Thursday, August 28, 2025

রক্তদান

কখনো ছোটো, সহজ ব্যাপারগুলোও এত জটিল হয়ে ওঠে। মনের ভেতরকার নানারকম সন্দেহ যেতেই চায় না।

সব্জিবাগের রাস্তা পেরিয়ে লঙ্গরটুলির মুখে পড়েছে কিশোর। মার্চের রাত, তাই সাইকেল নিয়ে হেঁটে যেতে কোনো কষ্ট হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু দুহাত দিয়ে হ্যান্ডেলটা ধরতে পারছে না। ডানহাত দিয়েও না, বাঁহাত দিয়ে ধরে হাঁটছে। ডান হাতে শক্ত করে ধরে ঝুলিয়ে রেখেছে রক্তের থলেটা।

তার নিজেরই রক্ত। কাজেই বেশ একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতিও হচ্ছে। যতদূর অব্দি রাস্তা এবড়ো খেবড়ো, ততদূর হেঁটে যাবে। যাতে পড়ে না যায় বা কোথাও খোঁচা না লাগে। রাস্তা মসৃণ হলে, ফাঁকা আর সোজা হলে নাহয় সাইকেলে চাপবে, যাতে বাঁহাতে হ্যান্ডেল ধরে চালিয়ে যাওয়া যেতে পারে। আবার নামবে লেভেলক্রসিংএর কাছে।

রাস্তাটাও তো খুব কম নয়। পিএমসিএইচকে গঙ্গার তীর ধরলে কঙ্কড়বাগের পুরোনো শেষ প্রান্ত, কিশোরের মনে পড়ে গেল ছোটোবেলায় স্কুলে পড়াঃ পাটনা শহর লম্বায় আট মাইল, চওড়ায় দুই মাইল। অর্থাৎ মোটামুটি দু’মাইল, আঁকাবাঁকা পথে একটু বেশিই হবে। রাজেন্দ্রনগর স্টেডিয়াম হয়ে, বাহাদুরপুর গুমটি পেরিয়ে, মুন্নাচক পেরিয়ে কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়। তার পিছনে খানিকটা আরো গিয়ে সেই মেটারনিটি হাসপাতাল। বৌ ভর্তি আছে। সিজারিয়ান হবে, দ্বিতীয় সিজারিয়ান, আগেরটাও সিজারিয়ান ছিল। তার আগে তাকে রক্ত দিতে হবে।

কম্পাউন্ডার বলেছিল ‘বি-পজিটিভ’, এক বোতল, মানে ২০০ এমএল জোগাড় করুন। ডোনার আছে? তাহলে নিয়ে যান পিএমসিএইচএ। তিওয়ারিজি আছেন, আমার নাম বলবেন, তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করে দেবেন।

-       আচ্ছা শর্মাজি, আমারও তো বি-পজিটিভ, আমি দিতে পারি? আমার হেমোগ্লোবিন পার্সেন্টেজও ভালো।

-       হ্যাঁ, কেন দিতে পারবেন না?

-       কোনো প্রব্লেম হবে না তো? মানে শুনেছি যে একই পরিবারের মধ্যে রক্ত দেওয়া-নেওয়া হলে একটা অসুখ হয় সেটা ঐ রক্তেরই … কী যেন বলে কনস্যাঙ্গুইন ব্লাড …

-       সেসব আমি জানি না, ঐ ব্লাডব্যাঙ্কেই জিজ্ঞেস করে নেবেন।

ব্লাড ব্যাঙ্কে তিওয়ারিজিকে জিজ্ঞেস করল। তিওয়ারিজি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “আপনি আর আপনার বৌ কি একই পরিবারের, জ্ঞাতিগুষ্ঠি, একই ব্লাডলাইন …?”

-       না। একদম না।

-       তাহলে? চিন্তা করছেন কেন? কী, দেবেন তো?

-       হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।

-       এখানে সময় লাগবে। চলুন।

পিএমসিএইচ থেকে বেরিয়ে সব্জিবাগের কাছাকাছি, তিওয়ারিজির পরিচিত একটা প্রাইভেট

ব্লাডব্যাঙ্কে যাওয়া হল। সাইকেলটা নিচে তালা লাগিয়ে রেখে দোতলায় উঠে রক্ত দিল।

-       পাঁচ মিনিট রেস্ট নিয়ে নিন। আর বাইরে গিয়ে চা-বিস্কুট অন্ততঃ খেয়ে নেবেন।

রক্ত পরীক্ষা, বার করে দেওয়ার কাজ আর পাউচের দাম চুকিয়ে নিচে নেমে দেখল চায়ের কোনো দোকানই খোলা নেই আশেপাশে।

 

তারপর হাঁটতে হাঁটতে এই লঙ্গরটোলি অব্দি চলে এসেছে। কটা বাজে? হাতে ঘড়ি নেই। সাড়ে আটটা-পৌনে নটা হবে। তিওয়ারিজি নিশ্চিন্ত করলেও মনের ভিতরটা খচখচ করছে। কিছু ভুল করছে না তো? রত্নার বডি এ্যাক্সেপ্ট করবে তো? আর বাচ্চাটা?

