্বন্ধ ছিল হিন্দু মুসলমানের মধ্যে মাদের শহরে

এটার ন্দা নতুন সা অফিসারের ছিল না। তারর ভাষা আন্দোলন দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভালবাসার নতুন সেতু হল। লোককে জুড়তে ভাষার কি বিশাল ভূমিকা ঐ আন্দোলনে সেটা প্রমাণ ল। দুই বৎসর পর যে নির্বাচন হল তাতে মুসলিম লিগ পূর্ব পাকিস্তাথেকে সমাপ্ত হয়ে গেল (৩০০ সীটের মধ্যে মাত্র ৯টি) এবং সেখানে ফলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট সরকার থাকলো। কিন্তু এই সুদূর প্রসারী রাজনৈতিক লড়াইএর আগেই এস.ডি.পি.ও.-র এবং নিশ্চয়ই আরো নেক অফিসারদেই ঘরেলড়াই শুরু হয়ে গেল যখন তিনি আবিষ্কার করলেন তাঁর স্ত্রী আমাদের বাড়ীতে গিয়ে মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। বাবা যিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে অনেকদিন জেলে থেকেছেন, এই ঘটনাকে খুবই শান্ত এবং স্বাভাবিক ভাবে নিয়েছিলেন কিন্তু মা কিছুটা প্রথমে হকচকিয়ে গিয়েছিলেন এবং মুষড়ে পড়েছিলেন।

সারাদিন ট্রেন এবং বাসে কাটিয়ে ভীর রাতে আমাদের রাজশাহী সেন্ট্রাজেলে দশ নম্বর ওয়ার্ডে ঢোকানো হল। ঐ ওয়ার্ডে দশটা লাদা আলাদা সে আছে যেখানে খুব বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ লোকদের রাখা হতো। আর আমরা এখন গুরুত্বপূর্ণ বন্দী। বাকি সেলগুলিতে ভাষা আন্দোলনের নেতাদের রাখা হয়েছিল যার মধ্যে একজন এম.এল..-ও ছিলেন। আমাদের জন্য দুটো সেল সকাল থেকে পরিষ্কার হচ্ছিল। প্রচার ছিল দুজন খুব বিপদজনক বন্দী আসছে। আমাদের আগমনের সম্বন্ধে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছিল খুব। সকালবেলা সেলের গেট খুললে যখন ওয়ার্ডের লোকেরা দেখলো হাফপ্যান্ট পরা দুটো পুচকি ছেলে বসে আছে তখনি সবাই প্রথমে আশ্চর্য হন কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই আমাদের দেশভাইয়ের মতো গ্রহণ করে রাজবন্দীদের সংসারের অঙ্গ করে নিলেন। আমরা ঘরের মতো ছিলাম। কোন অসুবিধা মনে হয় নি। যাঁরা আমাদের সাথে ছিলেন ওয়ার্ডে তাঁদের একজনের নাম ছিল একরামুল হক। তিনি ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে না থাকলেও তাঁকে ধরা হয়েছিল কারণ ছাত্রদের মধ্যে তিনি কম্যুনিস্ট হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন আর পাকিস্তানের সরকারী ফর্মূলা অনুসারে কম্যুনিস্ট এবং হিন্দুরাই ভাষা আন্দোলনের আসল জড়। কিছুদিন পরে ধীরে ধীরে সবাই ছাড়া পেতে লাগলো। প্রথমে ছাড়া পেলেন এম.এল..। তারপর অন্যান্যরা। শেষে একরামুলদার সাথে আমরা ছিলাম তিনজন দশ নম্বর ওয়ার্ডে। দুমাস পরে আমরাও ছাড়া পেলাম। একরামুলদা রয়ে গেলেন একা। দুই বৎসর পরে যখন মুসলিম লিগ সরকার পরাজিত হয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকার আসলো একরামুলদা ছাড়া পেয়েছিলেন। জেলে বসেই তিনি পড়াশোনা করেছিলেন। পরে তিনি রাজশাহী কলেজের প্রফেসর হন। রাজশাহী জেলে তখন ভাষা আন্দোলন কর্মী ছাড়াও অনেক কম্যুনিস্ট রাজবন্দী ছিলেন। কিছুদিন আগেই নাচোল কান্ড হয়েছিল। ইলা মিত্রের ওপর বর্বর অত্যাচার। জেলে কম্যুনিস্টদের আলাদা করে রাখা হতো ভাষা আন্দোলন কর্মীদের কাছে থেকে। অনেক বন্ধন ছিল তাদের ওপর। কিছুদিন আগেই গুলি চলেছিল সেন্ট্রাল জেলে। প্রায় একশ কম্যুনিস্ট রাজবন্দী মারা গিয়েছিলেন। সে সময় জেলের নিয়মও ছিল হত্যা করা। কিন্তু তা সত্ত্বেও কম্যুনিস্ট রাজবন্দীরা খবর পেয়েছিলেন আমাদের সম্বন্ধে। গেটের ফাঁক দিয়ে দেখা করতেন, কথা বলতেন আমাদের সঙ্গে। আমাদের পাকিস্তান সরকার আটকে রেখেছিল বিনা বিচারে প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন এ্যাক্টে (পি. ডি. এ্যাক্ট)। এর ঠিক পনেরো বছর পর আবার জেলে আসতে হয়েছিল আর ঐ পি.ডি.এ্যাক্টেই, কিন্তু সেটা এবার ভারতে, ধানবাদে যেটা আমার জীবনধারাকেই বদলে দিল।

