Tuesday, September 21, 2021

পাটনার মহিলা অটোচালকেরা

-          

বিহারের রাজধানী পাটনা শহরে কিছুদিন যাবৎ মহিলারা অটোচালকের কাজে যোগ দিয়েছেন। শুনতে রীতিমত দুঃসাহসিক। সাধারণ ঘরের মহিলাদের পুরো একটা দলকে অটোচালক হবার জন্য উৎসাহিত করার এই চমকপ্রদ কাজটা করেছেন সি.আই.টি.ইউ.এর পরিচালনাধীন পাটনা জেলা অটোচালক সঙ্ঘের নেতৃবৃন্দ। শুধু এই পথে নিজেদের পরিবারের অন্নসংস্থান খুঁজতে উৎসাহিত করা নয়, চালকের কাজে তাদেরকে প্রশিক্ষিত করা, ট্রেনার নিযুক্ত করে, বিশেষ কোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে মার্শাল আর্টসেও তাদের কুশল করে তোলা, সরকার ও প্রশাসনের সাথে কথা বলে তাদের লাইসেন্স পাওয়ানোর ব্যবস্থা করা, পাটনা জাংশনের প্রিপেড অটো স্ট্যান্ডে তাদের জায়গা করিয়ে দেওয়া… এই সমস্ত কাজে এগিয়ে এসেছে পাটনা জেলা অটোরিকশা চালক সঙ্ঘ। এঁরাও সংগঠনের সদস্য হয়েছেন। কয়েকজনের মধ্যেকার নেতৃত্বের সুষুপ্ত ক্ষমতা জেগে ওঠার জায়গা পেয়েছে। এঁদের মধ্যে অনেকেই ১২ই ডিসেম্বর ২০১৩য় দিল্লীতে শ্রমিক সংগঠনগুলোর পার্লামেন্ট মার্চে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

এই মহিলাদের কয়েকজনের ‘জবানবন্দী’, সম্মেলন উপলক্ষে প্রকাশিত বিহার স্টেট অটোচালক সঙ্ঘের স্মরণিকায় ছেপেছে। তারই সংক্ষিপ্ত রূপ বাংলায় নিচে দেওয়া হল। ছবি যে কটা পেয়েছি, সেগুলো যোগাড় করে দিয়েছেন অটোচালক সঙ্ঘের নেতা রাজকুমার ঝা, চুন্নু সিং এবং নবীন মিশ্র।

 

কাঞ্চন দেবী

আমি কাঞ্চন দেবী। পিতার নাম কেশব মাহাতো। জন্ম হয়েছিল নালন্দা জেলার চন্ডী থানান্তর্গত ধর্মপুর গ্রামে। পাঁচ বোন আর এক ভাইয়ের মধ্যে আমি সবচে’ ছোটো। পরিবারের অবস্থা ভালো ছিলো না। তাই আমার বিয়েতে বাবা বেশি খরচ করতে পারেন নি। ১৯৯৮ সালে নালন্দা জেলার হিলসা থানান্তর্গত উগন বিগহা গ্রামের নিবাসী মোসমাত চন্দেশ্বরী দেবীর বড় ছেলে রাম সিংএর সাথে আমার বিয়ে হয়। শ্বশুরবাড়ীর পরিবারও সাধারণ ছিল। শ্বাশুড়ি গ্রাম ছেড়ে এসে থাকতেন পাটনার বাহাদুরপুর হাউসিং কলোনিতে। তিন ছেলের মুখে তিনি অন্ন জোটাতেন ঘরে ঘরে বাসন মেজে। শিক্ষা পায়নি বলে বড় হয়ে ছেলেগুলো মজুরি করা শুরু করেছিল। আমার স্বামী প্লাম্বারের কাজ করতেন কিন্তু মদের নেশায় পরিবারের ভরনপোষণ করতে ছিলেন অক্ষম। বাধ্য হয়ে আমাকেও ঘরে ঘরে ঝিয়ের কাজ ধরতে হয়েছিল। ধীরে ধীরে তিন মেয়ে হল আমার। আজ বড় মেয়ে ১২ বছরের, তার পরেরটি ১০ আর সবচেয়ে ছোটোটি ছয় বছরের। শ্বাশুড়ির পরিবার আর আমাদের পরিবার আগেই আলাদা হয়ে গিয়েছিল।

জুন ২০১২য় আমার শ্বাশুড়ি মারা গেলেন। লিভারের অসুখে আমার স্বামী মারা গেলেন ২০১৩র ২৬শে ফেব্রুয়ারী। পরিবারের খাইখরচে সে বিশেষ কিছু দিতে পারতো না, শুধু নিজের সংকল্পের জোরে বাচ্চা তিনটেকে প্রাইভেট স্কুলে পড়াচ্ছিলাম, কিন্তু তার মারা যাওয়াতে ভীষণ একা হয়ে পড়লাম। ঝিয়ের কাজে দিন চলছিল না। তখনই পাশের ঘরের মঞ্জু কুমারী খবরের কাগজে পাটনা জেলা অটোরিকশা চালক সঙ্ঘের একটা বিজ্ঞাপন পড়ে আমাকে খবর দিল। অটোরিকশা চালক সঙ্ঘের সচিব নবীন কুমার মিশ্রা নাকি মেয়েদের অটো চালাবার ট্রেনিং দিচ্ছেন। আমিও তাতে শামিল হয়ে গেলাম। উনিই ট্রেনিং দিলেন, লাইসেন্স যোগাড় করে দিলেন। ব্যাঙ্ক অফ বড়োদা থেকে ঋণের ব্যবস্থা করিয়ে দিলেন। যে বাড়িগুলোয় আমি ঝিয়ের কাজ করতাম তাঁরাও আমাকে কিছু কিছু অর্থসাহায্য দিলেন অটো কিনতে। ১৮ই আগস্ট ২০১৩ থেকে আমি পাটনা জাংশনের প্রিপেড অটোস্ট্যান্ড থেকে অটো চালাচ্ছি। সকাল ছটা থেকে সন্ধ্যে ছটা অব্দি স্ট্যান্ডে থাকি। সারাদিনে তিন-চার ফেরির সওয়ারি জুটে যায়। তেল আর স্ট্যান্ডের খরচ কেটে ২০০-২৫০ টাকা বাঁচে। ব্যাঙ্কের ঋণ ফেরাতে ১০০ টাকা প্রতিদিন দিতে হয়। অটোর মেন্টেনেন্সের জন্য ৫০ টাকা আলাদা করে রাখি। এভাবে ১০০ টাকা থাকে নিজের আর বাচ্চাদের খাইখরচের। চলে না। বাড়িতে থাকতে পারি না বলে বাচ্চাদেরও সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু মানুষেরা, সঙ্ঘের সাথীরা আশ্বাস দিয়েছেন যে দিন বদলাবে – সেই ভরসায় বাঁচছি। 

