[লেখাটা ১৭ই মার্চ ইংরেজিতে দিয়েছিলাম ফেসবুকে। তখনই মনে হয়েছিল বাংলায়ও দেওয়া উচিৎ। আজ একটু খালি ছিলাম, গুগল ট্রান্সলেটে ফেলে একটু এডিট করে নিলাম। মনে তো হলো যান্ত্রিক অনুবাদ বিশেষ কিছু গোলযোগ সৃষ্টি করে নি। আপনারাও পড়ে দেখুন।]
গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবারই পাটনায় এসেছিলেন। সেটা ছিল ১৯৩৬
সালের ১৬ই মার্চ। তখন তাঁর ৭৬ বছর বয়স। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছেন। মহাত্মা গান্ধী তাঁকে
তাঁর ভঙ্গুর স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে সফর না করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সে পরামর্শ উপেক্ষা করে তিনি এই সফর করছিলেন বিশ্বভারতীর
জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। বলাবাহুল্য, বহুদিন ধরে লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়নে
বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল।
পাটনা অবশ্য তাঁর এই সফরের একমাত্র গন্তব্য ছিল না। ১৯৩৬ সালের
(মার্চ-এপ্রিল) বিশ্বভারতীর বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে যে, গুরুদেব ১৬ই মার্চ পাটনায়, ১৮ই মার্চ এলাহাবাদে, ২১শে মার্চ লাহোরে এবং ২৫শে মার্চ
দিল্লিতে পৌঁছোন। (প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
তাঁর ‘রবীন্দ্রজীবনী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, দিল্লি থেকে গুরুদেব ২৯শে মার্চ মীরাটও সফর করেন এবং সেখান থেকে পুনরায় দিল্লিতে ফিরে আসেন)। ১লা এপ্রিল দিল্লি
ত্যাগ করে তিনি শান্তিনিকেতনে (বোলপুর) ফিরে আসেন।
অবশ্যই, তিনি এই সফরে একা যাননি। তাঁর
সঙ্গে ছিল একটি নাট্যদল, যারা তাঁর রচিত নৃত্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’ মঞ্চস্থ করার দায়িত্বে ছিল।
যেমনটি ‘রবীন্দ্রজীবনী’ (উপরে উল্লিখিত) গ্রন্থে বলা
হয়েছে—কলকাতায় অভিনব
আঙ্গিকে পুনর্সৃষ্ট নৃত্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’র বিপুল সাফল্যের পর—"বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ
করেন যে, উত্তর ভারতের গুরুত্বপূর্ণ
শহরগুলোতে এই নৃত্যনাট্যটি মঞ্চস্থ করা হবে; এই সফরের উদ্দেশ্য
হবে শান্তিনিকেতনের শিল্প-শিক্ষার আদর্শের প্রচার এবং আংশিকভাবে বিশ্বভারতীর শূন্য
ভাণ্ডার পূর্ণ করা।"
১৬ই মার্চ রবীন্দ্রনাথ তাঁর দলবলসহ বাঁকিপুর জংশনে (তৎকালে পাটনা
জংশনের এটাই নাম ছিল) এসে পৌঁছান। তখন সকাল আনুমানিক সাড়ে সাতটা। ট্রেনটি সম্ভবত ‘দানাপুর ফাস্ট প্যাসেঞ্জার’ ছিল, যা বোলপুর হয়ে, অর্থাৎ হাওড়া-পাটনা লুপ লাইনে আসত। গুরুদেবকে অভ্যর্থনা করার উদ্দেশ্যে চার দিন আগেই
এখানে একটি অভ্যর্থনা কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
১২ই মার্চ তারিখের 'বিহার
