Sunday, November 19, 2017

ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির উচ্ছেদঃ দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা এবং জাত-পাত

ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির উচ্ছেদ শুরু হয় ঔপনিবেশিক শাসনের অমান্য ও বিরুদ্ধাচরণ দিয়ে। সেটাই ভারতের আধুনিক ইতিহাস এবং আধুনিক হয়ে ওঠার ইতিহাস। যুগটি শেষ হয়নি, চলছে।
দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা এবং জাত-পাতের উচ্ছেদ সেই সর্বাত্মক উচ্ছেদ-প্রয়াসেরই অঙ্গ। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, ওই তিনটের জন্ম কি ঔপনিবেশিক যুগে হয়েছে? না, তা হয় নি। আগে থেকে ছিল। শ্রেণী-শাসনের স্বার্থে তিনটেরই জন্ম। ঔপনিবেশিক শাসক তিনটেকেই হাওয়া দিয়েছে, বাড়িয়েছে আর নিজের কাজে লাগিয়েছে। ছিল বলেই কাজে লাগাতে পেরেছে; যত দিন থাকবে কাজে লাগাবে।আবার এটাও এক বিচিত্র পরিহাস যে ঔপনিবেশিক শাসনের অমান্য ও বিরুদ্ধাচরণের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়েও, কিছু অমান্য ও কিছু বিরুদ্ধাচরণের মূল কারণ এবং চারিত্রিক বৈশিষ্টই ছিল ওই তিনটি বা ওই তিনটের যে কোনো একটি। আগে থেকেই সামন্তবাদী সংস্কৃতিতে প্রতিপালিত দুর্নীতিগ্রস্ত কেউ, দুর্নীতিজনিত অর্থলাভ সন্তোষজনক না হওয়ায় অসন্তুষ্ট হয়েছে এবং বিরুদ্ধাচরণ করেছে। আগে থেকেই সাম্প্রদায়িকমনস্ক কেউ, ঔপনিবেশিক শাসনের উপস্থিত প্রতিনিধিকুলকে বিধর্মী বলে চিহ্নিত করে সাম্প্রদায়িক বিরুদ্ধাচরণ করেছে। আগে থেকেই জাত-পাত করা মাথা বিষিয়ে উঠেছে ওই একই ভাবে।
খুবই সম্ভব। ইতিহাসের এই ধরণের প্যারাডক্সের সমাধান তাত্ত্বিক বিতর্কে হয়না। হয় ইতিহাসেরই অগ্রগমনে। স্বাধীনতা সংগ্রামের পরবর্তী পর্যায়গুলোয় ওই ধরণের বিরুদ্ধাচরণকারীরা হয় এগিয়ে গেছে, নিজেদের মুক্ত করেছে ওই বৈশিষ্টগুলোর দুষ্প্রভাব থেকে, শামিল হয়েছে যথার্থ বিরুদ্ধাচরণের সামুহিক অভিব্যক্তিতে, নয়তো ফিরে গেছে পিছনে, ঔপনিবেশিক শাসনের সাথে সমঝোতা করে আখের গুছিয়েছে নিজেদের।
এই প্রক্রিয়াটাই অনুধাবনীয়। কেননা, যেমন বললাম - যুগটি শেষ হয়নি, চলছে। এবং, এরই মধ্যে ঔপনিবেশিকতার উচ্ছেদের প্রতর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভাবধারাগত জায়গা করে নিয়েছে বামপন্থী শক্তিরা, যারা শ্রেণী-শাসনের উচ্ছেদের সংগ্রাম করে আর তাই, দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা ও জাতপাতকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার সম্ভাবনাকে শ্রেণী-শাসনের উচ্ছেদ ও সমাজবাদ প্রতিষ্ঠার সাথে যোগ করে।   
কিন্তু এই কথাগুলো বলছি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও সমাজবাদী ব্যবস্থার দুর্বল হওয়ার সাতাশ বছর পর। এই মুহূর্তে সারা বিশ্বেই দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক শক্তির বোলবালা। আমাদের দেশেও রাজনৈতিক শাসন সেই সব শক্তিদের হাতে যারা প্রথম থেকেই সর্বাত্মক উচ্ছেদ-প্রয়াসের বিরোধী। আর তাদেরই কাঁধে ভর দিয়ে এসে গেছে পুনঃঔপনিবেশিকরণ বা নবঔপনিবেশিকরণ।

প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে এই তিনটে প্রবৃত্তির অন্তর্সম্পর্কের দিকগুলো নিয়ে আরো একটা কথা না বলে পারছিনা। একজন দুর্নীতিপরায়ণ মানুষকে নিজের ভিতরের বিশ্বাস থেকে না হোক বাইরের পরিচয়ে একজন সাম্প্রদায়িক বা জাতবিচার করে চলা মানুষ হতেই হবে। শাসনে-প্রশাসনে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে একটা লাইন-আপ তার প্রয়োজন। আবার একজন সাম্প্রদায়িক মানুষ বা জাতবিচার করে চলা মানুষ দুর্নীতিপরায়ণ নাও হতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত বিশ্বাসের স্তর থেকে বেরিয়ে যেই দুজনে রাজনীতির আঙিনায় প্রবেশ করবে তাদেরকে দুর্নীতিপরায়ণ মানুষের সাথে শুধু সহাবস্থানই নয়, সায় দিয়ে, সংরক্ষণ দিয়ে চলতে হবে। এবং সামাজিক সহাবস্থান এবং পারস্পরিক সংরক্ষণের এই ভিত্তিতে যখন তারা রাজনৈতিক শক্তি বাড়িয়ে তোলার প্রশ্নের মুখোমুখি হবে তখন শুরু হবে মেধাগত দুর্নীতির খেলা। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিজেদের দৃষ্টিকে ন্যায়সঙ্গত ঠাউরাতে তারা নিজেদের মত করে পুনর্গঠন করার চেষ্টা করবে অতীত, গুজবে সাজাবে বর্তমান।

২
১৯৯১এর পর থেকে গত ২৬ বছরে ভারতের অর্থনীতিতে যা কিছু ঘটছে তাতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে বিদেশী ও দেশী একচেটিয়া পূঁজি, আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শ্রমিক ও কৃষকেরা। এবং কে বেশি লাভবান হচ্ছে বা কে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সে প্রশ্নটা হয়তো মুলতুবিও রাখা যেত যদি প্রমাণিত হত যেঃ-
১। স্বাধীনতার পর ধাপে ধাপে চালু হওয়া আর্থিক নীতিসমূহের সফলতা (তার বিবিধ নামকরণে আমি যাচ্ছিনা) বিশ শতকের নব্বইয়ের দশকের শেষ নাগাদ একটি যুক্তিসঙ্গত পরিণতিতে পৌঁছে গিয়েছিল অথবা তাদের সম্পূর্ণ বিফলতা শেষ বারের মত প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল;
২। ১৯৯১ সালে শুরু করা আর্থিক নীতিগুলি সত্যিই একান্ত প্রয়োজনীয় ছিল কেননা এই পথেই আর্থিক উন্নয়নের পরবর্তী পর্ব সম্ভাবিত ছিল; মানে এই মুহুর্তে কারো লাভ বেশি হলেও বা কারো ক্ষতি বেশি হলেও দীর্ঘসুত্রে প্রস্তাবিত ছিল যে জনগণেরই লাভ হবে এই নীতিগুলো চালু হলে;
৩। অথবা, সোভিয়েত রাশিয়ার বিপর্যয়ের পর যে একমেরুর দুনিয়া তৈরি হল তাতে সরকার নিরুপায় হয়ে পড়েছিল; তাদের সামনে ‘এছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না’।

তিনটের একটারও সত্যতা প্রমাণ করতে পারেনি ভারতের শাসকশ্রেণী।
প্রথমটির দ্বিতীয় প্রস্তাব অর্থাৎ ‘সম্পূর্ণ বিফলতা’ সম্পর্কে ১৯৯০-৯২ সালেই হঠাৎ জ্ঞানোদয় হয়েছিল কিছু স্বনামধন্য স্বঘোষিত তাত্ত্বিকের । তারা বেশ কিছু বইটইও লিখেছিলো । শেষে দেখলো যাদের মুখ চেয়ে লেখা তারাই বিশেষ পাত্তা দিচ্ছে না আইডিয়াগুলোকে । ইদানিং নরেন্দ্র মোদি আইডিয়াটা ধরেছিলেন । ‘কিচ্ছু হয়নি সাড়ে ছেষট্টি বছরে । যা কিছু করার, তিনিই করেছেন ।’ এখন তিনিও খুব বেশি হাততালি অথবা ‘মোদি-মোদি’ কুড়োতে পারেন না কথাটায়।    
দ্বিতীয় প্রস্তাবটা সরকার বেশ কিছুদিন আউড়ে ছিল, ট্রিক্ল্‌ডাউন তত্ত্ব তারই নির্যাস – মোটামুটি ২০০৪এর পর থেকে, আওড়ানো না ছাড়লেও গুরুগম্ভীর বিষন্ন স্বরে যোগ করছে, ‘শুধু ওতে হবে না, আরো কিছু চাই’, বিশ্বায়নের মানবিক মুখ’। যেমন দেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি সিংহাসনারূঢ় হওয়ার সময় বলেছিলেন । নতুন সরকার আর বলেনা। ১৯শে মে, ২০১৪র বিকেলে ‘টাইমস নাউ’এর তৎকালীন বিখ্যাত গর্জক (যাঁরা বর্তমান সরকারের হয়ে চ্যানেলে সবার সাথে তর্জন-গর্জন করেন) চেঁচিয়ে বলেছিলেন, ‘এন্টাইটেলমেন্টের দিন শেষ হল, এম্পাওয়ারমেন্টের দিন এল’। অর্থাৎ তথাকথিত ‘মানবিক মুখ’ খতম । আর এম্পাওয়ারমেন্ট জনতার কোনো অংশের না হলেও গেরুয়া রেজিমেন্টগুলোর খুব হল এবং এখনও হচ্ছে।
তৃতীয় প্রস্তাবটাই এখন আঁকড়ে ধরার শেষ তাত্ত্বিক খড়কুটো। কিন্তু তত্ত্বটা যে মূলতঃ মিথ্যে সেটার সবচেয়ে বড় প্রমাণ তো সরকারের নিজেরই নীতিসমূহের সেই অংশ যা ২০০৪এ ওই ‘মানবিক মুখ’ হিসেবে চালু হল এবং যার কল্যাণে কিছু নীতি, কিছু ‘ফ্ল্যাগশিপ প্রোজেক্ট’ বিগত কিছু বছর ধরে গ্রামীণ ও শহরী দরিদ্র পরিবারে আয় সৃজনের জন্য এবং জাতীয় আয় পুনর্বিতরণের জন্য চালু করা হচ্ছে! আর ব্যালেন্স অফ পেমেন্টস এর সংকটের সত্যতা যদি তত্ত্ব হিসেবে খাড়া করতেও চায় তারা, তার কারণ তো রাজীব গান্ধী সরকারের সময়কার নীতিবদল -- খোলাবাজার থেকে মহার্ঘ্য বিদেশি ঋণ নিতে বড় দেশি পূঁজিপতিদের হুড়োহুড়ি!

এখন মোটামুটি অনেকেই এটা দেখতে পাচ্ছে যে স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্থনীতির ঝালে-ঝোলে-অম্বলে নামে-বেনামে চল্লিশ বছর ঈষৎ লো প্রোফাইলে থেকে ভারতের একচেটিয়া পূঁজি যে ধনশক্তি সংগ্রহ করেছিল (অর্থভেদে, চুরি করেছিল সরকারী উদ্যমগুলো থেকে) সেই ধনশক্তিই তাদের উৎসাহিত করলো এশিয়া-আফ্রিকা-দক্ষিণ আমেরিকার মাটিতে পা বাড়াবার কথা ভাবতে, আর পা বাড়াবার টিকিট পেতে হলে আমেরিকা-ইওরোপ-জাপানের পূঁজিকে ভারতের ধনসম্পদ দখল করার সুযোগ করে দেওয়াই ছিল একমাত্র পথ। সেটি করার শুভলগ্ন এনে দিল সোভিয়েত রাশিয়ার বিপর্যয়। এ ছাড়া আর কোনো কারণ, কোনো যুক্তি নেই ‘নবউদার’ অর্থনীতির পেছনে।

যাহাঁতক সেই রহস্যময় ‘উন্নয়ন’এর বর্মিবাক্স খুলে দেখা যায়, তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের ফলশ্রুতি হিসেবে সৃষ্ট শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রগুলো এবং এর প্রভাবে বেড়ে ওঠা আরো কিছু পরিষেবা ইত্যাদি… বাদ দিলে উন্নয়নএর সেই বিশিষ্ট ‘উ’টারও দেখা পাওয়া যাবেনা, যা সাধারণভাবে বুর্জোয়া গভর্নেন্সের অঙ্গের – আবশ্যক পরিষেবা সৃষ্টি - গতিবেগ থেকে একরত্তিও বেশি! আর তথ্য প্রযুক্তি বিপ্লবের সাড়া ভারতে পৌঁছোনো কোনোভাবেই নব্য-অর্থনীতির অবদান নয়। তথাকথিত ও বহুনিন্দিত ‘লাইসেন্স-কোটা-পারমিট-রাজ’ থাকলেও তা পৌঁছতো । হয়তো ঘুষগুলো নিচে থেকে উপর অব্দি একটু ভাগ-বাঁটোয়ারা হত, সবটাই ওপরে যেত না। বরং তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব নতুন অর্থনীতির ক্ষেত্রে (বা নতুন রাজনৈতিক-অর্থনীতির ক্ষেত্রে) বাহক-তরঙ্গের (ক্যারিয়ার ওয়েভ) কাজ করেছে।
একটা উদ্ধৃতিঃ-
“For almost all observers, East or West, the political events of the past several years have been stunning.… Observers and participants alike remark that telecommunications and the news media may have facilitated these events and are a new factor to be reckoned with in international political developments. ….increasingly acknowledged role of telecommunications and the information technologies in the transformation of world commerce and international affairs raises the question of whether the awesome power of the information revolution can be deliberately or even more effectively harnessed.”
– A Rand Note, Seizing the Moment: Harnessing the Information Technologies, Steve Bankes, Carl Builder, Rand 1992

৩
ভারতের একচেটিয়া পূঁজির নিজের স্বার্থে ডেকে আনা এই পুনঃঔপনিবেশিকরণের কী প্রভাব তাহলে পড়লো ডিকলোনাইজেশন বা ঔপনিবেশিকতার উচ্ছেদের ঐতিহাসিক প্রকল্পের ওপর? বিশেষ করে, এখানে আলোচ্য সাংস্কৃতিক অসুস্থতার তিনটে প্রবৃত্তি, তিনটে বৈশিষ্ট – দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা এবং জাত-পাতের ওপর?

