Thursday, December 23, 2021

সঙ্গীতে যুক্তিবাদ – কিছু ব্যক্তিগত ভাবনাচিন্তা

সঙ্গীত সম্পর্কে আমাদের মত সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত ধারণাগুলি আজও এক কিম্ভূত-মহলে বন্দি। সঙ্গীতের উদ্গম বা উদ্ভবের কিছু কল্পকাহিনী মহাদেবের জটার জটিলতায় ঘুরপাক খেতে থাকে। এ থেকেই বোঝা যায় আজ থেকে সোয়া শো, দেড় শো বছর আগে কী বিষম পরিস্থিতি ছিল। রাগরাগিণীর কথা উঠলে অযুত/অসংখ্য, ব্যাকরণের কথা উঠলে ঘরানার রহস্যময় বৈশিষ্ট, সমধর্মিতার কথা উঠলে শ্রুতির সূক্ষ্ম ভেদ, সময়সীমার কথা উঠলে নাদএর ব্রহ্ম-বিস্তৃতির গল্প অথচ মোদ্দা কথাটা ছিল যে যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত গতিহীন হয়ে পড়েছিল।

কে কবে কোথায় প্রথম শুরু করেছিলেন দেশের সঙ্গীতকে নতুন শতাব্দীর আলোয় যাচাই করার প্রয়াস, প্রথম ধাপে কতখানি ঘটেছিল অগ্রগতি জানা নেই। কিন্তু সাংস্কৃতিক পরম্পরার সব ক্ষেত্রেই যে একটা জাতীয়তাবাদী-যুক্তিবাদী পুনরাবিষ্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল উনিশ শতকে, সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও সেটা একই সময়ে শুরু হয়ে থাকবে।

কিছু বড় নাম এবং কিছু বড় কাজ (অবশ্যই আমি যেগুলোকে বড় মনে করি) ধরে আমি নিম্নলিখিত শৃংখলাটি তৈরি করেছি একে সঙ্গীতের যুক্তিবাদী পুনরাবিষ্কার এবং পুনর্নির্মাণকে বোঝার একটি ঐতিহাসিক-যৌক্তিক (হিস্টোরিকো-লজিকাল) পদ্ধতি বলতে পারেন।

রাগরাগিণীর প্রামাণিক ঠাট নির্দ্ধারণ
সঙ্গীত সম্মেলনের আয়োজন
সঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
লোকসঙ্গীত ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মধ্যেকার চিরায়ত সম্পর্কের পুনরাবিষ্কার
লোকসঙ্গীত সংগ্রহ ও গবেষণা
নতুন সঙ্গীত রচনা
বাংলায় গান রচনার পরম্পরা
সঙ্গীতে যুক্তিবাদ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা
যুক্তিবাদ বনাম নন্দন তত্ত্ব
১০ উপসংহার

যদিও সে দৃষ্টিতে, কাজ এবং নামের দিক থেকে ভারতীয় বা বিশেষভাবে উত্তর-ভারতীয় সঙ্গীতের দুই মহাপুরুষ, পন্ডিত বিষ্ণুদিগম্বর পালুস্কর এবং পন্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখন্ডের মধ্যে পালুস্করের নাম প্রথমে আসা উচিৎ। তাঁর বৈপ্লবিক পদক্ষেপ, সঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং সম্পর্কিত কাজকর্ম ১৯০১ সালেই শুরু হয়েছিল যখন নাকি ভাতখন্ডের কালজয়ী গ্রন্থ হিন্দুস্তানি সঙ্গীত-পদ্ধতির প্রথম খন্ড ১৯০৯ সালে এসেছিল। তা সত্ত্বেও, ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলোকে শৃংখলায় আনার জন্য তাঁর কাজের উল্লেখ ভাতখন্ডের পরে করেছি।

রাগরাগিণীর প্রামাণিক ঠাট নির্দ্ধারণ

বাংলায় রবীন্দ্রনাথের জন্মের এক বছর আগে ১৮৬০ সালে মহারাষ্ট্রের কোল্‌হাপুরে জন্মেছিলেন বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে। আলটপকা রবিঠাকুরের নামটা এইজন্য আনলাম যে ভারতে সঙ্গীতে যুক্তিবাদের যে কোনো অধ্যয়নে তাঁর প্রসঙ্গ অপরিহার্য। ভাতখন্ডে পেশায় উকিল ছিলেন। পেশায় সফল ছিলেন। ভারতের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (উত্তর ভারতীয় এবং কর্ণাটকি, দুটোই) বা মার্গসঙ্গীতের অধ্যয়ন প্রথম থেকেই তাঁর নেশা ছিল। স্ত্রী এবং কন্যার অসাময়িক মৃত্যুর পর বেরিয়ে পড়লেন ভারত ভ্রমণে। এতদিন ওকালতিতে যে টাকা উপার্জন করেছিলেন তা কাজে লাগল। এক একটি ঘরানার জীবিত বিশারদদের কাছে গিয়ে দেখা করলেন। সে দেখা সহজ ছিল না। অধিকাংশ ওস্তাদ, গুরু বা বিশারদ নিজেদের অহঙ্কারে মজে ছিলেন। দেখা করতে আসা লোকটির উদ্দেশ্যের কথা জেনে, তার বিরুদ্ধে নিজেদের ক্রোধ ও উপেক্ষা জাহির করতে তাঁরা কিছু বাকি রাখেন নি। যেন লোকটি কোনো গর্হিত কাজ করতে বেরিয়েছে। দর্জির ফিতে দিয়ে অসীমকে মাপতে বেরিয়েছে! এত বড় স্পর্ধা? সঙ্গীতকে মাপবে? এখনি শিবের তৃতীয় নেত্র খুলবে আর পাপিষ্ঠ লোকটি তাঁর রোষানলে ভস্ম হয়ে যাবে! তবুও ভাতখন্ডে জারি রাখলেন তাঁর ভ্রমণ। কেউ কিছু বলতেই চায় না! তবু কাজে লেগে রইলেন তিনি। যেখানে যেটুকু পাওয়া যায়। ছোটো ছোটো নোটে ডাইরি ভরে গেল। তারপর ফিরলেন আবার কোলহাপুরে, নিজের বাড়িতে। প্রথমে একটা ছোটো বই লিখলেন রাগের পরিচিতি নিয়ে স্বরমালিকা। তারপর বন্ধুদের কথায় মারাঠিতে লিখলেন তাঁর ম্যাগনাম ওপাস, হিন্দুস্তানি সঙ্গীত-পদ্ধতি। এই গ্রন্থের চতুর্থখন্ডের মুখবন্ধে উনি লিখেছেন

সঙ্গীত বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা মোটামুটি পঞ্চাশ বছরের। এই পঞ্চাশ বছরে দেশের অনেক সুপ্রসিদ্ধ গায়ক-বাদকের সম্পর্কে আমি এসেছি। যে সব নামকরা গুণী শিল্পীদের আমি শুনেছি, তাঁদের অধিকাংশের নাম এই গ্রন্থে দেওয়া হয়েছে। গ্রন্থটি লেখা শুরু করার আগে এক নেপাল বাদ দিয়ে অন্য সমস্ত প্রদেশে গিয়ে থেকে, সেখানকার গায়ক-বাদকদের সঙ্গে সঙ্গীতচর্চা করে এবং প্রবাসে যা কিছু উপযোগী গ্রন্থ দেখতে পেয়েছি, সেগুলো সম্পাদিত করে, ভালোভাবে অধ্যয়ন করেছি। শুধু তাই নয়, অনেক প্রখ্যাত গায়কদের সামনে নিজে বসে তাঁদের কাছ থেকে খেয়াল-ধ্রুপদের হাজার, দেড় হাজার গান শিখেছি এবং নোটেশনও তৈরি করেছি। তার অধিকাংশ তো আমি আমার বিশিষ্ট শিষ্যদের শিখিয়েও দিয়েছি। সার কথা এই যে এতটা পূর্ব প্রস্তুতি নেওয়ার পরই আমি এই গ্রন্থ রচনার কাজে হাত দিয়েছি।

সবচে আগে আমি সমাজে বর্তমানে প্রচলিত সবকটি রাগকে সূক্ষ্মভাবে নিরীক্ষণ করেছি। তাতে দেখতে পেয়েছি যে আজকাল সমাজে একশো-দেড়শোর বেশি রাগ গাওয়া হয় না। এটাও লক্ষ্য করেছি যে স্থূল দৃষ্টিতে এ সমস্ত রাগকে মূলতঃ নিচের তিনটে শ্রেণিতে ভাগ করা যায়ঃ

যে রাগে রে, ধা এবং গা স্বর তীব্র হয়।
যে রাগে রে কোমল এবং গা আর নি তীব্র হয়।
যে রাগে গা এবং নি কোমল হয়।

এটাও লক্ষ্য করলাম যে গাওয়ার সময় কয়েকটি রাগে দ্বিরূপ স্বর প্রকট হয়, কিন্তু সব মিলিয়ে সে রাগগুলোর চলন এবং রচনা দেখে বলতে পারি, তাদের শ্রেণি পৃথক করার প্রয়োজন নেই। এভাবে, শ্রেণি নির্দ্ধারিত হয়ে যাওয়ার পর, সমস্ত রাগকে শ্রেণিভুক্ত করার জন্য নিম্নলিখিত দশটি মেল বা ঠাটকে আমি হিন্দুস্তানি সঙ্গীতের ভিত মনে করলামঃ

ইমন       বিলাওয়ল         খামাজ    ভৈরব     পূর্বী
মাড়োয়া   কাফি      আশাবরি          ভৈরবী          ১০ টোড়ি

টোড়ি ঠাটে গা কোমল এবং টোড়ির কয়েকটি ধরণে গা, নি কোমল। তাই ঠাটটাকে গা, নি প্রযুক্ত শ্রেণিতে নেওয়া হয়েছে। এভাবে, সমস্ত রাগকে এই দশটি ঠাটে শ্রেণিভুক্ত করে [মারাঠি সংস্করণের মুখবন্ধ, হিন্দুস্তানি সঙ্গীত পদ্ধতি, চতুর্থখন্ড, সঙ্গীত কার্যালয়, হাথরস]

