Monday, January 25, 2021

দিল্লীর প্রবেশপথগুলোয়

কৃষকেরা তলাচ্ছিল মৃত্যুর পল্বলে
গত বছর চেনাল পথ রক্ত-পায়ে চলে
আজ তাদের বাড়ছে ভীড় বাঁচার অমলে

চারাচ্ছে শাসক, দেশে হিংসাধর্ম-স্রাব
মারছে মানুষ মাথায় দিয়ে পাষন্ডতার আব
ছ’বছরে হত্যার তারা লুকোচ্ছে হিসাব
 
কৃষকই আটকাল তাদের, শ্রমিক আছে সঙ্গে
তন্ত্রপ্রধানেরা ভয়ে ভুল করছেন রঙ্গে
মাঝমাঠে ভারত-মাই হাসছেন ভ্রুভঙ্গে   

কোথায় ছিলে আনন্দ?
আগেও তো পুহিয়েছি রোদ এত শীতে
বন্ধু-ভীড়ে গা-ঘেঁসেছি, কলহে-পীরিতে
পাইনি এমন ছন্দ!

ব্যাঙ্গালোর
৩.১.২১



 

বি এম দাস রোড

ভেষজ কারখানা থেকে ছড়ানো ঝাঁজগন্ধ যেমন, ঘরের নিচু ছাতটাও
সয়ে গিয়েছিল; রেললাইনের ওপারের নতুন পাড়ার মানুষ, মজেছিলাম
রাস্তাটার বাঙালি নামে, আমাদের ঘরবাঁধার বাঙালিয়ানায় – চারদিকে
কোচিং, স্কুল, কলেজের যুবমুখ, পাশেই মুসলমানি মোহল্লায়
রোজার সন্ধ্যার শির-চা, পুরোনো বন্ধুদের স্মৃতি, দুয়া-সালাম ...
ভালো লাগার সবকিছুই কাছে কাছে – ডিওয়াইএফের অফিসঘরটায়
বসে গান গাওয়া, রাহুল পাঠচক্র, ফুটবলে যুবপ্রচার কলেজের মাঠে!

দুচার বছরের থাকায় কত কি দেখলাম বল! ভুমিকম্প, রামশিলাদাঙ্গা,
বাবরিপতন, কার্ফ্যু ... ওদিকে ঘাড়ে ভুয়ো মামলার খাঁড়া, ঝঞ্ঝাট ...
তার মাঝেই রাতে নিজের রক্ত আবার ব্লাডব্যাঙ্কে থলেয় ভরে সাইকেলে
তিন মাইল তোমার প্রসূতিশয্যায় পৌঁছোলাম; তোমায় দেওয়া হল –
প্রথম জানলাম দুজনের রক্তের গ্রুপেও মিল – দেখছিলাম সারারাত,
জ্ঞানে ফিরে, কন্যার জন্মে প্রসন্ন ঘামবিন্দু তোমার উত্তপ্ত কপালের!

এখন আর আমরা নেই। কিন্তু পাড়াটা রয়েছে জানো? উন্নয়নে চাপা।
গলির ভিতরে আরো সরু গলি খুলে গেছে, নালার ওপরে পাটাতন!
সে কারখানা নেই কিন্তু ভেষজ ঝাঁজ আরো অসহ্য ভিতরগলির পচা ইঁটে।
সে রোদটাও দুপুরে একবার নামে মাঝগলি অব্দি ছড়ানো সাবানফেনায়।
পৃথিবী সমতল নয়। কোণ-ঠাসলে পড়বেনা জীবনাংশ। শাসকের ভ্রান্তি।

 

ব্যাঙ্গালোর
২৮.১২.২০



 

ঈশ্বর

আজ যে কিছুই করিনি! ভাত পাব, ঈশ্বর?
ভালো হত, আমার এমন কথায়
কান না দিয়ে বেরোতে ঘর থেকে
কুড়ুল কাঁধে, গুঁজতে বনে ঝর্ণামুখে পাথর।

আমার সব কাজের ছকে সারাটা দিন ঘুরে
বাড়িয়ে তুলতে বাধা; আমার রাগে
হাসতেওনা, নিরেট, যেন জন্তু আমি,  
ঘ্যানঘ্যানানি না থামালে ঢিল মারতে ছুঁড়ে।

