গোড়ার কথা
ভারতের প্রথম সরকারী বাংলা আকাডেমি বিহারে
১৯৮৩ সালে স্থাপিত হয়। বিহার বাংলা একাডেমির পূর্বসূরী তখন একমাত্র ঢাকা শহরের বাংলাদেশ
বাংলা আকাডেমি। এছাড়া অন্যত্র কোন সরকারী বাংলা আকাডেমির অস্তিত্ব তখন ছিল না। বিহারের
এই আকাডেমি গঠনের পশ্চাদ্স্পটটির উপর আলোক পাত করা দরকার। প্রদীপ জ্বালানোর আগে যেমন
সলতে পাকানোর পর্বটি অন্তরালে থাকে এক্ষেত্রেও এমনই এক ঐতিহাসিক অধ্যায় প্রচ্ছন্ন রয়েছে।
বিহারে ভূমিপুত্রের ন্যায়সঙ্গত স্বীকৃতি
আদায়ের জন্য ১৯৩৮ সালে বিহার বাঙালি সমিতি গঠিত হয়। স্বাধীনতা প্রাপ্তির পূর্বেই বিহারের
বাঙালিরা সমিতির প্রচেষ্টায় সেই স্বীকৃতি আদায় করে নেয়। স্বাধীনতা অর্জনের পরে বাঙালি
সমিতি আবার সক্রিয় হয়ে ভারতের সংবিধানে প্রদত্ত ভাষাগত সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রতিষ্ঠার
জন্য আন্দোলন করে এবং বিহার সরকারের কাছ থেকে সরকারীভাবে সেই অধিকার লাভ করে। সুতরাং
ভূমিপুত্রের অধিকার ও ভাষিক সংখ্যালঘুর জন্য নিদ্ধারিত অধিকার এই দুই অধিকারের বলে
বলীয়ান হয়ে বাঙালি সমিতি সরকারের কাছে প্রথম শ্রেণীর নাগরিকদের প্রাপ্য অধিকারগুলি
দাবি করতে লাগল। দেখা গেল বিহারে কয়েকটি আকাডেমি গঠিত হয়েছে। তার মধ্যে মগহী, ভোজপুরী,
মৈথিলী অন্যতম। কিন্তু বাংলা আকাডেমি গঠিত হয়নি। অথচ ভারতীয় ভাষাতত্ত্বের জ্ঞান যাঁদের
আছে তাঁরা জানেন যে বাংলা ভাষা বিহারে বহিরাগত তো নয়ই বরং বিহারেই এর জন্ম হয়েছে। মাগধী
প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার জন্ম। ভারতের প্রবাদ প্রতিম ভাষাবিদ সুনীতি চট্টোপাধ্যায়
থেকে সুকুমার সেন প্রমুখ খ্যাতনামা ভাষাবিদ্রা ভাষাতাত্ত্বিক সূত্রগুলির সাহায্যে প্রমাণ
করে দেখিয়েছেন যে মগধ (অর্থাৎ বিহার) অঞ্চলে বিকশিত মাগধী প্রাকৃত থেকে দুইটি শাখার
জন্ম হয়। তাদের একটি হলো পূর্বী মাগধী, অপরটি পশ্চিম মগধী। পূর্বী মাগধী ভাষা পরিবারে
রয়েছে বাংলা, ওড়িয়া, অসমিয়া। পশ্চিম মাগধীর মধ্যে রয়েছে-মগহী, মৈথিলী, ভোজপুরী ইত্যাদি।
এই ইতিহাস নির্ভর অভ্রান্ত তথ্যসূত্রের উপর নির্ভর করে বাঙালি সমিতি এগিয়ে চলল। প্রশ্ন
তোলা হল বিহারে যদি মগহী, ভোজপুরী, মৈথিলী ভাষা ও সাহিত্যর একাডেমি থাকে তাহলে বাংলা
একাডেমি থাকবে না কেন?
রাজ্যপালের সঙ্গে সাক্ষাৎকার: ১৯৭১ সালের
সাধারণ নির্বাচনের সময় বিহার সরকার 'শিল্প-সাহিত্য কোষ' গঠনের কথা ঘোষণা করে। সেই কোষের
আওতা থেকে বাংলা বাদ হয়ে যায়। বাংলা ভাষাকে সেই তালিকায় যুক্ত করার জন্য বাঙালি সমিতির
একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল তৎকালীন রাজ্যপাল শ্রী দেবকান্ত বড়ুয়ার সঙ্গে দেখা
করেন। সেই দলে ছিলেন - ডাঃ শরদিন্দু মোহন ঘোষাল, দীপেন্দ্রনাথ সরকার ও ডঃ গুরুচরণ সামন্ত।
শ্রী বড়ুয়া প্রতিনিধিদের জানান যে এই কোষটি স্থাপিত হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের সুপারিশ
অনুযায়ী বিশেষ ভাষা-গোষ্ঠীদের কথা মনে রেখে। তিনি ঐ কোষে বাংলাকে অন্তর্ভুক্ত করতে
অক্ষম বলে জানান। তবে তিনি প্রতিনিধিদের পরামর্শ দেন সরকারের কাছে যোগ্যতা অর্জন করার
জন্য বিহারে বাংলা ভাষার রাজনৈতিক গুরুত্বকে প্রতিষ্ঠিত বা প্রমাণিত করতে হবে। বাংলা
শিক্ষার সমস্যা, জনগণনায় বাঙালিদের সংখ্যা কম করে দেখানো প্রভৃতি আরো কয়েকটি বিষয় নিয়ে
তাঁর সঙ্গে দীর্ঘকাল আলোচনা হয়। তিনি সব কটি সমস্যার সমাধানের একমাত্র উপায় হিসাবে
ঐ রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধির কথাই বলেন।. তিনি এও জানান যে অচিরে বিহারে উর্দু আকাডেমি
স্থাপন করা হবে।
বাঙালি সমিতির সিদ্ধান্ত: বালি সমিতি অনেক
ভাবনা-চিন্তার পর স্থির করে আগে 'শিল্প-সাহিত্য সাহায্য কোষে' বাংলাকে যুক্ত করতে হবে।
তারপর বাংলা আকাডেমির জন্য চেষ্টা করা হবে। যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রী সভা গঠিত হওয়ার পর
ঐ কোষে বাংলা ভাষাকে যুক্ত করানো সম্ভব হয়। সমিতির চেষ্টায় শিল্প সাহিত্য সাহায্যকোষে
বাংলার দাবি স্বীকৃতি পেল। অধ্যাপক রঞ্জন হালদার ঐ কোষ থেকে আর্থিক সহায়তা পেলেন। এরপর
রাজ্যস্তরে সংখ্যালঘু কমিশন গঠনের দাবি করা হয় এবং সরকার তা মেনে নেন। সমিতি সংখ্যালঘু
