Labels
- Ajker dintar janya (10)
- Alokji's poems in English translation (6)
- Articles (124)
- Arun Kumar Roy (1)
- Behar Herald (2)
- Bhinshohore (55)
- Biography (1)
- Engels (11)
- Hindi (50)
- Housing Question (10)
- Kedarnath Bandopadhyay (1)
- Krishak Sabhar Smriti (2)
- Lok Janwad (4)
- Magadher Sahitya (6)
- Meghsumari (156)
- Other's writings (1)
- Phire ese (210)
- Plays (10)
- Poems (502)
- Poems by Robin Datta (5)
- Priyo Pochis (8)
- Purnendu Mikhopadhyay (1)
- Sanchita (1)
- Sirir mukhe ghor (20)
- sketches (6)
- Smritiprasanga (3)
- Somudro Dubhabe Dake (29)
- Song (1)
- Songs (7)
- Stories (66)
- Translations (90)
- Video (5)
- कौन थे इश्वरचन्द्र विद्यासागर (200वीं जन्मजयंती पर एक कर्मवीर की कीर्तिगाथा) (19)
Monday, June 30, 2025
যুদ্ধবিরতি
অস্থির ঘুমের স্বপ্ন
অনিলদা
নিঃসঙ্গ মানুষ
ডি-জি
Monday, June 23, 2025
ওয়াররুম
দুপুরের খাওয়ার ছুটি। বেরিয়ে সোজা পিছনে যাওয়ার প্যাসেজে ঢুকল না মনোজ। ওয়াররুম ওয়ান-এর পর ওয়াররুম টু। সেখান থেকে অজয় বেরোবে। কমবয়সী, যুবসংগঠনের সাথী। বিহার থেকে তারা দুজনে এসেছে।
সামনে খোলা ঘাসের
লন ঘিরে টাইলস বসানো হাঁটার রাস্তা। মাঝখানটায় গোল করে ছোট্টো এক প্রস্থ ফুল আর পাতাবাহার
গাছের বাগিচা। পরিসরের দেয়াল পেরিয়ে রাস্তা, আবাদি দেখা যায় না, শুধু দূরের পাহাড়গুলো
দেখা যায়।
কখনো ভেবেছিল? বিশ
শতকের শেষ দেড় দশকে সংগঠনের লড়াইএর একটি প্রধান বিষয় হবে অটোমেশনের হামলার প্রতিরোধ,
কর্মী-ছাঁটাইকারী কম্পিউটারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আর …! একুশ শতকের প্রথম দেড় দশকের মাথায় সেই সংগঠনের প্রথম সারির এক
নেতা, অবসর গ্রহণের পর একদিন ঢুকবে প্রচার অভিযানের ওয়াররুমে? সারা দেশের অনেক অনেক
কমরেডের সঙ্গে কাঁধেকাঁধ চালাবে টুইটারে ঝড় তোলার, ট্রেন্ডিংএ আনার লড়াই, বানাবে ফেসবুক
মীম, আর একই সঙ্গে তার নিজস্ব বিশেষ চেষ্টা – সব কিছু
তার রাজ্যের সাধারণ কমরেডদের বোধগম্য ভাষা হিন্দিতে করা, টুইট আসতে না আসতে হিন্দি
করে নিয়ে ছাড়া! এত দ্রুত, যে তৃতীয় দিন কাজ শুরু হতে না হতে ওয়াররুমের ব্ল্যাকবোর্ডে
তখনকার টুইটটার নিচে লেখা হয়ে যাবে, “হিন্দি-প্রদেশের
সাথীরা, বিহার থেকে হিন্দি টুইট নিন।”
রাতেও রেস্টহাউজের
বিছানায় শুয়ে মনোজ, সেদিনের প্রস্তাবগুলোর হিন্দি অনুবাদ করে পাঠিয়ে দেয় সবাইকে, তারপর
ঘুমোতে যায়।
তার মনে পড়ে নতুন
শতক শুরু হওয়ার পরে পরেই এক ছুটির দিনের কথা। বোধহয় ২০০৪ সাল। মাইনের খাতায় কর্জ নিয়ে
সদ্য বাড়িতে একটা নতুন ডেস্কটপ কিনে এনেছে সে।
- কা দাদা? ইৎনা লড়ে কম্পিউটর কে খিলাফ, আ সবসে
পহিলে ত আপ হী অপনে ঘর মেঁ লে আয়ে কম্পিউটর! লড়াইয়ে হার-জিত লেগে থাকে তা’বলে, ওদিকে ব্যানার খুললেন আর এদিকে অফিসে দু’দিন যন্তরটায় কাজ করে এমন প্রেমে পড়ে গেলেন যে পয়সা খরচ করে বাড়িতে
নিয়ে এলেন … ? কত পড়ল?
- একটা কথা বাদ দিয়ে দিলেন কেন?
- কী?
- আপনার স্টাইলে ‘মতলব ক্রান্তিকারিতা ছোড় কর সীধা মালিককে গোদ মেঁ চলে গয়ে …’! লজ্জা করল?
- চলিয়ে, ওয়হি সহি!
- গোপালজি, লড়াইটা তখনও কম্পিউটারের বিরুদ্ধে
নয়, কর্মী-সঙ্কোচন নীতির প্রয়োগে তার ব্যবহারের বিরুদ্ধে ছিল। কম্প্যাকের তখনকার বিজ্ঞাপনটা
মনে আছে? একবার তো ভাষণ দিতে গিয়ে খবরের কাগজটার পৃষ্ঠা মেলে দেখিয়েছিলাম! এক সুন্দরী
আধুনিকার ছবি আর একটা ক্যাপশান – এই তন্বীকে কোমল
ভাববেন না, একবারে ছ’জনের চাকরি খেতে
পারেন, কেননা তার সাথে আছে কম্প্যাক! পূঁজিবাদের এই জায়গাটা সবার মাথায় ঢোকানো ছিল
প্রথম উদ্দেশ্য। আর দ্বিতীয়, যতটা বাস্তবে সম্ভব – সঙ্কোচন কম করা এবং ধীরে ধীরে করা। যা শক্তি ছিল আমাদের, ততোটা
পেরেছি। আর তখন ছিল মিশ্র অর্থনীতির জমানা। বোঝানোর আরো দরকার ছিল যে সেটাও পূঁজিবাদ,
সমাজবাদ নয় …
- সমাজবাদ তো চলেই গেল!
