Thursday, October 12, 2017

আমার ‘ঝুলন’



আমি      পরাণের সাথে খেলিব আজিকে মরণখেলা
নিশিথবেলা ।
সঘন বরষা, গগন আঁধার,
হেরো বারিধারে কাঁদে চারিধার
ভীষণ রঙ্গে ভবতরঙ্গে ভাসাই ভেলা;
বাহির হয়েছি স্বপ্নশয়ন করিয়া হেলা
রাত্রিবেলা ।

ওগো      পবনে গগনে সাগরে আজিকে কী কল্লোল !
দে দোল্‌ দোল্‌ ।
পশ্চাৎ হতে হা হা করে হাসি
মত্ত ঝটিকা ঠেলা দেয় আসি,
যেন এ লক্ষ যক্ষশিশুর অট্টরোল ।
আকাশে পাতালে পাগলে মাতালে হট্টগোল ।
দে দোল্‌ দোল্‌ ।…’

রাত । ঘূর্ণিঝড় আর বৃষ্টিতে তোলপাড় আকাশ । টিভি বলছে হাওয়ার গতি সাড়ে তিনশোয় শুরু হয়েছিল, তবে এখানে পৌঁছোতে পৌঁছোতে ৭০কিমিতে নেমে এসেছে । বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ চলছে ।
৭০০ কোটি মানুষের পৃথিবীতে প্রায় পঁচিশ কোটি মানুষ পূর্বভারতে এই মুহুর্তে এই ঝড়বৃষ্টিতে প্রভাবিত । এমনই ঘূর্ণিঝড় হয়ত আরো কয়েকটি এলাকায় চলছে – চীনে, তাঞ্জানিয়ায়, পেরুতে – আমরা জানিনা ।
এর আগে পৃথিবীতে আসা এমনই রাতগুলোর মত এরাতও কারো না কারোর জীবনে নিছক রাত নয় । বেশ কিছু দিন ধরে তার মাথায় নৈরাশ্যের অনির্দেশ দিনরাতের ভেদ আবছা করে দিয়েছে । রাতের এই ঝড় যেন আরো উস্কে দিয়েছে তার ভিতরের ঝড়টাকে । যে ঝড় তাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের দিকে । আর বৃষ্টি ? বৃষ্টি তো নয় যেন আত্মকরূণার অভিমান; বেঁচে থাকার শেষ ইচ্ছেটুকু কেড়ে নেওয়া অবসন্নতার হিম ।
কেন? কিসের জেরবার তার দিনযাপনে ? ‘ভালোবাসার প্রতারণা’, বাসি হয়ে ওঠায় বুঝতে পারার ? জীবনের বিস্ময়ের মাংস গলে হাড় বেরিয়ে পড়ার ? বিশ্বাসে চিড় ধরে যাওয়ার ? শ্রদ্ধা বা মমতার ভিত নড়ে যাওয়ার ?
ঠিক কোন পরিস্থিতিতে আত্মহননের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে মানুষ ? ‘পরাণের সাথে মরণখেলা’র বদলে নিজের পরাণের রক্তধারা জমাট করে দেয় ধমনীতে ।
সব প্রেমিক কি নিজের প্রেমিকাকে নিয়ে পালাতে পারে নিরুদ্দেশযাত্রায় ? প্রেমিকাই কি দুঃসাহসে চেপে ধরতে পারে আত্মভোলা ‘রসায়নবিদ’কে (মনে করুন ঋত্বিকের ‘নাগরিক’) ? খাপ পঞ্চায়েত ত পরের ব্যাপার । মনটাই তো খাপে খাপে বন্দী ।
-          সব মেয়ে কি দিওয়ানি হয়ে দৌড়োয় জীবনের, জগতের সমরাহ্বান স্বীকার করে নিতে ?
-          কিছু মেয়ে তবু তো দৌড়োয় ।
-          সবাই কি তরে যায় ?
-          অনেকে হারিয়ে যায় গুমনাম । তবু যারা দৌড়েছে তারাই বদলেছে নিজেদের গল্প, গত একশো বছরে ।
-          কিছুটা ফাইনান্সিয়াল ব্যাকগ্রাউন্ড চাই ভায়া !
-          ছেঁদো কথা ।
……
চরম মুহুর্তগুলো জীবনে আসে । আর সে মুহুর্তে একটাই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারে মানুষঃ-

আমি      পরাণের সাথে খেলিব আজিকে মরণখেলা…

বাকি সব সিদ্ধান্ত নেতিবাচক । আত্মহত্যার – একবারে অথবা তিলে তিলে । মৃত্যু কে চায় ? কিন্তু না চাইলে যে পরাণের সাথে মরণখেলা খেলতে হয় বারবার, এই উপলব্ধিটা হয়না (হতে চায়না – আড়াল করে রাখে আমাদের চেতনার দাসত্ব; কেন, তার বিশেষ কার্যকারণে যাওয়ার প্রয়োজন নেই এখন) । তাই, কিছু মৃত্যু হয়ত এড়িয়ে যেতে পারি, কিন্তু বড় মৃত্যু, নিরর্থক দিনযাপনের, সারাটি জীবন যাপনের মৃত্যু এড়াতে পারিনা ।
আবার পরাণের সাথে মরণখেলাও যে শেষ যুক্তিতে সামাজিক !

*                      *                      *                      *                      *
একটা কথা আছে, হুজুগ । হুজুগে যুগ পাল্টায়না । হুজুগ কোনো ঘটনা নয় । হুজুগ মনের একটি সামাজিক অবস্থা । হুজুগেই মানুষ কিছু একটা ধরে, অবলম্বন হিসেবে । হুজুগের স্তর ভালোবাসায়ও হয়, এ্যাডভেঞ্চারেও হয়, গবেষণাতেও হয় আবার আন্দোলনেও হয় ।
‘ভীষণ রঙ্গে’ ‘স্বপ্নশয়ন’ হেলা করে বেরিয়ে পড়তে হয়; পৌঁছে যেতে হয় রামলীলা ময়দানে – আন্না হাজারের শপথের সাথে শপথ মেলাতে । মোমবাতি হাতে তুলতে হয় ভগৎ সিং চকে – ইরোম শর্মিলার জেদী কন্ঠস্বরের সাথে কন্ঠ মেলাতে । (এর মানে এই নয় যে যারা যায় তারা সবাই হুজুগেই যায় । কিন্তু হুজুগেও যায় আর আমি আপাততঃ তাদের কথাই বলছি ) ।
মিছিলে বন্ধু জোটে নানারকম, সমাবেশে রাত কাটে । গবেষণাগারে শেষরাতে মাথা কুরে খায় সিনিয়রদের ক্যরিয়রমুখী লবির কথাগুলো । এ্যাডভেঞ্চার ঘিরে ধরে বরফশীতল নির্জনতা ও তারপর ?… অন্যরকম, অনেকটা অন্যরকম হয় পরের দিন সকাল । একটা জেদ ছুটে এসে ঘিরে ধরে শরীর – আমি করব !
ভুখ হড়তালের পঞ্চম দিন সকালে ঘুম ভাঙে এক অসীম নির্লিপ্তিতে । মৃত্যুও যেন দীর্ঘতর ঘুম !… পুলিশ কর্ডনের মুখোমুখি, ভয়ে নিজের চোখে বেইজ্জৎ হয়ে পিছু হটে, আবার যাই, ব্যারিকেড টপকাই; লাঠি খেয়ে কাঁধের হাড় ফাটে, মাথার আগলটাও খুলে যায় । প্রথম দেখতে পাইঃ-

আজি      জাগিয়া উঠিয়া পরাণ আমার বসিয়া আছে
বুকের কাছে ।
থাকিয়া থাকিয়া উঠিছে কাঁপিয়া
ধরিছে আমার বক্ষ চাপিয়া
নিঠুর নিবিড় বন্ধনসুখে হৃদয় নাচে;

সদ্য জেগেছে তাই চিনেছি । এই জায়গায় তো আজকাল হাঁটু গেড়ে বসে হাতের ফুলটা বাড়িয়ে বিবাহের প্রস্তাব দিতে হয় ! ‘আই লাভ ইউ’ বলতে হয় ! নববধুকে যতনভরে রাখি, সোহাগ করি, সুখের সংসার গড়ে তোলার চেষ্টা করি । নইলে, অন্ততঃ ভালোবাসাবাসির কথা বলি, সারাজীবন ‘সাথ নিভানে কা’র শপথ করি ।
হুজুগ যেমন বেশি দিন থাকেনা, যায় অথবা পাল্টায়, ‘নিবিড় বন্ধনসুখে’র স্তরটাও বেশি দিন থাকেনা । বিয়ে করলেও মরে, বিয়ে না করলেও মরে । সংগঠনের রোজনামচায় দৃষ্টি হারায়, শুধু নিয়মশৃংখলার তন্ত্র থেকে যায় । তারপর তন্ত্রও গিয়ে থাকে মন্ত্র – পেট থেকে গজিয়ে ওঠে গোপন দ্বিতীয় মাথা । লাল ফিতের বাঁধন খুলতে খুলতে হারিয়ে যায় স্বাধীন গবেষণার ইচ্ছে – কোম্পানির গোলামি বেশি লোভনীয় মনে হয় । ছবি-মালা-বরেণ্যস্মরণ চর্বিতচর্বন হয়ে ওঠে । বন্ধুত্ব, জিন্দাদিল ইয়ারি হারিয়ে যায় ক্যরিয়রের দৌড়ে ।
এমনকি দেশের জীবনও হারিয়ে যায় স্বাভিমানহীনতায়, উদ্যমহীনতায় । মুমুর্ষু সমাজব্যবস্থার  বিষাক্ত স্ফীতি খেয়ে চলে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের লোকায়তিক ।
হায়        এতকাল আমি রেখেছিনু তারে যতনভরে
শয়ন-‘পরে ।
দুয়ার রুধিয়া রেখেছিনু তারে গোপন ঘরে
যতনভরে ।।
……………
শেষে      সুখের শয়নে শ্রান্ত পরাণ আলসরসে,
……………
পরশ করিলে জাগেনা সে আর,
কুসুমের হার লাগে গুরুভার
ঘুমে জাগরণে মিশি একাকার নিশিদিবসে ।
বেদনাবিহীন অসাড় বিরাগ মরমে পশে’

পুরোনো বাসর নতুন উদ্যমে তবু আবার সাজাই হয়ত দুরাশায়, কোনো একদিন । সুর ফেরেনা । পুরোনো ইয়ারি ফিরিয়ে আনতে চাই বন্ধুদের ‘দারু’র পার্টিতে ডেকে এনে । শেষরাতে একে অন্যকে বিষ উগরে ফিরে যাই নিজেদের সেই সুরছেঁড়া বাসি বাসর, অর্থাৎ  খোঁড়লে । পুরোনো কাজ ধরতে চাই আবার থেকে – অবসাদ জেঁকে ধরে । সংগঠনে সাথীদের পুরোনো লড়াকু মনোভাব, একে অন্যের প্রতি মমত্ব বজায় রাখতে বলি – মিটিং করি, ওয়ার্কশপ করি । দেখি অনেকের ব্যস্ততা আজকাল আরো সব অন্যান্য দিকে বেড়ে গেছে । দেশ ফিরে তো আসেই না, আরো হারিয়ে যেতে থাকে ‘ভারতপর্ব’এর ঝলমলে লেসার শো’য়ে ।

ঢালি       মধুরে মধুর বধুরে আমার হারাই বুঝি

একটা জগৎবিখ্যাত বই আছে । কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো । সবাইকার পছন্দ নাও হতে পারে । তবু, বইটার প্রথম দিকের একটা বিখ্যাত প্যারাগ্রাফ থেকে উদ্ধৃত করছি ।
“আজ অব্দিকার সর্বপ্রকার মানবসমাজের লিখিত ইতিহাস…” কী, আরো লিখতে হবে ? সবাই জানেন । কিন্তু, তৃতীয় লাইনটার দিকে নজর দেওয়ানোর জন্য পুরোটা আবার উদ্ধৃত করছি । “আজ অব্দিকার সর্বপ্রকার মানবসমাজের লিখিত ইতিহাস শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস । মুক্তমানুষ (‘ফ্রীম্যান’ এর গ্রীক অর্থে) ও ক্রীতদাস, প্যাট্রিসিয়ান ও প্লেবিয়ান, জমিদার ও ভূমিদাস, গিল্ডমাস্টার ও জার্নিম্যান, এককথায় অত্যাচারী ও অত্যাচারিত একে অন্যের বিরোধে রত থেকেছে আজঅব্দি, কখনো গোপনে কখনো প্রকাশ্যে লড়াই চালিয়েছে অনবরত । একটা লড়াই যা প্রতিবার, হয় সমাজের বৈপ্লবিক পুনর্গঠনে শেষ হয়েছে নয়তো…”
‘নয়তো’ …? তারপর কী ?
“নয়তো যুদ্ধরত শ্রেণীগুলির সমূহ ধ্বংসে শেষ হয়েছে ।”
কী বস্তু ? এই ‘সমূহ ধ্বংস; ?
ভূমিকম্পে, অগ্ন্যুৎপাতে, জলপ্রলয়ে সব কিছু শেষ হয়ে যাওয়াই কি শুধু সমূহ ধ্বংস ? এমনকি এক একটি জাতির সম্পূর্ণ অস্তিত্ব, একটি পুরো সভ্যতা হারিয়ে গেছে কালের গহ্বরে, অথবা গত দু’শো বছরে পূঁজির রথচক্রে পিষ্ট হয়ে কেননা তারা সমাজের বৈপ্লবিক পুনর্গঠন সময় মত করতে পারেনি ।
কিন্তু তাছাড়াও, সমাজজীবনের যে অর্থনৈতিক বিপর্যয়, সামাজিক, নৈতিক, সাংস্কৃতিক বিপর্যয়, সেটা বাড়তে বাড়তে ‘সমূহ ধ্বংসে’ পৌঁছে যেতে পারে না কি ?
ঢালি       মধুরে মধুর বধুরে আমার হারাই বুঝি
পাইনে খুঁজি ।
…………
অতল স্বপ্নসাগরে ডুবিয়া মরি যে যুঝি
কাহারে খুঁজি ।

