Sunday, October 7, 2018

মাড়োয়ার লালচে বুনটে


‘উত্তম খেতী
মধ্যম বাণ
অধম চাকরী
ভীখ নিদান’…

কখনো দস্যু কখনো ফৌজী
এ নদীতটের চতুর্থ সন্তান
সময়ভেদে কর্মী, রাজনৈতিক;
সবার সব কথাই কিছুটা ঠিক
তবু ঝান্ডার লালের অঙ্গীকারে,
নির্জনতর যৌথ অভিসারে।

সে কবেকার উচ্ছল কৌতুহল –
ব্লক ঘেরাওয়ে প্রথম হাতেখড়ি;
পিতার ক্ষোভে মায়ের শঙ্কায় চুপ
জল ভেঙে প্রশ্নসমাকূল তরী;

কবিতার মতই এক রাতে পেল
দেখা, কিম্বদন্তীর – যার জীবিত
কিম্বা মৃত শির সন্ধানে পুলিস
নাকাল; শাসককুল সন্ত্রস্ত, ভীত।

তারপর কত রাত বুকে চাবুক,
বিশ্ব আন্দোলিত দুর্নিবার,
নিরবচ্ছিন্ন মানুষের শ্রমে
প্রস্ফূটনে যুগ বদলে দেওয়ার

চালচিত্রে স্থিতধী হয়ে ওঠা –
কমরেড! ভালো আছো? কমরেড!
ভনি আরো সুত্রকাব্য কিছু!
হস্টেলে পাঠচক্র? পুলিস-রেড?

·          

একদিন দেখল সে দেখার যুক্তিতে
জেলাশাসকের বিলিতি বাংলোয়
ওই তো চোট্টা মিলমালিক, বিধায়ক,
                             অনুগত আমলা আরো খান ছয়,

                             বরেণ্য ভূপতি, সদ্য মালিক
দশ ট্রাকের, ঠিকেদার বাহাদুর –
শান্তির মহতী নাগরিক সভায়
লাস্যে পরিহাসে সৎসঙ্গে চুর!  

দেখল শীতের সকালে কালভার্টের নিচে লাশ।
এপ্রিলে রেলধর্মঘট। লোকনায়ক জয়প্রকাশ।
হঠাৎ টগ্‌বগে দেশ – স্কুলকলেজ বন্ধ্‌ -
          প্রত্যেক রাস্তায় মোড়ে পুলিস সিআরপি মোতায়েন।
ছাত্র মানে নায়ক? বিপ্লবের?
                   না, ওটা বিচ্যুতি,
                             ছড়িয়ে গেছে ফরাসী কোহেন।
তাহলে এ গণরোষ?
হ্যাঁ, এরি মধ্যে কাজ –
এই ছাত্ররাই গ্রাম থেকে গ্রামে বসন্তের আজ
                                      পাঠাবে বজ্রনির্ঘোষ!

সহজ হয়ে উঠল ভারত – দেরিও হল না
দুর্বোধ্য হয়ে উঠতে; ইতিমধ্যে ঠিকানা
সংগঠন – শোষিতের লাঞ্ছনা রুখতে সশস্ত্র
                                      মোকাবিলায়…
কমরেড! তুমি কোথায়?

·          

                             তার বুকে অসুখ গভীর –
সে মানে না নিয়তি,
                   ওই চিন্তা কৃষকসুলভ;
বুর্জোয়া আত্মরতি।
                   সাথীদের দেওয়া স্ট্রেপ্টোমাইসিন,
আইসোনেক্স পাস তার ঝোলায় – মানুষ
          অর্থে হতে চাওয়া প্রতিদিন।

যেমন এখন ভোরে মার্টিন রেলের
লাইনদুটি পেরিয়ে মাড়োয়ার লালচে বুনটে
ভাবছে সে কেন্দ্রীয় কমিটিতে পাঠানো
                                      ভাঙা শব্দপটে
চোরা প্রশ্নগুলি;
পা চলছে সত্বর – রাতের খবরঃ
          ‘ক’ গ্রামে দশ রাউন্ড চলেছে গুলি…

মাঝে মাঝে সে নিজের পাথরে গাঁইতির
                             প্রতিধ্বনি শোনে নির্জন!

এলাকার হতদরিদ্র মানুষদের চোখে আশার দাপট;
মহিলারা জোরকদমে অংশ নিচ্ছে দলে – সংগঠন
ভাঙছে গড়ছে ভাঙছে – প্রশ্নের উদ্বিগ্ন ঝাপট

ছায়াছন্ন করে মুখ – জোয়ার কিসে আসবে?
হিংসা-প্রতিহিংসাতীত
নিতান্ত বেঁচে থাকার তৃণমূল প্রয়োজনে
মাটি হচ্ছে পিঙ্গল – রক্ত এত!
বীজ
ধরিত্রী কবে ফেরাবে?