কমিশনকে কার্যকারী করে তোলার জন্য সর্বশক্তি নিযোগ করে। উদ্দেশ্য ছিল এই কমিশনের মাধ্যমে
বিহারে বাঙালিদের সমস্যাগুলির প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং সরকারী পর্যায়ে
বাঙালিদের গুরুত্ব বাড়ানো। কর্মক্ষেত্রে নাবার পর সমিতি লক্ষ্য করে বিহারে আমলাদের
মধ্যে বাঙালি ও বাংলা ভাষার প্রতি ভ্রান্ত ধারণা দূরীভূত হয়নি। অনেকেই মনে করেন বাংলাভাষা
পশ্চিম বঙ্গের ভাষা, বিহারের ভাষা নয়। সুতরাং ঐ ভাষার সংরক্ষণ ও বিকাশ বিহার সরকারের
নয়, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দায়। তবে বিহার সরকার কর্তৃক গঠিত সংখ্যা লঘু কমিশনটিতে ধর্মীয়
সংখ্যালঘু সম্প্রাদায় যেমন ছিলেন তেমনই ভাষিক সংখ্যালঘু হিসাবে বাঙালি প্রতিনিধিও ছিলেন।
সুতরাং বাংলা ভাষা বিহারে সংখ্যালঘু ভাষার সরকারী স্বীকৃতি পেয়ে অতি গুরুত্বপূর্ণ এক
ধাপ এগিয়ে গেল।
এরপর বাঙালি সমিতি পরবর্তি পদক্ষেপ হিসেবে
বাংলা আকাডেমি গঠনের ভাবনাটিকে বাস্তবায়িত করার জন্য উদ্যোগী হয়। বাঙালি সমিতি বিহারে
বাঙালিদের আত্মপরিচয় রক্ষা ও নাগরিক হিসাবে অধিকার রক্ষার জন্য যে মাধ্যমগুলিকে আশ্রয়
করে আগ্রসর হয় তার মধ্যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার সংস্থাগুলির পৃষ্ঠপোষকতা করা
অন্যতম। এর মধ্যে বাঙালিদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্কুল ও কলেজের ভাষিক সংখ্যালঘু হিসাবে
সরকার থেকে বিশেষ স্বীকৃতি আদায় অন্যতম। বাংলা পাঠ্য-পুস্তক প্রকাশ, নাট্য-লিখন ও মঞ্চায়নে
সহযোগিতা করা, বাংলা গ্রন্থাগারের রক্ষণা বেক্ষণ করা, আলোচনা সভার আয়োজন করা ইত্যাদি
এই কর্মকান্ডের অঙ্গ। বাংলা আকাডেমি গঠিত হলে বাঙালি সমিতির এই দায়বদ্ধতার ভার অনেকটা
লাঘব হবে বলে মনে করা হল। এই ভাবনার প্রতিফলন দেখা গেল ১৯৭৬ সালের ২৯শে ফেব্রুয়ারি
ডাঃ বিষ্টু মুখোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে সমস্তিপুরে অনুষ্ঠিত বাঙালি সমিতির অষ্টাদশ সম্মেলনে
গৃহীত বাংলা আকাডেমি সংক্রান্ত একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের মাধ্যমে। প্রস্তাবটি
এই ধরনের –
"বাঙলা ভারতের দ্বিতীয় এবং বিহারের
অন্যতম প্রধান স্বীকৃত ভাষা হওয়া সত্ত্বেও সরকার পক্ষ হইতে ইহার সংরক্ষণ ও বিকাশের
জন্য আজ পর্যন্ত বাংলা আকাডেমি স্থাপনের কোনও সরকারী আগ্রহ প্রকাশ পায় নাই, যদিও বিগত
কয়েক বৎসর হইতেই বাঙালি সমিতির পক্ষ হইতে বাংলা আকাডেমি স্থাপনের দাবি জানানো হইতেছে।
বিহার রাজ্য বঙ্গভাষী সম্মেলনের এই অষ্টাদশ অধিবেশন বিহার সরকারের নিকট অবিলম্বে বাংলা
আকাডেমি স্থাপনের জন্য পুনরায় দাবি জানাইতেছে।”
পরের বছর ১৯ এপ্রিল ১৯৭৭ সালে জামালপুরে
অনুষ্ঠিত বার্ষিক সম্মেলনে আবার সরকারকে আকাডেমি স্থাপনের অনুরোধ জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ
করা হয়। পরের বছর ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৮ সালে ভাগলপুরে অনুষ্ঠিত বার্ষিক সম্মেলনেও অনুরূপ
প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।
তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী গোলাম সরওয়ার সমিতিকে
আশ্বাস দেন যে তিনি ২৪-২-৭৯তে রানীবহালে অনুষ্ঠেয় বাঙালি সমিতির আগামী বার্ষিক সম্মেলনের
আগেই আকাডেমি গঠনের কাজ কিছুটা এগিয়ে রাখবেন। সেই অনুসারে একটি সংক্ষিপ্ত মেমোরেন্ডমের
ভিত্তিতে আকাডেমির রেজিস্ট্রেশনের সব ব্যবস্থা হয়ে যায়। কিন্তু নানা রাজনৈতিক চাপের
ফলে সে কাজ পুরো হতে পারেনি। সরকারী ফাইল আবার শিক্ষা দপ্তরে ফিরে আসে। শিক্ষামন্ত্রী
রানীবহালের বার্ষিক সভায় উপস্থিত হতে পারেননি। তাই সেখানে আবার বিগত বছরের মতো প্রস্তাব
গ্রহণ করা হয়। ইতিমধ্যে ১৯৭৯ র রাজ্য সংখ্যালঘু কমিশনের প্রাথমিক রিপোর্টের সুপারিশের
শেষ আইটেম হিসাবে বাংলা আকাডেমি গঠনের বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত করাতে সক্ষম হন দীপেন্দ্রনাথ
সরকার। বার্ষিক সভার পর পাটনায় ফিরে শিক্ষামন্ত্রীর উদ্যোগে শিক্ষা-বিভাগের অধিকর্তাদের
সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। তাঁরা বলেন যে সরকার কোনো আকাডেমি গঠন করবে (করে) না।
যদি কোনো ভাষা-গোষ্ঠীর জনসাধারণ আকাডেমি গঠন করে তাহলে সরকার সেটিকে স্বীকৃতি দিয়ে