কর্মভিত্তিহীন আশাবাদের স্বপ্নসাগরে ডুবে যুঝে মরছি – কাকে খুঁজছি ? যতই মধুর ঢালিনা কেন মধুরে, পরানবঁধুকে আর খুঁজে পাওয়া যায়না ।

একটা বই বেরিয়েছে কিছুদিন আগে । ‘অপটিমাল কন্ট্রোল অফ নন-লিনিয়ার প্রসেস, উইথ এ্যাপ্লিকেশন ইন ড্রাগস, কোরাপশন এ্যান্ড টেরর’ । যদিও খুবই চমকপ্রদ তার বিচার্য বিষয়, বিচারপদ্ধতি অত্যন্ত জটিল, সাধারণ বোধগম্যতার বাইরে । বিশুদ্ধভাবে গণিতবিদদের এলাকা । রকেটের বিভিন্ন ইঞ্জিনগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রাখার জন্য যে গাণিতিক প্রক্রিয়া ব্যাবহার করা হয়, সেটি প্রয়োগ করা হয়েছে সমাজের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের ওপর । যেমন কোরাপশন, অর্থাৎ দুর্নীতি । বইয়ের লেখকদের কাছে বিচার্য প্রশ্নটা হল এরকমঃ যদি কোনো সমাজে সাধারণভাবে মানুষ একদিকে ধনসম্পত্তি, প্রতিপত্তি ইত্যাদি এবং অন্যদিকে দুর্নীতিরোধক শাস্তিবিধানের তুলনার ভিত্তিতে সততা ও দুর্নীতিগ্রস্ততার মাঝে ঘোরাফেরা করে, তাহলে কি সে সমাজে সৎ ও দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষের অনুপাতে কখনো দীর্ঘস্থায়ী স্থিরতা আসতে পারে ? বা, গাণিতিক ভাষায়, স্থায়ী ভারসাম্য আসতে পারে কি সে সমাজে ?
বইটার লেখকদল (পাঁচজন গবেষক) গাণিতিকভাবে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, না, আসতে পারেনা । হয় কিছুদিনের মধ্যে সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত হবে অথবা সবাই সৎ হয়ে যাবে । অর্থাৎ, সেই একই কথা, হয় বৈপ্লবিক পুনর্গঠন নয় সমূহ ধ্বংস । মাঝামাঝি জায়গায় বেশি দিন থাকা যাবেনা ।
এ তো গেল বাইরের কথা ।
ঘরের কথা ?
কতরকম পরিভাষা ও প্রতীক গড়ে তুলি দাম্পত্যে দুর্নীতির ! এ্যাডজাস্টমেন্ট, কম্প্রোমাইজ । সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে স্যাক্রিফাইস ! সব ফাঁপা ! দাম্পত্য ভেঙে যায় ! ইন্ডিপেন্ডেন্স ! সেও ফাঁকা !

ব্যাকুল নয়নে হেরি চারিপাশে
শুধু রাশি রাশি শুষ্ক কুসুম হয়েছে পূঁজি;…

*                      *                      *                      *                      *
তাই       ভেবেছি আজিকে খেলিতে হইবে নূতন খেলা
রাত্রিবেলা ।
মরণদোলায় ধরি রশিগাছি
বসিব দুজনে বড়ো কাছাকাছি
ঝঞ্ঝা আসিয়া অট্ট হাসিয়া মারিবে ঠেলা
আমাতে প্রাণেতে খেলিব দুজনে ঝুলনখেলা
নিশীথবেলা ।

‘ভেবেছি’ । কিন্তু ভাবলেই কি আর হয় ? প্রাণকে নিজের অন্তরে অনুভব করা যদিও বা যায় মুহূর্তের চৈতন্যে, তাকে ধরে রাখাই হয় কঠিন । কেননা প্রাণ তো আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় । প্রেয়সীও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় । প্রাণ ইতিহাসের সাড়া । প্রেয়সী আরেকটি প্রাণের ধারক । তাতেও সেই একই ইতিহাসের সাড়া । প্রাণকে কাছে ধরে রাখতে গেলে ইতিহাসের সাড়া হৃদয়ে বাজিয়ে রাখতে হবে অনুক্ষণ । প্রেয়সীকে কাছে ধরে রাখতে গেলে তার প্রাণেও যে ইতিহাসের সাড়া তা কান পেতে শুনতে হবে ।
ইতিহাসের সাড়া প্রাণে বাজিয়ে রাখা, কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে গান শোনাও নয়, ডুগডুগি বাজানোও নয় । ইতিহাসের সাড়া প্রাণে অনুক্ষণ বাজিয়ে রাখতে গেলে শামিল হতে হবে ইতিহাস-নির্মাণের কর্মযজ্ঞে । প্রেয়সীও শামিল হবে তাতে । তবেই প্রেয়সীকেও পাওয়া যাবে ।

এই কঠোর সত্যটার মুখোমুখি হওয়া বেশ কঠিন । সব কবিতা এখানেই এসে হোঁচট খায় । এখানে তাকে আবার নতুন করে জায়গা করে দিতে হয় ইতিহাস-নির্মাণে রত কেজুড়ে মানুষটার জন্য, প্রাণশক্তির সন্ধানে । সাধারণ কবিতা তা করতে গিয়ে ছন্দ হারিয়ে ফেলে, ভেঙে যায় । তাই আগেই, কিছু স্বপ্নবাক্য আউড়িয়ে শেষ করে নিজের যাত্রাপথ । যাতে এখান অব্দি না পৌঁছোতে হয় । কিন্তু অনন্যসাধারণ যে কবিতা সে গ্রহণ করে, কেজুড়ে প্রাণশক্তিটাকে প্রবেশ দিয়ে, নিজের ছন্দ ভেঙে, নতুন ছন্দে নিজেকে আবিষ্কার করার সমরাহ্বান । সে কবিতা বলতে পারেঃ-
প্রাণেতে আমাতে মুখোমুখি আজ
চিনি লব দোঁহে ছাড়ি ভয়লাজ…

‘থ্রী ইডিয়টস’ ফিল্মে শরমন যোশির ক্যারেক্টারটা মনে আছে ? ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে বলেছিল, “স্যার ! শরীরের সতেরোটা হাড় ভেঙে আমি এই এ্যাটিচ্যুডটা পেয়েছি । চাকরী আপনারা রাখুন, এই এ্যাটিচ্যুড আমি ছাড়তে পারবো না ।” হাসপাতালে যেদিন ওর জ্ঞান ফিরে এসেছিল, ভয়ে ভয়ে বেঁচে থাকার বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, তখন নিশ্চয়ই সেও আউড়ে থাকবে উপরের পংক্তিদুটো, তা সে যা ভাষাতেই হোক । তারপরে অবশ্য সিনেমা ।
______________
 
‘স্বপ্ন টুটিয়া বাহিরেছে আজ দুটো পাগল’ । অর্থাৎ স্বপ্ন নয়, কঠোর বাস্তবের জমিতে ‘ভয়লাজ’ ছেড়ে যদি আমি ও প্রাণ একে অন্যকে চিনে নিতে পারি, যদি ইতিহাসের সাড়া বাজে দুজনেরই প্রাণে অনুক্ষণ তবেই গাইতে পারবঃ-

দে দোল্‌ দোল্‌ ।
এ মহাসাগরে তুফান তোল্‌ ।
বধুরে আমার পেয়েছি আবার, ভরেছে কোল ।
……………
বক্ষ শোণিতে উঠেছে আবার কী হিল্লোল !


ªªªªªª

(২০১৪ সালের কোনো একদিন লেখা)

মাতৃভাষা, মৈত্রীভাষা, দেশভাষা

এই লেখাটা এক বিহারবাসী বাঙালি কিম্বা বাংলাভাষী বিহারীর দৃষ্টিভঙ্গী, যে নিজের ও নিজের ভাষাগত সমূদায়ের মাতৃভাষা সংক্রান্ত অধিকারগুলো সরকার ও প্রশাসনের কাছ থেকে আদায় করে নিতে দল বেঁধে (আমি বিহার বাঙালি সমিতির সদস্য) লড়ছে – পরিস্থিতি মেনে নেওয়ার বা মানিয়ে চলার প্রবৃত্তিগুলো রুখছে।
বিহার বাঙালি সমিতি মনে করে বিহারবাসী বাংলাভাষী সমুদায় প্রধানতঃ বিহারেরই অংশ, প্রবাসী নয় (কিছু চাকরিজীবী, কাজেকর্মে আসা মানুষজন বাদে) এবং বিহারের রাজনৈতিক প্রেক্ষিতেই তাদের নিজেদের লড়াইটা লড়তে হবে।
দ্বিতীয়তঃ, লেখাটার নামের পিছনে যে ধারণাটা কাজ করছে সেটাও বলে দিই।
মাতৃভাষা শব্দটায় বোঝাবার কিছু নেই। মাতৃভাষা মাতৃভাষা। যার পাঠ দিয়ে আমাদের শিক্ষা শুরু হওয়া উচিৎ। তারপরে আসে, একটি বহুভাষী দেশের জন্য, সম্পর্কভাষা বা লিংগুয়া ফ্রাংকা, যেটা আবার ভারতসঙ্ঘের সঙ্ঘীয় বা কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রভাষাও। আমি বলছি এই ভাষাটি প্রকৃত অর্থে মৈত্রীভাষা হওয়া উচিৎ। কিন্তু তা হয়ে উঠতে পারছে না। বৈরিতার একটা জায়গা গড়ে তুলছে সরকারের শিক্ষানীতি ও আমলাতন্ত্র। যদি বৈরিতার সে জায়গাটা শেষ করে দেওয়া যায় রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যুক্ত প্রচেষ্টায় তবেই একসাথে মিলে এই বাজার-মৌলবাদের যুগে পুনরুজ্জীবন ঘটানো যাবে দেশভাষার যা বস্তুতঃ ভারতীয় ভাষাসমূহের কলতান – এক মহান কোরাস।

বিষয়ে প্রবেশ করার আগে আমার মনে হয় ভাষাসম্পর্কিত যে সকল অধিকার ও কর্তব্য – নাগরিকের এবং রাষ্ট্রশক্তির – এ দেশের সংবিধানে বিধৃত আছে, সেগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত চর্চা হয়ে যাওয়া দরকার। কেননা যে সমস্যাগুলোর প্রেক্ষিত হিসেবে এই লেখাটা তৈরি করছি, তার সবকটির সমাধান সংবিধানের দৃষ্টিভঙ্গির আলোতেই আমরা এযাবৎ করে এসেছি – মুখ্যমন্ত্রীর জনতা দরবার, বিধানসভায় প্রশ্ন উত্থাপন, খুঁজে খুঁজে বাঙালি স্বার্থ বুঝবেন এমন বিধায়ককে ধরে লবিইং, ফের জনস্বার্থ মামলা, জেলায় জেলায় ধর্না, প্যাম্ফলেট বিলি করা, পাটনার রাস্তায় মিছিল, ভোট বয়কট ইত্যাদি অনেককিছুর মধ্য দিয়ে – এবং কিছু কিছু সুফলও পেয়েছি।  
যখন নাকি বিহার থেকে ঝাড়খন্ড আলাদা হওয়ার পর বিহারের সরকারী আমলাদের মুখে এই কথাটিই শোনা যেত, “বাঙালি? বিহারে আর বাঙালি কোথায়? সব তো ঝাড়খন্ডে চলে গেছে!’ এবং সেই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বাংলা পাঠ্যক্রমএর জন্য সিলেবাস কমিটি গঠন, বাংলা পাঠ্যপুস্তক রচনা ও মুদ্রণ ও বিতরণ, স্কুলে বাংলা শিক্ষক নিয়োগ, ভাষাগত সংখ্যালঘু স্কুলগুলোর উন্নয়নে অন্ততঃ কিছুটা অংশীদারী... সমস্ত কিছু বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।  

