Thursday, October 4, 2018

বিদ্যাসাগর পথ, কর্মাটাঁড়


প্রথম দৃশ্য

[সকাল। একটা বারান্দাওয়ালা পুরোনো বাড়ির একাংশ বাঁদিকে দেখা যাচ্ছে। সামনে কয়েকটি ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে। একজন একটু এগিয়ে এসে সেলফোনে কথা বলছে। “হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চিন্ত থাকুন। আমাদের টীমের সবাই এসে গেছে। আপনার মন্ত্রী টন্ত্রী আসার আগে সব কিছু রেডি থাকবে। হ্যাঁ, বিদ্যাসাগর দ্বিশতবার্ষিকীর ব্যানার তৈরি আছে, প্রতিমার আবরণ, ফেস্টুন, বৃক্ষরোপণের জন্য দশ বারোটা চারা... যে ক’টা আপনারা ডিগনিটারিজরা পুঁতবেন পুঁতবেন, বাকিগুলো আমরা পুঁতে ফেলব।  ... এ্যাঁ, এখন? আমরা রিহার্সালটা দিয়ে রাখছি একবার। এরপর আর সময় পাবো না। রাখছি ফোনটা। মন্ত্রীর গাড়ী বেরুলেই আমাকে ফোন করে দেবেন। ফোনটা রাখে।]

ছেলেটি -       হ্যাঁ, একনম্বর প্ল্যাকার্ডটা দে। কার কাছে আছে। (একজন এগিয়ে দেয়। ছেলেটি বাড়ির সামনে প্ল্যাকার্ডটা গেঁথে দেয়। লেখা আছে ‘নন্দন কানন, কর্মাটাঁড়’। স্টার্ট! মোড়ল, চাষী, চাষীবৌ, শাস্ত্রীমশাই, সতীশ... (আঙুল দেখিয়ে এক এক করে সম্বোধন করে।) সবাই নিজেদের পার্টগুলোয় আছো?... চলো। (বলে সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। একটি ছেলে শুধু বাড়ির ভিতরে ঢোকে। বেরিয়ে আসে ঈষৎ মেক-আপ, ধুতি আর ফতুয়া চড়িয়ে। ... বাড়ির সামনের বারান্দায় ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পায়চারী করছেন। সামনে টেবিলের ওপর একতাড়া কাগজপত্র রাখা আছে। মোড়ল প্রবেশ করে।)
মোড়ল -        পেন্নাম, দেওতা! সে তো আবার কাহিল হয়ে পড়েছে রে! ...ওই যে বুড়ি, যাকে ওষুধ দিয়ে এলি না তুই গতকাল!
ঈশ্বর-           জ্বর কতো?
মোড়ল -        তা তো জানি না। ওর পড়শি বলছিল, একা একা ঘরে কোঁকাচ্ছে ভোর থেকে। তোকেই যেতে হবে আরেকবার, দেওতা।
ঈশ্বর-           তখন থেকে আমাকে দেওতা দেওতা করছিস কেন বল তো?
মোড়ল -        বাঃ, তুই তো দেওতাই। সবাই তো তোকে ঈশ্বর-দেওতা বলে আশে পাশের সবক’টা গাঁয়ে!
ইশ্বর -          বটে। আমি দেওতা। যেমন তুই মোড়ল।
মোড়ল -        (জিভ কাটে, কান ধরে) না, না। ছি। কী বলছিস। আমি কি সত্যি মোড়ল নাকি? গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরি, দশ ঘরের খবরাখবর নিই, হালচাল পুছি ... লোকে তো দুয়োও দেয় যে আমি নাকি একের কথা অন্যকে বলে ঝগড়া লাগাই, পাকামি করি ... মোড়লিপানা করি তাই মোড়ল বলে ঠাট্টা করে লোকে।
ঈশ্বর    -       তা আমাকেও ওই ধরণের দেওতা বানাতে...
সাঁওতাল -     (চাদরের খুঁট খুলে ছয়-সাতটা ভুট্টা বার করে) ও বিদ্যেসাগর, আজ আর আমার বাজারে গিয়ে এ
                   ক’টা
                   বিক্রি করা হবে না। তুই রাখ, পাঁচ গন্ডা পয়সা দে আমায়।
ঈশ্বর    -       দাঁড়া, (মোড়লকে) দ্যাখ, কী বলল আমায়! বিদ্যেসাগর।
মোড়ল -       (সাঁওতালকে, বিদ্যাসাগরকে দেখিয়ে) এ্যাই, ও কে রে?
সাঁওতাল -     (হাঁপাতে হাঁপাতে, ঈষৎ কেশে) বিদ্যেসাগর (কপালে হাত ঠেকিয়ে) দেওতা, দেওতা আমাদের!
ইশ্বর     -       (এগিয়ে এসে মাটিতে ঝুঁকে সাঁওতালের হাতটা টেনে নিয়েছিলেন, নাড়ি দেখছিলেন) তোর তো
                   জ্বর রয়েছে ভালো রকম। একদাগ ওষুধ দিচ্ছি, খেয়ে বাড়িতে গিয়ে শুয়ে থাক আজকের দিনটা।
                   পাঁচ গন্ডা পয়সাও দিচ্ছি।
মোড়ল -       দেখলি... (বিদ্যাসাগরের চোখের দিকে চেয়ে চুপ করে যায়)
ইশ্বর     -       তুই যা, আমি বুড়িকে দেখে আসবো একটু বেলায়। (ভিতরে চলে যান ওষুধ আনতে, ফিরে
                   আসেন, সাঁওতালকে ওষুধ খাওয়ান) যা, ঘরে গিয়ে একটু আরাম কর সারা দিন। জ্বরটা ছেড়ে যাওয়া উচিৎ। না ছাড়লে কাউকে দিয়ে খবর পাঠাবি। আর, এই নে পয়সা (সাঁওতাল চলে যায়)। (মোড়লের দিকে তাকিয়ে) কী রে, তুই গেলি না? আচ্ছা, যাস নি যখন, একটা কাজ করে দিয়ে যা। বারান্দার ওধারে দেখ্‌ এক গোছা শুকনো ডালপালা রাখা আছে। ঘরের ভিতরে মেঝেতে দড়ি আছে আর তাকে ছুরিও আছে। সব নিয়ে যা আর আমার নতুন আমচারাটার চারদিকে একটা বেড়া করে দে তো। কচি পাতা বেরোচ্ছে নিচের দিকে – গরু, ছাগল ঢুকে খেয়ে যেতে পারে। ... পারবি তো?
মোড়ল -       (উঠতে উঠতে) এটা কোনো কাজ? আমাকে দু’একটা ওষুধপত্তর শিখিয়ে দিতিস, আমিও একটু চিকিচ্ছে করতাম মাঝে মধ্যে।
ঈশ্বর    -       (অট্টহাসি হেসে ওঠেন) ওঃ হো হো, এই জন্যে তুই বার বার আসিস এখানে! তা তুই তো জ্বরই বুঝতে পারিস না নাড়ি দেখে! দুটো ওষুধের নাম শিখেই গাঁয়ের কোবরেজকে টক্কর দিবি? ... তখন সত্যি তোকে লোকে ঠেঙিয়ে গাঁছাড়া করবে। আর আমাকেও করবে তোকে শিখিয়েছি বলে। (ঈষৎ গম্ভীর হয়ে) লোকের ভালো করতে চাস ভালো কথা। সেবাশুশ্রুষা কর। পায়ে তেল লাগিয়ে দেওয়া, মাথা ধুইয়ে দেওয়া ... এগুলোও তো অনেক আরাম করে দেয় রুগীর। আর একটু লেখাপড়া শেখ! তুই তো আমার বড়দের স্কুলটাতেও আসিস না নিয়মিত। ওই যখন তখন চেহারা দেখিয়ে যাস।
মোড়ল -       (বারান্দার ওধারে, কাঠের টুকরোগুলো বাছতে বাছতে) লজ্জা করে। সবাই পেছনে লাগে। ... এই
                   ডালগুলো তো জবর! একদম সোজা সোজা তিন হাত। কোত্থেকে পেলি?
ঈশ্বর    -       গাঁয়ে গাঁয়ে যাই তো রুগী দেখতে। ফেরার সময় জঙ্গল থেকে বেছে কুড়িয়ে জড়ো করেছি।

[মোড়ল ডালগুলো দড়ি দিয়ে বেঁধে কাঁধের ওপর ফেলে। বাকি দড়ির গোছা আর ছুরিটা নিয়ে চলে যায় আমগাছের দিকে। বিদ্যাসাগর, সাঁওতালের রেখে যাওয়া ভুট্টাগুলো নিয়ে ঘরের ভিতরে ঢোকেন।]   


দ্বিতীয় দৃশ্য

[দুপুর বেলা। প্রথম ছেলেটি ঢুকে বাড়ির সামনের প্ল্যাকার্ডটা পাল্টে করে দেয় ‘গেরস্থ ঘর’। আরেকটি ছেলে উঁকি মারে নেপথ্য থেকে।]

দ্বিতীয় ছে-      শুধু একটা প্ল্যাকার্ড লাগিয়ে দিলে হবে? নন্দন কাননের বাড়িটা পাকা। আর এ গেরস্ত ঘর খড়ের ছাউনি, ওপরে লাউমাচা, দাওয়া আর উঠোনটা মাটির...
প্রথম ছে        -         অতশত মঞ্চসজ্জা নিয়ে হবে এই ছোট্টো নাটক? তাও থিয়েটারের স্টেজ হবে না, নেতাদের ভাষণের মঞ্চ হবে। আর পরে যদি করতেও হয় তো পথনাটিকার ধরণে করবো। তখন তো (বাড়ির অংশটাকে ইংগিত করে) এটুকুও পাবো না।

[ছেলেটি আর কথা না বাড়িয়ে একটা বড় চটের ছালা ভিতর থেকে টানতে টানতে এনে ছুঁড়ে ফেলে বাড়ির ছাতের ওপর। তারপর টেনে নামিয়ে ঢেকে দেয় ছাতটা। প্রথম জন হেসে ওঠে, “এটা কী হল? আচ্ছা, ঠিক আছে। এবার চল!” দুজনেই বেরিয়ে যায়। ... বিদ্যাসাগর গাঁয়ের পথ ধরে ভিনগাঁ থেকে ফিরছেন। ঘরের দাওয়া থেকে পথের প্রান্ত অব্দি ছোট্টো জায়গাটায় একফালি বেগুনের খেত। বিদ্যাসাগর বসে পড়লেন। ভিতর থেকে এক বৌ পড়ি মরি করে দৌড়ে এল।]

