“আরে, ভারত না ভাঙলে হয়তো সোভিয়েতও ভাঙতো না।”
এইরকম একটা মন্তব্য করে যে সন্ধ্যেটাকে
বিতর্কঘন করে তুলল, সে কিন্তু একেবারেই চিন্তাপ্রিয় মানুষ নয়। তবে হ্যাঁ, অনেক ব্যাপারে
চিন্তাহরণ। “সাধন, তোর ওপর জিম্মা দিলাম, খাবারের
দিকটায় তুই থাক। তিনশো জনের রান্না, সব জিনিষ কিনে দেওয়া হয়েছে, মহারাজজিও পুরোনো,
বিশ্বস্ত মানুষ, কিন্তু তুই থাক ওখানে।” ব্যস, সেদিন
হয়তো প্রচন্ড গরম। গেঞ্জি আর গামছায় সাধনকে শুধু রান্নার জায়গায় নয়, এমনকি দরকার পড়লে
সম্মেলনের মঞ্চেও খালেদ সাহেবের মুখের কাছে কান পাততে দেখা গেল।
১৯৯২এর ডিসেম্বর। বাবরি মসজিদ ভাঙার
ঘটনার বোধহয় এক সপ্তাহ বা দশ দিন পর। যদিও শহরে দাঙ্গা ছড়ায় নি কিন্তু কিছু এলাকায়
জবরদস্ত টেনশন। পাড়ার মোড়ে রাতের পাহারা। ঘরের মানুষেরা অনেকেই ঐ শীতের রাতের অন্ধকারেও
ছাতে জেগে কাটাচ্ছে যাতে রাস্তার গতিবিধি বোঝা যায়। কার্ফ্যু সরে গেছে, কিন্তু সশস্ত্র
বাহিনীর টহলদারি চলছে।
তা’বলে এতে
ট্রেড ইউনিয়নের কোনো দায়িত্ব থাকবে না? বরুণদা এভাবেই কথাটা বৈঠকে পাড়লেন। কোনো একটা
ইউনিয়নের বৈঠক না, অফিস কর্মচারীদের সংগঠনগুলোকে নিয়ে একটা কোঅর্ডিনেশন কমিটি আছে শহরে
তারই বৈঠক, একটাই এজেন্ডা, উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং আমাদের করণীয়। অবস্থা যা, তাতে বেশি
লোকের আসা উচিৎ - নেতাদেরই তো বৈঠক! – কিন্তু
উপস্থিতি কম।
হাওয়া তো বহুদিন ধরেই ক্রমে ক্রমে খারাপ
হচ্ছে। সেই রামশিলা পূজনের সময় থেকে। তারপর ভি পি সিং সরকারের সংরক্ষণ বলবৎ করার ঘোষণা
সংগঠনগুলোয় মাঝামাঝি চিড়ের দাগ দেখিয়ে দিয়েছে। “এখানে তো
আমরা তবুও সামলাচ্ছি”, সত্যপ্রকাশ ভাবল, “তাল ঠুকে
বলছি ‘জাতপাতের ঊর্ধ্বে, গর্বের সঙ্গে বলি আমরা শ্রমিক!’ নিজেদের
আর্থিক স্বার্থেই হোক, … কোথাও কোনো সংগঠন ভাঙে নি। একমাস আগে
শ্রমিকদের বিশাল সংসদ মার্চ হল দিল্লিতে। লাল কেল্লা থেকে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের মিছিল।
অথচ বোট ক্লাবের সভায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হল!”
পাশে বসে থাকা নির্মাল্যকে মাথা নিচু করে জিজ্ঞেস করল, “দাদা, আপনিও
গিয়েছিলেন না নভেম্বরের শেষে, সংসদমার্চে?”
-
হ্যাঁ, কেন?
-
বোট ক্লাবের সভায় মনে আছে, কিভাবে স্লোগান তুলে তুলে ভি পি সিংকে
হুট করতে লাগল প্যান্ডেলের এদিক ওদিক থেকে এক দল ছেলে? সব বিজেপির ভাড়ার টাট্টু ছিল।
-
হুম্। আর ম্যাক্সিমাম আপনারই জাতের ছিল, বামুন। আমরা নিজেদের
অল ইন্ডিয়া তৈরি করতে গিয়ে দেখেছি মেরঠ-ফেরঠের দিকে ব্রাহ্মণদের কী বোলবালা!
