সঙ্গীত১ সম্পর্কে আমাদের মত সাধারণ
মানুষের মধ্যে প্রচলিত ধারণাগুলি আজও এক কিম্ভূত-মহলে বন্দি। সঙ্গীতের উদ্গম বা উদ্ভবের
কিছু কল্পকাহিনী মহাদেবের জটার জটিলতায় ঘুরপাক খেতে থাকে। এ থেকেই বোঝা যায় আজ থেকে
সোয়া শো, দেড় শো বছর আগে কী বিষম পরিস্থিতি ছিল। রাগরাগিণীর কথা উঠলে ‘অযুত/অসংখ্য’, ব্যাকরণের কথা উঠলে ‘ঘরানার রহস্যময় বৈশিষ্ট’, সমধর্মিতার কথা উঠলে ‘শ্রুতির সূক্ষ্ম ভেদ’, সময়সীমার কথা উঠলে ‘নাদ’এর ‘ব্রহ্ম-বিস্তৃতির’ গল্প … অথচ মোদ্দা কথাটা ছিল যে যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে শাস্ত্রীয়
সঙ্গীত গতিহীন২ হয়ে পড়েছিল।
কে কবে কোথায় প্রথম শুরু করেছিলেন দেশের সঙ্গীতকে
নতুন শতাব্দীর আলোয় যাচাই করার প্রয়াস, প্রথম ধাপে কতখানি ঘটেছিল অগ্রগতি – জানা নেই। কিন্তু সাংস্কৃতিক পরম্পরার সব
ক্ষেত্রেই যে একটা জাতীয়তাবাদী-যুক্তিবাদী৩ পুনরাবিষ্কার প্রক্রিয়া শুরু
হয়েছিল উনিশ শতকে, সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও সেটা একই সময়ে শুরু হয়ে থাকবে।
কিছু বড় নাম এবং কিছু বড় কাজ (অবশ্যই আমি যেগুলোকে
বড় মনে করি) ধরে আমি নিম্নলিখিত শৃংখলাটি তৈরি করেছি – একে সঙ্গীতের যুক্তিবাদী পুনরাবিষ্কার এবং
পুনর্নির্মাণকে বোঝার একটি ঐতিহাসিক-যৌক্তিক (হিস্টোরিকো-লজিকাল) পদ্ধতি বলতে পারেন।
যদিও সে দৃষ্টিতে, কাজ এবং নামের দিক থেকে ভারতীয় বা বিশেষভাবে উত্তর-ভারতীয় সঙ্গীতের দুই মহাপুরুষ, পন্ডিত বিষ্ণুদিগম্বর পালুস্কর এবং পন্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখন্ডের মধ্যে পালুস্করের নাম প্রথমে আসা উচিৎ। তাঁর বৈপ্লবিক পদক্ষেপ, সঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং সম্পর্কিত কাজকর্ম ১৯০১ সালেই শুরু হয়েছিল যখন নাকি ভাতখন্ডের কালজয়ী গ্রন্থ ‘হিন্দুস্তানি সঙ্গীত-পদ্ধতি’র প্রথম খন্ড ১৯০৯ সালে এসেছিল। তা সত্ত্বেও, ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলোকে শৃংখলায় আনার জন্য তাঁর কাজের উল্লেখ ভাতখন্ডের পরে করেছি।
১ – রাগরাগিণীর প্রামাণিক ঠাট নির্দ্ধারণ
বাংলায় রবীন্দ্রনাথের জন্মের এক বছর আগে ১৮৬০
সালে মহারাষ্ট্রের কোল্হাপুরে জন্মেছিলেন বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে। আলটপকা রবিঠাকুরের
নামটা এইজন্য আনলাম যে ভারতে সঙ্গীতে যুক্তিবাদের যে কোনো অধ্যয়নে তাঁর প্রসঙ্গ অপরিহার্য।
ভাতখন্ডে পেশায় উকিল ছিলেন। পেশায় সফল ছিলেন। ভারতের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (উত্তর ভারতীয়
এবং কর্ণাটকি, দুটোই) বা মার্গসঙ্গীতের অধ্যয়ন প্রথম থেকেই তাঁর নেশা ছিল। স্ত্রী এবং
কন্যার অসাময়িক মৃত্যুর পর বেরিয়ে পড়লেন ভারত ভ্রমণে। এতদিন ওকালতিতে যে টাকা উপার্জন
করেছিলেন তা কাজে লাগল। এক একটি ঘরানার জীবিত বিশারদদের কাছে গিয়ে দেখা করলেন। সে দেখা
সহজ ছিল না। অধিকাংশ ওস্তাদ, গুরু বা বিশারদ নিজেদের অহঙ্কারে মজে ছিলেন। দেখা করতে
আসা লোকটির উদ্দেশ্যের কথা জেনে, তার বিরুদ্ধে নিজেদের ক্রোধ ও উপেক্ষা জাহির করতে
তাঁরা কিছু বাকি রাখেন নি। যেন লোকটি কোনো গর্হিত কাজ করতে বেরিয়েছে। দর্জির ফিতে দিয়ে
অসীমকে মাপতে বেরিয়েছে! এত বড় স্পর্ধা? সঙ্গীতকে মাপবে? এখনি শিবের তৃতীয় নেত্র খুলবে
আর পাপিষ্ঠ লোকটি তাঁর রোষানলে ভস্ম হয়ে যাবে! … তবুও ভাতখন্ডে জারি রাখলেন তাঁর ভ্রমণ। কেউ কিছু বলতেই চায় না!
