Monday, November 20, 2017

উদ্যমিতার সন্ধানে

অঁত্রপ্রেনিওর বা এন্ট্রপ্রেনিওর শব্দের মানে দেখলাম ‘ব্যবসায়ে যে ঝুঁকি নেয় বা তার পরিচালনার ভার গ্রহণ করে’। কিন্তু এন্টারপ্রাইজ শব্দের মানে পেলাম উদ্যম। চলন্তিকায় উদ্যম শব্দের অর্থ দেওয়া আছে ‘উদ্যমশীল, উদ্‌যোগী, চেষ্টাবান’। অর্থাৎ, মনে হচ্ছে স্পষ্টভাবে, যে ‘ব্যবসায়ে ঝুঁকি নেয় বা তার পরিচালনার ভার গ্রহণ করে’ তার জন্য উদ্যমী শব্দের প্রয়োগ বাংলায় নেই, বা ছিল না (নাকি এখন হয়েছে কিন্তু বাংলার বাইরে থাকি বলে জানিনা!)। অবশ্য না হলেই বা ক্ষতি কী? উদ্যম তো এখন আর শুধু ব্যবসা বা শিল্পবাণিজ্যের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়!
তাহলে কী বলি? শিল্পোদ্যমী? শিল্পোদ্যোগী? তাও তো হবেনা! ব্যবসাবাণিজ্যের ক্ষেত্রেও তো উদ্যমী হয়! আর এখন তো উদ্যমী শব্দটাকে ব্যাপক অর্থ দিয়েছে সরকার (সে কথায় যথা সময়ে আসব)। কাজেই শেষ পর্য্যন্ত উদ্যমী শব্দটাই গ্রহণ করলাম। আপাততঃ এর প্রয়োগ এখানে শিল্প (ইন্ডাস্ট্রি অর্থে) ও ব্যবসাবাণিজ্যের ক্ষেত্রে সীমিত রাখছি।  

আমি জানিনা মনের মধ্যে যে প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে সেগুলোর উত্তর খুঁজতে কীভাবে এগোনো উচিৎ। বিষয়টা আমার জন্য এতটাই নতুন যে ভারতে উদ্যমিতার এবং উদ্যমী মানসিকতার বিকাশের অধ্যয়নে কোথায় কত কাজ হয়েছে বা হচ্ছে তা আমি জানিনা। তবে এখন বিষয়টা ধরার পর অন্তর্জাল ঘাঁটতে ঘাঁটতে যে সামগ্রীগুলো পাচ্ছি সেগুলোই আমার পাথেয়। নিঃসন্দেহে উদ্যমী মানসিকতা আমি পছন্দ করি, শ্রদ্ধা করি উদ্যমীদের, হয়ত কিছুটা রোমান্টিকতাও আছে উদ্যমী মানসিকতা নিয়ে।… দেখা যাক!

মাথায় সবচেয়ে আগে ঘুরতে থাকে ভারতের সেই আদিবুড়ো, দাদাভাই নওরোজি সাহেবের কথাগুলো। ‘পভার্টি অ্যান্ড আনব্রিটিশ রুল’ বইটার ছত্রে ছত্রে বার বার, আগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও পরে ব্রিটিশ শাসনের কুকীর্তির হিসেব দিতে গিয়ে, যখনি আর্থিক বঞ্চনা ও লুন্ঠনের পরিণতি সম্পর্কে সাবধান করেছেন, রক্ত-নিংড়ে-শরীর-সাদা-করে-দেওয়া আর্থিক ক্ষয় ও উৎপাদন-ক্ষমতার ক্ষয়ের সাথে নৈতিক ক্ষয়, মানসিক ক্ষয়ের কথা বলেছেন। নিজের যুক্তি সাজাতে দক্ষ আইনজীবীর মত তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে ইংরেজদেরই দাঁড় করিয়ে সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করেছেন। সেই সমস্ত উদ্ধৃতির এখানে কোনো প্রয়োজন নেই। বইটার প্রধান বক্তব্যগুলো সবাই জানেন। যে দুর্নীতিপরায়ণ প্রশাসন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে কায়েম করেছিল, পরে প্রত্যক্ষতঃ ব্রিটিশ শাসনাধীন হওয়ার পরেও সেই প্রশাসনে, পুলিসে ও বিচারব্যাবস্থায় দুর্নীতি ও অবিচার, অন্ততঃ সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে একই রকম ছিল। আর সেই দুর্নীতিপরায়ণতা, নৈতিক অবক্ষয়, আত্মমর্যাদাশূন্য ঔপনিবেশিক বশম্বদতা ব্যাপকভাবে চারিয়ে গিয়েছিল দেশের উচ্চশ্রেণী, মধ্যশ্রেণী এবং আংশিক ভাবে, সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্খী প্রবৃত্তিগুলোর ভিতরে।
এই অপ্রাসঙ্গিক কথাটা এখানে হয়ত খুব বেশী অপ্রাসঙ্গিক হবেনা যে বৈবাহিক সম্পর্কস্থাপনে বরের গুণাগুণের প্রশংসায় ‘সরকারী চাকরীতে উপরী’র প্রসঙ্গটা সর্বাগ্রে রাখার জন্য হিন্দীভাষী এলাকার যে মানুষদের নিয়ে আমরা হাসাহাসি করি, আমরা বাঙালিরাও কিন্তু একসময়, বা কে বলতে পারে, হয়ত আজও, তাদেরই সমকক্ষ ছিলাম!… ‘সরকারি চাকরি’, অর্থাৎ ব্যাবসায়িক উদ্যমিতাকে নিচু নজরে দেখা তো বাঙালিদের জাতীয় গুণ হিসেবে আগে থেকেই ছিল এবং এখনও আছে (মনীষীরা তা নিয়ে অনেক ভর্ৎসনা করেছেন), আর তার ‘উপরি’ অর্থাৎ ঔপনিবেশিক সাহেবের দেওয়া মদের খোঁয়াড়িটাও একসময় অনেক উচ্চবিত্ত (এবং কিছুটা মধ্যবিত্তও) বাঙালির পছন্দের স্বাদ ছিল।
এই দ্বিতীয় জিনিষটা বিগত সাতাশ বছরের অর্থনীতি, বিশেষ করে ওপরমহলে আরো বাড়িয়েছে। দু’দশকের রাজনৈতিক উথালপাথালে খুব গুরুত্বপূর্ণ যে সামাজিক জ্ঞানটা সাধারণ মানুষ হাসিল করেছে সেটা হল, সমাজের মাথা ও হোতাগুলো, যাঁরা আগে শ্রদ্ধেয়/মাননীয় ছিলেন, দুর্মূল্য হতে পারেন, অমূল্য নন কেউই! এমনও জজসাহেবের কথা লোককে বলতে শুনেছি, অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস দেওয়ার জন্য পঞ্চাশ হাজারে কথা হয়েছিল, পরে টাকা গুনতে গিয়ে দেখেন পঁয়তাল্লিশ হাজার, রাগে দশ বছরের সাজা থেকে আট বছর বাদ দিলেও, দু’বছর রেখে দেন। নতুন অর্থনীতির জমানায় দুর্নীতি সাধারণভাবে বেড়েছে, কিন্তু সে প্রসঙ্গে যাওয়ার, এমুহুর্তে কোনো প্রয়োজন নেই। আর সরকারি চাকরি? সবাই জানেন যে নানা কারণে (স্থায়ীত্ব, কাজের লঘু চাপ, বেশি মাইনে) ক্যাম্পাস/প্লেসমেন্ট/প্যাকেজের তাৎক্ষণিক নেশায় মেতে ওঠা নতুন প্রজন্ম এবং তাঁদের অভিভাবকদের কাছে ২০০৮এর বেশ আগে থেকেই ‘সরকারি চাকরি’ বেশি মূল্যবান হয়ে উঠতে শুরু করেছে আবার থেকে।

যা হোক, উপরোক্ত ঔপনিবেশিক পরিস্থিতিতে উদ্যমীর জন্মের সন্ধান করতে যাওয়ার আগে একটু ভেবে নিই যে উদ্যমী কাকে বলব। সবাই জানেন যে শব্দটার অর্থ বিগত তিনশো (মোটামুটি) বছরে ধীরে ধীরে পাল্টেছে, এবং শেষ একশো বছরে, একচেটিয়া পূঁজির আধিপত্য উদ্যমীর বিকাশের কন্ঠরোধ করার পর দ্রুত পাল্টেছে। উইকিপিডিয়ায় দেখলাম ১৯৯২ সালে নতুন শব্দও তৈরি করতে হয়েছেঃ ইন্টার-প্রেনিওর। ‘কর্পোরেট’ মহালের যে কর্মচারীটি একটি নতুন আইডিয়া দিয়ে তাকে কার্যে পরিণত করার ঝুঁকি নেয়! আবার ভারত সরকার এদিকে তার একটি ওয়েবসাইটে উদ্যমীদের আট ভাগে ভাগ করেছে – বিজনেস অন্ত্রপ্রেনিওর, সোশ্যাল অন্ত্রপ্রেনিওর, ট্রেডিং অন্ত্রপ্রেনিওর, ইন্ডাস্ট্রিয়াল অন্ত্রপ্রেনিওর, কর্পোরেট অন্ত্রপ্রেনিওর, এগ্রিকালচারাল অন্ত্রপ্রেনিওর, টেকনিক্যাল অন্ত্রপ্রেনিওর, নন-টেকনিকাল অন্ত্রপ্রেনিওর।১   
এটা স্পষ্ট যে ‘ঝুঁকি’টা সাধারণ বৈশিষ্ট। নিশ্চিন্ত জীবন, নিশ্চিত আয়ের জগৎ স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে উদ্যমী ঝুঁকি নেয় – নতুন আইডিয়া মাথায় নিয়ে কার্যে পরিণত করতে এগোয়, নিশ্চিত দামে কাঁচামাল ও শ্রম কিনে নতুন মাল তৈরি করে অনিশ্চিত বাজারে অনিশ্চিত দামে বিক্রি করতে এগোয়, জানা বাজার থেকে মাল কিনে অজানা বাজারে অথবা অজানা বাজার থেকে মাল কিনে জানা বাজারে বিক্রি করতে এগোয়, এখনকার এন.জি.ও.র রমরমায় সরকারি স্কীমগুলো সফল করতে এগোয় – নতুন আইডিয়া নিয়ে খেলা করে, দুঃসাহস দেখায় ইত্যাদি, ইত্যাদি। এমনকি দুঃসাহসিক অভিযানেও যায়, ভাগ্যে থাকলে নতুন দেশও আবিষ্কার করে ফেলে। একটা মজার পরিভাষা পেলাম, পরিভাষাকার বেনামী। দেখলাম গবেষকদ্বয় উদ্ধৃত করেছেন, “উদ্যমিতা মানে তোমার জীবনের কয়েকটি বছর এমনভাবে কাটানো যেমনভাবে অধিকাংশ মানুষ কাটাতে চাইবেনা, যাতে তোমার বাকী জীবন এমনভাবে কাটাতে পারো যেমনভাবে অধিকাংশ মানুষ কাটাতে পারবেনা”! জিওঃ! কী দারূণ পরিভাষা! সত্যি বলতে, উদ্যমীর স্বপ্ন তো এটাই! কিন্তু, সত্যিই কি এটাই উদ্যমিতা?২  

এটা ঠিক যে উদ্যমীদের নিয়ে আমাদের সমাজে নেতিবাচক চিন্তাভাবনা একটু বেশি ছিল। তার কারণের একটা পারম্পরিক দিক যেমন ব্যাবসায়ীদের প্রতি শিক্ষিত সমাজের মানুষজনের হেয় দৃষ্টি - যার সাথে বিংশ শতকের সমাজবাদী চিন্তাভাবনা (ওই শিক্ষিত সমাজের একদেশদর্শিতার সাথে) বেশ খাপ খেয়ে গেল -আরেকটা দিক কিন্তু ভারতের ঔপনিবেশিক এবং উপনিবেশ-পরবর্ত্তী পরিবেশে খোদ ব্যবসায়ীদের ফুলেফেঁপে ওঠার বাস্তব কাহিনীগুলো (যার কিছু অংশ ওই হেয়দৃষ্টিজনিত কল্পনা হলেও অনেকটাই সত্য)। একটা উদ্ধৃতি দিচ্ছি, আমার কথার সমর্থনে ঠিক নয়, কিন্তু ভাবনাচিন্তা যে চলছে সেটা দেখাতে।
“ভারতকে নিয়ে লেখা বেশির ভাগ ইতিহাসে ব্যাবসায়ী এক অস্পষ্ট আকৃতি। অংশতঃ এটা খোদ ইতিহাসবিদদের পটভূমির প্রতিফলন, কেননা অধিকাংশ ইতিহাসবিদ ব্রাহ্মণ, কায়স্থ এবং অন্যান্য তথাকথিত লেখনকর্মে নিযুক্ত সমুদায়ের মধ্যে থেকে এসেছেন। বেশি রকম ইংরেজি-শিক্ষিত এই সামাজিক স্তরটির জন্য বৈশ্য বা বানিয়াকে নিচু চোখে দেখা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। রাজনীতির প্রাচীন বিদ্বান কৌটিল্যও তো নিজের ‘অর্থশাস্ত্রে’ এই ব্যাবসায়ীদের ‘নামে না হলেও কাজে চোর’ বলে গেছেন।… তার ওপর কম্পানি বাহাদুরের শুরুয়াতি দিনগুলোর দিনলিপি-রাখিয়েদের চোখেও ব্যাবসায়ীদের জাগতিক কাজকর্মগুলো রাজাদের বৈভব ও শৌর্য কিম্বা পন্ডিতদের জটিল আঁক কষার ক্ষমতার তুলনায় কম দৃষ্টি আকর্ষণ করত। এই উদাসীনতা জোর পেল জাতীয় আন্দোলনের সময়ঃ বানিয়াদের সুদখোর হিসেবে, কৃষকদের শোষণ এবং দুর্দশার জন্য দায়ী ঔপনিবেশিক যন্ত্রের অঙ্গ হিসেবে দেখা হতে লাগল। স্বাধীনতা-পরবর্ত্তী নেহরুবাদী রাষ্ট্র কর্ত্তৃক পূঁজিপতি-বিরোধী ভাবনাগুলোর সুবিধেবাদী লালনপালন, সামাজিক স্তরভেদের পারম্পরিক চিন্তাধারার সাথে খাপ খেয়ে ব্যাবসায়ীর নেতিবাচক স্টিরিওটাইপ তৈরি করল, যদিও বলা যাবেনা যে সেটা পুরোপুরি অসঙ্গত ছিল।”৩

আর সত্যিকারের উদ্যমিতা, ইয়োরোপে আমেরিকায় পূঁজিবাদের ধ্রুপদী বিকাশপথে যেভাবে দেখা দিয়েছিল, সেভাবে তো ভারতে কখনোই দেখা দেয়নি! আজও দেখা দেয়নি! আবার একটা ঈষৎ দীর্ঘ উদ্ধৃতি দেওয়ার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
“যদি আপনারা যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পপতিদের সূচীটার দিকে তাকান, দেখবেন হেনরি ফোর্ডের নামে ১৬১টা ইউএস পেটেন্ট রয়েছে, চার্লস গুডইয়ার ভাল্কানাইজড রাবার আবিষ্কার করেছিলেন, এলি হুইটনি জিন [কাপড়কলের] আবিষ্কার করেছিলেন। সাইরাস ম্যাককর্মিক রীপার আবিষ্কার করেছিলেন। এবং এঁরা সবাই সেই সময়েই মিলিয়নেয়ার হয়েছিলেন। তারপর দেখুন জর্জ ওয়েস্টিংহাউজ, যিনি রেলওয়ের এয়ারব্রেক আর বিদ্যুৎ প্রেরণে এসি প্রণালী আবিষ্কার করেন। স্যামুয়েল কোল্ট রিভল্ভিং কার্ট্রিজ সিলিন্ডারওয়ালা পিস্তল আবিষ্কার করেন। তারপর আছেন খোদ টমাস আল্ভা এডিসন। তেমনই আইজাক মেরিট সিঙ্গার। এমন নয় যে বিত্ত আর বাণিজ্যের লোকেরা একেবারেই ছিলেননা। জে পি মর্গানেরা ছিলেন, কার্নেগিরা ছিলেন। কিন্তু আসল কথা হল যে [পূঁজিবাদের বিকাশটা] মূলতঃ উৎপাদকদের নেতৃত্বে হয়েছিল আর একটা সংস্কৃতি ছিল নতুন কিছু প্রবর্তনের। যখন নাকি ভারতে সেটা হয়নি। প্রধানতঃ বণিকেরা এখানে পূঁজিবাদের বিকাশে নেতৃত্ব দিয়েছে। সেটাও একটা বড় কারণ যে এখানে এই বিকাশ আমাদের বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেনা। যদি উৎপাদকের নেতৃত্বে উদ্যমিতার ভারতে শুরু করেন, হয়ত কোয়েম্বটুরে খুঁজে পাবেন – যেমন জি ডি নাইডু! এমনকি কোয়েম্বটুরেও বেশি লোকে ওনাকে চেনেনা, যদিও এক উল্লেখযোগ্য মানুষ ছিলেন তিনি। তিনি ভারতের প্রথম ইলেক্ট্রিক মোটর এবং আরো কিছু বাছা বাছা নতুন জিনিষের প্রবর্তন করেছিলেন। বা, লুধিয়ানার রামগড়িয়াদের দেখুন, বাটালায় তাদের অনেকগুলো ফাউন্ড্রি আর মেশিন টুল শপ ছিল। কিন্তু এরা সবাই অত্যন্ত প্রান্তিক মানুষ। উৎপাদনের পথে বড় ব্যাবসায়ী হয়ে ওঠা একমাত্র নাম কির্লোস্করেরা, অথবা শেষাসেয়ীরা। নইলে সাধারণভাবে বণিকদের নেতৃত্বে এদেশে পূঁজিবাদের বিকাশ ঘটেছে।”৪

এটা ইতিহাস, বদলানো যাবেনা। প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগের ভারতে পূঁজিবাদের বিকাশ, বড় বড় বণিক ও ব্যাঙ্কাররা থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্যিক-পূঁজির স্তরেই কেন রয়ে গেল, কেন ম্যানুফ্যাকচারিং-পূঁজির (‘কারখানা-পূঁজি’ বলা যাবে কি?) জন্ম দিতে পারল না, এ নিয়ে দেশী-বিদেশী সমাজবিজ্ঞানীরা অনেক গবেষণা করেছেন, আর তার কারণ তাঁরা যাই পেয়ে থাকুন না কেন, ইতিহাসটা আবার থেকে তৈরি করা যাবেনা। প্রশ্ন এটাই, ঔপনিবেশিক পরিবেশ ভারতে উদ্যমিতার বিকাশের না হয় গতিরোধ করেছিল। স্বাধীনতা-পরবর্ত্তী অর্থনীতিতে উদ্যমিতার বিকাশের জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হল। ১৯৯১এর পর যে নতুন অর্থনীতি এল তা কি সত্যিই, যেমন অনেকে বলেন, উদ্যমিতার বিকাশে কোনো নতুন জোয়ার নিয়ে এল? আর তাহলে আজকের পরিস্থিতিটা কী।