-
ছাড়ুন। জাতের চালিসা তো খেয়েই নিল দেশটাকে।
-
কিন্তু এখন মনে পড়ল কেন?
- শালারা ভি
পি সিংকে বলতেও দিল না, বসতেও দিল না! তখন তো তিনি আর প্রধানমন্ত্রীও নন। তবু ব্যতিব্যস্ত
হয়ে নিজেই বললেন, আমার জন্য আপনাদের সভা বিঘ্নিত হচ্ছে, আমি যাচ্ছি, আপনারা সভা চালিয়ে
যান।
“আর তার দশ দিন পরেই বাবরি ধ্বংস” নির্মাল্য
বলল, “ঠিক যেন …”
-
কী?
সভাপতির জোরালো আওয়াজ শোনা গেল, “সত্যপ্রকাশ!
তোমরা কি নিজেদের মধ্যে কথা বলার জন্য মিটিংএ এসেছ?” খালেদ আহমদ
সাহেবই সাধারণতঃ এই ধরণের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। বয়োজ্যেষ্ঠ, কর্মচারিদের মাঝে অসাধারণ
বক্তা হিসেবে খ্যাত আর তেমনই দাপট। “কই, কেউ
কিছু বলবে, বরুণবাবুর প্রস্তাবে? সিদ্ধেশ্বর?”
-
আমার তো মনে হয় আমাদের অবিলম্বে একটা শান্তি মিছিল সংগঠিত করা
উচিৎ। একটু ভালো করে মোবিলাইজেশন হোক। সংবেদনশীল আবাসিক পাড়াগুলোয় যেতে হবে।
- গুড! আমারও
তাই অভিমত। আপনারা কী বলেন?
অখিলেশবাবু একটু নড়বড়ে ভাবে বললেন, “কিন্তু এদিকে
কাছাকাছি সংবেদনশীল আবাসিক পাড়া কোথায়? আর পুলিস যেতে দেবে কিনা …। আমরা সাধারণভাবে
যে রুটটা নিই, রেডিও স্টেশনের সামনে জড়ো হয়ে মিছিল করে স্টেশন বা হড়তালি মোড় অব্দি
…” সিদ্ধেশ্বরজি থামিয়ে দিলেন, “ওতে হবে
না অখিলেশবাবু। এটা তো আর ব্যাঙ্ক, বীমা বা রাজ্যসরকারি কর্মচারি বা এমআর-দের ব্যাপার
নয়! রোজকার বেতনচুক্তি, পেনশন, কম্পিউটার ইত্যাদি নিয়েও মিছিল নয়! জনগণের সমস্যা। আমরাও
সেই জনগণের অংশ। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সামনে থেকে বেরোন আর চলুন অশোক রাজপথ হয়ে সব্জিবাগের
দিকে।”
- পুলিস?
- পুলিস আপত্তি করবে না, আমি গ্যারান্টি
নিচ্ছি। এই সরকার নিজেই খুব তৎপর দাঙ্গা রোখার ব্যাপারে।
তাই হল।
বৈঠক থেকে বেরিয়ে গলির মুখের সিগরেটের দোকানে এক-একটা সিগরেট
ধরাচ্ছিল নির্মাল্য আর সঞ্জয়। পিছন থেকে সত্যপ্রকাশ তার সাইকেল নিয়ে দাঁড়ালো। নির্মাল্যকে
উদ্দেশ্য করে বলল, “কথাটা অসমাপ্ত রেখে দিলেন দাদা!”
-
কী?
-
আরে, তখন বললেন না? সংসদমার্চের দশ দিন পর বাবরি … যেন …কী যেন?
