Thursday, October 12, 2017

আমার ‘ঝুলন’



আমি      পরাণের সাথে খেলিব আজিকে মরণখেলা
নিশিথবেলা ।
সঘন বরষা, গগন আঁধার,
হেরো বারিধারে কাঁদে চারিধার
ভীষণ রঙ্গে ভবতরঙ্গে ভাসাই ভেলা;
বাহির হয়েছি স্বপ্নশয়ন করিয়া হেলা
রাত্রিবেলা ।

ওগো      পবনে গগনে সাগরে আজিকে কী কল্লোল !
দে দোল্‌ দোল্‌ ।
পশ্চাৎ হতে হা হা করে হাসি
মত্ত ঝটিকা ঠেলা দেয় আসি,
যেন এ লক্ষ যক্ষশিশুর অট্টরোল ।
আকাশে পাতালে পাগলে মাতালে হট্টগোল ।
দে দোল্‌ দোল্‌ ।…’

রাত । ঘূর্ণিঝড় আর বৃষ্টিতে তোলপাড় আকাশ । টিভি বলছে হাওয়ার গতি সাড়ে তিনশোয় শুরু হয়েছিল, তবে এখানে পৌঁছোতে পৌঁছোতে ৭০কিমিতে নেমে এসেছে । বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ চলছে ।
৭০০ কোটি মানুষের পৃথিবীতে প্রায় পঁচিশ কোটি মানুষ পূর্বভারতে এই মুহুর্তে এই ঝড়বৃষ্টিতে প্রভাবিত । এমনই ঘূর্ণিঝড় হয়ত আরো কয়েকটি এলাকায় চলছে চীনে, তাঞ্জানিয়ায়, পেরুতে আমরা জানিনা ।
এর আগে পৃথিবীতে আসা এমনই রাতগুলোর মত এরাতও কারো না কারোর জীবনে নিছক রাত নয় । বেশ কিছু দিন ধরে তার মাথায় নৈরাশ্যের অনির্দেশ দিনরাতের ভেদ আবছা করে দিয়েছে । রাতের এই ঝড় যেন আরো উস্কে দিয়েছে তার ভিতরের ঝড়টাকে । যে ঝড় তাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের দিকে । আর বৃষ্টি ? বৃষ্টি তো নয় যেন আত্মকরূণার অভিমান; বেঁচে থাকার শেষ ইচ্ছেটুকু কেড়ে নেওয়া অবসন্নতার হিম ।
কেন? কিসের জেরবার তার দিনযাপনে ? ভালোবাসার প্রতারণা, বাসি হয়ে ওঠায় বুঝতে পারার ? জীবনের বিস্ময়ের মাংস গলে হাড় বেরিয়ে পড়ার ? বিশ্বাসে চিড় ধরে যাওয়ার ? শ্রদ্ধা বা মমতার ভিত নড়ে যাওয়ার ?
ঠিক কোন পরিস্থিতিতে আত্মহননের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে মানুষ ? পরাণের সাথে মরণখেলার বদলে নিজের পরাণের রক্তধারা জমাট করে দেয় ধমনীতে ।
সব প্রেমিক কি নিজের প্রেমিকাকে নিয়ে পালাতে পারে নিরুদ্দেশযাত্রায় ? প্রেমিকাই কি দুঃসাহসে চেপে ধরতে পারে আত্মভোলা রসায়নবিদকে (মনে করুন ঋত্বিকের নাগরিক) ? খাপ পঞ্চায়েত ত পরের ব্যাপার । মনটাই তো খাপে খাপে বন্দী ।
-          সব মেয়ে কি দিওয়ানি হয়ে দৌড়োয় জীবনের, জগতের সমরাহ্বান স্বীকার করে নিতে ?
-          কিছু মেয়ে তবু তো দৌড়োয় ।
-          সবাই কি তরে যায় ?
-          অনেকে হারিয়ে যায় গুমনাম । তবু যারা দৌড়েছে তারাই বদলেছে নিজেদের গল্প, গত একশো বছরে ।
-          কিছুটা ফাইনান্সিয়াল ব্যাকগ্রাউন্ড চাই ভায়া !
-          ছেঁদো কথা ।
……
চরম মুহুর্তগুলো জীবনে আসে । আর সে মুহুর্তে একটাই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারে মানুষঃ-

