Friday, October 9, 2020

অভিব্যক্তি

কী অদ্ভুত না?
লেখার জন্য দরকার বৈপরীত্য!
সাদা আর কালোর,
মসৃণ সমতল আর ছুঁচলোর!
রঙের বৈপরীত্যের কথাই মানুষ আগে জেনেছে –
তাই গুহাচিত্র!
পরে, রাজত্ব বোঝাতে এসেছে খোদাই –
সমতল আর খাঁজের বৈপরীত্য,
খাঁজে আর খাঁজে তফাৎ।
 
আর রাজত্বের হাঁড়ি ভাঙতে হাটে?
আমার তো সেই পাগলটার কথা মনে পড়ে।
তার লাগতো পেচ্ছাপ করার সরকারি দেয়াল
আর কয়লার টুকরো।
পূবে সূর্যের আলো ফোটার আগে ফুটে উঠতো তার
হাতে লেখা বয়ান – মন্ত্রী আর আমলাদের
দুর্নীতি আর নানা অপরাধের কীর্তিকথা,
আদালতের মামলা সংখ্যা, জমির খতিয়ান সংখ্যা, জ্ঞাপন ও এফআইআর
... সন্দেহজনক কোনো মৃত্যুর কথা...
বৈপরীত্য ছিল তার উদ্ভ্রান্ত আচরণে আর অনুশীলিত স্মৃতিতে!
 
আমাদের
দেখেও না দেখায়,
এড়িয়ে যাওয়ায়,
নিজের ধান্ধায় মশগুল থাকায়
কোথাও কোনো বৈপরীত্য ছিল না।
বা, কে জানে, সেটাই বিপরীত ছিল
কোনো অস্ফূট, ভিতরে গোঙানো অভিব্যক্তির!
 
শুধু রঙে নয়, প্রকৃতিতে নয়,
বৈপরীত্য
মগজের ভিতরেও হয় তৈরি।
কখনো দামি, কখনো সস্তা বেঁচে থাকার
প্রাত্যহিক অনুশীলনে আঘাত করে উদ্ভ্রান্তি।
কোনটাকে কাগজ মানবে কোনটাকে কলম –
তোমার বিবেক।




কমরেড নিসার

 শেষগ্রীষ্ম তাঁকে খুব হাল্কা, কৃশকায় করে রক্তে
আরো এক বয়ঃসন্ধি দিয়েছিল, চাপতে রেকাবে;
বলেছিল, দেখ মিঞা এবারের বর্ষা হবে প্লাবী,
অনেক পুরোনো ধোঁয়া মিঠে হয়ে চশমা ভেজাবে ...

দুপুরে পুত্রের নীল জামাটি চড়িয়ে কাঁপা হাতে
মাথায় গামছা ফেলে, ধীরে হেঁটে, ককিয়ে অস্ফূট,
পৌঁছোতেন বৈঠকে পার্টির, সমাবেশে, ও নিত্যই
সংগঠন দপ্তরে, ঈষৎ ফস্কা যেন বা রংরুট ...

দেখতেন লোকেরা যা দেখে, মনে রাখে, ভোলে।
শুনতেন সব শোনা, বলা ও নিজের পালা এলে উঠে ধীরে
ন্যায়-অন্যায়ের চলিত প্রসঙ্গ থেকে রঙ্গে,
(বুড়োটে মাকালদের ভেল্কি দিতে) গরলে ও ক্ষীরে
কারবালা, কুরুক্ষেত্র, কলিঙ্গের সন্ধ্যা ছোঁয়াতেন,
দৃষ্টি থেকে, সংখ্যা থেকে, আশা ও ক্ষোভের দ্বৈতে একচুল
পা রাখার জায়গা খুঁজে অকস্মাৎ ওড়াতেন
শ্রমের কেতনখানি প্রতিবার, অমোঘ, নির্ভুল।

সাথীদের ব্যস্ত বুকে হানতেন প্রশ্ন, যা দাঁতাল।
কেতাবী উত্তর ঠুকে ভাবি, বেশ লড়ছি তো,
কাজেই নিবদ্ধ আছে দিন!
অথচ সে প্রশ্ন নির্বিবাদ প্রথম তাঁর বিতর্কে হত জাদু।
বাঁচার চ্যালেঞ্জ হত, বেড়ে যেত কৌমঋণ!