নবীন মিশ্র স্যার, রাজকুমার ঝা স্যার (এঁরা স্যার বলতে মানা করেন কিন্তু আমার স্যার বলতেই ভালো লাগে) এবং আরো সমস্ত নেতারা আমাদের পথ দেখাচ্ছেন। আমাদের সংগঠন তৈরি হয়েছে – অটোরিকশা চালক সঙ্ঘের মহিলা উপসমিতি। আমার মধ্য সেই সংগঠনে কাজ করারও রুচি জেগেছে।  

 

পিঙ্কী দেবী

আমার নাম পিঙ্কী দেবী। মার নাম সী কুমারী দেবী। বাবার নাম বিজয় কুমার। আমার হাসব্যান্ড কুক। তাঁর নাম শ্যাম নারায়ণ প্রসাদ। পরিবারের খরচ চলছিল না বলে ভাবছিলামই যে কিছু করা উচিৎ আমার কিন্তু পারছিলাম না। তখনই খবরের কাগজে দেখলাম যে পাটনা জেলা অটোরিকশা চালক সঙ্ঘ নিখরচায় মহিলাদের অটো চালানোর ট্রেনিং দিচ্ছে। নবীন কুমার মিশ্র নামে একজনের মোবাইল নম্বরও দেওয়া ছিল। রাত ভর ভাবলাম। স্বামী এবং সন্তানদেরও বোঝালাম যে কাজ করাটাও জরুরী আর সন্তানদের ভালো শিক্ষাদীক্ষার ব্যবস্থা করাটাও মা-বাপের টাস্ক। তারা রাজী হয়ে গেল।

নির্ধারিত দিনে আমি ভেটেরিনারী কলেজ ময়দানে পৌঁছোলাম। দেখলাম অনেক মহিলা ট্রেনিং নিচ্ছেন। আমার মনেও বিশ্বাস জাগলো। আমিও ট্রেনিং নিলাম।

মাঝে সঙ্ঘের নেতারা আমাদের সমঝদারী, সাহস আর বিশ্বাস বাড়াতে সভার আয়োজন করতেন। সেই সব সভায় মহিলা নেত্রী অনিতা দ্বিবেদী, সিটু নেতা অরুণ কুমার মিশ্র, শঙ্কর সাহ, চুন্নু সিং এবং আরো অনেকে আশ্বাস দিতেন যে আমাদের এগিয়ে চলার পথে কোনো রকম বাধা বা ঝুঁকি এলে সঙ্ঘ আর ইউনিয়ন আমাদের পাশে থাকবে। তাঁরাই লাইসেন্স করিয়ে দিলেন, ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ পাওয়ালেন, কোন গাড়িটা ভালো সেসব বোঝানো, কম্পানির সাথে কথা বলা… সব করলেন। আমরা অনুভব করলাম যে ইউনিয়নের লোকেরা আমাদের পরিবারের সদস্যের মত।

ওঁরা আমাকে কামকাজী মহিলার জাতীয় কর্মশালায় প্রশিক্ষণ নিতে বললেন। আমাকে উৎসাহ দিয়ে ওড়িশা পাঠালেন। সারা দেশের মহিলাদের সাথে মিশে আমার মধ্যে একটা দায়িত্বের বোধ জাগলো। সংকল্প নিলাম যে আমিও মহিলাদের স্বার্থে কাজ করব।

১৭ই নভেম্বর ২০১৩য় পাটনা জেলা অটোরিকশা চালক সঙ্ঘের সম্মেলন হল যাতে মহিলা উপসমিতি গঠন করা হল। আমি ওই উপসমিতির কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হয়েছি।

   

সরিতা পান্ডে

আমি পেশায় শিক্ষিকা ছিলাম। আমার স্বামী একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে সেল্‌সম্যানের কাজ করেন। পরিবারের সাথে আমি আনন্দে ছিলাম। শিক্ষিকা হিসেবে শিশুদের পড়াতে আমার ভালো লাগতো। কিন্তু সমাজের জন্য চিন্তা করা আর সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করা আমার পছন্দের একটা ব্যাপার ছিল। যখন খবরের কাগজে আমি মহিলা অটোচালক ট্রেনিংএর বিজ্ঞাপনটা দেখলাম, মনে হল বিহারের জন্য এটা নতুন কিছু এবং আর্থিক বা পারিবারিক দিক থেকে প্রতাড়িত মহিলাদের জন্য নিজের পায়ে দাঁড়াবার একটা সোনার সুযোগ। তখনই অটোচালক সঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক রাজকুমার ঝা আর নবীন কুমার মিশ্রর সাথে আমি দেখা করলাম। দেখা করে আমার সাহস আরো বাড়ল। লার্নিং লাইসেন্স আর ট্রেনিংএর পর্ব শুরু হল। তারই সাথে আত্মরক্ষার জন্য আমাদের ক্যারাটে আর তাইকোন্ডোর ট্রেনিং দেওয়া হল। আর আজ আমাদের অটো জোর গতিতে রাস্তায় দৌড়োচ্ছে।

বিহারের প্রতিনিধি হয়ে ওড়িশার পুরীতে ওয়ার্কশপে গিয়েছিলাম। নিজের রাজ্যে অটোরিকশা চালক সঙ্ঘের নেতৃত্বেও আমি নির্বাচিত হয়েছি। ভবিষ্যতে আমি নারীদের এগোবার পথে সাহায্য করতে চাই।

        

অনিতা দেবী

আমি অনিতা দেবী, নিজের অভিজ্ঞতার কথা আপনাদের বলছি। প্রথম প্রথম অটো চালাতে আমার ভালো লাগতো না। কিন্তু এখন অটো চালাতে আর তার রোজগারে নিজের পরিবারের প্রয়োজন পুরো করতে পেরে আমি গর্বিত।