অধিগ্রহণ করতে পারে। যেমন হয়েছে উর্দু ও মৈথিলীর ক্ষেত্রে। তাঁরা বলেন যে যেহেতু বাঙালি
সমিতি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান, তাই তার দ্বারা অন্য আর একটি প্রতিষ্ঠান গঠিত হওয়ার চেয়ে
ভাল হয়, আকাডেমিটি স্বাধীনভাবে গঠিত হোক। বাঙালি সমিতি তার নেপথ্যের কাজ সমাধা করুক।
যেমন অন্যান্য আকাডেমির ক্ষেত্রে করা হয়েছে। এই পরামর্শ অনুসরণ করে, বাঙালি সমিতির
অপ্রত্যক্ষ উদ্যোগে, স্বাধীনভাবে আকাডেমির একটি এড-হক- কমিটি গঠন করা হয় ১৯৭৯ সালের
সেপ্টেম্বর মাসে। এর দুই মাস পরে সমিতির কার্যকারী বৈঠকে "বাঙলা ভাষার সেবকদের
দ্বারা গঠিত" এই কমিটিকে অভিনন্দন জানিয়ে সমিতির পক্ষ থেকে সর্ববিধ সহযোগিতার
আশ্বাস দেওয়া হয় ও এর জন্য ২৫০ টাকা প্রাথমিক ব্যয়ও মঞ্জুর করা হয়।
সমিতির অনুরোধে ১৯৭৯ র সেপ্টেম্বরে বিধান
সভায় শ্রী কমলনাথ সিং ঠাকুর বাংলা আকাডেমি গঠনের দাবি জানিয়ে সরকার ও অন্যান্যদের দৃষ্টি
আকর্ষণ করেন।
আকাডেমির অস্থায়ী কমিটির প্রথম অধ্যক্ষ
ছিলেন প্রবাদপ্রতিম অধ্যাপক রঙীন হালদার এবং সচিব ছিলেন দীপেন্দ্রনাথ সরকার। কিন্তু
৯-১২-৭৯তে হালদার মহাশয়ের আকস্মিক মৃত্যুতে শ্রদ্ধেয় বর্ষীয়ান সাহিত্যিক শ্রী বিভূতি
ভূষণ মুখোপাধ্যায়কে অধ্যক্ষ করা হয় এবং অধ্যাপক পূর্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়কে সচিব মনোনীত
করা হয়।
রাঁচীতে অনুষ্ঠিত বার্ষিক সম্মেলনে (২৬-২-৮০)
ও ঘাটশীলায় অনুষ্ঠিত বার্ষিক সম্মেলনে (২৮-২-৮১) বাংলা আকাডেমির সরকারী স্বীকৃতির আবেদন
জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। এরপর সমিতির ২৮-৫-৮১ (রামগড়) ও ২২-১২-৮১ তে ডাল্টনগঞ্জের
ত্রৈমাসিক বৈঠকে সংবিধান রচনা ত্বরান্বিত করতে আবেদন জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।
২৪-১২-৮১তে দীপেন্দ্রনাথ সরকারের আকস্মিক
প্রয়াণের ফলে সমিতির কাজ ব্যাহত হলে আকাডেমি গঠনের কাজ সাময়িক ভাবে মন্থর হয়ে যায়।
১১-৪-৮২তে পাটনায় অনুষ্ঠিত সমিতির বার্ষিক
সভা উপলক্ষে রাজ্যমন্ত্রী সমায়লে নবী মুখ্যমন্ত্রীর হয়ে বাংলা আকাডেমি স্থাপনের সঙ্কল্প
ঘোষণা করেন এবং যেহেতু চলতি বছরে এর জন্য কোনো বাজেট নিদ্ধারিত হয়নি, তাই ১৯৮৩ সাল
থেকে কার্যকর করা হবে বলে আশ্বাস দেন। মুখ্যমন্ত্রী অপরিহার্য কারণে সেই সভায় উপস্থিত
থাকতে পারেন নি।
বাঙালি সমিতি রচিত আকাডেমি সংবিধানটি রেজিষ্ট্রেশন
করাতে গেলে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ তাতে কিছু স্ববিরোধ ও অসংগতি নির্দেশিত করায় সেটি সংশোধনে
দায়িত্ব দেওয়া হয় শ্রী প্রভু মুখোপাধ্যায়কে। অধ্যাপক গুরুচরণ সামন্ত তাঁকে সহযোগিতা
করেন। তাঁরা দুজনে সংবিধানের "আকাডেমির আদর্শ ও উদ্দেশ্য" ও সংগঠন অংশটির
নূতন রূপ দেন এবং পরে বাকি অংশ ঢেলে সাজান শ্রী পারিজাত প্রসূন সেন। সেই সংশোধিত নিয়মাবলীর
ভিত্তিতেই আবার মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আকাডেমি গঠনের কাজ ত্বরান্বিত করতে আবেদন জানানো
হয়। এই দৌত্যে সাহায্য করেন সমায়লে নবী।
মুখ্যমন্ত্রীর গত বছরের আশ্বাসের সূত্রেই
১৯৮৩র ২৬শে ফেব্রুয়ারী পূর্ণিয়ায় অনুষ্ঠিত সমিতির বার্ষিক সম্মেলনে, জনাব সমায়লে নবীর
চেষ্টার ফলে মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ জগন্নাথ মিশ্র নিজে উপস্থিত হয়ে বাংলা আকাডেমি স্থাপনের
কথা ঘোষণা করেন এবং মার্চ মাসের পরবর্তী বাজেট বক্তৃতাতেও আকাডেমির জন্য দেড় লক্ষ টাকা
ব্যয় বরাদ্দ মঞ্জুর করেন। সরকারী অফিসার পর্যায়ে যাঁদের সহযোগিতা ও পরামর্শ পাওয়া যায়
তাদের মধ্যে সর্বাগ্রে উল্লেখ করতে হয় তৎকালীন মুখ্যসচিব শ্রী সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের
নাম।
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ঐ
দিন সমিতির কেন্দ্রীয় পরিষদের বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ
করা হয়।
চিন্তন শিবির ও মজহরুল ইসলাম
বাংলা দেশ বাংলা আকাডেমির মহাপরিচালক মজহরুল
ইসলামকে কেন্দ্র করে উদ্বোধন অনুষ্ঠানের পরদিন প্রভু মুখার্জীর এস.পি. ভার্মা রোডের
বাসভবনে একটি চিন্তন শিবিরের আয়োজন করা হয়। এই আয়োজনের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল বাংলা দেশের