- হ্যাঁ। চলে গেল বলব না কিন্তু সোভিয়েত-পতন
বদলে দিল বিশ্বের ভারসাম্য। উলঙ্গ পূঁজিবাদের রাজত্ব এখন। তবে তার সঙ্গেও আমার কম্পিউটার
কেনার কিন্তু কোনো সম্পর্ক নেই।
- তবে?
- একটা জাপানি গল্প শুনেছেন?
- কী?
- বহুকাল আগে এক বিদেশি হয়তো ওলন্দাজ জাহাজ জাপানের
উপকূল পেরিয়ে উত্তর সাগরের দিকে যাচ্ছিল। তাদের উপকূল পেরিয়ে যাচ্ছে, কোনো কারণে ঝগড়াটা
বেধে গেল, এবং সেটা খণ্ডযুদ্ধ হয়ে উঠল। তীরে দাঁড়িয়ে থাকা বা নৌকোয় সওয়ার সব জাপানি
মানুষ মরে গেল ওলন্দাজ বন্দুকের ঘায়ে। আজকের বন্দুক নয়, মাস্কেট বা গাদা বন্দুক হবে
হয়তো, কিন্তু সেটার বিষয়েও জাপানিরা কিছুই জানত না তখন। তবে দু’একটি নৌকো জাহাজের গা অব্দি পৌঁছোতে পেরেছিল আর এক ওলন্দাজকে ঘায়েল
করে তার বন্দুকসুদ্ধু জলে ডুবিয়ে দিতে পেরেছিল। কিছুদিন পর যখন উত্তর সাগর থেকে ফিরতি
পথে ওলন্দাজ জাহাজটি সেই জাপানি উপকূলের কাছে পৌঁছোল, দূর থেকে সভয়ে দেখল, একঝাঁক জাপানি
মানুষ দাঁড়িয়ে আছে তাদের অপেক্ষায় – প্রত্যেকের
হাতে ঝিকঝিক করছে তাদেরই ওলন্দাজ বন্দুক।
- !!
- ঐ যে ডুবে যাওয়া একটা বন্দুক? সেটা তুলে, শুকিয়ে,
খুলে, ব্যাপারটা বুঝে, নিজেদের কারখানায় ইতিমধ্যে বানানো শুরু করে দিয়েছে তারা। বারুদটাও
শুকিয়ে, বিশ্লেষণ করে বানিয়ে নিয়েছে।
- মতলব?
- শত্রুর অস্ত্রটি ব্যবহার করতে শিখতে, তাতে
সজ্জিত হতে দেরি কোরো না। তা সে জ্ঞানের অস্ত্র হোক বা কর্মের। আপনিও চলে আসুন যে কোনো
দিন! বসে যান আমার কম্পিউটারে!
………………
মনোজের মনে পড়ে গেল
কত বছর আগে গোপালজির সঙ্গে হওয়া বার্তালাপটা।
তখনই তাদের ব্রাঞ্চ
সদ্য টিবিএম হয়েছে; ম্যানুয়াল থেকে সোজা; স্ট্যান্ড-অ্যালোন মোডে ডস্-বেসড্ বিরমতির
প্যাকেজ পেরোতে হয় নি। কাল ছিল লেজার, আজ অফিসে পৌঁছে পেল মেশিন। আর তার দু’এক সপ্তাহের মধ্যে টাকা জোগাড় করে সে কিনেছিল নিজের প্রথম কম্পিউটার।
অর্থাৎ ডেস্কটপ – ছুঁয়ে ছুঁয়ে চিনেছিল মনিটর, কিবোর্ড, মাউস,
সিপিউ, ইউপিএস; বসন্তকে ডেকে ফিট করাবার সময় জেনেছিল প্লাগ লাগাবার জায়গাগুলোকে সকেট
বলে না। বলে পোর্ট। আর সিপিইউএর ভিতরে তিনটে বড় অংশ থাকে – হার্ডডিস্ক, মাদারবোর্ড আর এসএমপিএস। জানতে হয় দুটো শব্দ আর কোনো
কম্পিউটারে তাদের শক্তি – র্যাম আর রম। একটা
ইঙ্কজেট প্রিন্টারও কিনেছিল সঙ্গে। সংগঠনের কাজে তো লাগাতে হবে! সার্কুলার লিখলে একটা
প্রিন্ট বার করে বাজারে জেরক্স করিয়ে নেবে। সাইক্লোস্টাইল করানোর যুগ (সেই এমার্জেন্সির
সময় থেকে শুরু হয়েছিল তার জীবনে) শেষ হল এবার। বাড়িতে থাকলে, ছেলে মেয়েও তো বড় হচ্ছে,
শিখবে। সেও শিখবে তাদের সঙ্গে।
একদিন ওয়র্ডে একটা
পৃষ্ঠা খুলে টাইপ করা শেষ করেছে সন্ধ্যায় – মঞ্জুর বর
ঢুকে দূরে বসেই বলল ওটাকে জাস্টিফাই করুন! লজ্জায় পড়ে গেল, কী করবে? জাস্টিফাই করা
কাকে বলে জানেই না। তখন সে উঠে এসে নিজেই করে দিয়ে গেল। ও ও, বাঃ, শব্দের মাঝখানের
জায়গা কমিয়ে বাড়িয়ে লাইনগুলোকে বাঁদিকের মতো ডানদিকেও সমান করাকে জাস্টিফাই করা বলে!
পুরোনো বাড়িতে তখনও
আলমারির মাথায় তখনও কয়েকটি অটোমেশন-বিরোধী লড়াইয়ের সময়কার, তার নিজের হাতে এঁকে তৈরি
করা পোস্টার আর প্ল্যাকার্ড রাখা ছিল। স্টেশন চত্বরে সারাদিনের অবস্থান। সবার হাতে
তারই তৈরি করা প্ল্যাকার্ড। একটা প্ল্যাকার্ডে
পাখির ডানা এঁকে কি যেন লিখেছিল হিন্দিতে –
মেশিন হাতের ডানা
তাকে হাত কাটার অস্ত্র বানাতে দেব না …
তার আগে পরে আরো
কতো লড়াই, হরতাল …!
কিন্তু আশ্চর্য!
কম্পিউটার কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সত্যিই এক মুহূর্তের জন্য মনোজের মনে হয় নি ‘ক্রান্তিকারিতা ছোড় কর সীধা মালিককে গোদ মেঁ …’। বিব্রতও বোধ করে নি। একটাই ছোট্টো বাক্য ভিন্ভিন্ করছিল মাথায়
– শেখো, হাতিয়ার করো। ইংরেজি কম জানে বলে কোনো
আপ্তবাক্য পেলেই মনে মনে সেটাকে ইংরেজি করার চেষ্টা করে। ‘ওয়েপনাইজ ইয়োরসেল্ভস! না, বি আর্মড! কোনটা ঠিক হবে?’