হেরাল্ড' পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, অভ্যর্থনা কমিটির সদস্য হিসেবে ছিলেন জনাব মো. আব্দুল আজিজ (শিক্ষামন্ত্রী),
জনাব সুলতান আহমেদ (পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য), শ্রী সচ্চিদানন্দ সিনহা (প্রখ্যাত ব্যারিস্টার), শ্রী
পি. কে. সেন (বরিষ্ঠ ব্যারিস্টার), রায়বাহাদুর এম. এন. রায়,
শ্রী বৈকুণ্ঠ নাথ মিত্র, শ্রী মুরলি মনোহর প্রসাদ
(সম্পাদক, 'সার্চলাইট'), শ্রী রাজেন্দ্র
প্রসাদ (তিনি তখন পাটনার মেয়র ছিলেন; তবে শহরের বাইরে থাকায়,
শুধুমাত্র এই উদ্দেশ্যেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাটনায় ফিরে এসেছিলেন)
এবং হাতুয়া ও সুরজপুরার মহারাজগণ।
ব্যারিস্টার প্রফুল্ল রঞ্জন দাস (দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের অনুজ), যিনি গুরুদেবের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তিনি ১৬ তারিখ সকালে রেল স্টেশনে উপস্থিত থাকতে পারবেন না বলে অপারগতা
প্রকাশ করেছিলেন। কারণ হিসেবে তিনি কিছু জরুরি
কাজের ব্যস্ততার কথা উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু সত্তরের দশকে, কমার্স
কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ অধ্যাপক জি. সি. সামন্ত, শ্রী দাসের
তৎকালীন ব্যক্তিগত সচিব শ্রী ডি. এন. সরকারকে উদ্ধৃত করে
বলতেন যে, শ্রী দাস সেদিন ঠিকই স্টেশনে পৌঁছেছিলেন।
বিশ্বভারতীর বার্ষিক প্রতিবেদনে লিপিবদ্ধ আছে যে, “পাটনা স্টেশনে
পৌঁছানোর পর কবিকে এক বিশাল ও উৎসাহী জনতা অভ্যর্থনা জানিয়েছিল — যদিও সেই ভিড় সামলানো বেশ কঠিন
হয়ে পড়েছিল; কার্যত শহরের সকল বিশিষ্ট
ব্যক্তিই সেদিন শহরের পক্ষ থেকে তাঁকে স্বাগত জানাতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন।” এবং যেমনটা প্রত্যাশিত ছিল, শ্রী পি. আর. দাসই ফ্রেজার রোডে অবস্থিত তাঁর নিজ বাসভবনে* গুরুদেবের থাকার যাবতীয় ব্যবস্থা করেছিলেন।
'রবীন্দ্র
জীবনী' গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, ১৬ই এবং
১৭ই — উভয় দিনই
'এলফিনস্টোন পিকচার হাউস'-এ নৃত্যনাট্য 'চিত্রাঙ্গদা' মঞ্চস্থ
হয়েছিল। 'সার্চলাইট' পত্রিকা ১৮ই মার্চ
তারিখে ১৬ তারিখের (সোমবার) পরিবেশনার একটি পর্যালোচনা প্রকাশ করেছিল। প্রশংসায় পঞ্চমুখ সেই পর্যালোচনায় পত্রিকাটি লিখেছিল:
চিত্রাঙ্গদা মঞ্চায়ন
মনোমুগ্ধকর সঙ্গীত:
চমৎকার নৃত্যশৈলী
“সোমবার সন্ধ্যায় 'এলফিনস্টোন
পিকচার হাউস'-এ শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থীদের করা, ড. ঠাকুরের 'চিত্রাঙ্গদা' নৃত্যনাট্যটির পরিবেশনা এক বিরল অভিজ্ঞতার সুযোগ করে দিয়েছিল। মনোমুগ্ধকর সঙ্গীত, চমৎকার নৃত্যশৈলী এবং কাব্যিক ছন্দের
জাদুকরী আবেশে দর্শকরা টানা দুই ঘণ্টা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বসেছিলেন। সঙ্গীত ও নৃত্যের