দুর্নীতি ।
দুর্নীতিমুক্ত শাসনব্যবস্থা এদেশে কোনোকালেই ছিলো না । কিন্তু স্বাধীনতাসংগ্রামে এদেশের মানুষ যে স্বপ্নগুলো নিয়ে শামিল হয়েছিলো তার একটি ছিলো স্বাধীনতার পর দেশে ওপরতলা থেকে নীচের তলা অব্দি দুর্নীতিমুক্ত শাসনব্যবস্থা ও প্রশাসন স্থাপিত হবে । অন্য অনেক স্বপ্নের মত এই স্বপ্নটিও পুরণ হলো না, বরং লোকে তাকিয়ে দেখলো, “ও বাবা, কালো সাহেবরা তো গোরাদের বাড়া !”
তবু ১৯৯১ সাল অব্দি দুর্নীতি প্রধানতঃ প্রশাসনের স্তরে ছিল আর শাসনব্যবস্থার নির্ধারিত আর্থিক নীতি অনুসারে কাজ করার ক্ষেত্রে ছিল । কোনো আর্থিক নীতির নির্ধারণটাই মূলতঃ দুর্নীতির ভিত্তিতে হচ্ছে, এই দৃষ্টান্ত খুব বড় মাপে দেখা দিল ১৯৯১এর পর । এবং সেটা বাড়তে লাগলো প্রতি বছর। যেমন একটা আইন ধরুন, কার্যকরী করার ক্ষেত্রে দুর্নীতি হওয়া এক ব্যাপার আর আইনটা বা তার জন্য তৈরি করা খসড়া বিলটাই দুর্নীতির উৎপত্তি হওয়া আরেক ব্যাপার । এই দ্বিতীয় প্রবৃত্তিটারই প্রতিফলন তো স্পেক্ট্রাম কেলেংকারি বা কয়লা কেলেঙ্কারি ! এবং কী বলা যায় – খুচরো ব্যবসায় বিদেশী লগ্নী থেকে শুরু করে নতুন পেনশনে বিদেশী লগ্নী, ব্যাঙ্কে বিদেশী লগ্নী, বীমায় বিদেশী লগ্নী সবই হয়তো তাই ! যে দিচ্ছে সে আমেরিকায় এবং যেখানে জমা হচ্ছে সেটা সুইজারল্যান্ডে ! একটা ভালো কামান কিনতে গিয়ে কিছু কিক-ব্যাক পাওয়া নিঃসন্দেহে ন্যক্কারজনক । কিন্তু প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত একটা এমন ভুল সিদ্ধান্ত করিয়ে নেওয়া যে এই এই বিশেষ স্পেসিফিকেশনের কামানটাই দেশের জন্য জরুরী, শুধু ন্যক্কারজনক নয়, বরফে ভেজা মোজা পরে অক্লান্ত দাঁড়িয়ে থাকা জওয়ানদের পিছন থেকে গুলি করে মারার শামিল । এই ধরণেরই ব্যাপার আজকাল বেশি ঘটছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রালয়গুলোয়। নরেন্দ্র মোদি সরকার বিগত কংগ্রেস সরকারের অনেক কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে লড়াই দেখিয়ে আর লড়াইটাকে সাম্প্রদায়িক চেহারা দিয়ে ভোট পেয়েছিল। প্রভূত পরিমাণ অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিল একচেটিয়া পূঁজি, কেননা গুজরাতের অভিজ্ঞতায় নরেন্দ্র মোদির ভিতরে তারা নিজেদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত দালাল খুঁজে পেয়েছিল। আর সেটাই হল। এসেই নিজের বিশ্বস্ততা প্রমাণ করতে পাইয়ে-দেওয়ার-দরজা খুলে দিল একচেটিয়া ও বড় পূঁজির জন্য, তাও এমন ক্ষেত্রে, প্রতিরক্ষা ও শস্ত্রনির্মাণের ক্ষেত্রে, যার কাল অব্দি বেসরকারি ক্ষেত্রে যাওয়া, বলতে গেলে নৈতিক ভাবে নিষিদ্ধ ছিল। ব্যাসেল কমিটির শংসায় ব্যাংকে শুরু হওয়া এন∙পি∙এ∙ র কনসেপ্ট তো একটা হাতিয়ার হয়ে গেল – কর্জ নাও, এন∙পি∙এ∙ হতে দাও, বাতিল কর্জ হবে, যদি কম্পানির ওপর দেউলিয়া ঘোষণা করার মামলা করতেই হয়, আগেই অন্য কম্পানি খুলে সাইফনিং করে নিও।       
পুরোনো ধরণের প্রশাসনিক দুর্নীতির তো কথাই নেই । আগে নীচের তলায় দিতে হত মালটা, নীচের তলা নিজেরটুকু রেখে বাকিটা সাহেবের দেরাজে রাখতো সন্ধ্যেবেলায় । এখন সাহেব সোজাসুজি নিজেই নেন – একটা ছোটো অংশ ‘মিষ্টি খাওয়ার জন্য’ নীচের তলায় পাঠিয়ে দেন । নীচের তলা যখন মুর্গী পায়, সেও রেট বাড়িয়ে দেয় তিনগুণ, “আগের সময় তো নেই দাদা, জানেনই ভিজিলেন্স ঘুরছে, হিউম্যান রাইট ঘুরছে, আরটিআই ঘুরছে !”
এমনকি জুডিশিয়ারীর ওপরতলা অব্দি আজ দুর্নীতি পৌঁছে গেছে ।
খোলাখুলি সাংসদ, বিধায়ক কেনাবেচাও চলছে। লবিইং এজেন্ট আগে বাইরে ব্রীফ কেস খুলে বসত! এখন দলের সভাপতি নিজেই সে কাজটা করছে।  
এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন । কিছু দুর্নীতি আছে যা দেশকে নৈতিক ভাবে হয়তো প্রভাবিত করছে কিন্তু জনতার প্রত্যক্ষ ক্ষতিবৃদ্ধি কিছু হচ্ছে না । যেমন তিনটে একই স্তরের কোম্পানির একটি হয়তো একটু বেশি ঘুষের লোভ দেখিয়ে সরকারি স্তরে ক্লিয়ারেন্স পেয়ে যাচ্ছে বিদেশে বা নিজের দেশে কোনো প্রজেক্ট শুরু করার বা হাতে নেওয়ার।
কিন্তু দুর্নীতির একটা নতুন বিরাট ক্ষেত্র খুলে গেছে যা সোজাসুজি জনতাকে প্রভাবিত করছে। যে ক’টি সরকারি স্কীম আছে তার ক্রিয়ান্বয়নে সরকারি আমলা এমনকি পঞ্চায়েত স্তরে দুর্নীতি অব্দি সংবাদ মাধ্যমে বেশ চট করে উঠে আসে। কিন্তু সেই সব এবং আরো কিছু অন্যান্য স্কীমগুলোর ক্রিয়ান্বয়নে সাহায্য করতে যে এনজিওগুলো বহাল করেছে নিজেদের তাদের ভিতরের দুর্নীতির – সরকারি এবং দেশি বিদেশি ফান্ডিংএর টাকার অন্যদিকে চলে যাওয়ার – কোনো হিসেব আমরা পাইনা । আবার এদেরই মাধ্যমে বেশির ভাগ কোম্পানি তাদের তথাকথিত ‘কর্পোরেট সোশ্যাল রেস্পন্সিবিলিটি’র কোটা পুরো করে ।
বামপন্থীরা বলি ‘কোরাপশন বাই ডিফল্ট’ – ভাই, পূঁজিবাদ থাকবে আর দুর্নীতি থাকবেনা তা হতে পারেনা । বিরোধটা পূঁজিবাদের করুন, উন্নয়নের এই গণবিরোধী মডেলের করুন !… আজ শাসকশ্রেণীর বক্তব্যটাও উল্টোভাবে প্রায় একরকম, ‘নিশ্চই! আমরাও তো তাই বলি – উন্নয়ন ! উন্নয়নের এই মডেলটার লাভ বুঝুন, সমর্থন দিন ! দুর্নীতি তো দূর হয়েই যাবে – একটু সময় লাগছে, এই যা !’ আর সত্যিই তো, উন্নয়নের এই মডেলটাকে বেশ ভালোভাবে খাইয়েছে মানুষকে আমাদের মিডিয়া ! আর নাগরিক সমাজের আত্মিক শুদ্ধিকরণের জন্য আন্না হাজারে সাহেব তো আছেনই !

সাম্প্রদায়িকতা।
দাঙ্গা, বিভীষিকাময় ভ্রাতৃসংহারের মধ্যে দিয়েই বিভাজিত হয়ে স্বাধীন হল এই দেশ । দাঙ্গা মাঝে মধ্যেই হয়েছে তারপর। হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার পাশাপাশি ১৯৮৪সালের শিখবিরোধী দাঙ্গাও দেখলো দেশের মানুষ । মন্দির-মসজিদ ভাঙার খেলাও নতুন নয়। স্বাধীনতার পর স্থানীয় স্তরে হয়তো অনেক জায়গায় হয়েছে । কিন্তু ১৯৯২ সালের ছয়ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদের ধ্বংস অনেকগুলো বার্তা বয়ে নিয়ে এল ।
১। যেটি ভাঙা হল সেটি আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া কর্ত্তৃক ঘোষিত সংরক্ষিত মনুমেন্ট ছিল। অর্থাৎ বার্তা দেওয়া হল যে ইতিহাসের বিকৃতিকরণ শুধু বইয়ে সীমিত থাকবেনা, প্রয়োজনে যে কোনো জাতীয় স্মৃতিসৌধকে গুঁড়িয়ে দেওয়া যাবে ।
২। হিন্দুসমাজের বিরাট সংখ্যক ‘নীচু’জাতের মানুষ যারা এক সময় জাতগত উৎপীড়নে বাধ্য হয়ে ধর্ম পরিবর্তন করেছিল তাদের বার্তা দেওয়া হল, যতই জাত-ভিত্তিক উৎপীড়ন হয়ে থাকুক, ধর্ম যখন পাল্টেছ, তোমাদের আমরা বাবরের সন্তান বলেই অভিহিত করব; আর সেই উদ্দেশেই ঘটনাটি ঘটানো হল ছয়ই ডিসেম্বর, ডঃ আম্বেদকরের প্রয়াণদিবসে ।
৩। ধ্বংসটা করা হল জনসমক্ষে, মিডিয়ার একটা বড় অংশের পরোক্ষ সমর্থনে; দশ দিন আগে দিল্লীতে যে কয়েক লক্ষ শ্রমিকের বিরাট সমাবেশ হয়েছিল তার প্রতি মিডিয়ার ঔদাসিন্যের প্রতিযুক্তি হিসেবে সাজিয়ে ।
৪। প্রধানমন্ত্রী চুপ থাকলেন, দুটো সার্ভেলেন্স হেলিকপ্টারও পাঠালেন না, যেটা এমনকি এমত পরিস্থিতিতে ইংরেজ সরকারও নিয়মমাফিক পাঠাতো – তিনি নিশ্চিত জানতেন যে দুটো সার্ভেলেন্স হেলিকপ্টার ঘটনাস্থলের মাথার ওপর কিছুক্ষণ স্থির হয়ে থাকলেই ৮০ প্রতিশত কারসেবক মসজিদের মাথা থেকে নীচে নেমে পড়তো । অর্থাৎ তিনি জানালেন যে নব্যঅর্থনীতির প্রতি সমর্থন জারি রাখলে পূঁজির স্বার্থের সাথে এই হিংসাত্মক হিন্দুত্ববাদের কোনো বিরোধ নেই ।
লক্ষ্যণীয় যে পরবর্তী বোমা বিস্ফোরণ, দাঙ্গা, মুসলিম উগ্রপন্থী কার্যকলাপ ইত্যাদি নিয়ে মুম্বাইয়ে বেশ কিছু ফিল্ম তৈরি হলেও মসজিদ-ধ্বংস নিয়ে একটাও ফিল্ম তৈরি হয়নি।
আর তারপর তো ২০০২ সালে ভারতে প্রথম সরকার বা স্টেট প্রযোজিত ধর্মভিত্তিক গণসংহার সংঘটিত হলো । যিনি তাতে নেতৃত্ব দিলেন তিনি আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী! তাঁর সার্টিফিকেট? না, গণসংহারে তাঁর কোনো হাত ছিলো না, এটা প্রমাণ করা মিডিয়ার মাথাব্যথা নয়। থাকলে থাকতেও পারে, কিন্তু তিনি চলতি ‘উন্নয়নী’ অর্থনীতির সবচেয়ে কঠিনহস্ত প্রয়োগকারী, এটুকুই যথেষ্ট। আর তাই আজ কখনো ‘লাভ-জেহাদ’এর নামে, কখনো গোরক্ষার নামে মুসলমান পীড়ন, মুসলমান নিধন হয়েই চলেছে। এমন প্রধানমন্ত্রী যার মুখে একটু দুঃখের অভিব্যক্তিও নেই। যেমন প্রতিদিন বদলাবার মত দামী জামাকাপড়, চশমা, চটি রাখেন ওয়ার্ডরোবে, তেমনই বিভিন্ন রঙের চোখের-জল রাখেন পকেটে, প্রয়োজন মত মাইকে বা টুইটারে চোঁয়ান। অন্যান্য ধার্মিক সংখ্যালঘুদের ওপরও হামলা চলছে বিশেষ বিশেষ এলাকায়।
এখানেও একটা ব্যাপার দেখার যে গুজরাটে ২০০২ সালের গণসংহারের পর কিন্তু কোনো কর্পোরেট হাউজ কিন্তু এর নিন্দায় এগিয়ে আসেনি । কোনো চেম্বার অফ কমার্স কোনো নিন্দাপ্রস্তাব গ্রহণ করেনি । অর্থাৎ ‘আমাদের দেওয়া উন্নয়নী প্রকল্প যদি শক্ত হাতে ক্রিয়ান্বিত করো তাহলে ওসব দাঙ্গা-টাঙ্গা প্রয়োজনে চালিয়ে যাও, আমরা সামলে নেব !’  

জাতপাত ।
ঔপনিবেশিকতা উচ্ছেদের প্রকল্পে গভীরতম সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রশ্ন !
যদি বাণিজ্যিক হিন্দী সিনেমা দেখার অভ্যেস থাকে, একটু মনে করে দেখুন তো, গত পঞ্চাশ বছরে কটা ফিল্মে নায়কের পদবী ‘উঁচু’ জাতের নয়? উত্তর-নবজাগরণী বাংলায় কটা উপন্যাসে কটা চরিত্র এবং আজকালকার টিভি সিরিয়ালে (হিন্দী বাংলা দুয়েতেই) কটা চরিত্র ‘উঁচু’ জাতের নয়? তাহলে কি সমস্ত লেখক, নির্মাতা, নির্দেশক জাতভেদের সমর্থক? না, তা নয়, কিন্তু বোঝা যায় যে এদেশের, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত মানসের (অর্থাৎ বর্তমান সমাজে বুদ্ধিজীবীতার মানসের) কালচারাল কন্সট্রাক্টের এত ভিতর অব্দি আছে ব্যাপারটা যে রিফ্লেক্সের মত কাজ করে ।  
তবে একটা নতুন অধ্যায় সূচিত হল ১৯৯১ সালে । প্রস্তুতিটা আগের বছরেই হয়ে গিয়েছিল। কেন্দ্রে এবং পাঁচটি রাজ্যে অকংগ্রেসী সরকার ও বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ এবং বিহারে অনগ্রসর জাতের মেরুকরণে উৎসাহিত হয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রী ভি পি সিং ১৯৯০ সালের আগস্ট মাসে ঘোষণা করলেন চাকরীতে অনগ্রসর জাতের জন্য আসন সংরক্ষণ (সুপারিশটা পনেরো বছরেরও বেশী সময় ধরে ঝুলিয়ে রেখেছিল কংগ্রেস সরকার)। ভীমরুলের চাকে ঢিল পড়ল । সঙ্গে সঙ্গে উত্তর ভারতে আগুন জ্বালালো শাসনে-প্রশাসনে ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকা বর্ণহিন্দু সামন্ত-শক্তিরা – ক্ষেপিয়ে তুলল তরুণ প্রজন্মের ছাত্রযুবদের। আর সেই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে তাদের নিজেদের ভোটব্যাঙ্কে শামিল করতে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির ‘রামরথ যাত্রা’ শুরু হল একমাস পর, সেপ্টেম্বরে । ১৯৯১ এর শেষে সোভিয়েত ইউনয়নের পতন এই ঘুর্ণিঝড়ে শামিল করে নিল শ্রমজীবী জনতার একটা বড় অংশকে । এবং এর পরবর্তী পর্যায়ে শুরু হল অনগ্রসর ও তপশীলী প্রতিটি জাতের জাতভিত্তিক সম্মেলন এবং জাতভিত্তিক সংগঠনগুলোকে নতুন জীবনপ্রদান ।
হিন্দী এলাকায় সম্প্রদায়বাদ বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা বিকৃত ভারসাম্য খুঁজে নিল ‘কমন্ডল’ বনাম ‘মন্ডলে’ । আর এসবের খেসারত দিতে হচ্ছে পরবর্তী কুড়ি বছর ধরে, আজ অব্দি। ভিপিসিংএর সেই বিখ্যাত স্লোগান ‘সত্তা মে হিস্‌সেদারী’ (সরকারে অংশীদারী)তে নিজের নিজের জায়গা লোটার জন্য দৌড়োদৌড়ি করছে জাতভিত্তিক ছোটো বড় রাজনৈতিক দল এবং দলের ভিতরকার জোট – ‘উন্নয়ন’এর চলতি মডেলের প্রশ্নে সবার ঘাড় নব্বই ডিগ্রী কাৎ, ‘জী হুজুর! শুধু মন্ত্রীত্ব দিতে হবে!’

          তাহলে ঔপনিবেশিকতার উচ্ছেদের প্রশ্নে ব্যাপারটা কোন জায়গায় দাঁড়াল ? ঠিক যেমন দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা এবং জাতপাতের রাজনীতি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের তাঁবেদারীর প্রশ্নে এক হয়েছিল, নব্যসাম্রাজ্যবাদী প্রকল্প এই তথাকথিত ‘উন্নয়ন’এর প্রশ্নে, দেশে পুনঃওউপনিবেশিকরণের জাল বিস্তার করার প্রশ্নে আজকের দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা এবং জাতপাতের রাজনীতি এক হয়ে গিয়েছে।
          কাজেই প্রশ্নঃ নব্যসাম্রাজ্যবাদী ‘উন্নয়নী’ প্রকল্পটির বিরুদ্ধে শেষ কথাটি না বলে, ওই প্রকল্পটির উচ্ছেদের দিকে অগ্রসর না হয়ে (বরং অনেক ক্ষেত্রে তাকে সমর্থন করে - বিশেষ করে শহুরে তরুণ প্রজন্ম এবং তথাকথিত ‘সুশীল সমাজ’এর দিকে চোখ রেখে কথাটা বলছি) শুধু দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা বা জাতপাতের বিরুদ্ধে কোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক এমনকি রাজনৈতিক আন্দোলন কি আদৌ সফল হবে ? ঔপনিবেশিকতার উচ্ছেদ কি হতে পারবে?