রাজশাহী জেল থেকে ছাড়া পেয়ে যখন আসলাম বাড়িতে তখন অভূতপূর্ব সম্বর্ধনা পেলাম শহরে। আমাদের ওজন এমনই নিয়মিত খাওয়াদাওয়াতে বেড়েছিল কিন্তু সামাজিক ওজন বেড়ে গিয়েছিল অনেক বেশী যার জন্য অবশ্য কোনো কৃতিত্বই আমাদের প্রাপ্য নয় এক সরকারের মুর্খতা ছাড়া। বোধহয় এইভাবেই তিল কে তাল করে সরকারের গৃহবিভাগ চলে। শহরের সমস্ত সামাজিক, সংস্কৃতি অনুষ্ঠানেই আমাদের ডাক। কলেজে যখন ফিরলাম সেখানেও আমাদের গুরুত্ব বেড়ে গেল। সেখানে খবরটা আগেই ছড়িয়ে গিয়েছিল। জেল থেকে বেলুড় বিদ্যামন্দিরে ফিরে অমিয়কে পেলাম না (ডঃ অমিয় বাগচী, খ্যাতনামা অর্থশাস্ত্রী)। ওদিকে আমি যখন জেলে তখন কিছু আদর্শগত প্রশ্নে সেও কলেজ থেকে বহিষ্কৃত। এই ঘটনার পরেও আট বৎসর পূর্ব বাঙ্গলার সাথে যোগাযোগ ছিল। বাবা মা ওলহানেই থাকতেন। আসা যাওয়া করতাম। শহরের কোনো অনুষ্ঠানই আমাদের ছাড়া পূর্ণ হতো না। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার কিছুদিন পরে আমরা রবীন্দ্রজয়ন্তীর আয়োজন করছি হঠাৎ এক পুলিশ এসে খবর দিল সাহেব ডাকছেন। গেলাম। দেখলাম ঐ এস.ডি.পি.. বসে আছেন। কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। উনি ট্রান্সফার হয়ে চলে যাচ্ছেন। খুব স্নেহের সাথে কথা বললেন। অবশ্য এটাও বললেন, আমি যেন ছাত্র অবস্থায় রাজনীতি না করি। এটা তিনি সমর্থন করেন না। পুলিশ অফিসারদেরও যে এক আলাদা চরিত্র হতে পারে আমার জানা ছিল না। কিছু আফসোস কিছু আন্তরিকতা মিলিয়ে যে কিছু কথা বলেছিলেন আজও মনে আছে। এরপর সত্যই একদিন দেশ ছাড়তে হল। অবশ্য তসলিমা নাসরিন-এর লজ্জার স্থিতিতে নয়। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমশই জটিল হচ্ছিল। রাত্রিতে ট্রেন। জানি আর ফিরবো না। রাজশাহী যেতে হতো পাসপোর্ট ভিসার ব্যাপারে। সেবার যেয়ে গেলাম সেই জেলখানার মাঠে গাছতলায়। পদ্মার ধারে যেয়ে বেঞ্চে বসলাম। জল খুব কাছে দিয়ে বয়ে চলছিল। এক মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম আগে পদ্মার জল অনেক দূর দিয়ে বইতো, আজ এত কাছে? মাঝি উত্তর দিল, পদ্মার মন বোঝা দায়। আগে জল বইতো এদিক দিয়েই, মাঝে চলে গিয়েছিল দূরে। আবার আগের জায়গা দিয়ে বইতে লেগেছে। জানি না সমস্ত মাঝিই এক স্বাভাবিক দার্শনিক কিনা। কিন্তু ঐ উত্তরের মধ্যে এ ইঙ্গিত স্পষ্ট ছিল নদী এক জীবন্ত প্রাণী। জীবনের মতো নদীও তার যাত্রাপথ বদলায়। যাবার দিন আবার সেই স্কুলের বারান্দায় বসলাম। সন্ধ্যায় সব বন্ধুদের কাছে গিয়ে একে একে বিদায় নিলাম। রব্বু, সলিমুল্লা, আলতাফ, আরও অনেকে। সে আজ চল্লিশ বছর হয়ে গেল। কত পরিবর্ত্তন হল। সেদিনের পূর্বপাকিস্তান আজ বাঙ্গলাদেশ। আর আমিও দুটি জিনিষ ভুলতে পারলাম না যেটা বিহারে একুশে ফেব্রুয়ারীর উৎসব নতুব করে স্মরণ করিয়ে দিল এক মাতৃভাষা বাঙ্গলা, অপরটি নিজের দেশ আর দুটি মিলালেই বাঙ্গলাদেশ।







 

[মূল বানান অপরিবর্তিত]

Digitized on 13th March 2026

Wednesday, March 11, 2026

বিহার বাংলা আকাডেমি – সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত, পূর্ণেন্দু নারায়ণ মুখোপাধ্যায়

গোড়ার কথা

ভারতের প্রথম সরকারী বাংলা আকাডেমি বিহারে ১৯৮৩ সালে স্থাপিত হয়। বিহার বাংলা একাডেমির পূর্বসূরী তখন একমাত্র ঢাকা শহরের বাংলাদেশ বাংলা আকাডেমি। এছাড়া অন্যত্র কোন সরকারী বাংলা আকাডেমির অস্তিত্ব তখন ছিল না। বিহারের এই আকাডেমি গঠনের পশ্চাদ্‌স্পটটির উপর আলোক পাত করা দরকার। প্রদীপ জ্বালানোর আগে যেমন সলতে পাকানোর পর্বটি অন্তরালে থাকে এক্ষেত্রেও এমনই এক ঐতিহাসিক অধ্যায় প্রচ্ছন্ন রয়েছে।

বিহারে ভূমিপুত্রের ন্যায়সঙ্গত স্বীকৃতি আদায়ের জন্য ১৯৩৮ সালে বিহার বাঙালি সমিতি গঠিত হয়। স্বাধীনতা প্রাপ্তির পূর্বেই বিহারের বাঙালিরা সমিতির প্রচেষ্টায় সেই স্বীকৃতি আদায় করে নেয়। স্বাধীনতা অর্জনের পরে বাঙালি সমিতি আবার সক্রিয় হয়ে ভারতের সংবিধানে প্রদত্ত ভাষাগত সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করে এবং বিহার সরকারের কাছ থেকে সরকারীভাবে সেই অধিকার লাভ করে। সুতরাং ভূমিপুত্রের অধিকার ও ভাষিক সংখ্যালঘুর জন্য নিদ্ধারিত অধিকার এই দুই অধিকারের বলে বলীয়ান হয়ে বাঙালি সমিতি সরকারের কাছে প্রথম শ্রেণীর নাগরিকদের প্রাপ্য অধিকারগুলি দাবি করতে লাগল। দেখা গেল বিহারে কয়েকটি আকাডেমি গঠিত হয়েছে। তার মধ্যে মগহী, ভোজপুরী, মৈথিলী অন্যতম। কিন্তু বাংলা আকাডেমি গঠিত হয়নি। অথচ ভারতীয় ভাষাতত্ত্বের জ্ঞান যাঁদের আছে তাঁরা জানেন যে বাংলা ভাষা বিহারে বহিরাগত তো নয়ই বরং বিহারেই এর জন্ম হয়েছে। মাগধী প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার জন্ম। ভারতের প্রবাদ প্রতিম ভাষাবিদ সুনীতি চট্টোপাধ্যায় থেকে সুকুমার সেন প্রমুখ খ্যাতনামা ভাষাবিদ্রা ভাষাতাত্ত্বিক সূত্রগুলির সাহায্যে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে মগধ (অর্থাৎ বিহার) অঞ্চলে বিকশিত মাগধী প্রাকৃত থেকে দুইটি শাখার জন্ম হয়। তাদের একটি হলো পূর্বী মাগধী, অপরটি পশ্চিম মগধী। পূর্বী মাগধী ভাষা পরিবারে রয়েছে বাংলা, ওড়িয়া, অসমিয়া। পশ্চিম মাগধীর মধ্যে রয়েছে-মগহী, মৈথিলী, ভোজপুরী ইত্যাদি। এই ইতিহাস নির্ভর অভ্রান্ত তথ্যসূত্রের উপর নির্ভর করে বাঙালি সমিতি এগিয়ে চলল। প্রশ্ন তোলা হল বিহারে যদি মগহী, ভোজপুরী, মৈথিলী ভাষা ও সাহিত্যর একাডেমি থাকে তাহলে বাংলা একাডেমি থাকবে না কেন?

