Wednesday, February 17, 2021

কৃষক সভার স্মৃতি - স্বামী সহজানন্দ সরস্বতী


যখন প্রথম প্রথম কৃষক সভা এবং কৃষক সংগঠনের ভাবনা আমাদের এবং আমাদের কয়েকজন সাথির মাথায় এসেছিল তখন সেটা ধোঁয়াটেই ছিল। সংগঠনের রূপরেখা বলতে স্পষ্টভাবে কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। দিকের জ্ঞান বা তীরের সন্ধান নেই তবু অতল সমুদ্রে জাহাজ চালানোর মত, আকস্মিকভাবে শুরু করা একটা চেষ্টা ছিল। এমনকি দিক-নির্ণায়ক যন্ত্রও ছিল না যে জাহাজটা ঠিক মত চালাতাম। এত দিন পর মনেও পড়ে না কিসের প্রেরণায় আমরা ওদিকে এগিয়েছিলাম। অবশ্যই উদ্দেশ্য ছিল কিছু, কাজটা শুরু করার, কিন্তু ভাসাভাসা ছিল সেসব। তবু, কী আমাদের প্রেরিত করল হঠাৎ, সেটা একটা রহস্যই, এবং রহস্যই থাকবে। যেন মনে হয় হঠাৎই আমরা ওদিকে ভেসে গেলাম। তবু, এ জায়গাটা আরেকটু স্পষ্ট করে নিলে ভালো হয়।

কৃষক সভা গঠন করার ভাবনা প্রথম জেগেছিল ১৯২৭ সালের শেষ দিনগুলোয়। সে সময় আমি কংগ্রেসের প্রাদেশিক নীতিতে, বা বলতে পারেন ১৯২৬ সালের কাউন্সিল নির্বাচনে বিহারের কিছু বড় নেতার কাজেকর্মে তিতিবিরক্ত হয়ে পড়েছিলাম। তাই স্বরাজ্য পার্টির প্রার্থীদের সমর্থন না করে লালা লাজপতরায় এবং পন্ডিত মদনমোহন মালবীয়র ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টিকেই সমর্থন করেছিলাম। বিহারে যারা প্রার্থী ছিল তাঁদের ওপর লালাজী এবং মালবীয়জীর আশীর্বাদ ছিল। কিন্তু অন্যদিকে খাঁটি গান্ধীবাদী তো ছিলামই। তাই কংগ্রেসের ওপর এক ধরণের বিরক্তি এসে গেলেও গান্ধীবাদে পুরোপুরি অনুরক্ত ছিলাম। এমনও নয় যে গান্ধীবাদী ঢঙে কৃষক সভা তৈরি করার ভাবনা ছিল না। আসলে সে সময় তো এ প্রশ্নটাই ছিল না। যখন কৃষক সভারই কোনো কথা ওঠেনি আগে তো গান্ধীবাদী সভার কথা ওঠে কি করে? তবু, সুত্রপাত হল কৃষক সভার।

ঠিক এধরণেরই ব্যাপার ১৯৩২-৩৩এও হল। সে সময়েও, ১৯৩০ সালের লড়াইয়ের পর, কংগ্রেসের প্রতি আমার বিরাগ জন্মেছিল; রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম, কৃষক সভার সাথে কোনো সম্পর্ক রাখতাম না। এবারের বিরাগের কারণটাও অদ্ভুত ছিল। ১৯২২ সালে আর ১৯৩০ সালে জেলে যাওয়ার পর দেখেছিলাম যে যারা গান্ধীজীর নামেই জেলে গেছে, তারাই এক এক করে তাঁর সব কথা অস্বীকার করে আর অন্য কাউকে শোনেও না। এতে ভীষণ কষ্ট পেলাম। ভাবলাম যে যেখানে কোনো শৃংখলা নেই, নিয়ম-পালন নেই, অনুশাসন নেই, ‘ডিসিপ্লিন’ নেই, সে প্রতিষ্ঠান খুব বিপজ্জনক। তাই বিরাগী হয়ে গেলাম আর ১৯৩২এর লড়াই থেকে বিচ্ছিন্নই রইলাম। কিন্তু ঠিক সেই সময়, হাজার অনিচ্ছা সত্ত্বেও, জোরালোভাবে কৃষক সভার দিকে আকর্ষিত হয়ে গেলাম। ১৯২৭ সাল কৃষক সভার জন্মের সময় ছিল আর ১৯৩৩ সাল তার পুনর্জন্মের। মাঝের দু’তিন বছর সভা মৃতবৎ ছিল।

এভাবে, দেখি যে রাজনীতির প্রতি বৈরাগ্যের সময়টাতেই আমি কৃষক সভার দিকে আকৃষ্ট হয়েছিলাম। এটাও অদ্ভুত ব্যাপার রাজনীতির প্রতি বিরাগ সত্ত্বেও কৃষক সভার প্রতি আমার বিরাগ হল না। দুবারের বৈরাগ্যে একই ধরণের চিন্ত ছিল যে যারা কংগ্রেস আর গান্ধীজীর সাথে প্রতারণা করতে পারে, ছল করতে পারে তারা জনগণের সাথে কী না করতে পারে! অতএব তাদের সাথে আমি থাকতে পারিনা, কোনোরকম সহযোগিতা থাকতে পারেনা। তবুও কৃষক সভায় তারাই এল এবং রইল। কিন্তু তারা যাতে না আসতে পারে তেমন কোনো চেষ্টাও আমি করিনি। আজ একটা ধাঁধা মনে হয় যে কেন আমি সে চেষ্টা করিনি। তাই তো বলি যে কিসের প্রেরণায় টান খেয়ে আমি চলে এলাম তা স্পষ্ট দেখতে পাই না। বলা যেতে পারে যে বৈরাগ্য বোধহয় ভবিষ্যতের অজ্ঞাত বিজ্ঞপ্তি ছিল এবং ইঙ্গিত করছিল যে এমন লোকেদের দিয়ে তো কৃষকদের কোনো লাভ হবেনা – ফলে একদিন না একদিন এদের বিচ্ছিন্ন করতেই হবে। একথাটা একটু মনে ধরে।

সে সময় আরো একটা ব্যাপার ছিল যেটা ওপর ওপর দেখতে একই রকম উদ্ভট মনে হয়। কৃষক সভাও তো রাজনৈতিক পদার্থ এবং আজ এটা স্পষ্ট। সবাই মানে যে রাজনীতির সার হল রুটি, আর তারই প্রশ্নের সমাধান করবে কৃষক সভা। তাহলে রাজনীতির প্রতি বৈরাগ্যে, অন্ততঃ ১৯৩২-৩৩এর দিনগুলোয়, কৃষক সভার প্রতিও অরূচি শামিল থাকার কথা। অথচ সে বৈরাগ্য আমায় কংগ্রেসে যাওয়ার পথে আটকালেও কৃষক সভায় ঝাঁপ দিতে কেন আটকাল না বুঝতে পারি না। কৃষক সভার রাজনীতিও ভিন্ন হবে, অর্থনীতি(রুটি)মূলক হবে, বোধহয় একথাটা মাথায় ছিল। রাজনীতি আমাদের সাধন যদিও বা, সাধ্য তো রুটি – এই দৃষ্টিই সম্ভবতঃ মনের ভিতরে অপ্রকটভাবে কাজ করছিল, যেটা পরে স্পষ্ট হল। কিন্তু এটুকু বললেই তো সে সময়কার পরিস্থিতির বহির্গত জটিলতা শেষ হয়ে যায় না। সে তো পরিষ্কার দেখা যায়। তবু এটুকু স্পষ্ট হয়েই যায় যে আমার অন্তরের ভাবনা কৃষকদের রঙে রাঙিয়ে ছিল।

কিন্তু গান্ধীবাদের শ্রেণি-সামঞ্জস্যের (class-collaboration) সাথে কৃষক সভার কী সম্পর্ক, সে প্রশ্নটা তো থেকেই যায়। আমি তো সে সময় পুরোপুরি গান্ধীবাদী ছিলাম। রাজনীতিকে ধর্ম মনে করতাম। যদিও এদিকে অনেক বছরের অভিজ্ঞতা বার বার স্পষ্ট করেছে যে রাজনীতির ওপর ধর্মের রঙ চড়ান অসম্ভব, নিরর্থক এবং বিপজ্জনক, তাই বৈরাগ্যও হল। কিন্তু সে সময় ভাবনাচিন্তা সেরকমই ছিল আর ধর্ম তো শ্রেণি-সামঞ্জস্যই; তাতে শ্রেণি-সংগ্রামের (class-struggle) সম্ভাবনা কোথায়? ফলে কৃষক সভাও সেই দৃষ্টিকোণ থেকে তৈরি হল। কিন্তু তাতেও একটা বৈচিত্র ছিল যা ভবিষ্যতের খবর দিচ্ছিল। যেন একটা ইশারা ছিল ওইদিকের।

আসলে ১৯২৭ সালের শেষ দিনগুলোয় প্রথম প্রথম কৃষক সভার আয়োজন, প্রারম্ভ ও সে সম্পর্কিত অনেকগুলো বৈঠক করার পর যখন ১৯২৮ সালের ৪ঠা মার্চে আনুষ্ঠানিক ভাবে কৃষক সভা গঠন করা হল তখন তার নিয়মাবলিতে একটি ধারা যোগ করা হল যে “যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কাজের দ্বারা নিজেদের কৃষক-স্বার্থের শত্রু প্রমাণিত করেছে তারা এই সভার সদস্য হতে পারবে না”। একদিকে মেল-বন্ধন আর সামঞ্জস্যের ভাবনা আর অন্যদিকে কৃষক সভার এমন দুর্গ-প্রহরা যে কৃষকদের মধ্যেও তারাই শুধু সদস্য হবে যারা বাস্তবে কৃষক-স্বার্থের শত্রু প্রমাণিত হয়নি। এ এক অদ্ভুত কথা ছিল। এধরণের লোকেরা কৃষক সভায় এসেও বা করত কী? যখন জমিদারদের সাথে কোনো যুদ্ধ করারই ছিলনা তখন এত সাবধানতার কারণ? জমিদারদের গুপ্তচর এবং ‘ফিফথ কলাম্ন’ ওতে থেকেই বা কী অনিষ্ট করতে পারত? বিশেষত্ব তো এটাই যে প্রারম্ভিক সভায় যে সিদ্ধান্তটা হয়ে গেল সেটা বিহার প্রাদেশিক কিসান সভা এবং অল ইন্ডিয়া কিসান সভার নিয়মাবলিতেও ঢুকে গেল। আমার মাথায় তো কথাটা বসেই ছিল। ফলে সব জায়গায় এর দরকার আমি বুঝিয়ে গেলাম। এভাবে, অজ্ঞাতভাবে, না চাইতেও, শ্রেণি-সংগ্রামের প্রস্তুতি প্রথম থেকেই নিচ্ছিলাম বা অন্ততঃ তার প্রয়োজন দেখতে পাচ্ছিলাম অন্তর্দৃষ্টিতে – এমনই মনে হয়।

প্রথম যে সভাটা হল সেটা প্রদেশ স্তরের তো ছিলই না পাটনা জেলা স্তরেরও ছিল না। সুত্রপাত হয়েছিল বিহটা আশ্রমে এবং বিহটা পাটনা জেলার পশ্চিমী অংশের প্রায় প্রান্তে। ওখান থেকে তিন মাইল পশ্চিমে গেলে শাহাবাদ জেলা শুরু হয়ে যায়। সে সময় প্রাদেশিক কাউন্সিলের জন্য দুজন সদস্য নির্বাচন করার ছিল – এক পূর্ব অংশ থেকে আরেকজন পশ্চিম অংশ থেকে। এই নির্বাচনের কথা ভেবে পাটনা জেলাকে দুভাগে ভাগ করা হয়েছিল এবং বিহটার সভা পশ্চিম অংশের সভা ছিল। তাই তার নাম রাখা হয়েছিল, পশ্চিম পাটনা কিসান সভা। কোনো বিপ্লবী চিন্তাভাবনা তো মাথায় ছিলই না। বিধানগত চাপ সৃষ্টি করে কৃষকদের কিছু কল্যাণসাধন করা এবং তাদের কষ্ট দূর করার চিন্তা ছিল। নইলে শ্রেণি-সামঞ্জস্য থাকত না। ভাবা হয়েছিল যে যেই ভোট চাইতে আসুক তাকে কৃষকদের জন্য কিছু করার স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য করা হবে।

পশ্চিম পটনায় ভরতপুরা, ধরহরা ইত্যাদি পুরোনো জমিদারি আছে। সে সময় তাদের যে অত্যাচার হত কৃষকদের ওপর তার তুলনা পুরো বিহার প্রদেশেও বোধহয় ছিলনা। পশুদের থেকেও নিকৃষ্টতর অবস্থা ছিল কৃষকদের এবং ছোটো বা বড় বলে কথিত জাতের কৃষকদের একই লাঠি দিয়ে হাঁকানো হত। এই দিক থেকে ওখানে পূর্ণ সাম্যবাদ ছিল। যদিও ওই জমিদারদের অত্যাচারের বিষয়ে সবটা তখন জানতাম না; পরে জানলাম। সে সময় বিশেষ জানার মনোবৃত্তিও ছিলনা। তবুও, অত্যাচারের প্রসঙ্গগুলো এত বেশি, জ্বলন্ত এবং স্পষ্ট ছিল যে কিছু না কিছু খবর আমাদের কানে পৌঁছেই যেত। আমরা এটাও জানতে পেরেছিলাম যে ১৯২১ সালের অসহযোগ যুগে পাটনার এক স্বনামধন্য নেতা ওই জমিদারিগুলোতে একটাও সফল মিটিং করতে পারেনি। জমিদারদের ইশারায় তাদের ওপর গোবর ইত্যাদি নোংরা জিনিষও ছোঁড়া হয়েছিল। লাঠির জোরে কৃষকদের সভায় যেতে দেওয়া হয়নি। আমরা ভাবলাম, কোনো দিন এই ধরণের অত্যাচার দু দলের মধ্যে সংঘাত বাধাবেই আর এধরণের গৃহ-কলহে স্বাধীনতার লড়াই দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলে আন্দোলনের চাপে অত্যাচার কম করার এবং এধরণের গৃহ-কলহ রোধ করার ভাবনা এল মাথায়। ধরহরারই এক জমিদার সদ্য কাউন্সিলে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার যথেষ্ট প্রতিপত্তিও ছিল। আমরা ভাবলাম যে সংগঠিত ভাবে কাজ করলে ভোটের চিন্তায় সে চাপে পড়বে আর কাজ হয়ে যাবে। কিছুটা সত্যিও ছিল এতে। সেই জমিদার সাহেব এই সভার নামে ভীষণ চমকে উঠলেন আর এর বিরুদ্ধে প্রচার করার চেষ্টাও করলেন। শোষকেরা তো ছারপোকার মত; অত্যন্ত ধূর্ত। তাই সজাগ ছিল। আমাদেরও খারাপ লাগল যে সে এত কঠোর শত্রু কেন হল। কিন্তু সেটা তো হিসেব মতই ছিল। আসলে আমরা সে সময় জমিদারিকে সে নজরে দেখতাম না যেমন এখন দেখছি। তবু বিরক্তিটা কায়েম রইল আর ১৯৩০এ হাজারিবাগ জেলে নিজের সাফাই দেওয়ার জন্য জমিদার সাহেব আমাদের কাছে এসেছিলেন। মনে হচ্ছিল বেশ ভয় পেয়েছেন। সে ভয়টা সত্যি হল, অবশ্য দেরিতে। কেননা কৃষক সভাই ১৯৩৬-৩৭ সালের নির্বাচনে তাঁকে আগে এসেম্বলিতে পটকান দিল তার পর ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডেও। মালদার লোকেরা দূরদর্শী হয়। ফলে বিপদের আভাসটা আগে থেকেই পাচ্ছিলেন যে কোনো না কোনো একদিন সংঘাত হবেই। 

সভা যে পুরো জেলাকে নিয়ে গঠন করা হল না তার কারণ ছিল আমাদের সাবধানতা। যতটুকু শক্তি আছ ততটুকুই দায়িত্ব নাও, যাতে ভালোভাবে চালাতে পার, এই নীতি আমাদের তাড়াহুড়ো করা থেকে আটকেছে। এই চিন্তা ছিল বলেই আমরা অল-ইন্ডিয়া কিসান সভা গঠন করতে অনেকদিন দোনামনা করেছিলাম। এই কারণেই আমরা প্রাদেশিক কৃষক সভায় থাকতে – বা তাতে দায়িত্ব নিতেও – অনেক আগাপিছা করেছিলাম। একই কারণে জেলার দায়িত্ব নিতেও আমরা সে সময় প্রস্তুত ছিলাম না। কিন্তু কে জানত যে দুই বছর হতে না হতে বিহার প্রাদেশিক কিসান সভা গঠিত হবেই এবং শুধু তার গঠনে নয় তার পুরো দায়িত্ব নিতেও আমাদের এগিয়ে আসতে হবে? অবশেষে ১৯২৯এর নভেম্বর মাসে সেটাই হল এবং সোনপুর মেলায় প্রাদেশিক কৃষক সভা গঠিত হল।

১৯২৯ সালের ডিসেম্বর মাস। লাহোর কংগ্রেসের আগে আর আমাদের বিহার প্রাদেশিক কিসান সভা তৈরি হয়ে যাওয়ার পরই বিহারে সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের সফর হল। রাজ্যের সব কটি প্রধান স্থানে তাঁর সফর হল। সবার রায় হল যে নবজাত কৃষক সভা এই সফরটাকে কাজে লাগাক না কেন? শ্রী বল্লভভাই সদ্য কৃষক আন্দোলন এবং কৃষকদের লড়াইয়ের নামেই সরদার হয়েছিলেন। বারদৌলির কৃষকদের লড়াইয়ের পরিচালক হওয়ার অধিকারেই তিনি সরদার উপাধি পেয়েছিলেন। আমরা ভাবলাম আমাদের কৃষক আন্দোলন তাঁর কাছ থেকে উৎসাহ নিক। তাই হল। যেখানে যেখানে তাঁর সফরের কর্মসূচি ছিল সেখানে সেখানে ঠিক তাঁর আগে আমরা কিসান সভা করে নিতাম এবং তারপর সেই সভাতেই উনি বক্তব্য রাখতে আসতেন। কোনো কোনো জায়গায় উনি আমাদের এবং আমাদের কিসান সভার নামও নিয়েছিলেন এবং তাকে সাহায্য করতেও বলেছিলেন। যদিও আমরা কিসান সভার প্রস্তুতি এবং মানুষের উপস্থিতি কাজে লাগিয়ে কৃষকদের বাণী তাদের শুনিয়ে দেওয়াটাকেই বড় লাভ মানতাম।

মুজফফরপুর জেলার সীতামঢ়ী বসতেও একটা বড় সভা হল। আমরা নিজেদের কাজ করে নিয়েছিলাম। উনি যখন বলতে উঠলেন তখন নানান কথার মাঝে জমিদারি প্রথার বিষয়েও অনেক কিছু বললেন আর পরিষ্কার বলে দিলেন যে এই প্রথার কোনো প্রয়োজন নেই। বললেন যে এরা গরীব কৃষকদের ওপর অত্যাচার করে, আর এই মহোদয়রা নিজেদের শক্তিশালী মনে করে। মানুষও এদের তেমনই মনে করে আর তাই ভয়ও পায়। কিন্তু এরা তো একান্ত দূর্বল। একবার যদি জোরে এদের মাথা চেপে দেওয়া হয় তাহলে সব ঘিলু বাইরে বেরিয়ে আসবে। এদের সামনে ভয় পাওয়ার কী আছে? এদের প্রয়োজনই বা কী? কোনো কাজ তো করেনা এরা! হ্যাঁ, পথে বাধার সৃষ্টি করে নিঃসন্দেহে। কে জানে আজ তিনিই বদলে গেলেন, দুনিয়াটা পালটে গেল নাকি জমিদার অন্য রকম হয়ে গেল। কেননা এখন আর এসব কথা উনি বলেন না, বরং শোনা যায় যে উনি জমিদারদের সমর্থক হয়ে গেছেন। সময়ে সময়ে পরিবর্তন হতেই থাকে আর নেতারা সেই পরিবর্তনে ব্যতিক্রম নন। বোধহয় আজকাল উনি বুঝদার এবং দূরদর্শী হয়ে গেছেন যখন নাকি আগে উনি শুধু আন্দোলনকারী (agitator) ছিলেন। কিন্তু ধৃষ্টতা ক্ষমা করবেন। আমাদের তো বুঝদারের বদলে ‘অ্যাজিটেটর’ই চাই। নিজের নিজের বুঝের আর প্রয়োজনের ব্যাপার।

হ্যাঁ, তো সেই সভা থেকে আমরা রাতে লরিতে মুজফফরপুরের দিকে রওনা দিলাম। মাঝরাতে গাড়ি ধরে আমাদের ছাপরা যাওয়ার ছিল। বাবু রামদয়ালু সিং, পন্ডিত যমুনা কার্পী এবং আমি, তিনজনেই লরিতে বসেছিলাম। আমি ছিলাম প্রাদেশিক কিসানসভার সভাপতি এবং কার্পীজি তার যুগ্ম সম্পাদক (ডিভিজনাল সেক্রেটারি)। বাবু রামদয়ালু সিং প্রাদেশিক কিসান সভা গঠনে খুব বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিসান সভার উন্নতিতে তিনি মগ্ন ছিলেন। এভাবে আমরা তিনজনেই সভার হর্তাকর্তা ছিলাম – সব কিছু ছিলাম। আমরাই তিনজনে সভা তৈরি করেছিলাম আর আমরা তিনজনে শেষ হয়ে গেলে সভাও শেষ হয়ে যেত নিশ্চিত।

লরি রওনা দিল। রাত দশটা বাজছিল। বাবু রামদয়ালু সিং ড্রাইভারের পাশে সামনের সিটে বসেছিলেন আর আমরা ভিতরে ছিলাম। লরি চলতে চলতে তিনভাগের একভাগ রাস্তা পার হয়ে রুনিসৈদপুরে দাঁড়াল। ড্রাইভার লরি ছেড়ে কোথাও গেল আর কিছুক্ষণ পরে ফিরে এল। আমরা চললাম। কিছু দূর চলার পর ড্রাইভারের ঝিমুনি আসতে লাগল। ফল হল যে লরি এঁকেবেঁকে চলতে শুরু করল। কখনো বাঁ’ধারে কখনো ডানধারে পিছলে পড়ছিল। ড্রাইভার ঠিক মত সামলাতে পারত না। এই রাস্তাও এত বিপজ্জনক যে অনেক দুর্ঘটনা (accidents) ঘটে গেছে। মোটর গাড়ি উল্টে গেছে, লোকে মারা গেছে। সময়টাও রাত। ক্ষণে ক্ষণে বিপদের সম্ভাবনা ছিল।

বাবু রামদয়ালু সিং ব্যাপারটা বুঝে ফেললেন। ড্রাইভারকে ঝিমোতে দেখে আগেও দু-চারবার তাকে সামলেছিলেন। কিন্তু সে তো আর ঘুমিয়ে পড়েনি। চোখে তার ঘুম ছিল না, ছিল নেশা। রুনিসৈদপুরে সে মদ খেয়ে নিয়েছিল। এখন উনি ঘাবড়ে গেলেন। ভয়ে ঘাম বেরুতে লাগল। যখন নাকি ডিসেম্বরের হাড়কাঁপানো শীত ছিল। আর ওই এলাকায় তো আরো বেশি ঠান্ডা পড়ে। বার বার উনি ড্রাইভারকে সজাগ করছিলেন। কিন্তু সেই নেশাই বা কী যেটা মাথায় না চড়ে আর অকেজো না করে? শেষে তিনি আর থাকতে পারলেন না আর জবর্দস্তি লরি থামালেন। তখন গিয়ে আমরা বুঝলাম যে কিছু হয়েছে। তার আগে তো কিছুই বুঝিনি।

আমরা সবাই নেমে পড়লাম। বাবুসাহেব বললেন যে ড্রাইভার মদ খেয়ে আমাদের সবাইকে মারতে চাইছে। দেখুন, আমি ঘামে ভিজে গেছি যখন নাকি এই হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। লরিতে আবার হাওয়াও লাগে; আমার তো কাঁপা উচিৎ ছিল। সবার প্রাণ বিপদে দেখে আমি শিউরে উঠছিলাম। যখন দেখলাম আর কোনো উপায় নেই তখন থামিয়েছি। যদি কোনো ঘটনা হয়ে যেত, লরি পালটি খেত বা নিচে গিয়ে পড়ত তাহলে পুরো বিহার প্রাদেশিক কিসান সভা শেষ হয়ে যেত। সবাই তো আমরা এতেই বসে আছি। কাল আমাদের শত্রুদের ঘরে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলত। তাই আমি এর নাম-ঠিকানা নোট করে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে রিপোর্ট করব। যাতে এর পর এইধরণের শয়তানি এই ড্রাইভার না করে আর মিছিমিছি মানুষের প্রাণ বিপদে না ফ্যালে।

বাবুসাহেব সত্যিই ড্রাইভারের নাম-ঠিকানা লিখলেন আর ড্রাইভার তাতে ভয়ও পেয়ে গেল। ফল হল যে আমরা সবাই ভালোভাবে মুজফফরপুর স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। ট্রেনটাও ধরা গেল। জানিনা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে রিপোর্ট হয়েছিল কিনা। কিন্তু ‘পুরো কিসান সভা শেষ হয়ে যেত’ কথাটা আমি ভুলতে পারি না। কী মধুর এই স্মৃতি! 

কিছু লোকের ধারণা যে তারা কখনও ভুল করেনি আর তাদের চিন্তাভাবনায় কখনও বিকাশও হয়নি। তারা ভাবে যে তাদের চিন্তাভাবনা তো প্রথম থেকেই পাকাপোক্ত। তাই যাদের চিন্তাভাবনার ক্রমবিকাশ হয়েছে তাদের নিয়ে তারা সময় সময়, প্রয়োজন মত ঠাট্টা করে। সেই সব বন্ধুরাই এখন নতুন রাস্তা ধরেছে যে যে প্রগতিশীল কাজে তাদের শিলমোহর পড়েনি সেসব কাজ অর্থহীন এবং আবর্জনা। তারা এটাও বলার সাহস করে যে বিহার প্রাদেশিক কিসান সভা কংগ্রেসই তৈরি করেছে। বা ঘুরিয়ে বলে যে সভার প্রতিষ্ঠাতারা গোঁড়া (orthodox) কংগ্রেসি। তাদের ইশারা সেইসব কংগ্রেসিদের দিকে যাদের গান্ধীবাদী বলা হয়। এই আওয়াজটা সদ্য উঠেছে। এর পিছনে কী রহস্য আছে কে জানে!

কিন্তু আসল কথা তো এটাই যে আমি, পন্ডিত যমুনা কার্পী আর বাবু রামদয়ালু সিং, এই তিনজনই তার মূলে ছুলাম – এই তিনজনেই বিষয়টা নিয়ে ভেবেছি, কী করে শুরু করা যায় তা নিয়ে চিন্তা করেছি, সোনপুরের মেলাটাই সুবর্ণসুযোগ এই সিদ্ধান্ত করেছি, মানুষজনের কাছে দৌড়েছি, নোটিস ছাপিয়েছি, বিলি করেছি আর মেলায় পুরো আয়জনটা করেছি। কেউ বলতেই পারে না যা চতুর্থ জনও কেউ ছিল। এটা কঠোর সত্য অটল কথা। আর এই তিনজনের মধ্যে এক রামদয়ালুবাবুকেই গান্ধীবাদী বলা যায়। এখানে ভিত্তিহীন কথার কোনো জায়গাই নেই।

এটা ঠিক যে নামমাত্র কিছু কংগ্রেসি প্রমুখ সভার সাথে ছিলেন, বা বলা উচিৎ মেম্বার ছিলেন। কিন্তু এই মেম্বারি তো নিয়মমাফিক ছিল না। কিসান সভার উদ্দেশ্যে স্বাক্ষর করে আর সদস্যতা চাঁদা দিয়ে কতজন মেম্বার ছিলেন কেউ বলবে? এমন মেম্বার হতে ওদের মধ্যে একজনও প্রস্তুত ছিল না। বরং সভা গঠিত হওয়ার অনেক আগেই তাদের মধ্যেকার প্রধান লোকেরা বিরোধ শুরু করে দিল। এমনকি সভায় শামিল হওয়ার বিরুদ্ধে বিজ্ঞপ্তি বিলি করা হল প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির তরফ থেকে। এটুকুই শুধু নয়। সোনপুরের পরেই যখন ওদের কাছে সম্মতি চাওয়া হল তখন বাবু ব্রজকিশোর প্রসাদ, যাঁকে সে সময় কংগ্রেসের মাথা বলে মান্য করা হত, তীব্র বিরোধ করলেন আর স্পষ্ট বলে দিলেন যে একটা বিপজ্জনক জিনিষ তৈরি হচ্ছে, কাজেই আমি এর সাথে নেই। এটা ঠিক যে অন্যেরা সে সময় আপত্তি করেনি। সত্যি এটাই যে আপত্তি করার সুযোগই তারা পায়নি। তারা বুঝতেই পারেনি যে কৃষক সভার মত কোনো জিনিষ তৈরি হয়ে যাবে। কেননা পরে এই কথাটা শোনা মাত্রই কানাঘুষো আর বিরোধী প্রচার শুরু হয়ে গেল। এটাও তথ্য যে অন্যদের নাম দেখে দু’একজন তিরস্কারও করল যে তাদের নাম কেন রাখা হয় নি। তাই পরে তাদের নামও যোগ করা হল। কিন্তু এসবে বাস্তব পরিস্থিতি বদলায় না। নাম দিয়ে দেওয়া হলেই কাউকে সভার প্রতিষ্ঠাতা বলা যায় না। লাখ কথার এক কথা তো এই যে যদি প্রতিষ্ঠার শ্রেয় কোনো চতুর্থ ব্যক্তিও নিতে চায় তাহলে তার নাম বলা হচ্ছেনা কেন? কেননা তাহলে তো তাকে স্পষ্ট প্রশ্ন করা যেতে পারে যে সে এই ব্যাপারে কবে কী করেছে? সেটা তো বলতেই হবে। শুধু কথা ঘোরালে তো চলবে না। নাম আর কাজ বলতে হবে।

কিন্তু আমাদের তো সেটা নিয়েও কোনো ঝগড়া নেই যে কে এই কাজটা করল। আমরা তো শুধু বাস্তবিকতাটা সামনে রাখার জন্য কথাগুলো বললাম। তারপরেও যদি কেউ সেরকম দাবি ঠোকে – আমরা তার আনন্দে বিঘ্ন আনব কেন? আমাদের কী? যে কেউ বানিয়ে থাকুক সভা। কিন্তু যে রূপে তার গঠন হয়েছিল বা যে চিন্তাভাবনাগুলো তার গঠনে ছিল সেগুলো আর নেই। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সভা এগিয়েছে এবং এখন তাতে সম্পূর্ণ রূপান্তর ঘটে গেছে। যদিও কেতাবি জ্ঞানের ভিত্তিতে সভা তৈরিও হয়নি এবং বর্তমান রূপেও আসেনি। এর ভিত্তিটা যথেষ্ট মজবুত। সংগ্রামের মধ্যেই তার জন্ম হয়েছে এবং সংগ্রামের মধ্যেই প্রতিপালিত হয়ে বড় হয়েছে। তাই সে যথেষ্ট শক্তিশালী। শোষিত জনগণের শ্রেণি-প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্ম এভাবেই হওয়া উচিৎ আর এভাবেই সেগুলোর এগুনো উচিৎ, এটাই বিপ্লবী পথ। লেনিন বলেওছেন যে জনগণের কাছ থেকে আর নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখেই আমাদের জনগণের পথ-প্রদর্শন করা উচিৎ। জনগণ নিজেরই অভিজ্ঞতা থেকে শিখে যখন নেতাদের কথায় বিশ্বাস করে এবং সে কথা মানতে শুরু করে তখনি আমাদের সঙ্গ নেয়, এমনই স্তালিন বলেছেন চীনের বিষয়ে কথা রাখতে গিয়েঃ –

“The masses themselves should become convinced from their own experience of the correctness of the instructions, policy and slogans of the vanguard.”

তাই লজ্জার বদলে আনন্দের কথা যে অভিজ্ঞতার জোরেই আমরা এগিয়েছি, আর কৃষকদেরও সঙ্গে নিতে পেরেছি।

কিন্তু আমাদের বিপ্লবী নামক বন্ধুদের একটি কথা আমাদের জন্য ধাঁধাই রয়ে যাবে। যখন সে কথা আমরা মনে করি তখন অদ্ভুত গাড্ডায় পড়ে যাই। আমাদের বন্ধুদের দাবী যে কৃষক সভাকে তারাই বিপ্লবী পথে আনতে পেরেছে, তারাই সভাকে বিপ্লবী কর্মসূচি দিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। যখন আমরা আগে এবং একেবারে এখন ওদের কাজকর্মের কথা চিন্তা করি তখন ওদের এই দাবি বুঝতে পারিনা। ওদের এক ভাইয়ের দাবি – বাকি ভাইয়েরা তাতে সায় দেয় – যে সে সেই নাকি জমিদারি উচ্ছেদের প্রস্তাব প্রথম প্রথম কৃষক সভায় পেশ করেছিল। বোধহয় ওরা মনে রাখেনি যে ওদের পার্টির জন্মের অনেক আগে যুক্ত প্রদেশে শ্রী পুরুষোত্তমদাস টন্ডন একটি কেন্দ্রীয় কিসান সঙ্ঘ গঠন করেছিলেন আর অন্যান্য অনেক কথার সাথে জমিদারি উচ্ছেদের কথাও সে সঙ্ঘ মেনে নিয়েছিল। যখন ১৯৩৪ সালের গ্রীষ্মে উনি দ্বিতীয় প্রাদেশিক কৃষক সম্মেলনের উদ্বোধন করতে গয়ায় এসেছিলেন সেখানেও উনি এই প্রস্তাব পাশ করাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমরা সবাই – তার মধ্যে সোশ্যালিস্ট নেতারাও ছিল – তার বিরোধ করেছিলাম। ফলে প্রস্তাবটা পড়ে গেল। তাঁর প্রস্তাবের বিশেষত্ব ছিল যে ক্ষতিপূরণ (মূল্য) দিয়েই জমিদারি উচ্ছেদের কথ তাতে ছিল।

টন্ডনজিও আমার সাক্ষি যে সম্মেলনে দ্বিতীয় দিন আমি যে ভাষণ দিয়েছিলাম তাতে স্পষ্ট বলেছিলাম যে বিহার প্রাদেশিক কিসান সভা জমিদারি উচ্ছেদের প্রস্তাব এখনও মানেনি, কেননা এই সভা এখনও মনে করে যে এই প্রস্তাবে ক্ষতি হবে। যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমি পুরোপুরি জমিদারি উন্মুলনের পক্ষে। কিন্তু মূল্য দিয়ে নয়, ছিনিয়ে নিয়ে। এটাই সবচেয়ে বড় অসুবিধা এই বিষয়ে। টন্ডনজি এই কথায় বিস্মিত হয়েছিলেন যে ছিনিয়ে নেওয়ার পক্ষে আছি কিন্তু ক্ষতিপূরণ দিয়ে উচ্ছেদের পক্ষে নই।

আরেকটা কথা। ১৯৩৪ সালের শেষে সিলৌতএ (মনিয়ারি-মুজফফরপুর) যে কৃষক কনফারেন্স হয়েছিল তাতে, বলা হয় যে, জমিদারি উচ্ছেদ করার এক প্রস্তাব একজন কৃষক নেতা পেশ করেছিলেন; তিনি নিজেকে এ ব্যাপারে মুক্তিদাতা বলে ঘোষণা করেন। আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। প্রস্তাবের প্রাসঙ্গিক অংশটা এরকম ছিল যে প্রাদেশিক কৃষক সভা সিদ্ধান্ত নিক যে কৃষক ও সরকারের মাঝে কোনো শোষক শ্রেণি থাকবে না। এখানে এটা ভাবার যে টন্ডনজির প্রস্তাব থেকে ভিন্ন বিশেষত্ব এতে কী আছে। ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গে এ চুপ। তাই খুব বেশি হলে এটুকুই এ প্রস্তাবের বিষয়ে বলা হয় এতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই কথাটাই বলা হয়েছে যেটা টন্ডনজির প্রস্তাবে স্পষ্ট বলা আছে। কিন্তু আসল কথা তো হল যে এ প্রস্তাবে জমিদারি শব্দটাই নেই। এটাই এর বিশেষত্ব। শোষক বললে জমিদারও এসে যায় কিন্তু স্পষ্ট নয় সেটা। এটাও কথার প্যাঁচ। ফলে গান্ধিজির ট্রাস্টি তত্ত্বের সম্ভাবনাও এতে আছে। কেননা ট্রাস্টি হয়ে গেলে তো জমিদার আর শোষক থাকবে না। তখন জমিদারি উচ্ছেদের প্রশ্ন আর উঠবেই বা কেন? এই কারণেই খাসমহলে, যেখানে সরকারই জমিদার, এই প্রস্তাব পাস হয়ে গেলেও জমিদারি উচ্ছেদের প্রশ্ন ওঠেনা। অতএব যারা সব জায়গায় জমিদারিকে খাসমহল করে দিতে চায় তারা এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানায়। তবুও এরই জন্য বন্ধুদের এত লাফালাফি।

সেই সভায় জমিদারদের অনেক বন্ধু ছিল। ওই জায়গারই এক চালাক-চতুর জমিদার আছে যে একটি মঠের মোহান্ত। তার ইষ্টকামী মিত্রের সংখ্যাও অনেক আর তোষামোদিরও। তারা ওই প্রস্তাবের খুব বিরোধ-টিরোধ করল। কিন্তু সফলতার আশা না দেখে প্রশ্ন করল – অন্যদের দিয়েও করাল – স্বামীজিও তো এখানেই আছেন! তাঁকেই প্রশ্ন করা যাক যে উনি এই প্রস্তাবের পক্ষে না বিপক্ষে, আর এই প্রস্তাব প্রাদেশিক কিসান সভার সিদ্ধান্তের বিপরীত কিনা। ওরা ভেবেছিল আমি এই প্রস্তাবের বিরোধ করবই আর বলব যে এটা প্রাদেশিক কিসান সভার বক্তব্যেরও বিরোধী। কিন্তু আমি মাঝখানে পড়তে চাইছিলাম না। আমি চাইছিলাম যে আমার বা অন্য কারোর প্রভাবে নয়, লোকে স্বাধীন ভাবে নিজেদের মত প্রকাশ করুক। আমার তো কৃষকদের আর জনগণের মানসিক অবস্থাটাও ঠিক ঠিক জানার ছিল; আমি কিছু বলে ফেললে সেটা জানার আর উপায় থাকত না। কেননা লোকে পক্ষে বা বিপক্ষে প্রভাবিত হয়ে যেত।

কিন্তু প্রস্তাবের বিরোধীরা জোর দিল যে আমি কিছু বলি। অবশ্য প্রস্তাবের পক্ষে যারা ছিল তারা বোধহয় ভাবছিল যে আমার বলা ঠিক হবেনা এবং ভয় পাচ্ছিল। যখন দেখলাম যে আমাকে বলতে জোর করা হচ্ছে আর না বললে যদি প্রস্তাবটা হেরে যায় তাহলে খারাপ হবে, শেষে বলে দিলাম যে আমি ব্যক্তিগতভাবে এই প্রস্তাবের বিরোধী তো নইই, প্রাদেশিক কিসান সভার সিদ্ধান্তের প্রতিকূলও নয় এই প্রস্তাব। কেননা এই প্রস্তাব তো সভার কাছে সুপারিশ করছে যে কথাটা মেনে নেওয়া হোক। ব্যস, আর কি, সভায় বিদ্যুৎ খেলে গেল আর ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় প্রস্তাব পাস হল। আমি এটাও স্পষ্ট বলে দিলাম যে জমিদারী ও শোষণ লোপ করার প্রশ্নে এ প্রস্তাব তো জনমত তৈরি করে আর জনমত ব্যক্তও করে। এমত অবস্থায় আমাদের সভা এই প্রস্তাবকে স্বাগতই জানাবে। কেননা জনমত তো আমরা জানতেই চাই। এবং জনমত তৈরি করাও আমরা পছন্দ করি। আমরা নিজেরা মানুষের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার বদলে জনমত অনুসারে সিদ্ধান্ত নেওয়াই পছন্দ করি। এটাই কারণ যে আমাদের প্রাদেশিক কিসান সভা এবিষয়ে এখনো চুপচাপ। এখনো অব্দি অনুকূল জনমত যে পায়নি!

এ প্রসঙ্গে আরো একটি কথা মনে পড়ে। আমাদের কিছু বন্ধু নিজেদের জমিদারি উচ্ছেদের অগ্রদূত মনে করে। অন্ততঃ সেরকমই দাবি করে আজ ওরা, আর ওদের সঙ্গীরা। কিন্তু এ ব্যাপারে কিছু কথা স্মরণীয়। যখন ১৯২৯ সালের নভেম্বরে সোনপুর মেলায় বিহার প্রাদেশিক কিসান সভার জন্ম হচ্ছিল, এবং ওদের কথা অনুযায়ী আজকের গান্ধীবাদীরাই সে কাজে জড়িত ছিল, তখন ওরা খোলা সভায় সে কাজের বিরোধ করেছিল। ওদের মত ছিল যে কৃষক সভার প্রয়োজনই নেই। যে কাজের জন্য সভা তৈরি করা হচ্ছে সে কাজ কংগ্রেসকে দিয়েই হয়ে যাবে। ওরা এটাও বলেছিল যে কৃষক সভা তৈরি হলে কৃষকেরা ওতেই চলে যাবে আর ফলে কংগ্রেস দুর্বল হয়ে যাবে। আমিই সভাপতি ছিলাম সে সময় এবং ওদের এ কথার সমুচিত উত্তরও দিয়েছিলাম। তাই এ কথাগুলো আমার মনে আছে। ওদের কথাগুলো পড়ে কেউ ভাববে যে কোনো গান্ধীবাদী আজ (১৯৪১ সালে) কৃষক সভার বিরোধ করছে। সে বুঝবেই না যে ভাবী বিপ্লবী (কেননা জানিনা সে সময় ওরা বিপ্লবী ছিল কিনা) এ কথাগুলো বলছে, যে এর পর জমিদারি উচ্ছেদের অগ্রদূত হওয়ার দাবি করবে।

বোধহয় বলা হবে যে সে সময় ওদের এত জ্ঞান ছিলনা আর বিপ্লবী পার্টিও পরে তৈরি হয়েছে! যা হোক , এমন বলার লোক পরোক্ষে তো মেনেই নেবে যে এই মুক্তিদাতারা এক দিন গোঁড়া রক্ষণশীল ছিল। কেননা তাদের নজরে আজ যারা হঠাৎ রক্ষণশীল হয়ে দেখা দিচ্ছে তারাই যখন কৃষক সভার বিরুদ্ধে না থেকে পক্ষে ছিলেন তখন মুক্তিদাতারা বিরুদ্ধে ছিলেন। এ এক অবাক কান্ড।

কিন্তু লখনউএর ‘সঙ্ঘর্ষ’ নামের সাপ্তাহিক হিন্দি পত্রিকা তো বিপ্লবী। সেই পত্রিকা যখন ১৯৩৮ সালে শীর্ষ প্রবন্ধে লিখে দিল যে আমাদের কৃষক সভাকেও ব্যবহার করা উচিৎ তখন বাধ্য হয়ে আমায় সম্পাদক মশাইকে পাটনাতেই বকুনি দিতে হল এবং নিজের রাগ দেখাতে হল। এটা অদ্ভুত ব্যাপার যে বিপ্লবের অগ্রদূত হওয়ার দাবিদার কংগ্রেসের তুলনায় কৃষক সভার মত শ্রেণি প্রতিষ্ঠানগুলোকে গৌণ মনে করা হয়। উনি হাজারটা সাফাই দিলেন। আমি মানতে পারলাম না। (৬.৮.৪১)

এগোনো যাক। কয়েক মাস আগে একটা সার্কুলার দেখেছিলাম। তাতে অন্যান্য কথার সাথে লেখা আছে যে “কৃষক সভাগুলোর সংগঠন স্বাধীন হওয়া সত্ত্বেও আজ অব্দি কংগ্রেসের সহায়ক মাত্র এবং তার নিচে থেকেছে!” এখানে ‘সহায়ক মাত্র’তে ‘মাত্র’ শব্দটা খুব কাজের। যারা কৃষক সভাগুলোকে, ১৯৪১ সাল শুরু হওয়ার আগে অব্দি রাজনৈতিক ব্যাপারে কংগ্রেসের শুধু সহায়ক মানত এবং তার নিচে স্থান দিত তারাই যখন দাবি করে যে কৃষক সভায় জমিদারি উচ্ছেদের প্রস্তাব প্রথম তারাই এনেছে ত আমরা চকিত হই। জমিদারি উচ্ছেদের কথা তো জবরদস্ত রাজনীতি। কংগ্রেস আজ অব্দি খোলাখুলি এই কথাটা বলেনি। কংগ্রেসের নীতি-নির্ধারণের কাজ যার হাতে আছে সে এবং কংগ্রেসের তাবড় তাবড় নেতা এবং কর্ণধার – সবাই – জমিদারির বরং সমর্থন করে। গান্ধীজি তো এতদূর গেলেন যে ১৯৩৪ সালে যুক্ত প্রদেশের জমিদারদের প্রতিনিধিমন্ডলকে (deputation) খোলাখুলি বলে দিলেন – “Better relations between the landlords and tenants could be brought about by a change of heart on both sides. He was never in favour of abolition of the Taluqdari or zamindari system.” (“Mahratta”, 12.8.1934)

“কৃষক আর জমিদারের পারষ্পরিক সম্পর্ক দুজনের হৃদয় পরিবর্তনেই ভালো হয়ে যাবে। আমি চাইনা যে জমিদারি বা তালুকদারি লোপ করে দেওয়া হোক।” এই প্রেক্ষিতে, এক দিকে কৃষক সভাকে কংগ্রেসের নিচে স্থান দিয়ে সহায়ক মাত্র বলা আবার অন্যদিকে সভার মাধ্যমেই জমিদারি উচ্ছেদের দাবি করা দুটো কথাই ধাঁধার মত। এর রহস্য বোঝা সাধারণ বুদ্ধির কাজ নয়। এমন মনে হয় যে প্রথম থেকেই কৃষক সভা গঠনের বিরোধ থেকে শুরু করে আজ অব্দি যে নীতি আমাদের এই বিপ্লবী বন্ধুরা নিজেদের জন্য ধার্য্য করে আসছেন তার ভিতরে মিল আছে, কোনো স্ববিরোধ নেই। যদি জমিদারি উচ্ছেদের মতন বিষয়ের আলোচনা দেখে বিরোধ মনেও হয় সেটা ওপর, ওপর, দেখনাই। কেননা রাজনীতি প্যাঁচালো জিনিষ আর আমাদের বন্ধুরা এই প্যাঁচে ওস্তাদ। এ তো একটি কলা আর কলা-চাতুর্‍্য্য না দেখিয়ে সবাইকে খুশি রাখা বা সব জায়গায় প্রশংসা কুড়োনো অসম্ভব।

কিন্তু যখন আমি নিজে আজ অব্দিকার ঘটনাগুলো নিয়ে ভাবি তখন মগজে ঢোকেই না যে কি করে কৃষক সভার স্থান কংগ্রেসের নিচে হয় আর কংগ্রেসের সহায়ক মাত্র হয়। আমি তো কখনো ভাবিই নি এরকম। আমাদের এই বন্ধুরাও আজ অব্দি কোনো অনুষ্ঠানে এই কথা বলেনি। আমি তো হালফিল ওদের সার্কুলার দেখেই প্রথম জানলাম যে ওরা এরকম ভাবে। জেনে বিস্মিত হলাম। কখনো আমাদের মিটিঙে ওরা কথাটা রাখত! কে বলবে যে এত গুরুত্বপূর্ণ কথা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল কেন? কংগ্রেস মিনিস্ট্রির জমানায় আমরা শতাধিক প্রজাসত্ত্ব সংগ্রাম চালালাম। দু হাজারের বেশি কৃষক ও কৃষক-সেবকদের জেলে যেতে হল। মিনিস্ট্রি এসবে ভীষণ নাজেহাল হল। তাই তো ১৯৩৯ সালের জুন মাসে বোম্বাইয়ে এধরণের লড়াই বন্ধ করা হল আর যারা বন্ধ করবে না তাদের কংগ্রেস থেকে বার করার হুমকি দেওয়া হল। তবুও আমরা মানলাম না। যার ফলে আমাদের মধ্যে কতজনকে কংগ্রেস থেকে আলাদা হতে হল।! এর পরেও কৃষক সভাকে কংগ্রেসের নিচে স্থান দেওয়া আর সহায়ক মাত্র বানিয়ে দেওয়ার বুঝদারি আর সাহস তারিফ করার যোগ্য।

প্রথম দিকে জেনেবুঝে কৃষক সভা এমন ভাবে চালানো হয়েছিল যাতে কারো সন্দেহ না হয় যে এটা সম্পূর্ণ স্বাধীন জিনিষ, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, কেননা তাহলে সভাকে বাল্যকালেই তীব্র বিরোধের সামনে পড়তে হত। তাই একটা প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছিল যে রাজনৈতিক বিষয়ে সভা কংগ্রেসের বিরোধ করবে না। তাই সে সময় তেমন ভাবার সম্ভাবনা হয়ত বা ছিল। যদিও এরকম কখনই বলা হয়িনি যে সভা কংগ্রেসের অধীন বা সহায়ক। কিন্তু ১৯৩৫ সাল শেষ হতে না হতে হাজিপুর সম্মেলনে যখন জমিদারি উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত হয়ে গেল তখনও ভাবা যে সভা কংগ্রেসের অধীন, অবাক করা কথা। জমিদারি উচ্ছেদ এমন একটি বিষয় যেটা স্পষ্ট বলে দেয় যে কৃষক সভা এবং কংগ্রেস দুটো আলাদা প্রতিষ্ঠান যাদের লক্ষ্য এবং পথ ভিন্ন, যদিও হতে পারে কোনো কোনো প্রশ্নে অবরে সবরে তাদের মিল হয়ে গেল। আমরা তো স্পষ্ট জানি যে জমিদারি ইত্যাদির প্রশ্নে, ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯২২এ বারদৌলিতে কংগ্রেসের কার্যনির্বাহক কমিটি অসহযোগ আন্দোলন স্থগিত করার সময় যে কথাগুলো বলেছিল সেগুলোই আজ অব্দি কংগ্রেসের নিশ্চিত নীতি। কমিটির প্রস্তাবের ষষ্ঠ এবং সপ্তম ধারায় স্পষ্ট লেখা আছে। এমনভাবেঃ –

“The working committee advises Congress workers and organisations to inform the ryots (peasants) that withholding of rent-payment to the zamindars (land-lords) is contrary to the Congress resolution and injurious to the best interest of the country.

“The Working Committee assures the zamindars that the Congress movement is in no way intended to attack their legal rights, and that, even when the ryots have grievances, the committee desires that redress be sought by mutual consultation and arbitration.”

অর্থ হল যে “ওয়র্কিং কমিটি (কার্যনির্বাহী কমিটি) কংগ্রেসের কর্মকর্তাদের আর প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরামর্শ দিচ্ছে যে তারা কৃষকদের বলে দিক, জমিদারদের খাজনা না দেওয়া কংগ্রেসের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে এবং দেশের স্বার্থে ঘাতক।

“কমিটি জমিদারদের আশ্বস্ত করছে যে কংগ্রেসের আন্দোলনের উদ্দেশ্য তাঁদের আইনি অধিকারে হামলা কখনই নয়। কমিটির ইচ্ছে এটাও যে কৃষকদের যদি নালিশ থাকে জমিদারদের বিরুদ্ধে তাহলে সে নালিশ যেন দুই পক্ষের মতামত, পরামর্শ এবং সালিশীর মাধ্যমে দূর করা হয়।”

বুঝিনা যে জমিদারি এবং জমিদারদের অন্যান্য আইনি অধিকারের এর বেশি তরফদারি কংগ্রেস আর কিভাবে করতে পারে। (৭.৮.১৯৪১)

১৯৩২ সালের শেষ এবং ১৯৩৩ সালের শুরুর দিন ছিল। জোরকদমে চলছিল কংগ্রেসের সত্যাগ্রহ আন্দোলন। সরকার এবার পুরো প্রস্তুতি নিয়ে চড়াও হয়েছিল। নির্যাতনের দাবানল দাউ দাউ করে জ্বলছিল। কংগ্রেসকে নিষ্পেষিত করার কোনো উপায় বাদ রাখেনি সরকার। লর্ড উইলিংটন ভারতের ভাইসরয় ছিলেন। তিনি পুরো হিসেব করে কাজ শুরু করেছিলেন। উপর থেকে, বাইরে থেকে মনে হত যে সরকার জৈষ্ঠ মাসের দুপুরের সুর্যের মত জ্বলছে। তাই প্রত্যক্ষ দৃষ্টিতে আন্দোলন নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল। মিটিঙের নামও নিতনা কেউ। এমনকি মুঙ্গের জেলা বোর্ডের নির্বাচন যখন ১৯৩৩ সালে শুরু হল আর নেতারা সবাই জেলে বন্দী থাকার কারণে জেলায় আমার সফর করার প্রয়োজন হল তখন লোকেরা ভয় পাচ্ছিল যে মিটিং হতে পারবে না। বড়হিয়াতে প্রথম আর লক্ষীসরাইয়ে দ্বিতীয় মিটিংএর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। সে সময় বড়হিয়াতে অতিরিক্ত পুলিস ফোর্স মোতায়েন। যখন মিটিং করতে গেলাম অফিসারদের কান খাড়া হয়ে গেল। সদল-বলে মিটিঙে পৌঁছে গেল ওরা। আমার ভাষণের একেকটা অক্ষর নোট করা হচ্ছিল। যখন আমার বলা শেষ হল আর ওরা সবাই দেখল যে লোকটা কেবল নির্বাচনের কথা বলেই শেষ করল তখন তারা ঠান্ডা হল যে যাক, নির্দোষ কথাবার্তা। লক্ষীসরাইয়েও একই ব্যাপার হল।

দেশের আর বিহারের সব প্রধান নেতা এবং কর্মকর্তা জেলে বন্দী ছিলেন। বাইরে ফাঁকা মাঠ। শুধু আমি বাইরে। আগেই বলেছি যে ১৯৩০ সালে জেলে আমি যা কিছু দেখেছিলাম কংগ্রেসি নেতাদের ব্যাপার-স্যাপার – শুধু ওদের যারা ফার্স্ট আর সেকেন্ড ডিভিশনে রাখা হয়েছিল – তাতে আমার বুক পুড়ে গিয়েছিল আর কংগ্রেসি রাজনীতির প্রতি বৈরাগ্য এসে গিয়েছিল। কেননা কথায় আর কাজে ফারাক ছিল দুস্তর। একই ব্যাপার ১৯২২ সালেও দেখেছিলাম। ভাবতাম যে ১৯২২ নাহয় প্রথম দিকের বছর। ভূলত্রুটি সম্ভব। কিন্তু যখন ৮-১০ বছর পরেও উন্নতির বদলে অবনতি দেখলাম, বিরাগ হওয়া স্বাভাবিক ছিল। ভাবতাম এমন প্রতিষ্ঠানে কেন থাকব যার কথাবার্তা শুধু দেখনাই আর যে কোনো পরিস্থিতিতেই কঠোরভাবে সস্যদের নিয়ময়ানুবর্তী করার কোনো ব্যবস্থা নেই। এমন প্রতিষ্ঠান তো ধোঁকা খাওয়ার জায়গা, টিঁকতেই পারবেনা। নিজের ইমানকে ধোঁকা দিতে দিতে আমরা জনগণকেও – যাদের সেবা করি বলে অহঙ্কার দেখাই – ধোঁকা দিতে শুরু করে দেব। তাই ১৯৩২ সালে পুরোনো বন্ধু আর সাথীরা হাজার বার বলা সত্ত্বেও আমি লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করলাম না। বাইরে থেকেই তামাশা দেখতে রইলাম।

বিহারই একমাত্র প্রদেশ ছিল সে সময় যেখানে কংগ্রেস ছাড়া অন্য কোনো সার্বজনিক প্রতিষ্ঠান দাঁড়াতে পারত না। মুসলিম লীগ, হিন্দু সভা অথবা লিবারাল ফেডারেশনও এখানে ছিল না। কৃষক সভা তো এই জন্য তৈরি হতে পারল যে ওতে মানুষগুলোই ভিন্ন ছিল। আরো একটা ব্যাপার ছিল। লোকে ভাবত যে এটা নিজে থেকেই খতম হয়ে যাবে। কেননা লোকে মনে করত যে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যেই এটা তৈরি হয়েছে আর সে উদ্দেশ্য শিগ্‌গিরই পুরো হয়ে যাবে। লোকেরা সংকল্প করে নিয়েছিল যে কোনো পরিস্থিতিতেই সভাকে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে যেতে দেওয়া হবেনা। এটাই কারণ যে শুরুর দিকের পাঁচ-ছয় বছর আমরাও খুব সাবধানে এগিয়েছিলাম। সভাও স্থগিত করে দেওয়া হয়েছিল ১৯৩০ সালের শুরুতে; পুনর্জীবিত করার কোনো চেষ্টাও করা হয়নি।

তাই সরকার, জমিদার, মালদার আর তাদের মোসাহেবরা ভাবল যে এটাই সুবর্ণ সুযোগ। এর ফায়দা উঠিয়ে একটা এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করে নেওয়া যাক যেটা কংগ্রেসের মোকাবিলা করতে পারবে। প্রথমত, সব প্রধান নেতা আর কর্মীরা জেলে ছিল। দ্বিতীয়ত, যারা বাইরে ছিল তাদের কংগ্রেসের জারি সংগ্রামটাকে সংগঠিত করার থেকে ফুরসত কোথায় ছিল যে এই নতুন প্রতিষ্ঠানের বিরোধ করবে? গণআন্দোলনের যে স্বাভাবিক নিয়ম, হাঁফ ধরে গেলে ভিতরে চলে যায়, ওপর ওপর দেখা যায়না, কংগ্রেসের সংগ্রামও তেমন ছিল। ভিতরে ভিতরে আগুনের মত ধ্বকধ্বক করে জ্বলছিল। তাই কংগ্রেস চালানো বেশি কঠিন ছিল সে সময়। পুলিস ছায়ার মত সর্বত্র ঘুরত, ঠিকানা পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে। অজান্তেই তারা জনগণকে গোপন আন্দোলন চালাতে শুধু উৎসাহই দিচ্ছিলনা, শিক্ষাও দিচ্ছিল এবং দৃঢ়তা আনছিল। প্রয়োজনেই তো মানুষ সব কিছু করে ফেলে। এভাবে দেশের আন্দোলন আসল বিপ্লবী পথে এগোচ্ছিল। গান্ধীজি যে ১৯৩৪ সালে শুরু করেই এ আন্দোলন বন্ধ করে দিয়েছিলেন তার কারণও এটাই। উনি বুঝে গিয়েছিলেন যে যদি থামান না হয় তাহলে এ আন্দোলন মধ্যশ্রেণির হাত থেকে বেরিয়ে যাবে আর যথার্থই গণআন্দোলনে পরিবর্তিত হয়ে যাবে। আর তা হলে কায়েমি স্বার্থের (vested interests) সোজাসুজি ক্ষতি হবে।

হ্যাঁ, তো বন্ধুদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে গেল। কখনো পাটনায়, কখনো রাঁচিতে, যেখানেই গবর্নরসাহেবের শ্রীচরণ পড়ে সেখানেই দ্বারভাঙা মহারাজা ইত্যাদি বড় বড় জমিদাররা বার বার গিয়ে পৌঁছোন, কথা হত আর এ কাজে সরকারহুজুরের আশির্বাদ পাওয়ার চেষ্টা চলত। কিন্তু সরকারও দেখতে চাইছিল যে এরা তার সহযোগিতার পাত্র কিনা। সরকার তো চাইছিলই যে কংগ্রেসের প্রতিদ্বন্দ্বী যে কোনো একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে যাক। তাই অনেক দৌড়ঝাঁপ এবং মাসাধিক কাল আলোচনা করে, যদ্দুর মনে আছে, রাঁচিতে সিদ্ধান্ত হল যে ইউনাইটেড পার্টি (যুক্ত দল) নামে প্রতিষ্ঠানটি তৈরি হোক। জমিদারদের ভিতরেও অবশ্যই এ ব্যাপারে দুটো দল ছিল যাদের মধ্যে শুধু নেতৃত্বের ঝগড়া ছিল যে কে এই পার্টির নেতা হবে। যদিও নেতৃত্ব তো সবচেয়ে বড় জমিদার এবং পূঁজিপতি দ্বারভাঙার মহারাজারই পাওয়ার ছিল। আসলে তাঁর সহায়ক এবং ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতা কে হবেন সেটাই ঠিক হচ্ছিল না। অবশেষে সুর্যপুরার (শাহাবাদ) রাজা তাঁর ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতা (মন্ত্রী) হলেন। ভিতরে ভিতরে মতানৈক্য থাকা সত্ত্বেও নিজেদের গোষ্ঠিকোন্দল এই মহান কাজে – এই মহাজাল নির্মাণে – বাধক কি করে হতে পারত? এই ভাবে ইউনাইটেড পার্টির জন্ম হয়ে গেল।

এ ব্যাপারে আরো একটি কথা। যখন আমাদের প্রাদেশিক কৃষক সভা প্রথম প্রথম তৈরি হল, তখন পাটনার উকিল বাবু গুরুসহায় লালকেও একজন যুগ্ম সম্পাদক বানান হয়েছিল, যদিও কাজ-টাজ কিছুই উনি করেননি। বাস্তবে তখন অব্দিকার অবস্থা এই ছিল যে পুরোনো কাউন্সিলে যে কৃষকের নামে দুচার ফোঁটা চোখের জল ফেলে দিত, দু’একটা গরম কথা বলে দিত বা খুব বেশি হলে কৃষক-স্বার্থের দিক থেকে প্রজাসত্ত্ব আইনে সংস্কারের জন্য সাধারণ দু’একটা বিল পেশ করে দিত, তাকেই মানা হত কৃষক সভার নেতা। যেন কৃষক লাওয়ারিশ মাল, দেখাশোনা করার কেউ নেই। তাই ‘ঈশ্বরের পথে দে’র নীতি অনু্যায়ী, কেউ নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য জন্য ওদের দিকে চোখ ঘোরাল কি না ঘোরাল সঙ্গে সঙ্গে তাকে কৃষকদের মুখপাত্র (spokesman) মনে করে নেওয়া হল। এধরণের মুখপাত্ররা প্রায় সবাই জমিদারদের সাথে মিলেমিশে থাকত এবং দু’একটা গরম গরম কথা বলে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করে নিত। এমন লোকেরাই ১৯২৯ সালেও কৃষকস্বার্থের নামে একটা বিল পেশ করেছিল টেন্যান্সি আইনে সংস্কারের জন্য, যাতে করে জমিদাররাও একটা উল্টো বিল ঠুকে দিয়েছিল। ফলে দুটোকেই সরিয়ে সরকার নিজের তরফ থেকে যে তৃতীয় বিলটা পেশ করেছিল তারই বিরোধকে তাৎক্ষণিক কারণ করে প্রাদেশিক কৃষক [সভা?]র জন্ম দেওয়া হয়েছিল।

সরকারের বক্তব্য হামেশাই ছিল যে প্রজাসত্ব আইনের সংস্কার দু’ভাবে হতে পারে – হয় কৃষক এবং জমিদার বা এই দুজনের প্রতিনিধি মিলেমিশে কোনো খসড়া (বিল) পেশ করুক এবং সেটাকে পাশ করে নিক অথবা, যদি এমন করা সম্ভব না হয় তাহলে সরকারই পেশ করুক এবং দুজনেই সেটা মেনে বিক। ঠিক দুই বেড়ালের ঝগড়ায় বাঁদরের সালিশির মত কথা ছিল। ১৯২৯ সালেও এমনটাই হয়েছিল আর দু’দলের মতে মিল না হওয়াতেই সরকার মাঝখানে লাফিয়ে পড়েছিল। কিন্তু যখন কৃষকদের তরফ থেকে কৃষক সভা ওই বিলটার তীব্র বিরোধ করা হল তখন সরকার বিলটা প্রত্যাহার করে নিল এই বলে যে যদি কৃষক সভাই এর বিরুদ্ধে থাকে তাহলে সরকারের কী গরজ বিলটার ওপর জোর দেওয়ার? এভাবে কৃষক সভা জন্মলগ্নেই দুটো কাজ সারল। এক তো ওই বিলটা প্রত্যাহার করিয়ে কৃষকের গর্দান বাঁচাল আর সরকারকে বাধ্য করল যে না চাইতেও যেন কৃষক সভাকে কৃষকদের প্রতিষ্ঠান মেনে নেয়।

এই পরিস্থিতিতেই সরকার এবং জমিদারদেরও মাথায় এল যে ইউনাইটেড পার্টিকে মজবুত করার জন্য আগে ওই পার্টির তরফ থেকে প্রজাসত্ত্ব আইনে কিছু সংশোধন করিয়ে কৃষকদের নামমাত্র কিছু অধিকার দিয়ে দেওয়া যাক। তারই সাথে, জমিদারদেরও অভীষ্ট সিদ্ধ হোক। কিন্তু তখন অব্দি যে পদ্ধতি ছিল সে অনুযায়ী কৃষক আর জমিদার দুতরফেরই স্বীকৃতি নিয়ে পেশ না হলে সরকার সে বিল মানতে পারত না। তাই প্রয়োজন বোধ হল যে যে ইউনাইটেড পার্টি তৈরি হচ্ছে তাতে কৃষকদের তরফ থেকে বলার কিছু লোকও রেখে নেওয়া যাক। নইলে সব ভেস্তে যাবে। ইউনাইটেড পার্টি নামটার তো অর্থই এই যে তাতে সব দল আর গোষ্ঠির লোকেরা শামিল হবে। দলটার যে কজন সদস্যবিশেষের নামের লিস্ট সে সময় প্রকাশিত হয়েছিল তাতেই মনে হত যে সব ধর্মের, সব দলের আর সব স্বার্থের মানুষ এতে শরিক। ফলে, বিহার প্রদেশের তরফ থেকে বলার অধিকার আছে দলটার।

কাজেই দলের সুত্রধারদের এবার চিন্তা হল যে কৃষকদের প্রতিনিধি হিসেবে কোন কোন ভদ্রলোককে এতে আনা যায়। ওদের সৌভাগ্য যে শ্রী শিবশঙ্কর ঝা উকিলকে পেয়েই গেল ওরা। ইনি সে ধরণেরই কৃষক নেতা যাদের কথা আগে বলা হয়েছে। এটা ঠিক যে বাবু গুরুসহায় লালও ছিলেন সাথে, ওই পার্টিতে। কিন্তু চালাকিটা করা হল এই ভেবে যে ওনার নামের ঘোষণা শুরুতেই করা হলে অনেক চিৎকার-চ্যাঁচামেচি হবে আর খেলার বারোটা বাজবে। হয়ত ভয়ও পেয়ে থাকবেন উনি। তাই সিদ্ধান্ত হল যে আগে উনি একটা বিহার প্রাদেশিক কিসান সভা খাড়া করে নেবেন। তারপর বিলে যে কথাগুলো প্রজাসত্ত্ব আইনে সংশোধনের নামে দেওয়ার সেগুলোকে সভায় এই বলে স্বীকার করাবেন যে এই শর্তেই জমিদারদের সাথে কৃষকদের সমঝোতা হয়েছে। ত্রপর আইন তৈরি করে ঢোল পিটিয়ে দেওয়া যাবে যে তিনি এবং ঝাজি দুজনে মিলে কৃষকদের বড় বড় অধিকার পাইয়ে দিয়েছেন। এভাবে কৃষকদের মাঝে ইউনাইটেড পার্টির ওজন বেড়ে যাবে। কেননা পার্টির তরফ থেকেই আইনে সংশোধন করান হবে। তারই সাথে গুরুসহায়বাবুও এই কাজের মুকুট-ফুকুট পরে খোলাখুলি চলে আসবেন পার্টিতে!

তাই উনি করলেন। যে সভার একজন সম্পাদক উনি নিজেও ছিলেন, সেই সভা থাকতেই অন্য একটি সভা দাঁড় করানোর সাহস দেখিয়ে ফেললেন। পরে তো সেই গুলাব বাগের (পাটনা) মিটিংএ কথাটা বেরুল যে এই নকল সভা তৈরি করার পিছনে জমিদারদের শুধু ইশারা নয়, টাকাও খেটেছিল। সে সময় এই কৃষক-দ্রোহে তাঁর সাথে আরো দু’একজন কথিতরূপে সোশ্যালিস্ট জমিদারদের সঙ্গে মিলে ষড়যন্ত্র করছিল। বিশেষত্ব এটাই যে এই সমস্ত কাজ এত ভাল ভাবে চুপচাপ সারা হচ্ছিল যাতে বাইরের দুনিয়ায় কেউ বুঝতে না পারে। এমনকি পাটনা থেকে ১৫-২০ মাইল দূরে বিহটাতে আমি উপস্থিত ছিলাম। কিন্তু সমস্ত ব্যাপার আমার কাছে লুকোনো হল – খবর দেওয়া বা আমার মতামত নেওয়া তো দূরের কথা। আসল কৃষক সভার ভুত ওদের ভয়ে উদ্ভ্রান্ত করে তুলছিল। ওরা খুব ভালো করে বুঝতে পারছিল যে যদি এই স্বামীর কানে খবরটা পৌঁছে যায় তাহলে বৈরাগী হওয়া সত্ত্বেও এমন না হয় যে পুরোনো সভাটাকে জাগিয়ে তোলে। কেননা সে সভা তো জন্মান মাত্রই সরকার আর জমিদারদের সাথে একহাত লড়ে তক্ষুনি এক আছাড় দিয়েছিল ওদের! তেমন হলে তো সব আশা জলে যাবে। একেই বলে গরীবের সেবা আর কৃষক-হিতৈষণা! ভগবান এমন বন্ধুদের হাত থেকে কৃষকদের বাঁচান।

কিন্তু শেষে হাঁড়ি ফেটেই গেল আর বেচারারা “টুকুর টুকুর নজর, কিছু করলে মার জবর” [মূল ফার্সি – টুক টুক দীদম, দম ন কশীদম] অনুসারে বুকে দীর্ঘশ্বাস চেপে রয়ে গেল। জানিনা কেন এদের কৃষক সভায় বিপদে পড়ে আমি পৌঁছে গেলাম; সবার ওপরে বরফ ঝরে পড়ল। ওখানে যখন আমি জমিদার আর জমিদার সভার লিডারদের দেখলাম তখন চমকে উঠলাম – এ কেমন কৃষক সভা! কিন্তু যখন কৃষকদের তথাকথিত নেতারা সভায় জমিদারদের এই কারণে ধন্যবাদ দিতে চাইলেন যে ওঁরা টাকাপয়সা দিয়ে সাহায্য করেছেন, তখন ঝুলি থেকে বেড়াল বেরিয়ে এল। পাপ লুকোনো গেলনা। মনে মনে ভাবলাম এ যে ভয়ঙ্কর কৃষক সভা! সুখের কথা যে ওখানেই ওই সভার শ্রাদ্ধ হয়ে গেল আর পুরোনো সভা জেগে উঠল। এভাবেই আমি, যে নাকি এখন অব্দি সভার প্রতি উদাসীন হয়ে ছিলাম, আবার সর্বশক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়লাম কৃষক সভায়। ওই সব কৃষক নেতারা কিছুদিনের মধ্যেই নিজেদের আসল রূপে ফিরে এলেন এবং সোজাসুজি জমিদারদের দলে ভিড়ে গেলেন। তবুও ওদের কারোর কোনো চাল চলল না, আর দু বছরের মধ্যে এমন ঝড় উঠল যে ইউনাইটেড পার্টি তো উবে গেলই, জমিদারদের সমস্ত মনোবাসনা জলে গেল। যে বিল তারা পেশ করল তাতে কৃষকস্বার্থের পক্ষে অনেককিছু ঢুকিয়ে, বিষাক্ত কথাগুলো সরিয়ে আইন করাতে বাধ্য হল তারা। সেই সময় থেকেই নিজেদের জমি-জিরেত বাড়াবার পুরোনো দাবি হামেশার জন্য তারা ছেড়ে দিল।

এই ভাবে, এখন অব্দি যারা নিজেদের কৃষকদের নেতা বলত, নতুন-পুরোনো সেসব লোকেদের মুখোশ খুলে গেল। মুখ দেখানোরও যোগ্য রইলনা তারা। লোকে ঝামেলার আশঙ্কায় ভীত ছিল যে যদি আমার ওপর চাপ পড়ে তাহলে অনর্থ হবে। কেননা তখন কৃষক নেতা ও জমিদারদের একটা জোট কিসান সভার বিরুদ্ধে ছিল। কিন্তু আমার মনে পূর্ণ বিশ্বাস ছিল যে জয় হবেই। আর হল। সঙ্গে, সাবধান থাকারও প্রয়োজন এল। কৃষক নেতাদের হাঁড়িভাঙা এটা প্রথম। ভবিষ্যতের গর্ভে আরো না জানি কত এমন হাঁড়িভাঙা লুকিয়ে ছিল। (৮.৮.১৯৪১)

১৯৩৩ সালে কিসান সভার পুনরুজ্জীবনের পরের দিনগুলোয় আমি দিন রাত অস্থির ছিলাম যে কিকরে ইউনাইটেড পার্টি, তার ছুপা রুস্তম বন্ধু আর জমিদারদের নাকাল করি, আর প্রজাস্বত্ত্ব আইনে তাদের পেশ করা সংশোধনগুলোকে জাহান্নামে পাঠাই। তাই দিন রাত এক করে পুরো প্রদেশে সফর করছিলাম। সেই সফরেই দ্বারভাঙ্গা জেলার মধুবনি অঞ্চলেও পৌঁছোলাম। মধুবনি শহরেই হাই ইংলিশ স্কুলের মাঠে একটা সভার আয়োজন ছিল। বিশাল ভীড় ছিল কৃষক আর শহরের লোকের। খুব জোরদার বক্তৃতা দিলাম যাতে দ্বারভাঙ্গা মহরাজ এবং অন্যান্য জমিদারদের ধারালো তরোয়ালের সম্ভাবিত কোপটার গল্প বললাম, যেটা কৃষকদের গলায় পড়ার ছিল। দেখলাম কৃষকদের মুখ আনন্দে ভরে উঠল, যেন কেউ ওদের মনের কথা বলছে।

কিন্তু কৃষকদের নেতা হওয়ার পরেও ওদের সমস্যাবলির যথার্থ জ্ঞান ছিল কোথায়? শুধু কানে শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে মাটি আকাশ এক করছিলাম। আসল কথাটা হল যে কৃষকদের আর শ্রমিকদের নেতা কেউ এত তাড়াতাড়ি হতে পারে না। যে বাস্তবিকই ওদের জন্য লড়তে চায় তাকে সবচেয়ে আগে ওদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে ওদেরই মুখে ওদের দুঃখকষ্টের গল্প শোনা উচিৎ। এটা বড় কাজ। একবার আগ্রহের সাথে ওদের গল্প শুনুন আর দেখুন যে আপনি ওদের হৃদয়ে প্রবেশ করে গেছেন কিনা, ওদের সাথে শিগগিরই আপনার গভীর সম্পর্ক হচ্ছে কিনা, এটাই চাবিকাঠি।

সেই মিটিংএ আমার বিস্ময়ের শেষ রইল না যখন কৃষকদের মধ্যে থেকেই চন্দনের তিলককাটা একজন উঠে সভার পর নিজের, মানে কৃষকদের রামকাহিনী শোনাল। তখন অব্দি মোটামুটি এটাই বোঝা হত যে বেশির ভাগ অত্যাচারিত কৃষক, তথাকথিত পশ্চাৎপদ জাতের মানুষ। কম সে কম এরকম একটা চিন্তা তো মাথায় ছিলই যে যাকে মৈথিলি ব্রাহ্মণদের একচ্ছত্র নেতা বলা হয় সেই দ্বারভাঙ্গা মহারাজ ব্রাহ্মণ কৃষকদের তো কিছু রেহাই দেবেই – অন্য কৃষকদের হাঁকার জন্য তৈরি লাঠি দিয়ে ওদের নিশ্চয়ই হাঁকবে না। নইলে সব মৈথিলরা ওকে নেতা মানবে কেন? নিজের শোষক ও শত্রুকে কেউ নিজের মুখপাত্র মানে?

