বিহার বাঙালি সমিতি – বিহার সরকার – বিহারের জনগণ – বাঙালি সমিতি ঝাড়খণ্ড – ঝাড়খণ্ড সরকার – ঝাড়খণ্ডের জনগণ
১৯৭২ সাল পর্যন্ত বিহার বাঙালি সমিতি, তৎকালীন
বিহারের কোথাও কর্মাটার (তৎকালীন দুমকা জেলা) নামের
কোনো গ্রামে, বাংলার নবজাগরণের কিম্বদন্তিপ্রতিম
পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের একটি বাড়ির অস্তিত্ব সম্পর্কে
কিছুই জানত না। তাদের কোনও পরিকল্পনাও ছিল না যে বিহারের
বাঙালিদের ভাষিক, সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের সংগ্রামে সেই ‘বিদ্যাসাগর’ নামে মহামানবটির নাম ব্যানারে, প্রচারপত্রে
লিখতে হবে যিনি, সৌভাগ্যবশতঃ স্কুলে-বাংলা-পড়তে-পারা বিহারের
বাঙালির কাছে নিছক কিছু গল্পকথায় পরিচিত ছিলেন। তখন অব্দি একমাত্র
রবীন্দ্রনাথই বিহার ও বহির্বঙ্গের বাঙালির কাছে, সাহিত্য ও ভাষার প্রশ্নে সর্বজনীনভাবে
সম্মানিত ব্যক্তিত্ব এবং আত্মপরিচয় হয়ে ছিলেন। অন্যান্য প্রশ্নে স্বামী বিবেকানন্দ, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র, জগদীশচন্দ্র
এবং আরও কয়েকজন থেকে থাকতে পারেন, কিন্তু বিদ্যাসাগর ছিলেন না নিশ্চিত। পড়াশুনো করা
মানুষেরা বিদ্যাসাগরের জীবন ও কাজ সম্পর্কে অবশ্যই অনেক কিছু জেনে থাকবেন, কিন্তু সাধারণ
মানুষ পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্রের ‘করুণাসাগর’, ‘দয়ার সাগর’, ‘বিদ্যাসাগর’ প্রভৃতি উপাধি সম্পর্কিত গল্পকথাগুলো এবং তিনি ‘বর্ণপরিচয়’ লিখেছিলেন এ তথ্যটি ছাড়া বিশেষ কিছু জানত না। আর তাই, তাঁর নাম
ব্যানারে লিখে বাংলা মাতৃভাষা সংক্রান্ত অধিকারসমূহের প্রশ্নে মানুষকে একজোট করা যেতে
পারে, এ কথা কেউ ভেবেছিল মনে হয় না। আর, বিহার সরকারের সচিবালয়ের
আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মধ্য দিয়ে বিষয়টি এগিয়ে নিতে, বাঙালি সমিতির নেতাদেরকে বিদ্যাসাগর বা রামমোহনের চেয়ে রবীন্দ্রনাথ,
অর্থাৎ ‘ট্যায়গোর’-এর নাম অনেক বেশি সাহায্য
করত সে সময়।
সেটা ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাস। পাটনায়, বিখ্যাত
চিকিৎসক, মেহনতী মানুষের নেতা এবং পরে পাটনার তিনবারের
বিধায়ক ডঃ এ. কে. সেন সকালে গুরুচরণ সামন্তকে ফোন করছিলেন। তখন কলেজ শিক্ষক
গুরুচরণবাবু ছিলেন ডঃ সেনের নেতৃত্বে চলা নাগরিক ফোরামের
সদস্য এবং বাঙালি সমিতির একজন কর্মী। ফোনে সেনসাহেবের
কথা শুনে, বিষয়টির গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা করতে পেরে, গুরুচরণবাবু একা ডঃ সেনের বাড়িতে এলেন
না, বরং বাঙালি সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং
বিহার হেরাল্ডের সম্পাদক-প্রকাশক ডি. এন. সরকার, বা মন্টু সরকার অর্থাৎ মন্টুদাকেও সঙ্গে করে নিয়ে এলেন। ডঃ সেনের বাড়িতে, তাঁরা সেই মানুষটির দেখা পেলেন, যাঁর কথা সেনসাহেব ফোনে বলেছিলেন। তিনি
ছিলেন সত্যেন সেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন
উপাচার্য। পরিচয়ে জানা গেল তিনি নিরক্ষরতা