বোঝা যায় যে কত বড় বৈপ্লবিক ছিল ভাতখন্ডের এই কাজ।
কর্ণাটকি সঙ্গীতে বোধহয় লক্ষণ-গীতির একটি পরম্পরা ছিল। রাগের লক্ষণ বোঝাবার জন্য। ঠাটের ধারণা অব্দি পৌঁছোনোর আগে ভাতখন্ডে সেই লক্ষণ-গীতির প্রেরণায় মারাঠিতে নির্ভেজাল সুরগুলোর বিহার রচনা করলেন। সে বইটি লিখতে গিয়ে তাঁকে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হল। নিজের ধরণে স্বরলিপি রচনা করার পদ্ধতি বিকশিত করলেন। পরে, ধীরে ধীরে সমস্ত দেশের জন্য এক মানের লিপি, চিহ্ন এবং রচনা-পদ্ধতি স্বীকৃত হয়েছে।

এমন নয় যে রাগরাগিণীকে শ্রেণিভুক্ত করার চেষ্টা এর আগে হয়নি। আরোহ-অবরোহের চক্রাকার বিন্যাস, ভাব এবং আরো অন্যান্য ধরণে শ্রেণিভুক্ত করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু একটিই সপ্তকে আরোহের ন্যুনতম যে কটি রূপকে চিহ্নিত করা যেতে পারে, তাদেরকে ঠাট বলে, সেই ভিত্তিতে রাগরাগিণীর শ্রেণিকরণ প্রথমবার ভাতখন্ডেই করেছিলেন। এখনো অনেকেই এ কাজটাকে হাওয়ায় উড়িয়ে দেয়। সেদিনই ইন্টারনেটে দেখলাম একজন বলছেন, ঠাট দিয়ে রাগরূপের তল পাওয়া সম্ভব নয়। কে বলছে ভাই, যে সম্ভব? ভাতখন্ডে সাহেব কি বলেছেন? ভাবের তল, প্রাণের মাপ সত্যিই পাওয়া যায় না কিন্তু হাড়ের মাপ তো পাওয়া যায়! আর সে সময় এটাই সবচেয়ে বৈপ্লবিক কাজ ছিল। সাত স্বরের সপ্তকে সা আর পা স্থির রেখে, বাকি পাঁচটি স্বরের মধ্যে মাএর কড়ি ও শুদ্ধ এবং রে, গা, ধা, নির কোমল এবং শুদ্ধ দশটি স্বর, দশটি রূপ। যতই হোক রাগ এবং রাগিণী, তার দশটি বিমূর্ত বর্গ বা শ্রেণিনির্মাণ।

বেঁধে দিলেন উনি। এমন বাঁধলেন যে পুরো ভারত মানল সে বাঁধন। আপনি গায়ক? বাদক? জৌনপুরি সাধছেন ওস্তাদ? সাধুন! বোধহয় আপনার মনে ছবি ফুটে উঠছে শরতকালে ছোট্ট কসবার রাস্তাটার, যখন আপনি স্কুলে যাওয়ার জন্য সেটা পার করতেন, রামতিরথের দোকানের জিলিপির গন্ধ ভুলিয়ে দিত সংস্কৃত স্যারের পেটাই দুপয়সার জিলিপি কিনে বসে যেতেন আমবাগানে রোদ চড়ত ধীরে ধীরে, পাতার ফাঁক দিয়ে মুখে, ঘাসে এসে পড়ত তার আলো গেয়ে চলুন, বাজিয়ে চলুন, প্রাণ ভরে মনে আনুন সেই সকালের আনন্দবেদনা! একদম মনে রাখার দরকার নেই যে জৌনপুরির ঠাটটা কি। কিন্তু ভাবের বিস্তারে কখনো যদি আশাবরির কোনো অঙ্গ ছুঁয়ে যেতে ইচ্ছে হয় তখন ভাববেন যে এই ইচ্ছের গতিপথের সুত্রটা কে আবিষ্কার করেছিল!  

ঠাটের ধারণা কি সঙ্গীতের স্বাভাবিক গতিকে রুদ্ধ করে? পদ্মফুলের ফুলসুদ্ধু মৃণালগুলোকে নারকেলের দড়ি দিয়ে বাঁধতে যায়? এটা কি সেরকমই হাস্যকর কোনো চেষ্টা, ভক্ত হনুমানের নামে প্রচলিত গল্পে যেমনটা আছে যে তিনি নাকি সীতামায়ের দেওয়া মুক্তোর মালা থেকে মুক্তো ছিঁড়ে চিবিয়ে দেখছিলেন যে সেটা খাওয়া যায় কিনা? অথবা যুক্তির পথে একটি বিরাট মুক্তিকে সম্ভাবিত করা হল! আধুনিক যুগের সাথে এবং ভারতের জাতীয় অভ্যুদয়ের সাথে ভারতের সাংস্কৃতিক পরম্পরাকে যোগ করার একটি পথের সিদ্ধান্ত ছিল ভাতখন্ডের কাজে। সারা দেশের জন্য এক মান নির্দ্ধারণ এবং প্রমিতকরণ। এটা ছিল প্রথম যুক্তিবাদি পদক্ষেপ।

মাদুরাইয়ের মীনাক্ষী মন্দিরের ভিতরে একটি স্তম্ভ আছে যেটি বস্তুতঃ বাইশটি শীর্ণ স্তম্ভের গুচ্ছ। শীর্ণ স্তম্ভগুলোর মাঝে খালি জায়গা আছে। কোনো একটা পাতলা কাঠি দিয়ে আলাদা আলাদা বাজালে বাইশটি বিভিন্ন স্বর উৎপন্ন হয়। সেগুলি নাকি বাইশ শ্রুতি। অদ্ভুত, না? এত জটিল একটা ট্যুনিং ফর্ক, বিরাট পাথরে তৈরি এবং তাও এক সপ্তকের বাইশটি স্বরের জন্য। কত শতাব্দি আগেকার!

ভারতের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পরম্পরার যে বিপুল বৈভব, কত শতাব্দিকাল ধরে সে ঐতিহ্যকে জিইয়ে রাখার যে অনন্য ফল রাগরাগিণীর প্রতিষ্ঠিত সামাজিক সম্পর্ক (দিন-রাতের প্রহর অনুসারে, মনের ভাবানুসারে সুর ও ভাবের সূক্ষ্ম প্রভেদ প্রায় সামাজিক অবচেতনের অঙ্গীভূত হয়ে গেছে এক একটি রাগ বা রাগিণী এখন কয়েকটি মেজাজের ভান্ডার, রিপোজিটরি অফ মুডস), অনহদ নাদের কল্পনার প্রতিধ্বনি এত বছর ধরে প্রাচ্যের বিশ্বদৃষ্টিকে যে এক বিশেষ বর্ণ দিয়েছে, এই সবকিছুকে ছোটো করে দেখার অভিযোগ যদি কেউ করে তাহলে সেটাই বরং পাগলের প্রলাপ হবে। 

সঙ্গীত সম্মেলনের আয়োজন

ঠাটের ভিত্তিতে রাগরাগিণীর প্রমিতকরণের পর স্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ বা বলা যায় দ্বিতীয় ঐতিহাসিক মুহূর্ত ছিল সঙ্গীত সম্মেলনের আয়োজন। তথাকথিত রহস্যময় ঘরানাকেন্দ্রিকতা থেকে মার্গ সঙ্গীতকে বাইরে আনল এই আয়োজন। মানুষের কাছে পৌঁছোল সঙ্গীত, মানুষের কাছে পৌঁছোতে ধীরে ধীরে লঘু করতে এমনকি ভাঙতেও হল অনেক অর্থহীন হয়ে পড়া রীতি। হয়ত বিরাট মাপের বিখ্যাত কিছু বিশারদ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলেন সম্মেলনে গাইবার বা বাজাবার ডাক, তবু একসাথে পরিবেশন, একে অন্যকে শোনা এবং ক্রমবর্দ্ধমান শ্রোতৃবর্গের কাছে নিজের শিল্প পৌঁছোনোর মত করে তোলা শুরু হল।

এ কাজেও ভাতখন্ডে পথ দেখালেন। যদিও জলন্ধরের হরিবল্লভ সঙ্গীত সম্মেলন দাবি করে যে ওদের সম্মেলন সবচেয়ে পুরোনো ১৮৭৫এ শুরু হয়েছে, এবং সেটা হতেও পারে কিন্তু যে উদ্দেশ্যের কথা বলছি সে উদ্দেশ্যের সাথে সম্মেলন বিশের শতকের দ্বিতীয় দশকে শুরু হল। কেননা ভাতখন্ডে এ কাজে ততক্ষণ সফল হতে পারতেন না যতক্ষণ নিজে, সঙ্গীত নিয়ে তাঁর ঐতিহাসিক গবেষণার ফলে সঙ্গীত-সমাজে প্রতিষ্ঠিত না হতে পারতেন। ঘটনাটা এমন হল যে বরোদার মহারাজা, যিনি ভারতীয় শিল্পকলা, শিক্ষা, গ্রন্থালয় ইত্যাদির আধুনিকীকরণের জন্য প্রসিদ্ধ, বরোদায় সঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার জন্য ডেকে পাঠালেন ভাতখন্ডেকে, এবং বোধহয় বিষ্ণুদিগম্বর পালুস্করকেও। সেটা ছিল ১৯১৬ সাল। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতিক্রমে ভাতখন্ডে মহারাজাকে সঙ্গীত সম্মেলনের প্রস্তাব দিলেন। ফলে বরোদায় ঐতিহাসিক সর্বভারতীয় সঙ্গীত সম্মেলনের আয়োজন হল। সারা দেশ থেকে চারশোরও বেশি সঙ্গীতজ্ঞেরা অংশগ্রহণ করেছিলেন। আয়োজনের প্রারম্ভে ভাতখন্ডে একটি দীর্ঘ সারগর্ভ ভাষণ দিলেন যেটি পরে A short historical survey of the music of upper India নামে প্রকাশিত হয়েছিল। এই ভাষণের প্রথমদিকের একটি প্যারাগ্রাফ, ঈষৎ দীর্ঘ হওয়া সত্ত্বেও উদ্ধৃত করতে চাই কেননা যে জাতীয়তাবাদি-যুক্তিবাদি পুনরাবিষ্কারের কথা এই প্রবন্ধের শুরুতে বলেছি তার স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে উদ্ধৃতিতেঃ

A satisfactory feature of the Renaissance of Indian culture and Indian ideals, which characterises the intllectual activity of India of the present day, is the attention that is paid to the revival of our ancient music. The keen interest evinced by the present generation in the preservation and further progress of this national heirloom has materialised itself broadly speaking, in two different aspects. On the one hand, one notices the movement of learned scholars from all parts of India meeting in national conferences with a view to focus attention on and co-ordinate the results of research grappling with the technical side of the question such as for instance, the working out of a system of uniform and adequate notation, the systematising of the ragas at present sung in the northern part of the country, so as to make the same easy of instruction ad assimilation and so forth. On the other hand one welcomes the growth of numerous music clubs and schools of music, and with it the facilities offered for serious and thorough-going study of the art, and its gradual introduction into our homesteads. Both these aspects are complimentary of each other, neither is complete without the other. The learned but dry-as-dust disquisitions of our theorists would be fruitless waste of time if they did not succeed in evoking some interest on the part of the public in the art; while the Gyan Samaj would be a deplorably shaky superstructure without the firm foundation of the science.