- ও! … উনিশশো
ছেচল্লিশ। বছরের শুরুতে আজাদ হিন্দের ফৌজের বন্দীদের মুক্তির প্রশ্নে সারা ভারত যেই
এক হল, আগস্টে কলকাতায় দাঙ্গা বেধে গেল …।
মিছিলের নির্ধারিত দিনে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের
সামনে জমায়েত। লাল শালুর ব্যানার তৈরি করিয়ে আনা হয়েছে – বড়ো বড়ো
করে সিলভার দিয়ে লেখা ‘শান্তিমিছিল’। নিচে কোঅর্ডিনেশন
কমিটির নাম। ওপরে ‘সাম্প্রদায়িক ঐক্য ভাঙার চক্রান্তের
বিরুদ্ধে’। একদিকের ডাণ্ডা ধরে আছে সাধন আর অন্য
দিকেরটা রিজার্ভ ব্যাঙ্কেরই কিশোরজির হাতে। খুব শান্ত, মৃদুভাষী কিন্তু বুঝদার মানুষ।
লাগাতার স্লোগান দেওয়ার স্ট্যামিনা রাখে এমন পরিচিত মুখ বেশ কয়েকজনকে দেখা যাচ্ছে কিন্তু
কেউ স্লোগান দিচ্ছে না। তার মধ্যে সত্যপ্রকাশও একজন।
“কী কী স্লোগান
হবে দাদা?” সত্যপ্রকাশ জিজ্ঞেস করল নির্মাল্যকে।
নির্মাল্য মাঝে মধ্যে নতুন স্লোগান বানায়। ‘শহীদোঁ,
তেরে অরমানোঁ কো, মঞ্জিল তক পহুঁচায়েঙ্গে’, সে-ই পোস্টারে
লিখেছিল তাদের কাত্রাসগড় সম্মেলনের সময়; এখন মুখে মুখে চাউর হয়ে গেছে, শহীদ বেদির সামনে
আকছার শোনা যায়। আরেকটা ফর্ম্যাট বানিয়েছিল। হয় তাদের দাবি, নয় কর্তৃপক্ষের কোনো পদক্ষেপের
উল্লেখ, তারপর প্রয়োজনানুসারে ‘কে লিয়ে’ নতুবা ‘কে খিলাফ’, আর তারপর
ধুয়ো – ‘লড়না হোগা একসাথ’। ‘বেতন সমঝৌতা
কে লিয়ে লড়না হোগা এক সাথ’ বা ‘বেতন কটৌতি
কে খিলাফ, লড়না হোগা একসাথ’।
কিন্তু তার মাথা থেকেও বিশেষ কিছু বেরুচ্ছে
না। ধরতাইয়ের জন্য দিল, “‘হিন্দু, মুসলিম, সিখ, ইসাই’ / ‘হাম সাব’ না মিলছে
না। হুম, ‘সবকে সব হ্যাঁয় ভাই ভাই’। এটাই বল!
তার সঙ্গে ‘কোঅর্ডিনেশন কমিটি জিন্দাবাদ’, ‘মজদুর একতা
জিন্দাবাদ’। ওদিক থেকে শুনছিলেন ছোটোখাটো অবিনাশজি,
সত্যপ্রকাশের সঙ্গেই আসেন। বললেন, “মন্দির-মসজিদ-গিরজাঘর
নে বাঁট লিয়া ভগবান কো / ধরতী বাঁটী, সাগর বাঁটা, মত বাঁটো ইন্সান কো”, শুনে সবাই
বাহ-বাহ করলে একটু গর্বের সঙ্গে বললেন “বিখ্যাত
কবিতা।” “কিন্তু লম্বা
চলন, স্লোগানে চলাতে অসুবিধা হবে”, বলে সত্যপ্রকাশ মাইকটা হাতে নিয়ে ‘ইনকলাব জিন্দাবাদ’ দিয়ে শুরু
করল।
তখনই সিদ্ধেশ্বরজি পৌঁছে কাছে এলেন।
সবাইকে হাত তুলে অভিনন্দন জানাবার মতো করে স্লোগান তুললেন, “ন হিন্দুরাজ
ন খালিস্তান / এক রহেগা হিন্দুস্তান”। সঙ্গে
সঙ্গে সেটা মিছিলের প্রধান স্লোগান হয়ে উঠল। নির্মাল্য জিভ কামড়ালো, ‘ইস, তখন
থেকে ধুয়োটা মাথায় উঠছিল। কিন্তু মাথায় পাকিস্তান ঘুরছিল আর বোকা বনে গিলে নিচ্ছিলাম।