অফিসের যন্তরটাকেও,
টিবিএমএ কাজ করার প্রথম দিন থেকে কতোরকম ভাবে ব্যবহার করা যায় খুঁজে দেখা শুরু করেছিল।
ইউনিয়নের কাজে, কিছু খোলা ব্যক্তিগত কাজেও। তখন নতুন নতুন, মেশিনগুলোকে পুরোপুরি সিস্টেম-ডেডিকেটেড
করে লক করা শুরু হয় নি।
তারপরেই তো ডিজিএম
ত্রিপাঠির সঙ্গে সেই ঝঞ্ঝাট। চার্জশিট খেল। এনকোয়ারি শুরু হওয়ার আগেই ট্রান্সফার হতে
হল শহরের বাইরের একটা ব্রাঞ্চে। প্রতিদিন রীতিমত ঝুঁকি নিয়ে পৌঁছোতেও লেগে যেত এক ঘন্টা।
কিন্তু সে ট্রান্সফারও শাপে বর হল। এক মার্কেটিং অফিসারের মাধ্যমে নিজের নোডটায় ঢুকিয়ে
নিল একটা এ্যাপ, বোধহয় লিপিকার। তখনও ওয়র্ডে টাইপ হয় না। ওই এ্যাপের নিজস্ব পাতায় হয়।
এক কপি প্রিন্ট করাতে পারলেই হল। শুরু হয়ে গেল চুটিয়ে হিন্দিতে সংগঠনের কাজ। এমনকি
বাংলাও। কবিতার সেই প্রিন্টগুলো কয়েকটা এখনও আছে ব্রিফকেসে।
●
ওয়াররুম ওয়ান থেকে
বেরিয়ে অজয় হাঁক দিল, “দাদা চলিয়ে। খনওয়া
খা লিজিয়ে পহলে। তব সোচিয়েগা।”
- কেয়া সোচেংগে?
- আরে আপলোগ তো ফিলাসফর আদমি হ্যাঁয়। কুচ্ছো
কুচ্ছো সোচতে রহতে হ্যাঁয় দিনভর। আপ থে, তভি ন ইয়হ কারনামা হুয়া। বোর্ড পর বিহার কা
নাম লিখা গয়া – ফলো বিহার।
- চলিয়ে, চলিয়ে। আপ হি কে ইন্তজার মেঁ থে। ভুখ
লগ গই হ্যয় বহুত।
দ্বিতীয় সেশনে ঢুকতে
ঢুকতে সুনিথ কাছে এল, “কমরেড, টু-ডে ইভনিংস
প্রেস কনফারেন্স; উই শ্যাল বি গোইং টু দ্য ভেন্যু টুগেদার। কিপ ইয়োর ক্যামেরা রেডি।
ইয়েস্টার্ডে ইট রেস্ক্যুড আস ইন দ্য ইন্টারভিউ, হোয়েন মাই সেলফোন ফেইল্ড।”
- শিওর, কমরেড! ইটস রেডি।
তবে, আরেকটা ওয়াররুম
আছে তার নিজস্ব, প্রায় আড়াই দশকের। অদৃশ্য। অন্তর্গত। সে ওয়াররুমের মহাফেজখানা তার
ডাইরিগুলো। আর বাবার একটা পুরোনো ব্রীফকেস; বাবা আর ব্যবহার করে না দেখে নিয়ে নিয়েছিল।
সেই ওয়াররুমটাকেও এই নতুন প্রযুক্তিতে সাজিয়ে তুলতে হবে। কাজটা শুরু করে দিয়েছে সে,
অনেক আগে থেকেই। তবে এবার পুরো করতে হবে। কেননা অবসরগ্রহণের পর সেই ওয়াররুমের ‘ওয়ার’টারই প্রেক্ষিত বদলে
গেছে অনেকখানি।
ওয়াররুমে নিজের প্রিয়,
ছোট্টো অ্যাসুসের নোটবুকটার কাছে ফেরার আগে লনে দাঁড়িয়ে একটা সিগরেট শেষ করতে করতে
মনোজ ভাবল।
মনোজ বিহারবাসী বাঙালি।
তার সাংগঠনিক, রাজনৈতিক মাতৃভাষা হিন্দি আর সাংস্কৃতিক, সামাজিক মাতৃভাষা বাংলা। পরিবারেও
দুভাষাই চলে; বাংলা নিয়ে লড়াইও চলে স্নেহের ভাষায়। দিদা নাতিকে নিয়ে বসিয়ে বাংলা লিখতে
শেখায়; বাবা মেয়েকে কাঁধে নিয়ে বাংলা গান শোনায়। মা ভাতের গ্রাসটা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে
– এখন মুখে ঢোকানো যাবে না। এবং মনোজের গর্ববোধ
আছে যে সে দ্বিভাষী।
তবে একটা জায়গায়
গিয়ে ফাঁসে। সাহিত্য করার একটা ধাত আছে তার। কবিতা লেখা, গল্প লেখা। একটা জায়গায় পৌঁছে
বুঝতে পারে নিজের ভাষায় হিন্দি আটকাতে ঢুকে পড়ছে কেতাবি বাংলা; স্বাভাবিকতা হারিয়ে
যাচ্ছে। সেটাকে ধরে রাখতে একটা লড়াই চলে তার নিজের ভিতর, নিরন্তর। রাত তিনটের সময় বৌ
মশারির ভিতর থেকে ডাকে, কী হল, ঘুমোবে না? সে জানলার ধারে বসে দূরের রেলইয়ার্ডের আলোর
দিকে তাকিয়ে থাকে, ছবিগুলো নিয়ে খেলা করে চলে কলমে, ডাইরির পাতায় …।
মিডিয়া ওয়াররুমের
কাজ শেষ করে ফেরার দিন, রাতের ট্রেন ধরার আগে মনোজ এবং ঝাড়খণ্ডের দুজন সাথী সারা দুপুর
শহরের সমুদ্রতীর ধরে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরছিল। অজয় আগের রাতেই বেরিয়ে গেছে। সারাদিনের
ঘোরার জন্য একটা গাড়ি ভাড়া করেছে তিনজনে।
হাতে আছে ছেলের কেনা
একটা সোনি ক্যামেরা।
প্রযুক্তি-বদল কতো
লড়াই নিয়ে আসে জীবনে! প্রযুক্তির কতো লড়াই একা পড়ে গিয়ে কেউ শুরুও করতে পারে না। মার
খেয়ে যায়।
এই যেমন, এখানে এসে
সে প্রথম শুনল এফএসএম-এর কথা – ফ্রি সফটওয়্যার
