Labels
- Ajker dintar janya (10)
- Alokji's poems in English translation (6)
- Articles (133)
- Arun Kumar Roy (1)
- Behar Herald (2)
- Bhinshohore (55)
- Biography (1)
- Engels (11)
- Hindi (55)
- Housing Question (10)
- Kedarnath Bandopadhyay (1)
- Krishak Sabhar Smriti (2)
- Lok Janwad (4)
- Magadher Sahitya (6)
- Meghsumari (161)
- Other's writings (1)
- Phire ese (236)
- Plays (10)
- Poems (534)
- Poems by Robin Datta (5)
- Priyo Pochis (8)
- Purnendu Mikhopadhyay (1)
- Sanchita (1)
- Sirir mukhe ghor (20)
- sketches (6)
- Smritiprasanga (3)
- Somudro Dubhabe Dake (29)
- Song (1)
- Songs (7)
- Stories (70)
- Translations (95)
- Video (5)
- कौन थे इश्वरचन्द्र विद्यासागर (200वीं जन्मजयंती पर एक कर्मवीर की कीर्तिगाथा) (19)
Wednesday, October 6, 2021
জন্মদাগ
আশা জেগেছিল
আমার এক বন্ধু। অন্য শহরে থাকেন। বছরখানেক আগে অব্দি নাজেহাল হচ্ছিলেন মেয়ের জন্য যোগ্য পাত্রের খোঁজে। দিল্লী, কলকাতা, ভিলাই, মুম্বই। মেয়ে তখন মেডিক্যালে – শেষ বছর। স্বাভাবিক ভাবে পরিবারের মত যে পাত্র ডাক্তার হতে হবে। নিজের জাতের যে হবে সেটা তো বলার কোনো কথাই নয়। ডাক্তার পরিবার হলে আরো ভালো হয়। বন্ধু নাজেহাল হচ্ছিলেন বস্তুতঃ ভালো পাত্রের খোঁজে নয়, পণের খাঁই দেখে। সর্বস্ব বিকিয়েও যে পার পাওয়া যাচ্ছে না! …
মিটিং ছিল সেই শহরে। রাত বন্ধুর সাথেই কাটল।
পুকুরধারে হাঁটছিলাম – বন্ধু বললেন, “মেয়েদেরই এগোতে হবে ভাই। নইলে বড় মুশকিল!” বন্ধুর
মুখের দিকে তাকালাম। স্ট্রিট লাইটের আলোয় একটা তীব্র কষ্ট দেখলাম তার মুখে। পণের খাঁই
মেটানোর নয়। গভীরতর। কেননা পরিবারের দিক থেকে বন্ধুও খুব গরীব নন। বরং শহরের প্রতিষ্ঠিত
পরিবার। বড় চৌহদ্দিতে সাবেকি তিন তলা বাড়ি। গ্রামে খেতখামার।
হঠাৎ খেয়াল হল, বন্ধুর মানসিকতা যে ভিন্ন।
ভুলেই গিয়েছিলাম। সমাজ-সংস্কারক। সক্রিয় কর্মী। কষ্টটা পণের খাঁই মেটানোর নয়, পণ ব্যাপারটাকে
মানতে বাধ্য হওয়ার। মেয়ের বাপ কি বলতে পারে পণ দেব না? যদি মেয়ের কোনো আপত্তি না থাকে?
আর মেয়ে তো জানে যে পণটাই একমাত্র প্যাঁচ, পৈত্রিক বা পারিবারিক সম্পত্তিতে তার ভাগ
দিতে বাধ্য করার। পরে তো আর কিছু দাবি করার অবস্থাতেই থাকবে না। ছাড়ার বোকামি কেউ করে?
ডাক্তারি করতেও, পূঁজি চাই না? আর বাবার ওই মূল্যবোধ-টোধ, ওসব বাবার ফ্যাকড়া!