একবার গোর্খাল্যান্ডও মাথায় এসেছিল। কিন্তু দশ বছর আগের খালিস্তানটা এলই না!’… একটা স্লোগান
নিজেই বানিয়ে নিল সত্যপ্রকাশ – সোজাসুজি – ‘জনতা কী
একতা জিন্দাবাদ!’ স্লোগান দিতে দিতে লাইনে দুভাগ হয়ে
এগিয়ে চলল মিছিল। এমপ্লিফায়ারের রিকশাসুদ্ধু দুলাইনের মাঝখানে মাঝ বরাবর জায়গা নিল
সত্যপ্রকাশ। পরে পঙ্কজ, সত্যেন্দ্র বা নির্মাল্য, কেউ মাইক নিয়ে নেবে।
একটু বেশি সময় অব্দি অপেক্ষা করা হয়েছে
তাও লোক খুব বেশি নয়। যেন তাড়াতাড়ি দায়টা পুরো হোক এমন ভাব নিয়ে দ্রুত এগোচ্ছিল মিছিলটা।
রাস্তায় লোকজনও কম। তবে কোথাও কোনো গোলমালের চিহ্ন নেই মানুষের চোখে মুখে। অশোক রাজপথে
ঢুকে পীরবহোর থানা অব্দি সোজা রাস্তা। ডানদিকে বাঁক নিয়ে সব্জিবাগে ঢোকার মুখেই পুলিস
দেখা দিল। তবে বাধা দিল না। জিজ্ঞাসাবাদ করে এস্কর্ট হিসেবে সঙ্গ নিল। সব্জিবাগের ভিতরে
ঢুকতেই সবাই বুঝতে পারল একটা থমথমে আতঙ্কের ভাব কাজ করছে। জমজমাট বাজারটা বন্ধ। কিন্তু
অবাক কান্ড! কোন কোন গলি আর দোকানের ফাঁক ফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসতে লাগল মানুষেরা। যেন
একটা আশ্বস্ত হওয়ার ভাব চোখে মুখে। কাছে এসে সঙ্গ নিল মিছিলের। যেমন করে শীতে আগুনের
কাছে ঘেঁষতে থাকে মানুষ।
বাঁদিকে বাঁক নিয়ে সরু রাস্তাটা ধরল
মিছিল। এখানেই বাঁদিকের গলিতে ঢুকে আজাদ লিথো, নির্মাল্যর মাথায় এল। ১৮ x ২০-র পোস্টারের
বড়ো কাজ হলে মাঝে মাঝেই আসতে হয়। তারপরেই সার সার বেকারির দোকান। ‘ক্যালকাটা
বেকারি’ তার প্রিয়। বানের মত দেখতে পাপা বিস্কুট
আর বাকরখানি কিনে নিয়ে যায়। এখন সে সংসারি। ছেলেমেয়ের বাবা। তবু মাঝে মধ্যে ভীষণ মিস
করে অনলকে। এমন দাগা দিল আর ভোগালো! এখন অফিসার হয়ে ঘুষ কামাচ্ছে। … আর ভোগালো
ঠিক এই বছরগুলোতেই।
উপর্যুপরি চারটে ধাক্কাঃ সোভিয়েত পতন,
নতুন অর্থনীতি, সংরক্ষণ নীতি আর হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার উত্থান। আর তারই মধ্যে নির্মাল্যর
ব্যক্তিগত জীবনে কতো কিছু ঘটল! কাজের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কাছের বন্ধুগুলোও চলে গেল এদিক
ওদিক। আর অনলটা? কাল নির্মাল্যকে পার্টির প্লেজ ভরালো আর আজ নিজেই দুর্নীতি করে বেরিয়ে
গেল। এসবেরই মধ্যে এই শান্তিমিছিলের কর্মসূচি।
খুব বেশি রাজনৈতিকও হওয়া যাবে না। নিজেদের লড়াইগুলো আছে। কাল আবার লড়তে হবে কম্পিউটার
নিয়ে, পেনশন নিয়ে, আগামি বেতন চুক্তি নিয়ে। ঐক্য সর্বোপরি। ভালো ধরেছে সত্যপ্রকাশ – ‘জনতা কী
একতা জিন্দাবাদ!’