স্টেডিয়াম পেরিয়ে যখন বাহাদুরপুরে পৌঁছোলো, দেখলো গুমটিটা খোলা, অনেকক্ষণ অন্ধকারের পর, সোডিয়াম ভেপারের আলোয় ভরা একটা চত্বর। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ … পাঁচটা রেললাইন। বন্ধ থাকলে দাঁড়িয়ে থাকতে হত। এক হাতে তো আর সাইকেল মাথায় উঠিয়ে ঘোরানো গেটটা পার হওয়া যেত না। রেললাইনগুলো পেরিয়ে শেষ সোডিয়াম-ভেপারটার নিচে গিয়ে দাঁড়ালো এক মিনিট। … ‘নাঃ, সিগরেট ধরানো ঠিক হবে না। আগুনের ফুলকি গিয়ে যদি পড়ে থলেটায়? অন্ধকারে খেয়াল করেনি। এখন তীব্র সোনালি আলোয় দেখল, ভিতরের পাউচ আর তার বাইরের থলে ভেদ করে রক্তের রঙটা বোঝা যাচ্ছে, কালচে লাল!   

এসব দিকে শহর এখনও ঠিক মত তৈরিই হয় নি। কোথাও জমজমাট কোনো চৌরাস্তা, রাত অব্দি খোলা চায়ের দোকান, কিচ্ছু নেই। অথচ জাংশনের কাছে গেলে, বা ঐ পি.এম.সি.এইচ.এরই সার্জিকালের সামনের গলিতে তো রাতভর চায়ের দোকান খোলা থাকে।

যাক, প্রায় পৌঁছেই তো গেছে। আর কোথাও দাঁড়াবারও দরকার নেই। ডানহাতে ঝোলানো থলেটা কখনো কখনো ঘুরে গিয়ে আঙুলের উল্টো দিকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। নিজেরই রক্ত, প্রথমদিকে যতটা গরম লাগছিল, এখন আর লাগছে না।

 

হাসপাতালে পৌঁছে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল কিশোর। কম্পাউন্ডারসাহেবের হাতে থলেটা দিয়ে নিশ্চিন্ত হল। বাইরে বসে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিল। অনেকক্ষণ, কে জানে কতক্ষণ, পরে ঘুম ভাঙল। নার্স ডাকছে। “অভিনন্দন, মেয়ে হয়েছে। হ্যাঁ, একদম ভালো আছে। একটু আন্ডারওয়েট। মা-ও ভালো আছে। আসুন!”

ভয়ে ভয়ে বেডের কাছে গেল কিশোর। রক্তের কোনো দোষ যায় নি তো শরীরে? এনাস্থেসিয়ার প্রভাবে ঝিমিয়ে আছে রত্না। বাচ্চাটা পাশে, তোয়ালে লপটানো। ঘুমিয়ে আছে। কোলে নেওয়ার সাহস হল না কিশোরের। একটা চেয়ার টেনে বসে চেয়ে রইল।

ভোরের দিকে বৌয়ের চোখ খুলল। কাছে গিয়ে দেখল ফর্সা মুখটা কালচে হয়ে আছে। কপালে ছোঁয়ালো হাতের উল্টোপিঠ। নাঃ, গরম নয়, বরং ঠাণ্ডা, কিন্তু ঘামে ভেজা। গালে, গলায় ছুঁইয়ে সরিয়ে নিল হাতটা। চাদরের ওপর এলিয়ে পড়ে থাকা ডান হাতের আঙুলগুলো ধরল মুঠোয়। ঠাণ্ডা নয়। পায়ের পাতা দুটো চাদরের বাইরে বেরিয়ে ছিল, চাদরের প্রান্তটা টেনে ঢুকিয়ে দিল ভিতরে।

“কী হয়েছে?” রত্না ক্ষীণ গলায় প্রশ্ন করল।

-       না, কিছু না। তুমি ঠিক আছো?

-       হ্যাঁ! কী হবে আমার? 

-       কেমন কালো হয়ে গেছে তোমার মুখটা! জ্বর জ্বর লাগছে না তো?

-       ও, ঐ জন্য ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছ, পায়ের পাতা ঢেকে দিচ্ছ?