তাই হল। মেডিক্যালে পড়া মেয়ে অম্লানবদনে পণের
ধনের সাথে পা দিল শ্বশুরবাড়ি। এখন ডাক্তার বর আর ডাক্তার বৌ নতুন নার্সিংহোমে পার্টনার।
গুপ্তাজির বড় ছেলে চান্স পেল খড়গপুর আই.আই.টি.তে।
ইলেকট্রনিক। অথচ প্রথম সেমেস্টারে রেজাল্ট খারাপ হতেই চেলে গেল ডিপ্রেশনে। বাড়িতে হুলুস্থুলু।
গুপ্তাজি ছেলেকে নিয়ে এলেন। গেলেন বিখ্যাত কয়েকজন নিউরোফিজিশিয়ান এবং অবশ্যই সাইকিয়াট্রিস্টের
দরবারে। ওষুধ চলতে লাগল। ওদিকে আই.আই.টি.তে চিঠি লিখে সময় নেওয়ার, পরের সেমেস্টারের
জন্য অনুমতি নিয়ে রাখার ব্যাপারটাও সামলাতে হচ্ছে। গুপ্তাজিরও ডিপ্রেশনে যাওয়ার মত
অবস্থা। গুপ্তাজি ছেলেকে নিয়ে গেলেন নিজের গুরুদেবের কাছে। গুরুদেব কিছু মন্ত্র-টন্ত্র
দিলেন। কিছু ধ্যান-ট্যান করতে বললেন। ওদিকে গুপ্তাজির স্ত্রী ছেলেকে নিয়ে গেলেন এক
জ্যোতিষীর কাছে। তাঁর উপদেশ মত কিছু আংটি, তাবিজ গড়িয়ে দিলেন। … তারপর স্বামীকে বললেন,
“আমি খড়গপুরে থাকব”। “কোথায়?” “বাইরে। আমি খোঁজখবর নিয়েছি। অনেক মায়েরা থাকে শহরে,
ক্যাম্পাসের বাইরে। ছেলেরা ভরসা পায়”। …
ছেলে এখন ব্যাঙ্গালোরে চাকরি করে। আইটি ফার্ম।
ভালো প্যাকেজ। তার মনে এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই যে সে কিসে ভালো হল। ওষুধে, মন্ত্রে,
তাবিজে না কি মায়ের খড়গপুরে গয়ে থাকায়। …”ইউ কান্ট সে! কত রকমের এনার্জি যে আমাদের
জীবনে কাজ করে!” ইদানিং আরো কয়েকটা আংটি বেড়েছে তার আঙুলে। কেন না তার রুমমেট দুম করে
একটা বড় ওপেনিং পেয়ে গেল। সে পাচ্ছে না।
ঝাজি আমার দিকে তাকিয়ে মাথাটা নাড়লেন। “কী
মুশকিলে যে পড়েছি, কী বলব। … পুরো ফ্যামিলি আমাকে তুলোধোনা করে ছেড়ে দিচ্ছে। আর আমাদের
ফ্যামিলি বলতে বোঝেন তো! বলতে গেলে এ হোল ভিলেজ! পুরো কুনবা!”
ব্যাপারটা এই যে ঝাজির ছেলে আমেরিকায়, একটা
ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়। এখান থেকে ফিজিক্সে এম.এসসি. করে চলে গিয়েছিল। সেখানেই পছন্দ
করেছে এক তামিল সহকর্মিনীকে। বাড়ির লোকের তীব্র বিরোধ যে এক তো মেয়েটি তামিল। তায় ব্রাহ্মণ
নয়। দহেজ নাহয় বাদ দেওয়া যায় কেন না মেয়ে কমাউঁ!
ঝাজি পুরোনো কম্যুনিস্ট। আক্ষেপ করলেন, “এত
বোঝাচ্ছি দাদা! আরে বাবা ব্রাহ্মণ নয় তো কী হয়েছে? কোনো ছোটো জাতের মেয়ে তো আর নয়?
হ্যাঁ, তামিল। তা সে আর কী করা যাবে?...”
যা হোক, ঝাজির ‘ভাবধারাগত সংগ্রামে’ কাজ হল।
কুনবা বুঝল যে তাদের জাত আর মেয়ের জাত ভিন্ন হলেও শূদ্রদমনে সমান অধিকারের উত্তরাধিকারী।
ধূমধামে বিয়ে হল।
ঝাজির ছেলে আরেক ধাপ এগিয়ে। বলল, “চাচাজি,
এমেরিকায় থাকি বলে কি সংস্কার ভুলে গেছি? ফাইন্যালি এটা একটা স্যাক্রেড রিলেশন বলে
কথা। জাত-ধর্ম ভুলে তো আর ঝাঁপিয়ে পড়া যায় না?”
