Sunday, January 13, 2019

নদীর রোদ-ঝিলিক


[শ্মশান । এমন সাজানো যেতে পারে যে মঞ্চের পিছন দিকে, মাঝের বাঁপাশে একটা কাঠের চৌকি । চৌকির গায়ে কাট আউট করে তৈরি একটা গাছ । গাছের নিচে, চৌকির ওপর, শেষকৃত্য ও দাহকর্মের প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের একটি দোকান সাজানো । চৌকির ডানদিকে, অর্থাৎ মঞ্চের পিছন ঘেঁষে মাঝবরাবর, কাঠের তৈরি তিন ধাপ সিঁড়ি এদিক দিয়ে উঠে ওদিকে নেমে গেছে । আভাসটা এই যে বর্ষার জলস্তর রোখার জন্য চার ফুটের বাঁধ পেরিয়ে নদীর ঘাট ।
সামনে একটি মৃতদেহ । পাশে বসে এক প্রৌঢ় । তার সামনে পুরোহিত । পুঁটলি থেকে সামগ্রী বার করছে । অদূরে বসে দুজন শ্মশানসঙ্গী । পাহারায় রত দুজন পুলিশ । চৌকির ওপর বসে দাহকর্মের জিনিষপত্রের দোকানটা সামলাচ্ছেন এক স্ত্রীলোক ।
সময় – সন্ধ্যা ।]

(একজন ফোটোগ্রাফার, যেমন শ্মশানে ঘুরফির করে ছবি তুলে দেওয়ার জন্য, তৃতীয় শ্মশানসঙ্গীর পিছুপিছু প্রবেশ করে ।)