-       না, মানে …

মাথার ওপরে খাটের লোহার রেলিং ধরে থাকা কিশোরের বাঁহাতটা ধরে টেনে নিজের গালের নিচে চেপে ধরল রত্না, “কী হয়েছে বলো তো? কিছু ভাবছ?” বলে হাতটায় টান দিল। রত্নার চোখের দিকে তাকিয়ে ডাকটা বুঝল কিশোর। নিজের মুখের বাঁপাশটা নামিয়ে এনে আলতো করে চাপ দিল রত্নার মাথার ওপর। ঘরের দরজা খোলা, এর বেশি জড়িয়ে ধরা যাবে না ভাবতে ভাবতেও ডানহাতটা নিজে থেকেই রত্নার কাঁধের নিচে চলে গেল। আঃ, মনটা হাল্কা হচ্ছে ধীরে ধীরে। বৌয়ের শরীরের উষ্ণতা শুশ্রুষার মত ছড়িয়ে পড়ছে।

-       কিছু ভাবছি না। তোমার মুখটা কালো লাগল তাই ভাবছিলাম হয়তো জ্বর আছে শরীরে। বা …

হাসিটা কানের কাছে ফিসফিসিয়ে উঠল, “জ্বর-টর নয়। তোমার রক্ত গেছে যে শরীরে। তুমি তো কালো! যেদিন প্রথম এসেছিলে আমাদের বাড়িতে, ছোটো বলেছিল, ঐ দ্যাখ দিদি, আবলুস কাঠের ছোটো আলমারি আসছে একটা!”

 ২১.৮.২৫


মৃদুলা

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে অন্ততঃ একটিবার তার সাথে ঘর বাঁধার কথা ভেবেছিলাম। সেদিন দুপুরে, দিনেশবাবুর সঙ্গে যখন তার জিনিষপত্র ছড়ানো ঘরটায় প্রথম গিয়েছি, তার তিনটে সন্তান ঘরে খেলছিল। স্বামী ব্যাঙ্কের যে গ্রামীণ শাখায় কাজ করতেন, স্বাভাবিক ভাবে সেখানেই সে ছিল এতদিন। কেননা স্বামীর মৃত্যুর পর বকেয়া টাকা পয়সা পাওয়া, অনুকম্পামূলক নিয়োগের জন্য আবেদন, অপেক্ষা; … অন্য কোথাও চলে গেলেও বার বার আসতেই হয় শাখায়। তারপর ছেলেমেয়েদের পড়াশোনাও থাকে। কোথায় শেষ অব্দি গিয়ে থাকতে হবে নিশ্চিত না হয়ে হুট করে স্কুল ছাড়ানো যায় না।

মৃদুলাও সেভাবেই প্রায় দেড় বছর কোশি অঞ্চলের সেই গঞ্জ-শহরে, স্বামীর ভাড়া নেওয়া ঘরদুটোয় থেকে অবশেষে যখন নিশ্চিত খবর পেল যে তার চাকরি হয়ে গেছে, রাজধানীতে বড় একটা শাখায় যোগ দিতে হবে, তখন সেখানকার পাট চুকিয়ে চলে এল। তার পৈত্রিক পরিবারে বিশেষ দেখাশোনা করার কেউ ছিল না, স্বামীর দিকের পরিবারেও – যেহেতু চাকরিটা স্ত্রীই পাবে, ভাইয়েরা পাবে না – মৃতের বিধবার বাঁচামরা নিয়ে কারোর বিশেষ দুশ্চিন্তা ছিল না। তাছাড়া দিনেশবাবু তাদেরই জাতের আস্থাভাজন মানুষ, সেই ব্যাঙ্কেই ইউনিয়নের নেতা যেখানে চাকরি করার, মৃত স্বামীরও বন্ধুস্থানীয়, কাজেই সেভাবে সঙ্গে থেকে সাহায্য করার মতো অন্য কারোর প্রয়োজনও ছিল না।

এহেন পরিস্থিতিতে দিনেশবাবু আমাকে যে কেন সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেটাই আমি আজ অব্দি বুঝতে পারি নি। অবশ্য পারি নি বললে মিথ্যে বলা হবে, কেননা নেতা হই আর না হই, সবার নজরে আমিও একজন আস্থাভাজন কর্মী হয়ে উঠেছিলাম – অবশ্যই জাতের না; ইউনিয়নের। আর যেটা বিহারে হয়, যেখানে ‘আস্থাভাজন’ তায় আবার, জাতের সঙ্গে জাতের কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট এসে পড়ে, সেখানে বাঙালি প্রথম পছন্দ হয়ে ওঠে। দিনেশবাবু ইউনিয়নের নেতা হিসেবে আমার চেয়ে বেশি যাকে নিতে পারতেন, সে তার সমস্ত কর্মতৎপরতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা সত্ত্বেও দিনেশবাবুর জাতের, অর্থাৎ বানিয়া ছিল না। তার ওপর আবার বানিয়া পশ্চাৎপদ জাত, আর সে অগড়ি, তাও আবার কুখ্যাত, লালা।

কিন্তু যেটা ভাবায় আজও, দিনেশবাবুর মনেও এমন কোনো সম্ভাবনা উঁকি দেয় নি তো, যে অবিবাহিত যুবক, অল্পবয়সী বিধবার সঙ্গে ঘর বাঁধলে ক্ষতি কী? জাত-ফাত আজকাল আর কে অত দেখে? মেয়েটা নির্ভরযোগ্য আশ্রয় পেয়ে যাবে! …