কিন্তু সেই কৃষক বলল যে আমি মৈথিলি ব্রাহ্মণ আর মহারাজের হাতে নিপীড়িত। আমাদের গাঁয়ে বা দেহাতে বা বলতে পারেন পুরো মধুবনি অঞ্চলে বৃষ্টির দিনে আমরা নাজেহাল হয়ে যাই, নিরাশ্রয় হয়ে পড়ি। এই অবস্থা মহরাজের পুরো জমিদারির। আমাদের এদিকে বৃষ্টি হয় প্রচুর, নদি-নালাও অনেক। ফলে মাঝে মাঝেই বন্যা আসে যাতে আমাদের ফসল তো নষ্ট হয়ই, কুঁড়েঘর আর বাড়িও ডুবে যায়, জলের তোড়ে পড়ে যায়। জল আটকানোর জন্য জায়গায় জায়গায় বাঁধ তৈরি করা আছে। যদি সত্বর সেগুলো জায়গায় জায়গায় কেটে দেওয়া যায় তাহলে শিগগিরই জল বেরিয়ে যেতে পারে আর তাহলে আমরা বেঁচে যাই, আমাদের ঘরবাড়ি, পশু, খেত সব বেঁচে যায়। কিন্তু আমরা এমন করতে পারি না। মহারাজের কঠোর নিষেধ।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন? সে উত্তর দিল, জল বেরিয়ে গেলে মাছ হবে কি করে? জমা হলে তবে তো জন্মাবে। যত দূর অব্দি জল থাকবে, বেশি দিন অব্দি জমে থাকবে, তত বেশি মাছ হবে আর জল-কর থেকে মহারাজের আয় বাড়বে। পানিফল ইত্যাদি থেকে তো আয় হবেই। জল-কর তাঁর আইনি অধিকার। যদি আমরা না মানি আর প্রাণ বাঁচানোর জন্য জল কেটে দিই তাহলে আমাদের ঘাড়ে খাঁড়া নেমে আসবে। একশো ধরণের মামলায় জড়িয়ে মহারাজ বিধ্বস্ত করে দেবেন আমাদের। তাঁর আমলা আর চাকরদের দেওয়া গালিগালাজের কথা আর জিজ্ঞেস করবেন না। তাদের রক্তচক্ষু তো মনে হয় গিলে খাবে আমাদের।

সে আরো বলল যে যখন এখানে সার্ভে সেটলমেন্ট হয়েছিল তখন আমাদের মানে কৃষকদের তো কোনো ধারণা ছিলনা এ বিষয়ে। ও সবের মানে ঠিক ঠিক বোঝার সাধ্য আমাদের ছিল না। ব্যস, আমাদের মূর্খতার ফায়দা উঠিয়ে, নিজের পয়সা আর প্রতিপত্তি খাটিয়ে মহারাজ সার্ভের কাগজে লিখিয়ে নিলেন যে জমির ওপর তো নাহয় কৃষকদের রৈয়তি হক। কিন্তু ওই জমিতে গজিয়ে ওঠা গাছের ওপর জমিদারের হক আদ্ধেক বা ন’আনা আর বাকি আমাদের। ফল হল এই যে নিজেদেরই বাপ-ঠাকুর্দার লাগানো গাছ থেকে একটা দাঁতন ভাঙবার বা পাতা ছিঁড়বার আইনি অধিকার আমাদের নেই। যদি আইন সব জায়গায় চলে তাহলে একেকটা দাঁতন আর একেকটা পাতার জন্য আমাদের তাঁর কাছে গিয়ে মঞ্জুরি নিতে হবে, যেটা সহজ কাজ নয়। এতে আবার তাঁর চাকরদের ঘুষ দেবার এবং তাঁর পুজোআচ্চা করার একটা বড় রাস্তা তৈরি হয়। তাই, যতক্ষণ তিনি খুশি, ততক্ষণ সব ঠিক। কিন্তু যেই কোনো কারণে উনি অখুশি হলেন, সঙ্গে সঙ্গে মামলার বৃষ্টি শুরু হল আর আমরা বেঘর হলাম। আর নয়ত অনেক টাকাকড়ি দিয়ে ব্যাপারটা মিটিয়ে নিতে বাধ্য হলাম। কিন্তু তা করতে গিয়েও আবার জমি বিকিয়ে যায়। পয়সা কোথায় আমাদের কাছে? … পরে গিয়ে আমরা হাজারটা এমন উদাহরণ পেলাম যাতে কৃষক সভার কর্মীকে এই কারণে যাচাই করা হয়নি কেননা সে মহারাজের জমিদারিতে সভা করার হিম্মত করেছিল।

কৃষকটি এও বলল, আর পরে গিয়ে দ্বারভাঙা, পুর্ণিয়া, ভাগলপুরের কৃষকেরা চোখের রক্তজলে একই ব্যথা শোনাল যে ঘরে পড়ে থাকা মড়া পচে যায় যাক, কিন্তু সেটার দাহ করার জন্য গাছ থেকে কাঠ ভাঙার বা কাটার অনুমতি সেই সার্ভের সময় থেকেই নেই। শুধু তাই নয়। সার্ভের সময়কার গাছ যদি অনেক কাল আগে মরেও গিয়ে থাকে আর তার জায়গায় নতুন গাছ লাগান হয়ে থাকে তবুও মহারাজের হুকুম ছাড়া কাটা যাবেনা। কেননা, প্রমাণ কি যে পুরোনো গাছ শেষ হয়ে গেছে আর সে জায়গায় নতুন লাগান হয়েছে? হিসাব তো লেখা হয়না সরকার বা জমিদারের ঘরে আর কৃষকের কথা কে মানে? ওরা তো মিথ্যেই বলে সব সময়। সততা আর সত্য তো টাকার কয়েদি, নাকি? তাই আজ আইনে সংশোধন হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও, যে কৃষকের নিজের লাগান গাছে তার পুরো হক, দুর্দশা লেগেই থাকে। কেননা পুরোনো গাছে তো নিয়মটা রয়েই গেছে।

এভাবে এক কষ্টদায়ক দৃশ্য হঠাৎ আমাদের চোখের সামনে জেগে উঠল আর আমরা হতভম্ব হয়ে গেলাম। ভাবলাম যে ধর্মকর্ম আর জাতপাতের ঠিকেদারি নেওয়া এই জমিদার আর রাজা-মহারাজা (কেননা দ্বারভাঙা মহারাজ ভারত ধর্ম মন্ডলের সভাপতি ছিলেন), নিজের অন্নদাতা মানুষগুলোকে মাছের থেকেও তুচ্ছ মনে করে। উফ! কী অনর্থ! আর এটা আইন না প্রতারণার আড়াল বা গরীব-পেষার মেশিন! জাত-সভা আর ধর্মমন্ডলের রহস্য খুলে গেল আর আমরা প্রথম বার এসবের উলঙ্গ রূপ দেখতে পেলাম। আমরা মানলাম যে জমিদার আর মালদারদের ধর্ম আর ভগবান শুধু টাকা আর দম্ভ, আর কিছু নয়। আমরা এটাও বুঝতে পারলাম যে ওদের বাইরের জাতি আর ধর্ম শুধু দেখনাই, যাতে লোকে ঠকে। কিন্তু ওদের আসল জাতি আর ধর্ম একেবারে অন্য জিনিষ। এই কথাতেও বিশ্বাস জন্মাল আমাদের যে কৃষক-কৃষক এক – জমিদার সবাইকে একই লাঠি দিয়ে হাঁকে – বলার জন্য জাতি উঁচু হোক বা নিচু। এই বিশ্বাসেই ওদের উদ্ধারের আশারও একটা ঝলক আমরা স্পষ্ট দেখতে পেলাম। 

ওই দিনগুলোতেই মধুবনির কাছে, পশ্চিম দিকে মচ্ছি নামের মৌজায় একবার মিটিংএর প্রস্তুতি নেওয়া হল। বিশেষ ব্যাপার ছিল যে অন্যান্য জেলা থেকেও প্রধান কর্মী এবং কিসান সভার কর্মকর্তাদের নিমন্ত্রিত করা হয়েছিল। সার্বজনিক মিটিং ছাড়াও আমাদের কৃষক সভার আলাদা মিটিং করার ছিল আর অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শলাপরামর্শ করার ছিল। ওই মৌজাতেই বাবু চতুরানন দাস থাকতেন, এদিকে দু’তিন বছর আগে উনি মারা গেছেন। দ্বারভাঙা জেলা এবং মধুবনি অঞ্চলে উনি একজন বড় নেতা এবং কংগ্রেসকর্মী হিসেবে মান্য হতেন। স্বরাজের লড়াইয়ের যোদ্ধাদের মধ্যে ওনার গুনতি ছিল।। সেই স্বরাজের যোদ্ধাদের মধ্যে যাকে গান্ধীজী দরিদ্রনারায়ণের স্বরাজ বলতেন এবং যে স্বরাজের দোহাই দিতেন কংগ্রেসের সব বড় নেতারা, এখনো দেন। আমাদের জন্য আনন্দের ব্যাপার ছিল যে এমন বড় কৃষক-সেবকের বাড়িতে সভা করতে হবে। আমাদের বিশ্বাস ছিল যে আমরা পুরোপুরি সফল হব।

মধুবনি থেকে আমরা যেমনতেমন বাদুড়ঝোলা হয়ে ওখানে পৌঁছলাম। কয়েকজন সাথীর তো থাকার ব্যবস্থাও চতুরাননবাবুর ওখানে হয়েছিল। কিন্তু আমরা মধুবনিতেই খাওয়াদাওয়া করে সোজা সভাস্থলে পৌঁছেছিলাম। আমাদের সাথ্র আরো কয়েকজন কৃষক-সেবক ছিলেন। কিন্তু ওখানে গিয়েই জানতে পারলাম যে গন্ডগোলের আশঙ্কা আছে। লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছিল যে দ্বারভাঙা মহারাজের তরফ থেকে আমাদের মিটিংএ বাধা দেওয়া হবে। ধীরে ধঈরে এতদূর জানা গেল যে মহারাজের লোকজনেরা সংকল্প করেছে যে যেমন করে হোক মিটিং বানচাল করতে হবে। একটু ঘাবড়ে গেলাম অবশ্যই। কিন্তু মিটিং তো করতেই হত। যদি মিটিং না করে ফিরে আসতাম তাহলে ওদের মধ্যে হিম্মত এসে যেত। তখন তো বিহার প্রদেশের সমস্ত জমিদারের সাহস বেড়ে আর আমাদের কাজটাই শেষ হয়ে যেত। তাই নিজেদের সাথীদের সাথে সভাস্থলে দৃঢ়ভাবে রইলাম। অপেক্ষা করছিলাম যে কৃষকেরা এলে মিটিং শুরু হবে। বাবু চতুরানন দাসও আসেননি। ওনারও আসার অপেক্ষা করছিলাম।

কিন্তু জানতে পারলাম যে জমিদার পুরো আটঘাট বেঁধেছে যাতে কেউ মিটিংএ না আসে। চারদিকে হুমকি তো দিয়েইছে, নানারকম মিথ্যে গুজবও ছড়ান হুয়েছে যে সভায় গুলি চলবে, মারপিট হবে, গ্রেপ্তারি হবে। এও বলা হয়েছে যে যারা যাবে তাদের নাম লিখে নেওয়া হবে এবং পরে তাদের হিসেব করা হবে। এছাড়া সভাস্থলের চার দিকে, কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে পিকেটিং চলছে যে কেউ এদিকে এলেই যেন ফিরিয়ে দেওয়া হয়। রাস্তায় এবং জায়গায় জায়গায় ওদের দালালরা বসে আছে আর লোকেদের আটকে দিচ্ছে। সারকথা, মিটিং না হতে দেওয়ার একটা উপায়ও ছাড়া হয়নি।

আমরা এসবের জন্য তো তৈরি ছিলামই; জমিদারদের শুধু স্বার্থের প্রশ্ন নয়, তাদের দম্ভও মাটিতে মিশে যাচ্ছিল। ভাবা চলছিল যে এর পর ওদের অস্তিত্বও বিপদে পড়বে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথাটা ছিল এই যে ভারতে, সবচেয়ে বড় জমিদার দ্বারভাঙা মহারাজের জমিদারিতে আমরা গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। মহারাজ লাঠির ঘা খাওয়া কালো নাগের মত হিস-হিস করছিলেন। তাঁর নাক কাটা পড়ছিল। ভয় পাচ্ছিলেন যে অত্যাচারিত অঞ্চল সভায় এমন ভেঙে পড়বে যেমন আগের মিটিংগুলিতে উনি দেখেছেন। ফল হবে যে কষ্টে থাকা কৃষকদের চোখ খুলে যাবে। তাই প্রাণ হাতে নিয়ে তাঁর চাকর-নফর আর উচ্ছিষ্টভোজিরা যদি আমাদের মিটিং আটকাতে চেয়ে থাকে তাতে আশ্চর্যের কী? (৯.৮.১৯৪১)

এসব যা করার তা তো করলই। তার ওপর চতুরাননজির বাড়িতে চড়াও হয়ে তাঁকে নানা ভাবে ধমকাল। উনিও তো মহারাজের জমিদারিরই বাসিন্দা। সবাই পড়ে রইল ওনার ঘর ঘেরাও করে। ফলে, মিটিংএর ব্যবস্থাপনা আর সাফল্যের চেষ্টা আর কি করবেন, নিজেই মিটিংএ আসার সাহস করতে পারলেন না। বেশি দেরি হওয়ায় আমরা চিন্তিত হয়ে উঠলাম। বার বার খবর পাঠাতে কোনো রকমে উনি এলেন। কিন্তু চেহারা ফ্যাকাশে ছিল। নেতাগিরির সব হাবভাব হজম হয়ে গিয়েছিল। যখন নেতাদের এই অবস্থা তো কৃষকদের কথা আর কী বলব? অনেক বাধা পেরিয়ে কিছু মানুষ আসতে পেরেছিল।

কিন্তু জমিদারের দালাল আর গুন্ডারা আমাদের মিটিংএও এসে পৌঁছোল এবং চ্যাঁচামেচি করা শুরু করে দিল। কখনো চ্যাঁচাচ্ছিল “মহারাজ বাহাদুরের জয়”, আবার কখনো মুখ ভ্যাংচাচ্ছিল। তাদের সৌভাগ্য ছিল যে আমাদের এই মিটিংএর আট-দশ বছর আগে ওই অঞ্চলে, বিহপুরে (ভাগলপুর) এবং আরো কয়েকটি জায়গায় এক মহাশয় কৃষক নেতা হয়ে কৃষকদের প্রতারণা করে গিয়েছিলেন। তাঁর আসল নাম ছিল মুন্সি ঘরভরণপ্রসাদ। সারণ জেলার বাসিন্দা। কিন্তু নিজের সুনাম ছড়িয়েছিলেন স্বামী বিদ্যানন্দ নামে। এক তো কৃষকদের ধোঁকা কাউন্সিল নির্বাচনে ভোট নিয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, ওদের ঠকিয়ে প্রচুর টাকাপয়সাও হাতিয়েছিলেন। তার পর যেখানেসেখানে জমিদারদের কাছ থেকেও যথেষ্ট টাকা নিয়ে মুজফফরপুরে নিজের প্রেস খুলে বসলেন। ফের গায়েব হয়ে গেলেন। পরে শুনলাম, বোম্বাই চলে গেছেন। একবার যখন পাটনা শহরের (গুলাব বাগ) সভায় হঠাৎ তাঁর দর্শন পেয়েছিলাম তখন মাথায় দেখেছিলাম গুজরাটিদের উঁচু টুপি।

হ্যাঁ, তো মহারাজের লোকেরা চার দিকে এবং ওই মিটিংএও হাল্লা করল যে এক স্বামী এর আগে এসে আমাদের লড়িয়ে দিল মহারাজের সাথে আর নিজে পয়সা কামিয়ে নিল। এখন আরেক স্বামী এসেছে। এও মহারাজের সাথে আমাদের লড়াই বাধিয়ে নিজের কাজ হাসিল করবে আর আমরা পিষ্ট হব … ইত্যাদি। আমাকেও ওরা এধরণেরই প্রশ্ন করছিল। বলছিল যে আমরা কৃষক সভা চাইনা। আপনি চলে যান, আমাদের এমনই থাকতে দিন। মিটিংএ যত বেশি শ্রোতা হবে তত বেশি হাঙ্গামা করার প্রস্তুতি নিয়েছিল ওরা। যেই আমাদের মধ্যে থেকে কেউ বলতে উঠত ওরা হাল্লা করত। এধরণের পরিস্থিতি আমাদের অভিজ্ঞতায় প্রথম ছিল। কিন্তু আমরাও জেদীই ছিলাম। ওখান থেকে পালাবার বদলে যেমন তেমন করে মিটিং করেই হটার সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা আর তাই করলাম। কতক্ষণ বকবক করত ওরা?

এভাবে সভা তো আমরা করে নিলাম। কিন্তু ওই সব নেতাদের ব্যাপারে বড় তিক্ত অভিজ্ঞতা হল যারা হৃদয় দিয়ে কৃষকদের জন্য কাজ করেনা, কৃষকদের জন্য প্রাণাতিপাত করে না। এমন মানুষেরা সময় এলে দাঁড়াতে পারেনা, পিছলে যায়। কথাটার টাটকা প্রমাণ আমরা মচ্ছিতে পেলাম। এটা ঠিক যে আমরা বাবু চতুরানন দাসের আশা ছেড়ে দিলাম। এমন লোক তো মাঝদরিয়ায় নাও ডুবিয়ে দেয়। কিন্তু এটাও ঠিক যে জমিদারের লোকেরাও অবাক হয়ে গেল আমাদের দৃঢ়তা দেখে। ওদেরও উৎসাহে কিছুটা ভাঁটা এল। যদিও তারপর মধুবনি অঞ্চলের আরো একটি মিটিং ওরা ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু আগের মত পারল না। বহেরা, মাধেপুর অঞ্চলেও অনেক মিটিংএ ওরা বাধা দিল। কিন্তু আমরা এগোতে থাকলাম আর ওরা পিছোতে থাকল। এটাই সত্যি যে মচ্ছির মত অবস্থা আমাদের মিটিংএ আর কোথাও হলনা। (১০.৮.১৯৪১)  

১৯৩৯ সালের বর্ষাকাল। দ্বারভাঙা জেলার মধুবনি অঞ্চলেই সকরি স্টেশন থেকে দুমাইল দূরে সাগরপুর মৌজাতে কৃষকদের সংগ্রাম জারি ছিল। দ্বারভাঙা মহারাজেরই জমদারি। সাগরপুরের পাশেই পন্ডৌলে তাঁর অফিস। ওখানেই হাজার বিঘা জমিতে ট্র্যাক্টরের সাহায্যে তাঁর চাষবাসও চলে। চিনির বেশ কয়েকটা মিল আছে ওখানে যার কয়েকটিতে বড় শেয়ার আছে মহারাজের। সকরিতেও একটা মিল আছে। তাই হাজারখানেক বিঘায় আখের চাষ করে জমিদারের লাভ হয় প্রচুর। অন্যান্য জিনিষেরও চাষ হয়। তাই জমিদারের মনে হয়, ভালো ভালো জমি যদি কৃষকদের হাত থেকে বেরিয়ে যায়, ভালোই হয়। খাজনা মেটানো সবসময় সম্ভব হয় না। তাই জমি নিলাম হতেই থাকে। কিন্তু আগে জমিদারদের নিজে চাষের কাজে হাত দেওয়ার ইচ্ছে থাকত না। তাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই জমু আবার কৃষকদেরই দেওয়া হত চাষ করতে। হ্যাঁ, চালাকি করা হত যে যে খাজনা শস্যে বা নগদে নেওয়া হত ওই জমিতে চাষের অধিকারের বদলে, তার স্পষ্ট রসীদ না দিয়ে ধোঁয়াটে কিছু লিখে দেওয়া হত, যাতে কৃষকেরা সে রসীদ তাদের দাবীর প্রমাণ হিসেবে পেশ না করতে পারে যে তারা ওই নির্দিষ্ট জমিটাই চষে। কেননা প্রমাণ থাকলে আইন অনুযায়ী ওই জমির ওপর ওদের কায়েমি রাইতি হক (occupancy right) হয়ে যাবে। সাগরপুরের জমিরও এই একই সমস্যা ছিল।

ওখানকার বকাস্ত জমিগুলোয় চাষ তো করত কৃষকেরাই। তাই সে জমির প্রতি তাদের দাবি স্বাভাবিক ছিল। একটু বুদ্ধি রাখলে যে কোনো মানুষ বলতে পারত যে এটাই মূল কথা ছিল ওখানে। গ্রামের তিন দিকে প্রায় ছাতগুলোর আলসে অব্দি জমি নীলাম হয়ে গেছে বলা হত। কৃষকদের বাইরে বেরোবারও রাস্তা ছিল না। জমি ওদের না হলে আলসে কি করে নামত? জমিদার নিজের জমিতে নামতে দিতনা নিশ্চয়ই। ওদের গবাদি পশু যেত কোন দিকে শেষ অব্দি? খেত কি? টোলার পাশে যে গোয়ালারা থাকত তাদের কুঁড়েগুলো তো ওই জমিতেই দাঁড়িয়েছিল। এর থেকে বড় প্রমাণ আর কী হবে?

আরেকটি কথা। মহারাজের চাষ হয় ট্র্যাক্টর দিয়ে আর তার জন্য বড় বড় খেত দরকার। ছোট ছোট খেতে ট্র্যাক্টর চলা অসম্ভব। কিন্তু যে কেউ দেখলেই বলতে পারত যে তখন অব্দি ছোট ছোট খেত পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। খেতের মাঝখানের সীমানাগুলো (আল) পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। অবশ্য সে সীমানাগুলো জবরদস্তি মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল জমিদার আর সব খেতের ওপর ট্র্যাক্টর চালিয়ে খেতগুলো এক করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমরা নিজে গিয়ে দেখলাম যে খেতগুলো আলাদা আলাদা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আসলে দু’একবার চষলেই সীমানাগুলো মুছে যেতে পারেনা। কম সে কম পাঁচ-দশ বার চষলে তবে মোছে। কিন্তু এখানে তো শুধু বলার জন্য একবার ট্র্যাক্টর চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাহলেও, এটুকু দিয়ে ধাপ্পা দেওয়া যাচ্ছিল না।

হ্যাঁ, তো সাগরপুরের এই বকাস্তের লড়াইয়ে আমাকে দুবার যেতে হয়েছিল। দুবারই এমন জবর্দস্ত মিটিং হল যে জমিদারের অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। একবার তো সভা চলাকালীন হাঙ্গামা করতে চাইছিল জমিদারের লোকেরা। কিছু গুজগুজ ফুসফুস করার বা সওয়াল-জবাব করারও চেষ্টা করল। সাহসের বলিহারি যে দশ-বিশ হাজার কৃষকের ভীড়ে দাঁড়িয়ে কয়েকজন চ্যাঁচামেচি করছে। কৃষকদের মাঝে উৎসাহ এমন ছিল যে ওদের পিষে চাটনি  বানিয়ে ফেলত। কিন্তু তাতে তো ক্ষতি ছিল আমাদেরই। শত্রুরা তো মারপিট চাইছিলই। তাদের মাথায় দুটো লাভ ঘুরছিল। প্রথম তো মিটিংটা ভেঙে যেত। দ্বিতীয়তঃ মিথ্যে মোকদ্দমায় ফাঁসিয়ে সব কজন প্রধান লোকদের উত্যক্ত করা যেত। তাই আমরা কথা বাড়তে দিলাম না আর কৃষকদের শান্ত রাখলাম। শেষে জনসমূহের মেজাজ প্রতিকূল দেখে লোকগুলো হেরে পিঠটান দিল। মিটিংএ উপস্থিত পুলিস এবং অন্যান্য সরকারি অফিসারদেওও আমরা বললাম যে দশ-বিশটা লোক উৎপাত করবে আর আপনারা চুপ করে থাকবেন এটা কেমন ব্যাপার? এ কথা শোনার পর ওরাও একটু বকা-ঝকা করল। তারপর আর কী করার ছিল ওদের? বাধ্য হল সরে পড়তে।

কিন্তু দ্বিতীয়বার ওরা ভিন্ন রাস্তা ধরল। এবার প্রথম থেকেই সজাগ ছিল। যেই আমরা স্টেশন থেকে নামলাম আর আমাদের সোয়ারি এগোল, এঁটোচাটার একটা বড় দল বাইরে এল। সকরিতেই পুলিশের একটা বড় দল বসেছিল। বকাস্তের লড়াইয়ে ধর-পাকড় করার জন্য ওদের পোস্ট করা হয়েছিল। আমরা যখন সকরির ডাকবাংলো থেকে এগোলাম হাল্লাবাজরা বেরিয়ে এল। যা ইচ্ছে তাই বলতে লাগল। ‘মহারাজ বাহাদুরের জয়’, কিসান-সভার ক্ষয়’, ‘স্বামীজী ফিরে যান, আপনার ধাপ্পায় পড়ব না’, ‘ঝগড়া বাধানেওয়ালাদের থেকে সাবধান’ ইত্যাদি স্লোগান দেওয়া শুরু করল। মজা হল যখন আমরা এগোলাম আর ওরা আমাদের পিছন পিছন দৌড়োতে দৌড়োতে চিৎকার করতে লাগল। বিদঘুটে পরিস্থিতি। দেখার মত তামাশা। এমন আর কোথাও আমরা দেখিনি। লাগাতার ওরা পিছু নিতে থাকল। এমনকি গাঁয়ের প্রান্ত অব্দি পৌঁছে গেল। কিন্তু যে আমরা গ্রামের ভিতরে ঢুকলাম ওরা অন্যদিকে ঘুরে গেল। খবর পেলাম যে পাশেই মহারাজের যে কাছারি আছে সেখানেই প্রমাণ দিতে গেল যে ওরা আমাদের পিছু পিছু এসেছে একেবারে গ্রাম অব্দি। তাই ওদের পারিশ্রমিক পুরোটা যেন ওরা পায়। জমিদারের তাঁবেদারি করা তো জরুরি ছিলই। এটাও দেখলাম যে কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ করতে করতে আমাদের পিছু নেওয়া লোকদের মধ্যে তিলক-চন্দনধারী ব্রাহ্মণ ছিল অনেক।

আমাদের হাসিও পেত আর ওদের এই মূর্খতায় করুণাও হত। মধুবনির সে ব্রাহ্মণ কৃষকের কথা আমাদের কানে মাঝে মাঝেই প্রতিধ্বনিত হত। ভাবতাম যে এরাও তারই মত গরীব আর অত্যাচারিত। তফাৎ এটাই যে তার জমি ইত্যাদি বিকিয়ে গেলেও আত্মা আর ইজ্জত বিকিয়ে যায় নি। নিজের আত্মসম্মান বাঁচিয়ে রেখেছিল সে। কিন্তু এরা তো নিজেদের সব কিছু জমিদারের ফেলা রুটির টুকরোর বদলে বেচে দিয়েছে। তাই এদের কাছ থেকে যেমন কিছু আশা করার নেই,ওই কৃষক এবং তার মত আরো যারা আছে তাদের ভিতরেই কৃষকের উদ্ধারের আশা দেখি আমরা।

আমরা এটা বলতে ভুলে গেলাম যে সাগরপুরে সে সময় দ্বারভাঙা জেলা কৃষক সম্মেলন ছিল। তাই কৃষক ছাড়া পুরো জেলার কর্মীদেরও ভালো জমায়েত হয়েছিল। অনেক প্রস্তাব গৃহীত হল। গরম গরম ভাষণও হল। এমনিতে তো আমাকেও খুব গরম মনে করা হয় আর আমার বক্তৃতা কঠোর হয় বলে সবাই। কিন্তু ওই সম্মেলনে যখন দু’একজন দায়িত্বশীল কিসান-সভাবাদীর ভাষণ শুনলাম, অবাক হয়ে গেলাম। মনে হচ্ছিল ওদেরই আয়ত্তে আছে সমস্ত কৃষক এবং তাদের শক্তি। ফলে, ওরা যা চাইবে, করে ফেলবে। তাই মাঝে মাঝেই দ্বারভাঙার মহারাজকে যুদ্ধে আহবান করে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল মহারাজ যেন কাঁচা সুতো, এক ঝটকায় ছিঁড়ে যাবেন। দশ বারো বছর কাজ করার পর কৃষক আন্দোলন যখন কৃষক সংগ্রামের পথে এগিয়েছে, ঠিক সে সময় এরকম দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা শুনতে আমি প্রস্তুত ছিলাম না। ফলে, নিজের ভাষণে আমি ওদের বকুনি দিলাম আর স্পষ্ট বলে দিলাম যে আপনারা যেমনটা ভাবছেন, দ্বারভাঙার মহারাজ তেমন দুর্বল নয়।

আমার এই কথার ওপর জমিদারদের খবরের কাগজ ‘ইন্ডিয়ান নেশন’এ যে মন্তব্যাদি প্রকাশিত হল, তা দেখে আমি আশ্চর্যচকিত হলাম যেমন, হাসিও পেল – লেখা হল যে স্বামীজী ভয় পেয়ে গেছেন। সত্যি কথা, জমিদারেরা যে এত মূর্খ হবে, আমার কথার অর্থ বুঝতে পারবে না, এ আমি ভাবিনি। আজ অব্দি বুঝতে পারলামনা কিসের ভিত্তিতে আমায় ভীত মনে করা হল। (১২.৮.১৯৪১) 

১৯৩৬ সালের গ্রীষ্মের কথা। লখনউ কংগ্রেস থেকে ফিরে আমি মুঙ্গের জেলার সিমরি বখতিয়ারপুরে মিটিং করতে গেলাম। তার আগে, ভূমিকম্পের পর আমি একবার ওখানে গিয়েছিলাম। বন্যার প্রকোপ ছিল সে সময়। বন্যা তো ওখানে আসে কোসি নদির কৃপায় আর সে নদি এমন ভয়ঙ্কর যে জুন মাসেই ঝড় তুলে দেয়। অঞ্চলটাকে উজাড় করে দিয়েছে নদি। প্রথম সফরে বন্যার প্রকোপ আর মানুষের ভয়ানক দারিদ্র্য দেখে আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। মন কাঁদছিল। প্রাণে গেঁথে গেল ছবিটা। ওখানকার মানুষজন আর কর্মীদের কাছ থেকে যা কিছু শুনলাম তাতে মনে সঙ্কল্প করে নিলাম যে দ্বিতীয়বার এই অঞ্চলে এসে ঘুরতে হবে। তবেই নিজের চোখে প্রকৃত অবস্থা দেখতে পাব।

তাই বর্ষাকাল আসার অনেক আগে, ১৯৩৬এর মে মাসেই, যদ্দূর মনে পড়ে, ওখানে গেলাম। এবার খাস বখতিয়ারপুর ছাড়াও ঘেনুপুরা, কেবরা ইত্যাদি জায়গাতেও মিটিংএর ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু সহজে সে সব জায়গায় পৌঁছোন সম্ভব ছিল না। প্রচন্ড গরম পড়ছিল আর চারদিকে জলের জন্য হাহাকার। কিন্তু ওই অঞ্চলে নৌকো ছাড়া ঘোরা অসম্ভব ছিল। কোসি মাইয়ের দয়ায় সব জমি জলের নিচে চলে গেছে। যেদিকে তাকাও শুধু জল। সমুদের জেগে থাকা দ্বীপের মত গ্রামগুলো দেখা যাচ্ছিল। গ্রামের কিনারে একটু আধটু জমি, যাতে চাষ হতে পারে। শেষ তো শুধুই জল। মানুষ মাছ আর জলপশু খেয়েই জীবনধারণ করত সাধারণতঃ; অন্ন তো নামমাত্র পেত কখনোসখনো, তাও কদ-অন্ন, জমিদারের কুকুরগুলো শুঁকতেও চাইবেনা, খাওয়া তো দূরের কথা। ওই অঞ্চলে কিছু দূর গরুর গাড়িতে গিয়ে বাকি সব জায়গায় নৌকো করে বা হেঁটে যেতে হত। যেখানে জল ছিল না, সেখানেও, হাঁটু অব্দি কাদা থাকার কারণে গরুর গাড়ি চলা অসম্ভব ছিল।

হ্যাঁ, এটা বলতে তো ভুলেই গেলাম যে ওই এলাকার সবচেয়ে বড় চালাক-চতুর জমিদার বখতিয়ারপুরের চৌধুরি সাহেব। তাঁর পুরো নাম চৌধুরি মোহম্মদ নাজিরুলহাসান মুতওয়লি। একটা প্রসিদ্ধ দরগা আছে ওখানে আর সেই দরগার সাথে সম্পর্কিত একটা খাস জমিদারি আছে যার আয় সব মিলিয়ে সে সময় ছিল বলা হয় সত্তর আশি হাজার। চৌধুরি সাহেব তারই মুতওয়লি বা অধিকারি। এভাবে, মুসলমানদের ধার্মিক সম্পত্তিরও তিনিই মালিক এবং সে সম্পত্তিই ভোগ করেন। দারুণ ঠাটবাটে রম্য প্রাসাদও তৈরি হয়েছে। হাতি, ঘোড়া, মোটরগাড়ি ইত্যাদি সব রকম সওয়ারি আছে। শিকার খেলতে ওস্তাদ, এমনকি গরীব কৃষকদের সম্মান, প্রাণ আর মালের শিকার করতেও একটুও দ্বিধান্বিত হন না, ব্যস, সুযোগ পেলেই হল। আর অত্যাচারি জমিদারেরা তো এমন সুযোগ পেতেই থাকেন। তাঁর মত অত্যাচারি জমিদার আমি খুব কম দেখেছি, অবশ্য, অত্যাচার আর বাড়াবাড়ি ছাড়া তো আর জমিদারি টিঁকে থাকতে পারেনা। আমার তো এটাই ধারণা যে কৃষক ও কৃষক-হিতৈষিদের, কৃষকসেবকদের মাটির তৈরি পুতুল জমিদারদের প্রতিও সজাগ থাকা উচিৎ। সেও কম বিপজ্জনক হয় না। আর কিছু না হোক, যদি গায়ের ওপর পড়ে যায়, হাত-পা তো ভেঙেই দেবে।

চৌধুরির জমিদারিতে আমি অনেক ঘুরেছি। কৃষকদের একেকটা কুঁড়েঘরে গিয়ে নিজের চোখে ওদের দুরবস্থা দেখেছি আর আলাদা করে বসে ওদের দুঃখ-কষ্টের গল্প শুনেছি। বুক কাঁপিয়ে দেওয়া ঘটনাগুলো শুনতে শুনতে আমার রক্ত গরম হয়ে উঠেছে। জমিদার হাজারটা রাস্তা বার করে রেখেছে কৃষককে দাবিয়ে দেওয়ার। কূটনীতির তো তারা অবতার, বলতে গেলে। বিভেদনীতিটা খুব বেশি করে কাজে লাগান। শ’খানেক কেন, হাজারাটা দালাল আছে ওদের যারা গুপ্তচরের কাজ করে। কৃষক তো মার খেয়ে আছেই। গোপনে ওরা কী বলাবলি করে তার বিষয়েও নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া হতে থাকে। আমাদের পিছনেও জমিদারের অনেক গুপ্তচর লাগানো হয়েছিল। তাই সতর্ক ভাবে আলাদা করে কথা বলার এবং কৃষকদের অবস্থা জানার প্রয়োজন হয়েছিল। তবুও, গরীব এবং অত্যাচারিত কৃষক এত ভয়ে ভয়ে ছিল যেন হাওয়াকেও বিশ্বাস করতে পারছিলনা। কারোর মধ্যে এতটুকু সাহস অবশিষ্ট ছিলনা। একটু নালিশ জানালে কি ব্যস, কে জানে কোন বিপদ শিরে ঘনিয়ে আসবে আর চৌধুরির জালে ফেঁসে মরতে হবে, তাও তিলে তিলে।

যে কৃষকদের কুঁড়েগুলোও ভেঙে গেছে এবং তার চালা ভেদ করে বৃষ্টি আর রোদ ঢোকে ঘরে, যাদের শরীরে কাপড়টুকুও অবশিষ্ট নেই, লজ্জা নিবারণ করছে হাজারটা টুকরো দিয়ে বোনা কানি, যাদের অন্ন জোটে ন’মাসে ছমাসে বোধহয় একবার, তাদের কাছ থেকে বছরে আশি হাজার টাকা উশুল করা চাট্টিখানি কথা নয়। বালি থেকে তেল বা পাথর থেকে দুধ বের করাও এর থেকে সহজ। কেমন কেমন বুদ্ধি খাটিয়ে আর কোন কোন উপায়ে টাকাগুলো উশুল করা হয় তার ফিরিস্তি দিতে গেলে একটা পুঁথি তৈরি হয়ে যাবে। তাই নমুনা হিসেবে কয়েকটি লিখছি।

ওই অঞ্চলেই আমি প্রথম জানলাম যে চৌধুরির জমিদারিতে চারটে জিনিষের মনোপলি (monopoly) ছিল। অর্থাৎ চারটে জিনিষের ওপর তার সবরকম অধিকার ছিল এবং তার মর্জির বিরুদ্ধে এ জিনিষগুলো বিক্রি হতে পারত না। সে চারটে জিনিষ ছিল নুন, কেরোসিন তেল, নতুন চামড়া আর শুঁটকি মাছ। এর মধ্যে থেকে শুধু নুনের মনোপলি আমার ওখানে পৌঁছোনোর আগে উঠে গিয়েছিল। বাকি তিনটের মনোপলি তো ছিলই, যা আমার আন্দোলনে উঠল। নিজের বিস্তৃত জমিদারিতে সে সবাইকে বলে রেখেছিল যে তার মর্জির বিরুদ্ধে কেউ নুন আর কেরোসিন এই দুটো জিনিষ বিক্রি করতে পারবে না। কাজেই কারো সাহস ছিল না। আর জমিদার সাহেব কোনো দু’একজন মোটা আসামির কাছ থেকে দু’চার হাজার নিয়ে শুধু তাকেই বেচবার হক দিতেন। ফল হত যে ঠিকেদার দুটো জিনিষই অন্য জায়গা থেকে বেশি দামে বিক্রি করত। কেননা, ঠিকে নেওয়ার পয়সাটা তো উশুল করতই, একচেটিয়া কারবার হওয়ার ফলে আরো বাড়িয়ে দিত দাম। আমি জিজ্ঞেস করে জানলাম যে কেরোসিন তেল অন্য জায়গায় পাঁচ পয়সায় বিক্রি হয় সেটা এই জমিদারিতে বিক্রি হয় সাত বা আট পয়সায়। উঃ, একে বলে লুট!

যদি কেউ বাইরে থেকে এই তেল নিয়ে আসত তাহলে কঠোর শাস্তি হত তার আর কত রকমের জরিমানা দিতে হত। তাই পাহারা দেওয়া হত যাতে কেউ বাইরে থেকে না আনতে পারে। দু’চারজন কড়া জরিমানা দিলে ফল হয় যে অন্যেরাও আর সাহস করতে পারেনা। খোলাখুলি চলত এই বেআইনি কাজ। এমনও নয় যে পুলিস খুব দূরে। থানাই তো আছে, তবুও এই দিনেডাকাতি টের পেত না কেউ। টের পাবেই বা কী করে? কারোর গরজ থাকলে তবে তো? গরজ ছিল কৃষকদের বা গরীবদের। কিন্তু ওদের কথা কে শোনে? ধনীরা তো বাইরে থেকেই টিন আনিয়ে নিত। ওখানে ধনী ছিলই বা কজন। ব্যাপারী গোছের মানুষেরা তো ভয়ে টুঁ শব্দটুকুও করত না। চৌধুরীর রাইয়ত, ধনী হোক বা গরীব, তার আজ্ঞার বিরুদ্ধে যাবে কী করে? কিন্তু এটা বিস্ময়কর যে আমি ওখানে পৌঁছোনোর আগে সরকার এই কেলেঙ্কারির কথা জানতে পারেনি।

নুন বিক্রির ওপরও চৌধুরির একচেটিয়া অধিকার তো ছিলই। কিন্তু ১৯৩০ সালের লবণ সত্যাগ্রহের পর সেটা আর রইল না। যখন মানুষ সরকারের কথা শুনতেই রাজি নয়, খোলাখুলি অমান্য করছে আইন তখন জমিদারের পরোয়া কে করে? আর যদি জমিদারসাহেব সে সময় এতে নাক গলাতেন, আবহাওয়া এমন ছিল যে তাঁকে আপশোষ করতে হত। কেননা বেআইনি কাজগুলোর হাঁড়ি ভাঙত হাটে। ফলে নুনের একচেটিয়া কারবারের সাথে কেরোসিন ইত্যাদির কারবারও ঘুচে যেত। তাই চালাকি করে মুখ বন্ধ রাখলেন। মানুষেরাও, নুন কেনাবেচার স্বাধীনতাতেই তুষ্ট হয়ে আর এগোল না। তাই জমিদারের কালো কাজকর্মের কথা বাইরের দুনিয়া জানতে পারল না আর বাকি জিনিষের ওপর তাঁর একচেটিয়া অধিকার রয়েই গেল।

শুঁটকি মাছের গল্পটাও এধরণেরই। আমি নিজে তো ওটার বিষয়ে কিছু জানিনা যে কেমন জিনিষ। কিন্তু লোকেরা বলল যে উৎকৃষ্ট কোনো মাছ, যারা খায় খুব তারিয়ে তারিয়ে খায়। তাই বাজারে বিক্রি খুব। জলের অঞ্চল। মাছ হয় অনেক। শুকিয়ে অনেক দূরে দূরে চালান হয়। যারা ধরে তাদের তো লাভ হয়ই, জমিদারও প্রচুর নাফা কামায়। তার আয় বাড়ে। মাছ থেকে যে আয় হয় সেটাই জলকর। এখন সবাই বা যার ইচ্ছে সে, যদি মাছ ধরতে না পারে তাহলে মিছিমিছি ঠিকে নেওয়া লোকেদের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা হবেই। জমিদার এটারই ফায়দা লোটে আর গোনাগুনতি লোককে মাছের ঠিকে দিয়ে বছরে না জানি কত হাজার টাকা কামিয়ে নেয়। অন্যান্য মাছের সেরকম চাহিদা না হওয়ার কারণে ধরতে কোনো মানা নেই। শুধু, যে ধরবে, জলকর দেবে।

জলকরেরও একটা বাঁধাধরা নিয়ম আছে। ওই জমিদারি এবং একই ভাবে দ্বারভাঙা মহারাজ থেকে শুরু করে অন্য জমিদারদের জমিদারিতে এই জলকর নিয়ে এমন ধাপ্পাবাজি চলে যে আর বলবেন না। বিশেষ করে কোসি নদি যেখা যেখান দিয়ে গেছে সেসব জায়গাতেই এই ব্যাপারটা দেখা যায়। সেটা এই – জমির ওপর দিয়ে তো নদি বইছে, ফসল হচ্ছেনা, তবু খাজনা তো কৃষককে দিতেই হবে! আইন যে! আবার জলের মাছ ইত্যাদির জন্য জলকরও দিতে হবে! একটাই জমি, তার ওপর দুটো ট্যাক্স, দুটো খাজনা। জলকর তো শুধু সেই জমিতে জমা জলের ওপর হওয়ার কথা যাতে কখনো চাষ হয়না। কিন্তু এখানে উল্টো গঙ্গা বইছে। তাই চৌধুরিও নিজের জমিদারিতে সেটাই করে।

এবার শেষ প্রসঙ্গ। নতুন চামড়ার একচেটিয়া কারবার। ব্যাপারটা এভাবে হয় যে যখন গ্রামে পশু মরে, তার মাংসখাওয়া লোকেরা ওটাকে উঠিয়ে নিয়ে যায় আর চামড়া বার করে বিক্রি করে দেয়। যার পশু ছিল তাকে দেওয়া হয় খুব বেশি হলে একাধ জোড়া জুতো বা কোথাও কোথাও বাঁধা দু-চার আনা পয়সা। এই পদ্ধতিই সব জায়গায় চলে। শৈশব থেকেই এ অভিজ্ঞতা আমার। কিন্তু উত্তর বিহারের পূর্বদিকের জেলাগুলোয় উল্টো ব্যাপার হয়। চৌধুরি ছাড়াও, দ্বারভাঙা মহারাজের জমিদারির পুর্ণিয়া ইত্যাদি অঞ্চলে জেনেছি যে বড় জমিদারেরা এই চামড়ার এক বিশেষ বন্দোবস্ত করে যাকে ‘চরসা মহাল’ বলা হয়। তা থেকে হওয়া আয়কে চরসা মহালের আয় বলা হয়। পদ্ধতিটা এই যে পশুর চামড়া যে বার করল সে যার তার হাতে সেটা বেচতে পারেনা। কিন্তু জমিদারকে বছরে  কয়েক হাজার টাকা দিয়ে এই চামড়া খরিদ করার ঠিকেদার দু’চারজন নিযুক্ত হয় প্রত্যেক অঞ্চলে আর তারা ওই চামড়া খরিদ করতে পারে। যদি অন্য কেউ কেনে বা অন্য কাউকে বেচে দেয় চামড়ার ধারক তাহলে দন্ডের ভাগী হয়। এভাবে খরিদ্দার দুটাকার চামড়াও দু’চার আনায় পেয়ে যায়। যে বেচে তার তো গরজ থাকেই; আর যেহেতু অন্য খরিদ্দার নেই তাই গরজে যা দাম পায় তাতেই বেচে। এভাবে হাজার হাজার গরীব মানুষকে লুটে কয়েকজন ঠিকেদার আর জমিদার নিজেদের পকেট গরম করে। এই একই পদ্ধতি চৌধুরির জমিদারিতেও ছিল।

এই চরসা মহালের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন সব জমিদারিতে হল। কিন্তু চৌধুরির জমিদারিতে তিন চার জায়গায় আমাদের সফর হল আর অনেক বেশি মিটিং হল। ওখানে কেরোসিন তেল আর শুঁটকি মাছের প্রশ্নও ছিল। তাই আন্দোলন আরো শক্তিশালী হল। মানুষকে দাবিয়েও রাখা হয়েছিল অনেক বেশি। আমরা ওই রকমই বা ওর থেকেও বেশি দাবিয়ে রাখা মানুষদের অঞ্চল আরেকটা পেয়েছিলাম বিহারে। সেটাও দ্বারভাঙা মহারাজেরই জমিদারিতে দ্বারভাঙা জেলার পন্ডরি পরগনার অঞ্চল ছিল। ওই এলাকাটাও এভাবে বারোমাস জলে ডুবে থাকে আর বেশির ভাগ বাসিন্দা তথাকথিত ছোটো জাতের। তাই চৌধুরির জমিদারির মতই, আমাদের আন্দোলনের গতি ওখানেও খুব তীব্র ছিল। দু’তিন বার আমি নিজে গেলাম। ফল হল যে ওখানকার গরীবেরাও উঠে দাঁড়াল। একই পরিস্থিতি বখতিয়ারপুরের জমিদারিতেও হল আর আমরা খবর পেলাম যে কেরোসিন তেল ইত্যাদি সব জিনিষের একচেটিয়া কারবার শেষ হয়ে গেছে।

চৌধুরি চালাক ছিল। আমাদের ওখানে যাওয়া ও বরদাস্ত করতে পারছিল না। এমন বন্দোবস্ত করল যাতে না আমরা সভা করার কোনো জায়গা পাই না থাকবার। কর্মীরা যে আশ্রম তৈরি করেছিল সেটাও ভেঙে ফেলার পুরো চেষ্টা চালাল। কিন্তু সব রকম চেষ্টা ওর বিফলে গেল। আমাদেরও ওখানে যাওয়ার একটা জিদ হয়ে গেল। একবার তো আমাদের মিটিং হওয়ার ছিল সলখুয়া গ্রামে। কিন্তু ও চেষ্টা করে ঠিক মিটিংএর সময়ে অন্যায়ভাবে আমাদের ওপর ১৪৪এর নোটিশ করিয়ে দিল। তবুও মিটিং তো হলই। আমাদের নামে যেন ওর পেটে উটের লাফানি শুরু হয়ে যেত। হিন্দু-মুসলমান প্রশ্নটাও ওঠাত নিজের ফায়দার জন্য কিন্তু শুধু মুসলমানদের দাবানোর সময়। চাইত যে হিন্দুরা যেন ওদের সাহায্য না করে। কিন্তু আমরা হিন্দুদের সজাগ করে দিলাম যে এমন ভুল যেন ওরা না করে। 

১৯৩৬ সালের বর্ষাকালে, যদ্দুর মনে পড়ে, ভাদ্রমাস ছিল। কিন্তু বৃষ্টি ভালো হয়নি আর দিনের বেলায় রোদ-ছায়ার খেলা চলত – মেঘের টুকরো আকাশে পড়ে থাকত। তবু এমন কড়া হত রোদ যে শরীরের চামড়া জ্বলে যাচ্ছে মনে হত। এমনিতেই বর্ষাকালের রোদ বেশ কড়া হয়। কিন্তু ভাদ্রে তার জ্বলুনি আরো বেড়ে যায়। বিশেষকরে বৃষ্টি কম হলে শরীরটাকে পোড়াতে শুরু করে। ঠিক এমনই সময় সারন (ছাপরা) জেলার অর্কপুর মৌজায় কৃষকদের একটি শক্তিশালী মিটিংএর আয়োজন হয়েছিল। তারিখ মনে নেই। কিন্তু দৈব এমন, মিটিং করে সেদিনই রাত সোয়া দশটার ট্রেন ধরে বিহটার পথে রওনা দেওয়া জরুরি ছিল। আসলে পরের দিন কৃষকদেরই প্রশ্নে কথা বলতে এক ভদ্রলোকের আসার কথা ছিল বিহটা আশ্রমে। আগে থেকে নির্দ্ধারিত ছিল এই আলোচনা। ওনারই জমিদারির ব্যাপার। জমিদারি এমন কিছু বড় নয়। কিন্তু এই ভদ্রলোক আমার পুরোনো পরিচিত। ডেহরির কাছে দরিহট মৌজা তাঁরই। ওখানে কৃষকদের আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠেছিল। আমাকেও যেতে হয়েছিল বেশ কয়েক বার। কৃষকদের প্রশ্নের সামনে, জমিদারের পরিচিত বা অপরিচিত হওয়ার কথা আমার মনে উঠতে পারত না। কিন্তু বোধহয় তাঁর বিশ্বাস ছিল। তাই অন্যদের দিয়ে আমায় বকুনিও খাইয়েছিল। ওসবের পরোয়া আমি করিনা কখনো। আমি তো নিজের কাজ করছিলাম। তা সত্ত্বেও যখন উনি নিজে এসে আমার সাথে এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলেন আমি খুশি মনে তাঁর জন্য দিন স্থির করে দিলাম।

এই অর্কপুর গ্রাম বেঙ্গল নর্থ ওয়েস্টার্ন রেলওয়ের (ও-টী-রেলওয়ে) ভাটাপোখর স্টেশন থেকে ৯ মাইল দক্ষিণে পড়ে। বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদের জন্মভূমি জিরাদেইএর পাশ দিয়েই একটা রাস্তা অর্কপুরের দিকে চলে যায়। সেখানে যাওয়ার জন্য সকালের ট্রেনেই পৌঁছেছিলাম। আমার সাথে আরো একজন ছিল। ছাপরা থেকে কংগ্রেস কর্মী শ্রী লক্ষ্মীনারায়ণ সিং ছাড়া আরো দুজন উকিল ভদ্রলোক ছিলেন, যাঁদের বাড়ি ছিল ওই এলাকায়। ভাটাপোখর স্টেশন থেকে এক মাইল দূরে দক্ষিণ-পশ্চিমের বাজারেই আমাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। আমরা সেখানে গেলাম, স্নান করলাম, খাবার খেলাম, তারপর দুপুরের আগেই অর্কপুরে যেতে বেরিয়ে পড়লাম। সওয়ারি ছিল হাতি। একদম পছন্দ নয় আমার। কিন্তু কৃষকদেরই তো সভা। যাওয়ার জন্য সওয়ারি জুটছে সেই কি কম? কত সভায় দূরে দূরে যেতে হয়েছে হেঁটে, যাতে মিটিং সময় মত হয়, কোনো ঝঞ্ঝাট না হয়। কোনো ধনী ব্যক্তির কৃপায় যদি হাতিই পেয়ে থাকি সেটায় অপছন্দ করার প্রশ্ন ওঠে কিভাবে? তাই সবার সাথে আমিও হাতির পিঠে চেপে রওনা হয়ে গেলাম। কিন্তু পথের রোদ আমাদের পুড়িয়ে দিল। অনেক কষ্টে দুপুর নাগাদ অর্কপুর পৌঁছোতে পারলাম। পথেই ভেবে নিয়েছিলাম যে ফেরার সময় হেঁটেই ফিরব। রাস্তায় কোনো অসুবিধা  হওয়ার তো কথা নয়। সাথে লন্ঠন থাকবেই, যাতে অন্ধকার হয়ে গেলেও কোনো সমস্যা নাহয়। তাই সবাই নিজেদের জামাকাপড় স্টেশনের কাছে ওই বাজারেই রেখে এসেছিলাম যাতে ফেরা সহজ হয়।

সভা তো হল এবং ভালোই হল। মানুষের কষ্ট যে অনেক। সরযুমাই কাছেই দরশন দেন। বর্ষাকালে তাঁর বন্যায় সমস্ত এলাকা জলমগ্ন হয়ে যায়, ফসল নষ্ট হয়। ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয় আর কৃষকদের মাঝে হাহাকার ছড়িয়ে পড়ে। তবু জমিদারেরা কঠোর হাতে নিজেদের আদায় চালিয়ে যায়। আমি গেলে হয়ত কৃষকেরা কিছুটা পরিত্রাণ পাবে আর তাদের আর্তনাদ বাইরের জগত শুনতে পাবে তাই আমায় ডাকা হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে সভা তো সফল হতই। কে বাধা দিত? ওখানকার জমিদার, দ্বারভাঙা মহারাজ বা বখতিয়ারপুরের চৌধুরির মত বলদর্পী ও সাহসীও ছিলনা যে বিশেষ বাধা দিত।

সভার সময় জেলার, বিশেষ করে ওই অঞ্চলের আরো অনেক কংগ্রেস কর্মী এসে গিয়েছিল এবং ওদেরই মধ্যে ছিল চৈনপুরের এক যুবক জমিদার, আমার পরিচিত। ওর কাকাদের সাথে আমার পুরোনো দেখা সাক্ষাৎ ছিল। কিন্তু আমি তো চমকে গেলাম – এ কি? কৃষকদের সভায় বড় বড় জমিদারদের পৌঁছোনোর মানে কী? লোকেরা বলল ইনি তো কংগ্রেসী। কংগ্রেসে তো সবার জায়গা আছে। তাই ইনিও এখানে এসেছেন। কথাটা শুনে নিলাম। কিন্তু আমার মনে বা বুদ্ধিতে কৃষকসভার সাথে কংগ্রেসের এই হৃদ্যতা ঢুকল না। আমার চোখের সামনে সে সময় ভারতের ভাবী স্বরাজ্যের একটা ছবি ভেসে উঠল। ভাবলাম যে এই জমিদারদেরও তো ওটাই স্বরাজ্য হবে। অন্য কিছু তো হবেনা। তাহলে সেটা কৃষকদের জন্য স্বরাজ্য কি করে হবে? বাঘ আর ছাগলের একটাই স্বরাজ্য হওয়া তো অনন্য ও অপূর্ব ঘটনা! কিন্তু আমার ভিতরে চলতে থাকা এই ওলটপালট আর মহাভারতের কথা ওখানকার মানুষজন কিভাবে বুঝবে? তারপর তো আমি নিজের কাজে লেগে গেলাম আর কথাটা ভুলেও গেলাম। সেই যুবক জমিদারের কাছে একটা নতুন আর খুব ভালো মোটরগাড়ি ছিল, তাতেই চড়ে এসেছিল সে।

সভার কাজ শেষ হওয়ার পর যখন দু’ঘন্টা বেলা থাকতেই রোনা হওয়ার কথা ওঠালাম তখন ওখনকার কংগ্রেসি বন্ধুরা প্রথমে এই যাচ্ছি, এই যাচ্ছি করতে থেকে গেল। তারপর বলল অনেক সময় আছে। একটু বসে যাই। আসলে ওরা পায়ে হেঁটে ন’মাইল যেতে রাজি ছিল না। ঠিকই ছিল কথাটা। আমার আর ওদের কৃষক সভা তো এক ছিল না। ওদের স্বরাজ্যের চিন্তা ছিল বেশি – ভাষা ভাষা স্বরাজ্য যাতে কৃষকের কী স্থান হবে তা এখনো অব্দি অজানা। সেই স্বরাজ্যের লড়াইয়েই কৃষকদের সাথে নিতে ওরা এসেছিল। দ্বিতীয়তঃ, ওদের স্বরাজ্য তো শিগগিরই এসেম্বলি, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড ইত্যাদির মেম্বারি এবং আরো বিভিন্ন রূপে আসার ছিল যাতে কৃষকদের সাহায্যের নিতান্ত প্রয়োজন। কৃষকেরা সাহায্য না করলে তো ওই স্বরাজ্য ওরা পেত না। এটাই মোদ্দা কথা যেটা ওরা খুব ভালো করে বুঝত। মোটরওয়ালা বাবুমশাইয়েরও কংগ্রেস-ভক্তি পুরোটা বুঝে গেলাম যখন দেখলাম যে, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের জন্য কংগ্রেসি প্রার্থী এক মুসলমান ভদ্রলোকের বিরুদ্ধে, মহাবীরী ঝান্ডা তোলা এক গাড়িতে উনি অত্যন্ত বিচলিতভাবে বসে আছেন!

শেষে যখন খুব দেরি হয়ে গেল আর আমি চিন্তায় পড়লাম তখন ওরা বলল যে বাবুমশাইয়ের মোটরগাড়িটা আমরা চেয়েছি, ওতেই আপনাকে পৌঁছে দেব। আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, এক জমিদারের মোটর গাড়িতে যাব আর তারপরেও কৃষক সভার কর্মী সেজে থাকব? এ হতে পারেনা। একথায় ওরা কিছুক্ষণ চুপচাপ রইল। আমিও চিন্তিত ছিলাম। ব্যবস্থা তো ওদেরই করতে হত। দেরি হয়ে গিয়েছিল। লন্ঠন ছাড়া চলা অসম্ভব ছিল আর আমার কাছে লন্ঠনও ছিলনা। নইলে আমি বেরিয়ে পড়তাম। যখন আবার আমি প্রশ্নটা তুললাম তখন ওরা সেই মোটরগাড়ির কথা বলল আর সাথে যোগ করল যে এটা ওদের ব্যবস্থা, আমার কি, আমি তো আর মোটর চাইনি। জবাব দিলাম, কিন্তু ওরা জিদ ধরে ছিল আর আমি তখন অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। একটু বেলা থাকতে যদি কথাটা উঠত আমি একাই বেরিয়ে পড়তাম। কিন্তু সন্ধ্যা হচ্ছিল তখন। ওরা আমার স্বভাব জানত, তাই মোটরগাড়ির কথাটা আগে ওঠায়নি। আর পরে যখন দেখল আমি একা আর পালাতে পারবনা তখন ওই ব্যাপারে জিদ ধরল। শেষে নিজের দুর্বলতায় রাজি হলাম আর মোটরগাড়িতে যাওয়া স্থির হল।

রাত আটটায় আমাদের সবাইকে নিয়ে মোটর চলল। বাবুমশাই নিজেই চালাচ্ছিলেন। জানলাম যে কাছেই তাঁর শ্বশুরবাড়ি। ওনাকে ওখানেই নামিয়ে মোটর আমাদের স্টেশনে পৌঁছে দেবে। মোটরে যাচ্ছি বলে আমরা লন্ঠনও সংগে নিইনি। যাই হোক, গাড়ি তাঁর শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছোল। উনি নেমে গেলেন। ড্রাইভার সামনে বসল। উনি ভালো করে বুঝিয়ে দিলেন খুব আরামে গাড়ি চালাতে। রাস্তায় ঝঞ্ঝাট না হয়। স্টেশনের দিকে বেরিয়ে পড়ল গাড়িটা। কিন্তু রাস্তাটা ভিন্ন ছিল, দিনের বেলা যে রাস্তায় এসেছিলাম সেটা ছিলনা। তবে একদম নতুন রাস্তা ছিল। রাত সাড়ে আটটা বাজছিল। বুঝতে পারছিলাম না কোথায় যাচ্ছি। হঠাত কাদায় আটকাল গাড়ি। বর্ষাকাল। রাস্তাটাও কাঁচা। ড্রাইভার জোর লাগাল। কোনো ফল হলনা। অনেকক্ষণ কাদার সাথে কুস্তি চালাল গাড়িটা। আমরা চিন্তিত হচ্ছিলাম। হতাশা বাড়ছিল। সন্দেহও হচ্ছিল যে ড্রাইভার বোধহয় রাতে যেতে চাইছে না তাই সত ভাবে নিজের কাজটা করছেনা। কিন্তু করব কি? বললে ব্যাপারটা খারাপ হত। ও না করে দিলে স্টেশনে পৌঁছোনোই অসম্ভব হত। শেষে যখন ঘড়িতে দেখলাম সাড়ে আটটা তখন মোটরগাড়ির আশা ছেড়ে হাঁটার কথা ভাবতে শুরু করলাম।

কিন্তু ভাদ্রের অন্ধকার রাত, রাস্তা একেবারেই অজানা, সঙ্গে লন্ঠনটাও নেই। মোটরগাড়ি আছে ভেবে লন্ঠনের প্রয়োজন বোধ করিনি আর এখন “চৌবে গেল ছব্বে হতে, দুবে হয়ে ফিরল”! তবু, আমাকে তো যেমন করে হোক স্টেশনে পৌঁছোতেই হত। পরের দিনের প্রোগ্রাম ছিল বিহটায়। আজ অব্দি আমি কখনও এমন হতে দিইনি যে আমার নিশ্চিত প্রোগ্রাম ফেল করে যায়। নিজের কর্মীদের আশ্বস্ত করেছি যে ভরসা রাখুন, আমার প্রোগ্রাম ফেল করতে পারেনা। হয় আমি আগেই খবর করে দেব যে কোনো কারণে আমি আসতে পারছিনা, যাতে সময় থাকতে লোকে সজাগ হয়ে যায়, নয়ত আমি নিজেই পৌঁছে যাব। আর যদি এর দুটোই না হয় তাহলে আমার লাশ নিশ্চিত পৌঁছোবে। এর ফল হয়েছে যে কৃষকদের বিশ্বাস হয়ে গেছে, আমার কথায় নড়চড় নেই।

কিন্তু সে মোতাবেক তো রাত সোয়া দশটার ট্রেনটা আমায় ধরতেই হত। অথচ রাস্তা মোটামুটি সাত মাইলের কম ছিল না। কেননা গাড়িতে আমরা উত্তরদিকে যাচ্ছিলাম আর দুমাইল যেতে না যেতেই গাড়ি ফেঁসে গিয়েছিল। এটুকু বুঝতে পারছিলাম যে দিনের বেলায় যে রাস্তাটা দিয়ে আমরা গিয়েছিলাম সে রাস্তা মোটরের রাস্তাটার পশ্চিমে। হতে পারে কিছুদূর যাওয়ার পর এটা ওই রাস্তাতেই মিলে যায়। কেননা, স্টেশন আর তার আশেপাশের জমির নকশা তো মাথায় ছিলই। আর হাতে সময় ছিল সব মিলিয়ে দেড় ঘন্টা। তার মধ্যেই আমাদের বাজারে পৌঁছোতে হত যেখানে জিনিষপত্র রাখা ছিল। আবার সেখান থেকে এক মাইল স্টেশন, জিনিষপত্র নিয়ে। যদি দশটার মধ্যে বাজারে পৌঁছোতে পারতাম তাহলে আশা ছিল যে পনের মিনিটে সেখান থেকে স্টেশনে পৌঁছে ট্রেনটা ধরে নেব।

যখন সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করলাম ওরা একেবারেই সাহস জোটাতে পারল না, যদিও ওদেরও ছাপরা পৌঁছোনো জরুরি ছিল। উকিল ছিল ওরা আর কাচারিতে কাজ ছিল। তখন আমি আরো চিন্তিত হলাম। কিন্তু যখন লক্ষ্মীবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম উনি বললেন নিশ্চয়ই যাবেন। তাহলে আর কি! মনটা খুশিতে ডগমগ করে উঠল। আমি তো একলা যাওয়ার সংকল্প নিয়েই ফেলেছিলাম আর এখন লক্ষ্মীবাবুও সঙ্গ দেওয়ার কথা বলে দিলেন। তারপর বাকি দুজন ভদ্রলোকেরও সাহস এল আর আমরা মোটর মহারাণিকে সেলাম করে উত্তর দিকের রাস্তা ধরলাম।

রাস্তা অজানা। তার ওপর মাটি সাদা। রাস্তায় যেখানে সেখানে কাদা আর জল। আমরা ধুতি উঠিয়ে কোমরে বাঁধলাম। জুতো হাতে নিলাম। আমার এক হাতে আমার লাঠিও ছিল। তারপর শুরু হল আমাদের “কুইক মার্চ”। না দৌড়োলে এত ঝামেলার পরেও ট্রেন ধরতে পারতাম না। তাই দৌড়োনো শুরু করলাম। রাস্তায় কোথায় কী আছে সেসব দেখার ফুরসত ছিলো কোথায়? সাপ-বিছের চিন্তা তো রইলই না। শুধু রাস্তায় মাঝে মধ্যে এগিয়ে আসতে থাকা কুঁড়েঘরগুলোয় মানুষ আছে কিনা জানার চিন্তা ছিল যাতে জিজ্ঞেস করতে পারি ঠিক রাস্তায় যাচ্ছি কিনা। অন্য কোনো দিকে হারিয়ে যাচ্ছি নাতো? ভাটাপোখর এখনো আরো কত দূর সেটা জানারও তীব্র উৎকণ্ঠা ছিল। কিন্তু সব কটা কুঁড়েঘর আর গ্রাম নিস্তব্ধ ছিল। অনেকটা দূর যাওয়ার পর এক গ্রামে দু’একজন মানুষ পেলাম যারা বলল এখনো দূরত্ব আছে। অনেকে তো রাস্তায় আমাদের দৌড়োতে দেখে বা পায়ের আওয়াজ শুনেই সরে পড়ছিল। ওদের ভয় হচ্ছিল যে এই ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে চোর-ডাকাত ছাড়া আর কে এমন দৌড়ঝাঁপ করবে? আমরাও বুঝে ফেলতাম আর হাসতে হাসতে এগিয়ে যেতাম।

রাস্তায় একটা মজার ব্যাপার হল। আমরা মহাভারতে পড়েছিলাম, ময়দানব এমন সভাভবন তৈরি করেছিল যে দুর্যোধনের শুকনো জমিতে জল আর জলে শুকনো জমির বিভ্রম হত। সে দেখে পান্ডবেরা কয়েকজন হেসে ফেলেছিল। তারই প্রতিশোধ নিয়েছিল সে পরে, লড়াইয়ে। কিন্তু আমাদের নিজেদেরই সেই বিভ্রমের শিকার হতে হল। অন্ধকার রাত্রে আকাশ পরিষ্কার হওয়ার দরুন তারা ফুটেছিল। ফলে চকচক করছিল রাস্তা। তার পরিণতি হল যে আমরা প্রায় শ’খানেক বার শুকনো জমিকে জল ভেবে ধুতি গোটালাম। পা শুকনো জমিতেই পড়তে থাকল। আর বিপরীতে, জলকে শুকনো জমি ভেবে বেধড়ক এগোলাম আর হাঁটু অব্দি ডুবে গেলাম। তাড়াহুড়োয় দৌড়োতে দৌড়োতে তো ভালো করে দেখবার সময়ই থাকছিলনা যে জল না শুকনো জমি। কিন্তু আনন্দ হচ্ছিল খুব। আনন্দ তো হৃদয়ে থাকে। বাইরে তো আর থাকেনা। সারা শরীর ভিজে ছিল আর কাদায় লেপটে ছিল। কিন্তু চিন্তা ছিল সময় মত পৌঁছোবার। তাই সমস্ত কষ্ট ভুলে আমরা হাসতে হাসতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম।

কিছু দূর যাওয়ার পর যখন আমরা পাকা রাস্তা পেলাম তখন গিয়ে বিশ্বাস হল যে আমরা ঠিক রাস্তায় চলেছি। কিন্তু এখনো চার মাইল বাকি। কাজেই নিঃশ্বাস নেবার সময় ছিল না। যা হোক, দৌড়োতে দৌড়োতে দশটা বাজার আগে বাজারে পৌঁছে গেলাম। প্রশ্ন করে জানতে পারলাম, যেখানে জিনিষপত্র রাখা ছিল সে ঘর বন্ধ করে আমাদের পরিচিত ভদ্রলোক বাড়ি চলে গেছেন ঘুমোতে। কেননা ট্রেনের সময় হয়ে যাওয়াতে সে মেনে নিয়েছিল যে আমরা আর আসব না। তার বাড়ি একটু দূরে। এবার এই দ্বিতীয় অসুবিধার মুখোমুখি হলাম। যা হোক, আমাদের একজন দৌড়ে তার বাড়ি গেল আর যেমনতেমন করে তাকে জাগিয়ে নিয়ে এল। সে আসতেই আমরা জিনিষ বার করলাম। আমার জিনিষ একটু বেশি হিল। কিন্তু সে সময় স্টেশনে জিনিষ পৌঁছোনোর লোক কত্থেকে পেতাম? ফলে নিজেদের জিনিষ নিজেদেরই মাথায় গাধার মত ওঠালাম। সঙ্গীরা এবং সাথে আসা মানুষটিও আমার সাহায্য করল। এভাবে জিনিষপত্রে বোঝাই হয়ে আমরা আবার সেই ‘কুইক মার্চ’ শুরু করলাম। ট্রেন আগেই চলে আসার ভয় ছিল। নিজেদের ঘড়িগুলোকেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সঙ্কটকালে এমনই হয়। গভীর বিশ্বাসগুলোর ওপরও বিশ্বাস থাকে না।

কিন্তু যখন স্টেশনে পৌঁছোলাম আর সেখানকার ঘড়িতে দেখলাম ঠিক দশটা বেজেছে, তখন ধড়ে প্রাণ এল। আনন্দের সীমা রইল না। নিশ্চিন্ত হয়ে আমরা হাত পা ধুলাম, জামাকাপড় পাল্টালাম আর শরীর পরিষ্কার করলাম। এমন বিপজ্জনক কাজ আমরা করতে পেরেছি, আট মাইল মত লম্বা রাস্তা দেড় ঘন্টায় পার করেছি, বাজারে পনেরো মিনিট দাঁড়িয়েওছি, ভেবে আমাদের আনন্দ আরো অনেকখানি বেড়ে গেল। বিশেষ কথা এই যে আমরা না ক্লান্তি অনুভব করছিলাম না বিরক্তি। কঠিনতম কাজ আর পরিশ্রম করার পরেও যদি সফলতা পায় মানুষ, সব রকম হয়রানি হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। কিন্তু যদি সামান্য হয়রানি সহ্য করেও, বিফল হতে হয় তাহলে এমন ক্লান্ত হয় যে সে বলার না। আমরা তো সাহস (adventure) দেখিয়ে সফল হয়েছিলাম। তাহলে আর ক্লান্তি কেন হবে? অন্ততঃ অনুভূতিটা হবে কেন ক্লান্তির? 