বৌ       -       এ্যাই, কে, কে ওখানে? বেগুন চুরি করার মতলব? ওঠ! ওঠ বলছি। (বিদ্যাসাগর উঠে দাঁড়ালেন। সঙ্গে সঙ্গে বৌটি এক হাত ঘোমটা মাথার ওপর টেনে জিভ কাটলেন।) ইশ্বর-দেওতা! আমি চিনতে পারিনি। ক্ষমা করবেন।
ঈশ্বর    -       (তখনও বেগুনের দিকে তাকিয়ে) তোমরা এই প্রথম বেগুন ফলালে, না আগেও লাগিয়েছ?
বৌ       -       প্রথম। আপনি একটু বসুন না দাওয়ায়, আমি ওকে ডেকে দিচ্ছি। এই তো পিছনেই, আতা গাছটা কাটছে। ফল হয় না। (বলে দৌড়ে চলে যায় পিছনে, এবার দুজনেই হন্তদন্ত হয়ে ঢোকে)।
চাষী     -       আপনি এখনো ওখানে দাঁড়িয়ে। একটু বসবেন না বিদ্যেসাগর? আমার বৌ বুঝতে পারে নি আপনি বসে আছেন ওখানে। ওর দোষ নেবেন না। একটু বসুন এসে। না এলে আমরা অপরাধী হয়ে থাকবো।
ঈশ্বর    -       আমি কিছু মনে করিনি গো। ভরদুপুরে অজানা কেউ খেতের ওপর ঝুঁকে থাকলে তো সন্দেহ হতেই পারে। আচ্ছা চল, দাওয়ায় গিয়ে বসি। (বলে নিজেই গিয়ে কিনারে বসে পড়েন)।
চাষী     -       আ হা হা, ধুলোতে বসলেন কেন? (বৌকে) একটা আসন নিয়ে আয় না শীগগিরই! (বৌ ভিতরে চলে যায়)।
ঈশ্বর    -       লাগবে না। পরিষ্কার আছে জায়গাটা। যা বলছিলাম শোনো। বেগুনগুলো এ কেমন ধারা হয়েছে? ছোট্টো, কোঁকড়ানো, তাও প্রতিটা চারায় একটা দুটো করে? বেগুন তো এ মাটিতে ভালো হওয়া উচিৎ।
বৌ       -       (ততক্ষণে আসন নিয়ে এসে আসন হাতে দাঁড়িয়ে আছে পিছনে) সেই তো। আমি তো বলেছিলাম, আমাদের গ্রামে কত ভালো বেগুন হয়। আপনি এই আসনটায় বসুন দেওতা। (বিদ্যাসাগর উঠে দাঁড়ালে বৌটি আসন পেতে দেয়। বিদ্যাসাগর আবার বসে পড়েন)।
চাষী     -       যা বীজ পেলাম জামতাড়ার বাজারে তাই তো এনে লাগালাম। কেন এমন হল! আপনি একটু সরবত খাবেন বিদ্যেসাগর? দূর থেকে আসছেন, ক্লান্ত হয়ে। আমরা ছোটো জাত নই দেওতা, বৈশ্য। (বিদ্যাসাগর চোখ উঠিয়ে কঠোর দৃষ্টিতে তাকান আর আসন ছেড়ে উঠে পড়েন) না, না, ঘাট হয়েছে, মানে, আমরা জানি আপনি জাতপাত মানেন না, কিন্তু... সরবতটুকু খেয়ে যাওয়ার...
ঈশ্বর    -       (হেসে ফেলেন) সরবত নয়, জল দাও এক ঘটি। সেটাও খাবো না কিন্তু, আগেই বলে দিচ্ছি। না,
                   কোনো রাগে টাগে নয়। কড়া রোদ্দুর তো। আর এতটা পথ যেতে হবে এখন। এখন পেটে জল গেলে ক্ষতি হবে। তবে হ্যাঁ, ঘাড়ে মাথায় জল দিয়ে শরীরটা চাঙ্গা করে নিই। যাও মা, একটু জল এনে দাও। অন্য কোনোদিন তোমার হাতের সরবত খেয়ে যাবো, ঠিক আছে?
                   (বৌটি জল এনে দিলে বিদ্যাসাগর খেতের দিকে সরে এসে ঘাড়ে মাথায় জল দেন, কুলকুচো করেন; ওদিকে বৌটি কিছু একটা ইশারা করে বরকে খোঁচাতে থাকে)
চাষী     -       ইয়ে, বৌ বলছিল ও কি আপনার টোলে আসতে পারে?
ঈশ্বর    -       (মুখে হাসি নিয়ে বিদ্যাসাগর ঘুরে তাকান; বৌটি হাত থেকে ঘটি নিয়ে একটা গামছা এগিয়ে দেয়) বাঃ, এতো উল্টো স্রোত বইছে!
চাষী     -       আজ্ঞে?
ইশ্বর     -       গেরস্থ ঘরের পুরূষমানুষেরা মেয়ে-বৌদের লেখাপড়া শেখাতে চায় না, পড়তে দিতে চায় না। তোমরা তো নতুন যুগের মানুষ গো! ক’পুরূষ ধরে আছো এ গাঁয়ে?
চাষী     -       আমার পূর্বপুরূষের ভিটে জামতাড়ার কাছে। সেখানে আমার দাদারা থাকে। আমি একটু জমি নিয়ে এখানে বসবাস শুরু করেছি দশ বছর হল।
বৌ       -       (নিজে থেকেই) দশ এখনো হয় নি। ন’বছর চলছে। আমার বাপের বাড়ি এখানেই, তবে অনেকটা        উত্তরে। আমাদের গাঁ থেকে যতদূর মিহিজাম, ততদূর কর্মাটাঁড়।
ইশ্বর     -       তা, প্রশ্নটার মানে বুঝলাম না!
চাষী     -       মানে, ও তো বৌ, এক বাচ্চার মা। তা বাচ্চা মেয়েদের সাথে বসতে বেমানান লাগবে, আবার বড় বড় পুরূষমানুষদের সাথে...
ইশ্বর     -       লেখাপড়া না শেখাটাই সবচেয়ে বেশী বেমানান আজকের যুগে। ও মেয়েদের স্কুলে বসতে চায় তো দিব্যি বসবে, কিচ্ছু ভাবার দরকার নেই। আর ওর সময় সুবিধে যদি বড়দের স্কুলের সময় হয়, তাহলে ওর জন্য আলাদা জায়গা থাকবে পর্দা দেওয়া। আসবে, আসতে দেবে তুমি, এটাই বড় কথা। আসি এবার, অনেক বেলা হল। ও হ্যাঁ, এবার যখন কলকাতায় যাব, তোমার জন্য ভালো বেগুনের আর টমেটোর, দেখেছ টমেটো, বিলিতি বেগুন বলে অনেকে, তা সেই টমেটোরও ভালো বীজ নিয়ে আসব। এত খারাপ ফলন হবে কেন? (বিদ্যাসাগর বেরিয়ে যান)
বৌ       -       আশ্চর্য, তুমি একবার খাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করলে না? দুপুর শেষ হতে চলল। নিশ্চয়ই খাওয়া হয়নি ওনার। এখানেই পুকুরে স্নান করে দুটো ভাত খেয়ে যেতেন! আমাদেরই পূণ্য হত।
চাষী     -       ভূল হয়ে গেল, (নেপথ্যের দিকে এগিয়ে) ইশ্বর-দেওতা!
বৌ       -       আঃ, এখন পিছন থেকে ডাকছে। রাখো। পরে একবার গিয়ে নেমন্তন্ন করে এসো। এখন নিজে আগে চানটা সেরে এস, আমি ভাত বাড়ছি। (চাষী একটা টাঙানো গামছা টেনে কাঁধে ফেলে পিছনে চলে যায়, বৌটি ভিতরে চলে যায়)।   
    

  তৃতীয় দৃশ্য

[প্রথম ছেলেটি ঢুকে বাড়ির সামনের প্ল্যাকার্ডটা পাল্টে করে দেয় ‘কর্মাটাঁড় রেলস্টেশন’। ছাতের ওপরকার ছালাটা টেনে নামিয়ে পিছনে ফেলে বেরিয়ে যায়। ...নন্দন কানন যাওয়ার রাস্তা। তরূণ হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এবং তাঁর ভ্রমণসঙ্গী সতীশ বসু বেরিয়ে হেঁটে আসছেন।]

শাস্ত্রী    -       সতীশ,এই কর্মাটাঁড় স্টেশনের স্টেশনমাস্টারের নামটা পড়েছিলে বোর্ডে?
সতীশ   -       না, খেয়াল করিনি তো!
শাস্ত্রী    -       তুমি যাঁর কাছে যাচ্ছো, তাঁর বিষয়ে কথিত আছে যে ছোটোবেলায় বাবার হাত ধরে প্রথমবার কলকাতা আসার সম শুধু মাইলস্টোন দেখে দেখে ইংরেজী সংখ্যা পড়া শিখে ফেলেন। আর তুমি, একটা স্টেশনে নামলে, স্টেশনমাস্টারকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় কোথায় থাকেন, স্টেশনমাস্টার ইংরেজও নয়, বাঙালী, তার নামটাও পড়ে নিতে চাইলে না?
সতীশ   -       ওই জন্যেই তো! প্ল্যাটফর্মে এক মিনিট দাঁড়াতেও ইচ্ছে হল না।
শাস্ত্রী    -       মানে?
সতীশ   -       আমি তো আর বুঝিনি উনি বাঙালি না মারাঠি, তাই ইংরেজীতেই জিজ্ঞেস করেছিলাম, উনি কি জানেন, বাংলার বিখ্যাত মানুষ, বিদ্যাসাগর নামে পরিচিত ইশ্বরচন্দ্র শর্মা এখানে কোথায় থাকেন।
শাস্ত্রী    -       তারপর?
সতীশ   -       মুখটা বেঁকিয়ে ইংরেজিতে বললেন, ইয়েস স্যার, উই আর ব্লেস্‌ড দ্যাট দ্য গ্রেট ম্যান লিভস হিয়ার। বুঝে গেলাম উনিও বাঙালি। জিজ্ঞেস করলাম। বললেন, বাঙালি, তবে বিখ্যাত তো নই যে আমার জন্য স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম উঁচু করে দেবে সরকার বাহাদুর! আপনারা যান, ওই বিখ্যাত মানুষটার কাছে যান। স্টেশনের বাইরে গিয়ে কাউকে জিজ্ঞেস করুন, দেখিয়ে দেবে। তারপর যাহোক, আমাদের মালপত্রগুলো রাখার ব্যবস্থার কথা বললাম, একদিন পর আবার ট্রেন ধরব
                   লখনউ যাওয়ার, বললাম, তো করে দিলেন।
শাস্ত্রী     -      আশ্চর্য তো, বিদ্যাসাগর মশাইয়ের পায়ে কষ্ট আছে বলে সরকার কর্মাটাঁড়ের প্ল্যাটফর্ম উঁচু করিয়ে দিয়েছে। সবাই জানে ব্যাপারটা। বিদ্যাসাগর একজনই আছেন সারা দেশে। তাঁর জন্য সরকার করতেই পারেন। তাতে স্টেশনমাস্টারের কিসে কষ্ট?  
সতীশ   -       জায়গাটা বেশ শান্ত আর নিরিবিলি, না?
শাস্ত্রী    -       হুঁ, কিন্তু রুক্ষ, পাহাড়ি! লাল মাটির দেশ।
সতীশ   -       তবে এই রাস্তাটা বেশ ছায়া ছায়া। কী বিরাট গাছগুলো দেখ! অনেক বয়স হবে। ...শুনেছি মনের কষ্টে এখানে এসে থাকছেন বিদ্যাসাগর মশাই।
শাস্ত্রী    -       আরে দূর, ইশ্বরদাদা হিমালয়। মনোকষ্ট, সব ছেড়ে ছুড়ে চলে যাওয়া, এসব ওনার ধাতে নেই। পায়ে বড় চোট পেলেন না? পেটটাও ভালো থাকেনা। ডাক্তাররা তো কবে থেকেই বলছিল হাওয়াবদল করতে। ... এটা ঠিক যে নারায়ণের ব্যবহারে দাদা কষ্ট পেয়েছেন। ... তুমি আবার এসব প্রসঙ্গ ওনার সামনে তুলোনা! (একটা বিরাট বটগাছ দেখে দাঁড়িয়ে পড়েন, তার বিরাটত্বের দিকে প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকান) দেখেছো, কী বিশাল! কত বয়স হবে বলো তো!
                                                দেব-অবতার ভাবি বন্দে যে তোমারে
                                                নাহি চাহে মনঃ মোর তাহে নিন্দা করি,
                                                তরুরাজ! প্রত্যক্ষতঃ ভারত-সংসারে,
                                                বিধির করূণা তুমি তরু-রূপ ধরি!
                                                জীবকূল-হিতৈষিণী, ছায়া-সুসুন্দরী,
                                                ...
                                                দেব নহ; কিন্তু গুণে দেবতার মত।

