Friday, March 13, 2026

বাঙ্গলাদেশের ভাষা আন্দোলনের সাথে যুক্ত জীবনের এক স্মরণীয় অধ্যায় - এ. কে. রায়

অনেকদিনের কথা। প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। দিন তারিখ মনে নেই। কিন্তু ঘটনাগুলো মনে আছে। ছবির মত ভেসে উঠলো। সংযোগ ছিল একুশে ফেব্রুয়ারী উযাপন। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। বাঙ্গলাদেশের ভাষা ন্দোলনের এক অবিস্মরণীয় দিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা বাঙ্গলাভাষার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রা দিয়েছিলখন নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান। প্রাণ দিয়ে অঙ্কুর গেড়েছিল আজকের বাংলাদেশে(বিহারের ধানবাদে প্রবাসী বাঙালী সং ঠিক করলো ২১শে ফেব্রুয়ারী মানাবে) তার সাথে এক সেমিনারও হবেটা বিষয় রবীন্দ্রনাথের সেই কথা, মাতৃভাষা ও মাতৃদুগ্ধ। হিরাপুরেহরিমন্দিরে চর্চার মধ্যে হঠাৎ সামনে চলে এলো সেই ঘটনাগুলো যেটাকে বাদ দিয়ে মার পক্ষে ২১শে ফেব্রুয়ারীর বর্ণনা করা হয়তো অসম্পূর্ণ।

সেই সময়টা আমরা স্কুল থেকে সদ্য পাশ করেছি। পূর্ব পাকিস্তানের রাজশাহী জেলার নওগাঁ মহকুমার কে. ডি. হাইস্কুল। সরকারী এবং খুব নামী হাইস্কুল ছিল সেটা অনেক ভাল ছাত্র পা করেছে সেই স্কুল থেকে। তার মধ্যে একজন হুমায়ুন কবীর ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী ছিলেনতখনও পাসপোর্ট ভিসা হয় নি। এপার বাংলা ওপার বাংলামধ্যে অবাধ আসা যাওয়া। অনেকের মনের মধ্যে বিভাজনটাও পাকা ন। পাকরে কলকাতার পাশে বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন পরিচালিত বিদ্যামন্দিরে ভর্তি হয়েছি। কি যেন ছুটি ছিল, ফিরেছি ঘরেবন্ধুবান্ধবের সাথে স্কুলের বারান্দায় বসে গল্প করছি। আলোচনার বিষয়ও ভাষা আন্দোলন জিন্না সাহেব ঢাকায় এসে বলে গেছেন, "উর্দুস্তানী চাহিয়ে"। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে। মানতে হবে এটাকে। এখন কি হবে? ঐ সময় পাকিস্তানে জিন্নার উপর কথা বলার লোক নাই নেতাদের মধ্যে। কিন্তু ছাত্ররা সেটা মানবে কেন। সময় ১১টা নাগাদ। ছাত্ররা স্কুলে আসতে

লেগেছে। ক্লাসে না ঢুকে তারা মাদের কাছে ভীড় করলো। কি করা উচিত। আশেপাশে সব স্কুল বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবী নিয়ে হরতাল করেছে। কিন্তুটা সরকারী স্কুল। এর প্রেসিডেন্ট এস.ডি.ও. স্বয়ং র সেক্রেটারী টাউন মুসলিম লিগের সেক্রেটারী এবং উকিল সিরাজ মিয়াঁ। এখানেখনও ধর্মঘট হয় নি। শক্ত মানা। তাছাড়া হেডমাস্টার কুণ্ডুবাবুর সাথে সিরাজ মিয়াঁ স্বয়ং স্কুলে এসে বসে গেছেন যাতে কেউ এদিক ওদিক না করতে পারে। ছাত্রদের আমরা কি বলেছিলাম এদিন পরে সব মনে নাই, কিন্ত তার মধ্যে একটা কথা ছাত্রদের খুব মনে ধরেছিললে আজও মনে আছে। "আমাদের রাইট নিয়ে ফাইট করতে হবে।" এরপর আর কি থা। ছেলেরা হৈ হৈ করে বেরিয়ে আসলো। যা কোনদিন হয় নি তাই হল। কে.ডি. হাইস্কুলে ধর্মঘট হয়ে গেল।