ফটোগ্রাফার - একটু তুলে ধরুন মাথাটা ।
                   (সঙ্গে আসা শ্মশানসঙ্গী এগিয়ে গিয়ে ঝুঁকে দু’হাত দিয়ে শবদেহের মাথা আর কাঁধটা তুলে ধরে । তাতে দেখা যায় শবদেহটি দশ-বারো বছরের ছেলের । কাপড়টা নিচে খসে যাওয়াতে গলার নিচ থেকে পোস্টমর্টেমের সেলাই দেখা যায় । একটা ছবি তোলা হয় – ফ্ল্যাশ ঝলকায় ।)
তৃতীয় শ্ম.স.-  (প্রৌঢ়কে) আপনি আসুন পাহুনজী১, একবার পাশে এসে বসুন । (প্রৌঢ় মাথা ঝাঁকান । শ্মশানসঙ্গীরা স্নেহভরে জোর করে তাঁকে শবদেহের পিছনে বসিয়ে দেয় । বাঁহাতে দেহের নিচের দিকে ঠেক দেওয়ায় ও অন্য হাতে মাথায় ঠেক দেওয়ায় । কিন্তু প্রৌঢ়ের নিজের মাথা আর সোজা হয় না । ওই অবস্থাতেই আরেকটা ছবি তোলা হয় ।
১ম শ্ম.স. -    আর দেরি কোরো না তোমরা । পোস্টমর্টেম করিয়ে বডি দিতেই বিকেল করে দিল । বাড়ি ফিরব কখন ? কীভাবে ফিরব ?
ফটোগ্রা. -      কী, হয়েছিল কী ?
                   (শ্মশানসঙ্গীরা একে অন্যের মুখের দিকে চায় । অর্থাৎ বলার ইচ্ছে নেই । দুই পুলিশের মধ্যে অপেক্ষাকৃত যে তরুণ, সে ফটোগ্রাফারকে ধমকের সুরে প্রশ্ন করে)
১ম পুলিশ -    ছবি তোলা হয়ে গেছে আপনার ?
ফটোগ্রা. -      হ্যাঁ ! সে তো দেখতেই পেলেন আপনারা !
১ম পুলিশ -    তাহলে যান ।
ফটোগ্রা. -      না, মানে এত ছোটো একটা বাচ্চার লাশ, তাও পোস্টমর্টেম করানো ...
২য় পুলিশ -    (ইনি একটু বয়স্ক) গ্রামের ঘরে ঘরে আগুন জ্বলছে ফটোগ্রাফরবাবু ! জমি নিয়ে, জাত নিয়ে, ধরম নিয়ে । তারপর নক্সলী উৎপাত । আর কিছু না পেলে ... গোতিয়ার২ ঝগড়া । জোরু নিয়ে টানাটানি ! কিছু বাকি আছে ? কত কত খবর রাখবেন? বড় কাউকে পেলোনা তো বাচ্চাটাকেই ধরে শেষ করে দিল !
৩য় শ্ম.স. -    আরে কাজিয়া, লড়াই, হাঙ্গামা, ফ্যাসাদ তো তবু বোঝা যায় । ভুল হোক আর ঠিক হোক, জমিজিরেত নিয়ে, জাত নিয়ে, হকহুকুক নিয়ে বয়স্কদের মধ্যে দুশমনি লাগতেই পারে । ওই নিয়েই জীবন । ... আমি তোকে মারলাম । তুই আমায় মারলি । এইই দিনকাল । ... কিন্তু বাচ্চাটা কার শত্রু ছিল ভাই ? কাকে মেরেছিল ? কার গোলার ধানে আগুন দিয়েছিল ? কার ঘরে ঢুকে বাড়ির অওরতের সাথে মুখ কালো করেছিল ? দশ বছরের একটা বাচ্চা ?
                   (এরই মধ্যে পিছন থেকে এক বৃদ্ধ প্রবেশ করে । তার আগল-পাগল বা নেশাগ্রস্ত চলনে শবদেহের কাছে আসার ধরণ দেখে সবাই চুপ করে যায় । ফটোগ্রাফার ‘ওই যে, এসে গেছে’ বলে বেরিয়ে যায় ।
পুরোহিত -     এ এখনো বেঁচে আছে ? ছিল কোথায় ? দেখতাম না তো ?
প্রৌঢ় -          লোকটা কে, পন্ডিতমশাই ?
                   (পুরোহিত জবাব দেওয়ার আগেই বৃদ্ধ শবের মুখটা ভালো করে দেখে হেসে ওঠে)
বৃদ্ধ -            এসে গেলি ? আবার ফিরে এলি ? এত শিগ্‌গির ?
৩য় শ্ম.স. -    বলে কি বুড়ো ! আবার ফিরে এলি মানে ?
বৃদ্ধ -            (তার দিকে তাকিয়ে তার কাছে এসে) বাঃ, ফিরে ফিরে আসছে আমার চোখের সামনে, পোড়ানো হচ্ছে বার বার ... বলব না ?
১ম শ্ম.স. -    কী বলছে বুড়ো যা তা ! সরা ওকে এখান থেকে ! কে ও ?
দোকানি -      (অদূরে তার দোকান থেকেই) ওই বুড়োই তো এই শ্মশানঘাটের রাজা ছিল । রাজা হরিশ্চন্দ্র, কলিযুগের ! এখন আর হাত পা চলে না । মাথাও বিগড়েছে । তাই ছেলে ধরেছে কাজ ।
২য় শ্ম.স. -    ঠিকই বলছে দোকানি । ওই আগে হাতে ধরিয়ে দিত আগুনের আঁটি । ঘাটছাড়ানি নিয়ে আমি নিজেও বেশ কয়েকবার দরদাম করেছি ওর সাথে – পাঁচ বছর আগে অব্দি । এদিকে দেখতে পেতাম না । ভেবেছিলাম মরে গেছে । (বলে নদীর দিকে নেমে যায়)
১ম শ্ম.স. -    এত সহজে মরে শালা চিমড়ে বুড়ো ! মাল টেনে দিব্যি মস্ত্‌ আছে, দেখছিস না !
বৃদ্ধ -            (তার কাছে এগিয়ে এসে) ঠিক বলেছিস ।  মাল টেনে, বুকে পেটে, মাথায় আগুন জ্বালিয়ে দিব্যি বেঁচে আছি । নদীর তারা গুনছি আর আকাশের ঢেউ গুনছি । কেন জানিস ?
৩য় শ্ম.স. -    জেনে কাজ নেই । মাল খাওয়ার যোগাড় যখন আছে তার মানে পেটের ভাতটাও সময় মত জুটছে । নদীর তারা আর আকাশের ঢেউই তো গুনবে । স্‌সালা ।
বৃদ্ধ -            (নিজের মনে) আমরা তো হলাম, ওই যাকে বলে যমের, মানে উপরের ডোমটার অরুচি । যেতে চাইলেও নেয় না । ফিরিয়ে দিল দু’দুবার । ... আর এই যে দেখছিস শুয়ে আছে যমের মাংসলুচি । কচি পাঁঠার মাংস । গপগপিয়ে খাবে । (হাসতে হাসতে নিজের দিকে আর শবদেহের দিকে আঙুল দেখিয়ে দেখিয়ে বলতে থাকে, ‘অরুচি – মাংসলুচি ... অরুচি – মাংসলুচি ...)
১ম শ্ম.স. -    তা এই বাচ্চার লাশটা দেখে ‘আবার ফিরে এলি’ বলার মানে কী ?
বৃদ্ধ -            বাঃ, বার বার আসবে, ফিরে ফিরে আসবে ... বলব না ? সেদিন এল । কী, না দাঙ্গায় মরেছে । আবার এল । কী না নৌকো ডুবেছে । এবার ? শুনছি জমি জিরেতের কাজিয়া । মাঝে মধ্যেই আসে অসুখে মরে । না খেয়ে । আগুনে পুড়ে । ফিরে ফিরে আসে এখানে । বলব না ?
৩য় শ্ম.স. -    বাঃ, পাগলের কথা শুনুন । জ্ঞানবাক্য । কাব্য । দুনিয়ার যত বাচ্চা মরছে সব একটাই বাচ্চা । যত যোয়ান মরছে সব এক যোয়ান । যত মেয়ে মরছে ... বুড়োও তবে যে কটা মরছে সব এক ! মানে ও নিজেই । বুড়ো সমাজের ভুত । শালা মাল খেয়ে টইটুম্বুর । ফিলজফি আওড়াচ্ছে । মানবতার মৃত্যু ।
বৃদ্ধ -            ও তুই বুঝবি না । বুঝবি না । বড়দের মরা আর এর এই শ্মশানে আসা বারবার (শবদেহের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে )... এক হয় কখনো ? বড়রা তো দুনিয়াদারীর ভাগিদার । দুনিয়াদারীতেই বাঁচছে, মরছে । নিজেদের কর্মে তৈরি করছে নিজেদের জীবন । নিজেদের মৃত্যু । ... এরা তো ঢোকেইনি সেই দুনিয়াদারীতে । জন্মই নেয়নি । মানুষের এক জন্ম মায়ের পেট থেকে । দ্বিতীয় জন্ম – দুনিয়াদারীর ছকে নিজের খোপটায় গিয়ে দাঁড়ানোর পর । নিজের হিস্‌সার কর্ম করতে । ... মাঝখানের বয়সটা ? (একটা চাওয়ালা বাচ্চা ছেলে, প্রায় একই বয়সের, হাতে খালি গেলাস বসান তারের জালি নিয়ে দোকানি স্ত্রীলোকের কাছে যায় । বৃদ্ধ তার দিকে তাকিয়ে থাকে ।) মাঝখানের বয়সটা । হাঁটা শেখার সময় থেকে চলা শেখার সময় অব্দি ভগবানের বয়স । ... ভগবান দুটো হয় ? ওই এক । ভগবান । সময়ের ফুল । ফল হওয়ার আগেই এভাবে মেরে ফেলি আমরা । আর তিনি ফিরে ফিরে আসেন শ্মশানে ।
চাওয়ালা -     (দোকানি স্ত্রীলোকের সামনে দাঁড়িয়ে) গেলাসটা কোথায় রেখেছ ? দোকানি চৌকির নিচে ইশারা করতে ঝুঁকে ছেলেটি গেলাস তুলে নেয়) এখনকারটা মিলিয়ে ন’টাকা হল । 
দোকানি -      পরে নিয়ে যাস ।
