Thursday, January 14, 2021

অবক্ষয়-প্রসঙ্গ

সভ্যতা ও সংস্কৃতির অবক্ষয়ের মুখ কি কখনও জীবনের উৎসবের মত হতে পারে? কেন হবেনা? অবক্ষয়ও তো একটা জীবনপ্রণালী! সেও তো এক যুদ্ধেরই অপর পক্ষ! আর যুদ্ধসাজের যত উপকরণ ও অস্ত্র, সে তো তার কাছেই বেশি!

আর তার সবটাই তো অবক্ষয় নয়! অবক্ষয় একটা দিশা, এবং সেই দিশার চিহ্ন কিছু বৈশিষ্ট। কিন্তু বৈশিষ্টগুলোকে তো আর প্রসাধনী চিকিৎসার মাধ্যমে সরিয়ে দেওয়া যাবেনা। পুরো জীবনপ্রণালীটারই নিষেধ করতে হবে, পরাজিত করতে হবে এবং সেই দ্বন্দেই নতুন জীবনপ্রণালীর স্বায়ত্ব হবে পুরোনো সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইতিবাচক উৎপন্নগুলো। এটাই নিষেধের নিষেধ।   

কাকে বলবো অবক্ষয়? খাজুরাহোর বা কোণার্কের মন্দিরের পাথরে যে শতাব্দীর জলহাওয়ার ঘষা, সাম্রাজ্যলালসার সংঘাতের ফাটল, অবলুপ্তি... সেসব তো পাথরের ক্ষয়। মন্দিরগাত্রের অসাধারণ ভাস্কর্যে দেহজ প্রেমলীলার, এমনকি যে উদ্ভট, কৌতুকপূর্ণ যৌনক্রিয়ার চিত্রকল্পগুলো, তাকেও সভ্যতার অবক্ষয় বলার আগে বেশ কিছু কথা ভাবতে হবে। ওগুলো তন্ত্রসাধনার প্রতীকী দৃশ্য হোক, পুরূষ-প্রকৃতির মিলনে মোক্ষপ্রাপ্তির প্রতীক হোক, নিজের রাজত্বে প্রজাদের প্রজাতিগত শক্তির বিকাশে সন্তানোৎপাদনের এবং সে কারণে যৌন-সুস্থতার প্রয়োজনীয়তা বোঝাবার রাজকীয় প্রয়াস হোক, কিছুতেই এককথায় ওই ভাস্কর্যগুলোকে অবক্ষয়ী বলে চিহ্নিত করা যায় না। চিহ্নিতকরণের আগে নিরেট ইতিহাসগত প্রেক্ষিতে খাপে খাপে বসাতে হবে।...  

এসবই ভাবছিলাম। তারই মধ্যে আমার মেয়ে এসে ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ও তো ছিলই, আমিও ‘কুইন’ (হিন্দী ফিল্ম) দেখার পর থেকে কঙ্গনা রনাওতের ফ্যান। ‘অনুপম খের শো’এর একটা পুরোনো এপিসোড, ওর মোবাইলে ইউটিউব থেকে দেখতে লাগলাম বসে বসে। বেশ কয়েকটি ইতিবাচক অনুক্ত, অর্ধোক্ত সামাজিক বক্তব্যের রেশ রেখে যাচ্ছে কঙ্গনার প্রতিটি জবাব। কয়েকদিন আগে কঙ্গনার আরেকটা বক্তব্য এসেছিল ফেসবুকে, কেন ও ফর্সা হওয়ার ক্রীমের বিজ্ঞাপন করবেনা তার কারণ হিসেবে; আমি নিজের টাইমলাইনে শেয়ারও করেছিলাম। এই পুরো ঘটনাটাই (মানে এইসব সেলিব্রিটি টকশো ইত্যাদি) তো আমাদের সাধারণ হিসেবে অবক্ষয়ী, পচনশীল সংস্কৃতির উৎপন্ন। তাহলে? কিভাবে নেব কঙ্গনার জবাবের ইতিবাচক অনুক্ত সামাজিক বক্তব্যগুলো? কিভাবে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করব মেয়ের সাথে যাতে পুরো ঘটনাটা যে অবক্ষয়ী সংস্কৃতিরই অঙ্গ, সেটা বলার জায়গাটাও থেকে যায়?

তবে সত্যিই কি ঘটনাটা একেবারে পূর্বনির্ধারিতভাবে অবক্ষয়ী সংস্কৃতির অঙ্গ, বা অবক্ষয়ী সংস্কৃতি? অবক্ষয় জিনিষটা কী? মানে এই যা কিছু নিয়ে আজকের বিনোদন শিল্প, মুখ্য বা বাণিজ্যিক ধারার সিনেমা, টিভির জগত, তার সবটাই কি নিরপবাদ ভাবে অবক্ষয়ী? ১৯৯১এর আগে তো থার্ড, প্যারালাল, প্রতিবাদী ইত্যাদি শব্দগুলো সিনেমার দুনিয়ায় জনপ্রিয় ছিল, সিনে সোসাইটি আন্দোলন ছিল... এখন তো সেসব আর নেই, সবটাই প্রায় মেনস্ট্রীম, অন্তত এদেশে, খুব বেশি হলে ক্রাউড-ফান্ডিং ইত্যাদি নতুন শব্দ কিছু শোনা যায়। উল্টোদিকে, থিয়েটার অবশ্য প্রথম থেকেই প্রতিবাদী বলেই চিহ্নিত। সাহিত্যে এই জাত-ভাগটা আবার অনেক দূর ব্যক্তি ও সংগঠন-নির্ভর; কোন সাহিত্যকে অবক্ষয়ী বলব আর কোন সাহিত্যকে জীবনধর্মী, জীবনমুখী, প্রগতিশীল, গণচেতনাসম্পন্ন... বার বার ধোঁকায় ফেলে দেয়। আর সঙ্গীত? চিত্রশিল্প, ভাষ্কর্য? নৃত্য? যত রকমের শ্রাব্য ও দৃশ্য কলামাধ্যমে যে কাজ হয়ে চলেছে দেশে? যদি নতুন প্রজন্মের সাথে তর্কযুদ্ধে নামতে হয়, কী করে বোঝাবো কাকে বলে অবক্ষয়?

তত্ত্বগত ভাবে নাহয় বলে দিলাম – ‘যা স্থিতাবস্থার পক্ষে’! বদলের কথা বললেও যা মূলতঃ এই ব্যবস্থাটাকেই, ভূলটুল শুধরে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াস। বা উল্টোভাবে যদি বলি, যা কিছু এই ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে নতুন সমাজ নির্মাণের কথা বলেনা, তা থেকে দূরে আটকে রাখতে চায় মানুষকে। কিন্তু সাহিত্যে, সিনেমায়, সঙ্গীতে, শিল্পে এর লক্ষণগুলো ধরা কি সহজ? আর তারপর, এই যে দুএকটা নতুন বস্তু এত জনপ্রিয় হয়েছে আজকাল – নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যক্তিগত লড়াই, কিছু নাগরিক মূল্যের জন্য সামূহিক (কিন্তু পুরোনো সাংগঠনিক বৃত্তের বাইরে, তথাকথিত ‘নাগরিক’ সমাজের, অর্থাৎ মধ্যবিত্তকেন্দ্রিক) লড়াই... কী করে পুরোটা খারিজ করব প্রথমটাকে বুর্জোয়া আত্মকেন্দ্রিক ‘র‍্যাগস টু রিচেস’এর স্বপ্নের রকমফের বলে, আর দ্বিতীয়টাকে ‘সুশীল সমাজের নাটুকেপনা’ বলে যখন নাকি সবাই দেখতে পাচ্ছি প্রথমটায় অনেকাংশে জুড়ে যাচ্ছে এদেশের শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রামের ছবি আর দ্বিতীয়টার প্রান্তসীমা মিলেমিশে যাচ্ছে গণ-আন্দোলনের সাথে!      

২০০৫ সালে একটা লেখা তৈরি করেছিলাম হিন্দীতে ‘ক্ষয় কা ত্বরণ’ – অবক্ষয়ের ত্বরণ বা এক্সিলরেশন অফ ডেকাডেন্স। গান্ধী সংগ্রহালয়ে পড়েছিলাম কোনো একটা আলোচনাচক্রে, পরে ছেপেছিল ‘লোকরঙ্গ’ পত্রিকায়। দুদিন আগে পুরোনো পত্রিকাটা বার করেছিলাম অন্য একটা লেখার প্রয়োজনে। পাতা উল্টে এই লেখাটা পড়তে গিয়ে দেখি লেখাটা দুর্বল লাগছে। দুর্বলতার একটা দিক তো যাকে বলে সাহিত্যিক গৃহিণীপনার অভাব। অর্থাৎ লেখার সময় যা মনে আসছে লিখে চলে যাওয়া আর তারপর তার ঠিকমত সম্পাদনা না করা। সেটা আমার চরিত্রগত দোষ। কিন্তু আরেকটা দিক আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক বছর আগে অব্দি আমি নব্য-উদারবাদী অর্থনীতি এবং উন্নত কারিগরীর দ্বান্দিক সম্পর্কটা ঠিক মত বুঝতে পারিনি। এখনও সবটা বুঝেছি বলবনা, কিন্তু ২০১২ সালের শেষে একটা গল্প লিখতে গিয়ে কিছুটা ভাবতে ও বুঝতে হয়েছিল। তা, ওই লেখাটাও এই বুঝের অভাবের দোষে দুষ্ট পেলাম। আরেকটা দিক তো লেখাটায় ছিলইনা। তার কথায় পরে আসব।

ওই লেখাতে মূলতঃ যে জিনিষটা দেখাতে চেয়েছিলাম তা হোলোঃ যখন একটা দেশের সংস্কৃতি নবজীবনে উত্তরণের সংগ্রামে অন্যান্য দেশের সংস্কৃতি থেকে শক্তি আহরণ করে আর যখন সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ তার আগ্রাসনে দেশজ সংস্কৃতির সাথে বলাৎ যোগসাধন করে, দুটোর ফসলে কী তফাৎ হয়। ঠিক মত দেখাতে পারিনি বলাই বাহুল্য। দোষনীয় আরো ছিল, যা দেখাতে পারলামনা, তাও দেখাতে পারলাম বলে দাবি করা। জঘন্য।