তবু কাজে লেগে রইলেন তিনি। যেখানে যেটুকু পাওয়া যায়। ছোটো ছোটো নোটে ডাইরি ভরে গেল।
তারপর ফিরলেন আবার কোলহাপুরে, নিজের বাড়িতে। প্রথমে একটা ছোটো বই লিখলেন রাগের পরিচিতি
নিয়ে – ‘স্বরমালিকা’। তারপর বন্ধুদের কথায় মারাঠিতে লিখলেন তাঁর ম্যাগনাম ওপাস, ‘হিন্দুস্তানি সঙ্গীত-পদ্ধতি’। এই গ্রন্থের চতুর্থখন্ডের মুখবন্ধে উনি লিখেছেন
–
“সঙ্গীত বিষয়ে আমার
অভিজ্ঞতা মোটামুটি পঞ্চাশ বছরের। এই পঞ্চাশ বছরে দেশের অনেক সুপ্রসিদ্ধ গায়ক-বাদকের
সম্পর্কে আমি এসেছি। যে সব নামকরা গুণী শিল্পীদের আমি শুনেছি, তাঁদের অধিকাংশের নাম
এই গ্রন্থে দেওয়া হয়েছে। গ্রন্থটি লেখা শুরু করার আগে এক নেপাল বাদ দিয়ে অন্য সমস্ত
প্রদেশে গিয়ে থেকে, সেখানকার গায়ক-বাদকদের সঙ্গে সঙ্গীতচর্চা করে এবং প্রবাসে যা কিছু
উপযোগী গ্রন্থ দেখতে পেয়েছি, সেগুলো সম্পাদিত করে, ভালোভাবে অধ্যয়ন করেছি। শুধু তাই
নয়, অনেক প্রখ্যাত গায়কদের সামনে নিজে বসে তাঁদের কাছ থেকে খেয়াল-ধ্রুপদের হাজার, দেড়
হাজার গান শিখেছি এবং নোটেশনও তৈরি করেছি। তার অধিকাংশ তো আমি আমার বিশিষ্ট শিষ্যদের
শিখিয়েও দিয়েছি। সার কথা এই যে এতটা পূর্ব প্রস্তুতি নেওয়ার পরই আমি এই গ্রন্থ রচনার
কাজে হাত দিয়েছি।
সবচে’ আগে আমি সমাজে বর্তমানে প্রচলিত সবক’টি রাগকে সূক্ষ্মভাবে নিরীক্ষণ করেছি। তাতে
দেখতে পেয়েছি যে আজকাল সমাজে একশো-দেড়শোর বেশি রাগ গাওয়া হয় না। এটাও লক্ষ্য করেছি
যে স্থূল দৃষ্টিতে এ সমস্ত রাগকে মূলতঃ নিচের তিনটে শ্রেণিতে ভাগ করা যায়ঃ–
এটাও লক্ষ্য করলাম যে গাওয়ার সময় কয়েকটি রাগে
দ্বিরূপ স্বর প্রকট হয়, কিন্তু সব মিলিয়ে সে রাগগুলোর চলন এবং রচনা দেখে বলতে পারি,
তাদের শ্রেণি পৃথক করার প্রয়োজন নেই। এভাবে, শ্রেণি নির্দ্ধারিত হয়ে যাওয়ার পর, সমস্ত
রাগকে শ্রেণিভুক্ত করার জন্য নিম্নলিখিত দশটি মেল বা ঠাটকে আমি হিন্দুস্তানি সঙ্গীতের
ভিত মনে করলামঃ–
টোড়ি ঠাটে গা কোমল এবং টোড়ির কয়েকটি ধরণে গা,
নি কোমল। তাই ঠাটটাকে গা, নি প্রযুক্ত শ্রেণিতে নেওয়া হয়েছে। এভাবে, সমস্ত রাগকে এই
দশটি ঠাটে শ্রেণিভুক্ত করে … “ [মারাঠি সংস্করণের
মুখবন্ধ, হিন্দুস্তানি সঙ্গীত পদ্ধতি, চতুর্থখন্ড, সঙ্গীত কার্যালয়, হাথরস]
এমন নয় যে রাগরাগিণীকে শ্রেণিভুক্ত করার চেষ্টা
এর আগে হয়নি। আরোহ-অবরোহের চক্রাকার বিন্যাস, ভাব এবং আরো অন্যান্য ধরণে শ্রেণিভুক্ত
করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু একটিই সপ্তকে আরোহের ন্যুনতম যে ক’টি রূপকে চিহ্নিত করা যেতে পারে, তাদেরকে ঠাট