চাওয়ালা -     এখনই দাও না । শেষে আমাকে কথা শুনতে হয় । আগের রেজিস্ট্রিবাবুর এভাবেই ছত্রিশ টাকা বাকি পড়ে গিয়েছিল । ট্রান্সফার হয়ে গেল । টাকা পেলাম না । আমার মাহিনা থেকে কেটে নিল মালিক ।
দোকানি -      তোর মালিক তো চশনখোর ।
চাওয়ালা -     (কথা এড়িয়ে যেতে) টাকাটা দিয়ে দিলেই তো ফুরিয়ে যায় । কেন কথা বাড়াচ্ছ ?
দোকানি -      আচ্ছা নিয়ে যা । (পয়সা দিয়ে বৃদ্ধকে চেঁচিয়ে শোনায়) এই যে দেখ, তোমার কেষ্টঠাকুর ! হাতে পায়ে হাজা ধরে নিল রাত বারোটা অব্দি এঁটো বাসন মাজতে মাজতে । একটু বল এর কথাও !
বৃদ্ধ -            (দাড়ির ফাঁকে ফোকলা দাঁতে খানিক হেসে নিয়ে) ও তো আমাদের দলের বোড়ে । এগিয়ে চলেছে । এগিয়ে চলেছে । কবে মালিকদের লাইনে ঢুকে তোর ঘোড়া বাঁচিয়ে দেবে, আমার হাতি বাঁচিয়ে দেবে, নাকি মন্ত্রী হয়ে যাবে ... দেখতে রয়ে যাবি ।
দোকানি -      এ তো আর দাবা খেলা নয় ! ... হয়তো দেখবে মালিকদেরই ঘোড়া হয়ে এসে তোমার পাঁজর গুঁড়িয়ে দিল । সময়ের আগেই ধরে নিয়েছে ছক । কীই বা বোঝে ও এই ছকের । লেখাপড়া করাবে, না নেশাখোর বাপ জুতে দিয়েছে কাজে ।  (একজন মোটাসোটা যুবক ঢোকে)
যুবক -          (বৃদ্ধকে ধরে নিয়ে যেতে যেতে) তোমাকে বলি ওদিকে থাক । কাজের সময় এসে বাগড়া দেওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে তোমার ।
দোকানি -      হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিয়ে যা তোর বাপকে ! যতক্ষণ থাকবে এই সমস্ত পাগলামি চলবে । সিপাহিজীরা ভাববে নিশ্চয়ই কোনো ব্যাপার আছে । রেজিস্ট্রিবাবুকে তো আলবাৎ ধরবে । একটা মড়ার ডবল রেজিস্ট্রি ... ।
                   (ছেলেটি বৃদ্ধকে টানতে টানতে নদীর দিকে নেমে যায় । ওদিক থেকেই উঠে আসে দ্বিতীয় শ্মশানসঙ্গী)
২য় শ্ম.স. -    এদিকের কাজ শেষ হয়ে গিয়ে থাকলে এবার চল । ওদিকে সবকিছু রেডি ।
                   (শবদেহ উঠিয়ে নদীর দিকে নেমে যায় মৃত বালকের পিতা, শ্মশানসঙ্গীরা এবং পুরোহিত । চাওয়ালা বাচ্চা ছেলেটি দাঁড়িয়ে পড়েছিল বৃদ্ধ ও তার ছেলের টানাটানি দেখতে । এবার গেলাসসুদ্ধু জালিটা পায়ে বাজিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ করতেই দুই সিপাই নড়ে চড়ে)
১ম পুলিশ -    (যে অপেক্ষাকৃত তরুণ) কী সাহেবজী, একটু চা পেলে কেমন হয় ?
২য় পুলিশ -    মন্দ নয় । এ্যাই চাইল্ড-লেবার । দুটো চা দিয়ে যা তো । আলাদা করে বানিয়ে আনবি ।
চাওয়ালা -     স্পেশাল তিন টাকা ।
২য় পুলিশ -    ডবল ?
চাওয়ালা -     পাঁচ ।
২য় পুলিশ -    ওই ! দুটো ডবল হাফ ।
চাওয়ালা -     পয়সা ?
১ম পুলিশ -    আরে নিয়ে আয় না ! না দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছি না ।
২য় পুলিশ -    (পয়সা বার করে) না, নিয়ে যা পয়সা । নইলে আবার ঝাড় খাবি মালিকের কাছে । কিন্তু চা যেন ভালো হয় । আর (নদীর দিকে ইশারা করে) ওই দিকে যাচ্ছি আমরাও । পৌঁছে দিবি । ... শালা কী নিয়মকানুন এই জমানার । বাচ্চারা টিভিতে গান গেয়ে, নেচে, এ্যাক্টিং করে পয়সা কামাচ্ছে । বাপমায়ের স্বপ্ন পুরো করার কথা বলছে । তো সে হল ট্যালেন্ট কা কমাল । আর দোকানে, কারখানায়, রাস্তায় কাজ করে পরিবার চালাচ্ছে, পেট পালছে, এমনকি লেখাপড়া শেখার জন্য খাটছে তো সে হল চাইল্ড-লেবার ! বেআইনি ! ...
                   (ততক্ষণে চাওয়ালা বাচ্চাটা পয়সা নিয়ে চলে যায় । সিপাই দুজনও নদীর দিকে নেমে যায় । দোকানি মেয়েলোকটি হাই তুলে আড়মোড়া ভেঙে ওঠে । কাট-আউট গাছটা সিঁড়ির ডানদিকে নিয়ে গিয়ে ঘুরিয়ে বাঁধের ওপাশে দাঁড় করায় । চৌকিটা টানতে টানতে নিয়ে নাট্যস্থলের বাইরে চলে যায় । অর্থাৎ, ঘটনাস্থল নদীর দিক । ...
গভীর রাত । মঞ্চ ঈষৎ অন্ধকার । যে ছেলেটি শবদেহ হয়েছিল সে ডানদিক থেকে ঢুকে ডানঘেঁষেই মাটিতে শুয়ে পড়ে । নিভন্ত চিতা বোঝাতে একটা লাল আলো ফেলা যেতে পারে তার ওপর ।
                   বাঁদিক থেকে বৃদ্ধ একটা মদের বোতল আর একটা পুঁটুলি হাতে নিয়ে ঢুকে বাঁ ঘেঁষে বসে পড়ে । ধপ করে বসতে গিয়ে বেসামাল হয়ে চিৎপটাং হয় । আবার উঠে বসে । মদ খায় ।
                   একেবারে সামনে বাঁদিকে তিন বালক/বালিকা, মাথায় মুখে কালো কাপড় বাঁধা, কাঁধে বন্দুক ... প্রবেশ করে । তাদের সাথে একজন দলনেতা – যুবক বা মধ্যবয়সী – মাথায় মুখে কাপড় বাঁধা বলে বোঝা যায় না ।)
দলনেতা -      সব কথা মনে রেখেছ তো তোমরা ? এটাই কিন্তু তোমাদের প্রথম অপারেশন, তোমাদের পরীক্ষা । আমি আর রাঘবদা রাস্তার ধারে থাকব । তোমাদের সিগন্যাল পেলেই বাইকে স্টার্ট দেব । ঠিক আছে, কমরেডস !
                   (দলনেতা চলে যায়)
১ম (বালি.) - কুশলের ছোটকা যদি না আসে শেষ অব্দি ?
২য় (বাল.) -   আসবেই । ওর আদরের ভাইপো, ওরই জন্য জীবনটা দিল ! পারলে লাশের সঙ্গেই আসত । কিন্তু পুলিশের ভয় । এখন আসবে । ভাইপোর চিতার কাছে । আসবেই ।
বালিকা -       একা আসবে ?
বালক -         একা নাও হতে পারে । দুজন । তিনজন । তবে দল বেঁধে এখান অব্দি আসার সম্ভাবনা কম ।
বালিকা -       দুজন তিনজন হলে চিনতে অসুবিধা হবে না ? কাপড়ে চোখমুখ ঢাকা থাকলে ...
বালক -         মিটিংএর সময় ঘুমোচ্ছিলি ?... চিতার কাছে আসবে । বসবে । ফিসফিসিয়ে কাঁদবে, গর্জাবে ...। অসুবিধা হবে চিনতে ?
৩য় (বালক) - চুপ । কেউ আসছে ।
                   (ওরা চুপ করে যায় । কিন্তু কেউ আসেনা । সিঁড়ির ওধার থেকে একজন শ্মশানসঙ্গী উঁকি মেরে চিতাটা দেখে । স্বগতোক্তি করে ‘নেভেনি । এখনও ঘন্টাখানেক লাগবে’ । বলে অদৃশ্য হয়ে যায় ।)
সত্যি বলতে কুশলটা বেচারা বেঘোরে মরল । ... অনেক আগে খতম করে দেওয়া উচিৎ ছিল ওর ছোটকাকে । রামস্বরূপ সিংএর ডান হাত ভেঙে যেত । আমাদের টোলায় গত দু’বছরে পাঁচটা হামলার মধ্যে তিনটে লীড করেছে ও । বাকি দুটোর সময় বম্বে গিয়েছিল মালিকের কাজে । শালা কুত্তা । সেদিনও দিদির ওপর ... (বলতে গিয়ে গলা ভেঙে আসে, বাকি দুজন ওর কাঁধে হাত চাপড়ে প্রবোধ দেয় । চুপ থাকে তিনজনেই । একটু পরে অন্যদিক থেকে চুপিসাড়ে, মাথায় মুখে কাপড় বাঁধা, বন্দুক কাঁধে দুজন লোক প্রবেশ করে । একজন চিতার কাছে এগিয়ে যায়। হাঁটু গেড়ে বসে । তিনজন বালক বালিকা ক্ষিপ্রতার সাথে পজিশন নেয় ।)
ছোটকা -       তোকে মারার বদলা তো আমি নেব কুশল । এমন বদলা নেব যে ... ! এত হিম্মত হয়ে গেছে ওই হারামিগুলোর ! পুরো টোলা ওদের ছারখার করে দেব এবার । শাবল দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আগুনে পোড়াব। দেখব কোন মসীহা আর কোন পার্টি ওদের বাঁচাতে আসে । ... আমাকে ওরা চেনেনি এখনও, যে চাইলে ...