দুদিকের সব দোকান বন্ধ, কে জানে কদ্দিন
হল! নইলে রাস্তা দিয়ে মিছিল যাওয়া অসম্ভব হতো। এত পরিচিত, দৈনন্দিন আসাযাওয়ার জায়গাগুলো।
হঠাৎ কেমন অপরিচয়ের আবরণে গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে। তাও তো এই মানুষগুলো আশ্বস্তি পেয়ে
বেরিয়ে এসেছে, মিছিলের অংশ হয়ে হাঁটছে। দোরুখি গলির মুখে ডানদিকে ঘুরে গেল মিছিল। এই
কোনাটায় একসময় মঞ্চ তৈরি হতো পূজোর সময়। সেতার বাজাতেন নিখিল ব্যানার্জি। কী ছিল শহরটা
দশ বছর আগে অব্দিও। হয়তো অবনতি আগে থেকেই ঘটছিল। কিন্তু একটা ঘটনা পুরো দুনিয়ায় মানুষকে
নাড়িয়ে দিয়ে গেল – সোভিয়েত পতন। ঘাড়ে চেপে বসেছে ওৎ পেতে
থাকা বিশ্বপূঁজি।
যা বেরিয়েছিল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে,
সব্জিবাগে ঢুকে তার দেড়গুণ হয়ে গেছে মিছিল। শীতের সন্ধ্যা যেমন তাড়াতাড়িই নামে, আজও
তার ব্যতিক্রন নেই। কলেজিয়েট পেরিয়ে গাছগাছালির মধ্যে খোলা জায়গাটা অন্ধকার হয়ে এসেছে।
সেখানেই সভায় বদলে গেল মিছিল। রাস্তার বিপরীতে মসজিদ। খালেদদার সভাপতিত্বেই হল সভা।
পাঁচ-ছটি কর্মচারি সংগঠনের নেতারা কথা রাখলেন। শেষমেশ সাম্প্রদায়িক চক্রান্তের বিরুদ্ধে
আগুন-ঝরানো বক্তব্য রেখে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করলেন সভাপতি।
সত্যপ্রকাশ, নির্মাল্য, সাধন, অবিনাশ,
সঞ্জয় এবং আরো কয়েকজন চায়ের খোঁজে হাঁটতে হাঁটতে আবার গান্ধী ময়দানে চলে এসেছে। কোথাও
চায়ের দোকান খোলা নেই। শেষে বাস ডিপোর দিকে যেতে হল। একমাত্র নির্মাল্যকেই আবার অশোক
রাজপথে ঢুকতে হবে। বাকি সবাই পশ্চিম বা দক্ষিণ দিকের বাসিন্দা। চায়ের দোকানে বেঞ্চে
বসে নির্মাল্যই শুরু করল কথা, “দেশভাগ বুঝতে গেলে তো আগে দেশটাকে বুঝতে
হতো। আমার সবকিছুই কেমন উল্টো উল্টো।”
“অবশ্য মায়ের
কাছে গল্পে শুনেছিলাম যে বড়ো পিসিমাকে মেয়েদের নিয়ে কোনোরকমে প্রায় এক কাপড়ে আসতে হয়েছিল
এদিকে, পুঁটুলিতে লুকিয়ে রাখা গয়নাগাঁটি সব ছিনিয়ে নিয়েছিল সেনা। সেই বোনেদের সঙ্গে
বন্ধুত্বও ছিল। কিন্তু বর্ডার, ওপার-এপার, পিসি ও বোনেদের সুরক্ষা … এসব ব্যাপারগুলো
ভাসা ভাসা ছিল। গল্প করার মত, থম্বু মেরে দেওয়ার মত নয়।”
“কেন, আপনার
বাবা?” সাধন জিজ্ঞেস করল। “বাবা তো
অনেক আগেই এদিকে চলে এসেছিল। চাকরির খোঁজে।” চা-ওলা