১০

১৯৩৫ সালের মে মাস। সে সময় পূর্ণিয়া জেলায় বর্ষাকাল শুরু হয়ে যায়। কংগ্রেসের পুরোনো কর্মী পন্ডিত পুণ্যানন্দ ঝা পুর্ণিয়া জেলার অররিয়া সাবডিভিজনে জাহানপুরে থাকেন। ওনারই আগ্রহে এবং ব্যবস্থাপনায় ওই জেলায় প্রথমবার সফর করার সুযোগ পেলাম। কাটিহার স্টেশনে নেমে আগেই কিশনগঞ্জ যাওয়ার প্রোগ্রাম ছিল। কাটিহারে ডাঃ কিশোরীলাল কুন্ডুর বাড়িতে উঠে সেখান থেকে কিশনগঞ্জ যাওয়ার ট্রেন ধরার ছিল। কিশনগঞ্জ পুর্ণিয়া জেলার সাবডিভিজন এবং বিহার প্রদেশের পূর্বপ্রান্তের শেষ এলাকা। এমনিতে জেলার বাসিন্দা হিসেবে মুসলমানের গণনা ৭৫ প্রতিশত করা হয়। কিন্তু কিশনগঞ্জে ওদের সংখ্যা বলা হয় ৯৫ প্রতিশত। কৃষকদের আন্দোলনের সূত্রে ওই এলাকায় যাওয়ার এটা আমার প্রথম সুযোগ ছিল। তার প্রসন্নতা ছিল মনে।

ঝাজী কাটিহারেই সঙ্গী হলেন এবং বারসোই হয়ে আমরা কিশনগঞ্জে পৌঁছোলাম। সেখানকার প্রসিদ্ধ কংগ্রেস কর্মী অনাথকান্ত বসুর বাড়িতে আমরা উঠলাম। প্রথম সভা শহরেই হওয়ার ছিল। হল। কিন্তু যেমন চাইছিলাম আমরা, বৃষ্টির জন্য তেমন হতে পারল না। তার কষ্ট ছিল সবার মনে। কিন্তু বাধ্যবাধকতা ছিল যে কিশনগঞ্জে দু’দিনই থাকার প্রোগ্রাম ছিল আমাদের। তা সত্ত্বেও অনাথবাবু ভিতরে ভিতরে ঠিক করে ফেলেছিলেন যে আমাকে আরো এক দিনের জন্য রেখে শহরে আবার একটি সভা করবেন যেটা সফল হবে। উনি গ্রামাঞ্চলেও খবর পাঠিয়ে দিলেন এবং ভালো প্রচার করলেন। যখন তৃতীয় দিন আমি যাওয়ার জন্য তৈরি হলাম তখনই কয়েকজন ডেপুটেশনে এসে জিদ করে আমায় বাধা দিলি আর খুব ভালো সভা করাল। আমারও ঝাজীর সঙ্গেই, গ্রামাঞ্চল হয়েই তাঁর বাড়ি (জাহানপুর) যাওয়ার ছিল। কাজেই, বিশেষ প্রোগ্রাম না থাকার কারণে একদিন অতিরিক্ত থেকে যেতে বিশেষ অসুবিধা হল না। যদি কোনো জায়গার নিশ্চিত প্রোগ্রাম হত তাহলে তৃতীয় দিন থেকে যাওয়া অসম্ভব হত।

ও হ্যাঁ, পরের দিন কিশনগঞ্জ থেকে উত্তরদিকে গ্রামাঞ্চলে যাওয়ার ছিল। পাঁজীপাড়া নামের একটা হাটে মিটিং করার ছিল। কিশনগঞ্জ থেকে যে সড়কটা উত্তরদিকে যায় তারই পাশে পাঁজীপাড়া বসত। কিশনগঞ্জ থেকে একটা লাইট রেলওয়ে দার্জিলিং যায়। কিন্তু সে অদ্ভুত। মনে হয় গরুর গাড়ি চলছে। যত দূর মনে পড়ে, আমরা ঘোড়াগাড়ি করে পাঁজীপাড়া গেলাম। হাটবার ছিল। যেখানে বসে লোকে জিনিষ বেচা-কেনা করছিল তার পাশেই একটা খড়ের কুঁড়ে ছিল। আগে তো বলেই দিয়েছি যে এলাকাটা বেশিরভাগ মুসলমানদেরই। হাটেও তাদেরই দেখা পাচ্ছিলাম। এটাও দেখলাম যে ওই কুঁড়েটায় ওদের একটা ভালো ভীড় জমা হয়েছে, আসা যাওয়া লেগে আছে। জানলাম যে ওই কুঁড়েটাই মসজিদ যাতে দুপুরের পরের নামাজ পড়া হচ্ছিল। অজ পাড়াগাঁয়ে এ ধরণের ধর্মভাব দেখে আমি প্রভাবিত হলাম। প্রথম দেখছিলাম এরকম। ভাবলাম, এদেরই সামনে কৃষক-সমস্যা নিয়ে ভাষণ দিতে হবে, এমন না হয় যে সমস্ত পরিশ্রম নিরর্থক হয়।

কিন্তু উল্টোটাই হল। আমি যারপরনাই বিস্মিত হলাম যখন দেখলাম যে ওরা সবাই খুব মন দিয়ে আমার কথা শুনছে। যেমন যেমন আমি বলে চলেছিলাম ওদের চেহারাগুলো প্রসন্ন হয়ে উঠছিল। অনেকে মাথা নাড়াচ্ছিল বোঝাতে যে তারা আমার কথাগুলো পছন্দ করছে। অনেকে তো মেতে উঠল এবং দুলতে লাগল। আমি তো প্রথমে এতেই শঙ্কিত হচ্ছিলাম যে মুসলমান কৃষকদের মাঝে বলতে হবে। এমন যেন না হয় যে গেরুয়া কাপড় দেখেই ওরা রেগে যায় যে কোনো হিন্দু ফকির নিজের ধর্মের কথা বলতে এসেছে। এক জায়গায় জড়ো হয়ে নামাজ পড়তে দেখে আমার আশঙ্কা আরো বেড়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় আশঙ্কা ছিল যে বাংলার সীমানায় থাকা মানুষজনেরা বাংলা বলে, থাকা-খাওয়াও বাঙালিদের মত, ওদের মাঝে আমার হিন্দুস্তানি ভাষা ঠিক জমবে না। আর বাংলা পড়তে বা বুঝতে পারলেও বলতে তো আমি জানিনা। তৃতীয় আশঙ্কা এটাও ছিল যে যেহেতু ওদের বিশেষ সমস্যাগুলো আমি জানিনা, ওদের কথা বলে ওদের মনোযোগ নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে পারবনা। তাই শুধু সেই সব সমস্যার কথাই বলতে থাকলাম যে সমস্যাগুলো সব কৃষককেই বিচলিত করে এবং তারা রেহাই পেতে চায়। যেমন জমিদারের অত্যাচার, খাজনার বোঝা, আদায়ের জুলুম, দেনার কষ্ট, বকাস্ত জমির অসুবিধে ইত্যাদি।

কিন্তু আমার ভয় ও আশঙ্কা অমূলক প্রমাণিত হল। মন দিয়ে ওরা আমার কথা শুনল যেন ওরা যা চাইছিল আমি তাই বলছি। বক্তৃতা দেওয়ার সময় আমার বলার ধরণ আর ভাষা এমনই হয় যাতে সবাই সহজে বুঝতে পারে। গুজরাট থেকে পূর্ববাংলা আর আসাম অব্দি আমি এই ভাষাই বলে এসেছি এবং কৃষকেরা বুঝতে পেরেছে। আসলে ওদের হৃদয়ের কথা সাধারণ আর মনে বিঁধতে পারা ভাষায় নিজের হৃদয় থেকে বললে ওরা এমনিতেই আদ্ধেকটা বা চারভাগের তিনভাগ বুঝে নেয় আর তাতেই কাজ হয়ে যায়। কিশনগঞ্জের লোকেরা তো পুরোটাই বুঝছিল। বিশেষকরে মুসলমানরা যেখানেই থাকুক, হিন্দুস্তানি ভাষা বোঝেই। এটা একটা বিশেষত্ব।

তাই যখন আমি মিটিং শেষ করলাম, ওরা আমায় ঘিরে ধরল এবং বলল যে আপনি তো খুব ভালো ভালো কথা বলেছেন। খুব ভালো লেগেছে আমাদের। আমাদের কাজের কথা। আমরা মৌলবীদের অনেক লেকচার আজ অব্দি শুনেছি। কিন্তু মৌলবীরা তো এসব কথা বলে না। আপনি তো রুটিরই প্রশ্ন তোলেন আর তারই কথা বলেন। আপনি আমাদের পেট ভরার এবং আরাম পাওয়ার কথা বলেন যা আমরা খুব ভালো করে বুঝতে পারি। আমাদের ভালো লাগে। আপনি আমাদের গ্রামগুলোয় চলুন। বেশ কয়েকজন অত্যুৎসাহী জিদ ধরল যে আমি ওদের গ্রামে গিয়ে কথাগুলো সবাইকে বোঝাই। কেননা ওরা অনেক অনেক দূর থেকে এসেছে এবং প্রত্যেক গ্রাম থেকে মাত্র দু’একজন করেই আসতে পেরেছে। বাকি সবাই তো চাষবাসের কাজে ব্যস্ত। সে সময় তো এই বলে ছুটি চেয়ে নিলাম যে পরে কখনো আসব, এখন আমার প্রোগ্রাম অন্য জায়গায় ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু বড় আপশোষ হয় মনে যে এখনো সে কথা আমি রাখতে পারিনি।

এভাবে ওই মিটিং এবং মুসলমান কৃষকদের মনোভাবের অত্যন্ত ভালো প্রভাব স্মৃতিতে নিয়ে আমরা সন্ধ্যে অব্দি কিশনগঞ্জে ফিরে এলাম। কৃষক ও শ্রমিকদের রোজকার যে আর্থিক প্রশ্ন এবং দিনযাপনের যে ভোগান্তি, সেগুলো এমন যে তারই ভিত্তিতে সব কৃষক শ্রমিক এক হতে পারে, সে ওদের ধর্ম আর মজহব যাই হোক না কেন। সহজে, নির্দ্বিধায় ওরা এক সূত্রে বাঁধা হতে পারে, ওদের একজোট করা যেতে পারে, এ কথাটা সেদিন থেকে আমার মাথায় ভালো করে বসে গেল। ওখানে তার একটা উদাহরণই পেয়ে গেলাম। আমার জীবনের এবং ওদের জীবনেরও বোধহয় এটা প্রথম সুযোগ ছিল যখন মুসলমান কৃষকেরা আমার মত, হিন্দু বলে পরিচিত ফকিরকে নিজের মানুষ মনে করল এবং নিজেদের গ্রামে, বাড়িতে ভালোবেসে নিয়ে যেতে চাইল। যখন নাকি আমার সাথে ওদের দেখাসাক্ষাৎ প্রথম সেদিনই মাত্র দু’এক ঘন্টার জন্য হয়েছিল। আর্থিক প্রশ্ন ছাড়া দ্বিতীয় কোন জাদু ছিল যেটা ওদেরকে এমনভাবে প্রভাবিত করল? আমার কথা যে ওরা মৌলবীদের কথা থেকে বেশি পছন্দ করল, তার অন্য কোনো কারণ ছিল কি?

বলা হয় যে সারেঙ্গী আর সেতারের তারের ঝঙ্কার যখন কোথাও দূর থেকেও ভেসে আসে তখন সব মানুষ, যাই ধর্ম মজহব হোক তাদের, মন্ত্রমুগ্ধের মত আকৃষ্ট হয়ে চলে আসে। সমস্ত কথা, সমস্ত কাজ ভুলে মন দিয়ে শুনতে থাকে। কিন্তু যদি ওদের নিজেরই বাড়ির – হৃদয়ের – তার ঝঙ্কৃত হয়ে ওঠে? তখন তো আরো আনন্দ ছড়াবে আর বিভোর হয়ে উঠবে তারা। আসলে সব গরীবের মৌলিক সমস্যাগুলো এক। হিন্দু, মুসলমান সবাইকে একভাবে কষ্ট দেয়। তাই একই ভাবে সবার হৃদয়ে বেঁধে। এমত পরিস্থিতিতে যেই সে সমস্যাগুলোর কথা ওঠালাম তখনই সবার হৃদয়ের তার একসাথে ঝঙ্কৃত হয়ে উঠল। ফলে সবাই একই হ্যাঁ তে হ্যাঁ মেলাল, সুরে সুর মেলাল আর একটাই রাগ গেয়ে উঠল যে “কমানেওয়ালা খায়েগা, ইসকে চলতে যো কুছ হো”। এই রাগে হিন্দু মুসলমানের বিভেদ নিজে থেকেই মিটে যায়। এটা পাক্কা কথা যে এই পবিত্র ধারায় হিন্দু-মুসলমান কলহের কলুষ ধুয়ে যাবেই। তার টাটকা নমুনা আমাদের চোখের সামনে সেদিন পাঁজিপাড়ায় দেখতে পেলাম আর ভবিষ্যতের আশায় সংপৃক্ত হয়ে উঠলাম যে গরীবের দুঃখ অবশ্যই দূর হবে। তাদের ভালো দিন আসবে এবং তাও শিগগিরই, যদি আমরা নিজেদের এই রাস্তায় চলি, এই কাজ জারি রাখি।

যাহোক, কিশনগঞ্জ ফেরার পর, যেমন একটু আগেই বললাম, একদিন ওখানে থেকে, ওই সাবডিভিশনের গ্রামাঞ্চলের অভিজ্ঞতা নিয়ে আনন্দ করতে করতে পন্ডিত পুণ্যানন্দজির গ্রামে পৌঁছোনো ঠিক হল। ওনার গ্রাম জাহানপুর আন্দাজ ২৫-৩০ মাইল দূরে। বর্ষাকাল। গ্রামাঞ্চলের রাস্তার তো এমনিতেই বারোটা বেজে থাকে। তার ওপর ওই এলাকাটা সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে থাকা। তাই রাস্তাও তেমনি আর সওয়ারির কথা কী বলব! অতি কষ্টে গরুর গাড়ি পাওয়া যেতে পারত। কিন্তু রাস্তা খারাপ; বলদ গাড়িটা টানবে কী করে সেটা জটিল প্রশ্ন ছিল। রাস্তার যা দশা তাতে বলদগুলোকে গাড়িতে জোতা কসাইয়ের কাজ হবে। দ্বিতীয়তঃ আমরা যতই নিষ্ঠুর হই ওরা চলতেই পারবেনা। আসলে গাড়ি বা লাঙল জোতার সময় আমরা বলদদের সাথে ঠিক সেই ব্যবহার করি যা জমিদার কৃষকদের সাথে করে। জমিদার যেমন কৃষকদের মানুষ না ভেবে বেওয়ারিশ পশু ভাবে, আর তাই ওরা খাবে-পরবে কী তার একটুও চিন্তা না করে ওদের সমস্ত রোজগার যেমন-তেমন করে আদায়ে নিয়ে নেওয়ার ফিকিরে থাকে, কৃষকও নিজের বলদগুলোর সাথে প্রায় তেমনই ব্যবহার করে, যদিও কৃষক জমিদারের মত নিষ্ঠুর হতে পারেনা। বলদগুলো যাতে খাবার পায়, জল পায় সেটুকু চেষ্টা সে করে। অবশ্যই, নিজের রোজগার করা অন্ন নিজের কাছে রেখে বলদদের ভুষি, খড় এসবই খাওয়ায়, যেগুলো সাধারণতঃ কৃষকদের কোনো কাজে আসেনা। নিজের বেলায় জমিদারও কৃষকদের রোজগার করা গম, বাসমতি, ঘি, সর ইত্যাদি নিজে রেখে ওদের জন্য মড়ুয়া, খেসারি, মাঠা এসবই ছাড়ে। কিন্তু জোতার বেলায় কৃষক বলদদের সাথে অত্যন্ত নিষ্ঠুরতা দেখায়।

আমার এসব কথায় কোনো কাজ হল না আর একটা গরুগাড়ি তৈরি করা হল। অনাথবাবুরও সঙ্গে যাওয়ার ছিল। জাহানপুর আর কিশনগঞ্জের মাঝেই কংগ্রেসের পুরোনো সেবক শ্রী শরাফত আলি মাস্তানের গ্রাম পড়ে কাঁঠালবাড়ি চৈনপুরে। পথে ওখানেই এক রাত থাকা আর একটা মিটিং করার কথা ঠিক হয়েছিল আগেই। মাস্তানও জানত সে কথা। কিন্তু দিন আর সময় ঠিক মত জানত না। আমরাও খুশিতে ছিলাম যে যেই মানুষটা ১৯২১ সাল থেকেই দেশের সেবায় নিজেকে বিধ্বস্ত করল, জমি-জায়দাদ সবকিছু ছিন্নভিন্ন আর নিলাম হয়ে যেতে দিল, সেই মানুষটির সাথে দেখা হবে, সে আবার খাঁটি কৃষকও। ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরোয়া না করার জন্যই বাস্তবে তার নাম হয়েছে মাস্তান। ‘শরাফত আলি’ বলে তো তাকে বোধহয় কেউ চেনেও না। মাস্তান নামেই প্রসিদ্ধ সেই পুরোনো দেশসেবক। কংগ্রেসের আন্দোলন শুরু হতেই তার মাথায় জেদ চাপল যে কৃষক কাউকে খাজনা দেবে কেন, আর কেন নিজে খিদেয় মরবে? সবাইকে একথাই সে বলতে শুরু করল। নিজেও তাই করল। জমি-জায়দাদ আর বাঁচত কী করে? জমি ছিল অনেক। কিন্তু সব এমনিই শেষ হয়ে গেল আর পথের ভিখিরি হয়ে গেল সে বাহাদুর। পরিবার খিদেয় মরতে বসল। তবুও সেই জেদটা রয়ে গেল অনেক দিন। এখনো আগুনটা সেরকমই আছে, চাপা আছে ভিতরে ভিতরে। যদি কৃষকও শুধু এটুকু বুঝে নেয় যে তারো অধিকার রয়েছে খাওয়ার, সে কখনও খিদেয় মরবে না। আর সে অনুসারে সে যদি নিজের রোজগারটা খাওয়া-পরা শুরু করে দেয় কারোর পরোয়া না করে তাহলে তাদের সমস্ত কষ্ট হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে।

যা হোক, আমরা সকালেই খাওয়াদাওয়া করে গরুরগাড়িতে বসলাম আর মাস্তানের গ্রামের দিকে রওনা দিলাম। রাস্তায় চারদিকে শুধু মুসলমান কৃষকদেরই গ্রাম ছিল। হিন্দুদের বসত হয়তো পেয়ে থাকব দু’একটা। এমন সফর প্রথম ছিল আমার জীবনে। আসল কথা যে যতই জানি, শুনি বা বুঝিনা কেন, মনে ধারণাটা বদ্ধমূল ছিল যে মুসলমান জনগণ অকারণেই হিন্দুদের থেকে বেশি বদমেজাজী, ঝগড়ুটে আর অহঙ্কারী হয়। তাই রাস্তায় পড়তে থাকা গ্রামগুলোয় অনবরত তার দৃষ্টান্ত দেখার সন্ধানে ছিলাম। ওদের বাড়িগুলোতেও কিছু বিশেষত্ব পেতে চাইছিলাম। তাই যখন কোনো মুসলমানের সাথে দেখা হত, তার দিকে মনোযোগ দিয়ে দেখতাম। গ্রামের পর গ্রাম চলে গেল আর একের পর এক না জানি কত ব্যক্তি আর দলবলের সাথে রাস্তায় দেখা হল। আমরা বার বার তাদেরকে মাস্তানের গ্রামের রাস্তা জিজ্ঞেস করলাম। তারা বললও। কিন্তু তাদের দিকে তাকিয়ে কোনো বিশেষত্ব দেখতে পেলাম না। একই রকম সিধাসাদা হাবভাব, একই রকম সোজা কথাবার্তা, একই রকম নরম কন্ঠস্বর আর একই রকম থাকা-খাওয়া! একটুও তফাৎ নেই। দাড়িও সবার ছিলনা যে তফাৎ বুঝব। জামাকাপড়ও এক রকম। বাড়িগুলোর গঠনে তো একেবারেই কোনো তফাৎ ছিলনা। মোরগমুর্গির দেখা না পাওয়া গেলে গ্রামগুলোতেও কোনো তফাৎ ছিলনা। যদি অন্য কোনো দেশের মানুষ এসব জিনিষ দেখত তো বুঝতেই পারত না এরা হিন্দু না মুসলমান! ঠিক কথাই তো। কৃষকও তো কৃষকই। তার আবার হিন্দু মুসলমান কি? অসুখ, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বিধ্বংস ইত্যাদি তো কলমা আর নামাজও পড়েনা আর গায়ত্রী সন্ধ্যাও জানেনা। আর এসবেরই শিকার সমস্ত কৃষক – এসবেরই ছাপ সব কৃষকের গায়ে লেগে আছে। তারপর আপনি তাদের হিন্দু বলুন বা মুসলমান! আসলে তো ওরা শুধু ক্ষুধিত, গরীব, অত্যাচারিত আর বিধ্বস্ত।

এসব দেখে আমার হৃদয়ে এই সফরের যে অনপনেয় প্রভাব পড়ল তা চিরকাল টাটকা রয়ে গেছে। পাঁজিপাড়ার পর এই দ্বিতীয় অভিজ্ঞতা সঙ্গে সঙ্গেই হল যা আমার চোখ সব সময়ের জন্য খুলে দিল। এতে আমার চোখের সামনে যথার্থ নাচতে লাগল। “জনতা, আওয়াম (masses) এক, তাদের মধ্যে ধর্ম মজহবের কোনো তফাৎ নেই। ভিতর থেকে ওরা পাক্কা।” এটা আমি প্রত্যক্ষ করলাম। কিসান সভার কাজে এই অভিজ্ঞতাটা আমাকে অনেক সাহস দিল। আজ যখন বড়র থেকে বড় আর বিপ্লবীর থেকে বিপ্লবী বলে কথিত মানুষেরা হিন্দু-মুসলমান প্রশ্নের উত্তেজনায় রীতিমত ঘাবড়ে যাচ্ছেন, ভবিষ্যতের প্রতি হতাশ হয়ে পড়ছেন, আমি নিশ্চিন্ত। আমি ওদের কথাবার্তা শুনে হাসি। ওরা এই ঝগড়ার ওষুধ জানে না। আমি তো শুধু বইয়ে পাইনি সে ওষুধ, নিজের চোখে কিশনগঞ্জের এই সফরে দেখেছি।

কিছু দূর যাওয়ার পর গরুরগাড়ি ছেড়ে দিতে হল। আসলে বলদগুলো ছিল দুর্বল এবং রাস্তা এতটাই সৃষ্টিছাড়া ছিল যে শুধু গাড়ির চাকা নয় বলদগুলোর পাও কাদায় ডুবে যাচ্ছিল। যখন ওরা চলতে পারছিল না গাড়োয়ান ওদের মারছিল। সে দৃশ্য সহ্য করা যাচ্ছিল না। কিন্তু তার পরও বলদগুলো এগোতে পারছিল না। এগোবেই বা কিভাবে? রাস্তা তেমন থাকলে তবে তো? তাই ঠিক হল যে গাড়ি ছেড়ে হেঁটে যাওয়া যাক। নইলে রাস্তাতেই থেকে যাব। মাস্তানের গ্রাম অব্দিও আজ পৌঁছোতে পারব না। ফলে জামাকাপড় গাঁট বেঁধে একজনের মাথায় চাপিয়ে দেওয়া হল আর জুতো হাতে নিয়ে আমরা সবাই উত্তর-পশ্চিম দিকে হাঁটা শুরু করলাম। কাদায় ফেঁসে, জল পার করে, পড়তে পড়তে আমরা লাগাতার এগিয়ে চলেছিলাম। এটাও বেশ মজাদার সফর ছিল। একটুও মেজাজ খারাপ হয়নি আমাদের। হাসতে হাসতে চলছিলাম। কী সুন্দর ‘প্লেজার ট্রিপ’, আনন্দ-ভ্রমণ ছিল! অবশেষে কাদায় জলে একাকার হয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সন্ধ্যে নাগাদ আমরা মাস্তানের গ্রামে পৌঁছেই গেলাম।

খবর পাওয়া মাত্রই মাস্তানসাহেব দৌড়োতে দৌড়োতে এসে হাজির হলেন। আমরা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরলাম। সন্ধ্যে হয়েই গিয়েছিল। আমরাও ক্লান্ত ছিলাম। আমি তো রাত্রে গরুর দুধ ছাড়া কিছু খেতাম না আর সেটা হঠাৎ করে পাওয়া সম্ভব ছিলনা। যদি আগে থেকে খবর দেওয়া থাকত তাহলে বোধহয় ব্যবস্থা হয়ে যেত। মাস্তান এবং তার সঙ্গীরা চেষ্টা করে করে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। কিন্তু দুধ পাওয়া গেলনা। বাকি সবাই খাওয়াদাওয়া করল। রাতে ক্লান্তির ফলে আমরা সবাই ঘুমিয়ে রইলাম। কথা হল যে মানুষজন খুব ভোরে জমা হবে এবং আমাদের মিটিং হবে। সেদিনই তাড়াতাড়ি সভা করে খেয়ে-দেয়ে আমাদের জাহানপুর পৌঁছোনোর জন্যও রওনা দেওয়ার ছিল। মাস্তান সাহেব সন্ধ্যে থেকেই এদিক ওদিক খবর পাঠান শুরু করে দিয়েছিলেন যে কাল ভোরেই যেন লোক জুটে যায়। জানলাম যে আমাদের আসার খবর উনি আগে থেকেই লোকজনের মধ্যে প্রচার করে রেখেছিলেন।

পরের দিন নিত্যক্রিয়া, স্নান ইত্যাদির পর আমাদের সভার প্রস্তুতি হল। লোকেরা জমা হল। কয়েক ঘন্টা ধরে ওদের বোঝালাম। আমরা তো শুধু ওদের ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের কথাই বলতে জানতাম আর সে কথা ওদের ভালোও লাগত। মাস্তান সাহেব শেরোশায়রির প্রেমিক। সময় মত বলার অনেক পদ উনি জানেনও। আমাদের বিষয়েও ওনার সেই ধারণা ছিল। আমাদেরও বললেন যে মাঝে মাঝে যদি কিছু মনে দাগ কাটার মত পদ শোনাতে থাকি তাহলে ভালো প্রভাব পড়বে। যদ্দূর সম্ভব আমরা তাঁর মর্জি পুরো করলাম। বস্তুতঃ আমাদের ভিতরে প্রসন্নতা ছিল যে একদম অজ পাড়াগাঁয়ে একজন সাচ্চা জনসেবকের বাড়িতে যেমনতেমন করে পৌঁছেছি, যেমন করে লোকে পদব্রজে যায় তীর্থ আর হজের যাত্রায়। আসল তীর্থ তো সেটাই যেখানে সাচ্চা আর পাগল জনসেবক থাকেন। পুরোনো মানুষেরা বলেও গেছেন যে সৎপুরুষ আর জনসেবক তীর্থগুলোকেও পবিত্র করে দেয় নিজেদের পায়ের ধুলোয় – “স্বয়ং হি তীর্থানি পুনন্তি সন্তঃ”। তীর্থ যে তীর্থ হয়েছে সেও তো সৎপুরুষেরা সেখানে ছিলেন বলেই। এ যুগে কৃষকের তীর্থ কিছুটা ভিন্ন ধরণের হবে।

জাহানপুর যাওয়ার জন্যও একটা গরুরগাড়ির ব্যবস্থা হল। যদিও আগের দিনের অভিজ্ঞতায় আমরা ভয় পাচ্ছিলাম যে আবার সেই এক অবস্থা হবে। কিছুটা আগের দিনের ক্লান্তি আর কিছুটা লোকেদের জিদে গরুরগাড়িতে যাওয়াই ঠিক হল। ওতেই সবাই মিলে বসে আমরা দুপুরের আগেই বেরিয়ে পড়লাম। সন্ধ্যে অব্দি যেমন করে হোক ঝাজির বাড়ি পৌঁছোনোর ছিল। কিন্তু আমাদের ভয়টাই সত্য হল। পরের রাস্তা আরো যাচ্ছেতাই ছিল। নদী-নালাও ছিল অনেক। শেষে যদ্দূর যেতে পারলাম তদ্দূর যাওয়ার পর যখন গাড়িতে যাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল তখন সেটাকে ফেরত পাঠিয়ে আমরা এগোলাম। গাড়িতে বসে নদী পার করাও কঠিন হত। তাই হেঁটে যাওয়াই সমীচীন মনে হল। নইলে সন্ধ্যে অব্দি পথেই পড়ে থাকতাম আর জাহানপুর পৌঁছোতেই পারতামনা। আজকের সফর আগের দিনগুলোর সফর থেকেও বেশি আনন্দদায়ক ছিল। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের অভিজ্ঞতা হওয়াও জরুরি ছিল আমাদের জন্য। এটাও পরীক্ষা করা দরকার ছিল যে আমরা নিজেরা কতটা সইতে পারি। কেননা সেটা না করে আর এধরণের কষ্ট সহ্য না করে কৃষক-আন্দোলন চালান যাবে না। এটা তো আর শ্রমিক-সভা নয় যে শহরেই মোটর দৌড়িয়ে আর রেলগাড়িতে গিয়ে করে নেওয়া যাবে। তাই জেনেশুনে এধরণের ছোটো ছোটো সফর কয়েকশো বার করেছি।

শেষে দ্বিতীয় দিনেরও আমাদের সফর পুরো হল এবং আমরা জাহানপুর পৌঁছে গেলাম। পন্ডিত পুণ্যানন্দ ঝা নিষ্ঠাবান মানুষ। দেখলাম গ্রামের মাঝখানে সবচেয়ে উঁচু জমিটায় ওঠা কুঁড়েঘরটাকে উনি আশ্রম বানিয়ে রেখেছেন। চরকা ইত্যাদির কাজ ওখানেই নিয়মিত হত। কয়েকটি ছেলে পড়াশোনাও করত। পন্ডিতজির একটিই ছেলে। কিন্তু তাকে উনি কোনো অন্য জায়গায় গিয়ে পড়াশুনো করতে দেননি। সরকারি স্কুলের বয়কট করেছিলেন যে। শেষ অব্দি বজায় রেখেছিলেন সেই বয়কট। আমি বেশির ভাগ লিডারকে দেখেছি যে ১৯২১ সালের বয়কটের পর আবার থেকে তাদের ছেলেরা সেই সরকারি স্কুলে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু ঝাজি এমন করা পাপ মনে করে ছেলেকে বাড়িতেই রাখলেন এবং লেখাপড়ার বদলে মানুষের যা কিছু সেবা সে নিজের মত করে ওই গ্রামাঞ্চলে করতে পারত সেটা করাই শ্রেয়স্কর মনে করলেন। তাঁর আশ্রম খুব পরিষ্কার আর মনোরম ছিল। মন এত ভালো হয়ে গেল যেন নিজের বাড়ি পৌঁছে গেছি। আমি বিশেষকরে পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত পছন্দ করি। সামান্যতম নোংরা থাকলে রাত ভর আমার ঘুম আসে না। অস্থির হয়ে পড়ি। স্নান-টান করে দুধ খেয়ে রাতে শুয়ে পড়লাম। পরের দিন সভা হবে এমনই কথা হয়েছিল।

পরের দিন কৃষকদের সভা খুব ভালো হল। আমি নিজের মনের কথা উজাড় করে দিলাম। ওদের সমস্যাগুলো ওদেরকে খুব ভালো ভাবে বোঝালাম। ওদের চোখের সামনে ওদের অবস্থার উলঙ্গ ছবিটা যেমন রাখলাম তার কারণও স্পষ্ট বলে দিলাম। ওদের দেখিয়ে দিলাম যে ওদের অজ্ঞতা এবং দুর্বলতার জন্যই ওদের এই দুরবস্থা এবং ওরা নিজেরা প্রস্তুত না হলে, নিজের ভিতর সাহস না আনলে এবং নিজের অধিকারগুলো না বুঝলে অন্য কোনো ভাবে এই অবস্থার পরিবর্তন হবেনা। ওদের প্রথম অধিকার পেটভরা ভোজন, ওষুধপত্রের পুরো ব্যবস্থা, প্রয়োজন মত জামাকাপড়, স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি জিনিষ আর ঘরবাড়ি। যদি দৃঢ়ভাবে তারা এই অধিকার বলবৎ করার দাবি জানায় দুনিয়ার কোনো সরকার এবং কোনো শক্তি অস্বীকার করতে পারবে না। যখন তারা নিজে অর্জন করে নিজে খেতে চায়, আপনজনকে আর বাকি দুনিয়াকেও খাওয়াতে চায় তো কার হিম্মত আছে দাবি করার যে সে নিজে ক্ষুধার্ত থাকুক আর দুনিয়াকে খাওয়াতে থাকুক? এমনকি যে গরুর দুধ চাই সে গরুকেও আগে খুব খাওয়াতে হয় আর আরামে রাখতে হয়। নইলে দুধের বদলে গরু লাথিই দেয়।

এবার কোনোভাবে আরারিয়া গিয়ে ট্রেনে চড়ে কাটিহার পৌঁছোনর ছিল। বর্ষাকালের দিন আর রাস্তায় ছোটো বড় নদী। আবার সেই গরুরগাড়িই আমাদের সাহায্য করল। কিন্তু এবার দুটো গাড়ি আনানো হল। ওপরে ছই দেওয়া। আগের গাড়িগুলো তো মামুলি ছিল। এবার একটু দেখেশুনে গাড়ি আর বলদ আনা হল। একটায় আমি নিজে, নিজের জিনিষপত্রের সাথে বসলাম আর অন্যটায় ঝাজি আর অনাথবাবু। রাতেই রওনা হলাম। নইলে পরের দিন রাস্তাতেই কোথাও থেকে যেতে হত। কত হয়রান আর নাজেহাল হয়ে বাকি সফর পুরো করলাম তা সেই বুঝতে পারবে যে কখনো এমনি সময়ে ওদিকে গিয়েছে। তার মানে এই নয় যে আমার মনমেজাজ খারাপ ছিল বা আমি এই বাধা-বিঘ্নগুলোকে মনে একটুও স্থান দিয়েছিলাম। দেবই বা কেন? আমি নিজে জেনেশুনে এই সফর করেছিলাম। ওই প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের অভিজ্ঞতা নেওয়ার ছিল যে। নিজেকে ওই কঠোর পরীক্ষায় পাশ করাবার ছিল। আর আমি খুশি ছিলাম যে ভালো ভাবে পাশ করতে পেরেছি।

আরারিয়ায় পৌঁছে সোজা স্টেশনে চলে গেলাম। স্টেশন শহর থেকে দূরে। স্টেশনেই থাকলাম, স্নান-টান করলাম, একটু খাওদাওয়া করলাম। তারপর ট্রেন এল। আমাদের কাটিহার পৌঁছে দিল।  

১১

১৯৩৫ সালে কিষণগঞ্জ সফরের পরে পরেই কাটিহারের পর কুরসেলা স্টেশনে যাওয়ার এবং সেখানে নেমে কাছেই উমেশপুর বা মহেশপুরে অনুষ্ঠিতব্য বিশাল কিসান-সভায় ভাষণ দেওয়ার ছিল। সেখান থেকে আবার টিকাপট্টী আশ্রমে যাওয়ার প্রোগ্রাম ছিল। রাতে থাকারও ছিল সেখানেই। আমরা সদলবলে ট্রেনে রওনা হয়ে গেলাম। স্টেশনে বাজনার দল, পতাকা আর মিছিলের বিরাট ভীড় ছিল। মানুষজনে উৎসাহ ঢেউ তুলছিল। কিসান-সভা আর কৃষকদের স্লোগানে এবং স্বাধীনতার আহ্বানে ফেটে পড়ছিল আকাশ। স্টেশনের পাশেই এক বড় জমিদার সাহেবের প্রাসাদ এবং সভাস্থানে যাওয়ার রাস্তাও ওই প্রাসাদের পাশ দিয়েই। জানিনা সে সময় উনি সেখানে ছিলেন নাকি কোথাও চলে গিয়েছিলেন। যদি থেকেও থাকেন, সে সময় ওনার মনের অবস্থা কী হচ্ছিল কে বলবে? খুব কড়া জমিদার এবং জৈষ্ঠের দুপুরের সূর্যের মত তেতে থাকেন। তাঁর জমিদারিতে বসবাস করা কৃষকদের একমাত্র ভরসা ভগবান।

কিন্তু উনিও একজন কংগ্রেসি। কংগ্রেসিদের মাঝে ওনাকে মান্য করা হয়। বোধহয় টিকাপট্টী আশ্রম এবং কংগ্রেসের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁর তরফ থেকে প্রতি বছর ভালো রকম আনাজপাতি ও টাকা পায়। জেলার কংগ্রেসি নেতাদের আতিথ্য সৎকারও তাঁরই বাড়িতে হয়। লিডারদের তো আগে স্বরাজ্য চাই, আর যতক্ষণ জমিদারেরা সঙ্গ দেবে না ততক্ষণ স্বরাজ্যপ্রাপ্তিতে বাধা আসবে। যদি জমিদারদের বাদ দিয়ে স্বরাজ্য পাওয়াও যায়, তাহলে হয়ত সেটা খোঁড়া হবে। কিন্তু যদি কৃষকদের কষ্টের কথা মনে রাখা হয় তাহলে এই জমিদারেরা কংগ্রেসে ঢুকবেই না। তাই আপাততঃ ওদিকে মনোযোগ দেওয়া হয়না। সবাইকে নিয়ে চলতে হবে তো। এও শুনেছি যে এই জমিদার সাহেব এবং এনার মত আরো দু’একজন এদিকে কংগ্রেসের জন্য প্রচুর মেম্বার তৈরি করতে শুরু করেছে প্রতি বছর। ব্যাপারটা খুবই সহজ। যে কৃষকও খাজনা দিতে এল তার কাছ থেকে খাজনা বাদে আরো চার আনা নিয়ে নেওয়া এমন কিছু কঠিন নয়। চার আনা না দিলে যদি খাজনার রসিদটাই না পাওয়া যায় তখন? তখন তো খাজনাও গেল আর চার আনাও গেল। তাই বাধ্য হয়ে গরীব চার আনা দিয়েই দেয়। নজরানা, শুক্রানা, রসিদানা, ফারখ বা ফরখতি ইত্যাদির নামে যখন নানা রকম বেআইনি আদায় করাই হয় তাদের কাছ থেকে, তো এই চার আনার কথা ভেবে আর কি হবে? বিপদ এটাই যে যখন চার আনা আদায় করাটা রেওয়াজ হয়ে যাবে তখন কিছুদিন পর কংগ্রেসের নামেরও আর প্রয়োজন হবে না আর এই পয়সাটা জমিদার নিয়মিত আদায় করতে থাকবে। খাজনার ওপর নতুন নতুন ধরণের স্থানীয় শুল্ক এভাবেই তো তৈরি হয়েছে! শুল্কের ইতিহাস আমাদের এটাই শেখায়। কিন্তু তাতে কি? কে পরোয়া করে এর? সুরসন্ডএর (মুজফফরপুর) এক জমিদার অন্নির নামে কে জানে কতদিন ধরে কৃষকদের কাছ থেকে বেআইনি পয়সা আদায় করে আসছে। যখন নাকি ওর ভাই কংগ্রেসি আর এখন তো জেলও খেটে এসেছে। এই অন্নিও ওইভাবেই তৈরি হয়ে থাকবে।

হ্যাঁ, তো আমরা স্টেশনে নেমে ধীরে ধীরে সোজা সভার জায়গাটার দিকে এগোলাম। ঠিক মনে নেই গরুর গাড়িতে গেলাম না হাতির পিঠে চেপে। বোধহয় গরুর গাড়িই ছিল। হাতির পিঠে চাপা অনেক কারণে আমার পছন্দ নয়। প্রথমতঃ, হাতি ধনী ব্যক্তিদের কাছেই থাকে। দ্বিতীয়তঃ, ওটা কর্তৃত্ব এবং গর্বের জিনিষ এবং তারই বাহন আর কৃষকদের সভায় এ ব্যাপারটা আমার ভীষণ ভাবে বুকে বাজে। তাই কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলে আমি হাতির পিঠে চাপতে অস্বীকার করি। কৃষকদের নিজের জিনিষ হওয়ার কারণ গরুর গাড়ি আমি মন থেকে ভালোবাসি। কখনো কখনো পালকিতেও, মানুষের কাঁধে চেপেই চলতে হয়। কিন্তু যখন কোনো উপায় থাকে না আর কাঁহারদের খাওয়াদাওয়া আর মজুরির পাকা ব্যবস্থা হয়ে যায় তখনই চাপি। কথায় কথায় কাঁহারদের জিজ্ঞেস করে নিই যে ওরা যা কিছু পেয়েছে তাতে ওরা সন্তুষ্ট কিনা। যদি একটুও কমবেশি হয়েছে বুঝি তাহলে সেটা পুরো করাই। সব জায়গায় আমি দেখি কাঁহারদের প্রতি উদাসীন এবং নির্মম ব্যবহার করা হয়। তাই আমি নিজে ওদের জিজ্ঞেস করি। বহু জায়গায় তো আমাকে ভালোবেসে ওরা এমনিই নিজেদের কাঁধে আমায় চাপিয়ে নিয়েছে।

এভাবে, প্রাণশক্তিতে ভরপুর এবং অদম্য উৎসাহে আমরা সভাস্থলে পৌঁছোলাম। বর্ষাকালের কড়া রোদ আমাদের রাস্তায় খুব তাতিয়ে ছিল আর সময়টাও ছিল দুপুর। মেঘহীন আকাশে সুর্য নিজের এমন তেজ দেখাচ্ছিল আর পোড়াচ্ছিল মানুষজনকে যেন জমিদার আর কৃষক। গাছের ছায়ায় শান্তি পেলাম। শীতল হয়ে জল-টল খেয়ে আমরা মিটিংএ পৌঁছোলাম। যেখানে মিটিং ছিল সেটাকে ধর্মপুরের পরগনা বলা হয়। পুর্ণিয়া জেলার খুব বড় একটা অংশ এতে চলে আসে। এখানকার জমিদার দ্বারভাঙা মহারাজ। দু’একদিকে কুরসেলার এবং বিশুনপুরের জমিদারেরাও আছে। কিন্তু মহারাজের সামনে এদের অস্তিত্ব প্রায় কিছুই নয়। এরা কয়েক হাজার বিঘা রাইয়তি জমি রাখে মহারাজের। বিশুনপুরের জমিদার তো বিশেক হাজার বিঘা রাইয়তি জমি রাখে, যে জমি তারা দর-রাইয়ত (undertenants) বা শিকমি কৃষকদের ভাগচাষে দেয়। কোথাও কোথাও নগদ খাজনাও নেয়। কিন্তু যখন ইচ্ছে জমি ছিনিয়ে নেওয়ার পাকা বন্দোবস্ত করে রাখে। তাই এই সব ব্যাপারে, অবস্থা দেখে নিজেদের কৃষক বলা এই মালদার লোকেরা জমিদারের থেকে বেশি অত্যাচারি এবং বিপজ্জনক হয়।

মহারাজের জমিদারিতে অত্যাচার তো আছেই, সে তো সাধারণত সব জমিদারিতে থাকে। সে ছাড়া একটা বিশেষ অত্যাচার, চরসা মহালের কথা আগেই বলা হয়েছে। কিন্তু ধর্মপুরেই জানতে পারলাম যে সার্ভে খতিয়ানে যদিও জমির ওপর কৃষকদের কায়েমি রাইয়তি লেখা আছে, এও লেখা আছে যে সে জমিতে থাকা গাছগুলো ষোল আনা জমিদারের। আসলে পুর্ণিয়া জেলায় যেমন যেমন উত্তরে, নেপালের তরাইয়ের দিকে যাবেন তেমন তেমন গাছে মধুর বড় বড় চাক তৈরি করতে থাকা মৌমাছি দেখতে পাবেন। ওদিকে মধুর ভালো ব্যবসা হয়। তাই জমিদার চালাকি করে সার্ভের সময় গাছগুলোর ওপর নিজের অধিকার লিখিয়ে নিয়েছে। কৃষকেরা সে সময় তো কিছু জানতই না এবিষয়ে। সার্ভের কী গুরুত্ব তাই ওরা ঠিক মত বুঝতে পারেনি, আর তারই খতিয়ানে লেখা কথা আজ ওদের গলায় ছুরি চালাচ্ছে। ওখানে বুদ্ধি আর যুক্তির কোনো জায়গাই নেই যে কৃষকের জমির ওপর জমিদারের গাছ কি করে হয়ে গেল? আর যদি আজও চাক থেকে মধু নামাতে আসা লোকেদের কৃষক বলে দেয় যে খবরদার, আমার জমিতে পা রাখলে হাড় ভেঙে দেব – উড়োজাহাজে এস, যাতে করে চাও উড়ে ওপর ওপর চড়ে যাও গাছে আর মধু নিয়ে যাও – তখন কী হবে? কিছু তো করতে হবেই শেষ অব্দি। নইলে কাজ চলবে কিভাবে? যখন ওরা কথা শোনেনা তখন যেমন কুকুর তেমন মুগুরের জবাব তো দিতে হবে।

দ্বিতীয় জুলুম জানলাম যে ওখানে ঘাটের নামে একটা ট্যাক্স লাগে। এই ট্যাক্স অন্যান্য জমিদারিতেও চালু আছে। এক বার তো এমন হল যে আমি নিজের সঙ্গীদের সাথে ফরবেসগঞ্জ এলাকায় গরুড় গাড়িতে গ্রামাঞ্চলে যাচ্ছিলাম। রাস্তায় কেউ এল আর গাড়ি থামিয়ে ঘাটের ট্যাক্স চাইতে শুরু করল। পরে যখন জানতে পারল যে গাড়িতে কে বসে আছে, তখন সটকাল আর আমরা এগোলাম। গল্পটা এই যে কিছু দিন আগে অব্দি যেখানে সেখানে জলের ধারা অনেক ছিল এ জেলায়। তার ফলে মানুষজনের হাটে-বাজারে যেতে বা অন্যান্য সময়ে বড় অসুবিধে হত। পারাপার কঠিন হত। প্রাণসংশয় ঘটত। তাই জমিদারেরা নিজের নিজের জমিদারিতে এই সব ধারাগুলো ঘাটে ঘাটে নৌকোর ব্যবস্থা করত যাতে লোকের সুবিধে হয়। প্রথম প্রথম কাজটা বিনামূল্যে হত। তারপর ধীরে ধীরে নৌকো ইত্যাদির খর্চা ওঠানো শুরু হল পার হওয়া লোকজনের কাছ থেকে। তারপর ঠিকেদার রাখা হল। সে নিজের নৌকো রাখত আর খেয়া উশুল করত পারাপারের। অবশেষে জমিদারেরা ঘাট নিলাম করা শুরু করল। যে বেশি পয়সা দিত সেই হত ঘটোয়ার বা ঘাটের ঠিকেদার। সে নিজের পরিসেবার বদলে খরচের সাথে মুনাফাও উশুল করত মানুষজনের কাছ থেকে। এই ঢংটাই নিয়মিত চলতে থাকল। ধীরে ধীরে ঘাটের ওপর ঘটোয়ারদের পাট্টা হল মৌরুসি। তারপর ধারাও শুকিয়ে গেল, নৌকোর প্রয়োজনও আর রইল না কিন্তু ঘটোয়ার রয়েই গেল। তারা জমিদারকে পয়সা দিত আর মানুষজনের কাছ থেকে উশুল করত। এটা লুট আর অবিচার ছাড়া কী? এর বিরুদ্ধেও আমাদের ঝড় তুলতে হল।

ওখানেই প্রথম আমরা জানলাম যে দ্বারভাঙা মহারাজের জমিদারিতেই গরীবদের ওপর ‘টরেস’ নামে এক বিপত্তি এসেছে। জমিদার সবাইকে উত্যক্ত করছে। প্রথমে তো আমরা বুঝতেই পারলাম না যে এই ‘টরেস’ কি জিনিষ। কিন্তু কথাবার্তায় জানা গেল যে কথাটা আসলে ‘ট্রেস পাস’ বা অন্যের জমিতে জবরদস্তি কব্জা করার অর্থে এসেছে। ‘পাস’টা সরিয়ে ‘ট্রেস’টাকে ‘টরেস’ করে দিয়েছে। আনাড়ি দেহাতি কি করে জানবে আসল শব্দটা কী? পিছনের কথাটা এই যে এদিকে কিছুদিন ধরে, বিশেষ করে কিসান সভার আন্দোলন শুরু হওয়ার পর, জমিদারের লোকেরা কৃষকদের উত্যক্ত করার নতুন নতুন ধরণ নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করে দিয়েছে। এসব করে মহারাজেরও আমদানি বাড়ছে আর অন্য দিকে কৃষকেরাও হার মানছে; মাথা ওঠাতে পারছে না। এসব নতুন ধরণের সন্ধানেই ট্রেস পাস নামে অস্ত্রটা খুঁজে বার করা হয়েছে।

আসলে সার্ভের সময় কৃষকদের বাড়ির জমি খতিয়ানে লেখা হয়েছে। কিন্তু বাড়ি বা কুঁড়েঘর দূরে দূরে হওয়ায় মাঝে খালি জমিও রয়ে গেছে যেগুলোকে কোথাও কোথাও ‘গৈর-মজরুয়া আম এবং কোথাও কোথাও খাস লেখা হয়েছে। [গৈর-মজরুয়া আম এবং গৈর-মজরুয়া খাস দুটোই সরকারি জমির প্রকার, প্রথমটা জনসাধারণের ব্যবহারে আসছে যেমন খেলার মাঠ, পুকুর, রাস্তা ইত্যাদি। দ্বিতীয়টা কোনো কাজে আসছেনা আপাততঃ – অনুবাদক] হতে পারে যে সময়কালে কৃষকের গবাদি পশু একটু বেশি জায়গা নিয়ে বাঁধা হতে লাগল। সার্ভের সময়েও সেটা হয়ে থাকবে। কৃষক তো আর কলকাতা শহরে থাকে না যে ইঞ্চি ইঞ্চি জমি খুঁজে মাপা হবে? কিন্তু সার্ভেতে সে কথাটা আর বলা থাকল না যে কৃষকের গবাদি পশু ওই জমিতে বাঁধা থাকে। পশু তো আর চব্বিশ ঘন্টা ঘরে থাকবে না। বাইরে বাঁধা হবেই। এটাও হতেই পারে যে মিছিমিছি কোথাও কোনো কৃষক কিছু জমি কব্জা করে নিয়ে থাকবে। অতিরিক্তই তো। কিন্তু জমিদারের তো ফন্দি চাই উত্যক্ত করার। তার আমলারা চায় ঘুস আর তদ্বির, যা সাধারণতঃ কৃষকদের কাছ থেকে তারা আর পাবে না। তাই রেগেমেগে খতিয়ান অনুসারে জমির মাপ নেওয়া শুরু হয়। মাপ নেবে সেই আমলা। কোনো সরকারি ওভারসিয়ার বা আমীন আসবে না। আর যদি মাপতে গিয়ে একটুকুও বেশি জমি বেরিয়ে গেল তো ব্যস, কৃষকের মাথায় নামল বিপত্তি। আমলা মাপামাপিতে গোলমাল করেও বেশি জমি প্রমাণ করে দেয়। এভাবে কৃষকের ওপর ট্রেসপাসের মামলা দায়ের করা হয়। যদি সে ভয় পেয়ে আগেই আমলার পুজো-নৈবেদ্যর ব্যবস্থা করে দেয় আর জমিদারকেও কিছু নজরানা বা সেলামি দিয়ে দেয় তাহলে বাঁচোয়া। নইলে লড়তে লড়তে বিপর্যস্ত হয়ে যেতে হয়। এই ‘টরেস’এর জন্য একটা আতঙ্ক দেখলাম ওখানে কৃষকদের মাঝে। পরে ভাগলপুর, দ্বারভাঙা ইত্যাদি স্থানেও দেখলাম এই জুলুমটা চলছে।

এমনিতে তো কয়েক শো ধরণের বেআইনি আদায় সময়ে সময়ে চলতেই থাকে। কিন্তু দু’একটা বিশেষভাবে ওখানকার। গবাদি পশুর বেচাকেনায় কৃষকদের কাছ থেকেই এক ধরণের ট্যাক্স নেওয়া হত এবং বোধহয় এখনো নেওয়া হয়। আনাজ বিক্রীর ওপরও। আরো অনেক রকম। জীবন অতিষ্ঠ থাকে ওদের। কিন্তু পুনাহি খরচের নামে যে আদায়টা হয় সেটা অত্যন্ত খারাপ। তেমনই, যখনই কোশি নদির জঙ্গলে শুওর বা হরিন শিকার করার জন্য মহারাজ, তারঁ বন্ধু বা ম্যানেজারদের ক্যাম্প গ্রামাঞ্চলে পৌঁছোয়, কৃষকদের কাছ থেকে ছাগল, পাঠা, দুধ, ঘি, মুর্গি, মোরগ ইত্যাদির মত কয়েক শো রকমের জিনিষ আদায় করা হয়। দেখাবার জন্য বোধহয় ওসব জিনিষের দাম লেখা হয় হিসেবে। কিন্তু কৃষকেরা পায় না। যদি দু’একবার পাওয়াও গেল, তো সে নামমাত্র। বাকি সব আমলাদের পেটে চলে যায়। এমনও হয় যে দুটোর জায়গায় চারটে ছাগল আনানো হল আর তার মধ্যে থেকে কয়েকটি ক্যাম্প খরচে লেখাই হলনা। ওপর ওপর আমলারা লোপাট করে নেয়। তার আর দাম কেউ পাবে কী করে? কুমোরদের থেকে মাগনায় বাসন নেওয়া আর কাহারদের দিয়ে বেগার করিয়ে নেওয়া তো রোজকার কথা। অন্যান্য গরীবেরাও এভাবেই খাটতে থাকে।

পুনাহির ব্যাপারটা এরকম। বছরে একবার মহারাজার প্রত্যেকটি সার্কেল অফিসে খুব বড় করে উৎসব হয় আর পুজো, যাগযজ্ঞ ইত্যাদি হয়। খুব খাওয়াদাওয়াও হয়। অনেক লোক জমা হয়। দশেরার (দুর্গাপুজো) সময় বা ওরই কাছাকাছি হয় এই উৎসব। বিহারের অন্যান্য জেলায় যে তৌজির প্রথা আছে সেটা তো দশেরার দিনেই হয়। এই পুনাহি সেই তৌজিরই বিস্তৃত রূপ। আসলে সংস্কৃতে পুণ্যাহ শব্দের অর্থ পবিত্র দিন। তারই অপভ্রংশ হয়েছে পুনাহ। পুনাহি সেই পুনাহ বা পুণ্যাহের সূচক। অর্থ পুণ্যাহ-সম্বলিত। জমিদার আগামী বছরের খাজনা আদায় সেদিনই শুরু করে যেমন অন্যান্য জায়গায় তৌজির দিন শুরু করে। হিন্দী বছরও তো দশেরার পর আরম্ভ হওয়া কার্তিক থেকে শুরু হয়। তাই আগামী বছরের খাজনা আদায় শুরু করার দিন হিসেবে ভালোই। আর জমিদারের জন্য তার থেকে পবিত্র দিন আর কী হবে যেদিন বছর শুরু হওয়ার আগেই আসছে বছরের খাজনা আদায় শুরু করা যায়। কৃষকের জন্য হোক না দিনটা খারাপ। কিন্তু জমিদারের জন্য দিনটা তো সোনা। তাই সে উৎসবকে পুনাহির উৎসব বলা হয়।

সে উৎসবের খরচের একটা এস্টিমেট বা আন্দাজ (Budget) তৈরি হয়। প্রতি বছর একই রকম থাকে; একটু কমবেশি তো হয়ই। তারপর সেটা প্রত্যেক তহশিলদারের হিসসায় ভাগ করে দেওয়া হয় যে কে কত আদায় করবে কৃষকদের কাছ থেকে। এবার তহশিলদারেরা এই সুবাদে নিজেদের জন্যও কিছু আদায় করে নেওয়ার সুযোগ পায়। তাই সার্কেল থেকে তার জিম্মায় যত টাকা বা ঘি ইত্যাদি সংগ্রহ করার দায়িত্ব দেওয়া হয় তার দেড়-দুইগুণ করে সে তার পাটোয়ারী এবং অন্যান্য অধীনস্থের জিম্মায় ভাগ করে দেয় যে কে কত আদায় করবে। আবার সে পাটোয়ারী এবং অন্যেরাও নিজেদের হিস্যা দেড়-দু’গুণ করে অধীনস্থ চাকরদের কাঁধে চাপায় যারা আরো একটু বাড়িয়ে প্রত্যেক কৃষকের কাছ থেকে আদায় করে। এভাবে আদায়ের সময় আসল খরচের অনেক গুণ বেশি আদায় হয় আর গরীব কৃষক মারা পড়ে। যা কিছু ওদের ঘি-দুধ ইত্যাদি জিনিষের মাধ্যমে বা নগদ টাকার মাধ্যমে দিতে হয় তা এমন এক ট্যাক্স যে বলার মত নয়। তার বদলে তারা কিছুই পায় না। সর্বস্বান্ত হয়। বোধহয় একাধটা মিষ্টি পায় হাতে!

এধরণের অত্যাচার আর জুলুমবাজি কত গোনাব? নমুনা হিসেবে কয়েকটা দেখিয়ে দিলাম। আসলে জমিদার যখন কৃষকদের মানুষই মানে না, মনুষ্যজাতিই মনে করে না, তখন তাদের ভোগান্তির কথা আর কী বলব? তা তো যত রকমের আছে তার মধ্যে এসব, সব মিলিয়েও কমই! তার ভারে পিষ্ট কৃষকদের দল সেদিন সেই সভায় হাজির ছিল। জমিদার আর তার চাকরদের খিদমত সে সভায় আমরা ভালোরকমই করলাম। আগের থেকেই জ্বলেপুড়ে ছিলাম। কৃষকদের করূণ কান্না, তাদের আর্তনাদ নুনের কাজ করল। ফেটে পড়া স্বাভাবিক ছিল। আমরা অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে এমন আগুন ঝরালাম আর এমন চুরমার করলাম তাদের দম্ভ যে মৃত কৃষকেরাও জেগে উঠল। তারা বুঝে গেল যে তাদের কষ্টের শেষ হতে পারে। আগে তো ভাবত “যে কেউ রাজা হোক, আমার কী আসে যায়। দাসীই থাকব, রণী হব না” (“কোউ নৃপ হমৈ কা হানী। চেরি ছাঁড়ি ন হোউব রানী”)। কিন্তু এক বার তাদের শিরা গরম হয়ে উঠল।

সভার পর কিছুটা দূরে টিকাপট্টী আশ্রমে গেলাম। রাত্রে ওখানেই থাকলাম। সকালে ঘুরে ঘুরে পুরো আশ্রমটা দেখলাম। এটা গান্ধীবাদের আখড়া। চরকা, তাঁতের কারবার দেখলাম ভালো রকম ছড়িয়ে আছে। এখানে যারা থাকে তারা আগে জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কখনো সখনো আওয়াজ তুলত। গ্রামাঞ্চলে ঘুরে মিটিংও করত। কিন্তু ধীরে ধীরে সেসব কম হয়ে গেল। এখন হয়ত কালেভদ্রে হয় বা তাও হয়না। বোধহয় শুরুর দিকে জায়গাটায় স্থিত হওয়ার ছিল। তাই কৃষকও জনতার সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। এখন তো বেশ জমাটি হয়ে আছে! তাই বোধহয় আর ওসব প্রশ্ন তুলবার দরকার হয় না। কিসান-সভারও এ জমানা শুরুর দিকেরই ছিল। মানুষে বুঝতেই পারেনি কোন দিকে যাবে। কৃষকদের মাঝে শ্রেণীচেতনা ছড়াবে এবং শ্রেণীসংগ্রামে প্রবল উৎসাহ জাগাবে এ কথাটা তখন অব্দি লোকেদের মাথায় আসেনি। তাই আমাকেও সে আশ্রমে নিমন্ত্রিত করা হল। স্টেশনের পাশের সভাটিরও ব্যবস্থা আশ্রমের লোকেরাই করেছিল। কিন্তু এখন তো কিসান-সভাকে লোকে ভয় পায়। শ্রেণী বিদ্বেষের কথা যথেষ্ট ছড়িয়ে পড়েছে। এমত পরিস্থিতিতে এধরণের আশ্রম যদি সতর্ক হয়ে যায় তো সেটা কোনো আশ্চর্যের ব্যাপার হবে না। আসলে কৃষকস্বার্থ আর জমিদারস্বার্থের মাঝের চওড়া আর গভীর খাদটা যেমন যেমন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে তেমন তেমন দোভাষীদের, মানে অবস্থা বুঝে দুদিকেরই কথা বলা লোকেদের জায়গা কমে আসছে। এখন তো গান্ধীবাদীরা আমাদের সাথে বসতেও ভয় পায় যে লিডাররা আবার জবাব তলব না করে। এমন হয়েওছে। ভালোই হল। কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হয় সেই সব মানুষদের কাছে যারা ওপর ওপর কৃষকের হিতাকাঙ্খী হলেও ভিতর থেকে শ্রেণীসামঞ্জস্যের পক্ষে, আর চায় যে কৃষক ও জমিদারদের মাঝে কোনো চুক্তি হয়ে যাক। নইলে শেষে তারা অথৈ জলে পড়বে। কেননা এখন তো কৃষকদের হাতে শুধু অন্নের নয়, ভোটেরও শক্তি আছে।

টীকাপট্টী থেকে আমাদের বনমনখি যাওয়ার ছিল। পুর্ণিয়া আর ভাগলপুর জেলার সীমায় অবস্থিত মুরলীগঞ্জ এবং বিহারিগঞ্জ স্টেশন থেকে আসা লাইনদুটোর সংযোগস্থল এই রেল জাংশন। এখান থেকেই পুর্ণিয়া হয়ে কাটিহার যায় লাইন। বড়হরা স্টেশনে সকালে ট্রেন ধরার ছিল আমাদের। কথা হয়ে গিয়েছিল যে পরের দিন রওনা হব। বড়হরা জায়গাটা দূরে। রাস্তা-টাস্তা বলতে কিছু নেই। গরুর গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো সওয়ারিও সম্ভব নয়। যদি দুপুরের পর রওনা হওয়া যায় আর সারা রাত চলা যায় তাহলে বোধহয় ঠিক সময়ে পৌঁছোতে পারব। কিশনগঞ্জ থেকে জাহানপুর যে সফরটা ছিল তার থেকে এটা কঠিন। ওটায় তো শুধু দিনের বেলায় চলার ছিল। এখানে সারা রাত ধরে চলতে হবে। কিন্তু করব কি? উপায় ছিল না। কৃষক আন্দোলন বলে কথা!

কথা মতই হল সব কিছু। আমাদের গরুর গাড়ি রওনা হয়ে গেল। দুর্ভাগ্যক্রমে যে গরুর গাড়ি পাওয়া গেল সেটা ছোট। পর্দাও ছিল না যে রোদ জল আটকাবে। সাধারণতঃ ওদিকে ছাউনি দেওয়া গাড়ি পাওয়া যায়। কিন্তু এ গাড়িটা নিছক মাল বওয়ার। তার ওপর আরো একটা ব্যাপার ছিল। গাড়িগুলোর কিনারায় লাগানো খুঁটির সাথে বেঁধে দুদিকে দুটো লম্বা বাঁশের টুকরো বসানো হয়। শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকে গাড়ির সাথে। ফলে গাড়িতে বসলে ভুল করেও নিচে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে না। জিনিষপত্রও সুরক্ষিত থাকে। কিন্তু আমাদের গাড়িটায় এসব কিছুই ছিল না। ফলে নিজেদের পড়ে যাওয়ার ভয় যেমন ছিল জিনিষপত্রও গড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। গাড়োয়ান ছাড়া আমরা তিনজন মানুষ গাড়িতে বসেছিলাম। তার ওপর জিনিষ। এমন অবস্থা হল যে দিনের বেলায় তো আসন করে আমরা বসেই রইলাম, রাতেও তাই। শোয়া তো দূরের ব্যাপার। একটু কাত হওয়া বা ঝুঁকে বসাও ছিল অসম্ভব। অসহ্য ছিল সে কষ্ট। জীবনে প্রথম বার দিনে রাতে মিলিয়ে লাগাতার ষোলঘন্টাও বেশি সময় গরুর গাড়িতে কাটালাম। এমনিতেও গরুর গাড়ির সওয়ারি সবচেয়ে খারাপ। ঝাঁকানির চোটে প্রতিমুহূর্তে লম্ফঝম্প হতে থাকে। এমন ধাক্কা লাগে যে বুক কেঁপে যায়। যদি খড় ইত্যাদি কোনো নরম জিনিষ বেছানো না থাকে তাহলে ভীষণ ব্যথা লাগে। পাছা জখম হয়ে যায়। তারপর যদি শোবার বা ঘুমোবার একটুও সুযোগ না পাওয়া যায় তাহলে মরণ। আর শোবো কোনদিকে? জিনিষগুলোও যে ছড়িয়ে আছে। মনে মনে হাসছিলাম। লোকে ভাবে যে কিসান-সভার কাজ খুব আরামের। একদিনও সারারাত জেগে গেলে আমি পরের দিন নির্ঘাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ি, একথাটা যে জানে সেই আন্দাজ করতে পারবে সেরাতের কষ্ট। তার ওপর ভয়ও ছিল যে ট্রেনটা না ছেড়ে যায়। তাই সারারাত তাড়া দিচ্ছিলাম গাড়োয়ানকে। যাই হোক, শেষে যেমন তেমন করে পৌঁছেই গেলাম বড়হরা স্টেশন, ট্রেন আসার আগে।

১২

পুর্ণিয়া জেলারই আরেকটি ঘটনা। সেই ১৯৩৫ সালের। ১৯৩৫ সালটা কিসান-সভার ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ বছরই প্রথম বিহার প্রাদেশিক কিসান সভা জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের সংকল্প করেছিল নভেম্বরের শেষে হাজিপুরে। ওখানেই হয়েছিল প্রাদেশিক কৃষক সম্মেলনের চতুর্থ অধিবেশন। আমিই তার সভাপতি ছিলাম। সে বছর সেই নভেম্বর মাসেই, যত দূর মনে আছে, হাজিপুর অধিবেশনের আগেই নভেম্বরের ১১-১২ তারিখে ধর্মপুর পরগনার রাজনৈতিক সম্মেলন এবং কৃষক-সম্মেলন হয়েছিল বনমনখিতে। প্রথম সম্মেলনের অধ্যক্ষ ছিলেনবাবু অনুগ্রহ নারায়ণ সিং এবং দ্বিতীয়টার বাবু শ্রীকৃষ্ণ সিং। এই দুজন ভদ্রলোকই পরে কংগ্রেসি-মন্ত্রীসভার জমানায় বিহারের অর্থমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। সেই ভবিষ্যতের প্রস্তুতিতে যা কিছু হয়েছিল তারই অংশ ছিল ওই দুটো সম্মেলন। আমিও আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। এও বলা হয়েছিল যে যদি কোনো অনিবার্য কারণে আমি একান্তই না যেতে পারি তাহলে কিসান-সভারই কোনো খ্যাতিমান নেতাকে যেন পাঠিয়ে দিই।

কিন্তু জেনে শুনে আমি দুটোর একটাও করলাম না। না নিজে গেলাম আর না কাউকে পাঠালাম। ওখানে আমাদের সাথীরা যারা ছিল তাদের কাছেও ক্ষমা চেয়ে নিলাম বাধ্যবাধকতা দেখিয়ে। আসল ব্যাপারটা ছিল যে কিসান-সভা ততদিনে শিকড় ধরে নিয়েছে। তার গলার আওয়াজ ভয়হীন হতে শুরু করেছে। সে শুধু দাবিই করছে না যে সে কৃষকদের স্বাধীন কন্ঠস্বর হয়ে উঠেছে; তার সাহসও দেখাচ্ছে। তাই কংগ্রেসি নেতাদের মধ্যে কিসান-সভার বিরুদ্ধে কানাঘুষো হওয়া শুরু করেছে। ভিতরে ভিতরে কিসান-সভার বিরোধ করছে তারা। তাদের ধারণা যে আমার মত কয়েকজন গোনাগুনতি লোক ঝড়টা তুলছে। নইলে, কৃষক তো নিজেই কংগ্রেস ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে পছন্দ করে না। গণআন্দোলনের প্রতি এমন ধারণা নতুন ব্যাপার নয়। এটাই সনাতনধর্ম। কংগ্রেসের ব্যাপারেও তো সরকারি আধিকারিক এবং সেকেলে দলের লোকেরা এধরণের কথাই বলত।

তাই আমি আর আমার সঙ্গীরা ভাবলাম যে যদি বনমনখি যাই তাহলে কংগ্রেসের প্রধান নেতাদের সাথে সোজাসুজি লড়াই হতে পারে। আমরা জানতাম যে স্বাধীন কিসান-সভা তৈরি করার এবং জমিদারি উচ্ছেদের প্রশ্ন ওখানে উঠবে। বিশেষকরে যদি আমরা থাকি। তখন অনিবার্য হয়ে উঠবে লড়াই। আমাদের উপস্থিতি সত্ত্বেও যদি প্রশ্নগুলো না ওঠে তাহলে রাজনৈতিক সম্মেলন থেকে আলাদা কৃষক-সম্মেলন করার কোনো মানেই নেই। আর শেষ অব্দি ওখানকার অত্যাচারিত কৃষকেরা বুঝবে কী? এই নয় কি, যে আমরাও জমিদারদের ভয় পাই, তাদের দালাল, এবং শুধু সে কারণেই কিসান-সভা তৈরি করে রেখেছি? সে তো মাথা কাটা যাওয়ার মত ব্যাপার হবে। তাই সব দিক ভেবে, না যাওয়াই স্থির করলাম। এটাও ভাবলাম যে এতদসত্ত্বেও যদি ওখানে জমিদারি উচ্ছেদের এবং বিহার প্রাদেশিক কিসান সভার নেতৃত্বে জেলায় কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার প্রশ্ন ওঠে তাহলে সেটা আমাদের সবচেয়ে বড় জয় হবে। তখন তো আমাদের বিরোধীদের বলার সুযোগই থাকবে না যে কিসান-সভার নামে আমরাই মিছিমিছি গোলযোগ করি – কৃষক এসব চায় না। তখন তো দুনিয়ার চোখ খুলবে যে কৃষকের প্রয়োজনেই কিসান-সভার জন্ম হয়েছে। আর যদি প্রশ্নটা ওঠে আর সংখ্যাগরিষ্ঠের রায় পক্ষে যায়, তাহলে তো কেল্লা ফতে। আমাদের ডবল জিত। ওখানে থাকলে নাহয় চাপ সৃষ্টি করতাম বা সহানুভুতিটা কাজে লাগাতাম। কিন্তু না থাকলে তো লোকে নির্দ্বিধায় নিজেরই চিন্তাধারা কাজে লাগাবে। আসলে কখনো কখনো নেতাদের দূরদৃষ্টি, তাদের ভীরুতা যাকে লোকে বিচারবুদ্ধি বলে, তাদের উদারতা … এগুলো জনগণের খুব ক্ষতি করে। এগুলো জনগণের হৃদয় এবং মস্তিষ্কে নিরর্থক লাগাম পরিয়ে দেয় এবং চিন্তাধারার নির্বাধ প্রবাহ থামিয়ে দেয়। আমরা ভাবলাম এই পাপ আমাদের করা উচিৎ হবে না।

যত দূর মনে করতে পারি, আমরা পাটনায় বিহার প্রাদেশিক কিসান কাউন্সিলের (কার্যনির্বাহী) মিটিং করছিলাম। কেননা হাজিপুরের ব্যাপারে সব রকম প্রস্তুতি নেওয়ার ছিল, সব কথা ভাবার ছিল। বনমনখির সম্মেলনগুলোর অব্যবহিত পরেই ছিল এই মিটিং। মিটিংএই যখন বনমনখি থেকে ফেরা কারোর মুখে শুনলাম যে কৃষক সম্মেলনে শুধু বিহার প্রাদেশিক কিসানসভার নেতৃত্বে স্বাধীন কিসানসভা গঠনের প্রস্তাবই শুধু পাশ হয়নি, জমিদারি প্রথা উচ্ছেদেরও সিদ্ধান্ত হয়েছে, আমরা আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম। এও শুনলাম যে প্রায় পনের হাজার কৃষক উপস্থিত ছিল। বনমনখি তো একেবারে অজ পাড়াগাঁ! আর লিডারদের চাপা আক্রোশ এবং মাথা-খোঁড়া পরিশ্রম সত্ত্বেও মাত্র তিন-চারশ জন বিরুদ্ধে মত দিয়েছে। বাকিরা সবাই ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘জমিদারি প্রথা ধ্বংস হোক’, ‘কৃষক-রাজ কায়েম হোক’, ‘কিসান-সভা জিন্দাবাদ’ ইত্যাদি স্লোগান তুলে প্রস্তাবগুলোর পক্ষে মত দিয়েছে। বিরোধ-করিয়েদের মধ্যে শুধু পুর্ণিয়া জেলার নয়, বাইরে থেকে পৌঁছোনো কংগ্রেসি নেতারাও ছিল। কেউ কেউ খোলাখুলি বিরোধ করেছে আর পুরো শক্তি লাগিয়েছে, আবার কেউ কেউ ভিতরে ভিতরে ওই একই কাজ করেছে। কিন্তু বিরোধ করেনি এমন নেতা একজনও ছিল না। কিসানসভা-বাদীদের কড়া বকুনিও দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ফল হয়নি।

এই অনন্য ঘটনাটি, যেটা নিজের ধরণের প্রথম ঘটনা ছিল, আমাদের মধ্যেকার অনেকের চোখ খুলে দিয়েছিল, কংগ্রেসি নেতাদের চোখ খুলে থাকুক আর না খুলে থাকুক। আমার সামনে তো এর অনেক আগেও এমন কিছু ঘটনা ঘটেছিল যা দেখে কৃষকদের প্রতি, কিসানসভার প্রতি এবং তার উদ্দেশ্যের প্রতি আমার বিশ্বাস পাকা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই ঘটনাটি আমাদের অন্যান্য সাথীদেরও ততটাই বিশ্বাসী হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিল।

১৩

ঠিক মনে নেই কোন বছরের কথা। বোধহয় ১৯৩৬ সালের গরমের দিনগুলোয়। কিন্তু কোশি নদীর এলাকায় সে সময় বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। ভাগলপুরের মাধেপুরা শহরটাকে কোশি চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে এবং প্রায় উজাড় করে দিয়েছে। ওখানেই আমাদের একটা মিটিংএর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ভাগলপুর জেলার উত্তরভাগে দুটো সাবডিভিশন পড়ে, সুপৌল এবং মাধেপুরা। সুপৌলের দক্ষিণে মাধেপুরা। কিন্তু কোশির কোপভাজন হয়ে শহরটা উজাড় এবং ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন কোশির প্রকোপ থেকে বেরিয়েছে শহরটা। হতে পারে আবার আগের মত হয়ে উঠবে।

হ্যাঁ, তো আমাদের সেদিন ওখানে কৃষকদের সভা করার ছিল। যদ্দূর মনে পড়ছে, একদিন আগে আমরা সুপৌল থেকে গরুর গাড়িতে বসে রওনা দিয়েছিলাম। কেননা, রাস্তায় আমাদের আরো একটা মিটিং করার ছিল। সে জায়গাটার নাম ছিল বোধহয় গামহারিয়া। একটা বাজার। ভালো সংখ্যায় বানিয়ারা ওখানে বাস করে। খুব উৎসাহ ছিল লোকজনের মধ্যে। মিটিংটাও ভালো হল। ওখান থেকে আমরা সকাল সকাল খাওয়া-দাওয়া করে মাধেপুরার পথে রওনা হয়েছিলাম যাতে তৃতীয় প্রহর নাগাদ মিটিংএ পৌঁছে যাই। কিন্তু সওয়ারি গরুর গাড়ির। মনে হচ্ছিল রাস্তা শেষই হচ্ছে না। যখন তিনটে-চারটে বেজে গেল তখন যারপরনাই চিন্তিত হয়ে উঠলাম। গাড়ি ছেড়ে দৌড়োতে চাইছিলাম। কিন্তু দৌড়ে যাব কোথায়? একা তো রাস্তাও চিনতে পারব না। নদী-নালার প্রদেশ। সেটা দ্বিতীয় অসুবিধা। রাস্তায় ভুট্টা, অরহড় ইত্যাদির ফসল দাঁড়িয়েছিল আর রাস্তা আটকেছিল সেই ক্ষেতগুলোই। যদি সেই জঙ্গলে রাস্তা হারিয়ে ফেলি তো আরো খারাপ হবে। আমাদের সঙ্গে ওখানকার প্রমুখ কর্মী শ্রী মহতাবলাল যাদব ছিলেন। উনি আমাদের দৌড়ে সঙ্গ দিতেন না। সারন জেলার অর্কপুরের সভা থেকে ফেরার সময় আমাদের সঙ্গীরা সাহসী ছিলেন; এখানে তেমন ছিলেন না। তাই গাড়োয়ানকে বার বার ‘একটু জোরে চালাও ভাই’ বলে হাঁকা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

কিন্তু গ্রামের বর্ষার রাস্তা ঘোরানো-প্যাঁচানো। গাড়োয়ান করতই বা কি? সে নিজেও অনেক চেষ্টা করল। বলদগুলো গলদঘর্ম হল। সব সত্ত্বেও দূরেই রইল মাধেপুরা। অনেক অসুবিধে করে এবং পর্যুদস্ত হয়ে, সন্ধ্যে হতে হতে আমরা কোশির তীরে পৌঁছোলাম। এবার মাঝখানে রইল নদী। নইলে মিটিং ধরতে দৌড় লাগান যেত। তাড়াতাড়ি পার হওয়ার চেষ্টা করতে লাগলাম। নদীটাও অত্যন্ত খারাপ। পাট চওড়া আর স্রোত তীব্র। এদিক থেকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি কৃষকেরা নিরাশ হয়ে সভাস্থল থেকে ফিরছে। কেউ কেউ তো নৌকো করে এপারে চলে এসেছে। কয়েকজন ওপারেই নৌকোর আশায় দাঁড়িয়ে আছে। দূর দূরান্ত থেকে তারা এসেছিল। অন্ধকার হয়ে আসছে। বাড়ি না ফিরতে পারলে গবাদি পশুদের হেফাজত কে করবে, সেটা বড় প্রশ্ন। খাবার-দাবারও সঙ্গে আনেনি। কিন্তু যখন ওরা জানতে পারল আমিই স্বামী জি, তখন, অনেকে যদিও ‘দর্শন’ করেই সন্তুষ্ট হয়ে এগিয়ে গেল, কয়েকজন নৌকোয় বসেই ফেরত চলল সভায়। নদী পার হতে হতে ঘন অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। তবু সাহস ছিল যে সভা হবেই। ওপারের লোকেরাও সঙ্গে চলল। আমি এগিয়ে ছিলাম। পিছনে কৃষকদের দল ছিল। আমরা ঊর্দ্ধশ্বাসে দৌড়োচ্ছিলাম। ক্ষেতের মধ্যে দিয়েই যাওয়ার ছিল। ফসল দাঁড়িয়েছিল। সভাস্থল যথেষ্ট দূরে ছিল। অবশ্য আমরা মাধেপুরাতেই দৌড়োচ্ছিলাম। লোকেরা ‘স্বামীজির জয় হোক’, ‘ফিরে চল’ ইত্যাদি আওয়াজ তুলতে শুরু করল, যাতে অন্যান্য রাস্তা দিয়ে যদি কৃষকেরা ফিরে যেতে থাকে বাড়ির দিকে, তারাও যেন সভায় ফিরে আসে। অদ্ভুত পরিবেশ ছিল। এক বার তো কিছুক্ষণ অব্দি চারদিক ডাকাডাকিতে প্রতিধ্বনিত হতে থাকল। যতক্ষণ আমাদের দৌড় জারি রইল, ডাকও চলতে থাকল। যে যেখানে ছিল সেখান থেকেই ‘জয়’, ‘জয়’ করতে করতে ফিরে চলল। শুকোতে থাকা ফসল যেন বৃষ্টি পেল। নিরাশ মানুষগুলোর মনের আনন্দ বাঁধ মানতে চাইছিল না। নাহয়, না খেয়েই থাকব, স্বামীজির বক্তৃতাটা তো শুনব, সেই উৎসাহই ঢেউ তুলছিল ওদের মনে।

যাহোক, এই পৌঁছোচ্ছি, এই পৌঁছোলাম … করতে করতে আমরা ঊর্ধশ্বাসে দৌড়োচ্ছিলাম। লোকেরাও চার দিক থেকে আওয়াজ শুনে দৌড়োতে শুরু করেছিল। যে শুনছিল সেই আবার আওয়াজ ছড়িয়ে দিচ্ছিল। সেদিন দেখিয়ে দিলাম যে সভা করায় আর সে সভা সঞ্চালন করায় শুধু নয়, দরকার পড়লে দৌড়োনোতেও আমি এগিয়ে থাকি। সেদিন কোত্থেকে এত শক্তি এসেছিল আমার ভিতরে, কে বলবে? আমি সব কিছু সহ্য করতে পারি কিন্তু একটাও মিটিং থেকে কৃষক নিরাশ হয়ে ফিরে যাবে আর আমি ঠিক সময়ে মিটিংএ পৌঁছোতে পারবনা, এটা আমার সহ্যের বাইরে, মৃত্যু থেকেও খারাপ। ওই সময় আমার মনের কী দশা হয় সেটা অন্যেরা বুঝতেই পারবে না। যদি আমাদের কর্মীরাও সে বেদনা বুঝতে পারত তাহলে ভবিষ্যতে এই ভুলগুলো করত না। মনের সেই দশায় নিরাশ হওয়ার বদলে আমার মধ্যে প্রচুর শক্তি চলে আসে যে যেমন করে হোক মিটিংএ পৌঁছে তো যাই। কেননা যদি কয়েকজন কৃষকও আমায় ওখানে দেখে নেয় তাহলে ধীরে ধীরে সবার মাঝে খবর ছড়িয়ে পড়বে যে আমি মিটিংএ পৌঁছেছিলাম শেষ অব্দি। দেরি হয়েছিল সওয়ারির জন্য।