                   (গুলি চলে । এক বালক ছোটকাকে তাগ্‌ করে । বাকি দুজন ছোটকার সঙ্গীকে ব্যস্ত রাখে । মোক্ষম গুলিতে ছোটকা লুটিয়ে পড়ে । তার সঙ্গী আড়াল খোঁজে । তখনই একজন বালক একটা বোমা ছোঁড়ে । ধোঁয়া, আগুন । তিন জন বালক-বালিকা পালিয়ে যায় । নেপথ্যে বাইকের আওয়াজ । মিলিয়ে যায় । ছোটকার সঙ্গী দ্রুত উঠে এসে রক্তাক্ত ছোটকার শরীর টানতে টানতে নেপথ্যে নিয়ে যায় । কিছু চাপা শোরগোল হয় পিছন দিকে । হন্তদন্ত হয়ে পুলিশ দুজন এবং শবসঙ্গীরা সিঁড়ির ওপর উঠে দাঁড়ায়, খানিক নেমে আসে । কাছে আসতে ভয় পায় । ওখান থেকেই অন্ধকারে ঠাহর করে ।)
কুশ. পিতা -   (সবচেয়ে পিছন থেকে) ছোট এসেছিল নির্ঘাৎ ।
১ম পুলিশ -    আর কে এসেছিল ?
২য় শ্ম.সঙ্গী -  কেউ তো এসেছিল পাল্টা তরফেরও । নইলে গুলি বোমা চলল কী করে ?
২য় পুলিশ -    পিছু হটুন আপনারা । এদিকেই থাকুন । ফোর্স আসা দরকার । থানায় খবর দিতে হবে (প্রথম পুলিশকে) এদের নিয়ে এখানে থাক । আমি থানায় খবর দেওয়ার ব্যবস্থা করি । (সবাই আবার ওদিকে চলে যায় ।)  
                   (এতক্ষণ গুলির আওয়াজ, হাঙ্গামার মধ্যে কাটিয়েও মধুর পিতা অর্থাৎ বৃদ্ধের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই । মদ খেয়ে যেমন ঝিমোচ্ছিল তেমনই ঝিমোতে থাকে । ... চিতার ওপর লাল আলো নিভে যায় । অলৌকিক এক ফিকে আলো ছড়িয়ে পড়ে সামনের দিকের সবটা জুড়ে । বৃদ্ধ হঠাৎ টেনে তোলে নিজেকে । মঞ্চের নিচে থেকে অর্থাৎ নদী থেকে উঠে আসে এক সাদা নরম কাপড় জড়ান স্ত্রীলোক । বসে পড়ে বৃদ্ধের একটু দূরে । বৃদ্ধ খেয়াল করেনা । ওদিকে চিতার ছাই থেকে উঠে বসে মৃত বালক, কুশল । বৃদ্ধের দিকে এগিয়ে আসে ।)
কুশল -          এসে গেছি ধর্মরাজা ! (বৃদ্ধের পুঁটুলির ভিতরে হাত ঢুকিয়ে একটা মুকুট বার করে বৃদ্ধকে পরিয়ে দেয় । বৃদ্ধ চমক ভেঙে কুশলকে দেখে । তার পর অদূরে বসে থাকা স্ত্রীলোকটিকে দেখে । কিছু একটা অস্বীকার করার ভঙ্গীতে মাথাটা দুলিয়ে দুলিয়ে নাড়ে ।)
বৃদ্ধ -            কেউ শালা মানতেই চায় না । কেন মানতে চায় না? ফিরে ফিরে আসছে সেই ভগবান । ফিরে ফিরে আসছে আকাশ-জল-মাটি-বাতাস আর আগুন দিয়ে তৈরি শক্তি । সময়ের ফুল । তারই মধ্যে তো প্রতিষ্ঠিত হন ভগবান । আর তোরা তাকে বানাচ্ছিস লাশ । ফিরে ফিরে আসছে লাশ । প্রতিদিন । ... অথচ কেউ মানতেই চায় না ।
স্ত্রীলোক -       আমি মানি । (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) আমি যে নিজেই বয়ে বেড়াচ্ছি এক জগদ্দল । লাশের বাড়া লাশ । প্রতিটি প্রহর ।
বৃদ্ধ -            তুই আবার কে রে । (ঠাহর করে দেখে) ও বাবা, এ তো মেয়েলোক । এই অন্ধকারে এখানে কী করছিস ?
কুশল -          ও কি ধর্মরাজা, নিজের বোনকে চিনতে পারছ না ? নদী । তুমি যম, ও যমুনা ।
বৃদ্ধ -            (অনিশ্চিত ভাবে) ওঃ, তা ... কী ? এখানে ? এখন ? কেন ?
স্ত্রীলোক -       তোমার ব্যথার টানে উঠে এলাম । তোমার দীর্ঘনিঃশ্বাসে উঠে এলাম । আমিও যে নিষ্কৃতি পাই না কিছুতেই । অথচ নিঃশ্বাস বন্দ হয়ে আসে । গতি রুদ্ধ হয়ে যায় ।
কুশল -          আমি কি দাঁড়িয়ে থাকব ধর্মরাজা ? এখানেই ? আমাকে নিয়ে যাবে না?
বৃদ্ধ -            কোথায় নিয়ে যাব তোকে ? কোথায় নিয়ে যাব বল তো যমুনা ? স্বর্গে ? নরকে ? কোথায় এর পাপ আর পূণ্যের হিসেব ?
স্ত্রীলোক -       আমায় দিয়ে দাও ।
বৃদ্ধ -            তুই নিয়ে যাবি ? তোকে দিয়ে দেব ? জানি না । ... কিন্তু তুই তো আবার বললি যে তোর নিঃশ্বাস বন্দ হয়ে আসে । কি  যেন এক জগদ্দল ... ।
স্ত্রীলোক -       সে তো ওই পাপপূণ্যের আবর্জনা । দুনিয়ার মানুষের । বেড়েই চলেছে আমার শরীরে । (কুশলের মাথায় হাত রেখে) এ তো আমার গতি, আমার ঢেউ । আমার রোদ-ঝিলিক । একে দিয়ে দাও আমার ভাগে ।
বৃদ্ধ -            তাহলে চল্‌, আমিই একে তোর ঘরে পৌঁছে দিয়ে আসি ।
                   (ছেলেটির হাত ধরে বৃদ্ধ । পাশে স্ত্রীলোক । বৃদ্ধের মাথায় মুকুট । মাঝখানে কুশল চলতে থাকে ।)
                   (ছেলেটির উদ্দেশে) এবারে কী হয়েছিল তোর ? কিসের খুনোখুনি ? না কি অসুখবিসুখ ?
কুশল -          (চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর) রাতে শুয়েছিলাম । বাবা ছিল । মা ছিল । দিদিরা ছিল । হামলার ভয় তো ছিলই । তাই ছোটকা ছিল না বাড়িতে । আর আমরাও ঘুমোইনি কেউ । পালাবার জন্য তৈরি ছিলাম । কিন্তু ভোরের ঠিক আগে হামলা শুরু হতে যেই খিড়কি দিয়ে পালাতে গেলাম, পা হড়কে পড়ে গেলাম কলাবনের কাছে । বাবা পিছু ফিরে দৌড়ে আসছিল । কিন্তু ততক্ষণে একটা প্রচন্ড ঘা পড়ল আমার ঘাড়ে । আর আমি কিছু জানি না । শুধু শুনতে পেলাম কেউ বলছে, “ছাড়বি না এই হারামির বাচ্চাটাকে, এও সেদিন ছিল ছোটর দলবলের সাথে”...
স্ত্রীলোক -       সেদিন মানে ? কোন দিন ? কী হয়েছিল ?
(কুশল দুজনের দিকে অনিশ্চিত ভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে কিছু ভাবে)
কুশল -          আচ্ছা, তোমরা ‘সংস্কার’ বোঝ ? ছোটকা বলে ‘সংস্কারহীন’ হয়ে যাচ্ছে দুনিয়া । ছোটরা বড়দের মানছে না, মুখে মুখে কথা বলছে । যারা শূদ্র তারা মুখ লাগাচ্ছে উঁচু জাতের । রামস্বরূপজি এত করেছেন গ্রামের উন্নতির জন্য । তার বিরুদ্ধে জমায়েত হচ্ছে মুসহরটোলায় আর কোথায় কোথায় । ... তো সেই জন্যই তিনচার সপ্তাহ আগে এক রাতে ছোটকাদের দল গিয়েছিল ওদের টোলায় । আমাকে বলল, “চল, তুইও আজ মরদ হয়ে আসবি ।” টোলার একেবারে শেষের দিকে ভীমজীর ঘর । সবাই ধরা পড়ে গেল । বন্দুকের নলের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল । ... ভীমজীর মেয়ে আমারই ছোড়দির বয়সী । ছোটকা ওকে (ইতস্তত করে) যেমন সিনেমায় থাকে না ? খারাপ সীন । ছোটকা, তার দলের তার জন । তারপর হাসতে হাসতে আমাকে উঠিয়ে ওই ভাবে শুইয়ে দিল ওর গায়ের ওপর । ... আমার কেমন গা ঘিন ঘিন করে উঠল । অন্ধকার, নরম গা, রক্ত । আমি ওদের পায়ের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে পালিয়ে গেলাম । হাঁপাতে হাঁপাতে নিজের বাড়ির কাছে এসে পিছনে দেখলাম । দাউ দাউ করে জ্বলছিল ঘরটা ...
                   (বৃদ্ধ মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে । স্ত্রীলোকটি কুশলের হাত ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে । বৃদ্ধ মুকুটটা মাথা থেকে উপড়ে ছুঁড়ে ফেলে চিতার ওপর । তারপর কোঁচড় থেকে একটা বিড়ি বার করে চিতা থেকে নিভু একটা অঙ্গার খুঁজে তাতে ধরায় । টানতে টানতে গিয়ে বসে পড়ে সিঁড়ির ওপর ।)

