Wednesday, March 26, 2025

শালগ্রাম শিলা

বব্বন ঝা ঘুম থেকে উঠলেন চাঙ্গা মন নিয়ে। ঈষৎ আড়মোড়া ভেঙে উঠে তাড়াতাড়ি তৈরি হতে শুরু করলেন। স্নান সেরে পুজোর জায়গায় ঢুকে ঝোলাটা উল্টে দেখতে শুরু করলেন কী কী আছে আর কী কী নিতে হবে। কোনো কিছু না থাকলে এখনি গঞ্জে ছুটতে হবে কিনতে। এ গ্রামে কি আর পুজোপাঠের জিনিষপত্রের দোকান থাকবে? কয়েকবার ঝাজি ভেবেছেন নিজেই একটা দোকান দেবেন। কিন্তু তাঁকেও তাহলে সেই গঞ্জে গিয়েই দোকান খুলতে হবে। এখানে অত গ্রাহক কোথায়? গ্রামে দোকান খুলতে গেলে দোকানটা কাপড়ের বা আনাজপাতির হতে পারে, হ্যাঁ, পুজোপাঠের জিনিষপত্রও থাকল। তা সে দোকান তো আছেই, ভালোই চলে। সাউজি তো বাড়িটাও দোতলা করে ফেলল। কতবার বলেছে, তুমিই কিছু জিনিষপত্র এনে রাখোনা কেন পুজোর? অবরে সবরে দরকার পড়ে! সাউজি বলে, কে কিনবে? ধুপকাঠি, অগুরুগুগ্‌গুল, গামছা এসব তো রাখিই; বা আগে বললে এনেও দিই। এখন আপনি দেবেন লম্বা ফর্দ। ওসব এনে আপনি ছাড়া কাকে বেচব? আর আপনিই বা কিনবেন কেন? রোজই গঞ্জের রাস্তা হয়ে নানান গ্রামে যাচ্ছেন পুজোপাঠ, শান্তিস্বস্ত্যয়ন করাতে; গঞ্জের দোকানে সস্তাও পড়ে আপনার।

ধ্যাততেরি! শালগ্রাম শিলাটা কই? তখন থেকে হাতড়ে যাচ্ছেন বব্বন ঝা, কিছুতেই পাচ্ছেন না। হঠাত মনে পড়ল, আরে ওটা তো মধুরেশ মিশির নিয়ে গেছে পরশু। যাঃ! মধুরেশ মিশিরের গ্রাম দক্ষিণ দিকে তিন কোশ, গঞ্জ উত্তর দিকে এক কোশ আর এখন ঝাজিকে যেতে হবে পূর্ব দিকে সাড়ে তিন কোশ। তাহলে? কয়েকদিন আগের বড় ভূমিকম্পে রাস্তাঘাটও ভাঙা অনেক জায়গায়। বাড়িঘরও অনেক পড়েছে, তবে এদিকটায় কারোর মারা যাওয়ার খবর শোনা যায় নি। গঞ্জের দিকে নদীর ওপরের পুলিয়াটা ভাঙে নি, কিন্তু দুপাশে রাস্তা ফেটে গেছে ভালো মত আর তাতে জল ঢুকে পড়েছে।

ঝাজির আজ সকালের আনন্দের কারণটাও তো ভূমিকম্প! সোনলডিহা গ্রাম থেকে ডাক এসেছে বাবু সাহেব কুঞ্জবিহারি সিং যজ্ঞ করাবেন। পৃথিবী মাতা ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছেন, মানুষের পাপের ভার এত বেড়ে গেছে তাঁর বুকে! তাই তো ভূমিকম্প! মাকে শান্ত করার জন্য যজ্ঞ হবে। বিশাল ব্যাপার। বব্বন ঝার ডাক পড়েছে তাই। ভালো দানদক্ষিণাও জুটবে।

