প্রথমবার বুদ্ধগয়া
তখনো কর্ড লাইন চালু
হয় নি। কেউ কলকাতা থেকে রওনা দিক বা গিরিডি থেকে, অথবা বোলপুর থেকে – হয় বর্ধমান-আসানসোল-ঝাঝা, নয় মধুপুর-ঝাঝা
নয়তো রামপুরহাট-ভাগলপুর-জামালপুর হয়ে কিউল পৌঁছোতে হতো। তারপর ধরতে হতো কিউল থেকে গয়া
যাওয়ার ট্রেন। গয়ায় বা ইদানিং সদ্য নাম-বদলানো গয়াজীতে পৌঁছে ঘোড়ায় টানা টাঙায় চেপে
যেতে হতো বোধগয়া, মূলতঃ বুদ্ধগয়া। রবীন্দ্রনাথেরাও সেভাবেই, অর্থাৎ পুরো যাত্রীদলটি
ঐ তিন বা (নিশ্চিতভাবে দুই) রাস্তা দিয়ে কিউলে পৌঁছে গয়ার ট্রেন ধরেছিলেন। তবে গয়া
থেকে বুদ্ধগয়ায় যেতে নিশ্চয়ই টাঙায় চাপতে হয় নি। তাঁরা সেসময়কার ঔপনিবেশিক ভারতের রাজধানী
থেকে আসা বিশিষ্ট নাগরিক (গোয়েন্দা বিভাগের নজর নিজের জায়গায়)। তার ওপর, (নিচে যথাস্থানে
উল্লেখিত আছে) তাঁদের আগমন বার্তা গয়ার মোহান্তর কাছে ছিল। গয়ার মোহান্তর সম্পত্তি
ও প্রতিপত্তি তখনো অজানা ছিল না, এখনো অজানা নয়।
এই প্রসঙ্গে ‘রবীন্দ্রজীবনী’তে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় লিখছেনঃ
“বিদ্যালয়ের অশান্তকর পরিবেশ হইতে মুক্তি পাইবার জন্য মন বোধহয় ব্যাকুল!
তাই কি হঠাৎ পরদিন স্থির করিলেন বুদ্ধগয়া যাইবেন? জগদীশচন্দ্র বসু, তাঁহার পত্নী অবলা
দেবী, স্বামী সদানন্দ, ব্রহ্মচারী অমূল্য (আর স্বামী শঙ্করানন্দ) ও ভগিনী নিবেদিতা,
যদুনাথ সরকার প্রভৃতি সঙ্গী। গিরিডি হইতে রথীন্দ্রনাথ ও সন্তোষচন্দ্র মধুপুরে আসিয়া
মিলিত হইলেন (৮ অক্টোবর ১৯০৪)। তখনো গ্র্যান্ডকর্ড লাইন নির্মিত হয় নাই, তাই কিউল হইয়া
গয়া যাইতে হইত। বুদ্ধগয়া হইয়া মোহান্ত মহারাজের অতিথিশালায় এক সপ্তাহ ছিলেন। সেখানে
প্রতিদিন তাঁহারা ওয়ারেনের Buddhism in translation এবং কখনো এড্যুইন
আর্নল্ডের Light of Asia হইতে অংশপাঠ করিতেন। রবীন্দ্রনাথ গান ও আবৃত্তি করিয়া
সকলকে তৃপ্ত করিতেন। … বুদ্ধগয়ার এই স্মৃতি
তিনি ‘বুদ্ধদেব’ সম্বন্ধে ভাষণ দান কালে উল্লেখ করেন ১৩৪২
সালের বৈশাখী পূর্ণিমায়।”
‘রবিজীবনী’তে প্রশান্তকুমার পাল লিখছেনঃ
“নিবেদিতা, জগদীশচন্দ্র
প্রভৃতি কয়েকজন বুদ্ধগয়া যাবার পরিকল্পনা করছেন, একথা রবীন্দ্রনাথ সম্ভবত গিরিডিতে
থাকার সময়েই জানতে পেরেছিলেন। তিনিও সদলবলে এই ভ্রমণে যোগদান করতে উৎসাহিত হয়ে ওঠেন।
শ্রীশচন্দ্র কিছুদিন আগে গয়াতেই ছিলেন। তাই তাঁর মাধ্যমে বুদ্ধগয়ায় থাকার জন্য তাঁবু
ইত্যাদির ব্যবস্থা করে তিনি কলকাতায় ফেরার আয়োজন করেন।…
“ …২২ আশ্বিনই [শনি 8 Oct] তিনি সদলবলে বুদ্ধগয়া
রওনা হন। এর আগে বহুবার তাঁর বাগবাজার ও পার্শিবাগানে যাওয়ার যে হিসাব পাওয়া যায়, তাতে
মনে হয় বুদ্ধগয়ায় যাওয়া বিষয়ে পরামর্শাদি করার জন্য তিনি ঘন ঘন নিবেদিতা ও জগদীশচন্দ্রের
কাছে গিয়েছিলেন।
শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে তাঁর এই সময়ে লেখা তিনটি
চিঠির প্রধান বিষয় বুদ্ধগয়া ভ্রমণ। একটি চিঠিতে লিখেছেন, ‘আগামী ৭ই অক্টোবরে রাত্রে গয়াধামে প্রয়াণ করব।
… নিবেদিতা যেই শুনলেন
আমরা তাঁবুর জোগাড় করে দিব্য আরামে থাকার থাকবার চেষ্টায় আছি অমনি বলে উঠলেন, Oh,
how nice! অর্থাৎ ওঁদের জন্যও তাঁবুর জোগাড় করে দেওয়া আবশ্যক।’ এর মধ্যে মহর্ষির শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁর
যাওয়া কিছুটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। শ্রীশচন্দ্রকে লিখলেন, ‘বুধগয়ায় আমার যাওয়া ঘটে কিনা সন্দেহস্থল। পিতার
শরীর অত্যন্ত উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। যাই হোক ছেলেদের নিয়ে তোমরা যেয়ো। সিস্টার নিবেদিতার
ও জগদীশের সংসর্গে ও আলাপ আলোচনায় তাদের বিশেষ উপকার প্রত্যাশা করছি। নিবেদিতা ওদের
জন্য উৎসুক হয়ে আছেন। তিনি ওদের দুজনের ইতিহাস শিক্ষার ভার নিয়েছেন – সেই জন্যে এই উপলক্ষ্যে তিনি ওদের সঙ্গে আলাপ
করে নিতে চান। বুধগয়ায় বসে তিনি ওদের ইতিহাসচর্চ্চার ভূমিকাস্থাপন করে দিতে পারবেন।
যতী ও লালু [ব্রজেন্দ্রকিশোর দেববর্মা] যাবেন – মহারাজ লালুকে যেতে সম্মতি দিয়েছেন। তাঁবুর বন্দোবস্ত তুমি করে
রেখো। জনসংখ্যা নিম্নলিখিত মতঃ – জগদীশ, নিবেদিতা, জগদীশজায়া, সিস্টার ক্রিষ্টিন, লালু, যতী, সম্ভবতঃ
আমি, তুমি, সন্তোষ ও রথী। সর্ব্বসমেত ৯/১০।’ ১৯ আশ্বিন [বুধ, 5 Oct] তিনি শ্রীশচন্দ্রকে নির্দ্দিষ্ট ভ্রমণসূচী
জানিয়ে লিখেছেন, ‘Howrah Kalka
Through Passenger নামক যে গাড়িখানা সাড়ে চারটার সময় কলকাতা ছাড়ে ও রাত দেড়টার সময়
মধুপুর পৌঁছয় – এবং কিউলে প্রাতঃকালে
ছাড়িয়া গয়ায় পৌঁছয় মধ্যাহ্নে ; সেই ট্রেনযোগে আমরা ছাড়চি। একটা পুরা গাড়ি রিজার্ভ করার
কথা, সুতরাং কিউলে বদল করতে হবেনা। কিন্তু রথীদের পক্ষে সময়টা অসুবিধাজনক হবে না কি?
