Thursday, August 28, 2025

ভিডিও

সকাল সকাল সুমন্ত ফোন করল রাজীবকে।

-       কী করছিস?

-       বাণী রান্না করছে সকাল থেকে আর আমি মোবাইলে খারাপ ভিডিও দেখছি!

“হ্যাঁ, সুমন্তদা”, রান্নার দিক থেকে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে, ফোনের ওপারের মানুষটাকে শোনাবার জন্য জোরে বলে উঠল বাণী, “আমাকে তো ঝুলিয়ে দিয়েছে দুটো বাচ্চা বার করে”, ফোনে মুখ এনে বাকিটা শোনাল, “এখন ওই ভিডিও দেখে সুখ পাচ্ছে!”

ফোনটা কেটে দিল রাজীব, “কিছু মুখে আটকায়না না? আর ঝুলিয়ে দিয়েছ, ঝুলিয়ে দিয়েছ কী বলো? কতোবার তো বলেছি সন্ধ্যের দিকে গিয়ে একটু জিম করো। পাশেই আছে। বেশি পয়সাও নেয় না।”

-       আমি চললাম। কয়েকটা জিনিষ কিনবো। তুমি যতক্ষণে উঠবে বাদলদা দোকান বন্ধ করে চলে যাবে বাড়ি। ভাত চাপিয়ে দিয়েছি, দুটো সিটি মারলে বন্ধ করে দিও।

-       তুমি সুমন্তদাকে যেভাবে বললে …

রাজীবের কন্ঠস্বরটা একটু ক্ষুব্ধ শোনালো। কিন্তু বাণী একই রকম ফাজিল মেজাজে বললঃ

-       তোমার করতে আটকায় নি আর এখন আমার বলতে আটকাবে?

এবার সত্যিই কালো হয়ে উঠল রাজীবের মুখ। ধাক্কাটা সামলে নিয়ে বললঃ

-       তুমি বলতে চাও তুমি চাও নি? আমি জোর করেছি? ম্যারিটাল রেপ করেছি তোমায়?

-       আরে ধ্যাৎ! কোথায় নিয়ে গেলে কথাটা? আমি বাচ্চার কথা বলছি।

-       বাচ্চা তুমি চাও নি?

-       তাতেও তোমার কোনো দোষ হয়তো ছিল না। বিয়ে হয়েছে, দুজনেই সুখ করেছি। বাচ্চা হয়েছে। তবে হ্যাঁ, আজকাল যেমন সবাই একটু প্ল্যানিং করে,  কখন হলে ভালো হয়, সেসব মাথাতেই ছিল না।

-       থাকলে?

-       হয়তো দু-তিন বছর সময় নিতাম!

-       বলো নি কেন?

-       বললাম তো, আমি ভাবিই নি। তুমিও ভাবোনি। দোষ নিচ্ছ কেন ঘাড়ে? সিম্পলি আমার বলার উদ্দেশ্য যে দু-তিন বছর আমরা একটু নিশ্চিন্তে আনন্দ করতে পারতাম! সেই বয়সটা তো আর ফিরবে না। যাক, আসছি আমি।

-       তবু, সুমন্তকে ওভাবে বলা …

-       সুমন্তদার সঙ্গে কথা বলে যে আরাম পাওয়া যায় সে তো এই জন্যই। যা ইচ্ছে বলা যায়।

বাণী দরজাটা আবজে বেরিয়ে গেল।

এই সময় বাণী একাই থাকে। আড়াইটে নাগাদ বেরোয়, বাচ্চাদের স্কুলবাসটা আসার সময় হলে। আজ রাজীবের ছুটি। তাই বাড়িতে।

 

সন্ধ্যের দিকে সুমন্ত এল। হাতে একটা পলিথিন ব্যাগে তিনটে খাবারের বাক্সো।

-       ওগুলো আবার কী?

-       তোর জন্য তো নয়! বাণী আর বাচ্চাদের জন্য।

-       কী?

-       পাপড়ি চাট। ওদের ভালো লাগে। এ্যাই দুজন! কোথায় তোরা? এগুলো নিয়ে যা তো! মাকে দে।

দুই ছেলে মেয়ে এসে, নিয়ে লাফাতে লাফাতে চলে গেল।     

-       এবার বল্‌। একটা ছুটির দিন ঘরে বসেই কাটিয়ে দিলি?

-       কোথায় যেতাম? বাচ্চাদের তো স্কুল ছিল।

-       ওদের স্কুলে পাঠিয়ে দু’ঘন্টার জন্য কোথাও ঘুরে আসতিস।

বাণী সেই তিনটে বাক্সোসুদ্ধু পলিথিন আর দুটো প্লেট নিয়ে ঘরে ঢুকল।

-       হ্যাঁ, তোর প্রস্তাবটা বাণীর খুব ভালো লাগত। ওর খুব বেড়ানোর শখ (একটু তাকিয়ে, সময় নিয়ে) … ছিল।

-       ছিল কেন? এখনো আছে। তবে এখন নয়। আর বাচ্চাদের না নিয়ে দুজনে তো একেবারেই নয়।

-       কেন তুমিই তো দুপুরে প্ল্যানিংএর কথা বলছিলে।

-       (বাণী তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো) বলছি। খাবারটা দিয়ে নিই।

-       তোমাদের তিনজনের জন্যই তো এনেছিলাম!