আমি      পরাণের সাথে খেলিব আজিকে মরণখেলা

বাকি সব সিদ্ধান্ত নেতিবাচক । আত্মহত্যার একবারে অথবা তিলে তিলে । মৃত্যু কে চায় ? কিন্তু না চাইলে যে পরাণের সাথে মরণখেলা খেলতে হয় বারবার, এই উপলব্ধিটা হয়না (হতে চায়না আড়াল করে রাখে আমাদের চেতনার দাসত্ব; কেন, তার বিশেষ কার্যকারণে যাওয়ার প্রয়োজন নেই এখন) । তাই, কিছু মৃত্যু হয়ত এড়িয়ে যেতে পারি, কিন্তু বড় মৃত্যু, নিরর্থক দিনযাপনের, সারাটি জীবন যাপনের মৃত্যু এড়াতে পারিনা ।
আবার পরাণের সাথে মরণখেলাও যে শেষ যুক্তিতে সামাজিক !

*                      *                      *                      *                      *
একটা কথা আছে, হুজুগ । হুজুগে যুগ পাল্টায়না । হুজুগ কোনো ঘটনা নয় । হুজুগ মনের একটি সামাজিক অবস্থা । হুজুগেই মানুষ কিছু একটা ধরে, অবলম্বন হিসেবে । হুজুগের স্তর ভালোবাসায়ও হয়, এ্যাডভেঞ্চারেও হয়, গবেষণাতেও হয় আবার আন্দোলনেও হয় ।
ভীষণ রঙ্গে স্বপ্নশয়ন হেলা করে বেরিয়ে পড়তে হয়; পৌঁছে যেতে হয় রামলীলা ময়দানে আন্না হাজারের শপথের সাথে শপথ মেলাতে । মোমবাতি হাতে তুলতে হয় ভগৎ সিং চকে ইরোম শর্মিলার জেদী কন্ঠস্বরের সাথে কন্ঠ মেলাতে । (এর মানে এই নয় যে যারা যায় তারা সবাই হুজুগেই যায় । কিন্তু হুজুগেও যায় আর আমি আপাততঃ তাদের কথাই বলছি ) ।
মিছিলে বন্ধু জোটে নানারকম, সমাবেশে রাত কাটে । গবেষণাগারে শেষরাতে মাথা কুরে খায় সিনিয়রদের ক্যরিয়রমুখী লবির কথাগুলো । এ্যাডভেঞ্চার ঘিরে ধরে বরফশীতল নির্জনতা ও তারপর ? অন্যরকম, অনেকটা অন্যরকম হয় পরের দিন সকাল । একটা জেদ ছুটে এসে ঘিরে ধরে শরীর আমি করব !
ভুখ হড়তালের পঞ্চম দিন সকালে ঘুম ভাঙে এক অসীম নির্লিপ্তিতে । মৃত্যুও যেন দীর্ঘতর ঘুম ! পুলিশ কর্ডনের মুখোমুখি, ভয়ে নিজের চোখে বেইজ্জৎ হয়ে পিছু হটে, আবার যাই, ব্যারিকেড টপকাই; লাঠি খেয়ে কাঁধের হাড় ফাটে, মাথার আগলটাও খুলে যায় । প্রথম দেখতে পাইঃ-

আজি      জাগিয়া উঠিয়া পরাণ আমার বসিয়া আছে
বুকের কাছে ।
থাকিয়া থাকিয়া উঠিছে কাঁপিয়া
ধরিছে আমার বক্ষ চাপিয়া
নিঠুর নিবিড় বন্ধনসুখে হৃদয় নাচে;