মুভমেন্ট। এদিকে এরা দশ বছর ধরে চালিয়ে যাচ্ছে। আর সে? এমএস উইন্ডোজ থেকে বেরোবার ঠিক
মতো চেষ্টাও করতে পারল না। উবুন্টু সিস্টেম ডাউনলোড করল, সিডিও আনালো। কিন্তু একটু
কারোর সাহায্য দরকার ছিল লাইনাক্সে শিফট করতে। পেল না। হলো না।
তারপর এই, ফটোগ্রাফি।
কবে থেকে শখ! নিজের ডার্করুম, এনলার্জার, নিজের একটা অন্ততঃ সেমি-প্রফেশনাল ক্যামেরা
কেনার মতো পয়সা জোটাতে জোটাতে প্রথম তো সাদাকালোর জায়গায় রঙিন এল। ডার্করুম করার দু’এক বছরের মধ্যে ঘাড়ে হাইপোর গন্ধ নিয়ে সে ডার্করুম হাওয়া করে দিতে
হল। এনলার্জার, ট্রে, কেমিক্যাল সব বিক্রি করে দিতে হলো। আর সস্তা একটা সেমি-প্রফেশনাল
ক্যামেরা কেনার দশ বারো বছরের মাথায় নতুন শব্দ জানল – এগুলো ভিন্টেজ, বলা হয় এ্যানালগ। ডিজিটাল ক্যামেরার যুগ এসে গেছে।
ব্যবহারের অযোগ্য ভিন্টেজ হয়ে যাওয়া বস্তুটা ফেলতে হল না ভাগ্যিস। ছেলে, বিগত যুগের
মহামূল্যবান একজিবিট হিসেবে রেখে নিল।
নিজের ভিতরের ওয়াররুমটাকে
নতুন প্রযুক্তিতে আনা শুরু করেছে সে ২০০৬-৭এ। তবে তাই বা কিভাবে বলি। প্রথম থেকেই তার
স্বপ্ন ছিল এই লেখালেখির কাজটাকে ইয়োরোপীয়দের মতো টাইপরাইটারে নিয়ে আসবে। টাইপরাইটারে
ভাবা যাবে না কবিতার লাইন? দেখাই যাক না! চেষ্টা করতে দোষ কী? অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, কলকাতার
বন্ধুকে নাহক অনেক খাটিয়ে একটা সেকেন্ড হ্যান্ড রেমিংটন বাংলা টাইপরাইটার জোগাড় করেছিল।
বান্দরবাগিচায় মুস্তাফি স্যারের ইন্সটিচ্যুটে ইংরেজি টাইপ শিখেছিল, বাংলা তো শেখে নি।
একটু একটু করে তাও শিখল। কবিতা ভাবতে শুরু করল রোলারে কাগজ চাপিয়ে। ভাবতে ভাবতে কয়েক
মরশুম বৃষ্টি আর বাসাবদলে মধ্যে বদলে গেল যুগ। লোহার দরে টাইপরাইটার বেচে দিয়ে কিনতে
হল ডেস্কটপ। ২০০৬-৭ সালে ডেস্কটপটা পুরোপুরি ছেলেমেয়েকে দিয়ে সে কিনেছিল এসারের একটা
ভারি ল্যাপটপ – সেটাকেই নিজের ওয়াররুমে পরিবর্তিত করা শুরু
করল।
ওয়াররুম বলতে, লেখালেখিকে
যুদ্ধের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার একটা ইতিহাস আছে মনোজের জীবনে। না, সেটা তার সাহিত্যদৃষ্টির
বিকাশের ইতিহাস নয়। সাহিত্যকে রাজনৈতিক বা ভাবধারাগত সংগ্রামের অঙ্গ হিসেবে দেখতে শুরু
করার প্রতিফল হ্যান ত্যান … সেসব কিছুই নয়।
এমনকি নতুন প্রযুক্তি শিখে তাতে নিজেকে ঢেলে সাজাবার রোজনামচা – তাও নয়।
বস্তুতঃ তার মনোভাবটা
শুরুর থেকেই ছিল যে চাকরি করলে ইউনিয়ন করব চুটিয়ে, তবে মিডল অর্ডারে। বাংলাভাষার অনুরণনে
থাকবে রাত আর সকাল, ডাইরির পাতায়, কখনো কবিতায়, কখনো গানে, কখনো গল্পে, প্রবন্ধে সমান্তরাল।
কিন্তু ১৯৯০এ অনেককিছুর
সঙ্গে তার ইউনিয়নবাজির মিডল অর্ডার ছিনিয়ে নিল কাপ্তেনরা। এক ধাক্কায় উঠিয়ে বসিয়ে দিল
ওপেনিংএ, সাধারণ সম্পাদকের পদে। সে পদে শুধু ইনকিলাব জিন্দাবাদ আর মিটিংএ বক্তৃতা দিয়ে
তো আর চলে না! কখনো কারোর ট্রান্সফারের জন্য ডিজিএমের সঙ্গে আমড়াগাছি করতে হয় হোটেলে
বসে, কখনো সরকারি বিভাগ সংক্রান্ত কাজে রাত ন’টায় মন্ত্রীর
দরজায় গিয়ে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। পকেটে করে নিয়ে বেড়াতে হয় বেনামি একাউন্টে
জমানো ঘুষে দেয় টাকা, বিভাগীয় বড়বাবুদেরকে দিতে হয়। সৎ থেকে অসতে, অসৎ থেকে সতে যাওয়াআসা
করতে হয় অনবরত। আর, সবচেয়ে বড়ো কথা, কপালের শিরায় দপদপানি ধরিয়ে দেওয়া একটা কান-ছোঁওয়া
হাসি তৈরি রাখতে হয় মুখে সারাটা সময়। নিজের জন্য সময় যায় কমে। যা থাকে তাও হয়ে ওঠে
রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত। আর তার ওপর এসে যায় বিশ্বের ওলট-পালট। দেশের ওলট-পালট। স্বপ্নের
কোমসোমোলের সদস্যের মত দেখতে মিষ্টি মেয়েটি মস্কোর রাস্তায় টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে
চেঁচিয়ে ওঠে “আমি ডলার-বেশ্যা হতে চাই!”