          

যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রযুক্তি

দুটো উপন্যাস
তেত্রিশ বছর আগে* কিনেছিলাম এলেক্স হ্যালির ‘রূটস’। তার তিন বছর পর কিনেছিলাম নর্মান মেলারের ‘দ্য এক্সিকিউশনার্স সঙ’। তিন দশক ধরে বই দুটি আলমারিতে অথবা বাক্সে বন্দী হয়ে ছিল। তিন দশকে ন’বার বাসাবদল করেছি। বই দুটি যতবার বার করেছি প্যাকিং খুলে নতুন বাসায় গুছিয়ে তুলতে, টেনেছে, যেমন করে সব না-পড়া বই টানে। কিন্তু পড়তে শুরু করার জন্য মন কেন জানিনা, যুগিয়ে তুলতে পারিনি।
আজ যে পারলাম, তাও জানিনা কেন পারলাম। ডাইরি দেখছি – ২০শে সেপ্টেম্বর ২০০৯এ শেষ করেছি ‘দ্য এক্সিকিউশনার্স সঙ’। আর ১৩ই নভেম্বর ২০১০এ পড়ে শেষ করলাম ‘রূটস’। সময় লেগেছে অবশ্যই। এক হাজার পৃষ্ঠার ওপর প্রথম বইটি। ছ’শো পৃষ্ঠার ওপর দ্বিতীয়টি। কুড়ি পঁচিশ দিন ধরে খেপে খেপে পড়েছি।
প্রথমটি নিয়ে একটি ফিল্ম তৈরি হয়েছিল বোধহয়; জানিনা কেমন চলেছিল। দ্বিতীয়টি নিয়ে একটি জনপ্রিয় টিভি সিরিয়াল তৈরি হয়েছিল। দুটো বইয়েরই রচনাকাল সত্তরের দশক। স্থান – যুক্তরাষ্ট্র এমেরিকা। কিন্তু বিষয়বস্তু, স্থান, কাল সব একেবারে আলাদা। তবু মনে হল দুটোকে পাশাপাশি রেখে জুড়বার চেষ্টা করে দেখি কী দাঁড়ায়।
যাঁরা উপন্যাসদুটি পড়ে থাকবেন তাঁদের কাহিনীসার শুনিয়ে সময় নষ্ট করার কোনো অধিকার নেই আমার। তবু এই চিন্তায় এগোতে দুটি কাহিনীসার পাশাপাশি রাখার প্রয়োজন আছে মনে হয়।


দ্য এক্সিকিউশনার্স সঙ (ঘাতকের গান)
সল্টলেক সিটি উটা রাজ্যের অন্তর্গত। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপশ্চিম। যাঁরা গেছেন তাঁরা ভালো জানবেন, আমি অগতির গতি ইন্টারনেট খুলে মিলিয়ে নিলাম শহরের জনসংখ্যার ৫৮% খ্রীস্টান ধর্মে মর্মন মতাবলম্বী। মর্মন সম্পর্কে উইকিপিডিয়ায় পেলাম খ্রীস্টান ধর্মের পরবর্তীকালীন সন্তদের (লেটারডে সেন্টস) অনুযায়ী। এই ধর্মমতের স্থাপনা বোধহয় এমেরিকাতেই উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে হয়েছিল। তারা গোঁড়া। তৈরি হতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো কারণে তাদের বিবাদ ছিল। উপন্যাসেও আছে আর নেটেও পেলাম যে সল্টলেক সিটির মর্মনদের জন্য ইতিহাসপুরুষ ব্রিহাম ইয়ং। কোনো একসময়ে ব্রিহাম ইয়ং নামে জনৈক ব্যক্তির নেতৃত্বে অনেক রক্তকর্দ্দমে পথ তৈরি করে মর্মন মতাবলম্বী মানুষেরা এই জনশূন্য মরুপ্রান্তরে এসে উপনিবেশ গড়ে তুলেছিল। অর্দ্ধশতাব্দীকাল তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যুদ্ধ চলে যুক্তরাষ্ট্রীয় সৈন্যবাহিনীর সাথে। অবশেষে সংযুক্তি। সেই উপনিবেশই আজ বিশাল সল্টলেক সিটি। আকাশরেখায় দেখা যায় মর্মন মন্দিরের চুড়া, ব্রিহাম ইয়ং বিশ্ববিদ্যালয়।
কোথা থেকে এসেছিল তারা? পরে জানবো নাহয়। না জানলেও বিশেষ ক্ষতি নেই। আপাততঃ উপন্যাসের প্রসঙ্গে সেটা খুব বেশি প্রয়োজনীয় নয়। যা হোক, আগে গল্পের ছকটা বলে নিই।

শৈশব থেকে পারিবারিক নিঃসঙ্গতার ফলে অপরাধমনস্ক হয়ে পড়া গ্যারি গিলমোর দ্বিতীয়বার দীর্ঘ কারাবাসের পর প্যারোলে ছাড়া পেয়ে সল্টলেক সিটিতে ঠাঁই নিতে আসে। তখন তার বয়স ছত্রিশ। কিন্তু দুবার জেল খাটার ছাপ শরীরে, মুখে। কয়েকটা দাঁত নেই। ভদ্র পরিবারে তার পূর্ব পরিচয় নিয়ে সতর্কতা সে তার গোলমেলে ভাবভঙ্গী দেখিয়ে আরো বাড়িয়ে তোলে। তাকে ভয়ও পায় লোকে। একমাত্র মাস্তুতো বোন ব্রেন্ডা, তার শৈশবের খেলার সাথী, যার স্পন্সরশিপে সে প্যারোল পেয়েছে, তাকে যাচ্ছেতাই করে বকবার ক্ষমতা রাখে। ব্রেন্ডাই জানে, হাইস্কুল পাশ করতে না পারা গ্যারির রুচিবোধ জেলে বসে পড়াশুনো করার ফলে কতটা সমৃদ্ধ। কত সুন্দর আঁকার হাত তার। আর বালকবয়সের স্বপ্নের রাজকুমার গ্যারি কুপারের মত রাজকীয় মন। কিন্তু সবাই তো আর ব্রেন্ডা নয়।
একদিকে ঘরের মধ্যে মর্মন সমাজের অতিধার্মিক, গোঁড়া, নীতিবাদী পরিবেশ আর অন্যদিকে বাইরে হাইওয়ে, পেট্রলপাম্প, পিক-আপ ভ্যান, ট্রাক অর্থাৎ ছড়াতে থাকা নগরায়ণ ও তার ফসল উচ্ছৃংখল জীবন। সমাজটাই তার নিজের বিকাশক্রমে এক বিপন্নতার, সঙ্কটের সম্মুখীন। তার মধ্যে গ্যারি আরেক বেখাপ্পা মানুষ। শৈশব থেকেই জেল খেটে খেটে তার মন আদ্ধেক শিশু, আদ্ধেক বুড়ো। ঠিক সুস্থ যুবকটাই যেন সে হয়ে উঠতে পারে না – কখনো শিশু হয়ে যায়, কখনো বুড়ো হয়ে যায়। অথচ শরীর তো তার মধ্যযৌবনে, তার রোজগার চাই, নারী চাই, ঘর চাই বাঁধার! ... ঘরোয়া পরিবেশে গল্প করতে গিয়ে সে বোঝে তার কাছে গল্পও নেই, জেলের নানান অপরাধকাহিনী ছাড়া। সেসব গল্প শ্রোতাদের ভয় পাইয়ে দেয়, সতর্ক করে দেয়, ঘৃণামিশ্রিত দূরত্বে ঠেলে দেয়।
তবু সে চেষ্টা করে খাপ খাইয়ে নেওয়ার, বাঁচবার। কাজও জোটায় – কখনো এটা, কখনো সেটা। থাকার ঘর জোটায়। বদভ্যাসের মধ্যে থেকে যায় এক ক্রেট বীয়ারের বোতল মাঝরাত অব্দি বসে খালি করা – তাও মাঝে মধ্যে। এমনকি একটি মেয়েবন্ধুও জোটায়, নিকোল। দুই বাচ্চা কোলে সেও এক উচ্ছন্নে যাওয়া মেয়ে।
নিকোলের শৈশব নষ্ট হয় তার পরিবারে। পাগলা গারদে যেতে হয়। কত পুরুষ যে তার জীবনে এসেছে তার গুনতি নেই। বস্তুতঃ সে জানে পুরুষসঙ্গ মানেই ঘন্টাখানেকের মধ্যে কাপড় খোলার জন্য তৈরি থাকা, অথচ সে নিরুপায়। ওঁই সঙ্গটুকুও না পেলে একা একা পাগল পাগল লাগে। আর মেয়েদের তো কথাই নেই। তারা সঙ্গ দেবে কী? কাছে গেলেই বেশ্যা ভেবে সতর্ক হয়ে ওঠে। হাঁটু অব্দি জীন্স আর হল্টার লাগানো স্লীভলেস টপ্‌স পরে সল্টলেক সিটির রাস্তায় নিজের সেকেন্ড হ্যান্ড মুস্ট্যাঙে সে এক বিষন্ন বেপরোয়া। কেউ জানেনা, সে কবিতাও লেখে মাঝে মাঝে।
গ্যারি আর নিকোল ঘর বাঁধার চেষ্টা করে। দুজনেই নিঃসঙ্গ। দুজনেরই মনের অবচেতনে সারাক্ষণ মনে হয় কিন্‌কিন্‌ করতে থাকে এক নিয়তিবোধ যে গোড়া থেকেই সব কিছু ভূল তাদের জীবনে, বোধহয় আর ঠিক হবে না কোনোদিন। তবু কিছুদিন চলে তাদের সংসার।
কিন্তু একেকটা দিন আসে ভীষণ খারাপ। এদিকে নিকোলের সাথে ঝগড়া, ওদিকে কাজের জায়গায় ধ্যাঁতানি, সারাক্ষণের অভাব, বাসস্থানে দূরসম্পর্কের আত্মীয়স্বজনের ঠান্ডা নজর, ব্রেন্ডাও যেন হাল ছেড়ে দিয়েছে... মাথাটা হিমশীতল অপরাধীর মত হয়ে ওঠে গ্যারির। একরাতে দু’দুটো ডাকাতি আর খুন করে ফেলে।
রাতেই ধরা পড়ে নিজের প্রিয় ভ্যানগাড়িটায় পালাতে গিয়ে। বিচার হয় কয়েক সপ্তাহ ধরে। শাস্তি হয় – মৃত্যুদন্ড। আপীল করা তার অধিকার। কিন্তু সে কোর্টকে জানায়, “যদি মৃত্যুদন্ড ঘোষণাটা ঠাট্টা না হয়, তাহলে প্লীজ, যে তারিখ দিয়েছেন সেই তারিখেই যেন মৃত্যু দেওয়া হয়।”
ব্যাস, আপীল না করা ছোট্টো কিন্তু রোমাঞ্চকর খবর হয়ে যায় স্থানীয় সংবাদপত্রে।
এই অব্দি প্রথম খন্ড। খন্ডটির নাম ‘পশ্চিমা কন্ঠস্বর’। এখানে পশ্চিম বলতে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম। এই পশ্চিম কতখানি জুড়ে তা আমি জানিনা তবে যে উটার গল্প সে উটা রাজ্যে, কাহিনীর ইঙ্গিতে স্পষ্ট, গোঁড়া ধর্মাবলম্বী, নীতিবাগীশ সাদা মানুষদের সাংস্কৃতিক প্রভুত্ব। পুরো কাহিনীতে চরিত্রদের আসা যাওয়ার পথে (একমাত্র গ্যারির জেলের অভিজ্ঞতা ছাড়া) একজন কালো মানুষ বা একজন লাল মানুষের দেখা নেই। পরিবারে, পথে, শরাবখানায়, প্রশাসনে মানুষদের কথাবার্তায় যে মানসিক গঠন দেখা যায়, অন্যধরণের মানুষদের উপস্থিতি সম্পর্কে একটা সহজাত অচেতনতা – এ যেন একশো বছর আগেকার দক্ষিণ এমেরিকা। শুধু তফাৎ এই যে তাদের ছিল ভীতি এবং অস্বীকৃতি, এদের, অচেতনতা। খুবই উল্লেখযোগ্য যে গ্যারি নিজেও কালো মানুষদের ঘৃণা করে – ব্ল্যাকহেটার। (আবার নেট ঘাঁটলাম। উটা প্রদেশে সাদা মানুষের প্রতিশত ৯৫। কালোর প্রতিশত ১এর কিছু বেশি। হিস্প্যানিওল ৪এর কাছাকাছি।)
দ্বিতীয় খন্ড শুরু হয় স্থানীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত ওঁই খবরটির সুত্রে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই সংবাদমাধ্যমের যোগাযোগে খবরটি পৌঁছে যায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণকেন্দ্র নিউইয়র্কের মিডিয়া-তারকাদের কানে। সেদিনই আবার জিমি কার্টার ভোটে জেতেন। কিন্তু সে শোরগোলেও চাপা পড়েনা উত্তেজক খবরটা – দশ বছরে এমেরিকায় প্রথম মৃত্যুদন্ড। খোদ উটায় ষোলো বছর পর। তারপর আসামী আবার বলে যে সে আপীল করবে না। দাবী করে যে নির্ধারিত দিনেই যেন তাকে মৃত্যদন্ড দেওয়া হয়!
ছুট! ছুট! ছুট!
পঙ্গপালের মত যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চল মানে কস্মোপলিস থেকে ধেয়ে আসে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি, বৈদ্যুতিন সম্প্রসার-মাধ্যমের প্রতিনিধি আর মানবাধিকার কর্মীরা। কী বিরাট হইচই। গ্যারি গিলমোরের এক্সক্লুসিভ, গ্যারির পরিবারের একেকজনকে খুঁজে খুঁজে ইন্টারভিউ, স্টোরি, বাইট, ফুটেজ... । গ্যারির নামে গেঞ্জি বেরিয়ে গেল, গ্যারির ফ্যানমেল আসতে শুরু করে দিল দিস্তা, দিস্তা। রাতারাতি গ্যারি হয়ে গেল স্টার।
ওদিকে মানবাধিকার কর্মীদের শুরু হল গ্যারিকে বিরক্ত করা আর বই ঘাঁটা। কেন সে আপীল করবে না? আসামী না চাইলেও কি মানবাধিকারের তাগিদে কোনো কোনো সংস্থা বা ব্যক্তি উটা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ফেডারেল সুপ্রীম কোর্টে মামলা দায়ের করতে পারে না?
এরই সাথে শুরু হল এক অন্তঃসলিলা কাব্য। গ্যারির হাতে ভাষা ও শিল্প তো ছিলই। নিকোলকে প্রেমপত্র লেখা শুরু করল পাতার পর পাতা। নিকোল, শরীরসর্বস্ব জগতে বড় হয়ে ওঠা নিকোল সেই প্রেমপত্র পড়তে লাগল। একদিকে গ্যারির কাছে একনিষ্ঠ থাকার চেষ্টা, অন্যদিকে এতদিনকার জীবনের বহুবিধ পুরুষসঙ্গ – নিকোলকে ভর্ত্তি করতে হল মানসিক চিকিৎসালয়ে। সেখানে নিকোল নিজেকে পুনরাবিষ্কার করল কবি হিসেবে। তার কবিতাগুলো পেয়ে গ্যারি যত্ন করে রাখতে লাগল বাক্সে। আর গ্যারির চিঠি জমা হতে থাকল নিকোলের বাক্সে।
বাণিজ্যের কী নজর! খোঁজ পড়ল সেই চিঠি আর কবিতার। হাতে আসার আগেই স্বত্বাধিকার বিক্রী হতে শুরু করল এক হাত থেকে অন্য হাতে। গ্যারি তো এখন বড়লোক। কিছু নিকোলের নামে লিখে দিল।
মিডিয়া আর মানবাধিকারের কাজ একে অন্যকে সাহায্য করল। মিডিয়া চাইছিল গ্যারির মৃত্যুদন্ড বলবৎ হোক। সেদিনটা হবে কার্নিভালের মত। জবরদস্ত ক্লাইম্যাক্স। কিন্তু একটু দেরি হোক তাতে। তাহলে স্টোরিলাইনগুলো যতদূর সম্ভব ডেভেলাপ করা যাবে। বাণিজ্য বাড়বে। মানবাধিকারের হস্তক্ষেপ বার বার খেপে খেপে সেই কাজটাই করে দিচ্ছিল।
অবশেষে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হল গ্যারিকে। জেল ক্যাম্পাস গাড়িতে, ক্যামেরায়, ফ্ল্যাশে ছয়লাপ। বিমানবন্দরে চার্টার্ড প্লেন দাঁড়িয়ে আছে ডজনখানেক।
জেল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ভাড়া করা ঘাতকের দল একটা পর্দার আড়াল থেকে বন্দুকের একঝাঁক গুলিতে প্রাণ শেষ করে দিল তার।
নিকোল তার দুই বাচ্চাকে নিয়ে চলে গেল দূরে।
মর্মন সমাজে শান্তি নেমে এল।
  
প্রথম যৌবনে ডাকাতির অপরাধে জেল হওয়ার পর গ্যারি মাকে বলেছিল, “ওরা আর কী কষ্ট দেবে আমায়? যা কষ্ট আমি নিজেকে দিয়েছি!” তৃতীয় দুনিয়ার দারিদ্র্যে জীবন কাটানো আমাদের কাছে আপাত-দুর্বোধ্য এই উক্তিটার মধ্যে রয়েছে গ্যারির পারিবারিক বিশৃংখলা এবং এমেরিকার সমাজে শৈশব ও কৈশোরের নিদারূণ সঙ্কট।
দ্বিতীয়বার জেলে যাওয়ার সময় আদালতে দাঁড়িয়ে গ্যারি একটা সংক্ষিপ্ত মর্মস্পর্শী বক্তৃতা দিয়েছিল। বিচারকের উদ্দেশ্যে দেওয়া সেই বক্তৃতা এখানে উদ্ধৃত করছি না। কিন্তু অসাধারণ যুক্তিপূর্ণ কিছু বিশ্লেষণ ছিল তাতে, অপরাধীর সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার জটিলতা সম্পর্কে। বস্তুতঃ গ্যারি সেই জটিলতারই শিকার হল।
উপন্যাসের শেষে একটি উপসংহার (আফটারওয়র্ড) আছে। তাতে লেখক নর্মান মেলার, প্রকাশকের অনুরোধে গ্যারি গিলমোরের মৃত্যুদন্ডের সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত এই উপন্যাসটি রচনার ইতিহাস বলেছেন। তিনবছর ধরে দুই ডজন গবেষক, টাইপিস্ট ও আরো কিছু মানুষজনের সাহায্য নিয়ে, ঘটনাবলীর সাথে জড়িত মানুষগুলোর সাক্ষাৎকার (একশো জনেরও বেশি), নোট্‌স (যার মোট আয়তন প্রায় পনেরো হাজার পৃষ্ঠা)... ইত্যাদির বিশ্লেষণ করে এই উপন্যাস রচিত হয়েছে। উপন্যাসকার দাবী করেছেন যে এধরণের লেখায় তথ্যের সাহায্যে সত্যের যতটা কাছে পৌঁছোনো সম্ভব ততটা পৌঁছোবার তিনি চেষ্টা করেছেন।