… আমরা শনিবারে ছাড়ব
– অতএব সেইদিনই রথীরা
আমাদের ধরতে পারে … আমি বোধ হয় গয়াযাত্রায়
যোগ দিতে পারব – কর্ত্তার শরীর একটু
ভাল আছে।’
“২২ আশ্বিন [শনি 8 Oct] মহালয়ার বিকেলে রবীন্দ্রনাথ সদলবলে বুদ্ধগয়া
রওনা হন। তিনি শ্রীশচন্দ্রকে যে তালিকা দিয়েছিলেন, প্রকৃতপক্ষে যাত্রীদল তার চেয়ে বড়
ছিল। ব্রজেন্দ্রকিশোরের স্মৃতি থেকে জানা যায়, ‘কলিকাতায় কয়েকদিন অতিবাহিত করিয়া মহারাজকুমার তদীয় শিক্ষক মোক্ষদাকুমার
বসুর সহিত বুদ্ধগয়ার পথে কবির সহযাত্রী হইলেন – আশ্বিনের শেষ সপ্তাহে। সঙ্গীদল বেশ বড় - … স্ব-পত্নীক আচার্য্য জগদীশচন্দ্র, ভগিনী নিবেদিতা,
ঐতিহাসিক অধ্যাপক যদুনাথ সরকার, আনন্দমোহন বসুর দুই কন্যা, রথীন্দ্রনাথ, সন্তোষ মজুমদার
প্রভৃতি। মহিম ঠাকুরও সঙ্গী হইয়াছিলেন তাঁহার মনে হয়। বৌদ্ধদের কি যেন মতদ্বৈধতা হইয়াছিল
– তাহারই নিরসনের
প্রয়াস এই যাত্রায় – মহারাজকুমারের ইহাই
স্মরণে আসিতেছে।’”
২
যদিও এ বৃত্তান্তের
কেন্দ্রে আছেন রবীন্দ্রনাথ, উদ্ধৃতিগুলোও রবীন্দ্র জীবনীকারদের লেখা থেকে নেওয়া, কিন্তু
মানুষগুলো এতো বড়ো যে সমসাময়িকতায় অন্ততঃ তিনজনকে কেন্দ্রে রেখে বৃত্তান্তটি তিন দিক
থেকে রচনা করা যেতে পারত। এবং তাঁরা যদি তাঁদের স্মৃতিকথা লিখতেন তাহলে ঐ তিনভাবেই
আসত।
যদুনাথ সরকার সর্বকালের
শ্রেষ্ঠ ভারতীয় ইতিহাসবিদদের একজন এবং প্রথম। তাঁর যাত্রাপথটি নিয়েও সংশয় আছে। ওপরে
উদ্ধৃত রবীন্দ্র জীবনীকারদের বক্তব্য পড়লে মনে হয় তিনি মূল দলটির সঙ্গে কলকাতা থেকে
গয়ায় পৌঁছেছিলেন। আবার অন্য এক সূত্র বলে যে তিনি পাটনা থেকে তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে
গয়ায় এসে দলটিতে যোগ দেন। এটা তথ্য যে যদুনাথ সরকার সে সময় পাটনা কলেজে ইতিহাস এবং
ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। হতে পারে তিনি কিউল অব্দি দলটির সঙ্গে এসে পাটনায় চলে আসেন।
তারপর পাটনা থেকে গয়ায় পৌঁছোন। তবে, তাঁকে কেন্দ্রে রেখে এ বৃত্তান্ত না ভাবলেও চলে
কেননা তিনি বয়সেও একটু ছোটো আর তখন অব্দি তাঁর মোগল সাম্রাজ্য নিয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ-শৃঙ্খলার
প্রথমটিই মাত্র, ইন্ডিয়া অফ অওরঙ্গজেব, বেরিয়েছে।
কিন্তু জগদীশচন্দ্র
বসু? আধুনিক কালের ভারতে বিজ্ঞান সাধনার জনক এবং বিশ্ববিজ্ঞানের একজন পথিকৃৎ। ততোদিনে
তাঁর ‘গাছেদের প্রাণ’ সংক্রান্ত গবেষণার ফলাফল প্রদর্শিত এবং প্রকাশিত
হয়ে গেছে। সে বছরেরই প্রথম দিকে তিনি তাঁর উদ্ভাবিত ‘সেমিকন্ডাক্টর ডায়োড’এর পেটেন্ট পেয়েছেন আমেরিকা থেকে। কিন্তু মনটা
ভালো নেই। ঘনিষ্ঠতম বন্ধু রবীন্দ্রনাথের শরীরের অবস্থা জানতে চেয়ে চিঠি লিখেছেন তিন
মাস আগে, ২৯শে জুন, ১৯০৪ – “আমার মনটা একটু বিষন্ন আছে, একটা বড় কিছু লইয়া
এখন থাকিতে চাহি, আমার নিজের কাজ তো একরূপ বন্ধ। কারণ ১৯টি papers লিখিয়াছি, তাহার
একটাও প্রকাশিত হইতে পারিতেছে না, কি হইল তাহাও বুঝিতে পারিতেছি না। বই লিখিব মনে করি,
কিন্তু সেই পুরাতন লেখা এখন দেখিতে ইচ্ছা করে না।”
তার ওপর,
“ভাল কথা, আমার যে
প্রতিদ্বন্দ্বী, আমার আবিষ্ক্রিয়া চুরী করিয়াছিল, সে একখানা পুস্তক লিখিয়াছে, তাহাতে
লেখা আছে যে, পূর্ব্বে লোকে মনে করিত যে, কেবল sensitive plant এ সাড়া দেয়; ‘But these notions are to be extended and
we are to recognise that any vegetable protoplasm gives electric responses.’
“‘I have used all
kinds of vegetable protoplasms.’
“‘We are to
recognise’; কাহার discovery দ্বারা ইহা হইয়াছে তাহার কোন উল্লেখ নাই।
“তারপর আমার পুস্তকে
Phiysiologistদের একটা প্রকান্ড ভুল ধরিয়া দিয়াছিলাম – আমার আবিষ্কার হইতে ইহা প্রমাণ হইয়াছে যে,
তাহাদের গোড়ায় গলদ – যাহা তাহারা
negative বলে তাহা Positive। ইহা অপেক্ষা সাংঘাতিক আর কি ভুল হইতে পারে? তাহার উত্তরে
প্রতিদ্বন্দ্বী লিখিয়াছে (আমার নাম করিতে নাই – আমার নাম physicist)।
“‘But in the
present state of our physiological literature, is it wise to attempt to use the
proper expression? No doubt the confusion is very great, no doubt the main bulk
of our electro-physiological literature is totally unintelligible to
physicists. Shall we not, however, lay the foundation of a further mass of
worse-confounded confusion by any sudden and unauthorised endeavour to call
white white and black black, when for the last twenty of thirty years our
leaders have been content to call white black and black white?’
“আমরা এতদিন
White কে Black বলিয়াছি। Unauthorised Physicist আসিয়া আমাদিগকে শিখাইতে চায় white
is white। কি ভয়ানক।
“তুমি কি মনে করিয়ে
পার, বিলাতের বিজ্ঞান এখন কিরূপ অবস্থায় পড়িয়াছে?
“ইহা হইতে বুঝিতে পারিবে যে, কিরূপ বাধার সহিত আমায় সংগ্রাম করিতে
হয়। এসব কথা তোমাকে লিখিয়া, বোঝা অনেকটা দূর হইল, কয়দিন পর পুস্তক লিখিতে আরম্ভ করিব।”
রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট
বলেছেন যে তাঁর জীবনে প্রথম বন্ধু হয়ে এসেছিলেন জগদীশচন্দ্র। এবং সারা জীবন তাঁর ঘনিষ্ঠতম
বন্ধু হয়ে ছিলেন। যদিও সে বন্ধুত্ব পরিণত বয়সের, একে অপরের কাজের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসনির্ভর,
বাল্যসখার মতো নয়।
ওদিকে ভগিনী নিবেদিতা?