২
          আগে দেখা যাক, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক গৃহীত শিল্পনীতি প্রস্তাব ও বক্তব্যগুলোতে অন্ত্রপ্রেনিওর শব্দটির ব্যবহার কবে কবে এবং কোন কোন প্রসঙ্গে হয়েছে।
১- In the past, there has been a tendency to proliferate schemes, agencies and organisations which have tended more to confuse the average small and rural entrepreneur than to encourage and help him.... Under the single roof of the District Industries Centre, all the services and support required by small and village entrepreneurs will be provided.
... To guide entrepreneurs, Government will issue a revised illustrative list of industries where no foreign collaboration, financial or technical, is considered necessary since indigenous technology has fully developed in this field. 
A number of units have been set up in joint ventures in many developing countries by Indian Entrepreneurs in collaboration with local associates. At the present stage of the country’s industrial development, substantial export of capital from India will neither be feasible nor desirable. The contribution of the Indian entrepreneur to the joint ventures abroad shall, therefore, have to be mainly in the form of machinery and equipment, structurals and also technical know-how and management expertise.
If the objectives of the new Industrial Policy of accelerating the pace of industrial growth, rapid increase in levels of employment, productivity and income of industrial workers and a wide dispersal of small and village industries have to be achieved, the willing co-operation of industrial worker, trade unions, managers, entrepreneurs, financial institutions and various governmental authorities responsible for implementing schemes of assistance will be essential.
INDUSTRIAL POLICY STATEMENT, 23rd December, 1977
২- ...Small is beautiful only if it is growing just as the phased manufacturing programme with a view to reducing reliance on imported components and material structure, a carefully worked out time bound programme for greater ancillarisation in certain industries will contribute considerably towards dispersal of industry and growth of entrepreneurship.
...The enhancement of the limit in terms of investment in plants and machinery will also help genuine small scale units particularly those being set up by young and technically qualified entrepreneurs, to come up.
... One of the major constraints to the growth of decentralised sector has been the difficulties of finance experienced particularly by industrial entrepreneurs in small, cottage and rural sector.
INDUSTRIAL POLICY STATEMENT July, 1980
৩- ...An exercise will be undertaken to identify locations in rural areas endowed with adequate power supply and intensive campaigns will be launched to attract suitable entrepreneurs, provide all other inputs and foster small scale and tiny industries.
...In order to widen the entrepreneurial bases the Government would lay particular emphasis on training of women and youth under the Entrepreneurial Development Programme. A special cell would be established in MSME-DO and State Directorates of Industries to assist women entrepreneurs.
...While the Government will continue to examine large projects in view of resource constants, decisions in respect of medium sized investments will be left to the entrepreneurs.
...For the import of Capital Goods, the entrepreneur would have entitlement to import upto a landed value of 30% of the total value of plant and machinery required for the unit.
In respect of transfer of technology, if import of technology is considered necessary by the entrepreneur, he can conclude an agreement with the collaborator, without obtaining any clearance from the Government, provided that royalty payment does not exceed 5% on domestic sales and 8% on exports. If, however, lumpsum payment is involved in the import of technology, the proposal will require Government clearance, but a decision will be communicated to the entrepreneur within a period of 30 days.                                                           
INDUSTRIAL POLICY 1990
৪- In 1956, capital was scarce and the base of entrepreneurship not strong enough. Hence, the 1956 Industrial policy Resolution gave primacy to the role of the State to assume a predominant and direct responsibility for industrial development. 
...New growth centres of industrial activity had emerged, as had a new generation of entrepreneurs. A large number of engineers, technicians and skilled workers had also been trained.
...Government will continue to pursue a sound policy framework encompassing encouragement of entrepreneurship, ...
...Industrial Policy Resolution of 1956 identified the following three categories of industries: those that would be reserved for development in the public sector, those that would be permitted for development through private enterprise with or without State participation, and those in which investment initiatives would ordinarily emanate from private entrepreneurs.
...Major policy initiates and procedural reforms are called for in order to actively encourage and assist Indian entrepreneurs to exploit and meet the emerging domestic and global opportunities and challenges. The bedrock of any such package of measures must be to let the entrepreneurs make investment decisions on the basis of their own commercial judgement. ... Government policy and procedures must be geared to assisting entrepreneurs in their efforts.
...Further impetus must be provided to these changes which alone can push this country towards the attainment of its entrepreneurial and industrial potential.
...The exemption from licensing will be particularly helpful to the many dynamic small and medium entrepreneurs who have been unnecessarily hampered by the licensing system.
...The Indian entrepreneur has now come of age so that he no longer needs such bureaucratic clearance of his commercial technology relationships with foreign technology suppliers.
...Entrepreneurs will henceforth only be required to file an information memorandum on new projects and substantial expansions.
STATEMENT OF INDUSTRIAL POLICY New Delhi, July 24, 1991

অর্থাৎ, শিল্পনীতি প্রস্তাব ১৯৪৮, ১৯৫৬ এবং বক্তব্য ১৯৭৩ এ শব্দটি একবারও প্রযুক্ত হয়নি। মাঝারি, ছোটো, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিকাশ সংক্রান্ত অনেক কথা আছে কিন্তু অন্ত্রপ্রেনিওর শব্দটি নেই! কেন? চারটে কারণ ভাবা যেতে পারে।
১- পরম্পরাগতভাবে ব্যাবসা-বাণিজ্য করা সমুদায়গুলো, যথা পার্সি, গুজরাটি, মারোয়াড়ি ইত্যাদি (এবং আরো কিছু ছোটো ছোটো দক্ষিণী জনগোষ্ঠি সম্ভবতঃ), যাদের মধ্যে উদ্যমিতার বিকাশ ঘটাতে সরকারের তরফ থেকে উৎসাহ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই, তারা ছাড়া আর সমস্ত রাজ্য ও জনগোষ্ঠির কথা নীতি-রচয়িতাদের মাথায় ছিল না। এমনকি, মনে হয়, পাঞ্জাবী বা শিখদের কথাও মাথায় ছিল না, কেননা যদি থাকত, অন্ততঃ দেশভাগের ফলে ছিন্নমূল হয়ে চলে আসা মানুষদের কথা ভেবে উৎসাহ প্রদানের কথা থাকত (বাঙালিদের কথা মাথায় রাখার তো প্রশ্নই ওঠেনা, কেননা সেটা বাঙালি ভাবুকদের মাথায়ও হয়ত ছিল না)। এবং হয়তো উদ্যমিতার পরিভাষায় তখন অব্দি শুধু কিছু ঝুঁকি-পূঁজি (ভেঞ্চার ক্যাপিট্যাল) হাতে বণিক সমূদায়ের যুবরা ছিল, চাকরি ছাড়া অন্য কিছু করে খেতে চাওয়া, পরিবারের অবলম্বন হতে চাওয়া যুবদের শামিল করতে পারার মত প্রসারিত হয়নি। 
২- নতুন উদ্যমিতা, প্রযুক্তিজ্ঞান-নির্ভর উদ্যমিতা, কারিগরীকুশল গিল্ডমাস্টার-ধরণের উদ্যমিতার কথা ভাবার সময় তখনও আসেনি, কেননা যে সীমিত সংখ্যায় তারা এই সদ্য-স্বাধীন দেশে ছিল তাদেরকে দেশে ধরে রাখা এবং সরকারি ক্ষেত্রে নেওয়া বিশাল পরিকল্পনাগুলির কর্মযজ্ঞে তাদেরকে শামিল করাটা, প্রথম ও একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়াই ছিল স্বাভাবিক। আই.আই.টি.গুলো থেকে যন্ত্রবিদ এবং প্রযুক্তিবিদদের নতুন প্রজন্ম ষাটের দশকের প্রথম দিকে বেরুনো শুরু হয়ে থাকবে। তাছাড়া সাধারণভাবেও তখন ১৯৫৬র শিল্পনীতি অনুসারে ‘আরো, আরো বেশি চাকরি-সৃজন’ (জেনারেশন অফ মোর অ্যান্ড মোর এমপ্লয়মেন্ট) এর জমানা।
৩- বাকি রইল খাদি, হস্তচালিত তাঁত, নানারকম কুটিরশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার সরকারি সংকল্পের বুলি; সেটা তো ছিলই। সেগুলোর প্রমোশনের জন্যও উদ্যমিতার বিকাশের কথা বলার প্রয়োজন তখনও অব্দি অনুভূত হয়নি।
৪- উদ্যমীদের জন্য জরুরী, বড় শহরের প্রান্তে, ছোটো শহরে বা জনপদে নিয়মিত বিদ্যুৎএর ব্যবস্থা, বড় সরকারি পরিকল্পনাগুলোর ফল হিসেবে সম্ভাবিত ছিল, কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি৫।

তারপর থেকে শিল্পনীতি সংক্রান্ত বক্তব্যে ১৯৯১ অব্দি সাকূল্যে আঠাশ বার শব্দটি প্রযুক্ত হয়েছে। অন্ত্রপ্রেনিওর শব্দের প্রথম উল্লেখ করল কেন্দ্রের প্রথম অকংগ্রেসী সরকার, জনতা পার্টির সরকার। ১৯৭৭এর ডিসেম্বরে গৃহীত এই শিল্পনীতি বক্তব্যে উদ্যমী-প্রসঙ্গের তিনটে দিক আছে। প্রথমতঃ বলা হচ্ছে যে উদ্যমীদের সম্পর্কে এতদিনকার (১৯৪৮-১৯৭৭) নীতি বিভ্রান্তিমূলক ছিল; সেসব বিভ্রান্তি দূর করে নীতিগুলো সহজ করা হবে এবং উদ্যমীদের একই ছাতের নীচে সব সুবিধে পাইয়ে দেওয়ার জন্য জেলা শিল্প কেন্দ্র গঠিত করা হবে। দ্বিতীয়তঃ, তাদেরকে সূচী দেওয়া হবে যে কোন কোন শিল্পে বিদেশী লগ্নীর কোনো প্রয়োজন নেই এবং একই ভাবে যেসব উদ্যমীরা অন্যান্য বিকাশশীল দেশে যৌথ উদ্যোগে কাজ করছে, তারা বিদেশে কারিগরী, যন্ত্রাদি এসব নিয়ে যেতে পারবে কিন্তু পূঁজি নয়, কেননা মহার্ঘ্য বিদেশী পূঁজির প্রয়োজন এদেশে এখন বেশি (এ কথাটা উদ্যমীদের জন্য না হয়ে কংগ্রেসের অপপ্রচারের জবাব দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল মনে হয়)। তৃতীয়তঃ, শিল্পের অগ্রগতি ও প্রসারের জন্য যে শিল্পনীতি প্রয়োজন তাতে শিল্পশ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়ন, ম্যানেজার, অন্ত্রপ্রেনিওর ইত্যাদি সবাইকার সহযোগিতা প্রয়োজন (এ কথাটাও উদ্যমীদের জন্য ততটা নয় যতটা নতুন শ্রমিকনীতি গ্রহণের প্রস্তুতি, যা পরে শিল্প সম্পর্ক বিল হিসেবে দেখা দিয়েছিল, যদিও গ্রহণ করতে পারেনি সরকার)। 
দ্বিতীয়বার অন্ত্রপ্রেনিওর শব্দের উল্লেখ দেখতে পাচ্ছি অব্যবহিত পরে – ১৯৮০তে কংগ্রেস সরকার ফিরে এলে পর, জুলাই ১৯৮০তে। একটা প্রচ্ছন্ন ধ্যাঁতানি আছে এতে, উদ্যমীদের ওকালতি যারা করছিল আগের সরকারে, তাদের জন্য। ‘অ্যান্সিলিয়ারাইজেশন’ শব্দটি প্রয়োগ করে বুঝিয়ে দেওয়া হল যে উদ্যমীদের জন্য ইকনমিক স্পেস প্রথমতঃ, শুধু মাত্র বড় শিল্প বা প্রজেক্টের অ্যান্সিলিয়ারী বা সহযোগী হিসেবেই দেখছে সরকার, তার বাইরে নয়। অন্যদিকে একটি ইতিবাচক সতর্কতাবাণী দেওয়া হল যে কম্পোনেন্ট আমদানী করে এখানে মালটা ইস্ক্রু কষে খাড়া করে দেওয়াটায় বিশেষ উদ্যমিতা নেই। দ্বিতীয়তঃ, আগের সরকারকে টেক্কা দিতে, ছোটো শিল্পের জন্য প্ল্যান্ট আর মেশিনারির ক্ষেত্রে লগ্নীসীমা বাড়াবার আশ্বাস দেওয়া হল, আর তৃতীয়তঃ, লঘু ও কুটির শিল্পের জন্য একটু চোখের জল ফেলা হল যে তারা ঠিকমত আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেনা।
এবার শিল্পনীতি, মে ১৯৯০। আবার অকংগ্রেসী, ন্যাশনাল ফ্রন্ট সরকার। লোকের কথায়, ক্রাচে ভর দিয়ে চলা সরকার, কেননা একদিকে কম্যুনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী)র সমর্থন অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টির সমর্থন। প্রধানমন্ত্রী ভি.পি.সিং। দুর্বল সরকার – রামরথযাত্রী আদবানিকে বিহারে মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ গ্রেপ্তার করালেন, ভাজপা সমর্থন প্রত্যাহার করল, সরকার পড়ে গেল দেড় বছরের মাথায়। অথচ, উদ্যমিতার বিকাশ নিয়ে প্রথমবার কিছু স্পষ্ট চিন্তাভাবনা এই শিল্পনীতিতেই দেখা গেল।
প্রথম বার বলা হল যে সব গ্রামীণ এলাকায় যথেষ্ট বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে সেগুলো চিহ্নিত করে সেখানে উদ্যমীদের আকর্ষণ করার জন্য তীব্র প্রচারাভিযান চালানো হবে। সব রকম সহায়তা দেওয়া হবে ক্ষুদ্র ও ছোটো এককের বিকাশে।
আরো বলা হল মহিলা ও যুব উদ্যমীদের প্রশিক্ষিত করতে ‘উদ্যমিতা বিকাশ কর্মসূচী’ (অন্ত্রপ্রেনিওরশিপ ডেভেলাপমেন্ট প্রোগ্রাম) চালানো হবে। মহিলাদের উৎসাহিত করতে মন্ত্রালয়ে বিশেষ সেল তৈরি করা হবে।
বলা হল, অর্থের যোগানে চাপ থাকার কারণে বড় শিল্পের ওপর সরকারের নজরদারি থাকলেও মধ্যম শিল্প বা এককগুলোর স্বাধীনতা থাকবে নিজের ইচ্ছে মত কাজের ক্ষেত্র বাছার, অর্থাৎ, একটা নতুন ইকনমিক স্পেসকে স্বীকৃতি দেওয়া হল (যার একটা অংশ যেমন দেশের আর্থিক বিকাশের ফল, আরেকটা অংশ কিন্ত রাজীব গান্ধীর জমানার নির্বাধ আমদানীনীতি আর বিদেশের বাজার থেকে নেওয়া মহার্ঘ্য ঋণের ফল, যার পরিণতি তার কয়েক মাসের মধ্যেই চমকে দেবে দেশের জনতাকে)।   
এছাড়া পূঁজিগত মালের (ক্যাপিট্যাল গুডস) আমদানি প্ল্যান্ট ও মেশিনারির ৩০%এ বাঁধা হল। বলা হল রয়্যাল্টির ভুগতান রপ্তানির ৮%এ এবং দেশে বিক্রির ৫%এ থাকলে, প্রযুক্তি আমদানির (টেকনোলজি ট্রান্সফার) জন্য সরকারের কাছে পূর্ব-অনুমতি নিতে হবেনা। (ব্যালেন্স শীটের খেলা করার সুযোগ দেওয়া হল আর কি!)।
কিন্তু এই নীতিসমূহের ফল হল চমকপ্রদ। কার্যরত স্মল স্কেল ইউনিটস সম্পর্কে একটা পরিসংখ্যান পাচ্ছি যেটা বলছে, ১৯৭৩-৭৪ থেকে ১৯৮৯-৯০ অব্দি ষোলো বছরে এই ইউনিটসের সংখ্যার বার্ষিক গড় বৃদ্ধিদর ছিল ১০%। আবার ১৯৯১-৯২ থেকে ২০০৬-০৭ অব্দিকার ষোলো বছরে এই গড় বৃদ্ধিদর মাত্র ৪%। কিন্তু একমাত্র ১৯৯০-৯১ সালে এই বৃদ্ধি হল ২৭৩%! অবিশ্বাস্য! আমিও বিশ্বাস করছিনা পুরোপুরি। পুরো পরিসংখ্যানটা তাই উৎস-সহ দিলাম৬।
এরপর সেই জলদেয়াল! – ১৯৯১। কংগ্রেসের পুনরাগমন এবং নব-উদারবাদী অর্থনীতির সূচনা। আশ্চর্য! এবারও কংগ্রেসের শিল্পনীতি উদ্যমিতার বিকাশে নতুন কিছু করার প্রতিশ্রুতিহীন, শুধু অনুজ্ঞানীতি (লাইসেন্সিং পলিসি) আর আমলাতান্ত্রিক অনুমতির নীতি খতম করার নামে বেনোজল ঢোকানোর বন্দোবস্ত করা ছাড়া! হ্যাঁ, এটা গাওয়া আছে যে ১৯৫৬র শিল্পনীতির ফলেই উদ্যমিতার ক্ষেত্রে বিস্তার ঘটেছে; যেটা সর্বস্বীকৃত সত্য এবং ঐতিহাসিক তথ্য।