রূট্‌স (শিকড়)
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। সেখানেই জুফুরে নামের একটি গ্রামে বড় হচ্ছিল কিশোর কুন্টা কিন্টে। বাবা ওমোরো। মা বিন্তা। বংশসূত্রে তারা মালি দেশের কামার এবং মান্ডিঙ্কা উপজাতির বীর কাইরাবা কুন্টা কিন্টের বংশধর।
সেটা ১৭৬৭ সাল। জুলাই মাসের এক ভোরবেলায় কুন্টা গিয়েছিল গ্রামের অদূরে জঙ্গলে। বহুদিন ধরে ইচ্ছে ভালো দেখে একটা গাছের গুঁড়ি কেটে ঢোল তৈরি করবে। তারপর যাবে দূর স্বপ্নের দেশ মালি। মায়ের জন্য, ভাইদের জন্য নানারকম উপহার নিয়ে আসবে। কালো উজ্জ্বল মুখে গুঁড়োকালি মেখে সেজে থাকা গ্রামের তরুণীদের একটিকে বাছবে নিজের ঘর বাঁধতে।
গাছের গুঁড়িটা বেছে ঝুঁকে যাচাই করার মুহূর্তে সে ধরা পড়ল ক্রীতদাস পাচারকারী দালালদের হাতে। মুক্ত হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টায় রক্তাক্ত হতে হতে নিজেকে পেল জাহাজের খোলে – উলঙ্গ, আরো দেড়শো উলঙ্গ দেশবাসীর সাথে। শিকলবাঁধা অবস্থায় চাবুক খেতে খেতে, নিজেদের মল-মুত্র-বীর্যে ঘেয়ো হতে হতে, তিন ভাগের খেপে খেপে মৃত দু’ভাগ বন্দীকে সমুদ্রে ডুবিয়ে দু’মাস পরে এক ভাগ পৌঁছোলো এমেরিকা মহাদেশের উপকূলে। দাসবাজারে তারা ক্রীত হল একে একে। কুন্টা কিন্টের নাম হারিয়ে গেল। মালিকের নামে নামকরণের প্রথায় তার নতুন নাম হল টবি ওয়ালার।
বহুবার পালাবার চেষ্টা করল কুন্টা। শেষ চেষ্টার শাস্তি হিসেবে তার ডানপায়ের পাতার আদ্ধেক কুড়ুল দিয়ে কেটে ফেলা হল। কবে যেন টের পেল সে – সতেরো বছরের কিশোরটি এখন বছর তিরিশের মধ্য যৌবনে। তিরিশও পেরিয়ে গেল। সে কি বাবা হবে না? কাইরাবা কুন্টা কিন্টের বংশ তার, মুক্ত হতে না পারার ব্যর্থতায় হারিয়ে যাবে? ... মাঝে মধ্যেই খবর আসে নানা জায়গায় গোলাম-ব্যারাক থেকে পালাবার, ছোটো ছোটো বিদ্রোহের ব্যর্থ চেষ্টার! ফিসফিসিয়ে কথা বলে তারা রাত্তিরবেলায়। ... এর মধ্যে কুন্টার ভালো লাগে বেল নামে মেয়েটিকে। তার থেকে বড়। মান্ডিঙ্কা পরম্পরায় মেয়ের বয়স পনেরো হওয়ার কথা। বেলের বয়স পঁয়ত্রিশ, নাকি চল্লিশ। ভারি জবরদস্ত স্বাস্থ্যবতী। তবু এই তো তার প্রাণ বাঁচিয়েছিল। কাটা পায়ে গ্যাংগ্রীন হওয়া রুখে দিয়েছিল। রাতের পর রাত জেগে স্নেহে শুশ্রূষায় তাকে সারিয়ে তুলেছিল। ... মালিকের অনুমতি নিয়ে তারা ‘ঝাঁটা ডিঙোয়’ (বিয়ে করে)।
মেয়ে হয়। বড় জেদি কুন্টা – কিছুতেই ছাড়তে চায় না তার আফ্রিকীয় পরিচয়, আত্মবিস্মৃত ক্রীতদাসদের দেখে তার রাগ হয়। সদ্যোজাতকে মায়ের কোল থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায় রাতের আকাশের নির্জনে ... বেল সন্দিগ্ধ স্বরে প্রশ্ন করে, মানে? আগের দুটো বাচ্চা তো কোল থেকেই বিক্রী করে দেওয়া হয়েছিল! কুন্টা জবাব দেয়, “তাই এর নাম ‘কিজ্জী’ মানে ‘এখানেই থাকো’।”
কিন্তু কিজ্জী থাকে না। গোপনভাবে লেখাপড়া শিখে নেওয়ার এবং সেই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে নিজের প্রেমিকের জন্য জাল ‘ট্র্যাভেলিং পাস’ (ক্রীতদাসদের লাগত নিজের মালিকের খামারের বাইরে যেতে – না থাকলে পুলিস ও গোলাম-ধরিয়ে চরেরা বেধরক মার দিয়ে ধরে ফেরত পৌঁছে দিত খামারে) তৈরি করে দেওয়ার গুরুতর অপরাধে শেরিফ তাকে ধরে। তার মালিকের অনুমতি আদায় করে বিক্রী করে দেয় বাজারে।
ষোলো বছরের কিজ্জী নতুন মালিক কর্তৃক প্রতি রাতে ধর্ষিত হতে হতে ভাবে কোথাও জেলের কুঠরিতে মরতে থাকা তার হতভাগ্য প্রেমিকের কথা। ধর্ষণের ফল হয় – একটি সাদাটে সন্তান। ক্রীতদাসের জীবনে সেটা কোনো অপমান নয়, বেঁচে থাকার বিরাট অবলম্বন। নিজেই কিজ্জী তার সন্তানের কানে দেয় জাতিস্মৃতি – আফ্রিকীয় পিতামহের, গোলাম-ধরিয়েদের হাতে ধরা পড়ে সমুদ্র পার হয়ে আসার কাহিনী, পালাবার শেষ চেষ্টায় পায়ের পাতা কাটা যাওয়ার কাহিনী।
কিজ্জীর মালিক ওস্তাদ মোরগ-লড়িয়ে। মোরগ-লড়াইয়ের বাজি জিতেই সে আজ হতদরিদ্র গোলাম-ধরিয়ে চরদের শ্রেণী থেকে উঠে সদ্য-বড়লোক হয়েছে। পাঁচটা ক্রীতদাস পোষার ক্ষমতা রাখে। কিজ্জীর ছেলে জর্জের চোখে সে দেখতে পায় মোরগ-খেলার নেশা। তার নিজস্ব মোরগ-ট্রেনার ক্রীতদাস মিঙ্গোর হাতে সঁপে দেয় জর্জকে।
বড় হতে হতে জর্জ হয়ে ওঠে দশটা খামারে নামডাকওয়ালা চিকেনজর্জ। মালিকের বশম্বদ, মাথায় ডার্বিটুপি, গলায় সবুজ স্কার্ফ। ওস্তাদ মোরগ-লড়িয়ে। পুরো গোলাম-ব্যারাক তার আচার-ব্যবহারে ক্ষুব্ধ।
কোথাও জর্জের মধ্যে একটা দ্বিচারিতা থাকে। শৈশবে মায়ের মুখে শোনা তার আফ্রিকীয় পিতামহের কাহিনী আর কথার ছলে মায়ের মুখ ফস্কে বেরিয়ে যাওয়া শব্দ থেকে বুঝতে পারা যে সে ধর্ষণের সন্তান – ওই ‘মাস্‌সা’ (মাস্টার শব্দের মৌখিক বিকৃতি, মালিকদের প্রতি গোলামদের সাধারণ সম্বোধনসূচক) টম লীই তার পিতা – তার ভিতরে দ্বিচারিতা গড়ে দেয়। একদিকে মালিকের মোরগটিকে জেতাবার জন্যে জান লড়িয়ে দেয়, অন্যদিকে পাতি মোরগ-খেলায় বাতিল মোরগগুলো নিয়ে যাওয়ার অনুমতি আদায় করে মোট বাজির টাকার কিছুটা পুরস্কার হিসেবে পেয়ে জমিয়ে রাখতে, যাতে কোনোদিন সে নিজেকে ও মাকে মুক্ত করার দাম মালিককে, থুড়ি, পিতাকে দিতে পারে।
সে সময়টা বিদ্রোহের ও বিদ্রোহদমনের গল্প বারবার দক্ষিণ এমেরিকার এদিক ওদিক থেকে, বিভিন্ন খামার ও রাজ্য থেকে ফিরে ফিরে আসার সময়। অন্যদিকে দাসপ্রথার বাইরে থাকা উত্তর এমেরিকায় ইংল্যান্ডের বিরূদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলন গড়ে ওঠার খবর আসার সময়। প্রতিটি খামারে, গোলামঘরগুলোতে ফিসফাস, উত্তেজনা, উদ্দীপনা ও কিছুদিন পর বিমর্ষতা প্রায় অভ্যাসে পরিণত হওয়ার সময়।
চিকেনজর্জ বিয়ে করে অন্য খামারের ক্রীতদাসী ধর্মভীরু মাটিল্ডাকে। জর্জের মালিক মাস্‌সা লী মাটিল্ডাকে কিনেও নেয় যাতে দুজনে একসাথে থাকতে পারে। সচরাচর ক্ষেতখামারে কাজ করা ক্রীতদাসেরা পায় না এ সুযোগটুকু। জর্জ পায় চিকেনজর্জ বলে। মাটিল্ডার গর্ভে একে একে সন্তান জন্মায় সাতটি। চার ছেলে, তিন মেয়ে। ওদিকে নিজের দ্বিচারিতায় জর্জ একদিকে মালিকের চামচা, একনম্বর দারুবাজ ও মাগীবাজ। অন্যদিকে স্নেহশীল পিতা ও শুধু কিজ্জী নয় পুরো গোলাম-ব্যারাকের মুক্তি কিনে দেওয়ার ইচ্ছে রাখা সন্তান। নিজের তৃতীয় ছেলে, যার নাম মালিকের নামে ‘টম’, তাকে ওস্তাদ কামারের শাগরেদী করতে পাঠিয়ে দেয় মালিকের কাছে তদ্বির করে।
টম ফিরে আসে ওস্তাদ কামার হয়ে, মালিকের খামারে জায়গা পায় দোকান খোলার। মালিকের আয় বাড়ে, টমের কারিগরী শিল্পের সুনাম পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সুদিন থাকে না। খুব বড় একটা মোরগখেলায় বাজি ধরে সর্বস্বান্ত হয় টম লী। বাজির পুরো টাকা দিতে না পারার খেসারৎ হিসেবে চিকেনজর্জকে দিয়ে দেয়।
চিকেনজর্জ নতুন মালিকের সাথে কয়েক বছরের জন্য চলে যায় ইংল্যান্ড। ওদিকে টম লী সব কিছু খোয়াতে খোয়াতে শেষে কিজ্জী ও আরো তিনজন বুড়োবুড়ি ছাড়া বাকি সব ক্রীতদাসদের বেচে দেয় অন্য খামারমালিকের হাতে।
নতুন খামারে মাটিল্ডার অভিভাবকত্বে ও টমের নেতৃত্বে পুরো পরিবার আগের থেকে অনেক সুখেই দিন কাটাচ্ছিল। নতুন মালিকেরাও একটু উদারপন্থী। সময়টাও বদলাচ্ছে। রেললাইন আসছে। টেলিগ্রাফ আসছে। কিছু বছর আগেই হাইতির সফল বিদ্রোহ তার রক্তাক্ত দমন সত্ত্বেও ছাপ রেখে গেছে হাওয়ায়। ওদিকে উত্তর এমেরিকায় স্বাধীনতা ঘোষণাও হয়ে গেছে। দক্ষিণ তৈরি হচ্ছে ইয়াঙ্কি উত্তরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য। ...এমনই আবহাওয়ায় প্রতিশ্রুত সময়ের তিন বছর বেশি লন্ডনে কাটিয়ে ফিরে আসে চিকেনজর্জ।
নিজের খামারে গিয়ে দেখে কেউ নেই। শুধু স্মৃতিভ্রষ্ট রাঁধুনী মালিজী মাসী, আর আগের মতই পাজি কিন্তু সর্বস্বান্ত কঙ্কাল টম লী। মা কিজ্জী অদূরে মাটির নীচে। কবে যেন শায়িতা। মালিককে ঠেসে মদ গিলিয়ে, সিন্দুক ভেঙে নিজের মুক্তিপত্র মুঠোয় নিয়ে বেরিয়ে যায় চিকেনজর্জ, ঘোড়া টগবগিয়ে নিজের পরিবারের খোঁজে।
নতুন খামারের বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে টমের বৌ, আধাকালো-আধাইন্ডিয়ান আইরিন সবচেয়ে আগে দেখতে পায় লোকটিকে। ঘোড়ার পিঠে এগিয়ে আসছে – কালো ডার্বি, সবুজ স্কার্ফ। এত গল্প শুনেছে সে নিজের শ্বশুরের! চেঁচিয়ে ওঠে, “চিকেনজর্জ! চিকেনজর্জ!”
এতদিন পর নিজের পরিবারের কাছে ফিরেও থাকা আর হয় না তার। কেননা আইন অনুসারে দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে মুক্ত গোলামদের স্থান নেই। পরিবারের স্বার্থে চিকেনজর্জ হারিয়ে যায় আবার।
ওদিকে যুদ্ধ তীব্রতর। প্রতিদিন মন ভেঙে দেওয়া খবর আসছে যে দক্ষিণের সঙ্ঘ জিতছে। ক্রীতদাসপ্রথা ঘুচিয়ে নতুন যুক্তরাষ্ট্র গড়তে চাওয়া উত্তরের সেনা হারছে।
অবশেষে দিন ঘুরতে শুরু করে। দক্ষিণের সঙ্ঘ একের পর এক যুদ্ধক্ষেত্রে হারতে হারতে শেষে আত্মসমর্পণ করে। যুক্তরাষ্ট্র এমেরিকা গঠিত হয়। দাস-মালিক ও আরো হরেকরকম সাদা-জিগিরদারদের মুখ চুন করে ক্রীতদাসপ্রথা আইনতল নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।
দু’এক রাতের উৎসব। তারপরেই সত্যটা মুখব্যাদান করে সামনে দাঁড়ায়। মুক্ত হলেই বা কী? কাজও করেই তো খেতে হবে! তা পুরোনো মালিকের খামারে কাজও করে খাওয়াই তো ভালো!... কিন্তু বুড়ো চিকেনজর্জ ঘোড়ায় চড়ে বীরের মত ফেরে মুক্ত দক্ষিণে। নতুন স্বপ্ন দেখায়, “চল, নতুন জমি আবাদ করি”। দুই ডজন গাড়ির ক্যারাভানে মাস্‌সা মারে’র গোলামপরিবারগুলো সবাই পাড়ি দেয় নতুন আবাদের মুক্ত দিগন্তে।
সেখানেও অবরোধ – কালোদের প্রতি ঘৃণা সেখানেও কম নয়। কিন্তু তারা আজীবন দাসত্ব করেছে। কঠিনতম পরিস্থিতিতেও জীবনের ফসল বুনতে তারা অভ্যস্ত। তারাই তো ক্ষেতে, খামারে, রেলপথে, কাঠকলে, কামারশালায় তিলে তিলে গড়ে তুলেছে এমেরিকা!
তারা বেঁচে থাকে। স্বচ্ছল হয়ে ওঠে। তারা গড়ে তাদের বাড়িঘর, তাদের সন্তানদের স্কুল, তাদের নিজস্ব গির্জা। এমনকি ধীরে ধীরে ওই অঞ্চলের স্বনামধন্য পরিবার হয়ে ওঠে তারাই।
টম, যে কামার হয়েছিল, চিকেনজর্জের তৃতীয় ছেলে, আফ্রিকার জুফুরে গ্রাম থেকে ধরে নিয়ে আসা ক্রীতদাস কুন্টা কিন্টের প্রপৌত্র, তার কনিষ্ঠ মেয়ে হল সিন্থিয়া। সিন্থিয়া আর উইল পামারের মেয়ে হল বার্থা, বার্থা জর্জ। বার্থা জর্জ ও সাইমন এ∙ হ্যালির সন্তান হলেন এই উপন্যাসের রচয়িতা এলেক্স হ্যালি।    

উপন্যাসের শেষ অধ্যায়ে লেখক কুড়ি পৃষ্ঠায় বলেছেন তাঁর বারো বছরের গবেষণার রোমাঞ্চকর কাহিনী। গাম্বিয়ায় সেই জুফুরে গ্রামে গিয়ে মৌখিক ইতিহাস-কইয়ে পরম্পরাগত ‘গ্রিয়ট’দের কাছে মান্ডিঙ্কা উপজাতি ও কিন্টে বংশের কাহিনী শোনা, গ্রামের মানুষদের কাছে কিন্টে বংশের বংশধর হিসেবে স্বীকৃত ও অভিষিক্ত হওয়া, পোর্ট লুইসের নথীপত্র ঘাঁটা, আন্নাপোলিস বন্দরের মালখানার রেকর্ড ঘাঁটা, স্পট সিল্ভানিয়া কাউন্টির দাস কেনাবেচার রেকর্ড দেখা, শেষে অন্তর্বাস পরে জাহাজের খোলে বারো রাত এটলান্টিকের দোলায় লোহা আর কাঠের ঘষা খাওয়া। মাথার মধ্যে ছিল সেই জাতিস্মৃতি যা বাপমাহারা ধর্ষিতা মা কিজ্জী ও তার সন্তান চিকেনজর্জের আদেশ মত কুন্টা কিন্টের বংশধরেরা পরবর্ত্তী প্রজন্মের কানে দিয়ে গেছে – আদিদেশ আফ্রিকা, ‘ক্যাম্বি-বোলোঙ্গো’ নদী, ভোরের জঙ্গলে ঢোলের জন্য গাছের গুঁড়ির খোঁজ, ক্রীতদাস-বাহক ‘টোবর’ জাহাজের খোলে ছয় চাঁদের (তিন মাসের) নারকীয় সফর, পালাবার শেষ চেষ্টায় পায়ের পাতা কাটা পড়া।
ছ’শো অষ্টআশি পৃষ্ঠার এই বই কালো মানুষের চোখ দিয়ে দেখা এমেরিকা দেশটার গড়ে ওঠার ইতিহাস।
এবং এই কালো মানুষ সত্তরের দশকের ব্ল্যাকপ্যান্থার বা কোনো উগ্রপন্থী নয়। কালো নেতা ম্যালকম এক্সের আত্মজীবনী লেখক ছিলেন এলেক্স হ্যালি। ‘রূট্‌স’ তাঁর দ্বিতীয় বই। ঘাতকের হাতে নিহিত ম্যালকম এক্স, কালো ও সাদা মানুষদের একসঙ্গে মিলে মিশে কাজও করার প্রয়োজনের কথা বলতেন।