-       সে এনেছিলেন। আমি তো পাঁচ ভাগ না করে খাবো না।

-       খুব কম দিও আমায়।

-       কমই দিচ্ছি। মিকি, ঝিল! তোদের দুটো নিয়ে যা। হ্যাঁ, এবার বলো, কী বলছিলে। (বাচ্চাদুটো এসে নিয়ে যাওয়ার পর) প্ল্যানিং! … অবশ্যই। যে কোনো কাজ প্ল্যানমাফিক করলে ভালো হয়। মা হওয়া তো একটা বিরাট কিছু নয়, পরে হতাম। কিন্তু হয়েছি। হয়েছি যখন, মা-ই থাকব।

সুমন্তর মুখটা একটু গম্ভীর দেখালো।

-       সরি, আমি ঢুকব কথায়?

-       ঢুকবে না তো খালি শুনে মজা নেবে নাকি? বলো।

-       তুমি যে বললে ‘মা হওয়া বিরাট কিছু নয়’, এর মানে কী? কতো মেয়ে মা হতে পারে না, কষ্ট হয়, চিকিৎসা করাতে গিয়ে ভুল চিকিৎসার শিকারও হয় …

-       সেরকম আমার সঙ্গে হলে আমিও তেমনই কষ্ট পেতাম, আমিও চিকিৎসার চেষ্টা করতাম। আমার সঙ্গেও ভুল চিকিৎসা হতে পারত। কিন্তু ঐ যে তোমার আশ্চর্য লাগল একটা মেয়ে কেন এমন কথা বলছে, ওর মধ্যেই আছে তোমার সমস্যা।

-       আমার সমস্যা?

-       হ্যাঁ, মা হওয়াটাকে আইডলাইজ করে রেখেছ! … একটা প্রজাতিগত বাস্তবতা। নারীরা মা হয়, পুরুষেরা পিতা হয়। মানুষের বংশবৃদ্ধি হয়। সেই প্রসেসে আমরা দুজনে একটু দেরিতে ঢুকতে পারতাম! এটুকুই তো কথা! সময় মতো বুঝি নি। বুঝি নি যখন, তার দায় তো ওদের (বাচ্চাদের দেখিয়ে) নয়? যখন আমরা মা, বাবা হয়েই গেছি, ওদেরকে নিয়েই এখন যা কিছু ভাবব! কেন আমার একটা ছোট্টো কথা নিয়ে সকাল থেকে তোমার বন্ধু ভুল বুঝছে জানি না।

-       তুমিই তো বলছ ওরা আছে বলে তোমরা আলাদা করে একটু আনন্দ করবে না, কোথাও বেড়াতে যাবে না।

-       সেটা সত্যি। ওরা বড়ো হোক। নিজেরা একা একা ঘুরে বেড়াতে শিখুক। তখন আমরাও যাব।

-       তখন তো এই দিনগুলো আর থাকবে না।

-       তাহলে এই দিনগুলো, মানে যৌবনের দিনগুলোর, যেটুকু বাকি আছে, আলাদা একটা মাধুর্য আছে, তাই তো বলছ? তার আনন্দ উপভোগ করতে হলে সন্তানদের আড়ালেই করতে হবে।

-       হ্যাঁ। কিছুটা তাই।

-       আমিও তো তাই বলছি। আগেই সেই মাধুর্যটা আরেকটু উপভোগ করে নিতাম দু-তিন বছর। প্রথম বছরেই বাস্তবে পরীক্ষা করে নেওয়ার কী দরকার ছিল যে মেয়েটা মা হতে পারবে কিনা, বা ছেলেটা বাবা হতে পারবে কিনা? অনেক কিছুই তো তখনো পাওয়া যেত! … আর তেমন হলে দুপক্ষই মেডিক্যাল পরীক্ষা করিয়ে রিপোর্ট অদল বদল করে নিতাম। আজকাল তো শুনেছি তাও হচ্ছে।

-       তা, সেটা কি আমার একার দোষ?

-       বার বার দোষ বলছ কেন? অজ্ঞতা, এবং সেটা দুজনেরই। দুজনেরই সিদ্ধান্ত ছিল মিলন, কোনো কিছু ব্যবহার করার কথা ভাবি নি। আর … তার ফলে সন্তান। তবে হ্যাঁ। মা হওয়ার একটা বড়ো শারীরিক ধকল আছে, যেটা নারীকেই সইতে হয়। শরীর বিকৃত হয়। বিদঘুটে দেখতে হয়।

-       বিকৃত? বিদঘুটে? আজকাল হিরোইনরা পেট বার করে ছবি পোস্ট করছে দেখেছ?

-       তোমাদের সুন্দর লাগে? সত্যি বলবে। সুন্দর লাগে না একটা ভ্যাল্যুকে ইউলোজাইজ কর।

-       ঐ রকম পেট বার করে হয়তো সুন্দর লাগে না। ওটা আমাদের বোধের সঙ্গে খাপ খায় না। তবে গর্ভবতী নারীর শাড়ি পরা কমনীয় ছবি তো ভালো লাগেই!