রাষ্ট্রীয় স্কুল এবং কংগ্রেস অফিসের পাশের মাঠটা ছিল সভাস্থল। আমিও পৌঁছোলাম আর লোকজনও এল, যদিও অনেকে চলে গিয়েছিল। আমি ওদেরকে কিছু উপদেশ দিলাম আর দেরির জন্য ক্ষমা চাইলাম। এও কথা দিলাম যে পরের দিন আবার সভা হবে। রাতে-রাতেই খবর ছড়িয়ে দেওয়া হল সব জায়গায়। পরের দিনও অনেক লোক এল। আসবে নাই বা কেন? কোশি তো ওদের ছিবড়ে করে দিয়েছে। তার পরেও, শরীরে রয়ে যাওয়া রক্ত শুষে নিয়েছে জমিদার। শুধু কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে। এই তো জমিদারি প্রথার মার খাওয়া কৃষক আমাদের।

১৪

ভাগলপুর জেলার উত্তর অংশে কোশি নদী আর জমিদারেরা মিলে কিছুটা এমন জোট বেঁধেছে যে কৃষকও পরিত্রাণ চাইছে। দুজনেই নিষ্ঠুর এবং কৃষকদের প্রতি এত দায়িত্বহীন যে বলার মত নয়। কোশির তো নাহয় বুঝও নেই আর চেতনাও নেই। তাই ও যা কিছু অনর্থ বাঁধাক, বোঝা যায়। ও তো অন্ধ। কিন্তু মানুষরূপী আর সভ্য বলে কথিত এই জমিদারগুলো! এদের কী বলা যায়? যখন কোশিকেও টেক্কা দিয়ে যায় এই ভালোমানুষেরা তখন অবাক হতে হয়। মনে হয় এরা নাদিরশাহ। মনুষ্যত্বের সাথে কোনো সম্পর্কই নেই। কোনো আইন-কানুনও নেই এদের জন্য! এই অদ্ভুত জীবগুলোকে প্রকৃতি তৈরি করেছে কেন, বোঝাই যায় না।

কিসান-সভার আন্দোলনের কাজেই আমি অনেকবার কোশি-বিধ্বস্ত ওই এলাকায় গেছি। কোশির স্রোতের কোনো ঠিক নেই। থাকতে থাকতে হঠাৎ পাল্টে যায় আর আবাদ ভূখন্ড বিশ বছরের জন্য নিজের পেটে ঢুকিয়ে নেয়। এটা ঠিক যে যে জমিটা ছাড়ে তাতে ফলন হয় দারুণ। কিন্তু ঝোপেঝাড়ে, ঘাসে-আগাছায় এমন গভীর জঙ্গল হয়ে থাকে যে বলার মত নয়। সে জঙ্গল জংলি শুওর, হরিণ এবং অন্যান্য জানোয়ারের আড্ডা হয়ে যায়। সেখান থেকে এই জানোয়ারগুলো দূরে দূরে গিয়ে হামলা করে। কৃষকদের ফসল বাঁচিয়ে রাখা যায়না। তারা আশ্রয় খোঁজে। জঙ্গলগুলো কাটাও হয় না। কৃষকদের সাধ্য কি ওই জঙ্গল কাটার! হাজার, লক্ষ বিঘে ছড়িয়ে শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল। কাটলেও আবার দাঁড়িয়ে যায়। যতক্ষণ শিকড় অব্দি না খোঁড়া হয় কিছুতেই যায় না। আর এ কাজ সহজ নয়। এসব নিয়েই নাজেহাল থাকে কৃষকেরা।

কোশির স্রোত যেদিক দিয়ে যায়, এক তো সেই দিকে লক্ষ লক্ষ বিঘা জমি জলের পেটে ঢুকে যায়। অন্য দিকে বেরিয়ে আসা জমি জঙ্গলে ভরে যায়। তৃতীয়তঃ, ম্যালেরিয়ার প্রকোপ এমন হয় যে সবার চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। এমনও নয় যে নদীর সব জায়গায় স্রোত থাকে। লক্ষ কোটি বিঘেয় স্থির জমা জল পড়ে থাকে। তাতেই জঙ্গল তৈরি হয় আর মশার ফৌজ জন্ম নেয়। ওই জলে এক ধরণের ধান রোয়া যায়। কিন্তু তার ওপরও বিপদ ঘনিয়ে আসে। যখন ধানের শিষ ওঠে আর পাকতে শুরু করে তখন রাত্তির বেলায় জলের পাখিদের দল বিশাল ঝাঁকে ঝাঁকে এসে খেয়ে যায়। কে বলবে যমরাজার এই সৈন্যদল কোত্থেকে আসে? কিন্তু আসে, অবধারিত ভাবে। এক তো রাতে প্রতি দিন এদের হামলা থেকে ফসল পাহারা দেওয়া সসহজ নয় – অসম্ভব। নৌকো ছাড়া কাজ চলে না। তাও যদি অনেক নৌকো হয় আর শ’য়ে, হাজারে লোক সারা রাত জেগে হু হু করতে থাকে তাহলে হয়ত তাড়ানো যায়। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার এই যে জমিদার সেটা ওদের করতেও দেয় না। ওই এলাকায় নওগাছিয়ার জমিদার হলেন বাবু ভূপেন্দ্র নারায়ণ সিং ওরফে লাল সাহেব। তাঁর পাখিশিকারের প্রচন্ড শখ। নিজে তো বেরোনই, দূর দূর থেকে বন্ধুদের ডেকে আনেন এই কাজে। সরকারি আধিকারিকদেরও মাঝে মধ্যেই আমন্ত্রিত করা হয়। রাতে জলে চারা ফেলা হয়যাতে পাখিরা দল কে দল সেই লোভে আসে। এবার যদি কৃষক নিজের ফসল বাঁচানোর জন্য তাদের ওড়ানো শুরু করে তাহলে জমিদার সাহেব ও তার বন্ধুরা শিকার কী করে খেলবেন? তখন তো আনন্দটাই মাটি হয়ে যাবে। যখন নাকি সেই আনন্দেরই উদযুগে চারা ফেলা হয়, যে যদি ধানের লোভে পাখি নাও আসে চারার লোভে তো আসবেই। তাই কৃষকদের জন্য কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা আছে যে যেন তারা পাখিদের না ওড়ায়, দিনে হোক বা রাতে হোক। কেমন নবাবী আর আধিপত্য! অন্ন না পেয়ে কৃষকদের প্রাণপাখি উড়ে যায় যাক, কিন্তু পাখি ওড়ানো যাবে না। পাখিদের উড়ে যাওয়া জমিদারের জন্য অসহ্য! আর বিশেষত্ব এটাই যে এই জমিদার সাহেবই লিডারদের চেষ্টায় বিগত এসেম্বলি নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রার্থী প্রায় প্রায় হয়েই গিয়েছিলেন। কোনরকমে আটকানো গিয়েছিল।

ওই এলাকাতেই দুটো বড় গ্রাম আছে দ্বারভাঙ্গা মহারাজের জমিদারির, প্রায় শহরের মত – মহিষী আর বনগাঁও। একটা আরেকটা থেকে অনেকখানি দূরে, আর মাঝখানে তৃতীয় কোনো গ্রামও নেই। তবুও দুটো নাম প্রায় একসাথেই নেওয়া হয়। ও জায়গায় মৈথিলি ব্রাহ্মণদের – দ্বারভাঙ্গা মহারাজের বিশেষ বন্ধুবান্ধবদের - জনসংখ্যা বড়। যে সাহারসা স্টেশন থেকে একটা ছোটো লাইন মাধেপুরার দিকে গেছে তারই পাশে পড়ে এই দুটো গ্রাম। ওখানেই নেমে গ্রামে পৌঁছোতে হয়। বনগাঁওয়ের অত্যাচারিত কৃষকেরা আমাদের মিটিংএর ব্যবস্থা করে রেখেছিল। কিন্তু আমরা জানতাম যে মহিষীতেও তেমনই মিটিং আছে। ওখানেও যেতে হবে। যাব তো বটেই, কিন্তু পথে কোশির জলরাশি বড় বাধা ছিল। তাই অনেক দূর অব্দি হেঁটে গিয়ে নৌকোয় করে যাওয়ার ছিল। অন্য রাস্তা ছিলই না। শেষে বনগাঁওএর দারুণ সভা পুরো করে আমরা মহিষীর দিকে রওনা দিলাম। জল তো ক্ষেতে সর্বত্রই ছড়িয়েছিল আর বনগাঁওবাসীরাও বড়ই কষ্টে ছিল। অথচ জল কম বলে ছোটো ডিঙিও ক্ষেতগুলোর মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই অনেক দূর অব্দি কাদা আর জল পার করে আমরা ডিঙিতে উঠলাম তারপর এগোলাম।

পথে যে দৃশ্য চোখে পড়ল তা ভোলার মত নয়। যেগুলো আগে ধানের সবুজ ক্ষেত ছিল সেগুলোই আজ দুস্তর জলরাশি আর জঙ্গল। যেখানে কখনো ধানের ঢেউ দুলত আর কৃষকের প্রাণ আনন্দে ভরে উঠত সেখানে আজ কোশির জল আর জঙ্গল। নৌকো করে যেতে যেতে অনেকটা সময় গেল। তবুও পথের শেষ নেই। ওই সব ক্ষেতের কৃষকেরা কেমন করে বাঁচে ভাবার বিষয়। আমরা জানতে পেলাম – কৃষকেরা নিজেদের দুঃখযন্ত্রণার কাহিনী শোনাল আমাদের – যে গ্রামের চোদ্দ আনাই জলের ভিতর। বড় বড় বিদ্বান এবং কুলীন ব্রাহ্মণ গ্রাম থেকে দৌড়ে বেরিয়ে ঢোল-বাদ্য ইত্যাদির সাথে হাঁটু অব্দি জলে আমাদের নিতে এসছিলেন। ওদের আনন্দের দিন ছিল আজ। কিসান-সভার কাছে তাদের আশা করার ছিল। তাই চাইছিলেন যে আমি নিজের চোখে ওঁদের দুর্দশা দেখে যাই। তাঁরা নিজেদের কৃষকসুলভ নির্মল এবং কোমল হৃদয় আমার সামনে মেলে ধরেছিলেন। সত্য তো এটাই যে গ্রামের ভয়াবহ অবস্থা দেখে আমার রক্ত গরম হয়ে উঠছিল, চোখ থেকে আগুন বেরুচ্ছিল। ইচ্ছে হচ্ছিল যে যেমন করে হোক এই রাক্ষুসে জমিদারিটাকে রসাতলে পাঠিয়ে দিই – ধ্বংস করে দিই। মন ভরে ওখানকার সভায় আমি জমিদারি প্রথাকে দুষলাম। মিটিংএ ওখানকার ব্রাহ্মণেরা যে অভিনন্দন জানাল তা ভোলার মত নয়। তাতে আমার সংকল্প আরো দৃঢ় হল যে জমিদারিকে জাহান্নামে পাঠিয়েই ছাড়ব।

ওখানেই জানলাম যে বিশ বিশ বছর ধরে জমিতে বারোমাস জল দাঁড়িয়ে আছে। চাষ হতে পারে না। তবুও জমিদারকে খাজনা দিতে হয়। বাহ রে খাজনা আর বাহ রে আইন। খাজনা না দিলে মহারাজ নালিশ রুজু করে আর জিনিষপত্র, জন্তুজানোয়ার উঠিয়ে নিয়ে যায়। জমিদারের তো নালিশ করারও প্রয়োজন নেই। সার্টিফিকেটের অধিকার রয়েছে। যেমন সরকারি পাওনা বিনা নালিশেই আদায় হয়। কেননা যা জিনিষ থাকে ঘরে, বাজেয়াপ্ত করে নেওয়া হয়। ঠিক তেমনই মহারাজাধিরাজ করেন সার্টিফিকেটের শক্তিতে। সরকারি মাল-বিভাগের আধিকারিককে বিধিমত একটা বার্তা দিলেই তার কাজ হয়ে যায় আর পুরো টাকা আদায় হয়ে যায়। আর নইলে পঁচিশ-পঞ্চাশ টাকার জিনিষ এক টাকায় নিলাম হয়ে যায়। তাই সেসব ঝামেলায় না গিয়ে কৃষক গয়না, জমি বেচে, ধার নিয়ে এমনকি মেয়ে বেচেও টাকা আদায় করেই দেয়।

প্রশ্ন উঠতে পারে যে জমিটাই নিলাম হয়ে যেতে দেয় না কেন? যখন নাকি কিছু হয়ই না ওতে? কথাটা ঠিক। কিন্তু সার্টিফিকেটের নিয়মানুসারে জমি পরে নিলাম হয়। আগে অন্যান্য জিনিষ লোটা হয়। আরেকটি কথা। কৃষকের আশা থেকেই যায় যে হয়ত কোশির স্রোত ওদিক থেকে সরে যাবে আর ক্ষেতগুলোয় আবার থেকে চাষ সম্ভব হবে। তাহলে তো কিছু বছর ক্ষেতগুলো ভালো ফসলও দেবে। তাই ক্ষেত নিলাম হতে দিতে তারা চায় না। আশায় আশায় পেরিয়ে যায় বছরের পর বছর। নিরাশ হয় না সে। আসলে ওদের বুকে যত সাহস থাকে তত মুনিঋষি বা পয়গম্বর, আউলিয়াদের বুকেও বোধহয় থাকে না। এক’দু বছর বা এক’দু বার ক্ষতি হলে ব্যাপারিরা দেউলিয়া হতে থাকে। অথচ লাগাতার পাঁচ, সাত বা দশ বছর ফসল নষ্ট হয়, মজুরি, বীজ ও অন্যান্য খরচ বর্বাদ হয়। তবুও মরশুম এলেই তারা আবার চাষে ব্যস্ত হয়। বিশেষত্ব এটাই যে এত কিছুর পরেও, এভাবে সর্বস্বান্ত হওয়ার পরেও কৃষক সরকার বা অন্য কাউকে অপরাধী ঠাউরায় না। শুধু নিজের ভাগ্য এবং পূর্বজন্মের কর্মকে দোষ দিয়েই সন্তুষ্ট হয়।

এও বলা হল আমায় যে যাদের অন্যান্য জমিজায়গা আছে তারা সেই জমিতে অন্ন ফলিয়ে এই জলভরা জমির খাজনা আদায় জরে। এমন অনেক কৃষকের নামও বলা হল আমায়। এও জানলাম যে যদি কৃষক ওই জলভরাজমির জলে মাছ ধরে কোনোভাবে নিজের জীবিকা চালাতে চায় তাহলে জমিদারকে আলাদা করে জল-কর দিতে হয়। কী দারূণ! কাটা ঘায়ে নুন ছড়ানো ছাড়া আর কিই বা বলা যায় একে। ফলন হয় না। তবু খাজনা দিতে হয়। আর যদি সেই জমির জলে জন্ম নিতে থাকা মাছ কৃষকও ধরে, বা সেই জলে মাখানার চাষ করে তাহলে আলাদা করে জল-কর আদায় করা হয়। কদ্দিন চলবে এই অন্ধকারের রাজত্ব? ওই অত্যাচারিতদের অবস্থা কখনো কি ভালো হবে না? যারা ভেবে রেখেছে যে ওরা এই ভাবেই অন্নদাতা কৃষকদের শিকার করতে থাকবে তারা ভুলে গেছে যে সেদিন দূরে নেই যেদিন ওদের পাপের হাঁড়ি ভাঙবে – ওদের পাপ ওদেরই মাথায় চড়ে নাচবে।

যাহোক আমরা কৃষকদের যতটা সম্ভব আশ্বস্ত করলাম আর ওখান থেকে আবার ওই একই ডিঙিতে চড়ে রওনা হয়ে গেলাম। পরের দিন আমাদের প্রোগ্রাম কোনো অন্য জায়গায় ছিল। বোধহয় চৌধুরি বক্তিয়ারপুরের জমিদারিতে মিটিং করার ছিল যেখানে আমাদের ওপর ১৪৪ ধারায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা ছিল। পাটনায় পৌঁছে আমরা খবরের কাগজে ওখানকার সমস্ত বিবরণ ছাপিয়ে দিলাম।

১৫

ভাগলপুর জেলারই আরো একটি মনে রাখার মত সফর। সেও ওই কোশি এলাকার। কোশির স্রোত বার বার বদলে যাওয়ায় ভাগলপুর আর পুর্ণিয়া জেলার মাঝে অনেকটা জমি জঙ্গলে ঘিরে থাকে। কিন্তু মাঝে মাঝে চাষ হয়। ওটাকেই কোশির দিয়ারা বলা হয়। রাজস্থানের অসীম মরুভূমির মত অবস্থা। চলতে থাকুন, কিন্তু শেষ হবেনা। ওই দিয়ারাতে কদোয়া নামের একটা গ্রাম বা গ্রামের সমূহ আছে। দশ, দশ, কুড়ি, কুড়ি বা কখনো তার থেকেও বেশি কুঁড়ে নিয়ে অনেক অনেক টোলার বাস। মাইলের পর মাইল চলে যান। কিন্তু একটাই গ্রাম পাবেন। নদীদের সরে যাওয়ায় যে নতুন জমি তৈরি হয় সেগুলোই দিয়ারার জমি। সে ধরণের জমিতে জনবসতের এই অবস্থা সর্বত্র দেখা যায়। লাগাতার মাইলের পর মাইল লম্বা গ্রাম আর কোথাও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। চাষের কাজ সহজে করতে দু’একটা কুঁড়ে দাঁড় করিয়ে নিল, ব্যস, কাজ শুরু হয়ে গেল। আবার কিছুটা দূরে সরে গিয়ে আরো কয়েকটা চালা তুলে নিল এবং তার চারপাশে চাষ শুরু হল। এভাবেই গ্রাম তৈরি হয়। কদোয়াও এমনই একটা গ্রাম।

ভাগলপুরের জেলার উত্তর ভাগে শ্রী নাগেশ্বর সেন একজন শক্তসমর্থ যুবক এবং নিষ্ঠাবান কৃষক-সেবক। সে সময় কদোয়া ওনারই কর্মক্ষেত্র ছিল। উনিই ওখানে মিটিংএর ব্যবস্থা করেছিলেন। ওনারই অনুরোধে এবং আগ্রহে আমরাও ওখানে যাওয়ার স্বীকৃতি দিয়েছিলাম। কিন্তু আমরা জানতাম না যে কদোয়া গ্রামটা পড়ে কোনদিকে আর কোন রাস্তা দিয়ে কিভাবে ওখানে পৌঁছোব। এটুকু জানতাম যে কোশির দিয়ারায় কোথাও আছে। যতক্ষণ রওনা হইনি ততক্ষণ জানতাম যে গরুর গাড়ির রাস্তায় কোথাও পড়বে। কিন্তু যখন মিটিংএর আগের দিন নওগাছিয়া থেকে রওনা হওয়ার যোগাড়যন্তর শুরু হল আর বলা হল নৌকোয় করে যেতে হবে রাতভর, তখন গিয়ে আন্দাজ করতে পারলাম যে দুর্গম হবে সফর।

সন্ধ্যের সময় ছিল। মেঘ ছিল আকাশে। দু’এক ফোঁটা বৃষ্টিও হচ্ছিল, যদিও সেই টিপ টিপ। নওগাছিয়া স্টেশনের কাছেই নদীর যে ধারাটি আছে, তাতেই একটি নৌকো তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছিল। বলা হয় যে এই ধারাটা তেমন স্রোতস্বিনী নয়। কিন্তু বর্ষাকালে তো রূপ তার বিকট হয়েই ছিল। নৌকোর ওপরে ছাউনিও ছিল যাতে বৃষ্টি পড়লে জামাকাপড় বাঁচান যায়। ছোটো ডিঙি ছিল যাতে খুব বেশি হলে পাঁচ-দশজন যেতে পারতাম। তার বেশি লোক হলে ডুবেও যেতে পারে। বলা হয় যে স্রোতে কুমির ইত্যাদি বিপজ্জনক জন্তুজানোয়ারও অনেক। তাই নৌকোয় বসেও লোকে সাবধানে সফর করে। কে জানে, কোথাও নৌকো ফেঁসে গেলে হিংস্র জলচরেরাই আক্রমণ করতে পারে! তার ওপর রাতের সময়। বর্ষাকাল। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তার বিপদের আভাস দিচ্ছিল। মোদ্দা কথা এই যে যাত্রীদের দমে যাওয়ার সব উপকরণ মজুত ছিল পথে।

হলও তেমনটাই। নাগেশ্বর সেন তো সাথে ছিলেনই না। উনি তো কদোয়াতেই সভার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু আর সব সঙ্গীরা, যাদের সেখানে যাওয়ার ছিল, তাদের মধ্যে একজন ছাড়া বাকি সবাই দমে গেল। জেনেশুনে মৃত্যুমুখে কে যায়? যদি রাতে তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়ে যায় আর নৌকো ডুবে যাওয়ার পরিস্থিতি হয়? সত্যিই হলও তাই আর অনেক বার নৌকো তীরে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাতে হল। কিন্তু সঙ্গীরা তো হিসেব কষছিলেন যে সোজা কুমিরের মুখে যেতে হবে; হ্যাঁ মুখে বলছিলেন না। ভিন্ন ভিন্ন অজুহাত দিচ্ছিলেন – ‘অসময়’, ‘খারাপ আবহাওয়া’, ‘কে জানে রাস্তায় কি হয়’, ‘বৃষ্টির জন্য মিটিংও বোধহয় হবেই না’, ‘হলেও বেশি কৃষক আসবে না হয়ত’ ইত্যাদি। না যেতে চাওয়ার এই অজুহাতগুলো যেমন যেমন শুনছিলাম আমার রাগ হচ্ছিল আর ভয়ও হচ্ছিল যে যদি সত্যিই এরা শেষ অব্দি না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে খুব খারাপ হবে। আমার প্রোগ্রাম আর সেটা পুরো হবে না? আমি ওই ভাবনাটা আনতেও চাইছিলাম না তাই সঙ্গীদের এই কাপুরুষতায় ভিতরে ভিতরে মনঃক্ষুন্নও হচ্ছিলাম আবার ওদের ওপর করুণাও হচ্ছিল। সবাই তো কৃষক-সেবক। তাও পুরোনো। কিন্তু ঠিক পরীক্ষার সময় সেবায় ফেল করছিল।

রেলগাড়ি, মোটর বা অন্যান্য সওয়ারিতে সম্মানের সাথে পৌঁছে ফুলের মালা পরা, নেতা হওয়া, পুজো নেওয়া, গরম গরম লেকচার ঝাড়া এসব কে কৃষক-সেবা বলে না। এ তো দোকানদারিও হতে পারে সেবাও হতে পারে। এতে কৃষকেরা প্রতারিত হতে পারে। দশ-কুড়ি মাইল হেঁটে, জলকাদার সাথে কুস্তি লড়ে, প্রাণ হাতে করে, ছুটে বেরিয়ে আর খিদেপেটে থেকেও যখন নিজের প্রোগ্রাম পুরো করে সেবক, কৃষকের উৎসাহ বাড়ায়, তাদের সংগ্রাম সঞ্চালন করে এবং তাদেরকে পথ দেখায় তখন তাকে কৃষক-সেবা বলা যায়। এটাই সে সেবার অগ্নিপরীক্ষা। এ পরীক্ষায় বার বার উত্তীর্ণ হতে পারলেই কেউ কৃষক-সেবক হওয়ার অধিকার অর্জন করে। দূর দূরান্তের গ্রাম থেকে নিজেদের কাজকর্ম ছেড়ে কৃষকেরা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে, রোদ্দুরে পুড়তে পুড়তে অথবা শীতে কাঁপতে কাঁপতে এই আশায় মিটিংএ এল যে নিজের কিছু কাজের কথা শুনবে, অন্ধকারে নিজের পথ দেখবে। কিন্তু কথাগুলো বলার আর পথ দেখাবার নেতাই গরহাজির! সে নিজের মনে গরহাজির থাকার কারণটা পাকাপোক্ত করে নিল যে সওয়ারি পাওয়া গেল না, আবহাওয়া খারাপ ছিল ইত্যাদি। কিন্তু কৃষক তার কী জানে? তাকে কে বলেছিল যে আবহাওয়া খারাপ থাকলে সভা হবে না অথবা ওকেই (প্রত্যেক কৃষককে) সওয়ারির ব্যবস্থা করতে হবে? এ কথাগুলো তো জেনেশুনেই ওদেরকে বলা হয় না। শুধু অন্ন-জল আর পয়সা চাওয়া হয় সভার কাজে আর গরীবেরা, এমনকি নিজে ভুখা থেকে গেলেও, আনন্দের সাথে তা দিয়েও দেয়। এমত অবস্থায় ওদের নিরাশ করার বা মিটিংএ ঠিক পৌঁছোবার বেলায় গরহাজির হয়ে যাওয়ার অধিকার কি কোনো কৃষকনেতার বা কৃষক-সেবকের থাকে? এমন করা শুধু দায়িত্বজ্ঞানশূণ্যতা নয় কৃষকস্বার্থের প্রতি অসাধুতা। এমন করলে কৃষকও আন্দোলন স্রেফ দোকানদারিতে পর্যবসিত হয়।

কিন্তু আমাদের এসব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হলনা এবং শেষে সিদ্ধান্ত হল যে হোক না হোক, যেতে আমাদের হবেই। শুনে এমন আনন্দ হল যে কী বলব! নৌকো রওনা হল। কথা বলতে বলতে, কখনো জেগে কখনো ঘুমিয়ে আমরা সেই কয়লা থেকেও বেশি কালো রাতে, নদীর ভয়ঙ্কর স্রোতে নৌকোয় বসে এগিয়ে চলেছিলাম। আগেই বলেছি যে পথে অনেক বার নৌকো তীরে টেনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাতে হয়েছিল। বলা সম্ভব নয় যে আমরা কত মাইল গিয়েছিলাম। কিন্তু যখন সকাল হল তখন জানলাম যে আরো অনেকটা যেতে হবে। আরো সমস্যা ছিল যে পথে কয়েকটি করে স্রোত পাচ্ছিলাম আর কোনটা কদোয়া পৌছোবে বোঝা মুশকিল হচ্ছিল। তবুও যেমন-তেমন করে আমরা ঠিক পথেই এগোতে থাকলাম। জন্তুজানোয়ারের দেখা তো একটাও পেলাম না। কিন্তু পথে অনেকবার এমন হল যে নদীতে জল একেবারেই কম ছিল আর আমাদের ছোটো নৌকোও মাটিতে বসে যাচ্ছিল। তখন আর আগোয় কী করে? প্রতিবার আমরা নেমে পড়ছিলাম যাতে নৌকোটা হাল্কা হয়ে একটু ওপরে উঠে যায়। তারপর সামনে পিছনে হাত লাগিয়ে ঠেলছিলাম। এটাই এই সফরের আনন্দ ছিল। ঠেলা-ঠেলি করতে করতে গন্তব্যে পৌঁছে গেল নৌকো।

একটা সমস্যা এও ছিল যে পথে গ্রাম বলতে বোধহয় একটাও পাইনি। শুধু ভুট্টার ক্ষেত দাঁড়িয়েছিল চার দিকে। হ্যাঁ, কোথাও কোথাও সে ক্ষেত পাহারা দেওয়া কৃষকদের কুঁড়েঘর ছিল। ওদের কাছেই প্রয়োজনে পথের হদিশ নিয়ে নিচ্ছিলাম। ওরাও অবাক হচ্ছিল আমাদের দেখে যে কেমন পাগলের দল – দিব্যি আনন্দে নাচতে নাচতে চলেছে। ওরা তো ভাবত যে ওদিকে ওদের মত অসুবিধে সহ্য করতে পারা লোকেরাই যায় আর আমাদের দেখে ভাবছিল সাদামাটা বাবু। বাবুদের যাওয়ার পথ ওদিকে কোথায়? তাই ওরা অবাক হচ্ছিল। ওরা কিভাবে জানবে যে আমরা বাবুদের সঠিক পথে আনার বাবু? ওরা কি করে জানবে যে বাবুরাও আমাদের দেখে ক্রুদ্ধ হয় আর ভয় পায়? ওরা তো জানত না যে আমরা জনসেবার নামে দোকানদারি খতম করার লোক। যদি ওরা জানত যে আমরা জমিদারি প্রথাকেই ওই স্রোতে ডুবিয়ে কুমিরের মুখে গুঁজে দেওয়ার লোক তাহলে বেচারারা কত খুশি হত! কেননা সবাই তো জমিদারের অত্যাচারে পীড়িত।

এই ভাবে ঘোরা পথে চক্কর কাটতে কাটতে আমরা সেখানে পৌঁছোলাম যেখানে নৌকো দাঁড় করিয়ে আমাদের হেঁটে যাওয়ার ছিল। খুশি হলাম যে যাক, এসে গেলাম। কিন্তু এখনো কয়েক মাইল হেঁটে হেঁটে ক্ষেত পার হওয়ার ছিল। ওখানেই নিত্যকর্ম, স্নান ইত্যাদি সেরে আমরা ‘কুইক মার্চ’ শুরু করলাম। দৌড়োচ্ছিলাম না তবে খুব জোরে হাঁটছিলাম। রাত ভর নৌকোয় বসে বসে এক ধরণের ক্লান্তি এসে গিয়েছিল। সেই ক্লান্তি দূর করা আর প্রাতঃভ্রমণ দুটোই উদ্দেশ্য ছিল আমাদের। তাই একটু জোরে হাঁটা জরুরি ছিল। পথে বোঝা মুশকিল ছিল যে আমরা কোন দিকে যাচ্ছি। চার দিকে শুধু ভুট্টা দাঁড়িয়েছিল। ওই এলাকায় এই ফসলটা খুব বেশি হয় আর বর্ষাকাল শুরু হতে হতেই তৈরি হয়ে যায়। যখন অন্য জায়গায় গ্রামাঞ্চলে মকায়ের ভুট্টা দেখতেও পাওয়া যায় না তখন ওখানে ফসল পেকে তৈরি হয়ে যায়।                                                          

ন’টা দশটা নাগাদ আমরা আশ্রমে পৌঁছোলাম যেখানে শ্রী নাগেশ্বর সেন সভার তৈয়ারি করে রেখেছিলেন। দেখলাম দুধ-দইয়ের পাহাড় সাজান আছে। প্রচুর লোকের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা। দূর-দূরান্ত থেকে যে কৃষকেরা আসবে তাদেরও খাওয়ানোর ব্যবস্থা ছিল। তাই এত প্রাচুর্য্য। কৃষক গরুমোষ পোষেই। একবারের দুধ দিয়ে দিল, ব্যস হয়ে গেল। গরীব আর কষ্টে পীড়িত হওয়া সত্ত্বেও কৃষক কত উদার তার অভিজ্ঞতা আমার অনেক। কিন্তু আনজান লোক ভিরমি খেয়ে যেত ওই ব্যবস্থা দেখে। হয় ভাবত যে ধনীদের সভার প্রস্তুতি, নয়ত কৃষকের উদারতাতেই মুগ্ধ হয়ে যেত।

তৃতীয় প্রহরে ওখানে বিরাট বড় মিটিং হল। জমিদারের হাতে কৃষকদের কেমন ভাবে অত্যাচারিত হতে হয় এবং তাদের বিশেষ নালিশগুলো কী, সেসব জানলাম। আমি তা থেকে নিস্তার পাওয়ার উপায় বললাম আর তারা খুশি মনে শুনতে থাকল। সভার কাজ শেষ হওয়ার পর, পরের দিন কাহারদের কাঁধে চড়ে আমি নারায়ণপুর স্টেশন অব্দি গেলাম। সেখানেই ট্রেন ধরে বিহটা ফিরলাম। সঙ্গে করে এক বস্তা ভুট্টা নিয়ে গেলাম আমার আশ্রমের ছেলেদের জন্য।

১৬

১৯৩৩ সালের জুলাই মাস ছিল। খুব সম্ভব, ১৫ই জুলাইয়ের কথা। তারিখটা এই জন্য মনে আছে যে কিসান-সভার তরফ থেকে গয়ার কৃষক-সম্পর্কিত তদন্তের কাজ আমরা প্রথম প্রথম শুরু করেছিলাম। তাও ভরা বর্ষায়। সেই তদন্তের দীর্ঘ রিপোর্ট দুই কপিতে তৈরি করতে কয়েক মাস লেগে গিয়েছিল। আসলে আমাওয়াঁ টেকারির জমিদার রাজা হরিহরপ্রসাদ নারায়ণ সিংএরই জমিদারি গয়া জেলায় চারদিকে ছড়িয়ে আছে। তাই ওনার ষাটটা গ্রামে গিয়ে ভিতরের ব্যাপারগুলোর খোঁজ করা জরুরি ছিল।  পুরো জেলার ষাটটা গ্রামে গেলে ওনার জমিদারির সব গোপন কথা বেরিয়ে আসত। তাই অতগুলো গ্রামে যেতে হয়েছিল। যখন রাজা সাহেব আমাদের রিপোর্ট চাইলেন, যাতে অবস্থা জেনে কিছু করতে পারেন, তখন বাধ্য হয়ে আমাদের দুটো কপি তৈরি করতে হল। যদিও, এই কাজে এবং পরে কথাবার্তায় যে সময় গেল তার ফল কিছুই হল না। সবচেয়ে বড় লাভ হলঃ এই পুরো ঘটনাটার অনপনেয় প্রভাব পড়ল মনে যে জমিদারি উচ্ছেদ করা ছাড়া কৃষকদের, অত্যাচার এবং বিপত্তি থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার কোনো উপায়ই নেই। আমার হৃদয়ে যে ভাবনাটা কখনো কখনো আসত যে বোধহয় গান্ধীজির কথা সত্যি এবং জমিদারেরা ভালো হয়ে যাবে, এই ঘটনার পর সেটা একদম মুছে গেল। আমি সর্বান্তঃকরণে স্বীকার করে নিলাম যে জমিদারি নামের অসুখটার কোনো চিকিৎসা নেই। “গয়ার কৃষকদের করুণ কাহিনী” নামে ওই রিপোর্টের বয়ান পরে বই করে ছাপাও হয়েছিল। এই সব কারণেই, আর এখন লিখব যে কারণগুলো সেগুলোর জন্যও, সেই বর্ষাকালের ১৫ই জুলাই এখনও ভুলিনি।

সেদিনই আমি, পন্ডিত যমুনা কার্পী, পন্ডিত যদুনন্দন শর্মা এবং ডাক্তার যুগলকিশোর সিং কৃষকদের অবস্থার তদন্ত করতে প্রাদেশিক কিসান-সভার তরফ থেকে জাহানাবাদ পৌঁছেছিলাম। পন্ডিত যদুনন্দন শর্মা গয়া জেলায় আমাদের প্রতিদিনের প্রোগ্রাম বানিয়ে দিয়েছিলেন। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বর্ষার দিনে তদন্তের কাজ, তাও আবার নিজের মত করে প্রথম, পুরো করা সহজ ছিল না। দশ মাইল, পনের মাইল বা তা থেকেও বেশি দূরত্বে আমাদের সময় মত পৌঁছোবার থাকত। নইলে তদন্ত অসম্ভব হয়ে পড়ার ভয় থাকত। এক দিনও পিছিয়ে গেলে কৃষকদের এক জায়গায় জমা করা অসম্ভব হয়ে উঠত। তদন্তের কাজের পর ওদের বড় বড় সভা করে কিছু উপদেশ দেওয়ারও দরকার পড়ত। তাই শর্মাজি এমন সুন্দর ব্যবস্থা করেছিলেন যে একদিনও আমাদের কাজে কোনো ব্যাঘাত ঘটল না। গেঁয়ো রাস্তা পার করে আমরা প্রতি দিন সময় মত সব জায়গায় পৌঁছোতে থাকলাম। এক জায়গায় আমাদের কাজ পুরো হতে না হতে দ্বিতীয় জায়গা থেকে সওয়ারি হাজির হয়ে যেত। এমনও হত যে যেখানে সওয়ারি পাওয়ার কোনো আশাই নেই আমরা হেঁটেই পৌঁছে যেতাম। তুমুল বৃষ্টির মধ্যে সওয়ারি জুটতই বা কি, আর কিভাবে? যে কাজটা বাবুয়ানি ঢঙে করে কংগ্রেসের তদন্ত কমিটি গ্রীষ্ম আর শীতেও করতে পারেনি সে কাজ আমরা মাঝবর্ষায় এত ভালো করে পুরো করলাম যে আমরা নিজেরাই বিস্মিত ছিলাম, কী করে হল! অন্যান্যরা তো কাজটা অসম্ভব ভেবেই বসে রইল।সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল যে কৃষকদের দৃঢ়তা এবং প্রস্তুতির ওপর আমাদের ভরসা হয়ে গেল, হ্যাঁ, যদি পন্ডিত যদুনন্দন শর্মার মত কর্মী ওরা পেয়ে যায়। আমরা মেনে নিলাম যে ক্ষেত্রটা তৈরি। শুধু ধনী কৃষক-সেবক এবং পথ-প্রদর্শক প্রয়োজন। আমাদের এই বিশ্বাসটা সে সময় শ্রমিকদের আকস্মিক দৃঢ়তা দেখে তৈরি হয়েছিল, তারপর থেকে লাগাতার মজবুত হয়ে চলেছে।

এটা সবাই জানে যে কিসান-সভার কাছে টাকাপয়সা ছিল না। সদ্য তো পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল। আর সত্যি এটাই যে সভার কাছে টাকাপয়সা কখনো ছিলই না যদিও কাজের সময় সভার নামে হাজার হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বস্তুতঃ, জনগণের প্রতিষ্ঠানের কাছে স্থায়ী তহবিল থাকা উচিতও নয়। মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিষ্ঠানগুলোর চিন্তা থাকে যে টাকা জমা হোক। ওদের কাজ টাকা ছাড়া চলতেই পারে না। কিন্তু বিপরীতে জনগণের প্রতিষ্ঠানের আসল তহবিল তো জনগণের ভরা বিশ্বাস এবং ভালোবাসা। আর সেটা থাকলে অন্ন-ধনের কমতি কখনো হয় না। হ্যাঁ, সেটুকুই পাওয়া যেতে থাকে যেটুকুর সময়ে সময়ে দরকার পড়ে। বেশিও নয় আর কমও নয়। ব্যস, কাজ চালানোর মত আসতে থাকে। সৎ প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই বেশি অর্থ সংগ্রহ করে না। বেশি হয়ে গেলে তার সদ্ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিছু না কিছু এমন খরচ হয়েই যায় যার কোনো প্রয়োজন ছিল না। ফল হয় যে পাপ লুকোনো যায় না আর প্রতিষ্ঠানে ঘুণ ধরে নেয়। তহবিলে পয়সা জমা থাকলে সেবার জায়গা নিয়ে নেয় মোহান্তগিরি। যে প্রতিষ্ঠানে কেবল গুণসম্পন্ন ও পরিশ্রমী লোকেরা আসত সেখানে ঘেও-কুঁড়েদের প্রবেশ ঘটতে থাকে।

আমাদের সেই তদন্তে কৃষকেরা শুধু আমাদের সওয়ারি আর খাওয়াদাওয়াই নয়, তদন্তের প্রতিটি কেন্দ্রে যথাসাধ্য টাকাপয়সারও পুরো ব্যবস্থা করত; সেটা আমরা চুপচাপ শর্মাজির জিম্মায় দিয়ে দিতাম। কখনো কখনো ট্রেনে করে যাওয়ারও সুযোগ ঘটেছিল। পাটনা থেকে তো ট্রেনে করেই গিয়েছিলাম। শহরে পৌঁছোলে সওয়ারি আর খাওয়াদাওয়ার খরচ জরুরি ছিল, তাই ওরা টাকাপয়সার ব্যবস্থা করেছিল। একটা তদন্ত শেষ করে যেই রওনা হতাম, পয়সা পেয়ে যেতাম। এটাও জানতে পারলাম যে পয়সাটা সব কৃষকদের কাছ থেকে একটু একটু করেই আদায় করা হয়েছে। তদন্তের কেন্দ্রে আমাদের খাওয়াদাওয়া এবং সওয়ারির ব্যবস্থা হওয়ার পর যা বেঁচে থাকত সেটুকুই আমরা পেতাম। সেটুকুই আমাদের প্রয়োজনে যথেষ্ট হত। তদন্তের শেষ কাজ আমরা গয়া সদর সাবডিভিজনের ফতেহপুর থানায় করেছিলাম। পুরোপুরি জংলি আর পাহাড়ি এলাকা। আমাওয়াঁ, গয়ার মোহান্ত ইত্যাদির জমিদারি। মোহান্ত তো কৃষকদের পর্যুদস্ত এবং সর্বস্বান্ত করে রেখেছিল। আমাওয়াঁর অত্যাচারও কম নয়। পিছিয়ে থাকা এলাকায় অত্যাচার এমনিতেই একটু বেশি হয়। কিন্তু আমরা জেনে অবাক হলাম যে এখানেও আমাদের খরচের জন্য অনেক পয়সা আদায় হয়ে গেছে। আসলে ওখানেই আমরা প্রথম জানতে পারলাম যে প্রত্যেক জায়গায় কৃষক তদন্তের পর শর্মাজিকে পয়সা দিয়ে গেছে। একটাও তদন্ত-কেন্দ্র বাদ যায়নি।

বাইরের দুনিয়ায় লোকে বোধহয় বিশ্বাস করবে না এবং অবাক হবে যে কিসান-সভার শুরুর দিনগুলোয় কিকরে এসব হল। কিন্তু আমি বিহার প্রাদেশিক কিসান সভার বিষয়ে পাকাপাকি ভাবে বলতে পারি যে খুব বেশি হলে সব মিলিয়ে দু’একশ টাকা আজ অব্দি আমরা আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে পেয়ে হব, তাও একবারে নয়, দশ-বিশ করে। সবচেয়ে বেশি পঞ্চাশ টাকা একজন একবার দিয়েছিল, তাও ১৯৩৩ সালের শুরুতে, ইউনাইটেড পার্টির ঝামেলার সময়। কিন্তু আজ অব্দি আমাদের সভা লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে হবে। শুধু আমার সফরেই, যা মাসে পঁচিশ দিন তো হয়েই যায়, কখনো কখনো বেশিও হয়, বছরে কমসে কম পাঁচ ছয় হাজার টাকা তো খরচ হয়েই যায়। এরকমই প্রায় দশ বছর ধরে চলছে। যে আমাকে ডাকছে সেই আমার রাহাখরচের ব্যবস্থা করবে এটাই সাধারণ নিয়ম। আন্দাজে ততটা পয়সা হয় আমায় আগেই পাঠিয়ে দেওয়া হয় অথবা ওখানে পৌঁছোলে পেয়ে যাই। ওখানকার লোকেরা জিজ্ঞেস করে নেয় যে খরচপাতি কত হবে। আমিও যত হলে কাজ চলে, বলে দিই। কখনো দু’চার টাকা বেশিও পেয়ে যাই যখন ওরা কিছুই জিজ্ঞেস করে না। অন্য প্রদেশে সফরের বেলায়ও তাই হয়। ফলে, ‘কুঁয়ো খোঁড়ো আর জল খাও’এর নীতিটাই আমার নীতি। বেশি হজমও হয় না আর কাজও আটকায় না। যদি কিছু বাঁচে তো বছরে ওই দশ-বিশ টাকাই, তাও দু’এক টাকা করে জমে। ভালোই, “না বাসি জমে না কুকুরে খায়”! এখন তো এটা সবাই জানে যে আমার সফরের খরচ কৃষকদেরই করতে হয়। তাই আগে থেকেই তারা জমা করে রাখে। হ্যাঁ, জমিদারেরা এবং তাদের বন্ধুরা বোধহয় এটা জানে না। কিন্তু তাতে আমার কি আসে যায়! ওরা আমার খরচের বিষয়ে আন্দাজ করতে থাকুক যে কে দেয়। যে কৃষকও ওদেরকে এবং সারা দুনিয়াকে দেয় সে আমায় কেন দেবে না যদি আমি ওদের কাজ করতে যাই? ওদের প্রত্যয় থাকতে হবে যে আমি ওদের জন্য মরি না ওদের শত্রুদের জন্য, আর আমার দৃঢ় বিশ্বাস সে প্রত্যয় ওদের আছে। তাহলে আর কি চাই? আর যদি আমি কৃষকদের কাছ থেকে পাওয়ার আশা ছেড়ে পয়সার জন্য অন্যদের মুখাপেক্ষী হই, যারা প্রায়শ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষকদের শত্রু হতে পারে, তাহলে আমার মত দাগাবাজ আর পাপী কে হবে? যদি কিসান-সভাও এমনটাই করে তাহলে সে কৃষকদের সভা কিছুতেই হতে পারে না, এটা আমি মানি।

হ্যাঁ, তো জাহানাবাদ থেকে প্রথম দিন আমাদের আলগানা এবং দ্বিতীয় দিন ধনগাঁওয়া যাওয়ার ছিল। এ দুটো গ্রাম জাহানাবাদের উত্তর-পূর্বে এবং পূর্বে পড়ে। কখনো সবুজ ছিল। এখন উজাড়। ওই গ্রামগুলোর তদন্ত করে যা জেনেছিলাম তার বর্ণনা এখানে করব না। অন্যান্য গ্রামেরও না। “গয়ার কৃষকদের করুণ কাহিনী”তে সব লেখা আছে। কিন্তু দু’একটি ঘটনা এমন যা এখানে লেখা উচিৎ। বলা হয় যে জীব একে অন্যকে খেয়েই বাঁচতে পারে – জীবো জীবস্য জীবনম্‌।” আলগানায় টেকারির জমিদারির এক পাটোয়ারির দেখা পেলাম। ইনি খাজনা আদায়ের সময় কৃষকদের সাথে অত্যন্ত কঠোর ব্যহার করতেন। কিন্তু মানতে রাজি হচ্ছিলেন না। এক দিন কথায় কথায় বলে উঠলেন যে উনি টেকারির জমিদারিতেই অন্য কোনো মৌজায় থাকেন। বকায়া খাজনা দিতে জমি নিলাম হয়ে গেল তাই ওখানে চাকরি করতে শুরু করলেন। জিজ্ঞেস করায় এটাও কবুল করলেন যে এক তো খাজনা বেশি, দ্বিতীয়তঃ ফসল নষ্ট হয়েছে লাগাতার। তাই চোকাতে পারেননি র জমি নিলাম হয়ে গেছে। কিন্তু আলগানাতে ইনি নিজে অন্যের জমি নিলামে চড়ানোয় উদ্যোগী ছিলেন এবং এভাবে নিজের জীবিকা চালাতেন। আসলে জমিদারির মেশিনটায় তেলের কাজ তো সবহারা কৃষকেরাই করে। তারাই এটাকে চালায়। তার প্রত্যক্ষ নিদর্শন পেলাম পাটোয়ারি সাহেব। তাই জেনেশুনে কৃষকদের বর্বাদ করা হয়। নইলে জমিদারের চাকরি কে করত? তাও আবার দশ-পাঁচ টাকা মাইনেয়? কৃষকদের রক্তেই জমিদারির চারা বড় হয় আর ফলেফুলে ভরে!

ধনগাঁওয়ায় আমরা জানতে পারলাম যে তরিতরকারির ক্ষেতে জল দেওয়ার জন্য পুরোনো জমানায় জমিদার যে চারটে কুঁয়ো তৈরি করিয়েছিল সেগুলো নষ্ট হয়ে গেছে আর মেরামতও হয়নি। দ্বিতীয়তঃ,ভোটের সময় যদি জমিদারের তহশিলদার বা সার্কেল অফিসার প্রার্থী হয় তাহলে মাগনায় তরিতরকারি উঠিয়ে ভোটারদের খাওয়াতে নিয়ে যায়। কেননা ধনগাঁওয়া জাহানাবাদের কাছে। পরিস্থিতির কাছে হার স্বীকার করে কোইরিরা তরিতরকারির চাষই বন্ধ করে দিয়েছে। এখন সবাই শুধু ধানের চাষ করে। সে চাষও কখনো নষ্ট হয় কখনো কিছুটা দাঁড়ায়। কেননা নদীর বাঁধ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় জল না পেয়ে ফসল মরে যায়। জমিদার বাঁধের মেরামত করায় না আর দশ-পাঁচ হাজার টাকা লাগানো কৃষকদের পক্ষে সম্ভব নয়।

আমাদের মাঝিয়াওয়াঁ যাওয়ার ছিল। রাতে মহমদপুরে থেকেছিলাম – সেই মহমদপুর যেখানে পরে গিয়ে কৃষকেরা নিজেদের সংগঠন এবং দৃপ্ত প্রতিরোধের জোরে জমিদারদের নাস্তানাবুদ করেছিল এবং পুরো আশি বিঘা নিলামে চড়ানো জমিতে কৃষকদেরই চাষ করতে দিতে হয়েছিল। কেননা নিলামির পর যা কান্ডগুলো হয়েছিল তাতে জমিদারদের দানটাই উল্টো পড়েছিল এবং বড় লোকসান সইতে হয়েছিল। যখন কৃষকেরা নিজেদের দৃঢ়তায় জমিদারদের মদগর্ব গুঁড়িয়ে দিল তখন আর তারা কি করত? এর পুরো বৃত্তান্ত পাওয়া যাবে ‘কৃষক কিভাবে লড়ে’ নামের বইটিতে। রাতে খুব বৃষ্টি হয়েছিল এবং সকালেও হচ্ছিল। মাঝিয়াওয়াঁর দূরত্ব আট ন মাইলের কম ছিল না, তাও বৃষ্টির মধ্যে, গ্রামের লোক তো এই কাছেই বলে খালাস। সওয়ারির ব্যবস্থা অসম্ভব ছিল। জলে হতই বা কি? ওখানকার মাটি পলিমাটি (কালো-চিকন)। এত শক্ত যে দেখতে দেখতে পা পিছলে যায়। কোথাও কোথাও আবার এত নরম যে পা ছাড়তেই চায় না। হাঁটু অব্দি লেপটে দেয়। রাস্তায় একটা গভীর নালাও পড়ে। কিন্তু আমাদের তো প্রোগ্রাম পুরো করার ছিল। তবুও বলব যে মাঝিয়াওয়াঁ বড়ই অত্যাচার-পীড়িত। আমাওয়াঁর রাজা জায়গাটাকে জ্বালিয়ে দিয়েছে। হালফিলে বকাশ্তের লড়াইয়ের পর কিছুটা সামলে উঠতে শুরু করেছে। এই গ্রামই পন্ডিত যদুনন্দন শর্মাকে জন্ম দিয়েছে। সে সময় লাখ লাখ টাকা খাজনা বাকি ছিল বলা হত।

এমন গ্রামে যদি না যেতাম তাহলে সব মাটি হয়ে যেত। শিগগিরই ওখানে কেউ পৌঁছোতোও না। রাস্তাটাই এমন। তাই আমরা সাহস করে রওনা দিলাম। লাফ-ঝাঁপ দিতে দিতে, পড়তে পড়তে এগোচ্ছিলাম। রাস্তা সত্যিই ভয়বহ ছিল। সেদিন আমাদের অগ্নি-পরীক্ষা ছিল। ফেল হলে মুখ দেখাতে পারতাম না। ১৯৩৯ সালের বর্ষাকালে মাঝিয়াওয়াঁ যে বীরত্ব দেখিয়েছিল বকাস্তের লড়াইয়ে, বিশেষ করে ওখানকার নারীরা যে দৃঢ়তার সাথে লড়ে জয়লাভ করেছিল তার বীজ আমরা বপন করেছিলাম ১৯৩৩ সালের বর্ষায়, সেই তদন্ত-সফরের সময়। সেই বীজই ছয় বছরে পুষ্পিত-পল্লবিত হয়ে উঠল। তাই এটা স্পষ্ট যে সেদিন না গেলে কাজ পন্ড হত। তাই আমরা আনন্দে রওনা হয়েছিলাম। প্রশংসার কথা যে আমাদের মধ্যে কাউকে দোনামনা করতে দেখলাম না। সবাই উৎসাহের সাথে এগোতেই চাইছিল। নইলে সফরটা মাটি হয়ে যেত। এমন সময় দ্বিধায় কাজ নষ্ট হয়।

ফল হল যে দুপুরের আগেই আমরা মাঝিয়াওয়াঁ ঠাকুরবাড়ি পৌঁছে গেলাম। লোকে হতাশ ছিল যে আমরা পৌঁছোতে পারব না। কিন্তু আমাদের দেখে কৃষকদের মনে বিদ্যুৎ খেলে গেল। যে কাজ আমাদের হাজারটা লেকচারে আর উপদেশে হতনা সে কাজ আমাদের সাহস করে দিল। একেই বলে মৌন বা রূপায়িত উপদেশ। ‘বলে শোনাই না করে দেখাই’ এর মধ্যে ‘করে দেখাই’ এরই নাম।

মাঝিয়াওয়াঁর কৃষকদের যে দারিদ্র্য আমরা প্রথম-প্রথম দেখলাম তা ভোলার মত নয়। জমিদার কেমন নির্মম এবং পাষাণ-হৃদয় হতে পারে, তার ছবি প্রথম প্রথম চাক্ষুষ দেখলাম ওখানেই। বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে আমরা ওদের অবস্থা দেখলাম, শোণিতাশ্রু বর্ষণ করলাম এবং বুক ভরে অভিশাপ দিলাম জমিদারিকে।

১৭

১৯৩৮ সালের বর্ষাকাল পেরিয়ে গিয়েছিল। আশ্বিন বা কার্তিকের মাস হবে। তখনো অব্দি গ্রামের রাস্তাগুলোর মেরামত হতে পারে নি। কৃষকও রবির ফসল বুনতে ব্যস্ত ছিল। রাস্তায় কাদা আর জলের কমতি ছিলনা। ঠিক সেই সময় বিশ্বনাথ প্রসাদ মর্দানা বালিয়া জেলায় আমার সফরের প্রোগ্রাম তৈরি করল। যুক্ত প্রদেশের কয়েকটি জেলায় আমার সফর করার ছিল। শ্রী হর্ষদেব মালবীয় (এলাহাবাদ) তার ব্যবস্থা করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশতঃ বলুন বা সৌভাগ্যবশতঃ, বালিয়া জেলার জন্য মাত্র একদিনের সময় পেয়েছিলাম আর মর্দানা ওই এক দিনেই, এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে তিন-চারটে মিটিংএর ব্যবস্থা করেছিল। মোটরে করে যাওয়ার ছিল। কিন্তু রাস্তাগুলো না তো মোটরের আয়ত্তে ছিল না মর্দানার কব্জায়। ওই রাস্তাগুলোর ওপর ভরসা করে চারটে মিটিংএর ব্যবস্থা করা মানে বিপদকে ডেকে আনা। হলও তাই। কিন্তু মর্দানা তো মর্দানাই বটে। যথেষ্ট উৎসাহ আর সাহস। বয়স কম বলে বিপদের কথা কম চিন্তা করেন। যা হবে দেখা যাবে ধরণের ভাবনাটাই মাথায় কাজ করে। তাই বিপদের সাথে খেলা করতে আনন্দ পান। আমাদের কর্মীদের মধ্যে সাধারণতঃ দায়িত্বজ্ঞানের ততটা চিন্তা নেই যতটা থাকা উচিৎ, আর আন্দোলনের পক্ষে এটা খুবই খারাপ। গ্রামাঞ্চলে সভার ব্যবস্থা করার ব্যাপারে যাদেরকে খুব বড় এবং দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন কর্মী মনে করা হয় তাদের বিপজ্জনক দায়িত্বজ্ঞানশূন্যতা দেখে আমায় স্তম্ভিত হতে হয়েছে, তাও বার বার। এটা আমাদের খুব বড় দুর্বলতা যেটা মাঝেমাঝেই আমায় ভাবিয়ে তোলে।

হ্যাঁ, তো বালিয়া স্টেশনে মাঝরাতের পরেই আমরা নামলাম এবং ওয়েটিং রুমে থেকে গেলাম। সকালেই খাওয়াদাওয়া করে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি ছিল। একটাই মোটরগাড়ি। ওতেই যতজন সওয়ার হতে পারতাম হয়ে রওনা হয়ে গেলাম। রেওয়তি, সাহাতওয়ার, বাঁসডিহ এবং মানিয়ার এই চার জায়গায় সভা করে পরের দিন সকাল হওয়ার আগেই, প্রায় রাত দুটোয় বেলথরা রোড স্টেশনে পৌঁছে বস্তি যাওয়ার ট্রেন ধরার ছিল। জেলার পূর্ব প্রান্তের কাছে পৌঁছে প্রথম মিটিং এবং পশ্চিমোত্তর প্রান্তে পৌঁছে ট্রেন ধরার। রাস্তা সবকটা কাঁচা, শুধু প্রথমে কিছুটা পাকা পেলাম। বৃষ্টিতে সে রাস্তার এমন হাল করেছিল ভর রাস্তা গাড়ি লাফিয়ে লাফিয়ে চলল। আমি তো অবাক হলাম গাড়িটার মজবুতিতে – ভাঙল না, শেষ অব্দি চালু রইল।

দুপুর নাগাদ আমরা রেওয়তি পৌঁছোলাম। একটা বাগানে মিটিংএর ব্যবস্থা ছিল। পাশে এক ডেপুটি সাহেবের ক্যাম্প ছিল। বোধহয় তকাভি বা সে ধরণের কোনো ঋণ বিতরণ করছিলেন গরীব কৃষকদেরকে। কিন্তু তিনি কৃপা করলেন এবং আমাদের মিটিংএ কোনো বাধা এলনা। আমরা নিজেদের কথা কৃষকদেরকে বললাম এবং বাঁসডিহের পথে এগিয়ে গেলাম। পথেই পড়ল সাহাতওয়ার গ্রাম। যাওয়ার সময়েও পড়েছিল এবং ওখানকার মানুষেরা মনস্থির করে নিয়েছিল যে আমাদের থামাবে। ফেরার সময় থামতে বাধ্য হলাম। গ্রামাঞ্চলের ভালো বাজার জায়গাটা। লোক জমা হয়ে গেল। অন্য গ্রামের লোকেরাও ছিল। গাছগাছালির মাঝে, বোধহয় কোনো মন্দিরের, একটা উঁচু পাকা জায়গায় আমরা ওদেরকে ওদের কর্তব্য বোঝালাম এবং কৃষকদের জন্য কী করা জরুরি সেটা বললাম। ফের তক্ষুনি বাঁসডিহের রাস্তা ধরলাম।

বাঁসডিহে বড় প্রস্তুতি ছিল। কোঠাবাড়িতে থাকার ব্যবস্থা ছিল। অনেক মানুষ ওখানেই জমা হয়ে গেল। তাদের সাথে কথাবার্তা চলতে থাকল। তারপর নিচে ভিড় হল খুব। বাধ্য হয়ে আমাদের কোঠাবাড়ির ছাতের ধারে দাঁড়িয়ে উপদেশ দিতে হল যাতে নিচে এবং উপরে সবাই ভালো করে শুনতে পারে। অন্য জায়গায় যেতে দেরি হত আর আমাদের তখনই মানিয়ার যাওয়ার ছিল। মানিয়ার ওখান থেকে বেশ দূরে। তাই কোঠা থেকেই উপদেশ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ওখানকার কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করে আমরা চটপট মানিয়ারের জন্য রওনা হয়ে গেলাম। আসলে সবচেয়ে বড় আর প্রস্তুতি নিয়ে আয়োজন করা সভা মানিয়ারেই হওয়ার ছিল। মনে শান্তি ছিল যে সভাটা রাতে হুওয়ার। দিনের বেলায় হওয়ার থাকলে আমরা পৌঁছোতেই পারতাম না। পৌঁছোতে পৌঁছোতেই তো অন্ধকার হয়ে গেল। মর্দানা রাতের সভার ব্যবস্থা করে অবশ্যই দূরদৃষ্টি এবং দায়িত্বজ্ঞানের পরিচয় দিয়েছিল।

নিঃসন্দেহে আশাতীত সভা হল ওখানে। সভাস্থলের আয়োজন ইত্যাদি তো দেখলামই। তবুও তাতে খুব বেশি আকৃষ্ট হলাম না। হ্যাঁ, যখন দেখলাম শ’য়ে শ’য়ে কিসান-সেবক (ভলান্টিয়ার) উর্দি পরে এবং হাতে লাঠি নিয়ে চারদিকে তৈরি এবং ভিড়কে নিয়ন্ত্রণে রাখছে, তখন দারুণ আনন্দ হল। মিটিংএর ব্যবস্থাপনা, কথা রাখার ধরণ সবকিছুই প্রশংসনীয় ছিল। কয়েক ঘন্টা ধরে আমরা কথা বললাম এবং কৃষকদের সমস্যাবলী খোলাখুলিভাবে জনতার সামনে রাখলাম। আসলে সেদিনকার চারটে মিটিংএর প্রথমটায় তাড়াহুড়ো সত্ত্বেও ভালো করে বলতে পেরেছিলাম। কিন্তু মানিয়ারে তো আমি নিশ্চিন্ত হয়ে বলে চললাম। শ্রোতারাও এমন শান্ত ছিল যেন আমাদের কথা আনন্দের সাথে পান করছে। কংগ্রেসি মন্ত্রিসভার যুগেও কৃষকদের কষ্ট আগের মতই রয়ে গেল এটা দেখে মানুষজন ক্ষুব্ধ ছিল ভীষণ। আসল ব্যাপারটা মানুষে বুঝতে শুরু করেছিল। এবার আর কথায় নয়, কাজ দিয়ে লোকে মন্ত্রীদের পরীক্ষা করছিল এবং স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল যে তাদের কথাগুলো বুকনিবাজি। তাই আমার মুখে তার রহস্য শুনতে এবং বুঝতে তাদের ভালো লাগছিল। কিসান-সভার প্রয়োজন এবার ওরা বুঝতে পারছিল।

যাহোক, সভা তো শেষ হল এবং আমরা থাকার জায়গায় এলাম। আমি দুধ খেলাম এবং সঙ্গিরা খাবার খেল। এসবেই রাত দশটা-এগারটা বেজে গেল। রোনা হওয়ার তাড়া ছিল। বস্তী জেলার প্রোগ্রাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আসলে ওখানে প্রথমবার আমরা যাচ্ছিলাম। বালিয়ায় তো আগেও কয়েকবার এসেছি। তাও এক ক্রুর জমিদারির কৃষকদের জমায়েত ছিল। তাই ট্রেন ধরা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তিত ছিলাম। কিন্তু মোটরগাড়ি আছে বলে সঙ্গিরা একটু বরং নিশ্চিন্তই ছিল। ফলে, খেয়েদেয়ে রওনা হয়ে গেলাম। মোটর পশ্চিমের দিকে এগোল। হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেলাম যে সরযু নদীর বন্যা মানুষজনের ঘরবাড়ি এবং ফসল বরবাদ করে দিয়েছিল। রাস্তাঘাটেরও বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিল। পথে বরবাদ হয়ে যাওয়া গ্রাম আর ঘরবাড়ি দেখতে দেখতে এগোচ্ছিলাম। লোকেরা বাইরে বেরিয়ে এসে আমাদের অভিবাদন করছিল। আমাদের আসার খবর তো পৌঁছেইছিল ওদের কানে। আবার কিছু মানুষ সভা থেকেই ফেরত এসেছিল। এভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ খবর এল যে সামনে রাস্তা ভাঙা। মোটরগাড়ি ‘পাস’ করতে পারবে না। যদি পাশ দিয়ে যেতে পারেন তো যান। কিন্তু ঠিকঠাক রাস্তা বলার কেউ ছিল না। ব্যস, শুনি আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। মনে হল কিছু একটা ঝামেলা হবে। বুকটা ধক ধক করছিল।

মোটরগাড়ি রাস্তা ছেড়ে ক্ষেত ধরে এগিয়ে চলল। ড্রাইভার আন্দাজেই চালাচ্ছিল। এক তো রাত, দ্বিতীয়ত আনজান রাস্তা, তৃতীয়ত মোটরগাড়ি আর ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে তার চলা। বিস্ময়কর ঘটনাবলি! আমরা সত্যিই সেদিন মৃত্যুর সাথে খেলছিলাম। ক্ষেতে, ক্ষেতে ঘুরে, বাগান হয়ে মোটরটা ধীরে ধীরে এই আশায় এগোচ্ছিল যে সামনে আবার রাস্তা পেয়ে যাবে, এবং রাস্তাটা ঠিকঠাক থাকবে। প্রয়োজনে আমাদের মধ্যে থেকে দু’একজন নেমে এগিয়ে রাস্তার হদিশ নিয়ে আসছিল। তারপর মোটর এগোচ্ছিল। এমনভাবেই চলতে চলতে হঠাৎ আমাদের মধ্যে থেকে একজন বলে উঠল, “কুঁয়ো, কুঁয়ো!” ড্রাইভার তৎক্ষণাৎ গাড়ি থামিয়ে দিল। বস্তুতঃ ও খুব ধীরে ধীরে গাড়ি চালাচ্ছিল তাই আমরা বেঁচে গেলাম। নইলে গাড়িটাই কুঁয়োয় গিয়ে পড়ত। কুঁয়োটা বর্ষায় ঘাসে লুকিয়েছিল। ঠিক যখন কুঁয়োটার পাড়ে পৌঁছোলাম তখনই দেখতে পেলাম, আর কোনোরকমে বাঁচলাম আমরা।

আবার এগোলাম। কিন্তু রাস্তা নিখোঁজ। যদিও আমরা ভাবছিলাম যে আমরা রাস্তার কাছ দিয়েই যাচ্ছি। কিন্তু রাস্তা তখনো অব্দি পাইইনি যে রাস্তার দিকে এগোব। সর্বত্র কাদা-জলেরই দেখা পাচ্ছিলাম। এভাবে এগোতে এগোতে ঘুরপাক খাচ্ছিলাম। পরিণতি হল যে আমরা প্রথমত রাস্তা থেকে অনেক দূরে সরে গেলাম। দ্বিতীয়ত, পশ্চিম দিকে যেতে যেতে পূর্ব দিকে হয়ে গেলাম। মোটরের চক্রাকার গতির কারণে ড্রাইভারও বুঝতে পারল না আর আমরাও বুঝতে পারলামনা যে আমরা কোনদিকের বদলে কোনদিকে যাচ্ছি। এভাবে চলতে চলতে এই অবস্থা হল যে আমরা চষা ক্ষেতের ওপর দিয়ে যেতে শুরু করলাম। এটা তো পুরোপুরি আমাদের মুর্খতা ছিল। মোটরগাড়িতে চড়ে অন্ধকার রাতে রাস্তা ছেড়ে ক্ষেত হয়ে আন্দাজে অজানা দিকে যাওয়ার সাহস কে করবে? কিন্তু “আরতি করি, ভাবনা ছাড়ি” গোছের ব্যাপার ছিল। আমাদের পরের দিনের প্রোগ্রাম পুরো করার ছিল। আর মর্দানা, রাস্তার অবস্থা সঠিকভাবে না জেনে আমাদের যে এমনিই বলে দিয়েছিল যে রাস্তা ঠিক আছে, তার প্রায়শ্চিত্ত আমাদের যেমন করে হোক সময় মত বেলথরা পৌঁছে দিয়ে করতে চাইছিল। তাই সে সময় আমরা মৃত্যুকেও ভুলে গিয়েছিলাম। নইলে কুঁয়োর ঘটনাটার পর তো আমরা এমনিই থেমে যেতাম।

এরই মধ্যে হঠাৎ এক হ্রদের ধারে পৌঁছোল আমাদের মোটরগাড়ি। চষা ক্ষেতের ওপর দিয়ে চলতে চলতে আমরা বুঝতেই পারিনি কোনদিকে যাচ্ছি। ততক্ষণে জলের ধারে পৌঁছে গেছি। এটাও আন্দাজ হল যে হ্রদটা লম্বা। এবার আমরা হতাশ হয়ে গেলাম আর ঘড়ি দেখা শুরু করলাম। দেখলাম যে রাত দুটোর বেশি হয়ে গেছে। এতক্ষণ তো মাথায় ছিল যে এই ট্রেনের বাঁশি শুনতে পাব বা আসার শব্দ পাব। ভাবছিলাম যে স্টেশন কাছেই। কিন্তু এবার হতাশ হয়ে পড়লাম। পরের দিনের প্রোগ্রামটা নষ্ট হওয়ার যে বেদনা সে সময় আমার হল সেটা কে বুঝবে? যদি তেমন বুঝদার থাকত তাহলে কৃষকেরা আজ কত এগিয়ে গিয়ে থাকত। এবার ভাবা শুরু হল যে কোথাও থামা যাক। কেননা জানতামই না যে কোনদিকে যাচ্ছি। সামনে জলও ছিল। সারা রাতের জাগরণ ছিল। আগের দিন চারটে সভায় বলতে বলতে শ্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম। শোওয়ার কোনো জিনিষপত্র ছিল না। চিন্তায় প্রাণ যাচ্ছিল তার কষ্ট আলাদা। এরই মধ্যে আবার ঘড়ি দেখলাম যে তিনটের থেকেও বেশি বেজে গেছে।

নিরুপায়, ভাবা হল যে সকালে যাওয়া হবে। কিন্তু ঘুম কোথায়? সেও তো তখনই আসে যখন আরাম আর ফুর্তির জিনিষ মজুত থাকে। একা আসতে তো জানে না। নিরুপায় হয়ে কয়েক ঘন্টা কোনোভাবে কাটালাম। ফের খেয়াল হল যে সব জিনিষপত্র সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। তাই গরুর গাড়ি তো চাইই চাই। তার জন্য দু’একজন সঙ্গী গেলেনও পাশের গ্রামে। কিন্তু আমার সাথে তো আরো একটা আপদ এসে জুটল। প্রথম দিনের দৌড়ঝাঁপ আর হয়রানির পরেও রাত ভর ঘুম এল না। ফলে আমার আওয়াজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। গলা এমন বসল যে তাজ্জব বনে যাচ্ছিলাম। আমার জীবনে গলার এই দশা প্রথম বার হল আর বোধহয় শেষবারও। একফোঁটা আওয়াজ বেরুচ্ছিল না। আমার আওয়াজ জোরালো মনে করা হয়। কিন্তু সে যে হঠাৎ কোথায় এবং কেন চলে গেল সে আর ডাক্তার আর হাকিম-বৈদ্য ছাড়া কে বলবে? জ্বরও এসে গেল। তবুও যেমনতেমন করে গরুর গাড়িতে বসে বেলথরা তো পৌঁছোতেই হত। পৌঁছেও গেলাম। ঠিক সেই সময় যুক্তপ্রদেশের শ্রী মোহনলাল সাক্সেনা কংগ্রেসি মন্ত্রিসভার দামামা বাজিয়ে বেলথরা পৌঁছেছিলেন। তাঁর সভা ছিল। লোকেরা আমাকেও বলতে বলল জিদ ধরে। অবশ্য সাক্সেনা চমকে উঠেছিল। কিন্তু এদিকে তো গলার আওয়াজই বন্ধ। তাই ঝামেলা মিটে গেল।

স্টেশন থেকেই বস্তির লোকেদের নিজের নিরুপায় অবস্থার কথা জানিয়ে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে সন্তুষ্ট হতে হল। অন্য কোনো উপায় ছিলও না। ফের সিদ্ধান্ত হল যে বেনারসে গিয়ে গলা ঠিক করানো যাক। তারপর সফর করা যাবে। সব জায়গায় খবর পাঠিয়ে প্রোগ্রাম স্থগিত করতে হল আর আমরা কাশিতে বাবু বেনিপ্রসাদ সিংএর বাড়ি পৌঁছোলাম। ওখানেই দু’তিন দিনে গলা ঠিক করে তারপর আবার থেকে সফর শুরু হল। 

১৮

সালতারিখ ঠিক মনে নেই। বিহারেরই ঘটনা। তাও পাটনা জেলার। বিহটার দক্ষিণে, মসৌঢ়া পরগনার নামজাদা নিষ্ঠুর জমিদারদের জমিদারির। ভরতপুরা, ধরহরার জমিদারদের কাছে যে কোনো জমিদার তালিম পেতে পারে যে অত্যাচার কত রকমের হয় এবং কেমন করে করতে হয়। তার ওপর বিশেষত্ব যে সরকার এবং তার আইনকে কলা দেখিয়ে কৃষককে নিংড়ে নেওয়া যায়। এখন তো কিসান-সভার প্রতাপে জমানা বদলে গেছে আর ওই জমিদারদেরই, ওখানকার পর্যুদস্ত কৃষকেরাই নাকাল করে দিয়েছে। যে জমিদার ভাওলি খাজনাকে (শস্যের ভাগ) নগদ করার কথা বললে আকাশ-পাতাল এক করে তুলত – কেননা ভাওলি (দানাবন্দী) তে তার পুরো ফায়দা ছিল, আর কৃষকেরাও বরবাদ হত – এখন হার মেনে নগদে খাজনা নিতে বাধ্য হয়েছে। কৃষকেরা একটু সাহস, সমঝদারি আর দূরদৃষ্টির পরিচয় দিল আর জিতে গেল। কৃষকদের সত্যনিষ্ঠা এবং সততার অন্যায় ফায়দা লুটে ওদেরকেই উত্যক্ত করা জমিদারদের সাথে কেমন ব্যবহার করা উচিৎ, সেটা কৃষকেরা বুঝে গেলেই কাজ শেষ। ওরা বুঝে গেল যে সবার সাথে যুধিষ্ঠির আর ধর্মরাজ হওয়া বিরাট ভুল। এটুকুতেই দান পাল্টে গেল।

হ্যাঁ, তো ধরহরারই এক জমিদারের কুঠি আছে আছুয়া মৌজায় পাকা সড়কের ওপর। মৌজাটাও ওই মহাশয়ের। ওখানকার কৃষকেরা বেশির ভাগ কোইরি। কোইরি পাকাপাকি এক চাষজীবী জাত। সরল মানুষ, বেশির ভাগ নিরক্ষর এবং সৎ। ঝগড়া করা তো জানেই না, জমিদারদের সাথে তো নয়ই, এমনকি তাদের মামুলি আমলাদের সাথেও নয়। আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে মানুষের মধ্যে এরা গো-জাত। এত পরিশ্রমী এবং রক্ত জল করে চাষকাজ করে যে বলার মত নয়। জৈষ্ঠের রোদ্দুরের হলকা আর ধু ধু দুপুরে ওরা মাঠে শাকসবজির ক্ষেতগুলোতে দিনরাত জলসেচ করে চলে। তবে গিয়ে কড়ায় গন্ডায় জমিদারের পাওনা চোকাতে পারে। ধান বা রবির ফসলে কাজ চলে না। তাই নিজেদের এভাবে পোড়ায়। তবুও, এমনই জল্লাদ হয় জমিদার যে প্রতিমুহুর্তে ওদের রক্তপিপাসু হয়ে থাকে। তার পেট কখনো ভরে না। কুম্ভকর্ণ যে! পেট ভরবে কি করে? যত বেশি পায় তত বেশি চায়। তাই নারী-পুরুষ, শিশু এমনকি বুড়োদের শরীর পুড়িয়েও জমিদারের দাবি পুরো করা কৃষকদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। এভাবেই আছুয়ার গরীব কোইরি কৃষকেরাও জমিদারের অত্যাচারের শিকার হয়েছিল।

আসলে ওখানকার জমিদার সব কৃষকদের দিয়ে, বিশেষ করে পশ্চাৎপদ জাতের কৃষকদের দিয়ে দিনভর বেগার খাটাত। ভোরবেলায় জমিদারের দেউড়িতে কৃষকদের পৌঁছে যেতে হত। রাতে বাড়ি ফিরতে পারত তারা। অন্য কিছু পাওয়ার কথা তো ছেড়েই দি, দিনে একবার খাবার জোটাও মুশকিল ছিল যদি নিজেরা বাড়ি থেকে খাওয়ার জন্য ছাতু-তরকারি না নিয়ে যেত। ভাগ্য ভালো থাকলে জমিদার, ক্ষুধার্ত আর লাওয়ারিশ কুকুরদের রুটির টুকরো দেওয়ার মত দু’চার পয়সা বা একপোয়া, আধসের আনাজ দিয়ে দিত। তবুও টুঁ শব্দটি করার বা পরের বার কাজে না আসার সাহস কারো ছিল না, তাতে নিজের হাজারটা কাজে ক্ষতি হয়ে যায় তো যাক। জমিদারের বাড়িতে বেগার খাটতে যেতেই হবে। একবার কোনো কারণ বাধ্য হয়ে একজন কৃষকও যেতে পারেনি। তার পরিণামে শুধু তাকে নয় পুরো গ্রামটাকে বরবাদ করা হয়েছিল। তাই আছুয়ার কৃষকেরা ভয়ে থরথর করত। জমিদারের নামে ওদের আত্মা কাঁপত।

জমিদার এমন পদ্ধতি খুঁজে বার করেছিল যাতে এক এক করে প্রত্যেক কৃষককে ওর বাড়িতে পৌঁছোতেই হত। পদ্ধতিটা এমন যে ভয়টাও ব্যাপ্ত থাকবে আর কাজ চলতে থাকবে। জমিদারের একটা মোটা আর লম্বা লাঠি সন্ধ্যেবেলাতেই একজন বাদে একজন কৃষকের দরজায় পৌঁছে যেত। যে কৃষকের ঘরে আজ সন্ধ্যেবেলা লাঠি পৌঁছোল সে আগামিকাল জমিদারের বাড়িতে যাবে। ফের সন্ধ্যেবেলায় তার ঘরের লোকেরা চুপচাপ লুকিয়ে লাঠিটা প্রতিবেশির ঘরের দরজায় রেখে আসবে যাতে সে খবর পেয়ে যায় যে পরের দিন তাকে যেতে হবে। এই পদ্ধতিটা একেবারে নিয়ম মেনে চালু ছিল। লাঠি মহারাজ পৌঁছোল মানে হাজারটা কাজ ছেড়েও যেতে হবে। এক বার কোনো কৃষকের বাড়িতে লাঠি মহারাজের পদার্পণের পর বাড়ির এক বৃদ্ধ সদস্য মারা গেল। রেওয়াজ মাফিক ঘরের সবাই মিলে মৃতদেহ গঙ্গার ধারে নিয়ে গেল। ফলে জমিদারের বাড়িতে কেউ যেতে পারল না। যখন জমিদার জানতে পারল রাগে উন্মত্ত হয়ে উঠল। কৃষকের ডাক পড়ল। সে এল। হাত জোড় করে অশ্রুরুদ্ধ গলায় সে নিজের কাহিনী শোনাল আর আসতে নিরুপায় হওয়ার জন্য ক্ষমা চাইল। কিন্তু কে ক্ষমা করবে? জমিদারের সমস্ত রাগ কৃষকের মাথায় নামল। গ্রামের মানুষদের উত্যক্ত করা শুরু হল। নানা ধরণের জাল-জোচ্চুরি করে কৃষকদের ওপর বিভিন্ন রকমের মামলা রুজু করা হল, মার-ধর করা হল এবং এভাবে ওদের কাঁদিয়ে ছাড়ল জমিদার। এ এক ঐতিহাসিক ঘটনা যা ওখানকার শিশুরাও জানে।

এসেম্বলির নির্বাচনে ধরহরারই একজন চালাক-চতুর জমিদার, যে নাকি ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান, পুরোনো কাউন্সিলের লাগাতার মেম্বার এবং শেষমেশ প্রেসিডেন্টও হয়েছিল, বিচ্ছিরি ভাবে হেরে গেল। নির্বাচনে সমস্ত কৃষকেরা মন খুলে আমাদের সঙ্গ দিয়েছিল। যে জমিদারের বিরুদ্ধে চট করে কেউ দাঁড়াতে হিম্মত করত না আর করলেও বিচ্ছিরি ভাবে হারত, এমনকি স্বরাজ্য পার্টির আমলে একবার এক কংগ্রেসি প্রার্থীরও জামানত জপ্ত হয়ে গিয়েছিল, সে হারল আর তারই জামানত কোনো রকমে বাঁচল। যদি কৃষকেরা মন খুলে আমাদের সঙ্গ না দিত তাহলে কি এটা হত? তাই ওদের এই সাহসের সামনে আমরা মাথা নোয়ালাম। জমিদারের সমস্ত হিংস্রতা এবং হুমকির তোয়াক্কা না করে কৃষকেরা অনন্য সাহস দেখাল। জমিদারের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া মানে বেড়ালের ঘরে হানা দেওয়ার ছিল ইঁদুরদের। কিন্তু সেটাই করে ওরা সবাইকে বিস্মিত করে দিল। যারা এই বলে কৃষক-সংগ্রাম থেকে পালাতে চায় যে সময়ে ওরা সঙ্গ দেবে না, তাদের মুখে জোরদার থাপ্পড় কষাল ওখানকার কৃষকেরা এবং কার্যত প্রমাণ করে দিল যে এই অভিযোগ সর্বৈব মিথ্যে। আমি তো ওই বিহটা এলাকাতেই আরো অনেক এমন ঘটনা দেখেছি যখন কৃষকেরা আশার হাজার গুণ বেশি করে দেখিয়েছে। তাই আমার অটুট বিশ্বাস আছে কৃষকদের ওপর। আমি মানি যে যদি ওরা কখনো আমাদের সঙ্গ না দেয়, তখন দোষটা আমাদেরই থাকে, ওদের নয়। যদি আমরাই ওদের ওপর বিশ্বাস না করি তাহলে আর কী হবে? আমরা নিজেরাই যদি লড়তে না চাই, আগুপিছু করতে থাকি তাহলে কৃষকেরা কী করবে? কী করে ওরা পুরোপুরি সঙ্গ দেবে? আর সঙ্গ না দিলেও ওদের দোষী কী করে বলব? আরো মজার – যে মহাশয়কে জমিদারের বিরুদ্ধে কৃষকেরা গৌরবের সাথে জেতাল, সে’ই কৃষকদের ওপর বিশ্বাস করতে পারল না। এর স্পষ্ট প্রমাণ আমরা পরে দুবার পেলাম। তার পর উনি নিজেও স্বীকার করলেন যে ওনার বিশ্বাস ছিল না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম। তাই হেরে গিয়ে উনি আমার বিশ্বাসটার সত্যতা মানলেন। যখন নাকি ওনাকে কৃষকদের বিপ্লবী নেতা মনে করা হয়, বা অন্ততঃ উনি নিজেকে তাই মনে করেন। এই হল আমাদের কৃষক-নেতৃত্ব! এর পরেও অহঙ্কার দেখাই যে বিপ্লব করব আর কৃষক-শ্রমিক রাষ্ট্র কায়েম করব!