২

সে যা হোক। আমার মনে হয়, এই নব্য-উদারবাদী অর্থনীতি আর উন্নত কারিগরীর মধ্যেকার সম্পর্কটা আমার আশেপাশের অনেকেই ভালো করে বোঝেননা। কেন বোঝেননা তার ইঙ্গিতটা ওই গল্পের মধ্যে ছিল। আমাদের, বা আজ ষাটোর্ধ/সত্তরোর্ধ এমনকি পঞ্চাষোর্ধ ভারতীয়দের জন্য ১৯৯১ সাল একটা ওয়াটারশেড বা জলদেওয়াল। শুধু ভারতীয়ই বা কেন, গোটা পৃথিবীর মানুষের জন্য। কয়েকবছর আগে থেকেই আশঙ্কাজনক ভাবে বাড়ছিল জল। কিন্তু তা যে এমন রূপ নেবে, কেউই ভাবেনি। হঠাৎ, বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকের প্রথম বছর শুরুর আগে থেকেই উঠল ঝড়। সোভিয়েত সঙ্ঘের পতনই শুধু ঘটলনা, বরিস ইয়েলৎসিন বিয়ারের বোতল হাতে ট্যাঙ্কের ওপর চড়ে হামলা চালালো বোধহয় মস্কো নিউজের অফিসে, তারপর ১০০ দিনে রুশে পূঁজিবাদ পুনর্বহাল করার ঘোষণা করল, পেরেস্ত্রোইকা/গ্লাস্নস্তের নায়ক গর্বাচেভ পালালো আমেরিকায়, টেলিভিজনে ইন্টারভিউ এল একটি রাশিয়ান মেয়ের (আমাদের স্বপ্নের সেই কোমসোমোলের মেয়ের মতই যাকে দেখতে) যে সে ‘ডলার-বেশ্যা’, অর্থাৎ খদ্দেররা যাকে ডলারে ভুগতান করবে, হতে চায়... আমেরিকার প্রথম ইরাক-যুদ্ধ শুরু হল,... পূর্ব ও পশ্চিম ভারতের যুব তখন, একদিকে মন্ডল কমিশন অনুযায়ী সংরক্ষণ নীতি বলবৎ হওয়ার ঘোষণার পক্ষে ও বিপক্ষে আন্দোলিত এবং অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টী, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলির, ‘হিন্দুত্বে’র ধ্বজা তুলে সাম্প্রদায়িক ভোটব্যাঙ্ক সংগঠিত করার প্রয়াস, রথযাত্রা ইত্যাদি ইত্যাদি... আর এসবেরই মাঝে বিশ্বের আরেক কোণে আইবিএম বার করল তার প্রথম পার্সোনাল কম্পিউটার, যা শুধু অফিসঘরেই নয় সবকটি কাজের জায়গায় বিপ্লব ঘটাবে কিছুদিনের মধ্যে এবং ঢুকে পড়বে ঘরের ভিতরেও, এসে গেল কোমরে আঁটা পেজার, এসে গেল ২জি মোবাইল, আগস্ট মাসে জন্ম নিল ইন্টারনেটের হাইপারটেক্সট ট্রান্সফার প্রোটোকল...আর বছরের শেষ দিকে ভারতে এল নতুন কেন্দ্রীয় সরকার, এসেই ঘোষণা করল, কল্যাণকামী অর্থনীতির দিন শেষ, মিশ্রঅর্থনীতির দিন শেষ, ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডে চলে যাওয়া ভারতের সোনা ফেরত আনার বাহানায় শুরু করা হল নতুন অর্থনীতি, বলবৎ হল আন্তর্জাতিক মুদ্রাকোষের শর্তাবলী, একে একে গ্যাট বা পরবর্তী, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার শর্তাবলীগুলোও। কী দ্রুত পাল্টে যেতে শুরু করল আমাদের জীবনযাপন ও ভাবনাচিন্তার পুরো প্রেক্ষিতটাই!

এবং আমরা একটা ভ্রান্তির শিকার হলাম। অবশ্য খুব দোষনীয় নয়, কেননা একদিকে আমাদের চেনাজানা জগৎ ও তৎসম্পর্কিত ধারণা এবং পূর্বানুমানগুলো সম্পূর্ণ বিধ্বস্তপ্রায় আর অন্যদিকে কানের কাছে অহরহ নতুন জমানার, প্রতিভু শুধু নয় সেই জমানায় শিক্ষা/রুজি পাওয়া আমাদেরই সন্তানদেরও কলরব। আমরা, ঠিক স্বীকার না করলেও ভাবতে শুরু করলাম যে নতুন অর্থনীতিরই উৎপন্ন নতুন কারিগরী। শুধু ভারতেই নতুন অর্থনীতির ফলশ্রুতি হিসাবে কম্পিউটার বা সাধারণ অর্থে ডিজিটাল প্রযুক্তি আসেনি, এমনকি বিদেশেও, এসব আবিষ্কারই হতে পেরেছে কোনো একসময়ে আমেরিকায় রেগান, ইংল্যান্ডে থ্যাচার বা ওই ধরণেরই আরো আর্থনীতিক কর্মকান্ডের জমানা এসেছে বলে।

অথচ তা তো ঘটনা নয়। নতুন প্রযুক্তি সম্ভাবিত হয়ে ওঠার চাপেই বদলেছিল পূঁজিবাদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর স্থাপিত অর্থনৈতিক বিন্যাস। পরিবর্তিত বিন্যাস বাড়িয়ে তুলেছিল উৎপাদকতা আর হারিয়ে দিয়েছিল সমাজবাদী দেশগুলোকে। যখন নাকি মার্ক্সবাদের অন্যতম তত্ত্ব ছিল, সমাজবাদী প্রণালী উৎপাদকতা বৃদ্ধিতে নির্ণায়কভাবে হারিয়ে দেবে পূঁজিবাদকে। সমাজবাদী প্রণালীর এই অর্থনৈতিক পরাজয়ই তৈরি করেছিল দেশগুলোর আভ্যন্তরীন রাজনৈতিক সংকট আর ওই নতুন প্রযুক্তির জয়ঘোষকে প্রধান ভাবধারাগত অস্ত্র করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সাম্রাজ্যবাদ। সমাজবাদকে ধ্বংস করতে সফল হয়েছিল। যখন সে লড়াইটা চলছিল তখনই, তার অনুপ্রক্রিয়া হিসেবে রাজীব গান্ধী জমানায় ইয়োরোপীয় বাজার চড়া সুদে থেকে নেওয়া ঋণ, ব্যালেন্স অফ পেমেন্ট্‌সের সংকট আর নরসিংহ রাওয়ের নতুন অর্থনীতির ঘোষণা।

তার অনেক বছর পর সিওয়ান গিয়েছিলাম জনবাদী লেখক সঙ্ঘের জাতীয় কার্যকারী সমিতির বৈঠকে। ঠিক বৈঠকে নয়, আমি তার সদস্য ছিলামনা, কিন্তু যেহেতু বিহারের মানুষ তাই অভ্যর্থনা সমিতির স্বয়ংসেবক হিসেবে। মেঘলা সকালে স্কুলের মাঠে চা খেতে খেতে ওরা কথা বলছে, মিটিং শুরু হবে একটু পরে, হঠাৎ একজনে গলা তুলতে তার বক্তব্যটা শুনতে পেলাম, “কন্টিনিউইটি না রাপচার, সেটা স্থির করতে হবে আমাদের”। কানে ধরে গেল। সত্যিই তো, যতই ভাবধারাগত ভাবে খারিজ করে দিয়ে থাকি উত্তর-আধুনিকতাবাদ বা অধুনান্তিক ধারণাগুলো, সেভাবে তো স্থির করিনি ১৯৯১ এর আগে-পরে কন্টিনিউইটি না রাপচার! ধারাবাহিকতা না বিদারণ? আর যদি দুটোরই চিহ্ন থাকে সময়ের সেই সন্ধিক্ষণে? তাহলে কিসের ধারাবাহিকতা আর কিসের বিদারণ?

আজ মনে হয়, বিদারণের মত মনে হলেও তথাকথিত কল্যাণকারী অর্থনীতি/মিশ্র অর্থনীতি থেকে নব-উদারবাদী অর্থনীতিতে সংক্রমণ এক্কেবারে সহজ, সরল ধারাবাহিকতা। আমাদের এই ধারাবাহিকতা বুঝতে অসুবিধে হয় কেননা আমরা মধ্যশ্রেণির মানুষ। আমাদের কাজের জায়গায়, ঘরে, ভাবনাচিন্তায় যে আগ্রাসনগুলোর মোকাবিলা করতে হয়েছে বা হচ্ছে এখনও, অথবা যে আগ্রাসনগুলোর সাথে সমঝোতা করে নিয়েছি, সে আগ্রাসনগুলোতে নব্য-অর্থনীতির স্টিকার ঝুলছে ‘তার’ প্রযুক্তি হয়ে। যে নতুন সুবিধেগুলো ব্যাবহার করছি সে সুবিধেগুলোও প্রযুক্তিগত আর নব্য-অর্থনীতির স্টিকার লাগানো। যদি দেশের অর্থনীতির প্রত্যন্ত সীমায় দাঁড়ানো মানুষ হতাম – গরীব কৃষক, আদিবাসী - আমরাও বলতাম, “কই, কিছুই তো বদলালোনা এই সাতটি দশকে!” অর্থাৎ, ধারাবাহিকতাকে চিহ্নিত করতাম অনায়াসে। বস্তুত, ধারাবাহিকতা না বিদারণ এই প্রশ্নটাই মধ্যশ্রেণিগত। 

তবুও, বিদারণ একটা আছে। এবং সেটা প্রযুক্তিতেই আছে। আবার এটাও সত্য যে প্রধানতঃ মধ্যশ্রেণির জীবনেই আছে। জীবনযাপনের যে দিকগুলো গুণগত ভাবে বদলেছে, তা প্রযুক্তির জন্য বদলেছে। এবং সেটা যে সে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়। একটা নতুন সাংস্কৃতিক সামাজিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দেশ (স্পেস অর্থে) ও কালগত বোধ, নতুন ভাষা, নতুন দিনযাপন আর সেগুলোকে নিয়ে এগিয়ে চলার নতুন প্রজন্ম... সব তৈরি করেছে ওই নতুন প্রযুক্তি। তারই সাথে এটাও তথ্য যে নব্য-অর্থনীতি ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তুলেছে এই মধ্যশ্রেণির শক্তি ও কন্ঠস্বর। বাকি শ্রমজীবীশ্রেণিগুলোর শক্তি ও কন্ঠস্বর দাবিয়ে রাখার জন্য।

সভ্যতা ও সংস্কৃতির অবক্ষয়ের মুখ কি কখনও জীবনের উৎসবের মত হতে পারে? না, পারেনা, কিন্তু মনে হতে পারে, মনে হয় কেননা আমরা, মানে মধ্যশ্রেণির মানুষেরা ‘ধারাবাহিকতা না বিদারণ’ এই প্রশ্নের ধাঁধায় এখনও ঘুরছি। এখনও মনে করছি যে নব্য-অর্থনীতিরই ফলশ্রুতি নতুন প্রযুক্তি।