এই তথ্যগুলো দেখার পর কয়েকটা সিদ্ধান্তে তো পৌঁছোনো যেতেই পারে। প্রথমতঃ, উদ্যমীদের প্রসঙ্গ কেন্দ্রীয় সরকারের এজেন্ডায় প্রথম এনেছিল দেশের কংগ্রেস-বিরোধী রাজনীতির ধারা। খুব স্বাভাবিকভাবেই এই ধারার চিন্তায় দুটো বিপরীত দিক থেকে থাকবে – অতিদক্ষিণপন্থী, জনসঙ্ঘী, সাধারণভাবে সরকারিক্ষেত্র-বিরোধী চিন্তা এবং মধ্যবাম, লোহিয়াপন্থী-সমাজবাদী (যাই বলুন) মাঝারি ও ছোটোপূঁজি সমর্থক চিন্তা। দুটো দিকই পরিকাঠামো ও আধারগত নির্মাণের ক্ষেত্রে সরকারি একাধিকার এবং তার প্রতি চেম্বার অফ কমার্সগুলোর (যেগুলোর নেতৃত্ব একচেটিয়া ও বড় পূঁজির দখলে ছিল) সমর্থনকে একটা চুক্তি হিসেবে দেখছিল কি? জানিনা। এটুকু জানি যে সমর্থনটা ছিল। আর তাই কংগ্রেস অন্ততঃ ১৯৬৯ অব্দি ভারতের একচেটিয়া ও বড় পূঁজির একমাত্র পছন্দের দল ছিল। হতে পারে ১৯৬৯-পরবর্তী ঘটনাগুলোর প্রভাব একচেটিয়া ও বড় পূঁজির প্রচ্ছন্ন মদদ জনতা পার্টিকে যুগিয়েছিল আর প্রতিফলনও ১৯৭৭এর শিল্পনীতি সংক্রান্ত বক্তব্যে ছিল। সেদিকে যাওয়া বিষয়ান্তর হবে।
দ্বিতীয়তঃ, ১৯৫৬-৭৭এর দুই দশকে ‘আরো, আরো বেশি চাকরি-সৃজন’এর জায়গাগুলো সংপৃক্ত হয়ে আসছিল এবং বেকারির সংখ্যা সারা দেশেই ছিল ক্রমবর্ধমান। সেখানে তাদের জন্য বিকল্প-রোজগারের ব্যবস্থা হিসেবে উদ্যমিতার মানসিকতাকে উৎসাহিত করা সরকারের পক্ষে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল। এবং তার সম্ভাবনাও গড়ে উঠেছিল কাঠামোগত ও আধারগত নির্মাণের দুটি দশকে।
তৃতীয়তঃ, কংগ্রেস কখনোই, এমনকি ১৯৯১এর পরেও উদ্যমিতাকে উৎসাহিত করা এবং উদ্যমীদের সংরক্ষণ দেওয়ার ব্যাপারে ভাসা ভাসা প্রতিশ্রুতি দেওয়া ছাড়া স্পষ্টভাবে সচেষ্ট হয়নি। অন্যুন কয়েক কোটি ছোটো ব্যবসা, দোকানপাটের কথা যদি ছেড়েও দিই, একটু আগে যে পরিসংখ্যানটা পেলাম তার সুত্র ধরেই বলতে পারি যে ১৯৯১এ স্ট্রাকচারাল এডজাস্টমেন্টের নামে সরকারি ক্ষেত্রের সমস্ত শিল্প ও পরিসেবাকে ধীরে ধীরে জাহান্নামে পাঠানোর বন্দোবস্ত করে প্রাইভেট সেক্টরের জয়গানে মেতে থাকার পরেও ষোলো বছর (১৯৯১-২০০৭) ধরে স্মলস্কেল ইউনিটসের গড় বার্ষিক বৃদ্ধিদর ৪% কেন? এগুলো প্রাইভেট সেক্টর নয়? নাকি দেশী-বিদেশী একচেটিয়া পূঁজিই (তথাকথিত ‘কর্পোরেট’) শুধু সেই কিম্বদন্তীপ্রতীম প্রাইভেট সেক্টর? এটা ঠিক যে নতুন নীতি ও নতুন প্রযুক্তি বিস্ফোরণ ‘স্কেল’টাই আমূল বদলে দিয়েছিল (আন্তর্জালিক দুনিয়ায় এখন দুই-তিন বন্ধুর সামান্য পূঁজি লাগিয়ে শুরু করা ব্যবসা, বাজার ধরলে দশ বছরে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে প্রতিদিন), কিন্তু পুরোনো উদ্যমীদের, তাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মচারিদের সংরক্ষণে সরকারের একটা কর্তব্যের কথা আমরা পড়তামনা পাঠ্যবইয়ে আর রকমারি বিভাগীয় ঘোষণাপত্রে? ২০০১-২০০২ সালে করা এস.এস.আই.ইউনিটসের সর্বভারতীয় সেন্সাস অনুসারে দেশে এস.এস.আই.ইউনিটসের মোট সংখ্যা ৯,০১,২৯১ যার ৬৯.৭৯% ব্যক্তিমালিকানাধীন অথবা পার্টনারশিপ (পাব্লিক লিমিটেড, প্রাইভেট লিমিটেড, জয়েন্ট হিন্দু ফ্যামিলি নাহয় ছেড়ে দিচ্ছি, কো-অপারেটিভও ছেড়ে দিচ্ছি)। এই ৯,০১,২৯১ ইউনিটসের মধ্যে ২,২১,৫৩৬টা অসুস্থ। এটাও মনে রাখার যে এদের জন্য কাজের যে সাতটি ক্ষেত্র সরকার কর্ত্তৃক স্বীকৃত, সেগুলো হল (১) হস্তশিল্প, (২) হস্তচালিত তাঁত, (৩) খাদি, গ্রামীণ এবং কুটির শিল্প, (৪) নারকেল ছোবড়া, (৫) রেশম ও গুটিপোকার চাষ, (৬) বিদ্যুৎ-চালিত তাঁত এবং (৭) রেসিডুয়াল স্মলস্কেল ইন্ডাস্ট্রিজ। অর্থাৎ প্রথম থেকে জানা যে বাজারের প্রভাবে এগুলো মার খাবেই, কেননা সেভাবে প্রতিস্পর্ধী হতেও পারেনা আর তাই সরকারের সংরক্ষণী সংকল্পটা দেশের স্বাধীনতার চার্টারের অন্তর্গত, নতুন কোনো ব্যাপার নয়।
১৯৯১এর পর সরকারে সরকারে ভেদ করার ব্যাপারটা অপ্রাসঙ্গিক, কেননা সবাই ‘আমাকে আগে দেখুন, শ্যামচাচা’র ধাক্কাধাক্কিতে নব-উদারবাদের শুধু সমর্থক নয়, স্বঘোষিত প্রবর্তক আর তাই ১৯৯৭ থেকে ২০০৩ এর মাঝে নতুন কোনো শিল্পনীতি সংক্রান্ত বক্তব্যের কথা অন্ততঃ আমার জানা নেই। ২০০০-০২ এর মধ্যে বি.জে.পি.নেতৃত্বাধীন এন.ডি.এ. সরকার কিছু সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিশেষ করে কম্পিউটার, ইন্টারনেট নিয়ে এবং তার মাধ্যমে করা হচ্ছে যে কাজগুলো সেগুলোকে এস.এস.আই. এর এবং সাধারণভাবে শিল্পবাণিজ্যের গন্ডীতে আনতে, যাতে তারা সরকারি সুবিধে, ব্যাংক থেকে ঋণ ইত্যাদি পেতে পারে।৭ মাঝারি ও ছোটো শিল্পের জন্য নতুন আইন ২০০৬এ গৃহীত হল ইউ.পি.এ.র জমানায়। অনেক নোটিফিকেশনও হল সেই সুবাদে। একটি নোটিফিকেশনে মাইক্রো, স্মল, ও মিডিয়াম শিল্প এবং ব্যবসায়ের জন্য লগ্নীর উচ্চসীমা নির্ধারিত করা হল। ছোট শিল্পের ক্ষেত্রে পাঁচ কোটি আর মাঝারির ক্ষেত্রে দশ কোটি টাকা প্লান্ট-মেশিনারিতে খরচ করনেওয়ালাকে ‘উদ্যমী’র তকমা পরানো হল যাতে ব্যাংকের ঋণে আরো বেশি অংশ ধনী ও প্রতিষ্ঠিত পূঁজিপতিদের বেনামে দেওয়া যেতে পারে। বোর্ড-ফোর্ড তৈরি হল। সে কি অদ্ভুত বোর্ড! আইনে লেখা রইল, বোর্ড তৈরিতে, বোর্ডের সদস্যদের নিযুক্তিতে এমনকি বোর্ডের কার্যাবলীতে কোনো ত্রুটি থেকে গেলেও বোর্ডের সিদ্ধান্তগুলো বলবৎ হবে। মালের যোগান দেওয়া অতিক্ষুদ্র (মাইক্রো) বা ছোটো প্রতিষ্ঠানের যদি ভুগতান বা অন্য ব্যাপার নিয়ে বিবাদ লাগে সরকার বা বড় প্রতিষ্ঠানের সাথে তার জন্য চটজলদি আর্বিট্রেশনের ব্যবস্থা করা হল...ইত্যাদি, ইত্যাদি।
২০০৬-০৭ বিত্তবছরে, দেশে ১৬ লক্ষ অতিক্ষুদ্র, ছোটো ও মাঝারি শিল্প ছিল। যার মধ্যে ক্ষেত্রগত দিক থেকে অতিক্ষুদ্র ছিল ৯৪.৯%, ছোটো ৪.৯% এবং মাঝারি ০.২%। কাজের দিক থেকে ম্যানুফ্যাকচারিং ছিল ৬৭.১%, পরিসেবা ১৬.৮% এবং মেরামতি ও দেখাশোনা (মেনটেনেন্স) ১৬.১%। গ্রামে অবস্থিত ৪৫.২%, শহরে অবস্থিত ৫৪.৮%।৮


৩
          ইতিমধ্যে অনেক কিছু পাল্টে গেছে। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাগুলোর গায়ে গায়ে লেগে থেকে রক্ত চুষে অনেক ফুলে উঠেছে বেসরকারি পূঁজির জগৎ। সবচে’ বেশি লুটেছে একচেটিয়া ঘরাণাগুলো, তারপর বড়পূঁজিপতিরা এবং নেহাৎ-কম-নয় চোর সরকারি মন্ত্রী ও আমলারা যাদেরকে সম্ভাবিত-পূঁজিপতি বলতে পারি। উৎপাদন ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রটাও বড় হয়েছে। কাজেই উদ্যমীর সরকারি পরিভাষার ফাঁকফোকর দিয়ে অনেক এমন ব্যবসা এবং ব্যবসায়ী ঢুকে পড়েছে এবং পড়তে চাইছে যেগুলো সদর্থে উদ্যম নয় এবং যারা উদ্যমী নয়।
          কিন্তু সত্যিকারের উদ্যমিতার বিকাশ? নিঃসন্দেহে উদ্যমিতার ক্ষেত্র অনেক বড় হয়েছে এবং ১৯৯১এর পর প্রযুক্তি বিস্ফোরণ সে ক্ষেত্রে হঠাৎ নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। সেটা কাজে লাগাতে কতখানি এগিয়ে এসেছে দেশের সাধারণ যুব সম্প্রদায়? সাধারণভাবে তার মানসিকতায় কতটা পরিবর্তন এসেছে?
          অনেকে ভাবতে পারেন উদ্যমিতা নিয়ে এত কথা বলছি অথচ এখনো পর্য্যন্ত দেশের গর্ব বলে যে স্বাধীনতা সংগ্রামের যুগের উদ্যমীদের কথা শোনানো হয় তাদের নামটুকুও নিচ্ছি না কেন? জামশেদজি টাটা, ঘনশ্যামদাস বিড়লা, আর্দেশির গোদরেজ, কির্লোস্কর...! অথবা স্বাধীনতা-পরবর্তী যুগের বিখ্যাত র‍্যাগ্‌স টু রিচেজ কিম্বদন্তী ধিরুভাই অম্বানী! তার ছেলে মুকেশ আম্বানী, অনিল আম্বানী। আজকাল আবার গৌতম আদানী! ...
          এরা কি সত্যিই উদ্যমী? প্রথম প্রজন্ম নাহয় মেনেও নিলাম, দ্বিতীয় প্রজন্ম? তৃতীয় প্রজন্ম? অথচ আজকের এনডিএ সরকার এদেরকেই অন্ত্রপ্রেনিওর বলছে আর নতুন উদ্যমীদের জন্য নতুন নামকরণ হয়েছে ‘স্টার্ট আপ’!

          আসলে আমি একটু অন্য ভাবে প্রশ্নটা ধরতে চাই। একটা রিসার্চ পেপারে চীন সম্পর্কে নিম্নলিখিত তথ্যটা পেলাম।
          “হুনান প্রদেশের ২০১টি বেসরকারি উদ্যমীদের সার্ভে করেছিল হুনান এসোসিয়েশন অফ বিজনেস অ্যান্ড কমার্স অ্যান্ড দ্য ডিপার্টমেন্ট অফ হুনান ইউনিফিকেশন। তাতে তারা পায় যে ৪১.৭৯% উদ্যমীরা নিজেদের প্রতিষ্ঠান গঠন করেছে নিজেদের জীবনধারণের মান উন্নত করতে, ১৬.৯১% নিজেদের জীবনধারণের মূল মানটুকু বাঁচিয়ে রাখতে, ১৮.৪১% নিজেদের আত্ম-মূল্য বাস্তবায়িত করতে, ১৫.৯১% সমাজকে কিছু দিতে, ৪.৪৮% তাদের বিশেষত্বটা কাজে লাগাতে এবং ২.৪৯% অন্যান্য উদ্দেশ্যে।”৮
যদিও এটা চীনের কথা আমার মনে হয়না যে ভারতে এমন সার্ভে করলে প্রতিশতগুলো খুব কিছু আলাদা হবে। বরং, হয়তো একটা বড় প্রতিশত বলবে “চাকরিবাকরি পাইনি বলে”, বা “বেসরকারি চাকরিতে এত কম মাইনে দিচ্ছিল যে ঝুঁকিটা নিলাম...ব্যাস্‌ করে খাচ্ছি”।৯
          ওই রিসার্চ পেপারেই গ্লোবাল অন্ত্রপ্রেনিওরশিপ মনিটর রিপোর্ট, ইন্ডিয়া ২০০১ থেকে একটা পরিসংখ্যান উদ্ধৃত যাতে একটা পদ্ধতি ব্যবহার করে কিছু মন্তব্যের ওপর ভারতে মানুষের রায় নেওয়া হয়েছে। রায়ে ‘মিথ্যে’ বললে ১ আর ‘সত্যি’ বললে ৫, এই হিসেবে১০।
মন্তব্য
২০০০
২০০১
সর্বনিম্ন
সর্বোচ্চ
উদ্যমিতা ধনী হওয়ার সম্মানজনক উপায়
৩.৪৪
৩.৩৩
২.২৭ জাপান
৪.৬৮ যুক্তরাষ্ট্র
বেশির ভাগ মানুষের জন্য উদ্যমিতা উন্নতির ভালো পথ
২.৮১
২.২৪
২.১৭ ফিনল্যান্ড
৪.৩১ ইজরায়েল
সফল উদ্যমীদের স্ট্যাটাস/কদর
৪.১৪
৩.৬৯
২.৫৬ অস্ট্রেলিয়া
৪.৬১ যুক্তরাষ্ট্র
সফল উদ্যমীদের অনেক গল্প শোনায় মিডিয়া
জানা নেই
৩.৭৯
২.৭৭ নরওয়ে
৪.২ ইসরায়েল
লোকে ভাবে শুধু বেকার মানুষেরাই নতুন প্রতিষ্ঠান শুরু করে
২.৯২
৩.২৪
২.৫৮ ব্রাজিল
৪.৪৪ ইজরায়েল
          যদিও এধরণের তথ্যগুলো র‍্যান্ডম সার্ভে থেকে পাওয়া হয়। গ্লোবাল অন্ত্রপ্রেনিওরশিপ মনিটর রিপোর্ট পড়ে জানলাম ২০০০ মানুষের সার্ভে করে পাওয়া তথ্যগুলো কয়েক রাউন্ড স্ক্রুটিনির মধ্যে দিয়ে যায়। তবুও, এটা কি শুধু যুবদের মতামতভিত্তিক? নাকি তাদের বাবা-মা বা বাবা-মার বয়সী মানুষজনেরও মতামতও আছে এতে? কেননা তাদের মতামত তাদের সন্তানদের মধ্যে উদ্যমিতা সম্পর্কে ভয় বা সাহস তৈরি করতে অনেকখানি ভূমিকা নেয়। তবুও, সব খামতি মেনেও উপরে দেওয়া চার্টের সাথে ২০১৩তে নেওয়া মতামতগুলোর সাথে যদি তুলনা করি, দৃশ্যটা আশাব্যঞ্জক মনে হবে। ২০১৩য় ওই গ্লোবাল অন্ত্রপ্রেনিওরশিপ মনিটর সংস্থা কর্তৃক সারা বিশ্বের অনেক দেশের করা সার্ভে থেকে ভারতের অংশটুকু নীচে উদ্ধৃত করলাম।
সুযোগগুলোর উপলব্ধি   ৪১.৪                উদ্যমী হওয়ার ইচ্ছে              ২২.৭
সক্ষমতাগুলোর উপলব্ধি ৫৫.৭                ভালো বৃত্তি হিসেবে উদ্যমিতা    ৬১.৪
অসফলতার ভয়          ৩৮.৯                 সফল উদ্যমীদের উঁচু স্ট্যাটাস    ০.৩
সফল উদ্যমীদের প্রতি মিডিয়ার নজর     ৬১.৩

ইষৎ ভিন্ন প্রশ্নাবলী যদিও, মিলটা চোখ এড়িয়ে যেতে পারেনা। আর তাই উদ্যমিতার সমর্থনে ইতিবাচক পরিবর্তনটা লক্ষণীয়।
অর্থাৎ, একচেটিয়া পূঁজির যুগে, নবউদারবাদের নামে দেশের জাতীয় সম্পদগুলো বিদেশি ও দেশি পূঁজিপতিদের হাতে তুলে দেওয়ার যুগে সত্যিকারের নিচুতলার উদ্যমীদের জন্য সংরক্ষিত থাকা উচিৎ যে আর্থিক জায়গাটা সেটায় বড় পূঁজির অনুপ্রবেশের সমস্ত সুযোগ করে দিতে দেশের কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক আইনের নানারকম ফেরবদল সত্ত্বেও (এর মধ্যে খুচরো ব্যবসায় বিদেশি লগ্নীর জন্য ছাড় এবং আগে থেকেই দেশি বড় পূঁজির ক্রমবর্ধমান লগ্নীও ধর্তব্য, যদিও সেদিকটার বিশদে আর যাচ্ছিনা) উদ্যমতার ইচ্ছেটা বাড়ছে। দেশের মানুষ সেই ১৯৪৭ থেকেই এগোতে চাইছে, লড়ছে সুযোগগুলো পেতে।
কেন আমি একে ইতিবাচক বলছি? বন্ধুরা প্রশ্ন করতে পারেন। আরো বেশি চাকরির দাবীতে মিছিল করছি পথে, মুক্তবাজারের অর্থনীতির তীব্রতম বিরোধে আমি গর্বের সাথে শরিক, মাঝে মধ্যে ভাষণে, ইংরেজিতে যাকে বলে লক-স্টক-অ্যান্ড-ব্যারেল এই অর্থনীতিকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার কথা বলি এবং পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে বলি যে সেন্সেক্স হঠাৎ ১০০০০ সূচক নেমে এলেও বা ব্যাপক ভাবে পূঁজির পলায়ন শুরু হয়ে গেলেও তাৎক্ষণিক আর্থিক দুর্যোগ কাটিয়ে অর্থনীতিকে আগের থেকে বেশি গণমুখী উন্নয়নের পথে নিয়ে আসা যাবে – সন্ধান আছে সে বিকল্প পথের… তাহলে?
কেননা আমি মনে করি উদ্যমিতা শুধু ব্যবসাকেন্দ্রিক নয়, একটা জাতীয় গুণ। একটা নবজাগরণ-সম্পর্কিত গুণ। সেটা বেড়ে উঠলে অনেক কিছু বদলে যাবে। হয়তো আমাদেরই মিছিলে হাঁটার ছন্দ পাল্টে যাবে!