বলে, সেই ভিত্তিতে রাগরাগিণীর শ্রেণিকরণ প্রথমবার ভাতখন্ডেই করেছিলেন। এখনো অনেকেই
এ কাজটাকে হাওয়ায় উড়িয়ে দেয়। সেদিনই ইন্টারনেটে দেখলাম একজন বলছেন, ঠাট দিয়ে রাগরূপের
তল পাওয়া সম্ভব নয়। কে বলছে ভাই, যে সম্ভব? ভাতখন্ডে সাহেব কি বলেছেন? ভাবের তল, প্রাণের
মাপ সত্যিই পাওয়া যায় না কিন্তু হাড়ের মাপ তো পাওয়া যায়! আর সে সময় এটাই সবচেয়ে বৈপ্লবিক
কাজ ছিল। সাত স্বরের সপ্তকে সা আর পা স্থির রেখে, বাকি পাঁচটি স্বরের মধ্যে মাএর কড়ি
ও শুদ্ধ এবং রে, গা, ধা, নির কোমল এবং শুদ্ধ – দশটি স্বর, দশটি রূপ। যতই হোক রাগ এবং রাগিণী, তার দশটি বিমূর্ত
বর্গ বা শ্রেণিনির্মাণ।
বেঁধে দিলেন উনি। এমন বাঁধলেন যে পুরো ভারত
মানল সে বাঁধন। আপনি গায়ক? বাদক? জৌনপুরি সাধছেন ওস্তাদ? সাধুন! বোধহয় আপনার মনে ছবি
ফুটে উঠছে … শরতকালে ছোট্ট কসবার
রাস্তাটার, যখন আপনি স্কুলে যাওয়ার জন্য সেটা পার করতেন, রামতিরথের দোকানের জিলিপির
গন্ধ ভুলিয়ে দিত সংস্কৃত স্যারের পেটাই … দু’পয়সার জিলিপি কিনে
বসে যেতেন আমবাগানে … রোদ চড়ত ধীরে ধীরে,
পাতার ফাঁক দিয়ে মুখে, ঘাসে এসে পড়ত তার আলো … গেয়ে চলুন, বাজিয়ে চলুন, প্রাণ ভরে মনে আনুন সেই সকালের আনন্দবেদনা!
একদম মনে রাখার দরকার নেই যে জৌনপুরির ঠাটটা কি। কিন্তু ভাবের বিস্তারে কখনো যদি আশাবরির
কোনো অঙ্গ ছুঁয়ে যেতে ইচ্ছে হয় তখন ভাববেন যে এই ইচ্ছের গতিপথের সুত্রটা কে আবিষ্কার
করেছিল!
ঠাটের ধারণা কি সঙ্গীতের স্বাভাবিক গতিকে রুদ্ধ
করে? পদ্মফুলের ফুলসুদ্ধু মৃণালগুলোকে নারকেলের দড়ি দিয়ে বাঁধতে যায়? এটা কি সেরকমই
হাস্যকর কোনো চেষ্টা, ভক্ত হনুমানের নামে প্রচলিত গল্পে যেমনটা আছে যে তিনি নাকি সীতামায়ের
দেওয়া মুক্তোর মালা থেকে মুক্তো ছিঁড়ে চিবিয়ে দেখছিলেন যে সেটা খাওয়া যায় কিনা? অথবা
যুক্তির পথে একটি বিরাট মুক্তিকে সম্ভাবিত করা হল! আধুনিক যুগের সাথে এবং ভারতের জাতীয়
অভ্যুদয়ের সাথে ভারতের সাংস্কৃতিক পরম্পরাকে যোগ করার একটি পথের সিদ্ধান্ত ছিল ভাতখন্ডের
কাজে। সারা দেশের জন্য এক মান নির্দ্ধারণ এবং প্রমিতকরণ। এটা ছিল প্রথম যুক্তিবাদি
পদক্ষেপ।
মাদুরাইয়ের মীনাক্ষী মন্দিরের ভিতরে একটি স্তম্ভ
আছে যেটি বস্তুতঃ বাইশটি শীর্ণ স্তম্ভের গুচ্ছ। শীর্ণ স্তম্ভগুলোর মাঝে খালি জায়গা
আছে। কোনো একটা পাতলা কাঠি দিয়ে আলাদা আলাদা বাজালে বাইশটি বিভিন্ন স্বর উৎপন্ন হয়।
সেগুলি নাকি বাইশ শ্রুতি। অদ্ভুত, না? এত জটিল একটা ট্যুনিং ফর্ক, বিরাট পাথরে তৈরি
এবং তাও এক সপ্তকের বাইশটি স্বরের জন্য। কত শতাব্দি আগেকার!