রাজ্যপালের সঙ্গে সাক্ষাৎকার: ১৯৭১ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় বিহার সরকার 'শিল্প-সাহিত্য কোষ' গঠনের কথা ঘোষণা করে। সেই কোষের আওতা থেকে বাংলা বাদ হয়ে যায়। বাংলা ভাষাকে সেই তালিকায় যুক্ত করার জন্য বাঙালি সমিতির একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল তৎকালীন রাজ্যপাল শ্রী দেবকান্ত বড়ুয়ার সঙ্গে দেখা করেন। সেই দলে ছিলেন - ডাঃ শরদিন্দু মোহন ঘোষাল, দীপেন্দ্রনাথ সরকার ও ডঃ গুরুচরণ সামন্ত। শ্রী বড়ুয়া প্রতিনিধিদের জানান যে এই কোষটি স্থাপিত হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের সুপারিশ অনুযায়ী বিশেষ ভাষা-গোষ্ঠীদের কথা মনে রেখে। তিনি ঐ কোষে বাংলাকে অন্তর্ভুক্ত করতে অক্ষম বলে জানান। তবে তিনি প্রতিনিধিদের পরামর্শ দেন সরকারের কাছে যোগ্যতা অর্জন করার জন্য বিহারে বাংলা ভাষার রাজনৈতিক গুরুত্বকে প্রতিষ্ঠিত বা প্রমাণিত করতে হবে। বাংলা শিক্ষার সমস্যা, জনগণনায় বাঙালিদের সংখ্যা কম করে দেখানো প্রভৃতি আরো কয়েকটি বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘকাল আলোচনা হয়। তিনি সব কটি সমস্যার সমাধানের একমাত্র উপায় হিসাবে ঐ রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধির কথাই বলেন।. তিনি এও জানান যে অচিরে বিহারে উর্দু আকাডেমি স্থাপন করা হবে।

বাঙালি সমিতির সিদ্ধান্ত: বালি সমিতি অনেক ভাবনা-চিন্তার পর স্থির করে আগে 'শিল্প-সাহিত্য সাহায্য কোষে' বাংলাকে যুক্ত করতে হবে। তারপর বাংলা আকাডেমির জন্য চেষ্টা করা হবে। যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রী সভা গঠিত হওয়ার পর ঐ কোষে বাংলা ভাষাকে যুক্ত করানো সম্ভব হয়। সমিতির চেষ্টায় শিল্প সাহিত্য সাহায্যকোষে বাংলার দাবি স্বীকৃতি পেল। অধ্যাপক রঞ্জন হালদার ঐ কোষ থেকে আর্থিক সহায়তা পেলেন। এরপর রাজ্যস্তরে সংখ্যালঘু কমিশন গঠনের দাবি করা হয় এবং সরকার তা মেনে নেন। সমিতি সংখ্যালঘু কমিশনকে কার্যকারী করে তোলার জন্য সর্বশক্তি নিযোগ করে। উদ্দেশ্য ছিল এই কমিশনের মাধ্যমে বিহারে বাঙালিদের সমস্যাগুলির প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং সরকারী পর্যায়ে বাঙালিদের গুরুত্ব বাড়ানো। কর্মক্ষেত্রে নাবার পর সমিতি লক্ষ্য করে বিহারে আমলাদের মধ্যে বাঙালি ও বাংলা ভাষার প্রতি ভ্রান্ত ধারণা দূরীভূত হয়নি। অনেকেই মনে করেন বাংলাভাষা পশ্চিম বঙ্গের ভাষা, বিহারের ভাষা নয়। সুতরাং ঐ ভাষার সংরক্ষণ ও বিকাশ বিহার সরকারের নয়, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দায়। তবে বিহার সরকার কর্তৃক গঠিত সংখ্যা লঘু কমিশনটিতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রাদায় যেমন ছিলেন তেমনই ভাষিক সংখ্যালঘু হিসাবে বাঙালি প্রতিনিধিও ছিলেন। সুতরাং বাংলা ভাষা বিহারে সংখ্যালঘু ভাষার সরকারী স্বীকৃতি পেয়ে অতি গুরুত্বপূর্ণ এক ধাপ এগিয়ে গেল।

এরপর বাঙালি সমিতি পরবর্তি পদক্ষেপ হিসেবে বাংলা আকাডেমি গঠনের ভাবনাটিকে বাস্তবায়িত করার জন্য উদ্যোগী হয়। বাঙালি সমিতি বিহারে বাঙালিদের আত্মপরিচয় রক্ষা ও নাগরিক হিসাবে অধিকার রক্ষার জন্য যে মাধ্যমগুলিকে আশ্রয় করে আগ্রসর হয় তার মধ্যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার সংস্থাগুলির পৃষ্ঠপোষকতা করা অন্যতম। এর মধ্যে বাঙালিদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্কুল ও কলেজের ভাষিক সংখ্যালঘু হিসাবে সরকার থেকে বিশেষ স্বীকৃতি আদায় অন্যতম। বাংলা পাঠ্য-পুস্তক প্রকাশ, নাট্য-লিখন ও মঞ্চায়নে সহযোগিতা করা, বাংলা গ্রন্থাগারের রক্ষণা বেক্ষণ করা, আলোচনা সভার আয়োজন করা ইত্যাদি এই কর্মকান্ডের অঙ্গ। বাংলা আকাডেমি গঠিত হলে বাঙালি সমিতির এই দায়বদ্ধতার ভার অনেকটা লাঘব হবে বলে মনে করা হল। এই ভাবনার প্রতিফলন দেখা গেল ১৯৭৬ সালের ২৯শে ফেব্রুয়ারি ডাঃ বিষ্টু মুখোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে সমস্তিপুরে অনুষ্ঠিত বাঙালি সমিতির অষ্টাদশ সম্মেলনে গৃহীত বাংলা আকাডেমি সংক্রান্ত একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের মাধ্যমে। প্রস্তাবটি এই ধরনের

"বাঙলা ভারতের দ্বিতীয় এবং বিহারের অন্যতম প্রধান স্বীকৃত ভাষা হওয়া সত্ত্বেও সরকার পক্ষ হইতে ইহার সংরক্ষণ ও বিকাশের জন্য আজ পর্যন্ত বাংলা আকাডেমি স্থাপনের কোনও সরকারী আগ্রহ প্রকাশ পায় নাই, যদিও বিগত কয়েক বৎসর হইতেই বাঙালি সমিতির পক্ষ হইতে বাংলা আকাডেমি স্থাপনের দাবি জানানো হইতেছে। বিহার রাজ্য বঙ্গভাষী সম্মেলনের এই অষ্টাদশ অধিবেশন বিহার সরকারের নিকট অবিলম্বে বাংলা আকাডেমি স্থাপনের জন্য পুনরায় দাবি জানাইতেছে।

পরের বছর ১৯ এপ্রিল ১৯৭৭ সালে জামালপুরে অনুষ্ঠিত বার্ষিক সম্মেলনে আবার সরকারকে আকাডেমি স্থাপনের অনুরোধ জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। পরের বছর ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৮ সালে ভাগলপুরে অনুষ্ঠিত বার্ষিক সম্মেলনেও অনুরূপ প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।

তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী গোলাম সরওয়ার সমিতিকে আশ্বাস দেন যে তিনি ২৪-২-৭৯তে রানীবহালে অনুষ্ঠেয় বাঙালি সমিতির আগামী বার্ষিক সম্মেলনের আগেই আকাডেমি গঠনের কাজ কিছুটা এগিয়ে রাখবেন। সেই অনুসারে একটি সংক্ষিপ্ত মেমোরেন্ডমের ভিত্তিতে আকাডেমির রেজিস্ট্রেশনের সব ব্যবস্থা হয়ে যায়। কিন্তু নানা রাজনৈতিক চাপের ফলে সে কাজ পুরো হতে পারেনি। সরকারী ফাইল আবার শিক্ষা দপ্তরে ফিরে আসে। শিক্ষামন্ত্রী রানীবহালের বার্ষিক সভায় উপস্থিত হতে পারেননি। তাই সেখানে আবার বিগত বছরের মতো প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। ইতিমধ্যে ১৯৭৯ র রাজ্য সংখ্যালঘু কমিশনের প্রাথমিক রিপোর্টের সুপারিশের শেষ আইটেম হিসাবে বাংলা আকাডেমি গঠনের বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত করাতে সক্ষম হন দীপেন্দ্রনাথ সরকার। বার্ষিক সভার পর পাটনায় ফিরে শিক্ষামন্ত্রীর উদ্যোগে শিক্ষা-বিভাগের অধিকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। তাঁরা বলেন যে সরকার কোনো আকাডেমি গঠন করবে (করে) না। যদি কোনো ভাষা-গোষ্ঠীর জনসাধারণ আকাডেমি গঠন করে তাহলে সরকার সেটিকে স্বীকৃতি দিয়ে অধিগ্রহণ করতে পারে। যেমন হয়েছে উর্দু ও মৈথিলীর ক্ষেত্রে। তাঁরা বলেন যে যেহেতু বাঙালি সমিতি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান, তাই তার দ্বারা অন্য আর একটি প্রতিষ্ঠান গঠিত হওয়ার চেয়ে ভাল হয়, আকাডেমিটি স্বাধীনভাবে গঠিত হোক। বাঙালি সমিতি তার নেপথ্যের কাজ সমাধা করুক। যেমন অন্যান্য আকাডেমির ক্ষেত্রে করা হয়েছে। এই পরামর্শ অনুসরণ করে, বাঙালি সমিতির অপ্রত্যক্ষ উদ্যোগে, স্বাধীনভাবে আকাডেমির একটি এড-হক- কমিটি গঠন করা হয় ১৯৭৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। এর দুই মাস পরে সমিতির কার্যকারী বৈঠকে "বাঙলা ভাষার সেবকদের দ্বারা গঠিত" এই কমিটিকে অভিনন্দন জানিয়ে সমিতির পক্ষ থেকে সর্ববিধ সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয় ও এর জন্য ২৫০ টাকা প্রাথমিক ব্যয়ও মঞ্জুর করা হয়।

সমিতির অনুরোধে ১৯৭৯ র সেপ্টেম্বরে বিধান সভায় শ্রী কমলনাথ সিং ঠাকুর বাংলা আকাডেমি গঠনের দাবি জানিয়ে সরকার ও অন্যান্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

আকাডেমির অস্থায়ী কমিটির প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন প্রবাদপ্রতিম অধ্যাপক রঙীন হালদার এবং সচিব ছিলেন দীপেন্দ্রনাথ সরকার। কিন্তু ৯-১২-৭৯তে হালদার মহাশয়ের আকস্মিক মৃত্যুতে শ্রদ্ধেয় বর্ষীয়ান সাহিত্যিক শ্রী বিভূতি ভূষণ মুখোপাধ্যায়কে অধ্যক্ষ করা হয় এবং অধ্যাপক পূর্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়কে সচিব মনোনীত করা হয়।

রাঁচীতে অনুষ্ঠিত বার্ষিক সম্মেলনে (২৬-২-৮০) ও ঘাটশীলায় অনুষ্ঠিত বার্ষিক সম্মেলনে (২৮-২-৮১) বাংলা আকাডেমির সরকারী স্বীকৃতির আবেদন জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। এরপর সমিতির ২৮-৫-৮১ (রামগড়) ও ২২-১২-৮১ তে ডাল্টনগঞ্জের ত্রৈমাসিক বৈঠকে সংবিধান রচনা ত্বরান্বিত করতে আবেদন জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।

২৪-১২-৮১তে দীপেন্দ্রনাথ সরকারের আকস্মিক প্রয়াণের ফলে সমিতির কাজ ব্যাহত হলে আকাডেমি গঠনের কাজ সাময়িক ভাবে মন্থর হয়ে যায়।

১১-৪-৮২তে পাটনায় অনুষ্ঠিত সমিতির বার্ষিক সভা উপলক্ষে রাজ্যমন্ত্রী সমায়লে নবী মুখ্যমন্ত্রীর হয়ে বাংলা আকাডেমি স্থাপনের সঙ্কল্প ঘোষণা করেন এবং যেহেতু চলতি বছরে এর জন্য কোনো বাজেট নিদ্ধারিত হয়নি, তাই ১৯৮৩ সাল থেকে কার্যকর করা হবে বলে আশ্বাস দেন। মুখ্যমন্ত্রী অপরিহার্য কারণে সেই সভায় উপস্থিত থাকতে পারেন নি।

বাঙালি সমিতি রচিত আকাডেমি সংবিধানটি রেজিষ্ট্রেশন করাতে গেলে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ তাতে কিছু স্ববিরোধ ও অসংগতি নির্দেশিত করায় সেটি সংশোধনে দায়িত্ব দেওয়া হয় শ্রী প্রভু মুখোপাধ্যায়কে। অধ্যাপক গুরুচরণ সামন্ত তাঁকে সহযোগিতা করেন। তাঁরা দুজনে সংবিধানের "আকাডেমির আদর্শ ও উদ্দেশ্য" ও সংগঠন অংশটির নূতন রূপ দেন এবং পরে বাকি অংশ ঢেলে সাজান শ্রী পারিজাত প্রসূন সেন। সেই সংশোধিত নিয়মাবলীর ভিত্তিতেই আবার মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আকাডেমি গঠনের কাজ ত্বরান্বিত করতে আবেদন জানানো হয়। এই দৌত্যে সাহায্য করেন সমায়লে নবী।

মুখ্যমন্ত্রীর গত বছরের আশ্বাসের সূত্রেই ১৯৮৩র ২৬শে ফেব্রুয়ারী পূর্ণিয়ায় অনুষ্ঠিত সমিতির বার্ষিক সম্মেলনে, জনাব সমায়লে নবীর চেষ্টার ফলে মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ জগন্নাথ মিশ্র নিজে উপস্থিত হয়ে বাংলা আকাডেমি স্থাপনের কথা ঘোষণা করেন এবং মার্চ মাসের পরবর্তী বাজেট বক্তৃতাতেও আকাডেমির জন্য দেড় লক্ষ টাকা ব্যয় বরাদ্দ মঞ্জুর করেন। সরকারী অফিসার পর্যায়ে যাঁদের সহযোগিতা ও পরামর্শ পাওয়া যায় তাদের মধ্যে সর্বাগ্রে উল্লেখ করতে হয় তৎকালীন মুখ্যসচিব শ্রী সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নাম।

মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ঐ দিন সমিতির কেন্দ্রীয় পরিষদের বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।