তেঁতুল গাছের ছায়ে টাটকা মাটির ছোট্ট ঢিবি
তার নিচে শোয়ালাম এক ফালি অশান্ত পৃথিবী।

 


মধুচাঁদ

আমাদের মধুচাঁদ সেই সমুদ্রশহরের এক ভুল জায়গায় আমাদের নামিয়ে দিয়েছিল।
বাসটা চলে যাওয়ার পর, ঘুমচোখে টের পেয়েছিলাম – এখানে তো নামার ছিল না।
খুঁজতে খুঁজতে, পয়সায় কুলোয় তেমন এক হোটেল, ব্রীজের নিচে বাজার-চত্বরে পেলাম।
অনেক বছর পর ঠিক তেমনই বাজার-চত্বর ‘নুক্কড়’ সিরিয়ালে (হোটেলও ছিল নিশ্চয়ই) দেখেছিলাম।
সে যে কী দোতলা হোটেলবাড়ি, খুপরি-খুপরি ঘর, খাট বলতে প্রায় বেঞ্চি!
এক ঘরে আমরা তো পাশের ঘরে দেওরের সাথে বাচ্চাকোলে পালানো বৌ।
তার পরের ঘরে দুই মাঝবয়সী পুরুষ আর এক মহিলার আনন্দ-গুলজার।
জানতাম না রাতে ঘরের জানলা খোলা রাখলে পিছনের বস্তি থেকে পড়বে ঢিল আর সকালে ম্যানেজারের কাছে হবে নালিশ – ‘রাতভর উদোম বেলেল্লাপনা, বলি আমাদের বাড়িতে বৌবাচ্চা আছে কি নেই?’ 
ম্যানেজারের ঘর থেকে কান গরম করে বেরিয়ে ওপরে উঠে দেখি তোমার চান হয়ে গেছে, আর অবাক কান্ড, তুমি খোলা চুলে ওই পাশের ঘরের বৌটির সাথেই গল্প করছ – একসাথে একটা ছবি তুলে দিতে বললে। বললে নিচে উঠোনে তোমার ভেজা কাপড় মেলা হয়ে গেছে আর বাগানটা ঘুরে ঘুরে দেখেছ। “কী সুন্দর জায়গাটা!” বলে বারান্দার জানলায় হাসলে।

এখন ভাবি, ভুল জায়গায় না নামলে কি জানতাম, তোমার মনের এই ব্যাপ্তি?

 


বিহারে রবীন্দ্রনাথ

বোধগয়া

 

সেই রাতগুলো বড় টানে,

যেন ব্যাপ্তির টঙ্কার ।

অন্ধকারে অশ্বত্থের নীচে

বুদ্ধ-মাহাত্ম্য কথক নিবেদিতা,

শ্রোতা রবীন্দ্রনাথ ও ছেলে রথী,

জগদীশ বসু, স্ত্রী অচলা...

পাটনা থেকে তরুণ যদুনাথ ও মথুরা পৌঁছেছেন ।

 

যুক্তির প্রাচীনতম দিগ্বলয়

ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখাচ্ছে এক আবেগদৃপ্ত প্রাণ,

শুনছে পিতৃশোকে বিচলিত এক চিত্ত এবং এক দরদী বৈজ্ঞানিক;

বাকিদের চোখে বিস্ময়ের আলোড়ন ।

রাতভর সবাই বোধগয়ার

মন্দিরে, ঋদ্ধ ভারতের সাধক ।

 

হঠাৎ কেঁপে উঠল সেই দিগ্বলয় !

বুদ্ধ বলে উঠলেন –

আমার শরণে, অর্থাৎ অন্বেষণে এগোও,

দৃঢ় রাখো তর্কের অনুশীলন – ধর্ম আমাদের,

পথটা কঠিন – সঙ্ঘে থাকো হাতেহাত ।

 ............

আমরা ওইসব

বড়মানুষদের ধারেকাছেও আসি না বস্‌ !

কিন্তু রাতগুলো আসে ।

কখনো দিনে, কখনো সন্ধ্যায়, আমাদের আলোচনায় –

 

বুদ্ধের হাঁকটা শুনবো কিনা, সেটা আমাদের এলেম ।

 

 

 

বেলা স্টেশনে

 

সেদিন আপনার গায়ে জ্বর ছিল রবিঠাকুর !

যার পৌঁছোবার কথা ছিল – আমাদেরই, মানে বিহারেরই তো লোক –

পৌঁছোলোই না, অদ্ভুত !