বিয়ন্ড দ্য মেল্টিং পট
‘বিয়ন্ড দ্য মেল্টিং পট’। বাংলা করতে গেলে অর্থের দিক থেকে ‘পুনর্গঠনের সূচনা’ই করতে হয়, ‘গলনপাত্রের ওপারে’ করার কোনো অবকাশ নেই। তবে ‘মেল্টিং পট’ কথাটার মধ্যে একটা কাব্যিক ভাব আছে। বইটির যুগ্ম রচয়িতা নাথান গ্লেজার এবং সেই ভারত-পরিচিত ড্যানিয়েল প্যাট্রিক ময়নিহান। বিংশ শতকের সত্তরের দশকে নিউইয়র্ক মহানগরে বসবাসকারী সংখ্যালঘু যথা নিগ্রো, পুয়ের্তোরিকান, ইহুদি, ইটালিয়ান এবং আইরিশ জনগোষ্ঠির সমস্যাবলী নিয়ে একটি সমাজশাস্ত্রীয় গবেষণা।
তবে এই বইটির প্রসঙ্গে আসার আগে উপরোক্ত দুটো উপন্যাসকে পাশাপাশি রেখে দেখি কী কী দুটোতেই সমানভাবে পাওয়া যায়। প্রথমেই দেখা যায় এমেরিকান শ্রমের প্রকৃতি। জাত চেনা যাকে বলে আর কি। লেখকদ্বয়ের তথ্যনিষ্ঠা শিক্ষণীয়। দ্বিতীয় বিশেষত্ব হল বাস্তব ঘটনার চিত্রায়ণ। বাস্তব ঘটনার চিত্রায়ণ বলেই তথ্যনিষ্ঠার প্রয়োজন অতটা বেশি ছিল। কিন্তু জানতে ইচ্ছে করে ১৯৭০এর দশকের এমেরিকায় বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে আর কোন কোন উপন্যাস লেখা হয়েছিল এবং এটা কোনো ঝোঁক ছিল কিনা সেই দশকের। আর, যদি ছিল তবে কেন ছিল। বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশক আন্তর্জাতিক স্তরে একটি বিশেষ দশক, তাই জানতে চাই। তৃতীয় বিশেষত্ব হল রাষ্ট্রযুক্তি। যদিও দুটো উপন্যাসের কাল এবং পাত্র ভিন্ন, স্থান কিন্তু একটাই – এমেরিকা। অথবা ঘুরিয়ে বললে, স্থান আলাদা হলেও কাল কিন্তু একটাই –এমেরিকা। এলেক্স হ্যালির উপন্যাসের বিষয়টাই এমন যে ইতিহাসের বিশাল প্রবাহে তিনি একটি তন্বী স্রোতস্বিনীর পরিচয় খুঁজতে খুঁজতে এগিয়েছেন। আবার সেই পরিচয়েই চিহ্নিত করেছেন ইতিহাসের প্রবাহটিকে। শতাব্দীব্যাপী এক পারিবারিক দিনপঞ্জী। শিকড় থেকে শুরু করে প্রধান কান্ডটিকে আকাশের দিকে এগিয়ে দিতে গিয়ে নির্মম হাতে বাদ দিয়েছেন গোড়ার দিকের ডালপালার বিস্তার। কুন্টা বন্দী হওয়ার পর তার বাবা-মা ওমোরো আর বিন্তার কী হল? উপন্যাসে নেই। মালিক তাদের মেয়ে কিজ্জীকে বিক্রি করে দেওয়ার পর কুন্টা ও বেলের কী হল? উপন্যাসে নেই। ... কাব্যধর্মী এই উপন্যাসের শেষ একটি গূঢ় নীতিবাক্য বা বাকধারা দিয়ে – ‘জয়ীরাই ইতিহাস লেখে’।
কাদের জয়? কাদের ওপর? কালোদের জয়? সাদাদের ওপর? আফ্রিকার জয়? এমেরিকার ওপর? কোনোটাই না। মুক্তিসংগ্রামের জয়? দাসপ্রথার ওপর? অবশ্যই। কিন্তু আরো কিছু। ভালোবাসার জয়। ঘৃণার ওপর। আর একটি দৃষ্টিভঙ্গীর জয় – এমেরিকা আমাদেরও, ঠিক ততটাই যতটা তোমাদের। মাটিতে রক্ত ঝরিয়ে, ফসল ফলিয়ে সেই অধিকার আমরা অর্জন করেছি। এই বহুবর্ণী এমেরিকাকে অস্বীকার করতে চেও না, কুক্ষিগত করতে চেও না, নিজেরাই শেষ হয়ে যাবে।
নর্মান মেলার স্টাইলের দিক দিয়ে বেশি আধুনিকতাবাদী। কাব্যধর্মীতা, নীতিবাক্য ইত্যাদি নেই; কাটাকাটা ভাষা। বিষয়টাও অন্যরকম। যেন ১৯৭৬ সালের এমেরিকার সমাজজীবনের অনুপ্রস্থফলক। কিন্তু নামটা লক্ষ্য করেছেন? ঘাতকের গান। কে ঘাতক? জেলার? ভাড়াটে ঘাতকেরা? প্রোভোর জেল? উটার কোর্ট? পূর্বদিক থেকে উড়ে আসা মিডিয়াতারকারা, যারা গ্যারির মৃত্যুটাকে লোভনীয় পণ্যসামগ্রী করে তুলছিল? নাকি পুরো সমাজজীবনটাই – ঘাতক ঔদাসীন্যে, ঘাতক শাসনতন্ত্রে এবং ঘাতক পণ্যমন্ত্রে পর্যবসিত?
সুইডিশ চলচ্চিত্র পরিচালক ইংগমার বার্গম্যানের একটা ফিল্ম দেখেছিলাম, ‘ফ্যানি অ্যান্ড এলেকজান্ডার’। দুই শিশু ভাইবোন। শৈশব কাটছিল আমাদের সাধারণ পৌত্তলিক হিন্দু সমাজের মত সবকিছু মানিয়ে হাসিখুশি চলা এক ক্যাথলিক পরিবেশে। সেখানে মজার খুড়ো জোরদার পাদে মোমবাতি নিভিয়ে দেয়, আবার বাবা-মা যখন তখন কাপড় নামিয়ে যৌন-আদর শুরু করে দেয়। শুধু হুল্লোড়েই বাচ্চাদুটোর বারোটা বাজছে দেখে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হল তাদের গভর্নেসের প্রটেস্ট্যান্ট পরিবারে (আমাদের ব্রাহ্ম পরিবারের মত কী?)। সেখানে কঠোর নিয়মতন্ত্র এবং হিমশীতল আধ্যাত্মিকতা। বাচ্চাদুটো পাগল হয় বলে এবার। ... শেষ একটা চার্চ থেকে, ক্রিসমাসের প্রার্থনার পর বেরিয়ে আসা মানুষজনের সঙ্গে তারাও বেরুচ্ছে। নানাজনের মুখে নানারকম সৌজন্যবিনিময়। ওদের দুজনের, একে অন্যের সঙ্গে ফিসফিসিয়ে আশ্রাব্য অশ্লীল গালিগালাজের বিনিময়। ওদের নীট শিক্ষাপ্রাপ্তি ওইটুকুই।   
নর্মান মেলারের উপন্যাসের মর্মন সমাজ ও উটার শাসনতন্ত্র যেন ওই প্রটেস্ট্যান্ট পরিবেশ। তথানামিত ‘পশ্চিমা কন্ঠস্বর’। আর নিউইয়র্ক থেকে ধেয়ে আসা মিডিয়া আর মানবাধিকার যেন ওই ক্যাথলিক পরিবেশ – ‘পূরবিয়া কন্ঠস্বর’। নীটফল অপরাধ-মনস্কতা, উন্মাদ-অবস্থা, ড্রাগ্‌স, যৌন-আধিক্য আর হিংসা।
দুটো উপন্যাসের একটিতে জর্জ ওয়াশিংটনের সময় থেকে আব্রাহাম লিঙ্কনের সময়, আবার সেখান থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময় অব্দি ইতিহাস প্রসঙ্গ রয়েছে। কালো এলেক্স হ্যালি এমেরিকার কোস্টগার্ডের চাকরী থেকে অবসর নিচ্ছেন। তাঁর বাবার নামে রাস্তা আছে এমেরিকার মাটিতে। বহুবর্ণী, বহুধর্মী এমেরিকান জাতি যেন পুরোপুরি প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে।
যে বই থেকে এই অংশের উপশীর্ষকটা (বিয়ন্ড দ্য মেল্টিং পট) ধার নিয়েছি সে বইয়ের ৩১৩ সংখ্যক পৃষ্ঠায় একটি উদ্ধৃতি পাচ্ছি। ১৯০৪ সালে প্রকাশিত ‘এক এমেরিকান কৃষকের পত্রাবলী’ নামক বইয়ে জনৈক মিশেল-গিলেম জাঁ দ্য ক্রেভাকুর স্বপ্ন দেখেছিলেন যে এমেরিকার বিভিন্ন ধার্মিক ও জাতীয় পরিচয়গুলি মিশ্র-প্রতিবেশ ও বিবাহের মাধ্যমে গলে গিয়ে এক হয়ে যাচ্ছে।
“এই মিশ্র-প্রতিবেশ এক অদ্ভুত ধার্মিক খিচুড়ি দেখাবে যা না বিশুদ্ধ ক্যাথলিসিজম থাকবে না বিশুদ্ধ ক্যালভিনিজম। এমনকি প্রথম প্রজন্মেই লক্ষণীয় ঔদাসীন্য দেখা যাবে; এবং হতেই পারে যে এক ক্যাথলিকের মেয়ে অপসৃত [ক্যাথলিক মত থেকে] একজনের ছেলেকে বিয়ে করবে এবং নিজের বাবামায়েদের থেকে দূরত্ব রেখে বসবাস করবে। তাদের সন্তানদের তারা কী ধর্মশিক্ষা দেবে? ত্রুটিপূর্ণ কিছু একটা! যদি আশেপাশে কোনো উপাসনা-স্থান থাকে, আমরা ধরে নেব বন্ধুসভার [কোয়্যাকার] বৈঠক, নিজেদের ভালো জামাকাপড় না দেখিয়ে তারা বরং ওইখানেই যাবে, কেউ কেউ নিজেকে যুক্তও করবে ওই সমাজের সাথে। অন্যেরা খাঁটি উদাসীন থাকবে। ...
“এভাবে সব মত ও জাতি মিশ্রিত হচ্ছে, ধার্মিক ঔদাসীন্য অগোচরে ছড়িয়ে পড়ছে মহাদেশের এক কোণ থেকে আরেক কোণে; আজকের দিনে এটাই এমেরিকানদের প্রবলতম বৈশিষ্ট।”
এই বৈশিষ্ট ক্রুভাকুরের সময় দৃষ্টিগোচর হলেও বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকের এমেরিকায় এর উল্টোটাই ঘটছে। ‘বিয়ন্ড দ্য মেল্টিং পট’ বইটার লেখক দুজন দেখছেন ধর্মমত ও পন্থাগুলি দানা বেঁধে উঠছে আরো বেশি। দুই মতের পরিবারে বিয়ে হলে দুটো মতই দুর্বল হবে এই কথাটা মিথ্যা প্রমাণিত করে স্থানপ্রধান মতটির মানুষ বেড়ে উঠছে।
আর বর্ণের তো কথাই নেই। লেখকদ্বয় বলছেন, “বেশির ভাগ জাতিগোষ্ঠির [এথনিক গ্রুপ] বিশিষ্ট জাতীয় [ন্যাশন্যাল] দিকগুলোর কোনো গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন, তৃতীয় প্রজন্ম অব্দি প্রায়শঃ বেঁচে থাকে না। যদি না রঙের প্রশ্ন থাকে। এটাই সাধারণ নিয়ম।” অর্থাৎ রঙের প্রশ্ন থাকে। আর যদি সমাজটা ‘ঘাতকের গান’এর সমাজ হয়?
১৯৬০-৭০এর এমেরিকায় নাগরিক অধিকারের আন্দোলন, বর্ণবৈষম্য, দাঙ্গা, প্রতিবাদ, কৃষ্ণাঙ্গচেতনা ইত্যাদির ইতিহাস সর্ববিদিত। ম্যাককার্থিজম ও কম্যুনিস্ট-শিকারের ইতিহাসও সবাই জানে। কিন্তু, একটা অন্য প্রশ্ন ভাবায়। শতাব্দীর শুরুতেই আমেরিকান সমাজের উঠতি স্পন্দিত গণতন্ত্র একচেটিয়া পূঁজির আধিপত্যে ও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হচ্ছিল। জন দস পাসসের ট্রিলজিতে সমাজের ভিতরমহলে এই পরিবর্তনের প্রভাবটা ধরা আছে। মিশেল-গিলেম জাঁ দ্য ক্রেভাকুর যে সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা থেকে ‘বিয়ন্ড দ্য মেল্টিং পট’এ বিধৃত পরিস্থিতি অব্দি আমেরিকান সমাজের অধোমুখী যাত্রা কি রাষ্ট্রশক্তির চরিত্রবদল-জনিত? একচেটিয়া ও পরে বহুরাষ্ট্রিক-পূজির আধিপত্য জনিত?
এখন কী অবস্থায় আছে এমেরিকান জাতির মিলনপ্রক্রিয়া?
এমেরিকার সমাজ সম্পর্কে আমার কোনো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই। ঔৎসুক্য অবশ্যই আছে। এমেরিকান রাষ্ট্রশক্তির আগ্রাসননীতি, এমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের হামলা ইত্যাদির বিরুদ্ধে পথে নামি মাঝে মধ্যেই। কিন্তু দেশটা তো প্রিয়! ওয়াল্ট হুইটম্যানের দেশ, জ্যাক লন্ডনের দেশ, ল্যাংস্টন হিউজ ও পল রবসনের দেশ এমেরিকা। এমেরিকার শ্রমশক্তির ওপর শ্রদ্ধা লেনিনই তৈরি করে দিয়ে গেছেন। তাই একটু আগের আলোচনার সুত্র ধরে দুটো হাইপথেটিক্যাল মন্তব্য করার দুঃসাহস করে লেখাটা শেষ করতে চাই।
প্রথমতঃ এমেরিকান গণতন্ত্রে, সমাজে সাম্রাজ্যবাদের স্বীকৃতি, ‘ন্যায়সঙ্গতি’ (ওই পাসসের ট্রিলজির নাম অনুসারে ‘১৯১৯’এর এমেরিকার ‘ফর্টিসেকেন্ড প্যারালাল’ ধরে ‘বিগ মানি’র আমেরিকা হয়ে ওঠা) ধর্ম, জাতি ও বর্ণবৈষম্য ঘুচিয়ে এমেরিকান জাতি হয়ে ওঠার মহামিলন প্রক্রিয়া কে স্তিমিত ও অবরূদ্ধ করে রেখেছে। এমনকি সংকটের দশকগুলোতে বিপরীতমুখীন করে বাড়িয়ে তুলেছে বর্ণ, জাতি ও ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠী ও ‘ভোটব্লক’ নির্মাণপ্রক্রিয়া। বারাক ওবামা আজ রাষ্ট্রপতি। তবুও মনে হয় আমি ভূল বলছি না। কেননা নতুন অর্থনীতির ‘গ্রেট কন্সেন্সাস’টা যে সামাজিক ভুগোলে সীমিত, দূর থেকে সব দেশেরই ওই কস্মোপলিটান অংশটাই আগে ফোকাসে আসে।
দ্বিতীয়তঃ, এমেরিকার ‘অতীত’ নেই এটা যেমন ওই দেশটার শক্তির উৎস, এমেরিকা ‘অতীত’কে যে হত্যা করেছে তার অভিশাপ ভিতরে দুর্বলতাও ছড়িয়ে রেখেছে। বিপজ্জনক ধাঁধা মনে হচ্ছে কি?
এই যে আমাদের দেশে প্রবণতা আছে অতীতচর্চার, প্রাচীন যুগের সোনার থালা ধুয়ে জল খাওয়ার... এটা একটা বোঝা। সৃজনী-উদ্ভাবনী চ্যালেঞ্জ স্বীকার করার গতি শ্লথ করে দেয়। এমেরিকা আড়াইশো বছরের আগে নেই। কিছুই নেই। বিভিন্ন দেশের মানুষ, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এসে এমেরিকাকে তৈরি করেছে। তাই তাদের সৃজনী-উদ্ভাবনী চ্যালেঞ্জ নিয়ে খেলা করার প্রবণতা বিস্ময়কর। (হঠাৎই মাথায় খেলে গেল- বরেন বসুর ‘রঙরূট’ উপন্যাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন উত্তরবঙ্গে এমেরিকান সৈন্যের প্রবেশ এবং ব্রিটিশদের থেকে তাদের এ্যাটিচুডের তফাৎ - লেখকের মন্তব্য; সেটা ওই গণতান্ত্রিক সমাজের প্রতিফলন)
কিন্তু এটা অর্ধসত্য। আরেকটা দিক হল যে ওই মাটির একটা অতীত ছিল। অত্যন্ত মানবিকসম্পদশালী অতীত। লালমানুষদের অতীত। পরবর্ত্তী এমেরিকা, ব্রিটিশ উপনিবেশ এমেরিকা, ধনতান্ত্রিক এমেরিকা, সাম্রাজ্যবাদী এমেরিকা সেই অতীতকে হত্যা করেছে। ধ্বংস করেছে, হাজার হাজার মানুষকে সংহারের লীলা চালিয়েছে শতাব্দীকাল ধরে।
তার অভিশাপ যেন ‘ঘাতকের গান’এর ছত্রে ছত্রে দেখা যায়। কী নিদারূণ আত্মিক অবলম্বনহীনতা। কী ভয়াবহ শূণ্যতা। একজন ভালো ধার্মিকও নেই সমাজে। আবার একজন ভালো অধার্মিকও নেই। দর্শনচিন্তার জায়গায় পৌঁছোলেই মানুষগুলোর কথাবার্তা কী অদ্ভুত ফাঁপা আর করুণ হয়ে পড়ছে। পণ্যদেবতার অধিষ্ঠানের যেন আদর্শ বেদীমূল!
*২০১১ সাল, অর্থাৎ এই লেখাটার রচনাকাল থেকে ৩৩ বছর আগে।