হ্যাঁ, তো কংগ্রেসি মন্ত্রিসভা তৈরি হওয়ার পর বোধহয় ১৯৩৮ বা ১৯৩৯ সালে সেই আছুয়ার এক তরুণ কোইরি কৃষক আমার কাছে বিহটা আশ্রমে এল এক দিন। আঠেরো বা কুড়ি বছর বয়স হবে। শক্তসমর্থ যুবক, ছিপছিপে শরীর, কালো রঙ আর হাসিখুশি চেহারা। সেদিনের ঘটনা এমন ছিল যে সারা জীবন ভুলতে পারব না। তাই তার চেহারা আমার চোখের সামনে নাচতে থাকে। আমি তো চিনতামও না তাকে। যদিও সে চিনত আমাকে।

নিজের দুঃখের কাহিনী শোনাতে সে এসেছিল আমার কাছে। বোধহয় বাড়িতে বয়স্ক বা বৃদ্ধ কেউ ছিল না। লেখাপড়াও সে জানত না। কংগ্রেসের মন্ত্রিরা খাজনা কম করাবার নামে আর বকাস্তের জমি ফেরত দেওয়াবার নাম করে যে ব্যর্থতা দেখিয়েছিল আর পরিণামে কংগ্রেসকে ডুবিয়ে দিয়েছিল তারই ফলশ্রুতি ছিল আমার সামনে সেই গরীব ছেলেটির ফরিয়াদ। সব রকম চেষ্টা করে ও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু জমিদারের টাকা আর আইনের প্যাঁচের সামনে সে অসহায়। ফলে তার চোখ খুলে গিয়েছিল। নির্বাচনের সময় কংগ্রেসের নামে যে ঢোল পেটানো হয়েছিল যে খাজনা অনেক কম করা হবে আএ বকাস্তের জমি ফেরত দেওয়া হবে, তাতে সাদা-সিধা কৃষকেরা পুরোপুরি বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু সময়কালে ওরা বাস্তবের সম্মুখীন হল আর জানল যে তর্জনগর্জন করার মেঘ তো আলাদা রকমের হয়ই, কংগ্রেসি মন্ত্রিরা সব তাই, তখন কৃষকেরা যারপরনাই ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল। প্রথমত তো হলনা কিছুই। দ্বিতীয়ত, জমিদার এবং তাদের দালালদের হুমকি আর টিটিকিরি শোনা আবার থেকে শুরু হল। তাই তাদের ক্ষোভ এবং ক্রোধ সংগত ছিল। এই যুবকও সেই ক্ষোভ এবং ক্রোধ জানাতে আমার কাছে এসেছিল।

সামনে আসতেই আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, “বল ভাই, হুকুম কী?” আমি সব সময় নতুন বা আকস্মিক আগন্তুকদের “হুকুম কী” ই বলি। কৃষকদেরও সাধারণতঃ এভাবে সম্বোধন করি। আমি মানি যে আমায় হুকুম করার ওদের পুরো অধিকার আছে। যখন সময়মত আমার কথায় বিশ্বাস করে ওরা আমার উপদেশ মেনে নেয়, তাহলে অন্য সময়ে ওরা আমায় হুকুম কেন করবে না? যদি ওদের এ অধিকার না থাকে তাহলে আমার কথা ওরা মানবে কেন? কোনো জোরজুলুম বা চাপ তো নেই। এটা তো পরস্পর সমঝোতাতেই (understanding) হতে পারে। আর এটাই বাস্তব। তাই আমার কাজে কোনো বাধা আসেনা। আমি সব সময় মানি যে কৃষকেরা আমার সঙ্গ নিশ্চয়ই দেবে। কেননা আমি যে ওদের সঙ্গ দিই।

ছেলেটি নিজের দীর্ঘ কাহিনী শোনাল আর বলল যে কেমন কেমনভাবে দৌড়োদৌড়ি করার পরেও তার একটা কথাও কেউ শুনল না। যে ক্ষেতটা তার এমনই পাওয়ার ছিল, সে পেল না। অনেক দৃষ্টান্ত দিল ওদিককার যে বকাস্তের জমিও কেউ ফেরত পায়নি আর খাজনাও কম হয়নি। তারপর বলল, “শুনেছিলাম সব কিছু হয়ে যাবে। এই আশাতেই প্রাণসংশয় করে ভোট দিয়েছিলাম। সে সব তো ধোঁকাবাজি বেরুলো” ইত্যাদি ইত্যাদি। তার মুখ দিয়ে যে কথাগুলো বোমা ফাটার মত বেরুচ্ছিল আমি মন দিয়ে শুনছিলাম এবং তার ভাবভঙ্গিও দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল বড় রকমের ধোঁকা খেয়ে তার চোখ খুলেছে এবং মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া লোকেদের – বিশেষ করে কংগ্রেসের মন্ত্রীদের – সে কাঁচা গিলে ফেলতে চায়। যদিও বাইরে থেকে তার এই ভয়ঙ্কর ক্রোধ বোঝা যাচ্ছিল না। কিন্তু ভিতরে ভিতরে জ্বলতে থাকা আগুনটা আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। সে বিপুল বিস্ময়ে খাবি খাচ্ছিল যে এমন লোকেরাও মিথ্যে কথা বলতে পারে। সে সময় তার চেহারা দেখার মত ছিল। তাই তার চেহারাটা ভুলতে পারি না।

তার কথা শোনার পর আমি পরিষ্কারভাবে কবুল করে নিলাম, “হ্যাঁ ভাই, ধোঁকা তো হয়েছে। এখানে তো সেই উঁচু দোকান আর পানসে মাল, কথাটা চরিতার্থ হল।” তার পর আমি সবিস্তারে তাকে বোঝালাম যে বকাস্তের জমি ফেরত দেওয়ার আর খাজনা কম করার নামে যে আইন সদ্য তৈরি হয়েছে সেটা কত কাঁচা আর পয়সাওয়ালা জমিদার কিভাবে সে আইনকে ফাঁকি দিয়ে বাজিমাত করে। ভালো মত একটা লেকচারই শুনিয়ে দিলাম। কেননা আমার বুকও তো পুড়েছিল। তার সামনে আমি আরো অনেক উদাহরণ দিয়ে বললাম যে ধোঁকা তো দেওয়াই হচ্ছে।

এর জবাবে সে তৎক্ষণাৎ শুনিয়ে দিল, “আপনিই তো বলেছিলেন কংগ্রেসকে ভোট দিন। আমরা তো জানতাম না কে কী? আপনি যেমন বললেন আমরা তেমনই করলাম।” এ কথায় আমি থেমে গেলাম। এর উত্তর তো আমার কাছে ছিলনা। ছেলেটি তো পুরোপুরি সত্যিকথা বলছিল। কৃষকেরা তো আমার বলাতেই নিজেদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে কংগ্রেসের নামে এমনকি সেই নরপিশাচ জমিদারগুলোকেও ভোট দিয়েছিল যারা কৃষকদের ওপর অত্যাচার করতে কিছু বাকি রাখেনি। আমার মনে আছে যে ভোট দেওয়ার আগে ওই ধরহরা অঞ্চলেই এক কৃষক এক সভায় লেকচার শোনার পরেই আমায় আস্তে করে জিজ্ঞেস করেছিল যে আপনার কথা তো আমরা মেনে নেব আর ভোট দেব নিশ্চয়ই। কিন্তু যাকে ভোট দিতে বলছেন সে জমিদার নয় তো? সে সময় আমি ওকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঠিক করে দিয়েছিলাম। আজ এই কোইরি যুবকের কথা শুনে সেই ঘটনাটাও মনে পড়ে গেল।

আমি পরিষ্কারভাবে স্বীকার করে নিলাম, “হ্যাঁ ভাই, কথাটাতো সত্যি। তোমার অভিযোগ আমি স্বীকার করি। আসলে আমিও ধোঁকায় ছিলাম। দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে ঢোল পিটিয়ে যে কথাগুলো বলা হচ্ছিল আর যে কথাগুলো বড় বড় মহাত্মা আর লিডারেরা বার বার লাখো মানুষের সামনে পুনরাবৃত্তি করছিল আমি কী করে বিশ্বাস করতাম না সে কথা? এতেই তো ধোঁকাটা হল। এই দিক থেকে কৃষকদের সামনে আমার অপরাধ আমি স্বীকার করি। কিন্তু এটুকু বলে দিচ্ছি যে এই ঘটনা থেকে আমি অনেককিছু শিখেছি এবং কৃষকদেরও শেখা উচিৎ। হ্যাঁ, ভবিষ্যতের জন্য বলতে পারি যে এমন আর হতে দেব না।”

দেখলাম যে আমার স্পষ্ট কথায় সে তুষ্ট হল। যদি আমি নানা অজুহাত দেখিয়ে নিজেকে ঠিক দেখাবার চেষ্টা করতাম তাহলে বোধহয় সে তুষ্ট হত না। কিন্তু সততার সাথে নিজের ভুল কবুল করে নেওয়ায় সে বুঝল যে ভুল সবাই করতে পারে। স্বামীজিও ধোঁকা খেয়ে গেছেন। জেনেশুনে কিছু করেননি। ছেলেটি কোনো বড় রাজনীতিজ্ঞ তো ছিলনা যে আমি তাকে রাজনীতির প্যাঁচ বোঝাতে শুরু করতাম আর বলতাম যে যদি তুমি এমনটা না করতে, কংগ্রেসকে ভোট না দিতে তাহলে জমিদার জিতে যেত। তাহলে তো আরো খারাপ হত ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব চুলচেরা যুক্তি বেচারা ওই নিরক্ষর এবং সাদাসিধা কৃষক কী বুঝত? আমি তো ভাবি যে ওদের এসব কথা বললে ওরা বুঝত তো না’ই, উল্টে নেতাদের মাপার যে সোজা নিক্তিটা আছে ওদের মনে যে, যা-বলবে-পুরো-করবে, সেই নিক্তিটাও ভুলে যেত। ফলে এই একই রাজনীতির আড়ালে প্রতারক লোকেরা ওদের বার বার ধোঁকা দিত। তাই আমি সোজা কথা বললাম এবং নিজের ভুল স্বীকার করে নিলাম।

কিন্তু এই ঘটনাটা গভীরভাবে দাগ কাটল আমার মনে যে কৃষকেরা নিজেদের হিতাহিত বোঝা শুরু করে দিয়েছে। যদি ওদেরকে সঠিক পথে নেতৃত্ব দেওয়া যায় তাহলে ওরা সহজে বড় বাতেলাবাজ নেতাদের বা ভোট-ভিখিরিদের শঠতার জালে পা দেবেনা। যদি কিসান-সভা নির্বাচনের দিনগুলোর ন্যায্য সুযোগ নিয়ে ওদেরকে আগের থেকে সাবধান করে দেয় তাহলে ভবিষ্যতে ওরা ভোট চাইতে আসা নেতাদের নাকের জলে চোখের জলে এক করে দেবে। যারা বলে যে কৃষকেরা বোকা এবং ওদের সহজেই ফাঁসিয়ে নেওয়া যায় তারা যে কতটা ভ্রান্ত, সেটা সেদিন আমি নিজের চোখে দেখে নিলাম। অত্যন্ত পিছিয়ে থাকা সরল জাতের এক নিরক্ষর যুবক যদি নির্দ্বিধায় এ কথাগুলো বলতে পারে এবং আমাকেও মিষ্টি সুরে ভর্ৎসনা করতে পারে তাহলে অন্যেরা তো আরো বেশি বলবে! আসলে জনগণের মনোবৃত্তির সঠিক হদিশ রাখা সবার কর্ম নয়। কঠিন কাজ। যারা নিজেদের জনগণের মধ্যে মিশিয়ে দিয়েছে, রাত দিন তাদেরই হাতে সঁপে দিয়েছে, তাদেরই ঘুম ঘুমোয় এবং জাগে, তেমন অল্প কয়েকজনই পারে। এ সম্পর্কে রুশি কৃষকদের একটি ঘটনা আমার মনে পড়ে গেল।

শ্রী ল্যান্সেলট ওয়েন (Launcelot A. Owen) নিজের ইংরেজি বই “দি রাশিয়ান পিজ্যান্ট মুভমেন্ট ১৯০৬ – ১৯১৭”য় রুশের কৃষকদের প্রথম সংগঠিত মিটিংএর উল্লেখ করেছেন যেটা ৩১.৭.১৯০৫এ এলেকজান্ডার বাকুনিন নামক জমিদারের জমিদারিতে তোরজোক জেলায় হয়েছিল। সেই মিটিংএর কার্যাবলি পুরো হওয়ার পর নিজেদের মধ্যে যে কথাবার্তা হয়েছিল তাতে কৃষকেরা অংশগ্রহণ করেছিল। মাত্র সতেরোটি গ্রামের কৃষকেরা জমা হয়েছিল। জেলার সরকারি বোর্ডের মেম্বারদের যে সন্দেহ ছিল যে কৃষকেরা দায়িত্বশীল শাসনের জন্য প্রস্তুত হয় নি, তাই ওদের দাবি অর্থহীন, তার পাল্টা জবাব ওখানেই এক কৃষক তৎক্ষণাৎ দিল যে, “না না। তেমন কোনো ব্যাপার নয়। আসল কথা তো এটাই যে কৃষকও ওই শাসনের জন্য দরকারের থেকে বেশিই যোগ্য এবং প্রস্তুত। তাই সরকার ভয় পায়।” 

“Another (peasant) confronting the Zemstvomen’s doubts as to peasant ripeness for responsibility, asserted that the trouble was that they were overripe ."  

১৯

১৯৩৮-৩৯ সালের ঘটনা। হরিপুরা কংগ্রেসের আগে এবং তারপরেও আমি কৃষকও আন্দোলনের কাজে গুজরাট সফর করার সুযোগ পেয়েছিলাম। হরিপুরার আগে গুজরাটের আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কৃষক-কর্মী শ্রী ইন্দুলাল যাজ্ঞিক নিজের সহকর্মীদের মত নিয়ে ঠিক করলেন যে কংগ্রেস উপলক্ষে কৃষকদের একটা বড় মিছিল আর মিটিং করা যাক। ফৈজপুরের সময় থেকেই এই নিয়ম আমরা চালু করেছিলাম এবং সেটা এখনও চলছে। আমিও ওনার কথায় স্বীকৃতি দিয়েছিলাম। তাই সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে প্রস্তাবিত মিছিলের আগে আমার একটা সফর হয়ে যাক। কেননা ওখানে তো কৃষক আন্দোলনের জন্ম দেওয়ার ছিল। তখন অব্দি গুজরাটে আন্দোলন ঠিক মত বাড়তে পারেনি। গান্ধীজির প্রদেশ বলে কথা। সেও আবার খাস বারদৌলির পাশেই কংগ্রেস হওয়ার ছিল। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল আমাদের ওপর প্রচন্ড কুপিত হয়ে ছিলেন। এ খবরও খবরের কাগজে ছেপে গিয়েছিল যে কংগ্রেস উপলক্ষেই শ্রী বল্লভভাইয়ের সভাপতিত্বে অখিল ভারতীয় ক্ষেত মজদুর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এই ক্ষেত মজদুর আন্দোলনটাকে কিসান-সভা বিরোধী তৈরি করা হচ্ছিল। বিহার এবং অন্ধ্র ইত্যাদি প্রদেশে খোলাখুলি চেষ্টা চলছিল যে ক্ষেত মজদুরদের উস্কে, বা কমসে কম ওদের নামেই কোনো আন্দোলন দাঁড় করিয়ে, এগোতে থাকা কৃষক আন্দোলনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যাক। খোলাখুলি জমিদারদের লোক এবং পয়সা লাগিয়ে কাজটা করা হচ্ছিল। ব্যাপারটা আমরা জানতাম।

কিন্তু আমরা একটুও তোয়াক্কা করিনি। ভালো করে জানতাম যে ব্যাপারটা টিঁকবে না। তবুও সজাগ হওয়ার জন্য কৃষকদের বিশেষ জমায়েত হরিপুরায় করা জরুরি হয়ে পড়ল। তাই সফরের প্রয়োজন ভালো রকমের ছিল। কৃষকদের বোঝাতে হত তো যে কংগ্রেস নামে প্রতিষ্ঠানটা থাকা সত্ত্বেও কিসান-সভার দরকার কি? সাধারণ লেখাপড়া জানা মানুষদের থেকে শুরু করে ওপরতলার প্রায় সবাই কিসান-সভাকে দুচোখে দেখতে পারত না। এমন এমন যুক্তি খাড়া করত যে শুনলে স্তম্ভিত হতে হত। কৃষকদের নামে বারদৌলির যে লড়াই আগে লড়া হয়েছিল তাতে এই ভ্রান্তি আরো ছড়িয়ে পড়েছিল যে কংগ্রেসই কিসান-সভা এবং শ্রী বল্লভ ভাইই কৃষকদের আসল নেতা। শ্রী ইন্দুলালজির সাথে কথা বলে কিছুটা তো জেনেই গিয়েছিলাম যে বারদৌলির লড়াই আসল কৃষকদের ছিল না, তাদের শোষকদের ছিল এবং আসল কৃষকদের সরিয়ে তারাই কয়েকজন সে জায়গায় বসেছে। কিন্তু ভালো করে জানার জন্য জায়গাটায় যাওয়া এবং ঘোরা জরুরি ছিল। তাই খুব উৎসাহের সাথে আমরা সফরে রওনা হয়েছিলাম। ওখানে গিয়ে আমরা নিজে অভিজ্ঞতা লাভ করলাম যে কৃষকদের জমি প্রায় মাগনায় কব্জা করে নেওয়া যে দশ-পনের প্রতিশত বানিয়া, পারসি আর প্যাটেল ইত্যাদি রয়েছে তাদেরই কৃষক বলা হয়। তারা যথেষ্ট মালদার এবং প্রভূত জমি আছে তাদের কাছে। আগের কৃষকেরা ওদেরই হলকর্ষক বা গোলাম হয়ে নয়ারকীয় জীবন কাটায়। সেই দশ-পনের প্রতিশত মানুষের মালগুজারি কম করার জন্য বারদৌলির লড়াই লড়া হয়েছিল, আসল কৃষকদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া জমি তাদেরকে ফেরত দেওয়ার জন্য বা তাদের গোলামি মেটানোর জন্য নয়।

ভুসাওয়ল থেকে আমরা তাপ্তি ভ্যালি রেলওয়ে ধরলাম আর রওনা হলাম। এই রেলওয়ে ভীষণ ধীরগতি এবং কষ্টদায়ক। তবু, যেতে তো হতই। মাঢ়ী স্টেশন, যেখান থেকে হরিপুরা যাওয়ার ছিল, তার অনেক আগেই সোনগঢ় এলাকায় আমাদের প্রথম মিটিং করার ছিল আর সোনগঢ় ওই তাপ্তি ভ্যালি রেলওয়েতেই পড়ে। বরোদা রাজ্যের অংশ। কৃষক খুবই অত্যাচারিত এবং দুখি। ওখান থেকেই আমাদের অভিযানের প্রারম্ভ করার কথা ছিল। কিন্তু বরোদা রাজ্যের হাকিমেরা এটা বরদাস্ত করতে পারছিল না আর ধান্ধায় ছিল যা কি করে আমাদের সভাটা ভেস্তে দেওয়া যায়। তার পিছনে অনেক মাথা খাটাল ওরা। সোজাসুজি নোটিশ দিয়ে আমাদের সভা বন্ধ করায় বোধহয় ওরা বিপদ দেখছিল। তাই একটা চাল খেলল। ঠিক সভার দিন, যখন আমাদের লোকেরা আর সভার তারিখ পাল্টাতে পারবে না, খুব সকালে সব গ্রামের প্যাটেল আর মুখিয়াদের খবর দেওয়া হল যে তারা যেন রাজ্যের কাছারিতে পৌঁছে যায়। প্যাটেল আর মুখিয়ারা রাজ্যের এক ধরণের চাকর। তাই ওদের কাছারি পৌঁছোন জরুরি হয়ে পড়ল, আর সব গ্রামের মুখিয়ারাই চলে গেলে সভায় আর আসবে কে? তখন অব্দি কিসান-সভা তো ওখানে দাঁড়ায়ইনি। সাদাসিধা খেড়ুত (কৃষকও) তার গুরুত্ব কিভাবে জানবে? আর এতদসত্ত্বেও গ্রামের প্রধান মানুষেরা যদি সভায় আসত, অন্যেরাও আসত। কিন্তু তারাও তো কাছারি চলে গেল। ফলে সভা হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই রইল না। এভাবে বড়োদা রাজ্যের চেষ্টাটা সফল হয়ে গেল।

যখন আমরা স্টেশনে পৌঁছোলাম তখন ইন্দুলালজি সব কথা বললেন। তখন জানলাম যে রাতে পাশেরই একটা গ্রামে থাকার কথা আছে। থাকার ব্যবস্থা আগে থেকেই ছিল। ওই অঞ্চলে বেশির ভাগ রানিপরজ নামে একটি বিখ্যাত জাতির লোকেদের বাস। ওরাই ওখানকার আসল কৃষকও। ওদের নেতা শ্রী জীবনভাই আমাদের সঙ্গেই ছিলেন। উনি সে সময় কোথাও বাইরে ব্যবসা করে দিনগুজরান করতেন। কিন্তু আমাদের সাহায্য করার জন্য চলে এসেছিলেন। তাঁর সাথেই আমরা সেই গ্রামে গেলাম। যখন আমরা রানিপরজদের অবস্থা জানতে চাইলাম তখন সেই গ্রামের লোকেরা সব কাহিনী শোনাল। এও বলল যে “রানিপরজ প্রগতিমন্ডল” নামে একটি সংস্থা খোলা হয়েছে যেটি ওদের উন্নতির চেষ্টা করে। স্কুল ইত্যাদির মাধ্যমে ওদের কিছু লেখাপড়া শেখান হয়। চরকা কাটাও শেখান হয়। সর্দার বল্লভ ভাই এবং অন্যেরা এতে সাহায্য করেন। “রানিপরজ” বা এমনই কোনো নামে একটি পত্রিকাও প্রকাশিত হয়। সারকথা এই যে “প্রগতিমন্ডল” সমাজসংস্কারের একটি প্রতিষ্ঠান। তাই মদ্যপান ইত্যাদি থেকে মানুষজনকে বিরত করে।

আমি অবশ্যই বিস্মিত হলাম যে এখানেই পাশে বারদৌলিতে কৃষকদের লড়াই হয়ে ছিল এমনটা সবাই জানে, শোনে, তবু রানিপরজের লোকেরা আজ ভূমিহীন এবং অন্যের গোলামি করে। দুবলা নামেই ওদের খ্যাতি। ওদের জমি দেওয়ান বা ওদের গোলামি মেটানোর লড়াই না লড়ে এই সমাজ-সংস্কারের (social reform) কাজ করাটা অদ্ভুত ব্যাপার! যেন এরা দুর্বৃত্ত জাতি (Criminal Tribes)। দুর্বৃত্ত জাতির লোকেদের যেমন ধর্মের নামে সৎপথে আনার চেষ্টা করা হয় আর মদ্যপান বন্ধ করার জন্য প্রচার চালান হয় এখানেও সেই অবস্থা। আমি বুঝে নিলাম যে আসল কাজ না করে এরা লোকেদের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য বাইরে মলম লাগিয়ে চিকিৎসার ভান করছে। অরণ্যবাসী সাহসী জাতি পেটের জন্য মাগনাখোর আর লুটেরাদের গোলামি করুক আর নেতারা এর মধ্যে সমাজ-সংস্কারের প্রচার করুক! অদ্ভুত ব্যাপার! বিয়ে-শাদি ইত্যাদির সময় বানিয়া, সাহুকার বা মদ্যবিক্রেতারা এই সাদাসিধা কৃষকদের বেশি বেশি করে লিখিয়ে কর্জ দেয়, দেওয়ায় আর মদ খাওয়ায়। পরে সেই কর্জের বদলেই ওরা এদের জমি তো নিয়েই নেয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম এদেরকে গোলাম বানিয়ে নেয়। এই লুট আর ধোঁকাবাজির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রচার এদের মধ্যে করার প্রয়োজন ছিল। এদের বলার প্রয়োজন ছিল যে ওই ভুয়ো কর্জ এরা অস্বীকার করুক এবং শুনিয়ে দিক যে আমরা আর কারো গোলাম নই। এটাই তো ছিল এই অসুখের আসল দাওয়াই। কিন্তু নকল নেতারা অন্যই কথা বলে। আসলে এতে ওদেওও স্বার্থ আছে। ওরাও তো হয় নিজেরাই সাহুকার অথবা সাহুকারের বন্ধু এবং দালাল!

ওখান থেকে পরের দিন আমাদের সুরাট যাওয়ার ছিল। ট্রেন ধরে সুরাট পৌঁছোলামও আর সন্ধ্যেবেলায় একটা মিটিংও করলাম। তারপর সোজা পঞ্চমহাল জেলার দাহোদ শহরেরদিকে ফ্রন্টিয়ার মেলে রওনা হয়ে পরের দিন ভোরবেলায়, রাত থাকতেই পৌঁছে গেলাম। ওখানে প্রথমত, মিউনিসিপ্যালিটির তরফ থেকে আমাদের মানপত্র পাওয়ার ছিল। দ্বিতীয়ত, একটি সার্বজনিক সভায় বক্তৃতা দেওয়ার ছিল। বম্বে-বরোদা এবং সেন্ট্রাল রেলওয়ের বড় কারখানা থাকার কারণে ওখানে শ্রমিকদের একটি সভায় কথা রাখার ছিল। কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতা ছিল দাহোদ থেকে দূরে গ্রামাঞ্চলে ভীলদের একটি বড় সভা। মিউনিসিপ্যালিটির অধ্যক্ষ ছিলেন এক বোহরা মুসলমান ভদ্রলোক। কিন্তু যে অভিনন্দন পত্রটি গুজরাটিতে উনি পড়লেন এবং যে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতাটি দিলেন দুটোই উল্লেখযোগ্য ছিল। আমিও যথোচিত উত্তর দিলাম। সন্ন্যাসী হয়েও কৃষকদের কাজে আমি কেন নিজেকে নিযুক্ত করলাম তার ব্যাখ্যা ওখানে আমি অন্যরকম ভাবে দিলাম। আসলে শহরের লোকেদের পেট যেমন করে হোক ভরেই যায়। তাই তাদের ধর্মচিন্তা বেশি থাকে। আমিও তাই ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ওদেরকে বোঝালাম। আমি বললাম যে যদিও ভগবান সর্বত্র আছে তবু আমি তাকে শোষিতদের মাঝেই বিশেষ করে পাই এবং ওখানেই খুঁজলে তাকে পাওয়া যায়। যার ফোড়া হয়েছে তার সারা শরীরে ওষুধ না লাগিয়ে ব্যথার জায়গাটায় ওষুধ লাগালেই মন প্রফুল্ল হয়, কেননা মনটা তার ওখানেই পড়ে থাকে। তার মন, তার আত্মাটাকে ওখানেই পাওয়া যায়, ধরা যায় যদিও আছে সেটা সারা শরীরে। ঠিক তেমনই অবস্থা ভগবানের।

যখন আমরা পরের দিন ভীলদের মিটিংএ গেলাম, খুব আনন্দ পেলাম। জায়গাটার নাম ভুলে যাচ্ছি। মাঠে সভা ছিল। ভীড় ছিল ভালোরকম। চারদিকে মানুষ আর মানুষ। পুরুষ ছিল, নারীও ছিল। ভীল ছাড়া অন্যান্য মানুষেরাও ছিল কিন্তু ভীলদেরই প্রাধান্য ছিল। ছোটোবেলায় শুনতাম যে দ্বারকার পথে যাত্রীরা যখন ডাকোরের দিকে এগোয় তখন দাউদ-গুহরা (দাহোদ-গোধ্রার) ঝোপ-ঝাড় পড়ে পথে। অর্থাৎ দাহোদ আর গোধরার মাঝে লাগাতার ঝোপঝাড় রয়েছে, জঙ্গল রয়েছে যেখানে ভীলেরা তীর চালায় আর যাত্রীদের মেরে লুটে নেয়। আমি ভাবতাম ভীষণ হিংস্র এবং ভয়ঙ্কর হবে ভীলেরা। কিন্তু যখন ওদের দেখলাম যে ভালো মানুষের মতই চেহারা তখন বিস্মিত হলাম। হ্যাঁ, অধিকাংশের হাতে ধনুক এবং তীরের গোছা ছিল অবশ্যই। তীরধনুকের প্রতি ওদের অসীম ভালোবাসা। তাই সঙ্গে রাখে। তারা বলল যে রাস্তায় কোথাও চোর-বদমাশ বা বন্যপশুর বিপদ থাকলে এই তীরধনুকই কাজে আসে। বন্য অঞ্চল তো বটেই। এই দৃশ্য আমি প্রথম প্রথম দেখলাম। কিন্তু এও দেখলাম যে আমার কথা তারা মন দিয়ে শুনত এবং প্রসন্ন হত। আমি তো ওদের ভাষা বলছিলাম না। তবু আমি এমন করে বলছিলাম যাতে ওরা বুঝে যায়। ওদের মনের কথাই তো বলছিলাম। তাহলে ওরা প্রসন্ন হবে নাই বা কেন?

আমরা ওখানে এও জানতে পারলাম যে ওই এলাকায় অনেক আগে থেকে “ভীল সেবামন্ডল” কাজ করছে। সেখানে যাওয়ার সুযোগ পেলাম না। সন্ধ্যে অব্দি দাহোদে ফিরে আসা জরুরি ছিল। রেলওয়ে শ্রমিকদের সভায় বলার ছিল যে। কিন্তু ফেরার সময় দূর থেকে আমাদের “সেবামন্ডল”এর বাড়ি দেখান হল। মন্ডলের কর্মীদের মধ্যে অনেক ভালো ভালো ত্যাগী মানুষেরা হয়েছেন। আমাদের সঙ্গী ইন্দুলালজীরও অবদান আছে তাতে। এ কাজ সে সময় শুরু হয়েছিল যখন দেশে রাজনৈতিক চেতনা প্রায় ছিল না। তাই সমাজসেবার নামে এই মন্ডল খুলল। কিন্তু আজ যখন রাজনৈতিক চেতনার বড় বন্যা এসে গেছে দেশে এবং তারই সাথে তার আর্থিক দিকটাও স্পষ্ট হয়ে গেছে, তখন এধরণের সংস্থাগুলোর বিশেষ কোনো গুরুত্ব আছে কি নেই, সেটা একটা প্রশ্ন। যদি গুরুত্ব থাকেও, তাহলে কি তার কাজের ধরণধারণ আগের মতই থাকবে, নাকি বদলাতে হবে, এই দ্বিতীয় প্রশ্নটাও দাঁড়িয়ে যায়। ভীলদের সে অ-সভ্যতা তো আর নেই। সময় বদলে গেছে আর ওরাও এখন সভ্যতার হাওয়ায় নিঃশ্বাস নিতে বাধ্য। এই হাওয়ার ঝোঁকা ওরা হাজার চাইলেও এড়িয়ে যেতে পারবে না। এমত পরিস্থিতিতে আর্থিক প্রোগ্রামের ভিত্তিতে ওদের মধ্যে কাজ করা হবে না কেন? আমার তো বিশ্বাস যে অসভ্য এবং দুর্বৃত্ত জাতি বলে কথিত মানুষদের মাঝে এখনো পৌরুষ অনেক বেশি অন্যদের থেকে। তাই আর্থিক প্রোগ্রামের ভিত্তিতে ওদের মধ্যে যেই কাজ শুরু হবে এবং ওরা তার গুরুত্ব বুঝতে পারবে, হকের লড়াইয়ে লড়ার জন্য সবচেয়ে প্রথম সারিতে ওদেরই দেখা পাওয়া যাবে।

যাহোক, সন্ধ্যে হতে হতে ওই সভা থেকে ফিরে আমরা শ্রমিকদের মিটিংএ গেলাম। ভালো মিটিং ছিল। পরিচ্ছন্ন কাপড়পরা বাবুদের একটা ভালো ভীড় ছিল মিটিংএ। নোংরা আর কালো কাপড়ওয়ালারা তো ছিলই। শ্রমিকদের অধিকার কী, এবং তা পেতে হলে তাদের কী করতে হবে তাই আমি ওদের বললাম। সভার পর আমরা নিজের জায়গায় ফিরে এলাম।

পরের দিন গোধরার কাছে, তার পরের স্টেশন বৈজলপুরের উত্তরে জীতপুরায় আমাদের মিটিং ছিল। খাস গাঁয়ের সভা। অনেক দূর থেকে কৃষকেরা এসেছিল। প্রচুর উৎসাহ এবং উদ্দীপনার সাথে ওরা আমায় ওখানে নিয়ে গেল। বাজনাবাদ্যি আর তৈয়ারির কোনো কমতি ছিলনা। সভাও পুরোপুরি সফল হল। যে জমিতে সভা হল সে জমিটা কৃষক কৃষক-আশ্রম তৈরি করার জন্য দিয়ে দিল। এটাই সবচেয়ে বড় বিশেষত্ত্ব ছিল যে ভবিষ্যতের স্থায়ী কাজের এভাবে ভিত্তিস্থাপন করা হল। আমি খুব খুশি হলাম যে আমার হিন্দী ওখানকার খেড়ুতরা ভালোভাবে বুঝে নিচ্ছিল। অবশ্য আমার অভ্যাসও এরকম হয়ে গেছে যে কৃষকদের বোঝার মত ভাষাই বলি, তাও ধীরে ধীরে। বাস্তবে তো আমি ওদের মনের কথাই বলি। তাই বোঝা সহজ হয় ওদের জন্য। হ্যাঁ, জীতপুরা থেকে ফিরে আমরা রাত্রেই ট্রেন ধরলাম আর মঢ়ীর পথে রওনা হলাম। মঢ়ী থেকেই হরিপুরা যাওয়ার ছিল।

মঢ়ী এবং হরিপুরার মাঝেই আমাদের আরো একটি সভা ছিল খাস গ্রামাঞ্চলে। তৃতীয় প্রহরে সে সভা করলাম আমরা। কংগ্রেসি মন্ত্রিসভা তো তৈরি হয়েই গিয়েছিল। প্রথম প্রথম সেই সভাতেই আমি একটি কথা বললাম যেটি পরে আরো অনেক জায়গায় বলেছি। আসলে গুজরাটে এবং মহারাষ্ট্রে কর্জ এবং সাহুকারের অত্যাচারের প্রশ্নই সবচেয়ে প্যাঁচালো এবং গুরুত্বপূর্ণ। বলা হয় যে ওখানে জমিদারি প্রথা নেই। ওখানকার কৃষকদের সোজা সম্পর্ক সরকারের সাথে। একে রাইয়তওয়ারি বলে। কিন্তু বানিয়া এবং সাহুকারেরা বছরের পর বছর সুদের জালে ফাঁসিয়ে কৃষকদের প্রায় সমস্ত জমি নিয়ে নিয়েছে এবং নিজেরাই জমিদার হয়ে বসেছে। আধিয়ারি বা ভাগচাষে ওই কৃষকদেরই সেই জমি আবার সাহুকারেরা চাষ করতে দেয়। আর যদি ফসল নষ্ট হয় তাহলেও অন্যায়ভাবে নগদ মালগুজারি উশুল করে নেয়। ভীত এবং নিষ্পেষিত কৃষক টুঁ শব্দটিও করতে পারেনা। ভাগচাষের অবস্থা এমন যে চিনেবাদামের মত দামী আর মুদিখানার ফসলেরও আদ্ধেক নিয়ে নেয় সাহুকার। কৃষকদের গোলামিও এই কারণে।

তাই ওদের অসীম আনন্দ হয় যদি কর্জের এই অসহ্য ভার ওদের ঘাড় থেকে সরিয়ে ছুঁড়ে ফেলার কথা বলা হয়। যদি ওদের বুক থেকে এই পাথরের চাঁইটা সরে তাহলে ওরা একটু নিঃশ্বাস নিতে পারে। কথাটা তো আমি জানতামই। তাই বললাম যে পাশেই কংগ্রেস হচ্ছে। কংগ্রেস দাবিও করে যে সে গরীব এবং অত্যাচারিত মানুষদেরই প্রতিষ্ঠান। শ্রী বল্লভ ভাই নিজেকে কৃষকদেরই নেতা বলেন। আর আজকাল তো বলা হয় যে বোম্বাই প্রদেশে কংগ্রেসের মন্ত্রিরাই শাসন চালাচ্ছে। তাঁদেরই মর্জিতে আইন তৈরি হয়। তাই হরিপুরায় লাখো লাখ সংখ্যায় কৃষক জমা হয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিক যে এই অভিশপ্ত কর্জ আমাদের কোমর ভেঙে দিয়েছে। একটাকার জায়গায় দশটাকা আমরা দিয়ে দিয়েছি। তবুও সাহুকারের বইতে (চৌপড়ি) কুড়িটাকা বকেয়া লেখা আছে। আমাদের জমি আর ইজ্জত এই কারণেই গেছে। আমরা গোলামও হয়ে গেছি। এখানে এক নতুন ধরণের “সাহুকার জমিদার” জন্ম নিয়ে নিয়েছে। তাই কংগ্রেসের মন্ত্রিরা দয়া করে এই সাহুকারদের সমস্ত কাগজপত্র নিজের কাছে আনিয়ে নিক। তারপর হয় বোম্বাইয়ের পাশেই সমুদ্রে ডুবিয়ে দিক আর নয় তো বুড়ির ঘর করে পুড়িয়ে দিক। আর যদি হুকুম হয় তো আমরাই তাপ্তির জলে ডুবিয়ে দি। নইলে আমাদের এই জীবনটা যে ভার হয়ে গেছে সেটা শেষ হয়ে যাবে।

দেখলাম যে কথাগুলো শুনেই কৃষকদের চেহারা খুশিতে ভরে উঠল। তারপর সভার কাজ শেষ করে আমরা হরিপুরা পৌঁছোব ভাবলাম। খেয়াল হল যে মোটর লরিগুলো তো লাগাতার ছুটছেই। এক পলকে আমরা পৌঁছে যাব। তাই ওখান থেক সড়কে উঠে এলাম আর লরির অপেক্ষা করতে লাগলাম। কয়েক ঘন্টা পেরিয়ে গেল। ডজন খানেক লরি ইতিমধ্যে এল আর চলে গেল। হাজার চেষ্টা করলাম যে থামুক কিন্তু একটাও থামল না। নিরুপায় হয়ে জীবনভাইয়ের সাথে হাঁটতে হাঁটতে এগোলাম। উনি বললেন যে একটু দূরে যে গ্রামটা পাকা সড়ক থেকে সরে গিয়ে পড়ে ওখান থেকেই একটা গরুর গাড়ি নিয়ে হরিপুরা যাব। ব্যস, গ্রামের দিকে চলতে শুরু করলাম। দু’তিন মাইল চলার পর গ্রাম এল।

গ্রামে পৌঁছোবার আগেই আমি জীবন ভাইয়ের কাছে রানিপরজ এবং কৃষকদের অবস্থা জানতে চাইলাম। উনি নিজেও রানিপরজ বিরাদরিরই মানুষ। তাই ওদের অবস্থা ঠিক ঠিক বলতে পারতেন। ওপর ওপর মনে হত যে জীবন ভাই গান্ধীজি এবং সর্দার বল্লভ ভাইয়ের খুব ভক্ত। আগে কংগ্রেসে অনেক কাজও করেছেন। কিন্তু তিনি নিজের ভাইদের কষ্টের যে হৃদয়-বিদারক বর্ণনা করলেন তা শুনে আমার রক্ত গরম হয়ে উঠল। বলতে বলতে ওনারও মুখচোখ বদলে গিয়েছিল। বললেন, যদি কোনো রানিপরজের কাছে অনেক জমি থাকে এবং নিজের গরীব ভাইকে দিয়ে চাষের কাজ করায় তাহলে কাজ করা ভাইয়ের পরিবারকে নিজেরই বাড়ির একাংশে স্থান দিয়ে সে পরিবারকে নিজের পরিবারে শামিল করে নেবে। কিন্তু সাহুকার, পারসি বা প্যাটেল যদি সেই কাজ গরীব রানিপরজকে দিয়ে করায় তাহলে দিনের বেলায় জোয়ারের রুটি আর কোনো তরকারি তাকে খেতে দেবে যাতে মশলার নামে শুধু লাল লঙ্কার বিচি থাকবে, লঙ্কাটাও নয়। আসলে গুজরাটে ওই বিচিগুলো বার করে ফেলে দেওয়া হয়। খায় না। তাই সাহুকার ওই ফ্যালনা জিনিষগুলো গরীবের তরকারিতে ঢেলে দেয়। সন্ধ্যেবেলায় দুই সের জোয়ার বা এক-দেড় আনা পয়সা দিয়ে দেয়।

এর পর যা কিছু তিনি বললেন বা বলতে চাইলেন তা অত্যন্ত বীভৎস ছিল। তাঁর চোখ ছলছল করে উঠল। নিজেরই বিরাদরির সম্মানের কথা যে! বললেন, আমাদের যে ভাইয়েরা সাহুকারের দেনায় জড়িয়ে আছে তাদের জোয়ান মেয়ে বা ছেলের বৌদের এই রাক্ষসেরা কখনো কখনো জবরদস্তি কাজ করাবার জন্য ডাকিয়ে নেয়। এখন আপনি নিজেই ভাবুন যে ওদের ধর্ম কি করে বাঁচবে … ইত্যাদি। তিনি এই কথাগুলো বেশ জোর দিয়ে বললেন আর বললেন যে দুবলা নামে খ্যাত গরীব কৃষক এবং তাদের বউবেটিদের সম্মান বিপন্ন।

তাতে আমি বললাম, “কিন্তু আমরা যে এই কিসান-সভা করছি, এটা তো সর্দার বল্লভ ভাই পছন্দ করেন না। যখন নাকি ওনার নিজেরই দুবলাদের জন্য কাজ করা উচিৎ ছিল আর গান্ধীজিরও উচিৎ ছিল এ বিষয়ে ওনাকে উপদেশ দেওয়া। এটা কেমন কথা যে গান্ধীজি এ বিষয়ে চুপচাপ? উনিও পছন্দ করেন এই পরিস্থিতি?” তখন উনি বললেন, “এতে গান্ধীজির দোষ নেই। আসলে লিডাররা গন্ডগোল পাকায়।” আমি আবার বললাম, “কিন্তু গান্ধীজি যে আমাদের কিসান-সভাকে পছন্দ করেননা, সেটা সত্যি কথা। তাহলে আমি কি করে মানি যে শুধু লিডারদের ভুল, তাঁর ভুল নেই? আর এই অবস্থায় আপনি যদি কিসান-সভা করেন, উনি আপনার ওপর রাগ করবেন।” তারপর আর কি, উনি পুরোপুরি খোলা কথায় চলে এলেন। বললেন, “গান্ধীজি নিজের কাজ করেন আর আমরা নিজের। আমরা কিসান-সভাতেই কৃষকদের উদ্ধার দেখতে পাই। কংগ্রেসের দ্বারা কিসসু হবে না। তার জন্য যদি গান্ধীজি আমাদের ওপর রাগ করেন তো আমরা কী করব? আমরা তো কিসান-সভা করবই।” ব্যস, আমি বুঝে গেলাম যে যখন শুরুতেই জীবন ভাইয়ের মত কৃষকেরা কিসান-সভার প্রয়োজন এবং গুরুত্ব এত সহজে বুঝতে পারছে, গুজরাটেও কিসান-সভা জীবন্ত প্রতিষ্ঠান হয়েই ছাড়বে। যখন নাকি সভার কাজকর্ম এখনো তাঁরা দেখেনইনি। এতে পরিষ্কার যে পরিস্থিতি (objective conditions) কিসান-সভার অনুকুলে। শুধু পথ-প্রদর্শক এবং সাচ্চা কর্মীর (subjective conditions) অভাব।

এসব কথার মধ্যেই আমরা সেই গ্রামে গিয়ে পৌঁছোলাম এবং এক কৃষকের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম। গরুর গাড়ির ব্যবস্থা হতে লাগল। সন্ধ্যেও নেমে আসছিল। একটু পরে গাড়ি তৈরি হয়ে এসে পড়ল এবং আমরা তাতে চেপে রওনা হয়ে গেলাম। রাস্তায় আমি গাড়ি হাঁকতে থাকা কৃষকের সাথে হরিপুরা নিয়ে কথা বলা শুরু করলাম। জিজ্ঞেস করলাম যে ওখানে বিঠ্‌ঠল নগরে কাজ করার জন্য এদিককার লোকে যায় কিনা, আর যদি যায় তাহলে প্রতিদিন মজুরি পায় কিনা। এ প্রশ্নের উত্তর সে দিল যে ওখানে রেলওয়ে বা সড়ক তৈরি ইত্যাদিতে যারা কাজ করে তারা দশ আনা করে পায়। কংগ্রেসের কাজেও তার থেকে সামান্যই কম পাওয়া যেত। কিন্তু পরে যখন বেশি করে লোকে কাজ করতে যাওয়া শুরু করল তখন মাত্র ছয় আনা দেওয়া শুরু হল। এর বিরুদ্ধে হো-হাল্লাও হল অনেক। কিন্তু শোনে কে? বোধহয় ঝড় উঠলে তখন কেউ শুনবে। কিন্তু মজদুর তো ভুখা। তাই যা পায় তাকেই ভবিতব্য মেনে নেয়। আরো এরকম সব কথা সে বলল। শুনে আশ্চর্য হলাম না আমি। কংগ্রেসি লিডারদের মনোবৃত্তি তো আমি জানতাম। কিন্তু ওদের এই দুঃসাহস, নির্লজ্জতা এবং হৃদয়হীনতায় ক্রোধ হল অবশ্যই। মনে ভাবলাম যে এরাই নাকি গরীবদের স্বরাজ্য এনে দেবে। এটাই গ্রামাঞ্চলের কংগ্রেস যেখানে গাঁয়ের মানুষেরা সেটুকুও মজুরি পায়না যেটুকু সরকারি ঠিকেদার দেয়। এরই জোরে গান্ধীজি অব্দি দাবি করে ফেলেন যে কৃষকদের সবচেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠান কংগ্রেস – “The Congress is the Kisan organisation par excellence!” আমি খুশি ছিলাম যে শুধু গাড়ি হাঁকনেওয়ালা মানুষটাই নয়, যেমনটা ওর কথায় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে ওই গ্রামাঞ্চলের সমস্ত মানুষই ভিতরের ব্যপারগুলো ভালো করে বুঝতে পারছিল।

রাতে আমরা বিঠ্‌ঠলনগরে পৌঁছোলাম এবং সেখানেই থাকলাম। পুরো আঠেরো টাকা দিয়ে আমরা একটা কুঁড়েঘর ভাড়ায় নিলাম যাতে মাত্র তিনটে চারপাই আঁটে। এটাই গরীবদের কংগ্রেস! এখানে একটাকার কমে তো একটা মানুষেরও এক দিনের জন্য পেট ভরবে না। জিনিষপত্রের এত দাম যে বলার মত নয়। জল্লাদের মত নির্মমভাবে তো দোকানদারদের কাছ থেকে ভাড়া উশুল করা হয়। গ্রামাঞ্চলে হওয়া সব কংগ্রেসে এই অবস্থাই হয়। দিন প্রতি দিন জিনিষের দাম বাড়তে থাকে।

যাহোক, হরিপুরায় তো আমাদের নিজেদের কাজ করার ছিল। কৃষকদের দীর্ঘ মিছিল বার করার ছিল। মিটিংও করার ছিল। কিন্তু জানতে পারলাম যে সর্দার বল্লভ ভাইয়ের কড়া হুকুম, তাঁর আজ্ঞা ছাড়া বিঠ্‌ঠলনগরের ভিতরে যেন কোনো মিটিং বা প্রদর্শন না হয়। কথাটা আমার খারাপ লাগল। আমি বললাম সর্দার সাহেব বা তাঁর অভ্যর্থনা সমিতির কোনোভাবেই এ অধিকার থাকতে পারে না যে আম রাস্তায় মিছিল আটকে দেবে। যতক্ষণ পুলিস বা ম্যাজিস্ট্রেটের এ ধরণের কোনো নির্দেশ না থাকবে ততক্ষণ আমাদের কেউ আটকাতে পারবে না। হ্যাঁ সরকারি নির্দেশনামা এসে গেলে আইন ভাঙার প্রশ্ন এসে যাবে। কিন্তু সর্দার বা তার সঙ্গীদের পুলিশের অধিকারও নেই, ম্যাজিস্ট্রেটের অধিকারও নেই। তাহলে ওদের নাদিরশাহির সামনে মাথা নোয়াব কেন?

ফল হল যে আমি এবং আমার সঙ্গী ইন্দুলাল যাজ্ঞিক এবং অন্যেরা কাউকেও জিজ্ঞেস করতে গেলাম না এবং মিছিল বেরুলো পুরো ঠাটবাটের সাথে। পঁচিশ তিরিশ হাজারের কম লোক ছিল না। সাহুকারদের থেকে পরিত্রাণ দেওয়ানো এবং হালী প্রথা মেটানো ইত্যাদির স্লোগান প্রধান ছিল। হালী এবং দুবলা বা গোলামি সব একই। মিটিংও খুব ভালো করে হল। আমিই অধ্যক্ষ ছিলাম। আমি ছাড়া যাজ্ঞিক, ডাঃ সুমন্ত মেহতা ইত্যাদি অনেকে বক্তব্য রাখলেন।

সর্দার বল্লভ ভাই এসব দেখে ভিতরে ভিতরে রেগে কাঁই হয়ে গেলেন সত্যি। কিন্তু নিরুপায় ছিলেন। তাই অন্য কোনো ভাবে নিজের মনের রাগ বার করতে থাকলেন। মাঝে মধ্যেই, কোনো কারণ থাক বা না থাক আমাদের নিয়ে ফোড়ন কাটতে থাকলেন। এক বার তো ওখানকার পালিত গরুর বিষয়ে লেকচার দিতে গিয়ে বলে বসলেন আমরা তো এই গরুদেরই পছন্দ করি যারা না কোনো প্রস্তাব রাখে না কোনো সংস্কার পেশ করে। এরা তো বিপ্লব আর জমিদারি উচ্ছেদ বা পূঁজিবাদ মেটানোর কথাও বলে না। কিন্তু দুধ দিয়ে যায়। যাতে আমাদের কাজ চলে। এ ধরণেরই অনেক প্রসঙ্গ এল।

এক বার তো খাস বিষয় সমিতিতেই বিনা কারণে এবং কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই বিশেষ করে আমায় এবং সাধারণ ভাবে সমস্ত বামপন্থীদের উদ্দেশ্য করে কে জানে কী কী সব বলে গেলেন। এত বেশি হয়ে গেল যে সবাই রেগে আগুন হয়ে গেল। ফলে আমরা অনেক চিৎকার চ্যাঁচামেচি করলাম এবং সভাপতি শ্রী সুভাষবাবুর ওপর চাপ দিলাম যে ওনাকে থামান। প্রথমে তো সভাপতি মশাই ইতস্তত করতে রইলেন আর সর্দার সাহেবও বেপরোয়া হয়ে বকে চললেন। কিন্তু যখন পরিস্থিতি প্রতিকুল হয়ে উঠল এবং চিৎকার খুব বেশি হওয়া শুরু করল তখন সভাপতি মশাই বল্লভ ভাইকে থামালেন। পরিণতি হল যে বল্লভ ভাই হঠাৎ মুখ ঝুলিয়ে বসে পড়লেন। এভাবে বারদৌলির ভূমিতেই তাঁর নাক কাটা গেল এবং সিংহ নিজের কোটরেই কোতল হয়ে গেল।

হরিপুরার পর, কয়েক মাস কেটে গেলে আবার গুজরাট সফরের সুযোগ ঘটল। এবার শ্রী ইন্দুলাল যাজ্ঞিক এবং তাঁর সঙ্গীরা গুজরাটের প্রায় প্রত্যেকটি জেলায় সংগঠিত কৃষকদের সভা করলেন। আহমেদাবাদ শহরেই শুধু নয়, গ্রামেও একটা সভা হল। হরিপুরার পর কৃষকদের বেশ কয়েকটি সংগঠিত লড়াইও হয়েছিল এবং বিশেষ করে বরোদা রাজ্যে শ্রী যাজ্ঞিক এবং আমাদের প্রধান কিসান-সেবকদের তীব্র নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল। ওঁদের অনেকগুলো মিটিং, ১৪৪ ধারার নোটিশ জারি করে এবং পুলিশ লেলিয়ে দিয়ে আটকান হয়েছিল। তবুও লড়াই জারি রইল। যখন নাকি বরোদার সরকারের আইন ছিল যে কৃষকদের কাছ থেকে খাজনাই নিতে হবে, ভাগের ফসল নয়। তবুও সাহুকার জমিদারেরা এ কথা মানত না। বরং, বছরে দুটো ফসল হলে দুটো ফসলেরই আদ্ধেক অংশ নিয়ে নিত। ফলে কৃষকেরা ফসলের ভাহ দিতে অস্বীকার করল। সরকারের তো এ ব্যাপারে কৃষকদের এবং কিসান-সভার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু বিপরীতে, নির্যাতনের চক্র চালু হয়ে গেল। আসলে সরকার তো মালদারদেরই। তাই ধনীদের রক্ষা করা যে কোনো পরিস্থিতিতে ওদের কর্তব্য হয়ে যায়। মালদারেরা আইন ভাঙলেও কিছু নয়। শোষিত জনগণকে মাথা ওঠাতে দেওয়া হবে না। আইন আসল সত্যি নয়, আসল সত্যি হল রোজগার করা, কিন্তু লুন্ঠিত হতে থাকা জনগণকে যেমন করে হোক দাবিয়ে রাখা। আইনও এই কারণেই তৈরি করা হয়। কিন্তু কোনো কারণে যদি আইনেরই সুবিধে নিয়ে জনগণ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে তাহলে সেই সুবিধের থেকে বড় ভুল আর কী হতে পারে? এটাই কারণ যে জমিদারেরা এবং মালদারেরা আইন ভাঙলেও সরকার এড়িয়ে যায়। ওদের প্রভাব প্রতিপত্তি এবং টাকা থাকার কারণে সরকার বাহানা পেয়েই যায় ওদেরকে বাঁচিয়ে নেওয়ার। পুলিস ওদের বিষয়ে রিপোর্ট করেই না। তাহলে সরকার আর কী করবে? আর যদি কোথাও দু’এক জায়গায় কৃষক মাথা ওঠাবার সুযোগ পেয়ে যায় তাহলে তো বিরাট কিছু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকেই। কেননা, “বুড়ির মরার ভয় ততটা নয় যতটা যমের রাস্তা খুলে যাওয়ার”! বরোদা রাজ্যে কৃষকদের লড়াইগুলো এসব ব্যাপার স্পষ্ট করে দিল।

আহমেদাবাদের সভার পর আমাদের সফর ছিল খেড়া জেলায় – সেই খেড়া জেলায় যেটা শুধু ইন্দুলালজীরই জেলা নয় সর্দার বল্লভ ভাইয়েরও জন্ম ওই জেলাতেই হয়েছে। আমাদের মিটিংগুলো একদম অজ পাড়াগাঁয়ে ছিল। স্টেশনে নেমে বেশ কয়েক দিন গ্রামে গ্রামেই ঘুরে বেড়াবার এবং এভাবে ডাকোরের কাছে রেললাইন ধরার সুযোগ হল। কিছুটা দূর লরিতে এবং বেশির ভাগ পথ গরুর গাড়িতে পেরুতে হল। এবার আমরা এমন এলাকায় গেলাম যেখানে আজ অব্দি কংগ্রেসের কোনো বিশেষ প্রভাব পড়েনি। এটা জেনে আমার খুব আনন্দ হল। অভিজ্ঞতাও খুব আনন্দের হল।

আসলে খেড়া জেলার অনেকটা বড় অংশে ক্ষত্রিয়দের এক বাহাদুর জাতি থাকে যাদের ধারালা বলে। এরা আহমেদাবাদ জেলাতেও বড় সংখ্যায় থাকে। আমার এটা জেনে খুব কষ্ট হল সরকার এই সাহসী জাতিটিকে দুর্বৃত্ত জাতি ঘোষিত করে রেখেছে। আসলে বিদেশি সরকারের নীতি সবসময় এমনই হয় যে যেন লোকজনের মধ্যে পৌরুষ না থাকে। কিন্তু আপশোষের কথা যে কংগ্রেসি মন্ত্রিরাও এই কলঙ্ক মুছবার চেষ্টা করেনি, যার কারণে ধারালা লোকেদের এখনও তেমনই মনে করা হয়। আগে গান্ধীজির ‘নবজীবন’ এবং ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ পড়ে আমারও এদের সম্পর্কে এমনই ভুল ধারণা ছিল। কিন্তু সফর করার পর জানলাম যে সমস্ত কথা ভুল। এরা নিজেদের কাছে লম্বা লম্বা লাঠিতে দা লাগিয়ে রাখে যাকে ধারিয়া বলে। ধারালা নামটা এই ধারিয়া থেকেই এসেছে। জঙ্গলে কাঠ ইত্যাদি কাটা এতে খুব সহজভাবে হয়। আমি খুব আনন্দিত হলাম যে এরা চিরকাল কংগ্রেসের বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও আমাদের কিসান-সভাকে শুধু আপনই করল না, কাজেও খুব দৃঢ়তা দেখাল। ওরা এই প্রতিষ্ঠানকে নিজের বলে মেনে নিল। এর প্রমাণ আমি সেই সফরে প্রত্যক্ষ পেলাম। সাহুকারেরা আজ অব্দি যে বেলাগাম লুট চালিয়েছিল তা থেকে বাঁচার রাস্তা ওরা কিসান-সভাতেই পেল। কেননা সভার নীতি এই ব্যাপারে পরিষ্কার। তাই কংগ্রেস থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা সত্ত্বেও ওরা কিসান-সভার দিকে ঝুঁকল। কংগ্রেসের নীতি তো গোলমেলে।

খেড়া জেলার গ্রামগুলোয় ঘুরতে ঘুরতে আমরা ডাকোর থেকে সাত-আট মাইল দূরের রেলস্টেশন কালোল পৌঁছোলাম। এটা ভালো শহর। ব্যাপারি এবং সাহুকার প্রচুর সংখ্যায় থাকে। আমাদের সফরে এদের ভিতর এক ধরণের কাঁপুনি শুরু হয়ে গিয়েছিল যদিও আমরা সেটা ঠিক মত জানতাম না। সর্দার বল্লভ ভাইয়ের সাঙ্গোপাঙ্গরাও চুপচাপ বসে ছিল না। আমরা তো ওদের দুর্গেই আক্রমণ করছিলাম। যে গুজরাটকে আজ অব্দি গান্ধীবাদের দুর্গ মনে করা হত সেখানেই কিসান-সভার দ্রুত প্রসার নেতাদের গলায় বিঁধছিল। তাই আমাদের বিরুদ্ধে যা-ইচ্ছে-তাই প্রচার করে এবং আমাদের কংগ্রেস-বিরোধী প্রচার করে ওরা মধ্যবিত্ত মানুষদের আমাদের বিরুদ্ধে ওস্কাচ্ছিল। আর কালোল শহর তো মধ্যবিত্তদেরই জমায়েত।

একটা ব্যাপার আরো ইতিমধ্যে হয়ে গিয়েছিল। এর আগে গ্রামাঞ্চলে আমাদের যে অনেকগুলো লেকচার হয়েছিল তাতে সাহুকার এবং সুদখোরদের লুটের ভালো ভান্ডাফোড় করেছিলাম। আমরা বলেছিলাম যে কৃষকদের সমস্ত কর্জ মকুব করে দেওয়া হোক। এতে সাহুকারদের মধ্যে গুঞ্জন ওঠা স্বাভাবিক ছিল। ওরা ভাবল যে এ তো আমাদের বড় এক শত্রু দাঁড়িয়ে গেল। ওরা বুঝতে পারছিল যে যদি এধরণের লেকচার কৃষকদের মধ্যে হওয়া শুরু হয়ে যায় তাহলে কৃষকেরা ওদের একটাও কথা শুনবে না, নির্ভীক হয়ে উঠবে এবং ওদের দেউলিয়া করে ছাড়বে। পঞ্চমহাল জেলার গুসর মৌজায় পরে শ্রী জবের ভাই নামের কৃষক তেমনটাই করল। অন্য জায়গাতেও এধরণের ঘটনা ঘটল। তাই ওদের ভয় পাওয়া এবং সতর্ক হওয়া স্বাভাবিক ছিল।

যেদিন আমরা কালোল পৌঁছোলাম তার ঠিক এক দিন আগে একজন সাহুকারের সাথে এমন ঘটনা হয়ে গেল যে সে চমকে উঠল এবং খুব সম্ভব যে সেও কালোলে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। ঘটনাটা এমন হল যে সে কৃষকদের বাজে খরচ করার অভ্যাসের সমালোচনা করতে গিয়ে বলে ফেলল যে এরা শহরে গিয়ে সেলুনে চুল কাটায়। সেলুন ইংরেজ ধরণের জায়গা যেখানে নাপিতরা বাবুয়ানি ঢঙে চুলদাড়ি কাটে আর মজুরিতে বেশি পয়সা নেয়। সাহুকারের চোখে এটা লাগত যে এরা তার কর্জ আর সুদ না চুকিয়ে ফালতু খরচ করে। তাই সে আমায় নালিশ জানাল এ বিষয়ে।

আমি বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম এমনকি নিয়মিত হয়, না কখনো কখনো? সে উত্তর দিল কখনো কখনো। তখন আমি ওকে বকলাম যে এই ব্যাপারটাই তোমার বিঁধে গেল? কৃষকেরা তো পাথর নয়! ওরাও মানুষ! ওদেরও ইচ্ছে আছে, কামনা আছে। তাই কখনো কখনো সেগুলো পুরো করে। যারা এদেরই রোজগারের পয়সা সুদ, কর্জ আর খাজনার নামে লুটে নিয়মিত সেলুনে যায় আর ফুর্তি ওড়ায়, তাদের লজ্জা হওয়া উচিৎ, কৃষকদের নয়। এরা তো নিজেরই রোজগারের পয়সা দিয়ে কখনো কখনো এমন করে আর সেটা স্বাভাবিক। অথচ আপনার চোখে বড়লোকের চালচলন না বিঁধে এদেরটাই কেন বেঁধে? এরা কাকে লুটে সেলুনে যায়? এ কথায় সে সাহুকার ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সে তো আমায় গান্ধীবাদীদের মত সমাজ-সংস্কারক ভাবত। ফলে আমার কথায় ও ঘাবড়ে গেল। বোধহয় কালোলে সেই বেশি উত্তেজনা ছড়িয়েছিল।

হ্যাঁ, তো কালোলে পৌঁছে শহরের বাইরে, রেলস্টেশনের কাছেই একটা বাগানে আমরা উঠলাম। আমাদের থাকার ব্যবস্থা আগে থেকেই ওখানে করা ছিল। বাগানে আগে একটা কারখানা ছিল যেটা ধ্বংসস্তুপ হয়ে পড়েছিল। শহরের দু’একজন প্রতিষ্ঠিত এবং শিক্ষিত মানুষ ওখানে আমার সাথে দেখা করতে এল। এটাও জানলাম যে ওরাই আমাদের সভার ব্যবস্থাও করেছে। শ্রী ইন্দুলালজীর সাথে ওদের পুরোনো পরিচয়। আমি আনন্দিত ছিলাম যে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত লোকেরাও আমাদের সঙ্গে আছে। ওদেরই নামে সভার নোটিশও বিলি হয়েছিল। সভার সময় ছিল সন্ধ্যায়, আলো জ্বলার পর। আমিও নিশ্চিন্ত ছিলাম। কেননা ভিতরে চলতে থাকা উত্তেজনা এবং আমাদের বিরুদ্ধে হওয়া প্রস্তুতির বিষয়ে আমি জানতাম না। অন্যেরাও বোধহয় জানত না। নইলে আমায় বলত নিশ্চয়ই যাতে আমি আগে থেকে সজাগ হয়ে যাই। কিন্তু বিরোধীরা চুপচাপ নিজেদের প্রস্তুতি করে রেখেছিল।

যখন সন্ধ্যের পর আমরা সভার দিকে এগোলাম, তো দেখলাম যে শহরের মধ্যে যাচ্ছি। অবাক হলাম, এ কেমন ব্যাপার! ঘন বাড়িঘরের মাঝ দিয়ে কোথায় যাচ্ছিলাম বোঝা অসম্ভব ছিল। ইতিমধ্যে আমরা এমন জায়গায় পৌঁছেছি যেটা চারদিকে উঁচু উঁচু বাড়ি দিয়ে ঘেরা। মাঝখানে যে জায়গাটা খালি ছিল সেখানে অনেক পরিচ্ছন্ন জামাকাপড় পরা লোক জমা হয়েছিল। সবাই দাঁড়িয়েছিল। বসার জন্য কোনো সতরঞ্চি বা বিছানাও দেখতে পেলামনা। আমি ভাবলাম এমনিই কোনো কাজে লোকে দাঁড়িয়ে আছে তাই এগিয়ে চললাম। কিন্তু বলা হল যে এটাই সভাস্থল। অবাক হলাম যে শহরের সভা আর এধরণের তৈয়ারি! বুঝতেই পারলামনা কি ব্যাপার। এরি মধ্যে কেউ ইশারা করে দিল যে এই স্বামীজি। ইশারাটা আমি তো জানতেও পারলাম না। কিন্তু বিরোধিদের প্রস্তুতি এমন ছিল যে কারোর ইশারা তারা বুঝতে পারছিল।

ব্যস, তারপর যা হল কি বলব! কেউ এমনও ছিল না যে আমায় বসতে বলে। এমনকি কেউ কোনো কথাও বলল না আর চার দিক থেকে অদ্ভুত ‘সী-সী’ আওয়াজ আসা শুরু করল। এমন আওয়াজ আমি প্রথম শুনলাম। হাজার হাজার কৃষক-সভা করেছি। বিরোধীদের ভীড়ে গিয়ে বক্তব্য রেখেছি এমনকি হরিপুরার আগে সুরাট জেলার বিলিমোড়া স্টেশন থেকে একটু দূরের এক শহরে আমাদের সভা হয়েছিল যেখানে গান্ধীবাদী ভরে ছিল। কিন্তু এমন অবস্থা ওখানে দেখিনি। ওরা সভ্য ভাবে সম্মানের সাথে আমায় প্রশ্ন করেছিল নিশ্চয়ই যার জবাব আমি দিয়েছিলাম। কিন্তু এমন তারা করেনি। এখানে তো শোনার লোক বলতে কেউ ছিল না। মনে হচ্ছিল এমনিই ‘সী-সী’ আর ‘হু-হু’ করে বা টিটকিরি মেরে এরা আমাদের ভাগিয়ে দিতে চাইছে। টিটকিরির কথাও বলা হচ্ছিল। কেউ কেউ আমায় সন্ন্যাসীর ধর্মও শেখাচ্ছিল। কিন্তু পরোক্ষ ভাবে, যেমনটা হয়ে থাকে।

প্রথমে তো আমি আর যাজ্ঞিক দুজনেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। কিন্তু পরে ভাবলাম যে এখানে তো যেমন করে হোক একটা নিষ্পত্তি করতেই হবে। মাড় খেতে হলে খাব, কিন্তু সভা করেই পিছু হটব। এরই মধ্যে একটা দেওয়ালের পাশের চত্ত্বরে আমরা দুজনে গিয়ে দাঁড়ালাম এবং যাজ্ঞিক বলার চেষ্টা করলেন। প্রথমে তো ওরা শুনতেই রাজি ছিল না। ওদের ‘সী-সী’ চলতে থাকল। কিন্তু আমি বা যাজ্ঞিক শিশুও ছিলাম না আর ক্লান্ত হওয়ার পাত্রও ছিলামনা। তাই যাজ্ঞিক বলার চেষ্টা লাগাতার চালিয়ে গেল। ফল হল যে যারা বাধা দিচ্ছিল তারাও শুনতে বাধ্য হল। কতক্ষণ ‘সী-সী’ করত? ওদের ক্লান্ত হওয়া অবধারিত ছিল। আমাদের তো উদ্দেশ্যটাই পবিত্র। তাতে যে মেতে যায় সে আবার ক্লান্ত হয় নাকি? উদ্দেশ্যটা মহানও। শোষিত এবং উৎপীড়িতের উদ্ধারই আমাদের উদ্দেশ্য। তার ওপর আমাদের অটল বিশ্বাস। কাজেই আমরা ক্লান্ত হব কেন? বরং এমন বাধা পেলে আমাদের সাহস আরো বাড়ে। কিন্তু ওদের উদ্দেশ্য তো মহান আর পবিত্র ছিলনা। তাই ক্লান্তই বা হতনা কেন?