মাধ্যমে রূপায়িত সেই ঝলমলে কবিতার ভুবনে, যা সৌন্দর্যের এক অফুরন্ত
ভাণ্ডার নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল, দর্শকরা যেন এক পরম আশ্রয় খুঁজে
পেয়েছিলেন। কোনো কোনো মুহূর্তে অনুভূতিটা ছিল ঠিক এমন — যেন শরীরের ছন্দময় সঞ্চালনের
মধ্য দিয়ে সাবলীলভাবে প্রবাহিত সঙ্গীতের উন্মত্ত ঢেউয়ের ওপর ভর করে তাঁরা ভেসে চলেছেন। নাটকের মূল বিষয় ছিল যৌনচেতনার
জাগরণ; এর উৎস ছিল পৌরাণিক, ভাষা ছিল রবীন্দ্রনাথের
এবং সমগ্র নাটকের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য প্রকাশিত হয়েছিল নৃত্যের দৃশ্যগত ভাষার মধ্য
দিয়ে। যখন চিত্রাঙ্গদা অন্তরের গভীর থেকে ভেসে আসা আহ্বানের গান গায়, মদনদেবের কাছে সৌন্দর্যের বর প্রার্থনা করে এবং নিজের রূপান্তরের পরমানন্দে
বিভোর হয়ে নৃত্য করে — তখন তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতিটি সঞ্চালন যেন মৌখিক শব্দের মতোই
সুষ্পষ্টভাবে ভাব প্রকাশ করে চলে। অর্জুনের প্রতিরোধ, তার আত্মসমর্পণ, রূপান্তরের
পর প্রাপ্ত শারীরিক সৌন্দর্যের মূর্ত প্রতীক চিত্রাঙ্গদার মোহজাল থেকে তার মুক্তিলাভ
এবং পরিশেষে প্রকৃত চিত্রাঙ্গদার সাথে আধ্যাত্মিক মিলনের মাধ্যমে নিজেকে পুনরায় খুঁজে
পাওয়া — এই সবকিছুই
নৃত্যের ভাষায় প্রতীকী রূপে প্রকাশিত হয়েছিল। সেই পরিবেশনার প্রভাব ছিল এতটাই জাদুকরী
যে, যারা সেদিন দর্শকাসনে উপস্থিত ছিলেন,
তাদের স্মৃতিতে সেই রেশ দীর্ঘকাল ধরে অনুরণিত হতে থাকবে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের
সঞ্চালনের মধ্য দিয়ে আত্মার অন্তর্জ্বালাকে রূপায়িত করার যে ভারতীয় নৃত্যশৈলী — তার পুনরুজ্জীবন হলো ভারতীয় নবজাগরণে
রবীন্দ্রনাথের বহু অবদানের অন্যতম। শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থীরা সঙ্গীত, চারুকলা এবং নাট্যকলায় যে প্রশিক্ষণ লাভ করছে—মঞ্চে তার এমন এক প্রাণবন্ত ও
নান্দনিক রূপ ফুটে উঠেছিল যে, এ কথা বলতে বিন্দুমাত্র
দ্বিধা জাগে না যে, ড. রবীন্দ্রনাথ নৃত্যকলাকে এক অনন্য উচ্চতায়
উন্নীত করছেন এবং তাকে তার যোগ্য স্থানে এবং এক উন্নততর ব্যবস্থার
অধীনে সে যে স্থান অধিকার করেছিল, ঠিক সেই স্থানেই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত
করছেন।
“সেই সন্ধ্যার আরেকটি অনবদ্য আকর্ষণ ছিল মঞ্চে কবির উপস্থিতি।
তাঁর সুদৃশ্য ব্যক্তিত্ব সমগ্র পরিবেশনায় এক বিশেষ মাত্রা যোগ করেছিল। তাঁকে দেখে কোনো
সাধারণ মানুষ বলে মনে হচ্ছিল না; বরং মনে হচ্ছিল
তিনি যেন সংগীত ও কাব্যের চেতনারই এক মূর্ত প্রতীক। আর তাঁর আবৃত্তি — যা ছিল ধীর, সংযত ও সুরময় — তা শ্রোতাদের মনে গভীর অনুপ্রেরণা
জাগিয়েছিল।”