[নাটকের মঞ্চ-নির্দেশাদি নিছক মাথায় ঘুরতে থাকা ছবিটা স্পষ্ট করতে চাওয়া । প্রয়োজনে ওগুলো অপ্রয়োজনীয় বলে বাদ দেওয়া যেতে পারে। ]           
__________
১ – জামাইবাবু  
২ – জ্ঞাতি

[২০০৯, ২০১০ বা ২০১১র সঞ্চিতা, সাহিত্য সংখ্যায় প্রকাশিত]

Wednesday, October 24, 2018

শিল্পীর প্রতিশোধ


পকেটমারি নিঃসন্দেহে একটা শিল্প । কী নিপূণ শল্যচিকিৎসা ! পকেটের ভিতর ঠিক যে ফোলা জায়গাটার কথা ভেবে ভেবে আপনি ট্রেনের কামরায় দিব্যি হাওয়া খেতে খেতেও শুয়ে ঘুমোতে পারছেন না, ফোঁড়ার মত টিস দিচ্ছে বার বার, আপনার হৃদয় ও মস্তিষ্ককে বন্দী করে রেখেছে ... আপনি কিছু বুঝতে পারার আগেই সেই ফোলা জায়গাটা গায়েব, আপনি মুক্ত । কিছুক্ষণ পকেটের কাটা ফাঁকটায় বোকার মত হাত ঢুকিয়ে, যন্ত্রণায় হায় হায় করে নেওয়ার পর আপনি নিশ্চিন্তে, মানে চিন্তা করেও যখন লাভ নেই, ঘুমোতে পারেন – সত্যি বলতে কি, না চাইলেও ঘুমিয়েই পড়েন ক্লান্তিতে । 
বর্ধমান স্টেশনে ট্রেনটা দাঁড়াতেই সাধারণ কামরায় গেটের মুখে ঢুকবার জন্য ধ্বস্তাধ্বস্তি । হঠাৎ সব কোলাহল ছাপিয়ে একটা গালাগালের নির্ঝর প্রবাহিত হল আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সকলকে ঠেলে সরিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল একটা রোগা দড়ি পাকান লোক । সাদা প্যান্ট, সাদা পাঞ্জাবী, গলায় বজরঙ্গবলীর সুতো আর কদমছাঁট চুল । পাতলা গোঁফ । হাতে একটা ছোট্টো ফোমের হাতব্যাগ – যা তখনকার অফিসবাবুদের মধ্যে প্রচলিত ছিল । বিহার অঞ্চলের বহুভাতে বা রিসেপশনে সন্ধ্যেবেলায় বরের বাবা বা কাকা, মানে যাঁরা ফান্ড ইঞ্চার্জ হতেন, তাঁরাও রাখতেন । এক খোপ থেকে রান্নার দেখনদারকে হঠাৎ জরুরি হওয়া অতিরিক্ত চালের দাম দিতেন, অন্য খোপে নিমন্ত্রিত অনেকের দেওয়া গিফ্‌ট এনভেলপ গুঁজে রাখতেন ।
লোকটি সিট খোঁজার জন্য এগিয়ে এল না । বিপরীত দিকের বন্ধ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে গেল এবং আশে পাশে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকা – বিশেষ করে সেই সব লোকেদের সাথে যারা নিজেদের জামাকাপড়ে, চেহারায় প্রতিফলিত শ্রেণীদোষে ধ্যাঁতানি খাওয়ার থেকে পেচ্ছাপখানার ধারে শুয়ে পড়া শ্রেয়ষ্কর মনে করে – ঠিক তেমনই আত্মবিশ্বাসী হাসিঠাট্টা আরম্ভ করল যেমন ঠিকেদারের দালাল ঠিকেদারের ‘জন’দের সাথে করে ।
বাইরে মে মাসের রাত । ট্রেনটা ভারতের তদানীন্তন কুড়ি হাজার মাইল বাতিল রেলপথের মাত্র কয়েকশো মাইলে, গতি কম হাল্লা বেশির রীতি অনুসরণ করে ‘ম্যাটার ইন মোশন’এর উচ্চকিত জানান দিতে দিতে চলছিল ।
লোকটি মস্করা জারি রেখেছিল বার বার ঘুমিয়ে পড়া এক বৃদ্ধের সাথে । বিবাহকেন্দ্রিক রসিকতা, যা এমত অবস্থায় কথার পিঠে কথা জাগিয়ে রাখার জন্য হয়ে থাকে । হঠাৎ তার চোখ পড়ল ছেলেটির ওপর । পড়তেই তার চোখদুটো, ওস্তাদ জহুরির মত, মুক্তোর মালার মাঝে একটা নকল পূঁতি দেখে ফেলার মত কুঁচকে উঠল , “তুই এখানে কোত্থেকে ? তোকে আগে দেখেছি মনে হচ্ছে !” ছেলেটি নিরীহ চোখ তুলে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল ।
-       কোত্থেকে উঠেছিস ?
-       আজ্ঞে, হাওড়া থেকে ।
-       যাবি কোথায় ?
-       আজ্ঞে, পাটনায় ।
-       কলকাতায় কোথায় থাকিস ? (ছেলেটি একটা জায়গার নাম বলে) বুঝেছি ।
লোকটি প্রজ্ঞার গভীর স্তরে কিছু একটা সংকেত পাওয়ার মত মুখভঙ্গি করে আমাদের দিকে, অর্থাৎ সিটে, বাঙ্কে, দুটোর মাঝখানে গাদাগাদি হয়ে থাকা সমবেত ভদ্র ও আধাভদ্র মন্ডলির দিকে মুখ ফেরাল ।
-       ভাই, আপনারা সবাই একটু সামলে চলবেন । এ মালকে আমি চিনি । এরা একলা ওঠে না । মনে হচ্ছে পুরো গ্যাংটাই এই ট্রেনটায় উঠেছে । নিজেদের পকেট, জিনিষপত্র ইত্যাদি সামলে রাখবেন ।
বলে, ঘুরে তাকাল ছেলেটির দিকে, “দেখি তোর টিকিটটা দেখি !” টিকিটটা নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখে ফিরিয়ে দিল । একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে স্বগতোক্তি গোছের করল, “চল ! বোঝা যাচ্ছে সারারাত তুই কাউকে ঘুমোতে দিবি না ।“
আমি ওদের কথার ফাঁকে ফাঁকে ছেলেটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলাম । বেঁটে, কালো, মজবুত গড়ন । কদমছাঁট চুল, ভোঁতা নাক, মোটা ঠোঁটে হাওড়া স্টেশনে খাওয়া পানের লালচে রেখা । এই দুঃসহ গরমেও ওর জমকালো শার্টের নিচে ততোধিক জমকালো একটা কলারওয়ালা পলিয়েস্টার গেঞ্জি । গলায় জোড়া খুকরির লকেট ঝোলানো কালো সুতো । জংঘার কাছে উত্তেজকভাবে আঁটসাট একটা ধুসর সবুজ প্যান্ট । কোমরে ৭৮৬ মার্কা বাক্‌লসের বেল্ট । পায়ে জমকালো চটি, সাধারণতঃ যে ধরণের চটি মুসলমান গরীব ছেলেরা ধান্দায় দুপয়সা কামালে পরে । দেখে পকেটমার মনে হয় না । কিন্তু একটা ইংগিত আছে চেহারায় । বিশেষ করে জংঘাদুটোয়, নাক আর ঠোঁটে । চোখদুটোর অভিব্যক্তিশূন্যতায় । অর্থাৎ, সিনেমায় ব্ল্যাক করা, মদ খেয়ে ফুর্ত্তি করা, দল বেঁধে নিষিদ্ধপল্লিতে যাওয়া, মারপিট করা ... ছেলেটি সেই যে প্রথম প্রশ্নের সাথে উঠে দাঁড়িয়েছিল তারপর আর বসে নি । মুখে একটা বিনীত বাধ্য ভাব, যদিও শরীরের পেশীগুলো জানলা দিয়ে আসা হাওয়ার চাপে দুর্বিনীত ভাবে ফুটে উঠছিল । শেষে লোকটির এক ধ্যাঁতানি খেয়ে বসে পড়ল ছেলেটি ।
হয়ত ঘুমে ঢুলছিলাম । ট্রেন কখন দুর্গাপুরে ইন করেছিল জানি না। ঢুলুনি ভাঙল একটা কর্কশ চিৎকারে । চোখ খুলে দেখলাম লোকটি ছেলেটিকে জাগাচ্ছে রুক্ষ স্বরে, “এ্যাই, ওঠ শালা !”
চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে দাঁড়াল ছেলেটি । লোকটি ওর গায়ে কোথাও হাত না লাগাল না । ওর সামনাসামনি কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে হিসহিসিয়ে উঠল, “ভালো চাস তো ব্যাগটা দিয়ে দে !”
তখনও ঘুমে ঢুলছিল । লোকটি ওর মাথাটা সজোরে দেয়ালে ঠুকল, “ভালো চাস তো দিয়ে দে বলছি ব্যাগটা । আমি একটুও মারব না তোকে ।“
যেন এতক্ষণে বুঝতে পারল প্রশ্নটা । মুখ তুলে তাকিয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়ার মত করে প্রশ্ন করল, “কোন ব্যাগ ?”
-       ও, তুই এখন ব্যাগটা চিনিসও না !
একটু ক্ষণ তাকিয়ে ওর মুখ ঠাহর করল লোকটি । তারপর হঠাৎ বেদম জোরে একটা ঘুষি চালাল ওর বুকে । ছেলেটি বুকে হাত চেপে ডুকরে উঠল ।
ব্যাপারটার ইশ্বরীয় রসিকতায় সকলেই নড়ে চড়ে উঠে বসেছিল ততক্ষণে । আড়ালে হাতের স্পর্শে নিজেদের পকেট ও মালপত্রের ঠাহর নিতে নিতে তারা সমাজের বিবেকের মত চারদিক থেকে মুখ বাড়িয়েছিল, “কী হল ? হলটা কী ? যে ওর টুপি চেনাল তাকেই ও টুপি পরাল ? যাস্‌সালা !”...
লোকটি তখন পাশের জনকে প্রশ্ন করছিল যে মাঝে ছেলেটি কোথাও গিয়েছিল কিনা । পাশের জন দুর্গাপুর স্টেশনে ছেলেটির একটুক্ষণের জন্য নামার কথা জানাল । লোকটি আবার ঘুরল ছেলেটির দিকে ।
-       কোথায় গিয়েছিলি ?
-       খাবার খেতে ।
-       কী কী খেলি ?
-       দুটাকার পুরি-তরকারি ।
-       কত টাকা ছিল তোর পকেটে ?
-       দশ টাকা ।
লোকটি ওর পকেটে হাত ঢোকাল । একটা পাঁচ টাকার নোট ।
-       শালা, দশ টাকা থেকে দুটাকার খেলে পাঁচ টাকা থাকে ?
-       দুটাকা কোথায় ? দুটাকার আমি আর দুটাকার আমার বন্ধু ।
-       বন্ধু ? বন্ধু কোথায় ?
-       অন্য কম্পার্টমেন্টে বসেছিল । দুর্গাপুরে নামার ছিল, নেমে খেয়ে চলে গেল ।
-       ও, তাই না ? তাহলেও যে ছটাকা থাকে !
-       ওই তো, চার আনার বিড়ি কিনলাম আর বাকি পঁচাত্তর পয়সা ...।
বলে বিড়ি আর পঁচাত্তর পয়সা খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে উঠল ছেলেটি । বোধহয় সময় নিচ্ছিল । তখনও ফোঁপানি বন্ধ হয় নি ।
-       মিছি মিছি আমি মার খাচ্ছি । আমি কোনো ব্যাগ দেখিনি, নিইও নি, আমি জাতিতে চামার, আমার ঘর পাটনায়, সেখানে নথুনি চামার মিঠাপুর ঘুমটির ধারে বসে, সে আমার বাবা ... এই তো, এই দেখুন !
যেন বিরাট একটা প্রমাণ বার করে এনেছে নিজের নির্দোষিতার, সেভাবে কান্না থামিয়ে এক মুঠো বিড়ি আর পঁচাত্তর পয়সা ছেলেটি ভিতরের গেঞ্জির পকেট এবং প্যান্টের পিছ-পকেট থেকে বার করে আনল ।
হিন্দী সাহিত্যের খ্যাতিমান লেখক অমরকান্তের একটা গল্পে নায়ক চুরির মিথ্যা অভিযোগে মার খায় আর চ্যাঁচায়, “আমি বঢ়ই, আমি বঢ়ই” । বঢ়ই অর্থাৎ ছুতোর মিস্ত্রী । অমরকান্ত বলেন যে লোকটি নিজের জাতির পরিচয় এমন ভাবে দেয় যেন দুনিয়ায় আর যে যা ইচ্ছা করুক, বঢ়ই জাতির লোক চুরি করতে পারে না ।
তবে এই ছেলেটি ‘আমি জাতিতে চামার’ সেই অর্থে আওড়াচ্ছে বলে মনে হল না । বরং ভাবটা এমন ছিল যেন ও জানে যে আশেপাশের লোকেরা প্রায় সবাই উঁচু জাতের, আর তাই এটা ওর নিয়তি যে চুরি করুক আর না করুক, মার খাবেই, তবু ! যদি কারো দয়া হয় ...!
এক্কেবারে সেন্টুতে ঘা লাগান রাজনীতি । স্পষ্ট দেখলাম আশেপাশের সবার মুখে এক মুহুর্তের জন্য কথাটার প্রভাব পড়ল ।
লোকটি স্থির দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল । তারপর শেষ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলার মত করে দাঁতে দাঁত চাপে আস্তে আস্তে প্রশ্ন করল, “শেষবার তোকে জিজ্ঞেস করছি, ব্যাগটা তুই দিবি কিনা ?”
-       আমি ব্যাগটা নিই নি বল...
হঠাৎ বেধড়ক ঘুষি আর কনুইয়ের গুঁতো চালাতে শুরু করল লোকটা, ছেলেটির শরীরের মোক্ষম জায়গাগুলোয় – পেটে, পাখনার হাড়ের খাঁজটায়, বুকের একটু নিচের দিকে, কাঁধে, পিঠে, আর নাকে তো বটেই ।