ভারতের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পরম্পরার যে বিপুল বৈভব, কত শতাব্দিকাল ধরে সে ঐতিহ্যকে জিইয়ে রাখার যে অনন্য ফল – রাগরাগিণীর প্রতিষ্ঠিত সামাজিক সম্পর্ক (দিন-রাতের প্রহর অনুসারে, মনের ভাবানুসারে সুর ও ভাবের সূক্ষ্ম প্রভেদ প্রায় সামাজিক অবচেতনের অঙ্গীভূত হয়ে গেছে – এক একটি রাগ বা রাগিণী এখন কয়েকটি মেজাজের ভান্ডার, রিপোজিটরি অফ মুডস), অনহদ নাদের কল্পনার প্রতিধ্বনি এত বছর ধরে প্রাচ্যের বিশ্বদৃষ্টিকে যে এক বিশেষ বর্ণ দিয়েছে, এই সবকিছুকে ছোটো করে দেখার অভিযোগ যদি কেউ করে তাহলে সেটাই বরং পাগলের প্রলাপ হবে।
২ – সঙ্গীত সম্মেলনের আয়োজন
ঠাটের ভিত্তিতে রাগরাগিণীর প্রমিতকরণের পর
স্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ বা বলা যায় দ্বিতীয় ঐতিহাসিক মুহূর্ত ছিল সঙ্গীত সম্মেলনের
আয়োজন। তথাকথিত রহস্যময় ঘরানাকেন্দ্রিকতা থেকে মার্গ সঙ্গীতকে বাইরে আনল এই আয়োজন।
মানুষের কাছে পৌঁছোল সঙ্গীত, মানুষের কাছে পৌঁছোতে ধীরে ধীরে লঘু করতে এমনকি ভাঙতেও
হল অনেক অর্থহীন হয়ে পড়া রীতি। হয়ত বিরাট মাপের বিখ্যাত কিছু বিশারদ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান
করলেন সম্মেলনে গাইবার বা বাজাবার ডাক, তবু একসাথে পরিবেশন, একে অন্যকে শোনা এবং ক্রমবর্দ্ধমান
শ্রোতৃবর্গের কাছে নিজের শিল্প পৌঁছোনোর মত করে তোলা শুরু হল।
এ কাজেও ভাতখন্ডে পথ দেখালেন। যদিও জলন্ধরের
হরিবল্লভ সঙ্গীত সম্মেলন দাবি করে যে ওদের সম্মেলন সবচেয়ে পুরোনো – ১৮৭৫এ শুরু হয়েছে, এবং সেটা হতেও পারে – কিন্তু যে উদ্দেশ্যের কথা বলছি সে উদ্দেশ্যের
সাথে সম্মেলন বিশের শতকের দ্বিতীয় দশকে শুরু হল। কেননা ভাতখন্ডে এ কাজে ততক্ষণ সফল
হতে পারতেন না যতক্ষণ নিজে, সঙ্গীত নিয়ে তাঁর ঐতিহাসিক গবেষণার ফলে সঙ্গীত-সমাজে প্রতিষ্ঠিত
না হতে পারতেন। ঘটনাটা এমন হল যে বরোদার মহারাজা, যিনি ভারতীয় শিল্পকলা, শিক্ষা, গ্রন্থালয়
ইত্যাদির আধুনিকীকরণের জন্য প্রসিদ্ধ, বরোদায় সঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার জন্য
ডেকে পাঠালেন ভাতখন্ডেকে, এবং বোধহয় বিষ্ণুদিগম্বর পালুস্করকেও। সেটা ছিল ১৯১৬ সাল।
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতিক্রমে ভাতখন্ডে মহারাজাকে সঙ্গীত সম্মেলনের প্রস্তাব
দিলেন। ফলে বরোদায় ঐতিহাসিক সর্বভারতীয় সঙ্গীত সম্মেলনের আয়োজন হল। সারা দেশ থেকে চারশোরও
বেশি সঙ্গীতজ্ঞেরা অংশগ্রহণ করেছিলেন। আয়োজনের প্রারম্ভে ভাতখন্ডে একটি দীর্ঘ সারগর্ভ
ভাষণ দিলেন যেটি পরে A short historical survey of the music of upper India নামে প্রকাশিত
হয়েছিল। এই ভাষণের প্রথমদিকের একটি প্যারাগ্রাফ, ঈষৎ দীর্ঘ হওয়া সত্ত্বেও উদ্ধৃত করতে
চাই কেননা যে জাতীয়তাবাদি-যুক্তিবাদি পুনরাবিষ্কারের কথা এই প্রবন্ধের শুরুতে বলেছি
তার স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে উদ্ধৃতিতেঃ
A satisfactory feature of the
Renaissance of Indian culture and Indian ideals, which characterises the
intllectual activity of India of the present day, is the attention that is paid
to the revival of our ancient music. The keen interest evinced by the present
generation in the preservation and further progress of this national heirloom
has materialised itself broadly speaking, in two different aspects. On the one
hand, one notices the movement of learned scholars from all parts of India
meeting in national conferences with a view to focus attention on and
co-ordinate the results of research grappling with the technical side of the
question such as for instance, the working out of a system of uniform and
adequate notation, the systematising of the ragas at present sung in the
northern part of the country, so as to make the same easy of instruction ad
assimilation and so forth. On the other hand one welcomes the growth of numerous
music clubs and schools of music, – and with it the facilities offered for serious and
thorough-going study of the art, – and its gradual introduction into our homesteads. Both these
aspects are complimentary of each other, neither is complete without the other.