মুশকিল যে তোমায় গড়েছিলাম মনের মত।
যাতে পাথর সরাতে রাতগুলো
না মনে হয় নেকড়ের ঘেরাবন্দি
ঝর্ণামুখে ঝিমোলে, ইঁদুর না চাটে ক্ষত।  

গুরু ছিলে, বন্ধু ছিলে, হলে রাজার ছায়া!
রাজার আদত শত্রু আমি; যা পারি,
পাথর খুঁড়ি। কুড়ুল কাঁধে বেরোই।
তবু স্মৃতি – বিবর্ণ এক বন্ধুত্বের মায়া।

ব্যাঙ্গালোর
২১.১২,২০



অবাক কান্ড

শাসকেরা লুকোচ্ছিল ইতিহাসের রোদ।
সরকারি লোক লাগিয়ে বশ্যতার কালো
পর্দাগুলো টাঙাচ্ছিল সত্যের জানলায়।
যাতে দেশের ছেলেমেয়ে জানতেও না পায়
ভুগোল নয়, ধর্ম নয়, রাজার ধ্বজাও নয়,
দেশ গড়ে অন্যায়ের দীর্ঘ প্রতিরোধ।

এমন হল, বর্তমানই ভাঙছে ঝুঠের মৌজ।
ইতিহাসের পর্দা দিচ্ছে খুলে।
ছেলেমেয়ে দেখছে চোখ মেলে –
অবাক কান্ড! বন্ধ রাজধানী?
তাহলে আয়, এখানেই ব্রেক টানি –
ঢোকার মুখেই তাঁবু তুলুক লাঙলবাহীর ফৌজ!

হাড়কাঁপানো সকালে এই ফৌজ ঘিরে বাড়ছে দেশের আশ!
হাতের গরম, কথার মরম, রুটির নরম সাঝা করছে বসে, 
ভালো থাকতে চাওয়া পৃথ্বীর যুদ্ধনিঃশ্বাস।

ব্যাঙ্গালোর
২১.১২.২০



মাঝরোদ্দুর

ভাষার কথা যদি বলো,
মা আমার বাংলা তবে,
হিন্দিও ধাই মা।
মাঝরোদ্দুর আমার খেলা,
একটেরে ছায়ায় গিয়ে
ছন্দই পাই না ।
 
মুখে লেথোই ধড়িবাজির
তিলকধারী সরকারি
ভাষার দাদাগিরি।
কিন্তু মাথায় থাকে পাড়ার
গলিতে ধাইমায়েরও হাত,
পথ দাপিয়ে ফিরি।
 
মাঝরোদের কুঁয়োতলায় –
বাল্টিটা ওই ডুবো ডুবো –
পাঠাচ্ছে ঢুপ-ঢুপ?
মাতৃভাষায় খুঁজি বরং
কার বুকে বাজছে আর
কার বুকটা চুপ!
 
জলই আমার দুই মা,
যখন যেমন শব্দ, লিপির
জুড়ি করতল –
প্রতিধ্বনি শুনি আমার
ডাকের – খাই কুঁয়োর মিঠে,
কেঁপে ওঠা জল।

ব্যাঙ্গালোর
২৫.১২.২০


 

ভাষাপ্রসঙ্গ

ট্র্যাডিশন বাঁচিয়ে রাখব স্যার!
দু’মুঠো পাটশাক, স্নেহের ছাত্রটিকে দিতে
চড়া রোদ্দুরে হাঁকাব সাইকেল –
পেরুব খানাখন্দ, অশথতলা
যা আমাদের বয়সকালে হবে আরো একপ্রস্থ দমছুট জীবনধারণ।

ট্র্যাডিশন এমনিতেও বড় শক্ত জিনিষ –
মনে রাখে পুরোনো ছোবল
প্রণয়ের পাবকস্পর্শ অবিনাশী
বৃষ্টিতে নীরবে মুছে যাওয়ার স্বচ্ছতা
বাদাম কেনার এক ছটাক কার্বাইডের আলো
বিশ্বাসের
হয়ে ওঠা ভারতবর্ষ – জননী –
সুনীল জলধি হতে, বিপর্যস্ত অবেলায়
এবং লেগে থাকা এবং অভিমানের
হিমশক্তি ঢেকে রাখা কাজের গরম।