আমার এক পুরোনো ইয়ার কুন্তল চ্যাট্যার্জি।
ম্যাট্রিকের পর বি.কম.টা করেছিল সেকেন্ড ক্লাসে। সারা জীবন ছোট ছোট চাকরি ধরতে আর ছাড়তে
রয়ে গেল। গুছিয়ে বসতে পারল না কোনোদিন। বৌ, ছেলেমেয়ের ভোগান্তি।
ম্যাট্রিকের পর লম্বা ছুটিটায় আমরা নরক গুলজার
করতাম খোকনের বাড়িতে। সদস্যতার শর্ত ছিল বামুন হলে পৈতে ছিঁড়ে ঢুকতে হবে। কুন্তল শুধু
ছেঁড়েই নি, আরো কিছু করেছিল তা আর বলা যাবে না। … আর পরেনি পৈতে।
মাঝে মধ্যে শহরে আসে। রাস্তার ওপার থেকে ষাঁড়ের
মত ডাকে। বদমায়েসির হাসি ছাড়ে একটা। দিলখোলা মানুষ।
আসলে এই ধারণাটাই ভুল যে বিজ্ঞান পড়লে বা বিজ্ঞান
চর্চা করলে জীবনের প্রতি, সমাজের প্রতি মনোভাবে বৈজ্ঞানিক শুচিতা আসবে। জীবিকা ও বৃত্তি
হিসেবে বিজ্ঞান আর কর্ম ও মননের ভিত্তি হিসেবে বিজ্ঞান হয়ত একে অন্যের থেকে এত তফাতে
আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে ছিল না। আর তাই আমরা গত দুই দশকে যখন বিশাল সংখ্যায় ভারতীয়
যুবকে প্রযুক্তির দিকে যেতে দেখলাম, আশা জেগেছিল যে তাদের কর্মে ও মননেও বুঝি বা ভিত্তি
দেবে বিজ্ঞান। জাগবে বিদ্রোহ। ভাঙবে অনেক অচলায়তন।
কিন্তু উল্টোটাই হচ্ছে।
তবে কি হতাশায় ডুবে আক্ষেপ করা ছাড়া কিছু করার
নেই?
………………………
আগে ছিল শিক্ষা, দীক্ষা। শিক্ষা দিত বস্তুচেতনা,
জীবনচেতনা, সমাজচেতনা। এক্ষুনি জানি একজন গর্জে উঠবেন, ‘কেন? ধর্মচেতনা নয় কেন?’ …
হ্যাঁ ভাই, ধর্মচেতনাও। ওই সমাজচেতনার মধ্যেই ছিল সংস্কৃতিচেতনা, ধর্মচেতনা। ঠিক আছে?
…… আর দীক্ষা দিত কর্মচেতনা।
তখনকার যাঁরা শিক্ষাগুরু ছিলেন তাঁরা জানতেন,
শিক্ষার পর দীক্ষারও পর প্রয়োজন। নইলে জীবন হয় নেতির দর্প, আত্মক্ষয়।
তখনকার যাঁরা দীক্ষাগুরু ছিলেন তাঁরাও জানতেন,
দীক্ষার নিচে শিক্ষার ভিতটা জরুরি। নইলে জীবন হয় যন্ত্রবৎ।
মানুষের মানুষ হয়ে ওঠায় খামতিগুলো তাঁরা পুষিয়ে
দিতেন। শিক্ষাগুরুও প্রয়োজনে দীক্ষা দিতেন। দীক্ষাগুরুও প্রয়োজনে শিক্ষা দিতেন।
পঁচিশ বছর আগে এল মানব সম্পদ বিকাশ/উন্নয়ন।
কথাটা খুব সুন্দর। প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে যে মানবিক সম্পদ আছে, তার স্বীকৃতি এবং
তার বিকাশসাধন। যেন বা ‘ওপর থেকে শিক্ষা’র ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার কাটিয়ে ‘নিচ থেকে,
মানুষের প্রত্যন্ত জীবনধারণ থেকে জীবনমূল্যগুলির আবিষ্কার এবং তাদের সংহতিসাধন’।
কিন্তু হল একেবারেই ভিন্ন একটা ব্যাপার। মানুষ,
জ্বলজ্যান্ত মানুষটাই পরিগণিত হল, ধনতন্ত্রের প্রয়োজনে, সম্পদ হিসেবে। যেমন খনিজ সম্পদ,
কৃষিসম্পদ, তেমনই মানবসম্পদ। যেমন মেশিনারি, মেটিরিয়াল তেমনই লেবার। মুনাফার প্রয়োজনে
ওই লেবারের অর্থাৎ লেবার-পাওয়ারের, শ্রমশক্তির উন্নতিসাধন, মেধাশ্রমশক্তির বিকাশ এসবই