শেষ করার আগে
জানি অনেক প্রশ্ন অনুত্তরিত ছেড়ে দিলাম। অন্তর্জালে দেখছিলাম উদ্যমীদের মধ্যে নারীদের অংশীদারীর প্রশ্ন, তপশীলী জাতির অংশীদারীর প্রশ্ন নিয়েও বেশ কাজ হচ্ছে। তবে আমার মনে হয় এ প্রশ্নগুলো বৃহত্তর সামাজিক অংশীদারীর প্রশ্ন থেকে আলাদা করে দেখলে বিশেষ সুবিধে হবেনা। যে এতদিন পর্যন্ত তার প্রাপ্য সংরক্ষণের সুবিধেটুকুও পেল না, বা চুরি হয়ে যেতে দেখল, সে উদ্যমিতাতে উৎসাহ পাবে কেন? নিজের হকটা ছেড়ে দিতে?
ভারতের নতুন প্রজন্ম যে বদলাচ্ছে, গত দু’তিন বছর ধরে স্পষ্ট হয়ে ওঠা সে ছবিটাই উদ্যমিতার প্রসঙ্গেও যাচিয়ে নেবার চেষ্টা করলাম। শেষে একটা গুরুত্বপূর্ণ দিকের উল্লেখ করতে চাইব।
বড় শিল্প কম রোজগার সৃজন করে (পূঁজিনিবেশের তুলনায়) আর মাঝারি ও ছোটো শিল্প বেশি রোজগার সৃজন করে এই আপ্তবাক্যটা আবার স্পষ্ট হয়ে উঠে এসেছে গুজরাতে ভোটের হাওয়ায় – ‘গুজরাট মডেল’ নিয়ে আলোচনায়। পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে যে পূঁজিনিবেশে গুজরাতের আদ্ধেকে থেকেও রোজগার সৃজনের নিরিখে তামিল নাডু গুজরাতের দ্বিগুণ। কেননা তামিল নাডুর পূঁজিনিবেশে মাঝারি ও ছোটো শিল্প শুধু সংখ্যাতেই বেশি নয়, তারা মোটামুটি ভালো ভাবে চলছে। যখন নাকি ‘মডেল’ গুজরাতের উন্নয়ন দাঁড়িয়েছে ছোটো ও মাঝারি শিল্পের কবরের ওপর। (২০০২ সালের দাঙ্গায় দাঙ্গাপীড়িতদের জন্য সবচেয়ে ভালো ‘শিবির’ গড়ে তুলতে পেরেছিল জেলা প্রশাসনগুলো বন্ধ মাঝারি ও ছোট শিল্পের শেডগুলোর ভিতরে)। কাজেই এটাও স্পষ্ট যে যতই ‘স্টার্ট আপ’ নিয়ে জাতীয়/আন্তর্জাতিক সেমিনার/এনক্লেভ ইত্যাদি হোক, বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি । ক্ষুদ্র, ছোটো ও মাঝারি শিল্পের স্বার্থের বিরুদ্ধে। তা যদি না হত, তাহলে সারা দেশে ধুঁকতে থাকা ৮০র ও ৯০এর দশকের ‘উদ্যম’গুলোর রাজ্যওয়ারি সার্ভে করিয়ে তাদের যতদূর সম্ভব চাঙ্গা হতে সাহায্য করার কোনো প্রচেষ্টা হত না? শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলোর ক্রেডিট পোর্টফোলিওতে এমএসএমই বলে একটা সেগমেন্ট করে, আর মুদ্রা যোজনা করেই থেমে থাকত সরকার?      
 _______________________________________________________________________________________________________________________
২ ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ সোশ্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারডিসিপ্লিনারী রিসার্চ’এর ভল্যুম ২(৭), ২০১৩য় প্রকাশিত   ‘এন্টারপ্রেনিওরশিপ ইন   ইন্ডিয়া’ নামে গবেষণাপত্রে (পরে এই জার্নালটার আরো সাহায্য নিতে পারি, তখন প্রসঙ্গপত্র-১ বলে উল্লেখ করব)
৩ ক্লদ মার্কোভিৎস লিখিত ‘মার্চেন্টস, ট্রেডার্স, এন্ট্রপ্রেনিওরসঃ ইন্ডিয়ান বিজনেস ইন দ্য কলোনিয়াল এরা’ বইটির হরিশ দামোদরন কৃত সমীক্ষা, http://www.india-seminar.com । (আমার জন্য প্রসঙ্গপত্র – ২।)  
৪ ইন্ডিয়ান ইন্সটিট্যুট অফ ম্যানেজমেন্ট, ব্যাঙ্গালোরের এন এস রাঘবন সেন্টার ফর এন্ট্রপ্রেনিওরাল লার্নিং ২০১১ সালে যে ওয়র্কিং পেপার সংখ্যা ৩২৯ প্রকাশ করেছে তার শীর্ষক ‘রিসার্চ অন বিজনেস অ্যান্ড এন্ট্রপ্রেনিওরশিপ হিস্ট্রী অফ ইন্ডিয়া – রিফ্লেকশন্স অন দ্য স্টেট অফ দ্য আর্ট অ্যান্ড ফিউচার ডিরেকশন্স’। অর্থাৎ, আমার জন্য ‘প্রসঙ্গপত্র-৩’। তাতে, জনৈক হরিশ দামোদরনের (হয়ত উপরোক্ত, একই মানুষ মনে হয়) বক্তব্যের এক অংশ।
৫ নিজের ভাষায় না বলে নেহরুযুগের আলোচক এক অখ্যাত আমেরিকান গবেষকের ভাষায় বলার লোভ সামলাতে পারছিনা।
  “Despite a sometimes disappointing rate of growth, the Indian economy was transformed between 1947 and the early 1990s. The number of kilowatt-hours of electricity generated, for example, increased more than fiftyfold. Steel production rose from 1.5 million tons a year to 14.7 million tons a year. The country produced space satellites and nuclear-power plants, and its scientists and engineers produced an atomic explosive device (see Major Research Organizations, this ch.; Space and Nuclear Programs, ch. 10). Life expectancy increased from twenty-seven years to fifty-nine years. Although the population increased by 485 million between 1951 and 1991, the availability of food grains per capita rose from 395 grams per day in FY 1950 to 466 grams in FY 1992.”- http://eternian.wordpress.com/2010/02/20/indias-economy/An Economic History of India from 1947-2013
৬ PCMA Journal of Business, Vol. 1, No. 2 (June, 2009) pp. 135-146, Globalization and Its Impact on Small Scale Industries in India, Sonia, Research Fellow, Department of Commerce, Punjabi University, Patiala(Punjab).Dr. Rajeev Kansal, Reader, Department of Commerce, Punjabi University, Patiala(Punjab).
























৭ 5(1)/2001-SSI BD.& Pol. Dated 10th Sept., 2001
৮ Source: Annual Report FY12, Ministry of Micro Small and Medium Enterprises, Government of India – Final Report of the  Fourth All India Census of Micro, Small & Medium Enterprises 2006-07, Aranca Research, as quoted in MSME and the growing role of industrial clusters, Indian Brand Equity Foundation, January 2013
৯ এবং ১০ ROLE OF ENTREPRENEURSHIP IN NATIONAL ECONOMIC GROWTH A COMPARATIVE ANALYSIS OF INDIA & CHINA PROF. AMIT GUPTA Doctoral Student, National School of Leadership, Pune, India. EXCEL International Journal of Multidisciplinary Management Studies Vol.2 Issue 4, April 2012, http://zenithresearch.org.in/www.zenithresearch.org.in 86

Sunday, November 19, 2017

ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির উচ্ছেদঃ দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা এবং জাত-পাত

ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির উচ্ছেদ শুরু হয় ঔপনিবেশিক শাসনের অমান্য ও বিরুদ্ধাচরণ দিয়ে। সেটাই ভারতের আধুনিক ইতিহাস এবং আধুনিক হয়ে ওঠার ইতিহাস। যুগটি শেষ হয়নি, চলছে।
দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা এবং জাত-পাতের উচ্ছেদ সেই সর্বাত্মক উচ্ছেদ-প্রয়াসেরই অঙ্গ। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, ওই তিনটের জন্ম কি ঔপনিবেশিক যুগে হয়েছে? না, তা হয় নি। আগে থেকে ছিল। শ্রেণী-শাসনের স্বার্থে তিনটেরই জন্ম। ঔপনিবেশিক শাসক তিনটেকেই হাওয়া দিয়েছে, বাড়িয়েছে আর নিজের কাজে লাগিয়েছে। ছিল বলেই কাজে লাগাতে পেরেছে; যত দিন থাকবে কাজে লাগাবে।আবার এটাও এক বিচিত্র পরিহাস যে ঔপনিবেশিক শাসনের অমান্য ও বিরুদ্ধাচরণের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়েও, কিছু অমান্য ও কিছু বিরুদ্ধাচরণের মূল কারণ এবং চারিত্রিক বৈশিষ্টই ছিল ওই তিনটি বা ওই তিনটের যে কোনো একটি। আগে থেকেই সামন্তবাদী সংস্কৃতিতে প্রতিপালিত দুর্নীতিগ্রস্ত কেউ, দুর্নীতিজনিত অর্থলাভ সন্তোষজনক না হওয়ায় অসন্তুষ্ট হয়েছে এবং বিরুদ্ধাচরণ করেছে। আগে থেকেই সাম্প্রদায়িকমনস্ক কেউ, ঔপনিবেশিক শাসনের উপস্থিত প্রতিনিধিকুলকে বিধর্মী বলে চিহ্নিত করে সাম্প্রদায়িক বিরুদ্ধাচরণ করেছে। আগে থেকেই জাত-পাত করা মাথা বিষিয়ে উঠেছে ওই একই ভাবে।
খুবই সম্ভব। ইতিহাসের এই ধরণের প্যারাডক্সের সমাধান তাত্ত্বিক বিতর্কে হয়না। হয় ইতিহাসেরই অগ্রগমনে। স্বাধীনতা সংগ্রামের পরবর্তী পর্যায়গুলোয় ওই ধরণের বিরুদ্ধাচরণকারীরা হয় এগিয়ে গেছে, নিজেদের মুক্ত করেছে ওই বৈশিষ্টগুলোর দুষ্প্রভাব থেকে, শামিল হয়েছে যথার্থ বিরুদ্ধাচরণের সামুহিক অভিব্যক্তিতে, নয়তো ফিরে গেছে পিছনে, ঔপনিবেশিক শাসনের সাথে সমঝোতা করে আখের গুছিয়েছে নিজেদের।
এই প্রক্রিয়াটাই অনুধাবনীয়। কেননা, যেমন বললাম - যুগটি শেষ হয়নি, চলছে। এবং, এরই মধ্যে ঔপনিবেশিকতার উচ্ছেদের প্রতর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভাবধারাগত জায়গা করে নিয়েছে বামপন্থী শক্তিরা, যারা শ্রেণী-শাসনের উচ্ছেদের সংগ্রাম করে আর তাই, দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা ও জাতপাতকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার সম্ভাবনাকে শ্রেণী-শাসনের উচ্ছেদ ও সমাজবাদ প্রতিষ্ঠার সাথে যোগ করে।   
কিন্তু এই কথাগুলো বলছি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও সমাজবাদী ব্যবস্থার দুর্বল হওয়ার সাতাশ বছর পর। এই মুহূর্তে সারা বিশ্বেই দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক শক্তির বোলবালা। আমাদের দেশেও রাজনৈতিক শাসন সেই সব শক্তিদের হাতে যারা প্রথম থেকেই সর্বাত্মক উচ্ছেদ-প্রয়াসের বিরোধী। আর তাদেরই কাঁধে ভর দিয়ে এসে গেছে পুনঃঔপনিবেশিকরণ বা নবঔপনিবেশিকরণ।

প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে এই তিনটে প্রবৃত্তির অন্তর্সম্পর্কের দিকগুলো নিয়ে আরো একটা কথা না বলে পারছিনা। একজন দুর্নীতিপরায়ণ মানুষকে নিজের ভিতরের বিশ্বাস থেকে না হোক বাইরের পরিচয়ে একজন সাম্প্রদায়িক বা জাতবিচার করে চলা মানুষ হতেই হবে। শাসনে-প্রশাসনে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে একটা লাইন-আপ তার প্রয়োজন। আবার একজন সাম্প্রদায়িক মানুষ বা জাতবিচার করে চলা মানুষ দুর্নীতিপরায়ণ নাও হতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত বিশ্বাসের স্তর থেকে বেরিয়ে যেই দুজনে রাজনীতির আঙিনায় প্রবেশ করবে তাদেরকে দুর্নীতিপরায়ণ মানুষের সাথে শুধু সহাবস্থানই নয়, সায় দিয়ে, সংরক্ষণ দিয়ে চলতে হবে। এবং সামাজিক সহাবস্থান এবং পারস্পরিক সংরক্ষণের এই ভিত্তিতে যখন তারা রাজনৈতিক শক্তি বাড়িয়ে তোলার প্রশ্নের মুখোমুখি হবে তখন শুরু হবে মেধাগত দুর্নীতির খেলা। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিজেদের দৃষ্টিকে ন্যায়সঙ্গত ঠাউরাতে তারা নিজেদের মত করে পুনর্গঠন করার চেষ্টা করবে অতীত, গুজবে সাজাবে বর্তমান।

২
১৯৯১এর পর থেকে গত ২৬ বছরে ভারতের অর্থনীতিতে যা কিছু ঘটছে তাতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে বিদেশী ও দেশী একচেটিয়া পূঁজি, আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শ্রমিক ও কৃষকেরা। এবং কে বেশি লাভবান হচ্ছে বা কে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সে প্রশ্নটা হয়তো মুলতুবিও রাখা যেত যদি প্রমাণিত হত যেঃ-
১। স্বাধীনতার পর ধাপে ধাপে চালু হওয়া আর্থিক নীতিসমূহের সফলতা (তার বিবিধ নামকরণে আমি যাচ্ছিনা) বিশ শতকের নব্বইয়ের দশকের শেষ নাগাদ একটি যুক্তিসঙ্গত পরিণতিতে পৌঁছে গিয়েছিল অথবা তাদের সম্পূর্ণ বিফলতা শেষ বারের মত প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল;
২। ১৯৯১ সালে শুরু করা আর্থিক নীতিগুলি সত্যিই একান্ত প্রয়োজনীয় ছিল কেননা এই পথেই আর্থিক উন্নয়নের পরবর্তী পর্ব সম্ভাবিত ছিল; মানে এই মুহুর্তে কারো লাভ বেশি হলেও বা কারো ক্ষতি বেশি হলেও দীর্ঘসুত্রে প্রস্তাবিত ছিল যে জনগণেরই লাভ হবে এই নীতিগুলো চালু হলে;
৩। অথবা, সোভিয়েত রাশিয়ার বিপর্যয়ের পর যে একমেরুর দুনিয়া তৈরি হল তাতে সরকার নিরুপায় হয়ে পড়েছিল; তাদের সামনে ‘এছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না’।

তিনটের একটারও সত্যতা প্রমাণ করতে পারেনি ভারতের শাসকশ্রেণী।
প্রথমটির দ্বিতীয় প্রস্তাব অর্থাৎ ‘সম্পূর্ণ বিফলতা’ সম্পর্কে ১৯৯০-৯২ সালেই হঠাৎ জ্ঞানোদয় হয়েছিল কিছু স্বনামধন্য স্বঘোষিত তাত্ত্বিকের । তারা বেশ কিছু বইটইও লিখেছিলো । শেষে দেখলো যাদের মুখ চেয়ে লেখা তারাই বিশেষ পাত্তা দিচ্ছে না আইডিয়াগুলোকে । ইদানিং নরেন্দ্র মোদি আইডিয়াটা ধরেছিলেন । ‘কিচ্ছু হয়নি সাড়ে ছেষট্টি বছরে । যা কিছু করার, তিনিই করেছেন ।’ এখন তিনিও খুব বেশি হাততালি অথবা ‘মোদি-মোদি’ কুড়োতে পারেন না কথাটায়।    
দ্বিতীয় প্রস্তাবটা সরকার বেশ কিছুদিন আউড়ে ছিল, ট্রিক্ল্‌ডাউন তত্ত্ব তারই নির্যাস – মোটামুটি ২০০৪এর পর থেকে, আওড়ানো না ছাড়লেও গুরুগম্ভীর বিষন্ন স্বরে যোগ করছে, ‘শুধু ওতে হবে না, আরো কিছু চাই’, বিশ্বায়নের মানবিক মুখ’। যেমন দেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি সিংহাসনারূঢ় হওয়ার সময় বলেছিলেন । নতুন সরকার আর বলেনা। ১৯শে মে, ২০১৪র বিকেলে ‘টাইমস নাউ’এর তৎকালীন বিখ্যাত গর্জক (যাঁরা বর্তমান সরকারের হয়ে চ্যানেলে সবার সাথে তর্জন-গর্জন করেন) চেঁচিয়ে বলেছিলেন, ‘এন্টাইটেলমেন্টের দিন শেষ হল, এম্পাওয়ারমেন্টের দিন এল’। অর্থাৎ তথাকথিত ‘মানবিক মুখ’ খতম । আর এম্পাওয়ারমেন্ট জনতার কোনো অংশের না হলেও গেরুয়া রেজিমেন্টগুলোর খুব হল এবং এখনও হচ্ছে।
তৃতীয় প্রস্তাবটাই এখন আঁকড়ে ধরার শেষ তাত্ত্বিক খড়কুটো। কিন্তু তত্ত্বটা যে মূলতঃ মিথ্যে সেটার সবচেয়ে বড় প্রমাণ তো সরকারের নিজেরই নীতিসমূহের সেই অংশ যা ২০০৪এ ওই ‘মানবিক মুখ’ হিসেবে চালু হল এবং যার কল্যাণে কিছু নীতি, কিছু ‘ফ্ল্যাগশিপ প্রোজেক্ট’ বিগত কিছু বছর ধরে গ্রামীণ ও শহরী দরিদ্র পরিবারে আয় সৃজনের জন্য এবং জাতীয় আয় পুনর্বিতরণের জন্য চালু করা হচ্ছে! আর ব্যালেন্স অফ পেমেন্টস এর সংকটের সত্যতা যদি তত্ত্ব হিসেবে খাড়া করতেও চায় তারা, তার কারণ তো রাজীব গান্ধী সরকারের সময়কার নীতিবদল -- খোলাবাজার থেকে মহার্ঘ্য বিদেশি ঋণ নিতে বড় দেশি পূঁজিপতিদের হুড়োহুড়ি!

এখন মোটামুটি অনেকেই এটা দেখতে পাচ্ছে যে স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্থনীতির ঝালে-ঝোলে-অম্বলে নামে-বেনামে চল্লিশ বছর ঈষৎ লো প্রোফাইলে থেকে ভারতের একচেটিয়া পূঁজি যে ধনশক্তি সংগ্রহ করেছিল (অর্থভেদে, চুরি করেছিল সরকারী উদ্যমগুলো থেকে) সেই ধনশক্তিই তাদের উৎসাহিত করলো এশিয়া-আফ্রিকা-দক্ষিণ আমেরিকার মাটিতে পা বাড়াবার কথা ভাবতে, আর পা বাড়াবার টিকিট পেতে হলে আমেরিকা-ইওরোপ-জাপানের পূঁজিকে ভারতের ধনসম্পদ দখল করার সুযোগ করে দেওয়াই ছিল একমাত্র পথ। সেটি করার শুভলগ্ন এনে দিল সোভিয়েত রাশিয়ার বিপর্যয়। এ ছাড়া আর কোনো কারণ, কোনো যুক্তি নেই ‘নবউদার’ অর্থনীতির পেছনে।

যাহাঁতক সেই রহস্যময় ‘উন্নয়ন’এর বর্মিবাক্স খুলে দেখা যায়, তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের ফলশ্রুতি হিসেবে সৃষ্ট শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রগুলো এবং এর প্রভাবে বেড়ে ওঠা আরো কিছু পরিষেবা ইত্যাদি… বাদ দিলে উন্নয়নএর সেই বিশিষ্ট ‘উ’টারও দেখা পাওয়া যাবেনা, যা সাধারণভাবে বুর্জোয়া গভর্নেন্সের অঙ্গের – আবশ্যক পরিষেবা সৃষ্টি - গতিবেগ থেকে একরত্তিও বেশি! আর তথ্য প্রযুক্তি বিপ্লবের সাড়া ভারতে পৌঁছোনো কোনোভাবেই নব্য-অর্থনীতির অবদান নয়। তথাকথিত ও বহুনিন্দিত ‘লাইসেন্স-কোটা-পারমিট-রাজ’ থাকলেও তা পৌঁছতো । হয়তো ঘুষগুলো নিচে থেকে উপর অব্দি একটু ভাগ-বাঁটোয়ারা হত, সবটাই ওপরে যেত না। বরং তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব নতুন অর্থনীতির ক্ষেত্রে (বা নতুন রাজনৈতিক-অর্থনীতির ক্ষেত্রে) বাহক-তরঙ্গের (ক্যারিয়ার ওয়েভ) কাজ করেছে।
একটা উদ্ধৃতিঃ-
“For almost all observers, East or West, the political events of the past several years have been stunning.… Observers and participants alike remark that telecommunications and the news media may have facilitated these events and are a new factor to be reckoned with in international political developments. ….increasingly acknowledged role of telecommunications and the information technologies in the transformation of world commerce and international affairs raises the question of whether the awesome power of the information revolution can be deliberately or even more effectively harnessed.”
– A Rand Note, Seizing the Moment: Harnessing the Information Technologies, Steve Bankes, Carl Builder, Rand 1992

৩
ভারতের একচেটিয়া পূঁজির নিজের স্বার্থে ডেকে আনা এই পুনঃঔপনিবেশিকরণের কী প্রভাব তাহলে পড়লো ডিকলোনাইজেশন বা ঔপনিবেশিকতার উচ্ছেদের ঐতিহাসিক প্রকল্পের ওপর? বিশেষ করে, এখানে আলোচ্য সাংস্কৃতিক অসুস্থতার তিনটে প্রবৃত্তি, তিনটে বৈশিষ্ট – দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা এবং জাত-পাতের ওপর?