দূরীকরণ অভিযানেরও একজন কর্মী এবং বিদ্যাসাগরের রচনা প্রকাশে
উদ্যোগী মানুষদের একজন।
বিদ্যাসাগরের জন্মশতবর্ষ
এমন একটা সময়ে পড়েছিল যেটা সারা দেশের জন্য ছিল এক সন্ধিক্ষণ। আগের বছর জালিয়াঁওয়ালাবাগের
সংহারলীলা দেশবাসীকে ক্ষোভে ও যন্ত্রণায় বিমূঢ় করে দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ, যিনি বিদ্যাসাগরের
জন্মশতবর্ষ পালনে মানুষকে সবচেয়ে বেশি উৎসাহিত করে তুলতে পারতেন, কেননা তিনিই সবচেয়ে
বেশি জানতেন জাতীয় জীবনে ‘বিদ্যাসাগর’ ফেনোমেননটার সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব, দেশে ছিলেন
না। জুলাই অব্দি তিনি ইংল্যান্ডে, সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি হওয়ার প্রতিটি সুযোগ সদ্ব্যবহার
করে ভারতের ঔপনিবেশিক শাসনের বর্বর স্বরূপটি উদ্ঘাটিত করে চলেছিলেন। গত বছর নাইটহুড
ত্যাগ করে মনে শান্তি হয় নি। কেননা পথে নামতে পারেন নি, দেশে প্রতিবাদসভা করতে পারেন
নি, পাঞ্জাব যেতে পারেন নি, ক্ষোভে গুমরোচ্ছিলেন। ওদিকে আগস্টে ভারতে প্রথম অসহযোগ
আন্দোলন শুরু হল। মহাত্মা গান্ধীর ‘অহিংসা ও সত্যাগ্রহ’ প্রথম গণ-অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হল এবং জনতার অংশীদারিতে ঐতিহাসিক
সাফল্য আসতে শুরু করল। রবীন্দ্রনাথ মনে একটু শান্তি অনুভব করেন। কিছুদিন ফ্রান্সে কাটিয়ে
নেদারল্যান্ডসে চলে যান। বিদ্যাসাগরের শততম জন্মদিনে তিনি সম্ভবতঃ ইউট্রেখট শহরে ছিলেন।
সে কারণেই বিদ্যাসাগরের
জন্মের সার্ধশতবার্ষিকী বাংলার বিদ্বৎজনের ওপর একটা কর্মভার ন্যস্ত করে। বিদ্যাসাগর
রচনাবলী নিয়ে গবেষণা, প্রকাশ এবং তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা। আজ আমরা
বিদ্যাসাগর বিষয়ে যাকিছু সামগ্রী পড়তে পাই, তার একটা বড়ো অংশ ওই সময়কারই ফসল।
যাহোক, ১৯৭২-এর সেপ্টেম্বর
মাসে যখন ডঃ এ কে সেন-এর বসার ঘরে বসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সত্যেন সেন,
বিহার বাঙালি সমিতির দীপেন্দ্রনাথ সরকার এবং গুরুচরণ সামন্তর সঙ্গে কথা বলছেন তখনই
বিদ্যাসাগরের অপ্রাপ্য হয়ে পড়া রচনাগুলো নতুন করে মুদ্রণে যাচ্ছে এবং রচনাবলীতে সংকলিত
হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যাসাগরের প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে,
কারণ বিদ্যাসাগরের স্মৃতি তাঁর গ্রাম বীরসিংহ
বা কলকাতায় সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন সত্যেন
সেন মহাশয়। সেই সূত্রেই তিনি প্রস্তাব করেন যে
বিহারের বাঙালিদের উচিত কলকাতা-দিল্লি মেন-লাইনের ধারে কর্মাটাঁর নামে একটি অজ্ঞাত গ্রামের অস্তিত্ব খুঁজে বার করা, এবং সেখানে কোথাও বিদ্যাসাগরের বাড়িটি কী অবস্থায় আছে জানার চেষ্টা করা; যদি সে বাড়ি খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে সেটিকে সংরক্ষণের চেষ্টা করা।
সমিতিকে প্রথমেই যুক্তি খুঁজে বের করতে হয়েছিল। এই ‘বাড়ি খোঁজার অভিযান’-এ সমিতির স্বল্প তহবিল থেকে ব্যয় করার যুক্তি কী?