-       একটি নবজাতের জন্মের সম্ভাবনার সূচক হিসেবে, না নারীটিরই শারীরিক সুষমার দিক থেকে।

-       দুই হিসেবেই।

-        তা, ঐ রূপটা যদি সুন্দর হয়, তাহলে আমার ভুঁড়িটাও সুন্দর। ঢিলে গা-ও সুন্দর। পেটে ছিল তো জন্মের সম্ভাবনা ধারণ করতাম, এখন এই শরীর সন্তানদের বিকাশের সম্ভাবনা ধারণ করে! এর মধ্যেই শারীরিক সুষমা খুঁজুক পুরুষ! পায় না তো! তাদের তো বিকৃত-দেহ হতে হয় না, কোনো শারীরিক উপসর্গ পোহাতে হয় না। তাই মহিমান্বিত মাতৃত্বে সাফল্যলাভের পরে পরেই, আমাদের জিমে গিয়ে, পেট সিঁটিয়ে, গা টাইট রেখে কুমারীরূপটাও ফিরিয়ে আনার কথা শুনতে হয়।

-       কিন্তু সেটা তো তোমাদের শরীরের পক্ষেও ভালো!

-       হোক। আমি পারব না। আমি এখন মা, ফুল মা। মনের সুখে মোটা হবো। দুজনে বেড়াতে যাবো ফুল বুড়োবুড়ি হয়ে। কারুর কোনো আপত্তি আছে? আপত্তি থাকে, শুয়ে শুয়ে ভিডিও দেখুক। আমিও, দরকার পড়লে দেখব। ঠিক?

সুমন্ত ঠিক বুঝে উঠতে পারল না বাণী যে আজ ফুল ফর্মে আছে তার কারণ কি কোনো ক্ষোভ?

 

২১.৪.২৫  

বিগ্রহ

দেবতা আর রাতে মন্দিরে তাঁর বিগ্রহে থাকেন না আজকাল। ভিড় বাড়ছে প্রতিদিন – সারাদিন পুজো নেওয়ার চাপ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের জন্য জানলা-ঘুলঘুলি বন্ধ করে দেওয়ায় রাতে গর্ভগৃহে দমবন্ধ ভাব, তারপর সারাদিনের পুজোর পচাফুল, পোড়া তেল, ঘি, কর্পুর ইত্যাদির গন্ধ। তাই পূজারী বাইরে থেকে মন্দিরে তালা লাগালেই ভিতর থেকে তিনিও ফুরুৎ - দেবলোকে। আবার পরের সকালে পূজারী এসে দরজা খুলে, যতক্ষণে মেঝে-টেঝে পরিষ্কার করান, ততক্ষণে দেবতা অদৃশ্যে আবার এসে বিগ্রহে ঢুকে পড়েন, অধিষ্ঠিত হয়ে বিগ্রহ-স্বরূপ হয়ে যান।

কিন্তু বিগ্রহটি অস্থির হয়ে উঠল। প্রাণহীন হয়ে পড়লেও সে যে প্রতিমা, তার অঙ্গে অঙ্গে প্রাণকে পাওয়ার ডাক! দেবতা সে ডাককে উপেক্ষা করলেও শিল্পী উপেক্ষা করতে পারলেন না। এমনিতেও, রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমোবার অভ্যাস তাঁর নেই, কর্মশালায় কাজ করতে করতে হঠাৎ অস্থিরতা অনুভব করলেন। একটা প্রবল আকর্ষণ। প্রায় নিশির ডাকে পাওয়া মানুষের মতো তিনি পথে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বন্ধ মন্দিরের কাছে পৌঁছে গেলেন।

তবে তিনি তো আর দেবতা নন। অরূপ বা সূক্ষ্মরূপ, কোনোটাই হওয়ার ক্ষমতা তাঁর নেই। মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়েই তিনি অনুভব করলেন, ভিতরে বিগ্রহে দেবতা নেই! হতবাক হয়ে মন্দিরের সিঁড়িতে বসে পড়লেন। ভোর হল। পূজারী মন্দিরে এসে দেখলেন সিঁড়িতে শিল্পী বসে আছেন। সারারাত অস্থির থেকেছেন, জেগে কাটিয়েছেন। পূজারী মন্দিরের দরজার তালা খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে। শিল্পী বলতে গিয়েও বলতে পারলেন না। ততক্ষণে, মন্দিরের ভিতরে তাকিয়ে তিনি বুঝলেন, দেবতা অধিষ্ঠিত হয়েছেন বিগ্রহে। কিচ্ছু না, বলে তিনি নিজের বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন।

এভাবে দ্বিতীয় দিন ভোর, তৃতীয় দিন ভোর। চতুর্থ দিন পূজারী শিল্পীর পাশে এসে স্নেহপরবশ কন্ঠস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে বলো তো? কোনো কষ্ট আছে মনে? বাড়িতে কোনো সমস্যা? এস! মন্দিরের ভিতরে এস! দেবতাকে বলো নিজের কষ্টের কথা। মন হাল্কা হবে। কষ্ট দূর করবেন তিনি।

শিল্পী বললেন, না এখন ঠিক আছে। সুস্থ বোধ করছি। তিনি এসে গেছেন।

-       কে এসে গেছেন?

-       আজ্ঞে, মন্দিরের দেবতা। বিগ্রহে ফিরে এসেছেন।

-       মানে?