ভাবতে তো হবেই কমরেড! তুমি জানো,   
একনিষ্ঠ কর্মী, নিজের সত্যের নিঃসঙ্গতাতেও
শ্রমের অমরত্বের কাছে ছোটো হয় না কখনো।…  




Saturday, October 6, 2018

মসলিন

রাত শেষে সজল হয়ে উঠছে তারাগুলি ।
ঘুমের দহে রূপোর হালের আলতো মোচড় দিয়ে
হারিয়ে গেছে চাঁদ ।
বইছে শিশির, গাছের গুঁড়ি বেয়ে ।
দূর বাংলায় এমনই এক অন্বিত রাত শেষে
খাড়ির মৃদু হাওয়া
ডাবের ভিতর দুধিয়ে দিত জল,
জেগে উঠত ঘরের কোণে সুতোবোনা মেয়ে ।

সারাটা দিন রোদে ফেটে উপচে পড়ত তুলো ।
দিল্লী থেকে আসত মোগল সল্‌তনতের তাড়া ।
বণিক জাহাজ উত্তমাশা
অন্তরীপের নিত দখল
রেশম পথে, খাইবারে সাত
ভাষার চলত অদলবদল,
দাদন দিতে আসত মহাজনের কারিন্দারা ।
গাঁয়ের হাটে দুপুর বেলায় পছিয়া সদাগর
ফেরি করত চিনি;
রাতে বাপু, মাদুরে চিৎ, পুছতো আকাশটাকে,
“বর্ষা আসছে, খড় কী করে, বল্‌ তো মা, কিনি ?...

সুতোবোনা মেয়েরা বাংলার –
জেগে উঠত – চাঁপা-আঙুল গাইত কাপাস-গান,
স্বচ্ছরক্ত শিশির শিরার দৈর্ঘা টানটান

যুগের সাঁঝে পাটরানিরা নরককুন্ডে ঝাঁপিয়ে পড়ার কালে
ডাকত তাদের, ঢেকে নিতে নগ্নতা নিজদেহের
আরো করূণ মোহজালে ।

֍

ইতিহাসের টিকায় লেখা, তারা ছিল কূলীন ঘরের
বালবিধবা, কারণ
চাষের কাজে, ঘরের কাজে হাত ক্ষওয়ানো ছিল তাদের বারণ !
মাঝে মধ্যে পূর্বজন্মে যাই ।
অশরীরে বসে জানি সেই কোনো এক নারীর
দেহদেউলে মধুপর্বের ঝুঁকি –
সূক্ষ্মতম তৃষার তন্তু পাই,
মসলিনেরই সুতোয় গড়া ঊর্ণনাভ প্রায় ।
পাশে থাকে শূদ্রাণী মোর, পাছে বখাই, নিয়ে যেতে চায় ।
পুছি আমার শূদ্রাণীকেই, আপন ভাঙা ঘরে –
“একটিবারও কস্‌নি তারে, ভাগ্‌ !
“মরতে আছে ঘরে,
“কিসে বাঁধা পড়ে ?
“জীবনটা কি শিকলের দায়ভাগ ?...”
শূদ্রাণীও হাসে –
ওই নারীও হেসে ওঠে বাঁশবনের ওপারে তির্যক ।
চাঁদের কাঁপন দেখে বুঝি তাদের হাসির অন্ত্যমিল,
যদিও এ কাব্য নয় নারী বিষয়ক ।

֍

রাতশেষে সজল হয়ে উঠছে তারাগুলি – নিভে আসছে ।
শহরপ্রান্তে নো-এন্ট্রির বাইরে লাইন, ট্রাকগুলির
জিরিয়ে নেওয়ার, বাড়ছে ।
মাজার নিঝুম – আধেক দেখছি শালু –
আবির্ভাবের নামালুম সালতারিখ,
এক জিনের তারিফ, মোবারকবাদ...
অশ্বত্থও নতুন পাতায় পান্নাসবুজ জাগছে ।
শহরপ্রান্তে ছোটোবস্তির মহিলারা ইতিউতি
বেশি আঁধার ঝোপের আড়াল খুঁজছে ।
---------
আইজলের মনোরমা !
---------
অনেক প্রশ্ন পাহাড়গুলির সমতলের বিরুদ্ধে আজ জমা ।
অনেক প্রশ্ন অরণ্যানির, অববাহিকার,
অনেক প্রশ্ন দেশের – দেশটা কার ?

֍

কেমন করে বুনট পেল দেশটা তার রক্তসমাগমে ?
ব্লক সদরের সূচী থেকে তুলি
যে কোনো এক গ্রামের নাম, নামের ভিতর
কয়শ’ বছর লাঙল, জাল, ঢেঁকি, তাঁত, হাপর
মিলছে সমে ?
কত হাজার চৈত্ররাতের নিদ্রাহীন, ফুরিয়ে আসা বাতি
গড়ছে কাঠে, কাঁসায়, বস্ত্রে, পোড়ামাটি, পাথরে সুখ্যাতি ?
ফাল্গুনে, অঘ্রাণে বরযাত্রা ও বাসর
মনে রাখে, বিশেষ কোনো গল্প ?
গল্পসূত্রে কোনো পরবের রাত্তিরে আল ধরে হঠাৎ
দেবীদর্শন ? গ্রামখানি হয়
পীঠস্থান – স্মৃতি, শ্রুতির কল্প ?
মৃত্যুভার কাঁধে নিয়ে, জন্মকূজন রেখে পাশের ঘরে
টোলাগুলোর পারাপার, কয় প্রজন্ম ধরে ?...
তারি মধ্যে পঞ্চ আর প্রপঞ্চ বদল ।
দাঁত কামড়ে সয়ে যাওয়ার বল,
শিকল ছিঁড়ে অভিমানী যাওয়া,
অচেনা উজান, ঘৃণার নতুন পালে বাওয়া !
রক্তপাত !... কত ঝোঁকে
শহর থেকে এল নতুন জল ?... নতুন কল ?...
কবে হল বিলুপ্তি, দুর্যোগে ?
আবার ফুঁড়ে উঠল নবশ্বাসে ?
একটু কি বলবেন স্যার, হাকিম !
নিয়েছেন কি উদ্যোগ,
দাখিল করার, মহাফেজে, বিশদে এই স্মৃতিমহীরূহ

এই নামটির পাশে ?