The learned but dry-as-dust disquisitions of our theorists would be fruitless
waste of time if they did not succeed in evoking some interest on the part of
the public in the art; while the Gyan Samaj would be a deplorably shaky
superstructure without the firm foundation of the science.
একদিকে রাগরাগিণীর গভীরে বিবিধ পথগামী অনুসন্ধানের
পরিণামগুলো একজায়গায় এনে তার একরূপ নোটেশন তৈরি করে প্রণালিবদ্ধকরণ (সিস্টেমেটাইজেশন)
এবং অন্যদিকে জনগণের হৃদয়ে পৌঁছোনোর সংগঠিত প্রয়াস। এবং এই দুটোকে একসাথে যোগ করতে
পারে বিজ্ঞানের মজবুত ভিত্তি।
পরে তো দেশের বিভিন্ন শহরে এ ধরণের সঙ্গীত সম্মেলন অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠল। স্বাধীনতার পর অল ইন্ডিয়া রেডিও বা আকাশবাণী আয়োজিত সঙ্গীত সম্মেলনের বিশেষ গুরুত্ব কায়েম হল সঙ্গীতমহলে। দেশের অন্যান্য শহরে তো বড় বড় সঙ্গীত সম্মেলনে টিকিট, গেটপাস ইত্যাদির ব্যবস্থা হত, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি পাটনার কথা। দুর্গাপুজো থেকে কালীপুজো অব্দি ডজন খানেক সাঙ্গীতিক আয়োজন – চিল্ড্রেন্স পার্ক, পাটনা কলেজিয়েট, গোবিন্দ মিত্র রোড, সব্জিবাগ, নালা রোড, গান্ধী ময়দান, সেক্রেটারিয়েট, বীণা সিনেমা, স্টেট ব্যাঙ্ক … ঠিক সঙ্গীত সম্মেলন না হলেও তার থেকে খুব কম কিছু হত না। গেটপাস কিছু থাকত, কিন্তু তা বহাল থাকত শেষ রাত অব্দি। শাস্ত্রীয় নৃত্যের সমঝদার হোন বা না হোন, নাচ দেখার সামন্ততান্ত্রিক ঐতিহ্যে কায়েম থেকে বড়লোক শ্রোতারা চেয়ারে থাকতেন ওই সিতারা দেবী বা যামিনী কৃষ্ণমুর্তি বা উর্মিলা নাগর বা অন্য কোনো শিল্পীর নাচ অব্দি। সামিয়ানায় ভোরের হাওয়া লাগার আগেই চেয়ারগুলো খালি হয়ে যেত আর বাঁশের বেড়ার ফাঁকফোকর দিয়ে ঢুকে পড়ত গেটপাসহীন সাধারণ মানুষেরা। গ্রাম থেকে গরুর গাড়ীতে করে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শুনতে আসছে লোকে, ভাবা যায়? ভাবা যায়, বৃষ্টি নামল, আয়োজকেরা গিরিজা দেবীর গান থামিয়ে ভিতরে নিয়ে যেতে ব্যতিব্যস্ত আর গিরিজা দেবী? দূরের শ্রোতাদের আওয়াজ “গেয়ে চলুন গিরিজা দেবী, আমরা আছি” শুনে আয়োজকদের বললেন পাঁচটে ছাতার ব্যবস্থা করতে। একটা তাঁর মাথায়, একটা তানপুরার মাথায়, একটা তবলচির মাথায় … এবং গেয়ে চললেন অঝোর বৃষ্টির মধ্যে খেয়াল শেষ করে একের পর এক ঠুমরি, কাজরি! এই ছিল ভাতখন্ডে, পালুস্কর এবং অন্যান্যদের কাজের জোর! জাতীয়তাবাদী-যুক্তিবাদী অভিযানের জোর! … শিশুদের লেখাপড়া শুরু হয় হাতে-খড়ি দিয়ে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে দেশের সাধারণ মানুষের কানে-খড়ি হতে পেরেছিল এই সব সঙ্গীত সম্মেলনের জন্য।
৩ – সঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
গুরু-শিষ্য পরম্পরার মাধ্যমেই আমরা মহান সঙ্গীতজ্ঞদের
পেয়েছি। আজও, পল্লবগ্রাহিতায় থেমে না থেকে গভীরতর অনুধ্যানে যেতে হলে গুরুর কাছেই গান্ডা
বাঁধতে হবে। কিন্তু শুধু মহানদের দিয়েই কি কাজ চলে? একটু কম মহানদেরও দরকার পড়ে। সাধারণদেরও
দরকার হয়। সবচেয়ে বড় কথা, মহান গায়কের গান শুনে যদি দু’এক লাইন গুনগুন করতে ইচ্ছে হয়, তাহলেও বেসুরোই
গুনগুন করব? অথবা শুধু সেই গুনগুন করবে যার গলায় সহজাত সুর আছে ঈশ্বরের বরদানে? কেউ
হয়ত একটুই শিখতে চায় – শিল্পটা বুঝতে,
নিজের আনন্দ-অবসরে গাইতে বাজাতে। কারোর হাতে বেশি সময় নেই। সংসারের জোয়াল কাঁধে নিতে
হবে, বিয়ের জন্য চাপ শুরু হবে, আর্থিক সঙ্গতি কম, বাজারে নামতে হবে ইত্যাদি, ইত্যাদি
… । আর, শাস্ত্রীয়
সঙ্গীত যদি সত্যিই জাতীয় ঐতিহ্য হয়, তাহলে তো সেটা জনমানসে ছড়িয়ে দেওয়ার দরকার আছে।