সঙ্ঘের রাজভাষা
এ দেশের সংবিধান অনুসারে “ভারত, অর্থাৎ ইন্ডিয়া, রাজ্যগুলির সঙ্ঘ”১। তাই সংবিধানের দৃষ্টিতে এ দেশের, হিন্দীতে যাকে বলে ‘রাষ্ট্রভাষা’, বাংলায় ‘জাতিভাষা’ এবং ইংরেজিতে ‘ন্যাশন্যাল ল্যাংগুএজ’, নেই (হিন্দীতে জাতীয়তাকে বলে ‘রাষ্ট্রীয়তা’)। হিন্দীও ‘রাষ্ট্রভাষা’ অর্থাৎ জাতিভাষা বা জাতীয়ভাষা নয়।২
ভাষার প্রশ্নে সংবিধান বলে, “সঙ্ঘের রাজভাষা হবে হিন্দী এবং লিপি হবে দেবনাগরী”৩। রাজভাষা অর্থাৎ ‘অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ অফ দ্য স্টেট’ – ‘স্টেট’ এখানে রাজ্য বা প্রদেশ নয়, রাজ, সরকার, শাসন ও প্রশাসন।
এর পর, এই ‘রাজভাষা’ সম্পর্কিত সমস্যাগুলোর নিদান বা প্রাসঙ্গিক ব্যাপারগুলোয় সুপারিশ করার জন্য সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে নির্দেশ দিয়েছে যে দেশের সংসদে এই সংবিধান গৃহীত হওয়ার পাঁচ বছর এবং আবার দশ বছর পর, “নিজ আদেশে একটি কমিশন গঠিত করবেন তথা কমিশনের একজন অধ্যক্ষ এবং অষ্টম তপশীলে বিনির্দিষ্ট বিভিন্ন ভাষার প্রতিনিধি নিযুক্ত করবেন; তাঁর আদেশে কমিশন যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে তা নির্ধারিত থাকবে”৪। [কিছু শব্দের ওপরে জোর লেখকের]
সংবিধানে, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তাবিত এই কমিশনকে এ নির্দেশও দেওয়া হয়েছে যে, “নিজের সুপারিশগুলো করার সময় এই কমিশন ভারতের শিল্পগত, সাংস্কৃতিক এবং বৈজ্ঞানিক উন্নতির প্রতি তথা অহিন্দীভাষী ক্ষেত্রের মানুষদের লোকসেবা [public services] সম্পর্কিত ন্যায়সংগত দাবী ও স্বার্থের প্রতি সর্বাঙ্গীণ দৃষ্টি রাখবে”।
সঙ্ঘের সংবিধানে সঙ্ঘের রাজভাষা নিয়ে সিদ্ধান্ত তো হয়ে গেল। কিন্তু তাৎক্ষণিক প্রভাবে হিন্দীকে সঙ্ঘের একমাত্র রাজভাষা করার প্রাথমিক প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অহিন্দীভাষী, বিশেষকরে দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়ে গেল। তখন ইংরেজীকেও রাজভাষা হিসেবে বজায় রাখার বিধান দেওয়া হল। সময়সীমা রাখা হল, তখন এবং পরেও, কিন্তু প্রতিবার সেই সময়সীমা বাড়াতে হল।
প্রশ্ন ওঠে, অষ্টম তপশীলে বিনির্দিষ্ট বিভিন্ন ভাষার যে প্রসঙ্গ উঠে এল সে ভাষাগুলোকে সংবিধান কোন শ্রেণীতে রাখল। সেটা স্পষ্ট নয়। রাজ্যগুলোকে অবশ্যই হিন্দীর বদলে কোনো অন্য ভাষাকে (সেই রাজ্যের ভিতরে) রাজভাষা করার অধিকার দেওয়া হল কিন্তু সে অধিকারকে অষ্টম তপশীলের নিরিখে সীমিত করা হলনা। তপশীলভুক্ত নয় এমন যে কোনো ভাষাকে রাজ্য প্রথম বা দ্বিতীয় রাজভাষার স্থান দিতে পারে।
এসব দেখে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে সংবিধান রচয়িতাদের মাথায় ভাষা সম্পর্কিত বিষয়টি শুধু ঔপনিবেশিক ভাষা ইংরেজিকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরিয়ে, স্বাধীনতা আন্দোলনপর্বে বিকশিত সম্পর্কভাষা বা লিংগুয়া ফ্রাংকা খড়িবোলী হিন্দীকে সঙ্ঘের রাজভাষার হিসেবে উন্নীত করা এবং সেই প্রেক্ষিতে (১) রাজ্যগুলির ভাষাগত অস্মিতাকে (যদিও ভাষাভিত্তিক পুনর্গঠন পরে হল) পরোক্ষ স্বীকৃতি দেওয়া তথা (২) ভাষাগত সংখ্যালঘুদের ভাষাসম্পর্কিত অধিকারগুলোকে পরিভাষিত ও সংরক্ষিত করাতেই সীমিত ছিল।
অষ্টম তপশীল তৈরিই হল সংবিধানের ধারা ৩৪৪(১) এবং ৩৫১ অনুসারে ‘সঙ্ঘের রাজভাষা’ হিসেবে হিন্দীর সত্বর প্রসার সম্পর্কিত পথনির্দেশের জন্য। যে ভাষাগুলোকে তপশীলভুক্ত করা হল সে ভাষাগুলোকে জাতীয়ভাষা বা ‘রাষ্ট্রভাষা’ও বলা যাচ্ছিল না আবার রাজ্যে স্বীকৃত ভাষা হিসেবেও পরিভাষিত করা যাচ্ছিল না। এটুকুই বলা যাচ্ছিল যে এই ভাষাগুলো সংস্কৃত (যেটি প্রাচীন ও উৎসভাষা) বাদে দেশের আধুনিক ভাষাসমষ্টি। এই ভাষাগুলো যারা বলে সেই জনতা এই দেশেরই কোনো না কোনো এলাকায় অথবা একসাথে কয়েকটি এলাকায় থাকে এবং, উর্দু (যার জাতীয়-ভৌগোলিক অস্মিতা হিন্দীরই অংশ) বাদ দিয়ে, স্বাধীনতা আন্দোলনে নিজেদের বিশিষ্ট জাতীয় অস্মিতা প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তাই অষ্টম তপশীল একটি খোলা তপশীল হয়ে রইল যাতে পরে আরো ভাষা অন্তর্ভুক্ত হতে থাকল। প্রথমে এই তপশীলে ১৪টি ভাষা ছিল। যোগ হতে হতে ২০০৪ সালে সে সংখ্যাটি হল ২২। এখনো, অষ্টম তপশীলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য ৩৮টি ভাষার দাবী কেন্দ্রীয় সরকারের ফাইলে, অনিষ্পাদিত।

ভাষাগত সংখ্যালঘুদের ভাষা ও শিক্ষা সম্পর্কিত অধিকার
সংবিধানে বিধৃত মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে সর্বাধিক পরিচিতঃ “বাকস্বাধীনতা এবং অভিব্যক্তির স্বাধীনতা”৫। এর প্রয়োগ বিস্তৃত এবং ভাষাকেও শামিল করে। মৌলিক অধিকারসংক্রান্ত অধ্যায়ে পরের দিকে সংবিধান বলছেঃ-
সংখ্যালঘু শ্রেণীসমূহের স্বার্থসংরক্ষণ৬
(১) ভারতের রাষ্ট্রগত এলাকা বা তার কোনো অংশের নিবাসী নাগরিকদের যে কোনো উপ-অংশের, যদি নিজেদের বিশিষ্ট ভাষা, লিপি অথবা সংস্কৃতি থাকে, তা বাঁচিয়ে রাখার অধিকার থাকবে।
(২) রাষ্ট্র কর্তৃক পৃষ্ঠপোষিত অথবা রাষ্ট্র-তহবিল থেকে সাহায্যপ্রাপ্ত কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশে, কোনো নাগরিককে ধর্ম, মূলবংশ, জাত, ভাষা অথবা এর মধ্যে কোনো একটিরও ভিত্তিতে বঞ্চিত করা হবেনা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনায় এবং প্রশাসনে সংখ্যালঘু শ্রেণীসমূহের অধিকার৭
(১) ধর্ম অথবা ভাষাভিত্তিক সমস্ত সংখ্যালঘু শ্রেণীসমূহের আপন রুচি অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনার ও পরিচালনার অধিকার থাকবে।
(২) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাহায্য দেওয়ার সময় রাষ্ট্র কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে, সেটি ধর্ম অথবা ভাষাভিত্তিক কোনো সংখ্যালঘু শ্রেণীর পরিচালনায় রয়েছে।

সংবিধান এর পর অভিব্যক্তির ভাষা সম্পর্কিত একটি মৌলিক অধিকারের ব্যাখ্যা করে যে “প্রত্যেক ব্যক্তির, কোনো অভিযোগের নিবারণে সঙ্ঘ বা রাজ্যের কোনো আধিকারিক বা প্রাধিকারীকে, প্রয়োজনানুসারে, সঙ্ঘ বা রাজ্যের কোনো ভাষায় নিবেদন দেওয়ার অধিকার থাকবে”৮। এবং এর পর ওখানেই পরবর্তী প্যারাগ্রাফে ‘মাতৃভাষা’র উল্লেখ রয়েছে।
“প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ সুবিধা – প্রত্যেকটি রাজ্য ও রাজ্যের অন্তর্গত প্রত্যেক স্থানীয় প্রাধিকারী সংখ্যালঘু শ্রেণীর বালকবালিকাদের জন্য, শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষায় শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবে এবং রাষ্ট্রপতি কোনো রাজ্যকে এমত ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করার জন্য আবশ্যক ও সমুচিৎ নির্দেশ দিতে পারবেন”৯।
এর পর, ভাষাগত সংখ্যালঘু সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ আছে।
“ভাষাগত সংখ্যালঘু শ্রেণীসমূহের জন্য বিশেষ আধিকারিক – (১) ভাষাগত সংখ্যালঘু শ্রেণীসমূহের জন্য এক বিশেষ আধিকারিক থাকবে যাকে নিযুক্ত করবে রাষ্টপতি। (২) বিশেষ আধিকারিকের কর্তব্য হবে যে সে এই সংবিধানে ভাষাগত সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার যাকিছু ব্যবস্থার বিধান দেওয়া হয়েছে সে সম্পর্কিত সমস্ত বিষয়ের অন্বেষণ করবে। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্ধারিত কালান্তরালে সেই বিষয়গুলি সম্পর্কে এই আধিকারিক রাষ্ট্রপতিকে প্রতিবেদন দেবে। রাষ্ট্রপতি এই সমস্ত প্রতিবেদন সংসদের প্রত্যেকটি সভায় পেশ করার ব্যবস্থা করবে তথা সম্পর্কিত রাজ্যের সরকারের কাছে পাঠাবে।”


২
বাঁচা গেল। আইন ও বিধানের অনুবাদ বড় কঠিন কাজ। তবু এতক্ষণ ধরে নিজেই নিজের লেখাটা আইনী বাক্যাংশে কন্টকিত ও জর্জর করলাম কেননা এসবগুলোই আমাদের লড়াইয়ে, বাদবিবাদে এবং মাঝে মধ্যে হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করতে কাজে লাগে। তবু এটাকে সম্পূর্ণ বলবনা কেননা আমি আইনজ্ঞ নই আর সংবিধানের অনেককিছু খোলসা হয় পরে, কোনো সমস্যার সমাধানে প্রয়োগ করার সময়, যেটা সুপ্রীম কোর্টের বিভিন্ন রায়ের মাধ্যমে হয়ে থাকে। যেমন কিছুদিন আগে, কর্ণাটক সরকার কর্তৃক কন্নড় বা নিজের মাতৃভাষার পাঠ আবশ্যিক করার আদেশ এবং তার বিরুদ্ধে প্রাইভেট স্কুলমালিকদের নালিশের ওপর সুপ্রীম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের রায়। কর্ণাটক সরকারের ওই আদেশেরই ভিত্তিতে আজ রায়চুর জেলার রিফিউজী কলোনীর বাংলাভাষী পরিবারের শিশুরা স্কুলে বাংলা পড়তে পারছে। 
বিহারে ১৯৯১ সাল থেকে বলবৎ বিহার রাজ্য সংখ্যালঘু আয়োগ আইনে বিহারের বাংলাভাষীরা ভাষাগত সংখ্যালঘু এবং সেজন্য আয়োগের একজন উপাধ্যক্ষ পদ একান্তরে বাংলাভাষী অথবা খ্রিশ্চান হন। এর পিছনে আছে বিহার বাঙালি সমিতির দীর্ঘ, কয়েক দশকব্যাপী কাজের ইতিহাস।
কেননা দেখুন, সারা দেশের জন্য যে সংখ্যালঘু কমিশন আইন ১৯৯২ সালে বলবৎ হল এবং সে অনুসারে কমিশনের গঠন হল তার দৃষ্টিতে ভাষাগত সংখ্যালঘুর প্রশ্ন রইলনা। যখন নাকি জাতিসঙ্ঘের সেই বছরেরই ঘোষণায় ভাষাগত সংখ্যালঘুর উল্লেখ ছিল। কমিশনের দৃষ্টিতে ভাষাগত সংখ্যালঘুর প্রশ্ন এতটাই রইলনা যে দেশে ১৯৫৬ সাল থেকে যে একটা ন্যাশন্যাল কমিশনার ফর লিংগুইস্টিক মাইনরিটিজ কাজ করছে, দিল্লীতে লোদী রোডে, পর্যাবরণ ভবনে যার অফিস, তার উল্লেখটাও রইলনা। আর সত্যি তো, এন∙সি∙এল∙এম∙ যে আদৌ রয়েছে, কী কাজ করছে, কেউ জানেনা। কোথাও ভাষাগত সংখ্যালঘুরা এই কমিশনারের কোনো সাহায্য পায়না। আগে কী ছিল  জানিনা। হ্যাঁ, সারাদেশের রিপোর্ট কিন্তু প্রতি বছর সরকারের কাছে জমা হয়! কোত্থেকে সেই রিপোর্ট জোটানো হয় তাও জানিনা। সরকার অবশ্য বলতে পারে যে ১৯৯২ এর আইনে সংখ্যালঘুর আগে ‘ধার্মিক’ কথাটাও তো লেখা নেই!... আর নোটিফিকেশনে? 