দুর্নীতি ।
দুর্নীতিমুক্ত শাসনব্যবস্থা এদেশে কোনোকালেই ছিলো না । কিন্তু স্বাধীনতাসংগ্রামে এদেশের মানুষ যে স্বপ্নগুলো নিয়ে শামিল হয়েছিলো তার একটি ছিলো স্বাধীনতার পর দেশে ওপরতলা থেকে নীচের তলা অব্দি দুর্নীতিমুক্ত শাসনব্যবস্থা ও প্রশাসন স্থাপিত হবে । অন্য অনেক স্বপ্নের মত এই স্বপ্নটিও পুরণ হলো না, বরং লোকে তাকিয়ে দেখলো, “ও বাবা, কালো সাহেবরা তো গোরাদের বাড়া !”
তবু ১৯৯১ সাল অব্দি দুর্নীতি প্রধানতঃ প্রশাসনের স্তরে ছিল আর শাসনব্যবস্থার নির্ধারিত আর্থিক নীতি অনুসারে কাজ করার ক্ষেত্রে ছিল । কোনো আর্থিক নীতির নির্ধারণটাই মূলতঃ দুর্নীতির ভিত্তিতে হচ্ছে, এই দৃষ্টান্ত খুব বড় মাপে দেখা দিল ১৯৯১এর পর । এবং সেটা বাড়তে লাগলো প্রতি বছর। যেমন একটা আইন ধরুন, কার্যকরী করার ক্ষেত্রে দুর্নীতি হওয়া এক ব্যাপার আর আইনটা বা তার জন্য তৈরি করা খসড়া বিলটাই দুর্নীতির উৎপত্তি হওয়া আরেক ব্যাপার । এই দ্বিতীয় প্রবৃত্তিটারই প্রতিফলন তো স্পেক্ট্রাম কেলেংকারি বা কয়লা কেলেঙ্কারি ! এবং কী বলা যায় – খুচরো ব্যবসায় বিদেশী লগ্নী থেকে শুরু করে নতুন পেনশনে বিদেশী লগ্নী, ব্যাঙ্কে বিদেশী লগ্নী, বীমায় বিদেশী লগ্নী সবই হয়তো তাই ! যে দিচ্ছে সে আমেরিকায় এবং যেখানে জমা হচ্ছে সেটা সুইজারল্যান্ডে ! একটা ভালো কামান কিনতে গিয়ে কিছু কিক-ব্যাক পাওয়া নিঃসন্দেহে ন্যক্কারজনক । কিন্তু প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত একটা এমন ভুল সিদ্ধান্ত করিয়ে নেওয়া যে এই এই বিশেষ স্পেসিফিকেশনের কামানটাই দেশের জন্য জরুরী, শুধু ন্যক্কারজনক নয়, বরফে ভেজা মোজা পরে অক্লান্ত দাঁড়িয়ে থাকা জওয়ানদের পিছন থেকে গুলি করে মারার শামিল । এই ধরণেরই ব্যাপার আজকাল বেশি ঘটছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রালয়গুলোয়। নরেন্দ্র মোদি সরকার বিগত কংগ্রেস সরকারের অনেক কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে লড়াই দেখিয়ে আর লড়াইটাকে সাম্প্রদায়িক চেহারা দিয়ে ভোট পেয়েছিল। প্রভূত পরিমাণ অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিল একচেটিয়া পূঁজি, কেননা গুজরাতের অভিজ্ঞতায় নরেন্দ্র মোদির ভিতরে তারা নিজেদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত দালাল খুঁজে পেয়েছিল। আর সেটাই হল। এসেই নিজের বিশ্বস্ততা প্রমাণ করতে পাইয়ে-দেওয়ার-দরজা খুলে দিল একচেটিয়া ও বড় পূঁজির জন্য, তাও এমন ক্ষেত্রে, প্রতিরক্ষা ও শস্ত্রনির্মাণের ক্ষেত্রে, যার কাল অব্দি বেসরকারি ক্ষেত্রে যাওয়া, বলতে গেলে নৈতিক ভাবে নিষিদ্ধ ছিল। ব্যাসেল কমিটির শংসায় ব্যাংকে শুরু হওয়া এন∙পি∙এ∙ র কনসেপ্ট তো একটা হাতিয়ার হয়ে গেল – কর্জ নাও, এন∙পি∙এ∙ হতে দাও, বাতিল কর্জ হবে, যদি কম্পানির ওপর দেউলিয়া ঘোষণা করার মামলা করতেই হয়, আগেই অন্য কম্পানি খুলে সাইফনিং করে নিও।       
পুরোনো ধরণের প্রশাসনিক দুর্নীতির তো কথাই নেই । আগে নীচের তলায় দিতে হত মালটা, নীচের তলা নিজেরটুকু রেখে বাকিটা সাহেবের দেরাজে রাখতো সন্ধ্যেবেলায় । এখন সাহেব সোজাসুজি নিজেই নেন – একটা ছোটো অংশ ‘মিষ্টি খাওয়ার জন্য’ নীচের তলায় পাঠিয়ে দেন । নীচের তলা যখন মুর্গী পায়, সেও রেট বাড়িয়ে দেয় তিনগুণ, “আগের সময় তো নেই দাদা, জানেনই ভিজিলেন্স ঘুরছে, হিউম্যান রাইট ঘুরছে, আরটিআই ঘুরছে !”
এমনকি জুডিশিয়ারীর ওপরতলা অব্দি আজ দুর্নীতি পৌঁছে গেছে ।
খোলাখুলি সাংসদ, বিধায়ক কেনাবেচাও চলছে। লবিইং এজেন্ট আগে বাইরে ব্রীফ কেস খুলে বসত! এখন দলের সভাপতি নিজেই সে কাজটা করছে।  
এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন । কিছু দুর্নীতি আছে যা দেশকে নৈতিক ভাবে হয়তো প্রভাবিত করছে কিন্তু জনতার প্রত্যক্ষ ক্ষতিবৃদ্ধি কিছু হচ্ছে না । যেমন তিনটে একই স্তরের কোম্পানির একটি হয়তো একটু বেশি ঘুষের লোভ দেখিয়ে সরকারি স্তরে ক্লিয়ারেন্স পেয়ে যাচ্ছে বিদেশে বা নিজের দেশে কোনো প্রজেক্ট শুরু করার বা হাতে নেওয়ার।
কিন্তু দুর্নীতির একটা নতুন বিরাট ক্ষেত্র খুলে গেছে যা সোজাসুজি জনতাকে প্রভাবিত করছে। যে ক’টি সরকারি স্কীম আছে তার ক্রিয়ান্বয়নে সরকারি আমলা এমনকি পঞ্চায়েত স্তরে দুর্নীতি অব্দি সংবাদ মাধ্যমে বেশ চট করে উঠে আসে। কিন্তু সেই সব এবং আরো কিছু অন্যান্য স্কীমগুলোর ক্রিয়ান্বয়নে সাহায্য করতে যে এনজিওগুলো বহাল করেছে নিজেদের তাদের ভিতরের দুর্নীতির – সরকারি এবং দেশি বিদেশি ফান্ডিংএর টাকার অন্যদিকে চলে যাওয়ার – কোনো হিসেব আমরা পাইনা । আবার এদেরই মাধ্যমে বেশির ভাগ কোম্পানি তাদের তথাকথিত ‘কর্পোরেট সোশ্যাল রেস্পন্সিবিলিটি’র কোটা পুরো করে ।
বামপন্থীরা বলি ‘কোরাপশন বাই ডিফল্ট’ – ভাই, পূঁজিবাদ থাকবে আর দুর্নীতি থাকবেনা তা হতে পারেনা । বিরোধটা পূঁজিবাদের করুন, উন্নয়নের এই গণবিরোধী মডেলের করুন !… আজ শাসকশ্রেণীর বক্তব্যটাও উল্টোভাবে প্রায় একরকম, ‘নিশ্চই! আমরাও তো তাই বলি – উন্নয়ন ! উন্নয়নের এই মডেলটার লাভ বুঝুন, সমর্থন দিন ! দুর্নীতি তো দূর হয়েই যাবে – একটু সময় লাগছে, এই যা !’ আর সত্যিই তো, উন্নয়নের এই মডেলটাকে বেশ ভালোভাবে খাইয়েছে মানুষকে আমাদের মিডিয়া ! আর নাগরিক সমাজের আত্মিক শুদ্ধিকরণের জন্য আন্না হাজারে সাহেব তো আছেনই !

সাম্প্রদায়িকতা।
দাঙ্গা, বিভীষিকাময় ভ্রাতৃসংহারের মধ্যে দিয়েই বিভাজিত হয়ে স্বাধীন হল এই দেশ । দাঙ্গা মাঝে মধ্যেই হয়েছে তারপর। হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার পাশাপাশি ১৯৮৪সালের শিখবিরোধী দাঙ্গাও দেখলো দেশের মানুষ । মন্দির-মসজিদ ভাঙার খেলাও নতুন নয়। স্বাধীনতার পর স্থানীয় স্তরে হয়তো অনেক জায়গায় হয়েছে । কিন্তু ১৯৯২ সালের ছয়ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদের ধ্বংস অনেকগুলো বার্তা বয়ে নিয়ে এল ।
১। যেটি ভাঙা হল সেটি আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া কর্ত্তৃক ঘোষিত সংরক্ষিত মনুমেন্ট ছিল। অর্থাৎ বার্তা দেওয়া হল যে ইতিহাসের বিকৃতিকরণ শুধু বইয়ে সীমিত থাকবেনা, প্রয়োজনে যে কোনো জাতীয় স্মৃতিসৌধকে গুঁড়িয়ে দেওয়া যাবে ।
২। হিন্দুসমাজের বিরাট সংখ্যক ‘নীচু’জাতের মানুষ যারা এক সময় জাতগত উৎপীড়নে বাধ্য হয়ে ধর্ম পরিবর্তন করেছিল তাদের বার্তা দেওয়া হল, যতই জাত-ভিত্তিক উৎপীড়ন হয়ে থাকুক, ধর্ম যখন পাল্টেছ, তোমাদের আমরা বাবরের সন্তান বলেই অভিহিত করব; আর সেই উদ্দেশেই ঘটনাটি ঘটানো হল ছয়ই ডিসেম্বর, ডঃ আম্বেদকরের প্রয়াণদিবসে ।
৩। ধ্বংসটা করা হল জনসমক্ষে, মিডিয়ার একটা বড় অংশের পরোক্ষ সমর্থনে; দশ দিন আগে দিল্লীতে যে কয়েক লক্ষ শ্রমিকের বিরাট সমাবেশ হয়েছিল তার প্রতি মিডিয়ার ঔদাসিন্যের প্রতিযুক্তি হিসেবে সাজিয়ে ।
৪। প্রধানমন্ত্রী চুপ থাকলেন, দুটো সার্ভেলেন্স হেলিকপ্টারও পাঠালেন না, যেটা এমনকি এমত পরিস্থিতিতে ইংরেজ সরকারও নিয়মমাফিক পাঠাতো – তিনি নিশ্চিত জানতেন যে দুটো সার্ভেলেন্স হেলিকপ্টার ঘটনাস্থলের মাথার ওপর কিছুক্ষণ স্থির হয়ে থাকলেই ৮০ প্রতিশত কারসেবক মসজিদের মাথা থেকে নীচে নেমে পড়তো । অর্থাৎ তিনি জানালেন যে নব্যঅর্থনীতির প্রতি সমর্থন জারি রাখলে পূঁজির স্বার্থের সাথে এই হিংসাত্মক হিন্দুত্ববাদের কোনো বিরোধ নেই ।
লক্ষ্যণীয় যে পরবর্তী বোমা বিস্ফোরণ, দাঙ্গা, মুসলিম উগ্রপন্থী কার্যকলাপ ইত্যাদি নিয়ে মুম্বাইয়ে বেশ কিছু ফিল্ম তৈরি হলেও মসজিদ-ধ্বংস নিয়ে একটাও ফিল্ম তৈরি হয়নি।
আর তারপর তো ২০০২ সালে ভারতে প্রথম সরকার বা স্টেট প্রযোজিত ধর্মভিত্তিক গণসংহার সংঘটিত হলো । যিনি তাতে নেতৃত্ব দিলেন তিনি আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী! তাঁর সার্টিফিকেট? না, গণসংহারে তাঁর কোনো হাত ছিলো না, এটা প্রমাণ করা মিডিয়ার মাথাব্যথা নয়। থাকলে থাকতেও পারে, কিন্তু তিনি চলতি ‘উন্নয়নী’ অর্থনীতির সবচেয়ে কঠিনহস্ত প্রয়োগকারী, এটুকুই যথেষ্ট। আর তাই আজ কখনো ‘লাভ-জেহাদ’এর নামে, কখনো গোরক্ষার নামে মুসলমান পীড়ন, মুসলমান নিধন হয়েই চলেছে। এমন প্রধানমন্ত্রী যার মুখে একটু দুঃখের অভিব্যক্তিও নেই। যেমন প্রতিদিন বদলাবার মত দামী জামাকাপড়, চশমা, চটি রাখেন ওয়ার্ডরোবে, তেমনই বিভিন্ন রঙের চোখের-জল রাখেন পকেটে, প্রয়োজন মত মাইকে বা টুইটারে চোঁয়ান। অন্যান্য ধার্মিক সংখ্যালঘুদের ওপরও হামলা চলছে বিশেষ বিশেষ এলাকায়।
এখানেও একটা ব্যাপার দেখার যে গুজরাটে ২০০২ সালের গণসংহারের পর কিন্তু কোনো কর্পোরেট হাউজ কিন্তু এর নিন্দায় এগিয়ে আসেনি । কোনো চেম্বার অফ কমার্স কোনো নিন্দাপ্রস্তাব গ্রহণ করেনি । অর্থাৎ ‘আমাদের দেওয়া উন্নয়নী প্রকল্প যদি শক্ত হাতে ক্রিয়ান্বিত করো তাহলে ওসব দাঙ্গা-টাঙ্গা প্রয়োজনে চালিয়ে যাও, আমরা সামলে নেব !’  

জাতপাত ।
ঔপনিবেশিকতা উচ্ছেদের প্রকল্পে গভীরতম সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রশ্ন !
যদি বাণিজ্যিক হিন্দী সিনেমা দেখার অভ্যেস থাকে, একটু মনে করে দেখুন তো, গত পঞ্চাশ বছরে কটা ফিল্মে নায়কের পদবী ‘উঁচু’ জাতের নয়? উত্তর-নবজাগরণী বাংলায় কটা উপন্যাসে কটা চরিত্র এবং আজকালকার টিভি সিরিয়ালে (হিন্দী বাংলা দুয়েতেই) কটা চরিত্র ‘উঁচু’ জাতের নয়? তাহলে কি সমস্ত লেখক, নির্মাতা, নির্দেশক জাতভেদের সমর্থক? না, তা নয়, কিন্তু বোঝা যায় যে এদেশের, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত মানসের (অর্থাৎ বর্তমান সমাজে বুদ্ধিজীবীতার মানসের) কালচারাল কন্সট্রাক্টের এত ভিতর অব্দি আছে ব্যাপারটা যে রিফ্লেক্সের মত কাজ করে ।  
তবে একটা নতুন অধ্যায় সূচিত হল ১৯৯১ সালে । প্রস্তুতিটা আগের বছরেই হয়ে গিয়েছিল। কেন্দ্রে এবং পাঁচটি রাজ্যে অকংগ্রেসী সরকার ও বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ এবং বিহারে অনগ্রসর জাতের মেরুকরণে উৎসাহিত হয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রী ভি পি সিং ১৯৯০ সালের আগস্ট মাসে ঘোষণা করলেন চাকরীতে অনগ্রসর জাতের জন্য আসন সংরক্ষণ (সুপারিশটা পনেরো বছরেরও বেশী সময় ধরে ঝুলিয়ে রেখেছিল কংগ্রেস সরকার)। ভীমরুলের চাকে ঢিল পড়ল । সঙ্গে সঙ্গে উত্তর ভারতে আগুন জ্বালালো শাসনে-প্রশাসনে ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকা বর্ণহিন্দু সামন্ত-শক্তিরা – ক্ষেপিয়ে তুলল তরুণ প্রজন্মের ছাত্রযুবদের। আর সেই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে তাদের নিজেদের ভোটব্যাঙ্কে শামিল করতে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির ‘রামরথ যাত্রা’ শুরু হল একমাস পর, সেপ্টেম্বরে । ১৯৯১ এর শেষে সোভিয়েত ইউনয়নের পতন এই ঘুর্ণিঝড়ে শামিল করে নিল শ্রমজীবী জনতার একটা বড় অংশকে । এবং এর পরবর্তী পর্যায়ে শুরু হল অনগ্রসর ও তপশীলী প্রতিটি জাতের জাতভিত্তিক সম্মেলন এবং জাতভিত্তিক সংগঠনগুলোকে নতুন জীবনপ্রদান ।
হিন্দী এলাকায় সম্প্রদায়বাদ বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা বিকৃত ভারসাম্য খুঁজে নিল ‘কমন্ডল’ বনাম ‘মন্ডলে’ । আর এসবের খেসারত দিতে হচ্ছে পরবর্তী কুড়ি বছর ধরে, আজ অব্দি। ভিপিসিংএর সেই বিখ্যাত স্লোগান ‘সত্তা মে হিস্‌সেদারী’ (সরকারে অংশীদারী)তে নিজের নিজের জায়গা লোটার জন্য দৌড়োদৌড়ি করছে জাতভিত্তিক ছোটো বড় রাজনৈতিক দল এবং দলের ভিতরকার জোট – ‘উন্নয়ন’এর চলতি মডেলের প্রশ্নে সবার ঘাড় নব্বই ডিগ্রী কাৎ, ‘জী হুজুর! শুধু মন্ত্রীত্ব দিতে হবে!’

          তাহলে ঔপনিবেশিকতার উচ্ছেদের প্রশ্নে ব্যাপারটা কোন জায়গায় দাঁড়াল ? ঠিক যেমন দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা এবং জাতপাতের রাজনীতি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের তাঁবেদারীর প্রশ্নে এক হয়েছিল, নব্যসাম্রাজ্যবাদী প্রকল্প এই তথাকথিত ‘উন্নয়ন’এর প্রশ্নে, দেশে পুনঃওউপনিবেশিকরণের জাল বিস্তার করার প্রশ্নে আজকের দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা এবং জাতপাতের রাজনীতি এক হয়ে গিয়েছে।
          কাজেই প্রশ্নঃ নব্যসাম্রাজ্যবাদী ‘উন্নয়নী’ প্রকল্পটির বিরুদ্ধে শেষ কথাটি না বলে, ওই প্রকল্পটির উচ্ছেদের দিকে অগ্রসর না হয়ে (বরং অনেক ক্ষেত্রে তাকে সমর্থন করে - বিশেষ করে শহুরে তরুণ প্রজন্ম এবং তথাকথিত ‘সুশীল সমাজ’এর দিকে চোখ রেখে কথাটা বলছি) শুধু দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা বা জাতপাতের বিরুদ্ধে কোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক এমনকি রাজনৈতিক আন্দোলন কি আদৌ সফল হবে ? ঔপনিবেশিকতার উচ্ছেদ কি হতে পারবে?