সংযোজন
যখন লেখাটা তৈরি করেছিলাম তখন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ছিলেন বারাক ওবামা। গত বছর জিতলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি যিনি জনতার ভোটে পরাজিত হলেও নির্বাচক ভোটে জয়ী ঘোষিত হয়েছেন। যিনি জনতার ভোট বেশি পেয়েছিলেন সেই হিলারি ক্লিন্টনও এমন কিছু জনপ্রিয় ছিলেন না। কিন্তু এসবের নীচের স্তরে, যে সামাজিক সমীকরণটা ক্রিয়াশীল ছিল তার ইংগিত দেয় বিবিসির এই পরিসংখ্যানঃ-
সাদা মানুষের ভোট ৫৮% পেয়েছিল রিপাব্লিকান পার্টি, ৩৭% পেয়েছিল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। যখন নাকি হিস্প্যানিক ও এশিয়ান ভোট ২৯% গিয়েছিল রিপাব্লিকানদের দিকে এবং ৬৫% গিয়েছিল ডেমোক্র্যাটদের দিকে। আর কালো মানুষের ভোট? মাত্র ৮% ছিল রিপাব্লিকানদের দিকে, ৮৮% ডেমোক্র্যাটদের দিকে; যখন নাকি হিলারিও সাদা। নারীদেরও সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছিল।
নানা কারণ আছে এই বিভাজনের। কিন্তু ‘গলনপাত্রে’ ধাতুর রঙ যে মিশ খায়নি, তা তো স্পষ্ট। এই মুহূর্তে রাজ্যগত পরিসংখ্যানটা হাতে নেই, কিন্তু মনে আছে। যে রাজ্যে কালো মানুষের সংখ্যা কম সেখানে রিপাব্লিকান সমর্থন, ইংরেজিতে যাকে বলে প্রিডমিনেটিং।




ªªªªª

Thursday, October 12, 2017

জ্যাক লন্ডনঃ স্মৃতিচারণ - আন্না স্ট্রান্সকি ওয়লিং

“এভাবে দেখো আমায়ঃ পথভোলা অতিথি, লবণাক্ত ডানা ঝাপটে উড়তে উড়তে তোমার জীবনে এক মুহুর্তের জন্য ঢুকে পড়া এক বিহঙ্গ – বাঁধা জীবনযাপনের সুখসুবিধেগুলোর অনভ্যাসে রূঢ় এবং ভূল করে চলা, ব্যাপ্ত হাওয়া আর মহাশূন্যে বেড়ানো বিহঙ্গ।” জ্যাক লন্ডন

তার জীবনের চব্বিশতম বছরে, ওকল্যান্ড থেকে ২১শে ডিসেম্বর, ১৮৯৯এ পাঠানো এক চিঠিতে সে এই কথাগুলোই আমায় লিখেছিল। শুধু আমার জীবনের এক ছোট্ট মুহুর্তের নয়, লবণাক্ত ডানা ঝাপটে ওড়া এই বিহঙ্গ শাশ্বত-কালের জীবনপথের পথিক। কেননা কে বলবে কবে পৃথিবী থেকে শেষ হবে সেই বিস্ময় ও সৌন্দর্য যার নাম ছিল জ্যাক লন্ডন? কিভাবে ভুলবে কেউ যে তাকে একবার জেনেছে? আর জীবনই বা তাকে ভুলবে কী করে যে জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল? সে ছিল যৌবন, দুঃসাহস, রোমাঞ্চ। সে ছিল এক কবি এবং সমাজবিপ্লবী। বন্ধুত্ব গড়ার অসাধারণ প্রতিভা ছিল তার। যেমন সে ভালোবাসতে পারতো তেমনই অফুরান পেতো ভালোবাসা। কিন্তু কিভাবে শব্দে তার ব্যাক্তিত্বের সেই গুণটা ধরব যা তাকে সবার থেকে ভিন্ন করেছিল? কিভাবে তার চৌম্বক-আকর্ষণ আর তার কবিপ্রকৃতি বোঝাবো কাউকে? পুরোনো দুনিয়ার লড়াই আর যন্ত্রণায় বিকশিত সে ছিল সেই দুনিয়ার সমস্ত ভয়ানক ও দুর্বৃত্তমূলক কলঙ্ক থেকে নির্যসিত শক্তি আর নৈতিক উৎকর্ষ। সে সেই গহ্বর থেকে বেরিয়ে এল যে গহ্বরে তার প্রজন্মের এবং তার আগের প্রজন্মগুলোর লক্ষ লক্ষ মানুষ নৈরাশ্যে হারিয়ে গিয়েছে। সে উঠল সেই গহ্বর থেকে, পালালো, জাতিসত্ত্বার মত বড় হয়ে উঠতে আর সেই শক্তিগুলোর সাথে চিহ্নিত হতে যারা মানব-জাতির ভবিষ্যৎ বদলায়।

তার জীবনের আদর্শ ছিল উঁচু। ধনসম্পদের নানারকম আরাম আর সুবিধেগুলো, প্রতিভা, সামর্থ্য আর প্রণয়ের সুখ তার নাগালের মধ্যে ছিল। নেপোলিয়ন আর নীৎশের কিছু অংশ ছিল তার মধ্যে, কিন্ত তার নীৎশেবাদী দর্শন রূপান্তরিত হল সমাজবাদে – তার সময়ের আন্দোলনে – আর তার নেপোলিয়ন-ধাঁচের মেজাজের জোর দিয়ে সে গড়ে তুলল এক অবিশ্বাস্য সফলতার ধারণা; তা অর্জন করার ইচ্ছাশক্তিও তার ছিল। যেহেতু সংবেদনশীল আর আবেগময় ছিল তার প্রকৃতি, তাই লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যাওয়ার পথ থেকে সব রকমের বিচ্যুতি সে পরিহার করল। নিজের জীবনটাকে বিন্যস্ত করল। কী প্রকান্ড উদ্যম, তবু সে নিজেকে বিশ্বাস করল না! নিয়মের দাস করল নিজেকে। আত্মশাসন, শৃংখলা আর সংযম হল এই প্রাণবন্ত ও কামনাময় যুবকের ধর্ম। নিজের রোজকার খাটনি বাঁধল এক হাজার শব্দ, লিখে সংশোধন করে টাইপ করা। বছরের পর বছর নিজের বরাদ্দ করে রাখল সাড়ে চার ঘন্টা ঘুম; উষাকালে কাজ শুরু হত নিয়মিত। রাতে করত বিজ্ঞান, ইতিহাস আর সমাজশাস্ত্রের গভীর অধ্যয়ন। এটাকে সে বলত নিজের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি অর্জন। সপ্তাহে একদিন সে নিজেকে সঁপতো জীবনসংগ্রামে রত এক বন্ধুর কাজে। বিনোদন ছিল মুষ্টিযুদ্ধ, অসিযুদ্ধ এবং সাঁতার। দারুণ সাঁতারু ছিল সে। অথবা জলযাত্রা – সে ছিল মাস্তুলের সামনে দাঁড়ানো নাবিক – আবার অনেকটা সময় যেত তার ঘুড়ি ওড়ানোতেও; ঘুড়ির ভালো সংগ্রহ ছিল তার কাছে। জোলার মত তার প্রথম প্রচেষ্টাগুলো ছিল কবিতা। নিঃসন্দেহে এটাই গোপন রহস্য ছিল তার গদ্যের মিলটনোচিত সারল্যের, যে কারণে সে নিজের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এবং সর্বোনএ শুদ্ধ ইংরেজি আর স্টাইলের স্বীকৃত মডেল হয়ে উঠেছে। কবিতা লিখতে সে হামেশাই চাইত, কিন্তু প্রবাদানুসারে কবিরা অনাহারে থাকে – যদিনা ভিন্ন কোনো উৎস থেকে আয় থাকে তাদের – তাই খ্যাতি আর ঐশ্বর্যপ্রাপ্তির দিনটি অব্দি কাব্যলেখন স্থগিত রইল। খ্যাতি আর ঐশ্বর্য সে পেল এবং তা সে ভোগও করল এক দশকেরও বেশি সময়, কিন্তু কবিতা লেখা স্থগিত রয়ে গেল, এবং নিজের কাছে করা এই শপথটা মনে পড়ার আগেই মৃত্যু এসে পড়ল। আরো অনেক কিছু তার মনে পড়ার আগেই এসে পড়ল মৃত্যু। এত কঠোরভাবে কাজে রত ছিল সে – এত করূণ, এত ট্র্যাজিক ছিল তার কাজে এই কঠোরতা এবং একটা স্থায়ী অভ্যাস হয়ে পড়েছিল এতদিনে – যে সে নিজের কথাগুলো ভুলে গেল, যে কথাগুলো আমাকে পাঠানো একটি চিঠিতে সে সেই সময় লিখেছিল যখন আমরা দুজনে বালক-বালিকা থেকে ইষৎ বড় ছিলামঃ

জানুয়ারি ১৮, ১৮৯২

“স্টিভেনসনের চিঠিগুলো পড়িনি কেননা – প্রিয় বালিকা! – যেদিন আমি ঠিকঠাক বৈজ্ঞানিক ভিত্তি অর্জন করে নেব আর ব্যাংকের একাউন্টে এক হাজার ডলার জমা হবে, যখন আমি সারাদিন চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ব, আর পড়ব, আর পড়ব, আর পড়ব…তখন আমার সাথে থাকার জন্য এস।
“তুমি যদি জানতে কিভাবে প্রলুব্ধ করে বই! এদিকে আমি স্পেন্সার আর হেকেল হাতুড়ি মেরে মাথায় ঢোকাই আর না-পড়া জিনিষগুলোর আনন্দ ভুলে থাকার চেষ্টা করি।”

সেই সময়টা এল যখন তার ব্যাংক একাউন্ট হল ১০০০ ডলারের, তাছাড়া বাৎসরিক ৬০,০০০ ডলারের ওপর হল সুনিশ্চিত আয়। কিন্তু কবি আর ছাত্রের সেই সহজ আর সুন্দর জীবনে ফিরে আসার যে স্বপ্ন ছিল তার সেটা আর হল না। যা সে পেল তার চরম মূল্য তাকে দিতে হল। তার সফলতাই তার জীবনের ট্র্যাজেডি ছিল। বাজারের দাবী মেটাতে সে বন্ধক রাখল নিজের মস্তিষ্ক, এবং ক্লান্তি ও অতি-উত্তেজনা তাকে নিয়ে গেল জন বার্লিকনের পথে আর ফলস্বরূপ সেই যন্ত্রণায় যাকে সে বলত ‘শ্বেত যুক্তি’। চুয়াল্লিশখানা বই সে লিখেছিল। মাঝেমধ্যে উচ্চতাজনিত ঘুর্ণিরোগ চেপে ধরত তাকে। কলমের মত এইটুকু ছোট্টো একটা উপকরণের শ্রমে কী করে বাঁচবে একজন বলবান, স্বাভাবিক মানুষ? পুরুষালী কাজের জন্য সে মুখিয়ে থাকত। নিজের ‘চাঁদের উপত্যকা’ চাষ করার বাসনা জন্মালো তার মনে। কলমের জোরে রোজগার করা অর্থ সে নিয়োগ করবে এক বিশাল কৃষি-গবেষণায়; উষর জমিকে সে উর্বর করে তুলবে। ফলাবে ইউক্যালিপ্টাস আর শুরু করবে অশ্বপালন। এক হিসেবে এগুলো সৃজনী উদ্যম ছিল কেননা যে গল্পগুলো এত বেশি পরিমাণে সে লিখছিল (বছরে চারটে করে বই) সেগুলোতে আর সেই সৃজনী প্রতিভার ছাপ ছিল না; তার মনে রাখার সময় ছিল না যে যে কলম এই বাজারে-মালগুলো লিখছে সেই কলমেই লেখা হয়েছিল ‘উত্তরের অভিযান’ আর ‘শ্বেত নৈঃশব্দ’র মত অমর সৌন্দর্যের ছোটোগল্প, ‘মার্টিন এডেন’ আর ‘বন্যের আহ্বান’এর মত মহান বই এবং ‘কেম্পটন-ওয়েস পত্রাবলী’ (যেটা আমরা দুজনে মিলে লিখেছিলাম) তে প্রকাশিত অতুলনীয় উজ্জ্বল প্রবন্ধগুলো।

তার অর্থরোজগারের ব্যাপারটা কোনো কুৎসিত লালসার মত ছিল না। ‘খেলা’ নামের বইটাতে সে পুরস্কারী লড়াকুর মানসিকতার ব্যাখ্যা করেছে যার কাছে ঘেরা (রিং) টা খেলার প্রতীক আর খোদ জীবনেরই উদ্দেশ্য। কলমের প্রচেষ্টায় অপরিমিত ধনী হওয়া তার কাছে ‘খেলাটা খেলা’র মত ছিল। আই.ডব্লিউ.ডব্লিউ.এর সদস্যদের, ‘পথ’এর কমরেডদের অথবা মেক্সিকোর বিপ্লবীদের প্রাসাদে আতিথ্য প্রদান তার পরিহাসবোধ ও নাট্যবোধকে তৃপ্তি দিত। তাদের কাছে সবচেয়ে ভালোটাও অতিরিক্ত ভালো ছিল না, কারোর জন্যই হয় না। গহ্বর যে তাকে শুধু গিলতে পারেনি তাই নয়, গহ্বর তার সাথে উপরে উঠে এসেছিল।

১৯০০ সালের ২১শে জানুয়ারি এই চিঠিটা সে ওকল্যান্ড থেকে লিখলঃ

“তুমি কি জানো, বন্ধু বানাবার এক মারাত্মক দক্ষতা আছে আমার, আর তাদের সাথে ঝগড়া করতে পারার ইশ্বরপ্রদত্ত গুণ আমার নেই। এবং প্রতিনিয়ত তারা আসছে। ফিরে আসতে থাকা সমস্ত ক্লন্ডাইক-যাত্রী, নাবিক অথবা ভাগ্যের সৈনিক, যাদের সাথে জীবনে কখনো হয়ত দেখা হয়নি তাদের সবার জন্য আমার বাড়িটা হল মক্কা। কোনোদিন আমি একটা প্রতিষ্ঠান তৈরি করব, তাদের সবাইকে নিমন্ত্রণ করে আনবো আর একে অন্যের বিরুদ্ধে খোলা লেলিয়ে দেব। জাত, ধর্ম আর চরিত্রের এমন খিচুড়ি দ্বিতীয়টি আর হবে না। বিধ্বংসটাও হবে জবরদস্ত।
“যাই হোক, নিজের স্বাধীনতায় আমি এত অত্যধিক আনন্দ অনুভব করছি যে মুর্খ হয়ে পড়ছি। যে পথ দিয়ে আমার সাথে দেখা করতে লোকেরা ঢুকে পড়ে সে পথে আমি গর্ত খুঁড়ে ফাঁস পেতে রাখব, আর আরো নানা জিনিষের মধ্যে সামনের দরজার ভিতরে একটা ম্যাক্সিম দ্রুত-গুলিছোঁড়া বন্দুক দাঁড় করাবো। আমার ফায়ারপ্লেসের পবিত্রতা অলঙ্ঘনীয় হবে। অথবা, যদি আমার হৃদয়টাই মুষড়ে পড়ে, আমি দুনিয়ার অন্য পিঠে পালিয়ে যাব।”

ঠিক এটাই সে ক্যালিফোর্নিয়ার সুন্দর সোনোমা উপত্যকায় গ্লেন অ্যালেনে করেছিল। পনেরো’শো একড় জমি দিয়ে ঘেরা একটা অট্টালিকা তৈরি করালো, অবারিত দ্বার, আর যখন হৃদয় মুষড়ে পড়ত, সে দুনিয়ার অন্য পিঠে ছুটে পালাতো। চলে যেত হাওয়াই এবং দক্ষিণ সমুদ্রের দ্বীপগুলোয়। দুনিয়া থেকে সাত বছর দূরে থাকার অভিপ্রায়ে হল তার ‘স্নার্ক’এ স্মরণীয় ও অসাধারণ সেই সমুদ্রাভিযান।

