Saturday, October 24, 2020

চা দোকানের বিস্কুট

চা দোকানের বিস্কুট বেশ বড়ই হয়,
চা না খেলেও খিদের মুখে লাগে।
সরু গেলাস, মাটির ভাঁড়ে ডোবেও না,
ভাঙতে হয় পাঁচ আঙুলের মাঝে।
রঙমিস্ত্রি এসে বসে দুপুরবেলায়,
গালের পেশীই বলে পেটের খিদে।
রঙমিস্ত্রির কাজ চলছে দু’হাত দূরে –
তারিয়ে খায় হাতের গুঁড়োটুকু।

ওই দোকানেই অনেক আগে এসেছিল
রঙে ছিল পুরো কাজের ঠিকে।
এবার সে এক বড় ঠিকেদারের লোক,
উর্দি, মান আছে,পয়সা কম।
জমানা বদলাচ্ছে, আসছে নতুন মাল
মালিকেরও পাল্টে যাচ্ছে গতিক।

শরতও কি আগের মত আলোয় আসে?
ঋতুর ঘরেও ব্যায়ের সংক্ষেপ।
রাজপথের আকাশে পাই মনের ডানা,
থেকেই যায় গলির কালসিটে।
দূরত্বের বাড় শুধু তারায় নয়
দেখতে পারো শহরে, সম্বিতে।

এসো বরং বিস্কুটটাই ভেজাই চায়ে,
আধ-বিস্কুট ভেজা রোদ্দুর খাই।           

ব্যাঙালোর
১৬.১০.২০



এত ভাষা

এত ভাষা তবু কোলাহল হয়না কখনো।
প্রত্যেকের শ্রোতা আছে যারা আর কারো নয়।
একটাই আমি, দেখ কানে শুনছি তোমাকে
দু’চোখ ভরে শুনছি ছাতের পায়রাদের,
মাথার কন্দরে এক ঘড়ির শব্দ শুনছিঃ
যেতে হবে! আগে প্রাণে ভরে নিই বেলা।

এত ভাষা তবু কোলাহল হয়না কখনো।
একটি ঝিলে দুপুরে, একটি গাছে সন্ধ্যায়
শীতের খবর দেয় পরিযায়ী পাখিকূল
পৃথিবীর কত হ্রদ ছেড়ে এভূঁয়ে, রোদ্দুরে!
পাহারার মানুষটিও তাদের কথা শোনে,
বলে, বকুনিও দেয় মাঝে মাঝে – তারা বোঝে!
 
এত ভাষা তবু কোলাহল হয়না কখনো।
ওদিকে সমুদ্র ডাকে, এদিকে জনসমুদ্র!
সমুদ্রের ঢেউ বেয়ে জনসমুদ্রে পৌঁছোয়
তীরবর্তী গ্রাম থেকে শ্রমিককৃষক, হাতে
লালঝান্ডা; সারা দেশ থেকে আগত মানুষ
স্লোগান তোলে বহুভাষ – কোলাহল তো নয়!    

এত নীরবতা শুধু কোলাহল উদ্ভ্রান্ত।
সমুদ্র বলছে কিছু? শুনতে পাচ্ছিনা কেন?
সমুদ্র দুভাবে ডাকে বলেছিলাম সেদিন
সাধতে চেয়ে মিলন; সে যে চাইলে হয় না।
কখনো শুনতে চেয়ে ডাক যেকোনো সমুদ্রের
পাই শুধু আশরীরচিত্ত অশ্রাব্য শূণ্যতা। 

এত নীরবতা শুধু কোলাহল উদ্ভ্রান্ত।
যেন কাঁচের ওপারে ঘষে নামে রক্তমাখা
হাত, আর্তি অবিরাম। আমিও আছি এদিকে
লাইনে, তলিয়ে যাবো ওভাবেই একদিন।
কোনো দৈত্য নয়, আমাদেরি আত্মসুখগুলো
ধর্ষক রাষ্ট্রযন্ত্রের উল্লসিত শীৎকার।

এত নীরবতা শুধু কোলাহল উদ্ভ্রান্ত।
অমৃতভান্ড পদাবলীর রসে সিক্ত এক
চাঁদ ওঠে দু’দিগন্তে, গগনে এবং মননে।
আমরা কি দু’ভাবে পোহাবো? নশ্বরতার
একই নির্ঘুম? স্বপ্নাভাসে, নাকি কশাঘাতে?
পাশা নাচাবার শব্দ হয় তন্ত্রের মুঠোয়।  

ব্যাঙ্গালোর
১.৯,২০   



আমার লেনিন - ১

আমার লেনিন শ্বেতবসনা একটি মেয়ে।

শামলা মুখে সেদিন তিনি প্রভাবতী;
তখনো ঘুমচোখে, দেখি হঠাৎ ঢুকে
‘বিদ্যুৎ! ওই বইটা আছে?’ বলে নিজেই
হাত ডোবালো র‍্যাকে আমার বইয়ের গাদায়।
 
আমি, বলতে ভ্যাবাচ্যাকা। চাদর ঠেলে
একা থাকার রাত-পোড়ানো কালি নিয়ে
বেরুব কি, খালি গায়ে, জাঙ্গিয়াতে ...
‘ধ্যাত্‌তেরি, এই এক্ষুনি এর আসার ছিল?’
 