          

যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রযুক্তি

দুটো উপন্যাস
তেত্রিশ বছর আগে* কিনেছিলাম এলেক্স হ্যালির ‘রূটস’। তার তিন বছর পর কিনেছিলাম নর্মান মেলারের ‘দ্য এক্সিকিউশনার্স সঙ’। তিন দশক ধরে বই দুটি আলমারিতে অথবা বাক্সে বন্দী হয়ে ছিল। তিন দশকে ন’বার বাসাবদল করেছি। বই দুটি যতবার বার করেছি প্যাকিং খুলে নতুন বাসায় গুছিয়ে তুলতে, টেনেছে, যেমন করে সব না-পড়া বই টানে। কিন্তু পড়তে শুরু করার জন্য মন কেন জানিনা, যুগিয়ে তুলতে পারিনি।
আজ যে পারলাম, তাও জানিনা কেন পারলাম। ডাইরি দেখছি – ২০শে সেপ্টেম্বর ২০০৯এ শেষ করেছি ‘দ্য এক্সিকিউশনার্স সঙ’। আর ১৩ই নভেম্বর ২০১০এ পড়ে শেষ করলাম ‘রূটস’। সময় লেগেছে অবশ্যই। এক হাজার পৃষ্ঠার ওপর প্রথম বইটি। ছ’শো পৃষ্ঠার ওপর দ্বিতীয়টি। কুড়ি পঁচিশ দিন ধরে খেপে খেপে পড়েছি।
প্রথমটি নিয়ে একটি ফিল্ম তৈরি হয়েছিল বোধহয়; জানিনা কেমন চলেছিল। দ্বিতীয়টি নিয়ে একটি জনপ্রিয় টিভি সিরিয়াল তৈরি হয়েছিল। দুটো বইয়েরই রচনাকাল সত্তরের দশক। স্থান – যুক্তরাষ্ট্র এমেরিকা। কিন্তু বিষয়বস্তু, স্থান, কাল সব একেবারে আলাদা। তবু মনে হল দুটোকে পাশাপাশি রেখে জুড়বার চেষ্টা করে দেখি কী দাঁড়ায়।
যাঁরা উপন্যাসদুটি পড়ে থাকবেন তাঁদের কাহিনীসার শুনিয়ে সময় নষ্ট করার কোনো অধিকার নেই আমার। তবু এই চিন্তায় এগোতে দুটি কাহিনীসার পাশাপাশি রাখার প্রয়োজন আছে মনে হয়।


দ্য এক্সিকিউশনার্স সঙ (ঘাতকের গান)
সল্টলেক সিটি উটা রাজ্যের অন্তর্গত। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপশ্চিম। যাঁরা গেছেন তাঁরা ভালো জানবেন, আমি অগতির গতি ইন্টারনেট খুলে মিলিয়ে নিলাম শহরের জনসংখ্যার ৫৮% খ্রীস্টান ধর্মে মর্মন মতাবলম্বী। মর্মন সম্পর্কে উইকিপিডিয়ায় পেলাম খ্রীস্টান ধর্মের পরবর্তীকালীন সন্তদের (লেটারডে সেন্টস) অনুযায়ী। এই ধর্মমতের স্থাপনা বোধহয় এমেরিকাতেই উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে হয়েছিল। তারা গোঁড়া। তৈরি হতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো কারণে তাদের বিবাদ ছিল। উপন্যাসেও আছে আর নেটেও পেলাম যে সল্টলেক সিটির মর্মনদের জন্য ইতিহাসপুরুষ ব্রিহাম ইয়ং। কোনো একসময়ে ব্রিহাম ইয়ং নামে জনৈক ব্যক্তির নেতৃত্বে অনেক রক্তকর্দ্দমে পথ তৈরি করে মর্মন মতাবলম্বী মানুষেরা এই জনশূন্য মরুপ্রান্তরে এসে উপনিবেশ গড়ে তুলেছিল। অর্দ্ধশতাব্দীকাল তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যুদ্ধ চলে যুক্তরাষ্ট্রীয় সৈন্যবাহিনীর সাথে। অবশেষে সংযুক্তি। সেই উপনিবেশই আজ বিশাল সল্টলেক সিটি। আকাশরেখায় দেখা যায় মর্মন মন্দিরের চুড়া, ব্রিহাম ইয়ং বিশ্ববিদ্যালয়।
কোথা থেকে এসেছিল তারা? পরে জানবো নাহয়। না জানলেও বিশেষ ক্ষতি নেই। আপাততঃ উপন্যাসের প্রসঙ্গে সেটা খুব বেশি প্রয়োজনীয় নয়। যা হোক, আগে গল্পের ছকটা বলে নিই।

শৈশব থেকে পারিবারিক নিঃসঙ্গতার ফলে অপরাধমনস্ক হয়ে পড়া গ্যারি গিলমোর দ্বিতীয়বার দীর্ঘ কারাবাসের পর প্যারোলে ছাড়া পেয়ে সল্টলেক সিটিতে ঠাঁই নিতে আসে। তখন তার বয়স ছত্রিশ। কিন্তু দুবার জেল খাটার ছাপ শরীরে, মুখে। কয়েকটা দাঁত নেই। ভদ্র পরিবারে তার পূর্ব পরিচয় নিয়ে সতর্কতা সে তার গোলমেলে ভাবভঙ্গী দেখিয়ে আরো বাড়িয়ে তোলে। তাকে ভয়ও পায় লোকে। একমাত্র মাস্তুতো বোন ব্রেন্ডা, তার শৈশবের খেলার সাথী, যার স্পন্সরশিপে সে প্যারোল পেয়েছে, তাকে যাচ্ছেতাই করে বকবার ক্ষমতা রাখে। ব্রেন্ডাই জানে, হাইস্কুল পাশ করতে না পারা গ্যারির রুচিবোধ জেলে বসে পড়াশুনো করার ফলে কতটা সমৃদ্ধ। কত সুন্দর আঁকার হাত তার। আর বালকবয়সের স্বপ্নের রাজকুমার গ্যারি কুপারের মত রাজকীয় মন। কিন্তু সবাই তো আর ব্রেন্ডা নয়।
একদিকে ঘরের মধ্যে মর্মন সমাজের অতিধার্মিক, গোঁড়া, নীতিবাদী পরিবেশ আর অন্যদিকে বাইরে হাইওয়ে, পেট্রলপাম্প, পিক-আপ ভ্যান, ট্রাক অর্থাৎ ছড়াতে থাকা নগরায়ণ ও তার ফসল উচ্ছৃংখল জীবন। সমাজটাই তার নিজের বিকাশক্রমে এক বিপন্নতার, সঙ্কটের সম্মুখীন। তার মধ্যে গ্যারি আরেক বেখাপ্পা মানুষ। শৈশব থেকেই জেল খেটে খেটে তার মন আদ্ধেক শিশু, আদ্ধেক বুড়ো। ঠিক সুস্থ যুবকটাই যেন সে হয়ে উঠতে পারে না – কখনো শিশু হয়ে যায়, কখনো বুড়ো হয়ে যায়। অথচ শরীর তো তার মধ্যযৌবনে, তার রোজগার চাই, নারী চাই, ঘর চাই বাঁধার! ... ঘরোয়া পরিবেশে গল্প করতে গিয়ে সে বোঝে তার কাছে গল্পও নেই, জেলের নানান অপরাধকাহিনী ছাড়া। সেসব গল্প শ্রোতাদের ভয় পাইয়ে দেয়, সতর্ক করে দেয়, ঘৃণামিশ্রিত দূরত্বে ঠেলে দেয়।
তবু সে চেষ্টা করে খাপ খাইয়ে নেওয়ার, বাঁচবার। কাজও জোটায় – কখনো এটা, কখনো সেটা। থাকার ঘর জোটায়। বদভ্যাসের মধ্যে থেকে যায় এক ক্রেট বীয়ারের বোতল মাঝরাত অব্দি বসে খালি করা – তাও মাঝে মধ্যে। এমনকি একটি মেয়েবন্ধুও জোটায়, নিকোল। দুই বাচ্চা কোলে সেও এক উচ্ছন্নে যাওয়া মেয়ে।
নিকোলের শৈশব নষ্ট হয় তার পরিবারে। পাগলা গারদে যেতে হয়। কত পুরুষ যে তার জীবনে এসেছে তার গুনতি নেই। বস্তুতঃ সে জানে পুরুষসঙ্গ মানেই ঘন্টাখানেকের মধ্যে কাপড় খোলার জন্য তৈরি থাকা, অথচ সে নিরুপায়। ওঁই সঙ্গটুকুও না পেলে একা একা পাগল পাগল লাগে। আর মেয়েদের তো কথাই নেই। তারা সঙ্গ দেবে কী? কাছে গেলেই বেশ্যা ভেবে সতর্ক হয়ে ওঠে। হাঁটু অব্দি জীন্স আর হল্টার লাগানো স্লীভলেস টপ্‌স পরে সল্টলেক সিটির রাস্তায় নিজের সেকেন্ড হ্যান্ড মুস্ট্যাঙে সে এক বিষন্ন বেপরোয়া। কেউ জানেনা, সে কবিতাও লেখে মাঝে মাঝে।
গ্যারি আর নিকোল ঘর বাঁধার চেষ্টা করে। দুজনেই নিঃসঙ্গ। দুজনেরই মনের অবচেতনে সারাক্ষণ মনে হয় কিন্‌কিন্‌ করতে থাকে এক নিয়তিবোধ যে গোড়া থেকেই সব কিছু ভূল তাদের জীবনে, বোধহয় আর ঠিক হবে না কোনোদিন। তবু কিছুদিন চলে তাদের সংসার।
কিন্তু একেকটা দিন আসে ভীষণ খারাপ। এদিকে নিকোলের সাথে ঝগড়া, ওদিকে কাজের জায়গায় ধ্যাঁতানি, সারাক্ষণের অভাব, বাসস্থানে দূরসম্পর্কের আত্মীয়স্বজনের ঠান্ডা নজর, ব্রেন্ডাও যেন হাল ছেড়ে দিয়েছে... মাথাটা হিমশীতল অপরাধীর মত হয়ে ওঠে গ্যারির। একরাতে দু’দুটো ডাকাতি আর খুন করে ফেলে।
রাতেই ধরা পড়ে নিজের প্রিয় ভ্যানগাড়িটায় পালাতে গিয়ে। বিচার হয় কয়েক সপ্তাহ ধরে। শাস্তি হয় – মৃত্যুদন্ড। আপীল করা তার অধিকার। কিন্তু সে কোর্টকে জানায়, “যদি মৃত্যুদন্ড ঘোষণাটা ঠাট্টা না হয়, তাহলে প্লীজ, যে তারিখ দিয়েছেন সেই তারিখেই যেন মৃত্যু দেওয়া হয়।”
ব্যাস, আপীল না করা ছোট্টো কিন্তু রোমাঞ্চকর খবর হয়ে যায় স্থানীয় সংবাদপত্রে।
এই অব্দি প্রথম খন্ড। খন্ডটির নাম ‘পশ্চিমা কন্ঠস্বর’। এখানে পশ্চিম বলতে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম। এই পশ্চিম কতখানি জুড়ে তা আমি জানিনা তবে যে উটার গল্প সে উটা রাজ্যে, কাহিনীর ইঙ্গিতে স্পষ্ট, গোঁড়া ধর্মাবলম্বী, নীতিবাগীশ সাদা মানুষদের সাংস্কৃতিক প্রভুত্ব। পুরো কাহিনীতে চরিত্রদের আসা যাওয়ার পথে (একমাত্র গ্যারির জেলের অভিজ্ঞতা ছাড়া) একজন কালো মানুষ বা একজন লাল মানুষের দেখা নেই। পরিবারে, পথে, শরাবখানায়, প্রশাসনে মানুষদের কথাবার্তায় যে মানসিক গঠন দেখা যায়, অন্যধরণের মানুষদের উপস্থিতি সম্পর্কে একটা সহজাত অচেতনতা – এ যেন একশো বছর আগেকার দক্ষিণ এমেরিকা। শুধু তফাৎ এই যে তাদের ছিল ভীতি এবং অস্বীকৃতি, এদের, অচেতনতা। খুবই উল্লেখযোগ্য যে গ্যারি নিজেও কালো মানুষদের ঘৃণা করে – ব্ল্যাকহেটার। (আবার নেট ঘাঁটলাম। উটা প্রদেশে সাদা মানুষের প্রতিশত ৯৫। কালোর প্রতিশত ১এর কিছু বেশি। হিস্প্যানিওল ৪এর কাছাকাছি।)
দ্বিতীয় খন্ড শুরু হয় স্থানীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত ওঁই খবরটির সুত্রে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই সংবাদমাধ্যমের যোগাযোগে খবরটি পৌঁছে যায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণকেন্দ্র নিউইয়র্কের মিডিয়া-তারকাদের কানে। সেদিনই আবার জিমি কার্টার ভোটে জেতেন। কিন্তু সে শোরগোলেও চাপা পড়েনা উত্তেজক খবরটা – দশ বছরে এমেরিকায় প্রথম মৃত্যুদন্ড। খোদ উটায় ষোলো বছর পর। তারপর আসামী আবার বলে যে সে আপীল করবে না। দাবী করে যে নির্ধারিত দিনেই যেন তাকে মৃত্যদন্ড দেওয়া হয়!
ছুট! ছুট! ছুট!
পঙ্গপালের মত যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চল মানে কস্মোপলিস থেকে ধেয়ে আসে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি, বৈদ্যুতিন সম্প্রসার-মাধ্যমের প্রতিনিধি আর মানবাধিকার কর্মীরা। কী বিরাট হইচই। গ্যারি গিলমোরের এক্সক্লুসিভ, গ্যারির পরিবারের একেকজনকে খুঁজে খুঁজে ইন্টারভিউ, স্টোরি, বাইট, ফুটেজ... । গ্যারির নামে গেঞ্জি বেরিয়ে গেল, গ্যারির ফ্যানমেল আসতে শুরু করে দিল দিস্তা, দিস্তা। রাতারাতি গ্যারি হয়ে গেল স্টার।
ওদিকে মানবাধিকার কর্মীদের শুরু হল গ্যারিকে বিরক্ত করা আর বই ঘাঁটা। কেন সে আপীল করবে না? আসামী না চাইলেও কি মানবাধিকারের তাগিদে কোনো কোনো সংস্থা বা ব্যক্তি উটা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ফেডারেল সুপ্রীম কোর্টে মামলা দায়ের করতে পারে না?
এরই সাথে শুরু হল এক অন্তঃসলিলা কাব্য। গ্যারির হাতে ভাষা ও শিল্প তো ছিলই। নিকোলকে প্রেমপত্র লেখা শুরু করল পাতার পর পাতা। নিকোল, শরীরসর্বস্ব জগতে বড় হয়ে ওঠা নিকোল সেই প্রেমপত্র পড়তে লাগল। একদিকে গ্যারির কাছে একনিষ্ঠ থাকার চেষ্টা, অন্যদিকে এতদিনকার জীবনের বহুবিধ পুরুষসঙ্গ – নিকোলকে ভর্ত্তি করতে হল মানসিক চিকিৎসালয়ে। সেখানে নিকোল নিজেকে পুনরাবিষ্কার করল কবি হিসেবে। তার কবিতাগুলো পেয়ে গ্যারি যত্ন করে রাখতে লাগল বাক্সে। আর গ্যারির চিঠি জমা হতে থাকল নিকোলের বাক্সে।
বাণিজ্যের কী নজর! খোঁজ পড়ল সেই চিঠি আর কবিতার। হাতে আসার আগেই স্বত্বাধিকার বিক্রী হতে শুরু করল এক হাত থেকে অন্য হাতে। গ্যারি তো এখন বড়লোক। কিছু নিকোলের নামে লিখে দিল।
মিডিয়া আর মানবাধিকারের কাজ একে অন্যকে সাহায্য করল। মিডিয়া চাইছিল গ্যারির মৃত্যুদন্ড বলবৎ হোক। সেদিনটা হবে কার্নিভালের মত। জবরদস্ত ক্লাইম্যাক্স। কিন্তু একটু দেরি হোক তাতে। তাহলে স্টোরিলাইনগুলো যতদূর সম্ভব ডেভেলাপ করা যাবে। বাণিজ্য বাড়বে। মানবাধিকারের হস্তক্ষেপ বার বার খেপে খেপে সেই কাজটাই করে দিচ্ছিল।
অবশেষে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হল গ্যারিকে। জেল ক্যাম্পাস গাড়িতে, ক্যামেরায়, ফ্ল্যাশে ছয়লাপ। বিমানবন্দরে চার্টার্ড প্লেন দাঁড়িয়ে আছে ডজনখানেক।
জেল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ভাড়া করা ঘাতকের দল একটা পর্দার আড়াল থেকে বন্দুকের একঝাঁক গুলিতে প্রাণ শেষ করে দিল তার।
নিকোল তার দুই বাচ্চাকে নিয়ে চলে গেল দূরে।
মর্মন সমাজে শান্তি নেমে এল।
  
প্রথম যৌবনে ডাকাতির অপরাধে জেল হওয়ার পর গ্যারি মাকে বলেছিল, “ওরা আর কী কষ্ট দেবে আমায়? যা কষ্ট আমি নিজেকে দিয়েছি!” তৃতীয় দুনিয়ার দারিদ্র্যে জীবন কাটানো আমাদের কাছে আপাত-দুর্বোধ্য এই উক্তিটার মধ্যে রয়েছে গ্যারির পারিবারিক বিশৃংখলা এবং এমেরিকার সমাজে শৈশব ও কৈশোরের নিদারূণ সঙ্কট।
দ্বিতীয়বার জেলে যাওয়ার সময় আদালতে দাঁড়িয়ে গ্যারি একটা সংক্ষিপ্ত মর্মস্পর্শী বক্তৃতা দিয়েছিল। বিচারকের উদ্দেশ্যে দেওয়া সেই বক্তৃতা এখানে উদ্ধৃত করছি না। কিন্তু অসাধারণ যুক্তিপূর্ণ কিছু বিশ্লেষণ ছিল তাতে, অপরাধীর সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার জটিলতা সম্পর্কে। বস্তুতঃ গ্যারি সেই জটিলতারই শিকার হল।
উপন্যাসের শেষে একটি উপসংহার (আফটারওয়র্ড) আছে। তাতে লেখক নর্মান মেলার, প্রকাশকের অনুরোধে গ্যারি গিলমোরের মৃত্যুদন্ডের সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত এই উপন্যাসটি রচনার ইতিহাস বলেছেন। তিনবছর ধরে দুই ডজন গবেষক, টাইপিস্ট ও আরো কিছু মানুষজনের সাহায্য নিয়ে, ঘটনাবলীর সাথে জড়িত মানুষগুলোর সাক্ষাৎকার (একশো জনেরও বেশি), নোট্‌স (যার মোট আয়তন প্রায় পনেরো হাজার পৃষ্ঠা)... ইত্যাদির বিশ্লেষণ করে এই উপন্যাস রচিত হয়েছে। উপন্যাসকার দাবী করেছেন যে এধরণের লেখায় তথ্যের সাহায্যে সত্যের যতটা কাছে পৌঁছোনো সম্ভব ততটা পৌঁছোবার তিনি চেষ্টা করেছেন।