জানি না। দিনেশবাবুও আর নেই, মৃদুলাও আর নেই। কিন্তু এটা ঠিক যে সারা জীবন, মানে যদ্দিন ও বেঁচে ছিল, আমাকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু মনে করত। দাঁত দেখাতে যাবে, আমারই স্কুটারের পিছনে বসে। আমিই ওকে দেখিয়ে নিয়ে আসব। জমি কিনল বাড়ি করার জন্য, আগে আমাকে গিয়ে দেখে আসতে হল। … ছেলে মেয়েরা বড় হয়েছে, ওদের পড়াশুনো, চাকরি, বিয়ে সব ও নিজের হাতে করেছে একে একে। কিন্তু প্রত্যেকটা ধাপে আমার ডাক পড়েছে। ও অমুক জায়গায় পড়তে যাচ্ছে – যাবে তো? ওর ওই চাকরি থেকে ডাক এসেছে – যাবে তো? মেয়ের বিয়ের কার্ডটা দেখে যান না – ঠিক আছে কিনা!। তখন আর ওর ব্রাঞ্চটায় কাজও করি না, দূরে ট্রান্সফার হয়ে গেছে, তবু টেলিফোনে ডাক পড়ত, আর আমিও এক ডাকে চলেও যেতাম। এমনকি ছেলে মেয়েকে বলে রেখেছিল – ‘আমি না থাকি, কোনো প্রয়োজন হলে মানসবাবুকে ডাকবি’।

মৃদুলা আর নেই, সারল্যে ভরা ওর চোখদুটো, ভরা কালো মুখ আর ঠোঁট … ভীষণভাবে মনে পড়ে। ঠিক সেভাবে ওর শরীরের দিকে কখনো তাকাতামও না, যেন ওর বাৎসল্যে ভাগ পাওয়াটাই আমার পাওয়া হতো আর বুকের খুব কাছে পেতাম ওর ছোট্টো নিঃশ্বাসগুলো। কখনো কোনো কষ্টের কথায় টস টস করে জল পড়তো চোখ থেকে। না সিনেমার মতো রুমাল বার করে দিই নি, বুকেও টানিনি কিন্তু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতাম শাড়ির খুঁটটা চাপা দিচ্ছে চোখে।

ভাগ্যিস ওর মৃত্যুর দিন ছিলাম না শহরে।    

১.৫.২০২৫

ভিডিও

সকাল সকাল সুমন্ত ফোন করল রাজীবকে।

-       কী করছিস?

-       বাণী রান্না করছে সকাল থেকে আর আমি মোবাইলে খারাপ ভিডিও দেখছি!

“হ্যাঁ, সুমন্তদা”, রান্নার দিক থেকে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে, ফোনের ওপারের মানুষটাকে শোনাবার জন্য জোরে বলে উঠল বাণী, “আমাকে তো ঝুলিয়ে দিয়েছে দুটো বাচ্চা বার করে”, ফোনে মুখ এনে বাকিটা শোনাল, “এখন ওই ভিডিও দেখে সুখ পাচ্ছে!”

ফোনটা কেটে দিল রাজীব, “কিছু মুখে আটকায়না না? আর ঝুলিয়ে দিয়েছ, ঝুলিয়ে দিয়েছ কী বলো? কতোবার তো বলেছি সন্ধ্যের দিকে গিয়ে একটু জিম করো। পাশেই আছে। বেশি পয়সাও নেয় না।”

-       আমি চললাম। কয়েকটা জিনিষ কিনবো। তুমি যতক্ষণে উঠবে বাদলদা দোকান বন্ধ করে চলে যাবে বাড়ি। ভাত চাপিয়ে দিয়েছি, দুটো সিটি মারলে বন্ধ করে দিও।

-       তুমি সুমন্তদাকে যেভাবে বললে …

রাজীবের কন্ঠস্বরটা একটু ক্ষুব্ধ শোনালো। কিন্তু বাণী একই রকম ফাজিল মেজাজে বললঃ

-       তোমার করতে আটকায় নি আর এখন আমার বলতে আটকাবে?

এবার সত্যিই কালো হয়ে উঠল রাজীবের মুখ। ধাক্কাটা সামলে নিয়ে বললঃ

-       তুমি বলতে চাও তুমি চাও নি? আমি জোর করেছি? ম্যারিটাল রেপ করেছি তোমায়?

-       আরে ধ্যাৎ! কোথায় নিয়ে গেলে কথাটা? আমি বাচ্চার কথা বলছি।

-       বাচ্চা তুমি চাও নি?

-       তাতেও তোমার কোনো দোষ হয়তো ছিল না। বিয়ে হয়েছে, দুজনেই সুখ করেছি। বাচ্চা হয়েছে। তবে হ্যাঁ, আজকাল যেমন সবাই একটু প্ল্যানিং করে,  কখন হলে ভালো হয়, সেসব মাথাতেই ছিল না।

-       থাকলে?

-       হয়তো দু-তিন বছর সময় নিতাম!

-       বলো নি কেন?