কিছু বলার আগে বলে
নিই, এঁরা সবাই এতো বড়ো মাপের মানুষ ছিলেন যে স্বল্প পরিসরে কিছুই বলা যায় না। আমি
শুধু একসঙ্গে বোধগয়া যাওয়ার সময় এঁদের প্রত্যেকের জীবনের কয়েকটি প্রাসঙ্গিক ঘটনা বা
তথ্য এক জায়গায় জড়ো করতে চাইছি যাতে তাঁদের মনের ভিতরের অবস্থাটাও কিছুটা কল্পনা করা
যায়।
ভগিনী নিবেদিতার
গুরুজি, স্বামী বিবেকানন্দ মারা গেছেন দু’বছর আগে। তার কিছুদিনের মধ্যেই বেলুড় মঠ ছেড়ে তিনি বেরিয়ে এসেছেন।
এখন তিনি চিঠির নিচে শুধু লেখেন ‘রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের নিবেদিতা’, যাতে মঠের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ইংরেজ পুলিস প্রমাণ না করতে পারে।
আশ্রয় নিয়েছেন বাগবাজারে। যে বালিকা বিদ্যালয়টি খুলেছিলেন সেটিই ভালোভাবে চালানোর জন্য
সিস্টার ক্রিস্টিনকে ডেকে নিয়েছেন। ক্রিস্টিনের হাতে পরিচালনা আর নিবেদিতার কাজ অর্থ
জোগাড় করা। ১৯০৪-এরই মে মাসে ‘দ্য ওয়েব অফ ইন্ডিয়ান লাইফ’ প্রকাশিত হয়েছে ইয়োরোপে এবং
বিস্তর সাড়া জাগিয়েছে। এবং জুন মাসে লেখা জগদীশচন্দ্র বসুর উপরুল্লিখিত চিঠিতে তিনি
রবীন্দ্রনাথকে খবর দিচ্ছেন যে, “Sister নিবেদিতা ও Christine তোমার বাড়ীতে স্কুল খুলিবার জন্য বিশেষরূপে
লাগিয়াছেন। তবে ছাত্রী জোগাড় কি করিয়া করিবেন জানি না – আর টাকাও দরকার মনে হয়।” রবীন্দ্রনাথও নিজের তরফ থেকে উদ্যোগ নিয়েছিলেন
যাতে পৈত্রিক বাড়িটার একাংশে বিদ্যালয়টি চলে আসে। কিন্তু নিবেদিতার জীবনীকার জানাচ্ছেন
যে শেষ অব্দি বিদ্যালয় সেখানে যায় নি। অর্থাৎ, সে সময় ভগিনী নিবেদিতার জীবনে দুটো সামাজিক
সক্রিয়তার ধারা একসঙ্গে বইছিলঃ বালিকা বিদ্যালয় পরিচালন এবং বিপ্লবী সংগঠন ও স্বাধীনতাসংগ্রামে
পরোক্ষ অংশগ্রহণ – অনুপ্রেরণা, পরামর্শ,
আর্থিক এবং বিভিন্ন প্রকারের সাহায্যের মাধ্যমে। অর্থসংগ্রহের কিছুটা আগে রামকৃষ্ণ
গিল্ডের মাধ্যমে অনুদানে আসছিল, তার স্রোত ক্ষীণ হয়ে আসায় বাড়িয়ে দিয়েছিলেন সংবাদপত্রাদিতে
লেখালিখি। আইরিশ বিপ্লবিয়ানার রক্তে লালিত, বিবেকানন্দের কর্মযোগে দীক্ষিত দ্রষ্টা
সন্ন্যাসিনী তিনি; কষ্ট বা দুশ্চিন্তা বলতে একটাই তাড়া করে বেড়াতো – গুরুজির দেওয়া সমস্তটা দায়িত্ব তিনি বুঝতে
পারছেন কিনা এবং পুরো করতে পারছেন কিনা।
রবীন্দ্রনাথ তাঁকে
‘লোকমাতা’ নামে অভিহিত করেছিলেন। বয়সে ছোটো হওয়া সত্ত্বেও
শ্রদ্ধা করতেন চিন্তায় কর্মে ঐ নারীর বিস্ময়কর অসামান্যতা। যদিও তাঁর ভারত-দৃষ্টির
সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ভারত-দৃষ্টির মিল ছিল না, তার জন্য তাঁদের সহৃদয়, এবং যেমন জগদীশচন্দ্রের
সঙ্গে – পরস্পরের কাজের
প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসনির্ভর – বন্ধুত্ব কখনো কম হয় নি। সে বন্ধুত্বের কয়েকটি দিক ছিল। যেমন এক,
উগ্র ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এবং সহিংসতার প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথের কঠোর আপত্তি থাকা
সত্ত্বেও জাতীয় জাগরণের প্রয়োজনীয়তাবোধে একাত্মতা। দুই, শিক্ষার বিশেষ করে নারীশিক্ষার
এবং মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাবোধে একাত্মতা। এবং তিন, দুজনেরই প্রিয় বন্ধু বিজ্ঞানী
জগদীশচন্দ্রকে তাঁর জয়যাত্রায় সাহায্য করার প্রয়োজনীয়তাবোধে একাত্মতা।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে
বিচলিত করত নিবেদিতার চরিত্রের একটি দিক। ১৯১৬ সালে প্রকাশিত ‘পরিচয়’ নামের প্রবন্ধ সঙ্কলনে ‘ভগিনী নিবেদিতা’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি লিখছেন, “তাঁহার প্রবল শক্তি আমি অনুভব করিয়াছিলাম, কিন্তু সেই সঙ্গে ইহাও বুঝিয়াছিলাম তাঁহার পথ
আমার চলিবার পথ নহে। তাঁহার সর্ব্বতোমুখী প্রতিভা ছিল, সেই
সঙ্গে তাঁহার আর একটি জিনিষ ছিল, সেটি তাঁহার যোদ্ধত্ব।
তাঁহার বল ছিল এবং সেই বল তিনি অন্যের জীবনের উপর একান্ত বেগে প্রয়োগ করিতেন— মনকে পরাভূত করিয়া অধিকার করিয়া
লইবার একটা বিপুল উৎসাহ তাঁহার মধ্যে কাজ করিত। যেখানে তাঁহাকে মানিয়া চলা অসম্ভব
সেখানে তাঁহার সঙ্গে মিলিয়া চলা কঠিন ছিল। অন্তত আমি নিজের দিক্ দিয়া বলিতে পারি তাঁহার সঙ্গে আমার
মিলনের নানা অবকাশ ঘটিলেও এক জায়গায় অন্তরের মধ্যে আমি গভীর বাধা অনুভব করিতাম।
সে যে ঠিক মতের অনৈক্যের বাধা তাহা নহে, সে যেন একটা বলবান
আক্রমণের বাধা।”
এই ‘মনকে পরাভূত করিয়া অধিকার করিয়া
লইবার একটা বিপুল উৎসাহ’-ই তৈরি করেছিল নিবেদিতার
অসাধারণ বাগ্মীতা। যে কারণে কুড়ি জনের দলটাকে বোধগয়ায় সন্ধ্যার পর সন্ধ্যা দীর্ঘক্ষণ
তিনি পড়ে শোনাতেন বুদ্ধের জীবনকাহিনী এবং বুদ্ধের শিক্ষা। আর বিভিন্ন বয়সের শ্রোতারা
মন্ত্রমুগ্ধের মত তা শুনত। রবীন্দ্রনাথ তো বলেই ছিলেন অনেককে, কাঁচাবয়সী ছেলেমেয়েদের
নিয়ে আসতে। তিনি জানতেন নিবেদিতার ঐ জ্ঞানাশ্রয়ী আবেগময় বাগ্মীতা বালক-বালিকা বা যুবক-যুবতীদের
মনে কী চমকপ্রদ প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
এবার আসি রবীন্দ্রনাথে।
রবীন্দ্রনাথ কেমন
ছিলেন? তখনো তাঁর ‘নোবেল লরিয়েট’ হতে ন’বছর দেরি আছে। সাহিত্য সমাজে স্বীকৃত হলেও, নাগরিক সমাজে ‘একজন প্রতিষ্ঠিত কবি এবং আজকাল যাকে বলে ‘পাব্লিক ইন্টেলেকচুয়াল’। স্ত্রী মৃণালিনী মারা গেলেন ১৯০২ সালে। ১৯০৩
সালে মারা গেলেন কন্যা রেণুকা। ১৯০৪এর সেই দিনগুলোয় বাবার অসুস্থতা বার বার গুরুতর
হয়ে উঠছে আর রবীন্দ্রনাথকে ভাবতে হচ্ছে যাবেন কিনা। নিজে না যেতে পারলেও অন্ততঃ পুত্র