সে যা হোক, আপাততঃ আমি সেই দুঃখজনক পরিস্থিতি বা ঘটনাগুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করব যেগুলোর ফলে মাতৃভাষার ক্ষতি হল, মৈত্রীভাষা বৈরীভাষার মত দেখতে হয়ে গেল আর দেশভাষা ঠিকমত তৈরীই হতে পারলনা।

জনতার ভাষা হিন্দী বনাম রাজভাষা হিন্দী
হিন্দী, খড়িবোলী, পরিমার্জিত হিন্দুস্তানী কিম্বা হিন্দী-উর্দু ভাষাযুগল উত্তর ভারতের একটা বড় অংশের শহরগুলোয় প্রধান কথ্য ও লিখিত ভাষা হিসেবে বিকশিত হচ্ছিল। যদিও পরবর্ত্তী কালে হিন্দী নিজেকে উর্দু থেকে বিযুক্ত করার চেষ্টায় সংস্কৃতে শুধু নিজের উৎস নয় পুরো বর্তমান রূপটাই খুঁজতে উদ্যোগী হল, বাস্তব এটাই যে উত্তর ভারতের শহরগুলোয় প্রথমে মোগল ও পরে ইংরেজদের উর্দীধারী হিন্দুস্তানী ফৌজীদের মাধ্যমেই উর্দীর ভাষা উর্দু বা উর্দু-হিন্দী প্রচারিত ও প্রসারিত হয়েছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রগতির ভাষা হয়ে এটি আধুনিক হিন্দীর (দেবনাগরী লিপিতে) রূপ পরিগ্রহণ করল এবং এই রূপে হিন্দীকে অনেক অহিন্দীভাষীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভাবে সম্পর্কভাষা হিসেবে স্বীকার করে নিল। উনবিংশ শতাব্দীতেই ঔপনিবেশিক বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীর বিহার অঞ্চলে সরকারী কাজকর্মে হিন্দীকে স্বীকৃতি দেওয়ার লড়াইটা চালান কলকাতা থেকে আসা এক বাংলাভাষী রাজকর্মচারী ভুদেব মুখোপাধ্যায়। রাজভাষা কমিশন ১৯৫৫র সদস্য হিসেবে নিজের বিরুদ্ধমত রেকর্ড করানোর দিনটিতেও সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় বাঙলার হিন্দী প্রচারিণী সভার অধ্যক্ষ ছিলেন।
‘হিন্দী-হিন্দু-হিন্দুস্তান’এর রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা তখনো সংসদে ভালো সংখ্যাতেই ছিল, কিন্তু যতই ঘেউ ঘেউ করুক, সে সময়কার ভারতও তো অন্যরকম ছিল।
রাজভাষা রূপে হিন্দী স্বীকৃত হওয়ার পর একটা দেশের ভাষিক পরিস্থিতিতে একটা বিশেষ পরিবর্তন এল। রাজভাষা নিয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনটার কারণ ছিলনা। হিন্দীর ছাড়া অন্য কোনো ভাষা সঙ্ঘের রাজভাষা হওয়ার জায়গায় ছিলওনা। কিন্তু একদিকে হিন্দীভাষী রাজ্যগুলোতেই অহিন্দীভাষীবিরোধী চিন্তাভাবনায় নতুন জোয়ার আর অন্যদিকে, সঙ্ঘের নতুন রাজভাষা রূপে হিন্দীকে উন্নত ও প্রসারিত করার নামে কোটি কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ – সঙ্ঘীয় বাজেটের মাধ্যমে, হিন্দীভাষী রাজ্যগুলোর বাজেটের মাধ্যমে এবং ১৯৭৬এর পর সবকটি সরকারী শিল্প/উদ্যোগ/সংস্থা ইত্যাদির রাজভাষা বিভাগের বার্ষিক খরচের মাধ্যমে! লাখখানেক রাজভাষা আধিকারিকের বেতন, রাজভাষা গ্রন্থাগারগুলোর বার্ষিক খরিদ, বিভিন্ন ধরণের একাডেমীগুলোর খাতে অনুদান। ২০১৩-১৪ সালে, শুধু সঙ্ঘীয় বা কেন্দ্রীয় বাজেটে রাজভাষা বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল ৪৬∙৯৮ কোটি টাকা! এর সাথে যোগ করুন রেলবাজেটের বরাদ্দ, হিন্দী ‘ক’ ও ‘খ’ শ্রেণীর রাজ্যগুলোর বাজেট বরাদ্দ এবং সরকারী সংস্থাগুলোর এই খাতে খরচ!
হিন্দী বইয়ের নামচিন প্রকাশন সংস্থাগুলোর বই কখনো দোকানে গিয়ে হাতে নিয়ে দেখুন। ছাপাই, বাঁধাই, কাগজ আর বোর্ডএর ওজন, কোয়ালিটি... এবার দামটা দেখুন। দেখবেন সমমানের বাংলা বইয়ের দ্বিগুণ। কেন? খরচ কি বেশি? একেবারেই না। কিন্তু হিন্দী বইয়ের প্রকাশকেরা পাঠকের তোয়াক্কা করেনা। তাদের হিসেব থাকে তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে সারা দেশে কটা রাজভাষা গ্রন্থাগারে টাইটেলটা খাওয়ানো যাবে। তার ভিত্তিতেই মুনাফার ভালো মার্জিন রেখে (যার মধ্যে কিছু রাজভাষা আধিকারিককে দেয় ঘুষটাও ধরা থাকে) তারা দামটা বসায়।
স্বাভাবিকভাবেই, স্বার্থের একটা বড় জোট তৈরি হল যেটি হিন্দীর উন্নতির নামে হিন্দীর ক্ষতিসাধন করছিল। হিন্দীকে উর্দু থেকে আলাদা করার থিংক-ট্যাংক বড় বড় বুদ্ধিজীবী হলেও ওই প্রবণতাটা ভালো সমর্থক পাচ্ছিল এই রাজভাষার জোটগুলো থেকে। অফিসের – সওদাগরী, ব্যাংক, বীমা ইত্যাদি – কাজেকর্মে যে পারিভাষিক শব্দগুলোর প্রয়োজন হয় তার বেশির ভাগই কিন্তু ব্রিটিশকালেও ফারসীতে প্রচলিত ছিল, লোকের মুখে মুখেও প্রচলিত ছিল। কিন্তু সেগুলোকে বাদ দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টায় সংস্কৃত থেকে কিছু উদ্ভট হিন্দী শব্দ তৈরি হল যেগুলো চলতেই পারেনা। একেবারেই যেখানে সম্ভব ছিলনা সেখানে ফারসী শব্দগুলো রয়ে গেল।

হিন্দীভাষী রাজ্যগুলোতে অহিন্দীভাষীদের পরিস্থিতিতে বদল
এই জোটের জন্য অবশ্য প্রত্যক্ষভাবে হিন্দীভাষী রাজ্যগুলোতে অহিন্দীভাষীদের কোনো ক্ষতি হয়নি। কিন্তু এই জোট এবং এই সরকারী টাকার বাড়তে থাকা প্রভাবে অহিন্দীভাষীবিরোধী রাজনৈতিক মতবাদের একটা হেজেমনি তৈরি হল আর সেটাই ক্ষতি করতে শুরু করল নানা ভাবে। সূচীটা অসম্পূর্ণই থাকবে, তবু ১৯৭৬ থেকে ১৯৯১এর মাঝে অহিন্দীভাষীদের ভাষাস্বার্থ যে বিরাটভাবে ধাক্কা খেল তার বিভিন্ন দিকগুলো সূচীবদ্ধ করতে চাইব।
১। কেন্দ্রীয় এবং হিন্দীভাষী রাজ্যগুলোর রাজ্য শিক্ষা বোর্ডের প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষায় পড়ার অধিকারটা বজায় রাখা তো দূর অস্ত, মাতৃভাষাটুকু পড়ার সুযোগও পাওয়া এত কঠিন হয়ে দাঁড়ালো যে কিছুদিন পর সেটা কাজেকলমে আর রইলোই না। মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যক্রমে ত্রিভাষা সুত্রের অন্তর্গত মাতৃভাষা অথবা হিন্দী বাদে কোনো অন্য আধুনিক ভারতীয় ভাষা পড়ার যে সুযোগ ছিল, সেটা বাধ্যতামূলকভাবে হয়ে দাঁড়ালো ইংরেজী, হিন্দী আর সংস্কৃত। স্কুলে ভর্তি করার অস্থিরতায় অভিভাবক ও ছাত্র দুজনেই পরিস্থিতিটা মেনে নিল। প্রাইভেট আর কনভেন্ট স্কুল তো আগে থেকেই এ ব্যাপারে উদগ্রীব ছিল যে খরচ কমবে। এমনকি ভাষাগত সংখ্যালঘু পরিচালিত স্কুলগুলোতেও, বিশেষ করে যারা সরকারী সাহায্য পাচ্ছিল, একটা চাপ শুরু হয়ে গেল যা ভাষা বিষয় মানে ইংরেজী, হিন্দী আর সংস্কৃত।
২। স্বাভাবিক ভাবে, পরের বছর থেকে এর প্রভাব পড়া শুরু করল। সরকারী মহলে পরিসংখ্যান রেকর্ড হওয়া শুরু করল যে সব ছাত্র হিন্দীভাষী। এবং সেই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে ইংরেজী, সংস্কৃত এবং হিন্দী ছাড়া আর কোনো ভাষার পাঠ্যক্রম, পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষক কোনো কিছুরই ব্যবস্থা করার প্রয়োজন রইল না।
৩। চিন্তাধারার প্রাধান্য একটা পরিবেশ তৈরি করে। আইনি অর্থে কোনো ষড়যন্ত্র না থাকলেও ষড়যন্ত্র হয়ে যায়। একটা উদাহরণ দিচ্ছি। জনগণনা। প্রতি দশ বছরে হয়। এখন তো তবু কিছু আইনি সুযোগ আছে, ইন্টারনেটে সেন্সাস অধিকর্তার ওয়েবসাইট আছে আর কিছু ব্যাপারে মানুষের গণতান্ত্রিক চেতনাও বেড়েছে। তবু তৃণমূল স্তরে বাস্তবটা কী? আমার আপনার মত সাধারণ মানুষেরাই হন সেন্সাসের লোক। বিহারে সাধারণতঃ সরকারী শিক্ষকদের মধ্যে থেকে নেওয়া হয়। ট্রেনিংএর সময় তাঁদেরকে একটি বিধিবহির্ভূত পরামর্শ পান। কখনো সরকারী ট্রেনার বা কখনো সিনিয়র, যারা আগে একাজ করেছেন তাদের কাছ থেকে। ফর্মের যে বইটা আপনাদের বিভাগের তরফ থেকে দেওয়া হবে সেগুলো ওখানে বসে ভরবার বা ভরাবার দরকার নেই। বড়জোর সাইনটা করিয়ে নেবেন, বা, না করালেও ম্যানেজ হয়ে যাবে। ঘরে ঘরে গিয়ে জিজ্ঞেস করে ভরবেন বা ওদের দিয়ে ভরাবেন – কোথাও ভূল হয়ে গেলে কাটিং হবে, জবাবদিহি করতে হবে আপনাকে। তার চেয়ে ভালো, যে পয়সা আপনাদের দেওয়া হচ্ছে তা’থেকে দশ-কুড়ি টাকা খর্চা করে একটা ভালো খাতা কিনে নেবেন। বয়ে বেড়াতেও সুবিধে হবে। সমস্ত তথ্য কলাম বানিয়ে ওতেই নোট করবেন। সন্ধ্যে বেলায় ফিরে ওগুলো দেখে দেখে ফর্মটা ফিল-আপ করে নেবেন। কোথাও ভূলও হবেনা, জবাবদিহিও করতে হবেনা!”
কত সহজ! সুবিধেজনক! কর্মচারীরা চা খেতে খেতে, নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে ব্যাপারটাকে আরো সহজ করে নেন। বাড়ি বাড়িতে গিয়ে বলেন, “শুধু নাম লেখান সবাইকার, পুরুষ/মহিলা আর বয়স। হ্যাঁ, আর শিক্ষা। বাকি সব আমরা ভরে নেব”। বাড়ির লোকেরাও ভাবে বাঁচা গেল। ভরদুপুরে এই উটকো ঝামেলা। কর্মচারীরা যখন রাত্রে বসে ফর্মটা ভরা শুরু করলেন তখন নাম, পুরুষ/মহিলা, বয়স ভরার পর ধর্ম তো নাম দিয়েই বুঝে নিলেন। আর ভাষা/কথ্যভাষা/মাতৃভাষার মত গৌণ প্রশ্নে ওপর থেকে নিচে অব্দি একবারে ‘হ’, ‘হ’, ‘হ’ ভরে শেষ করে দিলেন। খেল খতম! হয়ে গেলেন সবাই হিন্দীভাষী। মস্করা করছিনা। এটাই হয়েছে (যেখানে ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া গেছে সে কাহিনী তো আরো ভয়ানক) গত পাঁচটি জনগণনায় বিশেষ করে বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ অথবা পরবর্তীকালে উত্তরাখন্ডে, ঝাড়খন্ডে এবং ছত্তিশগড়ে এবং দেশের আরো বেশ কয়েকটি এলাকায়। তাতেই দেখা যায় যে সাধারণভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির দর ধনাত্মক হওয়া সত্ত্বেও বাংলাভাষী জনসংখ্যার বৃদ্ধিদর ঋণাত্মক! আর হিন্দীভাষীর বৃদ্ধিদর, ইংরেজিতে যাকে বলে এক্সপোনেনশিয়াল, লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। সেন্সাস রিপোর্ট তো নেটেই আছে, খুলে দেখে নিন! স্বাভাবিক ভাবেই এই পরিসংখ্যানের প্রভাব তো রাজ্যের শিক্ষাগত উন্নয়নের বাজেটেও পড়বে!       


