Saturday, July 25, 2026

সার্জাপুর জার্নাল - ১

এ শহরটা আমাদের নয়
তবে কখনো সেটা বুঝিয়ে দেওয়া নেই
এত বেশি কাজে ব্যস্ত মানুষ
নিজেদেরকে ঈষৎ দূর থেকে দেখছি
 
বাইরের দিক; রাত প্রায় এগারোটায়
কিছুটা অন্ধকার রাস্তা মাঝে মাঝে
গা ঘেঁষে বেরিয়ে যাচ্ছে বাস, ডাম্পার
রাস্তা ছেড়ে হাঁটছে এক বয়স্ক দম্পতি
 
এই তারা এক জীর্ণ বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ালো
মোবাইলে কথা বলছে কারো সাথে
আজ মনটা হাল্কা, দেশে যুবরা উদ্দীপিত
মন্ত্রী ইস্তফা দিয়েছে তাদের দাবিতে
 
খুব সাবধানে হাঁটছি, পাশাপাশি জায়গা নেই
সামনে-পেছনে, জলকাদা-আবর্জনা এড়িয়ে
খুব কম সুযোগ হয় এভাবে একসাথে একা
চায়ের তলানির চিয়াবীজগুলো প্রথম খেলে আ

২৬.৭.২৬

Tuesday, July 21, 2026

২০শে জুলাই ২০২৬

নতুনের বার্তা আনছে রক্তাক্ত যুবমুখ
শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল, এবারে ভারত!
পাকিস্তানও পিছিয়ে থাকবে না নিশ্চয়ই;
উপমহাদ্বীপ ফিরে পাক নিজের ভূগোল।
 
সামান্য তিনটে হক শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রোজগার;
রাষ্ট্র-বদলের নয়, বেঁচেবর্তে গোলামির!
সেটুকুতেও নারাজ লুটেরা পূঁজির চর,
ফিরিঙ্গি পাঁকের দাঙ্গাবাজ রামনামীগুলো!
 
জুলাইয়ের মেঘলা আকাশ, ভেজা রাজপথ।
এমাসেরই শুরুতে শহীদ হন পীর আলি।
জলকাদায় থৈ থৈ হয় শহরটা আমার।
চিন্তা হয়, বন্যা-খরা রাজ্যে ঘনাবে কেমন।
 
ওদিকে রাজধানীতে শাসকের ধুন্ধুমার,
একহাতে পাজামার ফিতে, আরহাতে লাঠি।
শাহীনবাগে নারীরা, আন্দোলিত কৃষকেরা,
এবারে যুবরা কোথায়? ক্রোনোলজি মাস্টার?
 
২২.৭.২৬ 

Sunday, July 19, 2026

ইস্তফা

ইস্তফার এটাই যে মুশকিল।
কী করে দিই?
একটা হলেই আরেকটা।
শেষ তো নেই কেলোর কীর্তির,
আর কীর্তিমানদের!
সবারই পিছনে বধ্যভূমি;
কারোরটায় এখনো লোপাটের
জোগাড়যন্তরে ব্যস্ত চেলারা
 
রথযাত্রার দিনই সেই আবার
সাদাপর্দা টাঙিয়ে খুন করতে হল
দেশের যৌবনের উদ্যম, বিবেক!
জয় জগন্নাথঅ! জগন্নাথঅ!
একটু দেখ সামী!
আকাশে মেঘ।
রথের পাঁপর ভাজছে মালব্যের দল।
 
একটু দেখ!
বাকিটুকু দেখবে শাহজির ব্রিফকেস।
 
১৯.৭.২৬

Thursday, July 9, 2026

বারো বছর

আপন-খোয়ানো লোকটার মুঠোয়
খুনির শোকবার্তা বেজে ওঠা ফোন যেন
রোজ খবরে আমাদের সরকারটির
অমায়িক হাস্যমুখ
তার লাস্য শিরোনামগুলোয়
 
সারাক্ষণ সশংকিত থাকি
আবার আমাদের এ দেশটাকে না এক
নতুন দুর্বৃত্তায়নে জড়িয়ে নেয়
এ সরকার ও তার ঘাঘু লোকলস্কর
যেভাবেই হোক,
নির্বাচিত বলে কথা!
 