যখন ওরা চুপ হয়ে গেল তখন আমাদের সাহস আরো বাড়ল। তারপর তো শ্রী ইন্দুলাল নিজের লেকচার জোরদার করলেন আর ধীরে ধীরে ওদের এমন বশ করলেন যে সে কী বলব! তিনিও তো ওই খেড়া জেলারই মানুষ। কালোলের অনেক লোকে তাঁর ত্যাগ এবং জনসেবার বিষয়ে ভালো করে জানত। অনেক দিন পর্য্যন্ত উনি গান্ধীজির প্রাইভেট সেক্রেটারি ছিলেন। লেখা পড়া করে, ওকালতি পাশ করে উনি নিজেকে দলিতের সেবায় সমর্পিত করেছেন। বিয়েও করেননি। এসব কথা খেড়ার লোকেরা জানবে না এমন তো সম্ভব ছিলনা। সে কারণেই বিরোধীদের তিনি মিষ্টি মিষ্টি করে অনেক কথা শোনালেন।

তারপর আমার পালা এল। আমি দাঁড়ালাম আর বক্তৃতা বয়ে চলল। দেখলাম যে ওদের কংগ্রেসের মন্তব্য এবং প্রস্তাব দিয়েই ঘায়েল করা ভালো হবে। তাই কংগ্রেসের নির্বাচনী ঘোষণা, ফৈজপুরের প্রস্তাব এবং লখনউয়ের প্রস্তাব উল্লেখ করে আমি ওদের বললাম যে যদি ওরা কংগ্রেসের ভক্ত হয় তাহলে শিগগিরই কৃষকদের কর্জ থেকে, জমিদারদের অত্যাচার থেকে এবং বর্দ্ধিত খাজনা থেকে মুক্তি দিতে হবে। ও বেচারারা কী জানতে গেল যে প্রস্তাব কী আর লিডাররা কংগ্রেসের মন্তব্যের বিরুদ্ধেই কাজ করছে? ওদের তো যা বোঝান হয়েছিল তেমনটাই মেনে নিয়ে আমায় কংগ্রেসের বিদ্রোহী বলে দেগে দিয়েছিল। আমি ওদের প্রশ্ন করলাম, অপরাধ কেউ করবে আর অপরাধী ঠাউরানো হবে অন্য কাউকে? ওদের আহ্বান করলাম, আমার একটা কথারও উত্তর দিয়ে দিলে আমি হার মেনে নিতে প্রস্তুত। কয়েক ঘন্টা আমার বক্তৃতা চলল আর এমন শান্ত রইল পরিবেশ যে কী বলব। এবার তো আর কেউ টুঁ শব্দটিও করছিল না। আমার পর স্থানীয় এক ভদ্রলোক বললেন তারপর সভা শেষ করে দেওয়া হল।

পরে তো ‘সী-সী’ করনেওয়ালারা ভালোই বুঝতে পারল যে তারা ধোঁকায় ছিল। যখন আমি শুধু ওদের নয়, ওদের বড় বড় নেতাদেরও প্রশ্নে চেপে ধরলাম তখন তারা আর কী করতে পারত? আসলে মধ্যবিত্ত মানুষদের এভাবে দিকভ্রান্ত করে ঘাঘু লোকেরা নিজেদের কাজ হাসিল করে। ওখানেই আমি প্রত্যক্ষ করলাম যে মধ্যবিত্ত মানুষেরা কী বিপজ্জনক হয় এবং হতবুদ্ধির মত এদিক থেকে ওদিকে ঢলে যেতে থাকে। প্রথমে তো আমার শত্রু ছিল তারা। কিন্তু এমন পিছু হটল যে কী বলব। যা হোক, ওদের বিরোধের কল্যাণেই আমাদের কিসান-সভার খাতির ভালোই বাড়ল।

২০

লখনউ কংগ্রেসের পরেই ১৯৩৬ সালে বিহার প্রাদেশিক ওয়র্কিং কমিটির মিটিং ছিল। আমিও উপস্থিত ছিলাম। লখনউয়ে কংগ্রেস যে প্রস্তাব কৃষকদের অবস্থা নিয়ে তদন্ত করার জন্য পাস করেছিল এবং প্রাদেশিক কমিটিগুলোর কাছ থেকে রিপোর্ট চেয়েছিল যে বিভিন্ন প্রদেশে কৃষকদের জন্য কী কী সংস্কারের প্রয়োজন আছে যাতে ওদের কষ্টের লাঘব হয় এবং ওদের আরাম হয়, তার বিষয়েই ছিল এই বিশেষ মিটিং। সেই মিটিংএই কৃষকও তদন্ত কমিটি তৈরি করার ছিল। তৈরি করাও হল। অনেকক্ষণ আলোচনা এবং তর্ক-বিতর্ক চলেছিল। সমস্যাটা ছিল প্যাঁচালো। তাই কমিটির কাজ সহজ ছিল না। শেষে সিদ্ধান্ত হল যে নয়জন সদস্য নিয়ে কমিটি তৈরি হোক এবং তদন্তের কাজ অবিলম্বে শুরু হোক। তাহলেই ফৈজপুর কংগ্রেসের আগে ডিসেম্বর আসতে আসতেই রিপোর্ট তৈরি হতে পারবে।

তখন প্রশ্ন উঠল যে মেম্বার কে কে হবে। এটা তো জরুরি ছিল যে বিহারের সব প্রধান লিডারেরা যারা ওয়র্কিং কমিটিতে ছিল ওই কমিটির মেম্বার হত। হলও তাই। কিন্তু একটা অসুবিধা এল। আমিও ওয়র্কিং কমিটির মেম্বার ছিলাম। কৃষকদের বিষয়ে আমার থেকে বেশি কেউ জানতও না। কমিটিতে থেকে কৃষকদের তেমন সমস্ত প্রশ্ন করা যাতে জমিদারদের সেই অত্যাচারগুলো বেরিয়ে আসে যা তখন অব্দি গোপন – আমিই করতে পারতাম সেগুলো। কোথায় কোন প্রশ্ন করা উচিৎ এবং কখন করা উচিৎ এ সম্পর্কেও সবচেয়ে বেশি আমিই জানতাম। শুধু তাই নয়। রিপোর্ট তৈরি করার সময় আমি সেটাকে কৃষকদের পক্ষে প্রভাবিত করতে পারতাম। আমি না থাকলে বাকি লোকেরা হয় জমিদারের তরফদার হত, বা খুব বেশি হলে দোভাষী হত। কিন্তু কৃষকদের কিছুমাত্র ভালো করতে গেলে, নয়জন সদস্যের মধ্যে একজনের এমন হওয়া অনিবার্য ছিল যে কৃষকদের কথাগুলো ঠিক মত জানত এবং তাদের সমস্ত সমস্যা বুঝত। কোনো কারণও ছিলনা আমায় তদন্ত কমিটিতে না রাখার। সেই সাহসই বা কার হত যে আমার তদন্ত কমিটিতে থাকা আটকায়? পরের বছরের শুরুতেই যে নির্বাচন হওয়ার ছিল, তাতে কিসান-সভার সাহায্যও জরুরি ছিল কংগ্রেসের জন্য। সে কারণেও আমায় রাখতেই হত।

কিন্তু আমি কী করে জানব যে খোদ বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদ ধর্মসঙ্কটে খাবি খাচ্ছিলেন। আমি তো জানছিলাম, অন্যেরাও জানছিল যে তদন্ত কমিটিতে আমার থাকা নিশ্চিত। অন্য কোনো কথা হতেই পারেনা। কিন্তু যখন রাজেন্দ্র বাবু চাপা আওয়াজে বললেন যে স্বামীজি থাকলে জমিদার এবং সরকার, দু’তরফই বলবে, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট তো আসলে কিসান-সভার, কংগ্রেসের থোড়েই, সে তো শুধু বলার জন্য – আমি অবাক হলাম, কী বলছেন? কিন্তু তারপর উনি এও বললেন যে আমরা চাইনা কেউ এমন কিছু বলার সুযোগ পাক। আমরা চাই যে সবার নজরে রিপোর্টটার মূল্য এবং গুরুত্ব থাকুক। আমি আরো বেশি বিচলিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম আপনি এ কী বলছেন? নয় জনের মধ্যে আমি একাই শুধু কিসান-সভার। বাকি তো সবাই খাঁটি কংগ্রেসি, জমিদার এবং জমিদারদের বন্ধু! তাহলে এ কেমন করে হবে যে তাদের কোনো মূল্য থাকবে না আর শুধু আমার থাকার কারণে রিপোর্টটা কিসান-সভার হয়ে যাবে? খোদ রাজেন্দ্রবাবুও তো থাকবেন কমিটিতে। তাহলে কি আমার সামনে ওনারও কোনো মূল্য থাকবে না? কিসান-সভা এবং আমার গুরুত্ব সরকার এবং জমিদারদের নজরে এত বেড়ে গেল? আমি তো শুনে চমকে উঠছি।

আমার এ কথার কী উত্তর দিত ওরা? কোনো কথা থাকলে তবে তো? আর যদি কিসান-সভার অথবা আমার গুরুত্ব এত বেশি মেনে নেওয়া হয় তাহলে কংগ্রেসকে কী বলা যায়? কংগ্রেসকে তো সবার ওপরে রাখা উচিৎ ছিল ওদের! এসব যুক্তির কী জবাব দিত ওরা? তাই বলা শুরু করল যে আপনি থাকলে রিপোর্ট সর্বসম্মত (unanimous) হবে না এবং রিপোর্টটাকে সবার চোখে মূল্যবান করে তুলতে সর্বসম্মত করা জরুরি। তাতে আমি বললাম, আপনারা এখনই কি করে মেনে নিলেন যে রিপোর্ট সর্বসম্মত হবেনা আর আমি এমনিই মিথ্যে মিথ্যে ভিন্ন মত পোষণ করব? আমি তো অনেক দিন ধরে ওয়র্কিং কমিটির মেম্বার এবং সে কমিটিকে অনেক জটিল প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। কৃষক-সম্পর্কিতও নানান প্রশ্ন কমিটির সামনে এসেছে। কিন্তু আপনারা কোনো এমন সময়ের উদাহরণ দিতে পারেন যখন আমি ভিন্ন মতে থেকেছি? অথবা শেষে নিজের আলাদা অভিমত রেখেছি? তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। তা সত্ত্বেও শেষে সিদ্ধান্ত তো আমরা এক মত হয়েই নিয়েছি। তবুও যদি আপনারা এখন থেকেই এটা ধরে বসে থাকেন যে তদন্ত কমিটির রিপোর্টে এমনি এমনিই আমার একটা ভিন্ন রিপোর্ট থাকবে, তাহলে মাফ করবেন, আমি অন্য অভিসন্ধি দেখতে পাচ্ছি। আমি স্তম্ভিত যে এ কী শুনছি আমি!

আরেকটা কথা। ধরুন, মেনেই নিলাম যে বাকি মেম্বারদের সাথে আমার দ্বিমত হবেই। তো? এমন তো সবসময়েই হয়। সবকটি কমিটিতে কি রিপোর্ট সর্বসম্মতই লেখা হয়? নিরানব্বই প্রতিশত রিপোর্টে সবাই একমত হয় না। হয়ত একশটায় একটা হয়। তাহলে কখনো এমনও কি হয় যে প্রথম থেকেই এমন লোকদের মেম্বার করা হল যাদের চিন্তাধারা এক? বরং আমি এটাই দেখেছি, সব সময় দেখি যে এধরণের কমিটিতে বিশেষ করে ভিন্ন ভিন্ন চিন্তাধারার লোকেদেরই রাখা হয়। সেই রিপোর্টগুলো বেশি মূল্যবান হয়, বেশি গুরুত্ব পায় এই কারণেই যে তার কমিটিগুলোতে নানা মতের লোক ছিল। তবুও আপনার উল্টো কথা বলছেন। আপনাদের এই তদন্ত কমিটি কোনো অসামান্য ব্যাপার তো নয়। তাহলে আমি কেন শুনছি যে রিপোর্টে একমত হবে না?

এবার তো কারোর কিছু বলবার জায়গা ছিলনা। সবাই চুপ। অন্যান্য লোকেদের ভাবভঙ্গি দেখে আর বিশেষ করে রাজেন্দ্রবাবুর চেহারা দেখে স্পষ্ট বুঝতে পারলাম যে ওরা বড় রকমের সমস্যায় পড়েছে। ওরা চায় না যে আমি তদন্ত কমিটিতে থাকি। কিন্তু ওদের সমস্যা এটাই যে ওরা আমাকে রাখতে বাধ্য, যদি না আমি নিজেই থাকতে অস্বীকার করি। আমি বুঝতে পারছিলাম না এমন কেন হচ্ছে। আমি কী করে জানব, ওদের মনে পাপ ঢুকে আছে যে রিপোর্ট তৈরিও হবে না আর ছাপবেও না। শুধু নির্বাচনের আগে তদন্তের নাটক করে কৃষকদের ঠকান হবে যাতে তারা ভোট দেয়। এর ভান্ডাফোড় তো তখন হল যখন রিপোর্টের নাম নেওয়াই ওরা বন্ধ করে দিল। উল্টে আমি যখন ওদের এই অবস্থা দেখে ফৈজপুরে অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটিতে প্রশ্নটা তুলেছিলাম ওরা বিচ্ছিরি ভাবে খেপে উঠেছিল। ওদের ওখানেও আমি বকেছিলাম আর এমন কথা শুনিয়েছিলাম যে ওদের মুখ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

হ্যাঁ, তো অবস্থা দেখে আমি নিজেই বললাম, যদি আপনাদের এটাই ইচ্ছে তাহলে নিন, আমি নিজেই কমিটিতে থাকতে অস্বীকার করছি। কেননা দেখছি যে যদি এমনটা না করি তাহলে তদন্ত কমিটি তৈরিই হবে না আর পরে তার জন্য সবাই আমাকেই অপরাধী ঠাউরিয়ে নিজেদের নির্দোষ দেখানোর চেষ্টা করবে। আমি সেটা হতে দেব না। তাই নিজেই সরে যাচ্ছি। কিন্তু এটা কেমন করে হবে যে আপনারা যেমন রিপোর্ট চাইবেন ছেপে দেবেন আর আমি মেনে নেব? ফাইনাল রিপোর্ট তৈরি হওয়ার আগে এবং ছাপার আগে আমাকে তো সুযোগ দিতেই হবে যাতে যুক্তিতর্ক দিয়ে যদি সম্ভব হয়, রিপোর্টটাকে অন্য রূপ দিতে পারি। একথায় সবাই একসাথে বলে উঠল হ্যাঁ হ্যাঁ সে তো হবেই। তদন্তের সময়েও আপনি থাকতে পারেন। কিন্তু তদন্তের কাজ পুরো হওয়ার এবং রিপোর্ট লেখার আগে এক বার কমিটি আপনার সাথে রিপোর্টের সব দিক নিয়ে ভালো করে আলোচনা করে নেবে এবং আপনাকে পুরো সুযোগ দেওয়া হবে যাতে আপনি রিপোর্টকে প্রভাবিত করতে পারেন। তারপর যখন রিপোর্ট তৈরি হবে তখন ছাপার আগে এক কপি আপনার কাছে নিশ্চয়ই পাঠান হবে। যদি আপনার মনে হয় তাহলে তখনও কমিটির সাথে আবার আলোচনা করে তাতে বদল করাতে পারবেন। আমি বললাম ধন্যবাদ! এতেই আমি সন্তুষ্ট হলাম। তখন গিয়ে রাজেন্দ্রবাবু এবং অন্যদের ধর্মসঙ্কট কাটল।

এরপর এক ভিন্ন প্রশ্ন সামনে এল। যত মেম্বার নির্বাচিত হল তার মধ্যে পাটনা এবং শাহাবাদ জেলার একজনও ছিল না আর কৃষক-সম্পর্কিত প্রশ্নের দিক থেকে এই দুটো জেলার গুরুত্ব অনেক। সত্যি যে এই প্রশ্নটা আমি তখনো বুঝতাম না আর আজ অব্দিও বুঝতে পারিনি। সব জেলার মেম্বার না থাকলে কী হয়েছে? আমি তো খুব ভালো করে জানি যে নিজের জেলার কৃষক-সমস্যার বিষয়ে তথ্যাদি প্রায়শঃ লোকে জানেই না। জানবে তো তারা যাদের রুচি থাকবে এবং সব সময় সে বিষয়ে সজাগ থেকে জানার চেষ্টা করে যাবে। এদের মধ্যে কারুর না তো এ নিয়ে কোনো মাথাব্যাথা আছে না ফুরসৎ আছে। তাহলে এ প্রশ্নের মানে কী? বিহারের মোট ষোলটা জেলা মিলিয়ে যদি ন’জন সদস্যেরই তদন্ত কমিটি তৈরি হয় তাহলে প্রশ্নটা ওঠে কিভাবে যে অমুক জেলা থেকে কেউ নেই? হ্যাঁ, কারুর নাম কমিটিতে থাকলে খবরের কাগজে ছাপবে এবং এতে তার খ্যাতি ছড়াবে এটা যদি উদ্দেশ্য হয় তাহলে আলাদা কথা। আর সে দৃষ্টি থেকে পাটনা বা শাহাবাদ থেকে কারুর নাম দেওয়ার থাকে তো দেওয়া হোক।

যাহোক, কিছুক্ষণ বাদে কেউ বলল যে বাবু গঙ্গাশরণ সিং পাটনার। ওনাকেই দিলে কী হয়? প্রায় সবাই বলে উঠল ঠিক আছে, ঠিক আছে। শেষে সিদ্ধান্তও হয়ে গেল যে উনিও একজন মেম্বার হবেন এবং বাবু কৃষ্ণবল্লভ সহায়ও – দুজনেই তদন্ত কমিটির সচিব হবেন। আমি চুপচাপ বসে আশ্চর্যচকিত হচ্ছিলাম। বাবু গঙ্গাশরণ সিং শুধ বিহার প্রাদেশিক কিসান কাউন্সিলেরই মেম্বার নন, বিহার প্রাদেশিক কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টির কাউন্সিল অফ এ্যাকশনেরও সদস্য এবং খাঁটি সোশ্যালিস্ট বলে পরিচিত। আমাকে তদন্ত কমিটির জন্য বিপজ্জনক মনে করা হল কেননা আমি কিসান-সভাবাদী। কিন্তু সোশ্যালিস্টদের তো সোজাসুজি বিপ্লবে পৌঁছে যাওয়া মানুষ মনে করা হয়। বিপ্লবের নিচে তো ওরা কথাই বলে না। তা সত্ত্বেও গঙ্গাবাবু, বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদ এবং তাঁর সঙ্গীদের জন্য শুধু স্বীকার্যই নয়, বরং ওরাই তাঁর নাম পেশ করলেন। এ এক অদ্ভুত ব্যাপার ছিল, সোশ্যালিস্ট স্বীকার্য ছিল কিন্তু আমার মত মানুষ, যে কখনো সোশ্যালিস্ট হওয়ার দাবি করেনা, স্বীকার্য ছিল না। এই বিস্ময় আজ অব্দি মনের মধ্যে রয়েছে। শুধু তাই নয়, যখন আমি সোশ্যালিস্ট নেতা জয়প্রকাশবাবুকে কথাগুলো বললাম উনি নিজেও অবাক হলেন, গঙ্গাবাবু তো সোশ্যালিস্ট, তাহলে কী করে স্বীকার্য হয়ে গেলেন? তাই এই প্রশ্নটা আজ অব্দি যেমন ছিল মনের মধ্যে, তেমনই রয়েছে এবং কে জানে কত দিন থাকবে !  

২১

হাজারিবাগ জেলে এবার যে ঘটনাগুলোর সম্মুখীন হতে হল সেগুলোও খুব মজাদার। কিছু এমন গান্ধীবাদী ওখানে পেলাম যারা হিটলারের জয়ে শুধু এই কারণে খুশি হত যে হিটলার ভারতে চলে আসবে আর কিসান-সভা এবং শ্রমিক-সভার গলা টিপে দেবে। সোভিয়েত রাশিয়ার ওপর হিটলারের আক্রমণে ওরা আরো উৎফুল্ল ছিল। এতদূর আশান্বিত ছিল যে এই হারল, সেই হারল সোভিয়েত বলে নাচতে শুরু করেছিল। ভারতে হিটলার এলে ওদের কী অবস্থা হবে, সেটাও বোধহয় ওরা ভাবত, কিন্তু কী ভাবত সেটা জানতে পারিনি। ওরা এতেই আনন্দিত ছিল যে কৃষক আন্দোলন শেষ হয়ে যাবে। এ চিন্তাও ওদের ছিল না যে তার সাথে ওরা নিজেরাও শেষ হয়ে যেতে পারে। একমাত্র চিন্তা ছিল যে কিসান-সভা কি করে খতম হবে। ওদের মধ্যে এমন লোকও অবশ্যই ছিল যারা স্বরাজ্য নিতে চাইত না, কিন্তু যা ছিল তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইত। তারা জানত, তাদের নিজেদের স্বরাজ্য তো আছেই। জমিদারি বড় এবং টাকাপয়সাও প্রচুর জমা আছে। ঠাটবাট এবং প্রতিপত্তিও আছে পুরোপুরি। কৃষকদের ওপর কর্তৃত্বও খাটে ভালো। স্বরাজ্য আর কাকে বলে? ওরা তো স্বরাজ্যের অর্থ এটাই বুঝেছে। ওদের ভয় যে ওদের এই স্বরাজ্য কৃষক এবং উৎপীড়িত মানুষেরা ছিনিয়ে না নেয়। তাই কংগ্রেস এবং গান্ধীজির লেজ ধরে এই বিপদটা দূর করার জন্য ওরা এখানে এসেছিল। কেননা ওদের বিশ্বাস যে এখানে এলে পর ওদের স্বরাজ্যের রক্ষা গান্ধীজি এবং কংগ্রেস, দুজনেই ঠিক তেমন করেই করবে যেমন করে হিন্দুদের গরু তাদের বৈতরণীতে ডোবার আশঙ্কা থেকে বাঁচায়।

কিন্তু ওদের মধ্যে যারা জমিদার বা মালদার ছিল না তাদের এই মনোভাব দেখে আমার করুণাও হল আর হাসিও পেল। হিটলারের আগমন হলে ওরা আপন স্বরাজ্য কী করে পাবে বোধগম্য হল না। বোধহয় ওদের আপন স্বরাজ্যের ফিকিরও ছিল না। কোনো রকমে জেলে এসেছিল কেননা নেতাগিরি বিপদে ছিল – লাটে উঠত। সেটুকু বাঁচিয়ে নিল তাই কি কম? তাই নিয়েই কামিয়ে খাবে। আজকাল লিডারিও তো একটা পেশা হয়ে গেছে। কিন্তু, যদি হিটলার আসাতে সেই লিডারিও ছিনিয়ে যায়, যাক! তার সাথে কিসান-সভাও তো খতম হবে। ব্যস, এটুকুতেই ওরা সন্তুষ্ট ছিল। একেই বলে “আপু গয়ে অরু ঘালহিঁ আনহিঁ” (নিজেও নষ্ট হয়, সঙ্গদোষে অন্যদেরও নষ্ট করে) অথবা “শত্রুর দুই চোখ গালতে নিজের এক চোখ গেলে নেওয়া”! স্পষ্ট বুঝলাম যে কংগ্রেস একটা জাদুঘর বা চিড়িয়াখানা (Museum or zoo) যাতে রঙ-বেরঙের জন্তুজানোয়ার পাওয়া যায়। গোলাম ভারতের কিম্ভূত পরিস্থিতির ফল ওদের এই অবস্থা। কেননা জাতীয় প্রতিষ্ঠানের জায়গায় অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান ইংরেজদের সমানে সমানে জবাব দিতে পারবে না, মোকাবিলা করতে পারবে না। তাই কংগ্রেসকে যেমন করে হোক শক্তিশালী করা প্রত্যেক চিন্তাশীল সম্মানিত ব্যক্তির কর্তব্য হয়ে ওঠে। ইংরেজ সরকারের মনোভাব এবং ব্যবহার তাকে লড়তেও বাধ্য করে। এটাই হল কংগ্রেসের পরিস্থিতিজনিত বিলক্ষণ চরিত্র এবং স্বীকৃতি। কিন্তু রঙ-বেরঙের জীব তো এতে রয়েছেই।

হাজারিবাগ জেলে প্রতিদিন দশ আনা খোরাকি পাওয়া যায়। জামাকাপড়, টুথব্রাশ, পাউডার, সাবান ইত্যাদি আলাদা করে দেওয়া হয়। এর পরেও এক ‘পাতি’ জমিদার মশাইকে রাগে লাল হয়ে বলতে শুনলাম, “কষ্ট সহ্য করার জন্য থাকব আমরা জমিদারেরা আর কৃষক স্বরাজ্য নেওয়ার বা জমিদারি উচ্ছেদের কথা বলবে! দেখুন কেমন অবিচার!” দারুণ! মশাই এমন কষ্টে ছিলেন যে কী বলব? দশ আনা হজম করতে কি কম কষ্ট? আর এই পাউডার, ব্রশ ইত্যাদি? জেলের বাইরে তো এসবের ব্যবহার কখনো করেছেন বলে মনে হয় না। তাই এতেও ওনার ভীষণ কষ্ট। প্রতিদিন দশ আনা হজম করা তো একটা ঝামেলাই ছিল। কখনো কমবেশি হলে নাহয় কথা হত। কিন্তু রোজ পুরো দশ আনা! এটাই তো আজব ব্যাপার ছিল! জানিনা জেল থেকে বেরুবার দিন ওজন কত বেড়ে গিয়ে হবে – ৩০-৪০ পাউন্ড না কি কম! ওঁদের বিষয়ে এটুকুই বলার যে কৃষকেরা ওদের কখনোই জেলের এই কষ্ট ওদের ভোগ করতে বলেনি। ওরা নিজেই এসেছিল। তবে কৃষক কেন ওদের সাথে রেয়াৎ করবে, এটাই বুঝলাম না। আসলে কথা তো সেটা নয়! আগে ওরা ভাবত স্বরাজ্য হবে কৃষক এবং জমিদারের অংশিদারী, ভাগ-বাঁটোয়ারার সময় তারা কৃষককে গোয়ালার ছোট ভাইয়ের মত ঠকিয়ে নেবে। কিন্তু কিসান-সভা সেই কুবুদ্ধির হাঁড়ি ভেঙে বলে দিয়েছে যে অংশিদারির স্বরাজ্য হতেই পারে না। ব্যস, এটাই ওদের ক্রোধের কারণ।

কথিত আছে, কোনো গ্রামে গোয়ালা দুই ভাই একসাথে থাকত এবং দুজনেই রোজগার করে পেট চালাত। কিন্তু বড় ভাই ছিল খুব চালাক। সে নিজে কিছু করত না। খাটতে খাটতে মরত ছোট ভাইটা। কিন্তু খাওয়া-পরায় আয়েসে থাকত বড় ভাই। তবুও ভ্রুক্ষেপ করত না ছোট। কিন্তু কতদিন চলত এমন? শেষে একদিন ছোট ভাইয়েরও রাগ হল। সে বলল, আমাদের আলাদা করে দাও, সঙ্গে থাকব না। বড় অনেক চেষ্টা করল আটকাবার। কিন্তু ছোট জিদ ধরে ছিল। তাই নিরুপায় হয়ে সমস্ত জিনিষের বাঁটোয়ারা করতে হল। অন্য জিনিষ ভাগ করতে তো অসুবিধা ছিল না। কিন্তু একটা মোষ ছিল সদ্য বাচ্চা-দেওয়া, দশ-পনেরো সের দুধ দিত। প্রশ্ন উঠল তাকে কি করে ভাগ করা যাবে। ঘটি-থাল হলে একটা একটা ভাগ করে নেওয়া যায়। আনাজপাতি এবং টাকাপয়সা ভাগ করতেও অসুবিধা নেই। কিন্তু মোষ তো একটাই। দুটো হলে নাহয় কথা ছিল। এবার কী হবে? দুজনেই কিছু বুঝতে পারছিল না। বড়টার বুদ্ধি তো ছিলই। সেই পথ বাতলাল। মোশের আদ্ধেক তোর, আদ্ধেক আমার, যেমন বাড়িটা নিয়েছি আদ্ধেক আদ্ধেক। ছোট মেনে নিল। তখন প্রশ্ন উঠল মোষের কোন অংশটা কে পাবে?

এখানে বড় ভাই চালাকি করল এবং ছোটকে বলল, দ্যাখ ভাই, তোকে বড্ড ভালবাসি আমি। তাই এখানেও তোকে ভালো ভাগটাই দিতে চাই। তুই তো জানিষ, মোষের মুখটা কী সুন্দর, কেমন করে জাবর কাটে। সিং দুটো কেমন চকচকে এবং বাঁকা, কান, চোখ ইত্যাদিও দেখার মত। যখন নাকি ওর পাছার দিকটা কী নোংরা! সব সময় ওর ওপর গোবর-পেচ্ছাপ লেগে থাকে, রোজ ধুতে হয়। পায়খানা-পেচ্ছাপ তো মোষ করতেই থাকে। একদিন যদি উঠিয়ে না ফেলা যায় তাহলে থাকার জায়গাটাই নরক হয়ে ওঠে। তবু তোর মুখ চেয়ে আমি নিরুপায় হয়ে পেছন দিকটাই নেব আর পায়খানা-পেচ্ছাপ ফেলব। তোকে সামনের ভাগটা দিয়ে দিচ্ছি। ব্যস, ভাগ হয়ে গেল! খুশি তো? ছোট সায় দিয়ে মাথা নাড়ল।

এবার তো এমন হল যে ছোট ভাই মোষটাকে রোজ খুব খাওয়াচ্ছে-দাওয়াচ্ছে আর বড় ভাই চুপটি করে দু’বেলা মোষটার দুধ দুইছে এবং আনন্দে আছে। কিছুদিন এরকমই চলল। ছোট এর মধ্যে একদিনও একফোঁটাও দই দুধ কিছু পেল না। কখনো কখনো বিচলিত হত ঠিকই। কিন্তু সোজা মানুষ ছিল সে। কী করা যায় ভেবে পরিতোষ করে নিত। ভাগবাঁটোয়ারা হয়ে গেছে যে। তারপর আবার কাজে লেগে যেত। এভাবে পরিশ্রম করে মরত সে আর ফুর্তি লুটত বড় ভাই। কী সুন্দর বিচার! কী দারুণ ভালোবাসা বড় ভাই ছোট ভাইকে দেখাল! অন্যায়ভাবে ছোট ভাইয়ের সরলতার কেমন ফায়দা লুটল সে! কিন্তু এ অবিচার সইল না। সইবেই বা কেন?

এক দিন ছোট ভাইয়ের পরিচিত কোনো বুদ্ধিমান মানুষ তার বাড়িতে এল। ছোট অতিথিসৎকার করল। খাবারও ভালোই খাওয়াল। কিন্তু দুধ-দই নেই! আগন্তুক অবাক হল – সদ্য-মা-হওয়া সুন্দর মোষ বাঁধা রয়েছে দরজায়। দুধও ভালোই দেয় নিশ্চয়ই। এ মানুষটি আমার সাচ্চা বন্ধুও। তবুও আমায় দুধ দই কিছুই দিলনা! লক্ষ্য করে যা দেখলাম এর বাড়িতে দুধ, দই কিছু আছে বলেও মনে হল না। কী ব্যাপার? ছোট ভাইকে সে প্রশ্নটাই করল। ছোট উত্তর দিল, সে তো ঠিক। মোষ আছে। কিন্তু বাড়ি ভাগ হওয়ার সময় তার সামনের অংশটা আমি পেয়েছি, পিছনের অংশটা বড় ভাই। তাই, দুধ পাই কি করে? হ্যাঁ, সিং ইত্যাদির সৌন্দর্যে পরিতৃপ্ত হই। গোবর-পেচ্ছাপ থেকেও বাঁচি। এটাই কম কী? দাদা খুব দয়া করে আমায় সামনের অংশটা দিয়েছে। দাদা এমনই হওয়া উচিৎ। আগন্তুক বুঝে গেল চালাকিটা কোথায়।

সে ছোট ভাইকে বলল, তাহলে বড় ভাই দুধটাও কেন দোয়? তুমি যেমন সামনের দিকটাকে খাওয়াও-দাওয়াও, সেও তেমন পিছন দিকের গোবর-পেচ্ছাপ ফেলুক। এ কেমন কথা যে তুমি শুধু উপার্জন করতে করতে আর খাওয়াতে খাওয়াতে শেষ হয়ে যাবে আর ও ফুর্তি করবে? যখন একটা কাজ তুমি কর তো সেও একটাই কাজ করুক। মোষের দুধ দোয়ার দ্বিতীয় কাজটা সে করে কেন? তাকে গিয়ে আটকাও না কেন? দুজনেরই সমান সমান কাজ করার কথা। দুজনেরই অংশ তো সমান। এভাবে বোঝানতেই সরল ভাই কথাটা বুঝে গেল। আগন্তুক এর আগে দুধের ভাগবাঁটোয়ারা ইত্যাদির যে কথাগুলো বলেছিল সেসব ওর মাথায় কিছুতেই আঁটছিল না। যদিও কথাগুলো সত্যি ছিল। আমরা দেখি যে কৃষকও মাটি চষে, বীজ রুয়ে ফসল তৈরি করে। কিন্তু যতক্ষণ জমিদার হুকুম না দেয় একটা দানাও ছোঁয় না; নিজের জন্তুজানোয়ার এমনকি সন্তানদেরও ক্ষুধার্ত রাখে। যদি ওদের প্রশ্ন কর যে কেন কর এমন? নিজে খাও না কেন? তাহলে বলবে, রাম, রাম, এমন কী করে হবে? এমন করলে তো পাপ হবে। জমিদারেরও তো অংশ আছে ওতে! ওকে হাজার বোঝাও যে জমিদার তো কিছুই করে না। জমিও তো অর তৈরি নয়, ভগবান বা প্রকৃতির। সে জমির না জানি কত মালিক এল আর গেল। যে বলশালী হয় সেই জমি দখল করে – “বীরভোগ্যা বসুন্ধরা।” কিন্তু কৃষকের মাথায় কিছুই ঢোকে না। ধর্ম, পাপ আর অংশিদারির ভুত তাকে কষ্ট দিতে থাকবে। তেমনই অবস্থা ছোট ভাইয়ের ছিল। আর যেমন সোজা-সাপ্টা কথা তার মাথায় ঢুকে গেল তেমনই সোজা কথা কৃষকদেরও মাথায় ঢুকে যায়।

তারপর তো সে ছোট ভাই দৌড়োতে দৌড়োতে তক্ষুণি বড় ভাইয়ের কাছে গেল আর ঠিক মোষ দুইবার সময় বলতে লাগল, আপনি এ কাজটা তো বেশি করছেন। আমার একটা কাজ – মোষটাকে খাওয়ানোর। আপনারও একটাই হওয়া উচিৎ - গোবর-পেচ্ছাপ পরিষ্কার করার। তাহলে এই দ্বিতীয় কাজটা কেন করছেন? আগে আমি বুঝতে পারিনি। এখনি কথাটা বুঝেছি। তাই আপনাকে এই কাজ আমি করতে দেব না। নইলে এর বদলে আমাকেও একটা কাজ দিন।

শুনে বড় ভাই চিন্তিত হল ঠিকই। কিন্তু ভেবে বলল, পিছনের আদ্ধেক আমার আর সামনের আদ্ধেক তোর। নিজের নিজের ভাগে যে যা করতে চায় করুক। এতে বাধা দেওয়ার তো কোনো প্রশ্ন নেই। কাজের ভাগ তো হয়নি। মোষের ভাগ হয়েছে এবং তার দুভাগ করা হয়েছে। যদি তুই তবুও আরো কাজ করতেই চাস তাহলে মোষের মুখে-চোখে আর সিংএ তেলটেল লাগিয়ে দিস। বা যখন আমি মোষটাকে দুই তখন তার মুখের ওপর থেকে মশামাছি তাড়িয়ে দিস। ব্যস, আর কী চাই?

এ কথার জবাব খুঁজে না পেয়ে ছোট ভাই চলে গেল এবং আগন্তুককে সব কথা শোনাল। আগন্তুক বলল ঘাবড়িও না। এখনি হয়ে যাবে কাজ। পরের অংশে যে কাজটা ও বলল সেটা তো ওরই লাভের। দুধ দোয়া আরো সহজ হবে ওর জন্য। কিন্তু যখন ও মোষটাকে দোয়ার কাজ শুরু করেছিল তখন তো তোমায় জিজ্ঞেস করেনি কাজটা করবে কি না। পিছনের ভাগটা ওরই, তাই যা চাইল তাই করল। দুধ দুইলে ওর লাভ হয়। তাই ও সে কাজটাই করে। ঠিক তেমনই, তুমি নিজের লাভের কাজটা সামনের দিকে কর। ওকে জিজ্ঞেস করার কী আছে?

তখন ছোট জিজ্ঞেস করল, তাহলে আপনিই বলুন কী কাজ করলে আমার লাভ হবে। আগন্তুক বলল যেই তোমার দাদা দুধ দুইতে বসবে তুমি মোষটার মুখে বেধড়ক ডান্ডা চালাও। তাতে মোষ ক্ষেপে পালিয়ে যাবে আর দাদা দুধ দুইতে পারবে না। কথাটা ছোট ভাইয়ের পছন্দ হল এবং সে সঙ্গে সঙ্গে বলে দিল, “ঠিক আছে”। তারপর মোষ দুইবার সময় ঘরে ডান্ডা নিয়ে বসে গেল আর যেই দাদা দুধ দোয়ার তোড়জোড় শুরু করল সে দৌড়ে গিয়ে মোষটার মুখে বেধড়ক ডান্ডা চালাতে শুরু করল। বড় ভাই অবাক হয়ে যতক্ষণে “হে হে” করে ওটাকে থামাবার চেষ্টা করবে ততক্ষণে ওটা কে জানে কোথায় পালিয়ে গেল। বড় ভাই রহস্যটা জানত না। ছোটকে জিজ্ঞেস করায় জবাব পেল, মুখ তো আমার ভাগে! কাজেই তার ওপর যা ইচ্ছে আমি তাই করেছি, যেমন আপনি নিজের ভাগে যেমন চেয়েছেন তেমন করেছেন আজ অব্দি। কাজেই “হে হে” করার আর বকার প্রশ্ন কোথায়। বড় ভাইয়ের সন্দেহ হল ছোট পাগল হয়ে যায়নি তো? বুঝিয়ে সুঝিয়ে, হিংসা করা এবং মোষকে কষ্ট দেওয়া অনুচিত বলে ওকে শান্ত করল। ভাবল এর পর আর এমন করবে না। কিন্তু দ্বিতীয় বার যেই দুইতে শুরু করল ছোট আবার ডান্ডাকাহিনী শুরু করল। জিজ্ঞেস করাতে জবাবটাও আগের মতই দিল।

এবার তো দাদার পিলে চমকাল। বুঝলো কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে। বুদ্ধিমান গুরু পেয়ে গেছে ভাইটা। নইলে এ তো ভোলাভালা। নিজে থেকে এমন কিছুতেই করত না। যখন ভালো করে খোঁজখবর নিল জানতে পারল ছোট ভাইয়ের কোনো ধুর্ত বন্ধু এসেছে; সেই ওকে বুঝিয়েছে এসব। এখন তো আর আদ্ধেক দুধ না নিয়ে ও মানবে না। আর চালাকি চলবে না আমার। তাই হার মেনে ছোট ভাইকে বলল, কেন হুজ্জৎ করছিস। মোষটাও ক্ষ্যাপা হয়ে যাচ্ছে আর কেউ দুধ পাচ্ছে না – না তুই না আমি। যা, আজ থেকে যত দূধ হবে তোকে আদ্ধেক ভাগ করে নিশ্চয়ই দেব। তুই আগে বলিস নি কেন যে আদ্ধেক দুধ চাস? তখনই তোর কথা মেনে নিতাম।

শুনে ছোট ভাই আনন্দে বন্ধুর কাছে গেল আর বলল যে তার বাতলানো উপায়টা সঠিক ছিল। এবার দুধ দোয়ার পরেই আদ্ধেক দুধ আমি পেয়ে যাব। আপনার উপায়টা খুব সুন্দর এবং সহজ ছিল। শুনে বন্ধুও প্রসন্ন হল যে বেচারা তার খুইয়ে দেওয়া অধিকার ফেরৎ পেল।

কিসান-সভাও ঠিক এভাবেই সহজ উপায়টা কৃষকদের বলে দিয়েছে, যাতে ওরা নিজেদের উপার্জনটা পায় এবং পরিবারের ভরণপোষণ করতে পারে। জমিদার এই জন্যই সভা দেখে আশঙ্কিত হয় এবং অভিশাপ দেয়। সে তো অংশিদারির মোষের মত অংশিদারির স্বরাজ্য চাইছিল যাতে কৃষকদের সেভাবেই ঠকাতে পারে যেমন করে ছোট ভাইকে বড় ভাই মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে ঠকিয়েছিল। কিসান-সভা এই ঠগীর ষড়যন্ত্র আগেই বুঝিয়ে দিয়েছে কৃষকদের। বলে দিয়েছে পরিষ্কার, অংশিদারির স্বরাজ্য ধোঁকার টাটি হবে। খবরদার, কৃষকের স্বরাজ্য আর জমিদারের স্বরাজ্য অংশিদারির বা এক হতে পারে না। দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেটা কৃষকের হবে সেটা জমিদারের হবে না আর যেটা জমিদারের হবে সেটায় কৃষক কোতল হয়ে যাবে, যেমন মোষের গল্পে আমরা স্পষ্ট দেখেছি।

জমিদার এবং তাদের বন্ধুদের এটাই ক্ষোভ যে কৃষক এখন সাবধান হয়ে গেছে। ওরা আর মানতে তৈরি নয় যে জমিদার এবং তাদের বন্ধুদের সাহায্যে কৃষকেরা স্বরাজ্য পাবে। ওদের বিশ্বাস যে নিজেদেরই ত্যাগ এবং পরিশ্রমে কিসান-রাষ্ট্র কায়েম হবে। এটাই কারণ যে জেলে পড়ে থাকা পাতি জমিদারসাহেব কৃষকদের ওপর ক্ষেপে থাকত।

২২

জেলে আরো অনেক মজাদার ব্যাপার দেখা গেল। কিসান-সভাবাদীদের দৃঢ় ধারণা তো এটাই যে আর্থিক সংগ্রামের মাধ্যমেই কৃষকদের অধিকার তাদেরকে দেওয়ানো যেতে পারে। তাদের স্বরাজ্যও এভাবেই আসবে। ওরা এটাও মানে যে কৃষকদের মাঝে যেখানেই ধর্ম-টর্মের নাম নেওয়া হয়েছে সব কাজ পন্ড হয়েছে। ধর্মের ব্যাপারে যার যা করার করবে, অথবা করবে না। এটা প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত এক্তিয়ার যে সে ধর্ম মানবে অথবা মানবে না, আর যদি মানে তাহলে কোন ধর্ম এবং কিভাবে মানবে। মন্দির মসজিদ বা গির্জায় যাবে অথবা যাবে না এই সিদ্ধান্ত প্রত্যেকটি মানুষকে নিজের জন্য নিজেই করতে হবে। কিসান-সভা এ ব্যপারে কিছুতেই নাক গলাবে না। মাইলখানেক দূরে থাকবে। নইলে সব পন্ড হয়ে যাবে। আমরা কৃষক এবং শ্রমিক অথবা অন্যান্য শোষিতদের লড়াইয়ে পন্ডিত, মৌলবি এবং পাদ্রিদের জায়গা রাখতে চাই না। আমাদের এমন কোনো সুযোগ দেওয়াই উচিৎ নয় যাতে করে ওরা কৃষকদের ব্যাপারে “দুধে চোনা” হয়। নইলে সমস্ত কাজ বিফলে যাবে। কেননা ধর্মের কথা শুরু হলেই কৃষক-সভার লোকেদের আর বলার হকই থাকবেনা; টপকে এসে পড়বে পন্ডিত আর মৌলবি। ধর্ম যে ওদেরই অধিকারের বস্তু। সেখানে অন্যদের শুনবেই বা কে?

এ সত্যের তিক্ত অভিজ্ঞতা জেলে হল এবার। যারা গান্ধিজির নামেই জেলে এসেছিল এবং নিজেদের খাঁটি গান্ধিবাদী মানত, ওদেরই কাজকর্ম আমাকে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিল যে স্বাধীনতার লড়াই যারা লড়ছে, তাদের সামনে প্রত্যেকটি কথাকে ধর্মের মোড়কে বার বার এনে গান্ধিজি দেশের কত বড় ক্ষতি করছেন। যত উঁচু এবং আদর্শ রূপেই হোক না কেন, রাজনীতিতে ধর্ম মিলিয়ে দিলে কত অনর্থ হয় সেটা পরিষ্কার দেখতে পেলাম। এটাও ভালো করেই দেখলাম যে রাজনীতি অথবা রুটির প্রশ্নকে নিরেট বস্তুগত ব্যাপার মেনে চলা কত ভালো।

চম্পারণ জেলার মেহসি থানার এক মুসলমান সজ্জন সত্যাগ্রহী হয়ে জেলে এসেছিলেন। ওপর থেকে নিচে অব্দি খাদিময়। সাদাসিধা মানুষ ছিলেন, দেখলে মনে হত খাঁটি গ্রাম্য। ধুতি আর কুর্তার সাথে গান্ধিটুপিটাও সব সময় থাকত। পাঁচ-ছ মাসে, গান্ধিটুপি ছাড়া তাঁর মাথা একবারও দেখিনি। একবার তো এমনও শুনলাম যে উনি জেলের জামাকাপড় নিতে অস্বীকার করেছেন। শুধু এই কারণে যে সেগুলো খাদির নয়। যদিও গান্ধিজির হুকুম আছে যে জেলে খাদির জন্য জিদ না করে যে কাপড় পাওয়া যাচ্ছে সেটাই নিতে হবে। যখন চম্পারণের প্রধান গান্ধিবাদি নেতা তাঁকে কথাটা বোঝালেন, তিনি বললেন আপনি আর গান্ধিজি সক্ষম। তাই যেমন ইচ্ছে কাপড় পরতে পারেন। কিন্তু আমি তো সাধারণ। আমার কাছে এমন আশা কিকরে করেন? পরে উনি বাধ্য হয়ে জেলের কাপড় নিলেন বটে কিন্তু উনি যে কত বড় গান্ধিভক্ত তার প্রমাণ এই ঘটনা থেকেই পাওয়া গিয়েছিল। উনি যে গোঁড়া নামাজি সেটাও সবাই দেখেছে। গান্ধিজি তো ধর্মে জোর দেনই। তা উনিই বা তেমন হবেন না কেন? কিন্তু ধর্মের কথা কেমন অন্ধ তার প্রমাণও এতেই পাওয়া যায় যে ধর্ম বোধে এক বার যখন খাদি পরে নিয়েছেন, তখন হাজার বার গান্ধিজির দোহাই দিয়ে বললেও উনি অন্য কাপড় নিতে ততক্ষণ রাজি হলেন না যতক্ষণ বাধ্য না হলেন। রাজনীতিতে ধর্ম ঢোকানো গান্ধিজির এ থেকেও শেখা উচিৎ যে মানুষটি তাঁর কথাও মানতে প্রস্তুত ছিল না। ধর্মের নামে উনি এমন অস্ত্র নিজের অনুযায়ীদের দিয়ে দিয়েছেন যে ওরা ওনার কথাও শোনে না আর ধর্মেরই দোহাই দেয়। এই দোধারী তরোয়াল দুদিকেই চলে, এটা যেন গান্ধিজি মনে রাখেন। সেই ভদ্রলোকের ভোঁতা যুক্তি তো এটাই ছিল যে যখন একবার খাদি পরা ধর্ম হয়ে গেছে, তখন সে ধর্ম ত্যাগ করা উচিৎ কিভাবে হতে পারে। গাব্ধিজির এটাও ভোলা ঠিক নয় যে সাধারণ মানুষ এরকমই হয়। গান্ধিজির বুদ্ধি তো সবার থাকে না যে ধর্মের জটিলতাও বুঝবে! তাই ধর্ম খুব বিপজ্জনক জিনিষ, বিশেষ করে ইহজাগতিক এবং রাজনীতিক ব্যাপারে।

আচ্ছা, এগোই। এই ভদ্রলোক যেই হাজারিবাগ জেলে এলেন, তার দু’একদিন পরেই অন্য এক মুসলমান ভদ্রলোক এসে এনার বিষয়ে আমায় বললেন যে একজন মুসলমান এসেছেন। উনি গুদামে আমাকে দেখেই আকুল ভাবে বলেছেন যে ভাই, আমাকেও মুসলমানের হাতে তৈরি খাবার খাওয়াও। এত দিন ধরে ফলমূল খেতে খেতে আমি বিরক্ত হয়ে গেছি। সব তো হিন্দুই পেলাম। ওদের হাতে রান্না করা খাবার কী করে খেতাম? তুমি মুসলমান এবং নিজের খাবার আলাদা রান্না করাও। তাই আমাকেও যদি তাতে শামিল করে নাও তাহলে আমি তোমার অনেক উপকার মানব ইত্যাদি। যে মুসলমান আমাকে এই কথাগুলো বলল সেও অবাক হয়েছিল। অবাক হওয়ার কথাই। সাধারণতঃ এটা দেখা গেছে যে কয়েকজন ছাড়া বাকি সমস্ত হিন্দুদের মুসলমানের হাতে তৈরি খাবার খেতে কোনো আপত্তি থাকে না। অনেকে তো ইচ্ছে করেই মুসলমান রাঁধুনি রাখে। তাই সেই মুসলমান ভদ্রলোকের কথাটা চমকে দেওয়ারই মত ছিল। কিন্তু আমি শুনে হাসলাম আর তৎক্ষণাৎ বুঝলাম যে নিশ্চয়ই এটা ধর্ম মহারাজেরই মহিমা। যাহোক, সেই মুসলমান ভদ্রলোক আরেক মুসলমানের হেঁসেলে অনেকদিন পর্য্যন্ত অনেক বন্ধুদের সাথে খেতে থাকলেন, এ আমার নিজের চোখে দেখা।

এবার এমনই আরেকটি ঘটনা শুনুন। বড় এসেম্বলির এক হিন্দু জমিদার মেম্বারও এই জেলে ছিলেন। প্রথমে তো আমি কিছুই জানতাম না। কিন্তু পরে, নানান কথার সূত্রে জানতে পারলাম যে যদি মুসলমান ওনার খাবারের পাশ দিয়ে হেঁটে যায় বা ছুঁয়ে দেয় তাহলে উনি সে খাবার খান না। উনি নিজের খাবার অন্য একটি লোকের সাথে আলাদাই রান্না করাতেন। বলার জন্য কট্টর গান্ধিবাদি। গান্ধিজির বিরুদ্ধে একটাও কথা শুনতে তৈরি নন। কিসান-সভা বা সমাজবাদের এমন শত্রু যে বলার মত নয়। কিন্তু ধর্মের এমন ভক্ত যে মুসলমানের ছোঁয়াতেও অসুবিধা! মুসলমানের ছায়া পড়লে ওনার খাবার অপবিত্র হয়ে যায়। আমার জন্য এসব বোঝা অসম্ভব ছিল। আমিও স্বপাকে খাই এবং খাওয়াদাওয়ায় ছোঁয়াছুঁয়ি বাঁচিয়ে চলি। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে কোনো মুসলমান, ক্রিশ্চান বা যাদের অস্পৃশ্য বলা হয় তাদের ছোঁয়ায় খাবার জিনিষগুলোকে অখাদ্য মেনে নেব। আমার ছোঁয়াছুঁয়ির সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। যদি কখনো কোনো মুসলমান বা অছুত আমার রুটি, আমার ভাত ছুঁয়ে দেয় তাহলেও আমি সেগুলো খেয়ে নেব। কিন্তু সব সময় এমন করি না। কেননা সাধারণতঃ মানুষ নিজের ভিতরের এবং বাইরের শুদ্ধির ব্যাপারে কোথায় খেয়াল রাখে যে কে কেমন? কেউ কোনো ঘৃণ্যতম কাজ করেছে কিনা বা সংক্রামক রোগে আক্রান্ত কিনা সেটা তো জানতে পারা যায় না। তাই সাধারণতঃ আমি যাকে খুব ভালো করে জানি না, তার ছোঁয়া কিছু খাই না। এটাই আমার ছোঁয়াছুঁয়ির রহস্য।

কিন্তু সেই গান্ধিবাদি মহাশয় কে আমি খুব ভালো করে জানি। উনি আমার ধরণের ছোঁয়াছুঁয়ি মানেন না। ওনার পক্ষে সেটা মানা অসম্ভবও। ওনার ছোঁয়াছুঁয়ি তো সাধারণ হিন্দুদের মতই। যখন এক মুসলিম মৌলবি ভদ্রলোক যিনি আমার ব্যাপারটা জানতেন, ওনাকে চেপে ধরলেন তখন উনি আমার উদাহরণ দিয়ে পার হয়ে যেতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু মৌলবি ওনাকে এক পা এগুতে দিলেন না এবং অবশেষে চুপ করিয়ে দিলেন।

একটি তৃতীয় ঘটনাও শোনার মত। জেলে কয়েকজন প্রধান ব্যক্তি ধার্মিক ঢঙে শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী করার তোড়জোড় করছিলেন। এক আমাকে ছাড়া বাকি সবাই তাতে শামিল ছিল। কেননা আমি কৃষ্ণকে ধার্মিক গোঁড়ামি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং বাইরের জিনিষ মনে করতাম। আমার জ্ঞাতানুসারে উনি একজন খুব বড় গণ-সংস্কারক এবং নায়ক ছিলেন। ওনাকে বা ওনার গীতাকে ধার্মিক আবরণ দেওয়া মানে ওনার গুরুত্ব কম করা। উনি এবং ওনার গীতা সার্বভৌম পদার্থ। তাই আমি ওনাকে ধার্মিক রূপ দেওয়ার কাজে সঙ্গ দিতে চাই না। তাই সেই উৎসব থেকে আমি আলাদা ছিলাম। কোনো অন্য কারণ ছিল না। কিন্তু অন্যেরা তো শামিল ছিলই।

যে মৌলবি সাহেবের উল্লেখ করলাম একটু আগে তাঁকেই দু’একজন প্রধান ব্যক্তি উৎসবে নিমন্ত্রিত করলেন যে তিনি কৃষ্ণ বিষয়ে কিছু ধর্মকথা রাখুন। মৌলবি সাহেব স্বীকারও করে নিলেন। কয়েকদিন আগে হজরত মোহম্মদ সাহেবের জন্মদিন উদযাপন করেছিল মুসলমানেরা; তাতে সমস্ত হিন্দুদের নিমন্ত্রণ জানিয়েছিল। অনেকে তাঁর জীবনপ্রসঙ্গে ধর্মকথা শুনিয়েছিল। তাই এবার মৌলবিসাহেবকে ডাকা এবং তাঁর স্বীকার করে নেওয়া সেদিক থেকেও ন্যায্য ছিল। লোকে বলে যদি দুই সম্প্রদায়ের ধার্মিক উৎসবে দু’দলেই শামিল হয় এবং হৃদয় থেকে অংশগ্রহণ করে তাহলে ধর্মের ঝগড়া নিজের থেকেই মিটে যায়। যাই হোক না কেন। কংগ্রেসিরা কিন্তু এমনটাই মানে। তাই জন্মাষ্টমিতে মৌলবি সাহেবের শামিল হওয়া গৌরবের কথা ছিল, আনন্দের ব্যাপার ছিল।

কিন্তু এ ব্যাপারেই কিছু সত্যাগ্রহী হিন্দু কঠোর বিরোধী হয়ে গেল। তার মধ্যে একাধজন তো একেবারেই সোজা এবং কিছুই জানত না। কিন্তু দু’একজন এমন ছিল যে দিন রাত গান্ধিজিরই দোহাই দিতে থাকত। সবচেয়ে মজার কথা যে যে গান্ধিবাদি জমিদারের খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে একটু আগে বলেছি উনি মৌলবি সাহেবের শামিল হওয়ার এবং কিছু বলার একেবারে বিরুদ্ধে ছিলেন। কিছুতেই চাইছিলেন না যে মৌলবি সাহেব কৃষ্ণের বিষয়ে কিছু বলুন আর সে কথাটাতেই চালাকি করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জোর দিয়ে চলেছিলেন। সোজা তো বলতে পারিছিলেন না যে ধর্মের ব্যাপার! তাহলে বদনাম হয়ে যেতেন। তাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সব সময় বলে বেড়াতেন। খুব কষ্ট হল ওনার যখন জানলেন যে মৌলবি সাহেব গেছেনও এবং বলেওছেন। পরে বকুনির মত করে মৌলবি সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন, শেষ পর্য্যন্ত আপনি গেলেন? আবার বললেনও? মানলেন না? দু’একজনকে তো এমনকি স্পষ্ট বলতে শুনলাম, ধর্মই নষ্ট হয়ে গেল।

কিন্তু এ সব ঘটনাই যুক্তিযুক্ত বলতে হবে কেন না যখন আমাদের সমস্ত রাজনৈতিক এবং আর্থিক কাজে ধর্মের ছাপ রয়েছে তখন অন্যকিছু হবেই বা কি করে? গান্ধিজি ধর্মের হাজারখানা ব্যাখ্যা করুন এবং তাকে একেবারে নতুন একটা জামা পরিয়ে দিন যাতে রাজনীতিতে এসেও সে আদর্শ হয়ে থাকে, বিকৃত না হয়, যেমন ওপরের ঘটনায় দেখলাম, তবু জনসাধারণের মনে হাজার বছর ধরে ধর্ম সম্পর্কে যে ধারণা আছে সেটা বদলাবে না কিছুতেই। সেটা বদলান প্রায় অসম্ভব। ধর্মের নামে হতে থাকা বিকৃতি এবং পাপ দূর করার জন্য কত ধর্ম-সংস্কারক এলেন এবং চলে গেলেন। কিন্তু সেসব রয়েই গেল যেমন কে তেমন। তাই শুধু না, বেড়েই গেল আরো। সংস্কারকেরা সংস্কারের বদলে আরো একটি নতুন সম্প্রদায়ের জন্ম দিয়ে দিল যেগুলো কোনো সমাধানের বদলে আরো বাড়িয়ে তুলল জটিলতা। গান্ধিজির নামে তো এমন এক সম্প্রদায়ের জন্ম হয়ে গেছে যারা অন্যের কথা শুনতেও নারাজ। আসলে ধর্মের বিশেষত্বই হল অন্ধপরম্পরার জন্ম দেওয়া এবং তাকে প্রশ্রয় দেওয়া। যুক্তিতর্কের কোনো জায়গাই নেই ওখানে। আর যদি কেউ এ কথাটা না মানে তাহলে তাকে মানতে হবে যে যেখানে যুক্তিতর্ক এবং বুদ্ধির জায়গা আছে সেটা যদি ধর্মও হয় তাহলে বিশেষ কিছু মানুষ বা কিছু নির্বাচিত মানুষের জন্যই হতে পারে। যে মুহুর্তে সেটা নিজেকে সার্বজনিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করবে, সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধির প্রবেশের বিরুদ্ধে কড়া নির্দেশ জারি হবে আর অন্ধপরম্পরা প্রবেশ করবে। ধর্ম এবং ধার্মিক আন্দোলনগুলোর ইতিহাসে এ ব্যাপারটা স্পষ্ট পরিলক্ষিত। গান্ধিজি একথাটা না মেনে এবং রাজনীতির ওপর ধর্মের ছাপ দিয়ে খুব বড় ভুল করছেন যার পরিণাম আগামি প্রজন্মকে সুদের সাথে ভুগতে হবে, হবেই।

এভাবে আমরা দেখি যে যখনি কোনো কথায় ধর্মের নাম আসে সঙ্গে সঙ্গে ধর্মের নামে করে খাওয়া এবং ধর্মের সর্বসম্মত ঠিকেদার পন্ডিত এবং মৌলবিরা ঢুকে পড়ে। তখন অব্দি সে কথায় ঢুকবার সুযোগ ওরা পায় না যতক্ষণ কথাগুলো বিশুদ্ধ রাজনৈতিক এবং আর্থিক থাকে এবং তার ওপর ধর্ম বা মজহবের ছাপ না লাগে। তখন অব্দি এই সব মানুষেরা বাধ্য হয়ে দূরে থাকে এবং ফিকিরে থাকে যে কখন আমরা ঢুকবার সুযোগ পাব। যেই ধর্মের নাম নেওয়া হয়, ব্যস, লাফিয়ে পড়ে। ওদের কী গরজ পড়েছে জানার যে আপনি ধর্মের নাম কোন অর্থে নিচ্ছেন। ধর্মের উল্লেখই ওদের জন্য যথেষ্ট। অর্থ তো ওরা নিজেরাই বার করে নেবে এবং ওদের দাবিই এটা যে ওরা ছাড়া আর কেউ ধর্মের অর্থ বুঝতে পারে না এবং অর্থ বোঝার অধিকারিও নয়। বিশেষত্ব এটাই যে ওদের এই দাবির সমর্থন জনসাধারণও করে, স্বীকৃতিও দেয় আর তাই ওদের কথা মেনে নেওয়া হয় এবং অন্যের কথা, সে যত বড়ই মহাত্মা এবং পয়গম্বর হোক না কেন, হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।

আর যখন পন্ডিত আর মৌলবি কোনো ব্যাপারে ঢুকে পড়ে তারা তো মানুষজনকে নিজেদেরই রাস্তায় নিয়ে যাবে। যা ওরা বলবে সাধারণতঃ তাই মান্য হবে। তাই খাদ্যাখাদ্যের ব্যাপারে ওদেরই কথা চলে এবং ওপরে বর্ণিত ঘটনাগুলো হতেই থাকে। কিন্তু যদি কিছু মানুষ তেমনটা না করে তাহলে এটা পরিষ্কার যে গান্ধিজির হাজার চ্যাঁচানো সত্ত্বেও তাদের হৃদয়ে ধর্মভাব নেই, ধর্ম তারা বোঝেওনি, মানেও নি। তাহলে আজই বা কেন মানবে? যদি ধর্মের কথা তারা বলে তাহলে শুধু মুখে বলে। গান্ধিজি মানুন বা না মানুন, এটা কটু সত্য।

২৩

আমি যা কিছু আগের প্রসঙ্গে শেষে বলেছি তা অন্য একটি ঘটনায় পরিষ্কার হয়ে যায়। এক দিন জেলের ভিতরেই অবাক হওয়ার সাথে সাথে খুব কষ্টও হল যখন কয়েকজন হিন্দুকে আমি এক মৌলবি সাহেবের সমালোচনা করতে শুনলাম। উনি বলতে বলতে কৃষ্ণজীকে ‘হজরত’ বলে দিয়েছিলেন। এটাই ছিল ওনার গুরুতর অপরাধ। আমরা তো বুঝতেই পারলাম না ব্যাপারটা কি। কিন্তু পরে অনেক কথা মনে পড়ল। তার আগে এক ভদ্রলোক বলার সময় যখন ‘দৃষ্টিকোণ’ শব্দের ব্যবহার করেছিলেন এক মুসলমান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, তার মানে কি? যখন উনি মানে বোঝালেন তখন মুসলমান বললেন, বলার সময় এমন বলেন না কেন যাতে সবাই বুঝতে পারে? এটুকু বলতে না বলতেই হিন্দু ভদ্রলোক ক্ষেপে গিয়ে বললেন, আমি আপনার জন্য বা হিন্দু-মুসলমান মিলনের জন্য হিন্দুদের সংস্কৃত এবং তার সাহিত্যকে নষ্ট করব না। এতেই ব্যাপারটা এগিয়েছিল। কিন্তু তা নিয়ে এখন বলতে চাই না। আমার এতুকুই বলার যে সত্যিই, ‘দৃষ্টিকোণ’ শব্দের মানে সহজে সাধারণ হিন্দু জনতাও বুঝতে পারবে না আর মুসলমানেরাও জানবে না। আর যদি কেউ সেই কারণেই এধরনের শব্দ নিয়ে আপত্তি জানায় তখন গান্ধিবাদের মালা জপতে থাকা লোকেরা সাহিত্য আর হিন্দু সংস্কৃতি লোপ হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক খাড়া করে। যখন নাকি সারাক্ষণ তারা দোহাই দিতে থাকে যে কৃষক ও গরীবের কল্যাণের জন্যই তারা জেলে এসেছে। অথচ একটুও ভাবে না যে ওদের এই ভাষা কত প্রতিশত কৃষক বুঝবে। আর যদি না-ই বোঝে তো সঙ্গ কতদূর অব্দি দেবে।

কিন্তু যদি ‘হজরত’ শব্দ নিয়ে বিবাদটা দেখি, শব্দটার বিরোধ এজন্য হয়নি যে লোকে বুঝতে পারেনি। আমরা তো দিনরাতই দেখি যে ‘আসুন হজরত, হজরতের আচরণ তো দেখুন’ ইত্যাদি বলা হয়। হিন্দী ভাষায় এটা সাধারণ কথাবার্তার অঙ্গ হয়ে গেছে। আপত্তি হল শুধু এজন্য যে কৃষ্ণকে উনি হজরত বলে দিলেন। অদ্ভুত ব্যাপার। সেই মুসলমান নিজের বড় বড় নেতাদের হজরত বলে, পয়গম্বর সাহেবকে হজরত বলে আর আমরা দিব্যি শুনি। কিন্তু যদি সে মুসলমান তাকে, যাকে হিন্দুরা অবতার মানে, হজরত বলে দেয় তাহলে ঝঞ্ঝাট হয়ে যায়। এতেই প্রমাণ হয় যে আমরা কত গভীর জলে আছি। এভাবেই জেলে, ‘সীতাকে বেগম আর রামকে বাদশাহ’ বলার বিরোধ হতেও শুনেছি। বাইরে তো শুনতামই। যদি ইংরেজিতে কুইন (queen) আর কিং (king) বলা হয় তাহলে আমাদের একটুও কষ্ট হয়না। যদিও এদুটো শব্দের মানে তা-ই যা বেগম আর বাদশার। এসব দেখলাম আর আপশোষ হল।

আজকাল হিন্দী পড়ার শখ বেড়ে গেছে। তাই জেলেও একই ব্যাপার দেখা গেল। বেশির ভাগ গান্ধিবাদি লোক এধরণেরই দেখলাম। অবশ্য তথাকথিত বামপন্থি এবং বিপ্লবিরাও এধরণেরই ছিল। হিন্দি এবং হিন্দুস্তানি নিয়ে কথাবার্তাও হত। কয়েকজন, যারা নিজেদের রাজনৈতিক নেতা মনে করত, ঠিক করল যে মিডল ক্লাসের ওপর নাহয় হিন্দুস্তানির বই পড়ান হোক। কিন্তু নিচের ক্লাসগুলোয় ওই ‘দৃষ্টিকোণ’ ওয়ালা হিন্দিই পড়ান হোক। বোধহয় ওরা এক তিরেই দুটো পাখি শিকার করল। হিন্দি সাহিত্য এবং হিন্দু সংস্কৃতিকেও রক্ষা করা হল আর হিন্দু-মুসলিম একতার মাধ্যমে রাজনীতিরও রক্ষা হল। কিন্তু ওরা বুঝতে পারল না যে এই রক্ষাটা নকল। এতে কাজ হবে না।

আমি এরকম দু’একজন বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম, যারা মিডল থেকে এগোতে পারবে না তাদের রাজনীতি কি করে বাঁচবে? তাদের হিন্দু-মুসলিম মিলন কি করে হবে? আরো ভাবার কথা যে অধিকাংশ মানুষ তো মিডলেই থেমে যায়। অনেকে লোয়ার এবং আপার করেই শেষ করে দেয়। নব্বই প্রতিশত লেখাপড়ার নামই জানে না। আরেকটি কথা যে যারা জোয়ান বা বুড়ো হয়ে গেছে তারা তো এমনিই থেকে যাবে। ওরা তো নিরক্ষর। তাহলে তাদের জন্য আপনাদের হিন্দি বা হিন্দুস্তানি কোন কাজের? ওরা সংস্কৃতি বা সাহিত্যের রক্ষা কি করে করবে? চুপ করে রইল ওরা। দিতেই পারল না উত্তর। দিতই বা কী?

আসলে ব্যাপারটা তো ভিন্ন। আমি বা আমার মত কিছু মানুষ আছে যারা প্রত্যেকটি কথা ‘জনগণ’এর (mass) দৃষ্টি দিয়ে দেখে এবং ভাবে, সংস্কৃতি আর সাহিত্যের দৃষ্টি দিয়ে নয়। কেননা জনগণের প্রথম দরকার রুটি, কাপড় ওষুধ ইত্যাদি। হ্যাঁ, পেট ভরা থাকলে এসব ব্যাপারগুলো তারা দেখতে পাবে, কিন্তু এখন তো তার সুযোগ নেই। অন্য দিকে সাধারণ কংগ্রেসি – সে গান্ধিবাদি হোক বা তথাকথিত বিপ্লবি এবং বামপন্থি – সবচেয়ে আগে সাহিত্য ও সংস্কৃতির দিকে তাদের নজর দৌড়োয়। আর মনে রাখা দরকার যে এই দুটোরই পিছনে ধর্ম লুকিয়ে আছে। সোজাসুজি আসার বা কারোর ওটাকে নিয়ে আসার হিম্মত নেই। তাই সাহিত্য সংস্কৃতির ভড়ং খাড়া করা হয়। আসলে ওরা শুধু মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত নয়, ওদের মনোবৃত্তিটাও তেমনই। মধ্যবিত্ত শ্রেণির দৃষ্টি থেকেই ওরা সমস্ত ব্যাপার সাধারণতঃ দেখে বা মূল্যায়ন করে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির পেট তো ভরেই যায়। জামাকাপড় আর ওষুধপত্রও অলভ্য নয়। তাই ওরা সাহিত্য আর সংস্কৃতি না দেখলে আর দেখবে কী?

কিন্তু ওরা ভাবে না যে সাহিত্যের প্রয়োজন যদি কিছু থাকে তাহলে সেটা জনসাধারণের জন্যই। সাধারণ মানুষকে জাগান এবং প্রস্তুত করাই সাহিত্যের কাজ হওয়া উচিৎ, বিশেষ করে গোলাম দেশে। না জেগে এবং পুরোপুরি প্রস্তুত না হয়ে সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার লড়াইয়ে কিকরে অংশগ্রহণ করবে? এবং স্বাধীন হয়ে গেলেও ওদেরই ওপরে তোলা এবং এগিয়ে নিয়ে চলা জরুরি। নইলে দুনিয়ার ঘোড়দৌড়ে আমাদের দেশ পিছনে পড়ে যাবে। যত দিন সমস্ত দেশবাসির শারীরিক এবং মানসিক উন্নতি না হয় তত দিন দেশ পিছিয়েই থাকবে। তাই সেসময়েও সাধারণ মানুষের দৃষ্টি থেকেই সাহিত্যনির্মাণ হওয়া উচিৎ। এক গুচ্ছ মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ সাহিত্য পড়ে-পড়িয়ে কী করে নেবে? যদি কৃষক, শ্রমিক এবং অন্যান্য শ্রমজীবী ওদের সঙ্গ না দেয় ওরা করতে তো কিছুই পারবে না। তাই যে কোনো পরিস্থিতিতে সাহিত্যের আসল উপযোগিতা শোষিত জনগণের জন্যই। কিন্তু, “দিবসাবসান সমীপে গগন হল রক্তিম / তরুশিখরে কমলিনীকুলবল্লভের ছড়াল প্রভা”, অথবা “পূর্বপুরুষের চরিত-ভাবনার তরঙ্গে হও ভাসমান” ধরণের সাহিত্য, যা নিয়ে মধ্যবিত্ত বাবুরা গর্বিত, এবং যার জন্য তারা হিন্দি আর হিন্দুস্তানির বিবাদ দাঁড় করিয়ে আকাশ-পাতাল এক করছে, কতজন কৃষক বা শ্রমিক বুঝতে পারবে? একই অবস্থা “নহীঁ মিন্নতকশে তাবে শুনীদন দাস্তাঁ মেরী / খামোশী গুফ্‌তগুঁ হ্যয় বেজবানী হ্যয় জবাঁ মেরী”রও। দুটো সাহিত্যই, যা নিয়ে হিন্দু আর মুসলমানের নামে মাথাফাটাফাটি চলছে, কৃষকও এবং শ্রমিকদের থেকে, খেটে খাওয়া মানুষদের থেকে, সাধারণ মানুষদের থেকে যোজন যোজন দূরে।

কিন্তু তাতে কী? এক দল মধ্যবিত্ত মানুষ তো বোঝেই এই সাহিত্য। বাকি মানুষদের চিন্তা কই ওদের মাথায়? আসলে সাহিত্যের আড়ালে সংস্কৃতি লুকিয়ে আছে আর তার আড়ালে বসে আছে ধর্ম, সাধারণ জনতাকে ওস্কাতে যার উপযোগ করে এক দল বাবু এবং পরিচ্ছন্ন-পোষাকেরা নিজেদের কাজ বাগাচ্ছে। যদি মধ্যবিত্ত মানুষেরা সংস্কৃতি এবং ধর্ম, তমদ্দুত এবং মজহবের বিনাশের মিথ্যে আতঙ্ক খাড়া না করে, কৃষক-শ্রমিক তাদের প্রতারণায় পা দেবে না আর তা না হলে এদের কাজও চলবে না। কেননা সাধারণ হিন্দু এবং মুসলমানের নামেই এরা চাকরি নেবে, সিটের বাঁটোয়ারা করবে এবং প্যাক্ট বা সমঝোতা করবে। সাধারণ মানুষদের ধর্মভাবনাকে উত্তেজিত করে, উস্কে দিয়েই এই ধূর্ত লোকগুলো নিজেদের কাজ হাসিল করে, যদিও ওপর ওপর পাকা বকধার্মিক সেজে থাকে। গরীবের নামে এমন চোখের জল ফেলে যে কী বলব।

আগেই বলেছি, সাহিত্যের কাজ সাধারণ মানুষকে জাগৃত করা, প্রস্তুত করা এবং তাদের মানসিক উন্নতিসাধন, যাতে ওরা সাচ্চা নাগরিক হতে পারে। সাহিত্যের অন্য কোনো কাজ নেই। কয়েকজন মানুষের বিনোদন বা তাদের কল্পনার সংসারে বিচরণ করার সুযোগ দেওয়ারকাজ সাহিত্যের নয়। পুরোনো সাহিত্যিকেরা সাহিত্যের লক্ষণ বলতে গিয়ে স্পষ্ট বলেছেন, সঠিক সাহিত্য সেটাই যেটা মস্তিষ্কে বেশি চাপ দেয়না এবং তাই কোমল মস্তিষ্ক যাদের, তাদের জন্যও সুবোধ্য করে কথাগুলো। পড়ে যান বা শুনে যান, নির্বাধভাবে অর্থ বুঝে এগিয়ে যান। বুঝতে বেশি অসুবিধা হচ্ছে মানেই সেটা দুষিত সাহিত্য। কথাগুলো সরসভাবে যে বলা হয় তার কারণ এটাই যে যেন সহজে হৃদয়ঙ্গম হয়ে যায়।

এই দৃষ্টি থেকে জনসাধারণের জন্য সুলভ এবং সুগম সাহিত্য তৈরি করার দুটোই রাস্তা। হয় এমন ভাষায় লেখা হোক যে ভাষা ছোটোবেলা থেকে আমরা বলছি এবং শুনছি, মায়েরা আর বোনেরা বলে আসছে। আর যদি তা না হতে পারে বা করতে যাওয়া কঠিন হয় তাহলে এমন সোজা বরেলির ভাষা তৈরি করা হোক যেটা সব গ্রাম্য মানুষেরা – হিন্দু-মুসলমান একবারে বুঝে যায়। “এই দৃষ্টিবিন্দু সম্মুখে রেখে যদি আমরা পর্যবেক্ষণ করি তাহলে নর্মান্তিক বেদনা হয়”, অথবা “পহাড়োঁ কী চোটিয়াঁ গোশে সহাব সে সরগোশিয়াঁ কর রহী হ্যঁয়” টা কোন আম জনতা বোঝে? বুঝতে পারে? হিন্দি এবং উর্দুর নামজাদা লেখকেরা নিজেরা যাই বুঝুক। তাঁদের কথা সাধারণ মানুষের জন্য তেমনই যেমন বাঁদরদের জন্য জঙ্গলে পাকা বেল। না তো ওদের হিন্দি বুঝতে পারে হিন্দু জনগণ, না ওদের উর্দু বুঝতে পার মুসলমান জনগণ। তাহলে হিন্দিটা মুসলমান আর উর্দুটা হিন্দু জনসমুদায় কিকরে বুঝবে? না কি “লেখে ইশা, পড়ে মুসা” ধরণের ব্যাপার? নিজেই লেখে নিজেই পড়ে বা খুব বেশি তো ওদেরই মত গোনাগুনতি লোকে পড়ে। কিন্তু তারা তো জনগণ নয়। এটা মনে রাখা উচিৎ যে তারা বিশেষজন।

তাই বিহারে যদি আমরা জনগণের সাহিত্য তৈরি করতে চাই, তাহলে ভোজপুরি, মগহি, মৈথিলি, বাংলা, সাঁওতালি, ওঁরাওঁ ইত্যাদি ভাষায় আলাদা আলাদা অঞ্চলের জন্য আলাদা আলাদা সাহিত্য রচনা করতে হবে নয়ত হিন্দি আর উর্দু মিশিয়ে এমন সহজ-সরল ভাষা তৈরি করতে হবে যেটা সবাই বুঝতে পারবে। হিন্দি-উর্দু মেলানোর অর্থ হল সংস্কৃত শব্দে ভরা হিন্দি আর আরবি-ফারসি শব্দে ভরা উর্দুর জায়গায় সহজ এবং সবার বোঝার মত ভাষা তৈরি করা। উদাহরণের জন্য বলতে পারি, “অজীজম” বা অজীজমন” বা “প্রিয় মিত্র”র জায়গায় “আমার প্রিয় বন্ধু” বা “আমার প্রিয় ভাই” ইত্যাদি লিখলে বেশি ভালো লাগবে এবং কাজ চলবে। দরকার পড়লে নতুন নতুন শব্দ, হয় বানিয়ে বা অন্য ভাবে প্রচারে নিয়ে আসব।

যারা “হজরত” ইত্যাদি শব্দ দেখে-শুনে চমকে যান তাঁদের মনে রাখা উচিৎ, আমরা, আমাদের হিন্দি এবং আমাদের জনগণ আরবি-ফার্সির হাজার হাজার শব্দ হজম করে নিজেকে শক্তিশালী বানিয়েছে। তারপরেও এই ভাষা এখনও অসম্পূর্ণ মনে হয়। যদি হাজার হাজার শব্দ নিজের মধ্যে না মিলিয়ে থাকত তাহলে কে জানে কি অবস্থা হত! হাজিরি, মতলব, হেপাজত, হাল, হালত, ফুর্সৎ, কসুর, দাওয়া [বাংলা দাওয়া নয়; দাবি অর্থে – অনু.], মুদ্দই, অর্জ, আদালত, ইন্সাফ, তরহ, সদর, দিমাগ, জমিন ইত্যাদি শব্দগুলো যদি নমুনার মত দেখি তাহলে বুঝব যে এ শব্দগুলো এবং আরো হাজারো শব্দ খাঁটি আরবি-ফারসির। কিন্তু এ শব্দগুলো শুধু হিন্দি সাহিত্যওয়ালারাই নয়, একেবারে গ্রামে থাকা এবং সেখানেই বড় হওয়া গেঁয়ো কৃষক ও শ্রমিকেরাও বলে এবং বোঝে। সময়ে সময়ে এরা এবং আমরা এসব শব্দগুলো হজম করে নিজেদের শক্তি বাড়িয়েছি এবং প্রসারিত করেছি। এতে আমাদের সংস্কৃতি বিগড়োয়নি, শুধরেছে, তৈরি হয়েছে। সংস্কৃতি কোনো লজ্জাবতী লতা নয় যে হজরত, বেগম আর বাদশা বললে শেষ হয়ে যাবে। এটাও আমাদের অজ্ঞান যে সীতাকে বেগম আর রামকে বাদশা বললে নাক-মুখ কুঁচকোই। তুলসিদাস তো শ্রীরামজিকে অবতার মানতেন। উনি শ্রীরাম এবং জানকীর অনন্য ভক্ত ছিলেন। কিন্তু নিজের রামায়ণে “রাজা রাম জানকী রানী” লিখেছেন। ওনাকে হিন্দির শ্রেষ্ঠতম সাহিত্যিক বলা হয়। রাজা আর রানী বলতে ওনার তো কোনো দ্বিধা হলনা। আজ অব্দি আমাদের হিন্দি সাহিত্য সেবকেরা এব্যাপারে নিজেদের মখ খুলল না। কিন্তু রাজার জায়গায় বাদশা আর রানির জায়গায় বেগম বলতেই ঝড় উঠে গেল। তার মানে কি এবার হিন্দিরও শুদ্ধি হবে? আগে যে বললাম হাজার হাজার শব্দের কথা সেগুলোকে কি ঘাড় ধরে বার করে দেওয়া হবে? যদি তাই হয় তাহলে “খুদা হাফিজ”।

কথাটা পরিষ্কার ভাবে বলা উচিৎ। জাতীয়তাবাদি লোকেরা বেশির ভাগ মধ্যবিত্ত শ্রেণির। তার মধ্যেও, যাদের আজ খাঁটি কংগ্রেসি বা গান্ধিবাদি বলা হয় তারা তো বাছা বাছা মধ্যবিত্ত শ্রেণি, মিডল ক্লাস। ওরা নিজেদের বিষয়ে যতই বলুক যে ওরা হিন্দু নয়, মুসলমানও নয়, হিন্দুস্তানি; প্রথমে হিন্দুস্তানি, পরে হিন্দু বা মুসলমান – বাস্তব এটাই যে ওরা আগে হিন্দু বা মুসলমান, পরে হিন্দুস্তানি বা জাতীয়তাবাদি। তার প্রমাণ ওদের গুছিয়ে বলা কথাগুলোয় পাওয়া যায়না, কিন্তু ওদের কাজে এবং হঠাৎ বলা কোনো কথায় পাওয়া যায়। এই হিন্দি, উর্দু বা হিন্দুস্তানির ঝগড়াই এর প্রমাণ। যখন ওরা লেকচার দিতে বসে তখন ওদের বক্তব্যের ধরণ প্রমাণ দেয় যে ওরা কি। ওদের কথা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে কিনা তার চিন্তা ওদের একেবারেই থাকে না। একনাগাড়ে বলে চলে যায় যেন ওদের শ্রোতারা সবাই হয় পন্ডিত নয় মৌলবি। ওরা আলিম-ফাজিল অথবা সাহিত্য-সম্মেলনের পরীক্ষাগুলো পাশ করেছে। যদি ওরা অন্য রকম হত তাহলে অলঙ্কার-ভূষিত সংস্কৃত বা ফার্সির শব্দগুলো এত বেশি ব্যবহার করত কেন?