হিন্দীর বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা
রাজভাষার নামে গড়ে ওঠা নোংরা স্বার্থের পূর্বোক্ত বড় জোটটা বা এখুনি শিক্ষাক্ষেত্রে ও জনগণনায় যে কারচুপিগুলোর কথা বললাম তার থেকেও বেশী দুঃখজনক হয়ে উঠল প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার হিন্দী বুদ্ধিজীবীদের এ ব্যাপারে নীরবতা। সংখ্যায় ও শক্তিতে তো তারা খুব কম নয়! এমনও নয় যে তাঁরা আমার অভিযোগগুলোকে অস্বীকার করেন। পাশে বসে কথা বলে দেখেছি তাঁরা পুরোপুরি আমার সাথে একমত হয়ে যান। কিন্তু সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার সময়, দেশের চরিত্র বহুভাষিক বলার সময়ও, কষ্ট করে এটুকু বলেননা যে এই বহুভাষিকতাকে ধ্বংস করার একটা কুচেষ্টা চলছে তাঁদের রাজ্যগুলোয়।   

১৯৯১এর পর
১৯৯১ সালে এ দেশে নব্য-উদারপন্থার আর্থিক নীতিগুলো বলবৎ করা হল। বলবৎ হওয়ার পিছনে প্রধান হেতু অবশ্যই পূর্ব ইয়োরোপে এবং সোভিয়েত সঙ্ঘে সমাজবাদের পতনে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবার সাম্রাজ্যবাদের অভূতপূর্ব শক্তিবৃদ্ধি এবং এদেশের একচেটিয়া পূঁজিপতি ঘরাণাগুলোর তার সাথে গাঁটছড়া। কিন্তু এত তীব্র, সত্বর ও অমোঘ ভাবে বলবৎ হতে পারার কারণ ছিল নতুন প্রযুক্তির অভ্যুদয়। (সাম্রাজ্যবাদের শক্তিবৃদ্ধি ও সমাজবাদের পতনের পিছনেরও একটা বড় কারক এই নতুন প্রযুক্তি কিন্তু সেটা অন্য প্রসঙ্গ)।
নতুন প্রযুক্তি এবং তার ফলস্বরূপ গজিয়ে ওঠা পরিষেবা এবং শিল্প দেশের অর্থনীতিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে এল। মোট আভ্যন্তরীণ উৎপাদনে পরিষেবা ক্ষেত্রের অংশ ২৫% থেকেও কম ছিল। বেড়ে ৫০%এর বেশি হয়ে গেল। আর কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও কৃষির অংশদান ২০% থেকে কম হয়ে গেল।
এর জবরদস্ত প্রভাব পড়ল পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় এবং বিশেষ করে ভাষা শিক্ষায়। ইংরেজি ছাড়া অন্য যে কোনো ভাষার শিক্ষা সময়ের অপচয় হয়ে দাঁড়াল। যখন হিন্দীভাষী পরিবারে বাচ্চারা হিন্দীতে কথা বলা এড়িয়ে যেতে লাগল অথবা অশুদ্ধ, ইংরেজি মেশানো হিন্দী (আজকালকার ‘হিংলিশ’) বলা শুরু করল তখন বোধহয় বিবেকবান অভিভাবকেরা বুঝতে আরম্ভ করলেন যে বাড়িতে-পরিবারে নতুন প্রজন্মের কন্ঠ থেকে তাদের মাতৃভাষা হারিয়ে যেতে থাকলে কেমন কষ্ট হয়।
এই কষ্টটাই সাধারণভাবে অহিন্দীভাষী ও বিশেষকরে বাংলাভাষীরা নিজেদের ভাষা-প্রদেশের বাইরে (যে প্রদেশের সাথে তাদের সম্পর্ক তিন পুরুষেরও বেশি আগে থেকে নেই) হিন্দীভাষী রাজ্যগুলোতে পেয়ে আসছিল।


মাতৃভাষা, ভাষাগত আত্মপরিচয় অথবা ভাষিক সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম কি ভারতের ঐক্য বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম থেকে পৃথক?
আমি জানি, এক্ষুনি কেউ আশ্বাস দেওয়ার ভঙ্গীতে বলতে শুরু করবে, “আরে নারে ভাই, সে কথা নয়। দুদিকই তো দেখতে হবে! নিজেদের অধিকারের জন্য ন্যায্য সংগ্রাম নিশ্চয়ই করবে কিন্তু সবার আগে তো দেশের ঐক্য!”
-  হ্যাঁ স্যার, সবার আগে তো বটেই? কিন্তু কী যেন বললেন, দুদিক দেখতে হবে?
-  দুদিক নয়? দেশের ঐক্য আর তোমার অধিকার!
-  নাঃ, দুদিক তো নয়! আমার অধিকারেই দেশের ঐক্য আর দেশের ঐক্যেই আমার অধিকার – একটাই তো দিক!... আসলে স্যার, কি জানেন? আমরা ওই দুটো দিক বানিয়ে কাটকুট খেলা খেলতেই অভ্যস্ত। দেশের ঐক্য, দেশের উন্নয়ন, রাজ্যের উন্নয়ন ইত্যাদি নিয়ে একটা দিক আর মানুষের অধিকারের লড়াইগুলো আরেকটা দিক। ইংরেজিতে আমরা খুব গর্ব করে বলিনা, ‘ইউনিটি ইন ডাইভার্সিটি’? কাজের বেলায় ওটা হয়ে যায়, ‘ইউনিটি ইন স্পাইট অফ ডাইভার্সিটি’। বৈচিত্রের ঐক্যটা হয়ে যায় বৈচিত্র সত্ত্বেও ঐক্য। আর তখন ফুলগুলোকে ছিঁড়ে, মাটিতে ফেলে গাঁথার সুতোটা খুঁজতে যাই। ভূলে যাই যে ওটা সুতো নয়। ওটা তো অনেকগুলো সংস্কৃতি, ভাষা, ভাষিক আত্মপরিচয়ের পারস্পরিক ঐক্যমতের মিলনে জন্ম নেওয়া একটি নতুন রক্তবাহী শিরা! নানারঙের ফুলগুলো থাকবে, গাঁথা হতে চাইবে একসাথে তবে তো থাকবে শিরা, তার ভিতরে রক্ত!
যা হোক, অতটা দূরে নাই বা গেলাম। তবে এটুকু তো বুঝতেই হবে যে যতদূর একটা মানুষ তার ভাষিক-সাংস্কৃতিক অস্মিতায় বাস করবে ততদূর সে ভারতের অস্মিতায় বাস করবে। সারা ভারতে কোথাও নিজের নাগরিকতার অধিকারে থেকে, রোজগার করতে করতে, লেখাপড়া করতে করতে যত বেশি গুজরাটি হব, তামিল হব, বাঙালি হব, সাঁওতাল হব, খাসি হব, মণিপুরী হব, তত বেশি আমরা ভারতীয় হব। সাংস্কৃতিক, ভাষাগত আত্মপরিচয় হারিয়ে ফেলা মানুষ কখনো পুরোটা সার্থকভাবে নিজের নাগরিকতা পালন করতে পারবেনা। এ সত্যটা ভারতের মত দেশের জন্য আরো বেশি দামী।

জিহবায় নিজের মাতৃভাষা থাকলে পড়শীর ভাষা মৈত্রীভাষার মত করে পাশে জায়গা পাবে। আর দেশভাষা সব সময় হবে সবকটি মাতৃভাষার মিলনসংগীত। সেই সংগীতটা না জাগলে সম্পর্কভাষা একটি বাধ্যতা হবে আর রাজভাষা দাসত্ব।

_____________________________

১ – ভারতের সংবিধান, ভাগ ১∙১ (১)
২ – গুজরাট হাইকোর্টে দায়ের সিভিল এপ্লিকেশন সংখ্যা ২৮৯৬ বছর ২০০৯, সুরেশ ভাই কচোটিয়া বনাম ভারত সঙ্ঘ, ১৩ জানুয়ারি ২০১০এর রায়
৩ – ‘রাজভাষা’ শীর্ষক ভাগ ১৭র অন্তর্গত ‘সঙ্ঘের ভাষা’ শীর্ষক অধ্যায় ১ এ ধারা ৩৪৩(১)
৪ – সংবিধানের ধারা ৩৪৪
৫ – ‘মৌলিক অধিকার’ শীর্ষক ভাগ ৩ এর অনুচ্ছেদ ১৯ (স্বাতন্ত্র্য সম্পর্কিত অধিকারাদি) এর ১(ক)
৬ -        - ওই -                ভাগ ৩ এর অনুচ্ছেদ ২৯
৭ -        - ওই -                ভাগ ৩ এর অনুচ্ছেদ ৩০
৮ – ‘রাজভাষা’ শীর্ষক ভাগ ১৭ তে ‘বিশেষ নির্দেশ’ শীর্ষক অধ্যায় ৪ এর অন্তর্গত ধারা ৩৫০