সেদিন নাকি কোন্‌ এক দিন, ইতিহাসের!
ছাত্রসঙ্ঘে সভা, ওকে বলতে হবে।
আমি শালা জানিওনা, ‘দাঁড়াও দেখি!’...
বলতে বলতে আলোর রেশে বেরিয়ে গেল।
 
কি তেজি মেয়েরে বাপ, রুখবে টা কে!
যেন ভালোবাসার চ্যালেঞ্জ, আগে লেনিন!
দূরেই রয়ে গেলাম নিজের নিজের মতন।
কিন্তু একটা ধাক্কা যে ও সেই সকালে

দিলো, সেটা চিনচিন করে ভাবতে গেলে।
--------------
এ্যাদ্দিন পর। আছো কোথায়? কাঁটাটোলির
মানে রাঁচির বাসস্ট্যান্ডে, মনে আছে,
একমিনিটের হঠাৎ দেখা? সেরাত্তিরেও
মনে হয়নি ভাবতে হবে কোনো কালে

লেনিনকে খুব জানার খিদে কে জাগালো।
সেই সকালে হাসছিলে কি ফেরার পথে?
হেসো না, এমনও নও মায়াবিনী।
কী হত, আবার এলে? জাগলাম তো!

ব্যাঙ্গালোর
৩০.৮.২০



Thursday, October 22, 2020

জুন-দুপুরের ম্যান্ডোলিন

                                    মা বলেছিলেন
‘তোরা আরেকটাকে কবে আনবি পৃথিবীতে?
আন!
দিয়ে যাস! ওটাকেও মানুষ করে তবে
যাব, যেখানে যাওয়ার।’
 
মায়ের কোল থেকে মায়েরা
জন্ম নেয়। শহরের এই নোংরা কাদাগলি
শক্তির উপত্যকা হয় কবির –
                             চাকা, তরোয়াল ও শোক –
আঙুর গাঢ় হয়
                             প্রবল মাতৃত্বে বসুন্ধরার,
প্রবাদে বাঁধা পড়ে ঋতু,
জানালায় মাটির কলসে
                   থাকে জুন-দুপুরের ম্যান্ডোলিন।

বাইরে ঘাম,
                             কার্বন ঝরায়
অনেক গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে কাজে লাগা
লিথোর বলগুলো,
রাতের গুমোটে
আমাদের ভাষার পতন, গানের অর্থ চুরি যাওয়া ...

একটি দুধের চারা
নীরবে শিকড় ডোবায় অরাজক
                             দুরূহ প্রত্যুষে।
অতসী বড় হবে।
........................
কত বড় ছিলাম আমি, কত ছোট ছিল
বছর পনের ষোল আগে পৃথিবী।
সুদূর গ্রহের মত ছিল;
                             তার মাধ্যাকর্ষণ
পায়ে বোঝার মত ছিল।

মাধ্যাকর্ষণ আমার ডানা আজ।
                   আজ থেকে বছর পনের ষোল পরে
আরো অনেক ছোট হব আমি
পৃথিবী আরো অনেক বড় হবে।
তবু সে অনেক দিন!
শহর মূর্খতর হবে রোজ,
গ্রামের নেড়া ঘাড় হিংস্রতর হবে,
গঞ্জে বেরোবে স্থানীয় সাপ্তাহিক
                   গণধর্ষণের ক্ষতগুলো সারিয়ে উঠে বারবার।
মানচিত্রে বিদীর্ণ হবে হাত,
পতাকায় ছায়া ফেলবে শাসকের জ্বালানো আগুন।
অতসী আঁকবে মুখ ‘রাতের প্রহরায়’
বার্ণ্ট আম্বারে, হলুদে, ক্রিমসনে
দাঙ্গার রাতে দেয়ালের মত দাঁড়ানো
                             গলির মোড়ে তার সাথীদের।
.................................
পুরোনো ট্রেডল মেশিনের সাথে
রাত জেগে ফিরি –
                   এনিবেসেন্ট রোডের মোড়ে অন্ধকার,
মাঝপথে মন্দিরের মাথায় আকাশ মেলে থাকা
                    অশত্থের পাতায় কান পেতে শুনি,
নীলচে হাওয়ার জোয়ার
                             উঠবার সময় হল কিনা।

আমি কি ক্ষয় করছি নিজেকে?
নাকি জয়?
প্রতিদিন?
বারবার প্রুফ পড়েও থেকে যাওয়া ভূলগুলো
শোধরাচ্ছি, বৃষ্টি ভেজা প্রেসের উঠোনের দিকে তাকিয়ে? 