১৭ তারিখ সন্ধ্যায়, পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (P.U.) ক্যাম্পাসে অবস্থিত 'হুইলার সিনেট হল'-এ রবীন্দ্রনাথের সম্মানে একটি সংবর্ধনা
সভার আয়োজন করা হয়েছিল। ১৮ই মার্চ 'বিহার হেরাল্ড' পত্রিকায় এ বিষয়ে প্রকাশিত হয়:
ঠাকুরকে বিপুল সংবর্ধনা
সিনেট হলে জনসভা
পাটনা,১৭ই মার্চ
“আজ সন্ধ্যায় হুইলার সিনেট হলে মহান কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে একটি সংবর্ধনাপত্র ও একটি মানপত্র (অর্থের থলি)
প্রদান করা হয়, সভাঘর কানায় কানায় ভরে গিয়েছিল;
মেঝের ওপর কিংবা গ্যালারিতে — কোথাও এক ইঞ্চি জায়গাও খালি ছিল
না। — গত দুদিন ধরে কবি 'এলফিনস্টোন' প্রেক্ষাগৃহে পাটনার
জনসাধারণকে তাঁর পরিবেশনার মাধ্যমে বিমল আনন্দ দান করছিলেন। জনসমাবেশ
দেখে মনে হচ্ছিল যেন আর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই আয়োজকরা অনুষ্ঠানটি সংক্ষিপ্ত
করার সিদ্ধান্ত নিলেন। যদিও পাটনা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার কোর্টনি টেরেল
স্বয়ং সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, তবুও তিনি অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব
করার জন্য শ্রী সচ্চিদানন্দ সিনহার নাম প্রস্তাব করলেন। স্যার সুলতান আহমদ প্রস্তাবটি
সমর্থন করলেন। উপস্থিত সকলেই এতে সম্মতি জানালেন; কারণ বিহারের
সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে শ্রী সিনহার একটি অনন্য
ও বিশিষ্ট স্থান আছে। সভাপতির ভাষণে শ্রী সিনহা বললেন,
“…ড. ঠাকুরকে
স্বাগত জানানো পাটনার জনসাধারণের জন্য এক পরম সৌভাগ্যের বিষয়। উপলক্ষটি ড. ঠাকুরকে
সম্মানিত করার চেয়ে বরং আমাদের নিজেদেরই সম্মানিত করার এক সুযোগ; কারণ এই পরম ক্ষণটি এমন এক মহান কবিকে স্বাগত জানানোর, যিনি আন্তর্জাতিক
খ্যাতি ও স্বীকৃতি অর্জন করেছেন এবং ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে ভারতের সাংস্কৃতিক
মানকে সমুন্নত করেছেন…”
“মাননীয় সৈয়দ আব্দুল আজিজ কর্তৃক পঠিত অভিনন্দন-লিপিতে বলা হয়েছিল:
“...আপনার প্রথম আগমনের এই
শুভলগ্নে, আমরা পাটনার নাগরিকবৃন্দ—যারা সমাজের সকল
স্তরের প্রতিনিধিত্ব করছি — আমাদের গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ আপনাকে এই স্বাগত-সম্বর্ধনাপত্রটি
নিবেদন করার অনুমতি প্রার্থনা করছি...
“আমরা অনুভব করি যে, দেশ ও বিশ্বের কল্যাণে আপনি যা কিছু করেছেন,
তার প্রতিদানস্বরূপ আমাদের কর্তব্য হলো আপনার প্রতি আমাদের সশ্রদ্ধ ভালোবাসা
ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা...
“আপনি দীর্ঘজীবী হোন
এবং আমাদের মাঝে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকুন; আর যে আদর্শ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আপনি হৃদয়ে লালন করেন, তা যেন মানুষের হৃদয়ে জয়লাভ করে...