আগে আমি চাকরি করতাম। অকারণে ওপরওয়ালার বকুনি শুনতে হত সারাদিন। খুব দুঃখ পেতাম ওরকম অপমানজনক ব্যবহার পেয়ে।

খবরটা পড়ে প্রথমে বিশ্বাসই হতে চায়নি। আমার স্বামী রাকেশ কুমার আমায় নিয়ে গেলেন ভেটেরিনারী কলেজ গ্রাউন্ডে। ট্রেনিং নিতে শুরু করলাম। মাঝেমধ্যে সভা হত, আমাদের চেতনায় সমৃদ্ধি আনতে। নেহা কুমারী আমাদের মার্শাল আর্ট শেখাতেন।…

একদিন অটো চালাবার সময় হঠাৎ মাথা ঘুরে গেল আর স্টিয়ারিং ঘুরে যাওয়াতে উল্টে গেল অটোটা। ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিস দৌড়ে এসে গাড়িটাকে দাঁড় করালো, আমায় উঠিয়ে গাড়িতে বসালো আর আমার স্বামীকে ফোন করলো। রাস্তায় যেতে থাকা অনেক অটোচালক দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাঁরা আমাকে সাহস দিলেন। পুলিসের আর অটোচালক ভাইদের সাহায্য আমি কখনো ভুলবো না। পরিবারেও এমন ব্যবহার পাওয়া যায়না। এই ঘটনার পর তো আমি ভয় শব্দটাই ভুলে গেছি।


গুড়িয়া সিন্‌হা

সঙ্ঘের মাননীয় পদকর্তা এবং সদস্যরা যেভাবে সাহস দেখিয়ে আমাদের মত নারীদের সঙ্গে থেকেছেন তার জন্য আমি গুড়িয়া সিনহা আপনাদের সবাইকে নমস্কার জানাচ্ছি।

যেদিন থেকে আমরা, নারীরা রাস্তায় অটো চালাচ্ছি, রাজ্যের পুলিস, প্রশাসন, এবং আম জনতার কাছ থেকে সর্বক্ষণ সহযোগিতা, সহানুভুতি আর প্রশংসা পাচ্ছি। অটোচালকদের মধ্যেও ৯৫% আমাদের সাথে সহযোগিতা করছেন। কিন্তু কিছু এমনও চালক আছেন যাঁরা আমাদের প্রতি অভদ্র ভাষা ব্যবহার করেন। তাঁদের এ ব্যবহার আমায় কষ্ট দেয়। প্রয়োজনে আমি সেই সব চালকদের নাম আর গাড়ির নম্বরও বলতে পারি। তাদেরও আমি এ কথাটা বলে দিয়েছি।

১৭ই নভেম্বর ২০১৩য় বিহার স্টেট অটোচালক সঙ্ঘের দ্বিতীয় রাজ্য সম্মেলনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেলাম। সম্মেলনে যোগেন্দ্র প্রসাদ সিং, মঞ্জুল কুমার দাস, শঙ্কর সাহ আর রাজ কুমার ঝাএর বক্তৃতা আর রিপোর্ট থেকে সিটু আর সঙ্ঘের উদ্দেশ্য এবং কার্য্যক্রম সম্পর্কে অনেক কিছু জানলাম। রাজ্য কমিটিতে সরিতা পান্ডেকে সহ-সভাপতি এবং আমাকে সম্পাদক নির্বাচিত করা হল। তারপর পাটনা জেলা অটোরিকশা চালক সঙ্ঘের মহিলা উপসমিতি তৈরি হল যাতে আমাকে সভাপতি আর সরিতা পান্ডেকে সাধারণ সম্পাদক করা হল। এটা গৌরবের কথা।

আমি সংকল্প নিচ্ছি যে পুরুষ কমরেডদের সাথে কাঁধ মিলিয়ে চলার সাহস যুগিয়ে রাখব, ভালো লীডার হওয়ার চেষ্টা করব আর সিটু ও সঙ্ঘের সাথে থেকে সমাজে মহিলাদের অবস্থা ভালো করার জন্য লড়বো, নিজেদের ওপর হতে থাকা অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নারীদের সাহায্য করবো।

 

নেহা ভার্মা

আমি একজন বেকার যুবতী ছিলাম। শ্বশুরবাড়ির আর্থিক অবস্থা ভালো ছিলো না। তবে বিয়ের আগে থেকেই আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল, কেননা বাপের বাড়িতে চারচাকা আর দুই চাকা, দুটোই আছে। তাই মাথায় এই কথাটা এল যে যদি অটোরিকশা চালক সঙ্ঘের রাজকুমার ঝা আর নবীন মিশ্রর সাথে যোগাযোগ করি তাহলে পরিবারের আর্থিক অবস্থা পাল্টাতে পারে, রুজিরুটির ব্যবস্থা হতে পারে। একদিন রাষ্ট্রীয় সাহারা খবরের কাগজে রাজকুমার ঝাএর মোবাইল নম্বর পেলাম। ওঁদের সাথে যোগাযোগ করলাম। ওঁরা অফিসে ডাকলেন। আমার শ্বশুরমশাইএর নাম অশোক কুমার ভার্মা। তাঁর সাথে সিটু অফিসে গিয়ে আমি সিটুর সদস্য হলাম। তারপর রাজকুমার ঝা আর নবীন মিশ্রর সহযোগিতায় ইউকো ব্যাঙ্ক, ফ্রেজার রোড থেকে লোনের ব্যবস্থা হল আর লীডার অটোমোবাইল থেকে মাহিন্দ্রা আলফা অটো। ড্রাইভিং লাইসেন্স তো আমার চারচাকার ছিল, ইচ্ছেও ছিল স্কর্পিও বা বোলেরো নেওয়ার কিন্তু আর্থিক সঙ্গতি না থাকার কারণে অটো নিলাম। আপনাদের আশীর্বাদ থাকলে, ইচ্ছে আছে একদিন স্কর্পিও চালাবো।

 

রিঙ্কু দেবী

আমার নাম রিঙ্কু দেবী। ম্যাট্রিক পাশ। তিনটে মেয়ে আছে। আগে রান্না করার কাজ করতাম, মাইনে তিন হাজারের কাছাকাছি ছিল। মহিলাদের অটো চালানো শেখানো হচ্ছে… পড়ে আমার ভালো লাগলো। ভাবলাম এটা নতুন ধরণের কাজ। স্বামী কে জিজ্ঞেস করলাম। সে রাজী হয়ে গেল। প্রথম দিন ট্রেনিংএ গিয়ে আমার বিশেষ ভালো লাগলো না। আবার ভাবলাম যে তিন মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও তো ভাবতে হবে! বাড়ির অবস্থা ভালো নয়! তাই শেষ অব্দি অটো চালানো শিখলাম।