আর আপনি, জোড়াসাঁকোর বাবু,

স্নান না, খাওয়া না,

সুর্যাস্তে সুর্যোদয়ে পথের গান লিখে গেলেন সারা দুপুর ।

 

পরে বুঝেছি, কবি হলেও

আসলে তো ছ’ফুট্টা কুস্তিগীর !

চওড়া কব্জির রক্তবাহী শিরাগুলো দপদপ করছে আজও !

  

 

 

মুঙ্গের

 

ব্যাথার চাঁদ আরো বড়, আরো মাদক হতে থাকে

রক্তে তার শ্বেত নির্জনতা রোধ করে ইস্পাত-আকাশ

একটু আড়াল নীলে, মৌনে মুখর হয় ব্যস্ততা মহাজাগতিক 

 

কষ্টহরণীর ঘাটে কি শমী এসেছিল ?

 

মুঙ্গেরে উত্তরমুখী গঙ্গা,

অথচ কোনো উত্তর নেই

কেন কবির বুকে নিদারূণ এই শেলটা এখানেই বিঁধলো ।

 

এই যে এখন সেতু হল এপার-ওপার

এখনো কোনো উত্তর নেই ! 

 


 

মুজফফরপুর

 

তিরহুতের বৌ আপনার বড় মেয়ে ।

আবার স্কুলও তো একটা খুলে গেছেন, এখনো চলছে ।

শুনি, পণ নিয়ে কোনো ঝামেলায়

আপনাকে আসতে হয়েছিল আবার !

 

হঠাৎ শহর মুজফ্‌ফরপুর যখন

ক্ষুদি আর প্রফুল্লর বোমায় কাঁপলো...

মাধুরী শুনেছিলেন?

ছুটে এসে ধরেছিলেন জানলার গরাদ?

 

যাঃ, একটু বেশি কবিত্ব হয়ে গেল ।

কিন্তু সত্যিই তো,

এত কম আমরা জানি মুজফফরপুরের মাধুরীকে !   

  


 

পাটনা

 

তোমার সাথে ছিল চিত্রাঙ্গদার নাট্যদল ।

পাটনা জাংশন থেকে বিশ্রামের জায়গায় তারপর মহড়ায়...

তারা কেউ সাদাকালো ছিল না, রঙীন,

          তুমিও; জীবন, নিসর্গ, লড়াই – সবই তো বাস্তবে রঙীন !

আর, রঙে বদল নিয়ম, যেমন এলফিনস্টোন এখন ।

 

যা অবস্থা হয়েছে,

টিভিতে সাদাকালো এলেই – অ্যাই থাম, থাম, দেখা,

          কী চলছে চ্যানেলটায় ?

রঙে আর মন স্থির থাকে না, বিশ্বাসও থাকে না আজকাল...

 

ভাঙা স্বাস্থ্য নিয়ে,

বিশ্বভারতীর জন্য চাঁদা চাইতে এসেছিলে, সর্বস্ব ঢেলেছিলে,

যার আচার্য এখন পদগুণে এক দাঙ্গাবাজ ।

 – হাঃ ।



শুটার

মসৃণ, শহুরে রাস্তা, নতুন দোতলা তেতলা ফ্লাইওভার;
রাতে ঝিরঝির বৃষ্টি, সোনালি বাতিমিনার – তিন আততায়ী
আস্তে গতি বাড়ালো বাইকে আজকের শিকারটাকে ধরতে –
পাশের সাততলায় হোটেলের তখন কামরাটি আঁধার

ওই আঁধারটুকুর কিছুটা প্রধান ষড়যন্ত্রীকে, কিছুটা
নিশ্চিন্ত নাগরিককে দেয় রাষ্ট্র। ওদিকে ঘরে পুলিশ-কর্তা,
তরূণ, সদ্য জারি অপরাধ-নিবারণী এ্যাপটা স্মার্টফোনে 
ঘাঁটেন – বাঃ, কী নির্বাধ থানায় ডাইরি হবে অনলাইন...
 
কিন্তু তারপর? তার আগে? ... শহরে বেড়ে চলে দুর্বৃত্তায়ণ -
উন্নয়নে নিষ্পেষিত মানুষের এঁদো গলিপথে এসে হাঁকে
উন্নয়নী দেবতার দূত, “কিরে! কাজটা করবি? রাজা হবি!”