কাজেই অধ্যাবসায়ী শিক্ষানবিশ, চেলা, যে বছরের পর বছর গুরুর কাছে গান্ডা বেঁধে শিখতে
প্রস্তুত সে শিখুক, কিন্তু নিয়মিত পাঠ্যক্রমে, সীমিত সময়ের ডিগ্রি ও ডিপ্লোমা কোর্সে
প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য স্কুল কলেজ চালু করা হোক।
যদ্দূর জানতে পারছি আরেক মারাঠি প্রবর্তক পন্ডিত
বিষ্ণু দিগম্বর পালুস্কর স্থাপন করলেন প্রথম সঙ্গীত বিদ্যালয়। অভাবনীয় ছিল তখন! পিরিয়ডের
ঘন্টি বাজিয়ে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শেখা? হতে পারে? অথচ হল। ১৯০১ সালের ৫ই মে, দেশের প্রথম
সঙ্গীত বিদ্যালয়, ‘গন্ধর্ব মহাবিদ্যালয়’ স্থাপিত হল লাহোরে। তারপর আর কী? বিদ্যালয়ের
পর বিদ্যালয় স্থাপিত হয়ে চলল। অনেকেই এগিয়ে এলেন এ কাজে। প্রথম পাঠ্যক্রমও পালুস্কর
সাহেবই তৈরি করেছিলেন, একটা বোর্ড গঠন করেছিলেন। সে বোর্ড এখনো আছে – যেহেতু বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে গেছে তাই এখন
তার নাম ‘অখিল ভারতীয় গন্ধর্ব
মহাবিদ্যালয় মন্ডল’। গন্ধর্ব মহাবিদ্যালয়ও
এখন দিল্লিতে; অন্যান্য জায়গায়ও আছে। এখন তো সঙ্গীত বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে, তাও একাধিক।
অন্যান্য কিছু বিশ্ববিদ্যালয়েও সঙ্গীতের পাঠ্যক্রম আছে।
রবীন্দ্রনাথের সময় ইংরেজ সরকারের শিক্ষা বিভাগ
এ বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে তিনি যোগ্যতম ব্যক্তি হসেবে ভাতখন্ডের নাম নিয়েছিলেন। নিজের
বিশ্ববিদ্যালয়েও সঙ্গীত বিভাগের প্রধান হিসেবে ভাতখন্ডে কে চাইতেন। পেলেন না যদিও।
যদিও একাজটা সমাজবিজ্ঞানের কাজ হিসেবে অনেক
পরে শুরু হয়েছে কিন্তু ভারতীয় সঙ্গীতে যুক্তির হস্তক্ষেপ হিসেবে আমি এটাকে, পূর্বকথিত
ঐতিহাসিক-যৌক্তিক ক্রমে চার নম্বর কাজ হিসেবেই দেখব।
এ কাজে প্রথম দিগদর্শন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
অর্থাৎ, লোকসঙ্গীত শুনতে শুনতে মাঝে মধ্যে তার ভিতরে রাগ-রাগিনীর এক একটা আদল শুনতে
পেয়ে মনে প্রশ্ন জাগত কিন্তু যতটা পড়েছি, তিনি উত্তরটা মনে হয় খুঁজতেন এদেশের জলহাওয়ায়,
প্রকৃতিতে, যা ওই রাগরাগিনীর মধ্যেই ঘোরাফেরা করার মত করে মানুষের কান ও হৃদয় তৈরি
করেছে, তাই সে মার্গসঙ্গীতে থাকুক বা লোকসঙ্গীতে, ওই রাগরাগিনী মেনেই চলবে, তবে চলনটা
ভিন্ন হবে। লোকসঙ্গীত চলবে মুক্ত ছন্দে আর মার্গসঙ্গীত বন্ধনে। কিন্তু দুটোই স্বতন্ত্র
ধারা। একটির শিকড় আরেকটির মধ্যে থাকতে পারে
এমন কোনো প্রস্তাব উনি করছেন, এমন পড়িনি।
সে প্রস্তাবটা প্রথম করেন ১৯৩৫ সালে অর্দ্ধেন্দ্র
চন্দ্র গাঙ্গুলি, সে সময়কার এক বিখ্যাত শিল্প-ইতিহাসবিদ। তাঁর বই “Ragas and Raginis’ এর মুখবন্ধে তিনি বললেন –
“Orthodox music
practitioners, opposing any manner of new developments and innovations – on the belief that Indian Music is a
stereotyped system hidebound by strict rules and conventions prescribed by
ancient musical Sages, to depart from which is to assail the individuality of
Indian Musical thought – and,
therefore, a musical crime, may find in this Volume much material which may
contradict such a belief. Indeed, the history of the rāgas, of which a bare
outline, is, here presented demonstrates that in all periods of its development
– Indian Music
has grown and progressed by assimilating new ideas from non-Aryan and
aboriginal musical practices – and that the Classical Rāga-System is firmly based on and is
heavily indebted to Primitive Folk-music, having never disdained from borrowing
and assimilating new data from alien or foreign sources.”