পাড়ার লোকেরা রোজ আমায় যেতে দেখে বলতো যে অটো চালানো শুধু পুরুষদের কাজ। তাই আমার কাছে এটা একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ালো।

যেদিন খবরের কাগজে আমার ছবি ছাপলো প্রথম সেদিন বাড়ির আর পাড়ার সবাই খুব খুশী হল।

অটো চালাতে যখন নতুন নতুন বেরোতাম তখন কিছু কিছু যেমন ভালো অভিজ্ঞতা হত, কিছু কিছু খারাপ অভিজ্ঞতাও হত। সেসব উপেক্ষা করে আজ আমি প্রীপেড চালাচ্ছি – সবার সহযোগিতা পাচ্ছি। বাড়িতে বেশি টাকা আনতে পারছি।

নবীন মিশ্র স্যার, রাজকুমার ঝা আর সিটুর অন্য নেতারা বরাবর আমাদের সাহায্য করছেন। তাঁদের দেখানো পথে আমিও সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করতে চাই, যাতে অন্যান্য নারীদের জীবন বদলাতে পারে।

 

বিভা কুমারী

আমি, বিভা কুমারী, সাধারণ পরিবারে প্রতিপালিত হয়েছি। কঙ্কড়বাগ কলোনিতে থাকি। তিন সন্তান। স্বামী টিউশন পড়ান, তাতে কিছু আয় হয়, বাচ্চাদের লেখাপড়া চলে। আয় বাড়ানোর উপায় ভাবছিলাম। তারই মাঝে পেপারে অটোরিকশার বিষয়ে পড়লাম। দুতিনটে মোবাইল নম্বর দেওয়া ছিল। যে নম্বরে যোগাযোগ হল সে নম্বরটা ছিল রাজকুমার ঝা’জীর। আমাকে সবকথা বুঝিয়ে বললেন। ট্রেনিং, লাইসেন্স, লোন, অটো কেনা… । যেমন যেমন নির্দেশ পেলাম করতে থাকলাম। আজ, এত কম দিনে আমার কাছে লাইসেন্স আছে, ব্যাঙ্ক থেকে লোনে অটো কেনা হয়ে গেছে। এসব অবিশ্বাস্য লাগতো। সাধারণ জনতার মত আমরা এঁদের কাছে এসেছিলাম।

আজ আমাদের আত্মশক্তি অনেক বেড়েছে। সিটু নেতাদের সহযোগিতা থাকছে লাগাতার।

 

শোভা কুমারী

আমি শোভা কুমারী। আমার জন্ম খুব গরীব পরিবারে হয়েছিল। বাবা রিকশা চালাতেন আর মা ঘরে ঘরে ঝিয়ের কাজ করতেন। যেমন তেমন করে আমাকে বাবা আটক্লাস অব্দি পড়াতে পেরেছিলেন। বিয়ে হল। স্বামীও রিকশা চালান। অবস্থার খুব একটা হেরফের হলনা। এরই মাঝে দুটো বাচ্চারও জন্ম দিলাম। বাচ্চাদুটোর খাওয়াপরা আর পড়াশুনোর ব্যবস্থা করতে পারছিলাম না। কোনো ভাবে সেলাই শিখলাম। সেলাই করে কিছু আয় হত। একদিন খবরের কাগজে মহিলাদের নিখরচায় অটোচালানো শেখানো হবে। সেদিনই রেডিও মির্চিতেও অটোট্রেনিংএর বিষয়ে বলা হল। তখনই মনে মনে সংকল্প নিলাম যে অটোচালানো আমায় শিখতেই হবে, যাতে বাচ্চাদের লেখাপড়া শেখাতে পারি। স্বামীকে বলায় উনি আমাকে সাহায্য করলেন। ওনার সাথেই আমি ট্রেনিংএর জায়গায় গেলাম। নবীন মিশ্র স্যারের সাথে দেখা হল। অনেক সাহায্য করলেন উনি। ওনার মেয়ে নেহা কুমারী আমাদের মার্শাল আর্টের ট্রেনিং দিতেন।

কিন্তু তিন মাস কঠোর পরিশ্রমের পর যখন নিজের টেম্পো কেনার প্রশ্ন উঠল তখন ভীষণ নিরাশ হয়ে পড়লাম। কেননা, ভয় জাগল যে গরীব পরিবারের বৌকে ব্যাঙ্ক লোন দেবে কিসের ভিত্তিতে। আমার কাছে পয়সাও ছিল না আর গ্যারান্টার হবার মতও কেউ ছিল না। তবু, মিশ্র স্যারের সহযোগিতায় সে লোনও আমরা পেলাম। লোন নেওয়ার আগে জমা করার ছিল ২০,০০০ টাকা। আমার কাছে ১৫,০০০ ছিল। ৫০০০ টাকা বাজার থেকে ধার করে জমা দিয়ে তবে লোন পেলাম। অটো কেনা হল। এখন আমি স্বনির্ভর। বাড়িতে আমি, আমার স্বামী, আমার বাবা, আমার এক ছেলে আর এক মেয়ে। আমার বাচ্চারা লেখাপড়ার সাথে সাথে আমার কাজেও সাহায্য করে। কেননা তারা জানে তাদের বাবা-মা তাদের ভবিষ্যতের জন্য প্রচুর পরিশ্রম করছে।

অটোচালানো শেখার সময় মাঝে মধ্যে ট্রেনিং পেতে থাকা মহিলাদের নিয়ে সভা হত। তাতে আমাদের সাহস যোগানো হত। আমরা সঙ্ঘের সদস্যতাও গ্রহণ করলাম। বিহার স্টেট অটোচালক সংঘ আর সিটুর নেতারা, অনিতা দ্বিবেদী, অরুণ কুমার মিশ্র, রাজকুমার ঝা, বিজলি প্রসাদ, শঙ্কর সাহ সবাই আমাদের পথ দেখিয়েছেন, পরিবারের সদস্যের মত আমাদের আপন করে নিয়েছেন তাই আমাদের মন থেকে ভয় আর আশঙ্কা দূরে সরে গেছে।