একদিকে রাগরাগিণীর গভীরে বিবিধ পথগামী অনুসন্ধানের পরিণামগুলো একজায়গায় এনে তার একরূপ নোটেশন তৈরি করে প্রণালিবদ্ধকরণ (সিস্টেমেটাইজেশন) এবং অন্যদিকে জনগণের হৃদয়ে পৌঁছোনোর সংগঠিত প্রয়াস। এবং এই দুটোকে একসাথে যোগ করতে পারে বিজ্ঞানের মজবুত ভিত্তি।

পরে তো দেশের বিভিন্ন শহরে এ ধরণের সঙ্গীত সম্মেলন অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠল। স্বাধীনতার পর অল ইন্ডিয়া রেডিও বা আকাশবাণী আয়োজিত সঙ্গীত সম্মেলনের বিশেষ গুরুত্ব কায়েম হল সঙ্গীতমহলে। দেশের অন্যান্য শহরে তো বড় বড় সঙ্গীত সম্মেলনে টিকিট, গেটপাস ইত্যাদির ব্যবস্থা হত, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি পাটনার কথা। দুর্গাপুজো থেকে কালীপুজো অব্দি ডজন খানেক সাঙ্গীতিক আয়োজন চিল্ড্রেন্স পার্ক, পাটনা কলেজিয়েট, গোবিন্দ মিত্র রোড, সব্জিবাগ, নালা রোড, গান্ধী ময়দান, সেক্রেটারিয়েট, বীণা সিনেমা, স্টেট ব্যাঙ্ক ঠিক সঙ্গীত সম্মেলন না হলেও তার থেকে খুব কম কিছু হত না। গেটপাস কিছু থাকত, কিন্তু তা বহাল থাকত শেষ রাত অব্দি। শাস্ত্রীয় নৃত্যের সমঝদার হোন বা না হোন, নাচ দেখার সামন্ততান্ত্রিক ঐতিহ্যে কায়েম থেকে বড়লোক শ্রোতারা চেয়ারে থাকতেন ওই সিতারা দেবী বা যামিনী কৃষ্ণমুর্তি বা উর্মিলা নাগর বা অন্য কোনো শিল্পীর নাচ অব্দি। সামিয়ানায় ভোরের হাওয়া লাগার আগেই চেয়ারগুলো খালি হয়ে যেত আর বাঁশের বেড়ার ফাঁকফোকর দিয়ে ঢুকে পড়ত গেটপাসহীন সাধারণ মানুষেরা। গ্রাম থেকে গরুর গাড়ীতে করে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শুনতে আসছে লোকে, ভাবা যায়? ভাবা যায়, বৃষ্টি নামল, আয়োজকেরা গিরিজা দেবীর গান থামিয়ে ভিতরে নিয়ে যেতে ব্যতিব্যস্ত আর গিরিজা দেবী? দূরের শ্রোতাদের আওয়াজ গেয়ে চলুন গিরিজা দেবী, আমরা আছি শুনে আয়োজকদের বললেন পাঁচটে ছাতার ব্যবস্থা করতে। একটা তাঁর মাথায়, একটা তানপুরার মাথায়, একটা তবলচির মাথায় এবং গেয়ে চললেন অঝোর বৃষ্টির মধ্যে খেয়াল শেষ করে একের পর এক ঠুমরি, কাজরি! এই ছিল ভাতখন্ডে, পালুস্কর এবং অন্যান্যদের কাজের জোর! জাতীয়তাবাদী-যুক্তিবাদী অভিযানের জোর! শিশুদের লেখাপড়া শুরু হয় হাতে-খড়ি দিয়ে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে দেশের সাধারণ মানুষের কানে-খড়ি হতে পেরেছিল এই সব সঙ্গীত সম্মেলনের জন্য।    

সঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা

গুরু-শিষ্য পরম্পরার মাধ্যমেই আমরা মহান সঙ্গীতজ্ঞদের পেয়েছি। আজও, পল্লবগ্রাহিতায় থেমে না থেকে গভীরতর অনুধ্যানে যেতে হলে গুরুর কাছেই গান্ডা বাঁধতে হবে। কিন্তু শুধু মহানদের দিয়েই কি কাজ চলে? একটু কম মহানদেরও দরকার পড়ে। সাধারণদেরও দরকার হয়। সবচেয়ে বড় কথা, মহান গায়কের গান শুনে যদি দুএক লাইন গুনগুন করতে ইচ্ছে হয়, তাহলেও বেসুরোই গুনগুন করব? অথবা শুধু সেই গুনগুন করবে যার গলায় সহজাত সুর আছে ঈশ্বরের বরদানে? কেউ হয়ত একটুই শিখতে চায় শিল্পটা বুঝতে, নিজের আনন্দ-অবসরে গাইতে বাজাতে। কারোর হাতে বেশি সময় নেই। সংসারের জোয়াল কাঁধে নিতে হবে, বিয়ের জন্য চাপ শুরু হবে, আর্থিক সঙ্গতি কম, বাজারে নামতে হবে ইত্যাদি, ইত্যাদি । আর, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত যদি সত্যিই জাতীয় ঐতিহ্য হয়, তাহলে তো সেটা জনমানসে ছড়িয়ে দেওয়ার দরকার আছে। কাজেই অধ্যাবসায়ী শিক্ষানবিশ, চেলা, যে বছরের পর বছর গুরুর কাছে গান্ডা বেঁধে শিখতে প্রস্তুত সে শিখুক, কিন্তু নিয়মিত পাঠ্যক্রমে, সীমিত সময়ের ডিগ্রি ও ডিপ্লোমা কোর্সে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য স্কুল কলেজ চালু করা হোক।

যদ্দূর জানতে পারছি আরেক মারাঠি প্রবর্তক পন্ডিত বিষ্ণু দিগম্বর পালুস্কর স্থাপন করলেন প্রথম সঙ্গীত বিদ্যালয়। অভাবনীয় ছিল তখন! পিরিয়ডের ঘন্টি বাজিয়ে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শেখা? হতে পারে? অথচ হল। ১৯০১ সালের ৫ই মে, দেশের প্রথম সঙ্গীত বিদ্যালয়, গন্ধর্ব মহাবিদ্যালয় স্থাপিত হল লাহোরে। তারপর আর কী? বিদ্যালয়ের পর বিদ্যালয় স্থাপিত হয়ে চলল। অনেকেই এগিয়ে এলেন এ কাজে। প্রথম পাঠ্যক্রমও পালুস্কর সাহেবই তৈরি করেছিলেন, একটা বোর্ড গঠন করেছিলেন। সে বোর্ড এখনো আছে যেহেতু বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে গেছে তাই এখন তার নাম অখিল ভারতীয় গন্ধর্ব মহাবিদ্যালয় মন্ডল। গন্ধর্ব মহাবিদ্যালয়ও এখন দিল্লিতে; অন্যান্য জায়গায়ও আছে। এখন তো সঙ্গীত বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে, তাও একাধিক। অন্যান্য কিছু বিশ্ববিদ্যালয়েও সঙ্গীতের পাঠ্যক্রম আছে।

রবীন্দ্রনাথের সময় ইংরেজ সরকারের শিক্ষা বিভাগ এ বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে তিনি যোগ্যতম ব্যক্তি হসেবে ভাতখন্ডের নাম নিয়েছিলেন। নিজের বিশ্ববিদ্যালয়েও সঙ্গীত বিভাগের প্রধান হিসেবে ভাতখন্ডে কে চাইতেন। পেলেন না যদিও।

এখন তো উল্টো গঙ্গা বইছে। বিবাহযোগ্যা কন্যার গুণের ফিরিস্তি বাড়াতে একটা অতিরিক্ত সার্টিফিকেট চাইলে গান গাওয়ার বা কিছু বাজাবারও দরকার নেই, জায়গামত পয়সা দিলেই পাবেন। তবে এসবে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। রবীন্দ্রনাথ তখনই বলেছিলেন, আজকাল ঘরে ঘরে হারমোনিয়ম, গ্রামোফোন, পাড়ায় পাড়ায় কন্সর্ট। ইহাতে অনেকটা রুচিবিকার দেখা যায়। কিন্তু চিনি জ্বাল দিবার গোড়ার বলকে রসে অনেকটা পরিমাণ গাদ ভাসিয়া ওঠে। সেই গাদ কাটিতে কাটিতেই রস ক্রমে গাঢ় ও নির্মল হইয়া আসে। আজ টগবগ শব্দে সংগীতের সেই গাদ ফুটিতেছে; পাড়ায় টেঁকা দায়। কিন্তু সেটা লইয়া উদ্বিগ্ন হইবার দরকার নাই। সুখবরটা এই যে, চিনির জ্বাল চড়ানো হইয়াছে।
[সঙ্গীতের মুক্তি, সঙ্গীতচিন্তা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]
এখনকার চিনির জ্বালের কড়াইগুলো মোবাইলের এ্যাপে, টেলিভিশনে, ডি-জে আর সোশ্যাল মিডিয়া। চিনি ফুটুক। আমাদের টেঁকা দায় হোক। নতুন প্রজন্মে ভরসা আছে।
যাহোক, তবু এক সময়ে বৈপ্লবিক ধাপ ছিল সঙ্গীত বিদ্যালয় স্থাপন।

লোকসঙ্গীত ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মধ্যেকার চিরায়ত সম্পর্কের পুনরাবিষ্কার

যদিও একাজটা সমাজবিজ্ঞানের কাজ হিসেবে অনেক পরে শুরু হয়েছে কিন্তু ভারতীয় সঙ্গীতে যুক্তির হস্তক্ষেপ হিসেবে আমি এটাকে, পূর্বকথিত ঐতিহাসিক-যৌক্তিক ক্রমে চার নম্বর কাজ হিসেবেই দেখব।