বাংলা পাঠ্যপুস্তকের অভাবের বিরুদ্ধে
সংগ্রাম করা, স্কুলে বাংলা শিক্ষক হয়েও ছাত্রহীন অবস্থায়
অন্য বিষয় পড়ানো এবং সন্তানদের মাতৃভাষা বাংলা শেখানোর কথা বলতে
গিয়ে উদাসীন বাঙালি মধ্যবিত্ত অভিভাবকদের সম্মুখীন হওয়া সদস্যরা তো বিদ্যাসাগরের যুগান্তকারী সব কাজের বর্ণনায় বিশেষ প্রভাবিত
হবে না! তিনি বিরাট এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন বলে, দুমকা জেলার কোথাও তাঁর অজ্ঞাত একটি বাংলোবাড়ির দিকে ইঙ্গিত করে
বিহারি-বাঙালিদের মাতৃভাষায় শিক্ষার জন্য সংগ্রামে উদ্দীপিত করা যাবে না। তাই, বাংলার নবজাগরণের শীর্ষস্থানীয় কিম্বদন্তি এই মানুষটিকে
মূলতঃ ‘বর্ণপরিচয়’-এর (যে কোনও ভাষার দীর্ঘতম
স্থায়িত্ব পাওয়া প্রাইমার) লেখক এবং
বর্ণমালার আধুনিকীকরণের হোতা পরিচয়েই বাঙালি সমিতি গ্রহণ
করল সেসময়। সমাজ সংস্কারক এবং ‘অজেয় পৌরুষ’এর প্রতীক হিসেবে তাঁকে চেনাবার বা শ্রদ্ধা করাবার জন্য বাঙালি সমিতির
প্রয়োজন ছিল না। সারা ভারতে এবং বিশেষ করে হিন্দি প্রদেশে তাঁর বিধবাবিবাহ সম্পর্কিত
কাজ বহুকাল ধরে প্রচারিত এবং সম্মানিত। আসমুদ্রহিমাচল গ্রামের মানুষও সতীদাহপ্রথা রোধকারী
রাজা রামমোহন রায় এবং বিধবাবিবাহ প্রচলনকারী বিদ্যাসাগরের নাম জানে। কাজেই, বাঙালি
সমিতির জন্য ‘পতাকা’ হবে তাঁর ‘বর্ণপরিচয়’-এর স্রষ্টা পরিচয়। আর সেটাই দারুণ ব্যাপার হবে।
তখনই নিশ্চয়ই বিষয়টি ভেবে দেখা
হয় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে বিহার বাঙালি সমিতির তরফ থেকে
গুরুচরণ সামন্ত এবং নরেন্দ্রনাথ মুখার্জী বিদ্যাসাগরের বাড়ির
অবস্থান জানতে দক্ষিণ বিহারে রওনা দেবেন। যদিও দ্বারভাঙ্গার বিখ্যাত সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ
মুখোপাধ্যায় তখন সমিতির সভাপতি ছিলেন, তবুও
পাটনা শহরের গরীব মানুষের কিম্বদন্তি পাগলা ডাক্তার ডঃ এস. এম.
ঘোষাল, যিনি নিজেও একজন পরম উৎসাহী সংস্কৃতিপ্রেমী,
সমিতির কোনো পদে থাকুন বা না থাকুন, সর্বদা সমিতির সকল কর্মকাণ্ডে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। তাই তাঁরা ডঃ ঘোষালের সাথে দেখা করতে যান। পাটনা থেকে মেন লাইনে যাওয়া কোনও ট্রেন কর্মাটারে থামে না বলে ঘোষালসাহেব নিজের মোটরগাড়িটি ড্রাইভারসুদ্ধু তাঁদেরকে দিয়ে দেন এবং যাতায়াত খরচ মেটাতে হাতে তিনশো টাকাও দেন।
এই ভ্রমণের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ আছে সমিতির ফাইলে, ২৬শে মার্চ, ২০১৮ তারিখে সমিতির বৈঠকে পেশ করা নরেন্দ্রনাথ মুখার্জির প্রতিবেদনে। সে সময়কার কোনো সংবাদপত্রে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল
কিনা জানা যায় নি, তবে পঁয়তাল্লিশ বছর পর, সেই প্রতিবেদনের ইংরেজি
অনুবাদ ৩১শে মার্চ, ২০১৮ তারিখের বেহার
হেরাল্ডে প্রকাশিত হয়েছে। সংক্ষেপে প্রতিবেদনের বয়ান এই
দাঁড়ায় যে দুমকা, মিহিজাম, জামতাড়া হয়ে তিনদিন পর তাঁরা কর্মাটাঁড়
পৌঁছোন। রাস্তায় তাঁদের কেউ কোনো হদিশ দিতে পারেনি বিদ্যাসাগরের বাড়ির বিষয়ে। কিন্তু কর্মাটাঁড় রেলস্টেশনের তখনকার স্টেশনমাস্টার
(শিবদাস মুখার্জি) সৌভাগ্যক্রমে বাঙালি তো ছিলেনই, কাকতালীয় ব্যাপার যে, তাঁর
বাড়িও ছিল বীরসিংহ গ্রামে। স্টেশন থেকে অদূরে একটা অশ্বত্থ গাছ দেখিয়ে বলেন ওর
পিছনেই বিদ্যাসাগরের বাড়ি। গল্পচ্ছলে শোনা যায় যে সেদিকে যেতে যেতে একটা ওষুধের দোকানে খোঁজ নেওয়ার
সময় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক সাঁওতাল বৃদ্ধ জিজ্ঞেস
করেছিলেন, “ইশ্বরচন্দ্র দেওতা?” পাটনা থেকে আগত দুইজনেই প্রথম বার
শ্রদ্ধাসূচক ওই স্থানীয় শব্দটার সম্মুখীন হন। পরে তাঁরা
জেনেছিলেন যে বিদ্যাসাগর ওই অঞ্চলে আদিবাসীদের
মধ্যে এক দেবতা হিসেবেই প্রসিদ্ধ ছিলেন, কিন্তু বহু বছরের বিস্মরণে,