হয়ে গেল সরকারি বিভাগটির মূলমন্ত্র। এমনকি, চাহিদা না থাকলে যেমন খনিতে খনিজসম্পদ থাকলেও
তা হয়ে ওঠে পরিত্যক্ত জঙ্গল, রোজগারের অভাবে মানবসম্পদও হয়ে উঠতে লাগল পরিত্যক্ত সামাজিক
জঙ্গল।
বাচ্চাদের আর কী দোষ? তাদের মুনাফার যন্ত্রে
আখ হিসেবে মাড়াই করার জন্য করানো হল ক্যাম্পাস, প্লেসমেন্ট, প্যাকেজের দৌড়। মানসিক
চাপে, অবসাদে তারা খড়কুটো খোঁজে, চেপে ধরে। …
তথ্য বলছে, প্রযুক্তির বিপ্লবে জীবিকার পাঠ
নিতে গিয়ে, অর্থাৎ ফলিত বিজ্ঞান পড়তে গিয়ে, এমনকি তত্ত্বগত প্রকৃতিবিজ্ঞানের পাঠটাও
চুলোয় যেতে বসেছে। প্রকৃতিবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মৌলিক গবেষণায় বিশ্বমঞ্চে ভারতের যে স্থান
ছিল তা গত পঁচিশ বছরে কমে এসেছে ক্রমাগত। লক্ষণীয় ভাবে বেড়েছে চৌর্যবৃত্তির, অন্যের
গবেষণাকে নিজের বলে চালাবার প্রচেষ্টার সংখ্যা।
দোষটা প্রযুক্তি-বিপ্লবের নয়। দোষটা ধনতন্ত্রের।
বিশেষকরে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে ওঠা তথাকথিত ‘অবাধ’ বাজারভিত্তিক অর্থনীতির। পূঁজির
বিশ্বায়নের। … যেহেতু নতুন প্রযুক্তি এদেশে এই অর্থনীতির হাত ধরে এসেছে তাই মাথায় গুলিয়ে
যায় ব্যাপারটা। দেখতে পাই না যে প্রযুক্তিকে বিজ্ঞান থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে এই বিশ্বায়ন।
কেননা তাদের অর্থনীতির মানচিত্রে বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার জন্য কিছু দেশ চিহ্নিত। আর প্রযুক্তি
নিয়ে কাজের জন্য অন্য কিছু দেশ চিহ্নিত। এই তফাৎটা না থাকলে তো মুনাফার মার্জিনটাই
বিপন্ন হওয়ার ভয় থাকবে! আর মুনাফার দর বাড়াতে না পারলে বিশ্বায়নের কাজ কী? আর তাহলে,
প্রযুক্তি আর বিজ্ঞানের মধ্যেকার অন্তর্নিহিত সম্পর্ক? সেটা কুক্ষিগত আছে বহুজাতিক
কম্পানিগুলোর ‘আর এন্ড ডি’ চিহ্নিত ক্যাম্পাসগুলোর গবেষণাগারে।
বস্তুতঃ, এই ধনতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইটাই প্রযুক্তির
কাছে নিয়ে আসবে বিজ্ঞানকে। আর জীবিকা হিসেবে বিজ্ঞানের কাছে নিয়ে আসবে কর্ম ও মননের
ভিত্তি হিসেবে বিজ্ঞানকে। প্রকৃতিবিজ্ঞানের কাছে নিয়ে আসবে সমাজবিজ্ঞানকে। যে শিক্ষিত,
সে দীক্ষিত হবে। যে দীক্ষিত, সে শিক্ষিত হবে।
মানছি তাতে দেরি আছে এখন অনেক। কিন্তু শিক্ষাগুরু
এবং দীক্ষাগুরুরা মন দিয়ে দেখুন। আপনাদের নতুন প্রজন্ম নিজেদের কাজ ঠিকমত না করা সত্ত্বেও
জীবন কিন্তু থেমে থাকে নি।
হয়ত বাঞ্ছনীয়ও নয় অনেক সময়, তবু নতুন নতুন
অভাবিত পথে মানবসম্পদ বিকশিত হচ্ছে প্রতিদিন। তার ত্বরিত ধারাগুলি রোদ্দুরে ঝিলিক দিয়ে
উঠছে মাঝে মধ্যেই।
এমনকি, এও দেখা যাচ্ছে যে যাদের বিজ্ঞান বা
প্রযুক্তির পাঠের সুযোগ পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই এ জীবনে, তাদেরই কর্মে ও মননে ভিত
যোগাচ্ছে বিজ্ঞানচেতনা। বিস্ময়! নয় কি?