রথী যাক। ওদিকে বোলপুরে, তিন বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ‘শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রম’ বিদ্যালয়টি একেবারে বেহাল হয়ে পড়েছে। শিলাইদহের বিদ্যালয়টিরও
দুরবস্থা চলছে। হাল ধরার একজন পাকাপোক্ত লোক পাচ্ছেন না রবীন্দ্রনাথ। এমনকি নিজের শারীরিক
অসুস্থতার মধ্যেও শুনতে হচ্ছে, স্কুলকে দুরবস্থায় রেখে ‘পালিয়ে বেড়াচ্ছেন’। ওদিকে বাংলা ভাগ নিয়ে তখন আলোচনা শুরু হয়েছে।
কার্জনের দুরভিসন্ধিতে রসদ জুগিয়ে মাথা চাড়া দিতে শুরু করেছে উগ্র স্বাদেশিকতা এবং
সাম্প্রদায়িকতা। রবীন্দ্রনাথ ঐ প্রবৃত্তিগুলোর প্রতিরোধে সংস্কারমূলক দেশপ্রেমের পথ
দেখাতে চাইছেন। উগ্র স্বাদেশিকতার রাজনৈতিক প্রতিনিধি এবং সংবাদমাধ্যমগুলোর তীব্র সমালোচনা
সত্ত্বেও ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধটি রীতিমতো সাড়া জাগাচ্ছে মানুষের
মনে। মানুষ শুনতে চাইছে নতুন কথাগুলো।
কিন্তু এ সমস্ত ব্যস্ততায়
তাঁর শিল্পীসত্ত্বা যেন অনাদৃত থেকে যাচ্ছে তাঁর নিজেরই কাছে। বুদ্ধগয়া সফরের একমাস
আগে তিনি গিরিডিতে, অসুস্থ শরীরের ভোগান্তি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন, স্বাস্থ্যলাভ
করছেনও। কিন্তু, লেখার কাজ হচ্ছে না। ২৭শে আগস্ট দীনেশচন্দ্র সেনকে লিখছেন, “এখানে আসিয়া অবধি রচনাকার্য যে বিশেষ অগ্রসর হইতেছে তাহা বলিতে পারি
না। এখনো আমার কল্পনাশক্তি প্রসুপ্ত আছে।” চারুচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় বারাণসী থেকে একটা
নতুন গান চেয়ে পাঠালে ১২ই সেপ্টেম্বর তিনি লিখছেন, “বীণায় ওয়াড় পরাইয়া দেয়ালে লটকাইয়া রাখিয়াছি এখন
গানের প্রস্তাব করিবেন না — দোহাই আপনার।” আর এমনই এক সময়,
সেই দীনেশচন্দ্রকে চিঠি লেখার দিনই তিনি, সখারাম গণেশ দেউস্করের অনুরোধে লিখলেন ‘শিবাজী উৎসব’। বয়সে ছোটো হলেও দেউস্করের দেশপ্রেম ও কাজের
প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল। কবিতাটি তৎক্ষণাৎ জনপ্রিয় হয়ে উঠল। এখনও জনপ্রিয়। কিন্তু কবিতাটির
মেজাজ বস্তুতঃ সেই উগ্র হিন্দুকেন্দ্রিক স্বাদেশিকতাকেই সমর্থন করছিল যার প্রতিরোধে
তিনি ‘স্বদেশী সমাজ’ লিখেছিলেন।
আমি রবীন্দ্রতত্ত্ববিদ
নই যে তাঁর মনের কথা জানার ধৃষ্টতা করব, কিন্তু মনে হয়, এই যে কবিতা, গান লিখতে না
পারাটা তাঁকে কষ্ট দিচ্ছিল, সেটাই আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল ঐ কবিতাটি। আগামি বহু বছর তিনি
তাঁর কোনো সঙ্কলনে ‘শিবাজি উৎসব’ অন্তর্ভুক্ত করেন নি। বস্তুতঃ সঞ্চয়িতাতেও
১৩১১ বঙ্গাব্দে (ইংরেজি ১৯০৪ সালের ১৫ই এপ্রিল থেকে ১৯০৫ সালের ১৪ই এপ্রিল) তাঁর কাব্যসৃষ্টি
(এবং স্বচয়ন) চিহ্নিত হয়ে আছে ‘সাময়িক পত্র’ (অর্থাৎ তখন অগ্রন্থিত) মাত্র একটি কবিতায় – ‘শিবাজি উৎসব’।
এমনই মনের অবস্থা
নিয়ে তিনি বুদ্ধের কাছে যাচ্ছিলেন।
৩
‘রবিজীবনী’র (পঞ্চম খণ্ড) লেখক বলছেন যে নিছক বুদ্ধচর্চা, বিশিষ্ট বান্ধবজনের
সঙ্গে তীর্থভ্রমণ বা ভারতবর্ষ সম্পর্কে ভ্রমণসঙ্গী কচিকাঁচাদের জ্ঞানবৃদ্ধি … এসব ছাড়াও নিবেদিতার একটি বিশেষ উদ্দেশ্য
ছিলঃ
“বুদ্ধগয়া বৌদ্ধতীর্থ হলেও কয়েক শতাব্দী ধরে শৈব মহান্তের কর্তৃত্বাধীনে
ছিল। সিংহলী বৌদ্ধ অনাগরিক ধর্মপাল এখানে বৌদ্ধকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার
চেষ্টা করলে তা নিয়ে উভয় পক্ষে সংঘর্ষ উপস্থিত হয়। ওকাকুরা যখন ভারতে এসে ছিলেন,
তখন জাপান সরকারের আর্থিক সহায়তায় এখানে একটি অতিথিশালা তৈরি করতে
চেয়েছিলেন। মোহান্ত প্রথমে জমি দিতে চেয়েও পরে অস্বীকার করেন। শ্রীশচন্দ্র
মজুমদারকে লেখা রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি পত্রে বিষয়টির উল্লেখ আছে। নিবেদিতা
মোহান্তের পক্ষ অবলম্বন করেছিলেন, লর্ডকার্জন নিরপেক্ষ
ভূমিকা নিতে চাইলেও বৌদ্ধদের প্রতি তাঁর সমর্থন ছিল [দ্র কার্জনের 18 Jan 1903-এর গোপন মন্তব্য, Letters of Sister Nivedita, vol. 2 pp. 605-10]। নিবেদিতা এই ভ্রমণের আয়োজন
করেছিলেন মোহান্তের সঙ্গে বিশিষ্ট
ব্যক্তিদের আলাপের মাধ্যমে তাঁদের প্রভাবিত করতে; 21
Sep [বুধ ৫ আশ্বিন] তিনি মিস ম্যাকলাউডকে লেখেন: ‘I am trying to arrange a party for
Bodh-Gaya, Oct. 8 to 14th. I shall be so thankful if the
leaders of public opinion can be brought into personal contact with the Mohunt.’ ব্রজেন্দ্রকিশোর তাঁর
স্মৃতিকথায় ‘মতদ্বৈধতা’ বলতে এই প্রসঙ্গটিকে বুঝিয়েছেন।”
এই উদ্দেশ্যে নিবেদিতা
কতোদূর সফল হয়েছিলেন জানা নেই। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এই বিষয় নিয়ে তাঁর কোনো কথাবার্তা
হয়েছিল কিনা জানি না। তবে এই ঐতিহাসিক বুদ্ধগয়া ভ্রমণের এক যুগ পর, ২০১৩ সালের ৬ই মার্চ
টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় একটি খবর বেরিয়েছিল, শিরোনাম ছিলঃ ‘Tagore favoured Buddhist control over
Bodh Gaya shrine’। ‘মাতৃভূমি’ (Mathrubhumi, Malayalam) সংবাদপত্রে মলয়ালি অনুবাদে প্রকাশিত,
১৯২২ সালে লেখা রবীন্দ্রনাথের কোনো প্রবন্ধ থেকে টাইমস অফ ইন্ডিয়া উদ্ধৃত করেছিলঃ “I am sure it will be admitted by all
Hindus who are true to their own ideals that it is an intolerable wrong to
allow the temple raised on the spot where Buddha attained enlightenment to
remain under the control of the rival sect, which can neither have an intimate
knowledge of, nor respect for Buddhist religion and its right of worship”.