কী করা যায়? ধুর! কে দেখতে যাচ্ছে শালগ্রাম শিলা। বব্বন ঝা একটু পরিষ্কার মাটি খুঁড়ে নিলেন উঠোন থেকে। জলে ভালো করে মেখে ছোট্ট গোল পাকিয়ে একটু চ্যাপ্টা করে রেখে দিলেন শুকোতে। ততক্ষণ ঘরের পুজোটা সেরে নেওয়া যাক।

গিন্নি খাবার বেড়েছিলেন। খেতে বসার আগে মাটির গোল ঢেলাটা নিয়ে রেখে দিলেন রান্নাঘরের তোলা উনুনের নিচে, ছাই পড়ার জায়গাটায়। খাওয়া সেরে, মুখ ধুয়ে দেখলেন, এই তো বাঃ শুকিয়ে গেছে। বিশেষ চিড় ধরে নি। এবার উনুনের আঁচেও কিছুক্ষণ ধরলেন চিমটে দিয়ে। তারপর নিয়ে রাখলেন বারান্দার কোনে। গিন্নির অবাক, ভীত চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ওভাবে দেখার কিছু নেই। কথায় বলে বিশ্বাসই সবকিছু। বিশ্বাস করলে এটাই শালগ্রাম শিলা। বুঝেছ?

দেয়ালে কাঠের তাকে ঘুণ লেগেছিল বলে গঞ্জ থেকে ওষুধ মেশানো ব্ল্যাক জাপান কালো রঙ কিনে এনেছিলেন কিছুদিন আগে। খুলে দেখলেন ভালোই আছে, শুকোয় নি। মাটির পোড়া ঢেলাটা ওতে ডুবিয়ে চিমটে দিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভালো করে রাঙিয়ে নিলেন। তারপর শুকোতে দিলেন রোদ্দুরে। একঘন্টা সময় আছে এখনো বেরুতে।

 

সোনালডিহা গ্রামে যাওয়ার ঘুরপথটা ছেড়ে ক্ষেত ধরে এগুচ্ছিলেন ঝাজি। শিলার রঙ যাতে অন্যকিছুতে না লাগে তাই হাতেই ধরে ছিলেন। গ্রামের সীমানায় কয়েকজন দূর থেকে তাঁকে দেখেও ফেলল। প্রণাম জানাল দূর থেকে। তাদের প্রণাম দেখতে গিয়ে খেয়াল করলেন না ঢোকার মুখেই একটা বড় ফাটল করে দিয়ে গেছে ভূমিকম্প। ধড়াম করে তাতে পড়ে গেলেন পোঁটলাপুঁটলি সুদ্ধু। হাতের শালগ্রাম শিলাটা হাতেই ছিল শক্ত ভাবে ধরা। কিন্তু হাতটা গিয়ে পড়ল একটা পুরোনো পাঁচিলের টুকরোয়। কোনো এক সময়ে মাটিতে তলিয়ে গিয়েছিল। দুভাগে ভাগ হয়ে গেল শালগ্রাম। ভিতরে মাটি দেখা যাচ্ছিল।

বিশেষ ব্যথা লাগে নি ঝাজির। বলতে গেলে হাতেও লাগে নি বিশেষ, চোটটা শালগ্রামের ওপর দিয়েই গিয়েছিল। একটু ফেটে টাটাচ্ছিল ডান হাতের তিনটে আঙুল। তিনচারজন যুবক লাফিয়ে নেমে ঝাজিকে ওঠাল, দাঁড় করাল। গা হাত পা থেকে নিজেদের গামছা দিয়ে ধুলো ঝেড়ে জিজ্ঞেস করল, লাগে নি তো? বরং একটু বসে নিন, আরাম পাবেন।

ঝাজি ভাবছিলেন, কোন জাতের ছেলেগুলো কে জানে। নাঃ, ছোট জাতের হলে গায়ে হাত দিতে সাহসই করত না। আর যদি দিয়েই থাকে, কী আর করা যাবে। মন্দ তো আর কিছু করে নি। সাহায্য করেছে। কিছু বলাও যাবে না।

-                যাচ্ছিলাম কুঞ্জবিহারিজির বাড়িতে। দেরি হয়ে গেছে বলে ক্ষেতের রাস্তা ধরতে হল।

-                হ্যাঁ, ভালোই করেছেন। আমরাও তো যাব নেমন্তন্ন খেতে।

-                তা তোমরা কোন ঘরের ছেলে?