চিন্তন শিবির ও মজহরুল ইসলাম

বাংলা দেশ বাংলা আকাডেমির মহাপরিচালক মজহরুল ইসলামকে কেন্দ্র করে উদ্বোধন অনুষ্ঠানের পরদিন প্রভু মুখার্জীর এস.পি. ভার্মা রোডের বাসভবনে একটি চিন্তন শিবিরের আয়োজন করা হয়। এই আয়োজনের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল বাংলা দেশের বাংলা আকাডেমির অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে মজহরুল ইসলামের অর্জিত অভিজ্ঞতার দ্বারা লাভবান হওয়া। বাংলা দেশের বাংলা আকাডেমি বিহার আকাডেমির পূর্বসূরী। মজহারুল দূরদৃষ্টি সম্পন্ন প্রাজ্ঞ প্রশাসকের মতো কিছু কার্যকরী উপদেশ'বা পরামর্শ দেন। তিনি প্রথমেই জানতে চান বিহার সরকারের আর্থিক সহযোগিতার পরিমাণ কত। তিনি জানান বাংলা দেশের আকাডেমি যত টাকা চায় সরকার তত টাকা দেয়। কিন্তু বিহারের ক্ষেত্রে অবস্থাটি ঠিক বিপরীত। সুতরাং সীমিত আর্থিক সঙ্গতির কথা মনে রেখে আকাডেমির কার্যসূচী তৈরী করতে হবে। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কার্যসূচী গ্রহণ করতে হবে। বিহারে বাঙালিদের আত্মপরিচয় বহনকারী কাজগুলি প্রথমে করতে হবে। ব্যক্তিগত তুষ্টিকরণের পথে না গিয়ে এমন নৈর্ব্যক্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার যা সর্বসাধারণের হিতার্থে প্রযুক্ত হবে। বিহারে যে বাঙালি সাহিত্যিকরা সাহিত্য সৃষ্টির চিরায়ত নজীর রেখেছেন অথচ এখন তাঁদের সৃষ্টি করা নিদর্শনগুলি বিস্মৃতির অতল তলে তলিয়ে যেতে বসেছে সেই রত্নগুলিকে উদ্ধার করে বর্তমান প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে হবে। এমন সাহিত্য সৃষ্টির পৃষ্ঠপোষকতা করা দরকার যা সস্তা ও তরল প্রকৃতির নয়। মনে রাখতে হবে আকাডেমির একটা আলাদা মর্যাদা আছে। সাহিত্য চর্চাকে উৎসাহ দেওয়া উচিত কিন্তু দেখতে হবে ছাপার অক্ষরে যা তুলে ধরা হবে তার মধ্যে যেন গুণমানের অভাব না হয়। অনেক সময় দেখা যায় ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্খাকে তুষ্ট করতে গিয়ে গুণগত মানকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। মজহারুল বাংলা লোক সাহিত্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের উপর জোর দিতে বলেন। ঐ চিন্তন শিবিরে প্রভু মুখার্জীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন গুরুচরণ সামন্ত, পূর্ণেন্দু মুখার্জী, সুপ্রকাশ ঘোষ, বিহার সরকারের মুখ্যসচিব সুভাষ মুখার্জী। সুভাষবাবু এনসাইক্লোপিডিয়া থেকে ফরাসী সাহিত্য আকাডেমি সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান অর্জন করে এসেছিলেন।

বাধার পর বাধা

উদ্বোধন অনুষ্ঠানের দিন একটি চমকপ্রদ ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। সকলে দেখলেন মুখ্যমন্ত্রী জগন্নাথ মিশ্রের নামে হিন্দিতে লেখা রক্তব্যের একটি ছাপা কপি সভাগৃহে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলা আকাডেমির অনুষ্ঠানের বাংলা প্রতিলিপি বিতরণ করা হচ্ছে না কেন? এই প্রশ্ন দাবানলের মতো দর্শকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। প্রশ্ন করেও উত্তর পাওয়া গেল না। রহস্যের পর্দাখানি সরিয়ে প্রকৃত কারনের সন্ধান কারো কাছে পাওয়া গেল না। কেবল জানা গেল, মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং নাকি বিতরণ করতে বারণ করেছেন। অনেক অনুসন্ধান করে জানা গেল মুখ্যমন্ত্রীর লেখা হিন্দি বক্তব্যের বঙ্গানুবাদে নাকি এমন কিছু ভুল তথ্য ছিল যা হিন্দি ভার্সনে ছিলনা। আর সেই তথ্য সমাবেশটি নাকি জগন্নাথ মিশ্রের অজান্তে 'প্রেসের ভুতের' কান্ড। ছাপার পর মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতা বাঙালি আমলাদের কারো চোখে পড়ায় তিনি বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর করলে মুখ্যমন্ত্রী বিতরণ করতে বারণ করে দেন এবং প্যাকেটগুলি নিজের হেফাজতে রেখে নেন। ঘটনাটি মুখ্যমন্ত্রীর অভিপ্রেত ছিল না। মুখ্যমন্ত্রীর মনোভাবের কঠোরতা তখনই টের পাওয়া গেল যখন তিনি ঐ ঘটনার নেপথ্য নায়ককে বাংলা আকাডেমির পরিচালন কমিটি থেকেই বাদ দিয়ে দিলেন। আকাডেমির পরিচালন কমিটিটি যদিও অধ্যক্ষবিভূতি ভূষণ মুখোপাধ্যায়ের দেওয়া তালিকা অনুসারে গঠিত হয় তবুও মুখ্যমন্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে একটি নামও স্বীকৃতি লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেনি। এ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর নিরপেক্ষতাকে প্রশংসা করতেই হয়। সাধারণতঃ দেখা যায় সরকারের সমর্থকদের তুষ্ট করতে এবং নিজস্ব শিবিরে ধরে রাখতে পেশাদার রাজনীতিবিদ্রা চোখবুজে সরকারী বা আধা সরকারী সংস্থায় বিভিন্ন পদে গুজে দেন যোগ্যতা আছে কিনা বিচার করেন না। সৌভাগ্যক্রমে বাংলা আকাডেমি সেই ছোঁয়াচ থেকে মুক্ত থেকে গেছে।

বিভূতি ভূষণের দেওয়া তালিকাটি (পরিচালন সমিতির) বেশ কিছু কাল সরকারী ফাইলে পড়ে ছিল। প্রশাসনিক স্তরে কোন এক অদৃশ্য হাতের প্রভাবে সেটি মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে চাপা পড়েছিল। হঠাৎ শোনা গেল কংগ্রেসের জনৈক প্রভাবশালী মন্ত্রীর অদৃশ্য অঙ্গুলি হেলনে ফাইলটি আটকে আছে। তার জায়গায় আর একটি নতুন তালিকাযুক্ত ফাইল/মুখ্যমন্ত্রীর স্বীকৃতির জন্য রাখার তোড়জোড় চলছে। সেই তালিকায় অধ্যক্ষের পদে বিভূতি বাবুর স্থানে অন্য কোনো 'মহাপুরুষের' নাম ঢুকে গেছে। আর বাংলা আকাডেমির গঠনের প্রচেষ্টার সঙ্গে যাঁদের যোগ দীর্ঘদিনের, তাঁদের পরিবর্তে সেই প্রচেষ্টার সঙ্গে প্রায় সম্পর্ক-বিহীন অনেকের নাম ঢুকে পড়েছে। অমৃতবাজার পত্রিকার সত্ত্বাধারী ও স্বনামধন্য সম্পাদক তুষার কান্তি ঘোষ এগিয়ে এসে জগন্নাথ মিশ্রকে অনুরোধ করেন বিভূতি বাবুর তালিকাটি অবিলম্বে গ্রহণ করে যতশীঘ্র সম্ভব বাংলা আকাডেমির শুভারম্ভ করতে। বাঙালি সমিতির প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও দ্বারভাঙা লবি সম্মিলিত ভাবে জগন্নাথ মিশ্রার সঙ্গে দেখা করে বিভূতিবাবুর দেওয়া তাকিকাটি অনুমোদন করে যত শীঘ্র সম্ভব কাজ শুরু করতে অনুরোধ করেন। জগন্নাথ মিশ্রা বিভূতি বাবুকে অসীম শ্রদ্ধা করতেন তাই তিনি সতীর্থ কোন মন্ত্রীর কথায় কর্ণপাত না করে বিভূতি বাবুর দেওয়া তালিকাটিতে অনুমোদনের শীলমোহর লাগিয়ে দিলেন। বাংলা আকাডেমির সৌভাগ্য যে এটি ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্খী এবং রাজনৈতিক উচ্চাশার স্পর্শ থেকে গোড়া থেকেই মুক্ত থেকেছে। তার জন্য জগন্নাথ মিশ্রা ধন্যবাদের পাত্র।