৩

মার্ক্স এবং এঙ্গেলস বেশ কয়েকবার ইতিহাসের প্রসঙ্গে দেখিয়েছেন যে বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানকে তাৎক্ষণিক ভাবে পরাজিত এবং রক্তক্ষরণে নিস্তেজ করতে পারলেও শাসক শ্রেণী সেই অভ্যুত্থানের বাস্তব উপাদানগুলোকে নিশ্চিহ্ন বা অবলুপ্ত করতে পারেনা। বাধ্যতায় বিজয়ী শক্তি বরং ওই উপাদানগুলোকে স্বায়ত্ত করে নেয়; নিজের শ্রেণীস্বার্থ বজায় রেখে অবশ্যই। এংগেলস দৃষ্টান্তস্বরূপ দেখিয়েছেন, যীশুখ্রিষ্টকে ক্রুশে বিদ্ধ করার কয়েক বছরের মধ্যে রোম সাম্রাজ্যের রাজকীয় ধর্মে রূপান্তরিত হয়েছিল খ্রিষ্টধর্ম। প্রুশিয় রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ও জার্মান একতার সপক্ষে সবচেয়ে সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে সোচ্চার সামাজিক-গণতন্ত্রবাদী আর সমাজবাদীদের নিকেশ করতে সমাজবাদী-বিরোধী আইন বলবৎ করা বিসমার্ক সরকারকে নিজের হাতে (অবশ্যই নিজেদের শ্রেণিস্বার্থের মত করে) জার্মান একতা আনতে হয়েছিল এবং প্রুশিয় রাজতন্ত্রের অধিকার খর্ব করতে হয়েছিল।

ভারতে ১৮৫৭র স্বাধীনতা সংগ্রামকে পরাজিত করল কম্পানির শাসন। কিন্তু করা মাত্র কম্পানিকে সরিয়ে সংসদীয় ব্রিটেন নিজে শাসক হল - যেমন নাকি দাবি উঠত অনেক মহলেই, যে রাণির ‘ন্যায়পরায়ণ শাসন’ ভারতের মানুষেরা কম্পানির জন্য পাচ্ছেনা! পেল। কিন্তু কেমন রূপে পেল? যেমন, কম্পানিও হতে পারেনি। সেই একই ক্যানিং সাহেব যিনি নিজের কম্পানি-কালীন রাজত্বে শেষ ভারতীয় সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে রেঙ্গুনের জেলে পচিয়ে দিলেন, রাণি-কালীন রাজত্বে ভাইসরয় বা বড়লাটের মুকুট পরে ভারতের ‘সর্বকালের শ্রেষ্ঠ’ সম্রাট হওয়ার চেষ্টা শুরু করে দিলেন। কাজ তো পরে, রূপটা আসল। ইংল্যান্ডে নিজের সতীর্থকে চিঠি লিখে জানালেন যে সম্রাট সেজে থাকার এই “হামবাগ”টাকে (বাংলা অর্থে ধাপ্পাবাজিটাকে) জিইয়ে রাখা সবচেয়ে বেশি জরুরি। আর কাজের ক্ষেত্রে? যে হাত দিয়ে ঝাঁসির রাণি, বাবু কুঁওর সিং এবং বিদ্রোহের অন্য অনেক সামন্ততান্ত্রিক নেতাদের মারলেন, সেই হাত দিয়েই দেশের সামন্ততান্ত্রিক শক্তিকে নানারকম ভাবে তুষ্ট করে (ডালহাউসির নীতিগুলো বাতিল করে) নিজের ‘দরবারের’ অঙ্গীভূত করে নিলেন। হাজার হাজার বিদ্রোহী সেপাইকে হত্যা করালেন কিন্তু কম্পানির সেনার জায়গায় ভারতীয় সেনা তৈরি হওয়ায় বেতন-সম্পর্কিত অসন্তোষের অনেকটা মিটে গেল (টোটার কাগজ দাঁত দিয়ে ছেঁড়ার সমস্যাটা আগেই মনে হয় মিটে গিয়েছিল)।

অথচ আবার, নতুন রেজিমেন্ট গঠনে ও নামকরণে জাতিবিভেদ ও জাতের অহঙ্কার উস্কে দেওয়া হলেও, নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে যোদ্ধা-জাতি আর অযোদ্ধা-জাতির ধারণা আসাতে, সামাজিকভাবে পশ্চাৎপদ জাত ও পাহাড়ি জাতিগুলি থেকে নিযুক্ত সেপাইদের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেল। আর, সতীপ্রথা-বিরোধী আইন বা বিধবাবিবাহ আইনের মত করে সমাজ ও ধর্মের ক্ষেত্রে কখনও হস্তক্ষেপ করা হবে না বলে ধর্মের ধ্বজাধারীদের আশ্বস্ত করলেও, অন্যদিকে নিয়ে আসা হল ভারতীয় দন্ডবিধি, ভারতীয় উচ্চ আদালত বিধি, ভারতীয় পুলিস বিধি।

অর্থাৎ, বিদ্রোহের অব্যবহিত উপাদানগুলোকে ব্রিটিশ শাসন নিজের ঔপনিবেশিক স্বার্থে স্বায়ত্ব তো করলই, যে উপাদানগুলো অব্যবহিত নয়, সেই মুহুর্তে বিদ্রোহের কারণও ছিল না কিন্তু অসন্তোষের জায়গা তৈরি করছিল, সেগুলোকেও স্বায়ত্ব করল। যীশুখ্রিষ্টের ধর্ম রোম সাম্রাজ্যের ধর্ম হয়ে উঠল, একত্রিত জার্মানি বিসমার্কের অবদান হল। কিন্তু এখানে খোদ ঔপনিবেশিক শক্তিটাই যেহেতু পূঁজিতন্ত্র ও রাজতন্ত্রের মধ্যে একটা সমঝোতা, তার দ্বন্দ্বগুলো এদেশের বিদ্রোহ-প্রশমনের কর্মপদ্ধতিতে মাঝেমধ্যে কিছু বিপরীতধর্মী চরিত্র গ্রহণ করল।

ইতিহাস লেখার ধৃষ্টতা আমি করব না। অনেক প্রসঙ্গ অনুল্লিখিত থাকায় একটা ভূল অর্থ গৃহীত হবে। আমি শুধু বলতে চাইছি যে বৈপ্লবিক শক্তিকে পরাজিত করে প্রতিক্রিয়া বৈপ্লবিক উপাদানগুলোকে স্বায়ত্ত করতে চায় – শাসন বজায় রাখার স্বার্থে নিজেকেই বৈপ্লবিক দেখাতে চায়। জীবন্ত উপাদানগুলোকে মৃত সাজ বানিয়ে পরে নেয়। কিন্তু ওগুলো তো মৃত নয়। যেটা মুকুট হিসেবে পরল তার ভিতরে হয়ত শুঁড়গুলো খুলছে ধীরে ধীরে। যেটা গলার মালা হিসেবে পরল সেটা হয়ত খোলস বদলাচ্ছে। ... কাজেই সময় হলে সেই উপাদানগুলোই নতুন শক্তি খুঁজে নেয়, যে শক্তি তাদের যথার্থ রূপে কাজে লাগাবে।

এই ধরণের কোনো পরিস্থিতির বিশ্লেষণেই কি গ্রামশির পরোক্ষ বিপ্লবের তত্ত্ব কাজে লাগে? হতে পারে। তবে আপাততঃ ওদিকে যেতে চাই না। আমি শুধু দেখতে চাইছি যে প্রতিবিপ্লবের জয়ে যখন অবক্ষয়ী সংস্কৃতি গেড়ে বসে, কিন্তু গেড়ে বসার জন্য সমাজে বদলের সম্ভাবনার অনেক উপাদান নিজের স্বার্থে, নিজের মত করে বিকশিত করে, সেই উপাদানগুলোকে চিহ্নিত করা যায় কিনা, তার মধ্যেকার ইতিবাচক সারটা বার করে নিজেদের কাজে লাগান যায় কিনা। আর সেটা করতে গেলে, অবক্ষয়ের মুখটা ভালো করে দেখতে হবে। শিল্প ও সাহিত্যের প্রত্যেকটা রূপে গত তিরিশ বছরের যাত্রাপথে খুঁজতে হবে সাধারণ মানুষের মুখ।  

এ কাজটা আমার একার পক্ষে সম্ভবই না। শিল্পের বিভিন্ন রূপে যারা কাজ করছেন তাদেরকে করতে হবে। গানওলাকে গানের পথ, ফিল্মওলাকে ফিল্মের পথ, নাটকওলাকে নাটকের পথ, নাচওলাকে নাচের পথ, ছবিওলাকে ছবির পথ, কবিতাওলা-গল্পওলা-উপন্যাসওলাদেরকে তাদের কাজের পথ ... শেষ নেই।

কিন্তু করা উচিত, আমার মনে হয়। নতুন কারিগরী বদলে দিচ্ছে ধরণধারণ। আমি বই পড়তে ভালোবেসে এসেছি এই সেদিন অব্দি ... এখন বই কম, পিডিএফ, ইপাব বা কিন্ডল সংস্করণ পড়ি। কিন্তু পড়িই। শুনি না। আমার ছেলে, শুনতে ভালোবাসে। অডিও বুক ওর বেশি ভালো লাগে। এটা কি শুধুই রূপের বদল? পড়তে ভালো লাগা উপন্যাস, গল্প, কবিতা বা প্রবন্ধ,  আর শুনতে ভালো উপন্যাস, গল্প, কবিতা বা প্রবন্ধ প্রথম দিকে একই থাকলেও ধীরে ধীরে কি বদলে যাবে না? শব্দছবির গঠন, ঘটনার বিন্যাস, পর্বের ভাগ ... সবেতেই এর প্রভাব পড়বে না কি? গানের ধরণগুলো দেখুন! কত রকমের বদল এসেছে গত তিরিশ বছরে! যারা মানুষের মাঝে কাজ করছেন, সমাজবদলের লড়াইয়ে ব্যাপৃত আছেন, তাঁরা বুঝতেও পারছেন সেটা – তাঁদেরও নতুন গানের রচনারীতি, সুর, গায়কীতে প্রভাব পড়ছে সেই বদলের। তাঁরা অনেকেই বুঝতে পারছেন, পুরোনো দিনের কালজয়ী গণসঙ্গীতের রোমাঞ্চ কম না হলেও, নতুন গান নতুন ভাবে ভাবতে হবে। গত এক বছরের দুটো ভারতবিখ্যাত হিন্দী গানের কথাই ধরুননা – “কাগজ নহি দিখায়েঙ্গে” আর “সবকুছ ইয়াদ রখা জায়েগা” । ইপ্টার বা সফদরের জনমএর হিন্দী গান থেকে আলাদা নয়? আসামের মিয়াঁ কবিতার অভিব্যক্তি ভিন্ন নয়? ফিল্ম, ছবি ... সবেতেই শ্রেণীযুদ্ধ নতুন উপাদান নিচ্ছে ওই অবক্ষয়ী সংস্কৃতির মধ্যে থেকেই এবং লড়াইটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, ম্যাপিং নেই। একটা বিশ্লেষণাত্মক ইতিহাস নেই যেটা জানলে গ্রহণ-বর্জন করতে সুবিধে হয়।