বাজারের মানুষেরা জায়গাটাকে ‘মালিহাবাগান’ নামেই জানত। কেননা অতো বড়ো নির্জন জমি ও বাগানের রক্ষণাবেক্ষণে
নিযুক্ত একজন মালী ছাড়া তারা আর কাউকে কোনোদিন সেখানে দেখেনি।
গল্পচ্ছলে আরো শোনা
যায় যে গুরুচরণ সামন্ত কর্মাটাঁড়ের স্টেশনমাস্টারকে প্রশ্ন
করেছিলেন, স্টেশনের নামবদলের জন্য কিভাবে এগোতে হবে। স্টেশনমাস্টার বলেছিলেন কঠিন
কাজ। ‘তাহলে চিত্তরঞ্জন কি করে হল?’ ‘বিধান রায় ছিলেন! আপনাদের বিধান রায় আছে?’… শেষ অব্দি পাটনা থেকে আগত দুই ‘অভিযাত্রী’ বিদ্যাসাগরের বাড়ির গেটের সামনে পৌঁছোন। লোহার ছোটো ফাটকের ভিতরে
অদূরে দেখতে পান একতলা, জীর্ণ একটি বাংলোবাড়ি। চারদিকে অনেকটা জুড়ে খোলা জমি আর বাগান।
ফাটক খুলে ঢোকার আগে ডানদিকে দেখেন শ্বেতপাথরের ফলকে লেখা ‘নন্দনকানন’। বোধহয় তদানীন্তন মালিক সম্পর্কেও ইংগিত পেয়ে
থাকবেন সেখানে ‘সিংহদাস মল্লিক চরণাশ্রিত’ লেখা দেখে। যাই হোক, গুরুচরণ
সামন্ত এবং নরেন মুখার্জি ‘মালিহাবাগান’-এর মালীর সঙ্গে কথা বলে বিদ্যাসাগরের বাড়িটার বাস্তবিক
অবস্থান, অবস্থা, মালিকের নাম ঠিকানা ইত্যাদি তো সন্ধান
করেনই, তার সাথে আরো কিছু কাজ করে রাখেন। তাঁরা জামতাড়ায় বাঙালি সমিতির একটি
ব্রাঞ্চ গঠন করেন এবং তাদের মধ্যে থেকেই নন্দনকাননের খোঁজখবর রাখার জন্য, জামতাড়ার
বিখ্যাত উকিল এবং সমাজসেবক শ্রী অরুণ কুমার বসুর নেতৃত্বে একটি তদর্থক সমিতি গঠন করেন। তাঁরা মিহিজামের ডাক্তার পরিমল ব্যানার্জির সাথে
দেখা করে তাঁরও সহযোগিতার আশ্বাস পান।
নরেন্দ্রনাথ মুখার্জি রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর, সমিতির বৈঠকের
সিদ্ধান্ত অনুসারে সাধারণ সম্পাদক, দীপেন্দ্রনাথ সরকার ৫.১০.১৯৭২ তারিখে কলকাতার মল্লিক পরিবারের জিতেন্দ্রনাথ মল্লিককে
একটি চিঠি পাঠান। মল্লিক পরিবার সেই সময় নন্দন কাননের মালিক
ছিলেন। ২৩শে তারিখে চিঠির উত্তর আসে। সে উত্তর আশা জাগিয়ে তোলে যে সম্পত্তিটি ক্রয় করা যেতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, বিদ্যাসাগরের প্রতি শ্রদ্ধাবশতঃ সম্পত্তিটি
মল্লিক পরিবারের হাতেই ছিল বটে, কিন্তু সম্পত্তিটির
উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণে তারা অক্ষম হয়ে পড়েছিল। তাঁদের
পূর্বপুরুষ, যাঁকে বিদ্যাসাগর-পুত্র
নারায়ণচন্দ্র সম্পত্তিটি বিক্রি করেন, বিদ্যাসাগরের প্রতি
শ্রদ্ধায় বাড়িটি কিনেছিলেন। সেই
উদ্দেশ্যে, তাঁর এক বন্ধুর পরামর্শে তিনি একজন ডাক্তারকে
কয়েক হাজার টাকাও দিয়েছিলেন এবং তাকে কর্মাটাঁড়ে গিয়ে
একটি নিঃশুল্ক চিকিৎসা ক্লিনিক খুলতে বলেছিলেন। কিন্তু
ডাক্তার ছিলেন প্রতারক। পরে মল্লিকরা জানতে পারেন যে ডাক্তার
ক্লিনিক খোলার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে কর্মাটাঁড়ে স্থানীয়ভাবে আরও কিছু টাকা সংগ্রহ করে উধাও হয়ে গেছেন। তাই সেসময় তাঁরা সম্পত্তি
বিক্রি করতে আগ্রহী ছিলেন।
চিঠি পাওয়ার পর, ২৬.১১.১৯৭২ তারিখে ছাপরায় বিহার বাঙালি সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক
অনুষ্ঠিত হয় এবং বিদ্যাসাগর মেমোরিয়াল কমিটি গঠন করা হয়।
বিহারের তৎকালীন রাজ্যপাল দেবকান্ত বড়ুয়াকে এগারো সদস্যের কমিটির প্রধান
পৃষ্ঠপোষক করা হয়। বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়কে সভাপতি এবং সত্যেন্দ্রনাথ
চক্রবর্তীকে সম্পাদক করা হয়। সহ-সভাপতি হন পূর্বে উল্লেখিত
সত্যেন সেন এবং কলকাতার পশ্চিমবঙ্গ নিরক্ষরতা দূরীকরণ সমিতির
যুগ্ম সম্পাদক পার্থ সেনগুপ্ত। জামতারা এবং মিহিজামের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকেও
কমিটিতে রাখা হয়, যার মধ্যে একজন ছিলেন পূর্বোল্লিখিত অরুণ কুমার বসু এবং আরেকজন সেখানকার মুখিয়া মুখিয়া
হনুমান সাও।
কর্মাটাঁড়ের সম্পত্তি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলাকালীন, ১৯৭৩