বর্ণময় উদ্বোধন অনুষ্ঠান: নক্ষত্র সমাবেশ

বিহার বাংলা আকাডেমির উদ্বোধন অনুষ্ঠানটি বহু নক্ষত্র সমাবেশে সমৃদ্ধহয়ে ঐতিহাসিক তাৎপর্য অর্জন করে। প্রথমে বাঙালি সমিতি স্থির করে ১লা বৈশাখ উদ্বোধন হবে। কিন্তু সরকারী পর্যায়ে প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র তৈরী না হওয়ায় দিনটিকে পিছিয়ে দেওয়া হয়। তখন স্থির হয় রবীন্দ্র জন্মোৎসবের পূর্বাহ্নে, ৮ই মে, রবিবার পাটনার রামমোহন রায় সেমিনারী প্রাঙ্গণে বিকাল ৬ টায় উদ্বোধন করার জন্য মুখ্যমন্ত্রীকে সমিতির পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হবে। মুখ্যমন্ত্রীর' ইচ্ছানুসারে প্রণব মুখোপাধ্যায়কে উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য রাজী করাতে সমিতির প্রতিনিধিকে দিল্লী পাঠানো হয়। সমিতির পক্ষ থেকে সঞ্চিতা পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয় উদ্বোধনের দিন সমিতির কেন্দ্রীয় কার্যকারী সমিতির বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হবে, তাতে বিহারে সমিতির শাখাগুলির প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকতে বলা হয়। অবশ্য সরকারি সিদ্ধান্তে অনুষ্ঠানের দিন বদল করে হয় ১২ মে এবং স্থান পরিবর্তন করে করা হয় ভারতীয় নৃত্য কলা মন্দির।

ঐ দিন সন্ধ্যা ৬ টায় বর্ণময় উদ্বোধন অনুষ্ঠানটি শুরু হয় অতুল প্রসাদের অমর কীর্তি "মোদের গরব মোদের আশা" গানটি দিয়ে। স্বাগত ভাষণ দেন বিহারের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী করমচাঁদ ভগত। সভাপতিত্ব করেন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ জগন্নাথ মিশ্র। বিহার সরকারের শিক্ষা সচিব আকাডেমি স্থাপনের ঘোষণা ও নিবেদন করেন। উদ্বোধন করেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়। ভাষণে তিনি এই প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন ভাষা ও সাহিত্যের মাধ্যমে দেশের মধ্যে জাতীয় সংহতির কাজকে ত্বরান্বিত করতে হবে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে যে উদারতা আছে পরধর্ম ও ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি সহিষ্ণুতার ঐতিহ্য আছে তাকে স্মরণে রেখে এগিয়ে যেতে হবে। এরপর একে একে বিশিষ্ট অতিথিরা নবগঠিত আকাডেমির প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে ভাষণ দেন। বিশিষ্ট অতিথিদের মধ্যে ছিলেন ডঃ মজহারুল ইসলাম (বাংলা দেশের বাংলা আকাডেমির মহাপরিচালক) প্রখ্যাত কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্ত, ইন্দিরা গান্ধীর প্রতিনিধি ও তাঁর বিত্ত-পরামর্শদাতা প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ডঃ অর্জুন সেনগুপ্ত, ডাঃ বীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত, ডাঃ বিষ্টু মুখোপাধ্যায়, বিভূতি ভূষণ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। উপস্থিত ছিলেন প্রবাদ প্রতিম সাহিত্যিক গোপাল হালদার। অর্জুন সেনগুপ্ত তাঁর ভাষণে বলেন তাঁর পক্ষে এই মঞ্চ থেকে বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করা ধৃষ্টতা হবে, কারণ যাঁর হাত ধরে এই বিষয়ে তিনি যৎসামান্য জ্ঞানঅর্জন করতে পেরেছেন, সেই অসাধারণ জ্ঞানী মানুষ গোপাল হালদার স্বয়ং এখানে উপস্থিত রয়েছেন। ইন্দিরা গান্ধীর প্রতিনিধির মুখে একথা শুনে সবাই চমৎকৃত হলেন।

সভাপতির ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী বিহারে বাঙালিদের অবদানের কথা উল্লেখ করে তথ্যসমৃদ্ধ এক ভাষণ দেন। তাঁর ভাষণে বিহার ও বাংলার বহু শতাব্দীব্যাপী আত্মিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। মিথিলার সঙ্গে সাহিত্য ও জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে তিনি বাংলার যোগাযোগের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের তথ্য-সমৃদ্ধ বিশ্লেষণ করেন এবং বিহারের কয়েকজন অগ্রণী বাঙালি সাহিত্যিকদের নামোল্লেখ করেন যেমন বিভূতি ভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও মুখোপাধ্যায়, বনফুল, শরৎচন্দ্র, সতীনাথ ভাদুড়ী প্রমুখ। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিহারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করেন। সরকারী কাজে হিন্দি প্রচলনের জন্য এবং হিন্দি স্কুল স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণের জন্য ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের নাম শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি দ্বারভাঙ্গাকে 'বঙ্গের দ্বার' বলে মনে করেন। বাংলা সাহিত্যে বিহারের মানুষ, সমাজ ও প্রকৃতির ব্যাপক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে আশা ব্যক্ত করেন বিহার রাজ্য বাংলা আকাডেমি ভারতের মহান সাংস্কৃতিক একতার স্থায়ী সেতু হয়ে কাজ করবে।

অনুষ্ঠানে একটি নজরুল গীতি (একই বৃন্তে দুইটি কুসুম) ও রবীন্দ্র সংগীত (সবারে করি আহ্বান) সলিল দাশগুপ্তের পরিচালনায় পাটনার গীত ভবনের ছাত্র-ছাত্রীরা পরিবেশেন করেন।

প্রণব বাবু সস্ত্রীক এসেছিলেন। জগন্নাথ মিশ্র যখন জানতে পারলেন শুভ্রা মুখোপাধ্যায় গান জানেন তখন শুভ্রাদেবীকে গান গাইতে অনুরোধ করলেন এবং শুভ্রাদেবী তাঁর অনুরোধ রক্ষা করে নজরুল ও রবীন্দ্র সংগীত গেয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেন।