সদ্য জেগেছে তাই চিনেছি । এই জায়গায় তো আজকাল হাঁটু গেড়ে বসে হাতের ফুলটা বাড়িয়ে বিবাহের প্রস্তাব দিতে হয় ! আই লাভ ইউ বলতে হয় ! নববধুকে যতনভরে রাখি, সোহাগ করি, সুখের সংসার গড়ে তোলার চেষ্টা করি । নইলে, অন্ততঃ ভালোবাসাবাসির কথা বলি, সারাজীবন সাথ নিভানে কার শপথ করি ।
হুজুগ যেমন বেশি দিন থাকেনা, যায় অথবা পাল্টায়, নিবিড় বন্ধনসুখের স্তরটাও বেশি দিন থাকেনা । বিয়ে করলেও মরে, বিয়ে না করলেও মরে । সংগঠনের রোজনামচায় দৃষ্টি হারায়, শুধু নিয়মশৃংখলার তন্ত্র থেকে যায় । তারপর তন্ত্রও গিয়ে থাকে মন্ত্র পেট থেকে গজিয়ে ওঠে গোপন দ্বিতীয় মাথা । লাল ফিতের বাঁধন খুলতে খুলতে হারিয়ে যায় স্বাধীন গবেষণার ইচ্ছে কোম্পানির গোলামি বেশি লোভনীয় মনে হয় । ছবি-মালা-বরেণ্যস্মরণ চর্বিতচর্বন হয়ে ওঠে । বন্ধুত্ব, জিন্দাদিল ইয়ারি হারিয়ে যায় ক্যরিয়রের দৌড়ে ।
এমনকি দেশের জীবনও হারিয়ে যায় স্বাভিমানহীনতায়, উদ্যমহীনতায় । মুমুর্ষু সমাজব্যবস্থার  বিষাক্ত স্ফীতি খেয়ে চলে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের লোকায়তিক ।
হায়        এতকাল আমি রেখেছিনু তারে যতনভরে
শয়ন-পরে ।
দুয়ার রুধিয়া রেখেছিনু তারে গোপন ঘরে
যতনভরে ।।
……………
শেষে      সুখের শয়নে শ্রান্ত পরাণ আলসরসে,
……………
পরশ করিলে জাগেনা সে আর,
কুসুমের হার লাগে গুরুভার
ঘুমে জাগরণে মিশি একাকার নিশিদিবসে ।
বেদনাবিহীন অসাড় বিরাগ মরমে পশে

পুরোনো বাসর নতুন উদ্যমে তবু আবার সাজাই হয়ত দুরাশায়, কোনো একদিন । সুর ফেরেনা । পুরোনো ইয়ারি ফিরিয়ে আনতে চাই বন্ধুদের দারুর পার্টিতে ডেকে এনে । শেষরাতে একে অন্যকে বিষ উগরে ফিরে যাই নিজেদের সেই সুরছেঁড়া বাসি বাসর, অর্থাৎ  খোঁড়লে । পুরোনো কাজ ধরতে চাই আবার থেকে অবসাদ জেঁকে ধরে । সংগঠনে সাথীদের পুরোনো লড়াকু মনোভাব, একে অন্যের প্রতি মমত্ব বজায় রাখতে বলি মিটিং করি, ওয়ার্কশপ করি । দেখি অনেকের ব্যস্ততা আজকাল আরো সব অন্যান্য দিকে বেড়ে গেছে । দেশ ফিরে তো আসেই না, আরো হারিয়ে যেতে থাকে ভারতপর্বএর ঝলমলে লেসার শোয়ে ।

ঢালি       মধুরে মধুর বধুরে আমার হারাই বুঝি

একটা জগৎবিখ্যাত বই আছে । কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টো । সবাইকার পছন্দ নাও হতে পারে । তবু, বইটার প্রথম দিকের একটা বিখ্যাত প্যারাগ্রাফ থেকে উদ্ধৃত করছি ।
আজ অব্দিকার সর্বপ্রকার মানবসমাজের লিখিত ইতিহাস…” কী, আরো লিখতে হবে ? সবাই জানেন । কিন্তু, তৃতীয় লাইনটার দিকে নজর দেওয়ানোর জন্য পুরোটা আবার উদ্ধৃত করছি । আজ অব্দিকার সর্বপ্রকার মানবসমাজের লিখিত ইতিহাস শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস । মুক্তমানুষ (ফ্রীম্যান এর গ্রীক অর্থে) ও ক্রীতদাস, প্যাট্রিসিয়ান ও প্লেবিয়ান, জমিদার ও ভূমিদাস, গিল্ডমাস্টার ও জার্নিম্যান, এককথায় অত্যাচারী ও অত্যাচারিত একে অন্যের বিরোধে রত থেকেছে আজঅব্দি, কখনো গোপনে কখনো প্রকাশ্যে লড়াই চালিয়েছে অনবরত । একটা লড়াই যা প্রতিবার, হয় সমাজের বৈপ্লবিক পুনর্গঠনে শেষ হয়েছে নয়তো…”
নয়তো ? তারপর কী ?
নয়তো যুদ্ধরত শ্রেণীগুলির সমূহ ধ্বংসে শেষ হয়েছে ।
কী বস্তু ? এই সমূহ ধ্বংস; ?
ভূমিকম্পে, অগ্ন্যুৎপাতে, জলপ্রলয়ে সব কিছু শেষ হয়ে যাওয়াই কি শুধু সমূহ ধ্বংস ? এমনকি এক একটি জাতির সম্পূর্ণ অস্তিত্ব, একটি পুরো সভ্যতা হারিয়ে গেছে কালের গহ্বরে, অথবা গত দুশো বছরে পূঁজির রথচক্রে পিষ্ট হয়ে কেননা তারা সমাজের বৈপ্লবিক পুনর্গঠন সময় মত করতে পারেনি ।
কিন্তু তাছাড়াও, সমাজজীবনের যে অর্থনৈতিক বিপর্যয়, সামাজিক, নৈতিক, সাংস্কৃতিক বিপর্যয়, সেটা বাড়তে বাড়তে সমূহ ধ্বংসে পৌঁছে যেতে পারে না কি ?
ঢালি       মধুরে মধুর বধুরে আমার হারাই বুঝি
পাইনে খুঁজি ।
…………
অতল স্বপ্নসাগরে ডুবিয়া মরি যে যুঝি
কাহারে খুঁজি ।