[দশ বারো বছর আগে বিহার এস.সি.ই.আর.টি.র ত্রিভাষী পত্রিকায় প্রকাশিত]
Tuesday, October 5, 2021
সঁপেছি হৃদয় তোর গলিপথে স্বদেশ - ফয়েজ আহমদ ফয়েজ
১০.৪.২১
করে যাও যেটা তোমার করার - ফয়েজ আহমদ ফয়েজ
৯.৪.২০১০
কী করি বলো তুমিই - ফয়েজ আহমদ ফয়েজ
নিদো তানিয়ার প্রসঙ্গক্রমে - উদয় প্রকাশ*
মাত্র উনিশ বছরের রোগাপাতলা ছেলে ছিল নিদো তানিয়া। বেসরকারী একটি পেশা সম্পর্কিত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র – ওর সামনে ছিল বৃত্তিগত উন্নতির দীর্ঘ পথ এবং বহু বছরের ভবিষ্যৎ, যা ২৯শে জানুয়ারিতে হঠাৎ পিটিয়ে পিটিয়ে শেষ করে দিল দিল্লীর বাণিজ্যিক বাজার অঞ্চল লাজপতনগরের আটজন দোকানদার। তার হত্যাকারীদের মধ্যে দুজন ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক, ঠিক যেমন ‘নির্ভয়া’ বাস-ধর্ষণের ঘটনায় সবচেয়ে জঘন্য ধর্ষণকারীটি অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিল। এটা স্পষ্ট যে যতদিন না বর্তমান আইনে সংশোধন করা যাচ্ছে ততদিন ওই ছেলেটিকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া যাবেনা। ‘নির্ভয়া’ ঘটনার ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক’ দোষীকেও মাত্র তিন বছরের জন্য শিশু-সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে। এখনো আমাদের বিচারব্যবস্থা এই নতুন, পরিবর্তিত সমাজ-বাস্তবটা বুঝতে পারছেনা যাতে বাচ্চারা আর অপ্রাপ্তবয়স্ক নয়, বয়স্ক। তারা ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, লুট আর হত্যা করা শুরু করেছে। কিছুদিন আগে ঘটিত, দিল্লীর সবচেয়ে বড় লুটের (সাত কোটি টাকা) মাস্টারমাইন্ডও একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিল।
নিদো তানিয়া পাঁচটি ভুল করেছিল। প্রথম ভূল যে সে আজকালকার যুবদের মত চুলে রঙ লাগিয়ে রেখেছিল। দ্বিতীয় ভূল যে সে দিল্লীর একটি পনীরের দোকানে, পনীর বা মাখন ক্রীম ইত্যাদি কিনতে নয়, নিজের এক বন্ধুর ঠিকানা জিজ্ঞেস করতে গিয়েছিল। অর্থাৎ সে ‘কাস্টমার’ ছিল না। মির্জা গালিবের কথায়, যাচ্ছিল সে বাজারের পথেই, কিন্তু খদ্দের ছিল না। আজকাল আমাদের মহানগরগুলো এমনই হয়ে পড়েছে যেখানে প্রত্যেকেই, হয় কিছু বেচে অথবা কেনে, অর্থাৎ পুরো শহরটাই এক বড়সড় শপিং মল। নিদো তানিয়ার তৃতীয় ভূল ছিল যে সে অরুণাচল প্রদেশ থেকে এসেছিল। সেই অরুণাচল প্রদেশ যেখানকার মানুষজনের চেহারাগুলো দিল্লী বা উত্তরভারতের মানুষের থেকে ভিন্ন। সেই অরুণাচল প্রদেশ, যেটাকে চীন বেশ কিছু বছর ধরে নিজের মানচিত্রে শামিল করছে, কিন্তু প্রদেশটি আজও ভারতের অংশ কেননা সেখানকার জনতা নিজেদের ভারতীয় গণতন্ত্রের অংশ মনে করে।