তার মত তীব্র অনুভুতিসম্পন্ন যুবকই এত গভীর ভাবে বুঝতে পারে সময়ের ফুরিয়ে যাওয়া, আর এত ব্যগ্র ভাবে মজুত করতে পারে দিনের প্রহরগুলো। খুব ছোট্টো ছিল জীবন। অনর্থক আলস্যে সময় নষ্ট করা উচিৎ নয় কারোর। এটাই ছিল তার বিশ্বাস। জীবনে অনেক কিছু দেখার সুযোগ সে পেয়েছিল। জনতার সন্তান ছিল সে আশৈশব, কিন্তু শৈশব তার ভাগ্যে জোটেনি। প্রথম থেকেই দেখেছে সংগ্রাম আর বাধ্য হয়েছে সংগ্রাম করতে। নিজেকে সে মনে করত “রূঢ়, কঠোর আর আপসহীন”। অবশ্যই সে তেমন ছিল না। শুধু কিছু বিভ্রম ছিল তার মনে, এবং গহ্বরে বা আরো নীচে সে যা কিছু দেখেছিল সেগুলো তার শৈশব ও যৌবনের সংবেদনশীল প্রকৃতিকে যন্ত্রণাবিদ্ধ করে রেখেছিল। এই যন্ত্রণা এবং যাকে বলা হয় সংগঠিত সমাজ কিন্তু বাস্তবে যা একটি বিশৃংখল অরণ্য, সেটির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হল তার বিশ্বদর্শনের বনিয়াদ।

নিচের অংশটি ১৮৯৯ সালের ২১ ডিসেম্বরে লেখা একটি চিঠি থেকে নেওয়াঃ

“জীবন খুব সংক্ষিপ্ত। বস্তুবাদ যে মানসিক অবসাদ নিয়ে আসে তার অভিব্যক্তি ফিটজেরাল্ডের ‘জলদি, হে!’ থেকে ভালো কিছু হতে পারে না। আলস্যে সময় কাটানো কারোরই উচিৎ নয়। আর তারপর, যদি আমাকে তুমি জানো, এই কথাটা বোঝোঃ আমিও একটি খামারে, না, ক্যালিফোর্নিয়ার এক পশুখামারে একজন স্বপ্নদর্শী ছিলাম। কিন্তু খুব ছেলেবেলায়, ন’বছর বয়সে, দুনিয়ার কঠিন হাত এসে আমায় ধরল। তারপর সে হাত আর কখনো ঢিলে হয়নি। সে হাত আমার মধ্যে আবেগটুকু রেখেছে কিন্তু আবেগপ্রবণতা ধ্বংস করেছে। আমাকে এতটাই প্র্যাক্টিক্যাল করেছে যে আমায় লোকে রূঢ়, কঠোর আর আপসহীন বলে। দুনিয়ার সে কঠিন হাত আমায় শিখিয়েছে যে কল্পনা থেকে যুক্তি বেশি শক্তিশালী, বিজ্ঞানধর্মী মানুষ ভাবপ্রবণ মানুষের থেকে উঁচুদরের। আবার জগৎ সম্পর্কে এক সত্যতর এবং গভীরতর রোমাঞ্চও দিয়েছে সে হাত, যে রোমাঞ্চ এক আদর্শবাদ, একটি অন্তর্গত আশ্রয় যেটি আমার নিজের লোকেদের সাথে লেনদেনের সময় দৃঢ়ভাবে রুদ্ধ করে রাখা আবশ্যক, কিন্তু অন্তরের পবিত্রতম স্থানে সেটি রয়েছে। আশ্রয়টি যেন এক দৈববাণী, লালন করি স্নেহভরে কিন্তু বাজারে গেলেই খুলে দেখাই না, সে বাণী গ্রহণও করি না। যদি করি, তাহলে আমার ওপর আমার সাথীদের উপহাস বর্ষিত হবে আর আমিও অকৃতকার্য হব। মোদ্দা কথা, যেখানে যেমন।”

অকৃত্রিমতা তার চরিত্রের সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট ছিল। কখনো সে ছলনা করেনি। নিজের রচনা বা জীবন সে ফাঁকিতে ভরা তর্কের ওপর গড়েনি, এড়িয়েও যায়নি কোনোকিছু। সাহিত্যের যদি বাজার থাকে এবং তার দাম পাওয়া যায় আর যদি সে তার মস্তিষ্কের উৎপন্নগুলি বেচার জন্য সাজায়, তাহলে এমন ছল করার মত নীচে সে কখনো নামবে না যে সে পয়সার জন্য লিখছে না আর সে মানছে যে ‘শিল্পের জন্য শিল্প’। আবার, সমাজ যদি তাকে তার জিনিষের দাম হিসেবে প্রচুর না দেয় সেটাও তার সেই ‘যেখানে যেমন’এর সাথে মিলবে না। যদি নিজেকে বাজারের চাহিদা মত করেই থাকো তাহলে তোমায় অপরিহার্য হয়ে উঠতেই হবে। নিজের বিষয়ে যেমন সে দাবী করত যে সে ‘অর্থতান্ত্রিক মানুষ’ তেমনই, ঠান্ডা মাথায় সে নিজের লক্ষ্য সাধনে নেমে পড়ল। সে সময় মারী কোরেলি সম্ভবতঃ ধনার্জনের দিক থেকে সফলতম ঔপন্যাসিক ছিলেন। সে ভয় দেখালো যে সে তাঁর শিল্প অধ্যয়ন করে সেই গুণগুলো আবিষ্কার করবে যেগুলো তাঁর সাফল্য অনিবার্য করে তুলেছে আর সেসব সে নিজের মধ্যে গড়ে তুলবে। এসব কথা সে সোজাসুজি বলত এবং নিজের এই সংকল্প আর লক্ষ্যের কথা জানিয়ে বন্ধুদের চেঁচামেচি আর আক্রমণ ডেকে আনল। তারা অনেকেই তার থেকে বেশি ভালো করে এই কাজটা করতে লেগে পড়ল যারা বস্তুতঃ তার সংকল্পের দৃঢ়তায় ঈর্ষান্বিত ছিল।

নীচের চিঠিটা এর সাক্ষ্য বহন করেঃ

৯৬২, ইস্ট সিক্সটিন্থ স্ট্রীট,
ওকল্যান্ড, ক্যালিফোর্নিয়া,
ফেব্রুয়ারী ৩, ১৯০০

প্রিয় আনা,

“শনিবারের রাত, আর আমি ভালো বোধ করছি। শনিবারের রাত, আর প্রচুর কাজে ভরা একটা সপ্তাহ পুরো হল – ভাড়ার কাজ অবশ্যই। কেনই বা করব না? কপালের ঘাম পায়ে ফেলছি যে কোনো সৎ কারিগরের মত। এক বন্ধু আছে আমার যে এ ধরণের কাজকে ঘৃণা করে। সে উত্তরকালের জন্য লেখে, প্রশংসকদের একটা ছোট্টো দলের জন্য, সমাজের বিস্মৃতির প্রতি সে বিস্মৃত, পয়সা চায়না, পয়সার ভাবনাটাকেও উপহাস করে, নোংরা মনে করে, যারা পয়সার জন্য লেখে তাদের সবাইকে অভিশাপ দেয়, ইত্যাদি, ইত্যাদি, -- অর্থাৎ, সে নিজে বলে যে সে এমন। কিন্তু সদ্য তার একটি চিঠি পেয়েছি। ‘মুনসী’রা তার একটি গল্প কিনবে বলেছে যদি সে শেষটা পালটে দেয়। খুব যত্নের সাথে সে নিজের গল্পটি বুনেছিল। প্রত্যেকটি ভাবনা অন্তিম দৃশ্যের দিকে ধাবিত, যখন হিংসাজনিত মৃত্যু ঘটছে প্রধান চরিত্রের। এখন প্রকাশকেরা বলছে প্রধান চরিত্রটিকে, যে যুক্তিসংগত ভাবে মৃত, বাঁচিয়ে রাখতে। আমার লেখকবন্ধুটি পয়সাকে ঘৃণা করে। হ্যাঁ; আর সে চরিত্রটিকে বাঁচিয়ে রাখল! ‘আমার পতন হল’, নিজের আচরণের জন্য সে এটুকুই বলতে সম্মত।”

প্রচন্ড কাজের চাপ আর শিল্পকে পরিশ্রমের ব্যবসায় বদলে দেওয়ার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া শুরু হল। একটি অত্যন্ত উদারপ্রকৃতির মানুষ মাঝে মধ্যেই ডুবে যেতে লাগল শিল্পসংস্কৃতি-সাহিত্য-জগতের প্রতি ঘৃণায় – সফলতার সাথে ঘিরে ধরা চাটুকারিতায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল তার সত্তা। এই মানুষগুলো, যারা আজ তার স্তাবকতা করছে, সে ‘আবিষ্কৃত’ হওয়ার আগে তো কই দেখতে পায়নি কী ছিল তার ভিতরে! তার একটা গল্পের জন্য সে ওভারল্যান্ড মান্থলি  থেকে পাঁচ ডলার পেয়েছিল আর কেউ সে গল্পটির প্রশংসা করেনি। যখন বই হয়ে বেরুলো, হঠাৎ সে গল্পটি বিখ্যাত হয়ে উঠল। তাই মানুষের প্রশংসা আর দয়ালুতাকে সে হাল্কা ভাবে নিত। এক মানসিক অবসাদে তার মনে শুধু এই দুনিয়া নয়, জীবনেরও মূল্য সম্পর্কে প্রশ্ন জাগত। এত কিছু পাওয়ার পর সে আবিষ্কার করল যে সে সমস্ত মিথ্যে। কোনোকিছুরই অন্তর্নিহিত কোনো মূল্য নেই। বিষাদরোগে ভুগত সে। আত্মহননের ভাবনায় ডুবে যেত। একটা সময় ছিল যখন টলস্টয়ের মত সেও টেবিলের ওপর গুলিভরা রিভলবার রাখত – যেকোনো সময় নিজের ওপর ব্যবহার করতে প্রস্তুত।

জানুয়ারি ৫, ১৯০২

“নিজের স্মৃতিপথে তাকাই, সকাল একটায়, যে চেহারাগুলো দেখেছিলাম সব পান্ডুর আর সতৃষ্ণ হয়ে ওঠে – তোমার মনে পড়ে? অথবা, তুমি কি লক্ষ্য করেছ? – এবং আমি অবাক হই কিসের এত আলোড়ন?

“গতকাল ‘ক্যানভাসব্যাক’ হাঁস আর ‘টেরাপিন’ কচ্ছপের মাংসে আহার সেরেছি। হৃদয় ও মস্তিষ্ক উষ্ণ করছিল ঝলমলে শ্যাম্পেন আর আরো সব বিস্ময়কর পানীয় যার স্বাদ আগে কখনো আমি পাইনি। যৌবনের দিনের সেই রাতভর মদ্যপান আর নোংরা হুল্লোড় মনে পড়ছিল। ছেঁড়াখোঁড়া জামাকাপড় পরা, ভদ্র আচরণ না জানা জন্তু ছিলাম আমরা, গলাধঃকরণ করতাম সস্তা, তুচ্ছ আর বমি পাওয়ানো পানীয়। তারপর আমি স্বপ্ন দেখলাম, আর ওই এঁটেল কাদা থেকে নিজেকে টেনে উপরে তুলে ক্যানভাসব্যাক আর টেরাপিন আর শ্যাম্পেন অব্দি পৌঁছোলাম, পৌঁছে জানলাম যে গাঁজে যে তফাৎ আনে শিল্প সেটা শুধু পরিমাণগত।”

ছাব্বিশ বছর বয়স থেকে সে নিজের চিঠির নীচে “ইতি, বিপ্লবের জন্য তোমার” লিখে সই করতে শুরু করল। এই দেশে এবং সমুদ্রপারে অন্যান্য দেশগুলোয় হাজার হাজার মানুষ লুফে নিল এই বাক্যাংশ। প্রথম যৌবন থেকে সে বিপ্লবের সেবায় রত ছিল। পথসভায় সে সমাজবাদের কথা বলত এবং স্থানীয় এলাকায় রবিবার রাতের বৈঠকগুলোয় বক্তৃতা দিত। মেয়রের জন্য আর বিদ্যালয় পরিচালকের জন্য সে নিজের নাম সমাজবাদী রাজনৈতিক টিকিটে থাকতে দিয়েছিল। যখন খ্যাতি পেল তখন সে দেশের পূর্বদিকে এসে সমাজবাদী বিষয়ে ভাষণ দিয়ে বেড়াত।

১২ই ফেব্রুয়ারী, ১৯০৮এ লেখা চিঠিতে সে লিখছেঃ

“চার মাস বক্তৃতা দিয়ে ফিরলাম। শুকনো হাড়গুলো একটু বাজালাম। ইয়েল, হার্ভার্ড, কলাম্বিয়া আর শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে বললাম। এছাড়া সোশ্যালিস্ট পার্টির জন্য আরো অনেক বক্তৃতা। (বিপ্লববাদী ছিল সে) “মাথার ওপর সমাজের যে বিরাট ইমারতখানা আছে তা আমায় বিন্দু মাত্র আনন্দ দেয় না। ইমারতের ভিতটা আমার বেশি ঔৎসুক্য জাগায়। ওখানেই পরিতৃপ্ত থাকি আমি, শ্রম করি, হাতে থাকে শাবল, কাঁধে কাঁধ মেলাই বুদ্ধিজীবী, আদর্শবাদী এবং শ্রেণীসচেতন শ্রমিকদের সাথে, মাঝেমধ্যে চাক্ষুষ দেখি ভিতরের ব্যাপার-স্যাপার আর নাড়িয়ে দিই পুরো ইমারৎটাকে। কোনো দিন, যেদিন কিছু আরো হাত আর শাবল পাবো কাজে, উল্টে দেব পচা জীবন আর গোর-না-দেওয়া মড়ায় ভরা ওই ইমারৎ। শেষ করে দেব এই বীভৎস স্বার্থপরতা আর একঘেয়ে বস্তুবাদ। তারপর আমরা সাফসুথরো করব মাটির নিচের কুঠরিটাকে আর নতুন বাসস্থান তৈরি করব মানুষের, যার প্রত্যেকটি ঘর হবে আলোবাতাস ভরা, যে হাওয়ায় নিঃশ্বাস নেব সেটি হবে পরিষ্কার, মহৎ আর জীবন্ত।”

ওদিকে রাশিয়ায় ওরা উল্টে দিয়েছে ইমারৎখানা, অথচ দুঃখ এটাই যে জ্যাক লন্ডন নীরব, মুক্ত জনতার শীর্ষে আন্দোলিত রক্তপতাকা সে দেখতে পাবেনা আর, আন্তর্জাতিক গেয়ে ওঠা লক্ষ লক্ষ মানবকন্ঠ তাকে আর সাথে পাবে না।

ইওরোপে প্রথম যাত্রাকালে লন্ডনের বস্তির গল্প লিখেছিল সে, “গহ্বরের জনতা”। প্রকাশকদের সাথে দেখা করতেও সে যায় নি। নিজেকে নিরুদ্দেশ করে হারিয়ে দিয়েছিল মানুষের দুর্দশার গহ্বরে। যার ফলে আমরা পেলাম আমাদের সময়ের আধুনিক সমাজের বিরুদ্ধে কঠোরতম অভিযোগপত্র, সমাজবৈজ্ঞানিক ধাঁচে লেখা একটি নতুন “লা মিজারেব্‌ল”। এটা লিখতে, বস্তিবাসী হিসেবে বসবাস করতে সে নিজেকে বাধ্য করেছিল। নিজের অর্থসম্পদ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতো রোজগারের খোঁজে - ক্ষুধার্ত, গৃহহীন।

লন্ডন, আগস্ট ২৫, ১৯০২

“শনিবার সারারাত আমি গৃহহারাদের সাথে বাইরে কাটালাম, তিক্ত বর্ষণে হেঁটে বেড়ালাম রাস্তায় রাস্তায়, গায়ের চামড়া অব্দি ভেজা, ভোর হওয়ার প্রতীক্ষায় রইলাম। রবিবার সারাটা দিন গৃহহারাদের সাথে কিছু খেতে পাওয়ার নিষ্ঠুর সংগ্রামে কাটালাম। ঘরে ফিরলাম রবিবার সন্ধ্যায়, ছত্রিশ ঘন্টা লাগাতার কাজ আর একরাতের ছোট্টো ঘুমের পর। আজ ৪০০০ শব্দের কিছু বেশি লিখলাম, টাইপ করলাম আর সংশোধন করলাম। এক্ষুনি শেষ করেছি। সকাল [আমাদের হিসেবে রাত – অনু] একটা বাজছে। যা দেখেছি এবং যে যন্ত্রণা ভোগ করেছি তার ফলে আমি এখন শ্রান্ত, নিঃশেষিত আর আমার স্নায়ুগুলো ভোঁতা হয়ে পড়েছে।”

এবং আবারঃ
“লন্ডন শহর নামে পরিচিত মানব-নরকের এই গর্ত আমায় অসুস্থ করে তুলেছে।”

সামাজিক প্রজ্ঞা তার ছিল। শ্রেণীসংগ্রামটা সে বুঝত এবং জনতার আন্তর্জাতিক সংগঠনে তার আস্থা ছিল। সে বুঝত যে বিবর্তনে আমাদের আজকের আন্তর্জাতিক মানবতার একটিই শত্রু – আন্তর্জাতিক পূঁজিবাদ, এবং বুঝত যে সমাজের আর্থিক ও সামাজিক শক্তিগুলো জনতার মনে স্পষ্ট করে তুলছে এই সত্যটা আর তাদের হাতে অস্ত্র যোগাচ্ছে যাতে তারা সফল ভাবে এই শত্রুর মোকাবিলা করতে পারে। সমাজ একটি যুদ্ধক্ষেত্র যেখানে জনতার শক্তিসমূহ জনতার শোষক ও উৎপীড়কদের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত। তার স্থান ছিল জনতার মাঝে। তার সফলতা এবং তার প্রতিভা তাকে বিপ্লবী অস্ত্র হাতে তোলা থেকে অব্যাহতি দেয়নি। সেগুলো শুধু প্রমাণ করছে সামাজিক গণতন্ত্রের মূল সত্য, পরিবেশের শক্তি আর রক্ত ও কুলীনতার সাজানো গল্পটাকে। বিশ্বের শক্তিশালীদের সামনে দাঁড়িয়ে ভয়ে অভিভূত না হওয়ার মত বিশ্বাস, দৃষ্টি আর সাহস তার ছিল।