কোনো হত্যাকারীকে,
কোনো ধর্ষক, কোনো শিশুঘাতক,
কোনো শূদ্র- বা মুসলমান- বা
ক্রিশ্চান-বা বৌদ্ধ-উৎপীড়ককে না
মালা পরায়, আইন থেকে বাঁচায়,
জনপ্রতিনিধি বানিয়ে নেয়
 
অপরাধ আড়াল করতে
এনকাউন্টারে ঝাঁপিয়ে পড়ছে পুলিস
দ্রুত বদলে যাচ্ছে শিশুদের পাঠ্যসূচি,
স্বাধীনতাচর্চা থেকে দাসত্বচর্চায়
 
জোনাকির ঢেউয়ের মতন
মৃত ও উৎপীড়িতের চোখের মিছিল;
ওদের উন্নয়নী কালো হাওয়ায়
বারো বছর ধরে বাড়ছে
 
৯.৭.২৬

Sunday, June 21, 2026

ছোটোবেলার শহর

তোমার কাছেই যাচ্ছি বন্ধু এত দিনের পর,
সঙ্গে দুলাইন নতুন লেখা থাকবে না?
ছোটোবেলার সবকিছুতে হাতেখড়ির সখা
সফরপথের এটুকু মান রাখবে না?
তোমার কাছে যেতে পড়ছে অনেক নতুন রোদ,
সে রোদের কিছুটা তো গল্পে ছিল,
গাছগাছালির মাঝে মাঝে নতুন ঘরের দাওয়া,
মানুষগুলোর হ্রস্ব ছায়া তাকাচ্ছিল।
এই সফরপথটাই যে সেদিন দিল সরকার,
তিনটে জেলার বুড়ি ছোঁওয়া ট্রেন।
নতুন নতুন সহযাত্রীর দুপুরভর কচকচানি,
কুশি-প্রাঙণের লেখকটি জানতেন। 
তোমারও কি পাড়াগুলো আগের মতন আছে?
হাইওয়েটার গজরানি দিনরাতে।  
ভোরের আলোয় জলে খেলত সার্কাসের হাতি, 
বাবার হাতটা থাকত আমার হাতে।
এখন তো আর সেসব নেই, তুমিও বদলেছ,
ঠারে ঠারে কাজের রিশ্‌তা সব। 
তবুও নতুন বোল খুঁজছি ফিরে যাওয়ার সুরে,
খেলাশেষের সন্ধ্যার বৈভব।