সালের ২৮শে জানুয়ারী বিহার সরকারকে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল। সে চিঠিতে স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, আইনজীবী
এবং জামতারা ও কর্মাটাঁড়ের অন্যান্য বাসিন্দাদের স্বাক্ষর ছিল। এই চিঠিতে সরকারকে ‘নন্দনকানন’-এর সম্পত্তিটি অধিগ্রহণ
করে সেখানে 'বিদ্যাসাগরের নামে জাতীয়
স্মৃতিসৌধ' গড়ে তোলার অনুরোধ করা হয়েছিল। সেখানে 'আদিবাসীদের জন্য একটি স্কুল', 'মহিলাদের জন্য একটি
কারুশিল্প বিদ্যালয়' এবং 'মহিলাদের
জন্য বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র' চালু করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। ধারাবাহিকতায়, ৬ই ফেব্রুয়ারি আরও কয়েকজন
স্বাক্ষরকারীর নামে একই আবেদন আবার
পাঠানো হয়েছিল। খেয়াল রাখা হয়েছিল যে শুধুমাত্র স্থানীয় বাসিন্দারা স্বাক্ষর
করবেন। প্রথম আবেদনে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন, অরুণ
কুমার বসু, বৈজনাথ গুটগুটিয়া, নারায়ণ
চক্রবর্তী, বিভূতি ভূষণ চৌবে এবং খগেন্দ্র নাথ সরখেল (সচিব
এবং সভাপতি, বিহার বাঙালি সমিতি, জামতারা শাখা), গঙ্গা বিষ্ণু লাল, সি. এম.
চতুর্বেদী এবং আরও অনেকে। মোট আঠাশজন স্বাক্ষরকারীর মধ্যে সরকারি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারাও ছিলেন, রেলওয়ের কর্মকর্তারাও
ছিলেন। দ্বিতীয় আবেদনে স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রায় সব ক’জন মুখিয়ার নাম ছিল।
কিন্তু মনে হয় সরকার সম্পত্তিটির
অধিগ্রহণে আগ্রহী ছিল না। তাই ১৯৭৩ সালের ২৯শে এপ্রিল জামতারায় বিভূতিভূষণ
মুখোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে বিদ্যাসাগর মেমোরিয়াল কমিটির একটি
বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির সম্পাদক এস. এন. চক্রবর্তী,
বাঙালি সমিতির সম্পাদক ডি. এন. সরকার এবং অন্যান্যরা সে বৈঠকে
উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে নন্দনকাননের তদানীন্তন মালিকদের সঙ্গে চলতে থাকা
আলোচনার প্রতিবেদন পেশ করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের তরফ
থেকে আবেদনপত্র পাঠানোর (উপরে উল্লেখ করা হয়েছে) ঘটনাটিও প্রতিবেদিত হয়। সেদিনই কমিটি ‘নন্দনকানন’-এ গিয়ে "জমি এবং
ভবনের বিস্তারিত পরিমাপ নেয়, যাতে মূল্যায়ন সংক্রান্ত বিষয়ে
পেশাদারদের পরামর্শ নেওয়া
যায়।"
১৯৭৩ সালের ৮ই জুনে পাওয়া পেশাদার
মূল্যায়ন আর নন্দনকাননের তৎকালীন
মালিক মল্লিক পরিবার কর্তৃক উদ্ধৃত মূল্যে বিশেষ কোনো
তফাৎ ছিল না। তবুও সমিতি আরেকটু কমে রফায় আসতে চাইল, কেননা টাকা তো চাঁদা করেই জোটাতে
হতো! সমিতির প্রতিনিধিদের বারম্বার অনুরোধে বিক্রেতারা মাত্র ২৪,০০০/- টাকায় চুক্তিটি নিষ্পত্তি করতে সম্মত হলেন, কিন্তু
জোর দিলেন যে চুক্তিটি ১৯৭৪ সালের মার্চের মধ্যে সম্পন্ন করতে
হবে (২৩শে মে, ১৯৭৩ তারিখে লেখা তাঁদের
চিঠি ১লা জুন, ১৯৭৩-এ পাটনায়
পৌঁছোয়)। ১৯৭৩ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর, পণ্ডিত
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মবার্ষিকী উদযাপনের জন্য পাটনার আই.এম.এ. হলে বিহার বাঙালি
সমিতির পাটনা শাখা কর্তৃক একটি জনসভার আয়োজন করা হয়। সভার
সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক রঙিন চন্দ্র হালদার এবং উদ্বোধন করেন
বিহার বিধানসভার স্পিকার পণ্ডিত হরিনাথ মিশ্র। সেই সভায় একটি প্রসারিত বিদ্যাসাগর মেমোরিয়াল কমিটি গঠন করা হয়:
পৃষ্ঠপোষক: শ্রী আর ডি ভান্ডারে, বিহারের রাজ্যপাল
সভাপতিঃ শ্রী বিভূতি ভূষণ মুখোপাধ্যায়
ভাইস প্রেসিডেন্ট : ডক্টর সত্যেন্দ্রনাথ
সেন, ভাইস চ্যান্সেলর, কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়
ডঃ এস এম
ঘোষাল
সম্পাদকঃ শ্রী এস এন চক্রবর্তী
সদস্য: পণ্ডিত হরিনাথ মিশ্র, স্পিকার, বিহার বিধানসভা
শ্রীমতী আজিজা ইমাম, এম.পি.