-       বললাম তো, আমি ভাবিই নি। তুমিও ভাবোনি। দোষ নিচ্ছ কেন ঘাড়ে? সিম্পলি আমার বলার উদ্দেশ্য যে দু-তিন বছর আমরা একটু নিশ্চিন্তে আনন্দ করতে পারতাম! সেই বয়সটা তো আর ফিরবে না। যাক, আসছি আমি।

-       তবু, সুমন্তকে ওভাবে বলা …

-       সুমন্তদার সঙ্গে কথা বলে যে আরাম পাওয়া যায় সে তো এই জন্যই। যা ইচ্ছে বলা যায়।

বাণী দরজাটা আবজে বেরিয়ে গেল।

এই সময় বাণী একাই থাকে। আড়াইটে নাগাদ বেরোয়, বাচ্চাদের স্কুলবাসটা আসার সময় হলে। আজ রাজীবের ছুটি। তাই বাড়িতে।

 

সন্ধ্যের দিকে সুমন্ত এল। হাতে একটা পলিথিন ব্যাগে তিনটে খাবারের বাক্সো।

-       ওগুলো আবার কী?

-       তোর জন্য তো নয়! বাণী আর বাচ্চাদের জন্য।

-       কী?

-       পাপড়ি চাট। ওদের ভালো লাগে। এ্যাই দুজন! কোথায় তোরা? এগুলো নিয়ে যা তো! মাকে দে।

দুই ছেলে মেয়ে এসে, নিয়ে লাফাতে লাফাতে চলে গেল।     

-       এবার বল্‌। একটা ছুটির দিন ঘরে বসেই কাটিয়ে দিলি?

-       কোথায় যেতাম? বাচ্চাদের তো স্কুল ছিল।

-       ওদের স্কুলে পাঠিয়ে দু’ঘন্টার জন্য কোথাও ঘুরে আসতিস।

বাণী সেই তিনটে বাক্সোসুদ্ধু পলিথিন আর দুটো প্লেট নিয়ে ঘরে ঢুকল।

-       হ্যাঁ, তোর প্রস্তাবটা বাণীর খুব ভালো লাগত। ওর খুব বেড়ানোর শখ (একটু তাকিয়ে, সময় নিয়ে) … ছিল।

-       ছিল কেন? এখনো আছে। তবে এখন নয়। আর বাচ্চাদের না নিয়ে দুজনে তো একেবারেই নয়।

-       কেন তুমিই তো দুপুরে প্ল্যানিংএর কথা বলছিলে।

-       (বাণী তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো) বলছি। খাবারটা দিয়ে নিই।

-       তোমাদের তিনজনের জন্যই তো এনেছিলাম!

-       সে এনেছিলেন। আমি তো পাঁচ ভাগ না করে খাবো না।

-       খুব কম দিও আমায়।

-       কমই দিচ্ছি। মিকি, ঝিল! তোদের দুটো নিয়ে যা। হ্যাঁ, এবার বলো, কী বলছিলে। (বাচ্চাদুটো এসে নিয়ে যাওয়ার পর) প্ল্যানিং! … অবশ্যই। যে কোনো কাজ প্ল্যানমাফিক করলে ভালো হয়। মা হওয়া তো একটা বিরাট কিছু নয়, পরে হতাম। কিন্তু হয়েছি। হয়েছি যখন, মা-ই থাকব।

সুমন্তর মুখটা একটু গম্ভীর দেখালো।

-       সরি, আমি ঢুকব কথায়?

-       ঢুকবে না তো খালি শুনে মজা নেবে নাকি? বলো।

-       তুমি যে বললে ‘মা হওয়া বিরাট কিছু নয়’, এর মানে কী? কতো মেয়ে মা হতে পারে না, কষ্ট হয়, চিকিৎসা করাতে গিয়ে ভুল চিকিৎসার শিকারও হয় …

-       সেরকম আমার সঙ্গে হলে আমিও তেমনই কষ্ট পেতাম, আমিও চিকিৎসার চেষ্টা করতাম। আমার সঙ্গেও ভুল চিকিৎসা হতে পারত। কিন্তু ঐ যে তোমার আশ্চর্য লাগল একটা মেয়ে কেন এমন কথা বলছে, ওর মধ্যেই আছে তোমার সমস্যা।

-       আমার সমস্যা?

-       হ্যাঁ, মা হওয়াটাকে আইডলাইজ করে রেখেছ! … একটা প্রজাতিগত বাস্তবতা। নারীরা মা হয়, পুরুষেরা পিতা হয়। মানুষের বংশবৃদ্ধি হয়। সেই প্রসেসে আমরা দুজনে একটু দেরিতে ঢুকতে পারতাম! এটুকুই তো কথা! সময় মতো বুঝি নি। বুঝি নি যখন, তার দায় তো ওদের (বাচ্চাদের দেখিয়ে) নয়? যখন আমরা মা, বাবা হয়েই গেছি, ওদেরকে নিয়েই এখন যা কিছু ভাবব! কেন আমার একটা ছোট্টো কথা নিয়ে সকাল থেকে তোমার বন্ধু ভুল বুঝছে জানি না।

-       তুমিই তো বলছ ওরা আছে বলে তোমরা আলাদা করে একটু আনন্দ করবে না, কোথাও বেড়াতে যাবে না।