বিহার সরকারের মুখ্য-সচিব সুভাষ মুখোপাধ্যায় ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। এরপর পাটনার 'ঝংকার' সংস্থাটি "পাঁচ শো বছরের বাংলা গান" শীর্ষক একটি আলেখ্যযুক্ত সংগীতানুষ্ঠান পরিবেশন করে। বৈষ্ণব পদাবলী থেকে শুরু করে, শ্যামা সংগীত, বাংলা লোকগীতি, পুরাতনী, রবীন্দ্র, নজরুল, অতুল প্রসাদ, রজনীকান্ত, দ্বিজেন্দ্র লাল থেকে আধুনিক যুগের গণসঙ্গীত-সবই ছিল সেই গীতি আলেখ্যতে। সঙ্গীত পরিচালনা ও বিষয়ভাবনা তরুণ মিত্র-র এবং গীতি আলেখ্যটি রচনা ও পাঠ করেন পূর্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়।

কিছু স্মরণীয় কাজের সূচীঃ

১. 'রবীন্দ্রনাথ ও জাতীয় সংহতি' বিষয়ে আলোচনাসভা

স্থান- রবীন্দ্র ভবন, তারিখঃ ১১-১২ আগষ্ট ১৯৮৪। এই সভায় টেগোর ইনস্টিচিউট কলকাতার প্রতিনিধিরা অংশ গ্রহণ করেন। এই আলোচনা সভায় পরিবেশিত প্রবন্ধগুলির মধ্য থেকে নির্বাচিত প্রবন্ধ নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশ করা হবে- এই মর্মে ঘোষণা করা হয়।২. ব্রিটিশ কবি ব্র্যায়াণ প্যাটেনকে নিয়ে আকাডেমির ব্যবস্থাপনায় একটি বহুভাষিক কাব্য আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। তাং ০৪-১২-১৯৮৪

৩. স্যামুয়েল জনসনের দ্বিশত প্রয়াণ বার্ষিকী উপলক্ষে ইংল্যান্ডের প্রখ্যাত জনসন বিশেষজ্ঞ জিওফ্রে কার্নেলকে আমন্ত্রণ জানিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। তাং ১২-১২-১৯৮৪

৪. বিশ্বভারতীর বাংলার অধ্যাপক ও রবীন্দ্র চিত্র শিল্পবিশেষজ্ঞ সোমেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহায়তায় স্লাইড-এর সাহায্যে রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবির প্রদর্শনী এবং সেই সঙ্গে অধ্যাপক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশ্লেষণ মূলক অনবদ্য ব্যাখ্যান।

৫. বিভূতি ভূষণ মুখোপাধ্যায়ের ৯০ বৎসর পূর্তি উপলক্ষে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্মিলিত ভাবে তাঁকে সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তব্য পেশ করেন সর্বশ্রী কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী, ডা০ বিষ্টু মুখোপাধ্যায়, মন্ত্রী নগেন্দ্র নাথ ঝা, প্রখ্যাত আইনজীবী বসন্ত কুমার বন্দোপাধ্যায় প্রমুখ। বিভূতিবাবুকে মানপত্র দেওয়া হয়। মানপত্রটি রচনা করেন ও সভায় পাঠ করেন অধ্যাপক পূর্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়। তাং ২৮-১০-১৯৮৪

৬. রাজসাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙলা বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান ডা০ মান্নান সৈয়দের বক্ততা। এই সভায় মান্নান সাহেব তাঁর সম্পাদিত ও বাংলা দেশের বাংলা আকাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত মীর মশারফ হুসেন গ্রন্থাবলী বিহার বাংলা আকাডেমিকে শুভেচ্ছার নির্দশন হিসেবে প্রদান করেন। তাং ২৫-০৩-১৯৮৫

৭. রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা বিষয়ে আলোচনাসভা; স্থান-রবীন্দ্র ভবন, তাং ১৮-০৫-১৯৮৬

৮. ইংল্যান্ডে রথেনস্টাইনের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ তাঁর গীতাঞ্জলির ইংরাজি অনুবাদ পাঠ করে শোনান বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতিতে। পরবর্তী কালে ঐ গীতাঞ্জলির অনুবাদকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। রবীন্দ্রানুরাগী বিদগ্ধ সমাজ ঐ দিনটিকে স্মরণ করে প্রতি বছর সারা বিশ্বে কাব্যপাঠ দিবস পালন করে থাকেন। বিহার বাংলা আকাডেমির উদ্যোগে ৩০শে মে ১৯৮৬ কালিদাস রঙ্গালয়ে রবীন্দ্র সাহিত্য পাঠ দিবস পালন করা হয়।

৯. ৩০শে জুলাই ১৯৮৬ বিদ্যাসাগরের প্রয়াণ বার্ষিকীর দিনে বিহার বাংলা আকাডেমির গ্রন্থাগারের উদ্বোধন করা হয়। ঐ অনুষ্ঠানে ঘোষণা করা হয় এই গ্রন্থাগারে সস্তা, কুরুচিপূর্ণ গল্প উপন্যাস রাখা হবে না। শ্রোতাদের কাছে উৎকৃষ্ট, উন্নতমানের গ্রন্থের জন্য সুপারিশ করতে আবেদন করা হয়।

১০. বিষ্ণুপ্রভাকর প্রখ্যাত হিন্দি সাহিত্যিক এবং শরৎচন্দ্রের জীবনী লেখক (আওয়ারা মসিহা)। বাংলা আকাডেমির একটি অনুষ্ঠানে তাঁকে বক্তৃতার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেই অনুষ্ঠানে পাটনার হিন্দি সাহিত্যিকদের অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। ইনি তেরো বছর ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, যেখানে শরৎচন্দ্র গিয়েছিলেন সেখানে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে বইটি লেখেন।

১১. বিহার বাঙালি সমিতি প্রতি বছর বাংলাদেশের বাংলাভাষা আন্দোলনকে স্মরণ করে একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি পালন করে থাকে। বাংলা আকাডেমি গঠিত হবার পর সমিতির সঙ্গে আকাডেমিও প্রতি বছর যুক্তভাবে পালন করেছে।

 

১২. ১৯৯৩ সালে বাংলা আকাডেমির পক্ষ থেকে বাংলা, হিন্দি, উর্দু, মৈথিলী, ভোজপুরী কবিদের নিয়ে কবি গোষ্ঠীর আয়োজন করা হয়।

১৩. বিদ্যাসাগরের নামে পাটনার এবং কমাটাঁড়ে যতগুলি অনুষ্ঠান হয়েছে প্রতিটি অনুষ্ঠানে বাঙালি সমিতির সঙ্গে বাংলা আকাডেমি যুক্ত থেকেছে, সহযোগিতা করেছে।

 

১৪. কলকাতার বইমেলায় বাঙালি সমিতির সঙ্গে আকাডেমি যুক্তভাবে স্টল ভাড়া করে বই বিক্রি করেছে।

১৫. শৈলেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলা ও বাঙালি বইটির বাংলাদেশে খুব চাহিদা আছে লক্ষ্য করা গেছে।

অধ্যক্ষ এবং নির্দেশক সহ-সচিবের কালানুক্রমিক সূচী

অধ্যক্ষ: বিভূতি ভূষণ মুখোপাধ্যায়, নির্দেশক-সহ-সচিব শ্রী প্রণব শংকর মুখোপাধ্যায়

অধ্যক্ষ: বিভূতি ভূষণ মুখোপাধ্যায়, নির্দেশক-সহ-সচিব শ্রী আভাস কুমার চট্টোপাধ্যায়