৯ – ধারা ৩৫০ক এবং ৩৫০খ 

रॉबिनदा – एक सौन्दर्य-यात्रा की यादें

चलिये, अब थोड़ा रॉबिनदा के बारे में बतायें । वैसे रॉबिनदा के बारे में मुझे हिन्दी में लिखना चाहिये कि बंगला में, इसे लेकर मन में थोड़ा अनिश्चय था । फिर लगा मेरे बंगलाभाषी दोस्त तो हिन्दी पढ़ लेंगे, पर मेरे हिन्दीभाषी, खास कर बुद्धिजीवी मित्र, बंगला साहित्य से उनके लगाव का बखान जरूर करेंगे पर थोड़ा कष्ट करके बंगला सीखेंगे नहीं, क्योंकि वे ‘राजभाषी’ हैं ! और फिर बंगला और हिन्दीभाषी उत्तर भारतीय, जिसमें मैं खुद शामिल हूँ, कभी दबाव नहीं डालेंगे सरकार पर कि स्कूलों में तीसरी भाषा (पहली मातृभाषा और दूसरी राजभाषा के साथ साथ) के रूप में कोई दक्षिण भारतीय भाषा पढ़ाई जाय ! कभी तकलीफ तक नहीं होगी बोध के इस अभाव का कि कैसा होता होगा कुवेम्पु के कन्नड़ में कर्णाटक के पहाड़ी रास्ते पर पके तोतापरी आम का सुगंध !!
1970-71 में रॉबिनदा से पहली मुलाकात के पहले ही वह मेरे लिये ‘नायक’ बन चुके थे । उस वक्त जक्कनपुर में पल, बढ़ रहे हम नये नये कवि थे और उनदिनों बंगला के नये कवि, लेखकों का पहला पड़ाव बताया जाता था पुराना जेल के सामने एल॰आई॰सी॰ ब्रांच 2 में जीवनमय दत्ता या जीवनदा का टेबुल । हम कई लोग उन्हे घेर कर बैठते थे । उस वक्त यह भी नहीं पता था कि इस मार्ग से अलग भी कोई मार्ग है ‘कवि-साहित्यकार होने की ट्रेनिंग’ का । वह तो दीपन मित्र से मुलाकात के बाद मालूम पड़ा । लेकिन जीवनदा की पत्रिका ‘सप्तद्वीपा’ मेरे हाथ लग चुकी थी –
एखाने तो मध्यराते सॉत्तार गोभीरे शुधु पदध्वनि शुनि
भ्लादिमिर आपनि कि आमाके आज क्रुशे बिद्धो कोरे जाबेन
कारण निजेर काछे समोर्पितो रक्तेर लेगूने
                                                           सूर्योदय होलोना एखोनो…
[यहाँ तो मध्यरात्रि में, अस्तित्व की गहराई में सुनता हूँ पदध्वनि सिर्फ
व्लादिमीर, क्या मुझे आज सलीब पर चढ़ा जायेंगे आप
क्योंकि खुद को समर्पित रक्त के लेगून* में
                              सूर्योदय नहीं हुआ अभी तक
*अंग्रेजी शब्द Lagoon
रॉबिन दत्ता की कविता ‘व्लादिमीर इलिच लेनिन’ की पंक्तियाँ]
और रॉबिनदा मेरे ‘नायक’ बन चुके थे । उनकी काव्यभाषा एवं लय की अक्षम नकल करने लगा मैं चोरी चोरी । फिर सुनते भी रहा उनके बारे में, जीवनदा के अड्डे पर भी और दीपन एवं उसके दोस्तों, शेखर, सुब्रत से भी । सुना कि वह आज कल लगभग लिखते ही नहीं हैं । मन में उनकी रहस्यमयता बढ़ने लगी ।
उस वक्त मैं एक हस्तलिखित पत्रिका ‘अभियान’ से जुड़ चुका था जिसके मुख्य कर्ताधर्ता थे पार्थ सारथी राय, मीठापुर के रहने वाले । जक्कनपुर के मित्रालय का पार्थ सारथी मित्रा हमारा अभिन्न मित्र था एवं पत्रिका के साथ उसीने मुझे जोड़ा था । बांग्लादेश में मुक्तिवाहिनी के विजय पर एक अंक निकल चुका था । मैंने थोड़ा उद्यम दिखाया और हुआ कि पत्रिका अगले अंक से मुद्रित होगा । भिखनापहाड़ी स्थित भारती प्रिन्टर्स से बातचीत हो गई बस चुनौती थी उस वक्त देवघर में कार्यरत रॉबिन दत्ता की एक कविता मंगाने की । जिम्मा मैने ही लिया । पता जुगाड़ कर एक पोस्टकार्ड लिख भेजा । जबाब आया लम्बा, लिफाफे में बन्द दो पृष्ठ कागज में, जिसमें हमारे सारे प्रयासों की नि:सारता इतिहास की वृत्ताकार गति का बिम्ब इस्तेमाल कर व्यक्त की गई थी । मैं भी ठहरा नया नया ‘बोद्धा’ (यह बंगला शब्द है), मैने अपने उतने ही लम्बे जबाब में वृत्त के किनारे से एक टैन्जेन्ट (स्पर्शरेखा?) खींचने की कोशिशों की बात की ।
आ गई कविता ‘नील आलो चोले जाच्छे कोलकाता थेके कुड्डालोर …’। उस कविता के साथ सीना चौड़ा करते हुये निकला ‘अभियान’ का पहला मुद्रित अंक ।
इस घटना के कुछ दिनों के बाद उनसे पहली मुलाकात हुई । यहाँ एक बात यह भी बता देना जरुरी है कि तब तक मैं कदमकुआँ के देवालय से निकलने वाली पत्रिका ‘किसलय’ में दीपन मित्र की कविता भी पढ़ चुका था और दीपन से मित्रता के कारण जीवनानन्द दास की कविताओं का संग्रह भी हासिल हो चुका था – यानि रॉबिन दत्ता से बात करने के लिये मैं कुछ बेहतर ढंग से लैस हो चुका था ।
पार्थ सारथी मित्र के पिताजी सातकड़ी मित्र सेवानिवृत्त होने के बाद डाक्टरी करते थे, उन्ही के चेम्बर के बाहर रॉबिन दत्ता से पहली मुलाकात हुई । मिलते ही मेरी मुग्धता और बढ़ गई । हम सबसे अलग ‘डोले-शोले’ वाली मजबूत काठी, लम्बा कद, टेनिस खेलनेवाली चौड़ी कलाई और बात करने का खास तरीका ! पॉकेट में हाथ डाले, कंधा बाँई ओर थोड़ा झुकाये हुये, झूमते हुये चलते थे । खूब बात किये उस शाम को पर कुछ याद नहीं क्या बातें हुई थी ।  
उनसे अगली मुलाकात हुई कदमकुआँ स्थित ‘भागलपुर मेस’ में । पता चला था कि उन्हे कठिन बीमारी हुई है, नेफ्राइटिस, उसी के इलाज के सिलसिले में वह पटना आये हुये हैं । शरीर सूजा हुआ था और पीला पड़ा हुआ था, शायद उनकी माँ भी बगल में थीं, मेस के लोग थे, बहुत कुछ बातें करना सम्भव नहीं था ।
हमारी पत्रिका ‘अभियान’ लगभग नियमित तीन महीना पर प्रकाशित हो रही थी । जीवनमय दत्ता के साथ मिल कर योजना बनी कि रॉबिनदा की अब तक की छपी कविताओं को जुटा कर हमारे ‘अभियान’ में 1 से 16 पृष्ठ तक एवं जीवनदा के ‘सप्तद्वीपा’ में 17 से 32 पृष्ठ तक छापा जाय एवं दोनों सेट का 500-500 ऑफ-प्रिन्ट निकाला जाय । दोनों पत्रिकायें कलकत्ता में एक ही प्रेस में एवं एक ही टाइपसेट में छपेंगी । बाद में दोनों ऑफ-प्रिन्ट्स को मिला कर काव्य संकलन प्रकाशित किया जायगा । संकलन का नाम वही होगा जो खुद रॉबिनदा ने कई वर्षों पहले तय किया था – ‘मानुषेर नामभूमिकाय’ । सब कुछ प्लान के मुताबिक हुआ पर गाड़ी वहीं अटक गई, और आज (यानि 2017) तक अटकी हुई है । नो परमिशन । कवि की अनुमति नहीं । ऑफ-प्रिन्ट्स प्रेस में दीमक चाट गये ।

कुछ दिनों के बाद मुझे बैंक में नौकरी लगी और मैं चला गया धनबाद ।
पहली नौकरी, घर से अलग मेस बनाकर रहना, पूर्णेन्दू मुखोपाध्याय (वह उस वक्त कत्रास कॉलेज में प्राध्यापक थे) से मुलाकात, धनबाद जिला साहित्यकार संघ के रूप में खोरठा व हिन्दी के साथ हमारी बंगला की साहित्यिक गतिविधियाँ आदि से मेरा मन तेजी से बदल रहा था । बरसात में एक शनिवार को ट्रेन पकड़कर मैं चला गया जसीडिह, फिर देवघर । भारी बारिश में भींगते हुये पहुँचे कैस्टर टाउन में रॉबिनदा के घर । बड़ा सा पुराने ढाँचे का मकान । सामने आंगन, बगीचा । खुद बैंक के अधिकारी थे और देवघर भी उस समय, उस समय ही क्यों झारखंड बनने के पहले तक काफी सस्ता और सूना सूना रहता था । भीड़ होती थी बस वही, सावन में, वह भी आज से बहुत कम ।  आस्था का इतना संकट तो आया 1991 के बाद ! खैर, तो किराये में इस तरह का घर रॉबिनदा ल्रे ही सकते थे । कपड़े बदल कर, चाय पीकर उनके विल्स नेवी कट की डिबिया से एक सिगरेट सुलगाकर बैठे ही थे कि उन्होने पूछा ‘रेकॉर्ड सुनोगे?’ मतलब संगीत सुनने से था, क्योंकि संगीत उस वक्त 331/3, या 45 आरपीएम के रेकॉर्डस में ही सुनने को मिलता था । और मेरे कुछ कहने से पहले उन्होने लगा दिया एकर बिल्क का ‘टच ऑफ लैटिन’, जादुई क्लैरिओनेट के साथ लियोन यॉंग का स्ट्रिंग कोराल ।… शादी, ब्याह में क्लैरिओनेट का पें पें सुनने वाला आदमी बिल्कुल पागल हो गया । उसके बाद ट्रैक बदला । हम चले आये रविशंकर-अली अकबर की सिंधी भैरवी में । वह न्युयार्क फिलहार्मोनिक वाला रेकॉर्डिंग नहीं, (वह हमेशा मुझे थोड़ा कम अच्छा लगा) दूसरा वाला, जिसके पीठ पर राग श्री था ।
दो दिन मैं पागल की तरह ही बिताया, संगीत सुनते हुये, बातें करते हुये, घूमते हुये । नन्दन पहाड़ के पीछे एक खुले कब्रिस्तान में किसी कब्र पर छोटी सी बच्ची या परी की मूर्ति लगी थी, संगमर्मर की बनी, पूरी मूर्ति तोड़ कर ले गये थे चोर, सिर्फ नन्हे दो पैर के तलवे बचे थे, बारिश से भीगे हुये, खूब सहलाये थे हम दोनों, उन नन्हे पैरों और उंगलियों को ।…
एकबार और गया था मैं देवघर – शिवबच्चन सिंह (हिन्दी के प्राध्यापक थे गोपालगंज में) भी आ गये थे, हम दोनों गये सिमुलतला – बातें अधिक नहीँ हो पाई उस बार ।

मैं भी पटना आ गया था और रॉबिनदा भी लखीसराय आ गये थे । वहाँ अकेले ही रहते थे । एकबार मैं पहुँचा था कविता के कुछ नये संकलन लेकर – शायद मिरोस्लाव होलुब, वास्को पोपा, एन्जेन्सबर्गर और … याद नहीं । फिर रॉबिनदा भी पटना आ गये । सपरिवार रहने लगे मेरे ही मोहल्ले, श्रीकृष्णानगर में । तब शुरू हुई गुरु के घर में मेरी शिष्य-परम्परा ।
रॉबिनदा तो अपने ही ढंग के काम करेंगे । बैंक के स्टाफ कॉलेज के फैकल्टी बन कर ट्रान्सफर हुये थे, पर पटना आकर उन्होने स्कूटर नहीं एक हरा रॉबिनहुड साइकिल खरीदा ऑफिस जाने आने के लिये । और उसकी सुरक्षा के लिये हाथी बाँधने की जंजीर और सात लीवर का ताला ।
जैसा मैंने आलोक धन्वा से जुड़ी स्मृतियों पर लिखते हुये जिक्र किया था कि उस समय हर शाम हम दोस्तों का जुटान होता था नाला रोड में प्रोफेसर्स लेन के अन्दर दीपन मित्र के घर पर, जहाँ हमारा सामूहिक अध्ययन भी (कविता एवं विचारों का) चलता था और फिर सब मिल कर घूमने निकलते थे राजेन्द्रनगर के दस नम्बर रोड की ओर … तो रॉबिनदा भी पटना आने के बाद उन शामों में शामिल होने लगे ।
और सुबह, सुबह क्या रात रहते रहते ही पहुँच जाते थे मेरे घर, खिड़की के बाहर से आवाज देते थे । फिर मैं भी तैयार होकर बाहर आता था और हम जॉगिंग करते निकल जाते थे बोटानिकल गार्डेन (संजय गांधी जैविक उद्यान) की ओर । दर असल मेरे ही इन्तजार के लिये वह थोड़ा ज्यादा पहले मिकलते थे । क्योंकि मेरा पेट निकला हुआ था, मुझसे अधिक यह उनके लिये चिन्ता का विषय था । मेरे लिये बहुत मुश्किल होता था देर रात तक जग कर सुबह उठना । अन्त में थक हार कर उन्होने मेरे सेहत को दुरुस्त करने का कार्यक्रम छोड़ दिया, अकेले ही जाने लगे मॉर्निंग वाक में ।