বিহারী-বাঙালী

           আমার জীবনে আমি ‘প্রবাসী’ শব্দটার কোনোদিন কোনো অর্থ খুঁজে পাইনি। যদি কোনোদিন ভেবেও থাকি যে ‘মূলবাসে’ যাবো একদিন, সেটা ‘ফিরে যাওয়া’ হিসেবে, ‘দেশের বাড়িতে ফিরে যাওয়া’ হিসেবে আসেনি, পশ্চিমবঙ্গে কোথাও একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করে থাকবো কিছুদিন, সারাদিনরাত রাস্তায়, বাজারে নিজের মাতৃভাষায় কথা বলার সুখে বুঁদ হয়ে থাকবো, এই স্বপ্ন হিসেবে এসেছে।

‘প্রবাসী’ শব্দটা অর্থবহ সামাজিক পরিভাষা হিসেবে ১৯৪৭ অব্দি, বা আরো কিছুদিন টেনে দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক যোজনা বাস্তবায়িত হওয়ার কাল অব্দি টানা যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই অর্থনৈতিক সংকটের চাপে বেশ কিছু সংখ্যক প্রবাসী বাঙালীর দ্বিতীয় প্রজন্ম আর প্রবাসী থাকেনি। দেশ (এবং বাংলা) ভাগ ‘দেশে ফেরার’ মানসিকতাটাকে আদ্ধেকের বেশি প্রবাসী বাঙালীর জন্য অপ্রাসঙ্গিক করে দিল। দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক যোজনায় প্রস্তাবিত শিল্পায়ন, সরকারি বা ‘গণ’স্বামিত্বের সংস্থাগুলিকে নেতৃত্বকারী স্থান দেওয়ার প্রস্তাব এবং ফলতঃ সরকারী বিভাগগুলির প্রসার, স্থায়ী সরকারী চাকরীর সুযোগে বৃদ্ধি ইত্যাদি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালির একটা বড় অংশকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে, সবরকম বাস্তব প্রয়োজনে স্থানীয় করে দিল। তারপরে প্রবাসীত্বের যা বাকি রইলো তা ওই, কোন্নগরে সরকারি ফ্ল্যাট বুক করে স্বপ্ন দেখা যে অবসরগ্রহণের পর বাংলার মাটিতে থাকবো, রাজারহাট, নিউটাউন অথবা উত্তর বা দক্ষিণবঙ্গের কোনো শহরে কোনো এক সময়ে দাদার সাথে কিনে ফেলা জমিতে একটা বাড়ি করে চলে যাওয়া ইত্যাদি। এগুলো প্রবাসীত্বের হ্যাঙোভার, আর নিজের ভাষাভুমির প্রতি স্বাভাবিক টান।

আর সত্যি কথা বলতে, নিজ ভাষাভূমির বাইরে অন্যান্য রাজ্যে কখনো সখনো যে (সুপরিকল্পিত) ‘অপরিচিত বিজাতীয়তা’র অতর্কিত আক্রমণে উপরোক্ত প্রবণতাটা, নিজের ভাষাভূমিতে গিয়ে থাকার ইচ্ছেটা জোর পায়, আজ সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের যুগে নিজ ভাষাভূমিতেও কি ব্যক্তিমানুষকে সেই অপরিচিত বিজাতীয়তার সম্মুখীন হতে হচ্ছে না?  

 এই পরিপ্রেক্ষিতেই আমি বিহারবাসী বাঙালিদের বা বাংলাভাষী বিহারীদের দেখতে চাই। বাঙলার বাইরে বাঙালী মানেই এক শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনস্ক শহরবাসী বাঙালী সম্প্রদায় যাঁরা অচেনা জায়গায় একসাথে হয়ে পুজোপার্বণ, নাটক, বিচিত্রানুষ্ঠান, ক্লাব, খেলাধুলো, সাহিত্যচর্চা এবং আরো এগোলে, বিদ্যালয় স্থাপন, সস্তায় চিকিৎসার ব্যবস্থা ইত্যাদির একটা উজ্জ্বল ইতিহাস গড়ে তুলেছিলেন একসময়। বিহার যেমন বদলেছে, বিহারে সেই বাঙালিরও একটা বিবর্তন ঘটে গেছে।

বিবর্তনের বাহ্য কারক চারটে। প্রথম, ১৯৭৪এর আন্দোলন থেকে রূপ নিতে থাকা বিহারী যুব-চেতনার (সে চেতনায় যাকিছু দুর্বলতা থাকুক) প্রেক্ষিতে বাঙালী যুবর (বা তৎকালীন যুবপ্রজন্মের) বহুখন্ডিত এবং প্রায় অনির্দিষ্ট অবস্থান। বাঙালীর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব তখন থেকেই কম হতে শুরু করেছে।

দ্বিতীয়, সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের সাংস্কৃতিক আক্রমণ। নতুন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এই আক্রমণ সারা দেশেই বিপন্ন করে তুলেছে মানুষের ভাষিক-সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব। ত্বরান্বিত করেছে সমাজের সবকটি ক্ষয়িষ্ণু প্রবৃত্তির বাড়। বিহারবাসী একটি ভাষাগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জীবন তার ব্যতিক্রম হবে কেন?

তৃতীয়, বিহার থেকে ঝারখন্ড নামে এক নতুন রাজ্যের সৃজন। সংখ্যাগত অনুপাতে বিহারে বাংলাভাষী হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়ায় তার প্রভাব তাদের মানসিকতার ওপরও পড়েছে। (এত ‘দুর্বল’ যে কয়েক বছর আগে রাজ্যের বাংলাভাষীদের কিছু প্রতিনিধি সমস্যাদি নিয়ে কথা বলতে গেলে বিহার সরকারের ভারপ্রাপ্ত সরকারী আধিকারিক চমকে ওঠেন, “বিহারে বাঙালী! আছে কোথায়? সব তো ঝারখন্ডে চলে গেছে!”)