আমি মলয়ালমও জানি
না যে ‘মাথ্রুভূমি’র পোর্টালে গিয়ে লেখাটা খুঁজব। আর কোনো উপায়
তো দেখছি না মূলটা খুঁজে বার করার। তবে ২০২৫ সালে মহাবোধি মন্দির নিয়ে প্রকাশিত একটি
পুস্তিকাতে (লেখকঃ অতুল মুরলীধর ভোসেকর) রবীন্দ্রনাথের জবানে ঐ একই বক্তব্য ঈষৎ পরিবর্তিত
ভাষায় উদ্ধৃত আছেঃ “I strongly believe that those
who are real Hindus would believe that this place where the Buddha attained
enlightenment, would never want to build a temple there or appropriate this
place. These people who forcefully occupy the Mahavihara do not know what is
Buddhism and are not aware of the Buddhists rights to worship this place.”
যখন বুদ্ধগয়া যাচ্ছিলেন
তখনও যদি রবীন্দ্রনাথের এই মত হয়ে থাকে, তাহলে তো সেখানে রীতিমতো তীব্র তর্কবিতর্ক
ও বিবাদ হওয়ার কথা! প্রশান্ত কুমার পাল আক্ষেপ করেছেন যে রথীন্দ্রনাথের স্মৃতিচর্চায়
বুদ্ধগয়া ভ্রমণের যে বর্ণনা আছে তাতে রবীন্দ্রনাথ-নিবেদিতার তর্কবিতর্ক লিপিবদ্ধ হয়
নি এবং “দুঃখের
বিষয়, নিবেদিতা ও রবীন্দ্রনাথের তর্কবিতর্কের
বিবরণ কেউ লিপিবদ্ধ করে রাখেননি।” তবে তাঁর কথায়, “অনুমান করা যায়,
বুদ্ধগয়ার মন্দির নিয়ে বৌদ্ধ-হিন্দু বিতর্কে রবীন্দ্রনাথের সহানুভূতি ছিল বৌদ্ধদের
প্রতি।”
মহাবোধি মন্দিরের
মালিকানা এবং পরিচালনার অধিকার নিয়ে মতের অনৈক্য হলেও ব্রাহ্ম, বৌদ্ধ এবং কালে কালে
হিন্দুসমাজ থেকে বেরিয়ে আসা আরো এমন ধর্মমত, পন্থা ও সম্প্রদায়গুলোর ‘সুসংস্কৃত হিন্দু ছত্রাধীন মহান ঐক্য’ সাধনের পরিকল্পনায় নিবেদিতা এবং রবীন্দ্রনাথে
একটা ঐক্যও ছিল। নইলে, বুদ্ধগয়া ভ্রমণের এক বছর আগে লিখিত ‘মন্দির’ প্রবন্ধে তিনি লিখতেন না, “বৌদ্ধধর্ম্ম হিন্দুধর্ম্মের অন্তর্গত
হইয়া গেল”।
অবশ্যই বুদ্ধের মানবিক
ধর্মদর্শনের আবির্ভাবের পরিণামে হিন্দুধর্মে ও সমাজে আসা পরিবর্তনের কথাই তিনি বলছিলেন।
এবং বুদ্ধকে সিঁদুর-টিঁদুর পরিয়ে দেবতা সাজানো, অবতার সাজানো, মন্দির খাড়া করা এবং
বিশেষ করে পুরাতত্ত্ব বিভাগের আওতায় আসা জমিগুলোকে চুরি করার আধুনিক দুশ্চক্রের খেলায়
আড়াল হয়েছে একটা লোকায়ত মিলনক্ষেত্র। যে মিলনক্ষেত্রে গ্রামের পুকুর থেকে ধোপার পাট
হয়ে উঠে আসা বুদ্ধমুর্তি হোক বা গ্রামের সীমানার মুসলমান পীরের স্থান, অশ্বত্থ গাছ,
সবই প্রণম্য, সবই সিঁদুর দিয়ে সাজিয়ে আপন করার যোগ্য। হ্যাঁ, নিবেদিতার মননে সেটা সহজে
রাজনৈতিক রঙ পেয়ে যেত, রবীন্দ্রনাথ সেটাকে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সীমিত রাখতেন।
৪
দলটি বুদ্ধগয়া পৌঁছোবার
কথা ৯ই অক্টোবর সন্ধ্যাবেলা। ভ্রমণে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গী হয়েছিলেন তাঁর ছেলে রথীন্দ্রনাথ।
রথীন্দ্রনাথের বয়ানেও তারিখটা তাই। এবং সেখানে তাঁরা চারদিন ছিলেন। তবে বুদ্ধগয়ায় তাঁরা
কী করতেন সারাদিন, সেই দিনপঞ্জিটা কল্পনা করার জন্য আমরা এক এক করে ভ্রমণসঙ্গীদের স্মৃতিচর্চায়
যাবো। সবচেয়ে আগে যাবো যদুনাথ সরকারের লেখায়। ১৯৪৩ সালে, ‘প্রবুদ্ধ ভারত’ পত্রিকায় তাঁর একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল
‘রেমিনিসেন্সেস অফ
সিস্টার নিবেদিতা’। হরিদ্বারের কঙ্খলে
রামকৃষ্ণ মিশন সেবাশ্রমে দেওয়া তাঁর বক্তৃতা থেকে আহরিত।
“অক্টোবর ১৯০৪-এ আমার ভগিনী নিবেদিতার (মিস মার্গারেট ই নোব্ল) সঙ্গে
দ্বিতীয় বার দেখা হওয়ার সৌভাগ্য হয়। স্যার জে সি বোস এবং ডঃ রবীন্দ্রনাথ ট্যাগোরের
সঙ্গে তিনি বুদ্ধ গয়ায় ছিলেন। ভারতীয় ধর্মশাস্ত্র, শিল্পকলা এবং লোকসংস্কৃতির যে অন্তর্ভেদী
ব্যাখ্যা তিনি করতেন তা আমাদের চমৎকৃত করত। ডঃ ট্যাগোরও সে ব্যাখ্যার খুব প্রশংসা করতেন।
কবির অবশ্যই সুন্দর নিজস্ব ধরণ ছিল গভীর কথাগুলো প্রকাশ করার, কিন্তু তিনি বলতেন, বিষয়গুলোর
হৃৎকেন্দ্রে প্রবেশ করার শক্তি আছে নিবেদিতার। তিনি এক বিস্ময়কর উদ্গাতা। গোধূলিবেলায়
আমরা বোধিবৃক্ষের নিচে বসে ধ্যান করতাম। বোধিবৃক্ষটি সেই বৃক্ষের সন্ততির সন্ততি ছিল
যার নিচে পঁচিশ শতাব্দী আগে বসে বুদ্ধ নির্বাণ লাভ করেছিলেন। আপনারা সবাই জানেন যে
সেই বৃক্ষের একটি শাখা অশোকের রাজত্বকালে শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং সেই দ্বীপে
সেটি রোপন করেছিলেন সেখানকার রাজা তিসসা। …
“সাধারণতঃ সে সময় আমরা নিবেদিতা এবং রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কিছুক্ষণ
সান্ধ্যভ্রমণ করতাম। উরুবেলা গ্রামের প্রধানের মেয়ে সুজাতাকে আপনারা বোধহয় জানেন। ক্ষুধায়
কাতর হয়ে বুদ্ধ যখন একটি গাছের তলায় বসে ছিলেন, তিনি তখন সোনার পাত্রে বুদ্ধকে আহার্য
দিয়েছিলেন। একদিন হাঁটতে হাঁটতে আমরা উর্বিল নামে একটি গ্রামে পৌঁছোলাম। নিবেদিতা বললেন
ওটাই উরুবেলা। সুজাতার প্রশংসা করতে করতে বললেন সুজাতা আদর্শ গৃহকর্ত্রী ছিলেন কেননা
আদর্শ গৃহকর্ত্রীদের ভাঁড়ারে সাচ্চা সন্ন্যাসীদের প্রয়োজনীয় সব জিনিষ মজুত থাকে। এতোটাই
উদ্দীপিত হয়ে উঠেছিলেন যে গ্রামের রাস্তা থেকে একমুঠো মাটি তুলে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন,
“সুজাতার বাড়ির এই
মাটি, পবিত্র মাটি!”