অধ্যক্ষ: শ্রী গোপাল হালদার, নির্দেশক-সহ-সচিব- শ্রী আভাস কুমার চট্টোপাধ্যায়

অধ্যক্ষঃ ডাঃ বীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত, নির্দেশক-সহ-সচিব অধ্যাপক শৈলেশ কুমার বসু

অধ্যক্ষঃ অধ্যাপক শিবেশ কুমার চট্টোপাধ্যায়, নির্দেশক-সহ-সচিব অধ্যাপক সন্দীপ মিত্র

অধ্যক্ষ: অধ্যাপক পূর্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়, নির্দেশক-সহ-সচিব-অধ্যাপক ইন্দীবর মুখোপাধ্যায়

অধ্যক্ষঃ শ্রী কল্যাণ কুমার পোদ্দার, নির্দেশক-সহ-সচিব অধ্যাপক ইন্দীবর মুখোপাধ্যায়

অধ্যক্ষঃ শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নির্দেশক-সহ-সচিব-অধ্যাপক ইন্দীবর মুখোপাধ্যায়

অধ্যক্ষ: শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নির্দেশক-সহ-সচিব শ্রী বিশ্বজিত সেন

অধ্যক্ষঃ শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নির্দেশক-সহ-সচিব শ্রীমতী রুবী শরণ

অধ্যক্ষ/নির্দেশক-সহ-সচিব শ্রীমতী রুবী শরণ

অধ্যক্ষ/নির্দেশক-সহ-সচিব শ্রী জিতেন্দ্র প্রসাদ

অধ্যক্ষঃ ডাঃ (ক্যাপ্টেন) দিলীপ কুমার সিনহা, নির্দেশক-সহ-সচিব শ্রীমতী বিনীতা ব্যানার্জী

প্রকাশনের তালিকা

১/ কেদার রচনাবলী- ১ম খন্ড (১৯৮৭)

২/ কেদার রচনাবলী ২য় খন্ড (১৯৮৯)

৩/ কেদার রচনাবলী ৩য় খন্ড (১৯৯১)

৪/ আশালতা সিংহের রচনাবলী-আশালতা সিংহ

৫/ বিহারে বাংলা সাহিত্য (ইতিহাস) (১৯৮৯) ডঃ নন্দদুলাল রায়

৬/ বাংলা ও বাঙালি (প্রবন্ধ সংকলন) শৈলেশ বন্দোপাধ্যায়

৭/ লোক কথার দিগদিগান্ত- ড০ সুধীর করণ

৮/ বাঢ় ও ঝাড়খন্ড (সংস্কৃতি সমন্বয়) (১৯৯২) ড০ কল্যাণী মন্ডল

৯/ রবীন্দ্র প্রবাহ (১৯৯০)-৬০ রামবহাল তেওয়ারি

১০/ রবীন্দ্রনাথ ও জাতীয় সংহতি প্রবন্ধ সংকলন, প্রকাশ- ১৯৮৬ (১২৫ তম রবীন্দ্র জন্মবর্ষ)

সম্পাদনা: ড০ গুরুচরণ সামন্ত, ড০ ভগবান প্রসাদ মজুমদার, অধ্যাপক পূর্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়, ড০ সন্তোষ কুমার মজুমদার

১১/ বিহারের সাম্প্রতিক বাংলা কবিতা সংকলন, ডিসেম্বর: ১৯৯০, সম্পাদনাঃ শ্রী দীপক গোস্বামী, সম্পাদনাঃ দীপক গোস্বামী পূর্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়, জীবনময় দত্ত, জ্যোতির্ময় দাশ

১২/ South Western Bengali Dr. Sudhir Karan

১৩/ আকাডেমি পত্রিকা

১৪/ আকাডেমি সমাচার

+++++++++++++++++++++++++++++++

শুভেচ্ছা বাণী

আহমদ রফিক

অপরাজিতা, ২০/সি নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০

সফল হোক, সার্থক হোক সম্মেলন

বিহার-বাংলা একাডেমীর সম্মেলন নিঃসন্দেহে মানব-ঐক্যের ছোট একটি প্রতীকী প্রকাশ। একদা বাংলা-বিহার-ওড়িষার স্বশাসিত সমন্বিত রাষ্ট্রিক যাত্রায় ছিল মৈত্রীর পরিচয় যা এখন ইতিহাস। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে ইতিহাস ঐতিহ্য সৃষ্টিরও সহায়ক। তেমন বিবেচনায় বিহার-বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার ঘটনাটি অভিনন্দনযোগ্য, আর তা প্রাচীনতম হলে তো কথাই নেই।

রবীন্দ্রনাথের আমৃত্যু আকাঙ্খা ছিল মানবমৈত্রীর, তা যে আয়তনেই হোক। সেটা আমাদেরও কাম্য। 'মানুষ' - এ শব্দটি রবীন্দ্রনাথের সমগ্র চৈতন্য আচ্ছন্ন করে রেখেছিন। তার আমলেও (অবশ্য প্রথম দিকে) বিহার বাংলা সীমানাহীন সৌহার্দ্য নিয়ে পথ চলেছে। ক্রমে রাজনীতি তার নানা স্বার্থে তাকে আঘাত করেছে, এবং তা যেমন ভারতীয় উপমহাদেশে তেমনি বিশ্ব জুড়ে। মানবমৈত্রীর চেতনা পরাশক্তি সমূহের চাপে ক্রমশ পিছু হটছে, এর অগ্রচারী ভূমিকা আমাদের আকাঙ্খিত।

তাই একুশ শতকের আধুনিকতায় বিশ্বের শান্তিকামী, মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আমাদের একই প্রত্যাশা-বিশ্বমানব তার চৈতন্যের ধারায় এক হোক, সংঘাত পরিহার করুক, 'মানব' শব্দটিকে সদর্থে গ্রহণ করুক। যুদ্ধ নয়, সংঘাত নয়, সাম্প্রদায়িকতা নয়, চাই শাস্তি ও মৈত্রী। মনে করতে পারি গৌতম বুদ্ধের একটি অসাধারণ বাণী: 'জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক'। দক্ষ্য করুন 'সকল মানুষই নয়, সকন প্রাণীর সুখ কামনা রয়েছে এ মহৎ বাণীতে। এ বাণী আমাদের সর্বাধিক কর্ম ও ভাবনা অর্জনের প্রেরণা হোক, সঙ্গী হোক।

সফল হোক, সার্থক হোক বিহার-বাংলা একাডেমীর সম্মেলন-প্রচেষ্টা। এ শুভেচ্ছাবার্তায় উদ্যোক্তাদের অভিনন্দন জানাই।

আহমদ রফিক

[আহমদ রফিক (জন্ম ১৯২৯), শীর্ষস্থানীয় ভাষাসৈনিক, ডাক্তার, প্রাবন্ধিক, কবি। স্বাস্থ্য সচেতনতা, বিজ্ঞান-সচেতনতা, লোক-সংস্কৃতি, সমাজ-রাজনীতি বিষয়ে নানা গ্রন্থের লেখক। পাকিস্তান মেডিক্যাল এসোসিয়েশন জার্নালের (বাংলাদেশ হওয়ার আগে) প্রাক্তন সম্পাদক ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের প্রাক্তন সভাপতি। ঢাকায় অবস্থিত রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্রের সংস্থাপক সভাপতি।]