এ কাজে প্রথম দিগদর্শন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অর্থাৎ, লোকসঙ্গীত শুনতে শুনতে মাঝে মধ্যে তার ভিতরে রাগ-রাগিনীর এক একটা আদল শুনতে পেয়ে মনে প্রশ্ন জাগত কিন্তু যতটা পড়েছি, তিনি উত্তরটা মনে হয় খুঁজতেন এদেশের জলহাওয়ায়, প্রকৃতিতে, যা ওই রাগরাগিনীর মধ্যেই ঘোরাফেরা করার মত করে মানুষের কান ও হৃদয় তৈরি করেছে, তাই সে মার্গসঙ্গীতে থাকুক বা লোকসঙ্গীতে, ওই রাগরাগিনী মেনেই চলবে, তবে চলনটা ভিন্ন হবে। লোকসঙ্গীত চলবে মুক্ত ছন্দে আর মার্গসঙ্গীত বন্ধনে। কিন্তু দুটোই স্বতন্ত্র ধারা। একটির  শিকড় আরেকটির মধ্যে থাকতে পারে এমন কোনো প্রস্তাব উনি করছেন, এমন পড়িনি।       

সে প্রস্তাবটা প্রথম করেন ১৯৩৫ সালে অর্দ্ধেন্দ্র চন্দ্র গাঙ্গুলি, সে সময়কার এক বিখ্যাত শিল্প-ইতিহাসবিদ। তাঁর বই Ragas and Raginis এর মুখবন্ধে তিনি বললেন

Orthodox music practitioners, opposing any manner of new developments and innovations on the belief that Indian Music is a stereotyped system hidebound by strict rules and conventions prescribed by ancient musical Sages, to depart from which is to assail the individuality of Indian Musical thought and, therefore, a musical crime, may find in this Volume much material which may contradict such a belief. Indeed, the history of the rāgas, of which a bare outline, is, here presented demonstrates that in all periods of its development Indian Music has grown and progressed by assimilating new ideas from non-Aryan and aboriginal musical practices and that the Classical Rāga-System is firmly based on and is heavily indebted to Primitive Folk-music, having never disdained from borrowing and assimilating new data from alien or foreign sources.

মূল বইয়েও কয়েক পৃষ্ঠা এগিয়েই রয়েছে

It may be remarked that a greater part of what now passes under the name of classical music, at one time or other, belonged to the world of deśi, or folk music, and which being refined and affiliated to the rules and system of the traditional music have contributed to its growth and development.
[Ragas and Raginis, O. C. Gangoly, Vol. I]

এ বইটার কথা আমি জানতাম না। আগে এ লেখাটা যখন সঞ্চিতা পত্রিকায় ধারাবাহিক ছেপেছিল, আমি স্পষ্ট লিখেছিলাম যে কাজটা কবে শুরু হয়েছে আমি জানি না, কিন্তু মনে হয় বিশ শতকের কুড়ি-তিরিশের দশকের আগেই শুরু হয়ে থাকবে, এবং নবজাগরণের প্রভাবে বাংলায় শুরু হয়ে থাকবে। যাহোক, শেষ অব্দি এক বাঙালিকেই পেলাম, ১৯৩৫ সালে। এর জন্য বিশেষভাবে আমি দি হিন্দু খবরের কাগজের ৩১শে  মার্চ ২০২২এর অনলাইন একটি খবরের কাছে ঋণী। Classical musics folk links শীর্ষক খবরটায় প্রথম ও সি গাঙ্গুলির নাম জানলাম। তারপর তাঁর নামের সূত্রে ইন্টারনেটে বইটা খুঁজে পেলাম।

তবে, আগের লেখায় এটাও লিখেছিলাম যে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রাণভোমরাটা যেহেতু লোকসঙ্গীতের মুঠোয় তাই বার বার তাকে লোকসঙ্গীতের কাছে যেতে হবে, নতুন প্রাণের মেয়াদ নিয়ে ফিরতে হবে এবং শুধু তত্ত্ব হিসেবে কথাটা বলা নয়, কাজ হিসেবে করার তাগিদটা বিশশতকের দ্বিতীয়-তৃতীয় দশকে শুরু হয়ে থাকবে।

রাগের ভাবপ্রসার করতে গিয়ে সচেতনভাবে লোকগীতির সুরে পৌঁছে যাওয়া আজ খুব স্বাভাবিক বলে মনে হয়। কুমার গন্ধর্বের গায়কীর বিরল সৌন্দর্য লোকসঙ্গীতকে revisit করারই ফলশ্রুতি।

৫। লোকসঙ্গীত সংগ্রহ ও গবেষণা

এ কাজটিও সমাজবিজ্ঞানের পদ্ধতিতে হয়ত পরে শুরু হয়েছে।

লোকসঙ্গীতের যাঁরা ধারক-বাহক তাঁরা অনেকেই আধুনিক বিদ্যালয়ী শিক্ষার আলো থেকে আজও বঞ্চিত। ঔপনিবেশিক প্রভাবে আধুনিক বিদ্যালয়ী শিক্ষার আলোটাও এমন যে মগজে ঢুকলেই লোকজীবন নামক দিগরেখাটি দৃষ্টির অগোচর হয়ে যায়।

সে সমস্যাটা নিজের জায়গায় থাক। তার জন্য কাজটা আটকায় নি (ক্ষতি হচ্ছে অন্য জায়গায়, সেটা আপাততঃ বিচার্য নয়)। সংগ্রহের কাজটা সংরক্ষণ ও গবেষণার সাথে সম্পর্কিত এবং সেটা দুধরণের। প্রথমতঃ গীতিসাহিত্যের এবং গীতিপ্রকৃতির বিবরণ সংগ্রহ। সেটা প্রবন্ধ বা বইয়ে সংগৃহীত থাকতে পারে। দ্বিতীয়তঃ সুর-তালের শ্রাব্য সংগ্রহ। সেটা, যদি কোনো গায়ক বা বাদক গবেষক নিজের গলায় বা যন্ত্রে তুলে না নেয় তাহলে অডিও বা ভিডিও রেকর্ডিং হতে হবে।

প্রথম ধরণের সংগ্রহ ভারতে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই আসা শুরু করেছিল। সামাজিক নৃতত্ব এবং সাংস্কৃতিক নৃতত্ব ইওরোপে একটি নতুন বিজ্ঞান হিসেবে দেখা দিয়েছিল। ঔপনিবেশিক শক্তি নিজের শাসন সুদৃঢ় করার প্রয়োজনেই, বিজ্ঞানের এই নতুন ক্ষেত্রে কাজ করা গবেষকদের কাজ করার পরিসর দিয়েছিল। একবার শুরু হওয়ার পর কাজটা আর থামেনি। ভারতের বিভিন্ন ভাষায় দেশীয় গবেষকরা এ ধরণের সংগ্রহের কাজে এগিয়ে গিয়েছিলেন। এ মুহূর্তে ভারতের প্রায় সবকটি ভাষা, উপভাষা এবং লোকভাষার গীতির, কোনো মহাফেজখানায় রাখার মত অন্ততঃ নমুনা সংগ্রহ অবশ্যই আছে। বই না থাকলে প্রবন্ধাদি আছে।

কিন্তু আমি যে জায়গা থেকে কাজটাকে দেখছি  সেখানে সুর-তালের শ্রাব্য সংগ্রহের কাজটা জরুরি। যাঁরা নিজেরা গায়ক এবং বাদক, এবং জাতীয়তাবাদী-যুক্তিবাদী চিন্তায় দীক্ষিত হয়ে মার্গ সঙ্গীত এবং লোকসঙ্গীতের মধ্যেকার জীবিত সম্পর্কটা বুঝতে পারছিলেন, তাঁরা নিজের মত করে পৌঁছোচ্ছিলেন লোকগায়ক ও বাদকদের কাছে। সংগ্রহটা করছিলেন নিজেদের মাথায়, গলায়, হাতের যন্ত্রে এবং অথবা পকেটের নোটবইয়ে লেখা স্বরলিপিতে। কিন্তু সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার মত সংগ্রহ কারিগরী কারণেই রেকর্ডিং শুরু হওয়ার আগে সম্ভব ছিল না। আর সত্যি সত্যি প্রত্যন্ত অঞ্চলে, জঙ্গলে, পাহাড়ে, মরুভুমিতে বসবাসকারী, স্থলে, জলে রোজকার শ্রমে ব্যস্ত গ্রামীণ শিল্পীদের কাছে গিয়ে ফিল্ড রেকর্ডিং করা বিশ শতকের পাঁচের দশকের আগে সম্ভব হয় নি। কেননা টেপ রেকর্ডারের উদ্ভাবন হয়েছিল দশ বছর আগে; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেই সে নতুন যন্ত্রটা বাজার ধরেছিল।

উনিশ শতকের শেষভাগ থেকেই বাংলার মনীষীদের দেখা যায় লোকসঙ্গীত নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে।

১৯৩৭ সালে রাশিয়ার চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ নিজের দেশের শ্বাসরোধী পরিস্থিতির সাথে বিপ্লবপরবর্তী রাশিয়ার বিরাট অগ্রগতির তুলনা করতে গিয়ে লিখছেন, লোকসাহিত্য, লোকসঙ্গীত নিয়েও প্রবল বেগে কাজ চলছে। তার মানে এ নিয়ে তাঁর মনে আগে থেকেই ভাবনাচিন্তা চলছিল। নিজের গানের সুরে লোকসঙ্গীতকে  আকর হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং শিল্পীদের কাছে বসে লোকসঙ্গীত শুনেছেন। সে সুযোগও তাঁর ছিল। তবে আপন শিক্ষায়তনটিতে একাজ করাতে তিনি কিভাবে সচেষ্ট হয়েছিলেন, নিশ্চয়ই লেখা হয়ে থাকবে, তবে আমি পড়িনি। তবে খবর নিয়েছিলাম, অন্ততঃ কয়েক বছর আগে পর্য্যন্ত বিশ্বভারতীতে এই বিভাগটা ছিল না।

গবেষণার তো হাজারটা দিক আছে। তবে সংগীতের বিকাশের ইতিহাসে যুক্তিবাদ প্রয়োগের দিক থেকে যে গবেষণাটা প্রয়োজন তা হল, শাস্ত্রীয়ের উৎস যে লোক, তার উজ্জীবনের সোনার কাঠি যে লোক, সেটার তথ্যপ্রমাণ যোগাড়, বিশ্লেষণ ও নিষ্পত্তি।

নতুন সঙ্গীত রচনা

বাংলায় গান রচনার পরম্পরা

সঙ্গীতে যুক্তিবাদ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা

যুক্তিবাদ বনাম নন্দন তত্ত্ব

১০ উপসংহার

      


Wednesday, December 22, 2021

माओ बनाम तथाकथित ‘माओवाद’