নিবেদিতা নিজে কয়েকটি
জায়গায় এই স্মরণীয় ভ্রমণের উল্লেখ করেছেন। জোসেফাইন ম্যাক্লিয়ড স্বামী বিবেকানন্দের
আমেরিকাবাসী বন্ধু এবং ভক্ত ছিলেন। সেই সূত্রে তিনি ভগিনী নিবেদিতারও ঘনিষ্ঠ। তাঁদের
দুজনের চিঠিপত্রের সংগ্রহটিও বিশাল এবং কৌতূহলোদ্দীপক। আজকের দিনের সহচর গুগলের এআই
জবাব দিচ্ছে নিবেদিতা জোসেফাইনকে লেখা চিঠির সংখ্যা ৮০০রও বেশি। ১৫ই অক্টোবর, রাজগীরে
আমোয়ার রাজার জমিদারি কুঠিতে বসে জোসেফাইনকে স্বভাবসিদ্ধ উচ্ছসিত ভাষায় লিখছেনঃ
“১৯০৪-এর দুর্গাপুজার
মহান দিন [পঞ্জিকা মতে সেদিন সপ্তমী – ব. লে.]
“প্রিয়তম ইয়াম,
“এখানে আছি – আর জানো তোমার শেষ চিঠি আমি কোথায় পেয়েছিলাম?
বোধ-গয়ায়! সব কিছু মিটে যাওয়া অব্দি তোমায় বলতে সাহস পাইনি – কেননা অভিষ্ট সিদ্ধি নিয়ে আমি ভীষণ কুসংস্কারী।
কিন্তু [এখন বলতে পারি – ব. লে.] কুড়ি জনের
একটা দল হয়ে আমরা চার দিন বোধগয়ায় কাটালাম। অতিথিশালায় [প্রশান্ত কুমার পালও এই ব্যাপারে
যদুনাথ সরকারের বয়ানে অনুমান করেন যে রবীন্দ্রনাথের সেই তাঁবুর ব্যবস্থা শেষ অব্দি
হয়ে উঠতে পারে নি; অর্থাৎ অতিথিশালা বলতে গয়ার মোহান্তের বাড়ির অতিথিশালা – ব. লে.] ছিলাম। এবং আমার মনে হয় এটা সারা
জীবন মনে রাখার মতো ঘটনা। বোস দম্পতিও ছিলেন, সঙ্গে দুজন শিশু, সব মিলিয়ে চারজন। কবি
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) ছিলেন। সঙ্গে ছিল তাঁর পুত্র আর পুত্রের এক বন্ধু – রাজপুত্র। এবং তার গৃহশিক্ষকও। আমার ছেলেরাও
ছিল তিনজন। একজন বিশিষ্ট পণ্ডিত ছিলেন। আরেক বন্ধু ছিলেন। স্বামী সদানন্দ এবং তার ভাইপো।
ক্রিস্টিনও ছিল। সকালবেলায় ৬টার মধ্যে আমরা চা খেতাম এবং তারপর পাঠ – লাইট অফ এশিয়া – ওয়েব অফ ইন্ডিয়ান লাইফ ইত্যাদি। কথাবার্তা
চলত। সবাই এসে জুটতাম বিরাট বারান্দাটায়। আমাদের মোহান্ত একেবারে রাজার মতো। সন্ধ্যেবেলায়
চা খাওয়ার পর বেরিয়ে আমরা পৌঁছোতাম মন্দিরে, বোধিবৃক্ষের তলায়, সুজাতার বাড়িতে এবং
আরো অনেক জায়গায়। ইতিহাস, জাতি, স্বামীজি, শ্রী রামকৃষ্ণ প্রভৃতি বিষয়ে কথা বলতাম।
“এই ভ্রমণ যদি শুধু আমার ছেলেদের জন্যও হতো, যে তারা উচ্চতর সংস্কৃতির
একটা ঝলক দেখবে, তাহলেও সার্থক হতো। তবে আমি আশা করি, বিশ্বাসও করি যে যে সব মানুষেরা
ইতিমধ্যেই খ্যাতনামা, তাঁরা ঐ এক ঝলকের থেকে বেশিও পেয়েছেন।”
এই চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ
সম্পর্কে তাঁর ধারণাটাও টের পাওয়া যায়। তাঁর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ধারণার উল্লেখ
এই লেখাতে আগেই হয়েছে। বরং নিবেদিতা সম্পর্কে আরো কিছু তিক্ত শব্দ রবীন্দ্রনাথ ব্যবহার
করেছিলেন, এমন একটা উল্লেখ ‘রবিজীবনী’তে আছে। তবে মনে হয় কথাবার্তায় বা বিভিন্ন আলোচনায় তাঁরা দুজনেই
এই তিক্ততার জায়গাটাগুলো এড়িয়ে চলতেন। স্বাভাবিক বন্ধুত্ব বজায় রাখতেন কেননা চলমান
সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগ্রামে দুজনেই একে অপরের প্রয়োজনীয়তা বুঝতেন। তাই সাবধানতা বা
দরকারে নীরবতা অবলম্বন করতেন। অন্য কথায় চলে যেতেন। প্রশান্ত কুমার পাল যে আক্ষেপ করেছেন
যে ‘নিবেদিতা-রবীন্দ্রনাথের
তর্কবিতর্ক’ কেউ লিপিবদ্ধ করেন
নি, সেটা এজন্যও হতে পারে যে তর্কবিতর্কে তেমন ‘ঝাঁজালো’ কিছু হয়ই নি। বুদ্ধের শিক্ষার ব্যাখ্যা দুজনে নিজের মতো করে করেছেন,
এবং কাছাকাছি পৌঁছোনোর চেষ্টা করেছেন। চিন্তায় ঐক্যের একটা বৃহৎ পরিসর তো ছিলই।
আর মন্দিরের ওপর
মোহান্তের অধিকার, বা সেই সূত্রে মহাবোধি মন্দিরে হিন্দু পুরোহিতদের মাতামাতি … সে নিয়ে বিশেষ আলোচনা না-ও হয়ে থাকতে পারে।
কেননা মোহান্তের বাড়িরই অতিথিশালায় তাঁরা ছিলেন।
ঐ চিঠিতে এগিয়ে নিবেদিতা
লিখছেন, “কবি, মি. ট্যাগোর,
একজন নিখুঁত [ইংরেজিতে পারফেক্ট – ব. লে.] অতিথি। উনি মনে হয় আমার দেখা একমাত্র ভারতীয় যাঁর সামাজিক
চরিত্রে ‘আদরে নষ্ট হওয়া শিশু’ -ভাবটা একেবারেই নেই। কথাবার্তায় এমন শিশুর
মতো সাদাসিধা একটা আত্মাভিমান যে সেটা বরং মর্ম স্পর্শ করে যায়। কিন্তু সব সময় তিনি
অন্যদের কথা ভাবেন, যেমনটা পশ্চিমা গৃহকর্ত্রী ছাড়া আর কেউ ভাবতে পারে না। সারাদিনরাত
তিনি গান গাইতেন, কথা বলতেন। সারাক্ষণ, হয় খাতির করতে বা খাতির পেতে প্রস্তুত। ডঃ বোসের