মূল বইয়েও কয়েক পৃষ্ঠা এগিয়েই রয়েছে –
এ বইটার কথা আমি জানতাম না। আগে এ লেখাটা যখন
‘সঞ্চিতা’ পত্রিকায় ধারাবাহিক ছেপেছিল, আমি স্পষ্ট লিখেছিলাম
যে কাজটা কবে শুরু হয়েছে আমি জানি না, কিন্তু মনে হয় বিশ শতকের কুড়ি-তিরিশের দশকের
আগেই শুরু হয়ে থাকবে, এবং নবজাগরণের প্রভাবে বাংলায় শুরু হয়ে থাকবে। যাহোক, শেষ অব্দি
এক বাঙালিকেই পেলাম, ১৯৩৫ সালে। এর জন্য বিশেষভাবে আমি ‘দি হিন্দু’ খবরের কাগজের ৩১শে মার্চ
২০২২এর অনলাইন একটি খবরের কাছে ঋণী। Classical music’s folk links শীর্ষক খবরটায় প্রথম ও সি গাঙ্গুলির
নাম জানলাম। তারপর তাঁর নামের সূত্রে ইন্টারনেটে বইটা খুঁজে পেলাম।
তবে, আগের লেখায় এটাও লিখেছিলাম যে “শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রাণভোমরাটা যেহেতু লোকসঙ্গীতের
মুঠোয় তাই বার বার তাকে লোকসঙ্গীতের কাছে যেতে হবে, নতুন প্রাণের মেয়াদ নিয়ে ফিরতে
হবে – এবং শুধু তত্ত্ব
হিসেবে কথাটা বলা নয়, কাজ হিসেবে করার তাগিদটা বিশশতকের দ্বিতীয়-তৃতীয় দশকে শুরু হয়ে
থাকবে।
“রাগের ভাবপ্রসার করতে গিয়ে সচেতনভাবে লোকগীতির সুরে পৌঁছে যাওয়া আজ খুব স্বাভাবিক বলে মনে হয়। কুমার গন্ধর্বের গায়কীর বিরল সৌন্দর্য লোকসঙ্গীতকে revisit করারই ফলশ্রুতি।”
৫। লোকসঙ্গীত সংগ্রহ ও গবেষণা
এ কাজটিও সমাজবিজ্ঞানের পদ্ধতিতে হয়ত পরে শুরু
হয়েছে।
লোকসঙ্গীতের যাঁরা ধারক-বাহক তাঁরা অনেকেই
আধুনিক বিদ্যালয়ী শিক্ষার আলো থেকে আজও বঞ্চিত। ঔপনিবেশিক প্রভাবে আধুনিক বিদ্যালয়ী
শিক্ষার ‘আলো’টাও এমন যে মগজে ঢুকলেই লোকজীবন নামক দিগরেখাটি
দৃষ্টির অগোচর হয়ে যায়।
সে সমস্যাটা নিজের জায়গায় থাক। তার জন্য কাজটা
আটকায় নি (ক্ষতি হচ্ছে অন্য জায়গায়, সেটা আপাততঃ বিচার্য নয়)। সংগ্রহের কাজটা সংরক্ষণ
ও গবেষণার সাথে সম্পর্কিত এবং সেটা দুধরণের। প্রথমতঃ গীতিসাহিত্যের এবং গীতিপ্রকৃতির
বিবরণ সংগ্রহ। সেটা প্রবন্ধ বা বইয়ে সংগৃহীত থাকতে পারে। দ্বিতীয়তঃ সুর-তালের শ্রাব্য
সংগ্রহ। সেটা, যদি কোনো গায়ক বা বাদক গবেষক নিজের গলায় বা যন্ত্রে তুলে না নেয় তাহলে
অডিও বা ভিডিও রেকর্ডিং হতে হবে।
প্রথম ধরণের সংগ্রহ ভারতে উনিশ শতকের মাঝামাঝি
সময় থেকেই আসা শুরু করেছিল। সামাজিক নৃতত্ব এবং সাংস্কৃতিক নৃতত্ব ইওরোপে একটি নতুন
বিজ্ঞান হিসেবে দেখা দিয়েছিল। ঔপনিবেশিক শক্তি নিজের শাসন সুদৃঢ় করার প্রয়োজনেই, বিজ্ঞানের
এই নতুন ক্ষেত্রে কাজ করা গবেষকদের কাজ করার পরিসর দিয়েছিল। একবার শুরু হওয়ার পর কাজটা
আর থামেনি। ভারতের বিভিন্ন ভাষায় দেশীয় গবেষকরা এ ধরণের সংগ্রহের কাজে এগিয়ে গিয়েছিলেন।