वैज्ञानिक समाजवाद के प्रणेता एवं मेहनतकशों के क्रांतिकारी नेताओं के बारे में भ्रांतियाँ फैलाया जाना आम बात है। पूंजीवादी शासनतंत्र एवं उसका सांस्कृतिक उद्योग उन्नीसवीं सदी के मध्य से ही जुटा रहा है इस काम में कि भ्रांतियाँ उपजती रहे एवं वर्ग संघर्ष के कतारों के कमजोर हिस्सों पर अपना असर डालती रहे।

स्टालिन तो उनके हिसाब से साक्षात राक्षस ही हैं। लेनिन की जिन्दगी के ‘कई अनछुए पहलुओं’ को सिर्फ पूंजीवादी रचनाकार, फिल्मकार एवं ‘मनोवैज्ञानिक’ ही देख पाते हैं, और निरपवाद रूप से उन पहलूओं में उनके व्यक्तिगत जीवन के विकृत चित्रण के अलावा कुछ भी नहीं होता है। सोवियत क्रांति के दिनों में उनका भी राक्षसनुमा चेहरा दिखता थेए पूंजीवादी अखबारों के व्यंगचित्रों में। मार्क्स भी घुंघराले बाल-दाढ़ी के साथ बस लंकेश्वर ही हैं उनके लिये। एंगेल्स उनकी निगाह में भले आदमी थे, पूंजीपति के बेटा थे जो मित्र के झाँसे में आकर बर्बाद हो गए।

इस तरह की चारित्रिक लांछनों से पूर्ण भ्रांतियों के फैलने से अधिक क्षति नहीं होती। शोषकों द्वारा दिये गये गालियों और फैलाये गये अफवाहों का आमतौर पर विपरीत संकेत जाता है शोषितों के दिलदिमाग में – गाली दिये जा रहे व्यक्तियों की विश्वसनीयता बढ़ जाती है। और फिर आजकल तो कुछ ही दिनों में, कुत्सा फैलानेवाले बुद्धिजीवियों को मिलने वाले पैसों का स्रोत एवं उनकी व्यक्तिगत कुंठायें भी सामने चले आते हैं।

अधिक क्षति होती है जब मेहनतकशों के क्रांतिकारी किसी नेता की तारीफ के कसीदे काढ़ने लगता है पूंजीवाद। पूंजीवादी अर्थशास्त्री, समाजशास्त्री एवं भांति-भांति के बुद्धिजीवी उनके रचनाओं के हिस्से अपने तात्विक विवेचनों में उद्धृत करने लगते हैं। हाई प्रोफाइल मानवतावादी एवं कई किस्म के टुटपूंजिये – साम्राज्यवाद की चाकरी कर रहे लोग – गाहे-बगाहे उनके नारों का इस्तेमाल शुरू कर देते हैं। किताबों के उत्सर्ग-पत्र पर जगह पाने लगती हैं उनकी सूक्तियाँ।

कुछ ऐसा ही हुआ है माओ-त्से-तुंग के साथ। चीनी क्रांति के विभिन्न चरणों में माओ द्वारा दिये गये (वह भी अधिकांशत: सांगठनिक) नारे, प्रासंगिकता की पहचान किये बगैर अक्सर इस्तेमाल होते रहते हैं। ‘सौ फूलों को खिलने दो’, ‘मुख्यालय पर तोप दागो’, गाँवों से शहरों को घेरो’, ‘बन्दूक की नली ही सत्ता का उद्गम है’ … आदि।

फिर आती है ‘सांस्कृतिक क्रांति’ नाम की ऐतिहासिक पहेली! सभी अच्छी अच्छी बातें! कई कारणों से वामपंथी साथियों/हमसफरों की उल्झनों और दुखते रगों को छूने जैसी बातें। फिर क्यों न कहते हम ‘चीन का चेयरमैन हमारा चेयरमैन’? और तो और, दिनरात चीन को भारत का मुख्य दुश्मन घोषित कर उसका मुन्डपात करने वाली जो जमात है उनके लोग भी, जब कभी जरूरत पड़ती है, औरों की तरह ‘सिस्टम’ नाम की चीज के खिलाफ अपना मुंहनोचु गुस्सा उतारने के लिये माओ द्वारा दिये गए उपरोक्त नारों का इस्तेमाल कर ही लिया करते हैं।

जो पढ़ने वाले लोग हैं, जो जानना चाहते हैं क्रांतिकारी नेताओं के विचारों को, उन्हे भी आम तौर पर माओ के जिन रचनाओं को पढ़ने के लिये कहा जाता है, उन रचनाओं में एक खासियत है।

मार्क्स-एंगेल्स पढ़ने की शुरूआत, कही जाती है, ‘मैनिफेस्टो’ से करो। लेनिन? ‘मार्क्सवाद के तीन स्रोत एवं तीन संघटक अंग’ के बाद? ‘साम्राज्यवाद – पूंजीवाद की चरम अवस्था’। थोड़ा कठिन है, लेकिन पढ़ ही डालो!

बेशक, ‘मैनिफेस्टो’ और ‘साम्राज्यवाद – …’, दोनों किताबें अपने जमाने की दुनियावी हुकूमत पर सीधी चोट करती हुई राजनीतिक-आर्थिक निबंधों की अनूठी मिसालें हैं। लेकिन स्टालिन? ‘द्वंद्वात्मक एवं ऐतिहासिक भौतिकतावाद’। क्लास-लेक्चरनुमा! उसी तरह, माओ? ‘अन्तर्विरोधों पर’। फिर ‘चीनी समाज में वर्ग’। यानि वही, पाठ्यपुस्तक। उससे आगे बढ़ना चाहें तो बस एक तरफ उनकी कवितायें तो दूसरी तरफ सैन्य-रचनाएँ। (हो-ची-मिन्ह को तो उतनी भी जगह नहीं मिली। बस ‘प्रिजन डायरी’ की कवितायें और सादगी की दन्तकथायें!)

कहने का मतलब, पूंजीवाद के खिलाफ, साम्राज्यवादी, औपनिवेशिक या सामन्ती सत्ता के खिलाफ सीधे राजनीतिक-आर्थिक संवाद वाली किसी रचना के बजाय माओ से हमारी पहचान शैक्षणिक रचनाओं के माध्यम से शुरू होती है।

और शायद इसीलिये माओ के बारे में सोचते हुए हम भूल जाते हैं कि इस व्यक्ति ने अगर लगातार 50 वर्षों तक अपने देश में, मजदूरों, किसानों एवं सभी मेहनतकशों की क्रांतिकारी अग्रगति का दिग्दर्शन किया, अपनी पार्टी की समझ के अनुसार काम करते हुये क्रांति को सफल किया तो 50 वर्षों तक लगातार इसने अपने देश, अपने जमाने से, हुक्मरानों से, वर्ग-दुश्मनों से एवं वर्ग-दोस्तों से राजनीतिक संवाद कायम रखा होगा। वे बहुत ठोस राजनीतिक संवाद रहे होंगे, सिर्फ कुछेक काव्यात्मक नारे और मुहावरे नहीं।

किसी भी देश की क्रांति की तरह चीनी क्रांति की अपनी पेचिदगियाँ थीं। सान्यातसेन की सही विरासत की पहचान से लेकर जापानी आक्रमण के खिलाफ जुझारू प्रतिरोध आन्दोलन को धरातल पर क्रांतिकारी परिवर्तन की कार्यनीति बना डालने तक इन पेचिदगियों का विश्लेषण इस आलेख का विषय नहीं है। दुनिया में बेशक इस विषय के कई अध्ययन हुये होंगे।

                                                 *******             *******            

वर्ष 1934 के जनवरी महीने में मजदूरों एवं किसानों के प्रतिनिधियों के राष्ट्रीय कांग्रेस में भाषण देते हुये माओ-त्से-तुंग ने कहा था -

“अगर हमारे साथी सचमुच अपने कार्यभार की समझ रखते हैं और समझते हैं कि किसी भी कीमत पर क्रांति को पूरे देश में व्याप्त करनी ही होगी, तो उन्हे आम जनों के तात्कालिक हित, उनकी खुशहाली के सवाल की कभी भी उपेक्षा नहीं करनी चाहिये, छोटा कर के नहीं आंकना चाहिये। क्योंकि क्रांतिकारी युद्ध आमजनों का युद्ध है; आमजनों को गोलबन्द कर एवं उन पर भरोसा कर के ही सिर्फ यह युद्ध छेड़ा जा सकता है … हमें अवश्य ही भूमि के लिये किसानों के संघर्ष का नेतृत्व करना चाहिये एवं उनके बीच भूमि का बँटवारा करना चाहिये, श्रम के उत्साह को बढ़ावा देना चाहिये उनके बीच एवं कृषि उत्पादन में वृद्धि करनी चाहिये, मजदूरों के हितों की रक्षा करनी चाहिये, सहकारी समितियों की स्थापना करनी चाहिये, बाहर के क्षेत्रों के साथ व्यापार विकसित करना चाहिये, और आमजनों के सामने खड़ी तमाम समस्याओं – मसलन भोजन, रहने का घर, पहनने का वस्त्र, ईंधन, चावल, रसोई का तेल एवं नमक, बीमारी एवं स्वास्थ्य-सुरक्षा एवं शादी-व्याह – सभी समस्याओं का समाधान करना चाहिये। संक्षेप में कहा जाए तो आमजनों के रोजमर्रे के जीवन की सभी व्यवहारिक समस्याओं की ओर हमारा ध्यान जाना चाहिये। अगर हम इन समस्याओं के प्रति ध्यान देंगे, इनका समाधान करेंगे एवं आमजनों की जरूरतों को पूरी कर पायेंगे तो हम सचमुच आमजनों की खुशहाली के संगठक बनेंगे और वे भी सचमुच हमारे चारों ओर गोलबन्द होंगे एवं अपना गर्मजोश समर्थन हमें देंगे।”

[जुईचिन, कियांसी प्रदेश में मजदूरों एवं किसानों के प्रतिनिधियों के द्वितीय राष्ट्रीय कांग्रेस में 27 जनवरी को दिया गया भाषण]

क्या इस उद्धरण में प्रतिफलित वैचारिक ढाँचे के किसी दूरस्थ कोने में भी आज के भारतीय ‘माओवादी’ दिखते हैं?