সতীশ   -       বাঃ! কার লেখা?
শাস্ত্রী    -       মাইকেল মধুসুদন দত্ত। পড়েছ?
সতীশ   -       বাবার আলমারীতে আছে। মেঘনাদবধ কাব্য। কিন্তু ভীষণ শক্ত।
শাস্ত্রী    -       এটা চতুর্দশপদী। এই মানুষটাকে কত সাহায্য করলেন বিদ্যাসাগর। সারা গায়ের মোদো গন্ধ আর পাগলামির ভিতরে বসে থাকা অমূল্য প্রতিভাটাকে বিদ্যাসাগরই চিনতেন। জানতেন যে মানুষটার যশ হবে না। সবাই বলবে শুধু ভাঙচুর করে গেছে। কিন্তু ওই ভাঙচুরটাও যে বাংলা ভাষার প্রয়োজন ছিল সেটা বিদ্যাসাগরই জানতেন।   
সতীশ   -       আপনি তো ওনার কাছে থেকেই পড়াশোনা করেছেন?
শাস্ত্রী    -       স্কুলে পড়ার সময়। আমার নন্দদাদা আর উনি প্রিয় বন্ধু ছিলেন তো। আর দেখ, কেমন ভাগ্য আমার। হেয়ার স্কুলে শিক্ষকের চাকরিটা পেলাম – দাদাও আর দেখার জন্য রইলেন না, ভাবলাম ইশ্বরদাদাকে প্রণাম করে আসি, গিয়ে শুনলাম তিনি এখানে। ভাগ্যিস লখনউয়ে এই এ্যাক্টিং স্যাংস্কৃট টিচারের কাজটা পেলাম, তাই আজ ইশ্বরদাদাকে প্রণাম করতে পারবো। কী হল, অত আস্তে আস্তে হাঁটছ কেন, শরীর খারাপ লাগছে, জ্বর আসেনি তো? একটু সাবধান থাকতে হবে আমাদের। তুমিও ম্যালেরিয়ার রুগী আর আমিও জ্বর থেকে উঠেছি।
সতীশ   -       ওই সামনের গেটটাই না?
শাস্ত্রী    -       ঠিক বলেছ, ওই তো, ডানদিকে লেখাই আছে ‘নন্দন কানন’। পান্ডববর্জিত টাঁড়ের শুকনো লালমাটিতে একা একা থাকার জন্য বাড়ির নাম ‘নন্দন কানন’ বিদ্যাসাগর মহাশয় ছাড়া আর কে      রাখবেন। এই না হলে একটা মানুষের জন্য স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম উঁচু করিয়ে দেয় সরকার বাহাদুর? মনে আছে তো, কী বললাম! কর্মাটাঁড়ে এসে কেন থাকছেন, কবে কলকাতায় ফিরবেন, জিজ্ঞেস কোরো না। কী দরকার, একদিনের জন্যে তো এসেছি।
সতীশ   -       ওরেব্বাপ! ওখানে ঢোকার পর আমি বোবা। সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন, সারা বাঙলার স্কুল ইন্সপেক্টর ছিলেন, দুশোটার বেশি স্কুল খুলেছেন, তারপর কত বই, সংস্কৃতের পন্ডিত, হিন্দু সমাজের সংস্কার করেছেন... বাপ্‌রে, গুনতি ভুলে যাবার যোগাড়, ইংরেজ সাহেবরাও সমীহ করে চলেন ... একটা প্রশ্ন করলেই তো আমি গেছি।
শাস্ত্রী    -       হাঃ হাঃ, গিয়ে দেখবে, উনি এক্কেবারেই সেরকম নন। খবর পেয়ে গেছেন তো আমরা আসছি। দেখবে কত কিছু খাবার আনিয়ে রেখেছেন।


চতুর্থ দৃশ্য

[প্রথম ছেলেটি অথবা আরো কোনো একজন ঢুকে বাড়ির সামনের প্ল্যাকার্ডটা পাল্টে আবার করে দেয় ‘নন্দন কানন, কর্মাটাঁড়’। আলো দিয়ে সকাল বোঝা যায়। বিদ্যাসাগর বাড়ির বারান্দায় টেবিল চেয়ারে বসে বইয়ের প্রুফ দেখছেন। বাইরে থেকে বেড়িয়ে এলেন হরপ্রসাদ এবং সতীশ।]

ইশ্বর     -       ঘুরে এলি? কেমন লাগল জায়গাটা? আর আমার ওই কচি আমগাছগুলো? একটা দুটো করে আনিয়ে সব লাগিয়েছি। এবারের আনা চারাটার চারদিকে বেড়া দেওয়ালাম গতকাল।   
শাস্ত্রী    -       আপনি সেই ভোরবেলা থেকে এখনও প্রুফ দেখছেন? আর এ তো ‘কথামালা’ দেখছি। তাও প্রথম সংস্করণ নয়। এর প্রুফ তো আপনার দেখার প্রয়োজনও নেই। ছাপাখানার প্রুফ-রীডারও তো দেখে নিতে পারবে। (একটা ফর্মা উঠিয়ে) রাত জেগে জেগে এই অসুস্থ শরীর নিয়ে...
ইশ্বর     -       আসলে ভাষা জিনিষটা এমনই। যতবার পড়ি, শব্দগুলো চোখের সামনে দিয়ে যায়, দৃষ্টি আটকে যায়, এখানে এ থেকে আরেকটু ভালো শব্দ দেওয়া যেতে পারতো না? ইস্‌, এই শব্দটা বাধছে। অর্থটা ঠিকই আছে কিন্তু দ্যোতনা কি ওই অর্থতেই ছড়াচ্ছে ... ? কিছুতেই মন স্পষ্ট হয়না,কাটকুট করে চলি সর্বদা। সে যা হোক, তোরা জলখাবার খাবি তো? (সতীশের দিকে তাকান) ভয় পেয়ো না। ক্ষেতের ভুট্টা তুলে হাতে দেব না। হা হা, ভালো জিনিষ আনিয়ে রেখেছি তোমাদের জন্য! তুমি এত ছোটো, নিজে আবার ম্যালেরিয়ার রুগী, কী করে যাবে অত দূর হরপ্রসাদের সাথে, ভাবতেই পারছি না। মহেন্দ্রনাথ বসু, তোমার বাবা, তার সাথে তো বিশেষ খাতির আছে আমার। তোমাকে ভালো করে না খাওয়ালে কী বলবেন মহেন্দ্রবাবু! কী আনিয়েছি তোমার জন্য জানো?   
শাস্ত্রী    -       সে ওর ঘুম চোখেই দেখা হয়ে গেছে। হাঁড়ি ভর্তি ছানাবড়া আর মতিচূর। কোত্থেকে আনালেন? বর্ধমান থেকে?
ইশ্বর     -       এখানে আর কোথায় পাবি ওসব?
                   (এক দল সাঁওতাল মেয়ে প্রবেশ করে। এসে নিজেদের মধ্যে হাসি-মস্করা ও ছুটোছুটি করতে থাকে। তারই মধ্যে থেকে একটি মেয়ে এগিয়ে আসে।)
মেয়ে    -       ও বিদেসাগর, কিছু খাবার দে আমাদের।
                   (বিদ্যাসাগর ঘরের দিকে যাওয়ার জন্যে ওঠেন।)
শাস্ত্রী    -       আপনি তো ওই দাম দিয়ে, না, দান দিয়ে, দান দিয়ে কেনা ভুট্টাগুলো এবার বিলোবেন। তার সাথে ওই মতিচূর ও ছানাবড়াও কয়েকটা দিয়ে দিন। এক এক হাঁড়ি খাবে কে?
ইশ্বর     -       আরে দূর! মতিচূর আর ছানাবড়া! কী ভেবেছিস, ওরা খুব অবাক হবে আর আনন্দে লাফিয়ে উঠবে? তারিয়ে তারিয়ে খাবে? ওদের শুধু খাবার চাই। যেমন ভুট্টা, তেমনই মতিচুর আর ছানাবড়া। ক্যোঁৎ করে গিলবে, খেয়ে নেবে। ওদের দিয়ে কোনো লাভ নেই। (ভিতর থেকে ভুট্টা বার করে এনে মেয়েদের দিতে দিতে) ওসবের সমঝদার লোকও আছে এখানে বুঝলি! এখান থেকে এক ক্রোশ দূরে একটা গ্রাম আছে, কোরা। সেখানে এক মারহাট্টা রাজা আছে। এক সময় যখন বাঙলায় বর্গীর আক্রমণ চলছিল সে সময় ওরা এখানে এসে ছোটোখাটো রাজত্ব গড়ে তোলে। সে রাজত্ব আর নেই। রাজা, ব্রাহ্মণ, সৈন্যসামন্ত, অন্য জাতের মানুষ সব মারহাট্টা ছিল, এখন সাঁওতালদের সাথে থেকে সাঁওতাল হয়ে গেছে। তবে ওই, ভালো খাবার যদি দাও, একটু একটু করে তারিয়ে তারিয়ে খাবে, জিজ্ঞেস করবে, জিনিষটা কী, কী ভাবে তৈরি হয়েছে, কী কী দেওয়া হয়েছে, কোথা থেকে আনানো হয়েছে...
শাস্ত্রী    -       তাহলে এক কাজ করি। আমাদের সাথে লুচি আছে কয়েকটা। পরশু ভাজা। সেগুলো দিয়ে দিই ওদের।
ইশ্বর     -       আছে নাকি? কই, আন্‌ তো!
                   (হরপ্রসাদ ছুটে বেরিয়ে যান, স্টেশনের মালপত্র থেকে লুচির প্যাকেটটা বার করে আনতে। সতীশও বেরিয়ে যায়। বিদ্যাসাগর মেয়েগুলোকে হাঁক দেন।) এ্যাই মেয়েরা, এদিকে শোন। (মেয়েরা এগিয়ে যায়।) খিদে পেলে, ‘বিদেসাগর খাবার দে’ বলতে সাতজন – এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত – আর বিকেলে আমার ইস্কুলে আসতে দুজন? বাকিরা কোথায় থাকে? কে কে আসেনি পরশু?
                   (যে মেয়েটি এগিয়ে এসে খাবার চেয়েছিল সে নিজেকে আর আরেকজনকে আঙুল দিয়ে দেখায়।)
মেয়ে    -       আমরা দুজনে এসেছিলাম।
ইশ্বর     -       বাকি রইল ক’জন?
মেয়ে    -       (আস্তে আস্তে ভেবে ভেবে গোনে) এক... দুই... তিন... চার... পাঁচ। (বিদ্যাসাগরের দিকে
                   তাকিয়ে) পাঁচ।
ইশ্বর     -       (ওই পাঁচজনকে) আসো না কেন তোমরা?
                   (মেয়েগুলো চুপ থাকে। শেষে বিদ্যাসাগর ওই গুনতি করা মেয়েটিকেই ডাকেন; তখনই হরপ্রসাদ
                   ও সতীশ ঢোকে। হরপ্রসাদ কলাপাতার মোড়ক খুলে লুচিগুলো শোঁকেন)
শাস্ত্রী    -       গরম জিনিষ, পাতাগুলোকে সেদ্ধ করে দিয়েছে, লুচিতেও পাতার গন্ধ। দিয়ে দিই ওদের?
ইশ্বর     -       দাঁড়া, আমায় দে। ওভাবে দেয় নাকি। কলাপাতাগুলো মেলে লুচিগুলো ছড়িয়ে রাখেন তার ওপর।
                   দুটো উঠিয়ে হাওয়ায় নাড়েন। তারপর শোঁকেন) এই তো আর গন্ধ নেই। (দুটো আরো উঠিয়ে
                   মুড়ে ভিতরে রাখার জন্য ওঠেন)
শাস্ত্রী    -       ওটা কী করছেন।
ইশ্বর     -       খাবো রে! তোর মায়ের হাতে ভাজা?
শাস্ত্রী    -       না, বড় বউয়ের।
ইশ্বর     -       তবে আরো ভালো! নন্দকুমার ন্যায়চঞ্চুর বিধবা পত্নীর! বড় ভালো বন্ধু ছিলো আমার, নন্দকুমার। (নিজের জন্য ভিতরে রেখে এসে আরো কয়েকটা লুচি তুলে মেয়েটির দিকে এগিয়ে দিলেন) নে খা। আর তুই যখন পালের গোদা তুই সবাইকে টেনে নিয়ে আসবি আমার ইস্কুলে, মনে থাকবে! (হরপ্রসাদের উদ্দেশ্যে) দেখলি, কেমন করে গপ গপ করে খেয়ে ফেললো লুচিগুলো। না রস বুঝলো না স্বাদ! (সাঁওতাল মেয়েগুলো বেরিয়ে যায়)। চল, বেলা হয়ে গেল। তোরা জলখাবার খেয়ে নে। একটু ঘুরে আয়। (দুজনকে নিয়ে ভিতরে চলে যান)