আর চতুর্থ, উপরোক্ত তিনটের ফলশ্রুতি হিসেবে, সামুদায়িক সাংস্কৃতিক জীবনের ক্ষয়। যার ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত সাধারণভাবে, বহির্বঙ্গে বাঙালীদের অবস্থা নিয়ে সাম্প্রতিক সব কটি লেখায় পাওয়া যায়। যথা, ক্লাব ও নাট্যদলগুলির লোপ, পুজোপার্বণে বিশেষকরে বারোয়ারি পুজোয় বাঙালী পুজোকমিটিগুলোরও অবাঙালী এবং অনেকাংশে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় টিঁকে থাকা, গ্রন্থাগারগুলির অবলুপ্তি, সংখ্যালঘু বিদ্যালয়গুলোর সংখ্যালঘু পরিচয়ের ওপর আক্রমণ এবং এমনই আরো অনেক কিছু।

বিবর্তনের আভ্যন্তরীন কারকগুলি সম্পর্কে কিছু বলার আগে ঈষৎ প্রসঙ্গান্তরে যাওয়া দরকার।

বাঙালীদের ভোট বয়কট! শুনেছেন অন্য কোনো প্রদেশে? কিন্তু বিহারে ডাক দিয়েছিল বিহার বাঙালী সমিতি। আসলে উপরোক্ত চারটে বাহ্য কারকের চাপে সম্পূর্ণ অসংগঠিত ও বিচূর্ণ হয়ে পড়া বাঙালী জাতভিত্তিক রাজনৈতিক সংখ্যাবিন্যাসে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ল। জাতভিত্তিক পালোয়ানির উত্থান, শহরে জমিজমার ব্যাবসার রমরমা ও আইনশৃংখলার সামগ্রিক অবনতি, এই সব কিছুর কারণে উঠতি প্রমোটার, অপহরণকারী, ছিনতাইবাজ ইত্যাদি সবরকমের দুর্বৃত্তের প্রধান লক্ষ্য (সফ্‌ট টার্গেট), বিশেষ করে বাঙালী-অধ্যুষিত শহরগুলোয় হয়ে দাঁড়ালো বাঙালী মধ্যবিত্ত। এই রকম পরিস্থিতিতে বিহার বাঙালী সমিতির কুশল নেতৃত্ব ধীরে ধীরে সংগঠনে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করল। উত্তর বিহারের বিভিন্ন জেলায় গ্রামাঞ্চলে কলোনী গড়ে বসবাসকারী প্রায় পাঁচলক্ষ এককালীন উদ্বাস্তু বাঙালী জনসমুদায় নিজেদের যে আন্দোলন চালাচ্ছিল, তাদেরকে সাদরে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে এল সমিতির ব্যানারে। পাটনার রাস্তায় বেরুলো মিছিল। জেলায় জেলায় রিলে ধর্না। সমিতির সদস্যতার শ্রেণীগঠন, দাবীসমূহ এবং তা আদায় করার ধরণধারণ সব কিছু গেল বদলে। গণআন্দোলন একটা নিয়মিত ব্যাপারে দাঁড়িয়ে গেল।

কিছুদিন আগে বিহার বাঙালি সমিতির এই দীর্ঘ আন্দোলনের চাপে বিহার সরকার বিহারবাসী বাঙালিদের একটা সার্ভে করিয়েছিল। অবশ্যই সার্ভে করানোর উদ্দেশ্য ছিল বিহারের বিভিন্ন জেলায় গ্রামাঞ্চলে এককালীন পূর্ব পাকিস্তান বা পরবর্ত্তী বাংলাদেশ থেকে আসা যে লক্ষ লক্ষ বাঙালীর বাস, তাদের প্রকৃত অবস্থাটা তুলে ধরা। যথা, তারা কেউ আর উদ্বাস্তু নয়, ছিন্নমূলও নয়, বিহার তাদের থাকার ও চাষবাষ করার জমি দিয়েছে, দুই দশক আগের কেন্দ্রীয় সরকারের আদেশে সে জমিতে তারা মালিকানাস্বত্বও পেয়েছে, অথচ সেই মালিকানার কাগজ তারা পাচ্ছেনা। তারা বেশির ভাগ দলিত, সরকারি পরিভাষায় তপশীলী জাতির, অথচ জাতি প্রমাণপত্র তারা পাচ্ছে না। স্বাভাবিক ভাবেই, এসবের অভাবে তারা মনরেগার জবকার্ডও পাচ্ছে না, বিপিএল কার্ড পাচ্ছে না ইত্যাদি। আর মাতৃভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থার অভাব, যেটুকু ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল গত এক শতকেরও বেশী সময় ধরে তার চূড়ান্ত অবনতি ও সমূহ ধ্বংস… এসব তো সার্বিক সমস্যা, এসব নিয়েও সার্ভের কিছু অবজার্ভেশন ছিল।

যেহেতু সার্ভেটা মূলতঃ এককালীন উদ্বাস্তুকেন্দ্রিক কাজেই সেটার বিশদ উল্লেখ পাঠককে খুব বেশি হয়ত উৎসাহিত করবে না। কিন্তু এই সার্ভে অব্দি পৌঁছোনোর যে পথ, সেটি অতিক্রান্ত, এবং এই অতিক্রান্ত পথের প্রভাব পড়েছে বিহারের বাঙালী সমাজের বিবর্তনের আভ্যন্তরীণ কারকগুলো তৈরি করতে।   

ফিরে যাই বিবর্তনের কথায়। শহরবাসী শিক্ষিত বাঙালী জনসমুদায়ের যে নেতৃস্থানীয় অংশ ছিলেন, অর্থাৎ অন্নসংস্থানের নিত্তনৈমিত্তিক টানাপোড়েন সামলেও যাঁরা সকাল-সন্ধ্যায় হয়ে উঠতেন সাহসিক সংস্কৃতি-চেতনার পাওয়ার হাউজ, ঠিক সেই রেনেশাঁ-মাপের না হলেও আজও তাঁরা আছেন। তাঁরা আছেন বলেই আজ বিহারে বাঙালী, শহর গ্রাম মিলিয়ে তার বৃহত্তর একতা ও ভাষিক দায়বদ্ধতার পরিচয় পেয়েছে। তাঁরাই আজও সদর্থক নেতৃত্বে আছেন।