নিদো তানিয়ার চতুর্থ ভূল ছিল যে সে তার দিকে ছোঁড়া মন্তব্যে ক্রুদ্ধ হয়ে দোকানটির কাঁচ ভেঙে দিয়েছিল। সে হোক না কেন যে সে কাঁচ ভাঙার অপরাধে দশ হাজার টাকার জরিমানা দিয়ে দিয়েছিল এবং নিজের হত্যাকারীদের সাথে ‘সমঝোতা’ করে নিয়েছিল। তার পঞ্চম ভূল ছিল যে সে মেনে নিয়েছিল যে দেশের রাজধানী দিল্লী একটি বিকশিত আধুনিক মহানগর এবং এখানে যেকোনো ভারতবাসী নির্ভয়ে স্বাতন্ত্র্য এবং বৈধ নাগরিক অধিকারে বসবাস করতে পারে।
হতে পারে ছেলেটি ভেবেছিল যে তার পিতা নিদো পবিত্র সেই রাজনৈতিক দলের বিধায়ক এবং পরিবার তথা স্বাস্থ্যকল্যাণ বিভাগের সংসদীয় সচিব যে রাজনৈতিক দলের সরকার এখনো কেন্দ্রে শাসন করছে। হতে পারে তার ভিতরে ভ্রান্তি তৈরি করেছিল এই তথ্য যে দেশের প্রধানমন্ত্রীকেও সেই উত্তর-পূর্বের, অর্থাৎ আসামের জনগণ সংসদে নির্বাচিত করে পাঠিয়েছে যে উত্তর-পূর্বের সে নিজেও একজন বাসিন্দা। আসাম উত্তর-পূর্বের সাত বোনের এক বোন, যেমন সাতটি নদীর মিলনে তৈরি হয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদ।
নিদো তানিয়া ভেবেছিল হয়ত যে যদি সাতটি আলাদা আলাদা নদীর মিলনে এক ব্রহ্মপুত্রের জন্ম হতে পারে, তাহলে অসংখ্য বর্ণ, ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা আর সমুদায়ের মিলনে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রেরও জন্ম হয়ে গিয়ে হবে। মাত্র চার দিন আগেই তো এই দিল্লীর রাজপথে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং রাজধানীর সব ভিআইপি গণ্যমান্যদের উপস্থিতিতে প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন করা হয়েছিল, যাতে ভারতের বিবিধতার মন্ত্রমুগ্ধকারী ট্যাবলো পেশ করা হয়েছিল। নিদো তানিয়ার হত্যার চার দিন আগের তারিখ ২৬শে জানুয়ারির এই প্রজাতন্ত্র দিবস ১৯৫০ সালে জারি হওয়া সেই সংবিধানের স্মৃতিতে উদযাপিত হয় যেটি এই প্রজাতন্ত্রে বসবাসকারী প্রত্যেকটি নাগরিককে সমান অধিকার এবং স্বাতন্ত্র্যের গ্যারান্টি দেয়। কিন্তু সেটা তানিয়ার ভ্রান্তি ছিল। অবাস্তব ছিল তার চিন্তাভাবনা, একটা স্বপ্নে বাঁচছিল সে, যে স্বপ্নে আমরা সবাই, বারবার নিরাশ হয়েও একটা জেদবশতঃ বেঁচে থাকি।
নিদো তানিয়ার হত্যা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন খাড়া করে। এটি কোনো সাধারণ অপরাধের ঘটনা নয়, এক প্রজাতন্ত্রের অসফল হয়ে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সংকেত – একটি ‘এমার্জেন্সি এলার্ম’। কিছুদিন আগেই এমেরিকার নামকরা খবরের কাগজ ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’এর একটি সার্ভে দুনিয়ার সেই প্রধানতম দেশগুলোর মধ্যে ভারতকে শীর্ষস্থানে পেয়েছে যেখানে বর্ণভিত্তিক, লিঙ্গভিত্তিক, সামুদায়িক এবং জাতিগত অসহিষ্ণুতা সবচেয়ে বেশি। এশিয়ার অর্থনৈতিক ‘সুপার পাওয়ার’, চাঁদে আর মঙ্গলে উপগ্রহ পাঠানো, পরমাণু ক্লাবের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, মিসাইল টেকনোলজিতে বিশ্বকে আশ্চর্যচকিত করা এই দেশটি নিজের মূলগত চরিত্রে কী করে এত পশ্চাৎপদ, প্রাক-আধুনিক, মধ্যযুগীন সমাজের একটি গোঁড়া হিংসাপরায়ণ দেশ হয়ে চলেছে? ভাববার প্রশ্ন।