পঞ্চম দৃশ্য

[প্রথম ছেলেটি এসে একটা বিশেষ জায়গায় দাঁড়িয়ে দর্শকদের বলে, “এখানে মাটিতে বাঁধানো একটা আসন ছিল।   বিদ্যাসাগর বিকেলে এখানে এসে বসতেন। এখানেই আজ প্রতিমাস্থাপন এবং অনাবরণ হবে।” বলে বেরিয়ে যায়। বিদ্যাসাগর সেখানে এসে বসেন। সামনে পাঁচজন বয়স্ক সাঁওতাল পুরূষ এসে বসেন।]

ইশ্বর     -       (একটা স্লেট আর স্লেটপেন্সিল মাটি থেকে উঠিয়ে নেন) এ জিনিষদুটো তোমাদের কাছে আজ নেই। আমি কলকাতা থেকে কয়েকটা আনাবার ব্যবস্থা করেছি। আর বই, সবাইকার হাতে একেকটা দিয়েছি? (সবাই ‘হ্যাঁ’এ মাথা নাড়ে) তবে, বই ধরে শুরু করার আগে একটা খেলা খেলি। আমি এক এক করে তোমাদের নাম লিখবো। দেখবো কে কে নিজের নাম চিনতে পারো। তবে তারও আগে (স্লেটে বড় করে লেখেন, ‘সাঁওতাল’), বল তো, কী লিখলাম? (স্লেটটা ওদের দিকে এগিয়ে দেন)
                   (ওরা এক এক করে স্লেটটা নেয়। লেখাটা দেখার আগে স্লেটটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করে) ওটাকে বলে স্লেট। চারদিকে কাঠের তৈরি খাপ আর মাঝখানে পাথর বসানো। ওই পাথরটাকে স্লেট পাথর বলে। ওরকমই হয়, পাতলা ফালির মত, গায়ে গায়ে লেগে বড় পাথরখন্ড হয়ে থাকে। ফালিগুলোকে আলাদা করতে হয়, মসৃণ করতে হয়, কেটে চৌকো করে ওই খাপটা আটকাতে হয়। পাথরটা আমাদের দেশেও হয়। তবে জিনিষটা ইংরেজরা নিয়ে এসেছে এদেশে। এখন এদেশেও তৈরি হওয়া শুরু হয়েছে। ...কেউ পড়তে পারল লেখাটা? (সবাই ‘না’এ মাথা নাড়ে। ততক্ষণে প্রথম দৃশ্যের মোড়ল ঢোকে। গাঁএর বাকি মানুষদের পাশে না বসে একটু তফাৎ রেখে বসে।) তুই পারিস পড়তে? (মুখ না তুলে কাঁদতে থাকে) কী হল?
মোড়ল -       বুড়িটা মরে গেল রে দেওতা! (বিদ্যাসাগর থমকে যান। বাকি সকলেও থমকে যায়। তারপর দু’একজন প্রশ্ন করে)
দু’একজন-     কোন বুড়ি? কার কথা বলছে মোড়ল?
ওদেরই
একজন -       আমাদের, বারমুন্ডির, সুবি মুর্মু, সবাই ঠানদি বলতো।
দু’একজন-     কী হয়েছিল?
সেজন   -       হবে আবার কী। সাত বুড়ির এক বুড়ি। বয়সের গাছপাথর নেই। মরবে না? একা মানুষ। এতদিন বেঁচেছিল তা শুধু আমাদের এই ইশ্বর-দেওতার সেবায় আর ওষুধে। দিনের পর দিন গিয়ে বুড়ির পায়ে তেল মাখিয়ে দিয়ে এসেছেন। ওষুধ খাইয়ে এসেছেন। 
ঈশ্বর    -       চেয়েছিলাম এই শীতটা অন্ততঃ পার করে যাক। গরম এলে আপনিই কিছুটা আরাম হত। পারলাম না। দেখলি তো। এই জন্য তোদের মানা করি দেবতা বলতে। সাধারণ মানুষ আমি।
মোড়ল -       (প্রায় ঝগড়ার মত করে) এবার তুই বোকার মত কথা বলছিস। বাঁচামরা দিয়ে দেওতা হয়? তাহলে তো কেউ মরতই না। (আকাশের দিকে আঙুল তুলে) ভগবান তো সব দেওতার বড়। মরত কেউ? যারা বড় মানুষ, ভালো মানুষ, আমাদের রাস্তা দেখায়, হাত ধরে, তারাই দেওতা। (ইতিমধ্যে দ্বিতীয় দৃশ্যের চাষী ও তার বৌ ঢুকেছে। দাঁড়িয়ে পড়েছে তারা একটু দূরে।)
চাষী     -       ভূল দিনে এসে পড়লাম বিদ্যেসাগর মশাই। মেয়েদের টোলটা কবে করেন?
ঈশ্বর    -       ভূল দিন বলে কিছু হয়না ভাই লেখাপড়ায়। আমিই তো বলেছিলাম ব্যবস্থা করে দেব। তবে সেটা হতে আরো এক সপ্তাহ দেরি হবে। আমার ওই বাড়িরই বারান্দায় ব্যবস্থা হবে ইস্কুলের। তাহলে আলাদা বসার আর পর্দার ব্যবস্থা করতে পারব। তা এসেই যখন পড়েছ মা, তুমিও শুরু করে দাও তো। (চাষীকে) ওই স্লেটটা ওকে দাও। (বৌটিকে) হ্যাঁ, তুমি পড়তে পারো কী লেখা আছে স্লেটটায়?
চাষীবৌ -       (বানান করে পড়ে) স, সএ আকার, ওপরে এটা কী?
ঈশ্বর    -       চন্দ্রবিন্দু বলে ওটাকে। ওটা থাকলে সব মিলিয়ে হবে ‘সাঁ’।
চাষীবৌ -       সাঁ, ও, ত, তএ আকার, তা, ল। সাঁ, ও, তা, ল। সাঁওতাল!
ঈশ্বর    -       ঠিক ধরেছিলাম আমি সেদিন। তুমি জানো। তাই আরো শেখার নেশাটা আছে। (বাকি বয়স্ক গ্রামীণদের) দেখলে, তোমরা সাঁওতাল। অথচ ‘সাঁওতাল’ এই সুন্দর কথাটা পড়তে পারলে না। সামনের সপ্তাহ থেকে তোমাদের জন্য বারান্দায় জায়গাও তৈরি হয়ে যাবে আর স্লেটও চলে আসবে। নিয়মিত আসতে হবে কিন্তু। (চাষীবৌকে) আর তুমি মেয়েদের স্কুলটাতেই এসো। তুমিই হবে এ্যাসিস্ট্যান্ট টিচার, আমার সহায়ক। ছটফটে মেয়েগুলো তো বসতে চায় না, শুধু খেলার মতলব, তুমিই ওদের বসাবে, অক্ষরজ্ঞান করাবে। একটা ব্ল্যাকবোর্ডও আনাবো ভাবছি। তাহলে আজ যাও। সন্ধ্যে হয়ে এসেছে।
                   (সবাই বেরিয়ে যায়। বিদ্যাসাগর উঠে বাড়ির ভিতরে চলে যান।)