֍

একটি দেশের এই তো এক কোষ, জায়মান !
পথ হতে চায়, কষ্ট ফলায়, দুর্বিপাকে রেঁধে
পরিশ্রমের নুনে অনির্বাণ,
হিন্দ বলতে লড়ে পাওয়ার ভূবন গড়ে প্রাণ !

֍

বুনন তবু বুনন ! ধরে বাতাসী জলনীড়,
উঠোন থেকে উঠে, পা ধুয়ে মানুষটি, বসে তাঁতে ।
জল-ঘর্ষণ, চকিত আলোর বজ্রশাসন ফেরায়
বেঁচে থাকার আটপৌরে চৌহদ্দিটাতে ।
কচুবনে উদোম শিশুর বাজে ক্যানেস্তারা,
নদী মেটে ঘূর্ণিস্রোত, খালে উথাল মৎস্যবীজ,
বাড়ে ধানের চারা ।
কুল ছাপায় বিল, বিলের রহস্যবাখান –
বাপের অশ্রুযন্ত্র মেয়ের অশ্রুতন্তু দিয়ে
বোনে গান ...
মসলিন !...
এক দেশ, সৃজনধন্য !
এমন মিশেল জানত লোহার
দামাস্কাসে পৌঁছে হত শ্রেষ্ঠ অসি, তাবৎ জাহাঁর
তরী গড়ত শক্তিশালী, তিন সমুদ্রে ছড়িয়ে দিতে পণ্য !

বাপের নামটা কী ?
বলতে পারো হিঁদুয়ানির মোড়ল ?
বলো দেখি মুরুব্বি ইসলামের,
মেয়ের নামটা কী ?
নিজের গান অশ্রু করে মেয়ের
অশ্রু দিয়ে গান বোনাই হিন্দের বন্দিশ !
কবে থেকে শুরু করি বলো !
কবীর ?... না কি তারও আগের, বন্দরে, মাশাল্লা
তোমাদেরই হাতে কলুষ – সেই কোন এক গাঁয়ের বৌ –
বেশ্যার কুর্ণিশ ?
বন্ধু বলে, সখা বলে, বলে আপন প্রিয়তম
কে এমন, ইশ্বরকে দিয়েছিল ডাক !
মানুষজনের কাজে ভীড়ে, ধাক্কা, রগড়, গালি খেয়ে
মুক্তির যে কলোচ্ছলে হাসল ইশ্বর,
ওই হাসি তোমাদের নরক, কুম্ভীপাক !
আগুন নিয়ে খেলছো বটে –
জানোনা যে বৃষ্টিও তো আগুনেরই নাম !
সব্বাইকে সবার মত
আরো আরো হতে দেওয়াই
হিন্দের পয়গাম !
এই তো এক দেশ যেথা জন্ম চায়
পাঁচ ধর্ম, সাত জাত, সতেরো ভাষার নিবিড় সংকর
মাথায়, নাকের হাড়ে
মেঘবিন্দু হয়ে জমে গোন্ডোয়ানার আগ্নেয় ভুস্তর !

֍

একশো নীল পদ্মদ্যূতি ফোটাবে এক উষা –
শিশিরশিরার ঊর্ণনাভে খেলবে রঙীন ইন্দ্রধনুর পুচ্ছ ।
গাছে গাছে গরম হয়ে উঠবে ফলের গুচ্ছ ।
এগিয়ে আসবে নতুন খইয়ের কোজাগরী, গুড়ের মৌতাত
আবার ঠিক এই স্তবকেই দেখা হবে নির্জনে, শেষরাত !


[সঞ্চিতা, শারদ সংখ্যা ১৪১৪য় প্রকাশিত]

ছবিঃ প্রথম আলো 



দোকান

ওভারব্রীজের নিচে হাট।
                             রেলজমির পাঁচিল বরাবর
চারপেয়ে ছ’টি নতুন গুমটিঘর –
সস্তা কাঠের কারসাজি হাফডজন;
খরিদের পর শহরের বিভিন্ন পাড়ায়
                             কিছু গেরস্তের হবে মূলধন,
                                      পাবে স্বপ্নপ্রণয়ন…
 
চাকার মেলা দেখেছি বিদিশায় –
অবশ্যই প্রাচীন কেন না চলে গেলে, চাকা ও মেলা দুটোই
                             গভীর শূন্যতা রেখে যায়;
কিন্তু পর পর সাজানো লক্ষ্মীর এই নতুন ঝাঁপিগুলোর ছক
নিতান্ত ছিঁচকে, অনুন্নত, দক্ষিণ এশীয় –
                             হাপিশ করে আক্‌ছার
                             প্রশাসন ওরফে প্রগতির ধমক।
 
তবু দেখে মনে হয় লুঙ্গি গুটিয়ে এখনি
                             বাঁদিকের দোর খুলে ঢুকি –
নতুন ঠিকানা ধরে
                   নতুন তুরুপে মনরহস্যের নিই ঝুঁকি।
 
 
 
চৈত্রের রোদে কাঠের খোলতাই।
                                      যদি কিনি,
প্রাইমারে, ভারি রঙে, বৌয়ের সাথে সাজাবো স্বর্গ!
সঙ্গতি কম বুঝলে শুধু যোগান সাজাবো,
                   রক্তে শুনি আছে ব্যবসার গোঁ!
পানের দোকান যদি করি,
সামনের উঁচু পাটায় বসাবো ল্যামিনেট, এ্যালুমিনিয়াম;
ভিতরে থাকবে চুন জর্দা মশলা খয়েরগোলা আর
ভেজা লাল
          শালুতে সবুজ মিঠে বাংলা
                                      মগহি গঞ্জাম।
দোকান
          করতে পারি মনোহারী – সম্ভারে মনোহরণ!
অথবা ধরতে পারি লাইন
                   পাথরকুচি, ছড়, বালির খুচরো ব্যবসার
রেলইয়ার্ড, নদীতীরে –
‘পায়ের ধুলো দেবেন স্যার, চিনে রাখুন
                             এই অধমের চাঁদবদন!’…
 
 
 
ইয়ারদোস্তের সে দলটাই তো নেই যে বলি,
‘চল, লাগা পূঁজি!
          ছিঁচকে এই গুমটিঘরে
                   শুরু করি কবিপক্ষ, সমবায়ী রুজি!’
 