বাংলা আকাডেমির অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে মজহরুল ইসলামের অর্জিত অভিজ্ঞতার দ্বারা লাভবান
হওয়া। বাংলা দেশের বাংলা আকাডেমি বিহার আকাডেমির পূর্বসূরী। মজহারুল দূরদৃষ্টি সম্পন্ন
প্রাজ্ঞ প্রশাসকের মতো কিছু কার্যকরী উপদেশ'বা পরামর্শ দেন। তিনি প্রথমেই জানতে চান
বিহার সরকারের আর্থিক সহযোগিতার পরিমাণ কত। তিনি জানান বাংলা দেশের আকাডেমি যত টাকা
চায় সরকার তত টাকা দেয়। কিন্তু বিহারের ক্ষেত্রে অবস্থাটি ঠিক বিপরীত। সুতরাং সীমিত
আর্থিক সঙ্গতির কথা মনে রেখে আকাডেমির কার্যসূচী তৈরী করতে হবে। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে
কার্যসূচী গ্রহণ করতে হবে। বিহারে বাঙালিদের আত্মপরিচয় বহনকারী কাজগুলি প্রথমে করতে
হবে। ব্যক্তিগত তুষ্টিকরণের পথে না গিয়ে এমন নৈর্ব্যক্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার
যা সর্বসাধারণের হিতার্থে প্রযুক্ত হবে। বিহারে যে বাঙালি সাহিত্যিকরা সাহিত্য সৃষ্টির
চিরায়ত নজীর রেখেছেন অথচ এখন তাঁদের সৃষ্টি করা নিদর্শনগুলি বিস্মৃতির অতল তলে তলিয়ে
যেতে বসেছে সেই রত্নগুলিকে উদ্ধার করে বর্তমান প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে হবে। এমন সাহিত্য
সৃষ্টির পৃষ্ঠপোষকতা করা দরকার যা সস্তা ও তরল প্রকৃতির নয়। মনে রাখতে হবে আকাডেমির
একটা আলাদা মর্যাদা আছে। সাহিত্য চর্চাকে উৎসাহ দেওয়া উচিত কিন্তু দেখতে হবে ছাপার
অক্ষরে যা তুলে ধরা হবে তার মধ্যে যেন গুণমানের অভাব না হয়। অনেক সময় দেখা যায় ব্যক্তিগত
উচ্চাকাঙ্খাকে তুষ্ট করতে গিয়ে গুণগত মানকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। মজহারুল বাংলা লোক সাহিত্য
সংগ্রহ ও সংরক্ষণের উপর জোর দিতে বলেন। ঐ চিন্তন শিবিরে প্রভু মুখার্জীর সঙ্গে উপস্থিত
ছিলেন গুরুচরণ সামন্ত, পূর্ণেন্দু মুখার্জী, সুপ্রকাশ ঘোষ, বিহার সরকারের মুখ্যসচিব
সুভাষ মুখার্জী। সুভাষবাবু এনসাইক্লোপিডিয়া থেকে ফরাসী সাহিত্য আকাডেমি সম্পর্কে বিস্তারিত
জ্ঞান অর্জন করে এসেছিলেন।
বাধার পর বাধা
উদ্বোধন অনুষ্ঠানের দিন একটি চমকপ্রদ ঘটনা
ঘটতে দেখা যায়। সকলে দেখলেন মুখ্যমন্ত্রী জগন্নাথ মিশ্রের নামে হিন্দিতে লেখা রক্তব্যের
একটি ছাপা কপি সভাগৃহে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলা আকাডেমির
অনুষ্ঠানের বাংলা প্রতিলিপি বিতরণ করা হচ্ছে না কেন? এই প্রশ্ন দাবানলের মতো দর্শকদের
মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। প্রশ্ন করেও উত্তর পাওয়া গেল না। রহস্যের পর্দাখানি সরিয়ে প্রকৃত
কারনের সন্ধান কারো কাছে পাওয়া গেল না। কেবল জানা গেল, মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং নাকি বিতরণ
করতে বারণ করেছেন। অনেক অনুসন্ধান করে জানা গেল মুখ্যমন্ত্রীর লেখা হিন্দি বক্তব্যের
বঙ্গানুবাদে নাকি এমন কিছু ভুল তথ্য ছিল যা হিন্দি ভার্সনে ছিলনা। আর সেই তথ্য সমাবেশটি
নাকি জগন্নাথ মিশ্রের অজান্তে 'প্রেসের ভুতের' কান্ড। ছাপার পর মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ
পরামর্শদাতা বাঙালি আমলাদের কারো চোখে পড়ায় তিনি বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর করলে
মুখ্যমন্ত্রী বিতরণ করতে বারণ করে দেন এবং প্যাকেটগুলি নিজের হেফাজতে রেখে নেন। ঘটনাটি
মুখ্যমন্ত্রীর অভিপ্রেত ছিল না। মুখ্যমন্ত্রীর মনোভাবের কঠোরতা তখনই টের পাওয়া গেল
যখন তিনি ঐ ঘটনার নেপথ্য নায়ককে বাংলা আকাডেমির পরিচালন কমিটি থেকেই বাদ দিয়ে দিলেন।
আকাডেমির পরিচালন কমিটিটি যদিও অধ্যক্ষবিভূতি ভূষণ মুখোপাধ্যায়ের দেওয়া তালিকা অনুসারে
গঠিত হয় তবুও মুখ্যমন্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে একটি নামও স্বীকৃতি লাভের সৌভাগ্য অর্জন
করেনি। এ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর নিরপেক্ষতাকে প্রশংসা করতেই হয়। সাধারণতঃ দেখা যায়
সরকারের সমর্থকদের তুষ্ট করতে এবং নিজস্ব শিবিরে ধরে রাখতে পেশাদার রাজনীতিবিদ্রা চোখবুজে
সরকারী বা আধা সরকারী সংস্থায় বিভিন্ন পদে গুজে দেন যোগ্যতা আছে কিনা বিচার করেন না।
সৌভাগ্যক্রমে বাংলা আকাডেমি সেই ছোঁয়াচ থেকে মুক্ত থেকে গেছে।
বিভূতি ভূষণের দেওয়া তালিকাটি (পরিচালন