নাচটাই ধরুন না। স্টেজে উঠে একক শিল্পী বা শিল্পীগোষ্ঠির শাস্ত্রীয় নৃত্যের কথা বলছি না। সামাজিক জীবনে অন্ততঃ বাৎসরিক একটা নাচের দিনের কথা বলছি, যেদিন সবাই নাচবে। ঔপনিবেশিক নগরায়ণ সারা ভারতেই নাচ-বর্জিত রূপে হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি হয়েছে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির এলাকাগুলোয়। পাঞ্জাবি, গুজরাতি, রাজস্থানি, অসমিয়া শহরগুলোর সমাজজীবনে নাচ আছে। বাংলায়, বিহারে এবং আরো কিছু এলাকার শহরে নেই। অথচ নাচ আছে। ক্লাবে ইয়োরোপীয় নাচ আছে। ভাসানের ট্রাকে বা পুজো প্যান্ডালে বলিউডি নাচের অক্ষম, হাস্যকর নকল আছে, মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের জনান্তিকে ঘরে কোমর দোলানো আছে। যাঁরা শিল্পটা জানেন, শরীর সেভাবে তৈরি তাদের কথা বলছি না। সামূহিকতার কথা বলছি – যেমন দুপুরে-রাত্রে সবাই খাবে, তেমনই সন্ধ্যায় সবাই নাচবে। সংস্কৃতির অঙ্গ হবে সেটা। সংস্কৃতির অঙ্গ ছিল না বলেই কিন্তু তিরিশ বছরে নতুন প্রজন্মে বলিউড ধরছে, আফ্রিকা ধরছে, জুম্বা, এরোবিক্স করছে কিন্তু আমরা আমাদের নাচ নিয়ে কোনো ভাবনাচন্তাই করিনি।মএই সেদিনই আমি আমার এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম যে যুবসংগঠনগুলোর অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে কি নাচ নিয়ে ওরা ভাবছে? এই যেমন ধরুন, দুপুরে বা সন্ধ্যায় সবার একসাথে নাচ? ফর্মটা ঝুমুর থেকে নেওয়া যায়। বা তিনচারটে ফর্ম থেকে সংশ্লেষিত করা যায়?

অর্থাৎ গত তিরিশ বছরের অবক্ষয়ী পথের একটা ক্যারেক্টার ম্যাপিং করে তা থেকে নিজেদের সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের রূপগুলো নিয়ে নতুনভাবে চিন্তাভাবনার কথা বলছি। 



Wednesday, January 13, 2021

মার্ক্সবাদ ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস - দুটো আবিষ্কারের প্রসঙ্গ

 মার্ক্সবাদকে মার্ক্সবাদ-এঙ্গেলসবাদ বলি না কেন? বা আরো স্পষ্ট করলে, যদি এই নতুন বিশ্বদৃষ্টিকে পরবর্তি কালে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ বলে অভিহিত করতে পারি, তাহলে মার্ক্সবাদ-এঙ্গেলসবাদ বলতেই বা বাধা কোথায়? এঙ্গেলস বলতে মানা করেছিলেন কেন? নিপাট ভালোমানুষি বা উদারমনা সৌজন্যের খাতিরে, না কঠোর বস্তুবাদী বৈজ্ঞানিক ছিলেন বলে? অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা না বলা যেমন ভালোমানুষি নয়, অযৌক্তিক উদারতাও তো ভালোমানুষি নয়। সাময়িকভাবে ভয় হতে পারে। তা এঙ্গেলস ভয় পাবেন কাকে?

উদারমনা তো উনি নিশ্চয়ই ছিলেন। বিনয়ীও ছিলেন। সবসময় নিজেকে ‘সেকন্ড ফিড্‌ল’ বলতেন, যা নাকি উনি ছিলেন না। মার্ক্সের জীবনকালেও (যাতে ম্যাঞ্চেস্টারের মিলে কেরানিগিরির আঠেরো বছর শামিল আছে) এঙ্গেলস বৈজ্ঞানিক সমাজবাদী ভাবনার বিকাশে সমান ভূমিকায় ছিলেন আর মার্ক্সের মৃত্যুর পর বারো বছর তো একা এঙ্গেলসই ছিলেন।

বিপ্লবী সক্রিয়তায় (লেখা ছাড়াও) এঙ্গেলসের ভূমিকা তো বিস্ময়কর। এক নজরে দেখলেঃ

·        কলোনে, পাশে বন্দুক রেখে ন্যু রাইনিশে জাইটুঙের সম্পাদকীয় দপ্তর সামলানো;

·        বিপ্লবী সামরিক অভ্যুত্থানে এলবারফেল্ডে, ব্যাডেন-প্যালেটিনেটে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া;

·        ১৮৫০শে লন্ডনে পলাতক জার্মান রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য ‘ধর্মশালা’ (ইংরেজি অর্থে রাতে শোবার জায়গা) চালানো, খাবারের জন্য ‘লংগর’ চালানো (মানে চাঁদা তুলে খাওয়ার ব্যবস্থা করা) আর ওদের রোজগারের ব্যবস্থা করা;

·        ম্যাঞ্চেস্টারে বসে মার্ক্সের নামে লাগাতার ন্যুয়র্ক ডেলি ট্রিবিউনে সংবাদ-প্রতিবেদন লিখে যাওয়া যাতে মার্ক্সের কিছু আয় হয়;

·        তারই সাথে মিলের কেরাণিগিরির ফাঁকে ফাঁকে নিজের নামেও বিভিন্ন পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখা যাতে সে আয় আরেকটু বাড়ে;

·        প্যারিস কমিউনের পরাজয়ের পর পলাতক কম্যুনার্ডদের সাহায্য সংগ্রহ অভিযান চালানো;

·        প্রথম আন্তর্জাতিকের সচিব হিসেবে ইটালিতে, স্পেনে ও আরো বিভিন্ন দেশে সংগঠন গড়ে তোলার কাজে ব্যাপৃত থাকা হোক (কেননা ওনার ভাষাজ্ঞানের কথা মনে রেখেই ওনাকে আনুষ্ঠানিক ভাবে তিনটে দেশের ভার দেওয়া হয়েছিল, বাকি উনি নিজের তাগিদে বাড়িয়ে ছিলেন);

... এক কথায় এঙ্গেলসের জবাব নেই।

আর তাত্ত্বিক লেখা!

·        মার্ক্সের সাথে যুক্তভাবে লেখা বইগুলোয় – হোলি ফ্যামিলি, জার্মান আইডিওলজি, কম্যুনিস্ট ইস্তাহার ইত্যাদি – এঙ্গেলস আর মার্ক্সের ভূমিকা সমান।

·        সমাজবদলের লক্ষ্যে একই বৈপ্লবিক শ্রেণির কাছে দুজনে দুদিক থেকে পৌঁছেছিলেন – মার্ক্স দর্শনের দিক থেকে আর এঙ্গেলস সমসাময়িক ইতিহাসের দিক থেকে।

·        মার্ক্সকে অর্থনীতি বুঝবার তাগিদটা ধরিয়ে দিয়েছিলেন এঙ্গেলসই, তাঁর প্রবন্ধের মাধ্যমে; মার্ক্স নিজেই বলেন যে প্রধান অর্থনৈতিক পারিভাষিক শব্দগুলো এঙ্গেলসই ধরিয়ে দিয়েছেন।

·        বিজ্ঞানে আর নৃতত্বে বস্তুবাদী দ্বান্দিকতার প্রয়োগে এঙ্গেলস তো বিংশশতাব্দির প্রথম থেকেই রেফারেন্স-পয়েন্ট। সহজবোধ্য বৈজ্ঞানিক সমাজবাদে এখনো তাঁর পুস্তিকাগুলো প্রচারপত্রের মত চলে।

·        বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বান্দিকতার প্রয়োগে এখনো এ্যান্টি-ডুহরিঙ ঝালিয়ে নিতে ফিরে যায় মানুষ।

·        আর সর্বহারা বিপ্লবে কৃষকের ভূমিকা বোঝাতে খোদ লেনিন, প্যারিস যাওয়ার পথে এঙ্গেলসের উদ্ধৃতি চিরকুটে লিখে পকেটে রেখে নেন। সেই ‘জার্মানিতে কৃষকযুদ্ধ’ লেখার সময় থেকে বার বার এঙ্গেলসই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে কৃষক, প্রান্তিক কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের ভূমিকা চিহ্নিত করে গেছেন। শ্রেণী-বিভেদিকরণের অর্থনৈতিক পটভূমিতে বুঝিয়ে গেছেন সর্বহারার বন্ধু হিসেবে কে কোন জায়গায় অবস্থান নেবে।

·        জাতীয়তার প্রশ্ন বনাম বিজয়ী জাতির সাম্রাজ্যবাদী অভীপ্সার দ্বন্দ্ব বুঝতে মার্ক্স দৌড়ে গেছেন এঙ্গেলসের কাছে কেননা ইওরোপের যুদ্ধের মোর্চাগুলোর মানচিত্র এঙ্গেলসের করতলে আঁকা থাকতো।

·        মার্ক্সের পূঁজির প্রথম খন্ড পুরোই হত না যদি এঙ্গেলস তাঁর সংসার চালাবার ভার না নিতেন।

·        দ্বিতীয় খন্ড প্রকাশিত হতনা আর তৃতীয় খন্ড ‘হিয়েরোগ্লিফিক্স’ থেকে যেত যদি এঙ্গেলসে নিজের সব কাজ ছেড়ে ওই দুটো খন্ড নিয়ে জীবনের শেষ বারো বছর কাটিয়ে না দিতেন।

সেদিক থেকে উনবিংশ শতকের বৈজ্ঞানিক সমাজবাদ নিশ্চয়ই মার্ক্সবাদ-এঙ্গেলসবাদ।

কিন্তু দুটো তত্ত্ব; গুরুত্বপূর্ণ দুটো তত্ত্ব, সম্পূর্ণরূপে মার্ক্সের আবিষ্কার ছিল। সে দুটো আবিষ্কারের কথা মনে রেখেই এঙ্গেলস ভবিষ্যত প্রজন্মকে বলে গেছেন যেন ভাবধারা হিসেবে ওটাকে মার্ক্সবাদ বলা হয়।

নতুন কথা নয়। এঙ্গেলস নিজেই ওই দুটো তত্ত্বের আবিষ্কারে মার্ক্সের ভূমিকার কথা বলে গেছেন। প্রথম বললেন মার্ক্সের সমাধিতে দাঁড়িয়ে। বিখ্যাত সেই ভাষণ। পৃথিবীর অনেক ভাষায় এবং বাংলায়ও অনুদিত, বহুপঠিত। ১৮৮৩ সালের ১৭ই মার্চ লন্ডনের হাইগেট গোরস্তানে নিজের বন্ধুর সমাধিস্থলে দাঁড়িয়ে এঙ্গেলস বললেন (ইংরেজিতেই বললেন, যদিও দুজনেই জার্মান এবং যে কজন এসেছিলেন তাঁদের মধ্যেও ইংরেজ কম, ফরাসী দুই জামাই ছাড়া বাকিরা জার্মান), “ডারউইন যেমন জৈব প্রকৃতির বিকাশের নিয়ম আবিষ্কার করেছিলেন তেমনি মার্ক্স আবিষ্কার করেছেন মানুষের ইতিহাসের বিকাশের নিয়ম, ...”