হঠাৎ শিল্পীর খেয়াল হল যে কথাটা বলা সমীচীন হবে না। “না, মানে মন্দির বন্ধ ছিল তো, ভিতরে একটা দমবন্ধ ভাব। …” পূজারী মন্দিরের ভিতরটা দেখে বললেন, “তা মানছি। রাতেই মন্দির পরিষ্কার করে তবে বন্ধ করা উচিৎ। অনাচার হয়ে যাচ্ছে। কী করব? একটা লোক পাই না। আমার বয়স হয়েছে, রাতে একা একা সবকিছু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে যাওয়া সম্ভব হয় না। … যাহোক, বুঝলাম। ঠাট্টা করে বলছ যে ফিরে এসেছেন, কেননা দরজা খোলা হল, মন্দির পরিষ্কার করা হবে। আমি তো চমকে উঠেছিলাম।”

ওদিকে কিছুদিন পর দেবতারও টনক নড়ল, যে তিনি মন্দির থেকে বেরিয়ে আসার পর শিল্পী মন্দিরের সিঁড়িতে বসে থাকে সারারাত। সে কি কিছু চায়? আমার কাছে? এক রাতে তিনি দেবলোক থেকে নেমে ভিতরের প্রতিমারই আদলে রূপ নিয়ে শিল্পীর সামনে এসে দাঁড়ালেন, “কী চাও তুমি বৎস!”

শিল্পী উঠে দাঁড়ালেন। প্রণাম করে বললেন, “কিছু চাই না। আপনি রাতে নিজের বিগ্রহ ছেড়ে চলে যান, বিগ্রহটির শূন্যতার হাহাকারে আমি অস্থির হয়ে উঠি, তাই নিজের কাজ ছেড়ে ছুটে চলে আসি এখানে!”

-       বিগ্রহ আমার, আর সে তোমাকে অস্থির করে তোলে? কই, আমাকে তো করে না!

-       (করজোড়ে) আমিই যে তৈরি করেছি ঐ প্রতিমা, প্রভু। ওর পাথরের শরীরের এক একটি কণায় আমার স্পর্শ আছে। ওকে প্রাণবান রাখার দায়ও যে আমার। তাই হয়তো ডাকে আমায়।

-       তাই যদি হয়, এত রাত ধরে আসছ, কই আমাকে তো ডাকো নি, ফিরে আসতে বলো নি।

-       প্রতিদিন দেখছি, সকালে মন্দিরের দরজা খুলতেই আপনি ফিরে আসছেন। তাই আর ডেকে বিব্রত করি নি।

যে রাতে শিল্পী আর দেবতার মধ্যে এসব কথাগুলো হচ্ছিল, সে রাতে পূজারীও নিজের ঘর থেকে, ঘুম আসছে না বলে বেরিয়ে মন্দিরের দিকে আসছিল। কিছুটা কাছে এসে এই কথোপকথন শুনে চমকে উঠল। আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনতে থাকল।

-       তুমি তো আশ্চর্য মানুষ? কিছু চাইছ না। আবার অহঙ্কার এত বেশি … যে দেবতার অভাব পুরো করতে চাইছ রাত ভর মন্দিরের সিঁড়িতে বসে!

-       আপনার অভাব পুরো করার ধৃষ্টতা করছি না দেবতা! রাত ভর ঐ বিগ্রহটায় আপনার অভাবে কষ্ট পাচ্ছি শুধু। কেননা আপনার অধিষ্ঠানের জন্যই তো তাকে তৈরি করেছিলাম, গ্রামের মানুষের কথায়!

-       যদি আমি ভেঙে ফেলি ঐ বিগ্রহ? … নাও, ভেঙে দিলাম!

কথার সঙ্গে সঙ্গে আকাশ থেকে একটা ছোটো উল্কাপিন্ড সোজা মন্দিরের চুড়োয় এসে আঘাত করল। মন্দির ধ্বংস হল। ভিতরের বিগ্রহ খান খান হয়ে গেল।

-       এবার কী করবে?

শিল্পী সভয়ে আগুনের বিস্ফোরণটা দেখে। “এ কী করলেন দেবতা?”

-       তোমার তৈরি বিগ্রহ ভেঙে ফেললাম! আর তোমায় তার জন্য কষ্ট পেতে হবে না।

সকাল হতে হতেই ভিড় এসে জমা হয়েছে মন্দিরের ধ্বংসস্তূপের সামনে। অনেকে হাহাকার করছে, কী অভিশাপ নেমে এল আমাদের জীবনে! মন্দির ধ্বংস হল, দেবতার বিগ্রহ ভেঙে গেল। পূজারী ঐ ধোঁয়া উঠতে থাকা ইঁটপাথরের ভিতরে ঢুকে নিজের গামছা দিয়ে ধরে তুলে আনলেন ছোট্টো, তখনও গরম উল্কাপিন্ডটি। বাইরে এনে মাটিতে রাখলেন। সবাই প্রশ্ন করল, জিনিষটা কী।

-       মন্দির ভেঙেছে, সেটাকে অভিশাপ ভেব না। আমি দেবতার সঙ্গে শিল্পীর কথাবার্তা শুনেছি। শিল্পীর তৈরি বিগ্রহ দেবতার পছন্দ ছিল না। দেবতা থাকতে পারছিলেন না মন্দিরে। তাই নিজে আমাদের এ উপহার দিয়েছেন। এটাই তাঁর নতুন বিগ্রহ। এ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমরা নতুন করে একটি মন্দির নির্মাণ করব।

কয়েকজন চিৎকার করে উঠল, “তাহলে তো শিল্পীকে ডেকে জবাবদিহি করতে হবে। কেন এমন বিগ্রহ তৈরি করল যা দেবতার পছন্দ হল না? অপবিত্র মনে বা অপবিত্র হাতে তৈরি করেছিল নিশ্চয়ই!”