রূট্‌স (শিকড়)
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। সেখানেই জুফুরে নামের একটি গ্রামে বড় হচ্ছিল কিশোর কুন্টা কিন্টে। বাবা ওমোরো। মা বিন্তা। বংশসূত্রে তারা মালি দেশের কামার এবং মান্ডিঙ্কা উপজাতির বীর কাইরাবা কুন্টা কিন্টের বংশধর।
সেটা ১৭৬৭ সাল। জুলাই মাসের এক ভোরবেলায় কুন্টা গিয়েছিল গ্রামের অদূরে জঙ্গলে। বহুদিন ধরে ইচ্ছে ভালো দেখে একটা গাছের গুঁড়ি কেটে ঢোল তৈরি করবে। তারপর যাবে দূর স্বপ্নের দেশ মালি। মায়ের জন্য, ভাইদের জন্য নানারকম উপহার নিয়ে আসবে। কালো উজ্জ্বল মুখে গুঁড়োকালি মেখে সেজে থাকা গ্রামের তরুণীদের একটিকে বাছবে নিজের ঘর বাঁধতে।
গাছের গুঁড়িটা বেছে ঝুঁকে যাচাই করার মুহূর্তে সে ধরা পড়ল ক্রীতদাস পাচারকারী দালালদের হাতে। মুক্ত হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টায় রক্তাক্ত হতে হতে নিজেকে পেল জাহাজের খোলে – উলঙ্গ, আরো দেড়শো উলঙ্গ দেশবাসীর সাথে। শিকলবাঁধা অবস্থায় চাবুক খেতে খেতে, নিজেদের মল-মুত্র-বীর্যে ঘেয়ো হতে হতে, তিন ভাগের খেপে খেপে মৃত দু’ভাগ বন্দীকে সমুদ্রে ডুবিয়ে দু’মাস পরে এক ভাগ পৌঁছোলো এমেরিকা মহাদেশের উপকূলে। দাসবাজারে তারা ক্রীত হল একে একে। কুন্টা কিন্টের নাম হারিয়ে গেল। মালিকের নামে নামকরণের প্রথায় তার নতুন নাম হল টবি ওয়ালার।
বহুবার পালাবার চেষ্টা করল কুন্টা। শেষ চেষ্টার শাস্তি হিসেবে তার ডানপায়ের পাতার আদ্ধেক কুড়ুল দিয়ে কেটে ফেলা হল। কবে যেন টের পেল সে – সতেরো বছরের কিশোরটি এখন বছর তিরিশের মধ্য যৌবনে। তিরিশও পেরিয়ে গেল। সে কি বাবা হবে না? কাইরাবা কুন্টা কিন্টের বংশ তার, মুক্ত হতে না পারার ব্যর্থতায় হারিয়ে যাবে? ... মাঝে মধ্যেই খবর আসে নানা জায়গায় গোলাম-ব্যারাক থেকে পালাবার, ছোটো ছোটো বিদ্রোহের ব্যর্থ চেষ্টার! ফিসফিসিয়ে কথা বলে তারা রাত্তিরবেলায়। ... এর মধ্যে কুন্টার ভালো লাগে বেল নামে মেয়েটিকে। তার থেকে বড়। মান্ডিঙ্কা পরম্পরায় মেয়ের বয়স পনেরো হওয়ার কথা। বেলের বয়স পঁয়ত্রিশ, নাকি চল্লিশ। ভারি জবরদস্ত স্বাস্থ্যবতী। তবু এই তো তার প্রাণ বাঁচিয়েছিল। কাটা পায়ে গ্যাংগ্রীন হওয়া রুখে দিয়েছিল। রাতের পর রাত জেগে স্নেহে শুশ্রূষায় তাকে সারিয়ে তুলেছিল। ... মালিকের অনুমতি নিয়ে তারা ‘ঝাঁটা ডিঙোয়’ (বিয়ে করে)।
মেয়ে হয়। বড় জেদি কুন্টা – কিছুতেই ছাড়তে চায় না তার আফ্রিকীয় পরিচয়, আত্মবিস্মৃত ক্রীতদাসদের দেখে তার রাগ হয়। সদ্যোজাতকে মায়ের কোল থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায় রাতের আকাশের নির্জনে ... বেল সন্দিগ্ধ স্বরে প্রশ্ন করে, মানে? আগের দুটো বাচ্চা তো কোল থেকেই বিক্রী করে দেওয়া হয়েছিল! কুন্টা জবাব দেয়, “তাই এর নাম ‘কিজ্জী’ মানে ‘এখানেই থাকো’।”
কিন্তু কিজ্জী থাকে না। গোপনভাবে লেখাপড়া শিখে নেওয়ার এবং সেই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে নিজের প্রেমিকের জন্য জাল ‘ট্র্যাভেলিং পাস’ (ক্রীতদাসদের লাগত নিজের মালিকের খামারের বাইরে যেতে – না থাকলে পুলিস ও গোলাম-ধরিয়ে চরেরা বেধরক মার দিয়ে ধরে ফেরত পৌঁছে দিত খামারে) তৈরি করে দেওয়ার গুরুতর অপরাধে শেরিফ তাকে ধরে। তার মালিকের অনুমতি আদায় করে বিক্রী করে দেয় বাজারে।
ষোলো বছরের কিজ্জী নতুন মালিক কর্তৃক প্রতি রাতে ধর্ষিত হতে হতে ভাবে কোথাও জেলের কুঠরিতে মরতে থাকা তার হতভাগ্য প্রেমিকের কথা। ধর্ষণের ফল হয় – একটি সাদাটে সন্তান। ক্রীতদাসের জীবনে সেটা কোনো অপমান নয়, বেঁচে থাকার বিরাট অবলম্বন। নিজেই কিজ্জী তার সন্তানের কানে দেয় জাতিস্মৃতি – আফ্রিকীয় পিতামহের, গোলাম-ধরিয়েদের হাতে ধরা পড়ে সমুদ্র পার হয়ে আসার কাহিনী, পালাবার শেষ চেষ্টায় পায়ের পাতা কাটা যাওয়ার কাহিনী।
কিজ্জীর মালিক ওস্তাদ মোরগ-লড়িয়ে। মোরগ-লড়াইয়ের বাজি জিতেই সে আজ হতদরিদ্র গোলাম-ধরিয়ে চরদের শ্রেণী থেকে উঠে সদ্য-বড়লোক হয়েছে। পাঁচটা ক্রীতদাস পোষার ক্ষমতা রাখে। কিজ্জীর ছেলে জর্জের চোখে সে দেখতে পায় মোরগ-খেলার নেশা। তার নিজস্ব মোরগ-ট্রেনার ক্রীতদাস মিঙ্গোর হাতে সঁপে দেয় জর্জকে।
বড় হতে হতে জর্জ হয়ে ওঠে দশটা খামারে নামডাকওয়ালা চিকেনজর্জ। মালিকের বশম্বদ, মাথায় ডার্বিটুপি, গলায় সবুজ স্কার্ফ। ওস্তাদ মোরগ-লড়িয়ে। পুরো গোলাম-ব্যারাক তার আচার-ব্যবহারে ক্ষুব্ধ।
কোথাও জর্জের মধ্যে একটা দ্বিচারিতা থাকে। শৈশবে মায়ের মুখে শোনা তার আফ্রিকীয় পিতামহের কাহিনী আর কথার ছলে মায়ের মুখ ফস্কে বেরিয়ে যাওয়া শব্দ থেকে বুঝতে পারা যে সে ধর্ষণের সন্তান – ওই ‘মাস্‌সা’ (মাস্টার শব্দের মৌখিক বিকৃতি, মালিকদের প্রতি গোলামদের সাধারণ সম্বোধনসূচক) টম লীই তার পিতা – তার ভিতরে দ্বিচারিতা গড়ে দেয়। একদিকে মালিকের মোরগটিকে জেতাবার জন্যে জান লড়িয়ে দেয়, অন্যদিকে পাতি মোরগ-খেলায় বাতিল মোরগগুলো নিয়ে যাওয়ার অনুমতি আদায় করে মোট বাজির টাকার কিছুটা পুরস্কার হিসেবে পেয়ে জমিয়ে রাখতে, যাতে কোনোদিন সে নিজেকে ও মাকে মুক্ত করার দাম মালিককে, থুড়ি, পিতাকে দিতে পারে।
সে সময়টা বিদ্রোহের ও বিদ্রোহদমনের গল্প বারবার দক্ষিণ এমেরিকার এদিক ওদিক থেকে, বিভিন্ন খামার ও রাজ্য থেকে ফিরে ফিরে আসার সময়। অন্যদিকে দাসপ্রথার বাইরে থাকা উত্তর এমেরিকায় ইংল্যান্ডের বিরূদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলন গড়ে ওঠার খবর আসার সময়। প্রতিটি খামারে, গোলামঘরগুলোতে ফিসফাস, উত্তেজনা, উদ্দীপনা ও কিছুদিন পর বিমর্ষতা প্রায় অভ্যাসে পরিণত হওয়ার সময়।
চিকেনজর্জ বিয়ে করে অন্য খামারের ক্রীতদাসী ধর্মভীরু মাটিল্ডাকে। জর্জের মালিক মাস্‌সা লী মাটিল্ডাকে কিনেও নেয় যাতে দুজনে একসাথে থাকতে পারে। সচরাচর ক্ষেতখামারে কাজ করা ক্রীতদাসেরা পায় না এ সুযোগটুকু। জর্জ পায় চিকেনজর্জ বলে। মাটিল্ডার গর্ভে একে একে সন্তান জন্মায় সাতটি। চার ছেলে, তিন মেয়ে। ওদিকে নিজের দ্বিচারিতায় জর্জ একদিকে মালিকের চামচা, একনম্বর দারুবাজ ও মাগীবাজ। অন্যদিকে স্নেহশীল পিতা ও শুধু কিজ্জী নয় পুরো গোলাম-ব্যারাকের মুক্তি কিনে দেওয়ার ইচ্ছে রাখা সন্তান। নিজের তৃতীয় ছেলে, যার নাম মালিকের নামে ‘টম’, তাকে ওস্তাদ কামারের শাগরেদী করতে পাঠিয়ে দেয় মালিকের কাছে তদ্বির করে।
টম ফিরে আসে ওস্তাদ কামার হয়ে, মালিকের খামারে জায়গা পায় দোকান খোলার। মালিকের আয় বাড়ে, টমের কারিগরী শিল্পের সুনাম পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সুদিন থাকে না। খুব বড় একটা মোরগখেলায় বাজি ধরে সর্বস্বান্ত হয় টম লী। বাজির পুরো টাকা দিতে না পারার খেসারৎ হিসেবে চিকেনজর্জকে দিয়ে দেয়।
চিকেনজর্জ নতুন মালিকের সাথে কয়েক বছরের জন্য চলে যায় ইংল্যান্ড। ওদিকে টম লী সব কিছু খোয়াতে খোয়াতে শেষে কিজ্জী ও আরো তিনজন বুড়োবুড়ি ছাড়া বাকি সব ক্রীতদাসদের বেচে দেয় অন্য খামারমালিকের হাতে।
নতুন খামারে মাটিল্ডার অভিভাবকত্বে ও টমের নেতৃত্বে পুরো পরিবার আগের থেকে অনেক সুখেই দিন কাটাচ্ছিল। নতুন মালিকেরাও একটু উদারপন্থী। সময়টাও বদলাচ্ছে। রেললাইন আসছে। টেলিগ্রাফ আসছে। কিছু বছর আগেই হাইতির সফল বিদ্রোহ তার রক্তাক্ত দমন সত্ত্বেও ছাপ রেখে গেছে হাওয়ায়। ওদিকে উত্তর এমেরিকায় স্বাধীনতা ঘোষণাও হয়ে গেছে। দক্ষিণ তৈরি হচ্ছে ইয়াঙ্কি উত্তরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য। ...এমনই আবহাওয়ায় প্রতিশ্রুত সময়ের তিন বছর বেশি লন্ডনে কাটিয়ে ফিরে আসে চিকেনজর্জ।
নিজের খামারে গিয়ে দেখে কেউ নেই। শুধু স্মৃতিভ্রষ্ট রাঁধুনী মালিজী মাসী, আর আগের মতই পাজি কিন্তু সর্বস্বান্ত কঙ্কাল টম লী। মা কিজ্জী অদূরে মাটির নীচে। কবে যেন শায়িতা। মালিককে ঠেসে মদ গিলিয়ে, সিন্দুক ভেঙে নিজের মুক্তিপত্র মুঠোয় নিয়ে বেরিয়ে যায় চিকেনজর্জ, ঘোড়া টগবগিয়ে নিজের পরিবারের খোঁজে।
নতুন খামারের বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে টমের বৌ, আধাকালো-আধাইন্ডিয়ান আইরিন সবচেয়ে আগে দেখতে পায় লোকটিকে। ঘোড়ার পিঠে এগিয়ে আসছে – কালো ডার্বি, সবুজ স্কার্ফ। এত গল্প শুনেছে সে নিজের শ্বশুরের! চেঁচিয়ে ওঠে, “চিকেনজর্জ! চিকেনজর্জ!”
এতদিন পর নিজের পরিবারের কাছে ফিরেও থাকা আর হয় না তার। কেননা আইন অনুসারে দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে মুক্ত গোলামদের স্থান নেই। পরিবারের স্বার্থে চিকেনজর্জ হারিয়ে যায় আবার।
ওদিকে যুদ্ধ তীব্রতর। প্রতিদিন মন ভেঙে দেওয়া খবর আসছে যে দক্ষিণের সঙ্ঘ জিতছে। ক্রীতদাসপ্রথা ঘুচিয়ে নতুন যুক্তরাষ্ট্র গড়তে চাওয়া উত্তরের সেনা হারছে।
অবশেষে দিন ঘুরতে শুরু করে। দক্ষিণের সঙ্ঘ একের পর এক যুদ্ধক্ষেত্রে হারতে হারতে শেষে আত্মসমর্পণ করে। যুক্তরাষ্ট্র এমেরিকা গঠিত হয়। দাস-মালিক ও আরো হরেকরকম সাদা-জিগিরদারদের মুখ চুন করে ক্রীতদাসপ্রথা আইনতল নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।
দু’এক রাতের উৎসব। তারপরেই সত্যটা মুখব্যাদান করে সামনে দাঁড়ায়। মুক্ত হলেই বা কী? কাজও করেই তো খেতে হবে! তা পুরোনো মালিকের খামারে কাজও করে খাওয়াই তো ভালো!... কিন্তু বুড়ো চিকেনজর্জ ঘোড়ায় চড়ে বীরের মত ফেরে মুক্ত দক্ষিণে। নতুন স্বপ্ন দেখায়, “চল, নতুন জমি আবাদ করি”। দুই ডজন গাড়ির ক্যারাভানে মাস্‌সা মারে’র গোলামপরিবারগুলো সবাই পাড়ি দেয় নতুন আবাদের মুক্ত দিগন্তে।
সেখানেও অবরোধ – কালোদের প্রতি ঘৃণা সেখানেও কম নয়। কিন্তু তারা আজীবন দাসত্ব করেছে। কঠিনতম পরিস্থিতিতেও জীবনের ফসল বুনতে তারা অভ্যস্ত। তারাই তো ক্ষেতে, খামারে, রেলপথে, কাঠকলে, কামারশালায় তিলে তিলে গড়ে তুলেছে এমেরিকা!
তারা বেঁচে থাকে। স্বচ্ছল হয়ে ওঠে। তারা গড়ে তাদের বাড়িঘর, তাদের সন্তানদের স্কুল, তাদের নিজস্ব গির্জা। এমনকি ধীরে ধীরে ওই অঞ্চলের স্বনামধন্য পরিবার হয়ে ওঠে তারাই।
টম, যে কামার হয়েছিল, চিকেনজর্জের তৃতীয় ছেলে, আফ্রিকার জুফুরে গ্রাম থেকে ধরে নিয়ে আসা ক্রীতদাস কুন্টা কিন্টের প্রপৌত্র, তার কনিষ্ঠ মেয়ে হল সিন্থিয়া। সিন্থিয়া আর উইল পামারের মেয়ে হল বার্থা, বার্থা জর্জ। বার্থা জর্জ ও সাইমন এ∙ হ্যালির সন্তান হলেন এই উপন্যাসের রচয়িতা এলেক্স হ্যালি।    

উপন্যাসের শেষ অধ্যায়ে লেখক কুড়ি পৃষ্ঠায় বলেছেন তাঁর বারো বছরের গবেষণার রোমাঞ্চকর কাহিনী। গাম্বিয়ায় সেই জুফুরে গ্রামে গিয়ে মৌখিক ইতিহাস-কইয়ে পরম্পরাগত ‘গ্রিয়ট’দের কাছে মান্ডিঙ্কা উপজাতি ও কিন্টে বংশের কাহিনী শোনা, গ্রামের মানুষদের কাছে কিন্টে বংশের বংশধর হিসেবে স্বীকৃত ও অভিষিক্ত হওয়া, পোর্ট লুইসের নথীপত্র ঘাঁটা, আন্নাপোলিস বন্দরের মালখানার রেকর্ড ঘাঁটা, স্পট সিল্ভানিয়া কাউন্টির দাস কেনাবেচার রেকর্ড দেখা, শেষে অন্তর্বাস পরে জাহাজের খোলে বারো রাত এটলান্টিকের দোলায় লোহা আর কাঠের ঘষা খাওয়া। মাথার মধ্যে ছিল সেই জাতিস্মৃতি যা বাপমাহারা ধর্ষিতা মা কিজ্জী ও তার সন্তান চিকেনজর্জের আদেশ মত কুন্টা কিন্টের বংশধরেরা পরবর্ত্তী প্রজন্মের কানে দিয়ে গেছে – আদিদেশ আফ্রিকা, ‘ক্যাম্বি-বোলোঙ্গো’ নদী, ভোরের জঙ্গলে ঢোলের জন্য গাছের গুঁড়ির খোঁজ, ক্রীতদাস-বাহক ‘টোবর’ জাহাজের খোলে ছয় চাঁদের (তিন মাসের) নারকীয় সফর, পালাবার শেষ চেষ্টায় পায়ের পাতা কাটা পড়া।
ছ’শো অষ্টআশি পৃষ্ঠার এই বই কালো মানুষের চোখ দিয়ে দেখা এমেরিকা দেশটার গড়ে ওঠার ইতিহাস।
এবং এই কালো মানুষ সত্তরের দশকের ব্ল্যাকপ্যান্থার বা কোনো উগ্রপন্থী নয়। কালো নেতা ম্যালকম এক্সের আত্মজীবনী লেখক ছিলেন এলেক্স হ্যালি। ‘রূট্‌স’ তাঁর দ্বিতীয় বই। ঘাতকের হাতে নিহিত ম্যালকম এক্স, কালো ও সাদা মানুষদের একসঙ্গে মিলে মিশে কাজও করার প্রয়োজনের কথা বলতেন।


