Saturday, March 20, 2021

হাইওয়ের পেট্রল পাম্প

সামনে খালি জমি অনেকখানি।
আলোকিত কংক্রিট ভরে ধুলো সময় পায়
বড় চক্কর কেটে ওড়ার।
 
একটা বাস এসে থামে। ভিতরে, 
ভিডিও পর্দায়
রাজতন্ত্রের প্রিভি-পার্স বেঁচে থাকে গণতন্ত্রের
উদাত্ত ঢিশুমঢিশুমে এবং 'পথে এসে বাছা'র 
বিনোদনী ডাকে
বিয়ের নাচে বদলে যায় উপজাতি ও কৃষক বিদ্রোহ!

পাম্পে মিটারের দ্রুতগতি আভাস দেয় দূরের 
পাহাড় পেরিয়ে কতশত মাইল
চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ হবে রক্তে।

তারপর আবার আলোকিত কংক্রিট,
মোবিলের দাগ লাগা হিপপকেটে খুচরো ফুর্তি ও 
ছোপধরা বাঁচা;
খাজাঞ্চির দেরাজে বয়স্ক নগ্নিকার ক্লান্ত লাস্য।



একটি শিশুর মৃত্যু

যখন চলে গেল, মাটিতে শোয়ানো তার শরীর
ভোরের আলোয় এত শান্ত, এত মননশীল, যেন শিক্ষক
এখুনি মৃদু হেসে সময়ের সহজ ও ঘৃণ্য সত্যগুলো বলবেন।

তার বিষয়ে এখন যখন কথা বলছি নিচু স্বরে,
শোকস্তব্ধ কালরাত্রে তার দুষ্টুমিগুলোই
এমনভাবে বলছি যেন এগুলো তার
মূল্যবান অবদান ছিল জীবনকে দেওয়ার,
সে জেনে বুঝে দিত, দেওয়ার কাজ শেষে
চলে গেছে নির্দিষ্ট সময়ে।

যেন ঈশ্বরের অবতার ছিল!
আর সত্যিই তো তাই সে, এই মুহূর্তে যখন
নরকের অক্ষম গোলাম ছাড়া কিছুই আমরা নই।


পুনরায় একটি শিশুর মৃত্যু

গাছের ঝুরমুটের ফাঁকে কাল দেখা গেছিল নীলাভ
ভোরের প্রথম নদী ও পালতোলা এক নৌকো -
খামের ভিতর থেকে উঁকি দেয়া অক্ষর, কোনো চিঠির

এ ছবি লিখিনি যার জন্য দাঁড়িয়ে থেকে সারারাত
এই বাচ্চা ওয়ার্ডে, সেও অক্ষর ছিল, প্রথম অক্ষর
পুরো চিঠিটা লিখতে হত আমাদের

ভালো চিঠি লেখা জীবনের খুব জরুরী ও দুরূহ সংগঠন।
অসফল হই বহুবার, কখনো চিরকালে হারিয়ে যায় লেখার সুযোগ।

রোদ ওঠে, গরম হয়, নৌকোর পালে এবং শূন্য কোলে -
একসাথে দাঁড়ায় কাঠগড়ায়
আমাদের মুখ, দুনিয়ার পরিসংখ্যান আর ওই সিলিন্ডার, অক্সিজেনহীন,
রাতের রহস্যময় বিমান থেকে পড়া না-ফাটা বোমা যেন।

একটি অক্ষর অক্ষরেই শেষ হয়
নৌকা কিছু বলে না, অনেকদিন, শুধু জেগে থাকে,
অশান্ত করে তোলে সব ভুল একান্তবাস,
জেগে থাকে গাছের ঝুরমুটের ফাঁকে
নদীর নীল কোটে বিজয়-চিহ্ন হয়ে।
 

Sunday, March 7, 2021

চলা রোজকার

চলা রোজকার সাবেক পথে, নতুন,
বাঁচার যুদ্ধে নতুন সাথীর হাত ধরে –
উড়ালপুলে সুর্য নামে,
স্মৃতির গুল্মে বাতাস শূন্য নীড় গড়ে।

বন্ধুরা মুচকুন্দ রাতের – কে কোথায়! –
শব্দে কে কী খুঁজছ?
বিশ্বাকাশের গর্ভাধানে দেখি আজও
ভাসে প্লাজমার গুচ্ছ!
……
নতুন সাথীর মনের খোঁজটা রোজকার;
পৌঁছোন তার দূরের পাড়ায়,
ছোট্টো ঘরে দেয়া নেয়া
লতায় ঢাকা পাঁজর,
অশ্রুর জেদি কুড়ুল
দুপুরে, কোনো রোববার! …
মনে আছে সেই পাখির পাথর ডিম?
কারো মন সে অঙ্কও চায় কষবার।

বাইরে গমের গন্ধ ‘পাশ’এর কাব্য ছোঁয়া,
সাদা মেঘগুলো সমন বকেয়া হিসেব চাওয়া। 

১৬.৩.৯৩



৫ই এপ্রিল ১৯৯৪

 [দিল্লিতে মিছিলে পুলিশে লড়াইয়ে ব্যারিকেডে উঠে দাঁড়িয়ে এক বুড়ো সাধু চিৎকার করছিল, “দেশটাই ছেড়ে দেব!”]