যদি হিন্দুস্তানি কমিটি নিজেদের বইগুলোয় কিছু উর্দু-ফার্সির শব্দ নতুন করে প্রয়োগ করে বা পাঞ্জাবের হিন্দুরা উর্দুতে সংস্কৃতের শব্দ ঢোকায় তখন ওদের বুকে ব্যথা শুরু হয়- হায়, হায়, হিন্দি নষ্ট হল, উর্দু বরবাদ হল, সাহিত্য দুষিত হল, সংস্কৃতি ধূলিসাৎ হল। মনে হয় আজকাল হিন্দিকে অজীর্ণ রোগে ধরেছে, অথবা তার পাচনশক্তি যেতে বসেছে। উর্দুরও একই অবস্থা। আমি অবাক তো এব্যাপারে হই যে এরাই দেশকে স্বাধীন করার উদ্যোগ নিয়েছে। হিন্দু-মুসলমানে মিলের জন্য এই ভদ্রলোকেরাই দিনরাত আকুল হতে থাকে। যদি কোথাও হিন্দু-মুসলমানে দাঙ্গা হয়ে যায়, হিন্দু-মুসলমান জনতাকে প্রাণ ভরে অভিসম্পাত দিতে এদের ক্লান্তি হয়না। কিন্তু কখনো ভাবে না, ভাবার কষ্ট নেয় না যে এই সব অনর্থের মূল ওদেরই দূষিত ভাবনা। ‘মুখে এক, মনে আরেক’এর যে চালচলন ওদের সেটাই এ সমস্ত কিছুর কারণ। সমস্ত ব্যাপারে মনের ভিতরে হিন্দুপনা আর মুসলমানপনার ছাপ দেওয়ার যে বাজে অভ্যাস আছে ওদের তার কারণেই যত ঝামেলা। যতই লুকোক নিজেদের। কিন্তু ওদের যে এই বিবাদ, হিন্দি, উর্দু আর হিন্দুস্তানি নিয়ে, এটাই যথেষ্ট ওদের আসল রূপ জাহির করে দিতে।

এসব বলার অর্থ কিছুতেই এই নয় যে আমি হিন্দুস্তানি কমিটির বা অন্যদের সব কথার সমর্থন করি। আমি কৃত্রিম এবং বানানো ভাষার কঠোর শত্রু এবং আমার ভয় যে হিন্দুস্তানি কমিটি শেষে এমনই এক ভাষা না বানিয়ে নেয়। হ্যাঁ, ওদের বইগুলো পড়ার সুযোগ আমি সত্যি পাই না। কখনো কখনো কিছু কথা এমনিই সামনে চলে আসে। তখন তার বিষয়ে জানা জরুরি হয়ে যায়। কিন্তু খবরের কাগজে এ ব্যাপারে যে কথাগুলো বেরোয়, আর বন্ধুদের মুখে যাকিছু শুনি তার ভিত্তিতেই আমার এই প্রত্যয়। আমি দেখেছি যে এই ঝগড়াগুলোর পিছনে অন্য এক ভাবনা কাজ করছে। সব জায়গায় আমি কিছু দেখতে পাই। যদি ভাবনাটা ঠিক হয়ে যায় তাহলে হিন্দি হিন্দুস্তানির ঝগড়া শিগগিরই শেষ হয়ে যাবে, বা অন্ততঃ শেষ হওয়ার রাস্তাটা নিশ্চয়ই পরিষ্কার হয়ে যাবে।

কিন্তু হিন্দি হিন্দুস্তানির এই ঝগড়ায় আমি বড় বিপদ দেখতে পাচ্ছি। এখন তো এ ঝগড়া শুধু মধ্যবিত্ত বাবুদের মধ্যে হচ্ছে বলে ওদেরই ব্যাপার হয়ে থেকে যাচ্ছে। কিন্তু আশঙ্কা আছে যে ওরা ঝগড়াটা কৃষক শ্রমিকদের মাঝেও ছড়াবে। শিক্ষার কাজ বেশির ভাগ এদেরই হাতে আছে। তাই নিজের ভাবনার ধাঁচ এরা সব কিছুতে নিয়ে যাবে। সে ধরণেরই বই, সে ধরণেরই রচনা, সে ধরণেরই খবরের কাগজ তৈরি হবে জনতাকে পড়ানোর জন্য। বেশি করে চেষ্টা হবে যে এই বিষ গ্রামে এবং শ্রমিক অঞ্চলে ছড়াক। যে যে জিনিষটা পছন্দ করে সেটাকেই সবার প্রিয় করে তুলতে চায়। তাই এর প্রতিফল সোজাসুজি ধর্ম-ভিত্তিক ঝগড়া থেকেও বেশি খারাপ হবে। কেননা বিষটা রাজনীতির বড়ির সাথে লোকে গিলবে। আজ তো রাজনীতি আমাদের জীবনের প্রধান অঙ্গ হয়ে গেছে। আরা তার সাথেই এ ঝগড়া যদি আমাদের কৃষক ও শ্রমিকদের ভিতরে ঢোকে তাহলে সর্বনাশ হবে। কেননা ধর্মের অন্ধত্ব ঢোকানোর নতুন পথ এবং নতুন রূপ এটাই হয়ে যাবে। তারপর তো আমরা সব সময় কাটা পড়ব। তাই আমাদের এখন থেকেই এর বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে হবে, যাতে জনগণের ভাবী জীবন এই ছাঁচে ঢালা না যায়।

আমি অবাক হচ্ছি যে এরকম হচ্ছে কেন। ভাষার বিকাশ তো নদীর মত হয়। নদী যেমন, নিজেই এগিয়ে যায়। নিজের রাস্তা নিজেই তৈরি করে নেয়। আমরা যতই চাই, আমাদের মর্জি মোতাবেক সে কখনো চলবে না। তাই তার এত চওড়া পাট। ভাষাও তেমনই। আজ ইংরেজদের সংস্রবে এসে কত শব্দ আমরা নিজেদের ভাষায় ঢুকিয়ে নিচ্ছি। প্রোগ্রাম, কমিটি, কনফারেন্স ইত্যাদি শব্দগুলো আমরা নিজের করে নিয়েছি। কংগ্রেস আর মিনিস্ট্রি শব্দদুটো সব সময় আমাদের মুখে মুখে ঘোরে। গ্রাম্য লোকেরাও এসব শব্দগুলো বোঝে এবং বলে। লালটেন [লন্ঠন – অনু.] আর রেল যেন হিন্দি ভাষারই শব্দ মনে হয়। আমরা বুঝতেও পারিনি যে আমরা এগুলো হজম করে নিচ্ছি। সভা না বলে মিটিং বলতে আমাদের ভালো লাগে। ঠিক এভাবেই মুসলমান জমানায় আমরা ফার্সি আর আরবি শব্দে নিজেদের ভাষার সম্পদ বাড়িয়েছি। তাহলে আজ দ্বিধা কিসের?

আজ যে খড়িবোলিতে সাহিত্য তৈরি করতে আমরা উঠেপড়ে লেগেছি সে খড়িবোলিও তো এভাবেই ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে, হয়ে চলেছে। সংস্কৃত, পালি বা প্রাকৃত এই রূপ পেয়েছে ধীরে ধীরে হাজার বছর পরে। এভাবেই আরবি আর ফার্সি থেকে উর্দু রূপ পেয়েছে। বিকাশ তো সংসারেরই নিয়ম। হিন্দি আর উর্দুর সংমিশ্রণে যে নতুন ভাষা তৈরি হবে সেটাই আমাদের প্রয়োজন পুরো করতে পারবে। তারই সাহায্যে এই দেশ এগোবে। আমরা যত ইচ্ছে চিৎকার করি আর বুক চাপড়াই। হবে এটাই। তাহলে সময় থাকতে আমরা সাবধান হয়ে যাইনা কেন? কেন না এই কাজেই সাহায্য করি? এই যে মিছিমিছি ঘুর্ণি তুলছি তা থেকে হাত তো সরুক! ভাষা আমাদের জন্য, আমরা ভাষার জন্য নই। কিন্তু আমাদের নিজেদের ঝগড়ায় আমরা পিছিয়ে না যাই, শেষ না হয়ে যাই, এটা ভাববার বিষয়।

আজকাল তো পশুপাখি আর গাছপালার সংমিশ্রণে নতুন নতুন প্রজাতি তৈরি করা হচ্ছে, যেগুলো আমাদের বাড়তে থাকা প্রয়োজনগুলো পুরো করছে। পুরোনো পশুপাখি আর গাছপালা আমাদের প্রয়োজন পুরো করার জন্য আর যথেষ্ট নয় এটা প্রমাণিত। তাই এই যুগকে ক্রসব্রিডস (cross-breeds) এর যুগ বলা হয়। এ কথাটা আমাদের ভাষার প্রসঙ্গে বলবৎ হবে না কেন? আজ হাজার চেষ্টা করেও ল্যাটিনকে প্রচলিত করা যাবে না। ওটা পুরোনো হয়ে গেছে। একই ভাবে সংস্কৃত, আরবি, আর ফার্সি ভাষার মায়া জনসাধারণের স্বার্থে আমাদের ছেড়ে দিতে হবে। আর সেটাও আধমনা হয়ে নয়, হৃদয় থেকে। মিছিমিছি সংস্কৃত আর আরবি-ফার্সির নতুন নতুন শব্দ খুঁজে বা তৈরি করে সার্বজনিক ভাষার ভুঁড়ি বাড়ালে তার শরীরে কফ বাড়বে। তার বদলে এমন সব শব্দ খুঁজতে আর তৈরি করতে আমাদের মাথা খাটান উচিৎ যেগুলো সব জাতি আর ধর্মের সাধারণ মানুষ সহজভাবে বুঝতে পারবে। এভাবে যে সাহিত্য তৈরি হবে সেটাই আমাদের উদ্ধার করবে, সদর্থে আমাদের কাজের হবে। নইলে মধ্যবিত্ত চিন্তাজগত আমাদের কে জানে কোথায় ছুঁড়ে ফেলবে। কিন্তু এরই সাথে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যেন ভাষার স্বাভাবিক ক্রমবিকাশ হয়, কৃত্রিমতা না আসে। নদীর প্রবাহের উদাহরণ আগেই দিয়েছি। যেমন শরীরে মাংসপিন্ড তৈরি হয় তেমনই যদি বাইরের শব্দ শরীরে ঝুলে থাকে তাহলে সেটা খারাপ। শরীর যেমন অন্নজল হজম করে তেমনই ভাষা যদি নিজে থেকেই শব্দ হজম করে নেয় তাহলেই সেটা ভাষার সঠিক বিকাশপথ হবে।

২৪

কংগ্রেসি মন্ত্রিসভার জমানার কথা। যদ্দুর মনে হয় ১৯৩৮-৩৯এর গল্প হবে। যুক্ত প্রদেশে পন্তজির মিনিস্ট্রি ছিল। গান্ধিজি অহিংসার কথা বার বার বলেন। আজকাল তো আরো বেশি জোর দিয়ে বলতে শুরু করেছেন। কংগ্রেস অহিংসাকেই নিজের নীতি করেছে একথাও উনি বলেন। কিন্তু কংগ্রেসি মন্ত্রিসভার জমানায় বোম্বাই এবং কানপুরে শ্রমিকদের ওপর যে গুলি চলল, লাঠিচার্জ হল আর বোম্বাইয়ে তো চোখে জল আনা গ্যাসের বোমাও ছোঁড়া হল, কে জেনে অহিংসার পরিভাষায় এ ব্যাপারগুলো কি করে ঢুকে যায়। নাগপুরে যখন শ্রী মঞ্চেরশাহ আওয়ারি অস্ত্রগ্রহণ করার জন্য সত্যাগ্রহ করছিলেন, তখন গান্ধিজি এই বলে ওনার বিরোধ করলেন যে সত্যাগ্রহ সশস্ত্র কিভাবে হতে পারে। যদি অস্ত্র নিয়ে চলেন তাহলে অহিংসামূলক সত্যাগ্রহ সম্ভব হবেনা। সত্যাগ্রহ আর অস্ত্রগ্রহণ এ দুটো পরস্পরবিরোধী কথা। তাই এটা বন্ধ হওয়া উচিৎ। আমার মাথায় তো ওনার এই যুক্তি সেদিনও ঢোকেনি। আজকাল তো আরো ঢোকে না। শুধু অস্ত্র নিয়ে চললে হিংসা কিকরে হয়? যখন পণ করেছি যে অস্ত্রটা ব্যবহার করব না, তখন হিংসার প্রশ্ন কোত্থেকে ওঠে? তাহলে তো কোনো অকালি শিখ কখনো সত্যাগ্রহী হতেই পারবে না। কেননা কৃপাণ ছাড়া তো ওরা একমিনিটও থাকতে পারেনা। কিন্তু গান্ধিজি ওদেরও বার বার সত্যাগ্রহে ভর্তি করেছেন। আর তাই যদি হয় তাহলে লাঠি, গুলি, বোমা বর্ষণ করিয়েও কংগ্রেসি মন্ত্রিরা অহিংসক কেমন করে রইলেন? আর যদি নাই থেকে থাকেন তাহলে গান্ধিজি ওদের বিরোধ না করে সমর্থন কেন করলেন? ওদের এই সব কাজে উনি সীলমোহর কেন দিলেন? তাই আমার তো মনে হয় ওনার অহিংসা একটা অদ্ভুত গোলমেলে ব্যাপার।

এই কারণেই ওনার অহিংসক অনুগামীরা ওনাকে খুব ঠকায়। আর মজার কথা যে গান্ধিজি এটা না বোঝেন আর না মানেন। আমি তো ওনার এবং ওনার প্রাইভেট সেক্রেটারি শ্রী মহাদেব দেসাইয়ের ক্রোধ এবং ধমক-ধামকের মুখে শুধু এই জন্য পড়েছি যে আমি এই কথাগুলো খোলাখুলি বলি আর সেকাজই করি যা ভিতরে-বাইরে একরকম। কৃষকদেরও এটাই শেখাই যে দন্ডপ্রণালী সংহিতা অনুসারে নিজের এবং নিজের জমিজমার সুরক্ষার জন্য সেটুকু হিংসা তো করতেই পার যেটুকু জরুরি হয়ে পড়ে। আগে থেকে পাওয়া এই আইনগত অধিকার কৃষকরা বা আপনারা ছেড়ে দেবেন বা কেউ ছাড়িয়ে দেবে, আমি কোনো মতেই তা মানতে রাজি নই। তাই ১৯৩৮ সালে হরিপুরা কংগ্রেসের আগে হরিজন পত্রিকায় মহাদেব দেসাই আমার বিরুদ্ধে দীর্ঘ প্রবন্ধও লিখেছিলেন যার জবাব আমাকে দিতে হয়েছিল। কিন্তু ঠিক সেই সময় হরিপুরার পৌঁছোবার আগে মধ্য প্রদেশের [ইংরেজশাসনের সেন্ট্রাল প্রভিন্স – অনু.] ভ্রমণ সারতে ওয়ার্ধা গিয়ে এবং অহিংসার অবতার শ্রী বিনোবা ভাবের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম যে কিসান সভা হিংসায় বিশ্বাস করে এমন ধারণা করার আগে ওরা সমস্ত কথা জানতেও চেষ্টা করেনি।

বিনোবাজির আশ্রমেই তাঁর সাথে ঘন্টাখানেক আমার কথা হল। সদ্যই বেরিয়েছিল হরিজন পত্রিকায় ওই প্রবন্ধটা। তাই কথাবার্তার বিষয়ও সেটাই ছিল। এই সব বাস্তব দুনিয়া সম্পর্কে কত কম ওয়াকিবহাল সেটা সেদিন আমি জানতে পারলাম। কিসান সভার কোনো কর্মী হিংসা-অহিংসা নিয়ে কোনো কথা বলে থাকুক আর না থাকুক, গান্ধিজির কাছে তাঁর ভক্তেরা রিপোর্ট পৌঁছে দিল আর গান্ধিজি সেটাকেই ধ্রুব সত্য মেনে নিলেন। অন্যদের তো হাজার বার বলেন কোনো কথা মানার আগে ভালো করে খোঁজখবর নাও। তার সত্যতা যাচাই কর। কিন্তু আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার আগে আমায় একবার জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করলেন না। কিসান সভাকেও একই প্রশ্নে দোষারোপ করা হল। কিন্তু সভা নিজের সাফাই দেওয়ার সুযোগ পেল না। এটাই গান্ধিজির ন্যায়! এটাই ওনার সত্য! শুধু নিজেই প্রত্যয় করলেন না ওই মিথ্যা অভিযোগে, নিজের সঙ্গীদের মাথায়ও ভরে দিলেন।

যখন বিনোবাজি আমায় প্রশ্নটা করলেন, আমি এমন জবাব দিলাম যে উনি অবাক হয়ে গেলেন। অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে আমি দাবি করলাম যে প্রমাণ দেওয়া হোক। আমি বললাম ,আমি যে হিংসার আশ্রয় নিয়েছি তা শুধু যে আইনের ভিতরে পড়ে তা নয়, গান্ধিজিও এধরণের হিংসার উপদেশ বার বার দিয়েছেন। তার পর আমি দেশাইয়ের দোষারোপের লিখিত উত্তরও ওনাকে দেখালাম। আরো অনেক কথা হয়ে চলল। শেষে উনি জিজ্ঞেস করলেন যে এ বিষয়ে গান্ধিজির সাথে আপনার কথা হয়েছে? আমি উত্তর দিলাম, না। তখন উনি বললেন কথা বলুন, অবশ্যই। কিন্তু আমি এড়িয়ে গেলাম। বললাম সময় পেলে দেখা যাবে। এও বললাম, যারা একতরফা কথায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে তাদের সাথে কথা বলে হবে কী? তা সত্ত্বেও উনি কথা বলার ওপর জোর খাটালেন। কিন্তু আমার সুযোগই বা কোথায় ছিল। আমার তো সন্ধ্যেবেলায় ওয়ার্ধার সোশ্যলিস্ট চকে একটা ভালো মিটিং করে এগিয়ে যাওয়ার ছিল।

কিন্তু এখানে গান্ধিবাদি নেতাদের অহিংসার দুটো সুন্দর নমুনা পেশ করব। পন্ত মিনিস্ট্রির সময় এলাহাবাদে বড় দাঙ্গা হয়ে গিয়েছিল। ভীষণ উত্তেজনা। বিতর্কও তুমুলে। সে সময় গান্ধিজির নীতি অনুসারে কংগ্রেসের প্রধান লোকেদের কর্তব্য ছিল নিজের প্রাণসংশয় করেও দাঙ্গাটা প্রশমিত করা, ঠিক যেমন ১৯৩১ সালের কানপুরের দাঙ্গায় স্বর্গীয় শ্রী গণেশশঙ্কর বিদ্যার্থি করেছিলেন। এমনই সময়ে গান্ধিজি এবং কংগ্রেসের অহিংসার পরীক্ষা হয়। গান্ধিজি জোর দিয়ে বলেনও যে এমন সময়ে যেন কংগ্রেসি নেতারা নির্ভয়ে হিন্দু-মুসলমান পাড়ায় যান এবং তাদেরকে শান্ত করেন। সেই নিয়মে বলা যায়, এলাহাবাদের দাঙ্গা ওই নেতাদের পথ চেয়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে ওখানেই স্বরাজ্যভবনে অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির অফিসও ছিল। এখনও আছে। তার জেনারাল সেক্রেটারি আচার্য কৃপলানি ওখানেই উপস্থিত ছিলেন, অন্য বড় মানুষেরাও ছিলেন।

কিন্তু কী করলেন ওঁরা? আমার দুই মুসলমান সাথি যারা কিসান-সভা এবং শ্রমিক আন্দোলনে রুচি নেয় এবং ভালো লেখাপড়া জানে, ওখানেই ছিল। যখন দাঙ্গা শুরু হয়ে গেল ওরা শিগগিরই স্বরাজ্যভবনে গেল এবং বড় নেতাদের বলল, আসুন, যাই, শহরে ঘুরে মানুষজনকে বোঝাই-টোঝাই, ওদের শান্ত করি। ওরা শান্ত হোক বা না হোক, আমরা চেষ্টা তো করি। আমার এক মুসলমান বন্ধু টাউন কংগ্রেস কমিটির সভাপতি ছিলেন। তাই তাঁরও নিজের দায়ত্ব পালন করার ছিল। কিন্তু ওই নেতাদের মধ্যে এক সবচেয়ে বড় নেতা – নাম নেওয়া সমীচীন হবে না, কিন্তু অখিল ভারতীয় নেতা এবং আজও সারা দেশে গান্ধিজির নামে ঢোল পিটিয়ে বেড়ান – সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, “অ্যাঁ, বেড়াতে যাব? এ আবার কী কথা? এমন বোকামি কেউ করে? মাথা খারাপ লোকগুলো আমাদের দেখলে বকি ভাববে যে এরা নেতা? ওখানেই শেষ করে ফেলবে না আমাদের? আমি তো কিছুতেই যাব না। আপনারাও যাবেন না।” আর তৎক্ষণাৎ লখনউয়ে পন্তজিকে মিলিটারি পাঠাবার জন্য ফোন করতে শুরু করলেন; নইলে আর বাঁচোয়া নেই। আমাদের যুবা মুসলমান সাথিরা অবাক হল তাঁর এ কথায়। হতবাকও হল। কিন্তু ওরা তো নিজেদের দায়িত্ব পালনে বেরিয়েই পড়ল। নেতাদের কথা কেন শুনত ওরা? ঘুরে ঘুরে যা কিছু করা সম্ভব ছিল ওরা করলও। হিন্দু, মুসলমান সব পাড়ায় নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াল। পরে যখন দেখা হল, অহিংসা নিয়েই আলোচনাক্রমে এই অদ্ভুত গল্প ওরা আমায় শোনাল। গান্ধিবাদিদের অহিংসায় ওরা হাসত। আমিও হাসতাম। এদিকে আ্মাদের, কিসান-সভাওয়ালাদের গান্ধিজির দরবারে যথেষ্ট দুর্নাম যে আমরা কংগ্রেসের নীতি পালন করি না। অন্যদিকে যে নেতাসাহেব এবং তার সঙ্গিরা প্রয়োজনের সময় শুধু লেজ গুটিয়ে পালিয়েই রইল না, সশস্ত্র পুলিস এবং সৈন্যদের গুলি আর বেয়নেটে দাঙ্গা শান্ত করার জন্য পন্থজির ওপর চাপ দিতে থাকল, তারা গান্ধিজির কাছ থেকে অহিংসার এমন দামি সার্টিফিকেট পেয়ে গেছে যে কহতব্য নয়। যদি এমনই ভাঙা নৌকোয় চড়ে গান্ধিজি শুধু নিজে নয় পুরো দেশটাকেও ওপারে নিয়ে যেতে চান তাহলে ওনাকে অভিনন্দন জানাই। কিসান-সভার লোকেরা যদি গান্ধিজির অহিংসা না মানে অন্ততঃ স্পষ্ট বলে তো দেয়। সময় এলে কাজের ক্ষেত্রে প্রতারণা তো করে না। বরং সততার সাথে, যতদূর পারা যায় কাজ করে।

এই ধরণের আরেকটি ঘটনা বিহারের। বিহার নিয়ে এবং বিশেষ করে তার অহিংসা নিয়ে গান্ধিজি গর্ব করেন। আকচার একথাটা উনি লিখে থাকেন এবং মুখেও বলেন। কিন্তু বিহারের নামি-দামি নেতারা অহিংসার পথে কতটা চলে এবং গান্ধিজির সাথে কতটা ছলনা করে তার তাজা নমুনা পাওয়া গেছে বিহারশরিফের দাঙ্গায়। পাটনা জেলার এক কংগ্রেসি সাথি সদ্য জেলে এসেছে; তার কাছেই পেয়েছি খবরটা। নিজের অভিজ্ঞতা সে একদিন শোনাল। তার বা যে নেতাদের দেখার সুযোগ তার হয়েছিল তাদের নাম নেওয়া উচিত হবে না।

বিহারশরিফে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা শুরু হয়ে যাওয়ার পর সদাকত আশ্রমের দুই বড় নেতা, যাদের প্রদেশ কংগ্রেসের অফিস চালানর জন্য খুব পুরোনো দায়িত্বশীল নেতা মনে করা হয় এবং তাঁরা খাঁটি গান্ধিবাদিও বটে, মোটরে করে বিহারশরিফ যাওয়ার জন্য তৈরি হলেন। তাঁদের একজন হিন্দু ও একজন মুসলমান। তাঁরা ভাবলেন পাটনা জেলার কোনো হিন্দু কর্মীকেও সঙ্গে নিয়ে নিলে ভালো হয়। যোগাযোগ হল এমন যে আমাদের কংগ্রেসি সাথি ওখানেই ছিল। হুকুম হল যে সঙ্গে যেতে হবে। সে, মানে আমাদের সাথি জানত সমস্ত ব্যাপারটা। সে বলল যে তার কাছে রিভলবার তো নেই। সে কী করে যাবে? পাঠক, মনে রাখবেন যে আমাদের সাথি সত্যাগ্রহ করে জেলে এসেছে। সে আবার বলল, যদি আমাকেও আপনারা একটা রিভলবার দেন তাহলে যেতে রাজি আছি। একথায় লিডাররা বললেন, আপনি আমাদেরই গাড়িতে আমাদের দুজনের মাঝখানে বসে চলুন। আমরা যে আলাদা মোটরগাড়িতে আপনাকে পিছন পিছন আসতে বলছিলাম স্টা এই জন্যই যে আপনার কাছে রিভলবার নেই। কিন্তু আপনি যখন সেভাবে যেতে প্রস্তুত নন তাহলে আমাদেরই গাড়িতে আমাদের মাঝে বসে চলুন। কিন্তু এ সাথি তাতেও তৈরি হল না। তখন ওকে বলা হল, আপনার বাড়ির লোকের কাছে তো বন্দুক আছেই। সেটাই নিয়ে চলুন। তখন সাথি বলল যে বন্দুক নিয়ে যাওয়া তো আরো খারাপ। আমি তা করবনা।

হার মেনে দুই নেতা রওনা হয়ে গেলেন। এ গল্প শোনানর পর সাথিটি আমায় বলল, আমি তো জানতামই যে ওদের দুজনের কাছেই একেকটা রিভলবার আছে। দুটোই কোনো নবাবসাহেবের কাছ থেকে আনিয়েছিলেন ওরা। আমি তার মধ্যে থেকে একটা চাইছিলাম। কিন্তু ওরা দিতে চাইল না। সাফ বলে দিল দুটোই তো রিভলবার আর আমরা নিজেরাই দুজন। আপনাকে কিকরে দিই? বিশেষ কথা এটাই যে রিভলবার সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও ওরা বিহারশরিফে ঢুকতে পারল না। যেখানে কংগ্রেসিদের আড্ডা ছিল সেখানেই গেল এবং দলবলের সাথে এদিকওদিক ঘুরে এল।

কি সুন্দর নমুনা গান্ধিজির অহিংসার! আজকাল তো জায়গায় জায়গায় কংগ্রেসি নেতারা শান্তিদল তৈরি করছে যার কাজই হল হিংসায় মেতে থাকা মানুষজনের মাঝে গিয়ে তাদের বোঝান এবং শান্ত করা। সে শান্তিদল অস্ত্রও রাখবে না এবং জীবনের পরোয়াও করবে না। এমনই প্রতিজ্ঞা করে শান্তিদলওয়ালারা। কিন্তু যখন ওদের নেতাদেরই এই দশা তো বাকিদের কথা বলার কী বাকি থাকে? পকেটে রিভলবার নিয়ে শান্তিদলের কাজ করা অদ্ভুত খেলা! তা সত্ত্বেও এই দ্বিচারিতা গান্ধিজি বুঝলে তবে তো! যদি আমি থাকতাম তাহলে নিশ্চয়ই বন্দুক নিয়ে যেতাম আর আস্তে করে লোকেদের ইশারা করে দিতাম, এই যে, দেখুন আমাদের অহিংসা!     

২৫

১৯৩৭ সালের জানুয়ারি মাস ছিল। ফৈজপুর কংগ্রেস থেকে আমরা সদ্য সদ্য ফিরে এসেছি। এসেম্বলি-নির্বাচনের তারিখ সামনে। নির্বাচনের ঠিক আগে তাড়াতাড়ি একবার পাটনা জেলার সফর সারছিলাম। আমার সাথে কংগ্রেসের অন্য নেতারাও ওই সফরে শরিক ছিল। বখতিয়ারপুরে একটা মিটিং করে বিহারশরিফ যাব। সন্ধ্যেবেলায় ওখানে মিটিং। এরই মাঝে হরনৌত থানার লোকেরা জিদ ধরল যে যেহেতু জায়গাটা পথে যেতেই পড়ে এবং একেবারে রাস্তার ওপর কাজেই ওখানেও একটা সভা যেন নিশ্চয়ই করে নিই। আমরা স্বীকৃতি দিয়ে দিয়েছি। লোকেরা মিটিংএর ভালো প্রস্তুতিও করে নিয়েছে। কিন্তু আমাদের বিরোধিরাও চুপ নেই। বিরোধিদের এলাকায় বিশেষ করে তাদের বসবাস যাদেরকে কুর্মি, কুর্মবংশি ইত্যাদি বলে। অন্য জাতিদের থেকে কুর্মিরা ওদিকে বেশি থাকে। নির্বাচনের সময় দুর্ভাগ্যবশতঃ জাতপাতের কথা বেশিরকম চলে। কিন্তু ওখানে আরো একটা কারণ ছিল যে জন্য জাতপাতের ব্যাপারটা বেড়ে গেল।

বখতিয়ারপুর বাঢ় সাবডিভিশনে পড়ে এবং তার দক্ষিণে পড়ে বিহার সাবডিভিশন। কংগ্রেসের ভিতরেই বাঢ় এবং বিহারের সিটগুলো নিয়ে কলহ আর টানাটানি চলছিল। বাঢ়েরই এক কুর্মি ভদ্রলোক, উকিল, নির্বাচিত হওয়ার জন্য আকুল ছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসি নেতারা যখন কোনো কারণে ওনাকে বিহারের সিটের জন্য মনোনীত করাতে চাইল তখন উনি রাজি হলেন না এবং ভিতরে ভিতরে এমন জোট বাঁধলেন যাতে বিহারের সিট থেকে কংগ্রেসি নয় এমন একজন কুর্মি নির্বাচিত হয়। প্রস্তুতি এমন নিখুঁত ছিল, যেন ঠিক সময়ে জেনেশুনে একটা ভুল করে দেওয়া হয় এবং অন্য কিছু হওয়াটাকে আটকে দেওয়া হয়। তাই, ইচ্ছে করে পরে উনি কবুল করে নিয়েছিলেন যে, ঠিক আছে, আমি বিহারেরই সিট থেকে নামাঙ্কন করতে তৈরি। যদিও ভিতরে ভিতরে প্রস্তুতি অন্য কিছুর ছিল। ওনার দুর্ভাগ্য যে ঠিক নমিনেশনের সময় ষড়যন্ত্রটা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় কংগ্রেসের তরফ থেকে ওনার নমিনেশন না করিয়ে অন্য এক কুর্মি ভদ্রলোকের নমিনেশন করান হল। এতে কুর্মি সমাজে উত্তেজনা ছড়াল। কেননা নির্বাচন নিয়ে ওই জাতের ভিতরেই দুটো দল হয়ে গিয়ে ছিল। কংগ্রেসবিরোধী কুর্মি ভদ্রলোকেরও নমিনেশন জমা পড়েছিল। তার প্রভাব বেশি ছিল ওই এলাকায়।

জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতিও আমিই ছিলাম। কিসান-সভার নেতৃত্ব তো ছিলই। আমি একটুও উদাসীন হয়ে পড়লে বিরোধিরা জিতে যেত। চেষ্টাও হল সেরকম। কংগ্রেসি প্রার্থী এক হৃদয়হীন জমিদার। সে কারণেও লোকে ভাবছিল যে যদি আমি তার সাহায্যে না যাই তাহলে সে হারবে নিশ্চয়ই। আমি ওরই জমিদারিতে ওরই জাতের কৃষকদের তরফ থেকে অনেক আন্দোলনও চালিয়েছিলাম আগে। এ কারণেও বিরোধিদের আশা ছিল যে নির্বাচনের সময় আমি প্রচারের কাযে ঢিলেমি দেখাব। কিন্তু আমার তো বাধ্যবাধকতা ছিল। জেলা কংগ্রেস কমিটির তরফ থেকে আমায় কাজ করতেই হত। প্রার্থীর জয় সুনিশ্চিত করতেই আমায় জবাবদিহি দেওয়া হয়েছিল। ফের বেইমানি কি করে করতাম? যদি ঠিক এই নির্বাচনের সময় জেলার সভাপতিত্ব থেকে সরে যেতাম সেটাও সঠিক হত না। হ্যাঁ, চাইতাম তো বটেই যে হৃদয়হীন লোকটা মনোনীতই না হোক। কিন্তু কংগ্রেসি নেতাদের তো তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা ছিল না। তারা তো সবাইকে সে সময় এসেম্বলিতে পাঠাচ্ছিল – হৃদয়হীন জমিদার ছাড়াও, এমন লোকদেরও পাঠাচ্ছিল যাদের কংগ্রেসের সাথে কস্মিনকালেও কোনো সম্পর্ক ছিল না। এই অনাচারের বিরুদ্ধে প্রাদেশিক ওয়র্কিং কমিটিতে আমি সব সময় লড়তাম। কিন্তু একলা ছিলাম। বাকি সবাই ওই ধরণেরই সিদ্ধান্তের সাথে থাকছিল। অদ্ভুত অবস্থা ছিল। কিন্তু করতামই বা কী?

এমত পরিস্থিতিতে আমারই ওপর ক্রোধ ছিল ওখানকার কংগ্রেস বিরোধিদের। ওরা জানত যে আমি ওখানে না গেলে কংগ্রেসি প্রার্থীকে ওরা তুড়ি বাজিয়ে হারিয়ে দেবে। কুর্মি জাতের হওয়া সত্ত্বেও দুই প্রার্থীর জ্ঞাতিগুষ্ঠি আলাদা ছিল এবং তারা নিজের নিজের জ্ঞাতিগুষ্ঠির লোকেদের নিয়ে চিন্তায় ছিল। বখতিয়ারপুরেই জানতে পারলাম যে হরনৌতের মিটিংএ ঝামেলা হবে আর বিরোধিরা হাঙ্গামা করবে। কাজেই, আমি আগে থেকে তৈরি হয়ে গিয়েছিলাম। গ্রামের কাছে পৌঁছোতেই দেখলাম এক দল লালঝান্ডা আর তেরঙাঝান্ডা নিয়ে বাদ্যিবাজনা নিয়ে আমায় অভর্থনা করতে তৈরি আর ঠিক তার পিছনেই আরেক দল কালোঝান্ডা নিয়ে “স্বামিজি, ফিরে যাও” ইত্যাদি স্লোগান তুলে আমার বিরোধ করছে। আমরা হাসছিলাম। আমাদের মোটরগাড়ি বিরোধিদের মাঝ দিয়ে এগিয়ে গেল। রাস্তা থেকে কিছুটা সরে আমরা একটা বাগানে গেলাম যেখানে সভার আয়োজন ছিল। মানুষ আগে থেকেই ছিল। এবার আরো এসে গেল।

সভাস্থলে অনেকগুলো তক্তাপোশ পাশাপাশি জুড়ে রেখে তার ওপর সতরঞ্চি, গালচে ইত্যাদি বেছানো ছিল। আমরা তারই ওপর উত্তর দিকে মুখ করে বসেছিলাম। ভাষণ চলছিল। অন্য কয়েকজনের বলা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমি তখনও অব্দি বলেছিলাম না। বলার পালা চলছিল। সবার মনোযোগ সেদিকেই ছিল। হঠাৎ ডান কাঁধে যেন তীব্র জ্বলুনি অনুভব করলাম। মনে হল কাঁধে জ্বলন্ত অঙ্গার এসে পড়েছিল। আমার হাত পৌঁছোলো তার ওপর। তীব্র ব্যথা। কিন্তু লোকে দেখতে পেল একটা লোক নিজের লাঠিটা আমার ওপর চালিয়ে ছুটে পালাচ্ছে। দৌড়োও, দৌড়োও, ধর, ধর আওয়াজ উঠল, কিন্তু আমি সবাইকে জিদ ধরে সবাইকে ফিরিয়ে আনলাম। যে মেরেছিল সে নিশ্চিন্ত ভাবে পালিয়ে গিয়েছিল। আসলে লাঠিটা তো সে আমার মাথা লক্ষ্য করেই চালিয়েছিল। কিন্তু মাথা বেঁচে গেল কোনরকমে আর লাঠিটা গিয়ে লাগল কাঁধে। এর আগে কখন লাঠির ঘা খাইনি। তাই মনে হল যেন জ্বলন্ত অঙ্গার পড়ল।

যে মেরেছিল তাকে ধরতে লোকজনকে আমি বারণ করলাম কেননা তাতে বিপদ ছিল। যদি সে ধরা পড়ত, আর নিশ্চয়ই ধরা পড়ত, তাহলে ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে সবাই কে জানে কেমন ব্যবহার করত। ভীড় তো ছিলই। মৃত্যুর আশঙ্কা ছিল তার। অন্ততঃ এই বিপদটুকু তো ছিলই। তারপর তার দলওয়ালারা না জানে কী করত। হতে পারে ওখানেই জবরদস্ত মারপীট শুরু হয়ে যেত। সেটা ভেবেই আমি সবাইকে থামালাম। পরিণতি ভালো হল। মিটিং তারপর নির্বাধভাবে চলতে থাকল। আমার চোট দেখে লোকেরা ওষুধের কথা ভাবল। কিন্তু আমি বাধা দিলাম। ঘা খাওয়া জায়গাটা ব্যথার জায়গাটা ফুলে উঠল, কালোও হয়ে গেল। কিন্তু আমি মাথা ঠান্ডা রাখলাম; দাঁড়িয়ে বললামও সভায়। লোকে অবাক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমি পরোয়া করলাম না। হায় হায় করে ওঠা বা চিৎকার করা তো আজ অব্দি আমি শিখিনি। কাজেই ওখানে কেমন করে করতাম। মিটিংএর পর বিহারশরিফ গিয়ে ক্ষতটা গরম জলে ধীরে ধীর ধোয়া হল যাতে ব্যাথা কম হয়। ওখানেও উত্তেজনা ছিল। কিন্তু আমি ওখানকার সভাতেও সারাক্ষণ বসে রইলাম। বললামও। এভাবে পুরো হল সে সফর। কংগ্রেসি প্রার্থী জিতল এবং ভালোভাবে জিতল।

অথচ দুবছর পর ওখানকার অবস্থা একেবারেই অন্যরকম হয়ে গেল। আমি নিমন্ত্রণ পেলাম যে হরনৌতে কিসান-সভা হবে। বিশেষ কথা এটাই যে যারা প্রথম সফরে আমার পরম শত্রু ছিল তারাই এবার আমার সভা করাচ্ছিল। আমার অভ্যর্থনার আয়োজনও সুন্দরভাবে করেছিল। সানন্দে নিমন্ত্রণ স্বীকার করলাম। গিয়ে দেখলাম সত্যি আবহাওয়া অন্যরকম ছিল। সাজান-গোছান মিটিং হল। ভালোবেসে আমার অভিনন্দন করল ওরা। অভ্যর্থনা সমিতির অধ্যক্ষ যে ভাষণটা দিলেন সেটা অন্যরকম ছিল। শ্রোতাদের আশ্চর্য হল। আমিও বিস্মিত হলাম। এটা তো সবাই স্বীকার করল যে দুবছরে কিসান-সভার শক্তি যথেষ্ট বেড়েছে। তাই আগের শত্রুরাও হার মেনেছে, তার মানেটা এবারের জন্য যাই হোক না কেন। এটাই কি কম গৌরবের কথা যে আমাদের শত্রুরাও আমাদেরই পতাকার নিচে এসে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করছে? হ্যাঁ, আমাদের সজাগ থাকা জরুরি যাতে কিসান-সভা বদনাম না হয়ে যায়। সেটা তো আগেও আমরা থাকতাম এবং এখনও থাকি। ওখানকার বদলে যাওয়া পরিস্থিতি দেখে আমরা কখনো এমন ভাবার ভুল করিনি যে ওরা কিসান-সভার পরম ভক্ত হয়ে উঠেছে। বিপদটা ওই ভাবাতেই ছিল আর সেটা আমরা করিনি। কিন্তু এটুকু মানলাম যে ওদের বাধ্য হয়ে কিসান-সভার স্লোগান তুলতে হয়েছে। এই বাধ্যবাধকতার অনুভূতি কিসান-সভার গুরুত্ব বুঝেছে বলে হয়েছে না এটা ভেবে যে কিসান-সভার হাত ধরে কাজ চালান যাবে, অথবা কিসান-সভার প্রতি সাচ্চা ভক্তি ওদেরকে বাধ্য করেছে - এটা ভিন্ন প্রশ্ন। সে সময় এর উত্তর দেওয়াও যেত না। সময়ই বলতে পারত আসল ব্যাপারটা কি।

কিন্তু ওখানে যে আশাজনক আসল ব্যাপারটা দেখলাম সেটা অন্য কিছু ছিল। ওখানে আমরা কুর্মি সমাজেরই কয়েকজন যুবক ও ছাত্র পেলাম। ওদের মধ্যে যা কিছু পেলাম সেগুলোই আমাদের আসল কাজের জিনিষ ছিল। আমরা মুগ্ধ হলাম সেসব পেয়ে। সেই পাওয়াটাকেই আমরা ওই সফরের সবচেয়ে বড় সফলতা মানলাম। ওই ছাত্র ও যুবকদের মধ্যে আমরা কিসান-সভা এবং কৃষক আন্দোলনের সাথে যুক্ত হওয়ার মনোভাব পেলাম। দেখলাম যে ওরা এই আন্দোলনকে নিজের বুঝতে শুরু করেছে। বুঝছে যে ওরা কৃষক এবং ওদের আসল প্রতিষ্ঠান কিসান-সভাই হতে পারে। কৃষক আন্দোলনেই ওরা কৃষক সমাজের মুক্তি দেখা শুরু করে দিয়েছে। আমার চোখে এটা কালো মেঘে সোনার আলোকরেখার মত ছিল।

আরেকটা ব্যাপার ছিল। ওরা আমায় হাতেলেখা একটি মাসিক পত্রিকা দেখাল। নামটা ভুলে যাচ্ছি। ওরা বলল যে প্রতি মাসে ওরা নিজেরাই হাতে লিখে তৈরি করে পত্রিকাটি। লেখা এবং ছবি দুইই ছিল তাতে। দুটোই হাতে লেখা বা হাতে আঁকা। ওরা আগ্রহ করল যে আমি পুরোটা পড়ে একটা শুভেচ্ছাবাণী লিখে দিই। সময় ছিল না। তবুও ওদের ইচ্ছাপুরণ করা জরুরি মনে করে প্রথম থেকে শেষ অব্দি পড়লাম পত্রিকাটি। লেখকেরা নতুন ছাত্র এবং যুবক। সেভাবে লিখতে এখনো শেখেনি। ব্যাকরণের জ্ঞানও সীমিত। তবুও যে ভাবগুলো পেলাম লেখায় তা আমায় মুগ্ধ করে দিল। ভুলেই গেলাম লেখাগুলোর ত্রুটিবিচ্যুতি। আমার সামনে তো ভাবটাই প্রধান হয়ে উঠল। দেশের এবং কংগ্রেসের বড় বড় সব নেতাদের নির্ভীক সমালোচনা ছিল পত্রিকার লেখাগুলোয়, তাও একটা দুটো নয়, অনেকগুলোয়। সমালোচনাও এত ভালো যে মন প্রসন্ন হয়ে যায়। তীক্ষ্ণ কথাগুলোও খুব সুন্দর ভাবে রাখা হয়েছিল।

সেটুকুই নয়। অবাক তখন হলাম যখন দেখলাম যে প্রবন্ধগুলোয় আমার এবং অন্য অনেক কৃষক নেতার উল্লেখ রয়েছে, তাদের বড়াই রয়েছে, তাদের কাজের প্রশংসা রয়েছে। এটাও লক্ষ্য করলাম যে জনস্বার্থের দৃষ্টিতে কংগ্রেসি নেতাদের তুলনায় আমাদের ভালো এবং গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়েছে। কথাগুলো বলার এবং লেখার ধরণ ওদের নিজেদের ছিল আর সেটাই ঠিক ছিল। মেকি ধরণে লেখা বা লেখায় অন্যের নকল করা কখনই ঠিক নয়। প্রত্যেক ব্যাপারে মৌলিকতার মূল্য আছে। তার রূপ যাই হোক – আর আমি তো ওদের লেখার নিজস্ব রূপ বা রীতিকে হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করেছিলাম – কিন্তু কথাগুলো সঠিক ছিল, দাগ কাটার মত ছিল। এমনও নয় যে আমার সাথে ওদের কোন ঘনিষ্ঠতা ছিল। আমি তো অদের কাউকেই চিনতামও না। তাই ওরা যা কিছু লিখেছি তা ওদের হৃদয়ের উৎসার ছিল। অনেকে লিখেছিল, দু’একজনও নয়। কংগ্রেসি নেতাদের নিয়ে কিছু শ্লেষোক্তিও ছিল, যেগুলো স্থূল ছিলনা। বরং ভালো ছিল।

লোকে বলে আমাদের দেশে জাতপাতের অভিশাপ কিছু করতে দেবে না। আমি নিরাশাবাদি নই, খাঁটি আশাবাদি। যদিও ওই এলাকাটা গোঁড়া জাতপাতের এলাকা এবং হরনৌত তার ঘাঁটি। তবুও ওখানে আমি নিরাশাবাদের বিপরীত ব্যাপার দেখলাম। আমার বিরুদ্ধে তো এক সময় ওখানে ঝড় উঠেছিল। তবুও যুবকদের ওই স্বতঃস্ফূর্ত হৃদয়োৎসার অন্য দিক দেখাচ্ছিল হাওয়ার গতির। আমি মানি যে বয়স হলে ওদেরও মাথায় বিষ ভরার চেষ্টা হবে, হয়। কিন্তু যা কিছু আমি ওখানে পেলাম তা বলছিল যে সেই বিষ অবশ্যই নির্মূল হবে।        

২৬

১৯৩৮ সালের গরমকাল ছিল। কৃষক আন্দোলনের কাজে আমার সফর চলছিল বাঢ় এবং বিহার সাবডিভিশনে। বাঢ় শহরের কাছেই একটা বড় গ্রামে সভা করার পর আমি একেবারে প্রত্যন্ত এক গ্রামাঞ্চলে গেলাম। জায়গাটা বাঢ়ের দক্ষিণে পড়ে, যাকে টালের এলাকা বলে। মাটি খুব চিকন আর কালো। বর্ষাকালে তো পা এমনভাবে আটকে যায়, ছাড়ানোই যায় না। আবার গরমকালে শুকিয়ে এত শক্ত হয়ে যায় যে পায়ে কাঁকরের মত ফোটে, কেটে দেয়। দূর দূর অব্দি গাছপালা দেখা যায় না। কোথাও কোথাও একেকটা গ্রাম। বর্ষাকালে পঞ্চাশ মাইল লম্বা আর কুড়িখানেক মাইল লম্বা সেই জমিতে শুধু জল দেখা যায়। মাঝে মধ্যে গ্রাম তেমনই দেখা যায় যেমন সমুদ্রে দ্বীপ। লাগাতার তিন চার মাস এমনই দৃশ্য থাকে। একমাত্র ডিঙিনৌকোয় চড়েই ও গ্রামগুলোতে যাওয়া যায়। ওই টালের এলাকারই একটা ভাগকে, যেটা বাঢ়ের অনেকটা পূর্বে এবং টালের শেষ অংশে পড়ে, বড়হিয়া টাল বলা হয়। সেই ভাগের উত্তরপ্রান্তে জমিদারদের একটা বড় গ্রাম বড়হিয়া এবং তার রেলওয়ে স্টেশন যেমন বাঢ়, মোকামা ইত্যাদি। বড়হিয়া, বাঢ়, মোকামা এসব গ্রামের বড় জমিদারিগুলো আছে বলে টালটার মিথ্যে মিথ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে শুধু জমিদারি জাহির করার জন্য। সেগুলোকেই বড়হিয়া টাল, মোকামা টাল ইত্যাদি বলা হয়। ওই টালেরই জমি নিয়ে বড়হিয়া এলাকার কৃষকদের লড়াই, যারা অধিকাংশ শুধু খেতমজুর এবং তথাকথিত ছোটোজাতের মানুষ, আমাদের কিসান-সভা লাগাতার কয়েক বছর ধরে লড়েছে। এই লড়াইয়ে কৃষকদের ওপর ঘোড়া দৌড় করানো হয়েছে, লাঠি চলেছে, বর্শা-বল্লম বিঁধেছে, শ’খানেক মামলা চলেছে, কয়েকশো কৃষক জেলে গেছে আর কত কিই না হয়েছে। আমাদের কর্মী এবং নেতারাও জেলে গেছে। এলহানেই প্রথম লালকুর্তা পরা কিসান-সেবকদের দল প্রথম তৈরি করা হয়েছে। তাদের বিষয়ে তো ওই টাল অঞ্চলে কর্মরত আধিকারিকেরা পর্য্যন্ত বলেছিল যে এরা সত্যি শান্তিদলের (peace brigade) এর লোক। জমিদারেরা লাঠিরাজ আর গুন্ডারাজ কায়েম করে দেওয়ার পরেও এরাই কৃষকদের সবরকম ভাবে শান্ত রেখেছে। এরাও ওই কৃষকদেরই সন্তান ছিল। সেটাই তো এই দলের বিশেষত্ব। আমরা লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্যও ওই পিছিয়ে থাকা কৃষকদেরই স্বাবলম্বী করেছিলাম। টাকাপয়সাও ওরা বেশির ভাগ নিজেরাই যোগাড় করেছিল।

হ্যাঁ, তো সেই টালেরই দুটো গ্রামে আমরা মিটিং করলাম। আগে থেকেই মিটিংদুটোর আয়োজন করা ছিল। তারপর বাঢ় ফেরার বদলে বাইরে বাইরেই আমাদের বিহারশরিফের এলাকায় নুরসরায় যাওয়ার ছিল। রাস্তা দুর্গম। গরুর গাড়ি ইত্যাদিতে চড়ে যেমন করে হোক আগে হরনৌত পৌঁছোতে হত। সেখান থেকে টমটমে চেপে সহজে নুরসরায় যাওয়া যায়। ঠিক মনে নেই যে আমরা হরনৌতে পৌঁছে টমটমে চাপলাম না তার আগেই। কিন্তু হরনৌতের পরে যে আমরা টমটমে চেপেই গিয়েছিলাম সেটা স্পষ্ট মনে আছে। আসলে সফরে, হরনৌতের পরের অংশটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই মনে আছে।

হরনৌত থেকে এগিয়ে অনেকটা দূর অব্দি আমরা পাকা সড়ক ধরেই গেলাম। কিন্তু তারপর পাকা সড়ক ছাড়তে হল। টমটম কাঁচা রাস্তায় চলতে শুরু করল। আমরা কয়েকজন সাথি ওতে বসেছিলাম। বোধহয় তিন জন। কিছু দূর যাওয়ার পর একটা অদ্ভুত লড়াই দেখতে পেলাম। যে গ্রামের কাছে সেটা হচ্ছিল তার নামধাম তো মনে নেই। আমরা অনেকটা দূর থেকেই দেখলাম যে তিন চারটে ছোটো জন্তু নিজেদের মধ্যেই কিছু নিয়ে ঝগড়া করছে। কখনো একটা তাড়া করছে বাকিদেরকে, মানে তিনজনকে, কখনো সেই বাকি তিনটে ফিরতি হামলা করছে প্রথমটার ওপর। অনেকক্ষণ ধরে দেখছিলাম। যতক্ষণ টমটমটা কাছাকাছি পৌঁছোয়নি আমি বুঝতেও পারিনি জন্তুগুলো কী। ধীরে ধীরে ঘুরতে ঘুরতে টমটমটা যখন কাছে পৌঁছোল তখন বুঝলাম যে একটা ছোটো মা-ছাগল নিজের তিনটে বাচ্চার সাথে একদিকে রয়েছে আর অন্যদিকে রয়েছে তিনটে কুকুর। এই দুটো দলের মাঝে চলছে লড়াই। আমি স্বচক্ষে ঘন্টাখানেক ধরে লড়াইটা চলতে দেখলাম। তার আগে কখন থেকে চলছিল কে বলবে। কিন্তু যখন থেকে আমি দেখা শুরু করেছিলাম, চোখ ফেরাতে পারিনি।

লড়াইটা এভাবে চলছিল। তিনটে কুকুর ছাগলটার ওপর হামলা করে চাইছিল বাচ্চাগুলোর সাথে মেরে খেয়ে নিতে। কিন্তু প্রতিরোধে বাচ্চাগুলোকে পেটের কাছে জড়ো করে মা-ছাগলটা যখন রাগে নিজের মাথা আর শিং নুইয়ে ওদের দিকে তেড়ে যাচ্ছিল, ওরা পালিয়ে যাচ্ছিল। আসলে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে যখন ও ঝাঁপিয়ে পড়ছিল তখন সাহস হারিয়ে ওরা পালিয়ে যাচ্ছিল। আবার যেই ছাগলটা থামছিল ওরা হামলা করছিল। এভাবেই চলল ঘন্টাখানেক। আমি একদৃষ্টিতে ওদেরই দিকে চেয়েছিলাম। যত কাছে পৌঁছোচ্ছিলাম ততই দৃশ্যটা আকর্ষণ করছিল। আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং প্রত্যেকটি রোমকূপ পুলকিত হয়ে উঠছিল। কাছে পৌঁছে দেখলাম ছোটোই ছিল মা-ছাগলটি। কিন্তু ক্রোধে চেহারা হয়েছিল সাক্ষাত মৃত্যুর মত, মুখটা রণচন্ডী যেমন, উদ্বিগ্নও ছিল। কুকুরগুলো তো উদ্বিগ্ন ছিলই। ছাগলটি এতক্ষণ অব্দি জিতছিল তাই সাহস বাঁচিয়ে রেখেছিল। কিন্তু কুকুরগুলোর ইচ্ছে পুরো হতে পারেনি। ওরা তো মা-ছাগলের অথবা নিদেনপক্ষে তিনটে ছাগল-বাচ্চার গরম গরম রক্ত খেতে চাইছিল যা ওরা পায়নি। তাই স্বাভাবিক ভাবে ওদের চেহারায় পরাজয়ের ভাব ছিল। তবুও চলছিল লড়াই। এরি মধ্যে আমার সামনেই ছাগলের মালিক এসে পৌঁছোল। সে কুকুরগুলোকে মেরে ভাগাল এবং ছাগলটাকে বাড়ি পৌঁছে দিল।

আমার চোখে এই দৃশ্য কেন রোমাঞ্চকর ছিল এবং কেন আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম, তার কারণ আছে। আমার সামনে সব সময় এই প্রশ্নটা এসে দাঁড়াত যে কৃষক তো সব ভাবে পরাজিত এবং সর্বস্বান্ত, তাহলে দৃঢ়তার সাথে জমিদারদের মোকাবিলা করবে কিভাবে? অথচ মোকাবিলা না করে তো অত্যাচার থেকে ওরা মুক্তি পাবে না! নিজেদের অধিকারও তারা হাসিল করতে পারবে না। যেখানেই যেতাম এই প্রশ্নটা উঠত। আমিও উদ্বিগ্ন ছিলাম। জবাব তো দিয়েই দিতাম। যারা প্রশ্ন করত তাদের এবং সাধারণ কৃষকদেরও বুঝিয়ে দিতাম ওরা কি করে জয়ী হতে পারে, হবে। বিশ্বে কৃষকেরা কোথায় কেমনভাবে জয়ী হয়েছে সে কাহিনী বলে ওদের বোঝাতাম। কিন্তু শেষ অব্দি এ সমস্ত কথা পরোক্ষ এবং মাথার দুনিয়ার। আমিও কোথাও কৃষকদের জয়ী হতে দেখিনি আর কৃষকেরাও দেখেনি। সব শোনা কথায় সীমিত থাকত। তাই আমি নিজেই নিজের জবাবে সন্তুষ্ট হতামনা। আমি প্রত্যক্ষ উদাহরণ দিতে চাইতাম যে কেমন করে অত্যন্ত দুর্বলও বলবানদের হারিয়ে দেয়। সব সময় এই চিন্তায় থাকতাম আর তারই মধ্যে হঠাৎ মা-ছাগলের এই অদ্ভুত ও ঐতিহাসিক লড়াই দেখতে পেয়ে গেলাম। আমার কাজ হয়ে গেল। পরে তো এটাও দেখেছি একলা বেড়াল কি করে মানুষের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে।

আমি নিজের চোখে দেখলাম যে মামুলি একটা ছাগলও, ঘন্টাখানেক প্রাণপণে তিনটে কুকুরের সাথে জবরদস্ত লড়াই চালিয়ে নিজের তিন সন্তানকে এবং নিজেকেও বাঁচিয়ে নিতে পারল। এটা তো প্রত্যক্ষ ঘটনা ছিল। একটা কুকুরও চাইলে ভীত এবং দমে যাওয়া একটা ছাগলের হাড় চিবিয়ে নিতে পারে। এখানে তো ছাগলটার তিনটে বাচ্চাও ছিল। এমত অবস্থায় আরো সহজ ছিল ছাগলটাকে মেরে ফেলা। কেননা ওর শক্তি শুধু নিজেকে রক্ষা করতে নয়, তিনটে বাচ্চাকে রক্ষা করার উদ্বেগেও অনেকখানি খরচ হচ্ছিল। তবুও ও সফল হল এবং ভালো ভাবে হল। কেন পারল? এর জবাব কথায় কিভাবে দেওয়া যায়? যে সেই সময় ওই ছাগলটার অঙ্গভঙ্গী ও চেহারা দেখেনি এবং নিজের চোখে দেখেনি যে সে কিভাবে লড়ছিল, তার মাথায় এ প্রশ্নের জবাব কেমন করে ঢুকবে, কেমন করে বসবে বলা মুশকিল। ঠিক ভাবে বোঝার জন্য নিজের চোখে এমন ধরণের ঘটনা দেখে নেওয়া একান্ত জরুরি। এমন একটি ঘটনা হাজারটা লেকচারের কাজ করে। কেননা এটা তো সেই “শুনুন, বলছি” নয়। এটা হল “করে দেখাচ্ছি”। আর “করে দেখাচ্ছি” না হলে কোনো কথা মনে বসে না।

আসলে কেউ যখন উদ্দেশ্য স্পষ্ট রেখে, দৃঢ় সংকল্পে প্রাণ হাতে করে এগিয়ে যায় তখন তার ভিতরে লুকোনো অসীম শক্তি বাইরে বেরিয়ে আসে। এটাই জগতের রীতি। শক্তি বাইরে থেকে আসে না। প্রত্যেকের ভিতরে লুকিয়ে থাকে যেমন দুধে মাখন। যেমন দুধটা মন্থন করলে মাখন বেরিয়ে আসে, তেমনই প্রাণ হাতে করে লড়লে, টক্কর নিলে টক্করটা মন্থন-দন্ডের কাজ করে। ফলে লুকিয়ে থাকা শক্তি বাইরে নিয়ে আসে। মা-ছাগলের লড়াইয়ে কথাটা স্পষ্ট হয়ে যায়। কথায় কথায় বলাও হয় যে “মরে, সে কী না করে?” এক সাধারণ মা-ছাগল যদি শক্ত ভাবে দাঁড়িয়ে নিজেকে সপরিবারে তিনটে কুকুরের কামড় থেকে বাঁচাতে পারে, কৃষক শক্ত হয়ে দাঁড়ালে কেন রক্ষা করতে পারবে না নিজের অধিকার? 

২৭

যখন দায়িত্বশীল কর্মী এবং নেতা এমন কাজ করে ফেলে যা সাধারণ বুদ্ধি (Common Sense) করতে মানা করে তখন খুব অসুবিধে হয়ে যায়। জনগণের মধ্যে কাজ করা এক জিনিষ আর শুধু রাজনৈতিক চালিয়াতি অন্য জিনিষ। খবরের কাগজে খবর ছাপিয়ে দেওয়া যে অমুক অমুক জায়গায় মিটিং হয়েছে এবং অমুক অমুক বক্তা বক্তব্য রেখেছেন – এটা এমন কাজ যেটা আমাদের কর্মী এবং লিডারেরা সাধারণতঃ পছন্দ করে। মিটিং কেমন হল, তাতে বাস্তব কাজ কী হল, নাকি হল না, এসবের পরোয়া তারা বিশেষ করে না। আমি এ মনোভাবটাকে শুধু দায়িত্বিহীনতাই নই, ঠগবৃত্তি মনে করি। হতে পারে বাইরের দুনিয়ায় কয়েকজন লোকের প্রতিপত্তি এবং নেতৃত্বের প্রভাব এতে বাড়ে। কিন্তু প্রতারণা করা হয়। জনগণের কোনো কাজ এসবে হয় না। তবুও আমরা কাজের এই ধারায় ভেসে চলি। আকচার খবরের কাগজের রিপোর্ট এধরণেরই হয়। তাতেই আমরা সন্তুষ্ট হই। বার্ষিক রিপোর্টগুলোর ভুঁড়িও এই সর্দিবসা রিপোর্ট দিয়ে ভরিয়ে দিই। বাইরের জগত আমাদের প্রশংসা করে যে আমরা অনেক কাজ করি। যদি একই দিনে আমাদের বেশ ক’টি মিটিংএর খবর ছেপে যায় তাহলে তো আর কথাই নেই। তখন তো আমাদের গুরুত্ব এবং লিডারি আকাশ ছুঁয়ে নেয়।

নিজেদের সফলতার হিসেব এই মিথ্যে রিপোর্টগুলো দিয়ে করলে কৃষক ও শ্রমিকদের কল্যাণে এক ভগবানই ভরসা থাকেন। বোঝা যায় যে আমরা কত সাচ্চা জনসেবক। আমাদের হৃদয়ে উৎপীড়িত জনগণের বাস্তবিক সেবা করার ইচ্ছের আগুন কেমন জ্বলছে তার প্রমাণ আমরা পেয়ে যাই। কিন্তু বাস্তবিকতা এটাই যে এইসব ক্রিয়াকলাপে গরিবের উদ্ধার সাত জন্মেও হবে না। এই মিটিংগুলো হতে থাকবে আর ওরা ছাগল-ভেড়ার মত কখনো এক দল কখনো অন্য দলের হাতে যেতে থাকবে। এভাবে আমরা ওদের নেতা হয়ে, নিজেদের তুচ্ছ স্বার্থের জন্য ওদেরকে ওদের শত্রুদের হাতে বেচে দিতে থাকব হামেশা। এটা কখনোই ওদের উদ্ধারের রাস্তা হতে পারেনা। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে এ ব্যাপারটার তিক্ত অভিজ্ঞতা কৃষক আন্দোলনে আমার এত বেশি হয়েছে যে গোনানো বেকার।

আরেকটা কথা। দায়িত্বর অর্থও আমরা ঠিকমত বুঝতে পারিনা। কোনো কাজ পুরো করতে গিয়ে কী কী করতে হবে, কোন কো অসুবিধার সম্মুখীন হতে হবে, সেগুলোর মোকাবিলা করব কিভাবে, সে ব্যাপারে কার ওপর বিশ্বাস করব, কার ওপর করব না, বিশ্বাস করলেও কতটা করব ইত্যাদি নানান দিক নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা দায়িত্বের ভিতরেই পড়ে এবং এগুলোই দায়িত্বের আসল অর্থ। এগুলো নিয়ে ভালো করে ভাবনাচিন্তা না করে আমরা দায়িত্ব পুরো করতে পারি না আর যদি কোনো দায়িত্বপালনে আমরা অসফল হই তার কারণ এটাই যে আমরা এখনো জানিনি যে দায়িত্ব কাকে বলে। অথবা আমাদের অভিজ্ঞতা নেই যে কে কী করতে পারে, কার কী কী অসুবিধা এবং বাধা আছে যেগুলো আগে থেকে বুঝে নেওয়া জরুরি। যখন গ্রামাঞ্চলের কৃষক বা কর্মী কোনো মিটিংএর আয়োজন করার পুরো দায়িত্ব নিয়ে নেয় তখন আমরা নিশ্চিন্ত হয়ে যাই যে এবার তো আর কিছু করার নেই – আমরা আনন্দে যাব আর মিটিং করে ফিরে আসব।

কিন্তু এটা বড় রকমের বিচ্যুতি। গ্রামাঞ্চলের মানুষদের পক্ষে কাজটা বোঝা এবং সব দিকের হিসেব করে নেওয়া সহজ নয়। সব দিকের ওজন রাখার দায়িত্ব ওদের কাঁধে দেওয়াটাই বিচ্যুতি। কেননা ওজন করার ওদের পাল্লাটাও গেঁয়ো, পুরো ওজন নেয় না। তাই আমাদের নিজেদের সব দিক দেখাশোনা করা জরুরি। আমি দেখেছি, মিটিং যারা করছে বা করাচ্ছে সাধারণতঃ তারা ভাবে যে দুনিয়ায় এই একটা মিটিং। এতেই সবার কাজ হয়ে যাবে। এই মিটিংএর পর আরো কোথাও আরেকটি মিটিং আমাদের লিডারের করার আছে কি নেই সে ভাবনা থাকে না কারোর মাথায়। কাল এবং পরশুও সে নেতার এভাবেই অন্য কোথাও যাওয়ার আছে কিনা, যদি উনি না যেতে পারেন তাহলে সেখানে লোকেদের একই ধরণের নিরাশা হবে কিনা, একই ভাবে মন ক্ষুন্ন হবে কিনা যেমন আয়োজন হয়ে যাওয়ার পর আমাদের মিটিংএ নেতা না এলে আমাদের হয়, এসব কথাও ওরা সাধারণতঃ ভাবে না। তাহলে ঠিক সময়ে মিটিং পুরো করার সমস্ত আয়োজন তারা করবেই বা কিভাবে? বরং এ তো আমাদের দায়িত্বশীল কর্মীদের কাজ যে তারা যেন সব দিক হিসেব করে এমন ব্যবস্থাপনা করে যাতে ঠিক সময়ে সব কাজ পুরো হয়ে যায়। গাঁ-দেহাতের লোকেরা বলে দিলেই সব কথা বিশ্বাস করে নেওয়া বড় রকমের বিচ্যুতি। ওরা না বললেও, অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমাদের বোঝা উচিত ওদের দুর্বলতাগুলো এবং সেই অনুসারে কাজ করা উচিত।

এ ব্যাপারে তিক্ত অভিজ্ঞতা তো আমার হাজারটা হয়েছে এবং সেগুলো থেকে কষ্টও পেয়েছি। কিন্তু কখনো কখনো ভিতরে ভিতরে একেবারে পুড়ে গেছি, বিশেষ করে যখন বড় লিডার বলে পরিচিত মানুষেরা এরকম বোকামি করেছে। এসব নিয়ে আগেও দু’একবার আলোচনা হয়েছে। কিন্তু একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য। ১৯৩৯ সালের বর্ষাকাল পেরিয়ে গিয়েছিল। কৃষকেরা রবির ফসল বোনার জন্য খেতগুলো তৈরি করছিল। ধানের ফসল তখনো তৈরি হয়নি। খেতেই দাঁড়িয়ে। কিন্তু বৃষ্টির জল মোটামুটি রাস্তাঘাটে শুকিয়ে গিয়েছিল। যেটুকু মনে করতে পারি কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তখনো পেরোয়নি। ঠিক সে সময় পাটনা জেলার বাঢ় সাব-ডিভিশনের আমাদের এক কৃষক-নেতা আমার সফরের প্রোগ্রাম বানালো। অন্যান্য যা মিটিং ছিল তা ছাড়া একই দিনে দুটো মিটিংএর ব্যবস্থা করল। একটা ফতুহা থানার উস্ফা গ্রামে আর দ্বিতীয়টা হিলসা থানার হিলসাতেই। যখন জানলাম, বললাম যে গ্রামে একটা মিটিংএর পর আরেকটাও মিটিং করার কথা ভাবা কঠিন যদি না মোটরে যাওয়ার রাস্তা থাকে। কিন্তু সে মানল না।

মিটিংএর দিন যখন ফতুহা স্টেশনে পৌঁছে বার বার জিজ্ঞেস করলাম যে উস্ফা কত দূর, রাস্তা কেমন ইত্যাদি তো জবাব পেলাম যে অনেকটা দূর অব্দি টমটম যাবে তারপর নদী পেরিয়ে তিন-চার মাইল হাতির পিঠে যেতে হবে। উত্তরটা হজম হল না। বিশেষ ব্যাপার এটাও ছিল যে মিটিংএর পর হাতির পিঠেই চার-পাঁচ মাইল গিয়ে লাইট রেলওয়ের টেন ধরে সন্ধ্যে অব্দি হিলসা পৌঁছোনোও জরুরি ছিল। আমি স্পষ্ট বললাম যে এ অসম্ভব। আমার যা গ্রামাঞ্চলের অভিজ্ঞতা তার ভিত্তিতে আমি ওকে আমার সাথে যেতে বাধা দিলাম আর হিলসা যেতে বললাম। এটাও স্পষ্ট বলে দিলাম যে আমার হিলসা পৌঁছোবার আশা না রেখে যেন নিজেই ওখানে মিটিং করে নেয়। হ্যাঁ, যদি সম্ভব হয় তাহলে আমিও পৌঁছে যাব। কিন্তু আমার অপেক্ষায় সে যেন বসে না থাকে। এই বোঝাপড়া অনুসারে আমি টমটমে বসে এক কর্মীর সাথে উস্ফার দিকে এগোলাম, এই আশায় যে যেখানে হাতি দাঁড়িয়ে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেখান অব্দি তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাব।

কিন্তু দায়িত্বহীনতার প্রথম নমুনা ফতুহাতেই পেলাম যখন আমাদের টমটম সদর রাস্তা ছেড়ে গলি দিয়ে চলতে শুরু করল। কিছু দূর গিয়ে গলি বন্দ ছিল; মেরামতের জন্য পাথরকুচি ডাঁই করা ছিল। খুবই অসুবিধা হল। টমটম যেতে পারবে তার আশা ছিল না। অনেক হয়রানির পর যেমনতেমন করে টমটম পার করানো হল। সে হয়রানি আমিই জানি। কিছুদূর এগোবার পর – বেশ কিছুটা দূর – সাইকেলে চড়ে একজন পিছনে পিছনে আসা এবং আমাদের ডাকা শুরু করল। অনেকক্ষণ অব্দি আমরা তার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম না, কাজেই এগোতে থাকলাম। যখন সে কাছে এসে গেল তখন তার ডাক শুনতে পেলাম। সে বলল, হাতি তো স্টেশনেই এসে গেছে, আপনারা ফিরে চলুন। আমরা ঘাবড়ে গেলাম – এ আবার নতুন সঙ্কট! ফিরলে তো আবার সেই গলি দিয়েই টমটম বের করার দুর্ভোগ শুরু হবে। তাই সাইকেল আরোহিকে বলে দিলাম, যাও, হাতি সেখানেই পাঠাও যেখানে থাকার কথা ছিল আগে। কেননা তুমিও তো বলছ যে হাতির মাহুত ভূল করে স্টেশনে চলে এসেছে। সে বেচারা ফিরে গেল। আমরা এগোলাম। কিন্তু কিছু আরো এগিয়ে টমটমওয়ালা বলে দিল, “ব্যস, বাবুজি, এর পর আর টমটম যেতে পারবে না। এখান অব্দি আসার কথা হয়েছিল।”

আমরা নেমে হাঁটা দিলাম। কিছু দূর চলার পর জানা গেল যে এদিকে কোনো নদী-টদি নেই। উস্ফার রাস্তা একটু এগিয়ে ক্ষেত হয়ে যায়, এই কাঁচা রাস্তাটা ছেড়ে। আমরা কিছুটা আরো দূর অব্দি গিয়ে ধানক্ষেতের মাঝে একটা অশ্বত্থ গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়ালাম। গাছের ছায়ায় একটু শুয়েও নিলাম। কিন্তু মনে শান্তি ছিল না। মিটিংএ পৌঁছোনোর উৎকন্ঠা ছিল। তাই থেকে থেকে হাতির পথ দেখছিলাম। কখনো দাঁড়াচ্ছি, কখনো বসছি। দেখতে দেখতে এক ঘন্টা গেল, দু ঘন্টা গেল। কিন্তু হাতির কোনো হদিশ নেই। দেখতে দেখতে চোখ টাটাতে শুরু করল। হয়রান হয়ে পড়লাম। তবু হাতি এল না। বেলা দশটা-এগারটা তখন। ভাবলাম, এমন না হয় যে হাতির অপেক্ষায় বসে বসে উস্ফার মিটিংয়ে যাওয়াও ভেস্তে যায়। হিলসা যাওয়ার তো তখন আর প্রশ্নই নেই। এখন এ তৃতীয় বাধা। ভাবলাম যে হেঁটেই এগোব। রাস্তাও চেনা নয়। তবুও সাহস করলাম যে একে-ওকে জিজ্ঞেস করে পৌঁছে যাব। আগে থেকে এটুকু বুদ্ধি খাটিয়েছিলাম যে সঙ্গে কোনো জিনিষপত্র আনিনি। নইলে ওখানেই বসে থেকে যেতাম। উস্ফা যাওয়া তো দূরের ব্যাপার ফতুহা ফেরাও কঠিন হয়ে পড়ত। জিনিষপত্র কে বইত? ওই অজ গ্রামাঞ্চলে কুলি কোথায় পেতাম? আমি অনেকবার এমন অবস্থায় পড়েছি। তাই প্রস্তুত হয়ে এসেছিলাম যে প্রয়োজনে হেঁটে যাব। জিনিষপত্র আনতামই বা কেন?

