Saturday, August 10, 2024

হরেকৃষ্ণ ঝা

আপনি মানে রাত – ৪৭, শ্রীকৃষ্ণনগর।
দেয়ালে বন্যার দাগ। দরজায় চাপা কন্ঠস্বর।  
বিছানা ছেড়ে চেয়ারে; তাও বসা, মুখটা ঘুরিয়ে!
তিনটে অব্দি প্রশ্নে প্রশ্নে আমায় বকানো খুঁচিয়ে।  
ঘরে তালা দিয়ে, অন্ধকারে হেঁটে পৌঁছোনো স্টেশন …
চা-সিগারেটে পাঠোদ্ধার করা শিল্পের সমন!
ভোরে ফেরা … এভাবেই কত দিন গেছে বলুন তো!
 
আপনি শুনতেন; বলতাম, যেনবা কালপক্ক!
একাগ্র শ্রোতা যেমন, চেয়ে পড়তেন সব বই।
টিউশনে ঝুপড়ির সব্জিরুটি;  
                                    রাত জাগা অথৈ –
বিজ্ঞানের কৃতি ছাত্র, তৈরি হচ্ছিলেন কবিতায়!
জেদ ছিল মৈথিলিতে লেখা, … লাইব্রেরি মাঠটায়
শোনালেন বিকেলে, বললেন, এবার যাবো গ্রামে,  
ভাষার সৌকর্য খুঁজব রক্তপতাকার সংগ্রামে …
·       
তিন দশক পর কে যেন বলল ঝা-জি শহরে।
 
ভালো শুনতে পাচ্ছিলাম না তার পাঠানো নম্বরে!
কবে বই, কী কী বই, পুরষ্কার …?
                                             সংক্ষিপ্ত অসুখে
মৃত্যুসংবাদের অনুসঙ্গে জানলাম ফেসবুকে!
……
একটা বই আমার, ফেরান নি। ভুলে যাবো কেন?  
বরং, দেন নি যে!  – জুড়ল আপনার কাব্যসংগ্রহও।
 
৮.৮.২৪/১৭.৩.২৫

বাতাসের সঙ্গে বচসা

বাতাসের সঙ্গে বচসার গত পঞ্চাশ বছরে
দুজনেই বড়ো হয়েছি কিছুটা, বুঝতে শিখেছি
আমরা সমবয়সী নই; আমি নিয়মে ফুরোবো,
তার বয়সের তো হিসেবটাও জানি না! যদিও
জানি পৃথিবীর চেয়ে কম, মানুষের চেয়ে বেশি!
 
চুক্তি ছিলো, দুপুরে কিম্বা বিকেলে যেই দেখা হবে,
সে শোনাবে কলস্বর মানুষের জানালাগুলোর,
পাতা, ধুলো, জলরেণু, খড়, বীজে স্বরভঙ্গি গড়ে
বেঁচে থাকার যুদ্ধের সমুদ্রের গন্ধ দেবে গল্পে …
নাহলে সে ভাঙবে কিসে আমার গানের গুমোট!  
 
বচসাটা এই – এত সঙ্গ চাই, ধন্ধ কেন তবে?
কেন সে মাঝেমধ্যে এমন চিৎকৃত ভাষাহীন?  
আমি কি শপ্ত নিজের একজন্ম পৃথিবীযাপনে?
বাকিটা তো এ-ওর পিঠে পিঠ ঘষা, শ্রান্ত ঘুম …

১৪.৬.২০২৪

নেতারহাট – ১৯৭৬

হলুদ সরগুজার আদিগন্ত ক্ষেত,
পাইনবনে সমুদ্রের তুফানি নিঃশ্বাস,
প্যাগোডার মতো ফল মাটিতে অজস্র।
জঙ্গল অব্দি ঘাসের ঢালু পথে দৌড় … 
সূর্যাস্ত শেষে জঙ্গলে স্কুলের ছেলেরা
জ্যোৎস্না নামিয়েছিলো মুকেশের গানে।
 
তুখোড় দুষ্টুমি ভরা গল্পে চ্যাপলিন
যেমন জীবনে দেন গভীর বিশ্বাস,
নেতারহাট উদ্দীপ্ত প্রাণের ছ’দিন
রবীনদার নেতৃত্বে আমাদের বুকে –
দীপন, সুব্রত, শিউবচ্চনজি, আমি …
বস্তুতঃ একত্রে আর কখনো যাই নি!
 
কেউ কি বলবে, ‘আরো আরো গল্প সব?’
সেগুলো কাঁধের হাড়ে ব্যথা করে রাখা। 
 
২
রাত? তিনটে চল্লিশ! কথায় কথায়
যুক্তির কুযুক্তিগুলো ভনভন করে
ঘুরছে মৌচাকময় মহুয়া-তন্দ্রার।
দূর! আর ঘুম হয়? খোলো জানলাটা!
 
পাগল জুটেছে যত্তো সব, বলে ভেংচে
চাদরে মুখ ঢাকলো কেউ একজন।
পরক্ষণে দন্তপাটি ঝিকিয়ে বললো,
‘সূর্যটা উঠতে শুরু করলে ডেক হে!’
 
৩০.৬.২৪

ঘুণ

ঘুণ বড়ো বিচ্ছিরি ব্যাপার।
মানছি, কাঠের গুণে খামতি থাকলেই
ঘুণ লাগবে, আজ নয়তো কাল,
তাবলে এখন
কাঠের খামতি দেখি না ঘুণ?
 