সমিতির) বেশ কিছু কাল সরকারী ফাইলে পড়ে ছিল। প্রশাসনিক স্তরে কোন এক অদৃশ্য হাতের প্রভাবে
সেটি মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে চাপা পড়েছিল। হঠাৎ শোনা গেল কংগ্রেসের জনৈক প্রভাবশালী মন্ত্রীর
অদৃশ্য অঙ্গুলি হেলনে ফাইলটি আটকে আছে। তার জায়গায় আর একটি নতুন তালিকাযুক্ত ফাইল/মুখ্যমন্ত্রীর
স্বীকৃতির জন্য রাখার তোড়জোড় চলছে। সেই তালিকায় অধ্যক্ষের পদে বিভূতি বাবুর স্থানে
অন্য কোনো 'মহাপুরুষের' নাম ঢুকে গেছে। আর বাংলা আকাডেমির গঠনের প্রচেষ্টার সঙ্গে যাঁদের
যোগ দীর্ঘদিনের, তাঁদের পরিবর্তে সেই প্রচেষ্টার সঙ্গে প্রায় সম্পর্ক-বিহীন অনেকের
নাম ঢুকে পড়েছে। অমৃতবাজার পত্রিকার সত্ত্বাধারী ও স্বনামধন্য সম্পাদক তুষার কান্তি
ঘোষ এগিয়ে এসে জগন্নাথ মিশ্রকে অনুরোধ করেন বিভূতি বাবুর তালিকাটি অবিলম্বে গ্রহণ করে
যতশীঘ্র সম্ভব বাংলা আকাডেমির শুভারম্ভ করতে। বাঙালি সমিতির প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও
দ্বারভাঙা লবি সম্মিলিত ভাবে জগন্নাথ মিশ্রার সঙ্গে দেখা করে বিভূতিবাবুর দেওয়া তাকিকাটি
অনুমোদন করে যত শীঘ্র সম্ভব কাজ শুরু করতে অনুরোধ করেন। জগন্নাথ মিশ্রা বিভূতি বাবুকে
অসীম শ্রদ্ধা করতেন তাই তিনি সতীর্থ কোন মন্ত্রীর কথায় কর্ণপাত না করে বিভূতি বাবুর
দেওয়া তালিকাটিতে অনুমোদনের শীলমোহর লাগিয়ে দিলেন। বাংলা আকাডেমির সৌভাগ্য যে এটি ব্যক্তিগত
উচ্চাকাঙ্খী এবং রাজনৈতিক উচ্চাশার স্পর্শ থেকে গোড়া থেকেই মুক্ত থেকেছে। তার জন্য
জগন্নাথ মিশ্রা ধন্যবাদের পাত্র।
বর্ণময় উদ্বোধন অনুষ্ঠান: নক্ষত্র সমাবেশ
বিহার বাংলা আকাডেমির উদ্বোধন অনুষ্ঠানটি
বহু নক্ষত্র সমাবেশে সমৃদ্ধহয়ে ঐতিহাসিক তাৎপর্য অর্জন করে। প্রথমে বাঙালি সমিতি স্থির
করে ১লা বৈশাখ উদ্বোধন হবে। কিন্তু সরকারী পর্যায়ে প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র তৈরী না হওয়ায়
দিনটিকে পিছিয়ে দেওয়া হয়। তখন স্থির হয় রবীন্দ্র জন্মোৎসবের পূর্বাহ্নে, ৮ই মে, রবিবার
পাটনার রামমোহন রায় সেমিনারী প্রাঙ্গণে বিকাল ৬ টায় উদ্বোধন করার জন্য মুখ্যমন্ত্রীকে
সমিতির পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হবে। মুখ্যমন্ত্রীর' ইচ্ছানুসারে প্রণব মুখোপাধ্যায়কে
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য রাজী করাতে সমিতির প্রতিনিধিকে দিল্লী পাঠানো
হয়। সমিতির পক্ষ থেকে সঞ্চিতা পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয় উদ্বোধনের দিন সমিতির
কেন্দ্রীয় কার্যকারী সমিতির বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হবে, তাতে বিহারে সমিতির শাখাগুলির
প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকতে বলা হয়। অবশ্য সরকারি সিদ্ধান্তে অনুষ্ঠানের দিন বদল করে
হয় ১২ মে এবং স্থান পরিবর্তন করে করা হয় ভারতীয় নৃত্য কলা মন্দির।
ঐ দিন সন্ধ্যা ৬ টায় বর্ণময় উদ্বোধন অনুষ্ঠানটি
শুরু হয় অতুল প্রসাদের অমর কীর্তি "মোদের গরব মোদের আশা" গানটি দিয়ে। স্বাগত
ভাষণ দেন বিহারের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী করমচাঁদ ভগত। সভাপতিত্ব করেন মুখ্যমন্ত্রী
ডাঃ জগন্নাথ মিশ্র। বিহার সরকারের শিক্ষা সচিব আকাডেমি স্থাপনের ঘোষণা ও নিবেদন করেন।
উদ্বোধন করেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়। ভাষণে তিনি এই প্রচেষ্টাকে
সাধুবাদ জানিয়ে বলেন ভাষা ও সাহিত্যের মাধ্যমে দেশের মধ্যে জাতীয় সংহতির কাজকে ত্বরান্বিত
করতে হবে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে যে উদারতা আছে পরধর্ম ও ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি সহিষ্ণুতার
ঐতিহ্য আছে তাকে স্মরণে রেখে এগিয়ে যেতে হবে। এরপর একে একে বিশিষ্ট অতিথিরা নবগঠিত
আকাডেমির প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে ভাষণ দেন। বিশিষ্ট অতিথিদের মধ্যে ছিলেন ডঃ মজহারুল
ইসলাম (বাংলা দেশের বাংলা আকাডেমির মহাপরিচালক) প্রখ্যাত কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্ত,
ইন্দিরা গান্ধীর প্রতিনিধি ও তাঁর বিত্ত-পরামর্শদাতা প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ডঃ অর্জুন
সেনগুপ্ত, ডাঃ বীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত, ডাঃ বিষ্টু মুখোপাধ্যায়, বিভূতি ভূষণ মুখোপাধ্যায়