বিয়ন্ড দ্য মেল্টিং পট
‘বিয়ন্ড দ্য মেল্টিং পট’। বাংলা করতে গেলে অর্থের দিক থেকে ‘পুনর্গঠনের সূচনা’ই করতে হয়, ‘গলনপাত্রের ওপারে’ করার কোনো অবকাশ নেই। তবে ‘মেল্টিং পট’ কথাটার মধ্যে একটা কাব্যিক ভাব আছে। বইটির যুগ্ম রচয়িতা নাথান গ্লেজার এবং সেই ভারত-পরিচিত ড্যানিয়েল প্যাট্রিক ময়নিহান। বিংশ শতকের সত্তরের দশকে নিউইয়র্ক মহানগরে বসবাসকারী সংখ্যালঘু যথা নিগ্রো, পুয়ের্তোরিকান, ইহুদি, ইটালিয়ান এবং আইরিশ জনগোষ্ঠির সমস্যাবলী নিয়ে একটি সমাজশাস্ত্রীয় গবেষণা।
তবে এই বইটির প্রসঙ্গে আসার আগে উপরোক্ত দুটো উপন্যাসকে পাশাপাশি রেখে দেখি কী কী দুটোতেই সমানভাবে পাওয়া যায়। প্রথমেই দেখা যায় এমেরিকান শ্রমের প্রকৃতি। জাত চেনা যাকে বলে আর কি। লেখকদ্বয়ের তথ্যনিষ্ঠা শিক্ষণীয়। দ্বিতীয় বিশেষত্ব হল বাস্তব ঘটনার চিত্রায়ণ। বাস্তব ঘটনার চিত্রায়ণ বলেই তথ্যনিষ্ঠার প্রয়োজন অতটা বেশি ছিল। কিন্তু জানতে ইচ্ছে করে ১৯৭০এর দশকের এমেরিকায় বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে আর কোন কোন উপন্যাস লেখা হয়েছিল এবং এটা কোনো ঝোঁক ছিল কিনা সেই দশকের। আর, যদি ছিল তবে কেন ছিল। বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশক আন্তর্জাতিক স্তরে একটি বিশেষ দশক, তাই জানতে চাই। তৃতীয় বিশেষত্ব হল রাষ্ট্রযুক্তি। যদিও দুটো উপন্যাসের কাল এবং পাত্র ভিন্ন, স্থান কিন্তু একটাই – এমেরিকা। অথবা ঘুরিয়ে বললে, স্থান আলাদা হলেও কাল কিন্তু একটাই –এমেরিকা। এলেক্স হ্যালির উপন্যাসের বিষয়টাই এমন যে ইতিহাসের বিশাল প্রবাহে তিনি একটি তন্বী স্রোতস্বিনীর পরিচয় খুঁজতে খুঁজতে এগিয়েছেন। আবার সেই পরিচয়েই চিহ্নিত করেছেন ইতিহাসের প্রবাহটিকে। শতাব্দীব্যাপী এক পারিবারিক দিনপঞ্জী। শিকড় থেকে শুরু করে প্রধান কান্ডটিকে আকাশের দিকে এগিয়ে দিতে গিয়ে নির্মম হাতে বাদ দিয়েছেন গোড়ার দিকের ডালপালার বিস্তার। কুন্টা বন্দী হওয়ার পর তার বাবা-মা ওমোরো আর বিন্তার কী হল? উপন্যাসে নেই। মালিক তাদের মেয়ে কিজ্জীকে বিক্রি করে দেওয়ার পর কুন্টা ও বেলের কী হল? উপন্যাসে নেই। ... কাব্যধর্মী এই উপন্যাসের শেষ একটি গূঢ় নীতিবাক্য বা বাকধারা দিয়ে – ‘জয়ীরাই ইতিহাস লেখে’।
কাদের জয়? কাদের ওপর? কালোদের জয়? সাদাদের ওপর? আফ্রিকার জয়? এমেরিকার ওপর? কোনোটাই না। মুক্তিসংগ্রামের জয়? দাসপ্রথার ওপর? অবশ্যই। কিন্তু আরো কিছু। ভালোবাসার জয়। ঘৃণার ওপর। আর একটি দৃষ্টিভঙ্গীর জয় – এমেরিকা আমাদেরও, ঠিক ততটাই যতটা তোমাদের। মাটিতে রক্ত ঝরিয়ে, ফসল ফলিয়ে সেই অধিকার আমরা অর্জন করেছি। এই বহুবর্ণী এমেরিকাকে অস্বীকার করতে চেও না, কুক্ষিগত করতে চেও না, নিজেরাই শেষ হয়ে যাবে।
নর্মান মেলার স্টাইলের দিক দিয়ে বেশি আধুনিকতাবাদী। কাব্যধর্মীতা, নীতিবাক্য ইত্যাদি নেই; কাটাকাটা ভাষা। বিষয়টাও অন্যরকম। যেন ১৯৭৬ সালের এমেরিকার সমাজজীবনের অনুপ্রস্থফলক। কিন্তু নামটা লক্ষ্য করেছেন? ঘাতকের গান। কে ঘাতক? জেলার? ভাড়াটে ঘাতকেরা? প্রোভোর জেল? উটার কোর্ট? পূর্বদিক থেকে উড়ে আসা মিডিয়াতারকারা, যারা গ্যারির মৃত্যুটাকে লোভনীয় পণ্যসামগ্রী করে তুলছিল? নাকি পুরো সমাজজীবনটাই – ঘাতক ঔদাসীন্যে, ঘাতক শাসনতন্ত্রে এবং ঘাতক পণ্যমন্ত্রে পর্যবসিত?
সুইডিশ চলচ্চিত্র পরিচালক ইংগমার বার্গম্যানের একটা ফিল্ম দেখেছিলাম, ‘ফ্যানি অ্যান্ড এলেকজান্ডার’। দুই শিশু ভাইবোন। শৈশব কাটছিল আমাদের সাধারণ পৌত্তলিক হিন্দু সমাজের মত সবকিছু মানিয়ে হাসিখুশি চলা এক ক্যাথলিক পরিবেশে। সেখানে মজার খুড়ো জোরদার পাদে মোমবাতি নিভিয়ে দেয়, আবার বাবা-মা যখন তখন কাপড় নামিয়ে যৌন-আদর শুরু করে দেয়। শুধু হুল্লোড়েই বাচ্চাদুটোর বারোটা বাজছে দেখে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হল তাদের গভর্নেসের প্রটেস্ট্যান্ট পরিবারে (আমাদের ব্রাহ্ম পরিবারের মত কী?)। সেখানে কঠোর নিয়মতন্ত্র এবং হিমশীতল আধ্যাত্মিকতা। বাচ্চাদুটো পাগল হয় বলে এবার। ... শেষ একটা চার্চ থেকে, ক্রিসমাসের প্রার্থনার পর বেরিয়ে আসা মানুষজনের সঙ্গে তারাও বেরুচ্ছে। নানাজনের মুখে নানারকম সৌজন্যবিনিময়। ওদের দুজনের, একে অন্যের সঙ্গে ফিসফিসিয়ে আশ্রাব্য অশ্লীল গালিগালাজের বিনিময়। ওদের নীট শিক্ষাপ্রাপ্তি ওইটুকুই।   
নর্মান মেলারের উপন্যাসের মর্মন সমাজ ও উটার শাসনতন্ত্র যেন ওই প্রটেস্ট্যান্ট পরিবেশ। তথানামিত ‘পশ্চিমা কন্ঠস্বর’। আর নিউইয়র্ক থেকে ধেয়ে আসা মিডিয়া আর মানবাধিকার যেন ওই ক্যাথলিক পরিবেশ – ‘পূরবিয়া কন্ঠস্বর’। নীটফল অপরাধ-মনস্কতা, উন্মাদ-অবস্থা, ড্রাগ্‌স, যৌন-আধিক্য আর হিংসা।
দুটো উপন্যাসের একটিতে জর্জ ওয়াশিংটনের সময় থেকে আব্রাহাম লিঙ্কনের সময়, আবার সেখান থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময় অব্দি ইতিহাস প্রসঙ্গ রয়েছে। কালো এলেক্স হ্যালি এমেরিকার কোস্টগার্ডের চাকরী থেকে অবসর নিচ্ছেন। তাঁর বাবার নামে রাস্তা আছে এমেরিকার মাটিতে। বহুবর্ণী, বহুধর্মী এমেরিকান জাতি যেন পুরোপুরি প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে।
যে বই থেকে এই অংশের উপশীর্ষকটা (বিয়ন্ড দ্য মেল্টিং পট) ধার নিয়েছি সে বইয়ের ৩১৩ সংখ্যক পৃষ্ঠায় একটি উদ্ধৃতি পাচ্ছি। ১৯০৪ সালে প্রকাশিত ‘এক এমেরিকান কৃষকের পত্রাবলী’ নামক বইয়ে জনৈক মিশেল-গিলেম জাঁ দ্য ক্রেভাকুর স্বপ্ন দেখেছিলেন যে এমেরিকার বিভিন্ন ধার্মিক ও জাতীয় পরিচয়গুলি মিশ্র-প্রতিবেশ ও বিবাহের মাধ্যমে গলে গিয়ে এক হয়ে যাচ্ছে।
“এই মিশ্র-প্রতিবেশ এক অদ্ভুত ধার্মিক খিচুড়ি দেখাবে যা না বিশুদ্ধ ক্যাথলিসিজম থাকবে না বিশুদ্ধ ক্যালভিনিজম। এমনকি প্রথম প্রজন্মেই লক্ষণীয় ঔদাসীন্য দেখা যাবে; এবং হতেই পারে যে এক ক্যাথলিকের মেয়ে অপসৃত [ক্যাথলিক মত থেকে] একজনের ছেলেকে বিয়ে করবে এবং নিজের বাবামায়েদের থেকে দূরত্ব রেখে বসবাস করবে। তাদের সন্তানদের তারা কী ধর্মশিক্ষা দেবে? ত্রুটিপূর্ণ কিছু একটা! যদি আশেপাশে কোনো উপাসনা-স্থান থাকে, আমরা ধরে নেব বন্ধুসভার [কোয়্যাকার] বৈঠক, নিজেদের ভালো জামাকাপড় না দেখিয়ে তারা বরং ওইখানেই যাবে, কেউ কেউ নিজেকে যুক্তও করবে ওই সমাজের সাথে। অন্যেরা খাঁটি উদাসীন থাকবে। ...
“এভাবে সব মত ও জাতি মিশ্রিত হচ্ছে, ধার্মিক ঔদাসীন্য অগোচরে ছড়িয়ে পড়ছে মহাদেশের এক কোণ থেকে আরেক কোণে; আজকের দিনে এটাই এমেরিকানদের প্রবলতম বৈশিষ্ট।”
এই বৈশিষ্ট ক্রুভাকুরের সময় দৃষ্টিগোচর হলেও বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকের এমেরিকায় এর উল্টোটাই ঘটছে। ‘বিয়ন্ড দ্য মেল্টিং পট’ বইটার লেখক দুজন দেখছেন ধর্মমত ও পন্থাগুলি দানা বেঁধে উঠছে আরো বেশি। দুই মতের পরিবারে বিয়ে হলে দুটো মতই দুর্বল হবে এই কথাটা মিথ্যা প্রমাণিত করে স্থানপ্রধান মতটির মানুষ বেড়ে উঠছে।
আর বর্ণের তো কথাই নেই। লেখকদ্বয় বলছেন, “বেশির ভাগ জাতিগোষ্ঠির [এথনিক গ্রুপ] বিশিষ্ট জাতীয় [ন্যাশন্যাল] দিকগুলোর কোনো গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন, তৃতীয় প্রজন্ম অব্দি প্রায়শঃ বেঁচে থাকে না। যদি না রঙের প্রশ্ন থাকে। এটাই সাধারণ নিয়ম।” অর্থাৎ রঙের প্রশ্ন থাকে। আর যদি সমাজটা ‘ঘাতকের গান’এর সমাজ হয়?
১৯৬০-৭০এর এমেরিকায় নাগরিক অধিকারের আন্দোলন, বর্ণবৈষম্য, দাঙ্গা, প্রতিবাদ, কৃষ্ণাঙ্গচেতনা ইত্যাদির ইতিহাস সর্ববিদিত। ম্যাককার্থিজম ও কম্যুনিস্ট-শিকারের ইতিহাসও সবাই জানে। কিন্তু, একটা অন্য প্রশ্ন ভাবায়। শতাব্দীর শুরুতেই আমেরিকান সমাজের উঠতি স্পন্দিত গণতন্ত্র একচেটিয়া পূঁজির আধিপত্যে ও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হচ্ছিল। জন দস পাসসের ট্রিলজিতে সমাজের ভিতরমহলে এই পরিবর্তনের প্রভাবটা ধরা আছে। মিশেল-গিলেম জাঁ দ্য ক্রেভাকুর যে সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা থেকে ‘বিয়ন্ড দ্য মেল্টিং পট’এ বিধৃত পরিস্থিতি অব্দি আমেরিকান সমাজের অধোমুখী যাত্রা কি রাষ্ট্রশক্তির চরিত্রবদল-জনিত? একচেটিয়া ও পরে বহুরাষ্ট্রিক-পূজির আধিপত্য জনিত?
এখন কী অবস্থায় আছে এমেরিকান জাতির মিলনপ্রক্রিয়া?
এমেরিকার সমাজ সম্পর্কে আমার কোনো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই। ঔৎসুক্য অবশ্যই আছে। এমেরিকান রাষ্ট্রশক্তির আগ্রাসননীতি, এমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের হামলা ইত্যাদির বিরুদ্ধে পথে নামি মাঝে মধ্যেই। কিন্তু দেশটা তো প্রিয়! ওয়াল্ট হুইটম্যানের দেশ, জ্যাক লন্ডনের দেশ, ল্যাংস্টন হিউজ ও পল রবসনের দেশ এমেরিকা। এমেরিকার শ্রমশক্তির ওপর শ্রদ্ধা লেনিনই তৈরি করে দিয়ে গেছেন। তাই একটু আগের আলোচনার সুত্র ধরে দুটো হাইপথেটিক্যাল মন্তব্য করার দুঃসাহস করে লেখাটা শেষ করতে চাই।
প্রথমতঃ এমেরিকান গণতন্ত্রে, সমাজে সাম্রাজ্যবাদের স্বীকৃতি, ‘ন্যায়সঙ্গতি’ (ওই পাসসের ট্রিলজির নাম অনুসারে ‘১৯১৯’এর এমেরিকার ‘ফর্টিসেকেন্ড প্যারালাল’ ধরে ‘বিগ মানি’র আমেরিকা হয়ে ওঠা) ধর্ম, জাতি ও বর্ণবৈষম্য ঘুচিয়ে এমেরিকান জাতি হয়ে ওঠার মহামিলন প্রক্রিয়া কে স্তিমিত ও অবরূদ্ধ করে রেখেছে। এমনকি সংকটের দশকগুলোতে বিপরীতমুখীন করে বাড়িয়ে তুলেছে বর্ণ, জাতি ও ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠী ও ‘ভোটব্লক’ নির্মাণপ্রক্রিয়া। বারাক ওবামা আজ রাষ্ট্রপতি। তবুও মনে হয় আমি ভূল বলছি না। কেননা নতুন অর্থনীতির ‘গ্রেট কন্সেন্সাস’টা যে সামাজিক ভুগোলে সীমিত, দূর থেকে সব দেশেরই ওই কস্মোপলিটান অংশটাই আগে ফোকাসে আসে।
দ্বিতীয়তঃ, এমেরিকার ‘অতীত’ নেই এটা যেমন ওই দেশটার শক্তির উৎস, এমেরিকা ‘অতীত’কে যে হত্যা করেছে তার অভিশাপ ভিতরে দুর্বলতাও ছড়িয়ে রেখেছে। বিপজ্জনক ধাঁধা মনে হচ্ছে কি?
এই যে আমাদের দেশে প্রবণতা আছে অতীতচর্চার, প্রাচীন যুগের সোনার থালা ধুয়ে জল খাওয়ার... এটা একটা বোঝা। সৃজনী-উদ্ভাবনী চ্যালেঞ্জ স্বীকার করার গতি শ্লথ করে দেয়। এমেরিকা আড়াইশো বছরের আগে নেই। কিছুই নেই। বিভিন্ন দেশের মানুষ, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এসে এমেরিকাকে তৈরি করেছে। তাই তাদের সৃজনী-উদ্ভাবনী চ্যালেঞ্জ নিয়ে খেলা করার প্রবণতা বিস্ময়কর। (হঠাৎই মাথায় খেলে গেল- বরেন বসুর ‘রঙরূট’ উপন্যাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন উত্তরবঙ্গে এমেরিকান সৈন্যের প্রবেশ এবং ব্রিটিশদের থেকে তাদের এ্যাটিচুডের তফাৎ - লেখকের মন্তব্য; সেটা ওই গণতান্ত্রিক সমাজের প্রতিফলন)
কিন্তু এটা অর্ধসত্য। আরেকটা দিক হল যে ওই মাটির একটা অতীত ছিল। অত্যন্ত মানবিকসম্পদশালী অতীত। লালমানুষদের অতীত। পরবর্ত্তী এমেরিকা, ব্রিটিশ উপনিবেশ এমেরিকা, ধনতান্ত্রিক এমেরিকা, সাম্রাজ্যবাদী এমেরিকা সেই অতীতকে হত্যা করেছে। ধ্বংস করেছে, হাজার হাজার মানুষকে সংহারের লীলা চালিয়েছে শতাব্দীকাল ধরে।
তার অভিশাপ যেন ‘ঘাতকের গান’এর ছত্রে ছত্রে দেখা যায়। কী নিদারূণ আত্মিক অবলম্বনহীনতা। কী ভয়াবহ শূণ্যতা। একজন ভালো ধার্মিকও নেই সমাজে। আবার একজন ভালো অধার্মিকও নেই। দর্শনচিন্তার জায়গায় পৌঁছোলেই মানুষগুলোর কথাবার্তা কী অদ্ভুত ফাঁপা আর করুণ হয়ে পড়ছে। পণ্যদেবতার অধিষ্ঠানের যেন আদর্শ বেদীমূল!
*২০১১ সাল, অর্থাৎ এই লেখাটার রচনাকাল থেকে ৩৩ বছর আগে।


সংযোজন
যখন লেখাটা তৈরি করেছিলাম তখন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ছিলেন বারাক ওবামা। গত বছর জিতলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি যিনি জনতার ভোটে পরাজিত হলেও নির্বাচক ভোটে জয়ী ঘোষিত হয়েছেন। যিনি জনতার ভোট বেশি পেয়েছিলেন সেই হিলারি ক্লিন্টনও এমন কিছু জনপ্রিয় ছিলেন না। কিন্তু এসবের নীচের স্তরে, যে সামাজিক সমীকরণটা ক্রিয়াশীল ছিল তার ইংগিত দেয় বিবিসির এই পরিসংখ্যানঃ-
সাদা মানুষের ভোট ৫৮% পেয়েছিল রিপাব্লিকান পার্টি, ৩৭% পেয়েছিল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। যখন নাকি হিস্প্যানিক ও এশিয়ান ভোট ২৯% গিয়েছিল রিপাব্লিকানদের দিকে এবং ৬৫% গিয়েছিল ডেমোক্র্যাটদের দিকে। আর কালো মানুষের ভোট? মাত্র ৮% ছিল রিপাব্লিকানদের দিকে, ৮৮% ডেমোক্র্যাটদের দিকে; যখন নাকি হিলারিও সাদা। নারীদেরও সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছিল।
নানা কারণ আছে এই বিভাজনের। কিন্তু ‘গলনপাত্রে’ ধাতুর রঙ যে মিশ খায়নি, তা তো স্পষ্ট। এই মুহূর্তে রাজ্যগত পরিসংখ্যানটা হাতে নেই, কিন্তু মনে আছে। যে রাজ্যে কালো মানুষের সংখ্যা কম সেখানে রিপাব্লিকান সমর্থন, ইংরেজিতে যাকে বলে প্রিডমিনেটিং।




ªªªªª