এই নিয়মপ্রসঙ্গে এঙ্গেলস এরপর বললেন ‘মতাদর্শের অতি নিচে এতদিন লুকিয়ে রাখা ... সহজ সত্য যে রাজনীতি, বিজ্ঞান, কলা, ধর্ম ইত্যাদি চর্চা করতে পারার আগে মানুষের প্রথম চাই খাদ্য, পানীয়, আশ্রয়, পরিচ্ছদ, সুতরাং ...”। গোরস্তানের ভাষণে কথাটাকে তার অন্তিম ফলশ্রুতি – বৈপ্লবিক সক্রিয়তার সুচিমুখে ঘুরিয়ে দেওয়াটাই যথার্থ ছিল।

দ্বিতীয়বার, যখন মার্ক্সের মৃত্যুর পাঁচ বছর পর এঙ্গেলস একাই নিজের স্বাক্ষরে, কম্যুনিস্ট ইশ্তাহারের ইংরেজি সংস্করণের ভূমিকা লিখলেন তখন আবার বললেন, “১৮৪৫ সালের আগেকার কয়েক বছর ধরে আমরা দুজনেই ধীরে ধীরে এই সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে চলেছিলাম। স্বতন্ত্রভাবে আমি কতটা এদিকে অগ্রসর হয়েছিলাম তার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন আমার ‘ইংলন্ডে শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা’ বইখানি। কিন্তু যখন ১৮৪৫ সালের বসন্তকালে ব্রাসেল্‌স্‌ শহরে মার্ক্সের সঙ্গে আমার আবার দেখা হল, তখন মার্ক্স ইতিমধ্যে সিদ্ধান্তে পৌঁছে গিয়েছেন।”

কী সেই সিদ্ধান্ত? তা আমরা জানি। কিন্তু তার মূলে কী ছিল, যা মার্ক্স ব্রাসেল্‌সে এঙ্গেলসকে বলেছিলেন এবং সম্ভবতঃ লিখিত রূপটা পড়িয়েও ছিলেন?

এঙ্গেলস সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলেন ‘ইংলন্ডে শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা’র খসড়া পান্ডুলিপি (যেটাকে তিনি সেখান থেকে বারমেনে গিয়ে বাড়িতে বসে পরিমার্জন করলেন)। আর মার্ক্সের সাথে ছিল অনেক পান্ডুলিপির খসড়া। ওই পান্ডুলিপিগুলোর যা কিছু পরে পাওয়া গিয়েছে সেগুলো একসাথে ‘১৮৪৪এর আর্থিক ও দার্শনিক পান্ডুলিপিগুলি’ নামে সোভিয়েত সঙ্ঘ থেকে বেরিয়েছে। শুধু চারটে পৃষ্ঠা আলাদা করে এঙ্গেলস প্রকাশ করেছিলেন ১৮৮৮ সালে – ‘লুডউইগ ফায়ারবাখ এবং জার্মান ধ্রুপদী দর্শনের সমাপ্তি’ নামের পুস্তিকাটির সাথে – ‘থিসিস অন ফায়ারবাখ’ বা ‘ফয়েরবাখ সম্বন্ধে থিসিসসমূহ’, যা আজ বিশ্ববন্দিত এগারটি সুত্র। এই সুত্রগুলোর প্রথমটাই ছিল সেই সিদ্ধান্তের মূলকথা যাকে আমরা বলতে পারি প্রতীতির দ্বান্দিকতা (ডায়ালেক্টিক অফ কগনিশন)।

১। প্রতীতির দ্বান্দিকতা (ডায়ালেক্টিক অফ কগনিশন)

আরেকবার পড়ে নেওয়া যাক প্রথম থিসিসটা।

“পূর্ববর্তী সমস্ত বস্তুবাদের – এবং ফয়েরবাখের বস্তুবাদও তার অন্তর্ভুক্ত – প্রধান দোষ এই যে, তাতে বস্তু (gegenstand), বাস্তবতা বা সংবেদ্যতাকে কেবল বিষয় (object) রূপে বা ধ্যান রূপে ধরা হয়েছে, মানবিক সংবেদনগত ক্রিয়া হিসাবে, ব্যবহারিক কর্ম হিসাবে দেখা হয়নি, কর্তার দিক থেকে (subjectively) দেখা হয় নি। ফলে বস্তুবাদের বিপরীতে সক্রিয় দিকটি বিকশিত করেছে ভাববাদ, কিন্তু তা কেবল অমূর্তভাবে, কেননা অবশ্যই ভাববাদ বাস্তব সংবেদনগত ক্রিয়া ঠিক যা সেই ভাবে তাকে জানে না। ...  ”

‘বাস্তবতা বা সংবেদ্যতাকে কেবল বিষয় রূপে বা ধ্যান রূপে’ ধরায়, ‘মানবিক সংবেদনগত ক্রিয়া হিসাবে, ব্যবহারিক কর্ম হিসাবে’ না দেখায়, কর্তার দিক থেকে’ না দেখায় ‘পূর্ববর্তী সমস্ত বস্তুবাদের’ কী ক্ষতি হয়েছে? ক্ষতি এই হয়েছে যে তারা মানুষের ইতিহাসটাই দেখতে পায়না তো সৃষ্টিকে বুঝবে কি করে। কাঠের গুঁড়িটাকে বলবে বাস্তবতা, কাঠের তৈরি টেবিলটাকে বলবে বাস্তবতা অথচ যে ছুতোর মিস্ত্রি টেবিলটা তৈরি করল তার শ্রমটাকে বাস্তবতায় গণ্য করবে না? আর যদি তার শ্রমটাকে বাস্তবতার মধ্যে গণ্য কর, তাহলে মনে রাখবে তার কাজের দুটো মুহূর্ত আছে। প্রথমে সে মাথায় টেবিলটার একটা খসড়া ছবি আঁকে তারপর কাঠের গুঁড়িতে হাত লাগায়; হাত লাগানোর পর্বে পর্বে সে বোঝে কাঠের দাঢ়্য, স্থিতিস্থাপকতা, ভেজা আর শুকনোর তফাত, রেশার মজবুতি, গাঁটের অসুবিধে অর্থাৎ প্রতীতির বিভিন্ন দিক। গুঁড়িতে হাত লাগানোর পর তার শ্রমের বাস্তবিকতা শুরু হয় না মাথায় ছবি আঁকার প্রারম্ভ থেকে? আর যদি মাথার ছবিটাও বাস্তবিকতা হয় তাহলে কাঠের প্রতীতি হল একটা দ্বান্দিক গতি – বিষয় থেকে বিষয়ীতে আবার বিষয়ী থেকে বিষয়ে – এই শ্রমের প্রক্রিয়াতেই আমরা বিপরীত – বস্তু ও চিত্তের, ম্যাটার আর মাইন্ডের ঐক্য ও সংঘর্ষ পাচ্ছি না কি? ... মানুষের পুরো প্রাগিতিহাস ও ইতিহাস তো এই দ্বন্দ্বের ওপর দাঁড়িয়ে! আর এটাকেই যদি বাস্তবিকতার মধ্যে গণ্য না করি তাহলে ইতিহাসটা দেখবই বা কিভাবে?

স্বাভাবিক ভাবেই সে দায়িত্বটা লুফে নেবে ভাববাদ। সে মানবশ্রমের পুরো বাস্তবিকতাটাকে ঈশ্বরীয় শ্রমের সত্যতা হিসাবে উপস্থাপিত করবে। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের মাথায় তৈরি হচ্ছে এই জগতের ছবি আর তাকে তিনি পর্বে পর্বে এক্সটার্নালাইজ বা বহির্স্থাপন করছেন!

এটাকে আমরা প্রতীতির দ্বান্দ্বিকতাও বলতে পারি অথবা প্রতীতির শ্রমতত্ত্বও বলতে পারি।

এই প্রসঙ্গে ‘পূঁজি’ প্রথম খন্ডের অধ্যায় ৭ থেকে একটু দীর্ঘ উদ্ধৃতি দেওয়ার লোভ সামলাতে পারছিনা।

“প্রথমত, শ্রম এমন একটি প্রক্রিয়া যাতে মানুষ ও প্রকৃতি উভয়েই অংশগ্রহণ করে এবং মানুষ নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী প্রকৃতি ও তার নিজের মধ্যে বৈষয়িক ঘাত-প্রতিঘাতগুলি সূচনা, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করে। ... এইভাবে সক্রিয় হয়ে বাহ্যজগতের সাথে ঘাত-প্রতিঘাতে তাকে পরিবর্তিত করে একই সঙ্গে সে নিজের প্রকৃতিও বদলায়। ... শ্রমের যেসব রূপ আমাদের কেবল পশুর কথাই মনে করিয়ে দেয় সেই আদিম সহজাত-প্রবৃত্তিমূলক রূপগুলি নিয়ে এখন আমরা আলোচনা করছিনা। ... শ্রমকে আমরা পূর্বানুমান করে নিই এমন একটা রূপে যা তাকে একান্তভাবেই মানবিক বলে চিহ্নিত করে। মাকড়সা যে প্রক্রিয়ায় কাজ করে তার সঙ্গে তাঁতীর কাজের সাদৃশ্য আছে, এবং মৌমাছি তার মৌচাক নির্মাণের কারিগরিতে অনেক স্থপতিকেই লজ্জা দেয়। কিন্তু সর্বশ্রেষ্ঠ মৌমাছির থেকেও সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্থপতির তফাৎ এখানেই যে স্থপতি প্রথমে কল্পনায় তার ইমারত তোলে তারপর বাস্তবে সেটিকে গড়ে তোলে।

 অর্থাৎ, রবিঠাকুরের সেই গানটাই একটু উল্টোভাবে – “আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবেনা/ এই জানারই সঙ্গে সঙ্গে তোমায় চেনা”র বদলে তোমায় জানা আমার ফুরাবে না/ সেই জানারই সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে চেনা ...।