রাস্তাতেই সিরাজ মিয়াঁ রাগান্বিত ভাবে আমাদের রলেন। এটা তোমাদেরই কাজ। দেখাচ্ছি মজা। আগুন নিয়ে খেলা করছো। তোমাদের বাবাদের বলছি। সংযো বশে আমরা যারাসেছিলাম তাদের অনেকেরই বাবা উকিল ছিলেন এবং সিরাজ মিয়াঁর সাথী। মাদের বাড়ীতেও উনি অনেকবার এসেছেন। সুতরাংনার বকাটাকে অত গম্ভীর ভাবে নিই নি। বাড়ী ফিরতেই দেখলাম বাবা কোর্ট থেকে ফিরে এসেছেন। জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে কার সিরাজ মিয়াঁ উত্তেজিতয়েনেক অভিযোগ করছিল। বাড়ীতে কি এক অনুষ্ঠান হচ্ছিল। অনেক লোকের সমাগম। আমি সংক্ষেপে ঘটনাটা বলে কেবল খেতে বসেছি হঠাৎ বাইরে কিছু শব্দ হ। পায়ের বুটের শব্দ এবং ফৌজী হুকুমের আওয়া। বাবা আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন। পুলিশ এসেছে আমাকে খুঁজতে। বেরিয়ে দেখি বিশাল ফোর্সের সাথে দারোগা, ইন্সপেক্ট, এস. ডি. পি.. গোটা বাড়ী ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। তল্লাসী নিবে। খুব গরম মেজাজ। আমাকে নিয়ে এস. ডি. পি.. চললো স্কুলে। সে এক দৃশ্য। চারিদিকে ভীড়। হেডমাস্টারকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন সে মাকে দেখেছে কিনা ছেলেদের উত্তেজিত করতে। কি কথা হল জানিনা। আমাকে নিয়ে এসে হাজতেন্ধ করে দেওয়া হল। এই ভাবে আমার আরেক বন্ধুকে গ্রেপ্তার করে থানাতে না হল। আমাদের মনের মধ্যে ভয়েথেকে উত্তেজনা বেশি। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। নতুন অনুভূতি।

স্কুলে ধর্মঘটের ফল যাই হো না কেন গ্রেপ্তারির প্রতিক্রিয়া ল শহরে প্রচন্ডমুহূর্তের মধ্যে ভাষা আন্দোলন এবং পুলিশী দমনের চর্চা চারিদিকে ছড়িয়ে গেল। পুলিশ আমাদের নিয়ে যেখানেই যাচ্ছে লোকে ভীড়রে দাঁড়িয়ে দেখছে। শহরে এই প্রথ গ্রেপ্তারী। রাষ্ট্রভাষা কি হওয়া উচিত সবাই যেন তার চর্চায় লেগে গেল। সব থেকে বড় কথা এতে থানাঅচ্ছুতা থালো না। আমরা হাজতে বসে শুনছি, শহরের লোকেরা যাদের অনেকেই পরিচিত, ছে এবং ভাষা এবং আমাদের গ্রেপ্তারী নিয়েই বিতর্ক চলছে। তারপরে দারোগা পুলিরাও চর্চায় লেগে গেল। (দেখলাম ভাষা একটা জিনি যেটা সবাইকেই মুখর করে তোলে। যারা উর্দুর পক্ষে তাদের বক্তব্য উর্দু মুসলমানের ভাষা আর পাকিস্তান মুসলিম রাষ্ট্র সুতরাং উর্দু রাষ্ট্রভাষা হবে। বাংলা হিন্দু ভাষা। তাই রাষ্ট্রভাষা হতে পারে না। যারা বাংলার পক্ষে তাদের কথা ভাষার কোন ধর্ম হয়না। সব ধর্মেরই লোক সব ভাষা বলতে পারে। তারা সব বাংলাভাষা বলে, তার মানে তারা কি সব হিন্দু? খাঁটি মুসলমান হতে গেলে কি এখন তাদের উর্দু শিখতে হবে? হাজতে বসে বসে এই তর্কবিতর্ক শুনে মজাই লাগছিল, বিশেষ রে যখন মনে হচ্ছিল বেশির ভাগ পুলিদারোগাও বাংলার পক্ষে, এবং এটা নিয়ে খামাখা আমাদের গ্রেপ্তারীর বিপক্ষে। এই ভিতরের সমর্থনের জন্য আমাদের আর কোন অসুবিধা হল না। বাড়ী থেকে খাবার বিছানা আসলো। আরাম করে রাত্রি কাটালাম। থানা থেকে আমরা জানতেও পারলাম যে সকালেই ছেড়ে দিবে।