হ্যাঁ। তো আমরা চলা শুরু করলাম। রাস্তার অবস্থা বলার মত নয়। পলির কালোমাটি শুকিয়েছিল। পা কেটে যাচ্ছিল তাতে। জুতো পরলে আবার মাঝে মধ্যেই কাদাজল পার করতে সমস্যা হচ্ছিল। তাই জুতো মহারাজ হাতেরই শোভাবৃদ্ধি করছিলেন। কখনো কখনো পায়েও পৌঁছোচ্ছিলেন। রাস্তাও কোনো তৈরি রাস্তা নয়। কোথাও ক্ষেত হয়ে আর কোথাও দুটো ক্ষেতের মাঝের আল ধরে চলতে হচ্ছিল। জিজ্ঞেস করলে লোকেরা এটুকুই বলল যে অমুক কোনে উস্ফা। ব্যস, সেই দিক ধরে হেঁটে যাচ্ছিলাম। তা সত্ত্বেও অনেক বার দিকভ্রান্ত হলাম। দূর অব্দি কোনো গ্রাম দেখা যাচ্ছিল না যে কাউকে রাস্তা জিজ্ঞেস করব। শূন্য প্রান্তরে গাছও ছিল না যে রামচন্দ্রের মত সীতার হাল পুছব। জন্তুজানোয়ারও অদৃশ্য। একই অবস্থা পাখির। অনেকখানি হাঁটার পর কোথাও কোথাও দু’একজন লাঙল ঠেলা কৃষকের দেখা মিলত; ওদেরকেই জিজ্ঞেস করে নিতাম উস্ফার পথ। আবার সেই আন্দাজেই এগোতাম। কার্তিকের রোদ এত তীব্র ছিল যে চামড়া জ্বলছিল। পিপাসাও পেয়েছিল। কিন্তু রাস্তায় জল খাওয়া সহজ ছিল না। কোথাও গ্রামে কুঁয়ো পাব তবে তো জল খাব! কিন্তু কুঁয়োগুলোর অবস্থা এমন ছিল যে মুখ অব্দি জলে ভরা। সে জল খাওয়া মানে অসুখ ডেকে আনা। তাই পিপাসা বেড়ে চলেছিল। রাস্তায় দু’একটা গ্রামও পেলাম। সেখানে আমরা উস্ফার রাস্তা জিজ্ঞেস করলাম আর এগিয়ে গেলাম।

চার মাইল ছ’ মাইলের তো কথাই নেই। আট ন’ মাইলের কম হাঁটিনি। লাগাতার হেঁটেছি। তবুও তিন ঘন্টার বেশিই লেগে গেল পৌঁছোতে। চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু অন্য উপায়ও তো ছিল না। যাই হোক না কেন, মিটিংএ পৌঁছোতেই হত। শেষে একটা গ্রাম পেলাম। ভাবলাম সেটাই উস্ফা। কিন্তু আন্দাজ ভুল বেরুলো। জানা গেল যে এর পরেরটা উস্ফা। নদীনালা আর জলকাদার জন্য রাস্তা ঘুরে ঘুরে যাচ্ছিল। একটু পরে কিছু লোক পেলাম যারা সভায় যাচ্ছে। ধড়ে প্রাণ এল যে এবার কাছাকাছি এসে পড়েছি। অবশেষে বাজনাবাদ্যিওয়ালাদের ভীড় পেলাম। আমাদের অভ্যর্থনা করতে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সরলতায় করুণা হল। আমরা আদৌ পৌঁছোব কিনা তার চিন্তা করল না অথচ অভ্যর্থনা করার জন্য বাজনাবাদ্যি নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। ভাবলাম, এবার কাছেই হবে সভার জায়গা। কিন্তু না, তা তো নয়। এখনো কয়েক মাইল আরো চলার। অনেক পরে যখন গ্রামে পৌঁছোলাম তখন সারা গ্রামে আমাদের মিছিল ঘুরল। কিভাবে জানব যে গ্রামে মিছিল ঘোরানো হচ্ছে? গ্রামটাও শয়তানের আঁতের মত লম্বা। আমরা তেষ্টায় মরছি আর এরা মিছিলে ব্যস্ত। কিন্তু করব কি? গেঁ-দেহাতের লোকেরা সাদাসিধে হয়। ওরা যদি সব কথা বুঝেই যায় তাহলে জমিদারি থাকে কিকরে? মহাজনের লুট চলে কিকরে? ওদের অবুঝপনা আর ভোলাভালা ভাব এগুলোই তো লুটেরাদের – শোষকদের – পূঁজি, ওদের অস্ত্র।

যেমনতেমন করে মিছিলের কাজ শেষ হল আর আমরা গ্রামের বাইরে বাগিচায় পৌঁছোলাম যেখানে সভার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু আমার তো গলা শুকোচ্ছিল। তাই কুঁয়ো থেকে জল আনিয়ে ভালোভাবে স্নান করলাম। তাতে কিছুটা ঠান্ডা হল শরীর। তারপর জল খেলাম। একটু শুয়ে নিলাম। এসবের মধ্যে লোক জড়ো হয়ে চলেছিল। জানলাম যে এ গ্রামে ক্বচিৎ কখনো কেউ আসে। বর্ষাকালে ফতুহা থেকে এখান অব্দি জলময় হয়ে থাকে। শীতেও আসা বলতে গেলে অসম্ভব। হ্যাঁ, আসার হলে গরমকালে কখনো কেউ আসে। সাধারণতঃ এই হয় যে মিটিংএর নোটিশ বিতরণ হয়ে যায়, লোকে জমাও হয়ে যায়। কিন্তু নেতারাই পৌঁছোতে পারে না। ফলে লোকেরা নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। ওখানকার লোকজনের অভ্যাসে চলে এসেছে ব্যাপারটা। মোটরগাড়ি ইত্যাদির আসা তো অসম্ভব। গরুর গাড়িও তাই। হাতি অথবা ঘোড়ায় চেপে আসা যায়। নইলে হন্টন। কিন্তু নেতা আর হন্টন? আমার বিষয়েও লোকে ভাবছিল যে হয়ত পৌঁছোতে পারব না। তাই ক্লান্ত, তৃষ্ণার্ত, অর্ধমৃত অবস্থায় যখন পৌঁছোলাম লোকেরা বেশ অবাক হল।

এমনিতে দেখতে গেলে উস্ফাতে মিডল স্কুল আছে, লাইব্রেরি আছে, ফুটবল ইত্যাদি খেলাও হয়। কংগ্রেসের লড়াইয়ে ওখানকার কয়েকজন অনেকবার জেলেও গেছে। তবুও সমস্ত অঞ্চলটাই পিছিয়ে আছে। সভাটভা কমই হয়। অঞ্চলের ছোটো, ছোটো জমিদারেরা প্রবল অত্যাচার করে। পুলিসের পক্ষেও পৌঁছোন সহজ নয়। তাই অত্যাচারিরা স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়ায়। লাগাতার কয়েক বছরের মধ্যে আমার ওই একটা মিটিং ছিল যেখানে পুলিস পৌঁছোতে পারেনি, সিআইডি রিপোর্টারদের পক্ষে পৌঁছোন তো আরো অসম্ভব ছিল। ওরা হিলসার মিটিংএ চলে গেল। এটাও অদ্ভুত ছিল।তামাশার ব্যাপার হল যখন আমায় নেওয়ার জন্য পাঠান হাতি, ঠিক মিটিংএর শেষে ওখানে ফিরে এল।

ওখানকার এক ছোটো জমিদারকে সভায় সভাপতি করা হল। আমি পরে জানলাম। নইলে এমন হতে পারত না। অবশ্য আমি যে লেকচার দিলাম তা জমিদারি প্রথা এবং জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধেই ছিল। তবুও কে জানে কিভাবে সভাপতি সেসব কথা কলজেটাকে পাথর করে শুনতে থাকল। ওর চেহারা দেখে আমার মনেই হল না যে ও আমার ভাষণ শুনে ঘাবড়ে যাচ্ছে। অবশ্য ঘাবড়ে গেলেও আমার কি? আমি তো আমার কাজ করতামই। হ্যাঁ, শ্রোতাদের দেখলাম আনন্দে আমার একেকটা কথা শুনছে। মনে হচ্ছিল, পান করছে। যেমন যেমন কথাগুলো শুনছিল, ওদের চেহারা আলোয় ভরে উঠছিল। ওখানে এটাও জানলাম যে উস্ফার কৃষকেরা জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়তে একটুও দ্বিধা করে না। অন্যদের মত পুলিসকেও ভয় পায় না ওরা। যদি পুলিস অন্যায়ভাবে জমিদার বা মহাজনের পক্ষ নেয়, তাহলে তাদের সাথেও লড়ে যায় কৃষকেরা। ভবিষ্যতের দিক থেকে কথাটা সুন্দর। অধিকারের জন্য প্রাণ ত্যাগ করার নিষ্ঠা ছাড়া কৃষকদের নিস্তার পাওয়ার ভিন্ন কোনো রাস্তা নেই।

হ্যাঁ, সভার শেষে একটা মজাদার ঘটনা হয়ে গেল। কয়েকজন যুবক, মনে হল স্কুল-কলেজের পড়ুয়া, জিজ্ঞেস করলঃ স্বরাজ্য পাওয়ার আগেই আপনি জমিদার-কৃষকের ঝগড়া কেন শুরু করছেন? ছিল ওরা জমিদারদেরই ছেলে। কিন্তু চালাকি করে স্বাধীনতার যুক্তি খাড়া করে নিজেদের কংগ্রেসি দেখাল। আমি জবাব দিলামঃ ঝগড়া শুরু করার কথা কোত্থেকে আসছে? ঝগড়া তো আগে থেকেই আছে। যদি কেউ আপনাদের জমিজায়গা লুটতে শুরু করে তাহলে কি স্বরাজ্যের কথা চিন্তা করে ওর সাথে আপনারা ঝাঁপিয়ে পড়বেন না? কেননা ঝগড়া বাধলে তো আপনাদেরই যুক্তি মত স্বরাজ্য প্রাপ্তিতে বাধা আসবে। আমরা তো কৃষকদের এটাই বোঝাই যে যে স্বরাজ্য তাদের আনতে হবে সেটা কেমন, কেননা জমিদারদের আর কৃষকদের স্বরাজ্য এক হবে না – আলাদা আলাদা হবে। যেটা একজনের জন্য স্বরাজ্য হবে, সেটা অন্যের জন্য আপদ হবে।

ওরা বললঃ আপনি তো মিস্টার জিন্নার মত কথা বলছেন। যেমন উনি স্বরাজ্য পাওয়ার আগেই তাকে ভাগ করছেন আপনিও তেমনই করছেন। তখন আমি ওদের বললামঃ আপনারা আমার বক্তব্য ঠিক মত বুঝতে পারেন নি। আমি তো কৃষকদের শুধু এটুকুই বলি যে সজাগ হয়ে যেন তারা স্বরাজ্যের জন্য লড়ে, যাতে এটা তাদের স্বরাজ্য হয়, জমিদার আর সুদখোরদের নয়। কিন্তু লড়ে যেন নিশ্চয়ই। জমিদারেরা যদি নাও লড়ে, একাই যেন লড়ে। আর যদি জমিদারেরা লড়ে তাহলে যেন একসঙ্গে লড়ে। কিন্তু যেন সাবধান থাকে যাতে সুযোগ এলে তাদের প্রতারণা করে জমিদারেরা স্বরাজ্যের ষোল আনাই না কুক্ষিগত করে নেয়। কিন্তু মিস্টর জিন্না তো মুসলমানদের লড়াইয়ে নামতেই বাধা দেন। উনি তো চাকরি আর এসেম্বলির সিটের বাঁটোয়ারা চান। সেই বাঁটোয়ারার জন্য হিন্দুদের সাথে মিলে লড়তে চান না। উলটে বার বার মুসলমানদের লড়াইয়ে নামতে বাধা দেন। তাহলে আমার সাথে ওনার তুলনা কেমন করে হয়? কেউ কি বলতে পারে যে আমি বা কিসান-সভা বা কৃষকেরা কংগ্রেসের লড়াইয়ে সঙ্গ দেয় নি? কখনো আমি কৃষকদের বাধা দিয়েছি?

এরপর ওরা চুপ করে গেল। কিন্তু কৃষকেরা সমস্ত কথা বুঝে গেল। আমি কৃষকদের জিজ্ঞেস করলামঃ তোমরা গ্রামের জমিদার যে নবাবসাহেব তাঁর স্বরাজ্যের জন্য লড়বে না নিজের স্বরাজ্যের জন্য? তারা এক আওয়াজে জবাব দিলঃ নিজেদের স্বরাজ্যের জন্য। তখন বললাম যে এই যারা প্রশ্ন করছিল এখন, এরা তো নবাবসাহেবেরই স্বরাজ্য চায়, যদিও স্পষ্ট করে বলছে না। কিন্তু মানেটা অস্পষ্ট করে দিলে তো স্বরাজ্য তাই দাঁড়াবে। এরা ভয় পাচ্ছে যে মানেটা অস্পষ্ট না রেখে যদি স্বরাজ্যের স্বরূপ তৈরি করতে শুরু করি তাহলে কৃষকেরা দ্বিধাগ্রস্ত হবে। যে স্বরাজ্যে জমির মালিক কৃষক হবে না, নিজের আয় আগে নিজে স্বপরিবারে উপভোগ করতে পারবে না, যথেষ্ট জমি পাবে না, সুদখোরদের হাত থেকে মুক্তি পাবে না, জমিদারদের অত্যাচার থেকে অব্যাহতি পাবে না এবং ক্ষুধিত থেকেও খাজনা, কর্জ ইত্যাদির পাওনা চোকাতেই হবে, সেটা ওদের স্বরাজ্য কিকরে হবে? আর যদি এসব না থাকে তাহলে জমিদার, মালদারদের স্বরাজ্য কি করে হবে? তাই বলি যে কৃষকের আর জমিদার-মালদারের স্বরাজ্য এক হতে পারে না। এ কথায় জয়জয়কার তুলে সভা বিসর্জিত হল। সবাই নিজের নিজের গ্রামে, বাড়িতে গেল।

এবার প্রশ্ন এল ফেরত যাওয়ার আর ঠিক সময়ে ফতুহায় ট্রেন ধরার। কেননা প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছিল। হিলসা যাওয়ার তো আর প্রশ্নই ছিল না। আশঙ্কা ছিল যে ফতুহা পৌঁছোলেও বিহটা যাওয়ার ট্রেন পাওয়া যাবে কিনা। যদি দ্রুতগতি সওয়ারি পাওয়া যেত তাহলে সম্ভব ছিল। তাই আমি জোর দিয়ে বললাম যে তাড়াতাড়ি যেন ভালো সওয়ারি আনা হয়। সভার আগেও, ওখানে পৌঁছেই আমি বলে দিয়েছিলাম যে সওয়ারির ব্যবস্থা যেন ঠিক থাকে। আসার সময় যে দুর্গতি হল তা তো হলই, যাওয়ার সময় যেন ঠিক থাকে অন্তত। নইলে কালকের প্রোগ্রামও ভেস্তে যাবে। হিলসা তো রয়েই গেল। লোকেরা হ্যাঁ হ্যাঁ করে দিল আর শুনিয়ে দিল যে সব ঠিকঠাক ব্যবস্থা করা আছে। কিন্তু আমার তো সন্দেহ ছিলই। “সব ঠিকঠাক ব্যবস্থা করা আছে” ধরণের জবাব যখন সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায়, খুব বিপজ্জনক হয়। এ অভিজ্ঞতা আমার অনেক জায়গার। কিন্তু কী করতাম? তাই মিটিং শেষ হতেই সোয়ারির জন্য চ্যাঁচামেচি শুরু করলাম। জবাব এল, আসছে। কিছুক্ষণ পরে আবার জিজ্ঞেস করলাম। আবার সে জবাব পেলাম, আসছে। কয়েকবার একই জবাব শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে উঠলাম। আসার ক্লান্তিতে দমে ছিলাম বলে সওয়ারির চিন্তা ছিল। নইলে হেঁটে বেরিয়ে পড়তাম। কিন্তু যখন দেখলাম যে সওয়ারির চিন্তা নিয়ে এদের কোনো হেলদোল নেই, তখন হেঁটেই বেরিয়ে পড়লাম। ওরা থামাতে চাইলঃ থামুন, সওয়ারি আসছে। কিন্তু আর আমার ভরসা ছিল না। রওনা হয়ে পড়লাম। পিছনে দেখলাম সেই পুরোনো হাতি পিঁপড়ের চালে এগিয়ে আসছে। রাগ তো ভীষণ হল যে এরা ধোঁকা দেয়। এই মরা সওয়ারি ধরে আমি কখন ফতুহা পৌঁছোব! এমন দায়িত্বিজ্ঞানশূন্যতা! তারপরেও পিছন থেকে আমায় থামানোর জন্য ডেকে যাচ্ছে! তাই আমি চলতে থাকলাম। দরকারের সময় সওয়ারির এই শেষ অসুবিধেটা ভীষণ গায়ে লাগল। কিন্তু নিরুপায় ছিলাম। দু’এক মাইল এগিয়ে গিয়েছিলাম। সন্ধ্যে হচ্ছিল। দুধও খেতে পারিনি। তাই সামনের গ্রামের মানুষেরা আমায় থামালো। ওরাও গিয়েছিল সভায়। এক বৈষ্ণব ব্রাহ্মণ বাইরেই কুঁয়োর পাড়ে কম্বল বিছিয়ে আমায় বসাল আর তক্ষুণি গরুর দুধ দুইয়ে আমায় খেতে দিল। এতে কিছু সময় গেল আর বুড়ো হাতিও এসে পৌঁছোল। ও হাতির পিঠে চড়তে দ্বিধা হচ্ছিল। আমি এর জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। কিন্তু লোকেরা জিদ করল।  রাতে সময়, অজানা রাস্তা। কাদাজল ঠেঙিয়ে পার হওয়া, তাও আট-দশ মাইল রাস্তা। কঠিন সমস্যা। দিন থাকলে এমনই হেঁটে পাড়ি দিতাম। কিন্তু অন্ধকার রাত। নিরুপায় হয়ে হাতির পিঠে বসতেই হল। একটা লন্ঠনও এল রাস্তা দেখানোর, সে এমন অপয়া যে আলো বোঝাই যায় না। অন্য লন্ঠন ছিল না। অগত্যা সেটাই নেওয়া হল। আর নিভেও গেল পরক্ষণেই। ফলে হাঁক দিয়ে মালিককে ডেকে ওই লন্ঠন ফেরত দিয়ে অন্ধকারেই পথ আন্দাজ করে আমরা এগিয়ে চললাম। কী করতাম? এক তো হাতিটা বুড়ো এবং দুর্বল। দ্বিতীয়তঃ আমাদেরই মত ক্লান্ত। কেননা এখনই স্টেশন থেকে ফেরত এসেছিল। তৃতীয়তঃ ক্ষুধার্ত। ভালোমানুষেরা তার খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা তো করেইনি উলটে ওকে আমার সঙ্গে আবার রওনা করে দিল। অদ্ভুত ব্যাপার। রাত না হলে ও না খেয়ে মরত। এগুতোও না এক কদম। কিন্তু যাই হোক, রাত ছিল বলে ওর মুখ চলতে থাকল। হাতি তো চলতে চলতে ছিঁড়ে খায়ই রাস্তায় পড়া ক্ষেতগুলোর খাড়া ফসল। এভাবেই তো ওর চলে। দিনের বেলায় ক্ষেতওয়ালারা সজাগ থাকে, চ্যাঁচায়, আকাশ ফাটায়। তাই মাহুত হাতিকে বকতে বকতে বাধা দিতে দিতে চলে, ফলে ওর খাবল বেশি চলে না। কিন্তু রাতে তো সেই বিপদ নেই। তাও হাতির স্বরাজ্য। ধানের সবুজ সবুজ ক্ষেত দাঁড়িয়েছিল। তারই মধ্যে দিয়ে আমরা চলছিলাম। হাতি খেতে খেতে চলছিল। কৃষকের ফসলের এভাবে নষ্ট হওয়া কষ্ট দেয় ঠিকই। তাই সাধারণতঃ আমি হাতির পিঠে চড়ি না। কিন্তু হাতির খিদে দেখে আমিও নিরুপায় ছিলাম; হাতিটাকে থামানোর জন্য মাহুতকে কিছু বলতে সাহস হচ্ছিল না।

এভাবে এগোতে এগোতে একটা নদীর তীর ঘেঁষে চলতে শুরু করলাম। জানা গেল যে এটা ফতুহা যাওয়ার সদর রাস্তা। এবার ভরসা হল যে আমরা রাস্তা ভুল করিনি। ঠিক যাচ্ছি। কিছু দূর সেভাবেই চলার পর নদীটা আমাদের ছেড়ে কে জানে কোথায় পালিয়ে গেল। নদীদের চলন তো আঁকাবাঁকাই হয়। ওদের পটবেই বা কার সাথে? তারই সাথে পটবে যার চলন একই ধরণের। আমাদের তো ফতুহা পৌঁছোবার তাড়া ছিল। হাতের নাগালে ঘড়ি ছিল। একটু পরে পরেই দেখে নিচ্ছিলাম। এবার ভয় পেয়ে বসল যে ট্রেন ধরতে পারব না। কেননা আন্দাজ করছিলাম যে ফতুহা এখনো দূরে। তখনই ট্রেনের আলো দেখতে পেলাম। দেখলাম পূর্ব থেকে পশ্চিমে ঝিকঝিক করতে করতে ট্রেন চলে যাচ্ছে। ওর তো আর আমার পরোয়া করার ছিল না। যদি ওর ভিতরে হৃদয় নামের কোনো বস্তু থাকত আর আমার বিষয়ে জানত তাহলে হয়ত আমার ভিতরে চলতে থাকা কুরুক্ষেত্রটা অনুভব করতে পারত। তবুও, আমার জন্য কি আর থামত? যারা সময়ানুবর্তী এবং সময়ের ডাক শুনতে পায় তারা কারোর পরোয়া না করে এগিয়ে চলে, এগিয়েই চলে। সে সময় আমার মাথায় এই চিন্তাটাই খেলে গেল। নিজের অসাফল্যেও এটুকু সাফল্য – এই শিক্ষা – আমি পেলাম। তাতেই তুষ্ট থাকলাম।

হাতি চলতে থাকল। এরই মধ্যে লাইট রেলওয়ের ট্রেনও দক্ষিণ দিক থেকে এল আর চলে গেল। আমি বোকার মত দেখতে রয়ে গেলাম। শেষে হাঁকতে হাঁকতে চলতে চলতে আমরাও ফতুহার কাছে পৌঁছলাম। যখন পাকা রাস্তায় এলাম, দু বছর আগের ঘটনা মনে পড়ল। মনে এল যে ফতুহার কাছে, বিশেষ করে হিলসার প্রোগ্রামে আমি বার বার অসুবিধায় পড়ি। দু বছর আগেও এমনই হয়েছিল। হিলসায় মিটিং করে আমরা টমটমে চেপেই ফতুহা যাচ্ছিলাম ট্রেন ধরতে। ট্রেন অবশ্য পেয়েছিলাম। কিন্তু ফতুহার কাছাকাছি পৌঁছে এই পাকা রাস্তার ওপর মরতে মরতে বেঁচেছিলাম। রাত হয়ে গিয়েছিল এবং যে টমটমে আমরা আসছিলাম সেটা হিলসারই ছিল। যেই সে জায়গাটায় পৌঁছোলাম যেখানে একটা পুল আছে এবং দুটো রাস্তা মেলে, সামনে একটা গরুর গাড়ি পেলাম। টমটমওয়ালা চাইল টমটমটাকে পাশ কাটিয়ে বার করে নিতে। কিন্তু সেটা করতে গিয়েই ঘোড়া রাস্তা থেকে নেমে গেল আর মুখ থুবড়ে পড়ল। আসলে জায়গাটায় রাস্তার পাশটা অনেক গভীর। টমটম উলটে গেলে আমরা কেউই প্রাণে বাঁচতাম না। সবাই শেষ হয়ে যেতাম। কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার যে ঘোড়া পড়ে যাওয়া সত্ত্বেও টমটম থেমে রয়ে গেল। আমাদের সঙ্গীরা নিচে পড়ে গেল। টমটমটা ঝুলে রয়ে গেল, ওল্টালো না। আর আমি ওতেই বসে রয়ে গেলাম। আমি ছাড়া বাকি সবাই আঘাত পেল অল্পবিস্তর।  ঘোড়া তো মরেই যেত যদি শিগগির আমরা ওকে টমটম থেকে খুলে আলাদা করে দাঁড় করিয়ে না দিতাম। যাহোক, তাকে ওঠান হল এবং যেমনতেমন করে টমটম স্টেশনের কাছে পৌঁছোল। সেদিনের ঘটনা কখনো ভুলতে পারি না। এধরণেরই ঘটনা কিসান-সভার সফরে আরো দু’একবার হয়েছিল। কিন্তু সেবারেরটা ছিল সবচেয়ে ভয়ানক। মরতে মরতে আমরা বেঁচেছিলাম। তাও আবার আমার কিছুই হল না। সেই ঘটনাটা আজ স্টেশনের কাছে মনে পড়তে না পড়তেই আমরা ঠিক সেই দুর্ঘটনার অকুস্থলে পৌঁছে গেলাম।

হাতি সেখান থেকে এগোল। স্টেশনের দক্ষিণ দিকে, রেললাইনের গুমটির ওপর আমরা হাতির পিঠ থেকে নেমে পড়লাম। এমন মনে হল যেন কোনো জনশূন্য জায়গা থেকে আসছি যেখানে না আছে রাস্তা আর না আছে কোনো সওয়ারি বা শিকারী। ট্রেন তো বহুক্ষণ আগে বেরিয়ে গিয়েছিল। এখন আর তার চিন্তাও ছিল না। বরং আনন্দ ছিল যে এই ভয়ঙ্কর সফর থেকে ফিরে ভালোয় ভালোয় স্টেশনে পৌঁছে গেছি। আসলে এক চিন্তা থাকতে যদি তার থেকে বেশি বিপজ্জনক ব্যাপার সামনে চলে আসে তাহলে চিন্তা নিজে থেকেই অদৃশ্য হয়ে যায় আর নতুন বিপদ চোখের সামনে নাচতে থাকে। আমার সেই একই অবস্থা হয়ে গিয়েছিল। আমরা স্টেশনে আদৌ পৌঁছোব কিনা, পৌঁছোলেও কখন এবং কী অবস্থায়, হাত-পা ভাঙা থাকবে না অটুট থাকবে ইত্যাদি চিন্তাগুলো মাথায় ভরেছিল এতক্ষণ। এটুকুই উৎকণ্ঠা ছিল যে যেমন করে হোক স্টেশনে ভালোভাবে পৌঁছে যেন যাই। তাই, পৌঁছে আনন্দে ভরে গেল মনটা।

স্টেশনে গিয়ে সমস্যা হল শোয়ার। শোয়ার জিনিষপত্র তো সঙ্গে ছিল না। সে তো ট্রেনেই চলে গিয়েছিল। এমনকি হাত-পা ধোয়ার জন্য জল আনার ঘটিও ছিল না। তাই ওয়েটিং রুমে আস্তে করে অন্ধকারে গিয়ে বসে পড়লাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পর স্থানীয় কবীরপন্থী মঠের কিছু ছাত্র আমায় খুঁজতে খুঁজতে এল। ওরা মোহান্তের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিল এবং আমার আসার প্রতীক্ষা করছিল। ট্রেনের সময় খুঁজে ফিরে গিয়েছিল। আবার এল আর আমায় নিজেদের জায়গায় নিয়ে গেল। সে সময় আমি ওদের খুব বেশি সাহায্য করতে পারলাম না। তবুও পথ বলে দিলাম। সকালের ট্রেনে বিহটা চলে গেলাম। 

২৮

কিসান-সভার তো এত স্মৃতি আছে যে কয়েকটি গ্রন্থ লেখা যেতে পারে। এমনও নয় যে সব শুধু স্মৃতিকথার মত। প্রত্যেকটি স্মৃতি মজাদার। ঘটনাগুলোর মাধ্যমে জানা যায় কোন কোন সঙ্কট কবে কবে কিভাবে পার করে কিসান-সভার ভিত মজবুত করা হয়েছে। বহুবার তিন-তিন মাইল, চার-চার মাইল দৌড়ে কোনো রকমে সভাস্থলে পৌঁছোতে পেরেছি, যেমন এক বার পাটনা জেলার দানাপুর অঞ্চলে মগর পাল দিয়ারার রামপুরের সভায় হয়েছিল। সওয়ারির ব্যবস্থা ওরা করতে পারল না আর যখন দেরি করে আমরা শেরপুরে পৌঁছোলাম তখন সন্ধ্যা নামছিল। যদি চার মাইল দ্রুতগতিতে না দৌড়োতাম লোকে হতাশ হয়ে চলে যেত।

এমনই একবার গয়া জেলার খটাঙ্গিতে সভা করার ছিল। গয়া থেকে মোটরগাড়িতে রওনা হলাম। বৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। রাস্তায় নতুন মাটি বেছানো হয়েছিল – নতুন তৈরি হয়েছিল কাঁচা রাস্তা। মোটর বসে যাচ্ছিল মাটিতে। ছয় মাইল যেতে ছয় ঘন্টা লেগে গেল। রাত হয়ে গেল। শেষে মোটর ছেড়ে সেই রাতেই আন্দাজে কয়েক মাইল হেঁটে পৌঁছোলাম। ততক্ষণে সভা থেকে লোকেরা চলে গিয়েছিল। কিন্তু চার দিকে ডাক দিয়ে লোকে দৌড়োন শুরু করল এবং মিটিংএর আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ফল হল যে রাস্তা থেকেই ফিরে এল লোকেরা। খটাঙ্গি থেকেই তারা দেরিতে বেরিয়েছিল, তাই রাস্তাতেই ছিল। রাত দশটা-এগারটায় সভা হল আর খুব ভালোভাবে হল।

সবচেয়ে মজাদার ব্যাপার তো মাঝিয়াওয়াঁয় বকাশ্তের লড়াইয়ের সময় হয়েছিল। মাঝিয়াওয়াঁ খটাঙ্গির দু’তিন মাইল উত্তরে। দুপুরবেলায় টেকারি পৌঁছেছিলাম। সেখান থেকে মাঝিয়াওয়াঁ চোদ্দ মাইল। বৃষ্টির দিন, কাঁচা রাস্তা, সওয়ারি আসতে দেরি। ব্যস, হেঁটেই রওনা হলাম। ছ-সাত মাইল চলার পর সওয়ারি পাওয়া গেল। খুব কষ্টে অন্ধকার হতে হতে মাঝিয়াওয়াঁ পৌঁছোলাম। সংগ্রাম চলছিল। তাড়াতাড়ি লোকজন জড়ো করলাম। মিটিং করলাম। সবাইকে বুঝিয়ে বিদায় নিলাম। মাঝরাতে গয়া থেকে ট্রেন ধরার ছিল। পরের দিনের প্রোগ্রাম যাতে ফেল না হয় তাই অমন করতে হল। অত তাড়াতাড়ি সওয়ারি কোথায় পাওয়া যেত? হেঁটেই রওনা দিলাম। সাধারণ রাস্তা নয়। পলিমাটির। খুব বৃষ্টি পড়েছিল। রাতের সময়। ট্রেন ধরার চিন্তা ছিল। ভালোর মধ্যে এটাই ছিল যে কয়েকজন লোক সঙ্গে ছিল। একটা টাট্টুও সাথে দিয়ে দেওয়া হল। যাতে ক্লান্ত হলে তার ওপর চেপে যেতে পারি কিছুদূর। টাট্টুতে চড়ার অভ্যাস তো আমার নেই। এক বার চড়ে, কিছুক্ষণেই কষ্টের চোটে নেমে পড়লাম। রাত একটায় যেমনতেমন করে টেকারি পৌঁছোলাম। মোটর দাঁড়িয়েছিল। মোটরে বসতেই ছুটল। দুটো নাগাদ গয়া পৌঁছে প্রায় চলন্ত ট্রেনটা ধরে পাটনা এলাম। আনন্দ হল যখন এত হয়রানি করে করা কাজের পর শুনলাম যে মাঝিয়াওয়াঁর কৃষকেরা, পুরুষদের থেকে বেশি নারীরা, লড়াই করে আমাওয়াঁ এস্টেটকে তাদের দাবি মানতে বাধ্য করেছে। বকেয়া খাজনার লাখো টাকা মকুব হল আর নীলামি জমি সস্তা খাজনায় ফেরত পেল কৃষকেরা। মাঝিয়াওয়াঁ শ্রী যদুনন্দন শর্মার জন্মভূমি।

কিন্তু যতগুলো স্মৃতিকাহিনী এখন অব্দি লিপিবদ্ধ হয়েছে, তা থেকে আমাদের আন্দোলনের প্রগতির ওপর অনেকটা আলোকপাত হয় এবং পড়লে জানতে পারা যায় যে এই কিসান-সভা কেমন করে তৈরি হয়েছে। আসাম, বাংলা, পাঞ্জাব এবং খান্দেশ ইত্যাদির সফর থেকেও এ বিষয়ের ওপরই আলো পড়ে। ওসব সফরের বর্ণনা স্থানান্তরে আছেও। তাই এখানে লেখা জরুরি মনে করা হয়নি। বিশেষ দরকার না থাকলে পুনরুক্তি উচিৎ নয়। তাই চলার পথের একটি মজাদার এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ করে এই স্মৃতিকথা শেষ করতে চাই। ঘটনাটা খুব পুরোনো নয়। ইয়োরোপের যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার পরের। এখন অব্দি আমার সঙ্গে থেকে যেসব মানুষেরা বিশেষ করে বিহারে এবং অন্য জায়গাতেও কিসান-সভা এবং কৃষক আন্দোলন চালাবার দায়িত্ব নিয়েছিল তাদের মনোভাবের ওপর আলোকপাত করে ঘটনাটা। কৃষক আন্দোলনকে ভবিষ্যতে সঠিক পথে যারা চালনা করবে তাদের জন্য এটা জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। নইলে তারা প্রতারিত হতে পারে, পথ হারাতে পারে। আসলে আমার নিজেরই এই কথাগুলো বুঝতে কম-সে-কম আধডজন বছর লেগে গেছে। তারপর বুঝেছি ভালোভাবে। তাই অন্যদের সামনে রাখা উচিৎ মনে হচ্ছে। যাতে ওদেরও আধ বা এক ডজন বছর এসব জানার জন্য নষ্ট না করতে হয়। আগেই বলে দিতে চাই আমি কারো নাম নেব না। নাম নিলে আলাদা করে কোনো লাভ হবে না।

১৯৪০এর মাঝামাঝি কংগ্রেসের ওয়র্কিং কমিটি নিজের অহিংসার আবরণটা খুলে ছুঁড়ে ফেলল আর গান্ধিজিকে পেন্নাম ঠুকে সিদ্ধান্ত করে নিল যে যদি ইংরেজ সরকার ভারতেও জাতীয় সরকার (National Government) বানিয়ে দেয় এবং ঘোষণা করে দেয় যে ভারত পূর্ণ স্বাধীনতার অধিকারী তাহলে কংগ্রেস ইয়োরোপীয় যুদ্ধে সফলতার জন্য সাহায্য করবে। যদিও প্রস্তাবের শব্দগুলো একটু ঘোরানো-প্যাঁচানো এবং ওকালতি ধরণের ছিল, তবুও রাষ্ট্রপতি এবং অন্যান্য দায়িত্বশীল নেতাদের বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে সত্যিকারের অর্থটা বেরিয়ে এল। ঠিক সে সময় জেলে আমার সাথে থাকা কয়েকজন সোশ্যালিস্ট নেতা একটা নতুন পার্টি তৈরি করার কথা ভাবল। তার জন্য তারা লম্বাচওড়া কিছু যুক্তি দিল এবং সেগুলোর ভিত্তিতে একটি কর্মপদ্ধতিও তৈরি করল। তারা পরিষ্কারভাবে এটাও বলল যে কংগ্রেস এক প্রকারে শেষ হয়ে গেছে। আর সে স্বাধীনতার জন্য লড়বে না। আমাদের কোনো কাজের রইল না দলটা। যদিও সরকার সে সময় ওয়র্কিং কমিটির প্রস্তাব স্বীকার করেনি, তাই তাতে মাটি চাপা পড়েছিল। কিন্তু যে কোনো সময় মাটি খুঁড়ে বার করে জ্যান্ত করা যেতে পারত। এবার কংগ্রেসি নেতারা সাম্রাজ্যবাদের সাথে হাত মিলিয়ে ওদেরই অস্ত্র দিয়ে জাগ্রত জনগণকে দাবিয়ে দিতে চাইছিল। কেননা দেশের সাধারণ জনতাকে (Masses) ওরা ভয় পেতে শুরু করেছিল। তাই তাদের সাথে সংযুক্ত মোর্চায় থাকার প্রশ্ন আর থাকছিল না।

এমন পরিস্থিতিতে এবার আমাদের কী করতে হবে সে বিষয়ে ওরা নিজেদের স্পষ্ট অভিমত দিল যে এবার আমাদের কিসান-সভাকেই কৃষকদের রাজনৈতিক সংস্থা হিসেবে সংগঠিত করতে হবে। এই কাজেই আমাদের পুরো জোর লাগানো উচিৎ। তারই সাথে শ্রমিকদের সংগঠনেও পুরো জোর লাগাবো এবং সময় এলে এই দুটো প্রতিষ্ঠানকে এক সুত্রে বাঁধব। এভাবে যে সম্মিলিত সংস্থা তৈরি হবে সেটাই ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য লড়বে এবং স্বাধীনতা আনবেও। তাই এবার আমাদের সমস্ত শক্তি সেই উদ্দেশ্যেই নিয়োজিত করা উচিৎ। সে কারণে ওরা এ সিদ্ধান্তও নিল যে দু’একটিকে ছেড়ে বাকি বামপন্থী দলগুলোকে নিয়েও একটি সম্মিলিত দল তৈরি হওয়া উচিৎ। সেই দলই তাদের এই নতুন কর্মসূচিকে ভালোভাবে বাস্তবায়িত করতে সফল হবে। সব দল মিলে গেলে আমাদের শক্তি বৃদ্ধি হবে। ওদের ভরসাও ছিল যে একটিকে ছেড়ে বাকি সব দল মিলে যাবে।

ওদের এই ভাবনা ওরা আমার সামনেও রাখল। আমিও মন দিয়ে শুনলাম। কিন্তু বামপন্থী কমিটির (Left consolidation Committee) ইতিহাস দেখার পর আমার ভরসা ছিল না যে সবাইকে মিলিয়ে একটা দল, যেমন ওরা ভাবছে, গঠন করা যাবে। বামপন্থী কমিটি নিয়ে যত কষ্টদায়ক এবং তিক্ত অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে তত বোধহয় আর কারোর নেই। সেই সব অভিজ্ঞতা এমন যে বামপন্থীদের কান্ডকারখানায় বিরক্ত হয়ে আমি কখনো কখনো কেঁদেও ফেলেছি। কারোর মন বসত না সেই কমিটিতে। মনে হত জবর্দস্তি ফাঁসানো হয়েছে। সবাই পালাতে চাইত। এক দল কাজে আগ্রহ দেখাত তো অন্য দল দূরে পালাত। অদ্ভুত অবস্থা ছিল। প্রথমে তো লোকে আমায় ফাঁসিয়ে দিল ওই কমিটিতে। কিন্তু পরে পার্টির নেতারা এদিক ওদিক করা শুরু করল। সবাই পালাবার সুযোগ খুঁজত। ফাঁসিয়ে টাসিয়ে কি কোনো সংযুক্ত দল গঠন হতে পারে?

যখন আমার অভিমত ওরা জানতে চাইল, আমি আমার পরিষ্কার ভাবনা ওদের বললাম। বললাম যে বামপন্থী দলগুলোর একে অন্যের প্রতি একটুও বিশ্বাস নেই। আর যতক্ষণ সেটা না হয়, মিলনের দিকে এগোবে কি করে? মিলন তো পরস্পর বিশ্বাসের ভিত্তিতেই হতে পারে এবং টিঁকতে পারে। লেফটকন্সলিডেশনের কথা আমি ওদের মনে করালাম আর বললাম যে আমার জ্ঞাতানুসারে সেটা অসফল হওয়ার একটাই কারণ ছিল, একটা দল তার প্রয়োজন স্বীকার করলে অন্যজন করত না। যদি সেই দুটো দলই প্রয়োজন স্বীকার করত, তাহলে বাকি দলগুলো করত না। সেই অবস্থা আজও। আজ আপনারা তার প্রয়োজন মনে করছেন নিশ্চয়ই। কিন্তু অন্যেরা করছে না। আর যতক্ষণ সব দল এই কথাটা অনুভব করবে না যে সবাইকে মিলিয়ে এক পার্টি না বানালে চলবে না, ততক্ষণ কিচ্ছু হবে না। ততক্ষণ আপনাদের এই নতুন পার্টি তৈরি হতেই পারবে না। ওদের এও বলে দিলাম যে আমি নিজে আর কোনো পার্টিতে শামিল হতে পারব না। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে কিসান-সভা ছাড়া অন্য কোনো পার্টি-টার্টির সাথে আমি সম্পর্ক রাখব না। আমি পার্টিগুলোর কান্ডকারখানা দেহতে দেখতে বিরক্ত হয়ে গেছি। তাই আমার পক্ষে পার্টি থেকে আলাদা থাকাই ভালো। মেহেরবানি করে আমাকে ছেড়ে দিন। এরপর সে সময় তো এ ব্যাপারে আমার ওপর কোনো জোর খাটানো হল না আর অন্য সব কথা হতে থাকল। কিন্তু পরে যখন একবার অনেকে মিলে আবার চাপ দিল আমায়, আমি নরম ভাবে জবাব দিলাম – আগে অন্যান্য দলগুলো মিলুক তারপর দেখা যাবে। যদি আমি এখনই সেই নতুন পার্টিতে যোগদান করে নিই তাহলে কিসান-সভার শক্তিবৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হবে। কেননা আপনারা পার্টির তরফ থেকে চাপ দেবেনই যে দায়িত্বের পদগুলোয় অই পার্টিরই লোককে কিসান-সভায় রাখা হোক, আর আমি পার্টি-মেম্বার হলে সেকথা আমাকে মানতেও হবে। ফল হবে যে অন্য পার্টিগুলোর ভালো ভালো কর্মীদের প্রতি আমি ন্যায় করতে পারব না। তারা বিরক্ত হয়ে আমাদের সভা থেকে মিছিমিছি সরে যাবে। সভা তাহলে শক্তিশালি কী করে হবে? তাই এ ঝামেলায় আমি পড়ব না।

কিন্তু এই শেষ কথার আগেই আরো কিছু কথা হয়েছিল। নতুন পার্টি নিয়ে ওদের দুটো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল আর সেদুটো ছিলও এমন যে আমি চিন্তিত হলাম। জানতে পারলাম যে দুটো সিদ্ধান্তই অটল। তাই আরো চিন্তা হল। তবু ওদের কিছু বললাম না সে বিষয়ে। আমিও চাইছিলাম যে একটু ওদের মনটা নাড়িয়ে দেখি। দুই সিদ্ধান্তের একটা ছিল যে খুব ভরসার সাথে ওরা তিন মাসের ভিতর কমপক্ষে পঁচিশ হাজার একনিষ্ঠ বিপ্লবীর সুসংগঠিত দল তৈরি করার সংকল্প নিয়েছিল। ওদের কথায় স্পষ্ট ফুটে উঠত যে এটা করা কোনো বড় কাজ ছিল না। এ ব্যাপারে অন্যদের ওরা কতরকম যুক্তি দেখিয়েছিল। এত নিশ্চিন্ত এবং আশ্বস্ত দেখা যেত এ ব্যাপারে যে আমার আশ্চর্য লাগত।

তাই আমি ওদের সাথে তর্ক করা শুরু করলাম। বললাম, আমি তো জীবনে প্রথম শুনছি যে তিন মাসে শ্রেষ্ঠ মানের পঁচিশ হাজার বিপ্লবী এত সহজে তৈরি করা যেতে পারে! আপনারা ইতিহাসে একটাও উদাহরণ দেখাতে পারবেন? এমনকি যদি কংগ্রেসের চারআনি মেম্বার তৈরি করা শুরু করি কৃষক ও শ্রমিকদের ভিতর তার সংখ্যাও তিন মাসে পঁচিশ হাজার করা সহজ হবে না। আবার সেই সময়ের মধ্যেই ওদের এমনভাবে সংগঠিত করে নেওয়া যাতে দায়িত্বপূর্ণ কোনো কাজ তারা করতে পারে, সে তো অসম্ভব ব্যাপার! বিপ্লবীদের সংগঠন আর ছাগল-ভেড়ার পাল কি এক জিনিষ? আমার তো অবাক লাগছে। যে কোনো বিপ্লবী পার্টিতে আসার জন্য কয়েক বছর পরীক্ষা তো করাই উচিৎ। তাহলেই আমরা মেম্বারদের আসল স্বরূপ এবং তাদের দুর্বলতাগুলো বুঝতে পারব; আমাদের বছরের পর বছর ওদের কঠোর ভাবে পরখ করতে হবে। তবে গিয়ে কয়েকজন খাঁটি বেরোতে পারে। এ তো ঘোড়ায় জিন চড়াবার লোকের ভর্তি নয় যে যাকে পেলাম ভর্তি করে নিলাম।

ওদের সাথে তর্ক করতে করতেই আমার মনে একটা আশঙ্কা জন্মাল যে যদি এভাবেই মেম্বার তৈরি করা হয় তাহলে বিপ্লব আর রিভল্যুশনের নামে এটা একটা অত্যন্ত বিপজ্জনক পার্টি হবে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির এবং কর্মহীন লোকেদের মধ্যে যারা মনে বড় উচ্চাশা পোষণ করে, লিডারি করার নেশা রাখে, দেশ-সেবা এবং বিপ্লবের নামে শুধু নিজের পুজোই করাতে চায় না, বরং ফুর্তি করতে চায়, বড় বড় কথা বলে মানুষকে প্রতারিত করতে চায়, ভিতরে শক্তি রাখে না অথচ লোকদেখানি আর বাইরের বেশভূষাকেই সম্পদ করে বাঁচতে চায়, সেসব ভয়ঙ্কর এবং বিপজ্জনক লোকেরা খুব সহজে এসে পৌঁছোবে এই পার্টিতে, যদি তাদের বিলাসিতার জিনিষপত্র এখানে পেয়ে যায়। ভাবলাম যে কৃষক ও শ্রমিকের সেবার নামে এসে এরা ওদের জন্য প্লেগ হয়ে দাঁড়াবে। যারা অন্য কোথাও চুরি-ডাকাতি ইত্যাদির আশ্রয় নেয় তাদের জন্য এটা খুব সুন্দর পেশা হয়ে যাবে। হ্যাঁ, টাকাপয়সার জোগানটা সহজ হওয়া জরুরি।

আমার যুক্তিগুলোর খুব বেশি প্রভাব ওদের ওপর পড়ছে বলে মনে হল না। ওপর ওপর মাথা নাড়ালো বটে, এবং স্বীকার করল যে এসব বাধাবিপত্তি আছে। তারপর বলল, আচ্ছা, দেখা যাবে। অত না হলে কম মেম্বারই নাহয় হবে। পঁচিশ হাজারই যে হবে সেটা জরুরি নয়। দেখলাম যে আমার ভাবনার কোনো প্রভাব পড়ল না ওদের ওপর। ওরা কেবল সংখ্যাটা ধরে আছে। আমি এধরণের মেম্বারশিপের বনেদটাকেই খারাপ এবং বিপজ্জনক মেনে ওদের সাথে কথা বলছিলাম। কিন্তু ওরা শুধু এটুকুই স্বীকার করল যে এত বড় সংখ্যায় সদস্যতা বোধহয় সহজে হবে না। ওরা এই বিচ্যুতিটা অনুভবই করল না যে সদস্যতা নিয়ে ওদের সমস্ত ভাবনা এবং পথটাই ভুল, আত্মপ্রতারণার। আমরা দু’তরফ এই ব্যাপারে, এত কথার পরও দুই ধ্রুবতেই রইলাম। দু’তরফের নজর একে অন্যের বিরুদ্ধে ছিল। মিলের কোনো জায়গা ছিল না। তা সত্ত্বেও আমি ওদের মনে করালাম এরকম কাঁচা মেম্বারদের নিয়ে টানাটানি করে তো আপনারাই এতদিন লড়ে এসেছেন। এমন লোকেরা সব সময় ‘গোল-তলা ঘটি’র [হিন্দি বাগধারা] মত কখনো এদিক কখনো ওদিকে গড়াতে থাকে। কখনো এই পার্টি তো কখনো ওই পার্টিতে যেতে থাকে। এতেই ঝগড়া হয় যে অন্য দল আপনাদের মেম্বার ভাঙিয়ে নিচ্ছে। যদিও ভুল আপনাদেরই যে আপনারা কাঁচা লোকেদের সদস্য বানান। আপনারা নিজেরাই “বাঁশও থাকবে না বাঁশিও বাজবে না” কেন করেন না? ওরা বলল, “হ্যাঁ, এটা ঠিক।”

তারপর ওদের অন্য একটি ভাবনার কথা তুললাম। নতুন পার্টির জন্য পয়সার দরকার ছিল। অর্থের সঙ্কট পার না করে কোনো দল চলতেই পারে না। এ প্রসঙ্গে ওরা সমস্যার একটা সমাধান প্রস্তাব করেছিল। সে সমাধান শুনে আমি আরো চমকেছিলাম। স্পষ্ট বুঝলাম যে এমন হলে আলতু-ফালতু আমুদে স্বভাবের লোকেদের ভর্তি সহজ হবে। আর্থিক ঝঞ্ঝাটের যেই সমাধান হবে, পয়সার অসুবিধা যেই শেষ হবে, মেম্বার হওয়ার জন্য লাইন লেগে যাবে। ওরা তো এই মজাটাই চাইবে – “রুগির যা মনে ধরে, বদ্যি বিধান করে” কথাটা তখন ষোল আনা উতরে যাবে।

আসলে পয়সা জমা করার যে উপায় ওদের প্রস্তাবে ছিল সেটা এ ছিল না যে আমরা কৃষক শ্রমিক জনতার কাছ থেকে একটু একটু করে জমা করব। এ কথাটার তো উল্লেখই ছিল না। বিন্দু বিন্দু জলে পুকুর ভরার ভাবনা ওরা করেইনি। ওদের সামনে বড় বড় প্রোগ্রাম আর খরচের ফর্দ ছিল। পার্টির প্রেস, খবরের কাগজ, অফিস, সাহিত্য, সফর ইত্যাদি ব্যাপারগুলো ওদের মাথায় ঘুরছিল। তার জন্য তো অনেক পয়সা চাইই চাই। মেম্বারদেরও তো আরামে রাখতেই হবে। নইলে তারা নিজেদের কাজে মোতায়েন থাকবে কী করে? আর পঁচিশ হাজার সংখ্যাটা তো কম নয়। ইদানিংকার হিসেবে ওদের খরচ-টরচও কম হবে না। ছোলা আর ছাতু বা শুকনো রুটি খেয়ে তো আর বিপ্লব হবে না। বিপ্লবী লোকেরা ওভাবে দিনগুজরান করতে পারে না। তাই মাসে কয়েক লাখ টাকা ওদের খরচের জন্যই চাই।

এটা পরিষ্কার যে এত টাকা গরিবেরা দিতে পারবে না। এক এক পয়সা করে ওদের কাছ থেকে নিয়ে টাকার এত বড় অংক জমা করা অসম্ভবই। বিপ্লবী লোকেরা এসব মামুলি কাজের জন্য হয়ও না। ওদের কাজ অনেক বড়। এ তো ছোট মানুষদের – সাধারণ ওয়ার্কারদের কাজ। তাই পয়সা জমা করার অন্য কোনো পথ রাখতে হবে, ওরা ভাবল। বললও সেরকমই। মোটা টাকা হাতে আনার পথ ওরা খুঁজে বের করেছিল এবং আমাকে বলেওছিল। আমি শুনে যেমন হেসেছিলাম, চিন্তাও হয়েছিল। ওদের জন্য সেটা বিপ্লবের সবচেয়ে সুগম পথ হলেও আমার অত্যন্ত বিপজ্জনক মনে হয়েছিল। ওই ধরণের পয়সায় ওদের নতুন পার্টিটা মঠ হতে পারে যেখানে ফুর্তি করার লোকেরাই থাকে, কিন্তু আমি যদ্দুর জানি, সেটা কৃষক আর শ্রমিকদের পার্টি কিছুতেই হতে পারে না।

আমি ওদের সাথে কথা বলা শুরু করলাম। বললাম, এটা তো অদ্ভুত ব্যাপার যে আপনাদের পার্টির জন্য অর্থসংগ্রহের প্রধান মাধ্যম কৃষক, শ্রমিক বা শোষিত জনগণ হবে না, অন্য কিছু হবে। আপনারা মেম্বার ভর্তি করার যে পথ বলেছেন তাতে তো স্পষ্ট যে শুধু মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকেরাই ও পথে আসবে। কৃষক শ্রমিক আসবেই না, বা বোধহয় দু’একজন আসবে। তাই, যত নেতা হবে তারাও তো কেউ কৃষক বা শ্রমিক শ্রেণি থেকে আসবে না। তারা ওই শ্রেণির জন্য বহিরাগত হবে। আর পয়সার অসুবিধা যদি দূর হয়ে যায় তাহলে তো এমনিতেও বাইরের লোকেরাই থাকবে। কেউ এটা আটকাতে পারবে না।

এবার রইল পয়সার কথা। সে পয়সাও গরিবদুখি জনতার কাছ থেকে আসবে না, আপনারাই বলছেন। তাও বাইরের থেকেই আসবে – অর্থাৎ বহিরাগতই হবে। সে পয়সা দিয়েই কাজের সব সরঞ্জাম জোগাড় করা হবে – পেপার, লিটারেচার, অফিস ইত্যাদি। এভাবে, মানুষ, পয়সা আর রসদ ও সরঞ্জাম, তিনটেই বাইরের হবে। প্রত্যেক লড়াইয়ে জরুরিও এই তিনটে – মানুষ, পয়সা আর রসদ ও সরঞ্জাম। আর এই তিনটেই বাইরে থেকে পাওয়াও হয়ে গেল। আর আপনারা বলছেন যে এসব দিয়েই বিপ্লবী সংগ্রাম চালানো হবে। চালানো যেতে পারে, আর সম্ভব যে সফল হবে সে সংগ্রাম – বিপ্লবও এসে যাবে। কিন্তু সে বিপ্লব কৃষক আর শ্রমিকদের হবে, এটা বোঝা আমার পক্ষে অসম্ভব। এ বিপ্লব তো তারই হবে যার লোকবল, পয়সা আর জিনিষে বিপ্লবটা আসবে। এমন তো দেখা যায়নি যে একজনের যোগাড়যন্ত্রে আরেকজনের জন্য কোনো বস্তু এসেছে। তাহলে বিপ্লবের মত বস্তুর বিষয়ে এমন ভাবা তো নিছক বোকামি।

আমি তো এই জানি আর পড়েওছি যে যদি কৃষক এবং শ্রমিকদের হাতে শাসনের রাশ আনতে হয় – তাকে বিপ্লব বলুন বা অন্য কিছু – তাহলে ওদেরই তার জন্য লড়তে এবং আত্মত্যাগ করতে হবে। যতক্ষণ না ওদেরই মধ্যে থেকে নেতা এবং যোদ্ধা জন্ম নেয়, জন্ম দেয় ওরা, ততক্ষণ ওদের নিস্তার নেই। লড়াই তো ওরা করেই। জেলে যায়, লাঠি খায়, গুলির শিকার হয়। কিন্তু ওদের নেতারা বাইরের লোক হয় – ওদের ভিতর থেকে আসে না। এক আধ জায়গা ছেড়ে দিলে সর্বত্র এমনই হয়েছে। ফল হয়েছে যে বিপ্লব হওয়া সত্ত্বেও ওরা কিছু পায়নি। ওদের দারিদ্র্য, লুন্ঠন, দুশ্চিন্তা, খিদে, অসুখ, নিরক্ষরতা যেমন ছিল তেমনই রয়েছে। দুনিয়ার বিপ্লবগুলো এর প্রমাণ। ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মানি, এমেরিকা, ইটালি ইত্যাদি দেশে বিপ্লব তো হয়েছে। কিন্তু শ্রমজীবীরা সুখী হওয়ার জায়গায় আরো কষ্টে আছে। যদিও লড়তে এবং মরতে তারাই এগিয়েছিল। কেন হল এমন? এইজন্যেই না, যে ওই লড়াই এবং বিপ্লবের নেতৃত্ব, রাশ অন্যের হাতে ছিল? তাই আমি এটাই মানি যে যারা বাইরের নেতা, তাদের কাজ কৃষক ও শ্রমিকদের ভিতর থেকেই নেতার জন্ম দিয়ে দেওয়া। তারপর বিপ্লব ওরা নিজেরাই আনবে। আমাদের প্রধান কাজ, বিপ্লব আনা নয়, কৃষক ও শ্রমিকদের ভিতর থেকে শুধু নেতার জন্ম দেওয়া। এটুকু করার পর ওদের নেতৃত্বে যে বিপ্লব হবে তাতে আমরা যা কিছু সাহায্য করব সেটা ন্যায্য হবে। কিন্তু সবচেয়ে আগে আমাদের নিজেদের নেতৃত্বে বিপ্লব আনার অসুখ থেকে মুক্তি পেতে হবে। যদি কৃষক ও শ্রমিকের ভিতর থেকে জন্ম নেওয়া নেতৃত্ব এবং আমাদের নেতৃত্বে কোনো ভেদ না থাকে, তারা এক হয়ে যায় সেটা আনন্দের কথা হবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে নেতৃত্ব যাচাই করার কষ্টিপাথর আমাদের নেতৃত্ব নয়, ওদের নেতৃত্ব হবে। আমাদের নেতৃত্বের সাথে ওদের নেতৃত্ব মিলছে কিনা দেখার বদলে ওদের নেতৃত্বের সাথে আমাদের নেতৃত্ব মিলছে কিনা দেখতে হবে।

একই কথা টাকাপয়সার বিষয়েও। যে বিজয়ী হতে চায় তাকে নিজেরই পয়সায় – সেই পয়সারই জোরে – লড়তে হবে। তাহলেই সাফল্য আসবে। ধার করে বা চেয়ে নেওয়া পয়সায় লড়লে ধোঁকা হবে – যদি মাঝ-লড়াইয়ে না হয় তো জয়ের পর হবে। বলার জন্য সে জয় কৃষক শ্রমিকের হবে। কিন্তু আসলে হবে তাদের যাদের পয়সা ওই লড়াইয়ে খরচ হয়েছে। মানুষ, তার ঈমান, তার আত্মাকেই কেনার চেষ্টা করে টাকাপয়সাওয়ালারা এবং সাধারণতঃ কিনেও নেয়। ওপর থেকে যতই ভালো মনে হোক তারা, ভিতর থেকে আমাদের আত্মা তো বিকিয়ে যায় যদি আমরা অন্যদের পয়সার ওপর ভরসা করি। মুখে আমরা হাজারবার ইনকিলাব আর কৃষক-শ্রমিক রাষ্ট্রের কথা বললেও তাতে প্রাণ থাকে না। কথাগুলো কিছু কিছু করে উঠতে পারে না। অন্তর থেকে আমরা পয়সাওয়ালাদেরই জয় বলি, তাদেরই মতে, তাদেরই ইশারায় চলি। যেমন মোটর যে চালায়, সে মোটরটাকে নিজের কব্জায় রাখে। নইলে সে মোটর কোথাও না কোথাও গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়বে, ধাক্কা খেয়ে যাবে কিছুর সাথে। ঠিক তেমনই পয়সাওয়ালারা আমাদের এবং আমাদের লড়াইটাকে পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখে। এই কারণেই আমার অভিমত যে কৃষক ও শ্রমিকদের লড়াই তাদের নিজেদের পয়সায় চালিত হওয়া উচিৎ। সেই লড়াইয়ের জন্য আসল এবং বিশেষ ভরসা থাকা উচিৎ কৃষক-শ্রমিকের পয়সার ওপর। অন্যদের সাহায্যের পরোয়া করা উচিৎ নয়। তার মানে এই নয় যে এরপরেও যদি কোথাও থেকে কিছু সাহায্য আসে তাহলে মিছিমিছি তাকে ফেলে দাও। কিন্তু সেই সাহায্যের ওপর ভরসা করাতেই বিপদ। তাই সেটার পরোয়া না করার কথা বলছি।

রদদ ও সরঞ্জাম নিয়েও সেই একই কথা। খাবার, জামাকাপড়, খবরের কাগজ, সাহিত্য, অফিস ইত্যাদি যার হাতে থাকবে সেই লড়াইটা চালাবে ইচ্ছেমত। এই জিনিষগুলো লড়াইয়ের মূলাধার, বনিয়াদ, প্রাণ। তাই এসবের জন্য আমরা পরের ওপর নির্ভর করতে পারি না। নইলে ঠিক যখন সময় তখনি বিপদ আসবে, বিপদ আসতে থাকবে বার বার। যখন তখন এই সব জিনিষ যোগাড় করনেওয়ালারা ভুরু কুঁচকোতে থাকবে আর মিছিমিছি নিজের মনের মত শর্ত রাখতে চাইবে – এটাই মানুষের স্বভাব। অন্য কেউ আপনাদেরকে পয়সা দেবে কেন? অথবা অন্য কোথাও থেকে পয়সা আনতে গিয়ে হাজারটা বিপদের সামনে পড়ার পর সে পয়সা আমাদের কেন দেবে? নিজের জন্য, নিজের সন্তানাদির জন্য সে পয়সায় জমি-জায়গা কেন কিনবে না? কোনো রোজগার, কোনো ব্যবসা কেন চালাবে না? এ ব্যাপারে ধর্ম আর পরোপকারের নাম নেওয়া, এই স্বার্থপর এবং ব্যবহারিক বস্তুবাদী (materialist in practice) সংসারে, নিছক আত্মপ্রতারণা, ব্যবহারিকতা থেকে চোখ ঘুরিয়ে নেওয়া। মিথ্যে মিথ্যে যে কসম খাওয়া হয়, আর কাছারিতে গঙ্গা তুলসি, এমনকি কোরান, পুরাণেরও শপথ যে প্রতিদিন নেওয়া হয় সে কি ধর্ম আর পরোপকারের জন্য? কে না জানে এসব কাজ পার্থিব লাভ এবং জমি-জায়গার জন্যই করা হয়? সে প্রকারেই ধর্ম আর পরোপকারের নামে যে ধনী এবং চালাক লোকেরা দান দেয় তারা সাধারণতঃ হাজার গুণ লাভ ভেবেই দেয়। হয় কোথাও নির্বাচনে ভোট পাওয়া সহজ করার জন্য, ব্যবসাবাণিজ্য সহজে চালাবার জন্য অথবা সুযোগ এলে বড় অংকের জমা টাকা বা বড় অধিকার পেতে সাহায্যের জন্য। কিন্তু স্বার্থটা থাকে নিশ্চয়ই। আমাদের কখনো ভোলা উচিৎ নয় যে তারা আগে থেকেই হিসেব-টিসেব করে এবং দূর অব্দি ভেবে নিয়েই ধর্ম আর উপকারের কাজে হাত দেয়।

তাই আমাদের একমাত্র মন্ত্র হওয়া উচিৎ, নিজের অধিকার হাসিল করার জন্য যে লড়াই কৃষক শ্রমিক লড়তে চায় তার জন্য লোকবল, টাকা এবং রসদ ও সরঞ্জাম (Men, Money and Material) তারা নিজেরাই জোটাক, নিজেদের মধ্যে থেকেই ব্যবস্থা করুক। নিজেরা ক্ষুধার্ত্ত, উলঙ্গ থাকলেও এই কাজ ওদের করতেই হবে। অন্য কোনো রাস্তা নেই। ওদেরকে স্পষ্ট বলে দেওয়া উচিৎ আমাদের যে যদি ওরা এমনটা না করে, এর জন্য প্রস্তুত না হয় তাহলে শর্ত রেখে দাবি করছি – ওদের লড়াইয়ে আমরা কিছুতেই আর থাকছি না। আমরা ওদের পরিষ্কার ভাবে বলে দিই যে এভাবে ওদের লড়াইয়ে শামিল হলে তো আমরা ওদের মিছিমিছি ধোঁকা দেব, হ্যাঁ, সস্তার নেতাগিরি নিশ্চয়ই পেয়ে যাব। শুধু তাই নয়, কৃষকের ধন এবং লোকবল না নিয়ে অন্যের আশায় ওদের লড়াই শুরু করলে আমাদের পক্ষে জমিদার ও মালদারদের সঙ্গে সওদা করতেও সুবিধা হবে এবং আমাদের নিজেদের কাজ হাসিল হয়ে যাবে। কিন্তু এমন ঘোর পাপ এবং ধোঁকাবাজি করতে আমরা তৈরি নই।

কিন্তু আমার এত বড় বড় যুক্তি, তর্ক আর কথাবার্তার ওদের ওপর কতটা প্রভাব পড়ল বলা কঠিন। আমার তো মনে হল, এমন কিছু লক্ষণ টের পেলাম যে আমার কথাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হল না। আমায় খুশি করার জন্য কিছু মিষ্টি কথা নিশ্চয়ই বলে দেওয়া হল। কিন্তু ওদের হৃদয়ে যে আমার কথাগুলো ঢুকল না সেটা আমার স্থির ধারণা। এ ধারণা করার এবং বলার পক্ষে আমার কাছে প্রমাণও আছে। ওরা যা কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সেগুলো কারোর চাপেও নেয় নি আর কোনো ঝোঁকের বশেও নেয়নি। বছরের পর বছর ঠান্ডা মাথায় ভাবনাচিন্তা করে এবং কয়েক মাস বার বার নিজেদের হৃদয় এবং মস্তিষ্ক মন্থন করে ওরা এই সব সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল। এসব কোনো নতুন কথাও ছিল না। ওরা যথেষ্ট লেখাপড়া জানা লোক। তাই এসব কথা ওরা ভালো ভাবে জানে। সেই প্রেক্ষিতে ওদের কথাগুলো ওদের হৃদয়ের কন্ঠস্বর ছিল, হৃদয়ের প্রবাহ ছিল যা ওই রূপে প্রকাশ পেয়েছিল। ওদের ভাবনার যে সরস ধারা ছিল, চিন্তার যে প্রাকৃতিক স্রোত ছিল তাই ওভাবে জাহির হয়েছিল, ওই রূপে বেরিয়ে এসেছিল। মানুষের হৃদয় ও মস্তিষ্কের যেমন নির্মিতি এবং প্রস্তুতি হয়, মানুষ ঠিক তেমনই ভাবে। লোকেদের যে ভাবনা এবং চিন্তা তৈরি হতে হতে পাকা হয় এবং বাইরে আসে সেটা সহজে বদলানো যায় না। কাজেই আমার কথার প্রভাব আর কী করে পড়বে। শুধু এটুকুই নয়। তারপর যে কথাগুলো ওরা এদিকওদিক ছড়ালো তাতে এও বলে ফেলল যে স্বামীজি আমাদের সঙ্গে আছেন। সেটা শুনে আমি ওদের বকলামও। কিন্তু চুপ! সেই শেষ নয়। এক দিন পর ওরা আবার সেই একই কথা বলল।

২৯

উপসংহারে, এই স্মৃতিকথার বিষয়ে দু’একটা কথা বলে এই দীর্ঘ গাথাটি, যা শেষ করা সহজ নয়, শেষ করতে চাই। হতে পারে পরে সুযোগ এলে রয়ে যাওয়া আরো হাজারখানেক ঘটনাকে লিপিবদ্ধ করতে পারব। কেননা সেসব ঘটনাগুলোরও অনেক গুরুত্ব আছে। সব ঘটনারই কোনো না কোনো বিশেষত্ব আছে এবং কৃষক আন্দোলনের কোনো না কোনো দিকে আলোকপাত করে। এমনিতে তো কত হাজার মিটিং হয়ে গেছে যেগুলোর বিশেষ কোনো গুরুত্ব নেই। আসলে আমাদের দেশে কৃষকদের এই সংগঠিত আন্দোলন – কিসানসভার আন্দোলন – একদম নতুন। তাই এতে হাজার রকম বাধাবিপত্তি এসেছে। আমরা সবাই এই আন্দোলনে একেবারেই নতুন ছিলাম – আমরা কিছুই জানতাম না এর বিষয়ে। অভিজ্ঞতা থেকে শক্তি নিয়েই আমরা এগিয়েছি, তাই বিপত্তির মুখোমুখি হওয়া জরুরি ছিল। অন্যান্য দেশের আন্দোলনের বিষয়েও আমরা বিশেষ ভাবে কিছু জানতাম না। মোটামুটি কিছু কথা যেখানে সেখানে লেখা পাওয়া যেত। তাও আংশিক। আন্দোলনের প্রগতি কিভাবে হল তার বিষয়ে কিছুই জানতাম না। কবে, কোন বাধার মোকাবিলা, কী পরিস্থিতিতে ওখানকার মানুষেরা কিভাবে করল, সে বিষয়ে আমাদের মধ্যে কে জানত? আমি অনেক চেষ্টা করেছি জানার, এ সম্পর্কে সাহিত্য খুঁজে পেতে মাথা খুঁড়েছি। বিপ্লবী বলে কথিত কত জনকে এমন সব বইয়ের নাম বলতে বা দিতে বলেছি। কিন্তু কে শুনত? আসলে জানতই বা কে যে সেসব দেশে কবে কী হয়েছিল। তাই সবাই নিরুপায় ছিলাম। তাই খুব সাবধানে আমরা এগিয়েছিলাম।

যখন আজ চোদ্দ বছর পর পিছনে নজর ঘোরাই তখন দেখতে পাই আমরা কোথা থেকে কোথায় চলে গেলাম। এটা ভেবেও অবাক হই যে আমাদের কেন এত কম বাধা এবং বিপত্তির সাথে যুঝতে হল। আনজান মানুষ তো রাস্তায় পায়ে পায়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়। তাও আবার কৃষক আন্দোলনের মত বিরাট ব্যাপারের চেষ্টায়। আমাদের চার দিকে বিরোধীদের দল ছিল। সবাই কোমর বেঁধে দাঁড়িয়েছিল যে কখন সুযোগ পাবে আর সমস্ত কিছু ধ্বংস করে দেবে। আমি তো প্রথম প্রথম ১৯২০ সালে কংগ্রেসি রাজনীতিতেই এসেছিলাম। ওখান থেকেই ১৯২৭ সালে কিসানসভা তৈরি করার দিকে এগোলাম। কিন্তু আমাদের এই কাজে কংগ্রেসি সঙ্গীরা এবং নেতারাও বিরোধ করল, শুরুতে কম পরে বেশি। প্রথমে ওরা বুঝতেই পারে নি কী হচ্ছে। তাই কেউ বিরোধ করলেও সেটা চাপা ছিল। পরে যেমন যেমন কিসান-সভা মজবুত হতে শুরু করল তেমন তেমন বিরোধও প্রবল হতে শুরু করল। এমনকি এদিকে কিছু দিন ধরে কংগ্রেসের সমস্ত শক্তি কিসান-সভার বিরুদ্ধে হয়ে গেছে। আমাদের পুরোনো সাথিদের মধ্যেও অনেকে ডুবে ডুবে জল খাওয়া শুরু করল। ওরাও এই আন্দোলন দেখে ভয় পেয়ে গেল। কিন্তু আমরা বেড়েই চলেছি এবং বাড়তেই থাকব এটা আমার বিশ্বাস।

এখন অব্দি যা কিছু স্মৃতিচারণ লিখেছি তা মধুর তো বটেই। একই সাথে, যারা পড়বে তারা আন্দোলনের ভিতর দৃষ্টি ফেলতে পারবে। যাদের একটুও রুচি আছে কিসান-সভায় তাদের, কাজে এগোতে অনেক সাহস জোগাবে এবং সাহায্য করবে এই স্মৃতিচারণ। তারা দেখবে যে কিসান-সভা ফুলের মুকুট নয়। ফলে দুর্বল লোকেরা প্রথমেই দ্বিধাগ্রস্ত হবে। সেটা ভালোই হবে। এ কাজে যে কত ধোঁকা আছে তাও জানবে পাঠকেরা। এ স্মৃতিকথা পড়ে সাচ্চা কিসান-সেবকেরা আনন্দিত হবে এবং তারা বিপদের বিষয়েও জানবে। তবেই তো তারা সময় মত নিজেকে বাঁচাবে। এখন অব্দি তো কিসান-সভার শিকড় জমানোর পর্ব ছিল। কিন্তু এবার এগিয়ে আসল কাজ করতে হবে। তাই নানা রকমের বিপদে মিছিমিছি পড়া থেকে বাঁচতে হবে। এসব ব্যাপারে তারা স্মৃতিচারণ থেকে সাহায্য পাবে। গরম কথা আর নরম কাজের বিপদ এখন বেশি। তাই এখন থেকেই সজাগ হয়ে যেতে হবে। আমাদের মন ভোলানো কথা চাই না। যদি ওসব কথা বাদ দিয়ে শুধু কাজ হয় তাহলে একটুও ক্ষতি হবে না। এবং তাহলে ধোঁকা হবে না। কথা তো ধোঁকা দেয়। কিসানসভার পুরো ইতিহাস এবং সে প্রসঙ্গে সমস্ত রকম বাধাবিপত্তির কথা আমি আমার জীবনীতে লিখেছি।

শেষে একটা কথা বলে দিতে চাই। তারিখ ভুলে যাওয়ার অভ্যাস আছে আমার। সঠিক বছর এবং তারিখ মনে রাখতে পারি না। একই ভাবে জায়গার নামও ভুলে যাই। এই স্মৃতিচারণ সেসব ভুল থেকে মুক্ত হতে পারে না। তার জন্য ক্ষমা চাইছি। আমি চিনের মহান কম্যুনিস্ট নেতার বিষয়ে পড়ে সাহস পেলাম যে উনিও তারিখ মনে রাখতে পারেন না। তবুও ক্ষমা তো চাইছিই আমি।                                                                                                                                          [শেষ]


To get the book in PDF copy the link below: 
https://drive.google.com/file/d/1bR6xLDVUjoGSCHGI3lTQFpl4jTBOkvsX/view?usp=sharing

                                

2 comments:

  1. খুব ভালো লাগছে পড়তে। অনেক কিছুই জানার থেকেও দেখতে পাচ্ছি।

    ReplyDelete