গুমটির ভেতরের তাজারং পেস্তা-দেয়ালে
হিমেল দক্ষিণ অরণ্য চিলির,
জোহান্সবার্গের বৃষ্টি আর
প্যালিস্টিনিয় পাথরের বাজবে যত সুর
তামিল নুন, গুরুমুখী ঝিল,
মারাঠি কুঁয়োতলা, মগহী পানিফল,
          খাসি আনারস দেবে তাল
আরো বেশি করে
কানে তালা লাগিয়ে বাজাবো
                             কাঠের ঘুঙুর!
 
 
 
কে বলে ছোটো? বিশ্ব বড় হচ্ছে ক্রমাগত।
প্রতিটি সকালে সমুদ্র দেয় নতুন ম্যাগেলান,
দিনযাপনের বাঁকে নতুন কবীর!
 বহমান গীতিকায়
                   নতুন প্রণয় ঢুকছে অবিরত।
কোন্‌ সে প্রণয় – গীতি যার তরে বহমান?
এ কোন হাওয়া যাতে উড়ছে ছিন্নভিন্ন
                             তার পর্ণনীড়?
 
 
 
জানি না কেন ওই কাঠের
                   দোকানঘরগুলো ডাকছে।
কচ্চী দরগার মেলার মত ডাকছে।
একশরীর ভরাট যৌন আবেদনে
                   জিরো মাইলে গুমনাম
                             ঘর বাঁধতে ডাকছে।
 
জলাজমি বুজিয়ে তৈরি রাস্তার
দু’ধার ঠেসে ফুটছে জলকুম্ভী।
বৈশাখের সোনালি ভোরে নম্র মাটিতে রাখা লব্‌নিতে
ফেনা মরছে তাড়ির।
চাঁইটোলার গলিতে সবুজ সাবানজল।
মোগলপুরায়
রেললাইনের নিচ দিয়ে হাঁটা-সুড়ঙ্গপথ –
সিঁড়ি বেয়ে
সাইকেল বগলদাবা করে নামছি,
যেন মায়ের বুকে শিশুর
                             নগ্ন তৃষ্ণাতুর ঢল।…
কিসের এত টান এই জলহাওয়ায়?
একি ফুরিয়ে যাওয়ার?
মখলি গোসালের, অজিত কেশকম্বলির শব্দছল!
 
বুদ্ধ! বুদ্ধ!
এক জন্মে শেষ হই না ভাই সিদ্ধার্থ!
নির্বাণ শুধু দাসমালিক, শ্রেষ্ঠী ইশ্বরেরা পায়
এ সত্য গোপনের অপরাধে
কী যে করি তোমায়, বলো তো!



নীল বই


গোলাপ ও জ্যামিতির বাক্স

একেক দিন বর্ষায় উষ্ণ আকাশের গা বেয়ে জল ঝরে।
প্রায়ান্ধকার জানালার কাছে
ডাকি “ইউক্লিড”!
চোখের ভীষণ সামনে জেগে ওঠে বড়সড় বাসন্তী গোলাপ!
ডাকি, “গোলাপ!”
টিনের জ্যামিতির বাক্স খুলে যায়।

শিশিরের প্রতিসারনে ধীরে
ফুটে ওঠে প্রোট্র্যাক্টর, সেটস্কোয়ার,
                   ডিভাইডার, কম্পাস,
                   ইরেজার, তীক্ষ্ণ পেনসিল!

তীক্ষ্ণতা ফোটে।
আঙুলের ডগায় এক বিন্দু রক্ত –
ইউক্লিডের গোলাপ!



প্রেমের শেষ কবিতা

হোক অন্য পথে,
আমারই বিরুদ্ধে এক বোঝাপড়ায়,
তবু পৌঁছোও!

চটিটা পায়ে গলাই। বেরিয়ে পড়ি পথে।
গাছের গুঁড়িগুলো গায়কের
রেয়াজের মত। স্নানরত শিশুর
গায়ে সর্ষের তেলের গন্ধ,
স্টেশনের কাছে ভীড়,
চায়ের কেটলি থেকে ধোঁয়া…ওঃ আমার
ভালো লাগে না এই হোঁচট খাওয়া শীতের সকালে!
আঙুলের ফাঁকে অসহ্য তোমার স্পর্শনীয়তা –
ঢোকাবো উনুনে, হাতদুটো?