এমন খেয়াল রাখতেন যেন তিনিই বোসের মা। দেশের কাজ আর মুক্তির জাতীয় আকাঙ্ক্ষার [‘জাতীয়’ শব্দটা আকাঙ্খাকে শ্লেষাত্মক করে দিচ্ছে! – ব.লে.] মধ্যে সবসময় একটা সংগ্রাম চলে তাঁর
ভিতর। সংক্ষেপে – কখনো কোনো মানুষ,
তার কাজে বা জীবনে কোথাও কেউ কুরুচিপূর্ণ বা অনৈতিক কিছু সন্দেহ করলে এত অসম্ভব রকম
অপমানিত বোধ করে নি, যেমনটা তিনি করেন। কিন্তু এসব সত্ত্বেও, মি. ট্যাগোরের ধরণের পুরুষত্ব
আমাকে আকর্ষণ করে না। বরং ক্রিস্টিনকে আকর্ষিত করে অনেক বেশি।”
রথীন্দ্রনাথের কথার পর পর দুটো উদ্ধৃতি আছে
প্রশান্ত কুমার পালের ‘রবিজীবনী’তে। তাই পুরোটাই নিচ্ছিঃ
“রথীন্দ্রনাথ
তাঁর ডায়ারিতে এই ভ্রমণের তাৎক্ষণিক বিবরণ লিখে রেখেছিলেন, তার কয়েকটি পৃষ্ঠা রবীন্দ্রভবনে রক্ষিত
হয়েছে। এই ডায়ারি থেকে জানা যায়, তাঁরা ২২ আশ্বিন [শনি ৪ Oct]
সন্ধ্যায় গিরিডি ত্যাগ করে পরের দিন বুদ্ধগয়ায় পৌঁছন। সেইদিন
সন্ধ্যায় মন্দির দেখে এসে তিনি লিখেছেন:
‘অন্ধকারের
ভিতর বুদ্ধের মূর্ত্তিটা ভারি impressive
বলে মনে হল। বুদ্ধের সেই শান্ত তপোমূর্ত্তি
মনকে অভিভূত করে দেয়।’ … পরবর্তী
কালে তিনি আরও বিস্তৃতভাবে এই অভিজ্ঞতার স্মৃতি চারণ করেন:
‘তখন অন্ধকার হয়ে এসেছে , মন্দিরের গায়ে গবাক্ষগুলিতে প্রদীপ জ্বেলে দেওয়া হয়েছে। চার দিকে
নিস্তব্ধ; তার মধ্যে কানে এল ওঁ মণি পদ্মে হুঁ — বৌদ্ধমন্ত্রের মৃদুগম্ভীর
ধ্বনির আবর্তন। কয়েকটি জাপানি তীর্থযাত্রী এই মন্ত্র আবৃত্তি করতে করতে মন্দির
প্রদক্ষিণ করছেন; আর প্রতি পদক্ষেপে একটি
করে ধূপ জ্বেলে রেখে দিয়ে যাচ্ছেন। কী শান্ত তাঁদের মূর্তি। কী গভীর তাঁদের
ভক্তি। ইষ্টপূজার কী অনাড়ম্বর প্রণালী। অনতিপূর্বে মন্দিরের ভিতরে বুদ্ধমূর্তির সামনে
মোহান্তের পুরোহিতদের কর্কশ ঢাক ঢোল বাজিয়ে আরতি দেখে এসে ছিলুম। আমাদের মনে এই
কথাটাই জাগল, ভগবান এঁদের মধ্যে কার পূজা খুশি হয়ে গ্রহণ
করলেন? ... অনেক রাত পর্যন্ত জগদীশচন্দ্র, ভগিনী নিবেদিতা ও পিতৃদেব বৌদ্ধধর্ম ও বৌদ্ধ ইতিহাস নিয়ে নিবিষ্ট মনে আলোচনা
করতেন। নিবেদিতা এক-একটি তর্ক তোলেন আর রবীন্দ্রনাথ চেষ্টা করেন তার যথাযোগ্য
সমাধানে পৌঁছতে। আমরা অন্যেরা তাঁদের প্রশ্নোত্তর তর্ক-বিতর্ক মুগ্ধ হয়ে শুনে
যাই। আমার বিশ্বাস, এই বুদ্ধগয়া-সন্দর্শনের ফলে উত্তরকালে
বৌদ্ধধর্ম ও সাহিত্যে পিতৃদেবের অন্তরের আকর্ষণ প্রগাঢ় গভীর হয়ে উঠেছিল।
শান্তিনিকেতনে ফিরে এসে আমাকে তিনি ধম্মপদ আগাগোড়া মুখস্থ করতে দিয়ে ছি লে ন।
পালি পড়াও শুরু হল এবং পিতারই আদেশক্রমে অশ্বঘোষের বুদ্ধচরিত তর্জমার দুঃসাহসে
প্রবৃত্ত হলুম।”
জগদীশচন্দ্র বসু
নীরব বিজ্ঞানসাধক ছিলেন। যদিও প্যাট্রিক গেডেস রচিত তাঁর জীবনীতে একটা পুরো অধ্যায়
আছে ‘হলিডেজ এ্যান্ড পিলগ্রিমেজেস’। তাতে জীবনীকার লিখছেন, “বিয়ের পরপরই তিনি [জগদীশচন্দ্র – ব.লে.] তাঁর যুবতী স্ত্রী-এর সঙ্গে, শুধুমাত্র
ভারতকে দেখা এবং চেনার জন্য, ভারতের অর্থ উপলব্ধি করার জন্য প্রতি বছর দুটো করে ছুটি
নেওয়া শুরু করলেন।” কিন্তু এই ভ্রমণ
বিষয়ে জগদীশচন্দ্রের যে বাংলা লেখাগুলো মুদ্রিত পাচ্ছি তাতে দেশের অন্যান্য অনেক স্থানে
ভ্রমণের বৃত্তান্ত থাকলেও বুদ্ধগয়া ভ্রমণের কোনো বৃত্তান্ত নেই।
আর তারপরে গেডেস যা লিখছেন তা মারাত্মক। দম্পতি ছুটিতে
বেড়াতে বেরিয়ে অনেক অনেক ছবি তুলতেন। সেসব ছবিই বলতে পারত তাঁরা দেশকে কী চোখে দেখতেন।
কিন্তু হায়! একজন নতুন আসা করিৎকর্মা ভৃত্যকে যখন ছবির নিগেটিভগুলো পরিষ্কার করতে বলা
হয়েছিল, তিনি নিগেটিভগুলো ঘষে ঘষে জলে ধুয়ে একেবারেই পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন। গেডেসের
বইয়ের ঐ অধ্যায়ে শুধু এটুকু উল্লেখিত আছে, “বুধগয়ায়, যে পিপল গাছের নিচে বুদ্ধ তাঁর উদ্ভাসন লাভ করেছিলেন, তারই
প্রতিনিধি সন্ততির তলায় [এই দম্পতি - ব.লে.] সেখানকার মোহান্তের অতিথি হয়ে ছুটি অতিবাহিত
করেছিলেন; মোহান্তের কথাবার্তা
বৌদ্ধ ধর্মের সারমর্মের প্রতি তাঁদের অন্তর্দৃষ্টিতে বৃদ্ধি ঘটিয়েছিল” … ইত্যাদি ইত্যাদি।
আগেই দেখেছি রবীন্দ্রনাথের
মন ভালো ছিল না। নানান ব্যক্তিগত দুঃখ কষ্ট তার কারণ নয়। কবিজীবন তো সেগুলোকে প্রতিনিয়ত