২১.৬.২৬ 

Wednesday, June 17, 2026

হত্যার অস্ত্র

হত্যার অস্ত্রটা কি পেয়েছেন ধর্মাবতার?
সাজিয়ে যে সাক্ষ্যপ্রমাণ টেবিলে আপনার
 
রাখা আছে কাট্টা, তরোয়াল বিভিন্ন জিনিষ,
নিরীহ উপকরণ; আসল তো তার শিস,    
 
যার ভোজসভায় কাল রাত্রে গিয়েছিলেন,
ছবি টবি হল, বিশ্রম্ভালাপে যোগা, জিনসেং
 
সুযোগ্য সম্মান আপনার, অবসরোত্তর
তারি যে শিসটি হয়ে পাশবতার মোচড়,
 
ইতিহাসের পায়ের কাঁচা জখমে বাজছে,
সনাতনী হিংসার ক্রিমিকীটগুলো জাগছে,
 
আপনাদের আইন-ফাইনে ঢোকাচ্ছে ঘুণ!
মানুষের মুঠোয় স্বাধীনতার নষ্টভ্রুণ।
 
অস্ত্রটা মিলর্ড, আদিষ্ট প্রতিবর্ত মগজে –
ওই শিসটাই; বেজেছিল আপনারো ভোজে। 
 
১৭.৬.২৬

Monday, June 8, 2026

কমরেড ইজরাইল

আজ ৫ই নভেম্বর কমরেড ইজরাইলের জন্মদিন। তাঁকে স্মরণ করার ব্যক্তিগত কারণ এই যে ১৯৯৭ সালে তাঁর হাতেই আমার কবিতার বই সমুদ্র দুভাবে ডাকের আবরণ উন্মোচিত হয়েছিল। তবে সামাজিক কারণটা তার চেয়ে অনেক বড়। তিনি শ্রমিক শ্রেণীর লেখক। শ্রমিক পরিবারেই জন্ম, শ্রমিক হিসেবেই শুরু করেছিলেন জীবন, প্রথাগত শিক্ষায় খুব বেশি দূর এগোতে পারেন নি, তবে কারুর না কারুর সাহায্য, সান্নিধ্য, গুরুমন্ত্র ও প্রশিক্ষণে লেখক জীবন শুরু করতে পেরেছিলেন।

তাঁর সঙ্গে আমার মোটমাট দেখা মাত্র তিনবার। চারবার হয়ে থাকলেও চতুর্থটা মনে নেই। প্রথম আলাপ পাটনায়। সালটা বোধহয় ১৯৯৪, সিআইটিইউ-এর সর্বভারতীয় সম্মেলন উপলক্ষে। আমি ভলান্টিয়ারে ছিলাম। কোথাও কোনো একটা ঘরে, সে-ঘরে সেসময় পাটনার খ্যাতনামা ডাক্তার এ কে দত্তও ছিলেন, বোধহয় কবি আলোক ধন্বাই আমাকে কমরেড ইজরাইলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাঁর নম্র ব্যক্তিত্বে খুবই আকর্ষণ অনুভব করেছিলাম।

তাই, তারপর কোনো একটা কাজে যখন কলকাতায় গেলাম, তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে, স্বাধীনতার দপ্তরে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করব বলে। সেখানে খবর পেলাম তিনি নিজের বাসস্থানে চলে গেছেন। পাশেই কোথাও একটা হোস্টেল বা মেসের বাড়ি ছিল। তাতে কয়েক (চার? পাঁচ?) তলা (বোধহয় লিফটে) উঠে একটা ছোট্টো ঘরে পৌঁছোলাম। বাঁদিকের আর ডানদিকের দেয়ালে সাঁটিয়ে দুটো সিঙ্গল খাটের বিছানা। মাঝখানে, সামনের জানলা ঘেঁষে একটা (বা হয়তো ছোটো ছোটো দুটো) টেবল আর একটা চেয়ার। কমরেড ইজরাইল বাঁদিকের বিছানায় ছিলেন। আর

ডানদিকের বিছানায় ছিলেন কমরেড ইন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়। তাঁকে চিনতাম। কেননা কিছুদিন আগেই, অর্থাৎ ১৯৯৪এর ডিসেম্বরে, কলকাতা বাংলা সাহিত্য সম্মেলন ১৪০১এ বিহারের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম। বস্তুতঃ, পূর্ণেন্দু মুখোপাধ্যায় তাঁর প্রাপ্য নিমন্ত্রণটা আমাকে পাস-অন করেছিলেন। তাই ইন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের স্বাক্ষরিত নিমন্ত্রণপত্র পেয়েছিলাম এবং জানতাম যে তিনি পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক।

সেই সাক্ষাতে কমরেড ইজরাইল আমাকে হাতে লেখা একটি কবিতা দিলেন। মহারাষ্ট্র বিধানসভার নাগপুর অধিবেশন উপলক্ষে স্থানীয় আদিবাসীদের মিছিল, পুলিসের আক্রমণে ছত্রভঙ্গ হয়েছিল এবং তাতে বহু মানুষ পদপিষ্ট হয়ে মারা যান। সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ত্রিপুরার তৎকালীন সংস্কৃতি মন্ত্রী কবি অনিল সরকার একটি কবিতা লিখে পাঠিয়েছিলেন। ইজরায়েল আমাকে দিয়ে বললেন, আলোককে দিয়ে হিন্দিতে অনুবাদ করিয়ে আমাকে পাঠিয়ে দিন, স্বাধীনতায় দেব। পাটনায় ফিরে বহুবার বললাম আলোকজিকে। যা ওনার স্বভাব, এধরণের কোনো কাজে বসানো কঠিন। শেষে, আমিই যেমন পারি, অনুবাদ করে পাঠিয়ে দিলাম। ইজরায়েলজিকে লিখে দিলাম, আলোক ধন্বার নয়, আমার করা, আপনি সেভাবেই দেখবেন। জানি না, স্বাধীনতায় ছাপা হয়েছিল কিনা।