শ্রী ধ্রুব গুপ্ত (দুমকা)
শ্রী হংস কুমার তিওয়ারি (গয়া)
শ্রী ফণীশ্বর নাথ "রেণু" (পাটনা)
ডাঃ যোগেশ চন্দ্র ব্যানার্জী (পাটনা)
শ্রী পার্থ সেনগুপ্ত (কলকাতা)
শ্রী হনুমান সাও, মুখিয়া (করমাটার)
শ্রী অরুণ বোস, অ্যাডভোকেট (জামতারা)
ডাঃ পরিমল ব্যানার্জি (মিহিজাম)
শ্রী সন্তোষ কুমার মজুমদার (পাটনা)
শ্রী নরেন্দ্র নাথ
মুখার্জি (পাটনা)
ডাঃ জি সি সামন্ত (পাটনা)
শ্রী ডি.এন. সরকার (পাটনা)
ডাঃ অনন্ত লাল ঠাকুর, শ্রী কে পি জয়সাওয়াল, শ্রীমতি মৃণালিনী ঘোষ,
অধ্যাপক গোপাল হালদার, শ্রী চন্দ্র শেখর সিং
এবং অন্যান্যরা সভায় বক্তব্য রাখেন এবং বিদ্যাসাগরের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ
করেন (২৮শে সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ তারিখে আনন্দ বাজার পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে)।
সভাধ্যক্ষ পণ্ডিত হরিনাথ
মিশ্র উদ্বোধনী ভাষণে যে পরামর্শ দেন, সে অনুসারে সভা নিম্নলিখিত প্রস্তাব গ্রহণ করে:
“আধুনিক
ভারতের অন্যতম নির্মাতা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর জীবনের শেষের বছরগুলি বিহারের
সাঁওতাল পরগনার কর্মাটাঁড়ে কাটিয়েছিলেন।
তিনি সেখানে নিজের একটি বাড়ি তৈরি করেছিলেন এবং বিভিন্ন উপায়ে স্থানীয় জনগণের
সেবায় নিজেকে নিবেদিত করেছিলেন।
“বিহার বাঙালি সমিতির পৃষ্ঠপোষকতায় বিদ্যাসাগর মেমোরিয়াল কমিটি ভারতের এই মহান পুত্রের স্মৃতি চিরস্থায়ী করার জন্য একটি
উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা তৈরি করেছে। ঈশ্বরচন্দ্রের বাড়ি তাঁর উত্তরাধিকারীরা
বিক্রি করে দিয়েছিলেন। সমিতি সেই বাড়ি কিনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত
নিয়েছে। সেখানে একটি ট্রাস্ট তৈরি করা হবে এবং সে ট্রাস্টের
মাধ্যমে আদিবাসী মহিলাদের জন্য একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং
বৃত্তিমূলক ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলা হবে। আদিবাসী শিশুদের
জন্য একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং কর্মাটাঁড়ের মানুষজনের জন্য বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা করতে একটি গভীর নলকূপ খনন করা হবে। ঈশ্বরচন্দ্রের স্মৃতি প্রকল্প বাস্তবায়নে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী
তাঁর সরকারের তরফ থেকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
“বিদ্যাসাগরের জন্মবার্ষিকী
উপলক্ষে পাটনার গণ্যমান্য মানুষ ও জনপ্রতিনিধিদের এই সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে ‘কর্মাটাঁড়’ রেলওয়ে স্টেশনের (পূর্ব রেলওয়ে) নাম
পরিবর্তন করে ‘বিদ্যাসাগর’ করা যুক্তিসঙ্গত হবে। কেন্দ্রীয় সরকার এবং কেন্দ্রীয় রেল মন্ত্রণালয়কে রেলওয়ে স্টেশনের নাম পরিবর্তন করার অনুরোধ করা হয়েছে।”
সভায় জনসাধারণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের জন্য এক টাকার একটি
কুপন জারি করা হল। প্রথমে পণ্ডিত হরিনাথ মিশ্র কুপন