হাতে হাতে চা দিয়ে গেল। একটু আগে হাতে বিস্কুট দিয়েছিল রোহিত। সেটা ভেঙে নির্মাল্য
চায়ের গেলাসে ডোবালো এক টুকরো। “বাঁটোয়ারা এই হিন্দু-মুসলমান ঝগড়াটাকে
পার্মানেন্ট করে দিয়ে গেল”, সত্যপ্রকাশ বলল, “এগোতেই দিচ্ছে
না আমাদের!” অবিনাশজি তখন থেকে কিছু বলার জন্য উসখুস
করছিলেন, শেষে বলেই ফেললেন, “যাই বলুন, এই বাবরি মসজিদ ভাঙার পিছনে
কিন্তু সিআইএ-র হাত আছে। যবে থেকে সোভিয়েত সঙ্ঘ ভেঙেছে, আমেরিকা একদম ঢুকে পড়েছে ভারতের
রাজনীতিতে।”
হঠাৎ ভুতের মতো সামনে এসে ডাকলেন খালেদদা, “সত্যপ্রকাশ!” চমকে উঠে
দাঁড়াতে গিয়ে সত্যপ্রকাশের হাতের গেলাস থেকে চা ছলকে পড়ল, “আমাকে ছেড়ে
দিয়ে চলে এলি?”
-
আপনি ছিলেন কোথায়? আমরা তো সভা শেষ হওয়ার পর খুঁজলাম আপনাকে!
-
(লজ্জিতভাবে হেসে) ছিলাম, ছিলাম। ঐ সামনেই, মসজিদের গলিটায়। আমার
এক খালা থাকেন সেখানে, তাঁকেই দেখতে গিয়েছিলাম।
-
তা, আমাদের বলে গেলেই তো পারতেন।
- আসলে ওনার
ছেলে এসেছিল আমাদের সভায়, সেই নিয়ে গেল।
এগিয়ে এসে ধপ করে বসে পড়লেন নির্মাল্যর পাশে, “তুই তো বাঙালি। এপার না ওপার।"
- আমি খাস পাটনার খালেদ সাহেব। তবে বাবা এসেছিলেন ঢাকা থেকে, সেটা এপার ওপার হওয়ার পঁচিশ বছর আগে।
-
তা তুই বুঝিস দেশভাগ?
-
সেটাই তো বলছিলাম এদের। আগে বুঝলাম তিনটে দেশ। সে যে ভাগ হয়ে
হয়েছে সেটা জানার আগে। তিনটের মধ্যে আবার একটা মুক্ত হল। বাঙালি হিসেবে গর্বিত হলাম।
সেটাও ভাগের কষ্টটা জানার আগে।
-
তা, প্রথম কষ্টটার কথা জানলি কোথায়?
-
পাঞ্জাবে।
-
কী?
- মানে, বাঙালিয়ানায়
নয়, পাঞ্জাবিয়ানায়।
- সত্যি বলছি।
… তখন নতুন নতুন ব্যাঙ্কের কাউন্টারে বসে কাজ করছি বিকেল চারটা
নাগাদ। একটি মেয়েকে সামনে এসে দাঁড়াতে দেখলাম। কাঠ মেরে গেছি ওর সৌন্দর্য দেখে। অপরূপ
সুন্দরী তো ফালতু বিশেষণ, এত পবিত্র মাধুর্যের জ্যোতি কেউ ছড়াতে পারে? যেন হলকা লাগছে,
দূরে সরে যেতে হয়! পিছন পিছন ঢুকলেন তার বাবা, ছোটো খাটো সর্দারজি। বগলে লক্ষ্য করলাম
উর্দু খবরের কাগজ। বললেন তাঁর মেয়ে কঁওয়লজিত। রিসার্চ স্কলার, ম্যাথেমেটিক্সে, তার
একটা একাউন্ট খুলতে হবে। ইন্ট্রোডিউসার হিসেবে সাইন করলেন উর্দুতে। জিজ্ঞেস করতে জানলাম,
উনি উর্দু আর গুরুমুখিই জানেন, দেবনাগরি লিখতে পারেন না। লায়ালপুরে বাড়িঘর ছিল, পার্টিশনে
এসে এখন গুড় কী মন্ডিতে থাকেন।
-
এতে কষ্টের কী বুঝলি?