তখন থেকে, সামাজিক
আচরণে দৈনন্দিন শতধা বিভাজিত হয়ে পড়া তার ব্যক্তিত্বের মূল ঐক্যটাকে রাতে পুনঃ প্রতিষ্ঠা
করার যুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার সামগ্রিক সাহিত্য-প্রয়াস। সাক্ষী ও মহাফেজখানা হয়ে উঠেছিল
বছরের পর বছর ধরে লেখা তার ডাইরিগুলো।
একুশ শতকের নতুন
প্রযুক্তি, আন্তর্জাল তাকে নতুন চ্যালেঞ্জের সন্ধান দিল। এই প্রযুক্তিতে ঢেলে সাজাতে
হবে তাকে নিজের লেখালেখির ওয়াররুম।
নিজের সমস্ত লেখালেখি,
শোধরাবার কাজ শেষ হলে পর তুলে নিতে শুরু করল নতুন কেনা ল্যাপটপে। একটা ফোল্ডারে জমিয়ে
রাখতে শুরু করল। ফোল্ডারটার নাম দিল শখ করে ‘আই রাইট’।
তখন ড্রাইভে জমা
করা বা ব্লগিং সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। ক্লাউড স্টোরেজ ইত্যাদি মুখে মুখে চাউর
হওয়াও শুরু হয় নি। তার ওপর চাকরি আর ইউনিয়নের ব্যস্ততা। তাই, মূল লেখালেখিগুলো হতো
কাগজে কলমে। তারপর কখনো কখনো অফিসে থাকলে লিপিকারে তুলে ছেপে নিত। বাড়ির ল্যাপটপে তুললে
পেনড্রাইভে নিয়ে দোকানে ছেপে নিত। ব্রিফকেসে একটা ফাইল করেছিল তিনপর্ব কবিতার। আর বেশ
কয়েকটি গল্প আর প্রবন্ধের।
সেসবের কয়েক বছরে
তার অবসরগ্রহণ চুকে গেল নির্বিঘ্নে। নিশ্চিন্ত এক বছর গেল শুধু পড়ায়। যতো কটা মোটা
মোটা বই এমনকি পঁয়ত্রিশ বছর আগে কিনে রেখে দিয়েছিল, পড়তে পারেনি নানান ঝামেলায়, সব
পড়ে গেল একের পর এক। স্তানিস্লাভস্কির ‘মাই লাইফ’, গোর্কির ‘ক্লিম সামঘিন’, এলেক্স হ্যালির ‘রূটস’, কম্পিউটারে পিডিএফে ‘দেখি নাই
ফিরে’ … । তারপর
ক্রমে শুরু করল ল্যাপটপ খুলে বসে ভাবা আর সোজাসুজি তাতেই লেখা।
এখন তো আর সেই ব্যক্তিত্বের
বিভাজন, ডিসিন্টিগ্রেশন অফ পার্সোনালিটির ব্যাপারটা নেই। কাজেই সেই যুদ্ধটাও আর নেই।
থাকলেও খুব কম। কখনো সখনো। তজ্জনিত ক্লান্তিটাও নেই। নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ালো নতুন
শতকের সময়টাকে ধরা। বয়স হয়ে গেছে। এক তরুণের উজ্জ্বলতায় হয়তো পারবে না, তবু যেন সত্যের
কাছাকাছি পৌঁছোবার চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে।
তবে একটা অন্যায়
করল। ডাইরি লেখা বন্ধ হয়ে গেল তার। নিজের রোজকার আত্মসংগ্রাম, চিন্তার ছিন্নসূত্র,
মনের অন্ধকার ইত্যাদি লিখে রাখা বন্ধ হয়ে গেল। সেটা বন্ধ রয়েই গেল। সে ধরণের তারিখ
দিয়ে বিচ্ছিন্ন নোট রাখার সুবিধে করে উঠতে পারল না নোটবুকে। তাই একটা ডাইরি রাখে ব্যাগে।
লেখা হয় না, বছর ঘুরে যায়। তবু কোনো দিন, বৃষ্টির ছায়ায় খুলে বসে।
কিন্তু কিছু দিনেই
হয়ে উঠল পুরোপুরি ল্যাপটপিয়া। ব্যাকআপ রাখার জন্য কিনল দু’তিনটে পেনড্রাইভ। তারপর একটা এক্সটার্নাল হার্ডডিস্ক। শুরু করল গুগলড্রাউভে
স্টোর করে রাখা। ছেপে রাখার কাজ ক্রমে বন্ধ
হয়ে গেল।
●
তারপর হাতে এসেছে
এসাসের ভীষণ প্রিয় এই নোটবুক। তার তো আর গ্রাফিক্সের বিশেষ কাজ নেই। এলে সেটাও করে।
যেমন গত নির্বাচনে এসেছিল। মুভিমেকার ডাউনলোড করে তাতে কাজ করছিল। মাঝে মধ্যে কেঁপে
উঠছিল নোটবুকটা। কিন্তু ভালো ছেলে। আটকালো না কোথাও। বার করে দিল। সব কাজ দিব্যি চলে
যায় এতেই।
সমুদ্রতীরে প্রদর্শনীর
জন্য রাখা পুরোনো ডুবোজাহাজের সিঁড়ি বেয়ে ঢুকতে ঢুকতে ডানদিকে রাস্তার ওপারের বাড়িটা
দেখছিল মনোজ। কী চেহারা হয়েছে গত বছরের হুদহুদ সাইক্লোনে! ছ’তলা নতুন বাড়ির সামনেটা পুরো এ্যাসিড-খাওয়ার মত খেয়ে গেছে। পরপর
সবক’টি বাড়িরই এক অবস্থা। পকেটে ফোন বেজে উঠল,
বাড়ি থেকে।
- ডুবোজাহাজের পেটে ঢুকছি। এরপর সমুদ্রে ডুব
দেব। অতলে।
- কী?