शुरू में तो हम सब ने, यानि मैं, दीपन, आलोकजी ने मिल कर दबाव बनाया कि वो दुबारा कविता लिखें । कविता तो लिखे नहीं पर कुछ दिनों के बाद शायद सुबह को (चूँकि अब हम दोनों एक ही मोहल्ले में थे) उन्होने एक पेन्टिंग दिखाया – 18”X12” के बोर्ड-माउन्टेड कैनवास पर । मैं दंग रह गया । ड्रॉइंग में सधा हाथ था यह तो मालूम था पर इतना सुन्दर पेन्टिंग भी ! अब पेन्टिंग को लेकर हम पीछे पड़ गये । बोले तब छुट्टी के दिनों में जाना पड़ेगा दूर दूर । मैंने कहा मैं जाउँगा आपके साथ ।
एक नया सिलसिला शुरु हुआ । वह झोले में ड्रॉइंग बुक और मैं अपने झोले में क्लिप-बोर्ड पर कागज लगाकर अपनी अपनी साइकिल से निकलते थे । कभी हवाई अड्डे की तरफ, कभी किसी सुनसान सरकारी क्वार्टर के अहाते में कभी और कहीं । वह ड्रॉइंग या पेन्टिंग के लिये स्केच करते थे (इजेल वगैरह तो था नहीं इसलिये कैनवास लेकर जाना निरर्थक होता) और मैं अलग कहीं पेड़ के नीचे बैठ कर कविता लिखने की कोशिश करता था ।
लेकिन निसर्ग का एकांत तो सिर्फ अपनी झिझक मिटाने के लिये था । कुछ ही दिनों के बाद खबर मिली कि हार्डिंज पार्क के विपरीत रेललाइन के सामने वाली जगह में बन्जारों की जो बस्ती थी वह तोड़ दी गई है । कुछ लोग इधर उधर गये और कुछ रबीन्द्र भवन के सामने रहने लगे हैं । वह सुबह को ही जाने लगे वहाँ, लोगों से बात करते हुये अपना स्केच करने लगे । एक परिवार से तो दोस्ती भी कर ली, एंग्लो-बर्मीज थे, कुछ ईसाई नाम था उनका, तार की जाली वाला पिंजरा बना कर सारा परिवार गुजारा करता था, हालाँकि पोते अब मजदूरी की तलाश में निकलने लगे थे । फिर रॉबिनदा ने मुझे बताया । अगले कई रविवार दोपहर को मैं भी जाते रहा रॉबिनदा के साथ । कविता तो नहीं, शब्दों का एक लम्बा स्केच लिखा मैं, एक दोपहर को लेकर ।
अब बात कुछ और आगे बढ़ी । मन्दिरी मोहल्ले में रॉबिनदा ने एक बढ़ई मिस्त्री ढूंढ़ लिया था । ईजेल का नाप लिखवा दिया था । साथ ही बड़े कैनवास के लिये बड़े बड़े फ्रेम के भी ऑर्डर दे दिये थे लकड़ी चुन कर । महेन्द्रु घाट के रास्ते के विपरीत, कैनवास के बड़े दुकान से थान निकलवाकर अलग अलग नाप के कैनवास कटवाये गये, कोकई काँटी (कच्चे लोहे के कील, जूतों ठोंकने के काम आते हैं) खरीदा गया, बढ़िया ग्लु के लिये सरेस का गोंद रॉबिनदा खुद पेड़ पर से खुरच कर लाये, फिर प्राइमर, रंग के बड़े बड़े ट्यूब, बड़ी-छोटी हॉग-हेयर एवं सैबल-हेयर (ये सारे नाम मुझे उन्होने ही बताया था) फ्लैट व राउंड ब्रशेज खरीदे गये । तब दोपहर में हमारा काम शुरु हुआ । कभी मैं फ्रेम पर खींच कर प्लायर्स से पकड़ता था कैनवास, रॉबिनदा काँटी ठोकते थे, कभी मुझे डाँट कर भगाते थे कि मुझमें ताकत नहीं है खींच नहीं पा रहा हूँ, फिर खुद खींचते थे और मैं ठोकता था काँटी । तब ग्लु का लेप चढाते थे वह खुद । प्राइमर का लेप चढ़ाते थे वह खुद । कभी कभी अविश्वास के साथ मुझे भी देते थे करने के लिये ।
हमारी रातें अब साथ बीतने लगीं । देर रात तक ईजेल पर कैनवास चढ़ाकर वह पेन्टिंग करते थे । मैं बगल में बैठ कर या लेट कर उनसे बातें करता था, किताबें पढ़ता था और लिखता था । घर में उनकी माँ, पिताजी (जो लगभग बिस्तर पर ही रहते थे) उनकी पत्नी और दो बच्चे – अमित और सोमा – थे । नींद आने के पहले तक अमित भी मेरे गोद में रहता था अक्सर और सोमा भी रहती थी । यहाँ बता दूँ कि रॉबिनदा के पिताजी प्रख्यात क्रान्तिकारी बटुकेश्वर दत्त के सगे भाई थे, इसलिये वर्धमान जिले के गाँव में बटुकेश्वर दत्त का घर देखने का सौभाग्य मुझे प्राप्त हुआ था ।
कितना विस्मय भरे थे वे दिन । पेन्टिंग करने के अलावे पेन्टिंग्स पर बातें भी होती थी । उन्ही से जान कर मैंने लस्ट फॉर लाईफ पढ़ा (आर्विंग स्टोन लिखित वान गॉग की जीवनी), फिर उन्ही की लिखी ‘ऐगोनी एंड एक्स्टैसी (मिकेलांजेलो की जीवनी) एवं ‘सेलर ऑन हॉर्सबैक’ (अमरीकी लेखक जैक लन्दन की जीवनी) भी पढ़े । फिर पूरे इम्प्रेशनिस्ट पीरियड के बारे में जाना और फिर …
शाम को दीपन का घर, दस नम्बर रोड, हमारी बातचीत और जीवनबोध मे भरने लगा टिन्टोरेट्टो के आसमान का नीला, रेम्ब्राँ के नाईट वाच का बर्न्ट अम्बर, मोनेत की बार वाली लड़की के सामने रखी नारंगियों का वाल्यूम और वजन, वान गॉग कृत पोस्टमैन रुलाँ की आँखेँ, साइप्रेस और तारों का घुमाव, डाक्टरी जाँच के लिये गाउन उठाये खड़ी लोत्रेक की वेश्याओं की करुण जांघें, … और हवा और धूप !
सब अपनी अपनी नज़र से कुछ नई चीजों को खोजते रहते थे ऐल्बम्स में । धड़ाधड़ खरीद रहे थे छोटे बड़े एल्बम, रॉबिनदा भी, मैं भी, दीपन भी । कुछ आलोकजी के पास भी पहुँच गये थे ।      
एकबार चर्चा हो रही थी लोत्रेक के बारे में । वान गॉग के आर्ल्स का खुलापन उनकी पेन्टिंग्स और ड्रॉइंग्स में तो है नहीं । सर्कस सिरीज के ड्रॉइंग्स में कहीं कहीं रंग डाल कर उन्होने अपनी प्यास को अभिव्यक्त किया है । बाकी तो पैरिस के धनी कुलीनों का एवं एवं उनकी सेवाओं में लगी नर्तकियों, भँड़ुओं एवं वेश्याओं का अश्लील रात्रिजीवन का चित्रण है । घृणा, सिर्फ घृणा है उन चित्रों में । शरीर के कारण कहीं जाने आने में भी अक्षम थे लोत्रेक और परिवार के सामन्ती वातावरण की आदतें भी थी । फिर भी कितनी घृणा थी उनमें ।
मैंने कहा, पर लोत्रेक और वान गॉग की आत्मा एक थी । दोनों तत्कालीन समाज के खिलाफ सोच के लगभग एक ही धरातल पर थे । (बरसों बाद एक अंग्रेजी शब्द मिला था मुझे इसके लिये, ‘बाइनरी’) । बहस को आगे बढ़ाते बढ़ाते एक दिन मुझे किसी ऐल्बम में ‘लॉन्ड्रेस’ मिल गया, लोत्रेक का । मैंने कहा देखिये, इस धोबिन को, 1871 के पैरी कम्यून के बाद की धोबिन है, मिलाइये ‘थर्डक्लास कैरेज’ वाले दॉमियेर की धोबिन और उसके बच्चे के साथ । रॉबिनदा तुरन्त फिदा हो गये ‘लॉन्ड्रेस’ की टेबुल पर झुक कर खड़ी दूर देखती हुई भावपूर्ण मुद्रा और टेबुल के किनारे को मजबूती से पकड़ी हुई उसकी बाँई कलाई पर ।
उत्तर-1871 के इस गॉग-लोत्रेक द्विविध अभिव्यक्ति पर काम करते हुये हम पहुँच गये रेनेसाँ काल में । इसबार भी मैने ही ढुँढ़ कर लाया ब्रुगेल द एल्डर को । ब्रुगेल तो इटली गये भी थे । लेकिन लौट आये अपने देश जहाँ उस नवजागरण का नामोनिशान नहीं था । अपने समाज के पिछड़ेपन को लेकर अपनी व्यथा और करुणा को अभिव्यक्त किया अजीब भद्दई वाले कपड़े पहने गँवई लोग, सड़क पर पेशाब करते तीन युवक, तीन अंधे, बर्फ में शिकार… उस जीवन में खुशी के मौकों पर भी कितने दबे रंग है ‘गँवई शादी के भोज’ में । मैंने कहा यहाँ भी वही फेनोमेनन है – मिकेलांजेलो-ब्रुगेल !
जितनी बातें रेनेसाँ से लेकर इम्प्रेशनिस्ट पीरियड तक को लेकर होती थी, बीसवीं सदी में आकर, सिर्फ पिकासो के पिंक पीरियड एवं सोवियत पेन्टिंग को छोड़ कर कम बातें होती थी । अब ग्वेर्णिका पर बातें होना, कैथे कोल्वित्ज के चारकोल ड्रॉइंग्स या थोड़ीबहुत शागाल या मातिस या दाली पर बातें होना अलग है ।
भारतीय पेन्टिंग्स में हम बॉम्बे स्कूल और बेंगॉल स्कूल के कलाकारों की तूलना करते थे, लेकिन एक बात जो खटकती थी वह थी जॉनर पेन्टिंग की कमी और उसमें भी औद्योगिक श्रम के दृश्यों एवं आजादी के संघर्ष से लेकर आगे के कई बड़े संघर्षों के दृश्यों की सम्पूर्ण उपेक्षा । जो है उसमें भी एक स्टाइलाइजेशन शुरु से ही हावी हो जाता है । यह भी बात समझ में आती थी कि आन्दोलनों से जुड़े कलाकार होने चाहिये । सोमनाथ होड़ थे तो तेभागा के चित्र हम देख पाये । चित्तोप्रसाद थे तो… ।
इन्ही दिनों के दौरान मुझे अपना ‘पोर्ट्रेट’ भी मिल गया, रेनातो गुत्तुसो का ‘रोक्को विथ ग्रामोफोन’ । मिल गया मतलब सोवियत लैन्ड में छपा उसका चित्र । हमें पेन्टिंग कहाँ से मिलेगी । आज भी मेरे घर की दीवार पर रोक्को मेरे साथ है, सिगरेट पीते हुये, ग्रामोफोन सुनते हुये …।  
इसी बीच रॉबिनदा के ईजेल पर एक के बाद एक कैनवास चढ़ने लगे और उतरने लगे । एक प्लैटफॉर्म था रात का जिस पर ट्रेन गुजर रही थी । फ्रेम के बीचोबीच एक ताम्बे का कलश जिसमें मुचकुन्द (हिन्दी में क्या कहलायेंगे?) के फूल, पत्ते सहित । ट्रेन वाला एक और पेन्टिंग था जिसमें भाप छोड़ते इंजन के पास ड्राइवर के साथ एक और आदमी खड़ा है, पीछे से बिल्कुल रॉबिनदा जैसा । …    

हाँ, पेन्टिंग्स के साथ साथ हमारा संगीत का स्टॉक भी बढ़ने लगा । दीपन जुटाया आमीर खाँ, हेन्डेल का ‘काक्कु एन्ड नाइटिंगेल’ …। मैंने जुटाये किशोरी अमोनकर, मोज़ार्ट का वायलीन कॉन्सर्टो, बिठोवेन का ‘ला एम्पेर्योर …। इसी तरह चलने लगा । फिर रॉबिनदा के ऑफिस का एक मित्र पटना में आया, विकास । उसके पास भी खूब स्टॉक था । फिर दीपन के घर का रबीन्द्रसंगीत तो था ही – देवब्रत विश्वास की आवाज थी । संगीत में हम सब एक ही अनुपम विरासत के थे । दशहरा के समय पटना में होने वाले कार्यक्रमों के श्रोता होने की विरासत ।