-       সেটা সত্যি। ওরা বড়ো হোক। নিজেরা একা একা ঘুরে বেড়াতে শিখুক। তখন আমরাও যাব।

-       তখন তো এই দিনগুলো আর থাকবে না।

-       তাহলে এই দিনগুলো, মানে যৌবনের দিনগুলোর, যেটুকু বাকি আছে, আলাদা একটা মাধুর্য আছে, তাই তো বলছ? তার আনন্দ উপভোগ করতে হলে সন্তানদের আড়ালেই করতে হবে।

-       হ্যাঁ। কিছুটা তাই।

-       আমিও তো তাই বলছি। আগেই সেই মাধুর্যটা আরেকটু উপভোগ করে নিতাম দু-তিন বছর। প্রথম বছরেই বাস্তবে পরীক্ষা করে নেওয়ার কী দরকার ছিল যে মেয়েটা মা হতে পারবে কিনা, বা ছেলেটা বাবা হতে পারবে কিনা? অনেক কিছুই তো তখনো পাওয়া যেত! … আর তেমন হলে দুপক্ষই মেডিক্যাল পরীক্ষা করিয়ে রিপোর্ট অদল বদল করে নিতাম। আজকাল তো শুনেছি তাও হচ্ছে।

-       তা, সেটা কি আমার একার দোষ?

-       বার বার দোষ বলছ কেন? অজ্ঞতা, এবং সেটা দুজনেরই। দুজনেরই সিদ্ধান্ত ছিল মিলন, কোনো কিছু ব্যবহার করার কথা ভাবি নি। আর … তার ফলে সন্তান। তবে হ্যাঁ। মা হওয়ার একটা বড়ো শারীরিক ধকল আছে, যেটা নারীকেই সইতে হয়। শরীর বিকৃত হয়। বিদঘুটে দেখতে হয়।

-       বিকৃত? বিদঘুটে? আজকাল হিরোইনরা পেট বার করে ছবি পোস্ট করছে দেখেছ?

-       তোমাদের সুন্দর লাগে? সত্যি বলবে। সুন্দর লাগে না একটা ভ্যাল্যুকে ইউলোজাইজ কর।

-       ঐ রকম পেট বার করে হয়তো সুন্দর লাগে না। ওটা আমাদের বোধের সঙ্গে খাপ খায় না। তবে গর্ভবতী নারীর শাড়ি পরা কমনীয় ছবি তো ভালো লাগেই!

-       একটি নবজাতের জন্মের সম্ভাবনার সূচক হিসেবে, না নারীটিরই শারীরিক সুষমার দিক থেকে।

-       দুই হিসেবেই।

-        তা, ঐ রূপটা যদি সুন্দর হয়, তাহলে আমার ভুঁড়িটাও সুন্দর। ঢিলে গা-ও সুন্দর। পেটে ছিল তো জন্মের সম্ভাবনা ধারণ করতাম, এখন এই শরীর সন্তানদের বিকাশের সম্ভাবনা ধারণ করে! এর মধ্যেই শারীরিক সুষমা খুঁজুক পুরুষ! পায় না তো! তাদের তো বিকৃত-দেহ হতে হয় না, কোনো শারীরিক উপসর্গ পোহাতে হয় না। তাই মহিমান্বিত মাতৃত্বে সাফল্যলাভের পরে পরেই, আমাদের জিমে গিয়ে, পেট সিঁটিয়ে, গা টাইট রেখে কুমারীরূপটাও ফিরিয়ে আনার কথা শুনতে হয়।

-       কিন্তু সেটা তো তোমাদের শরীরের পক্ষেও ভালো!

-       হোক। আমি পারব না। আমি এখন মা, ফুল মা। মনের সুখে মোটা হবো। দুজনে বেড়াতে যাবো ফুল বুড়োবুড়ি হয়ে। কারুর কোনো আপত্তি আছে? আপত্তি থাকে, শুয়ে শুয়ে ভিডিও দেখুক। আমিও, দরকার পড়লে দেখব। ঠিক?

সুমন্ত ঠিক বুঝে উঠতে পারল না বাণী যে আজ ফুল ফর্মে আছে তার কারণ কি কোনো ক্ষোভ?

 

২১.৪.২৫  

বিগ্রহ

দেবতা আর রাতে মন্দিরে তাঁর বিগ্রহে থাকেন না আজকাল। ভিড় বাড়ছে প্রতিদিন – সারাদিন পুজো নেওয়ার চাপ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের জন্য জানলা-ঘুলঘুলি বন্ধ করে দেওয়ায় রাতে গর্ভগৃহে দমবন্ধ ভাব, তারপর সারাদিনের পুজোর পচাফুল, পোড়া তেল, ঘি, কর্পুর ইত্যাদির গন্ধ। তাই পূজারী বাইরে থেকে মন্দিরে তালা লাগালেই ভিতর থেকে তিনিও ফুরুৎ - দেবলোকে। আবার পরের সকালে পূজারী এসে দরজা খুলে, যতক্ষণে মেঝে-টেঝে পরিষ্কার করান, ততক্ষণে দেবতা অদৃশ্যে আবার এসে বিগ্রহে ঢুকে পড়েন, অধিষ্ঠিত হয়ে বিগ্রহ-স্বরূপ হয়ে যান।