এক ঝোঁক চলার পর লোকটি হাঁপিয়ে উঠল । ছেলেটি ডুকরে কাঁদছিল কিন্তু আশ্চর্য, অজ্ঞান হওয়া তো দুরের কথা, পড়েও গেল না মাটিতে । বসলও না, ঠায় দাঁড়িয়ে রইল । যেন জানান দিচ্ছিল যে আমি ছোটো জাতের, আপনাদের সামনে বসা, তা সে যত মারই খাই না কেন, পড়ে যাওয়ার আগে অব্দি আমার কি সাজে ?
জানান দিতে থাকা এই জন্য বললাম যে ছেলেটি যদি পকেটমার নাও হয়, তাহলেও, কলকাতায় কাজ করা আর ফূর্ত্তি করা সৌখিন ছেলের চেতনার এই স্তর থাকতে পারে না যে ট্রেনে উঁচু জাতের লোকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ।
এবার সমাজের বিবেকদের হস্তক্ষেপ করার পর্যায় । এক এক করে প্রশ্ন উঠতে আরম্ভ করল, “কী ব্যাপার”, “কখন হয়েছে”, “ব্যাগটায় কী কী ছিল” ...। মাঝে মাঝে শ্মশ্রুশোভিত স্বগতোক্তি, “যা অবস্থা হয়েছে দেশের”, “কী দিনকাল পড়েছে”, “কাউকে বিশ্বাস করা যায় না” ইত্যাদি । এরই মাঝে ছেলেটি এক্কেবারে মোক্ষম বিষাদ কবিতার সুরে ডুকরে ওঠা শুরু করল ।
লোকটি এদিকে পুরো ঘটনাটা পঞ্চপরমেশ্বরকে শোনাল । বলল, যে সে ছেলেটিকে আগেই ভালোভাবে চিনেছিল ।
-       কী রে, কলকাতায় কোথায় থাকিস তুই ?
-       ওই তো, ...পট্টির দিকে, ...ব্যাপারির দোকানে কাজ করি ।
-       হুঁ, হুঁ, বেশ বুঝেছি তুই কেমন কাজ করিস ।
এবং আবার সে পঞ্চপরমেশ্বরের মুখোমুখি হল ... যে তার ব্যাগে টাকা এমন কিছু ছিল না । মাত্র দেড়শো টাকা, তা যদি ও ফেরৎ নাও দেয় তাহলেও সে কিছু বলবে না । কিন্তু তাছাড়া তার ব্যাগে ছিল পঞ্চাশটা আবেদন পত্র । ট্রান্সফারের । কলকাতা থেকে মোকামা এবং আশেপাশের অঞ্চলে । মোকামায় নেমে, আবেদনগুলো নেতাকে দিয়ে রেকমেন্ড করিয়ে তার দিল্লী যাওয়ার ছিল পরের ট্রেন ধরে । সেখান থেকে ওগুলো স্যাংশন করিয়ে আনার ভার ছিল তারই ওপর । লোকটি দুহাত তুলে রাজসিক আলস্য এবং নিশিন্ততার ভঙ্গী করল ।
-       যা হোক, তাও কোনো ব্য্যাপার নয় । খামোখা একটু দেরি আর ঝুঠ ঝামেলা, এই আর কি । এখন মোকামায় নেমে সবচেয়ে আগে এই খবরটা অফিসে দিতে হবে । তারপর জীপ নিয়ে বেরিয়ে ... মোকামায় এদের একটা দল আছে, সেই দলটার কাছে যেতে হবে । ব্যাগ তো আমি ফেরৎ পাবই । হ্যাঁ, আবেদনগুলো বাজে কাগজ হিসেবে ফেলে দিয়ে থাকলে আবার কলকাতায় গিয়ে সবাইকে দিয়ে লিখিয়ে ডিপার্টমেন্টে ফরোয়ার্ড করাতে হবে । দেরি হবে একটা দিন । (ছেলেটির দিকে তাকিয়ে) তোকে আমি বুঝিয়ে দেব তুই কার হাতে পড়েছিস । হাত পা ভেঙে চিরজীবনের জন্য অকেজো করে রেখে দেব । সোজা কথায় তুই দিলি না । ফের বলছি দিয়ে দে । এখনও বুঝিস নি তোর এবার কী হতে চলেছে ।
ছেলেটি আবার ডুকরে উঠে বিড়বিড় করল, “আমি নিই নি বলছি ব্যাগটা ...” ।
“তবে রে !” হঠাৎ লোকটি ছেলেটির গালদুটো দুহাত দিয়ে দুদিকে সাঁড়াশির মত টেনে মোচড়াতে শুরু করল । একটু পরেই ঠোঁটের কষ বেয়ে দর দর করে রক্ত বেরিয়ে এল । আর ফেনা ।
রক্তের একটা নিজস্ব প্রভাব আছে । চার পাশের লোকেরা একটা নৈতিক ভীতিতে বিড়বিড় করতে শুরু করল, “ছেলেটা পকেটমার নাও তো হতে পারে ! শুধু আন্দাজের ওপর এত মারা উচিৎ নয় । যদি কিছু হয়ে যায় ?”
আমার সামনে বসা ছাত্রটি শেষের কথাটা শুনে ফেলল । ওর বাথরুম যাওয়ার ছিল । নিচে নেমে, ঢিলে করে নেওয়া প্যান্টটা বোতাম লাগিয়ে টাইট করতে করতে জবাব দিল, “কিছু হয়ে যাবে ! আপনারা সেই ভ্রমেই থাকুন । ওর কিচ্ছু হবে না । এর দশ গুণ মার সহ্য করার ক্ষমতা ওদের থাকে ।“
বাথরুম থেকে ফিরে সেও ছেলেটির চুলের মুঠি ধরে দু’চারটা ঘুষি ছাড়ল । জুলপি উল্টো দিকে ঘষল । গালাগাল দিল দু’চারটে ।
-       ওঃ, আবার কান্না হচ্ছে ! দেখি !
বলে ওর চোখে হাত ছোঁয়াল তারপর চুল ধরে আচমকা হ্যাঁচকা টানে মাথাটা ওঠাল । সমবেত ভদ্রমন্ডলীর দিকে চেয়ে বলল, “দেখুন, দেখুন কেমন কান্না ওর । একফোঁটা জল নেই চোখে ।“
হাত ও মুখের সুখ হয়ে যেতে ছাত্রটি গর্বিত ভাবে হাত ঝাড়ল নিজের, যেন নোংরা কিছু পরিষ্কার করার সামাজিক কার্য ও নিজে যেচে করেছে । তার পর আবার চড়ে বসল বাঙ্কের ওপর ।
নিচে জানলার ধারের সিঙ্গল সিটে একজন শিক্ষক গোছের মানুষ বসে ছিলেন । ধুতি, ছাই রঙের পাঞ্জাবি, কাঁধে চাদর । চুল বেশির ভাগ পাকা । তাঁর সৌম্যতা দেখে তাঁর সিটে কেউ দ্বিতীয়জন আধপাছা বসতে আব্দার করেনি, তিনিও কাউকে জায়গা ছাড়েন নি । এটুকু তো তাঁর প্রাপ্যই !
তিনি উদাসীন স্বরে দুচার বার বললেন, “দিয়েই দে না ব্যাগটা ! কেন পড়ে পড়ে মার খাচ্ছিস ?”
ছেলেটি ব্যালেন্সিং ফোর্সের আভাস পেয়ে হঠাৎ এগিয়ে এল নিজের জায়গা ছেড়ে । হাত জোড় করে শিক্ষকের কাছে নিজের নির্দোষিতার কথা বলতে যাবে তখনই ওর কষের রক্ত টপ করে পড়ল নিচে বসা মানুষটির পায়ের ধারে ।
মানুষটি বেঁটেখাটো । কোনোকিছুর ব্যাপারী । সাথে পরিবার, মালপত্র । এতক্ষণ সে সম্পূর্ণ নিস্পৃহভাবে অন্যদিকে তাকিয়ে ঘুমোবার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই করে নি । রক্তের ফোঁটাটা টপ করে পড়ার সাথে সাথে সে বেমক্কা চেঁচিয়ে উঠল, “এ্যাই, এ্যাই, খবরদার ! এগোবি না । শালা, সকলের জামাকাপড় নোংরা করে দেওয়ার মতলব !”
আসানসোল এল । চলে গেল । চিত্তরঞ্জন । মধুপুর । জসিডি । শিমুলতলা । জমুই । ঝাঝা । একটু পরে ভোর ফুটতে শুরু করল ।
ব্যাপারীর চ্যাঁচ্যানি শুনে ব্যাগ-হারান লোকটি কাঁধ চেপে বসিয়ে দেওয়ার পর সেই যে ছেলেটি ঝিম মেরে বসেছিল তারপর আর একবারও ওঠেনি । নড়েও নি । শুধু দাঁত ঠোঁট চেপে রক্ত আর গাঁজটা মাঝে মাঝে বার করে দিচ্ছিল মুখ থেকে । সেটা গড়িয়ে পড়ছিল কিছুটা ওর জামায়, কিছুটা মেঝেতে ।
ঝাঝার একটু পরে একটা ছোট্টো স্টেশনে এসে ট্রেনটা দাঁড়িয়ে গেল অন্য একটা ট্রেনকে বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা দিতে । যাত্রীরা, বিশেষ করে পুরুষ যাত্রীরা প্রায় সকলে বাইরে এসে প্ল্যাটফর্মে ও লাগোয়া দেয়ালে বসে পড়ল । ভোরের আবছা আলোয় ছেলেটিকেও নামিয়ে আনল লোকটি ।
বাকি সকলে দেয়ালে চড়ে বসল, ছেলেটি নিচে বসল হাঁটু মুড়ে । আস্তে আস্তে সকালের আলো বেড়ে উঠল । স্টেশন থেকে বাইরে গিয়ে একটু নেমে ছোট্টো দু’একটা জলাজমি । ট্রেনটা বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়াবে শুনে অনেকে প্রাতঃকৃত্য সারতে গেল জলার পাশের ঝোপগুলোতে ।
একটু পরে ট্রেনের পিছনের কামরাগুলোর দিক থেকে দুজন জিআরপি একটি ছেলেকে ধরে এগিয়ে এল । ফর্সা, লম্বা, ছিপছিপে শরীরের ছেলে ।
-       কী ব্যাপার ? চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে ।
“বলছিলাম না, এদের পুরো গ্যাংটা এক সাথে ওঠে”, লোকটি নিশ্চিন্ত ভাব দেখায়, “আরো কয়েকটা হবে, এদিক ওদিকের কামরায় ।“
ফর্সা ছেলেটি আমাদের ছেলেটির পাশ দিয়ে চলে গেল । দুজনের কেউই একে অন্যের দিকে তাকাল না ।
হঠাৎ আমাদের ছেলেটির পাশে মজা-দেখতে-সেঁটে-থাকা এক বালক উল্লসিত হয়ে ঘোষণা করে, “বলছে পায়খানা পেয়েছে ! নিশ্চয়ই পালাবার মতলব !”
লোকটি দুহাত দূরে বসেছিল । ওকে ঘিরেছিল কয়েকজন যেন নায়ককে ঘিরে রেখেছে । লোকটি দেয়াল থেকে পা নামিয়ে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙল । তারপর এগিয়ে এল ।
-       কী রে, পায়খানা পেয়েছে ? না, পালাবার মতলব ?
ছেলেটি করূণ চোখ তুলে তাকাল । তারপর আবার চোখ নামিয়ে ফোঁপাতে থাকল ।
-       যা যা ! এখানে হেগে প্যান্ট নোংরা করতে হবে না । যা পায়খানা করে আয় গিয়ে ।
ছেলেটি তবু উঠল না ।
-       যা বলছি !
ছেলেটি এবার উঠল । কিন্তু দাঁড়িয়ে রইল ।
-       কী হল ?
-       কেউ সাথে ...
-       কোনো দরকার নেই । পালিয়ে তুই যাবি কোথায় ?
ছেলেটি মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে এগোল কামরার দিকে । ফচকে বালকটি নিজে থেকেই ওর সঙ্গ নিল ।
একটু পরে বালকটি কামরার দরজা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ঘোষণা করল, “পায়খানাতেই গেছে !”
ব্যাগ-হারান লোকটি এদিক থেকে স্নেহশীল ধমক দিল, “এ্যাই, নিচে নাম ! ও কোথাও যাবে না । তোর সাথে থাকার কোনো দরকার নেই ।“
বালকটি তবুও নামল না। ওখানেই দরজায় দাঁড়িয়ে হ্যান্ডেল ধরে ঝুলতে থাকল । মাঝে মধ্যে ভিতরে গিয়ে দেখে আসছিল ।
সূর্য উঠতে রোদ্দুর ছড়িয়ে পড়েছিল । হঠাৎ বালকটি উত্তেজিত ভাবে এল দরজার কাছে, “নেই ! পালিয়ে গেছে !”
বাকি সকলে উত্তেজিত । কিছু করবে এই আশায় ঘুরে তাকাল লোকটির দিকে । কিন্তু লোকটি নিশ্চিন্ত ভাবে যেমন কান খোঁচাচ্ছিল দেশলাই কাঠি দিয়ে তেমনই খোঁচাতে থাকল ।
-       ও কোথাও যেতে পারবে না । মোকামা থেকে কলকাতার মাঝে কোথাও ওর লুকোবার জায়গা নেই । ও বুঝে গেছে কার খপ্পরে পড়েছে ।
সকাল ছটা । ট্রেনটা চলছিল দুদিকের টাল (বর্ষায় জলডোবা প্রান্তর) পিছনে ফেলে । ছেলেটি আর ফিরে আসে নি । কেউ তার টিকিরও দেখা পায় নি ।
আমি বাঢ় স্টেশনে নেমে চা খাচ্ছিলাম । কামরার দিকে চোখ ওঠাতে লোকটিকে দেখলাম দাঁতন করছে । হঠাৎ ওর মুখটা মনে হল শীর্ণ, একটা কিছুর ভয়ে সন্ত্রস্ত আর সতর্ক, চিন্তিত ।দাঁতন সরিয়ে থুথু ফেলে ও কিছুক্ষণ নিরুদ্দিষ্ট ভাবে পাথরের নুড়ির ওপর পড়া থুথুটার দিকে তাকিয়ে রইল ।
ট্রেনটা স্টার্ট নিচ্ছিল । আমি চড়তে গিয়ে লক্ষ্য করলাম, বেশ কয়েকজনের কাঁধের ধাক্কা খাওয়া সত্ত্বেও ও নিজের ভঙ্গিতে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, অন্যমনস্ক, অন্যদিকে তাকিয়ে । একটুও নড়ছে না । হয়ত, খেয়ালও করছেনা যে ওর ধাক্কা লাগছে ।             
     