এই অংশ শেষ করার আগে হাল্কা ভাবে বলতে পারি যে ইতিহাস তো দূরের কথা, ছুটির দিনগুলোয় দেশেবিদেশে যেসব জায়গায় গিয়ে ভদ্রসমুদায় বিস্ময়ে চেঁচিয়ে ওঠেন ‘ভার্জিন ফরেস্ট’ বা ‘প্রিস্টাইন নেচার’, তার প্রায় সত্তর প্রতিশত কিন্তু মানবশ্রমের ফসল, সরকারি, বেসরকারি, সামুদায়িক বা ব্যক্তিগত উদ্যমে বনসৃজন।  

প্রতীতির দ্বান্দ্বিকতার উন্মোচন করে বস্তুবাদকে দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক করলেন মার্ক্স। এঙ্গেলসও সে জায়গাতেই পৌঁছোচ্ছিলেন, তবে মার্ক্স যেহেতু দর্শনের ও বিশেষ করে হেগেলীয় দর্শনের বিধিবৎ ছাত্র ছিলেন তাই তৎকালীন বস্তুবাদী দার্শনিক পরিভাষাবলির ঠিক সেই হেত্বাভাষে আঘাত করতে পেরেছিলেন যার কারণে বস্তুবাদ বিফলে যাচ্ছিল আর ভাববাদ জয়ী হচ্ছিল বার বার।

এঙ্গেলস বঞ্চিত থেকেছিলেন এই শিক্ষায়, তাঁর পরিবারের ও বিশেষ করে পিতার জন্য। তাই নিজেকে শিক্ষিত করে তুলতে তাঁর সংগ্রাম এক অনুকরণীয় অধ্যায় হল পরবর্তী অনেকের যৌবনে। লরেন্স উইশার্ট প্রকাশিত মার্ক্স-এঙ্গেলস রচনাসমগ্রের দ্বিতীয় খন্ডের সম্পাদকীয় বক্তব্য বলছেঃ-

“এঙ্গেলসের পক্ষে অবশ্য প্রগতিশীল দর্শনপথে পৌঁছোন মার্ক্স থেকে অনেক বেশি কঠিন ছিল। বারমেনের এক রক্ষণশীল এবং ধার্মিক পরিবারে তাঁর জন্ম হয়েছিল। পিতা তাঁকে স্কুল ছাড়তে আর ব্যবসা ধরতে বাধ্য করেছিলেন। অর্থাৎ, সমসাময়িক ধার্মিক, দার্শনিক, রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক প্রবৃত্তিগুলোর গোলকধাঁধার ভিতরে প্রবেশ করে নিজের রাস্তা খুঁজে বার করতে তাঁকে নিজের শিক্ষা স্বাধীনভাবে পুরো করতে হয়েছিল। এই পথে চলতে গিয়ে ছোটোবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ধর্মবিশ্বাসের ওপরে ওঠার একটা কষ্টদায়ক আত্মানুসন্ধান পোষিত হয়েছিল। প্রধানত, ধর্ম ও ঈশ্বরতত্ত্বের সমালোচনাত্মক বিশ্লেষণই এঙ্গেলসকে প্রগতিশীল দার্শনিক ভাবনার দিকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। সাহিত্যেরও এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর বিকাশে, বিশেষ করে শুরুর বছরগুলোয়।”

বার্লিন থেকে ড্রেসডেনে আর্নল্ড রুজকে লেখা তাঁর চিঠিটা পড়লে কষ্ট হয়। ডয়েশ জাহ্রবুখের  পত্রিকায় পরের লেখাটা পাঠানোর ছিল। পাঠালেন না। লিখলেনঃ

“মহাশয়, শুধু একথাটুকু জানাতে লিখছি যে আপনাকে আর কিছু আমি পাঠাব না। কিছুদিনের জন্য আমি আমার সব সাহিত্যিক কাজ ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি যাতে লেখাপড়ায় বেশি সময় দিতে পারি। কারণটা খুব সহজ। আমি যুবক এবং দর্শনে স্বশিক্ষিত। নিজের দৃষ্টিভঙ্গী তৈরি করতে বা সেই দৃষ্টিভঙ্গীটাকে রক্ষা করতে এটুকু শিক্ষা পর্যাপ্ত। কিন্তু ওই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে ঠিক ভাবে ও সফল ভাবে কোনো কাজ করার জন্য নয়। আর আমার কাছ থেকে তো লোকে একটু বেশিই আশা করবে কেননা দর্শনে আমি ‘ট্র্যাভেলিং এজেন্ট’। ডক্টরেটের ডিগ্রি নিয়ে দার্শনিক চিন্তাভাবনা লিপিবদ্ধ করার অধিকার অর্জন করিনি। ...”

তবু, পঞ্চাশ-ষাটের দশকগুলোয় যদি তিনি মার্ক্সের সাথে বসে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে কাজ করার সুযোগ পেতেন!  সেই ১৮৪৫এ জুলাই-আগস্টে ম্যাঞ্চেস্টারে এক মাস যেমন কাটিয়েছিলেন মার্ক্সের সাথে! চ্যাটহ্যাম লাইব্রেরির একটা টেবিলের দুদিকে বসে দুজনে নিজের নিজের পড়া পড়ছেন, নোট নিচ্ছেন। হয়ে গেলে এর নোট ও পড়ছে এবং মার্জিনে নিজের মন্তব্য লিখছে! ... সেরকম হলে হয়ত এই দ্বিতীয় আবিষ্কারটা যৌথভাবেই হত।

কিন্তু সে সোনার দিন তো আর আসবে না আপাততঃ। পাগলা মূরটাকে, কাজ না করতে পারার জ্বালায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে তাঁকে, অর্থাৎ এঙ্গেলসকে এর্মেন এন্ড এঙ্গেলস কম্পানির মিলে কেরানিগিরি করতে হবে আঠেরো বছর!

কাজেই, দ্বিতীয় আবিষ্কারটাও মূর অর্থাৎ মার্ক্স একাই করলেন। এই আবিষ্কারটাকে আমরা বলতে পারি মূল্যের দ্বান্দ্বিকতা অথবা মূল্যের শ্রমতত্ত্ব।

(২) মূল্যের দ্বান্দ্বিকতা (ডায়ালেক্টিক অফ ভ্যালু)     

প্রতীতির দ্বান্দ্বিকতার কথা বলতে গিয়ে এঙ্গেলসের যে ভাষণ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম, ১৮৮৩ সালের ১৭ই মার্চ লন্ডনের হাইগেট গোরস্তানে নিজের বন্ধুর সমাধিস্থলে দেওয়া সেই ভাষণেই এঙ্গেলস এগিয়েছিলেন, “কিন্তু শুধু এই নয়। বর্তমান পূঁজিবাদী উৎপাদন-পদ্ধতির এবং এই পদ্ধতি যে বুর্জোয়া সমাজ সৃষ্টি করেছে তার গতির বিশেষ নিয়মটিও মার্ক্স আবিষ্কার করেন। যে সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে এতদিন পর্যন্ত সব বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ ও সমাজতন্ত্রী সমালোচক উভয়েরই অনুসন্ধান অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছিল, তার ওপর সহসা আলোকপাত হল উদ্বৃত্ত মূল্য আবিষ্কারের ফলে।”

এর সবকিছুই ‘পূঁজি’ প্রথম খন্ড মহাগ্রন্থের প্রথম একশো পাতা, যা সবাই বার বার পড়তে বলেন। সমীকরণটা মনে আছে? দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ, ‘পণ্যের মধ্যে মূর্ত শ্রমের দ্বৈত চরিত্র’। যদিও আমাদের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘মূল্যের দ্বান্দ্বিকতা’, তার আগে এই পরিচ্ছেদের প্রথম অনুচ্ছেদটা দেখি যেখানে মার্ক্স নিজেই বলেছেন পণ্যের ভিতরে শ্রমের দ্বৈত চরিত্রটি তিনিই প্রথম দেখিয়েছেন।

“প্রথম দৃষ্টিতে পণ্য আমাদের কাছে হাজির করেছিল দুটি জিনিষের এক সংমিশ্রণ – ব্যবহারমূল্যের এবং বিনিময়মূল্যের। পরে আমরা এও দেখেছি যে শ্রমেরও আছে দ্বৈত চরিত্র, মূল্যের ভিতর তার যে প্রকাশ ঘটে সেদিক থেকে তার চরিত্র আর ব্যবহারমূল্যের স্রষ্টা হিসেবে তার যে চরিত্র, এই দুই চরিত্র এক নয়। পণ্যের ভিতরে যে শ্রম থাকে, তার দ্বৈত চরিত্র আমিই প্রথম দেখিয়েছি এবং আমিই প্রথম তার পুংখানুপুংখ বিচার করেছি।”

এবার আসি মূল্যের দ্বান্দিকতায়। তৃতীয় পরিচ্ছেদ, ‘মূল্যের রূপ বা বিনিময় মূল্য’। মূল্যের অভিব্যক্তি কি একটি পণ্য হাতে নিয়ে ঘোরালে ফেরালে পাওয়া যায়? আজকের দিনে একটি শিশু তো বটেই, বড় মানুষও বলবে, ‘কেন? প্রাইস ট্যাগ তো দেওয়াই থাকে!’ আমরা সাধারণ জীবনে মনেই রাখিনা যে মূল্য আর দাম এক জিনিষ নয়। যাহোক, সেদিকে আর যাব না। মূল্য এবং দামের অন্তর্সম্পর্ক ‘পূঁজি’র ওই খন্ডেরই পরের পাতাগুলোয় দেওয়া আছে। এখানে প্রশ্নটা করার মানে হল একটা পণ্য হাতে নিয়ে ঘোরালে-ফেরালে বলা যায়, ‘বাঃ, খুব সুন্দর তৈরি করেছে তো!’ অর্থাৎ, তার ব্যবহারমূল্য তৈরি করেছে যে ‘ব্যবহার্য শ্রম, ... একটি নির্দিষ্ট প্রকারের এবং একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যয়িত উৎপাদনশীল শ্রম’ তার প্রশংসা করা যায়। কিন্তু, ‘পণ্যের মূল্য বলতে’ যা বোঝায় ‘মানুষের বিশ্লিষ্ট শ্রম, নির্বিশেষ মানবিক শ্রমের ব্যয়’ তার অভিব্যক্তি পাওয়া যায় কি?  