कहीं नहीं दिखते। बलiक उनमें भी नहीं दिखते जिनकी अति-उत्साही क्रांतिकारिता की आलोचना में यह वक्तव्य रखा गया। आज के भारतीय ‘माओवादी’, अति-उत्साही क्रांतिकारिता या क्रांतिकारी हठधर्मिता या क्रांतिकारी दुस्साहसिकता या क्रांतिकारी आतंकवाद … किसी भी परिभाषा में फिट नहीं बैठते। कभी रहे होंगे। एक शक्तिशाली राष्ट्रयंत्र को, बिना जनान्दोलन के सिर्फ सैन्य-कार्रवाई के बल पर टक्कर देते रहने का रुमानी ख्याल उन्हे कीमती हथियार, विदेशी मुद्रा, तस्करी, ड्रग्स के ऐसे एक अन्तरराष्ट्रीय नेटवर्क में आज डाल दिया है कि वे माओ-त्से-तुंग के पूरे क्रांतिकारी विमर्श से ही बाहर चले गये हैं। विभिन्न प्रांतों में सरकार या विपक्षी राजनीतिक दलों एवं उम्मीदवारों के लिये उनमें से कुछेक गुट, भाड़े के टट्टु के रूप में काम करते हैं। प्रतिक्रिया के मित्र, हत्यारों और लुटेरों के गिरोह में तब्दील हो चुके हैं वो।

गनीमत है उनके लिये कि इस देश का पूंजिया-सामंती गँठजोड़, वर्गीय एवं जातीय शोषण और दमन का जमीनी हकीकत इतना घृणास्पद है। सुधार एवं प्रगति एवं विकास की सारी घोषणायें वर्गीय वर्चस्व को और मजबूत करने में इस तरह काम आती हैं एवं जनवादी आन्दोलनों की मुख्य धाराओं ने भी कई बार प्रान्तीय जीवन के सवालों से इस तरह मुंह मोड़ा है कि ग्रामीण जनता, खासकर दलित व आदिवासी सिर्फ आधुनिक राष्ट्र-व्यवस्था के प्रति उनके गहरे अविश्वास के चलते तथाकथित ‘माओवादियों’ को पनाह दे देते हैं। फिर, रोजगार का समीकरण भी तो है! दो हजार रुपये माहवारी और दो लाख के बीमा पर कभी रणवीर सेना में बहाली होती थी। उनके हमलों से बचने के लिये माओवादी सेना में बहाली क्यूं न हो? महिला एवं बच्चा स्क्वाड क्यूं न बने? दो सूखी रोटियों के साथ साथ दिल में तसल्ली भी होगी कि जुल्मियों का सीधा मुकाबला कर रहे हैं।

क्या स्थिति है आज! ‘विकास’ एक ऐसा खतरनाक शब्द हो गया है जिसके माध्यम से बुर्जुवा जनतंत्र के चारो खंभे – विधायिका, कार्यपालिका, न्यायपालिका एवं संचार-माध्यम – लगातार मेहनतकश जनता के अधिकारों पर हमला चलाये जा रहे हैं। आर्थिक प्रगति एक गाली बनती जा रही है करोड़ों की बदहाल आबादी के लिये। भ्रष्टाचार उस गाली जैसे विकास के साथ यूँ ओतप्रोत है जैसे अश्लील शब्द के साथ रिश्तों के नाम!

लेकिन कड़वी सच्चाई यही है कि ‘माओवादियों’ का कोई रिश्ता माओ-त्से-तुंग यानि उनकी विचारधारा से नहीं है। जहाँ तक मेहनतकशों के क्रांतिकारी जनान्दोलन का सवाल है, वे इसक खिलाफ, पूंजिया-सामन्ती दमनतंत्र की लम्बी उम्र की गारंटी के रूप में काम कर रहे हैं। मोहरा के रूप मे इस्तेमाल होने दे रहे हैं आदिवासी एवं दलित जनसमुदाय को।

पूंजीवादी-सामंती समाज में, कुलीनों के पवित्र परिवार में निषेधवादी वैकल्पिक-अस्मिता के तौर पर जिस तरह कहीं बड़ा तस्कर बोलता है, कहीं बड़ा धर्माचार्य, उसी तरह कहीं ये माओवादी नेता एवं बुद्धिजीवी बोलते हैं।

                                                 *******             *******            

माओ-त्से-तुंग का एक सुविख्यात प्रतिवेदन है। ‘हुनान में किसान आन्दोलन की जाँच पर प्रतिवेदन’। वर्ष 1927 के मार्च महीने में यह प्रतिवेदन लिखा गया।

इस प्रतिवेदन के कुछेक हिस्से बेहद रोचक और सिर्फ चीन के लिये नहीं बल्कि सभी देशों के लिये अत्यंत प्रासंगिक है। क्योंकि जहाँ कहीं भी किसान आन्दोलन आगे बढ़ता है, खेतमजदूर, गरीब भूमिहीन किसानों का संघर्ष कामयाबी दर्ज करता है oत हजारों वर्ष के शोषण-दमन के चक्र के विनाश के सन्देश को वर्गशत्रुओं के बीच पहुँचाने के लिये कुछ प्रतीकात्मक कार्रवाइयाँ हो जाती हैं। हो सकता है बदमाश खूनी जमीन्दार को गधा पर बैठा कर पूरा गाँव घुमाया जाय, सर मुड़ा दिया जाय …। बस, हाय तोबा मचने लगती है शासकीय मानवतावादियों में। “बताइये, ऐसा भी करना चाहिए?” … जैसे आसमान टूट पड़ा हो।

उपरोक्त प्रतिवेदन में किसान समितियों की क्रांतिकारी गतिविधियों को सिलसिलेवार समझाने के क्रम में माओ उस शासकीय मानवतावादियों को भी आड़े हाथों लेते हैं।

उस प्रतिवेदन में भी शुरू में ही यह रेखांकित किया जाता है कि क्रांतिकारी जनकार्रवाई का मतलब क्या है! बाहर से आये हुये रॉबिनहुडों की कार्रवाई या गाँव एवं इलाके की बहुमत जनता की कार्रवाई। और, चौदह बिन्दुओं में व्याख्या किये गये कार्यविधियों में अंतिम तीन बिन्दु हैं (12) शिक्षा के लिये आन्दोलन, (13) सहकारिता आन्दोलन एवं (14) रास्तों की मरम्मत एवं बांधों का निर्माण। …

[कुछ दिनों पहले मिथिलांचल के एक मित्र से बात हो रही थी। वे इस कारण से माओवादियों की तारीफ कर रहे थे कि उनके कारण स्थानीय ठेकेदार लोग त्रस्त रहते हैं। चूँकि अमूमन इलाके के भूस्वामी ही महाजन भी होते हैं, ठेकेदात भी और मौका मिलने पर मुखिया और विधायक भी, इसलिये ठेकेदारों के दिल में दहशत पैदा होते देखने में एक जायज खुशी थी। मैंने पूछा कि आखिर त्रास का कारण क्या है? क्या माओवादी सड़कों और बांधों के निर्माण में निगरानी करते हैं? मिलावट हो रही है या नहीं, काम सही हो रहा है कि नहीं … ! मेरे मित्र का सीधा जबाब था, “नहीं, यह सब वे लोग क्यों देखेंगे? अरे दादा, मोटा पैसा न उगाही करैछे सब! … बाकि उहे सब के डर से शांति के राज कायम रहै छे गाँव में। कौनों आँख उठाकर न देख सकै छे गरीब के बहु बेटी क!” बेशक! इस आलेख में पहले ही कहा गया कि स्थिति इतनी बिकराल है कि आज के माओवादियों को जमीन मिल जाती है। वैसे जहाँ तक टुटपूंजिये नजर से शांति का राज कायम होने की बात है, गरीबों को जरूरत पर कुछ पैसे मिलने की (साहब या हुजूर की कोठी से दान के तौर पर) बात है तो यह अधिकांशत: उस सांसद या विधायक के क्षेत्र में होता है जो अपने समय का सबसे कुख्यात माफिया सरगना या अपराधी रहा है। क्योंकि इलाके के सभी दूसरे छोटे अपराधी या तो इलाका छोड़ देते हैं या शांत बैठ जाते हैं। मैं नाम लेना नहीं चाहता हूँ। आप खुद इलाकों के लोगों से – खासकर मध्यवर्गीय लोगों से – पूछ लें।

                                                 *******             *******            

इस निबंध में मैंने माओ का पहला उद्धरण जिस भाषण से दिया था, उस भाषण से एक और उद्धरण देकर इस निबंध को समाप्त करुंगा। जैसा कि पहले ही मैंने कहा कि सुधार एवं प्रगति एवं विकास की सारी घोषणायें अन्तत: वर्गीय वर्चस्व को और मजबूत बनाने में काम आती हैं। क्यों काम आती हैं? क्योंकि उन्हे उसी तरीके से क्रियान्वित किया जाता है। यहीं पर कुछ सीख हम जनता के बीच काम कर रहे कार्यकर्ताओं को भी लेनी चाहिये। आखिर हम भी अपने काम कुछ सत्तासीन वर्ग के तरीके से ही तो नहीं करते हैं? फिर तो अपना उद्देश्य ही पराजित होता रहेगा!

जरा देखिये माओ क्या कहते हैं –

“हम क्रांतिकारी युद्ध के नेता एवं संगठनकर्ता हैं। साथ ही हम आमजनों के जीवन के भी नेता एवं संगठनकर्ता हैं। क्रांतिकारी युद्ध को संगठित करना एवं जनता के जीवन को बेहतर बनाना हमारे दो प्रधान कार्यभार हैं। इस मामले में हम कार्य करने की पद्धति की गंभीर समस्याओं का सामना कर रहे हैं। सिर्फ कार्यभार तय कर देना पर्याप्त नहीं, हमें उन कार्यभारों को पूरा करने की पद्धतियों की समस्या का भी समाधान करना होगा।  … अगर पद्धति की समस्या का समाधान नहीं किया जाय, तो कार्यभार की बातें निरर्थक हैं। … हम अपने कार्यभार पूरे [नहीं कर पायेंगे] … अगर हम सिर्फ कार्यभार तय करें और पूरे करने की पद्धतियों पर ध्यान न दें, काम करने की अफसरशाही पद्धति के खिलाफ न लड़ें एवं व्यवहारि व ठोस पद्धति न अपनायें, फतवा जारी करने वाली पद्धति को न त्यागें और धैर्यशील तरीके से समझाने की पद्धति न अपनायें।”

उद्धरण को सीमित रखने के कारण शायद थोड़ा अमूर्त्त लगे, पर दिशा स्पष्ट है।

 [दस वर्ष पहले बेफी न्युज में प्रकाशित] 

                 




                  

Monday, December 20, 2021

बैंकिंग क्षेत्र की लड़ाई देश की अर्थव्यवस्था को ही बचाने की लड़ाई है - प्रदीप विश्वास