-                কুশেশ্বর রায়জি

-                আরে হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওনার বাড়িতে তো আমি বিয়ে করিয়েছি গত বছর (মনে মনে শান্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, যাক, ভুমিহার)।

 

কিন্তু সে হলে কী হবে। যুবকদের চোখ কি আর ফাঁকি দেওয়া যায়? সোজা ওই ভাঙা শিলার দিকেই দেখিয়ে বলে উঠল কজন, এ কী হল পন্ডিতজি? শালগ্রাম শিলা ভেঙে গেল? নাকি পাথরের হয়, বজ্রের মত! আর ভিতরে কী? মেটে মেটে? ঝাজি পরিষ্কার দেখতে পেলেন ওদের মুখগুলো দমকা অট্টহাসিতে ফাটবো ফাটবো করেছে। এক্ষুণি কিছু করতে হবে, নইলে সব সম্মান মাটিতে মিশে যাবে। গাঁছাড়া হতে হবে হয়ত। পুরোহিতগিরি তো খতম!

ভাঙা শিলার দুটো টুকরো হাতে নিয়ে হঠাত হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলেন ঝাজি। ছেলেগুলো হতবাক। হে নারায়ণ! ভগবান! এত কষ্ট পেলে মানুষের দুঃখে? তোমারই তো রূপ এই শিলা! শিলা ফেটে গেল? তুমি জানিয়ে দিলে যে তোমার হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে প্রকৃতির এই বিপর্যয়ে, মানুষের দুর্গতিতে। তোমার হৃদয়ে তো লক্ষ্মী, আর লক্ষ্মী এই পৃথিবী। তাই তোমার হৃদয়ে লক্ষ্মীর রূপ!

শিগগির যে কটা সংস্কৃত শ্লোক-টোক মনে পড়ছিল আওড়াতে শুরু করলেন। আড়চোখে দেখলেন ছেলেগুলোর চোখ থেকে হাসি মুছে সম্ভ্রম ফুটে উঠেছে।

আর আমি যজ্ঞে যাব না। আমার নারায়ণ কষ্টে আছেন, আমি এখন যজ্ঞে গিয়ে বসতে পারি? কান্নাটা বজায় রেখে ঝাজি পোঁটলাপুঁটলি টাইট করে বেঁধে ফিরতি পথ ধরলেন।

ততক্ষণে আরো কিছু মানুষ এসে পড়েছিল গ্রাম থেকে। তারা গিয়ে জোর করে ফিরিয়ে আনল ঝাজিকে। আপনি শুধু নিজেরটুকুই দেখবেন? আর যজ্ঞ না হলে যে গ্রামের ক্ষতি হবে! সেটা দেখবেন না?

-                কিন্তু শালগ্রাম শিলাই যে ভেঙে গেল।

-                আপনারাই তো বোঝান যে মনের বিশ্বাসটাই সব। ওই শালগ্রাম শিলা নিয়েই পুজোয় বসুন। চলুন! চলুন! ব্রাহ্মণ দেবতা ফিরে গেলে গ্রামের পাপ হবে।

 

একটা অগত্যার ভাব দেখিয়ে ঝাজি এগোলেন গ্রামের দিকে। শরীরের কষ্ট বোঝাতে ওই তিনচারটে ছেলের মধ্যে যেটা সবচেয়ে দুষ্টু মুখের ছিল, তার কাঁধে হাত রাখলেন, একটু নিয়ে চল বাবা!

 

No comments:

Post a Comment