কিনলেন এবং তারপর সভায় মোট ২,৫৩৬/- টাকা সংগ্রহ করা হল। সমগ্র বিহার জুড়ে অভিযান চালানো হয়েছিল।
ইতিমধ্যে, পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তার জন্য সরকারের কাছে করা
পূর্বের অনুরোধের ধারাবাহিকতায়, ৬.১১.১৯৭৩ তারিখে
বিদ্যাসাগর মেমোরিয়াল কমিটির সচিব বিহার সরকারের শিক্ষা
কমিশনারকে একটি চিঠিতে অন্ততঃ ২০,০০০/-
টাকা অনুদানের অনুরোধ করেন।
বিহার সরকার অবশেষে ১৫,০০০/-
টাকা মঞ্জুর করে। কিন্তু অনুদান মঞ্জুর করা হয় ৩০ মার্চ। (১৯৭৪
সালের মেমো নং ৫১৬, সরকারের যুগ্ম সচিব কর্তৃক স্বাক্ষরিত)। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে টাকাটা পাওয়া যায়। তাই
বিক্রেতাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখতে, কিছু মানুষের কাছ থেকে ধার নিয়ে ক্রয়-চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়
এবং ২৯শে মার্চ ১৯৭৪ তারিখে সেটি নিবন্ধিত হয়।
৩রা এপ্রিল ১৯৭৪,
আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় ‘যৎকিঞ্চিৎ’এ সংবাদটি প্রকাশিত হয়ঃ “বিহার বাঙালী সমিতি সাঁওতাল পরগণার কার্মাটারে প্রাতঃস্মরণীয় ঈশ্বরপচন্দ্র
বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পবিত্র স্মৃতিমন্ডিত বাসভবনটি অধিগ্রহণ করিয়াছেন, ইহা নানা দিক
হইতেই আনন্দের সংবাদ। যে কাজটি বহু পূর্বেই হওয়া উচিত ছিল, অথচ হয় নাই, সে কাজটি বাঙালী
সমিতির উদ্যোগে সম্ভব হইয়াছে, ইহাতে আনন্দ ও গর্ব অনুভব করিবার নিশ্চয়ই কারণ আছে। বাঙালী
সমিতি বাড়িটি অধিগ্রহণের জন্য সরকারের শরণাপন্ন না হইয়া নিজেদের প্রচেষ্টাতেই এ কাজ
সম্ভব করিয়াছেন, ইহা যুগপৎ প্রশংসা ও আনন্দের কথা। সব কাজের জন্য সরকারের মুখাপেক্ষী
না হইয়া এইরূপ আত্মনির্ভরতার আদর্শ অন্যান্য সৎ ও শুভ কাজে অন্যদের দ্বারাও অনুকরণীয়।
সমিতির পক্ষ হইতে কার্মাটার স্টেশনটিকে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নামযুক্ত করার জন্য যে আবেদন
করা হইয়াছে তাহা মঞ্জুর করিতে রেল দপ্তরের দিক হইতে কোন দ্বিধা ও অসুবিধা হইবে বলিয়া
মনে হয় না। সমিতি ভবনটিকে শিক্ষা প্রচার ও ত্রাণ কাজের কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহার করিবার
শুভ সংকল্প করিয়াছেন। ইহা বাংলা ভাষা প্রচার ও প্রসারেরও কেন্দ্র হইবে বলিয়া আশা করি।
কারণ রবীন্দ্রনাথের মতে, বিদ্যাসাগর মহাশয়ই বাংলা গদ্যের প্রথম যথার্থ শিল্পী।”
২
এই প্রকল্পে সরকারের সহযোগিতা চেয়ে
অসংখ্য চিঠিপত্র চালাচালি এবং বৈঠক যে
হয় তার প্রমাণ রয়েছে। বিদ্যাসাগর মেমোরিয়াল
কমিটির সচিব এস. এন. চক্রবর্তীর ৯ই ফেব্রুয়ারী ১৯৭৬ তারিখের একটি প্রতিবেদনে যথেষ্ট বিস্তারিত ভাবে প্রাথমিক বছরগুলির কার্যকলাপের সারসংক্ষেপ পাওয়া যায়। তার অনুচ্ছেদ ৩ থেকে এখানে বাংলা অনুবাদে উদ্ধৃত করছি:
“৩.
সম্পত্তিটি ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে কেনা হয়েছিল। বিহার সরকারের কাছ থেকে ১৫,০০০/- টাকার আর্থিক সহায়তা পাওয়া গেছে।
“৪.