কিন্তু রাত্রির মধ্যে ঘটনা হয়ে গেঅন্যরকম। পাকিস্তান রেডিও ঘোষণা করলো সমস্ত ভাষা আন্দোলনই ভারত থেকে পাঠানো হিন্দু যুবকদের কান্ড যা দুজনেতাত্তেজক পর্চা বিতর কালে ধরা পড়েছে। ঢাকার কাগজে ফলাও করে বের হল পাকিস্তানকে ধ্বংরাবিশা ষড়যন্ত্রের" কথা। মুখ্যমন্ত্রীর বেতার ভাষণও হয়ে গে উপর। কলকাতার কাগজে খবর বের হল, হিন্দু ছাত্রেওপর পাকিস্তান সরকারের অত্যাচারের নমুনা হিসাবে। এর পর ছেড়ে দেবার প্রশ্নই আসে না। খুবই বিপদজনক বন্দী হিসাবে বিশাল ফৌজের সাথে আমাদের রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলে দশ নম্বর সেলের ওয়ার্ডে পাঠানো হল। নেক সিপাইএর মধ্যে আমাদের মত দুই হাফপ্যান্ট পরা ছেলেকে দেখতে লোকপচে পড়লো

আমাদের পাড়া, হাইস্কুল, কোর্ট খুব কাছাকাছি। এখন নওগাঁ জেলা শহর। তখন ছিল মহকুমা। আমাদের পাড়াতেই ছিল এস.ডি.পি.ও.-র অফিস এবং আবাস। এস.ডি.পি.ও. সিলেট থেকে আসাদ্বাস্তু। নতুন আসা তাই হিন্দু বিশেষ করে ভারবিদ্বেষী। গরম মেজাজ কিন্তু তার পরিবার ছিল বিপরীতএরই মধ্যে বাড়ীতে মায়ের কাছে প্রায়ই আসতেন। মাদের গ্রেপ্তারের রে পাড়াতে এস.ডি.পি.ও.-কে প্রায় সামাজিক বয়কটের মধ্যে পড়তে হয়েছিল। হিন্দু মুসলমান দুই পক্ষ থেকেইকত গভীর সম্বন্ধ ছিল হিন্দু মুসলমানের মধ্যে মাদের শহরে

এটার ন্দা নতুন সা অফিসারের ছিল না। তারর ভাষা আন্দোলন দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভালবাসার নতুন সেতু হল। লোককে জুড়তে ভাষার কি বিশাল ভূমিকা ঐ আন্দোলনে সেটা প্রমাণ ল। দুই বৎসর পর যে নির্বাচন হল তাতে মুসলিম লিগ পূর্ব পাকিস্তাথেকে সমাপ্ত হয়ে গেল (৩০০ সীটের মধ্যে মাত্র ৯টি) এবং সেখানে ফলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট সরকার থাকলো। কিন্তু এই সুদূর প্রসারী রাজনৈতিক লড়াইএর আগেই এস.ডি.পি.ও.-র এবং নিশ্চয়ই আরো নেক অফিসারদেই ঘরেলড়াই শুরু হয়ে গেল যখন তিনি আবিষ্কার করলেন তাঁর স্ত্রী আমাদের বাড়ীতে গিয়ে মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। বাবা যিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে অনেকদিন জেলে থেকেছেন, এই ঘটনাকে খুবই শান্ত এবং স্বাভাবিক ভাবে নিয়েছিলেন কিন্তু মা কিছুটা প্রথমে হকচকিয়ে গিয়েছিলেন এবং মুষড়ে পড়েছিলেন।