-
শুনুন তো। ওরা যাওয়ার পর পাশের কাউন্টারে বসা প্রেমচন্দ রামকে
বললাম সর্দারজি সাইন করলেন উর্দুতে! বলল, “করেই তো!” ওদিক থেকে
নন্দন পাসোয়ান বলে উঠল “আরে, প্রেমচন্দ নিজেই তো উর্দুতে লেখাপড়া
করেছে!”
-
কেন?
-
ও তো মাদ্রাসায় পড়েছে!
-
মাদ্রাসায়? হিন্দু ছাত্ররা পড়ে?
প্রেমচন্দ বলল, “অনেক! পড়বে
কোথায়? স্কুলগুলোতে তো গ্রামের দবঙ্গরা নিচু জাতের ছাত্রদের ঢুকতে দেয় না। ঢোকালে মাস্টারদের
ভোগান্তি। তাই আমরা মাদ্রাসাতেই পড়ি। আর সর্দারজি তো এখনকার পাকিস্তানে থাকতেন। উর্দু-হিন্দি
তো লিপির তফাৎ।”
-
এ্যাই সঞ্জয়! এই ছেলেটা একটা প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে এমন জিলিপি
পাকাচ্ছে কেন বল তো!
- আরে শুনুন
না এক মিনিট। মানে, মোদ্দা কথাটা হল দেশ যে কী, সেটা না জানলে তার ভাঙার কষ্টটা পাবো
কী করে? হিন্দু-মুসলমানে আমার কোনোদিনই কিছু ছিল না। কি জানি কেন। বরং, সলমা, রেশমা
ইত্যাদি নামগুলো এত ভালো লাগত যে ভাবতাম ঐরকমই নামের কোনো মেয়ের সঙ্গে আমার প্রেম হবে।
রোজ মুসলিম রোড দিয়েই কলেজে আসা যাওয়া করতাম। কিন্তু এই যে, একদিকে হিন্দুরাও উর্দু
পড়ে, আর সো-কল্ড নিচু জাতের হিন্দু হলে তাকে মাদ্রাসায় ভর্তি হতে হয়, এই দুটো বাস্তব
একসঙ্গে সেদিন ঐ ব্যাঙ্কে কাজ করতে করতে প্রথম জানলাম। আর তার সঙ্গে জড়িয়ে গেল ঐ দেবীপ্রতিমা।
যাকে পাঁচ বছর পর বিয়েতে ফাঁসালো এক জালিয়াত বামুন পুজারি। দশ বছর পর, লালজিটোলার মোড়ে
সেদিন তাকে দেখলাম, শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, মরতে দেরি নেই।
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন খালেদ সাহেব। তারপর বললেন, “ঠিক মতো
বুঝলাম না তুই কিভাবে কো-রিলেট করতে চাইছিস, তবে সে যা হোক, তুই তাকে বিয়ে করলি না
কেন?
-
ওর কাছে যেতেই আমার সাহসে কুলোতো না। কাউন্টারের কাছে এসে দাঁড়াতেই
স্ট্যাচু হয়ে যেতাম। এত পিওর, এঞ্জেলিক, যেন আভা ফুটে বেরোত চারদিকে। যেন আমাদের জগতের
নয়। … তবে যেটা বলছিলাম। দেশকে আরো বেশি করে জানার লড়াইটা বেড়ে গেল
ভিতরে। যত জানছিলাম ততো মনে হতে লাগল যদি ভারতবর্ষ ভাগ না হতো তাহলে এশিয়ার জিও-পলিটিক্স
… এশিয়া কেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দুনিয়াটাই অন্য রকম হতো।
তখনই বেঞ্চের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা সাধন
বিরাট ভাবুকের মতো আওড়ালো ঐ পরা-বাস্তব অতীতদৃষ্টি, “আরে, ভারত
না ভাঙলে হয়তো সোভিয়েতও ভাঙতো না।”
খালেদ সাহেব মাথা ঘুরিয়ে কটমট করে ওর দিকে তাকালেন। ও মুখ কাঁচুমাচু
করে বলতে গেল, “না, মানে আমার …”
-
চোপ্! যা, একটা সিগরেট কিনে নিয়ে আয় আমার জন্য।
-
সিগরেট তো আছে সঞ্জয়ের কাছে, এ্যাই সঞ্জয় দা।
-
আমি তোকে কিনে আনতে বলছি কিনা?