- না, কিছু না। সমুদ্রের ধারে ঘুরছি।
- কিছু নিয়ে এস কিনে।
- এটা কি পুরী? কিচ্ছু নেই এখানে। সমুদ্রের জলের
রঙটাও ইস্পাতের মতো, কালচে।
- কিচ্ছু নেই? স্টেশনের কাছের বাজার থেকেই নিও।
- দেখছি।
- রূপায়ন তোমায় খুঁজছিল। ফোনে পাচ্ছে না।
অবসর নেওয়ার পর এই
এক সমস্যা হয়েছে। কলকাতা আরো দূরে চলে গেছে। প্রথম তো ঝাড়খণ্ড হওয়ার পর এখন আর এদিকে
সীমানা মেলে না। ঝাড়খণ্ড হয়ে ঢোকে। শুধু পূর্ণিয়ার দিকে মেলে। তার ওপর, অবসর নেওয়ার
পর সংগঠনের কাজে যখন তখন কলকাতায় পৌঁছোন, সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে। আর বাংলা সাহিত্যের
কলকাতা-কেন্দ্রিকতা! কাজ থাক না থাক, মাঝে মধ্যে গিয়ে সাহিত্যমহলে চেহারা দেখিয়ে বেড়ানো
সে আগেও পারত না, এখনও পারে না। বইমেলায়ও নিয়মিত যাওয়ার কোনো অভ্যাস গড়ে ওঠে নি তার।
রাজ্য-কেন্দ্রিকতাই
মানে না, আবার তার মহানগর-কেন্দ্রিকতা! পঁয়ত্রিশ বছর আগে একবার বোধহয় কফিহাউজে গিয়েছিল,
এত নাম শোনা জায়গাটা দেখে আসতে। আর যায় নি। … ঠিক আছে,
বিকাশের সাধারণ নিয়মে কেন্দ্রাভিগ বল বাড়ছে, কেন্দ্রাতিগ বল কমছে। ঔপনিবেশিক সব ভাষাসাহিত্যেই
এই সমস্যাটা আছে। কিন্তু ভারতবর্ষ তো বিবর্তিত হয়ে চলেছে প্রতিদিন। বাংলাসাহিত্য সর্বভারতীয়,
এবং তারপর বৈশ্বিক। তার গুণমান বিচারের মাপটা এক এবং কঠোর রাখুন, অনুকম্পা দেখাবেন
না কিন্তু আলোচনটা, প্রতর্কটা, ডিস্কোর্সটা এক না রেখে, ছড়িয়ে যেতে দিন জলবাহিত উদ্ভিদের
গুচ্ছের মতো, স্থানিক ও প্লুরাল হয়ে উঠতে দিন। কী যেন শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন মলয়
রায়চৌধুরি? জীবনানন্দের কাব্যবিচারে? রাইজোম … ঘাসের শিকড়ের
মতো। অতো জটিল শব্দপ্রয়োগের দরকার নেই। সোজা কথায় বলি, তামিলনাডুর বাঙালি মেয়েকে এগমোরের
লোকালেই প্রেম করতে দিন না! সেটাও যেন প্রেমের বিচারে লালদিঘির পাড়ের সমতূল্য হয়। তারপর
করুন তার কাব্যবিচার।
তবে হ্যাঁ, মাঝে
মধ্যে গেলে কিছু প্রাপ্তি তো ঘটেই। ২০০৭ সালেই বোধহয়। কলকাতায় এক প্রবীণ, সবার প্রিয়
নেতার মৃত্যুতে তাকে প্রাদেশিক ফেডারেশনের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। মাল্যদান
কর্মসূচি পুরো হওয়ার পর শোকমিছিল। যতোই শোকমিছিল হোক, চাপা কথাগুলো তো আর থেমে থাকে
না। পাশে সৃজিত আর রূপায়ন কথা বলছিল। এরা দুজনেই পাটনায় ছিল বহু বছর, তাই এশহরে তার
নিকটতম বন্ধু।
- এ্যাই, তুমি বললে সবচেয়ে ভালো এই টুলটা। কোথায়?
প্রব্লেম করছে তো।
- প্রব্লেম করা উচিৎ নয় আর করলে মেইল করো।
- রেসপন্ড করে?
- আমি রাতে মেইল করলাম, রাত দুটোর মধ্যে ওরা
রেসপন্ড করল।
- রাত দুটোয়?
- মেহদি হাসান ছেলেটি যা করেছে না! বাংলাভাষার
জন্য! এখানে আমরা আজ অব্দি কিছুই করে উঠতে পারলাম না।
মনোজ ঢুকল কথায়।
- কী নিয়ে কথা বলছ হে তোমরা?
রূপায়ন ঘুরে বলল,
“কেন, তোমায় ওমিক্রনল্যাবের লিংকটা পাঠাই নি?
শুরু কর নি অভ্র ব্যবহার করা?
- করেছি তো!
- কোনো সমস্যা হচ্ছে?
- না। তবে লিপিকারটাও চালিয়ে যাচ্ছি।
- পুরোপুরি অভ্রে চলে এস। এত ফ্রেন্ডলি, এত সুন্দর
সব ফন্ট। আর সবচেয়ে বড়ো কথা আমার গর্ব হয়। এত সুন্দর একটা টুল তৈরি করল বাংলাদেশের
ছেলে আর এক পয়সাও কামাইয়ের ধান্ধা না করে দুনিয়াকে উপহার দিয়ে দিল।
তবে মনোজের মাথায়
ক্যারা তো কম নেই। বাংলাদেশের কেন? ভারতের কেন নয়? উইন্ডোজ সেভেনের প্ল্যাটফর্মে আসতে
আসতে সে পেয়ে গেল ভারতের নিজের ইউনিকোড টাইপিং টুল, বাইশটা ভাষার জন্য। সি-ড্যাকের
ডেভেলাপ করা। সঙ্গে সঙ্গে ডাউনলোড করল, বোধহয় ২০০৯এ। ওদিকে নোটবুকের উইন্ডোজটা বোঝা
গেল পাইরেটেড ভার্সান। এমএস অফিস ঝামেলা করতে শুরু করল। নামিয়ে নিল লিব্রে অফিস। কিছুদিন
চলল এভাবেই।
মেয়ে তখন ব্যাঙ্গালোরে।
সেখানে কাজ করছে। বার বার হ্যাং করছে সিস্টেমটা। টাচপ্যাড কাজ করছে না। রাঁচিতে একবার
চার্জার পুড়ে গেছিল শর্ট সার্কিটে। … ক্ষিপ্ত
হয়ে সজোরে ঘুঁষি মারল কি-বোর্ডে। এবার কি-বোর্ডও শুরু করল ম্যালফাংশন। বাধ্য হয়ে সেদিনই
মেয়ের সঙ্গে গেল ক্রোমায়। পঁচিশ হাজারের ওপরে ওঠার ক্ষমতা নেই। আবার কিনল একটা এসার।
প্রি-ইন্সটল্ড উইন্ডোজ টেন।
- যদি ডস-মোডে নিই? কতো পড়বে? আমি উইন্ডোজ সেভেন
ঢুকিয়ে নেব বাড়িতে।
- এগুলো ফ্যাক্টরি-সেট প্রি-ইন্সটল্ড স্যার।
হবে না।
- কিন্তু সেভেনটা স্টেবল ছিল। তার আগের এক্সপিটাও
স্টেবল ছিল। কিন্তু ভিস্তা দেখেছিলে? কেমন বিহেভ করত?