মার্ক্স বলছেন, “এক পণ্যের সঙ্গে ভিন্ন রকম আর এক পণ্যের যে মূল্য-সম্বন্ধ আছে, তাই হল তার সরলতম মূল্য-সম্বন্ধ।” আর তা থেকেই, অর্থাৎ, কোনো একটি পণ্যের অবয়ব, আকৃতি, রঙ বা গন্ধ থেকে নয়, অন্য পণ্যের সাথে তার সম্বন্ধ থেকে মূল্যের অভিব্যক্তি আমরা পাই, তাও একটি পণ্যেরঃ “অতএব দুটো পণ্যের মধ্যে যে সম্বন্ধ আছে, তা থেকে আমরা পাই একটি মাত্র পণ্যের মূল্যের সরলতম অভিব্যক্তি।” এটাই মূল্যের দ্বান্দ্বিকতা।

এবার আসি সমীকরণটায়।

“ক – মূল্যের প্রাথমিক অথবা আপতিক রূপ।

‘ও’ পরিমাণ পণ্য ক = ‘ঔ’ পরিমাণ পণ্য খ, অথবা

‘ও’ পরিমাণ পণ্য ক ‘ঔ’ পরিমাণ পণ্য খ এর সমান মূল্যবান।

২০ গজ ছিট = ১ কোট, অথবা

২০ গজ ছিট ১ কোটের সমান মূল্যবান।

১। মূল্যের প্রকাশের দুই মেরু, আপেক্ষিক এবং সম-অর্ঘ রূপ  

[‘ইকুইভ্যালেন্ট’এর এই অনুবাদই রয়েছে পীযুষ দাশগুপ্ত কৃত বাংলা অনুবাদে]

মূল্যের রূপ সংক্রান্ত সমস্ত কুহেলিকা এই প্রাথমিক রূপের মধ্যেই প্রচ্ছন্ন আছে। সুতরাং এর বিশ্লেষণই আমাদের সামনে আসল সমস্যা।”

ব্যস। আর উদ্ধৃতি দেব না। আমার প্রতিপাদ্য বিষয় এইটুকুই যে মূল্যের এই দ্বান্দ্বিকতা, যে সেটা একটি পণ্যে বিশ্লিষ্ট ভাবে অভিব্যক্ত হয় না, হতে পারে না – কেন না সে পণ্য, তার জন্মই হয়েছে বিনিময়ের জন্য (ব্যবহার্য বস্তু হিসেবে তো সে আগে থেকেই ছিল, তার পণ্যরূপ এক নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক উৎপন্ন) – অভিব্যক্ত হয় অন্য একটি পণ্যের সাথে এক সম্বন্ধে যার সমানতা নির্ধারিত হয় দুটো পণ্যে নিহিত ‘সামাজিকভাবে জরুরি শ্রমসময়’এর সমানতা দিয়ে। আর সেই অভিব্যাক্তি, দুটো পণ্যের নয়, একটির, সমীকরণের বাঁদিকের পণ্যটির। সেই অভিব্যক্তি হয় দুই রূপে – আপেক্ষিক, যা সেই পণ্যটিতেই অভিব্যক্ত হয় আর সম-অর্ঘ (বা সমার্ঘ), যা ডানদিকের অন্য পণ্যটিতে অভিব্যক্ত হয়। এই দ্বান্দ্বিক অভিব্যক্তির কারণেই সমীকরণটি বিস্তৃত হতে হতে উলটে যায় একদিন। ডানদিকের, সবার সম-অর্ঘ হওয়া পণ্যটি হয়ে বিশ্বজনীন সম-অর্ঘ্য – মুদ্রা। আর পণ্য-বাজারে মুদ্রার চলনের আবশ্যক গতি হিসেবে পূঁজির জন্ম হয়।

এঙ্গেলস এই আবিষ্কারের সময় ম্যাঞ্চেস্টার থেকে এসে এসে পান্ডুলিপি দেখে যাচ্ছিলেন। মার্ক্সকে ধ্যাঁতানি দিয়ে যাচ্ছিলেন, অন্য সব কাজ ছেড়ে এই কাজে এগিয়ে যাওয়ার জন্য।

পরে, যখন স্যামুয়েল মুর ও এডোয়ার্ড এভেলিং কৃত ইংরেজি অনুবাদটা সম্পাদনা করতে বসেন, তখন যে পাদটীকাগুলো উনি করেন, তার একটি এখানে উদ্ধৃত করতে পারি শুধু এটুকু দেখাতে যে দুই বন্ধু যখন মার্ক্সের পড়ার ঘরে কোনাকুনি একে অন্যের বিপরীতে হাঁটতে শুরু করতেন, মার্ক্সের লেখায় এঙ্গেলস কতটা ঢুকে যেতেন।

বাংলা অনুবাদের পৃষ্ঠা ৬এ ‘সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় শ্রম-সময়’ বোঝাতে গিয়ে মার্ক্সএর নিজের দেওয়া একটি পাদটীকা রয়েছে, যাতে তিনি নামবিহীন লেখককে উদ্ধৃত করছেন –

“‘জীবনধারণের প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী যখন পরস্পরের সঙ্গে বিনিমিত হয়, তখন তাদের মূল্য নিয়ন্ত্রিত হয় তাদের উৎপাদনে যতটা শ্রম ও সময় লাগে তার দ্বারা।’ সাধারণভাবে অর্থের সুদ সম্বন্ধে এবং বিশেষভাবে সরকারী তহবিল সম্বন্ধে (Thoughts on the Interest of Money in General and Particularly in the Public Funds, & c.) লন্ডন, পৃঃ ৩৬। লেখক-পরিচিতি-বিহীন এই চমৎকার গ্রন্থখানি লেখা হয়েছিল বিগত শতাব্দীতে কিন্তু এতে কোন নির্দিষ্ট তারিখ দেওয়া নেই। অবশ্য অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য থেকে এটা পরিষ্কার যে দ্বিতীয় জর্জের সময়ে, ১৭৩৯/৪০ সালে বইটি প্রকাশিত হয়েছিল।”    

পরে, ইংরেজি অনুবাদের সম্পাদনার সময়, শ্রমের দ্বৈত চরিত্র সম্পর্কে মার্ক্সের ব্যাখ্যার গুরুত্ব বোঝাতে, আর বিশেষ করে ইংলন্ডের গর্ব অ্যাডাম স্মিথের ভুলটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে এঙ্গেলসকেও একটি পাদটীকা জুড়তে হয় (দেখুন বাংলা অনুবাদের পৃঃ ১৪)। তিনি কী লেখেন?

“যা দিয়ে সর্বতোভাবে এবং প্রকৃতই সব সময়ে সমস্ত পণ্যের মূল্য নির্ধারণ ও তুলনা করা হয় তা যে শ্রম, সেকথ প্রমাণ করার জন্য অ্যাডাম স্মিথ বলেছেন, ‘শ্রমের সমান পরিমাণের শ্রমিকের কাছে সর্বকালে এবং সর্বস্থানে একই হতে বাধ্য। তার স্বাস্থ্যের, শক্তির এবং কর্মের স্বাভাবিক অবস্থায়, এবং তার যে গড়পড়তা কর্মকুশলতা আছে তাতে সে সর্বদাই তার বিশ্রামের, স্বাধীনতার এবং সুখের নির্দিষ্ট এক অংশ ত্যাগ করতে বাধ্য।’ জাতিবৃন্দের ধনসম্পদ (Wealth of Nations, Book I, Ch.5) একদিকে, অ্যাডাম স্মিথ এখানে (কিন্তু সবখানে নয়) পণ্য-উৎপাদনে যে পরিমাণ শ্রম ব্যয়িত হয় তার দ্বারা মূল্য নির্ধারণের সঙ্গে শ্রমের মূল্য দ্বারা পণ্যের মূল্য নির্ধারণের প্রসঙ্গটি গুলিয়ে ফেলছেন, এবং তার ফলে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে সম-পরিমাণ শ্রমের মূল্য সর্বদাই সমান। অপরদিকে, তাঁর এই রকম একটা অনুভাবনা আছে যে, যে শ্রম পণ্যের মূল্যের ভিতর অভিব্যক্ত হয়, তা কেবল শ্রম-শক্তির ব্যয় বলেই পরিগণিত হয়; কিন্তু তিনি এই ব্যয়কে কেবল বিশ্রাম, স্বাধীনতা, সুখ প্রভৃতির ত্যাগ বলে মনে করেন, সেই সঙ্গে জীবিত প্রাণীর স্বাভাবিক কাজকর্ম হিসেবে মনে করেন না। কিন্তু তাঁর চোখের সামনে রয়েছে আধুনিক মজুরি-শ্রমিক। অ্যাডাম স্মিথের পূর্বগামী পূর্বোক্ত নাম-পরিচয়হীন লেখক তা ঢের বেশি সঠিক ভাবে বলেছেন, ‘একজন লোক নিজেকে এক সপ্তাহ কাজে নিযুক্ত রেখেছে জীবিকা সংগ্রহের জন্য ... এবং বিনিময়ে যে তাকে অন্য জিনিষ দেয়, সে তার জন্য কত শ্রম ও সময় ব্যয় করেছে তার হিসেব ছাড়া আএ কোন ভাল হিসেব করতে পারেনা তার মূল্যের তুল্যমূল্যের জন্য; ফলতঃ, তার মানে আর কিছু নয়, কেবল কোন নির্দিষ্ট শ্রম-সময়ে তৈরি জিনিষের বদলে ঠিক সেই পরিমাণ শ্রম-সময়ে তৈরি জিনিষের বিনিময়।’ (I.c. পৃ.৩৯)”

নাম-পরিচয়বিহীন লেখকের বইটা দুজনে একসঙ্গেই বসে পড়েছিলেন মনে হয় না?  