“সম্বর্ধনাপত্রটির
পাঠ শেষে, সভার সভাপতি শ্রী সচ্চিদানন্দ সিনহা পাটনার জনসাধারণের
পক্ষ থেকে ‘বিশ্বভারতী’-র উদ্দেশ্যে কবিকে ১,১১১ টাকার একটি থলি উপহার হিসেবে প্রদান করেন। পরিশেষে
গুরুদেব উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জানান।”
‘বিহার হেরাল্ড’এর প্রতিবেদনে ‘ড. ঠাকুরের প্রত্যুত্তর’ শিরোনামে উল্লেখ করা হয়েছে, “ড. রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর প্রবল করতালির মধ্যে প্রত্যুত্তর দিতে উঠে দাঁড়ালেন; কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর জনতার কোলাহলে প্রায় হারিয়েই
গিয়েছিল — জনতা তাদের
অতি-উচ্ছ্বাসে কিছুটা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছিল। তিনি বললেন যে, ধন্যবাদ জ্ঞাপনের ক্ষেত্রে যদি তাঁর প্রকাশভঙ্গিতে
কোনো কার্পণ্য থেকে থাকে, তবে তা তাঁর বার্ধক্যজনিত অনিবার্য
অক্ষমতা বা দৈন্যের কারণেই ঘটেছে, যার জন্য শ্রোতাদের তাঁর প্রতি
কিছুটা সহৃদয় হওয়া উচিত...”
তিনি তাঁর রচিত দুটি বা তিনটি ছোট কবিতাও আবৃত্তি করেন। কবিতাগুলো
আবৃত্তি করার পূর্বে তিনি শ্রোতাদের প্রতি বাংলা ভাষা শেখার এবং এর সমৃদ্ধ সাহিত্যের
সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য একটি আহ্বানও জানান।
‘বিশ্বভারতী নিউজ’-এ উত্তর ভারত সফরের প্রতিবেদনটির সারসংক্ষেপ প্রকাশিত হওয়ার সময়, সফরে প্রাপ্ত অনুদানের অর্থের বিস্তারিত বিবরণও প্রকাশিত
হয়েছিল। প্রাপ্ত অর্থরাশির মধ্যে তিনটি অনুদান পাটনা থেকে এসেছে বলে
প্রতীয়মান হয়। জনসাধারণের পক্ষ থেকে প্রদত্ত ১,১১১ টাকার অনুদানের
পাশাপাশি, গুরুদেব শ্রী পি. আর. দাসের কাছ থেকে ৫০০ টাকা এবং
ড. এস. ঘোষালের কাছ থেকে ১০০ টাকা অনুদান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। সর্বশেষ উল্লিখিত
ব্যক্তিটি সম্ভবত আমাদের পরিচিত ডঃ শরদিন্দু মোহন ঘোষাল (গরিবের ডাক্তার এবং পরবর্তীকালে
বিহারের বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি), যিনি ততদিনে পিএমসিএইচ-এর
অ্যানাটমি বিভাগে নিযুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন।
১৮ তারিখে গুরুদেব এলাহাবাদে ছিলেন। দিল্লিতে গান্ধীজি তাঁর সঙ্গে
দেখা করতে আসেন। সফর শুরুর আগেও তিনি গুরুদেবকে
শারীরিক অসুস্থতার ঝুঁকি নিয়ে বোলপুর থেকে
না বেরোবার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আশ্বাসও দিয়েছিলেন যে
তিনি বিশ্ব-ভারতীর জন্য ৬০,০০০/- টাকা অনুদানের
ব্যবস্থা করে দেবেন। তিনি তাঁর আশ্বাস রক্ষা করেন এবং দিল্লিতে
গুরুদেবকে অনুদানে সংগ্রহ করা ৬০,০০০/- টাকা প্রদান করেন। তিনি আবারও গুরুদেবকে এই সফরে আর অগ্রসর না হওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।
দিল্লিতেই গুরুদেব তাঁর পরামর্শে
কর্ণপাত করেন এবং বোলপুরে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
--------------------------------
* পাটনার ফ্রেজার রোডে একসময় যেখানে
টাইমস অফ ইন্ডিয়ার অফিস ছিল, সেই অফিসের পাশের
দক্ষিণমুখী গলিতে ‘শান্তিনিকেতন’ নামের বাংলো বাড়িটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। এটা পরিতাপের বিষয়
যে এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটি, যেখানে রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু,
প্রখ্যাত সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরও অনেকে সেই দিনগুলিতে
থাকতেন, আজ জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
[বিহার বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডঃ (ক্যাপ্টেন) ডি. কে.
সিনহার তৈরি করা পিপিটি-র পাঠ্যের সহায়তায়]
২৫.৩.২৬

No comments:
Post a Comment