অতিক্রম করেই গড়ে ওঠে। কিন্তু অতিক্রম করবেন কিসের জোরে? কবিতার জোরে। আর কবিতা লেখা
বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ‘শিবাজি উৎসব’ লিখেও ভিতরে মুক্তির স্বাদ না পাওয়াটারও একটা
নেতিবাচক প্রভাব ছিল। যেমনটা রবীন্দ্র জীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, “শিবাজী-উৎসবের জন্য কবিতা লিখিলেন বটে, কিন্তু
অন্তরে দ্বিধা থাকিয়া গেল। এই উৎসবের মধ্যে তো মনুষ্যত্বের যথার্থ সুর দ্বনিত হইতেছে
না।”
ভিতরে একটা চাপ ছিল
সম্ভবত। স্ত্রী গেলেন, রানী (রেণুকা) গেল … কিসে পার করবেন এর শূন্যতা? ১৯১১ সালের অক্টোবর মাসেই (তারিখ নেই)
পুত্রবধু প্রতিমা দেবীকে চিঠিতে লিখছেন, “বৌমা, আমি তোমাদের সকলকে অনেক দুঃখ দিয়েছি এবং দুঃখ পেয়েছি। আমার
মনের মধ্যে কোথা থেকে একটা ঘন অন্ধকার নেমে এসেছে। কিন্তু সেটা থাকবে না।”
ঠিক তার পরের চিঠিতেই
অবশ্য বুদ্ধগয়া যাওয়ারও খবর দেওয়া আছে, “বৌমা, … কিছু দিন থেকে মনে
মনে ভাবছিলুম বুধগয়ায় যাব এমন সময় হঠাৎ দেখি নগেন মীরারাও সেখানে যাবার আয়োজন করচে
তাই এক সঙ্গে যাওয়াই ঠিক করেছি।”
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় রচিত জীবনীটি অনুসরণ
করলে দেখা যায় কবিতা না লিখতে পারার মনখারাপটা কাটতে এক বছর লেগেছিল। জীবনীকার নিজেও
অঙ্গুলি নির্দেশ করেন যে পরের বছর আষাঢ় মাসে কয়েকটি জাপানি কবিতার অনুবাদ করার মধ্যে
দিয়ে মনটা চাঙ্গা হয়, এবং কবিতা ফিরে আসে, “কাব্যলক্ষ্মীর এই সামান্য সোনার কাঠির স্পর্শে কবিজীবনে নূতন সুর
ধ্বনিয়া উঠিল। … এই বৎসরেই খেয়ার
কবিতাগুলি লিখিত (১৩১২ আষাঢ় – ১৩১৩ জৈষ্ঠ্)।
অনেকটা প্রসঙ্গান্তর
হয়ে গেল। বুদ্ধগয়া থেকে ফেরার দিন তাঁরা গয়ায় এসে একটি সভায় অংশগ্রহণ করেন। বিবেকানন্দ
ইন্সটিট্যুটের উদ্বোধন করেন নিবেদিতা। তিনিই বক্তব্য রাখেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদ
অনুযায়ী বাকি সকলে উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু তাঁরা বক্তব্য রেখেছিলেন এমনটা মনে হয় না।
প্রশান্ত কুমার পালের জীবনী যা বলে তাতে দেখা যায় নিবেদিতা এবং রথীন্দ্রনাথের বয়ানে
তারিখের তফাৎ আছে। নিবেদিতা বলেন ১৩ তারিখ, রথীন্দ্রনাথ বলেন ১২।
লেখাটার উপসংহারে
বরং আবার ফিরে আসি নিবেদিতায়। কেননা তাঁর প্রসঙ্গেই অনেকটা বেশি করে পাওয়া যায় এই মনীষীদের
ঐতিহাসিক বুদ্ধগয়া ভ্রমণের বর্ণনা। নিচের গদ্যাংশটি নভেম্বর ১৯১১-র মডার্ন রিভিউ পত্রিকা
থেকে কালেক্টেড ওয়র্ক্স অফ সিস্টার নিবেদিতা-র ষষ্ঠ খণ্ডে ‘ইন বোধগয়া’ শিরোনামে সংকলিত হয়েছে।
“১৯০৪ সালে বোধগয়া
ভ্রমণকালে তিনি তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে মন্দিরের ছায়ায় বহুক্ষণ নীরবে বসে থাকতেন। মাথার
ওপরে শরতের আকাশের স্বচ্ছ অন্ধকারে তারারা ঝিলমিল করত। শিখা নামানো লন্ঠনগুলো দৃষ্টির
বাইরে ঝোপঝাড়ে সরিয়ে দেওয়া হতো। মনে হতো তিনি অতীতে প্রবেশ করছেন। কিছুক্ষণ পর, ঐতিহাসিক
সত্যের বিস্ময়কর স্ব-লব্ধ বোধের মাধ্যমে তিনি বৌদ্ধ যুগের বিষয়ে বলতেন। [যা বলতেন তা
অনেকের কাছে সমর্থনযোগ্য না-ও হতে পারে আর সেটা এখানে অপ্রাসঙ্গিক। আমি শুধু পরিবেশটা
দেখাতে চাইছি – ব.লে.]
…
“বোধগয়া থেকে বিদায় নেওয়ার সময় তিনি ভেঙে পড়লেন এবং সারা রাত নিজের
ঘরে কাঁদলেন। বলছিলেন, ‘আমরা অসফল হয়েছি।
দেশের ঘুম ভাঙেনি। পুনরুজ্জীবন ঘটেনি তার। লোকে আমার কথা শোনে আর নিজেদের পুরোনো পথেই
চলতে থাকে। আমরা কিছুই করতে পারিনি। প্রকৃত ভারতাত্মা যা এককালে ভারতকে বিশ্বের গৌরব
এবং এশিয়ার হৃদয় করে তুলেছিল, পুনরুজ্জীবিত হয়নি। কবে এই জাতি নিজের মহান ঐতিহ্য সম্পর্কে
সচেতন হবে? মানুষের ভাবনার এবং সভ্যতার বিকাশে সেই বিশিষ্ট স্থানটি সম্পর্কে সচেতন
হবে যে স্থানে তারা আগে ছিল? কবে সেই জীবন, সেই আত্মা [জীবনসত্য অর্থে – ব.লে.] ফিরে আসবে?”
এসেছে প্রণম্য মনীষীগণ!
আপনারাই তো তাঁর বনিয়াদ নির্মাণ করে গেছেন।
অনেকটা এসেছে। ভারতসত্য কী, তারই তো লড়াই চলছে সারা দেশ জুড়ে!
বুদ্ধগয়া ভ্রমণের কয়েক মাস পর ওই যে কবিতার
ধারায় ভাসলেন কবি, দু’বছরের মধ্যেই তো
বেরুল ‘খেয়া’। আর বইটি জগদীশচন্দ্রকে উৎসর্গ করলেন যে কবিতা
দিয়ে, তাতে লিখলেনঃ
“সত্য যেথা কিছু আছে
বিশ্ব সেথা রয় …”
২৯.৩.২৬