আর.এম.এস. ম্যাজেস্টিক   
জুলাই ৩১, ১৯০২

“গতকাল দুপুরে নিউইয়র্ক থেকে সমুদ্রযাত্রা শুরু করলাম। এক সপ্তাহ পর লন্ডনে পৌঁছব। তারপর দুদিন থাকবে যার মধ্যে আমায় নিরুদ্দেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে লন্ডনের পশুদের দিক থেকে আমি দেখতে পারি রাজ্যাভিষেক। তাদের পশু ছাড়া আর কিছু বলা যায়না, যদি নিউইয়র্কের বস্তির মানুষের সাথে তাদের তুলনা করা যায়, এমন পশু যাদের মধ্যে এখানে ওখানে ইশ্বরত্বের বিদ্যুৎচমক দেখা যায়।
“দুনিয়াদার মানুষদের আমি দেখি পুলম্যান রেলকামরায়, নিউইয়র্ক ক্লাবে আর অ্যাটলান্টিক লাইনারের ধুম্রপান-কামরাগুলোয় এবং সত্যি বলতে, কাজ করতে থাকা শক্তিগুলো সম্পর্কে ওদের অজ্ঞান আর অবুঝপনা দেখে আমাদের উদ্দেশ্য আমায় আরো আশান্বিত করে। শ্রমিকদের প্রতি তারা তিক্ত, তিক্ততর হয়ে চলেছে। অন্যদিকে ঘনিয়ে আসতে থাকা বিপ্লব সম্পর্কে তারা পরমসুখে অজ্ঞান। তুমি দেখ, শ্রমিকদের বাড়তে থাকা সামর্থ্য তাদের আঘাত করছে, তাদেরকে তিক্ত করে তুলছে তবুও চোখ তাদের খুলছেনা।”

একটা প্রবন্ধ লিখেছিল সে – “আমার জন্য জীবনের অর্থ কী”। ক্রোপোটকিনের “যুবদের প্রতি আপীল” এবং অস্কার ওয়াইল্ডের “সমাজবাদে মানুষের আত্মার স্বরূপ”এর সাথে লেখাটির তুলনা করা যেতে পারে। লেখাটির শেষ পংক্তিতে সাধারণ মানুষের উত্থানের প্রতি বিশ্বাস ধ্বনিত হয়ে ওঠে, “সময়ের সিঁড়ি বেয়ে চিরকাল কাঠের জুতোর উঠতে থাকা আর পালিশকরা বুটের নামতে থাকা প্রতিধ্বনিত হতে থাকে”।

জ্যাক লন্ডনের মত এত যুবক একজনের যৌবন সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বস্তুতঃ একটা কঠিন অথচ বিস্ময়কর ব্যাপারকে ধরতে চেষ্টা করছি আমি। তার বিষয়ে বলতে গেলে ভাবনা নয় অনুভুতির দিক থেকে বলতে হয় এবং তার নিজের থেকে বেশি আর কেউ জানেনা যে সেটা কত কঠিন। আমি তার একটি চিঠি থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছিঃ

৯৬২ ইস্ট সিক্সটিন্থ স্ট্রীট,
ওকল্যান্ড, ক্যালিফোর্নিয়া, ডিসেম্বর ২৭, ১৮৯৯।

“ভাবুকরা অভিব্যক্তির অভাবে ভোগেনা। তাদের ভাবনাই তাদের অভিব্যক্তি। অনুভুতিওয়ালা মানুষেরা ভোগে। বিশ্বে সবচেয়ে কঠিন কাজ হল অনুভুতি, গভীর অনুভুতিকে শব্দে ব্যক্ত করা। অভিব্যক্তির দিক থেকে বলতে গেলে, চার ভল্যুমে ‘দাস ক্যাপিট্যাল’ লেখা অতগুলোই স্তবকের সাদাসিধে একটি গীতিকবিতা লেখার থেকে সহজ।”

নিজের শরীরের সামর্থ্য নিয়ে সে গর্ব করত। সে একজন আদর্শবাদী ছিল কিন্তু তার কোনো বিভ্রান্তি ছিল না। সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অতিশয় আগ্রহ ছিল, কিন্তু সেদুটো খুব কম দেখতে পেত চারপাশে। মানবতার উদ্দেশে উৎসর্গিত এক ব্যক্তিবাদী ছিল সে। যতদিন ছিল তার জীবন, সত্যের আবরণ উন্মোচিত করা ছিল তার কাজ। সমাজের যাকিছু মন্দ আর অন্যায়, তার বিরুদ্ধে সে ছিল জীবন্ত প্রতিবাদ।

৯৬২ ইস্ট সিক্সটিন্থ স্ট্রীট,
জানুয়ারি ১১, ১৯০০

“আমার ভিতরে যা কিছু সবচেয়ে মহৎ আর ভালো ছিল সব পিটিয়ে বার করে দেওয়া হয়েছিল। আমার জীবনটা তুমি জানো। কোনো জাহাজের, তাড়াহুড়োয় আঁকা অগ্রভাগ[ফোরক্যাস্‌ল]এর ছবির মত। বিচলিত ছিলাম। ছায়ার পিছনে হাতড়াচ্ছিলাম, ঠাট্টা করছিলাম, অবিশ্বাস করছিলাম, অনেক সময় মিথ্যেটাকেই চেপে ধরছিলাম বুকে, সবরকম সন্দেহ যেটা বিশ্বাস করার দিকে উন্মুখ করছিল সেটাকেও সন্দেহ করছিলাম। এবং সবচেয়ে বড় কথা, তৃষ্ণার্ত ছিলাম। ঘাড় শক্ত করে, নিজের শরীরের সামর্থ্য নিয়ে গর্ব করতাম, আশা থাকত যে পরিষ্কার জল উপচে বেরোবে। কিন্তু বেরোয়নি, কেননা যা করছিলাম সেটা বর্বরতা ছিল।”   

কী ছিল তার এই “শরীরের সামর্থ্য” যা নিয়ে সেই দিনগুলোয় এত গর্ব করত সে? সে যুদ্ধের পক্ষে থাকত। তার যুক্তি ছিল যে, যে সমাজের আইন মৃত্যুদন্ড বিধান করে সে সমাজ থেকে যতদিন আমরা পুলিসের সাহায্য আর রাস্তার আলো স্বীকার করব ততদিন মৃত্যুদন্ডের প্রতিবাদ করার কোনো অধিকার নেই আমাদের। সে সময় সে বলে বেড়াত যে অ্যাংলোস্যাক্সন মানুষেরা পৃথিবীর নুন আর বিশ্বাস করত যে কিছু জাতি নিকৃষ্ট। পুরুষের তুলনায় নারীর জৈববৈজ্ঞানিক নিকৃষ্টতায় বিশ্বাস করার দিকে তার ঝোঁক ছিল, কেননা যদি না পরে সে নারীপুরুষদের একসাথে পীডমন্ট স্নানাগারে না দেখে থাকত আর সুইমিং পুলের কিনারে নারীদের “ইশ্বরের নীচে সোজা না দাঁড়িয়ে” কাঁপুনি না দেখে থাকত, সে বিশ্বাস করত যে অধিকার শক্তি দেয়। সে সভ্যতা থেকে দূরে পালিয়ে বেড়াত এবং নিয়ম করে এড়িয়ে থাকত। মৃত্যুর প্রতি তার মনোভাব ছিল বর্বরোচিত, অদৃষ্টের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন, যে কোনো সময় যেতে প্রস্তুত। তার মত ছিল যে প্রেম, ব্যক্তির জন্য প্রকৃতির পেতে রাখা একটি ফাঁদ। ভালোবাসার জন্য নয়, বিয়ে করা উচিত বোধনির্ণিত কিছু গুণের জন্য। এই নিয়েই সে তর্ক করেছিল “কেম্পটন-ওয়েস পত্রাবলী”তে। সেও আবার এত বেশি আবেগের সাথে যে সন্দেহ হবে, যতটা সে দাবী করছে ততটা নিশ্চিত সে নয়। পরবর্তীকালে, জ্যাক হল সবচেয়ে নরম ভাবুকদের একজন, ঠিক ততটাই আবেগের সাথে নিজের নতুন ভাবনাগুলো চাউর করতে শুরু করল, যতটা আবেগের সাথে আগে সে ওই সব ভাবনাকে আক্রমণ করেছিল। সে এখন রোমান্টিক প্রেমে বিশ্বাস করতে শুরু করল, নারীদের ভোটাধিকারের আন্দোলনকে সাহায্য করল এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় এই আন্দোলনের সফলতায় উল্লসিত হয়ে উঠেছিল। এখন সে হল পুরোপুরি আন্তর্জাতিকতাবাদী এবং সৈন্যবাদ-বিরোধী। সে এখন নিজের নিয়ে ঠাট্টা করত যে কীভাবে সে রুশ-জাপান যুদ্ধে রুশের দিকে ছিল যখন নাকি পুরো সমাজবাদী আন্দোলন বিপ্লবী আন্দোলনের স্বার্থে রুশের পরাজয় চাইছিল। কেননা সে সময় তার নজরে রুশীয়রা সাদামানুষ ছিল, জাপানীরা ছিলনা। একটা আহত রুশীয় পা দেখে সে “স্বজাতিচেতনা” অনুভব করেছিল কেননা পা’টা তার পায়ের মত সাদা ছিল। মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে তার ঘৃণা হল তার সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্খী বই “দ্য স্টার রোভার”এর বিষয়বস্তু, আর উত্তেজনার জন্য উত্তেজনায় তার বিগত দিনের বিশ্বাসটাকে, যার জন্য সে নিজের ওপর মদ আর নেশার ওষুধের পরীক্ষা চালিয়েছিল, কালজয়ী “জন বার্লিকন”এ সে খন্ডন করল। সে অনেক দূরে চলে এসেছিল – যেগুলোর সাথে আগে তার সম্পর্ক ছিল সেই সমস্ত ধারণার বিপরীত দিকে সে বেরিয়ে এসেছিল, এবং যারা তাকে জানত তাদের সবার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে সে আসবেই।

আমি তাকে ছবিগুলোয় দেখিঃ এক হাতে নিজের বাগান থেকে সদ্য তোলা এক গোছা হলদে গোলাপ আর অন্য হাতে সাইকেলের হাতল ধরে আসছে, গাঢ় বাদামী চুলের ওপর টুপিটা পিছন দিকে হেলান, দুনিয়ার দিকে নক্ষত্রের মত বড় বড় নীল দুটো চোখ পাতার দীর্ঘ লোমের ভিতর দিয়ে দৃষ্টি মেলে আছে – অবর্ণনীয় সুন্দর আর পুরুষোচিত একটি ছেলে যার অভিব্যক্তির প্রজ্ঞা আর দয়ালুতা যৌবনকে আড়াল করে রাখে।

আমি তাকে দেখি পপির মধ্যে মুখ ডুবিয়ে শুয়ে আছে আর দুচোখের দৃষ্টি, তার বড় প্রিয় দৈত্যাকৃতি ইউক্যালিপটাস আর সেকোইয়ার চুড়োগুলো পেরিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার উঁচু নীল আকাশে উড়তে থাকা নিজের ঘুড়িগুলোকে অনুসরণ করছে।

আমি তাকে দেখি শান্ত, “দ্য স্প্রে”র ওপর - চাঁদ আমাদের পিছনে উঠছে - আর শুনি, আগের রাত জেগে পড়া স্পেন্সার আর ডারউইন থেকে করা তার সাধারনীকরণগুলো সে আওড়াচ্ছে। তার সমস্ত গতিবিধি এবং জীবনের প্রত্যেকটি খুঁটিনাটিকে এক মুগ্ধকর আকর্ষণে ভরে দিত তার ব্যক্তিত্ব। যখন শুরুর দিনগুলোয়, বিশ্বের ওপর নিজের ছাপ ফেলতে সে তার অতুলনীয় উদ্যমীশক্তি নিয়ে সংগ্রামে রত ছিল, তখনও সবাই তার প্রতিভা সহজাত বলে মানত।

আমি তাকে দেখতে পাই, রাত শেষ হওয়ার আগেই সে নিজের কাজে বসেছে, আর আমার মনে হয় যে ভোর তাকে অভিনন্দন জানিয়ে আলিঙ্গন করছে, এবং সে প্রকৃতির অন্যান্য, কম শ্রেণীগত পদার্থসমূহ থেকে বেশি মৌল-তত্ত্বগুলোর অংশ। মে মাসের সকালে আমি তাকে দেখি হানিসাক্‌ল পুষ্পলতা জড়ানো থামওয়ালা একটা বারান্দার রেলিং থেকে ঝুঁকে, প্রণয়ের হর্ষমদিরতায় একে অন্যের পিছু পিছু ঘুরতে থাকা দুটো হামিং পাখির দিকে চেয়ে আছে। সৌন্দর্যের বন্দী ছিল সে – পাখি আর নিকুঞ্জের, সমুদ্র আর আকাশের আর আর্কটিক জগতের বরফশীতল বিশালতার। রিচার্ড হোভে তাঁর “হিউম্যান ড্রিফ্‌ট” শীর্ষক প্রবন্ধে তাঁর বিশ্বদর্শনের সারসংক্ষেপ যে পংক্তিটি দিয়ে শেষ করেছিলেন, “দেখ, আমি বেঁচেছি!”, জ্যাক ছাড়া অন্য কেউ এত সত্য ভাবে এই কথাটি প্রতিধ্বনিত করতে পারবে না।
“দেখ, আমি বেঁচেছি!”

সে শুধু পৃথিবীর বিশাল প্রান্তরে, মকররেখীয় সূর্যালোকে আর শ্বেত হিমায়িত নৈঃশব্দে, পৃথিবীর সুখে আর দুর্দশায় বেঁচে থাকা শিশুদের সাথে বাঁচেনি, সে সবসময় জীবন ও মৃত্যুর ভাবনায় বেঁচেছে, আন্তর্জাতিক সমাজবাদের কালজয়ী ও সীমাহীন সংগ্রামে বেঁচেছে।
উৎসঃ দ্য মাসেস, জুলাই ১৯১৭ 
-------------------------------------------------------------------------------------------------------
আন্না স্ট্রান্সকির জন্ম হয়েছিল ১৮৭৮ সালের ২১শে মার্চ, রাশিয়ার ব্যাবিনোৎজে। তার পিতামাতা ছিলেন পুরোনো রাশিয়ার র‍্যাডিক্যালপন্থী মানুষ। আন্না তাঁদের সঙ্গে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিস্কো শহরে চলে আসে এবং সেখানেই শিক্ষা লাভ করে। সামাজিক সমস্যাবলী, সাহিত্য এবং শ্রমিক আন্দোলনের সাথে জীবন্ত যোগসুত্র ছিল।
 আন্না এবং তার পরিবার, তার এক ভাই ডঃ ম্যাক্স স্ট্রান্সকির বাড়িতে থাকত। আন্না এবং তার বোন রোজ, ক্যালিফোর্নিয়ার তরুণ লেখক ও শিল্পীদের একটি র‍্যাডিক্যালপন্থী দলের সদস্য ছিল। সেই দলেই ছিলেন জ্যাক লন্ডন, জিম হোয়াইটেকার, জর্জ স্টার্লিং এবং আর অনেকে। শতাব্দীবদলের সময় সানফ্রান্সিস্কো শহরে যে বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় বিকশিত হয়েছিল স্ট্রান্সকি বোনেরা তার নেতৃত্বে ছিল।

জ্যাক এবং আন্না উপসাগর এলাকার সমাজবাদীদের গতিবিধির নিয়মিত অংশীদার ছিল। খুব ভালো বন্ধু ছিল তারা এবং প্রথম দিকে একে অন্যকে কখনো রোমান্টিক ভাবে দেখেনি। একই ধরণের ভাবনা এবং স্বপ্নপ্রবণ দুই উচ্চ মেধাসম্পন্ন চিত্তের সম্পর্ক ছিল তাদের। জ্যাক লন্ডনের জীবনে আন্না স্ট্রান্সকির শক্তিশালী প্রভাব ছিল। ১৯০২ সালের কিছুটা সময় ছাড়া, যখন জ্যাক আন্নার ভালোবাসায় পড়েছিল, তারা খুব কাছের বন্ধু ছিল। আন্না নিজে কখনো জ্যাকের প্রেমে পড়েনি, কিন্তু জ্যাকের জন্য গভীরতম শ্রদ্ধা ছিল তার মনে।

১৯০০ সালের শেষ দিকে, প্রেমের প্রকৃতি নিয়ে তাদের চিঠিপত্র, “দ্য কেম্পটন-ওয়েস লেটার্স” নামে বইটির জন্ম দিল। বইটিতে জ্যাক, হার্বার্ট ওয়েস নামে, জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে আর আন্না, ডেইন কেম্পটন নামে, আদর্শগত ও আবেগগত দিক থেকে প্রেম নিয়ে আলোচনা করেছে। ১৯০৩ সালে বইটি প্রকাশিত হয়েছিল, এবং এখনও সম্পূর্ণ প্রেম-সাহিত্যে সবচেয়ে বেশি কৌতুহলোদ্দীপক এবং অদ্ভুত বইগুলোর একটি।

                                                     উৎসঃ রুস কিংম্যান, এ পিক্টোরিয়াল লাইফ অফ জ্যাক লন্ডন (১৯৭৯)
(বাংলা অনুবাদঃ বিদ্যুৎ পাল)      
Source: http://www.jacklondons.net/annastrunskymemoirs