निजीकरण के खिलाफ दिनांक 16-17 दिसम्बर 2021 को बैंक हड़ताल

इस साल
* दूसरी बार बैंकिंग उद्योग के अधिकारी एवं कर्मचारीगण दो दिनों के लिये देशव्यापी हड़ताल पर जा रहे हैं। पिछले मार्च महीने के 15-16 तारीख को युनाइटेड फोरम ऑफ बैंक युनियन्स (युएफबीयु) के आह्वान पर बैंकिंग उद्योग में मुकम्मल हड़ताल को अंजाम दिया गया था। दिनांक 1 फरवरी को संसद में पेश किये गये केन्द्रीय बजट में शामिल, दो बैंकों के निजीकरण के प्रस्ताव के खिलाफ हुई थी यह हड़ताल।

निजीकरण के उद्देश्य से किया गया विलय

वर्ष 2014 के मई महीने में जब भाजपा के नेतृत्व में एनडीए गठबंधन केन्द्रीय सरकार में सत्तासीन हुई, उस समय हमारे देश में राष्ट्रीयकृत बैंकों की संख्या थी 26। विलयों के माध्यम से घटकर अब राष्ट्रीयकृत बैंकों की संख्या मात्र 12 हो गई है। सन 2020 के अप्रैल महीने को एक फतवा जारी कर, 10 बैंकों को घट कर 4 बनाया गया। इस फतवे के तहत पश्चिम बंगाल में स्थित दो बैंकों का प्रधान कार्यालय खत्म कर दिया गया। एक स्थानान्तरित हुआ दिल्ली में और एक चेन्नई में। पहला था युनाइटेड बैंक ऑफ इन्डिया और दूसरा था इलाहाबाद बैंक। युनाइटेड बैंक इस राज्य [पश्चिम बंगाल] के बैंक के रूप में परिचित था जबकि इलाहाबाद बैंक हमारे देश के सबसे पुराने बैंकों में से एक था। विलय के फलस्वरूप दो बैंकों का अंत तथा उन दो बैंकों के प्रधान कार्यालयों का इस राज्य से हट जाने को लेकर राज्य की सरकार की कोई प्रतिक्रिया नहीं आई है। विलय के परिणामस्वरूप अब बड़ी संख्या में शाखा-बंदी तथा कार्मिक शक्ति में घटाव की प्रक्रिया जारी है। जिस समय देश में बेरोजगारों की संख्या बढ़ रही है उसी समय बैंकिंग उद्योग में बड़ी संख्या में पदों को खत्म किया जा रहा है। यह सब कुछ हो रहा है निजीकरण का उद्देश्य पूरा करने के लिये। जनविरोधी इन सुधारों का काम सन 1991 में पहली नरसिंहम कमिटी की सिफारिशों के आधार पर शुरू किया गया था। सिफारिशों में प्रमुख था राष्ट्रीयकृत बैंकों की संख्या में घटाव। सन 1991 की उस सिफारिश पर अमल करने के लिये मौजूदा भाजपा-एनडीए सरकार बेपरवाह हो उठी है।

बैंकों के राष्ट्रीयकरण के अच्छे परिणाम

स्वातंत्र्योत्तर भारत में देश की अर्थव्यवस्था की सुनियोजित विकास के उद्देश्य से बैंक कर्मचारी आन्दोलन ने बैंकों के राष्ट्रीयकरण की मांग उठाई थी। देश की बैंकिंग प्रणाली में उस वक्त एक अस्थिरता जारी थी। जनता के दिलोदिमाग पर ‘बैंक फेल’ की घटना का असर किसी अपवाद के रूप में नहीं बल्कि रोजमर्रा के रूप में होता था। 15 अगस्त 1947 से 19 जुलाई 1969 के पहले तक की अवधि में 650 निजी बैंक ‘फेल’ हुये। इस परिस्थिति में गुणात्मक बदलाव आया सन 1969 के 19 जुलाई को, जब पहले चरण में 14 निजी बैं राष्ट्रीयकृत किये गये। दूसरे चरण में सन 1980 के 15 मार्च को और 6 बैंकों का राष्ट्रीयकरण हुआ। हालांकि इसके पहले, सन 1955 में इम्पिरियल बैंक के राष्ट्रीयकरण के माध्यम से स्टेट बैंक की शुरुआत हुई और सन 1959 में, देश के भूतपूर्व रजवाड़ों की मिल्कियत में चल रहे निजी बैंकों का राष्ट्रीयकरण कर, स्टेट बैंक के 7 सहयोगी (ऐसोसियेट) बैंकों का सृजन किया गया। आज इन सारे बैंकों का अंत हो चुका है – इन्हे स्टेट बैंक के साथ विलयित कर दिया गया है।

राष्ट्रीयकरण के अच्छे परिणाम के तौर पर, बड़ी संख्या में शाखाओं के खोले जाने के बाद, बैंक की सेवायें आम आदमी के पास पहुँची है। प्राथमिकता वाले क्षेत्रों में ॠण प्रदान की नीति लागु होने के कारण लाभान्वित हुआ है देश का कृषिक्षेत्र, स्वनियोजन योजना, लघु कुटिर उद्योग, ढाँचागत विकास, शिक्षा, स्वास्थ्य इत्यादि क्षेत्र एवं हाशिये पर जी रहे सामान्य लोग। सरकारी सामाजिक योजनाओं का अधिकांश राष्ट्रीयकृत बैंकों के माध्यम से अमल में लाया जाता है। बहुचर्चित 43॰93 करोड़ जनधन खातों में से 42॰66 करोड़ खाते राष्ट्रीयकृत बैंकों द्वारा ही खोले गये हैं। निजी मिल्कियत में बैंक अमीरों के हित में थे, राष्ट्रीयकरण के बाद वे सामान्य लोगों के आंगन में पहुँचे। शाखाओं में व्यापक बढ़ोत्तरी के कारण 7 लाख बेरोजगार युवक एवं युवतियों को रोजगार मिला। नीचे की सारणी बताती है कि राष्ट्रीयकरण के बाद पिछले पाँच दशकों में बैंकिंग उद्योग में कैसा विस्तार हुआ।

 

1969

2021

बैंकों की कुल शाखाएँ (संख्या)

8000

1,18,000

कुल जमा

5000 करोड़

157 लाख करोड़

कुल ॠण-प्रदत्त

3500 करोड़

110 लाख करोड़

 

अनाजों के उत्पादन में हमारे देश को आत्मनिर्भरता दिलाने में उल्लेखनीय भूमिका रही है व्यापारिक बैं, ग्रामीण बैंक तथा नाबार्ड सहित देश की राष्ट्रीयकृत बैंकिंग प्रणाली की।

व्यापारिक बैंकों का राष्ट्रीयकरण, राष्ट्राधीन (सार्वजनिक) क्षेत्र में ग्रामीण बैंक (1975) एवं नाबार्ड (1982) की स्थापना के बाद हमारे देश की बैंकिंग प्रणाली का 90% सार्वजनिक क्षेत्र में आ गया। वर्ष 1991 के बाद से, नई उदारवादी आर्थिक नीतियों के लागू किये जाने के उपरांत राष्ट्रीयकृत बैंकों में सरकारी हिस्सेदारी अब 100% नहीं है। उन्ही नीतियों के कारण, बैंकिंग प्रणाली में राष्ट्रीयकृत बैंकों की मौजूदगी 90% से घट कर लगभग 70% पर आ पहुँची है। लेकिन फिर भी राष्ट्रीयकृत बैंक अभी भी मुनाफा कमानेवाले हैं। पिछले दस वर्षों में सार्वजनिक क्षेत्र के बैंको द्वारा अर्जित व्यापारिक लाभ का चित्र नीचे दिया गया।

वित्तीय वर्ष

कुल व्यापारिक (ऑपरेटिंग) लाभ

2009 – 10

76,945 करोड़

2010 – 11

99,981 करोड़

2011 – 12

1,16,337 करोड़

2012 – 13

1,21,839 करोड़

2013 – 14

1,27,632 करोड़

2014 – 15

1,38,064 करोड़

2015 – 16

1,35,238 करोड़

2016 – 17

1,59,022 करोड़

2017 – 18

1,55,585 करोड़

2018 – 19

1,49,603 करोड़

2019 – 20

1,73,595 करोड़

2020 – 21

1,97,376 करोड़

 

लगातार व्यापारिक लाभ अर्जित करते रहने के बावजूद, वर्ष 2015 के 14 अगस्त को पारित ‘इन्द्रधनुष’ दस्तावेज के सिफारिशों को लागू करते हुये, वित्तीय वर्ष 2014-15 से 2019-20 तक राष्ट्रीयकृत बैंकों को मजबूर किया गया कि वे अपने व्यापारिक लाभ में से बहुत बड़ी रकम अशोध्य ॠण का प्रावधान बना कर अलग रखें। फलस्वरूप, लगातार बैंकों को कुल घाटे की ओर धकेल दिया गया। 

लूट जारी है

बैंकिंग उद्योग की सबसे उल्लेखनीय समस्या है विपुल अशोध्य ॠण जो इस साल के 31 मार्च के सालाना लेखा के अनुसार 6,16,615 करोड़ रुपयों तक पहुँच चुका है। इसका अधिकांश हिस्सा देश के बड़े कॉर्पोरेट घरानों के पास बकाया है। जालसाजी के द्वारा बैंक से पैसे लेकर आराम से विदेश में बैठे हैं विजय माल्या, नीरव मोदी, मेहुल चोकसी और बहुत सारे लोग। इनमें से हर एक ने बैंकों से कर्ज लिया, और न लौटाई गई रकम से विदेश में बड़ी सम्पत्तियों का मालिक बना। बैंकिंग की परिभाषा में इन्हे पहले ‘विलफुल डिफॉल्टर’ कहा जाता था। इन्द्रधनुष दस्तावेज में इनके लिये नई संज्ञा का ईजाद किया गया है – ‘असहयोगी ॠणग्रहिता’। इस पारिभाषिक बदलाव से बैंक लुटेरों के प्रति केन्द्रीय सरकार का मनोभाव समझ में आ जाता है। जो जानबूझ कर बकाया कर्ज की रकम नहीं लौटा रहे हैं उन्हे ‘इरादतन चूककर्ता’ न कह कर ‘असहयोगी देनदार’ कहते हुये अशोध्य ॠण की अदायगी की आवश्यकता को ही हल्का कर दिया गया है। बैंक कर्मचारी आन्दोलन की मांग है कि इन इरादतन चूककर्ता बड़े कॉर्पोरेट व्यवसायियों के खिलाफ फौजदारी कानून का प्रयोग कर, इनकी चल, अचल सारी सम्पत्तियों को जब्त किया जाय तथा बैंकों के बकाये रकम की वसूली की जाय। लेकिन इन लुटेरों का हित देखनेवाली केन्द्रीय सरकार उस राह पर चलने के लिये तैयार नहीं है। सिर्फ उतना ही नहीं, इन्सॉलवेन्सी व बैक्रप्सी कोड 2016 (दिवाला और दिवालियापन संहिता 2016) लागू कर, बकाया रकम पर बड़ी मात्रा में छूट देते हुए ‘हेयर कट’ के नाम पर विभिन्न बैंकों में बकाया ॠण अदायगी के समझौते हो रहे हैं। ‘हेयर कट’ के नाम पर लूट की मात्रा नीचे की सारणी से स्पष्ट होगी।