 


 

Friday, January 1, 2021

শহীদ-এ-ওয়তন পীর আলি

 বাড়ি থেকে পালিয়ে আসা ছেলে। নিজের মুলুক থেকে এত দূরে, ধনী মানুষের দয়ায় বড় হওয়া ছেলে। ধুলো মাটিতে জন্ম নিয়ে, কুঠির অলিন্দে, দেউড়ির ছায়ায় ঘুরে দুনিয়া দেখতে শেখা ছেলে।

পীর আলি অন্যরকম হতে পারতেন। পাটনা বা আজিমাবাদ তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আফিম ব্যবসার কেন্দ্র। শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ডাচ, পর্তুগীজ, ইংরেজ বণিকেরা। আজকের গান্ধী ময়দান তখন সাহেবদের রেসকোর্স। পূবদিকে হাফ-নবাবী আর পশ্চিমে হাফ-সাহেবী শহরটায় অনেক প্রলোভন ছিল গা-ভাসানোর। গা-ভাসানো লোকগুলোর ঘাড়ে ভর দিয়েই তো চলছিল কম্পানির প্রশাসন।

কিন্তু কী যেন ছিল গঙ্গার বুক থেকে উঠে আসা হাওয়ায়। মন্দিরের বটের ঝুরিতে, অশ্বত্থের শিহরণে। মাজারের ওপর ঝরে পড়া কাঁঠালি চাঁপা ফুলগুলোর সুগন্ধে।

মাদ্রাসায় কত ছেলেই তো পড়ে। পীর আলি অক্ষর ধরে ধরে পৌঁছোতে চাইলেন হিন্দের হৃৎকমলে। কেননা দেখতে পাচ্ছিলেন তার পাপড়িগুলোর ওপর বণিকতন্ত্রের ছায়া। যেন গায়কের ফুসফুসে আফিমের ছোপ।

সোনার ভারত! তার আসল সোনা তো ছিল বুকের বল, মাথার স্পষ্টতা আর হাতের জাদু। তাই নিয়েই তো এ দেশ পৃথিবীর বাণিজ্য দখল করেছিল। হিন্দের কাপড়ের জন্য হুড়োহুড়ি পড়ত লিসবন, প্যারিসের বাজারে। হিন্দের ইস্পাত যেত ধারালো তরোয়াল হতে, দামাস্কাসে।

সে দেশের কী অবস্থা! রুগ্ন! হত দরিদ্র! হীন! সতেরো বছর বয়সে ভূমিকম্প দেখেছিলেন পীর আলি। ধেয়ে আসছে কড় কড় কান ফাটানো শব্দ, কাঁপছে পায়ের নিচে মাটি। সাত বছর বয়সে ছেড়ে আসা বাবা মায়ের কথা সেদিন খুব মনে পড়েছিল তাঁর।

কিন্তু পরে মনে হোত এর থেকে অনেক বড় কোনো এক ভূমিকম্পে ফাটল ধরে গেছে হিন্দের মর্মে। ধ্বসিয়ে দিয়েছে তার নৈতিক গঠন।

 

বুভুক্ষুর মত বই পড়তেন পীর আলি। পড়তে পড়তে কবে যেন সবাইকার চোখে তিনি বিদ্বান হয়ে উঠলেন! রাস্তায় পড়ে থাকা বাচ্চাটা হয়ে উঠল মওলানা পীর আলি খাঁ! উর্দু, আরবী, ফারসীতে সমান পারদর্শী।

কিন্তু পড়লেই তো শুধু হবে না, নিজের পায়ে দাঁড়াতেও তো হবে। পালক ধনী মানুষটি পিতার স্নেহ দিয়ে বড় করেছেন তাকে। কিছু দিন আগে যেমন নিজের ছেলের বিয়ে দিয়েছেন, পীর আলিরও বিয়ে দিয়েছেন ঘটা করে। সেই তাঁর কাছেই হাত পাতলেন শেষে। ‘কিছু টাকা চাই, একটা বইয়ের দোকান দেব, ভাবছি।’

তখনও ছাপাখানা আসেনি এদিকে। তার ওপর উর্দু, আরবীর বই তো ছাপাখানা আসার পরেও বহু বছর অব্দি হাতে লেখাই চলেছে। শহরে বইয়ের দোকান গোনাগুনতি। পীর আলি নিজের দোকান সাজিয়ে তুললেন লক্ষ্ণৌ, দিল্লী থেকে বই আনিয়ে। পড়াও চলবে, রোজগারও চলবে।

নানান ধরণের মানুষ, যাঁরা লেখাপড়া জানেন, দেশ-দুনিয়ার খবর রাখেন, পীর আলিকে চিনে ফেললেন। কত রকমের প্রশ্ন যুবকটির মনে! কত চিন্তা করে সে! তাঁরা বলাবলি করেন নিজেদের মধ্যে। বই আনানোর সূত্রে দূরের সুহৃদ বন্ধু ও প্রিয়জনদেরও একটা বড় জগত গড়ে উঠল পীর আলির।

কিছুদিনের মধ্যে অদ্ভুত সব খবর আসতে শুরু করল চারদিক থেকে। উড়তে লাগল নানা ধরণের গুজব। ইংরেজ ফৌজের হিন্দুস্যানী সেপাইদের মধ্যে ফুঁসে উঠেছে অসন্তোষ। ওদিকে ঝাঁসী, গোয়ালিয়র, পূণা ... আরো কতমুলুকের রাজা, রানীরা জোট বাঁধছে কোম্পানির বিরুদ্ধে। শহরের রাস্তায় যাওয়া আসা করা ইংরেজ অফিসারেরা যেন একটু সতর্ক।

-   কে, বলল কে?

-   হাজিগঞ্জের শেরশাহী মসজিদে এক ইমাম এসেছিলেন কলকাতা থেকে। তিনি বলেছেন।

-   ব্যাপারীর বজরা যাচ্ছিল গঙ্গায়। গোয়ালন্দ থেকে এলাহাবাদ। দীঘা ঘাটে রসদ কিনতে থেমে নাবিকেরা বলাবলি করছিল।

-   আরে, নটদের দল এসেছিল কানপুর হয়ে তারাই তো বলল!

-   তোমরা জানো না। দানাপুর ফৌজী ব্যারাকের বাইরে আর্দালী, খানসামাদের নতুন বস্তি উঠছে যে – ওখানেই একদিন গিয়ে শুনেছি।

শ্রীরঙ্গপত্তনে কবে যুদ্ধে প্রাণ দিল টিপু সুলতান – তার যুদ্ধডাক যেন সাড়া জাগিয়ে তুলেছে দেশে। পীর আলি তাঁর বইয়ের দোকানে বসে হঠাৎ, যেন সেই যুদ্ধডাক শুনে চমকে ওঠেন।

তিনি মনস্থির করে ফেলেন। এই সময় কবে থেকে তাঁর বুকে জমছিল গোরাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা! দেশটার মেরুদন্ডে ঘুণ ঢোকাচ্ছে কোম্পানির শাসন। ... আজ সেই শাসন উৎখাত করার দিন এসে গেছে।

নিজের যা কিছু উপার্জন, সব ঢেলে তিনি গোপনে গড়ে তুলতে শুরু করলেন বিদ্রোহীদের একটি দল। অস্ত্র যোগাড় করতে লাগলেন। নীল-সাদা রঙের বিদ্রোহের পতাকা ভাবলেন দলটির জন্য। কাছের দূরের বন্ধুদের সাথে চলল চিঠির আদান প্রদান – প্রস্তুতির আলোচনা। ক্যান্টনমেন্টে, ইংরেজ প্রশাসনে সম্পর্কসূত্র গড়ে তুললেন।

লক্ষ্ণৌএ এক মনের সাথী খুঁজে পেয়েছিলেন বইয়ের ব্যবসার সূত্রে। সেই সাথীর সাহায্যে স্ত্রী আর সন্তানদের লক্ষ্ণৌ প্রবাসের ব্যবস্থা করে দিলেন।

চলতে লাগল প্রস্তুতি আর সময়ের প্রতীক্ষা।

১৮৫৭ সাল। শুরু হোল উনবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় সামরিক বিদ্রোহ। ভারতে ইংরেজ ফৌজের এক লক্ষেরও বেশি ভারতীয় সেপাই কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে ফেটে পড়ল। ব্যারাকপুর থেকে মীরাট, দিল্লী, পেশোয়ার হয়ে তার ঢেউ আছড়ে পড়ল বিহারেও। বাবু কুঁঅর সিংএর বীরগাথা, দানাপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বিদ্রোহী সেপাইদের নৌকায় করে পাড়ি দেওয়ার কাহিনী আজ সবাই জানে।

তেসরা জুলাই পাটনার কমিশনার উইলিয়াম টেলার একটু বেলায় খবর পেলেন যে পতাকা উড়িয়ে, হাতে অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে কয়েকশো মানুষের একটা দল গুলজারবাগে সরকারি দপ্তরে হামলা চালাতে যাচ্ছে। আবার খবর পেলেন তারা গীর্জা ঘিরে নিয়েছে। প্রথমে যে দলটা গেল তারা টিকতে পারলো না বিদ্রোহীদের সামনে। কিন্তু তারা সঠিক খবর নিয়ে এল যে পাটনা আফিম এজেন্সির ভারপ্রাপ্তকর্তা ডেপুটি আফিম এজেন্ট ডা. লায়েলকে বিদ্রোহীরা নিকেশ করেছে। কমিশনার দানাপুর গ্যারিসন থেকে ব্রিটিশ সৈন্য চেয়ে পাঠালেন।

ইংরেজ সৈন্য আর ভারতীয় বশম্বদ সেপাইদের মিলিত শক্তি অবশেষে কাবু করল বিদ্রোহীদের। তখন প্রায় বিকেল। আকাশে আষাঢ়ের খন্ড খন্ড মেঘ। পীর আলি ডান হাতটা মুষ্টিবদ্ধ তুলছিলেন সাথীদের আহ্বান করে। তখনই মাস্কেটের গুলি লাগল বাঁ কাঁধে।

পরের দিন একুশ জনের ফাঁসী হল। ২৩ জনকে জেলে পাঠানো হল। কমিশনার টেলারের নৃশংসতা সর্ববিদিত। তিনিও বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন পীর আলির সামনে বসে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে করতে।

পরবর্ত্তীকালে একটি বইয়ে তিনি লিখেছেনঃ

“ভারী শিকলে বাঁধা, বাঁ কাঁধের ক্ষত থেকে বেরুনো প্রচুর রক্তে তার নোংরা জামাকাপড় মাখামাখি, বাঁচার এক বিন্দু আশা নেই। তবু আমার ও অন্যান্য ইংরেজ ভদ্রলোকের সামনে দাঁড়িয়ে তার মুখে এক মুহূর্তের জন্যেও উত্তেজনা, হতাশা কিম্বা ভয় খেললো না।

“তাকে প্রশ্ন করা হোল, এমন কিছু কি সে করতে চায়, যাতে তাকে জীবনদান দেওয়া যেতে পারে? সে পরম নিশ্চিন্ত ভাবে এবং ঈষৎ অবজ্ঞার সাথে জবাব দিল, ‘কখনো এমন সময় আসে যখন জীবন বাঁচানো ভালো। আবার এমন সময়ও আসে যখন জীবন খোওয়ানো ভালো।’ (কমিশনার হিসেবে) আমি যে দমননীতি চালিয়েছি তাকে বিদ্রুপ করে শেষে বলল, ‘আপনি আমাকে ফাঁসিতে ঝোলাতে পারেন, আমার মত আরো অনেককে ফাঁসিতে ঝোলাতে পারেন। কিন্তু আমার জায়গা নিতে হাজারো মানুষ ছুটে আসবে। আপনার উদ্দেশ্য কখনোই সফল হবে না। ...”

পাটনায় যেখানে পীর আলি এবং তার কুড়িজন সঙ্গীকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল সেখানে এখন একটি শিশু উদ্যান – ‘শহীদ পীর আলি খাঁ স্মৃতি পার্ক’।