সারাদিন ট্রেন এবং বাসে কাটিয়ে ভীর রাতে আমাদের রাজশাহী সেন্ট্রাজেলে দশ নম্বর ওয়ার্ডে ঢোকানো হল। ঐ ওয়ার্ডে দশটা লাদা আলাদা সে আছে যেখানে খুব বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ লোকদের রাখা হতো। আর আমরা এখন গুরুত্বপূর্ণ বন্দী। বাকি সেলগুলিতে ভাষা আন্দোলনের নেতাদের রাখা হয়েছিল যার মধ্যে একজন এম.এল..-ও ছিলেন। আমাদের জন্য দুটো সেল সকাল থেকে পরিষ্কার হচ্ছিল। প্রচার ছিল দুজন খুব বিপদজনক বন্দী আসছে। আমাদের আগমনের সম্বন্ধে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছিল খুব। সকালবেলা সেলের গেট খুললে যখন ওয়ার্ডের লোকেরা দেখলো হাফপ্যান্ট পরা দুটো পুচকি ছেলে বসে আছে তখনি সবাই প্রথমে আশ্চর্য হন কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই আমাদের দেশভাইয়ের মতো গ্রহণ করে রাজবন্দীদের সংসারের অঙ্গ করে নিলেন। আমরা ঘরের মতো ছিলাম। কোন অসুবিধা মনে হয় নি। যাঁরা আমাদের সাথে ছিলেন ওয়ার্ডে তাঁদের একজনের নাম ছিল একরামুল হক। তিনি ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে না থাকলেও তাঁকে ধরা হয়েছিল কারণ ছাত্রদের মধ্যে তিনি কম্যুনিস্ট হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন আর পাকিস্তানের সরকারী ফর্মূলা অনুসারে কম্যুনিস্ট এবং হিন্দুরাই ভাষা আন্দোলনের আসল জড়। কিছুদিন পরে ধীরে ধীরে সবাই ছাড়া পেতে লাগলো। প্রথমে ছাড়া পেলেন এম.এল..। তারপর অন্যান্যরা। শেষে একরামুলদার সাথে আমরা ছিলাম তিনজন দশ নম্বর ওয়ার্ডে। দুমাস পরে আমরাও ছাড়া পেলাম। একরামুলদা রয়ে গেলেন একা। দুই বৎসর পরে যখন মুসলিম লিগ সরকার পরাজিত হয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকার আসলো একরামুলদা ছাড়া পেয়েছিলেন। জেলে বসেই তিনি পড়াশোনা করেছিলেন। পরে তিনি রাজশাহী কলেজের প্রফেসর হন। রাজশাহী জেলে তখন ভাষা আন্দোলন কর্মী ছাড়াও অনেক কম্যুনিস্ট রাজবন্দী ছিলেন। কিছুদিন আগেই নাচোল কান্ড হয়েছিল। ইলা মিত্রের ওপর বর্বর অত্যাচার। জেলে কম্যুনিস্টদের আলাদা করে রাখা হতো ভাষা আন্দোলন কর্মীদের কাছে থেকে। অনেক বন্ধন ছিল তাদের ওপর। কিছুদিন আগেই গুলি চলেছিল সেন্ট্রাল জেলে। প্রায় একশ কম্যুনিস্ট রাজবন্দী মারা গিয়েছিলেন। সে সময় জেলের নিয়মও ছিল হত্যা করা। কিন্তু তা সত্ত্বেও কম্যুনিস্ট রাজবন্দীরা খবর পেয়েছিলেন আমাদের সম্বন্ধে। গেটের ফাঁক দিয়ে দেখা করতেন, কথা বলতেন আমাদের সঙ্গে। আমাদের পাকিস্তান সরকার আটকে রেখেছিল বিনা বিচারে প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন এ্যাক্টে (পি. ডি. এ্যাক্ট)। এর ঠিক পনেরো বছর পর আবার জেলে আসতে হয়েছিল আর ঐ পি.ডি.এ্যাক্টেই, কিন্তু সেটা এবার ভারতে, ধানবাদে যেটা আমার জীবনধারাকেই বদলে দিল।