কোনো শহরের ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ বদলে সেটিকে ইওরোপের বড় শহরগুলোর মত বানিয়ে দিলে, আধুনিকতম ভোগ্যপণ্যের টেকনোলজি বাজারে ভরে দিলে, প্রত্যেকের হাতে স্মার্ট ফোন আর ল্যাপটপ দিয়ে দিলে, সব জায়গায় সবক’টি সফটড্রিংক আর জাংকফুডের দোকান খুলে দিলে, ইওরোপকেও ম্লান করে দেওয়া বড় বড় মল তৈরি করে দিলে, মেট্রো রেল, মনোরেল চালিয়ে দিলে আর ছয়-আট লেনওয়ালা চওড়া সড়ক তৈরি করে দিলে অথবা কমনওয়েলথ গেমস আর এশিয়ান গেমসের দারুণ সমারোহ সফল করে এবার অলিম্পিক করানোর দাবী করলে কি কোনো মহানগর এবং তাতে বসবাসকারী সমাজ ‘আধুনিক’ হয়ে যায়? সংবিধান, লোকসভা আর বিধানসভার প্রতিষ্ঠা করে দিলে এবং ভোট করিয়ে দিলেই কি সত্যিই আধুনিক ও সভ্য গণতন্ত্রের নির্মাণ সম্পন্ন হয়? বিল্ডার আর কর্পোরেট ঘরানার ঠিকেদারেরাই কি আধুনিক গণতন্ত্রের নির্মাতা? যারা মল-মেট্রো আর আকাশচুম্বী অট্টালিকা বানিয়েছে তারা গণতন্ত্রও বানাতে পারে? গণতান্ত্রিক সমাজ হওয়ার প্রাথমিক ও মৌলিক শর্ত কী কী? এমন অনেক প্রশ্ন আছে, যেগুলো হঠাৎ উঠতে শুরু করেছে।
নিদো তানিয়ার হত্যার কিছুদিন আগে দক্ষিণ-দিল্লীর ওই অঞ্চলেই, বেড়াতে বেরুনো দুই মণিপুরী মেয়ের জুতোয় দুই যুবক নিজেদের পোষা কুকুরের বেল্ট বেঁধে দিয়েছিল আর যখন ভয় পেয়ে মেয়েরা চেঁচাতে শুরু করল, যুবকেরা হাসতে লাগল। যখন একটি মেয়ে কুকুরটাকে দূরে সরাতে পা দিয়ে ঠেলা দিল তখন যুবকেরা মেয়েটির চুল ধরে টানতে টানতে তাকে ‘চিংকি’, ‘ঝিংগা লা লা’, চাউমিন’ বলে গালিগালাজ করল। মেয়েদের বাঁচাতে এগিয়ে আসা উত্তর-পূর্বের দুই যুবককে ওরা মারধর করল। নালিশ করা সত্ত্বেও পুলিস এফআইআর নিলনা।
কিছুকাল আগে দিল্লীর জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় মহিলা আয়োগের যুক্তভাবে করা সার্ভেতে এই তথ্য সামনে এসেছে যে দেশের মহানগরগুলোয় উত্তর-পূর্ব থেকে আসা নারীদের ৬০% বর্ণগত ভেদাভেদ, অপমান এবং উৎপীড়নের শিকার। এই মহানগরগুলোর শীর্ষস্থানে আছে দেশের রাজধানী দিল্লী, যেখানে ৮১% নারীরা এই ভেদাভেদ এবং অপমানের দংশন সহ্য করে চলেছেন। চিংকি, নেপালী, চিনে, চাউমিন সম্বোধন তো চলেই, তার সাথে এটাও জিজ্ঞেস করা হয় আকছার, “তোমরা কি কুকুর আর সাপ খাও?” গুরুত্বপূর্ণ এটাও যে পুলিস এবং প্রশাসনিক কর্তাদের মনেও এসব ধারণা বদ্ধমূল। পাঠকদের মনে আছে হয়ত যে এবারের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান সম্মানীয় অতিথি ছিলেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিঞ্জো আবে। সেদিনের এই গল্পটি কম চিত্তাকর্ষক নয় যে সুরক্ষার সাথে জড়িত এবং অন্যান্য সরকারী আধিকারিকেরা মণিপুর আর মিজোরামের কিছু দর্শকের কাছে এসে বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন, “আপনারা কি জাপানী ডেলিগেশনের সদস্য?” আগ্রায় তাজমহল দেখার টিকিট কিনতে পৌঁছনো উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষদের কাছে পাসপোর্ট চাওয়া তো প্রতিদিনকার ব্যাপার।