फिर एक दिन वह दिन भी आया, काला दिन । हम सब उस वक्त एक राजनीतिक ग्रुपिंग के अन्तर्गत थे । काफी बदलाव आ रहे थे हमारी सोच में पर सांगठनिक दृष्टिकोण वही पुराना वाला था । सामान्य सा एक ड्रॉइंग थी रॉबिनदा की और सामान्य आलोचना थी आलोक धन्वा की । बस, उसी पर आसमान उठा लिया गया । तीखी बहस के अन्त में रॉबिनदा सहित बाकी लोग एक तरफ थे और आलोकजी, दीपन और मैं दूसरी तरफ । हम सख्ती के साथ मीटिंग छोड़ कर बाहर निकल गये ।
अगले दो दशकों तक रॉबिनदा हमारे जीवन से ही अलग हो गये ।
बीच में एक बार पता चला कि वह किसी ऑपरेशन के लिये शरीफ कॉलोनी में डा॰ हई के क्लिनिक में भर्ती हैं । मैं दौड़ कर गया पर मालुम हुआ कि उनका डिसचार्ज हो चुका है । फिर एक बार मेरी शादी के दो वर्षों के बाद उन्हे रास्ते पर देखा गुजरते हुये । मैंने उनका हाथ पकड़ा और खींच कर ले आया अपनी पत्नी और बच्चे से मिलाने के लिये । बाहर ही खड़े खड़े वह अनमने ढंग से मिले और चले गये । फिर मालुम हुआ वह ट्रांसफर लेकर कलकत्ता चले गये हैं ।
कुछ दिनों के बाद दीपन मित्र भी चला गया कलकत्ता । मैंने कहा था उससे कि रॉबिनदा के बैंक में जाकर पता करने कि वह कहाँ हैं । पर वह नहीं कर सका ।
पर जादू का चिराग तो जलेगा ही घिसते रहने पर । जब भी मैं कलकत्ता जाता था, शाम को विनय-बादल-दिनेश बाग (यानि जीपीओ के पास, लालदिघि के उस पार …) से खुलने वाली या हावड़ा से आने वाली बसों के लिये लगी कतारों में मैं उनका चेहरा तलाशते रहता था । एक दिन मिल ही गये । मैंने खप्प से पकड़ा उनको । ऑफिस का पता, घर का पता ।
कलकत्ता मैं ज्यादा दिनों के लिये तो जाता नहीं था । अगली बार गया तो उनके ऑफिस में जाकर मिला । पर बात बन नहीं रही थी । वह करीब आने से कतरा रहे थे । वैसे हम भी कहाँ थे उन्हे अपने हाल में छोड़ने वाले । जादबपुर वाले घर पर पहुँचने का तो मौका नहीं निकाल पाया, पर ऑफिस जरूर जाता था । न रहते थे तो बगल वाले को नाम पता लिखाकर आता था कि उनको पता चले कौन आया था ।
मुझे पता नहीं था कि उनके जीवन में क्या क्या परिवर्तन हो रहा था, बच्चे कहां थे, पिताजी या माँ जीवित थे या नहीं …।
कई वर्षों के बाद एक दिन शाम को पटना में मै अपने बैंक के मुख्य शाखा में युनियन के किसी काम के सिलसिले में बैठा हुआ था । अचानक सात बजे के आसपास उन्हे देखा दरवाजे से अन्दर प्रवेश करते हुये । मैं आगे बढ़ा, ‘रॉबिनदा, आप यहाँ !’
‘हाँ, तुम्ही से मिलने आया हूँ । अरुण (बगल में खड़ा था, उनका भांजा) बोला कि तुम यहीं पर मिल जाओगे । युनियन का काम रहता है ।‘
उफ ! कितने वर्षों के बाद ! डाकबंगला चौराहे एक बन्द दुकान की सीढ़ी पर बैठ कर बैठ कर हम बात करते रहे …।
अगले दिन मिलने की बात नहीं निकल पाई क्योंकि उनको वापस जाना था, पर वादा करके गये की अमुक तारीख को वह फिर पटना आयेंगे तो हमारे घर पर खाना खायेंगे । तब तक मोबाईल का जमाना चला आया था इसलिये गुम हो जाने की गुंजाइश कम हो गई थी ।
आये वह । उस दिन 11 बजते बजते पहुँच गये मेरे घर । हाथ में एक बड़ा भारी थैला । ‘यह सब क्या है ?’
उसमें से पहले निकला दो लैन्डस्केप, फ्रेमिंग किया हुआ । बोले, इधर के दिनों में किया था, किसी किसी को देने के लिये, उसी का कलर-जेरॉक्स है, बढ़िया जगह से कराया है, बदरंग नहीं होगा बहुत दिनों तक, तुम्हारे लिये, लो । ले लिया । मेरी बेटी पहली बार उनसे मिल रही थी, वह भी पहली बार मिल रहे थे; बेटी ने पेन्टिंग्स देखा और दोनों अपने पास रख लिया । फिर झोला बढ़ाते हुये बोले इसमें कुछ पुराने पेन्टिंग्स हैं उन दिनों के, ये भी रख लो । उसमें एक हम दोनों का बनाया हुआ माउन्टेड कैन्वास था, जिस पर उन्होने धुंध भरे जंगल का हरापन को एक्स्प्लोर कर रहे थे । दूसरा, एक दूसरा मीडियम था जिस पर हम उन दिनों काम करते थे, यानि मैं खरीद कर लाता था और वह पेन्ट करते थे – मैसोनाइट बोर्ड – बिना प्राइमर लगाये उसके गाढ़ा ब्राउन को ही बेस के रूप में इस्तेमाल करते थे । यह मेरा पोर्ट्रेट था एक, जिसे देख कर सभी चिढ़ते हैं आज तक कि मैं ऐसा न था न हूँ । इतना घनघोर काला, चेहरे पर जैसे किसी युद्ध के दाग, उस समय की उम्र के हिसाब से काफी अधिक… । पर मुझे अच्छा लगता रहा कि मैं खुद तो ऐसा ही चाहता था अपना चेहरा ! और माथे पर मेरा सबसे अधिक प्रिय टोपी, हरा वन-पीस बेरे ! मेरा रोँयेदार ओवरकोट !
खाना खाकर हम पैदल ही निकल गये घूमने । नये बने बहादुरपुर पुल या धनुष सेतु पर चढ़ते हुये मैंने दीपन को फोन लगाया, ‘कहाँ हो ?’
‘अन्दमान द्वीप’ ।
‘घुमों वहाँ । इधर देखो मैंने पा ही लिया रॉबिनदा को दोबारा !’

कुछ थी समस्यायें रॉबिनदा के घर पर । बच्चे अब सब बड़े हो गये थे, बाहर थे । वह खुद भी सेवानिवृत्त हो चुके थे । घर में सिर्फ वह और उनकी पत्नी । मैं मिलना चाहता था सबसे । पर उन्होने मना कर दिया । मोबाइल नम्बर दिया पर कहा कि वह खुद फोन करेंगे, मैं फोन न करूँ ।
फोन किया उन्होने एक दिन । दिन बताया आने के लिये; वह अकेले ही होंगे । पत्नी गई हुई हैं बच्चों के पास । बुरा लगा मुझे । ऐसा क्या है ? मारेंगी मुझे ? मार लेती जी भर ! पर मिलूँ नहीं, उनकी अनुपस्थिति में जाऊँ, बड़ी अजीब बात थी । फिर भी पहुँच गया कलकत्ता, नाकतला, उषा स्टॉपेज । वह खुद आये थे मुझे लेने । दिन भर रात भर चला संगीत, बिथोवेन की नाइन्थ सिम्फनी एवं बातचीत का दौर । रॉबिनदा हमेशा ही खिलाने के शौकीन रहे । मेरे लिये मीट-भात बनाते रहे दोपहर में । अगली सुबह लौटते वक्त उनके वो उजाड़ी गई बस्ती के स्केच और ड्रॉइंग्स भी ले आया । ‘कविता का संकलन ? ‘मानुषेर नाम भुमिकाय’ ? छापूँ ?’
‘नहीं’ ।
अपनी एक किताब दे आया डर सहम कर । गद्य की । कुछ दिनों के बाद लिफाफा आया । लम्बी चिट्ठी । पूरा झाड़ । झाड़ के रख दिया मुझे कमजोर गद्य के लिये । लेकिन साथ में इधर की लिखी हुई एक लम्बी कविता भी भेजी । आहा, नहा लिया मैं उनके वात्सल्य से ।

भेंट उसके बाद भी कई बार होती रही है उनसे कलकत्ता जाने पर । घर जाने से मना करते रहे पर खुद चले आये बिबादी बाग के इलाके में मुझसे मिलने के लिये । मेरे बच्चों के लिये केक, मिठाइयाँ ले आते रहे ।
इधर दो तीन वर्षों से फोन नहीं आया है उनका । उम्मीद करता हूँ वह स्वस्थ होंगे ।
-------------------------------------

उपसंहार : इस आलेख को पूरा करने के बाद मैने दीपन मित्र को भेजा था । उन्होने कुछ महत्वपूर्ण यादों को शामिल किया । मैं भी जस का तस उन्हे इस आलेख में जोड़ रहा हूँ ।
“रॉबिनदा की कविताओं में कितनी ताकत थीं, वह जैसे आज फिर से समझ में आया । उनकी कुछ और कविताओं को उद्धृत कर सकते थे । और एक विषय छूट गया है । वह है कि मूर्तिकला का कोई जिक्र नहीं है । जबकि हेनरी मूर, रेनोआँ, मिकेलांजेलो से लेकर बहुत सारे अमूर्त आकृतियों तक, जिनके मूर्तिकारों का नाम भूल गया हूँ (एक का नाम नॉम गैबो था न ?) । एक महिला मूर्तिकार थीं, जिनका काम हमें अच्छा लगता था [शायद बारबारा हेपवर्थ था उनका नाम – विद्युत] । आज न वे काम याद हैं न उन मूर्तिकारों के नाम । गोलघर की चोटी पर पहुँच कर हार्बर्ट रीड की किताब के पन्ने खोल कर देखना – मैं और रॉबिनदा था, तुम नहीं थे ?… जाड़े की एक रात में हम तीनों रॉबिनदा के फ्लैट में । देर रात तक तुम्हारा गाना, कविताओं का पाठ चला फिर रात सुबह होते होते कोई एक मजेदार बात कह कर तुम चादर तान कर सो गये । मैंने भी याद नहीं क्या क्या बातें की थीं । सुबह होने को आई । रॉबिनदा के घर की खिड़की के शीशे पर ओस की बून्दें । याद है ? ‘मुनियार घरे रात, शीत अर शिशिरेर जल’ [जीवनानन्द दास की पंक्ति] ।
“और कुछ बातें याद आ गई विद्युत । जैसे, देवघर में छत पर सोते समय लालटेन की रोशनी में रॉबिनदा द्वारा इलियट रचित लव सॉंग ऑफ ऐलफ्रेड जे॰ प्रुफक का पाठ, वेस्ट लैन्ड का पाठ । पटना में मेस वाले घर में शाम को पहुँचकर जोरदार आवाज में नीरेन्द्रनाथ चक्रबर्ती की कविताओं का पाठ । हालाँकि वह साल था 1971 । मैं, शेखर और सुब्रत मैट्रिक की परीक्षा के बाद मध्यरात को पहुँचे जसिडीह स्टेशन । भोर होते होते देवघर, एक अजीब सा धर्मशाला में । 8-9 बजे रॉबिनदा का घर ढूंढ़ कर पहुँचे । रॉबिनदा सब को अपने घर पर रखे । तुम नहीं थे उस वक्त । तुमसे उनका परिचय लगता है और बाद में हुआ । …
“अमरीका से शायद गिन्सबर्ग के देखरेख में निकलती किसी पत्रिका में कुछ लिखे थे, या कोई चित्र छपा था । मलय रायचौधरी भी उस पत्रिका के साथ जुड़े हुये थे । याद है ? [‘याद’ नहीं पर जानता था – ‘हिस्ट्री, हिस्ट्री, वनवे ट्रैफिक…’ शायद इसी तरह थी कविता – विद्युत]
“रॉबिनदा राधिकादा की कहानी कहते थे याद है ? नरेन्द्रपुर मिशन स्कूल में राधिकादा अंकन के शिक्षक थे और रॉबिनदा को बाहर ले जाते थे, प्रकृति के बीच, संथालों की दुनिया में । एकदिन स्कूल छोड़ कर वह एक वस्त्र में निकल गये पता नहीं कहाँ । इन सब कहानियों से रॉबिनदा हमारे लिये एक अत्यंत स्वस्थ्य, ताकतवर दुनिया के दरवाजे खोल दिये थे । हमने उन्हे समझने में गलती की थी । आलोकजी भी समझ नहीं पाये थे । रॉबिनदा जिस जीवन एवं शिल्प की बात करते थे वह आज का लिजलिजा साहित्य नहीं था । जबर्दस्त ऊर्जा व ताकत से भरी एक दुनिया थी वह । मुझे तो कम से कम वैसी दुनिया का पता किसी और से नहीं मिला । …”


__________________________