প্রমুখ। উপস্থিত ছিলেন প্রবাদ প্রতিম সাহিত্যিক গোপাল হালদার। অর্জুন সেনগুপ্ত তাঁর
ভাষণে বলেন তাঁর পক্ষে এই মঞ্চ থেকে বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত
করা ধৃষ্টতা হবে, কারণ যাঁর হাত ধরে এই বিষয়ে তিনি যৎসামান্য জ্ঞানঅর্জন করতে পেরেছেন,
সেই অসাধারণ জ্ঞানী মানুষ গোপাল হালদার স্বয়ং এখানে উপস্থিত রয়েছেন। ইন্দিরা গান্ধীর
প্রতিনিধির মুখে একথা শুনে সবাই চমৎকৃত হলেন।
সভাপতির ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী বিহারে বাঙালিদের
অবদানের কথা উল্লেখ করে তথ্যসমৃদ্ধ এক ভাষণ দেন। তাঁর ভাষণে বিহার ও বাংলার বহু শতাব্দীব্যাপী
আত্মিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। মিথিলার সঙ্গে সাহিত্য ও জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে
তিনি বাংলার যোগাযোগের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের তথ্য-সমৃদ্ধ বিশ্লেষণ করেন এবং বিহারের
কয়েকজন অগ্রণী বাঙালি সাহিত্যিকদের নামোল্লেখ করেন যেমন বিভূতি ভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
ও মুখোপাধ্যায়, বনফুল, শরৎচন্দ্র, সতীনাথ ভাদুড়ী প্রমুখ। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিহারের
ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করেন। সরকারী কাজে হিন্দি প্রচলনের জন্য এবং হিন্দি স্কুল
স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণের জন্য ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের নাম শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে
স্মরণ করেন। তিনি দ্বারভাঙ্গাকে 'বঙ্গের দ্বার' বলে মনে করেন। বাংলা সাহিত্যে বিহারের
মানুষ, সমাজ ও প্রকৃতির ব্যাপক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে আশা ব্যক্ত করেন বিহার রাজ্য
বাংলা আকাডেমি ভারতের মহান সাংস্কৃতিক একতার স্থায়ী সেতু হয়ে কাজ করবে।
অনুষ্ঠানে একটি নজরুল গীতি (একই বৃন্তে
দুইটি কুসুম) ও রবীন্দ্র সংগীত (সবারে করি আহ্বান) সলিল দাশগুপ্তের পরিচালনায় পাটনার
গীত ভবনের ছাত্র-ছাত্রীরা পরিবেশেন করেন।
প্রণব বাবু সস্ত্রীক এসেছিলেন। জগন্নাথ
মিশ্র যখন জানতে পারলেন শুভ্রা মুখোপাধ্যায় গান জানেন তখন শুভ্রাদেবীকে গান গাইতে অনুরোধ
করলেন এবং শুভ্রাদেবী তাঁর অনুরোধ রক্ষা করে নজরুল ও রবীন্দ্র সংগীত গেয়ে সবাইকে মুগ্ধ
করেন।
বিহার সরকারের মুখ্য-সচিব সুভাষ মুখোপাধ্যায়
ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। এরপর পাটনার 'ঝংকার' সংস্থাটি "পাঁচ শো বছরের বাংলা গান"
শীর্ষক একটি আলেখ্যযুক্ত সংগীতানুষ্ঠান পরিবেশন করে। বৈষ্ণব পদাবলী থেকে শুরু করে,
শ্যামা সংগীত, বাংলা লোকগীতি, পুরাতনী, রবীন্দ্র, নজরুল, অতুল প্রসাদ, রজনীকান্ত, দ্বিজেন্দ্র
লাল থেকে আধুনিক যুগের গণসঙ্গীত-সবই ছিল সেই গীতি আলেখ্যতে। সঙ্গীত পরিচালনা ও বিষয়ভাবনা
তরুণ মিত্র-র এবং গীতি আলেখ্যটি রচনা ও পাঠ করেন পূর্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়।
কিছু স্মরণীয় কাজের সূচীঃ
১. 'রবীন্দ্রনাথ ও জাতীয় সংহতি' বিষয়ে
আলোচনাসভা
স্থান- রবীন্দ্র ভবন, তারিখঃ ১১-১২ আগষ্ট
১৯৮৪। এই সভায় টেগোর ইনস্টিচিউট কলকাতার প্রতিনিধিরা অংশ গ্রহণ করেন। এই আলোচনা সভায়
পরিবেশিত প্রবন্ধগুলির মধ্য থেকে নির্বাচিত প্রবন্ধ নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশ করা হবে-
এই মর্মে ঘোষণা করা হয়।২. ব্রিটিশ কবি ব্র্যায়াণ প্যাটেনকে নিয়ে আকাডেমির ব্যবস্থাপনায়
একটি বহুভাষিক কাব্য আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। তাং ০৪-১২-১৯৮৪
৩. স্যামুয়েল জনসনের দ্বিশত প্রয়াণ বার্ষিকী
উপলক্ষে ইংল্যান্ডের প্রখ্যাত জনসন বিশেষজ্ঞ জিওফ্রে কার্নেলকে আমন্ত্রণ জানিয়ে আলোচনা
সভার আয়োজন করা হয়। তাং ১২-১২-১৯৮৪
৪. বিশ্বভারতীর বাংলার অধ্যাপক ও রবীন্দ্র
চিত্র শিল্পবিশেষজ্ঞ সোমেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহায়তায় স্লাইড-এর সাহায্যে রবীন্দ্রনাথের
আঁকা ছবির প্রদর্শনী এবং সেই সঙ্গে অধ্যাপক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশ্লেষণ মূলক অনবদ্য