कर्जदार

बकाया रकम (करोड़)

समझौते की राशि (करोड़)

हेयर कट %

एस्सार स्टील

54000

42000

23

भूषण स्टील

57000

35000

38

ज्योथि स्ट्रक्चर

8000

3600

55

डि एच एफ एल

91000

37000

60

भूषण पावर

48000

19000

62

इलेक्ट्रो स्टील्स

14000

5000

62

मॉनेट इस्पात

11500

2800

75

ऐमटेक

13500

2700

80

अलोक इन्डस्ट्रीज

30000

5000

83

लैन्को इन्फ्रा

47000

5300

88

विडिओकॉन

46000

2900

94

ए बि सि शिपयार्ड

22000

1200

95

शिवशंकरण इन्डस्ट्रीज

4800

320

95

 

उपरोक्त 13 कर्जदारों के कुल बकाये ॠण की राशि थी 4,46,800 करोड़ रुपये। समझौते के माध्यम से अदायगी हुई है मात्र 1,61,820 रुपयों की। इसके चलते बैंकों को घाटा हुआ 2,84,980 करोड़ रुपयों का। यह रकम कुल बकाए ॠण की राशि का मात्र 64% है।

लुटेरे ही बैंकों के मालिक बनना चाहते हैं

सन 1969 के 19 जुलाई को एक अध्यादेश के तहत 100% की सरकारी मिल्कियत पर सार्वजनिक क्षेत्र के बैंकों ने अपनी यात्रा शुरू की। सन 1991 में नई उदारवादी आर्थिक नीतियों के लागू किये जाने के पहले तक सार्वजनिक क्षेत्र में बैंकिंग उद्योग को जबर्दस्त विस्तार हासिल हुआ। वर्ष 1993 में बैंकिंग कम्पनीज (ऐकुइजिशन ऐन्ड ट्रान्सफर ऑफ अन्डरटेकिंग्स) ऐक्ट 1970 एवं 1980 में संशोधन कर सार्वजनिक क्षेत्र के बैंकों में सरकारी हिस्सेदारी घटा कर 51% तक करने का प्रावधान किया गया। लेकिन इन कानूनों की 3(2ई) धारा के अनुसार गैर-सरकारी हिस्सेदारों का मताधिकार अभी भी 10% में सीमित है, इसलिये 51% तक गैर-सरकारी मालिकाने का प्रावधान होने के बावजूद बैंकों पर राजसत्ता का नियंत्रण अभी भी मौजूद है।

इस साल के बजट प्रस्ताव में दो बैंकों को बेचने की बात कही गई है। सार्वजनिक क्षेत्र के बैंकों को बेचने के लिये उपरोक्त दो कानून तथा बैंक सम्बन्धित दूसरे कानूनों के विभिन्न धाराओं में बदलाव जरूरी है। इसी उद्देश्य से बैंकिंग कानून सुधार विधेयक 2021 तैयार किया गया है। शीतकालीन जारी अधिवेशन के विचारार्थ विषयों की सूची में यह सुधार विधेयक शामिल है। सरकार की तरफ से कोशिश हो रही है कि विधेयक को पारित करवा कर दो बैंक गैर-सरकारी मालिकों के हाथों में सौंपने का मार्ग प्रशस्त किया जाय। इस काम में अगर वे सफल हो जायें तो चोट आम आदमी पर पड़ेगी। शाखाएं बन्द होंगे और सेवाओं का दायरा संकुचित होगा।

विलय के दुष्परिणाम अभी ही नजर आने लगे हैं। दिनांक 1 अप्रैल 2019 को बैंक ऑफ बड़ोदा के साथ विजया बैंक और देना बैंक का विलय होने के बाद, बैंक ऑफ बड़ोदा द्वारा जारी मार्च’2021 के लेखा के अनुसार 1268 शाखाएं बन्द हुई हैं। युनाइटेड बैंक एवं ओरियेन्टल बैंक का विलय दिनांक 1 अप्रैल 2020 को पंजाब नैशनल बैंक के साथ होने के बाद पंजाब नैशनल बैंक ने अब तक 643 शाखाओं को बन्द किया है। उसी तरह, युनियन बैंक के साथ कॉर्पोरेशन बैं एवं आन्ध्रा बैंक के विलय के बाद 278 शाखाएं बन्द की गई है। इन्डियन बैंक के साथ इलाहाबाद बैंक के विलय के बाद इन्डियन बैंक ने 259 शाखाओं एवं 281 प्रशासनिक दफ्तरों को बन्द किया है; पहले दफे की बन्दी की सूची में और बीस शाखाएं हैं। सिन्डिकेट बैंक के विलय के बाद कैनरा बैंक ने पिछले जून महीने तक 614 शाखाओं को बन्द किया है। जिक्रतलब है कि युनियन बैंक के साथ कॉरपोरेशन बैंक एवं आन्ध्रा बैंक, इन्डियन बैंक के साथ इलाहाबाद बैंक और कैनरा बैंक के साथ सिन्डिकेट बैंक का विलय दिनांक 1 अप्रैल 2020 से प्रभावी हुआ। 10 बैंकों को एक धक्के में 4 बैंक बना दिया गया। यह ‘मेगामर्जर’ के रूप में जाना जाता है। देश के बैंकिंग उद्योग के इतिहास में इस तरह की घटना का कोई मिसाल नहीं है। इसके पहले साल 2017 के 1 अप्रैल से 5 ऐसोसियेट बैंकों को स्टेट बैंक के साथ मिला दिया गया था जिसके परिणाम स्वरूप स्टेट बैंक ने अब तक 1998 शाखाओं को बन्द कर दिया है। अब हर एक बैंक में कर्मचारियों की संख्या बड़े पैमाने पर घटाई जा रही है। जिन शाखाओं में कुछेक साल पहले सौ से अधिक कर्मचारी कार्यरत रहते थे, अब वहाँ गिनेचुने कुछ कर्मचारियों से काम चलाया जा रहा है। ग्राहकों को आवश्यक सेवाएँ नहीं मिल रही है। योजनाबद्ध तरीके से सार्वजनिक क्षेत्र के बैंकों के विरुद्ध लोगों के मन में असन्तोष भड़काने की कोशिश की जा रही है। चोट पड़ी है वरिष्ठ नागरिकों पर्। भाजपा-एनडीए जमाने में मियादी जमा पर ब्याज की दर लगभग 3% कम की गई है, कॉर्पोरेट प्रतिष्ठानों को कम ब्याज पर ॠण देने के लिये।  

दो बैंकों का निजीकरण करने में सफल होने पर सरकार वहाँ रुकेगी नहीं। नैशनल मॉनिटाइजेशन पाइपलाइन के नाम पर जिस तरह सार्वजनिक क्षेत्रों को एक के बाद एक निजी प्रतिष्ठानों के हाथों सौंपने का प्रयास चल रहा है उससे यह आशंका रह ही जाती है कि भविष्य में सार्वजनिक क्षेत्र के बैंकों का शायद कोई अस्तित्व ही नहीं रहेगा।

अगर बैंक सार्वजनिक क्षेत्र में न हों तो लोगों ने बचत कर रखे हैं उनमें, उस बचत की कोई सुरक्षा नहीं रहेगी। किसान को, बेरोजगार युवक-युवती को, गरीब छात्र-छात्रा को तथा छोटे मझौले व कुटिर उद्योगों को बैंक का ॠण नहीं मिलेगा। देश की अर्थव्यवस्था में आम आदमी की हिस्सेदारी के क्षेत्र सिकुड़ जायेंगे। देश के आर्थिक क्षेत्र पर स्याह बादल मंडराने लगेंगे।

इसीलिए जरुरी है प्रतिरोध

नई उदारवादी आर्थिक नीतियों के लागू होने के प्रारम्भकाल सन 1991 से ही बैंकिंग उद्योग के कर्मचारी एवं अधिकारीगण निरन्तर, सार्वजनिक बैंकिंग प्रणाली की रक्षा के लिये संघर्षरत हैं। केन्द्रीय सरकार की एक के बाद एक विनाशकारी नीतियों के खिलाफ वे इस अवधि में कुल 68 दिन हड़तालों में शामिल हुये हैं। विगत तीस वर्षों के इस धारावाहिक संग्राम का ही नतीजा है कि आज भी देश की बैंकिंग प्रणाली सार्वजनिक क्षेत्र में हैं एवं वर्ष 2008 की विश्वव्यापी आर्थिक मन्दी का असर उस तीव्रता के साथ हमारे देश पर नहीं पड़ा। बैंक कर्मचारी आन्दोलन व जनवादी आन्दोलनों के जोरदार संयुक्त प्रतिवाद के कारण ही वर्ष 2017 का एफ॰आर॰डी॰आई॰ विधेयक निरस्त करने के लिये बाध्य हुई थी यह सरकार। जाड़ा, गर्मी, बरसात की उपेक्षा कर, 700 से अधिक किसान शहीदों के बलिदान के बाद, एक साल के लम्बे लगातार किसान संग्राम की ऐतिहासिक सफलता, श्रमजीवी जनता के आन्दोलन के लिये एक उत्साह-वर्धक घटना है। बैंक कर्मचारी आन्दोलन इस सफलता से खुद को समृद्ध किया है और तैयार हो रहा है आगामी 16-17 दिसम्बर की हड़ताल को मुकम्मल कामयाबी देने के लिये।

सभी स्तरों के ग्राहकवर्ग, आम आदमी तथा बैंक कर्मचारी आन्दोलन की सम्मिलित शक्ति ही सिर्फ रोक पायेगी केन्द्रीय सरकार द्वारा बैंक बेचे जाने का दुष्प्रयास।       

     

*यह आलेख 16 दिसम्बर 2021 को दैनिक गणशक्ति अखबार में प्रकाशित हुआ था।