এটা স্পষ্ট যে আমাদের শিক্ষাসংস্থাগুলোয় নিজেদের দেশটার বিষয়ে যে শিক্ষা ছাত্রদের দেওয়া হয়েছে তাতে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাব রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৯০এর পর যে নতুন শিক্ষা যেভাবে তিন প্রজন্মকে শিক্ষিত করেছে, তার ফলশ্রুতি এই যে তারা সে দেশ আর সমাজটাকেই জানে না যাতে তারা থাকে। তারা বাণিজ্যিক কম্পানিগুলোর পরিচালন ও মার্কেটিংএর জন্য উপযোগী হতে পারে, কলসেন্টারে কাজ করতে পারে, হাইটেক মজুর হয়ে বিদেশ যেতে পারে এবং রোজগার করতে পারে কিন্তু তারা নিজেদের ভূমি থেকে কর্তিত, নিজেদের পরিবারের জন্য পর আর সমাজের জন্য অনুপযোগী।
এই কারণেই নিদো তানিয়ার হত্যার প্রতিবাদে আসা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাজার হাজার ছাত্র ও যুবদের একটা দাবী এও ছিল যে এনসিইআরটি স্কুলের জন্য এমন পাঠ্যক্রম তৈরি করুক যার মাধ্যমে ছাত্ররা এই দেশের বিবিধতার পূর্ণ তথ্য পেতে পারে। মনে পড়ে যে কখনো রামাস্বামী পেরিয়ার বলেছিলেন, হিন্দী-হিন্দু-হিন্দুস্তানওয়ালা জাতিবাদের সবচেয়ে বড় সংকীর্ণতা যে তারা পুরো দক্ষিণ ভারতটাকে ভুলে যায়। জেনে অবাক হতে হয়না যে আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীও বিন্ধ্য পর্বতের উপরের অংশটিকেই ভারত বলে মানতেন। তাঁর জাতীয় কল্পনির্মাণে দক্ষিণ ভারতই ছিলনা, উত্তর-পূর্বাঞ্চল থাকার তো কথাই ওঠেনা।
শিক্ষা বাদ দিয়ে কোনো সমাজ বা জাতিরাষ্ট্রের নাগরিক তৈরি করা যেতে পারেনা। যদিও মনোবৈজ্ঞানিকেরা বলেন যে শিশুদের আসল ও প্রথম প্রাথমিক বিদ্যালয় হয় তাদের পরিবার। যদি আমাদের পরিবারগুলো নাগরিক নয়, কম্পানির কর্মচারি তৈরি করা কিন্ডারগার্টেন হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে নাগরিক কোথা থেকে আসবে; ভীড়ই জন্ম নেবে আর সে ভীড় নিজের থেকে ভিন্ন কাউকে দেখে তেমনই হিংসাপরায়ণ আচরণ করবে যেমন তানিয়ার সাথে করল।
দিল্লী যদি দেশের সবচেয়ে আধুনিক আর বিকশিত মহানগর হওয়ার বদলে ধর্ষণ, জাতগত গোঁড়ামি আর বর্ণহিংসার রাজধানী হয়ে চলেছে, তাহলে তার কারণগুলো গভীরে গিয়ে খুঁজতে হবে। ভোলা উচিৎ নয় যে ১৯৪৮ সালের ৩০শে জানুয়ারি এই দিল্লীতেই মহাত্মা গান্ধীর হত্যা করেছিল এক সাম্প্রদায়িক উন্মাদ আর ২০১৪ সালের ৩০শে জানুয়ারিতে নিদো তানিয়ার হত্যা করল সেই দিল্লীর সমাজে বাড়তে থাকা বর্ণভিত্তিক হিংসা। কিছু মানুষ এখনও ঘটনাটিকে খুব হাল্কা ভাবে, সাধারণ অঘটনের মত করে দেখছেন। এটা তাঁদের ‘উটপাখিবাদ’, যা ভবিষ্যতে ঘনিয়ে আসা ঝড়ের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজের মাথা বালিতে গুঁজে নেয়।