কর্মভিত্তিহীন আশাবাদের স্বপ্নসাগরে ডুবে যুঝে মরছি কাকে খুঁজছি ? যতই মধুর ঢালিনা কেন মধুরে, পরানবঁধুকে আর খুঁজে পাওয়া যায়না ।

একটা বই বেরিয়েছে কিছুদিন আগে । অপটিমাল কন্ট্রোল অফ নন-লিনিয়ার প্রসেস, উইথ এ্যাপ্লিকেশন ইন ড্রাগস, কোরাপশন এ্যান্ড টেরর । যদিও খুবই চমকপ্রদ তার বিচার্য বিষয়, বিচারপদ্ধতি অত্যন্ত জটিল, সাধারণ বোধগম্যতার বাইরে । বিশুদ্ধভাবে গণিতবিদদের এলাকা । রকেটের বিভিন্ন ইঞ্জিনগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রাখার জন্য যে গাণিতিক প্রক্রিয়া ব্যাবহার করা হয়, সেটি প্রয়োগ করা হয়েছে সমাজের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের ওপর । যেমন কোরাপশন, অর্থাৎ দুর্নীতি । বইয়ের লেখকদের কাছে বিচার্য প্রশ্নটা হল এরকমঃ যদি কোনো সমাজে সাধারণভাবে মানুষ একদিকে ধনসম্পত্তি, প্রতিপত্তি ইত্যাদি এবং অন্যদিকে দুর্নীতিরোধক শাস্তিবিধানের তুলনার ভিত্তিতে সততা ও দুর্নীতিগ্রস্ততার মাঝে ঘোরাফেরা করে, তাহলে কি সে সমাজে সৎ ও দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষের অনুপাতে কখনো দীর্ঘস্থায়ী স্থিরতা আসতে পারে ? বা, গাণিতিক ভাষায়, স্থায়ী ভারসাম্য আসতে পারে কি সে সমাজে ?
বইটার লেখকদল (পাঁচজন গবেষক) গাণিতিকভাবে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, না, আসতে পারেনা । হয় কিছুদিনের মধ্যে সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত হবে অথবা সবাই সৎ হয়ে যাবে । অর্থাৎ, সেই একই কথা, হয় বৈপ্লবিক পুনর্গঠন নয় সমূহ ধ্বংস । মাঝামাঝি জায়গায় বেশি দিন থাকা যাবেনা ।
এ তো গেল বাইরের কথা ।
ঘরের কথা ?
কতরকম পরিভাষা ও প্রতীক গড়ে তুলি দাম্পত্যে দুর্নীতির ! এ্যাডজাস্টমেন্ট, কম্প্রোমাইজ । সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে স্যাক্রিফাইস ! সব ফাঁপা ! দাম্পত্য ভেঙে যায় ! ইন্ডিপেন্ডেন্স ! সেও ফাঁকা !