“না, তেমন কিছু নয়। ঐ বিগ্রহেই দোষ এসে গিয়েছিল। দেবতার বদলে সে শিল্পীকেই ডাকত বার বার। কোনো শিল্পীর তৈরি বিগ্রহ হলেই তাতে এ দোষ থাকবে।” উল্কাপিন্ডটা দেখিয়ে বলেন, “এটা তো কোনো শিল্পীর তৈরি নয়! দৈব!”

অদূরে, গ্রামের রাস্তায় নিজের বাড়ির দিকে যেতে যেতে শিল্পী আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসল, “এবার বুঝুন দেবতা। ঐ পিন্ডাকৃতি হবেন আপনি। যান! অধিষ্ঠিত হন! আমি বরং যাই, নিশ্চিন্তে একটি নতুন প্রতিমা পুরো করি। তার শরীরে প্রাণের প্রতীক্ষা থাকবে। পাবেও, যদি মানুষ তাকে ভালোবাসে। কিন্তু আপনার প্রতীক্ষা থাকবে না।”

পিছনে ফিরে তাকালো। ধোঁয়া ওঠা ধ্বংসস্তূপটা দেখতে দেখতে ভাবল, ভাঙা বিগ্রহের টুকরোগুলো নিয়ে আসবে পরে গিয়ে। কাজে লেগে যাবে।

২৩.৩.২৫

আমার মুসলমান বন্ধুরা

আজকাল পাড়ায় পাড়ায় সকালে বর্জ্য নেওয়ার গাড়িগুলো ঘোরে। একটা গান বাজে গাড়িতে বসানো মাইকে। এমনকিছু শ্রুতিমধুর নয়, কিন্তু মজার। বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তার আওয়াজে চমকে ওঠা গলির গৃহস্থেরা পলিথিনের থলেয় বর্জ্য ভরে প্রস্তুত হওয়া শুরু করবে।

সেদিন রাতে হাওড়া স্টেশনে দেখা হয়েছিল মাসুদের সাথে। বলছিল নিউজিল্যান্ডে নাকি তিন রঙের ডিবে থাকে রাস্তায়, তিন ধরণের বর্জ্য ফেলার। হয়তো ভারতেরও বড় শহরগুলোতে আছে। এক শহরেও তো পাড়ায় পাড়ায় ভেদ থাকে। চারকোনা বসার জায়গাটার ভিতরে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে কথা বলছিলাম। বার বার চোখ যাচ্ছিল পিছনে ওর বেগমের দিকে – কিছু একটা বলতে চাইছে বার বার। শেষে আর পারল না, বলেই ফেলল, “তখন থেকে শুধু কথাই বলে চলেছেন, আমাদের তরফ থেকে ভাইসাহবকে চা খাওয়াবেন তো অন্ততঃ!” তখন ‘হ্যাঁ হ্যাঁ’ করে গেল চা আনতে। আমার হাসি পেয়ে গিয়েছিল, কিন্তু কিছু বললাম না। ওর বিয়ের সময় বরযাত্রী গিয়েছিলাম। কত ভালো খাবার খাইয়েছিল মেয়েপক্ষ! আর এ শালা নবাব খানদান, খাওয়ানোর বেলায় ছিল কঞ্জুস। আজও তাই, বউকে মনে করাতে হয়। টিফিনে যখন একসঙ্গে বসতাম ও পোদ্দারকে টিটিকিরি দিত, “ক্যা রে, আবার সেই কদ্দু-ফদ্দু এনেছিস?” পোদ্দারও শোনাতো, “সালা কুঁজড়া” (কুঁজড়া একটি জাতি যারা তরিতরকারি বেচে) “নিজেকে নবাব খানদান বলে আর আনে কী? শুকনো রুটি আর আলুসেদ্ধ।” তবে সবচেয়ে আগে মাসুদ হাতে রুটির টুকরো নিয়ে পোদ্দারের ডিবেতেই হাত ডোবাতো আর পোদ্দারও মাসুদের আলুসেদ্ধয়।

খাওয়ানোর ব্যাপারে রাজা ছিল সলিমুদ্দিন। ব্রাঞ্চ ভিজিটে গেছি, জবর্দস্তি বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পরোটা মাংস। রোহতাসে কমিটি মিটিং করালো পুরো দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে নিয়ে। বৌকে দিয়ে বিরিয়ানি রান্না করালো সবার জন্য। মনে আছে আমার সদ্য বিয়ে হয়েছিল। তখনই সম্মেলন; নেতারা আসবেন। ভোরবেলা পৌঁছেছি স্টেশনে। একটু পরে কাঁধে লালঝান্ডা সলিমুদ্দিনের নেতৃত্বে বাকিরা হাজির। দূর থেকে ধমকে উঠল আমায়, “চান করে এসেছেন তো? নইলে কিন্তু হাত মেলাবো না। … মরে গেল হঠাৎ। তখন আবার ওর বেগমের কম্প্যাশনেট এ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে পড়তে হল। মোবারকের শ্বশুরবাড়ি এসে ঝামেলা করতে লাগল, ওদের হিস্যা – সলিমুদ্দিনের ছোটো ভাইটা বেকার, তার হয়ে গেলে সবার কল্যাণ, মোবারককে তারাই দেখবে। আমার ব্রাঞ্চের ব্যাপার, ম্যানেজার ডেকে পাঠালেন। আমি বুঝিয়ে বললাম, দেখুন চাকরিটা তো বেগমেরই হবে, অন্য কারো নয়। পিএফ ইত্যাদি নিয়ে যদি দাবি থাকে, কোর্টে গিয়ে নিষ্পত্তি করে নিন। এখানে তো তার নিষ্পত্তি হবে না। চাকরি হল। তখন থেকেই মোবারক আমাদের কমরেড। কখনো কোনো মিছিলে, সমাবেশে, সভায় পিছিয়ে থাকে নি। একবারই ইফতারে ওর বাপের বাড়িতে গিয়েছিলাম। কী এলাহি ব্যাপার!