তারপরের দেখার কথা তো এর আগে ফেসবুকে ছবিসুদ্ধু পোস্ট করেছি। ১৯৯৭ সাল। কবি দীপন মিত্র, কবি অনির্বাণ দত্ত এবং আরো অনেকের উদ্যোগে পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সঙ্ঘের স্থানীয় (কলকাতা?) শাখার তরফ থেকে আমার সমুদ্র দুভাবে ডাকের আবরণ উন্মোচন অনুষ্ঠান। একমাত্র আলোক ধন্বাই তাতে ছিলেন না। তিনি দিল্লিতে। নইলে, দীপন ছাড়াও নীলুদি, তাঁর ছেলে সঞ্জয়, শাহিদ, একরাম, কলকাতা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আরো অন্যান্য পরিচিত বয়স্ক এবং সমবয়সী কমরেড ! কমরেড ইন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়, কমরেড জিয়াদ আলি । সেই বোধহয় ইজরাইলের সঙ্গে শেষ দেখা।

তবে হ্যাঁ, চতুর্থ দেখার একটা অন্য গল্প আছে। তখন নীলুদি, কমরেড নলিনী তিওয়ারি (জনবাদী মহিলা সমিতি, বিহারের রাজ্য কোষাধ্যক্ষ) বাংলা ও রুশীয় ভাষা শিখে মনের আনন্দে অনুবাদ করে চলেছেন। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের বিদ্যুৎলতা করলেন, সোমেন চন্দের বেশ কয়েকটি গল্পের অনুবাদ করলেন, আমার ক্যালেন্ডার করলেন। ব্রেখটের গ্যালিলিওকে সংক্ষিপ্ত একাঙ্ক রূপ দিয়েছিলেন প্রবীর দত্ত। তাঁর লিখিত অনুমতি নিয়ে অনুবাদ করলেন গ্যালিলিও। জনবাদী সাংস্কৃতিক মোর্চার পাটনা শাখা প্রেরণার উদ্যমে সে নাটক অভিনীত হল বেশ কয়েকবার এবং যথেষ্ট জনপ্রিয় হল। তারপরই খবর পেলাম, কলকাতায় অরুণ মুখোপাধ্যায় ধরেছেন ইজরাইলের উপন্যাস রোশনরোশন আমার পড়া আর অরুণ মুখোপাধ্যায়ের জগন্নাথ আমার দেখা। লু শুনের ট্রু স্টোরি অফ আহ কিউও পড়া। নীলুদিকে বললাম,অনুবাদটা ধরুন, জমে যাবে। বাংলা নাট্যরূপের পাণ্ডুলিপি এবং অনুমতিপত্র আনিয়ে অনুবাদ শুরু করে দিলেন। অনুবাদ হল। কিন্তু জমল আর না। কেননা, ততদিনে প্রেরণা সাময়িকভাবে উদ্যমহীন হয়ে পড়েছিল। ভালো ভালো বেশ কয়েকটি ছেলে চলে গেছে মুম্বই, সিনেমায় যাবে।

নীলুদি চলে যাওয়ার কিছুদিন আগেই তাঁর পান্ডুলিপিগুলো আনিয়ে ছাপানোর কাজ শুরু করেছিলাম। কিন্তু তিনি হঠাৎ আমাকে আইসক্রিম না খাইয়ে চলে যাওয়ায় মুদ্রিত রোশনটা আর দেখাতে পারলাম না।