পৌঁছোও!   
আমি যাই, কুড়োই সারা ঘরে
নষ্ট রক্ত দুজনের।



আউটডোর

টিটেনাস ছড়িয়ে পড়াতে পনের দিন বন্ধ ছিল ওটিগুলো, গতকাল খুলেছে।
রুগী দেখার হলঘরে জনাচল্লিশ গর্ভবতী নারী। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আমরা পাঁচ,
বেশি উদ্বিগ্ন পুরুষ।

এক একজন ফুটবোর্ডে পা রেখে উঠে শুচ্ছে টেবিলে।
ডাক্তার দস্তানা-হাত তার শাড়ির ভিতরে ঢোকাচ্ছেন।
লেখাচ্ছেন উপসর্গ, ওষুধ।

অসহ্য গরম, দুর্গন্ধ।
পৌঁছোবার মুখে পিছনে ধাক্কা খেয়ে একবার
                             চোখ ফিরিয়ে দেখলে আমায়।

এগোও কাজল! আমি আছি এখানেই। থাকব। কোথাও গেলেও
মেনো যে আছি। যেমন আর সবাই মানছে। 
তুমি না মানলে এই নরককে কোনোদিন  
কী করে ভাবছি, করব হাসপাতাল?



অন্যমনস্ক

নিঃসঙ্গ নারীদের নিঃসঙ্গতায় তুমি ভরে থাক।
কেউ যুবতী কেউ বিগতযৌবনা
কেউ বিবাহিতা – বিধবা, পরিত্যক্তা, গৃহত্যাগিনী
কেউ অবিবাহিতা;
সব বন্ধু তোমার। 

আমায় জড়িয়ে ধরো যখন তখনও                 
তাদের নিঃসঙ্গতায় মাঝে মাঝে
                   অন্যমনস্ক হয়ে পড়ো তুমি!



বুঝতে সময় লাগে
                  
নানান কথার মাঝে তুমি বলে ওঠো,
‘ভীষণ দুরন্ত হয়ে উঠছে এখনই’…
আমার হাতটা টেনে
পেটের ওপর চেপে ধরে বোঝাও,
‘এইটে মাথা, দেখ দেখ, এদিকে সরছে ধীরে ধীরে!’
                  
তোমার হাঁটাচলার মধ্যে ওর সঞ্চরণ,
তোমার ঘুমের মধ্যে ওর ঘুম,
উড়ালপুলের পর
ভাঙা রাস্তাটুকুর ঝাঁকুনিতে ওর বিরক্তি,
তোমার কষ্টে ওর বয়ে যাওয়া –
পৃথিবীরও বুঝে উঠতে সময় লাগে কিছুদিন
তুমি কার কথা বলছ।



কারসাজি

ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল রোদ্দুরে হঠাৎ মেঘ,
চেতরপুরে সন্ধ্যায় গ্রামে অবক্ষয়ী বিষন্নতা,
                   জোলো হাওয়ার বিচ্ছিরি কাঁদুনি…
এসব তোমার সাথে আমার
সম্পর্কে দুর্বোধ্যতা নয় – প্রিয় বান্ধবী,
আমাদের জোর নিয়ে সন্দেহের কারসাজি।
         
এর বেশি জায়গা পাবো না বাসে, এস উঠি!
জীবনের দুর্বোধ্য মানেগুলো এভাবেই ধাক্কাধাক্কি করে শেষে
          হয়ত চালকের পাশে বসে পড়ে একসময়!



পাহাড়ি পথে বাসটা ওঠার আগে

রাস্তার দুপাশ হঠাৎ চওড়া।
বাঁদিকে একটা কাঁচা পথ
নতুন কোনো প্রজেক্ট বা কোয়্যারির।
মন্দিরটায় বাজছে হাইওয়ের ড্রাইভারদের ভরসা।
ভেজা বুনো গন্ধ হাওয়ায়।

দুগ্লাস চা এনে
একটা বাড়াই বাসের জানলার দিকে –
তোমার চোখদুটোয় খুঁজি
কয়স্তর মেঘের পর পাথর বেসামাল করছে রোদ্দুর,
গুটিগুলোর দেয়াল চরাচরে
কাঁপছে নাকি রঙিন ডানার চাপে, আলোড়নে।



ঢেউগুলো

তুমি মানবে আমাদের পৃথিবীটার
ঢেউগুলো অনেক স্তিমিত ইদানিং,
এখন জ্যোতির্ময় শরীর দুলিয়ে
ঘাসের সাথে ওঠার পায়না মেয়াদ -
দু’এক রঙে চটজলদি অভ্যাসে
নেমে পড়ে আসর জমাতে ঋতুদের।
ঋতুরাও আর সে প্রাচীন ঋতু নয়
শুধু ঘড়ি দেখে অধীর, এত বেয়াড়া!

একশ ওয়াটের খাড়া হলুদ আলোয়
দেখি মগ্ন চারকোলে দশ বছর
দেগা’র নারীর মত কালচে কেজুড়ে
তোমার দেহের ভাঁজ, তীব্র যৌন।

হাওয়া উথালপাথাল – ভালো লাগে না।
কেন মনে হয় তারারা কিছু বলবে!    