[স্টেজের আলো কমে আসে। সন্ধ্যা। দলে দলে সাঁওতাল মেয়েপুরূষ ঢোকে। তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে মাঠটায় বসে। কাঠকুটো জোগাড় করে আগুন জ্বালায়। বিদ্যাসাগর ঘরের ভিতর থেকে একটা চাদর জড়িয়ে, হাতে একটা আলো নিয়ে এসে চেয়ারে বসেন। কাগজপত্র টেনে নিয়ে তাঁর কাজও করতে থাকেন। সাঁওতালদের দু’একজন তাঁর হাতের ইশারায় ঘরের ভিতর থেকে কয়েক গোছা ভুট্টা নিয়ে এসে সবাইকে ভাগ করে দেয়। তারা আগুনে ভুট্টা সেঁকে খেতে খেতে গান গাইতে থাকে।]       


ষষ্ঠ দৃশ্য

[আগের শেষ দৃশ্যের ওপর সামনের দিকে আলো জ্বলে ওঠে। আলোটা আস্তে আস্তে পিছনে ছড়িয়ে পড়ে। যে বিদ্যাসাগর সেজেছিল সে স্টেজের সামনের দিকে এসে নেপথ্যে হাঁক দেয়। প্রথম ছেলেটি, অর্থাৎ নাটকের নির্দেশক ঢুকে বাড়ির সামনে লাগানো প্ল্যাকার্ডটা খুলে নেয়]

ছেলেটি -       যা, তুই জামাকাপড়টা পাল্টে নে। অবশ্য এই ড্রেসেও থাকতে পারিস। মন্দ লাগছে না। (নেপথ্যে ডাকে) এবার একটু হাত লাগাও ভাই সবাই! সবাই এসে পড়বেন। (সাঁওতাল মেয়েরা উঠতে যায়, ওদের বাধা দেন) তোরা কোথায় চললি?
মেয়েরা -       যাচ্ছিনা, আসছি এক্ষুণি, ফুল আনতে হবেনা বিদেসাগর-দেওতার জন্য? তোদের ডারেক্টার তো রাস্তা থেকে টেনে এনে আমাদের বসিয়ে দিল। আমরা ফুল টুল নিয়ে পরে আসতাম। (দল বেঁধে বেরিয়ে যায়। ওদিকে দুটো ছেলে ডানদিক থেকে টানতে টানতে নিয়ে আসে পেডেস্টাল সুদ্ধু বিদ্যাসাগরের আবক্ষ-প্রতিমা।)
ছেলেটি -       (সামনে দর্শকদের উদ্দেশ্যে) প্রায় একশ বছর লোকচক্ষুর অন্তরালে পড়েছিল ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের এই নতুন কর্মভূমি – কর্মাটার। শেষে বিহার বাঙালি সমিতির প্রচেষ্টায় কর্মাটারের এই নন্দন কানন বাঁচানো গেল। আপনারা জানেন বিহারের বিভাজনের পর এখন কর্মাটার শহর, স্টেশন বিদ্যাসাগর ঝাড়খন্ডের জামতাড়া জেলার অন্তর্গত। তা সেই ১৯৯২এ প্রতিমাস্থাপন থেকে আজ এই দ্বিশত জন্মবার্ষিকী অব্দি আমরা এই নাটকে একসাথেই ধরার চেষ্টা করব। লড়াইটা চলছে। এই ভাষাতীর্থ গড়ে তোলার।
                   (একজন ডাক্তার হন্তদন্ত হয়ে ঢোকেন। সঙ্গে তাঁর দুজন সহায়ক।)
ডাক্তার -       সরি। একটু দেরি করে ফেললাম বোধহয়। কোথায় বসব আমরা। (প্রতিমা টেনে নিয়ে আসা ছেলে দুজনের একজন এগিয়ে আসে)
ছেলেটি২ -     আপনি তো চোখের ডাক্তার। মিহিজাম থেকে। ক্যাম্পের জন্য এসেছেন তো। আমার সাথে আসুন। (ডাক্তার এবং সহায়কদের নিজের সাথে নিয়ে যায়। ডাক্তারের ব্যাগটা নিজের হাতে নিয়ে নেয়।)    
                   (কয়েকটি মেয়ে এবং ছেলে ঢোকে। তারা প্রতিমার সামনে একটা পর্দা টাঙানো, ফুল ইত্যাদি দিয়ে জায়গাটা সাজানো এবং আলপনা দেওয়ায় মেতে ওঠে। একজনের হাতে ফেস্টুন/ঝান্ডি লাগানো দড়ি – এক  প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত অব্দি টাঙালে দেখা যায় তাতে বাংলা বর্ণগুলো লেখা আছে।)
ছেলেটি৩-      (এগিয়ে এসে) এতো গেল সাজসজ্জা। এরপর হবে শ্রদ্ধানিবেদন। কিন্তু দায়? বিদ্যাসাগর তো এখানে এসেছিলেন অসুস্থ শরীর নিয়ে, পেটে দুরারোগ্য ব্যাধি, খোঁড়া পা... একটু অবসর নিতে, আরাম করতে। ইতিহাসে যাকে বলে অক্ষয় অবদান, তা তো তিনি রেখে এসেছিলেন কলকাতায়, সারা বাংলায়। দিনের পর দিন স্মার্ত পন্ডিত আর রক্ষণশীল বাঙালি ভদ্রলোকেদের ব্যক্তিগত আক্রমণ সহ্য করেও যা তিনি ভেবেছিলেন, করেছিলেন। রামমোহনের সতীহত্যারোধ আর বিদ্যাসাগরের বিধবাবিনষ্টিরোধের ভিত্তিতে আজ আমরা নারীমুক্তি আন্দোলনের কথা বলছি। (আলপনা দিতে থাকা একটি মেয়ে এগিয়ে আসে)
মেয়েটি -       বাংলা বর্ণমালার তিনি কারিগর; তাঁকে গুরু করে আমরা মাতৃভাষা শিক্ষার কথা বলছি; আমরা শিক্ষার অধিকারের কথা বলছি। (আরেকটি ছেলে এগিয়ে আসে।)
ছেলেটি৪ -     ঝড়ে জলে বৃষ্টিতে নিজের অসুস্থ শরীর নিয়ে ঘুরে ঘুরে এই কর্মাটাঁড়ের গ্রামে গ্রামে তিনি গরীব মানুষের চিকিৎসা করেছেন, সেবা করেছেন, কলকাতা থেকে উন্নত বীজ নিয়ে এসে, চাষের নতুন পদ্ধতি জেনে এসে তিনি এখানকার চাষীদের শিখিয়েছেন, সেই সুত্র ধরে আজ আমরা প্রান্তিক জনতার উন্নয়নের প্রশ্নগুলো তুলে ধরছি। স্বাস্থ্যের অধিকারের কথা বলছি।
(একদল মানুষ ঢুকে পড়ে। তার মধ্যে মন্ত্রী, সান্ত্রী, বাঙালি সমাজের নেতারা আরো অনেকে আছে। তারি মধ্যে অন্য দিক থেকে কয়েকজন পুরূষ ও মহিলা ‘জিন্দাবাদ’এর স্লোগান দিতে দিতে সামনে চলে আসে। সান্ত্রীরা ওদের আটকায়। বাঙালি সমাজের হর্তাকর্তাদের দুএকজন এগিয়ে আসেন।)
হর্তাকর্তা-      কী ব্যাপার!
স্লোগান দিতে
থাকা দলের
একজন -       হামরা মন্ত্রীজীকে আবেদন দিতে এসেছি।
হর্তাকর্তা-      কিসের আবেদন?
একজন -       (সোজা মন্ত্রীর উদ্দেশ্যে) ইহাঁ কা বালিকা বিদ্যালয় ইন লোগোঁনে অচানক বন্ধ্‌ কর দিয়া, মন্ত্রীজী! হামসাব কা তিন চার মাহিনে কা তনখাহ বাকি হ্যয়।
মন্ত্রী      -       (হর্তাকর্তার উদ্দেশ্যে) কেয়া বাত হ্যয়?
হর্তাকর্তা  -    বংগলা মিডিয়াম স্কুল খোলা থা হাম লোগো নে। কিসী তরহ চন্দা ইকট্‌ঠা করকে ইতনা সাল চলায়া। আব ন চন্দা দেনেওয়ালে হ্যঁয়, না বচ্চে হ্যঁয় পঢ়নে ওয়ালে। ইনসে হমারা ওয়াদা হ্যয়, ইনকি তনখাহ থোড়া থোড়া করকে দে দেংগে। পর স্কুল, বিদ্যাসাগর কী কর্মভূমি পর খড়া হোকর বোলনে মেঁ শর্ম আতী হ্যয়, বংগলা মিডিয়ম মে অব চল নহী পায়েগা। অংরেজি মিডিয়ম খোলনে কে লিয়ে কুছলোগ বোল রহে হ্যঁয়। ওয়সে আপ সরকার হ্যঁয়, হমনে কই প্রস্তাও আপকো দিয়ে হ্যঁয় ...
মন্ত্রী      -       ঠিক হ্যয়, (দু তরফকেই) হম বিচার করেংগে। (হর্তাকর্তাকে) অগর অংগ্রেজি স্কুল খুলে তো
                   ইনহে অগ্রাধিকার দিজিয়েগা, ইয়োগ্যতা কে মুতাবিক।
হর্তাকর্তা -     জী, বিল্কুল সরকার! ইয়ে ইনসে কহা হুয়া হ্যয়।
                   (সবাই চলে যায় প্রতিমা অনাবরণের দিকে।)
সেই প্রথম
ছেলেটি -       দেখুন কী অবস্থা! বাংলাভাষাই শেষ হয়ে আসছে।
মেয়েটি -       শিক্ষার অধিকারই কি সদর্থে বলবৎ? আর নারীদের কী অবস্থা আজ দেশে?
ছেলে২ -       কত বলব? তবু এক মহামানবের পথে চলব! মানুষের দিকে, তার জীবনসংগ্রামের দিকে থাকব সব সময়!
                   (ওদিকে প্রতিমা অনাবরণ সম্পন্ন হয়। হাততালি দেয় সকলে। একটি ব্যানার মেলে ধরে তিনজনে মিলে –
‘বিদ্যাসাগর দ্বিশতজন্মবার্ষিকী
নারীর অধিকারের পথে
মাতৃভাষার অধিকারের পথে
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের অধিকারের পথে
বঞ্চিত মানুষের অধিকারের পথে’)