আমরা মানুষ থাকিনা সারাজীবন।
কোনোদিন হয়ে উঠি হয়ত খানিক
একেকদিন পুরোটা হই, সেদিনের
কবিতা হয় নিষ্প্রতীক – দর্পণ।

আমরা সারাজীবন বাঁচিনা সময়।
কোনোদিন বেঁচে নিই হয়ত নিমেষ,
একেকদিন পুরোটা বাঁচি, সেদিনের
দর্পণ ভেঙে মানুষ কবি হয়।
 
আরেকটি বর্ষা আসছে; দেখে যাব।
ভিজবে জলকামান, গ্যাস-শেল, ঘোড়া,
বুকের চাপে ভাঙা দোমড়ান কর্ডন …
আমাদের, পুলিসেরো, জখম সারাব।

দেশটাই ছাড়বে দাদু, জব্বর দিলে!
বাঁচার রুটিতে খানিক নুন ছড়ালে।

১৯.৪.৯৪



 

Monday, March 1, 2021

এক পহরের রাতটা


এক পহরের রাতটা যখন কাশে পাড়ার মোড়ে,
কেউ জাগে সব জানলাগুলোর আগাম খোশখবরে।
ছড়ায় যখন তারার আঁচল পাহাড়গুলোর বাঁকে,
টালমাটাল উঠতে কেউ তারায় হাতের ভরটা রাখে।

কেউ বা কালের জল তোলে এক প্রাচীন কুঁয়োর ঘুমে,
জলের শব্দ আঘাত করে বুক ভাঙা নিঝ্‌ঝুমে;
দিনগুলো ভোজবাজির সর্বস্বান্ত উত্তেজনা,
লক্ষ মানুষ মাতাল – শুঁকছে মৃত্যুগন্ধী সোনা...

ঘুমের জলে, তারার ভরে, আগামীর সংবাদে,
জেদটা কষের রক্তে থাকে আশার লবণস্বাদে।

এত ভাষা, এত আকাশ, এত মেঘের দেশে
ঝড়ের বিকেল আগুন ধরায় পথের স্মৃতিরেশে –
শক্ত চোয়াল, শুকনো চোখে, পচনধরা খালে,
দুর্বিষহ বেঁচে মরার অধৈর্যে, ভুলভালে

ভাবের যত আয়না তত চলটে-ওঠা পারা,
ভিতর থেকে ভেংচি কাটে আধখ্যাঁচড়ার দাঁড়া।ভোজবাজিটার ডাকে তবু কানে দিয়ে তুলো
একটি রুমাল যত্নে ঝাড়ে নিজের মেঘের ধুলো। 


 

গাও সে গান


গাও সে গান যার সুরে জাগে এক নীল আকাশ
গাও সে গান যার সুরে জ্বলে একটি সূর্য
এই শতাব্দীর নিহিত চেতনায় লীন, গভীর
গাও সে গান যার সুরে জাগে এক নীল আকাশ

একটা উজ্জ্বল দিন আসে আজ কত আঁধার মৃত্যুর পরে
একটা স্বপ্নের পিছনে আজ কত দগ্ধ জীবনের ছাই ওড়ে
বৃষ্টি আসে আর ভাঙা মাটিতে রেখে যায় অসংখ্য চোখ
কত আকাঙ্খার শুভ্র মেঘ সেই চোখের মণিতে খেলা করে

গাও সে গান যা তিলে তিলে সেই দিন গড়ার
পথ দেখায় আর রক্তে সাগরের ডাক শোনায়
এই শতাব্দীর নিহিত বজ্রে লীন, অধীর
গাও সে গান যার সুরে জাগে এক নীল আকাশ

এক মুহূর্তও দ্বিতীয় বার এই ধমনীতে ফিরে আসবেনা
সময়ে এই হাত ছিল তোমার হাতে – এছাড়া আর কিছু বাঁচবেনা
মাঝে মাঝে এই জীবনে আসে দিন স্বপ্নের সত্য জানতে
মৃত্যু যত আজ সেদিন অমর যদি না করি সাগর আর ডাকবেনা




 

সাইকেলের গান


দূরের নেশায় বন, বসত ছেড়ে
সাইকেল আমাদের এগিয়ে যেত।
ক্লান্তি এলে, কালভার্টে
জলের কলধ্বনি ঘুম পাড়াতো।

কত ধুলোপথ এ দেশের
আজও টানে, যেতে হারিয়ে।
আসে হাওয়া উপসাগরের
ঝুরো নুন দিতে মাখিয়ে। 

যদিও পেরিয়ে যাওয়া বসতগুলোর
বাঁচার শিকল-ঘষা কম বুঝতাম,
সুহৃদের ডাকে যারা হাল পুছতো,
মুখেও আনেনি শয়তানদের নাম।

শুধু সাথে যেত আমাদের
তাদের দূরপিয়াসী চোখ;
অপরিচয়ের চায়ে, অন্নে
ভরে দিত আমাদের রোখ।
......

দূরের নেশায় বন, বসত ছেড়ে   
সাইকেল আমাদের এগিয়ে যেত।
ক্লান্তি এলে, কালভার্টে
জলের কলধ্বনি ঘুম পাড়াতো।