গোদাবরী রেলওয়ে জাংশনে

দিনের নদী অনেকটা উজানে গিয়ে জাগে
রাতে তার জাগরণ তটে উঠে আসে
বর্ষায় গাছ বেয়ে জড়ায় কোকিলের গলা



নিসর্গ

তুমি আমায় নিয়ে এলে তাই
                   এ নদীটার নাম
                         জানতে চাইলাম।
ওপারের
হাওয়া এসে খেলছে তোমার চুলে তাই
                             এ নদীটার বয়স
আমায় শোনালো মানুষের হয়ে ওঠার সঙ্গীত।
হাতে রাখলে হাত তাই মনে হল -
কত জন্ম ধরে এ নদীর পাড়ে আসছি ।



ফাল্গুন – ২০১০

বাসা বাঁধার চেষ্টায়
কিছু ঘরে, এ শহরের বিভিন্ন পাড়ায় আমরা থেকেছি।
ঘরগুলো আজ আরো জীর্ণ, তবু আমাদের
পরের প্রজন্মটিকে জায়গা দিয়ে, রাতে
সস্তার এফএমএ গুলজার।
পথে পথে হোলিকাদহনের
আগুনেমোষগুলো গলার        দাউ দাউ শিরা ফুলিয়ে চাটছে
                                                চন্দ্রাসব।

মনে পড়ে, এক ঘরের এক কোনায় অর্থহীন
ছিল একটি বাড়তি থাম। পর্দা দিয়ে ঢেকে
ঘরটাই সংক্ষিপ্ত, এমন বুঝিয়ে রেখেছিলাম।
পিছনে থাকতো সাইকেল।
এই প্রজন্ম
থামটাকে বানিয়ে নিয়েছে ঘরটির
নতুন মাত্রা – ছবির ছয়লাপে নিরুদ্দেশের
                             রঙীন অর্কেস্ট্রা;
পিছনে আজও রয়েছে সাইকেল।

বাসা বাঁধার চেষ্টার বাসাটি বস্তুতঃ
এক হয় সারা পৃথিবীতে।
সভ্যতার খালপারে,
ছায়া পড়ে – আরো মায়া ধরে,
নোনা ঝরে - রোদে কূল ভরে,
হোঁচট, পতন – মাধ্যাকর্ষণরহিত,
ভূলগুলো – প্রণয়ে উত্তাপ।

বাসা বাঁধার চেষ্টায়
না মচকানোর গুনগুনটাই সব।



তাড়া

এত ভারী 
                  গাঢ় জল
ক্ষেত ছাপিয়ে 
                        আরেক ক্ষেতে
                                                নামছে!
দূরের ওই 
                    শস্যময়
পাহাড়গুলো 
                        আঁধার হয়ে
মাতাল মেঘের
                          ঘেমো স্তনে  
মুখ ডুবিয়ে
                   ঘামছে।

প্রকৃতিও 
               বলতে নারাজ,
কতটা তার 
                   মানুষ!
                             আমার  
কাজের এবং 
                        যাওয়ার তাড়া
ঢুকে পড়ছে 
                         এ ওর ভিতর -
মেঘের বুকের
                  হারছড়াটা
                           নাকে মুখে
                                        বাধছে।



মায়া

চাস-কাত্রাস –
ভাপা জুনমাস,
          দিগন্তলীন কালচে ধুলোয়
হাওয়ার মরচে খুঁচোচ্ছে এক ফিঙে।

হ্যাঁচকা-কাঁখে শিশুমুখ টিঙটিঙে;
ভরদুপুরে রোগা মা’টি
                   বাসের ভীড়ে ঠেলছে -
অসময়কে ধরতে দুহাত
                   সময় যেন, মেলছে!

এই তো আমার মৃত্যুপারের স্বদেশ!
বাঁচছে আমার বৌ ও ছাওয়াল;
মানুষজনের চোখে, হাল্লায়
দুষ্টুমি এক কঠিন পথের
                             খেলছে!



বসন্ত

ফ্ল্যাটবাড়ির এই ঘরের ভিতর
হঠাৎ দেখি গজিয়ে উঠল সিঁড়ি!
চিলেকোঠাও পেলাম!
জানলা দিয়ে ঢুকল খাতায়
পেট্রলপাম্প,
শেরঘাটিতে ঢোকার আগে লাইন হোটেলে
চা-চুমুকের হাওয়া!
……………
উড়ুক্কু মন, বাজে কাপাস,
ক্লান্ত রাতে প্রতিটি বার
বুনট ফাঁসা,
সুতো ছিঁড়ে যাওয়া। 



মৌ

অমৃত এ প্রাচীন মাটি
গাছের নতুন ছাঁও,
নশ্বরতার শিষ বাজিয়ে পথ পেরোতে
ভালোবাসার বাঁও।

কালদুপুরে দেখেছিলাম
কুঁয়োতলার সাবানফেনায়
স্নানরতা   
          অজেয় এক দেশ।
কালদুপুরে?
কোন সে কাল?
ব্যাভিচারী মেধার জাল। 
দুর্বিনীত হাওয়ার খুরে
পোড়া ঘরের শ্লেষ।

তুই নি আমার সাধের মেয়ে?
তুই নি আমার বৌ?
অশথতলার আঁধার ফোটায়
অপরিচয়ের মৌ।

আমি আমার কেউ না,
আমি আমার রোখ;
রাস্তাটা বাঁক নেওয়ার আগেই
ফিরিয়ে নিলাম চোখ।



নতুন আইভি

এমন একটি বীজ যে’টি
                             হয়ে চলে।
বীজবন্দী আকাশ – আরো সুদূর
বীজবন্দী মাটি – আরো আতুর
বনস্পতি ও মেঘ
                   কথা বলে।

রঙে খেলা – শিমুলের গুটিতে উত্তাপ
স্পন্দিত নির্জনতা – ঢেউয়ে চোখের চাপ
জলবাহিত কথা…
একটি বীজ – অটুট নশ্বরতা।

তুমি আমায় অনেক কিছু আরো
দেবে না?
          আমি তোমায়?
                             কী?

বসন্তের ঝিল্লিতে নতুন আইভি –
সাদা চুল, তোমার আমার – শিকড় বৈকি!