সমাপ্ত


Tuesday, October 2, 2018

भारत में आर्थिक नियोजन की विरासत एवं उस पर हमले - असीम दासगुप्ता


भारत में आर्थिक नियोजन स्वतंत्रता संग्राम के हिस्से के रूप में विचारा गया था । स्वतंत्रता संग्राम में समझौताविहीन संघर्ष की जो धारा थी, उसी धारा पर चलते हुये नेताजी सुभाषचन्द्र बसु ने सबसे पहले, सन 1938 के फरवरी महीने में राष्ट्रीय कांग्रेस के हरिपुरा अधिवेशन में अध्यक्षीय भाषण के दौरान, स्वातंत्र्योत्तर भारत में राष्ट्रीय नियोजन की परिकल्पना, उसे कार्यान्वित करने की जरूरत एवं इस उद्देश्य से योजना आयोग के गठन के खास महत्व की चर्चा की थी । अपना भाषण तैयार करते हुये सुभाष ने जिन लोगों के साथ राय मशविरा किया था उनमें थे स्वामी विवेकानन्द के भाई, भारत में समाजविज्ञान के जन्मदाता भूपेन्द्रनाथ दत्त एवं वामपंथी लोग। उस समय राष्ट्रीय कांग्रेस के अन्दर एक वामपंथी ब्लॉक का भी गठन हुआ था ।
हरिपुरा अधिवेशन के भाषण में राष्ट्रीय नियोजन के महत्व की चर्चा के साथ साथ सुभाष ने यह भी कहा था कि ब्रिटिश साम्राज्यवाद के खिलाफ समझौताविहीन संघर्ष के द्वारा ही भारत को स्वतंत्रता अर्जित करना होगा । इसलिये स्वतंत्रता की प्राप्ति के बाद देश का निर्माण करते वक्त सतर्क रहना पड़ेगा कहीं राष्ट्रीय अर्थनीति पुन: विदेशी पूंजी पर आश्रित न हो जाय, और इसीलिये आत्मनिर्भरता अर्जित करने को प्राथमिकता देनी होगी । आत्मनिर्भरता हासिल करने का आधारभूत लक्ष्य होगा रोजगार में वृद्धि, गरीबी उन्मूलन एवं शिक्षा व जनस्वास्थ्य का प्रसार । आत्मनिर्भरता एवं रोजगार को प्राथमिकता देने के कारण ही औद्योगिक क्षेत्र में बुनियादी उद्योगों (लौह व इस्पात, कोयला, पेट्रौलजनित सामग्रियाँ, रासायनिक द्रव्य आदि) को सरकारी मिल्कियत में रखनी होगी । उपभोग के वस्तुओं के क्षेत्र में, खासकर मझौले एवं छोटे उद्योगों को निजी हाथों में रखा जा सकता है एवं यहाँ रोजगार में वृद्धि के उद्देश्य से बड़े एवं मझौले उद्योगों के साथ छोटे उद्योगों के सामंजस्य पर महत्व दिया जायेगा । कृषि पर बोलते हुये नेताजी के इस भाषण में सर्वोच्च प्राथमिकता आमूल भूमिसुधार को दी गई थी एवं उसी के साथ सिंचाई का प्रसार एवं उत्पादकता में वृद्धि पर जोर डाला गया था । किसानों को आसानी से कर्ज मिले इसके लिये सहकारी बैंकिंग व्यवस्था के प्रसार पर जोर डाला गया था । साथ ही किसान एवं खरीदार, दोनों के ही हित में फसलों की जायज कीमत पर जोर डाली गई थी । शिक्षा, खासकर, कारीगरी शिक्षा एवं जनस्वास्थ्य के त्वरित प्रसार को महत्व दिया गया । सुभाष के इसी भाषण में आगे राज्यों में सत्ता के विकेन्द्रीकरण एवं राज्यों के अन्दर पंचायत व नगरपालिकाओं के माध्यम से स्वायत्तशासन की स्थापना को विशेष प्राथमिकता दिये गये । और सबसे उपर महत्व दिया गया भारत की अखंडता, धर्मनिरपेक्षता एवं धार्मिक भाईचारे को ।
प्राथमिकताओं पर चर्चा के बाद इसी भाषण में कहा गया कि इन सभी प्राथमिकताओं पर काम करने के लिये बेलगाम बाजार की व्यवस्था पर भरोसा नहीं किया जा सकता है; उत्पादन व वितरण व्यवस्था को सामाजिक स्वरूप देना होगा और उसके लिये आवश्यक होगा भारतीय विशिष्टताओं को शामिल करते हुये समाजवादी तरीके से योजना-निर्माण एवं उसका क्रियान्वयन – समग्रता में इस नियोजन को शक्ल देने में विशेष महत्वपूर्ण भूमिका निभायेगा योजना आयोग । (स्रोत: नेताजी सुभाषचन्द्र बसु का भाषण, 1938, पृष्ठ: 39-42, पुनर्मुद्रित, योजना आयोग, 1997)
अपने इस वक्तव्य को पेश करने के बाद सन 1938 के अक्तूबर महीने तक सुभाष ने राष्ट्रीय राष्ट्रीय योजना कमिटी का गठन कर लिया । जवाहरलाल नेहरू अध्यक्ष बनाये गये तथा डा· मेघनाद साहा जैसे वैज्ञानिक, विश्वेश्वरैया जैसे प्रौद्योगिकी-विद्वान एवं अन्य कई विशिष्ट व्यक्ति सदस्य बनाये गये । प्राथमिकता के क्षेत्रों को चिन्हित कर एक प्रतिवेदन प्रस्तुत करने के लिये समयसीमा बांध दिया गया । अगले साल (1939) राष्ट्रीय कांग्रेस के त्रिपुरी अधिवेशन में महात्मा गांधी द्वारा मनोनीत प्रत्याशी को पराजित कर सुभाष फिर से राष्ट्रीय कांग्रेस के अध्यक्ष बने । फलस्वरूप और अधिक त्वरित गति से वह ब्रिटिश साम्राज्यवाद के खिलाफ संग्राम को आगे बढ़ाने लगे एवं उसीके अंग के रूप में राष्ट्रीय नियोजन की तैयारी का काम चलने लगा । उसी समय पश्चिम भारत के बड़े औद्योगिक घरानों एवं बड़े वणिकों के तबकों की ओर से रुकावट आने लगे । उन्ही रुकावटों की अभिव्यक्ति थी कांग्रेस दल के सर्वोच्च स्तर से जारी बयान, “सुभाष राष्ट्रीय नियोजन को लेकर ज्यादती करने लगा है” । सुभाष पर दबाव बनाया गया जिसके चलते सुभाष कांग्रेस अध्यक्ष के पद से और अन्तत: कांग्रेस दल से ही इस्तीफा देने को वाध्य हुये ।
उसके बाद की घटनायें – नेताजी का देश से बाहर जाना, जापान पहुँचना, क्रांतिकारी रासबिहारी बसु की मदद से एवं दक्षिण-पूर्व एशिया के भारतीयों द्वारा संगृहित धन के बदले जापान की सरकार से हथियार खरीदना, आजाद हिन्द फौज का निर्माण, उस फौज का सन 1945 में भारत की सीमा तक आ जाना एवं उसके जबर्दस्त प्रभाव के तौर पर भारत की नौसेना, वायुसेना व स्थलसेना में बगावत की परिस्थिति, भारतीय जनता द्वारा उस बगावत का समर्थन एवं मुख्यत: उसी कारण से सन 1946 के फरवरी महीने में, बहुत जल्दवाजी में ब्रिटिश शासकों द्वारा सत्ता हस्तांतर का फैसला लिया जाना (तत्कालीन ब्रिटिश प्रधानमंत्री लॉर्ड ऐटली के वक्तव्य में दिये गये तथ्यों के अनुसार) – ये सारी बातें आज तथ्यों के आधार पर प्रमाणित हैं । इसके बाद सन 1946 में राजनीतिक घटनायें दो दिशाओं में प्रवाहित हुईं । एकतरफ जनान्दोलनों की ज्वार (किसानों का तेभागा आन्दोलन, डाक विभाग के कर्मचारियों का देशव्यापी हड़ताल आदि) से आन्दोलित हो उठा भारत एवं समझौताविहीन संग्राम के रास्ते पर चल कर स्वतंत्रता अर्जित करने की संभावना भी बनी । पर दूसरी तरफ, इस संभावना को खत्म करने के लिये ब्रिटिश शासकों की मदद लेकर देश के विभिन्न इलाकों में साम्प्रदायिक दंगे भड़काये गये, और उसी मौके का फायदा उठा कर राजनीतिक दलों के भीतर का निहित स्वार्थी खेमा ने ब्रिटिश साम्राज्यवादियों के साथ समझौता किया और देश के बँटवारे के माध्यम से एक खन्डित भारत की स्वतंत्रता को मान लिया ।