ব্যাখ্যান।
৫. বিভূতি ভূষণ মুখোপাধ্যায়ের ৯০ বৎসর
পূর্তি উপলক্ষে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্মিলিত ভাবে তাঁকে সংবর্ধনার আয়োজন করা
হয়। শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তব্য পেশ করেন সর্বশ্রী কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী, ডা০ বিষ্টু
মুখোপাধ্যায়, মন্ত্রী নগেন্দ্র নাথ ঝা, প্রখ্যাত আইনজীবী বসন্ত কুমার বন্দোপাধ্যায়
প্রমুখ। বিভূতিবাবুকে মানপত্র দেওয়া হয়। মানপত্রটি রচনা করেন ও সভায় পাঠ করেন অধ্যাপক
পূর্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়। তাং ২৮-১০-১৯৮৪
৬. রাজসাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙলা বিভাগের
প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান ডা০ মান্নান সৈয়দের বক্ততা। এই সভায় মান্নান সাহেব তাঁর সম্পাদিত
ও বাংলা দেশের বাংলা আকাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত মীর মশারফ হুসেন গ্রন্থাবলী বিহার বাংলা
আকাডেমিকে শুভেচ্ছার নির্দশন হিসেবে প্রদান করেন। তাং ২৫-০৩-১৯৮৫
৭. রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা বিষয়ে আলোচনাসভা;
স্থান-রবীন্দ্র ভবন, তাং ১৮-০৫-১৯৮৬
৮. ইংল্যান্ডে রথেনস্টাইনের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ
তাঁর গীতাঞ্জলির ইংরাজি অনুবাদ পাঠ করে শোনান বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতিতে। পরবর্তী
কালে ঐ গীতাঞ্জলির অনুবাদকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। রবীন্দ্রানুরাগী বিদগ্ধ সমাজ
ঐ দিনটিকে স্মরণ করে প্রতি বছর সারা বিশ্বে কাব্যপাঠ দিবস পালন করে থাকেন। বিহার বাংলা
আকাডেমির উদ্যোগে ৩০শে মে ১৯৮৬ কালিদাস রঙ্গালয়ে রবীন্দ্র সাহিত্য পাঠ দিবস পালন করা
হয়।
৯. ৩০শে জুলাই ১৯৮৬ বিদ্যাসাগরের প্রয়াণ
বার্ষিকীর দিনে বিহার বাংলা আকাডেমির গ্রন্থাগারের উদ্বোধন করা হয়। ঐ অনুষ্ঠানে ঘোষণা
করা হয় এই গ্রন্থাগারে সস্তা, কুরুচিপূর্ণ গল্প উপন্যাস রাখা হবে না। শ্রোতাদের কাছে
উৎকৃষ্ট, উন্নতমানের গ্রন্থের জন্য সুপারিশ করতে আবেদন করা হয়।
১০. বিষ্ণুপ্রভাকর প্রখ্যাত হিন্দি সাহিত্যিক
এবং শরৎচন্দ্রের জীবনী লেখক (আওয়ারা মসিহা)। বাংলা আকাডেমির একটি অনুষ্ঠানে তাঁকে বক্তৃতার
জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেই অনুষ্ঠানে পাটনার হিন্দি সাহিত্যিকদের অনেকেই উপস্থিত
ছিলেন। ইনি তেরো বছর ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, যেখানে শরৎচন্দ্র গিয়েছিলেন সেখানে গিয়ে
তথ্য সংগ্রহ করে বইটি লেখেন।
১১. বিহার বাঙালি সমিতি প্রতি বছর বাংলাদেশের
বাংলাভাষা আন্দোলনকে স্মরণ করে একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি পালন করে থাকে। বাংলা আকাডেমি
গঠিত হবার পর সমিতির সঙ্গে আকাডেমিও প্রতি বছর যুক্তভাবে পালন করেছে।
১২. ১৯৯৩ সালে বাংলা আকাডেমির পক্ষ থেকে
বাংলা, হিন্দি, উর্দু, মৈথিলী, ভোজপুরী কবিদের নিয়ে কবি গোষ্ঠীর আয়োজন করা হয়।
১৩. বিদ্যাসাগরের নামে পাটনার এবং কমাটাঁড়ে
যতগুলি অনুষ্ঠান হয়েছে প্রতিটি অনুষ্ঠানে বাঙালি সমিতির সঙ্গে বাংলা আকাডেমি যুক্ত
থেকেছে, সহযোগিতা করেছে।
১৪. কলকাতার বইমেলায় বাঙালি সমিতির সঙ্গে
আকাডেমি যুক্তভাবে স্টল ভাড়া করে বই বিক্রি করেছে।
১৫. শৈলেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলা ও বাঙালি
বইটির বাংলাদেশে খুব চাহিদা আছে লক্ষ্য করা গেছে।
অধ্যক্ষ এবং নির্দেশক সহ-সচিবের কালানুক্রমিক
সূচী
অধ্যক্ষ: বিভূতি ভূষণ মুখোপাধ্যায়, নির্দেশক-সহ-সচিব
শ্রী প্রণব শংকর মুখোপাধ্যায়
অধ্যক্ষ: বিভূতি ভূষণ মুখোপাধ্যায়, নির্দেশক-সহ-সচিব
শ্রী আভাস কুমার চট্টোপাধ্যায়
অধ্যক্ষ: শ্রী গোপাল হালদার, নির্দেশক-সহ-সচিব-
শ্রী আভাস কুমার চট্টোপাধ্যায়
অধ্যক্ষঃ ডাঃ বীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত, নির্দেশক-সহ-সচিব
অধ্যাপক শৈলেশ কুমার বসু
অধ্যক্ষঃ অধ্যাপক শিবেশ কুমার চট্টোপাধ্যায়,
নির্দেশক-সহ-সচিব অধ্যাপক সন্দীপ মিত্র
অধ্যক্ষ: অধ্যাপক পূর্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়,
নির্দেশক-সহ-সচিব-অধ্যাপক ইন্দীবর মুখোপাধ্যায়