নিমফুল

কোন্‌ সকালে মেয়েটাকে
          ডাক্তার দেখাতে গেছ,
                   এখনো ফিরলে না।
কাজের পথে ওইদিকে
          চৌরাস্তায় হঠাৎ যদি
                   আসছ দেখি, নিশ্চই
                             থামিয়ে দেব সাইকেল।
দেরি হলেও ঘেমেচুমে
          চা খাব কিসুনজীর
                   দোকানে এককাপ।
চায়ের ফাঁকে ঝরবে না নিমফুল?



শুধু পাহাড় বা সমুদ্র নয়

কোন জায়গা মন টানে না বলো?
সে শুধু পাহাড় বা সমুদ্র নয়
এমনকি এই সপাট সমতল ঘিঞ্জি শহরেও
যদি আসো কোনোদিন, ওঠো এ আড়াইঘর মেঘে,
যদি দিতে পারি যাকে বলে জলরেণু, প্রাণের ছোঁয়াচ –

দশজন মেয়েপুরুষ, দুটো প্রজন্ম রাত তিনটে অব্দি
“এবার একটা ডুয়েট হোক বুলি, তোর প্রাক্তন প্রেমিকের সাথে”
সকাল আটটায় গাদাগাদি ঘুম থেকে উঠে
অপরিচিত জানলার বাইরে এক আটপৌরে পৃথিবীর মুখোমুখি

দুপুরে ঘুরে আসবো কোথাও, শিশুর হাত ধরে তার দর্পে –
মনোরম সবুজ, পাখির কাকলি, পুরোনো মন্দির ইত্যাদি…
বিকেল হতেই “কী ধুলো রে বাবা তোদের শহরে”
তবু সন্ধ্যায় কারো ডেরায় নেমন্তন্ন –
মানুষটি বৌয়ের ক্যান্সার সারাতে সারাতে নিজের
                   দাম্পত্য, ভালোবাসা বাঁচছে রোয়াবে
যেন বিশবছর ধরে ফোরলেনে চালাচ্ছে বুলেট

আর কিছু না হোক
ফিরে গিয়ে ওই বুলেটের শব্দ মন টানবে আলবাৎ।



পথসভায় বৃষ্টি

আকাশ ভরে ধেয়ে আসছে কালো মেঘ,
          তার নিচে ঝড়, সাথে দিগন্তঝাপসা বৃষ্টি-
আমরা আমাদের পথসভার বাকি কর্মসূচী কাটছাঁট করে নিচ্ছি কানে কানে;
ঠিক শেষের স্লোগানগুলোরই ওপর
          বৃষ্টির প্রথম তোড়টা এসে পড়ল…

সবার চোখ বলছে তারা হাসিমুখে জানে যে এ শত্রুর কোনো কারসাজি নয়
আমাদের প্রিয় দেশটার মরশুমী লীলা
এমন যেন আমাদের ঘরণীদের সম্মিলিত অট্টহাস, ‘আরো দেরি করো রোজ!’

রোসো! তোমাদেরও পথসভা হোক! আমরাও বৃষ্টি হতে জানি!…

আর যেদিন একসাথে করব পথসভা?
আমরা ও আমাদের ঘরণীরা, কাঁধে কাঁধে?
আঃ, সেদিনের বৃষ্টি তো সেদিনেরই বৃষ্টি হবে!



মশারি

বন্ধ ঘরে দুটো কবেকার পাতা বিছানা, টাঙানো মশারি।
দরজা ঠেলে খুলছে কামিনী ঝোপের ভিতরের শূণ্যতার হাওয়া।



কদম গাছ

বিরাট কদম গাছটা মাটিতে শুয়ে আছে।
বড় গাছ তো! শাখা প্রশাখায়
মৃত্যু ধরতে সময় লাগবে।
তবু আকাশ ছেয়ে আছে কালো মেঘে,
শুধু গাছটার গা ভরা ফুলে আর রঙ নেই।

এত সেন্টু হোয়ো না,
এর আগে ওদিকের শিমূলটা পড়েছিল,
এবাড়িতে আসার পর কত চৈত্র ওর তুলোর ওড়াউড়িতে পেয়েছি, মনে আছে?
আর, নিজে যে দাঁড়িয়ে আছ তিনতলায়
ওখানে কটা পড়েছিল গাছ, জানো?



চলভাষ

এই একটা ছোট্টো সিগারেটবাক্সের মত চলভাষে, কখনো ভেবেছিলাম?
হাঁটতে, হাঁটতে বা কখনো অটোয়,
মায়ের সাথে স্মরণ করছি টুসুর সেই বাহাত্তরে হত্যার পর
                             নকশাল বলে ছাপ্পা হয়ে যাওয়া,
সাথীকে আশ্বাস দিচ্ছি বিকেলের সভায় নিশ্চিত পৌঁছোবো, “হ্যাঁ, হ্যাঁ
                             সবাইকে খবর দিচ্ছি এক এক করে
ছেলেকে পাচ্ছি দ্বারভাঙ্গা ছাড়িয়ে রাজনগরের কাছে বাইকে তিনজন;
                   কানে বকবকানি শুনে ভাবছি, নাঃ
                   কিছু দৃষ্টি তার আমার থেকে বেশি যৌক্তিক,
                   যা চলছে তার বিরুদ্ধে নতুন ভাবে জোরালো!

কবে যেন বন্ধ হয়ে গেছে গঙ্গার বুকে স্টিমার!
বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা সামনের ডেকে
          একটু আড়াল করে পাঁপর ভাজা হত!
গতকাল একটা সেতু ভেঙে নদীতে পড়ল ট্রাক।
কী আকষ্মিক মৃত্যু হয় মানুষের!