-
কী খাবেন?
-
চার্মস।
সাধন একটা চার্মস কিনে এনে খালেদ সাহেবকে
দিল। সঞ্জয়ের লাইটার দিয়ে ধরালেন। তারপর মুঠোটা হুঁকোর মতো করে লম্বা টান দিয়ে সাধনের
দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকালেন, “তোর মুখ
দিয়ে এই কথাটা বেরুলো?”
তারপর সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, “কী দারুণ
একটা কথা বলেছে আমাদের সাধন, দেখ তো! কিন্তু এধরণের কথার সত্যিমিথ্যা যাচাই করা যায়
না। যেমন, যদি বলি এই পাষন্ড-ভীতু নির্মাল্যটা তার দেবীপ্রতিমাকে ভালোবাসতে ভয় না পেলে
হয়তো সুস্থ, সুন্দর জীবন পেত মেয়েটি! কী রে? কথাটা মনে হয় তোর? … কথাটা এত
সোজাসুজি বলা যে নির্মাল্যর মুখটা তো ছোটো হলই, বাকি সবাইও চুপ মেরে গেল। খালেদ সাহেব
গম্ভীর হয়ে বললেন, “তাই এই ধরণের কথা ভাবতে নেই। যা হয়েছে,
সেটাই বিচার্য বিষয়। যা হয় নি, তার চিন্তায় নষ্ট কোরো না সময়!”
পিএমসিএইচ-এর পাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে বাড়ি
ফিরছিল নির্মাল্য। সার্জিকাল এমার্জেন্সির জন্য বচ্ছরভর যে রাতে চায়ের আর ওষুধের দোকানে
ভিড় থাকে সেটাও এখন কম। খোদাবক্স লাইব্রেরি ছাড়িয়ে রাস্তার মাঝখানের বিশাল বটগাছটার
কাছে পৌঁছোলো। এর নিচ দিয়েই ডানদিকের রাস্তাটায় ঢুকবে। একবার থেমে ওপরে তাকালো। কতো
পাখি ঘুমিয়ে আছে গাছটার ভিতরে। আবার সকালে তাদের কলতান একটা পুরো শহর গড়ে তুলবে পাতার
আড়ালে আবডালে।
কঁওয়লজিতের কথাটা খেলাচ্ছলে বলতে গিয়ে
সিরিয়াস হয়ে গেল। চুরাশির দাঙ্গায় যখন দিনে দুপুরে এই রাস্তাটা চোখের সামনে কার্ফ্যুর
মধ্যেও লুচ্চা লুটেরাদের সাম্রাজ্য হয়ে উঠেছিল – পুলিসের
সামনেই কেউ স-মিলে আগুন লাগাচ্ছে, কেউ ইলেক্ট্রনিকের দোকানের তালা ভাঙছে, কেউ সর্দারনি
দেখলেই …! – কোথায় ছিল,
কেমন ছিল কঁওয়লজিত? তার ভাবা উচিৎ ছিল। ঐ মেয়েটির সঙ্গেই তো এসেছিল তার নজরে ভাঙা দেশের
প্রথম ছবি। কিন্তু নির্মাল্য ভাবে নি।
রাতে বাড়ির গলিটায় ঢুকতে ঢুকতে বুক ছিঁড়ে
নিচ্ছিল কাউকে ভালো না বাসার অপরাধবোধ।
৩০.৫.২৬
No comments:
Post a Comment