কিন্তু বিগ্রহটি অস্থির হয়ে উঠল। প্রাণহীন হয়ে পড়লেও সে যে প্রতিমা, তার অঙ্গে অঙ্গে প্রাণকে পাওয়ার ডাক! দেবতা সে ডাককে উপেক্ষা করলেও শিল্পী উপেক্ষা করতে পারলেন না। এমনিতেও, রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমোবার অভ্যাস তাঁর নেই, কর্মশালায় কাজ করতে করতে হঠাৎ অস্থিরতা অনুভব করলেন। একটা প্রবল আকর্ষণ। প্রায় নিশির ডাকে পাওয়া মানুষের মতো তিনি পথে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বন্ধ মন্দিরের কাছে পৌঁছে গেলেন।

তবে তিনি তো আর দেবতা নন। অরূপ বা সূক্ষ্মরূপ, কোনোটাই হওয়ার ক্ষমতা তাঁর নেই। মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়েই তিনি অনুভব করলেন, ভিতরে বিগ্রহে দেবতা নেই! হতবাক হয়ে মন্দিরের সিঁড়িতে বসে পড়লেন। ভোর হল। পূজারী মন্দিরে এসে দেখলেন সিঁড়িতে শিল্পী বসে আছেন। সারারাত অস্থির থেকেছেন, জেগে কাটিয়েছেন। পূজারী মন্দিরের দরজার তালা খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে। শিল্পী বলতে গিয়েও বলতে পারলেন না। ততক্ষণে, মন্দিরের ভিতরে তাকিয়ে তিনি বুঝলেন, দেবতা অধিষ্ঠিত হয়েছেন বিগ্রহে। কিচ্ছু না, বলে তিনি নিজের বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন।

এভাবে দ্বিতীয় দিন ভোর, তৃতীয় দিন ভোর। চতুর্থ দিন পূজারী শিল্পীর পাশে এসে স্নেহপরবশ কন্ঠস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে বলো তো? কোনো কষ্ট আছে মনে? বাড়িতে কোনো সমস্যা? এস! মন্দিরের ভিতরে এস! দেবতাকে বলো নিজের কষ্টের কথা। মন হাল্কা হবে। কষ্ট দূর করবেন তিনি।

শিল্পী বললেন, না এখন ঠিক আছে। সুস্থ বোধ করছি। তিনি এসে গেছেন।

-       কে এসে গেছেন?

-       আজ্ঞে, মন্দিরের দেবতা। বিগ্রহে ফিরে এসেছেন।

-       মানে?

হঠাৎ শিল্পীর খেয়াল হল যে কথাটা বলা সমীচীন হবে না। “না, মানে মন্দির বন্ধ ছিল তো, ভিতরে একটা দমবন্ধ ভাব। …” পূজারী মন্দিরের ভিতরটা দেখে বললেন, “তা মানছি। রাতেই মন্দির পরিষ্কার করে তবে বন্ধ করা উচিৎ। অনাচার হয়ে যাচ্ছে। কী করব? একটা লোক পাই না। আমার বয়স হয়েছে, রাতে একা একা সবকিছু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে যাওয়া সম্ভব হয় না। … যাহোক, বুঝলাম। ঠাট্টা করে বলছ যে ফিরে এসেছেন, কেননা দরজা খোলা হল, মন্দির পরিষ্কার করা হবে। আমি তো চমকে উঠেছিলাম।”

ওদিকে কিছুদিন পর দেবতারও টনক নড়ল, যে তিনি মন্দির থেকে বেরিয়ে আসার পর শিল্পী মন্দিরের সিঁড়িতে বসে থাকে সারারাত। সে কি কিছু চায়? আমার কাছে? এক রাতে তিনি দেবলোক থেকে নেমে ভিতরের প্রতিমারই আদলে রূপ নিয়ে শিল্পীর সামনে এসে দাঁড়ালেন, “কী চাও তুমি বৎস!”

শিল্পী উঠে দাঁড়ালেন। প্রণাম করে বললেন, “কিছু চাই না। আপনি রাতে নিজের বিগ্রহ ছেড়ে চলে যান, বিগ্রহটির শূন্যতার হাহাকারে আমি অস্থির হয়ে উঠি, তাই নিজের কাজ ছেড়ে ছুটে চলে আসি এখানে!”

-       বিগ্রহ আমার, আর সে তোমাকে অস্থির করে তোলে? কই, আমাকে তো করে না!