[২৭.৪.৮৫]

বিশ্বনাথ সিং


“মুখ্যমন্ত্রী তখনও আসেননি । বাইরে ভীড়ে ভীড় । আমিও বসে গেলাম এক কোণে । রাত তখন ন’টা । আর্দালিটা বলল, কখন ফিরবেন জানা নেই ।

“সে অবশ্য আমিও জানতাম । ডামাডোল অবস্থা সরকারের । আগেরদিন বিধানসভায় অর্থমন্ত্রী নাস্তানাবুদ হয়েছে বিরোধীপক্ষের হাতে । ইন্ডাস্ট্রিগুলোর তো দেখছেনই কী হাল !

“বসে রইলাম । রাত সাড়ে দশটায় মুখ্যমন্ত্রী এলেন । দু’একজনের পরেই আর্দালি বাইরে এসে ডাকল, ‘বিশ্বনাথ সিং !’

“আমি ভাবিনি যে আমায় দেখতে পেয়েছিলেন বারান্দা দিয়ে ঢোকার সময় । বললে বিশ্বাস করবেন না, দশ মিনিট ! অন্য সকলে যেখানে দেড় দুই মিনিটে বেরিয়ে আসছিল সেখানে দশ মিনিট বসিয়ে রাখলেন আমাকে । গ্রামের খবরাখবর জিজ্ঞেস করলেন ।

“... হ্যাঁ, আমাদেরই এলাকার তো । আমাদের গ্রামের পাশের গ্রামের । সে অনেক কথাবার্তা হল । আমি বললাম আমার কাজ ক’টার কথা । এক, গ্রামের উত্তরদিকের ক্যানালটার পাড় উঁচু করানো । বিডিও যা উত্তর দিয়েছিল তাও বললাম, যে কোনো ডেভেলাপমেন্ট ফান্ডে একটা কানাকড়িও নেই । অন্ত্যোদয়ের নামে সব হালে উপুড় করে পকেটে ভরেছে । একটা ফান্ডে শুধু কয়েক হাজার টাকা আছে । সেই টাকাটা যদি সেচের ফান্ডে ট্রান্সফার করানো যায়, তবে সে টাকায় কাজটা হয়ে যেতে পারে । ... আপনি একটু দেখুন ব্যাপারটা । সামনেই বর্ষাকাল আসছে । তার আগে কাজটা হয়ে যাওয়া দরকার । তা বললেন দেখব যথাসাধ্য চেষ্টা করে ।

“আর কাজ ছিল খুড়তুতো ভাইদুটোর চাকরির । তা তক্ষুনি লিখে দিলেন । একজনের বারৌনিতে, অন্যজনের রোহতাসে ।