রাজা হওয়ার নিশিডাকে মাঝরাতের শহরে কিংবা সকালে
পার্কের গেটের কাছে, বাড়ির বাইরে ঘুরে রেকি সারে; আরো
বেশি করে দেশের দুরন্ত প্রজন্ম যোগায় ওস্তাদ শুটার!    


তারূণ্যের দেশ

 সাতসকালে সতেরোখানা বাইক, অন্তঃস্রাবে অ্যাড্রিনালিন,

রোববার, বন্দ দোকানপাট – মাঝচত্বরে দাঁড়িয়ে বৈঠক, 

“হামলার অ্যাটিচুড চাই, তবে পুরো হবে টার্গেট। প্রত্যেক

বাড়ি তোমাদের বাজার; আজ কোনদিকে? অবধেশ! রবীন!”

 

এখন সে এম.আর.এর দিন নেই, ইয়েজ্‌দি হাঁকিয়ে মিঠাপুর

গুমটি পেরিয়ে...বীমা এজেন্টেরও কি আছে? সব সেল্‌স - ভীড়,

ঘাম, ছাঁটাইয়ের হুমকি, গলায় জিপিএস ট্র্যাকার – “শোহেব, তোমার

সিগন্যালে কাটনি, চা খাচ্ছো স্টেশনে; সাতনা যথেষ্ট দূর!”

 

এবং সবটাই তো বাজার – আলাদা আলাদা - চুল, খুলি, কান

চোখ, কপাল, নাক, গলা, চামড়া, নোখ, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেহের...

মেডিক্যাল, কস্মেটিক, জিমের আসবাব, হেল্‌থড্রিঙ্ক, গার্মেন্ট্‌স;

ঘরে কড়া নাড়ে শীর্ণ কালো মেয়ে, “ধুপকাঠি নেবেন? সাবান?”

 

অদৃশ্য চাবুকে বিষোচ্ছে তারূণ্যের দেশ, জীবন তবু ঢেউ;

“আমরা ফ্রেঞ্চাইজি মশাই, চাকরি গেছে, যান মুম্বই, দিউ!” 

এবারের বর্ষা তোমায় বাঙালির…

এবারের বর্ষা তোমায় বাঙালির খাসতালুক গদ্যে জাগাবো।

যেমন এ উদ্দীপক মেঘান্ধকার–ভুত
সুর্যস্নাত পাতায় জলবিন্দুর হাসি
দিগন্তে বিদ্যুৎচমক; --এ্যাডভেঞ্চার
জাগায় বাঙালিয়ানার দুরন্ত কিছু, মহারাজ।

তেমনই গদ্যে এবারের বর্ষা তোমায়
নিষিদ্ধ অতিক্রমণে 
সমুদ্রের দিকে নিয়ে গিয়ে
জাগাবো বন্দরের দুপুরে।

টিপটিপ বৃষ্টির অনিঃশেষে
ভাত বা ধাতের তাড়ায় যে নিরুদ্দেশ সফর,
বোটের তেরপলের নিচে বেআইনি...........

এবারে কোথায় সারেং?
কোসোভো না ইস্ট টিমোর?
বাগদাদ?
জাফনা, গাজা স্ট্রিপ, নাকি এরিট্রিয়া?

ভাষার মেঘতোরণ দিয়ে ঢুকে খুঁজবো
ইরাবতি মেকং হয়ে আবিশ্ব এক প্রবল জাতিস্মৃতিধারা

ওখানেই আকাশটা যখন রীডবাঁশির সুরে ফিকে নীল,
বলব, ‘ভারতবর্ষ? ওই যে ওই ঠান!
বাদবাকি যা দেখছেন সব নানা জলের পিছুটান!
যাবেন নাকি সুমাত্রা, বালি?
নৌকো তৈরি, ওস্তাদ নাবিক,
আজাদ হিন্দের ছেঁড়া উর্দি,
জাতে ধর্মে কিছু হিঁদু,
মোছলমান, কিছু বৌদ্ধ, লোমাই কাত্তিকও বটি,
মোট সব মেলায়ে বাঙালি!’

এবারের বর্ষা তোমায় সোনার তরী নয় বরং
বিপর্যস্ত সময়ের চোরাগলিতে ফিরিয়ে
মাশাল্লা, এক জাহাজি বাঙালিয়ানায় শানাবো।