সেই বাঙালীর দ্বিতীয় অংশ ছিলেন একটু নিজের মধ্যে মশগুল। ডাকলে শামিল হতেন সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজকর্মে, নিজেরা নেতৃত্ব দিতেন না সেভাবে। এঁদের মধ্যে তাই ‘প্রবাসী’ হ্যাঙোভারটা সবচেয়ে বেশী ছিল। সুযোগও ছিল। শক্ত আর্থিক বনিয়াদে দাঁড়িয়ে তাঁরা সবসময় ভাবতে পারতেন, ‘যে কোনো দিন চলে যেতে পারি’। এই দ্বিতীয় অংশের বেশ কিছু পরিবার আজ পশ্চিমবঙ্গে চলে গেছেন। অথবা নতুন অর্থনীতিতে এগিয়েছেন দিল্লী, মুম্বাই, পুণে, ব্যাঙ্গালোরের দিকে। তাঁদেরকে বাদ দিলেও অনেকে এখনও আছেন, বিহারের বাঙালীদের আন্দোলনের খবরাখবর শুনে যাঁদের বাঙালী হওয়ার নতুন মানে শিখতে হচ্ছে একটু একটু করে।

তৃতীয় অংশ ছিলেন ঈষৎ নিম্নবিত্ত। সে কারণে তাঁদের পক্ষে নিজেদের প্রবাসী ভাবা সম্ভব ছিলো না খুব বেশী দিন। আগের প্যারায় যে দিনগুলোর কথা বলা হল সে দিনগুলোয় তাঁদের দ্বিতীয় তৃতীয় প্রজন্মের বাঙালিয়ানা হারিয়ে যেতে লাগলো। বাবার হয়তো কষ্ট হচ্ছে নিজের মাতৃভাষার কথা ভেবে, ছেলে শুনিয়ে দিত, “রাখো তো! আজ বাদে কাল এখানেও যদি ‘বাঙালী-খেদাও’ শুরু হয় কোথায় পালিয়ে বাঁচবে?” ভাগলপুরের কিছু গ্রামবাসী রাঢ়ীকায়স্থরা যেমন আর কোনো ভাবেই বাঙালী নয়, তারাও নিজেদের স্বপরিচয় হারিয়ে ফেলতে লাগলো বেঁচে থাকার তাগিদে বা ভয়ে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাল্টে যাওয়ায় তারা বিহার বাঙালী সমিতির সাংগঠনিক গতিবিধি এবং আন্দোলনের নতুন পর্যায়ে আগে থেকে বেশী করে যোগ দিচ্ছে।

এরপর আছে চতুর্থ অংশ যাকে অংশ বলা উচিৎ নয়। কেন না তাঁরা আগে বিহারে ছিলেন না। চাকরী, ব্যাবসা ইত্যাদির সুত্রে নতুন এসেছেন। আসার পর কিছুদিন অব্দি চেষ্টা করেছেন চাকরী বদলে বা ট্রান্সফার নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে যাওয়ার। সবার পক্ষে সে সুদিন আনা সম্ভব হয় নি। একটা সময়ের পর তাঁরা বুঝতে শুরু করেছেন যে বিয়ে করতে হবে, সংসার করতে হবে বিহারবাসী হিসেবেই, কাজেই ব্যাংক থেকে লোন-টোন নিয়ে ফ্ল্যাট বা বাড়ি যা হোক, তৈরি করার চেষ্টা করতে হবে এখানেই। পরে কী হবে সে পরে দেখা যাবে। এঁদের মধ্যে বেশীর ভাগ মানুষ ভাষার সংকটের সম্মুখীন এখনো হননি, বিহার বাঙালী সমিতির নাম সেভাবে বিশেষ শোনেন নি, বাঙালীর আন্দোলন! সে আবার কী! গোছের ভাব। তবু, এদের মধ্যে থেকেও বিবেকবান যুবকেরা একটু একটু করে বুঝছেন বিহারে বাঙালী হওয়ার মানে, বাঙালী হওয়ার উত্তরদায়িত্ব।

শেষ করছি।

         না, সেই স্বর্ণযুগ আর নেই। নানা রঙের দিনগুলিও আর নেই। কিন্তু বিহারে বাঙালী আজ নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি পাওয়ার জন্য শ্রেণীদলমতনির্বিশেষে অন্ততঃ কিছুটা এক হতে পারছে, আন্দোলন করতে পারছে আর রাজনৈতিক সংখ্যাবিন্যাসে নিজেদের সংখ্যাটা গোনাতে শিখছে। আশা করা যায় ভাষা-সংস্কৃতি-সাহিত্যের সংস্থা ও অনুশীলনগুলোকে পুনর্জীবন দিতে পারবে এই বিবর্তিত বিহারী-বাঙালী। 



19 मई 1961 – मातृभाषा के लिए शहादत का एक अध्याय

दक्षिण असम में स्थित बराक की घाटी के उत्तर में है उत्तरी काछार जिला के पहाड़ी इलाके, दक्षिण में हैं त्रिपुरा और मिजोरम के पहाड़, पूरब में मणिपुर एवं अंगामी नागा पहाड़ियाँ और पश्चिम में बांग्लादेश का समतल… । मुख्य नदी है बराक, जिसकी दो शाखाएं – सुरमा और कुशियारा (उन दोनों की कई उपशाखाएं भी हैं) ने घाटी को तीन प्रशासनिक जिलों में विभाजित किया है – काछार, करीमगंज और हाइलाकांदी। बराक की घाटी अपने आप में कोई प्रशासनिक इलाके के रूप में चिन्हित नहीं है फिर भी इसकी भौगोलिक स्थिति इसे अलग चिन्हित कर देती है। असम की ब्रह्मपुत्र घाटी से इसका जुड़ाव या तो उत्तरी काछार पर्वतों के कठिन घुमावों से गुजरते हुए रेलमार्ग के माध्यम से है या मेघालय से गुजरते हुए उतने ही घुमावदार सड़क-मार्ग के माध्यम से है।

सिलचर शहर इस पूरे क्षेत्र का आर्थिक एवं सांस्कृतिक केन्द्र है। पूरी घाटी में बांग्लाभाषा बोलने वाली आबादी की बहुमत है। इनके अलावे यहाँ विभिन्न जनजातीय आबादी भी मौजूद हैं। ऐतिहासिक तौर पर, यह क्षेत्र अविभाजित बंगाल का हिस्सा था एवं इसका अधिकांश भाग सिल्हट जिला में पड़ता था जो अभी बांग्लादेश में है।