- এটায় তেমন কিছু হবে না স্যার। নিশ্চিন্তে নিয়ে
যান।
যাক, টাটা ব্রান্ডের
ক্রোমা যখন, পাইরেটেড বা ক্র্যাকড হবে না নিশ্চয়ই। পেয়ারের ইউনিকোড টাইপিং টুলটাও ডাউনলোড
করল আবার, কিন্তু ফেলেই রাখল। রূপায়নের কথা মতো পুরোপুরি এসে গেল অভ্রে।
২০১৫য় সমুদ্রের ধারের
শহরে সেই মিডিয়া ওয়াররুম থেকে এখন সে পুরোপুরি দ্বিতীয় ওয়াররুমে।
●
ভাগ্যিস কোভিডের
ছোয়াঁচ অল্পের ওপর দিয়ে গেল। নইলে অন্যরকম কিছু হতে পারত। তা ভেবে চিন্তাক্লিষ্ট হয়ে
তো আর লাভ নেই। পিসিআর টেস্টের লাইনে দাঁড়িয়ে একটা কবিতায় লিখে রেখেছে সেই ভয়ঃ
চারদিক থেকে অসুস্থতা এবং মৃত্যুর খবরে
কিনকিন করে ভয়;
নিঃশ্বাস টানি, ঢোঁক গিলি, কপালে হাত রাখি
– কী কী অসমাপ্ত রেখে যাব?
কাজে থাকি যেন শেষ মুহুর্ত অব্দি – যেমন থাকে মানুষ,
ওই তো! –
রোগা কর্মীটি পিপিই কিটের নামে প্লাস্টিকের
চাদর বেঁধে
কাজ করে যাচ্ছে ক্রমাগত, সেই সকাল থেকে
বিকেল অব্দি চলবে।
গ্লাভস খুলে এখন হাওয়া লাগাচ্ছে সাদা হয়ে
ওঠা হাতে; নতুন কর্মী এল। …
এখন তার হাতে অন্ততঃ
দুটো সঙ্কলনের মতো গল্প আছে তৈরি। ছোটো-বড়ো মিলিয়ে সাত-আটটা ছাড়া বাকি সবগুলো সোজাসুজি
ল্যাপটপে ভাবা, ছক কষা ও লেখা। তবে তার আসল গর্ব সেটা নিয়ে নয়। তার গর্ব যে গল্পগুলোর
পটভূমি সবক’টি হয় বিহারভিত্তিক নয় দেশে ছড়িয়ে, এবং তাতে
বাঙালি ও অবাঙালি বিহারি মানুষেরা সমানভাবে পাশাপাশি আছে।
তেমনই কবিতা আছে
একরাশ, তিন দশকের। কোনো সঙ্কলন করতে পারা না পারা, পাঠকের কাছে কোনো গ্রহণীয়তা পাওয়া
না পাওয়া নিজের জায়গায়। যে কোনো সময় যে কেউ মরে যেতে পারে। নিজের সামর্থ্যমতো কাজে,
যুগটাকে না ছুঁয়ে তো আর মরছে না।
গত কুড়ি বছরে গুরুত্বপূর্ণ
প্রবন্ধ লিখেছে বেশ কয়েকটি। করেছে অনেক অনুবাদ। সেগুলো সব নিজেই ডাইরি থেকে ডিজিটাইজ
করেছে ল্যাপটপে। বিষয় যাই হোক না কেন, রূপ যাই হোক না কেন, ধরণ-গড়ন যাই হোক না কেন,
তার লেখা প্রত্যেকটি অক্ষর বহন করেছে তার প্রতিটি রাতের উদ্দেশ্য – সারাদিনে শতধা বিভাজিত ব্যক্তিত্বটাকে তার অন্তর্নিহিত ঐক্যে ফেরানো।
অন্ততঃ, অবসর গ্রহণের পর আরো এক বছর অব্দি। তারপর কিছুদিনের অভ্যাসে নিজেকে দাঁড় করিয়েছে
নতুন আত্মসংগ্রামে। বহুকাল হারিয়ে যাওয়া আনমনা স্বাচ্ছন্দ্য ফিরে পেয়ে সেই ছন্দে ধরতে
চেয়েছে নিও-লিবারাল উন্নয়নী জৌলুষে মানুষের জীবন ও যাপনসংগ্রামের চিহ্নগুলো। ধরতে চেয়েছে
চলতে থাকা আখ্যান-যুদ্ধে, স্মৃতি-যুদ্ধে নিজের শ্রেণীগত অবস্থান ও তার ভাষা। অনেক খামতি
থেকে গেছে। অনেক অসফলতা বয়ে নিয়ে চলতে শিখেছে জরায়ুতে মৃতশিশুবাহী পশুর মত। আর ততো
দিনে লেখার ওপর বয়সের ছাপ পড়তে শুরু করেছে।
এত দিনের সংগ্রহ
বইপত্র আপাতত তালা-বন্ধই থাকে। ইন্টারনেট আর্কাইভ আর বাংলা বইয়ের সাইটগুলো জিন্দাবাদ।
ইংরেজির জন্য বাড়তি আছে গুটেনবার্গ। তাছাড়া রিসার্চ-সাইটগুলো প্রবন্ধে কাজে লাগে।
আর শেষ কথা, সোশ্যাল
মিডিয়া জিন্দাবাদ। অবসর গ্রহণের সময় থেকে বাড়তে থাকা সামাজিক মাধ্যমের বোলবালা দেখে
ক্রমে নিজের মধ্যে ‘নো লজ্জা লজ্জা ভাব’টা আনতে পেরেছে। এমনিতেও তার লেখালেখি নিয়ে কেউ লাফালাফি করতে যাচ্ছে
না। কলকাতার প্রকাশনের পাড়ায় না ঘুরলে, পাটনায় বসে থাকলে তার লেখা কেউ ছাপতে যাচ্ছে
না। তাই নিজেকে নিঃসঙ্কোচে জাহির করার এই নতুন দুনিয়ায়, এই ভার্চুয়াল মেলার মাঠে তাকেও
বাজাতে হবে ডুগডুগি, খুলতে হবে নিজের প্রদর্শনী; যেমন করে হোক থাকতে হবে। নিজের জন্য
থাকতে হবে, সবার জন্য থাকতে হবে। সাহিত্যের জন্য থাকতে হবে, রাজনীতির জন্য থাকতে হবে।
তাই তার দুই মাতৃভাষার দুটো ওয়াররুম সে গড়ে তুলেছে নিজের ল্যাপটপ আর মোবাইলে ভর করে।