নতুন লোহার গেটে জং ধরেছে পুরোনো বৃষ্টিতে;
আপনার প্রজন্মের সেই তেজীয়ান
দিদিটি, দেখছি বয়সের ভারে ঝুঁকে
তবু একাই এক কেয়ারি ক্রিসান্থিমামে একশ ...
নবজাগরণ! র‍্যাডিকাল মনন!
স্মরণের ভিত্তিচিত্রে জনমনে উদ্বীক্ষণ!
গিয়ে দাঁড়াচ্ছি নতুন মুখ, ঈষৎ সন্দেহপ্রবণ।

ট্র্যাডিশন বাঁচিয়ে রাখব স্যার !
লিখব উপচে পড়া প্রায় হিজিবিজি পোস্টকার্ড
সংগঠন ব্যক্তিমন মিলিয়ে মিশিয়ে,
উল্টো করে লেখা নিজের বাতগ্রস্ত হাঁটুর কুশল,
ছাপিয়ে ভাঙাচোরা লাইনে আরো একটি কাজের নির্দেশ,

পুরো না হলে মানুষমুড়িয়ায়
গিয়ে নিজেই দেখব,
শক্ত ঢেলা ভাতের সাথে ভাষাও কিভাবে মরিয়া হয়ে লড়ছে;
পঁচিশ বছর পর
পুরোনো কাঁঠালগাছ পেরিয়ে ডাক দেব –
‘রামনাথ!
শব্দে আছ না ব্রহ্মে?
স্কুলটা রয়েছে ! রয়েছে কিচিরমিচির শিশুদের !
এস করি রৌপ্য নাকি স্বর্ণজয়ন্তী উৎসব,
অভাবের
এবং অবশ্যই, স্বভাবেরও।”

 

৩.২.২০০০



বিবেকানন্দ পথ

শিকাগোয় শূন্যের নিচে সকালে
বিবেকানন্দ পথের সামনে দাঁড়িয়ে ওই গাইডের অজ্ঞতায়
মুচকি হেসে আপনি চুপ থাকতে পারতেন ডাক্তার এস.কে.সিং ।

শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কম্পানির বাস ।
বসে তিরিশটি দেশের চিকিৎসক প্রতিনিধি ।
আপনিও দেশছাড়া সাতাশটা বছর
এবং কার কী আসে যায়
যদি উনিশ শতকের শেষের এক ভারতসাধক
চিত্রিত হন আজকের দালাল বণিক তান্ডবের আদিপুরূষ ?
 
তবু কিছু সেদিন চুপ থাকতে দেয়নি আপনাকে ।
চলমান বাসে রীতিমত বক্তৃতা দিয়ে ফেললেন জ্বালাময়ী !
আর শতাব্দীশেষে, সেদিনের ওই ঘটনা
পাটনায়, ফেব্রুয়ারীর রাতে আমায় শোনালেন ।
 
অস্থির ! এখনো অস্থির – নিজের কাছে সৎ থাকতে অস্থির !
অভিনন্দন !
এমনই থাকুন, কমরেড !
 
কী বিড়ম্বনা, তাই না ?
স্বামীজী ধর্মকথা এমন বললেন যে ভারতের বাণী হল !
আর এখন, বণিক তান্ডবের দালালেরাভারতকথায় খুনে, 
বিদ্বেষী এক ধর্ম গড়ে তুলছে !
স্বামীজী দেশের সাধুদের শিক্ষার কাজে লাগাবেন, ভেবেছিলেন।
এরা শিক্ষাকে লাগিয়ে দিচ্ছে জোচ্চোর সাধুদের সেবায় !

স্বামীজী দেখছেন – কন্যাকুমারিতে, সুনামির ঢেউ খেতে খেতেও
দেখছিলেন – তাঁর ভরসা আছে এ দেশটায় !
এখন তো আর একা নন, প্রাচীন ঋষিকবি থিরুবল্লুবর
তাঁর পাশে মেঘ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে নজর রাখছেন –
নাগেরকোয়েল, মাদুরাই হয়ে হিমালয় অব্দি !
 
মুচকি হাসলেন নাকি তিনি, স্বামীজির দিকে ঘুরে তাকিয়ে ?
“তুমিও বুঝেছিলে আমার কথা –
যে বস্তু মৃত্যুর দিন অনশ্বর সখা হইয়া তোমার সঙ্গী হইবে সেই বস্তুই ধর্ম ...”
স্বামীজি দুহাত জোড় করে প্রণাম করলেন, সমুদ্র
ঝিকিয়ে উঠল !      

৪-৮-২০০৩/ পুনর্লিখন, ব্যাঙ্গালোর ৪.১.২১