ইফতার বলতে মনে পড়ে গেল ছোটোবেলায় ঈদের আগের সন্ধ্যায় জাহির, জামিরদের বাড়ির ছাতে সব ভাইবোনেদের জমায়েৎ। আমিও আছি তাদের মধ্যে। চাঁদের ক্ষীণ রেখাটা খুঁজছি আকাশে। কেউ খুঁজে পেলাম না। পেলেন ওদের মা। দেখালেন, “ওই দ্যাখ্‌!” ভাবিই নি যে অত ক্ষীণ একটা রেখা চাঁদ হতে পারে। জাহির বড় হয়ে দর্জির দোকান দিয়েছিল।আর জামিরের ইচ্ছে ছিল পুলিশে যাওয়ার, পুলিশেই গিয়েছিল।

স্কুলে খুব কাছের মুসলমান বন্ধু কেউ ছিল না। পুলিশের বড় সাহেব বাবার ছেলে মাজিদ সারা দিন ফাঁটবাজিই করত। তবে তখনকার ফ্যাশনে, ‘দোস্তি’ সিনেমা দেখে সেও কিনেছিল মাউথঅর্গান। তার বাজানোতেই প্রথম সুরটা শুনেছিলাম। পরে মাইকে। এক ছিল রিজওয়ান, ভালো ছেলে, কিন্তু নিজের মত থাকত। পনেরই আগস্ট,ছাব্বিশে জানুয়ারি, সরস্বতী পুজো বা হাউজের প্রোগ্রামে একক অভিনয়ে একটা নাটিকা পেশ করত। ভালো করত। আর ছিল, ফকরু মিয়াঁ, নাম ছিল পরবর্তীকালের রাষ্ট্রপতির, ফকরুদ্দিন আলি আহমদ। আশ্চর্য, নতুন কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়, দিল্লি আর মেরঠ থেকে আসা সব বাঘা বাঘা শিক্ষক … তাদের একজনও কিন্তু মুসলমান ছিল না, আর বেশির ভাগ ছিল ব্রাহ্মণ। এক তিওয়ারিস্যারকে পছন্দ করতাম, ইংরেজি পড়াতেন, বাজখাঁই গলায় বকে সামনের পোর্টিকোর জটলাটা খালি করাতেন কিন্তু বাড়িতে ডাকতেন ফ্রি টিউটোরিয়ালে, সবাইকে কফি খাওয়াতেন বাগানে। জোরে আবৃত্তি করতেন, “ও ক্যাপ্টেন, মাই ক্যাপ্টেন …!”   

কলেজেও। মানে আমাদের ক্লাসগুলোয় কোনো মুসলমান শিক্ষকও ছিলেন না আর ছাত্রদের মধ্যে মুসলমান থাকলেও আমার বন্ধু কেউ ছিল না।

বন্ধু হল চাকরিতে ঢোকার পর। প্রথম তো ধানবাদে, শাহাব, ওকে আমাদেরই মেসে নিয়ে এলাম। তবে থাকল না বেশিদিন। অঙ্কে ভালো পোস্টগ্র্যাজুএট, ওর ছিল প্রফেসর হওয়ার ইচ্ছে। চাকরি ছেড়ে চলে গেল। শবেবারাতের পর বাড়ি থেকে ডিমের হালুয়া (নামেই হালুয়া, আসলে বর্ফি) এনে খাইয়েছিল।

তারপর পাটনায়। সারাদিনের বন্ধু হয়ে উঠল ওয়ারিস। অফিস থেকে ফাঁক পেলেই ছুটে যাই রাস্তার উল্টোদিকের স্টুডিওটাতে। ওয়ারিস ফটোগ্রাফার ছিল, তবে মাস-মাইনেতে, স্টুডিও হাদি সাহেবের। বছরের পর বছর ওয়ারিসের সঙ্গে বসে গল্প করেছি। আমারও নেশা যেহেতু ছবি তোলা, তাই ওর কাছেই ফিল্ম ধুতে দিতাম, ডার্করুমে বসে দেখাতাম কোন ছবিটা কিভাবে ডেভেলাপ করবে, ওর কাছে তার টেকনিকটা শিখতাম। পরে তো ওর মাধ্যমেই প্রথম এসএলআর ক্যামেরা কিনলাম, ফ্ল্যাশ, তারপর এনলার্জার …। সাদাকালো গেল, রঙীন এল আর ওর দিনও গেল। তবে তত দিনে ওর মেয়ে বড় হয়ে গেছে, শিক্ষিকা হয়ে গেছে, মা পর্দানশীন কিন্তু সে আমার অফিসে এসে নিজে হাত বাড়িয়ে মেলালো, “হুমাইরা ওয়ারিস”, মিষ্টি করে হাসল, বাঁদিকের দাঁতটা দাঁতের ওপরে, উঁচু। জিজ্ঞেস করলাম “তোর বাড়িতে গিয়েছিলাম, মনে আছে?”