রাজশাহী জেল থেকে ছাড়া পেয়ে যখন আসলাম বাড়িতে তখন অভূতপূর্ব সম্বর্ধনা পেলাম শহরে। আমাদের ওজন এমনই নিয়মিত খাওয়াদাওয়াতে বেড়েছিল কিন্তু সামাজিক ওজন বেড়ে গিয়েছিল অনেক বেশী যার জন্য অবশ্য কোনো কৃতিত্বই আমাদের প্রাপ্য নয় এক সরকারের মুর্খতা ছাড়া। বোধহয় এইভাবেই তিল কে তাল করে সরকারের গৃহবিভাগ চলে। শহরের সমস্ত সামাজিক, সংস্কৃতি অনুষ্ঠানেই আমাদের ডাক। কলেজে যখন ফিরলাম সেখানেও আমাদের গুরুত্ব বেড়ে গেল। সেখানে খবরটা আগেই ছড়িয়ে গিয়েছিল। জেল থেকে বেলুড় বিদ্যামন্দিরে ফিরে অমিয়কে পেলাম না (ডঃ অমিয় বাগচী, খ্যাতনামা অর্থশাস্ত্রী)। ওদিকে আমি যখন জেলে তখন কিছু আদর্শগত প্রশ্নে সেও কলেজ থেকে বহিষ্কৃত। এই ঘটনার পরেও আট বৎসর পূর্ব বাঙ্গলার সাথে যোগাযোগ ছিল। বাবা মা ওলহানেই থাকতেন। আসা যাওয়া করতাম। শহরের কোনো অনুষ্ঠানই আমাদের ছাড়া পূর্ণ হতো না। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার কিছুদিন পরে আমরা রবীন্দ্রজয়ন্তীর আয়োজন করছি হঠাৎ এক পুলিশ এসে খবর দিল সাহেব ডাকছেন। গেলাম। দেখলাম ঐ এস.ডি.পি.. বসে আছেন। কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। উনি ট্রান্সফার হয়ে চলে যাচ্ছেন। খুব স্নেহের সাথে কথা বললেন। অবশ্য এটাও বললেন, আমি যেন ছাত্র অবস্থায় রাজনীতি না করি। এটা তিনি সমর্থন করেন না। পুলিশ অফিসারদেরও যে এক আলাদা চরিত্র হতে পারে আমার জানা ছিল না। কিছু আফসোস কিছু আন্তরিকতা মিলিয়ে যে কিছু কথা বলেছিলেন আজও মনে আছে। এরপর সত্যই একদিন দেশ ছাড়তে হল। অবশ্য তসলিমা নাসরিন-এর লজ্জার স্থিতিতে নয়। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমশই জটিল হচ্ছিল। রাত্রিতে ট্রেন। জানি আর ফিরবো না। রাজশাহী যেতে হতো পাসপোর্ট ভিসার ব্যাপারে। সেবার যেয়ে গেলাম সেই জেলখানার মাঠে গাছতলায়। পদ্মার ধারে যেয়ে বেঞ্চে বসলাম। জল খুব কাছে দিয়ে বয়ে চলছিল। এক মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম আগে পদ্মার জল অনেক দূর দিয়ে বইতো, আজ এত কাছে? মাঝি উত্তর দিল, পদ্মার মন বোঝা দায়। আগে জল বইতো এদিক দিয়েই, মাঝে চলে গিয়েছিল দূরে। আবার আগের জায়গা দিয়ে বইতে লেগেছে। জানি না সমস্ত মাঝিই এক স্বাভাবিক দার্শনিক কিনা। কিন্তু ঐ উত্তরের মধ্যে এ ইঙ্গিত স্পষ্ট ছিল নদী এক জীবন্ত প্রাণী। জীবনের মতো নদীও তার যাত্রাপথ বদলায়। যাবার দিন আবার সেই স্কুলের বারান্দায় বসলাম। সন্ধ্যায় সব বন্ধুদের কাছে গিয়ে একে একে বিদায় নিলাম। রব্বু, সলিমুল্লা, আলতাফ, আরও অনেকে। সে আজ চল্লিশ বছর হয়ে গেল। কত পরিবর্ত্তন হল। সেদিনের পূর্বপাকিস্তান আজ বাঙ্গলাদেশ। আর আমিও দুটি জিনিষ ভুলতে পারলাম না যেটা বিহারে একুশে ফেব্রুয়ারীর উৎসব নতুব করে স্মরণ করিয়ে দিল এক মাতৃভাষা বাঙ্গলা, অপরটি নিজের দেশ আর দুটি মিলালেই বাঙ্গলাদেশ।







 

[মূল বানান অপরিবর্তিত]

Digitized on 13th March 2026

No comments:

Post a Comment