এ মুহূর্তে ভারতের প্রায় সবক’টি ভাষা, উপভাষা এবং লোকভাষার গীতির, কোনো মহাফেজখানায় রাখার মত
অন্ততঃ নমুনা সংগ্রহ অবশ্যই আছে। বই না থাকলে প্রবন্ধাদি আছে।
কিন্তু আমি যে জায়গা থেকে কাজটাকে দেখছি সেখানে সুর-তালের শ্রাব্য সংগ্রহের কাজটা জরুরি।
যাঁরা নিজেরা গায়ক এবং বাদক, এবং জাতীয়তাবাদী-যুক্তিবাদী চিন্তায় দীক্ষিত হয়ে মার্গ
সঙ্গীত এবং লোকসঙ্গীতের মধ্যেকার জীবিত সম্পর্কটা বুঝতে পারছিলেন, তাঁরা নিজের মত করে
পৌঁছোচ্ছিলেন লোকগায়ক ও বাদকদের কাছে। সংগ্রহটা করছিলেন নিজেদের মাথায়, গলায়, হাতের
যন্ত্রে এবং অথবা পকেটের নোটবইয়ে লেখা স্বরলিপিতে। কিন্তু সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার মত
সংগ্রহ কারিগরী কারণেই রেকর্ডিং শুরু হওয়ার আগে সম্ভব ছিল না। আর সত্যি সত্যি প্রত্যন্ত
অঞ্চলে, জঙ্গলে, পাহাড়ে, মরুভুমিতে বসবাসকারী, স্থলে, জলে রোজকার শ্রমে ব্যস্ত গ্রামীণ
শিল্পীদের কাছে গিয়ে ফিল্ড রেকর্ডিং করা বিশ শতকের পাঁচের দশকের আগে সম্ভব হয় নি। কেননা
টেপ রেকর্ডারের উদ্ভাবন হয়েছিল দশ বছর আগে; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেই সে নতুন যন্ত্রটা
বাজার ধরেছিল।
উনিশ শতকের শেষভাগ থেকেই বাংলার মনীষীদের দেখা
যায় লোকসঙ্গীত নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে।
১৯৩৭ সালে রাশিয়ার চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ নিজের
দেশের শ্বাসরোধী পরিস্থিতির সাথে বিপ্লবপরবর্তী রাশিয়ার বিরাট অগ্রগতির তুলনা করতে
গিয়ে লিখছেন, “লোকসাহিত্য, লোকসঙ্গীত
নিয়েও প্রবল বেগে কাজ চলছে”। তার মানে এ নিয়ে
তাঁর মনে আগে থেকেই ভাবনাচিন্তা চলছিল। নিজের গানের সুরে লোকসঙ্গীতকে আকর হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং শিল্পীদের কাছে বসে
লোকসঙ্গীত শুনেছেন। সে সুযোগও তাঁর ছিল। তবে আপন শিক্ষায়তনটিতে একাজ করাতে তিনি কিভাবে
সচেষ্ট হয়েছিলেন, নিশ্চয়ই লেখা হয়ে থাকবে, তবে আমি পড়িনি। তবে খবর নিয়েছিলাম, অন্ততঃ
কয়েক বছর আগে পর্য্যন্ত বিশ্বভারতীতে এই বিভাগটা ছিল না।
গবেষণার তো হাজারটা দিক আছে। তবে সংগীতের বিকাশের ইতিহাসে যুক্তিবাদ প্রয়োগের দিক থেকে যে গবেষণাটা প্রয়োজন তা হল, শাস্ত্রীয়ের উৎস যে লোক, তার উজ্জীবনের সোনার কাঠি যে লোক, সেটার তথ্যপ্রমাণ যোগাড়, বিশ্লেষণ ও নিষ্পত্তি।
৬ – নতুন সঙ্গীত রচনা
৭ – বাংলায় গান রচনার পরম্পরা
৮ – সঙ্গীতে যুক্তিবাদ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা
৯ – যুক্তিবাদ বনাম নন্দন তত্ত্ব
১০ – উপসংহার