2- स्वतंत्रता के बाद योजना आयोग
उपरोक्त परिप्रेक्ष में स्वतंत्रता की प्राप्ति के बाद पहले ढाई वर्षों में भारत सरकार ने योजना आयोग का गठन नहीं किया । सिर्फ एक योजना परामर्शदात्री बोर्ड बनाकर काम चलाने की कोशिश की गई । नतीजा हुआ कि मंत्रालयों के कामकाज के बीच सामंजस्य का पूरा अभाव पाया गया । केन्द्र और राज्य सरकारों के कामकाज के बीच भी सामंजस्य का अभाव रहा । परिस्थिति नियंत्रण के बाहर चले जाने के इस अनुभव के कारण सन 1950 में भारत सरकार ने प्रशासनिक आदेश जारी कर योजना आयोग का गठन किया (स्रोत: भारत सरकार, मंत्रालय सचिवालय, 1950) । इस योजना आयोग के अध्यक्ष प्रधानमंत्री होने के नाते बने जवाहरलाल नेहरू, सदस्य बने उनके मंत्रीमंडल के चार सदस्य । उसके बाद तत्काल गठन किया गया राष्ट्रीय विकास पर्षद का भी, जिसके अध्यक्ष बने प्रधानमंत्री एवं सदस्य बने विभिन्न मंत्रालयों के पूर्ण-मंत्री एवं सभी राज्यों के मुख्यमंत्री । कहा गया कि पूरे देश की नैसर्गिक सम्पदा, बौद्धिक सम्पदा एवं आर्थिक सम्पदा के आकलन के आधार पर विभिन्न क्षेत्रों की प्राथमिकताओं के अनुसार वित्त के आबंटन के प्राथमिक प्रस्ताव की रचना योजना आयोग के कार्यों के लक्ष्य होगा । उसके उपरांत उस प्रस्ताव का अनुमोदन करेगा राष्ट्रीय विकास पर्षद । उक्त अनुमोदन के आधार पर वित्तीय वर्ष 1950-51 से शुरू होगा अगले पाँच वर्षों के लिये योजना का क्रियान्वयन । इस हिसाब से प्रथम पंचवार्षिक योजना की अवधि होगी 1950-55, द्वितीय पंचवार्षिक योजना की अवधि होगी 1955-60… आदि । यहाँ पर जिक्र करना प्रासंगिक होगा कि इन योजनाओं को रचना में, भारतीय सांख्यिकी के पिता अध्यापक प्रशान्तचन्द्र महलानवीश ने राष्ट्रीय स्तर पर सांख्यिकी के परामर्शदात्री के रूप में विशेष महत्वपूर्ण भूमिका निभाया और पहले दो पंचवार्षिक योजनाओं के ढाँचों का मुख्य अंश कलकत्ता स्थित इन्डियन स्टैटिस्टिकल इन्स्टिटूट में ही तैयार किया गया । इन्हे तैयार करने में विशिष्ट अर्थशास्त्री अध्यापक सुखमय चक्रवर्ती एवं अध्यापक अमर्त्य सेन ने भी हिस्सा लिया था । बाद में अध्यापक सुखमय चक्रवर्ती योजन आयोग के सदस्य भी बने ।
योजना के जिस ढाँचे को अध्यापक महलानवीश ने रचा (जो नेहरू-महलानवीश मार्ग के नाम से परिचित है) उसका बुनियादी लक्ष्य था कि अगर भारत जैसे विकासशील देश को आत्मनिर्भर बन कर आगे बढ़ना है तो आधारभूत उद्योगों (खास कर लोहा, इस्पात, कोयला, पेट्रोलियम आदि) को सरकारी मालिकाने में लाना होगा ताकि निवेश बढ़ाया जा सके । उक्त ढाँचे के अनुसार उपभोग के वस्तुओं का उत्पादन निजी क्षेत्र के मालिकाने में ही छोड़ने की बात कही गई थी । इसके अलावे, शिक्षा एवं जनस्वास्थ्य के क्षेत्र को भी सामाजिक महत्व दिया गया । गौरतलब है कि इन सभी क्षेत्रों को इसी तरह प्राथमिकता देने की बात सन 1938 में कांग्रेस के हरिपुरा अधिवेशन में राष्ट्रीय कांग्रेस के अध्यक्ष के रूप में अपने भाषण में सुभाषचन्द्र ने कहा था (जिसकी चर्चा पहले की गई है) ।    
योजनाबद्ध ढंग से सरकारी/सार्वजनिक क्षेत्र में सरकारी निवेश पर महत्व देने के बाद देश में, कुल निवेश सरकारी निवेश का हिस्सा कदम दर कदम बढ़ने लगा । वर्ष 1987-88 में कुल निवेश था 81,204 करोड़ रुपयों का जिसमें 41,211 करोड़ रुपये यानि लगभग 51 प्रतिशत था सरकारी निवेश (भारत सरकार की आर्थिक समीक्षा, सांख्यिकी परिशिष्ट, 1988-89) ।
इस सरकारी निवेश में, पहली पंचवार्षिक योजना में महत्व दिया गया सिंचाई एवं बाढ़ नियंत्रण परियोजनाओं को (कुल योजना आबंटन का 22%) । दूसरी और तीसरी पंचवार्षिक योजना (1955-60, 1960-65) में, सरकारी मालिकाने में स्थापित लोहा, इस्पात, कोयला, रासायनिक, खाद, पेट्रोलियम आदि बुनियादी उद्योगों में निवेश को प्राथमिकता दी गई (कुल योजना आबंटन का 25%) । इसके अलावे सभी बड़े निजी बैंक, जीवनबीमा एवं साधारणबीमा संस्थाओं का राष्ट्रीयकरण किया गया ।
लेकिन यहाँ जिक्र करना जरूरी है कि राष्ट्रीय नियोजन पर अपना वक्तव्य रखत हुये सुभाषचन्द्र ने भूमिसुधार को विशेष महत्व दिया था । वामपंथी लोग भी बार बार भूमिसुधार की जरूरत की बात कहते आये हैं । इसके बावजूद स्वतंत्रता की प्राप्ति के उपरांत, वर्गीय हितों के कारण शासकवर्ग अखिल भारतीय स्तर पर भूमिसुधार की दिशा में कोई कारगर कदम उठाने में पूरी तरह असफल रहा ।
नतीजे के तौर पर देश के ग्रामीण इलाकों में जमीन्दार-जोतदार वर्ग (उपर का दस फिसदी परिवार) के कब्जे में रह गया जमीन का मालिकाना, अन्यान्य सुविधायें एवं उन्ही के माध्यम से कृषि में अर्द्ध-सामंती व्यवस्था कायम रह गई । जबकि सामान्य श्रमजीवी किसान एवं खेतमजदूरों (ग्रामीण इलाके के लगभग 90 फिसदी परिवार) की क्रयशक्ति नें वृद्धि वाधित हुई और सन 1976-77 में भी, ग्रामीण इलाकों में गरीबी रेखा के नीचे ज़िन्दगी बसर कर रही आबादी का अनुपात 50% से अधिक बना रहा । इतनी बड़ी तादाद में जनता की क्रयशक्ति नहीं बढ़ने के कारण उद्योग के आन्तरिक बाज़ार के विकास को भी क्षति पहुँची । दूसरी ओर, उद्योगों के मालिकाने में भी विषमता बढ़ती देखी गई – इजारेदारी जाँच कमिटी (1970-71) के प्रतिवेदन के अनुसार सत्तर के दशक में ही मात्र 20 इजारेदार औद्योगिक घराने पूरे देश की औद्योगिक पूंजी का 33% कब्जे में कर चुके थे और यह इजारेदारी बढ़ रही थी । आन्तरिक बाज़ार नहीं बढ़ने एवं इजारेदारी बढ़ने के कारण सामग्रिक तौर पर उद्योग का विकास क्षतिग्रस्त हुआ । दूसरी ओर आर्थिक विषमता बढ़ने के साथ साथ देश के उच्चवर्ग विदेश से भोगविलास के सामानों का सीधा आयात बढ़ाने लगे । साथ ही, देश में भोगविलास के सामानों के उत्पादन के लिये संबन्धित संयंत्रों का आयात भी बढ़ने लगा । इन कारणों से, देश का कुल आयात बढ़ गया । जबकि, उपर में चर्चा किये गये कारणों से देश में उत्पादन में वृद्धि की गति धीमी रही और फलस्वरूप निर्यात नहीं बढ़ा । निर्यात नहीं बढ़ने के कारण आयात और निर्यात में फासला यानि विदेशी व्यापार में घाटा लगातार बढ़ते हुये देश की अर्थनीति के लिये जोखिम पैदा करने लगा । इस परिप्रेक्ष्य में, देश के भीतर ही आर्थिक नीति में बदलाव (भोगविलास के वस्तुओं के आयात पर नियंत्रण आदि) नहीं लाकर और शासकवर्ग के हित में, देश के संसद में कोई चर्चा किये बिना वर्ष 1991 में भारत सरकार ने अन्तरराष्ट्रीय मुद्रा कोष से ॠण लिया और ॠण के शर्त के तौर पर आसानी से तथाकथित उदारनीति को कबूल कर लिया । तथाकथित उदारनीति को कबूल करने के बाद योजना आयोग की क्या हालत बनी और हाल में भाजपा के नेतृत्व में मौजुदा केन्द्रीय सरकार किस तरह के हमले चला कर योजना आयोग को ध्वस्त कर रही है इस चर्चा में अब प्रवेश किया जायेगा ।