…বাতিল সেই লোহার ডেকে করতল চেপে ভেজাই।
গন্ধ শুঁকি।
ভেজা লোহার গন্ধ।
মুঠোর এই চলভাষে কাউকে পাঠানো যাবেনা এই গন্ধ।

বর্ষণমুখর ধারা কেটে এগিয়ে চলেছি ভেজা অতিকায় লোহা।



চাকায় জল

আকাশ ঢাকা মেঘের আলোয় তুমি।
                             আমার কে?
জানিনা।
চাকায় জল উঠছে ফেনিয়ে।



বারাণসী ৯৯

দেখা হলে হত অঘটন
অথবা ইশ্বরের
লীলা বলতে পারো।
অদেখা নিজেই, তেইশ বছরের –
যত ঐশ্বর্যে ফেরালাম, এখনো ফেরাচ্ছি,
এ ক্ষমতা কোনো ইশ্বরের নেই।
মায়ে ও দুই বোনে মিলে
বাড়িখানা পুরো করেছো দেখলাম।
মাধবীলতা দোতলা ছাড়িয়ে গেছে।
তোমার বোনপোর বয়স,
                   যদ্দুর মনে পড়ছে,
আমাদের অদেখা থেকে বেশ কিছুটা কম।
আর তার মুখে তার মাতৃভাষার জড়তা –
সে আরো এক অনেক বড় অদেখা
আমাদের সবার, যার বিষন্নতা
সন্ধ্যারতির ঘন্টাধ্বনিতে ফুটছিল।
বিরদোপুর, কামাচ্ছার গলিতে
আলো জ্বলে উঠছিল এসটিডি বুথগুলোয়।
গাছের মাথায়
পাখিদের ঘরে ফেরা ডাক তো শোনাও যায়না আজকাল।
তুমি কোন শহরে আছো কর্ণাটকে, জানিনা।



ইঁটের শ্যাওলা

অনেক ধ্রুপদী জীবনশিল্প আমরা আবার থেকে বাঁচি
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে
যখন সন্তানের হাত ধরে ভোরের কুয়াশার মাঠে যাই –
পুজোর ফুল দেওয়ার নামে
পুরোনো ভাঙা পাঁচিলে টাল সামলে উঠে
এক রাশ কনক ফুল
ইচ্ছে করে ডালটা তোমার মাথার দিকে নিয়ে
ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে ঝরাই
নামতে গিয়ে
তোমার বকুনিতে ঘষা খেয়ে
ইঁটের শ্যাওলায় জামাটা হয় সবুজ



ভিত্‌পাথরে ফিরে যাওয়া

আলোর সে বৃষ্টিতে স্নান আমারই রক্তে বিষ হয়ে আছে
তোমার মুখ যার প্রতিটি ফোঁটার সুধায় ভিজিয়েছিলাম।

ওই বিষ আমার স্বাভিমান, তার দংশনই আমার আলো
বৃষ্টি ঝরছে নিরন্তর – সে প্রান্তরে এজন্মে আর যাবোনা।

দেখ বিষ জাগছে শরীরে – দেখ চরাচরে আমার কাঁপন,
অশ্রুর অহঙ্কারে এভাবে ভিত্‌পাথরে ফিরে যাওয়া রোজকার।  



মায়েদের কথোপকথন

তোমার অভিসারে জেগে থাকতে,
তোমার বাতাসী স্ফটিকে মেলতে ঘুমচোখ
ললাটে স্পর্শ করাতে জানালার শীতল গরাদ
এখনো যে কী ভালো লাগে এপ্রিলের মধ্যরাত!

এই তো সময় যখন পৃথিবী ঘুরছে টের পাই।
সামনের অস্পষ্ট মাঠে আমি আমার মায়েদের সাথে বসি।
মায়েদের কোলে মাথা রাখি এক এক করে।
আহ! কত শতাব্দীর ভিতর-উঠোনে 
আমার প্রাচীন শক্তিশালী মায়েদের কথোপকথন!



ছবি

অনেকদিন ধরে ভাবছি
আমার ডাইরিতে তোমার ও ছেলেমেয়ের
একটা ছবি রাখবো –
কিছুতেই হয়ে উঠছে না।
বাইরে মুষলধারে বৃষ্টিতে নিঝুম হয়ে আছে রাত।
শেষে হঠাৎ, বেশ কিছুদিনের জন্য একদিন
বাইরে যেতে হবে অথচ
ছবি থাকবেনা তোমাদের।
বাইরে মুষলধারে বৃষ্টিতে নিঝুম হয়ে আছে রাত।
ছেলে মেয়ে ঘুমিয়ে রয়েছে,
তুমি আমার ওপর রাগ করে
ঘুমের ভাণ করতে করতে সত্যি –
ঘুমিয়ে পড়েছ কি?
বাইরে মুষলধারে বৃষ্টিতে নিঝুম হয়ে আছে রাত।
কাল সকালে জলে ডোবা স্টেডিয়াম, রাস্তা পেরিয়ে
যাওয়া আছে এদিক ওদিক,
নানা কাজে,
বহুবিধ সিঁড়ি ভাঙা আছে রোজকার।



রাগ

এখনো রাগটা রয়েছে তোমার ওপর।
তুমি কেন তেমন হলেনা যেমন
হওয়ার ছিল তোমার, আমারও
হওয়ার ছিল যদিও হতে পারিনি
আমিও।
আর একটু পরে আমি
ক্ষমা চাইব তোমার কাঁধের কাছে মুখ এনে, আর
একটু পরে।
ততক্ষণ যেন অচল থাকে ঘড়ি।