-       কেন থাকবে না, ছাতে গিয়ে অতক্ষণ আপনার সঙ্গে বকবক করলাম যে?

-       তোর বাবাকে বকেছিলাম, জানিস?

-       না তো, কেন?

-       তোর মায়ের সঙ্গে দেখা করায় নি বলে। অদ্ভুত! তিনিই রেঁধে খাওয়াচ্ছেন, অথচ একবার তোর বাবা বাইরের ঘরে ডেকে আনল না যে শুক্রিয়া আদা করি। নাহয় পর্দা করেই থাকত। তাই তোকে দেখে ভালো লাগছে।

-       পর্দা তো করতেই হয় আঙ্কলজি। দেখবেন না! পাড়া থেকে বেরুচ্ছে বুর্কা পরে, কলেজের কাছে এসে খুলে ব্যাগে রেখে নিল। আবার পাড়ায় ঢোকার আগে চড়িয়ে নিল।

-       তুইও করিস?

-       নাঃ। তবে ব্যাগে রাখি।

আফরোজের বৌ কিন্তু একেবারেই পর্দানশীন ছিল না। বেঁটে, কালো, কিন্তু মুখটা দারুণ মিষ্টি আর একেবারে ঘরের মেয়ে। বিয়ের সময় আফরোজের কী সন্দেহ! নিজে লম্বা, ঢ্যাঙা, বার বার এসে জিজ্ঞেস করে যাচ্ছে, “ওকে দেখেছেন? আমার সঙ্গে মানাবে তো?” আরে হ্যঁ, ভাই মানাবে। এই করতে করতে শক খেল প্রথমবার। নিকাহ যেখানে হবে, গর্দানিবাগের সেই কোয়ার্টারের দরজাটা ছোটো। টুনি বাল্বের সিরিজ দিয়ে সাজানো হয়েছে। তারের জয়েন্টগুলো খোলাই থাকে সচরাচর। আফরোজের গায়ের ঝলমলে পোষাকটায় জরির কাজগুলো বোধহয় কোনো বিদ্যুৎবাহী ধাতুর ছিল। ঢুকতে গিয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে আর জোরে ঝটকা। তিন বার হল। তারপর ব্যাপারটা বুঝে আমি এগিয়ে গেলাম। দুদিকের আলোর মালার ওপর সাবধানে হাত দিয়ে জায়গা করলাম ওর ভিতরে ঢোকার। বললাম মাথাটা একটু নুইয়ে ঢুকতে। … আফরোজ ভাষাটা বলত টিপিক্যাল ওদের পাড়ার, মানে আরা শহরের মিল্কি মোহল্লার – গইস, খাইস, কহিস … ।

ভাষা বলতে মনে পড়ে গেল নাহিদ আর করিমের কথা। দুজনে একসঙ্গে থাকত আর সাহিত্য বিষয়ে রুচি ছিল। সেই সূত্রে আমার বন্ধু হিন্দি কবির মাধ্যমে আলাপ। পরে সেটা ঘনিষ্ঠতা হল। যদিও ওদের বাড়িতে কখনও যাই নি। তা সেই নাহিদ, ভাষার শুদ্ধতা নিয়ে একটা মজার গল্প শোনাতো। রমনা রোডে যেখানে ও আগে থাকত, ঘরে ঢোকার চার ধাপ সিঁড়িটা সামনে থেকে না হয়ে ডান পাশ থেকে ছিল আর সামনেটা সোজা খাড়া। সেখানেই এক পা রেখে সাইকেলারোহী এক বন্ধু, দরজার সামনে দাঁড়ানো নাহিদের সঙ্গে কথা বলছিল। হঠাৎ টাল সামলাতে না পেরে ছেলেটা সাইকেল সুদ্ধু পড়ে গেল। ওপর থেকেই দুহাত বাড়িয়ে নাহিদ বলে উঠল, “আরে, চোট লগা?” তারপর কিছু ভেবে আবার বলে উঠল, “ওহ্‌ সরি, চোট লগি?” বন্ধুটা ততক্ষণে নিচে থেকে উঠে এসে নাহিদের ঘাড়ে আর পাছায় দুই থাপ্পড় লাগিয়েছে, “শালা, বন্ধু পড়ে গেছে, কোথায় লাফিয়ে নেমে তুলবি, না ওখানে দাঁড়িয়ে ক্রিয়াপদের শুদ্ধতা ভাবছিস? ‘লগা’ না ‘লগি’?”