যা লিখব, ভার্চুয়াল এই মেলার মাঠে ছড়িয়ে দেব। দরকার পড়লে পিডিএফে, ই-পাবে বই করে দেব;
যে চাইবে তাকে।
আগে একটা দ্বন্দ্বে
ভুগত, বিশেষ করে কবিতায়, হাতে লিখলে পর যে সংশ্লেষ গড়ে ওঠে জীবনের সঙ্গে, টাইপরাইটারে,
ল্যাপটপে বা মোবাইলে সেটা কি হারিয়ে যায় না? হাতের কলম ঘষে ক লেখা আর কিবোর্ডে আঙুল
টিপে ক লেখা কি এক? এখনো সে জানে না। ‘ক’য়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক কি নিস্তেজ হয়ে পড়েছে আজকাল? জানে না। যেমন
কিছু রোগ, স্পষ্ট করে সে জানে না তার আছে কিনা। হয়তো শেষ ‘স্টেজে’ ধরা পড়বে। কিন্তু
নিরুপায় – মনের আয়নার সামনে হলিউডি নায়কের মত কাঁধ ঝেড়ে
সে নিজেকে জানায়, আই রাইট।
২০১৭তেই ব্লগ তৈরি
করে তাতে সবকিছু প্রকাশ করা শুরু করে দিয়েছিল। এখন অভ্যাসটা নিয়মিত হয়ে গেছে। বড়ো লেখাগুলো
তো যেমন যেমন লেখে, ব্লগে দিতে থাকে। তাতে সুবিধে থাকে যে এখন ঘর ছাড়লে মোবাইলেই থাকে
সব লেখা। রাস্তায় যেতে যেতে পড়ে। কাজের অবসরে বসে পড়ে। যেখানে যেখানে খামতি বোঝে নোটে
লিখে রাখে তখনই। তার সাহিত্যের লড়াইয়ের ওয়াররুমও পুরোপুরি আধুনিকীকৃত আর প্রস্তুত।
এ মুহূর্তে সে ডিসেম্বরের
সকালে একটা নীল জিন্সের শার্ট আর খাকি কার্গো পরে লোকাল ট্রেনে যাচ্ছে বাংলারই একটি
মফস্বল শহরে, কবিতা পড়তে। মাথায় কালো টুপি। পকেটে তার ওয়াররুমের আউটপোস্ট, মোবাইল।
যে দুটো কবিতা পড়বে ভেবেছে, সেদুটোর কোনোটাতেই কলকাতা কেন, বাংলারও নিসর্গ ও সমাজের
কোনো অনুষঙ্গ নেই, বিহারিয়ানা আছে। তার নিজের মতো করে আছে। সেটা অভিব্যক্তির শিল্পে
অসফল হতে পারে, হোক! বাংলা কবিতার ধারা বলতে যা কিছু চিহ্নিত করা হয়, তার বাইরে কিছু
বাংলাভাষায় সৃজিত হলে সেটা যদি পাঠকের স্বীকৃতি না পায়, সেটা কবির অক্ষমতা। কিন্তু
সৃজনীশক্তির অভাব, অন্তত এই একুশ শতকে আর বাড়ির ঠিকানার পিনকোডের তফাতে উৎপন্ন হয় না।
কে যেন তাকে বলেছিল
তিরিশ বছর আগে পাটনায়, “এখানে হবে না। কাপড়
বুনতে হলে তাঁতিপাড়ায় থাকতে হয়। তাই আমি তো এখানে থাকব না, কলকাতায় যাব। তুমিও সময়
করে চলে এস, ওখানেই স্থায়ী হও।”
মনোজ জবাব দেয় নি।
মনে মনে বলেছিল, কোথাও তুমি ভুল ভাই! কথাটা সত্যির মত শোনালেও সত্যি হতে পারে না। এখন
হলে হয়তো বলত, বাংলার তাঁতের খটাখট শুনতে পাচ্ছো না ভারতের বিভিন্ন শহরে? কোথায় তাঁতিপাড়া
নেই? ত্রিপুরায়, আসামে, বরাকে … আর নাহোক শুধু বাংলার,
ভাষার মিলনের তো আছে! পাটনায় আছে, দিল্লিতেও আছে। আর এই সোশ্যাল মিডিয়া আর ইন্টারনেটের
জমানায় সব তাঁতের শব্দ তো একসঙ্গে শোনা যায়!
সবাই কলকাতায় গিয়ে
থাকতে পারে না ভাই। তোমার ঐ কলকাতাতেই ১৯৯৪এ মহাশ্বেতাদিকে বলতে শুনেছিলাম, “যেখানে তুমি আছ, সেটাই তোমার রণক্ষেত্র!” হয়তো সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের অংশীদার হতে আহ্বান করার
জন্য বলেছিলেন। কিন্তু কথাটা কবিতার ক্ষেত্রেও সত্যি। আমার সাহিত্য আমার হাতিয়ার। তাতে
আমি কিছু করতে পারব কিনা সেটা বিবাদের বিষয় হতে পারে। কিন্তু যা কিছু করেছি তাই নিয়েই
আমি নেরুদার শব্দে, ফুললি এমপাওয়ার্ড।
জানলাটা কেন যে বন্ধ
করে রেখেছে! গুমোট আর দুর্গন্ধ লাগে। একটু শীতেই গেল গেল ভাব একটা আছে এখানের মানুষদের।
অথচ ওদিকের এক পাট খোলা দরজা দিয়ে দিব্যি হু হু করে হাওয়া ঢুকছে। সেটা বন্ধ করাবার
চ্রষ্টা করে পারে নি। দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেগুলো দু’একবার টানাটানি করে হেসে জানিয়ে দিয়েছিল – জাম।
সীট থেকে ওঠার তোড়জোড়
করে পাশের যাত্রীকে প্রশ্ন করে মনোজ, “দাদা, এর
পরের স্টেশনটাই আরামবাগ না?”
২২-২৩.৬.২৫
.jpeg)