भारत के किसी भी राज्य में या केन्द्रशासित क्षेत्र में भाषाई अल्पसंख्यकों को किस प्रकार की सरकारी मान्यता मिलेगी एवं क्या उनके अधिकार होंगे इस बारे में भारत का संविधान बिल्कुल स्पष्ट है। तदोपरान्त, यहाँ एक क्लास-रुम मॉडल (यानि कक्षा में पाठ समझाने हेतु दिखाया जाने वाला रूप) मौजूद है जहाँ भाषाई राज्य की अवधारणा के अनुसार प्रधान भाषाभाषी (असमिया) ब्रह्मपुत्र घाटी में बहुमत में है और अल्पसंख्यक भाषाभाषी (बांग्ला) बराक घाटी में बहुमत में है। अगर गोआलपाड़ा या बरपेटा के छोटे शहर या गाँव में बसे कुछेक बांग्लाभाषी परिवारों की बात होती तो उनके भाषाई अधिकार या अस्मिता की रक्षा, सरकार की ओर से सकारात्मक पक्षपाती हस्तक्षेप या मदद पर निर्भर करता। लेकिन यहाँ, बराक घाटी में, सरकार को सिर्फ, जनता द्वारा स्थापित, दशकों पुराने, सांस्कृतिक/ शैक्षणिक ढाँचे को बाधित नहीं करना था या ध्वस्त नहीं करना था।  

लेकिन एक के बाद एक बनी असम की सरकारों ने ठीक यही किया। वह भी क्यों? इस क्षेत्र के नहीं, ब्रह्मपुत्र एवं दूसरे क्षेत्र की असमिया आबादी को वोट-बैंक बना कर अपनी झोली में भरने के लिए। राजधानी में पूंजीवादी अवसरवाद का मंत्र बना “असम असमिया बोलने वालों के लिए, बाकी भाड़ में जाए” ! विधान सभा में एवं सड़कों पर इसी मंत्र के अनुसार काम करने के लिये पूरे प्रशासनिक तंत्र को झोँक दिया गया।

बराक की जनता हर बार इन प्रशासनिक तिकड़मों का विरोध करती रही। उनके एकजुट विरोध के कारण केन्द्र से प्रधान मंत्री, गृह मंत्री एवं अन्य राज्य के मुख्यमंत्रियों को आना पड़ा सिलचर, जनता को आश्वस्त करने के लिए कि उनकी भाषाई अस्मिता की बलि नहीं चढ़ाई जाएगी। जब तक उनके हेलिकॉप्टर राजधानी में वापस उतरते थे यहाँ, राज्य में विपरीत धारा बहा दी जाती थी। सब आदि हो चुके थे इन बातों के।

19 मई 1961 को सिलचर में, सरकार द्वारा किए गए एक नये भाषाई हमले के खिलाफ सत्याग्रह का कार्यक्रम तय था। सुबह चार बजे से सिलचर रेलस्टेशन में सत्याग्रहियों की भीड़ आने लगी थी क्योंकि पाँच बजे खुलने वाली पहली गाड़ी को रोकना था। धूप चढ़ते चढ़ते सत्याग्रहियों की संख्या 3000 हो गई। पुलिस ने उन्हे हटाने के लिये लाठीचार्ज किया, कई गिरफ्तार किये गए। लेकिन सत्याग्रही डटे रहे। पुलिस द्वारा बीच बीच में लाठीचार्ज चलता रहा। दोपहर तक 20,000 सत्याग्रही जमा हो गये। बारह बजे अचानक सब कुछ शांत हो गया। लोग कहते हैं कि एक साजिश को अंजाम दिया जा रहा था – स्थानीय पुलिस थाने में एक झूठा एफ॰ आई॰ आर॰ दायर किया गया कि भीड़ ने पुलिस से एक बन्दूक (!) छीन ली है। …

खैर, सब लोग शांत थे। यहाँ तक कि कुछ लोग जो सुबह से बैठे सत्याग्रहियों के लिये खाना लेकर आए थे, पुलिस को भी खिला रहे थे। अचानक ढाई-तीन बजे ताबड़तोड़ गोलियाँ चलने की आवाज आई। गोलियाँ पीछे के तरफ से स्टेशन पर बैठे सत्याग्रहियों पर चलाई जा रही थी। लोग लुढ़क रहे थे, भाग रहे थे स्टेशन के उस पार, जल्ले की ओर। जल्ले में छलांग लगा रहे थे गोलियों से या लगी गोली की जलन से बचने के लिए। बाद में उस जल्ले से भी लाशें मिलीं।

सरकार की ओर से तो लीपापोती होनी ही थी। एक गैर-सरकारी जाँच आयोग ने इस पूरे घटनाक्रम की जाँच की थी। उस जाँच आयोग ने प्रतिवेदन में लिखा कि दो तरफ से गोलियाँ चलाई जा रही थी ताकि कोई भाग नहीं पाए।

सैंकड़ों इस गोलीकांड में घायल हुए। जिन इग्यारह मातृभाषा-योद्धाओं ने अपने प्राणों का बलिदान दिया उनके नाम निम्नलिखित हैं:

शचीन्द्रमोहन पाल, चन्डीचरण सुत्रधर, हितेश विश्वास, तरणि देवनाथ, कुमुद रंजन दास, सुकोमल पुरकायस्थ, सुनील दे सरकार, सत्येन्द्र कुमार देव, विरेन्द्र सुत्रधर, कानाईलाल नीयोगी एवं कमला भट्टाचार्य।

गौर करने की बात है कि वर्ष 1961 गुरुदेव रवीन्द्रनाथ ठाकुर का जन्मशतवर्ष था एवं उसी मई महीने में दस दिन पहले लोग रवीन्द्रजयन्ती मनाये थे। अगर रवीन्द्रपक्ष (रवीन्द्रजयन्ती कई जगह पन्द्रह दिनों तक मनाया जाता है) का हिसाब लें तो 19 मई की तारीख रवीन्द्रपक्ष के अन्तर्गत होती है। और उन्ही की भाषा को गोलियों और संगीनों से लहुलुहान किया गया।

हम जरूर याद रखें कि अपनी मातृभाषा के अधिकारों के लिये संघर्ष देश की अखण्डता एवं जनतंत्र को मजबूत करने के लिये होता है। जो सरकार या जो ताकत इन अधिकारों के खिलाफ होती है वह देश की अखण्डता और जनतंत्र को क्षति पहुँचाती रहती है।

(विशद में जानने के लिए नीचे दिये गये लिंक पर क्लिक करें)

https://web.archive.org/web/20131229042659/http://www.unishemay.org/english-pages/lang-content/NCChatterjee.pdf