-       (করজোড়ে) আমিই যে তৈরি করেছি ঐ প্রতিমা, প্রভু। ওর পাথরের শরীরের এক একটি কণায় আমার স্পর্শ আছে। ওকে প্রাণবান রাখার দায়ও যে আমার। তাই হয়তো ডাকে আমায়।

-       তাই যদি হয়, এত রাত ধরে আসছ, কই আমাকে তো ডাকো নি, ফিরে আসতে বলো নি।

-       প্রতিদিন দেখছি, সকালে মন্দিরের দরজা খুলতেই আপনি ফিরে আসছেন। তাই আর ডেকে বিব্রত করি নি।

যে রাতে শিল্পী আর দেবতার মধ্যে এসব কথাগুলো হচ্ছিল, সে রাতে পূজারীও নিজের ঘর থেকে, ঘুম আসছে না বলে বেরিয়ে মন্দিরের দিকে আসছিল। কিছুটা কাছে এসে এই কথোপকথন শুনে চমকে উঠল। আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনতে থাকল।

-       তুমি তো আশ্চর্য মানুষ? কিছু চাইছ না। আবার অহঙ্কার এত বেশি … যে দেবতার অভাব পুরো করতে চাইছ রাত ভর মন্দিরের সিঁড়িতে বসে!

-       আপনার অভাব পুরো করার ধৃষ্টতা করছি না দেবতা! রাত ভর ঐ বিগ্রহটায় আপনার অভাবে কষ্ট পাচ্ছি শুধু। কেননা আপনার অধিষ্ঠানের জন্যই তো তাকে তৈরি করেছিলাম, গ্রামের মানুষের কথায়!

-       যদি আমি ভেঙে ফেলি ঐ বিগ্রহ? … নাও, ভেঙে দিলাম!

কথার সঙ্গে সঙ্গে আকাশ থেকে একটা ছোটো উল্কাপিন্ড সোজা মন্দিরের চুড়োয় এসে আঘাত করল। মন্দির ধ্বংস হল। ভিতরের বিগ্রহ খান খান হয়ে গেল।

-       এবার কী করবে?

শিল্পী সভয়ে আগুনের বিস্ফোরণটা দেখে। “এ কী করলেন দেবতা?”

-       তোমার তৈরি বিগ্রহ ভেঙে ফেললাম! আর তোমায় তার জন্য কষ্ট পেতে হবে না।

সকাল হতে হতেই ভিড় এসে জমা হয়েছে মন্দিরের ধ্বংসস্তূপের সামনে। অনেকে হাহাকার করছে, কী অভিশাপ নেমে এল আমাদের জীবনে! মন্দির ধ্বংস হল, দেবতার বিগ্রহ ভেঙে গেল। পূজারী ঐ ধোঁয়া উঠতে থাকা ইঁটপাথরের ভিতরে ঢুকে নিজের গামছা দিয়ে ধরে তুলে আনলেন ছোট্টো, তখনও গরম উল্কাপিন্ডটি। বাইরে এনে মাটিতে রাখলেন। সবাই প্রশ্ন করল, জিনিষটা কী।

-       মন্দির ভেঙেছে, সেটাকে অভিশাপ ভেব না। আমি দেবতার সঙ্গে শিল্পীর কথাবার্তা শুনেছি। শিল্পীর তৈরি বিগ্রহ দেবতার পছন্দ ছিল না। দেবতা থাকতে পারছিলেন না মন্দিরে। তাই নিজে আমাদের এ উপহার দিয়েছেন। এটাই তাঁর নতুন বিগ্রহ। এ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমরা নতুন করে একটি মন্দির নির্মাণ করব।

কয়েকজন চিৎকার করে উঠল, “তাহলে তো শিল্পীকে ডেকে জবাবদিহি করতে হবে। কেন এমন বিগ্রহ তৈরি করল যা দেবতার পছন্দ হল না? অপবিত্র মনে বা অপবিত্র হাতে তৈরি করেছিল নিশ্চয়ই!”

“না, তেমন কিছু নয়। ঐ বিগ্রহেই দোষ এসে গিয়েছিল। দেবতার বদলে সে শিল্পীকেই ডাকত বার বার। কোনো শিল্পীর তৈরি বিগ্রহ হলেই তাতে এ দোষ থাকবে।” উল্কাপিন্ডটা দেখিয়ে বলেন, “এটা তো কোনো শিল্পীর তৈরি নয়! দৈব!”

অদূরে, গ্রামের রাস্তায় নিজের বাড়ির দিকে যেতে যেতে শিল্পী আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসল, “এবার বুঝুন দেবতা। ঐ পিন্ডাকৃতি হবেন আপনি। যান! অধিষ্ঠিত হন! আমি বরং যাই, নিশ্চিন্তে একটি নতুন প্রতিমা পুরো করি। তার শরীরে প্রাণের প্রতীক্ষা থাকবে। পাবেও, যদি মানুষ তাকে ভালোবাসে। কিন্তু আপনার প্রতীক্ষা থাকবে না।”

পিছনে ফিরে তাকালো। ধোঁয়া ওঠা ধ্বংসস্তূপটা দেখতে দেখতে ভাবল, ভাঙা বিগ্রহের টুকরোগুলো নিয়ে আসবে পরে গিয়ে। কাজে লেগে যাবে।

২৩.৩.২৫