নাহিদ কবিতার লোক ছিল না, দিল্লিতে গিয়ে একটা পত্রিকায় চাকরি আর নাটক করা শুরু করেছিল। একটি বাঙালি হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করেছিল। তবে করিম, বিশেষ করে বাবরি মসজিদের ঘটনার পর কবিতা লেখা শুরু করেছিল। ওর সেই উর্দু কবিতার বইটা আমাকে দিয়েছিল। আমারই ঘরে বসে রাতে শুনিয়েছিল প্রথম কবিতাটা। ওর এক বিধবা বৌদি ছিলেন। তখন সঙ্গেই থাকতেন এক ছেলেকে নিয়ে, পরে নিজের মফস্বল শহরে চলে যান। সেই বৌদির হাতের ডালভাত খেয়েছিলাম দিল্লিতে। করিম নিজেও চাকরিসূত্রে পরে মুম্বই চলে যায়। বিয়ে করে।

চাকরির ক্ষেত্রে আরো বেশ কয়েকজন আমার বন্ধু ছিল, তবে বয়সে আমার চেয়ে অনেক ছোটো বলে চেলা বা ভক্তই বলা হত। তার মধ্যে দানিশটা খুব কম বয়সে মারা গেল। ইউনিয়নের পাক্কা সাথী। শীতের সকালে ওর মঞ্জিলে (শবযাত্রায়) গিয়েছিলাম একটা মাঠ পেরিয়ে। শিশিরে পা ভিজে যাচ্ছিল।

২৪.৮.২৫

Saturday, August 23, 2025

সভাঘর ২

সভাঘর যেকারোর বাড়ি হতে পারে, চিলেকোঠা,
ছাত বা সিঁড়ির নিচে চাটাই বিছিয়ে, দুটি মোড়া,
অথবা ময়দানের সাত নং গেটের বেঞ্চিটায়,
ঈষৎ ভিতরে ঢুকে ঘাসে, অন্ধকারে; মশা খায় …

একত্র হওয়ার আপাত-সারল্যে বৃত ক্যামুফ্লাজ
কবে থেকে গানে,খোশগল্পে টানে দমিত সমাজ!
কখনো বটঝুরিতে ঢাকা ইঁটপাঁজা করে জয়,
সাজায় দপ্তর, পতাকা, নামফলক, সংঘ হয়। 

‘মানুষ মানুষ’ কাব্যে অশ্রুপাতে বাঁচেনা মানুষ,
সংগঠনী দিনলিপি সখ্যে গড়ে বাঁচাবার হুঁশ!

মনে আছে পুরোনো বন্ধুরা, স্টিমারঘাটায় রাতে,
ভোর অব্দি যুঝেছিলাম ইতিহাসের পরিখাতে?
বেলায় সেই যে অঙ্কুরিত হল নয়া সংগঠন,
সভাঘর জেগে থাকে রক্তের সংস্কারে প্রতিক্ষণ।

২৩.৮.২৫

সভাঘর

এক ঘরে বসার উষ্ণতা থেকে যায় বহুক্ষণ, 
বুকে তৈরি করে চাঁদ-ধরা উদ্যমের আলোড়ন,
কথোপকথনে সারা সপ্তাহের, ঘরটা ছড়ায়, 
কাজের আলোচনায় ছুটিরও বন্ধুত্ব বাড়ায়।

“সেদিনই তো কথা হল বৈঠকে, আগের শনিবার”
এবাক্যেই ঘরটা নৌকোর মত দুলে, ঠেলে দাঁড়;
সারাটা সপ্তাহ থেকে তালাবন্ধ, অপেক্ষায় ফেরে,
আলো জ্বলা সন্ধ্যায় জোটে মানুষ, সমস্যার জেরে।

বস্তুতঃ সভাঘরও সমস্যারই জের – সাময়িক!
মানুষের কর্মোদ্যমহীন হলে, খেদের বল্মীক। 

একটা কোনো বৈঠকী বন্ধুজনে গড়ে – রোধে ক্ষয়, –
একটা কিছু করার প্রকল্পে সুষুম্না ঋজু হয়,
ডানার ব্যথায় জাগে মনুষ্যধর্মের স্বত্বঋণ, 
সভাঘর হয় স্বপ্নার্দ্র মরাল, সংহত রুটিন।

২৩.৮.২৫

Friday, August 1, 2025

সঙ্গীত

আগে সুর তৈরি করে ঘর, কথা, পরে গিয়ে থাকে।
সুরের সে ঘরখানা কথার আভাস ধরে রাখে।
সে আভাস পায় সুর অব্যক্ত ব্যথায় কাঁপা ভোরে –
স্মৃত রাত, বেসামাল ইঞ্জিনের দাঁত চুঁইয়ে পড়ে,
আদিগন্ত আকাঙ্খার ফোটায় রক্তিম কলরোল;
বিস্তারে বেরোয় সুর, কুঁয়োর বাল্টিতে দেয় দোল …
 
কখনো কথাও, জেনে মনটা সুরের, ঘর ছায় –
চিলতে রোদ্দুরে পাতে চোখ – ওই এলো, মুখড়ায়!
প্রথম কলিটা তুলে বহুক্ষণ ভুগিয়ে বেড়ালো,
নাজেহাল করে শেষে বাকি শব্দে পাখনা ছড়ালো।
 
কথা আর সুরের গেরস্থালিতে, পুরোটা মানুষ
নিজেকে আঁটিয়ে চলে, দু’কাঁধে সামলে রাখে ক্রুশ।
পৃথিবীতে ছায়া তার, দীর্ঘ করে, হ্রস্ব করে দিন,
কথা-সুর সমৃদ্ধ করে তার, অক্লান্ত যাপনের ঋণ।     
 
২.৮.২৫