[১৯৯২-৯৩]




Wednesday, October 21, 2020

জলাধার

জলাধার!
ভিতরে স্বচ্ছ টঙ্কার, তরল পৃথিবীর।
নিচে মেশিনের গুঞ্জরণে
লুপ্ত টেথিসের নিয়ন্ত্রিত আলোড়ন।
 
ওই স্তম্ভ আমার হাত ছিল।
সিমেন্টের ওই পাত্র – করতল, অসহায়
ঊষর মরুর ঝলসান আকাশের দিকে উঠেছিল।
অনেক নদীতীরে,
অনেক চাঁদের বছরের
একই শক্তি ও শৃঙ্খলে
আঁকা হয়েছিল প্রথম
                             অভিনিষ্ক্রমণ।

জলাধার!
পাখি ও হাওয়ার পথে জলের শহুরে ঘর।
ঘরে জলের পদশব্দ – প্রাচীন, উচ্ছল!

জল!
একদিন তোমারই সন্ধ্যায় জনপদ গড়তে ডেকে তারপর
বজ্রদীর্ণ রাতে
কুল ছাপিয়ে গর্জন করে এসে
ভেঙেছিলে উনুন,
মাটির পাত্রে আঁকা আমাদের পাতার গুচ্ছ আর তারা। ...
আমরা ভয় পেয়েছিলাম।
মা তো প্রেয়সীও!
তবু নবজাত আমরা সেই রাতে
নগ্ন, বন্য অভিসারে দেখে তোমায়
                                      ভয় পেয়েছিলাম –
বাঁধ দিতে শিখিনি তখনো
দিতে পারিনি ব্যারাজ, টার্বাইন।
ভাঙা বসত আর মৃত হাড়ে কিছুটা পলিস্তরে ডুবে তাই আবার

ছড়িয়ে পড়েছিলাম ... ।
কতবার রঙ আর গঠন বদলাল মাটির;
নতুন ফল, নতুন ধাতু আর নতুন যুগের দিকে তবু
তোমারই নাম ধরে এগিয়েছি –
ইউফ্রেটিস, সিন্ধু, নীল, দানিয়ুব, ইয়াংসি, আমাজন ...
আর আজ গঙ্গার পাড়ে এক মেঘলা সকালে
এই জলাধারের সামনে আমি দাঁড়িয়ে –
জল!
তারল্য, প্রণয়িনী বসুন্ধরার!
আমাদের কংক্রীটের হৃৎপিন্ডে তুমি বাজছ।

তুমি প্রাথমিক আয়না।
মুখচ্ছবি দিয়েছিলে।
মৃত্যু স্পর্শনীয় হল
(হয়ত অরণ্য হেসেছিল আমাদের মূর্খতায় –
কোথায় গেল চতুর খরগোশ?) –

আজ
সহজভাবে বলতে পারি, ‘জল!
তুমি আমারই শঙ্খনাদে, কালবোধের
                   আঁধার জট থেকে এক শুক্লা তৃতীয়ায়
উজ্জীবনে ফিরেছিলে ...’
ভাষার জলপাত্রে, নিজেরই তান্ডবের
                   মরমে রুপোলী মাছ হয়ে থাকার
কবেকার প্রসঙ্গ এসব –
জেলেবস্তীর বারোমাস,
তোমার সাথে আমাদের ভালোবাসা ও কলহের মাঙ্গলিক।

জলাধার!
পাখি ও হাওয়ার পথে জলের শহুরে ঘর।
ঘরে জলের পদশব্দ – প্রাচীন, উচ্ছল!

মানুষের নিজস্ব আছে একটি মাধ্যাকর্ষণ।
জল!
তোমাকে সে নিজের কাঁধের আকাশে ওঠাল।
ভিস্তিওয়ালা! ভিস্তিওয়ালা!
                             পিঠে টইটুম্বুর মশক!
বাঁশিগুলো ছড়িয়ে দিল সে শহরের মাটির নিচে নিচে।
.................................
সকাল হয়।
রন্ধ্রে রন্ধ্রে উপচে পড়ে নদীদের আহ্লাদী দুপুর –
ঘরে আনতে মাথা ফাটে মায়ের। ছোটো বোনের ...। ভিস্তিওয়ালার
ফুসফুসে কেন বালি, মরুভূমির?

জলাধার!
পাখি ও হাওয়ার পথে জলের শহুরে ঘর।
ঘরে বেদনার ডানার শব্দ – প্রাচীন, ভারী!

জল!
কবে প্রথম চেতনায় ভাসল মরামাছ?
কবে চড়া হলাম?
কবে তুমি হলে হিংসা?
কবে ইশতাহার?
...............
...............
নীল আকাশের বুকে জলাধার –
রাস্তা থেকে একটু দূরে, কলোনীতে
          কারো ভেজা কাঠের গেটের ঠিকানা!
হেলিকপ্টার থেকে নিচে, ক্যামেরায়
শহরের ভাঁজে জলাধার, গায়ে শ্যাওলা এবারের বৃষ্টির;
গোলাপি নারকোলকুচি ফুল
                             সিঁড়িটাকে জড়িয়ে ধরেছে;
খুব কাছের ছবিতে আমার শতাব্দীর
                                      করুণার মত এক ষোড়শীর
                                                          চঞ্চল দুটো চোখ ...
  

[৮০র দশকে কখনো]