ব্যাকুল নয়নে হেরি চারিপাশে
শুধু রাশি রাশি শুষ্ক কুসুম হয়েছে পূঁজি;

*                      *                      *                      *                      *
তাই       ভেবেছি আজিকে খেলিতে হইবে নূতন খেলা
রাত্রিবেলা ।
মরণদোলায় ধরি রশিগাছি
বসিব দুজনে বড়ো কাছাকাছি
ঝঞ্ঝা আসিয়া অট্ট হাসিয়া মারিবে ঠেলা
আমাতে প্রাণেতে খেলিব দুজনে ঝুলনখেলা
নিশীথবেলা ।

ভেবেছি । কিন্তু ভাবলেই কি আর হয় ? প্রাণকে নিজের অন্তরে অনুভব করা যদিও বা যায় মুহূর্তের চৈতন্যে, তাকে ধরে রাখাই হয় কঠিন । কেননা প্রাণ তো আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় । প্রেয়সীও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় । প্রাণ ইতিহাসের সাড়া । প্রেয়সী আরেকটি প্রাণের ধারক । তাতেও সেই একই ইতিহাসের সাড়া । প্রাণকে কাছে ধরে রাখতে গেলে ইতিহাসের সাড়া হৃদয়ে বাজিয়ে রাখতে হবে অনুক্ষণ । প্রেয়সীকে কাছে ধরে রাখতে গেলে তার প্রাণেও যে ইতিহাসের সাড়া তা কান পেতে শুনতে হবে ।
ইতিহাসের সাড়া প্রাণে বাজিয়ে রাখা, কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে গান শোনাও নয়, ডুগডুগি বাজানোও নয় । ইতিহাসের সাড়া প্রাণে অনুক্ষণ বাজিয়ে রাখতে গেলে শামিল হতে হবে ইতিহাস-নির্মাণের কর্মযজ্ঞে । প্রেয়সীও শামিল হবে তাতে । তবেই প্রেয়সীকেও পাওয়া যাবে ।

এই কঠোর সত্যটার মুখোমুখি হওয়া বেশ কঠিন । সব কবিতা এখানেই এসে হোঁচট খায় । এখানে তাকে আবার নতুন করে জায়গা করে দিতে হয় ইতিহাস-নির্মাণে রত কেজুড়ে মানুষটার জন্য, প্রাণশক্তির সন্ধানে । সাধারণ কবিতা তা করতে গিয়ে ছন্দ হারিয়ে ফেলে, ভেঙে যায় । তাই আগেই, কিছু স্বপ্নবাক্য আউড়িয়ে শেষ করে নিজের যাত্রাপথ । যাতে এখান অব্দি না পৌঁছোতে হয় । কিন্তু অনন্যসাধারণ যে কবিতা সে গ্রহণ করে, কেজুড়ে প্রাণশক্তিটাকে প্রবেশ দিয়ে, নিজের ছন্দ ভেঙে, নতুন ছন্দে নিজেকে আবিষ্কার করার সমরাহ্বান । সে কবিতা বলতে পারেঃ-
প্রাণেতে আমাতে মুখোমুখি আজ
চিনি লব দোঁহে ছাড়ি ভয়লাজ

থ্রী ইডিয়টস ফিল্মে শরমন যোশির ক্যারেক্টারটা মনে আছে ? ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে বলেছিল, স্যার ! শরীরের সতেরোটা হাড় ভেঙে আমি এই এ্যাটিচ্যুডটা পেয়েছি । চাকরী আপনারা রাখুন, এই এ্যাটিচ্যুড আমি ছাড়তে পারবো না । হাসপাতালে যেদিন ওর জ্ঞান ফিরে এসেছিল, ভয়ে ভয়ে বেঁচে থাকার বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, তখন নিশ্চয়ই সেও আউড়ে থাকবে উপরের পংক্তিদুটো, তা সে যা ভাষাতেই হোক । তারপরে অবশ্য সিনেমা ।
______________
 
স্বপ্ন টুটিয়া বাহিরেছে আজ দুটো পাগল । অর্থাৎ স্বপ্ন নয়, কঠোর বাস্তবের জমিতে ভয়লাজ ছেড়ে যদি আমি ও প্রাণ একে অন্যকে চিনে নিতে পারি, যদি ইতিহাসের সাড়া বাজে দুজনেরই প্রাণে অনুক্ষণ তবেই গাইতে পারবঃ-

দে দোল্‌ দোল্‌ ।
এ মহাসাগরে তুফান তোল্‌ ।
বধুরে আমার পেয়েছি আবার, ভরেছে কোল ।
……………
বক্ষ শোণিতে উঠেছে আবার কী হিল্লোল !


ªªªªªª

(২০১৪ সালের কোনো একদিন লেখা)

No comments:

Post a Comment