অধ্যক্ষঃ শ্রী কল্যাণ কুমার পোদ্দার, নির্দেশক-সহ-সচিব
অধ্যাপক ইন্দীবর মুখোপাধ্যায়
অধ্যক্ষঃ শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়,
নির্দেশক-সহ-সচিব-অধ্যাপক ইন্দীবর মুখোপাধ্যায়
অধ্যক্ষ: শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়,
নির্দেশক-সহ-সচিব শ্রী বিশ্বজিত সেন
অধ্যক্ষঃ শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়,
নির্দেশক-সহ-সচিব শ্রীমতী রুবী শরণ
অধ্যক্ষ/নির্দেশক-সহ-সচিব শ্রীমতী রুবী
শরণ
অধ্যক্ষ/নির্দেশক-সহ-সচিব শ্রী জিতেন্দ্র
প্রসাদ
অধ্যক্ষঃ ডাঃ (ক্যাপ্টেন) দিলীপ কুমার
সিনহা, নির্দেশক-সহ-সচিব শ্রীমতী বিনীতা ব্যানার্জী
প্রকাশনের তালিকা
১/ কেদার রচনাবলী- ১ম খন্ড (১৯৮৭)
২/ কেদার রচনাবলী ২য় খন্ড (১৯৮৯)
৩/ কেদার রচনাবলী ৩য় খন্ড (১৯৯১)
৪/ আশালতা সিংহের রচনাবলী-আশালতা সিংহ
৫/ বিহারে বাংলা সাহিত্য (ইতিহাস) (১৯৮৯)
ডঃ নন্দদুলাল রায়
৬/ বাংলা ও বাঙালি (প্রবন্ধ সংকলন) শৈলেশ
বন্দোপাধ্যায়
৭/ লোক কথার দিগদিগান্ত- ড০ সুধীর করণ
৮/ বাঢ় ও ঝাড়খন্ড (সংস্কৃতি সমন্বয়) (১৯৯২)
ড০ কল্যাণী মন্ডল
৯/ রবীন্দ্র প্রবাহ (১৯৯০)-৬০ রামবহাল
তেওয়ারি
১০/ রবীন্দ্রনাথ ও জাতীয় সংহতি প্রবন্ধ
সংকলন, প্রকাশ- ১৯৮৬ (১২৫ তম রবীন্দ্র জন্মবর্ষ)
সম্পাদনা: ড০ গুরুচরণ সামন্ত, ড০ ভগবান
প্রসাদ মজুমদার, অধ্যাপক পূর্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়, ড০ সন্তোষ কুমার মজুমদার
১১/ বিহারের সাম্প্রতিক বাংলা কবিতা সংকলন,
ডিসেম্বর: ১৯৯০, সম্পাদনাঃ শ্রী দীপক গোস্বামী, সম্পাদনাঃ দীপক গোস্বামী পূর্ণেন্দু
মুখোপাধ্যায়, জীবনময় দত্ত, জ্যোতির্ময় দাশ
১২/ South Western Bengali Dr. Sudhir
Karan
১৩/ আকাডেমি পত্রিকা
১৪/ আকাডেমি সমাচার
+++++++++++++++++++++++++++++++
শুভেচ্ছা বাণী
আহমদ রফিক
অপরাজিতা, ২০/সি নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
সফল হোক, সার্থক হোক সম্মেলন
বিহার-বাংলা একাডেমীর সম্মেলন নিঃসন্দেহে
মানব-ঐক্যের ছোট একটি প্রতীকী প্রকাশ। একদা বাংলা-বিহার-ওড়িষার স্বশাসিত সমন্বিত রাষ্ট্রিক
যাত্রায় ছিল মৈত্রীর পরিচয় যা এখন ইতিহাস। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে ইতিহাস ঐতিহ্য সৃষ্টিরও
সহায়ক। তেমন বিবেচনায় বিহার-বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার ঘটনাটি অভিনন্দনযোগ্য, আর তা
প্রাচীনতম হলে তো কথাই নেই।
রবীন্দ্রনাথের আমৃত্যু আকাঙ্খা ছিল মানবমৈত্রীর,
তা যে আয়তনেই হোক। সেটা আমাদেরও কাম্য। 'মানুষ' - এ শব্দটি রবীন্দ্রনাথের সমগ্র চৈতন্য
আচ্ছন্ন করে রেখেছিন। তার আমলেও (অবশ্য প্রথম দিকে) বিহার বাংলা সীমানাহীন সৌহার্দ্য
নিয়ে পথ চলেছে। ক্রমে রাজনীতি তার নানা স্বার্থে তাকে আঘাত করেছে, এবং তা যেমন ভারতীয়
উপমহাদেশে তেমনি বিশ্ব জুড়ে। মানবমৈত্রীর চেতনা পরাশক্তি সমূহের চাপে ক্রমশ পিছু হটছে,
এর অগ্রচারী ভূমিকা আমাদের আকাঙ্খিত।
তাই একুশ শতকের আধুনিকতায় বিশ্বের শান্তিকামী,
মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আমাদের একই প্রত্যাশা-বিশ্বমানব তার চৈতন্যের ধারায় এক হোক,
সংঘাত পরিহার করুক, 'মানব' শব্দটিকে সদর্থে গ্রহণ করুক। যুদ্ধ নয়, সংঘাত নয়, সাম্প্রদায়িকতা
নয়, চাই শাস্তি ও মৈত্রী। মনে করতে পারি গৌতম বুদ্ধের একটি অসাধারণ বাণী: 'জগতের সকল
প্রাণী সুখী হোক'। দক্ষ্য করুন 'সকল মানুষই নয়, সকন প্রাণীর সুখ কামনা রয়েছে এ মহৎ
বাণীতে। এ বাণী আমাদের সর্বাধিক কর্ম ও ভাবনা অর্জনের প্রেরণা হোক, সঙ্গী হোক।
সফল হোক, সার্থক হোক বিহার-বাংলা একাডেমীর
সম্মেলন-প্রচেষ্টা। এ শুভেচ্ছাবার্তায় উদ্যোক্তাদের অভিনন্দন জানাই।
আহমদ রফিক
[আহমদ রফিক (জন্ম ১৯২৯), শীর্ষস্থানীয়
ভাষাসৈনিক, ডাক্তার, প্রাবন্ধিক, কবি। স্বাস্থ্য সচেতনতা, বিজ্ঞান-সচেতনতা, লোক-সংস্কৃতি,
সমাজ-রাজনীতি বিষয়ে নানা গ্রন্থের লেখক। পাকিস্তান মেডিক্যাল এসোসিয়েশন জার্নালের
(বাংলাদেশ হওয়ার আগে) প্রাক্তন সম্পাদক ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের প্রাক্তন
সভাপতি। ঢাকায় অবস্থিত রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্রের সংস্থাপক সভাপতি।]
No comments:
Post a Comment