“তারপর দুখড়া গাইলেন অনেক । তোমরা তো সবেতেই দোষ দেখতে পাও সরকারের । কম্যুনিস্ট পার্টির আবার একটা সত্যাগ্রহ আন্দোলন রয়েছে সামনের মাসে । সরকারের ভিতরেই টাস্‌ল লেগে আছে ।

“তোয়াজ করবে না ? ওই এলাকায় যেই দাঁড়াক, তার কাছে আমার চ্যালেঞ্জ, দু’হাজার ভোট আমি তার কেটে নেব । আজ পনের বছর ধরে ওই গ্রাম কম্যুনিস্ট পার্টির পাক্কা ঘাঁটি, একটা ভোটও এধার ওধার যাবে না । কম্যুনিস্ট পার্টি জিতুক না জিতুক, সে আলাদা কথা । কিন্তু ওই কটা ভোট এক কথায় কম্যুনিস্ট পার্টির ।

“আরে এই গত ইলেকশনেই তো । একটাও বুথে পোলিং এজেন্ট পর্যন্ত ছিল না । একটাও ভোট পড়ে না জানে, থেকে কী করবে ? ইলেকশনের পর প্রথম গিয়েছিলাম, তা দোষ দিতে শুরু করলেন যে তোমরা আমাদের পোলিং এজেন্টকে মেরে ভাগালে ! আমি বললাম যে আপনাদের একটা ভোটও যেখানে পড়ে না, আপনি ভালো করেই জানেন, সেখানে পোলিং এজেন্টকে মেরে ভাগানোর কথা আসছে কোত্থেকে ? আরে ওর বন্ধুরাই ওকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল চা খেতে । ওখানে বসে করার তো কিছু ছিল না । তারপর মাল টেনেছিল – সেখানেই বচসা তারপর মারপীট ! এখন তার বদনাম দেওয়া হচ্ছে আমাদের ওপর !আরে আমরা কম্যুনিস্ট পার্টি বানিয়েছি, কাউনো লুচ্চা লফঙ্গার দল থোড়েই না ?”


বিশ্বনাথ সিং তার ব্যাকব্রাশ কাঁচাপাকা চুলে হাত বোলালো । ছোটো চোখদুটো কুঁচকে আরো ছোটো হয়ে গেল গর্বিত আর সহজ একটা হাসিতে । পান সিগারেট কিছু খায় না তাই সামনের দাঁত চারটে ঝকঝকে । ময়লা নীল টেরিলিনের শার্টের বোতাম খোলা । ভিতরে ছেঁড়া নংরা একটা গেঞ্জি । পিতল রঙের টেরিলিনের প্যান্টটা কালচে হয়ে গেছে । পায়ে হাওয়াই চপ্পল । গামছাটা টেবিল থেকে নিয়ে ঘাম মুছল কপালের । দুটো মেয়ে ঢুকল দোকানে । একজনকে আগেও দেখেছি । মার্ক্স-এঙ্গেলস সিলেক্টেড হিন্দীটা কিনে নিয়ে গিয়েছিল । দ্বিতীয়জন নতুন । একটু পরে ভিতর থেকে এল মহেশ, “দাদা, শুনুন তো এরা কোন বই চাইছে !” আমি চাইলাম মেয়েদুটোর দিকে ।
-      আর পি দত্ত, ভারত ...কী যেন !
-      রজনি পাম দত্ত ? আজ কা ভারত ?
-      জী ! জী !
-      আছে নাকি মহেশজী ?

বিশ্বনাথ সিং মাথা নাড়ল, “নাঃ, আর থাকলেও সব বাঁধাছাঁদা হয়ে গেছে । আর বার করাও যাবে না”। মহেশ ওদিক থেকে একটা বইয়ের প্যাকিং বাক্স কাঁধে উঠিয়ে এনে দোকানের বাইরে রাখল । পাশেই ডাঁই করে রাখা আছে পুরোনো অনেক ছবির এ্যালবাম, বই, গ্রামোফোন রেকর্ড । ওগুলো এমনিই ফেলা যাবে । আমি ওর মধ্যে থেকে হাঁটকে একটু আগে বার করেছি, অজন্তার ফ্রেস্কোর একটা এলবাম, কিছু চিনে তুলি-কালির ছবি, লেনিনের প্রিয় গানের একটা গ্রামোফোন রেকর্ড আর রুশী মহাকাশযান থেকে পৃথিবীতে ভেসে আসা কন্ঠস্বরের একটা ছোট্টো প্লাস্টিক রেকর্ড ।
-      দোকান উঠে যাচ্ছে ম্যাডাম ।
-      মানে, পিপল্‌স বুক ... থাকবেই না ?
-      থাকবে । ওইদিকে, আরিফগঞ্জে, আমাদের অফিসটা দেখেছেন ?
-      কেন ? এখানে কলেজ, ইউনিভার্সিটি, স্টুডেন্টদের হস্টেল !

আবার বিশ্বনাথ সিং জবাব দিল, “রুস গির ন গয়া ম্যাডাম ! এখন এ দোকানের ভাড়াও বাড়িয়ে দিয়েছে বাড়ির মালিক । অত ভাড়া দেওয়া পোষাচ্ছে না ।“ মেয়েদুটো বেরিয়ে গেল ।
............     


“আ ই আজ কে বাত বা ? মায়ট্রিক মা পঢ়ত রহনি তবহিয়ে সে !” বিশ্বনাথ সিং আবার ফিরে গেল পুরোনো কথায়, “ ... ছুটির শেষে বাঁধের ওপর দিয়ে ফিরছিলাম । দেখি ভীড় জমে আছে । ভিতরে ঢুকে দেখি একজন দুসাধ, তালগাছ থেকে পড়ে মরে গেছে । আর লোকজন নিয়ে তখনই ছুটে এসেছে বৈজনাথ সিং । হাতে কিসের শালা একটা চোথা কাগজ। দেখি ওই দুসাধের আঙুলে কালি লাগিয়ে টিপছাপ দেওয়াচ্ছে তাতে । আমি দেখে এগিয়ে শালা ঝাঁপ দিয়ে কাগজ ছিনিয়ে নিলাম । কিসের টিপছাপ ? নাকি ওই দুসাধ পাঁচশো টাকা নিয়েছিল বৈজনাথের কাছে । ভেবেছিল ফিরিয়ে দেবে তাই কাগজ করেনি । হঠাৎ মরে গেল । তাই ! ... মিথ্যে কথা । প্রমাণ আছে কোনো ? আর কে কবে শুনেছে যে মরা মানুষের আঙ্গুলের টিপছাপ নেওয়া হয় ? বেচারার কিছুটা জমি আছে সেটা হড়পাতে চাও তাই শালা মিথ্যে দলিল নিয়ে এসেছ ! বৈজনাথ সিং গর্জিয়ে উঠল, এ হৃদে সিং কে বেটা, তুই ছোটো ছেলে, এসবে লাগতে আসিস  না । দিয়ে দে দলিলটা । আর দলিল ! ভীড়ের মধ্যে থেকে কেউ মুখে রা কাড়ছিল না কিন্তু আমরা চারজন বন্ধু তো ছিলামই । ধাওয়া করতেই দলিলটা হাতে নিয়ে পালালাম । তারপর ওদের দেখিয়ে শালা চোথা কাগজটা ছিঁড়ে কুটি কুটি করে উড়িয়ে দিলাম ।

“বাড়ীতে এসে কাউকে কিছু বললাম না । সন্ধ্যেবেলায় বৈজনাথ সিং এসে হাজির । কাকা বাইরে বসেছিল । কাকাই তো বড় করেছে আমাকে আর ভাইদের । পড়াশোনা করেনি কিন্তু জেদি লোক । যা ভাববে ঠিক, তাই ঠিক থাকবে – তার জন্য লাঠি চলুক আর বন্দুক চলুক । তা কাঁদুনি গাইল বৈজনাথ সিং । কাকা আমাকে ডাকলেন । গেলাম । যা যা হয়েছিল সব বললাম । শুনে ফিরে তাকালেন কাকা বৈজনাথ সিংএর দিকে । তা বল্‌। তোর কী বলার আছে ? বৈজনাথ সিং বলল, বলার আর কী ? ওইটুকু ছেলে ! সব জায়গায় যদি নাক গলাতে চায় তাহলে চলে ? কোনোদিন যদি কিছু হয়ে যায় ...! শুনেই কাকা ক্ষেপে গেলেন, হয়ে যায় মানে ? তুই কী বলতে চাস ? বলি, মরা মানুষের আঙুলের ছাপ নেওয়া হচ্ছে এটা কে কবে কোথায় শুনেছে ? ঠিক করেছে ও । আবার ওই সব হলে আবার করবে । ছোটো ছেলে বলে কি চোখের সামনে দেখবে, বুঝবে অন্যায় হচ্ছে আর মেনে নেবে ?

“বৈজনাথ সিং জানত কাকাকে টলান যাবে না । তাই ঘাঁটাল না বিশেষ । ফিরে গেল । আর আমাদের আর কী ? বুঝতেই পারছেন ! বাড়িতে যে জেঠ লোক, তারই যখন এই ভাব তো আমাদের আর রোখে কে ?


“পাঁচ মাস পরে আবার লাগল ঝগড়া ! ...