সারারাত সারাদিন
না ঘুমোতে দেয়, না সুস্থির বসে
কাজ করতে দেয় –
দেশের আকাশ জুড়ে
অনবরত ‘কুর্‌র্‌র্‌ কুর্‌র্‌র্‌ …’
বোঝাই যায়না কোথায় ঢুকে আছে!
পাঠ্যবইয়ে
নাকি পরিসংখ্যানের কাজে
নাকি পূরাতত্ত্বে
নাকি ধর্মে
নাকি সঙ্গীতে শিল্পে সিনেমায়
নাকি বাজারে, রোজকার
                    উড়ো খবরগুলোয় …
 
ফুটোগুলো খোঁজো,
আগে খুঁচিয়ে গুঁড়ো ঝেড়ে
গায়ে কেরোসিন ঢালার ব্যবস্থা করো!
ঘুণ-প্রতিরোধক
ঘুণ লাগার আগে কাজ করে,
একবার লেগে গেলে আর
কোনো উপায় নেই,
বার করে করে থেঁতলে মারা ছাড়া।
 
তবে এ কাঠও বদলাতে হবে …

৩০.৭.২৪

দেশ ছাড়া

দেশ যেন আরো বেশি করে মানুষের,
যত না ফেরা, ছাড়ার জায়গা হয়ে উঠছে।
অবশ্যই সন্ধ্যার পাথরটার মতো নয়,
যাকে রাত বাড়তে সবাই ছেড়ে যায়,
পার্কের আলোয়,
পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার তীব্র ছোটোগল্পগুলোর
রহস্য বাড়াতে সারারাত।
দেশ তো তা নয়।
সারা জীবন, এমনকি প্রজন্মান্তরেও
ছাড়তে পারে না মানুষ।
তবুও দৃশ্যতঃ লক্ষ লক্ষ মানুষ
ভাতের অথবা চাঁদের অভাবে
যেটুকু পারে জিনিষপত্র বেঁধে ছেঁদে
বেরিয়ে পড়ছে
বিশ্বব্যাপী দেশ ছাড়ার রাস্তাগুলোয় –
কোথাও দুর্যোগক্লিষ্ট
কোথাও বৃষ্টিতে আচ্ছন্ন
কোথাও আলোকোজ্জ্বল …
 
কোনোটাই শেষ হচ্ছে না কোথাও,
বরং বেড়েই চলেছে –
দেশও, ছাড়ার রাস্তাগুলোও!

১৬.৭.২৪

বয়স হলে

বয়স হলে ঘুম থেকে উঠে
নিজেকে ফিরে পেতেই বেরিয়ে যায়
অনেকটা সময়। কোথাও বাইরে থেকে ফিরলে
পুরো একটা দিন। সহজ নাকি?
কোন্‌ কোন্‌ জায়গা থেকে টেনে
হিঁচড়ে বার করতে হয় আগের
দিনটার যাপনে ছড়িয়ে থাকা নিজের
                 অস্তিত্বের টুকরোগুলো …
তার ওপর ক্লান্ত স্বপ্নাবিল ঘুমের পরত;
বুঝতেও সময় লাগে কোত্থেকে
শুরু করব – আধদেখা স্বপ্নগুলো থেকে নাকি
ব্যাগে বা ল্যাপটপে রাখা
আধকরা কাজগুলো থেকে।
 
জানি আমার বেঁচে থাকার খুবই কম
শরীরে বাঁচছে আমার।
মরে যাওয়ারও সবটুকু
শরীরে মরছে না।
 
তবু চেষ্টা করি নিজেকেই বোনার পথে এগোবার।
টানা নিই কাজ থেকে আর স্বপ্ন থেকে পোড়েন। 
এভাবেই নিজেকে ফিরে পাই যেটুকু সম্ভব।
 
২৩.৭.২৪

 

 

Tuesday, July 9, 2024

জেদের নোঙর

যেন আমি এক দুরন্ত সমুদ্রচষা বহুভাষী জাহাঁবাজ!
দশ দুপুরে দশ দ্রাঘিমায় প্রেমযাপনের চেনা কৌতুকে 
কারো না কারো পাশে বসে গার্হস্থ্যকথা বলি কপট মরমে, 
মাতি শৈশব যৌবনের দোহাই দিয়ে রসঘন বচসায়,
প্রমাণ করি, নই মাতাল, মিথ্যেবাদী। তাহলেও ধার চাই;
কিছুটা সিনেমার মতো পেরোই হতবাক শিশুদের চোখ  …

বস্তুতঃ এটাই নিখরচার সহজতম ফন্দি ভেবে সুখে,
দুনিয়ার গেরস্থালি-বৈচিত্রে অবগাহন করি প্রতিদিন!

কতো ভাষায় ক্ষুব্ধ গাল দিয়ে পুরোনো ভালোবাসার নিষ্কর্মা
পুরুষগুলোকে ধাক্কা দিয়ে ভাগায় শীর্ণ বা পৃথুলা মায়েরা! 
ফুলঝরা সুগন্ধি বোঁটার মতো শব্দগুলো কুড়োই হাওয়ায় …শুঁকি। পাঁপড়িগুলো খোলে চৈতন্যে – ওহ নারী! জেদের নোঙর!
কীভাবে ক্লিষ্ট হতে হতে ধরে রাখো ইতরামিসুদ্ধু আমায়,
এবং আমাদের! তোমাদেরি দূরত্বের সমুদ্রে আমি জাহাজী।

৮.৭.২৪