3- उदारीकरण की नीति के बाद योजना आयोग
उदारीकरण की नीति के तहत यह कहा जाने लगा कि देश के सभी महत्वपूर्ण आर्थिक व सामाजिक मुद्दों को बाज़ार की व्यवस्था पर छोड़ देना चाहिये एवं सरकार की कल्याणकारी भूमिका को कम किया जाना चाहिये । चूंकि बाज़ार का संचालन वही करते हैं जिनकी आर्थिक ताकत सर्वाधिक है अत: इस नीति में कहा गया कि पूरी अर्थव्यवस्था की जिम्मेदारी क्रमश: छोड़ देनी होगी पहले देश के बड़े पूंजीपति घरानों के हाथों और फिर और भी ज्यादा ताकतवर बहुराष्ट्रीय निगमों के हाथों; साथ ही सर्वाधिक मुनाफा कमाने की उनकी प्रवृत्ति को भी मान लेनी होगी ।
इसी उदारीकरण की नीति के चलते आयातशुल्क व तमाम परिमाणात्मक बाधायें तेजी से कम की गई । फलस्वरूप विदेश से आयात और वड़े पैमाने पर बढ़ने लगा । लेकिन हमारे निर्यातों के लिये पूंजिवादी दुनिया के धनी देशों के दरवाजे नहीं खुले । इसलिये आयात एवं निर्यात में जो फासला था (समस्या की शुरूआत जिस कारण से हुई, पहले जिस पर चर्चा हो चुका है) वह और बढ़ने लगा । वर्ष 1991-92 में आयात व निर्यात में फासला था 3,800 करोड़ रुपयों का । वर्ष 2013-14 आते आते उसमें 20 गुना वृद्धि हुई – फासला हो गया 8,26,000 करोड़ रुपयों का (स्रोत : आर्थिक समीक्षा, भारत सरकार, 2013-14) । यानि उदारीकरण की नीति के कारण हमारे देश में उत्पादित मालों, खास कर औद्योगिक मालों का बाज़ार खोता चला गया, उद्योग बीमार पड़ गये । पिछले आर्थिक वर्ष में हमारे देश के औद्योगिक विकास में वृद्धि की दर नकारात्मक रही (0·4%) । और इसी कारण से शहरी और अर्द्धशहरी इलाकों में बेरोजगारी बढ़ी ।
            फिर, इसी उदारीकरण की नीति के कारण कृषि के क्षेत्र में भी केन्द्रीय सरकार ने अपनी कल्याणकारी भूमिका को कम किया है । जहाँ पहले पंचवार्षिक योजना में केन्द्रीय योजना-बजट का 22% सिँचाई व बाढ़ नियंत्रण के लिये आबंटित किया गया था वह आबंटन अब 2% पर उतर आया है (स्रोत : केन्द्रीय बजट, 2014-15) । फलस्वरूप देश की कुल कृषिभूमि में सिंचित-भूमि का अनुपात अभी भी पचास प्रतिशत से नीचे रह गया है । उदारीकरण की नीति के तहत भारत सरकार ने अपने सभी महत्वपूर्ण खाद कारखानों (झाड़खन्ड में सिन्ध्री का खाद कारखाना, इस राज्य में हलदिया व दुर्गापुर का खाद कारखाना आदि) को बन्द कर दिया है एवं खाद की आपुर्त्ति के मामले में हमें निजी संस्थाओं एवं विदेशी बहुराष्ट्रीय निगमों पर आश्रित बना दिया है ; उन्होने भी मौका देख कर रासायनिक खाद का दाम तेजी से बढ़ा दिया है । कृषि में उत्पादन का खर्च बढ़ा है लेकिन किसानों को उनके पैदा किये गये फसलों का उचित दाम नहीं मिला । नतीजे के तौर पर कृषि उत्पादन में भी धीमापन आया है और ग्रामीण इलाकों में भी बेरोजगारी बढ़ी है ।
आम किसानों को फसल का उचित दाम नहीं मिला, फिर भी बड़े व्यापारियों के इजारेदारी के कारण क्रेताओं पर महंगाई का बोझ बढ़ता ही जा रहा है । यह सबको मालूम है, यह भी मालूम है कि सार्वजनिक जनवितरण प्रणाली के माध्यम से जवाबी प्रतिस्पर्धा का सृजन करके ही केन्द्रीय सरकार महंगाई रोकने के मामले में अपनी कल्याणकारी भूमिका निभा सकती है । पर सरकार ऐसा करने से हाथ खींचती रही है सिर्फ वही उदारीकरण की नीति के कारण ।
इसके अलावे, बुनियादी उद्योगों (लोहा, इस्पात, कोयला आदि) में केन्द्रीय निवेश बढ़ाने के बदले शुरू हुआ है अंधा निजीकरण । और समग्रता में, विकासात्मक कार्यों के लिये जहाँ देश में वर्ष 1987-88 के कुल निवेश का 51% था सरकारी निवेश (जिसकी चर्चा पहले की गई है) वहाँ उदारीकरण की नीति लागू होने के बाद वर्ष 2011-12 के कुल निवेश में सरकारी निवेश का हिस्सा बड़े पैमाने में घटा कर 24% कर दिया गया है (भारत सरकार, आर्थिक समीक्षा 2011-12) ।
उदारीकरण की नीति के इस परिप्रेक्ष्य में योजना आयोग की भूमिका को कम कर दिया गया है और इस कम की गई भूमिका में भी, खास कर केन्द्रीय मंत्रालयों का योजना-आबंटन करते समय और राज्यों को योजना-सहायता आबंटित करने के मामले में, प्राथमिकता वाले क्षेत्रों की चर्चा करते हुये योजना आयोग ने बाज़ार पर निर्भर होने के लिये बार बार जोर डाला है । फिर भी, योजना आयोग के लिये छोड़े गये इस संकुचित परिसर में भी, राज्यों के साथ विचारविमर्श के वक्त राज्यों का वक्तव्य, कम ही सही लेकिन सुना गया है । यहाँ जिक्र करना प्रासंगिक होगा की मूलत: वामपंथी ताकतों एवं वामपंथी राज्य सरकारों द्वारा मुहैया किये गये तथ्यों एवं तर्कों के दबाव के कारण ही राष्ट्रीय रोजगार गारंटी परियोजना (100 दिनों का काम), खाद्य सुरक्षा कानून एवं बालशिक्षा अधिकार कानून जैसे मुद्दों पर आंशिक ही सही पर सहमति देनें को वाध्य हुआ है योजना आयोग । इसके अलावे सीमित परिसर में भी, राष्ट्रीय विकास परिषद की बैठकें हुई है जहाँ राज्य के मुख्यमंत्री अपने वक्तव्य रखे हैं ।   

4- मौजुदा केन्द्रीय सरकार एवं योजना आयोग पर हमला
भाजपा के नेतृत्व में मौजुदा केन्द्रीय सरकार सत्ता में आने के बाद आर्थिक फैसलों को एवं योजना बनाने की प्रक्रिया को आम आदमी के लिये और अधिक हानिकारक बना दिया गया है । ‘अच्छे दिन आने वाले हैं’ के व्यापक प्रचार के बावजूद यथार्थ यही है कि रोजगार के प्रश्न की ओर से अगर देखें तो राष्ट्रीय रोजगार गारंटी (100 दिनों का काम) परियोजना का दायरा एवं आबंटन दोनों को कम करने की चर्चा शुरू हो गई है । सरकार के प्रस्ताव लागू हो जाने पर वह गरीब मेहनतकश लोगों पर बुरे दिनों का निर्मम प्रहार होगा । इसी बीच देश के श्रम कानूनों में संशोधन कर मज़दूरों के एक बड़े हिस्से के काम के समय में वृद्धि (बिना मज़दूरी बढ़ाये हुये), कर्मचारी राज्य बीमा, भविष्य निधि आदि सुविधाओं को कम करना एवं न्यूनतम मजदूरी के मुद्दे की अवहेलना सरीखे विभिन्न मज़दूर-विरोधी कदम उठाये जा रहे हैं । इसके अलावे, खाद्य-सुरक्षा कानून के प्रश्न पर इस केन्द्रीय सरकार ने एकतरफा ढंग से शान्ता कुमार (पिछले राजग सरकार में भाजपा की ओर से खाद्यमंत्री) के नेतृत्व में एक कमिटी का गठन कर अनुशंसा कराई है जिसके तहत खाद्य-सुरक्षा के दायरे को आबादी के सिर्फ निचले 40% तक सीमित कर दिया गया है । बीमा उद्योग के क्षेत्र में, हमारे राष्ट्रीयकृत उद्योगों की प्रतिबद्धता के वारे में जानकारी के बावजूद विदेशी बीमा संस्थाओं के लिये निवेश की सीमा बढ़ाई गई है – यह भूलकर कि हाल ही में, अपने देश के बचतकर्ताओं को धोखा देने के के कारण बड़ी संख्या में विदेशी बीमा संस्थाओं की छवि पर कालिख लगी है । रक्षा के क्षेत्र में भी, देश की सुरक्षा एवं संप्रभुता के प्रश्न पर अनिश्चितता की स्थिति पैदा कर विदेशी निवेश को आमंत्रित किया गया है ।
इतने सारे जनविरोधी कदमों के बाद, योजना आयोग की जो थोड़ी सी कल्याणकारी भूमिका बची थी (उदारीकरण की नीतियों के लागू होने के बाद उसका दायरा वैसे भी संकुचित हो गया था) उसे पूरी तरह खत्म करने के उद्देश्य से मौजूदा प्रधानमंत्री ने स्वतंत्रता दिवस पर अचानक वीरता दिखाते हुये घोषित कर दिया कि योजना आयोग को समाप्त कर दिया गया ! स्वतंत्रता संग्राम के इतिहास में योजना आयोग की गौरवशाली भूमिका के बारे में या तो उन्हे जानकारी नहीं है या वे भूल गये थे ! योजना आयोग को खत्म कर नीति (जो अंग्रेजी ‘नैशनल इन्स्टिच्युट फॉर ट्रान्सफॉर्मिंग इन्डिया’ यानि NITI से लिया गया है) आयोग के नाम से एक संस्था का सृजन किया गया है । प्रधानमंत्री खुद उसके अध्यक्ष हैं । सदस्य के तौर पर मनोनीत किये गये हैं चार केन्द्रीय मंत्री एवं पूरावक्ती या आंशिक समय के लिये कुछ दक्षिणपंथी विशेषज्ञ । इस नीति आयोग के साथ जोड़ा गया है एक परिषद जिसके अध्यक्ष हैं प्रधानमंत्री एवं सदस्य हैं राज्य के मुख्यमंत्रीगण (स्रोत : भारत सरकार की अधिसूचना, 1 जनवरी 2015) ।
गौरतलब है कि मुख्यमंत्रियों को लेकर गठित राष्ट्रीय विकास परिषद पहले भी था । लेकिन जो अलग है इस बार एवं चिन्ता की बात है कि यह नीति आयोग नाम का संस्था देश के ‘कायापलट’ (?) के लिये सिर्फ सामान्य परामर्श देगा । उस ‘कायापलट’ के लिये धन का संग्रह कैसे होगा, किस तरह उस धन का बँटवारा होगा राज्यों के बीच एवं केन्द्रीय सरकार के मंत्रालयों के बीच, इस पर उस नीति आयोग को कुछ भी कहने का अधिकार नहीं है । वह अधिकार होगा सिर्फ प्रधानमंत्री एवं उनके मनोनीत वित्तमंत्री का, यानि व्यवहारिक तौर पर सारा अधिकार केन्द्रित होगा प्रधानमंत्री के हाथों में । इसके फलस्वरूप केन्द्र एवं राज्यों के बीच तथा केन्द्रीय सरकार के मंत्रालयों के बीच सामंजस्य बनाने में वैसी ही भयानक समस्या देखी जायेगी जैसी देखी गई थी स्वतंत्रता के बाद ढाई वर्षों तक, जब योजना आयोग का गठन नहीं हुआ था (इसका जिक्र पहले किया गया है) । सिर्फ वही नहीं, नीति आयोग स्थापित करने वाला कदम केन्द्रीय सरकार के अपने अन्दर ही गणतंत्र पर कुठाराघात होगा । जब एक केन्द्रीय सरकार धूर दक्षिणपंथी एवं जनविरोधी नीति अपनाता है तब वह पहले बाहर के जनतंत्र पर चोट करता है (संसद में बार बार अध्यादेश लाने के माध्यम से जो अभिव्यक्त हुआ) एवं उसके बाद अपने आन्तरिक जनतंत्र को भी विसर्जित करता है । नीति आयोग उसी का उदाहरण है ।
योजना आयोग के इतिहास की समीक्षा करते वक्त हमने गौर किया कि ब्रिटिश साम्राज्यवाद के खिलाफ समझौताविहीन संग्राम के हिस्से के रूप में योजना आयोग की बात जब वर्ष 1938 में नेताजी सुभाषचन्द्र बसु ने कहा था, एवं राष्ट्रीय योजना कमिटी गठित कर आगे बढ़ने का प्रयास किया था तब जबर्दस्त वाधायें खड़ी की गई थी पश्चिम भारत के बड़े औद्योगिक एवं व्यापारिक घरानों की ओर से । इस बार भी योजना आयोग को ध्वस्त करने के पीछे वही पश्चिम भारत के बड़े औद्योगिक व वणिक गुटों का हाथ रहा एवं यह काम दिल्ली में उनके वर्गीय प्रतिनिधियों ने साम्राज्यवादियों के साथ समझौता कर तथा उनके द्वारा प्रायोजित उदारीकरण की नीति के साथ हाथ मिलाकर किया ।

[साभार: गणशक्ति, बांग्ला दैनिक] 
हिन्दी अनुवाद: लोकलहर में प्रकाशित