কমিটির নিম্নলিখিত প্রকল্পগুলি বিবেচনায় রয়েছে যা কেবলমাত্র সরকারের সহায়তায়
বাস্তবায়িত হতে পারে: -
ক. প্রশস্ত প্রাঙ্গণে একটি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় শুরু করা;
খ. একই প্রাঙ্গণে একটি মহিলা বৃত্তিমূলক কেন্দ্র শুরু করা;
গ. প্রাঙ্গণের মধ্যে একটি মাতৃত্ব কেন্দ্র শুরু করা;
ঘ. প্রাঙ্গণের মধ্যে কর্মাটাঁড়ের লোকদের পানীয় জল সরবরাহের জন্য একটি ট্যাঙ্ক স্থাপন করা; ঙ. কর্মাটাঁড় রেলওয়ে স্টেশনের নাম পরিবর্তন করে
বিদ্যাসাগর রাখা;
চ. জামতারা এবং কর্মাটাঁড়ের মধ্যে প্রায় ১৯ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পাকা রাস্তা নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করা; এবং
ছ.
বিহার জুড়ে নিরক্ষরতা দূরীকরণ কেন্দ্র পরিচালনা করা।
৫. বিহার সরকারের সাথে এখন পর্যন্ত যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে: -
ক. বিদ্যালয়
১.
তৎকালীন শিক্ষা কমিশনারের নির্দেশে আগেই একটি প্রাথমিক ক্ষেত্র-সমীক্ষা করা হয়েছিল যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এখানে একটি
বালিকা বিদ্যালয়ের প্রয়োজন আছে কিনা। যেহেতু কর্মাটাঁড়ের
মানুষ এমন একটি বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করত তাই তারা, বিদ্যাসাগর মেমোরিয়াল কমিটির এমন একটি প্রকল্প
রয়েছে শুনে কমিটিকে একটি স্মারকলিপি দেয়। সমীক্ষা প্রতিবেদন এবং ঐ স্মারকলিপিটি ২৬.১১.১৯৭৩ তারিখে শিক্ষা বিভাগে জমা দেওয়া হয়েছিল।
২. শিক্ষা কমিশনারের পরামর্শে, কমিটিও ২৬.১১.৭৩ তারিখে জেলা শিক্ষা আধিকারিককে এই প্রাঙ্গণে একটি বিদ্যালয় শুরু করার অনুরোধ
জানিয়ে চিঠি লিখেছিল। কিন্তু কোন উত্তর পাওয়া যায়নি।
৩. জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শকের সাথে ২৫.৪.৭৪ তারিখে দেখা করে তখন অব্দি হওয়া পত্র বিনিময়ের বিবরণ সহ
একই অনুরোধ জানানো হয়েছিল। সেখান থেকেও কোনও স্বীকৃতি বা
উত্তর পাওয়া যায়নি।
৪.
শিক্ষা বিভাগ তাদের রেফারেন্স নং 1208-1209 তারিখ 4.5.74 (কমিটিকে প্রদত্ত অনুলিপি) দ্বারা আমাদের অনুরোধ সম্পর্কে
দুমকার ডি.ই.ও.-কে চিঠি লিখেছিল কিন্তু আর কোনও অগ্রগতি হয়নি। শিক্ষা বিভাগ দৃঢ়
পদক্ষেপ না নিলে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হতে পারবে না।
খ. নারী বৃত্তিমূলক কেন্দ্র
এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনও আলোচনা হয়নি।
সম্ভবত, এটি ক্ষুদ্র শিল্প বিভাগের অধীনে পড়ে। আমরা সরকারের কাছে সহায়তার অনুরোধ করছি।
গ. মাতৃত্ব কেন্দ্র
এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনও আলোচনা হয়নি।
এটি সম্ভবত স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অধীনে পড়ে। সরকারের কাছে সহায়তার জন্য আন্তরিক অনুরোধ করা হচ্ছে। ঐ পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে এমন প্রকল্পের খুব প্রয়োজন।
ঘ. পানীয় জল সরবরাহ
I. বিহার জল উন্নয়ন
কর্পোরেশন, ২৩, পাটলিপুত্র কলোনি,
পাটনা ১৩-র সঙ্গে ২৯.১১.৭৩ তারিখে কর্মাটাঁড়ের ‘নন্দন
কানন’
প্রাঙ্গণে নলকূপ স্থাপনের জন্য যোগাযোগ করা হয়েছিল এবং ১২.১.৭৪ তারিখে আবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কর্পোরেশনের
কাছ থেকে তার কোনও স্বীকৃতি পাওয়া যায়নি।
II. ২৭.৮.৭৪ তারিখে কর্মাটাঁড়ের জনগণের পক্ষ থেকে, পানীয় জল সরবরাহের জন্য উপযুক্ত
প্রকল্পের মাধ্যমে গুণিডিহ এবং মহাজন নদীর জল ব্যবহার করার জন্য একটি স্মারকলিপি পাব্লিক হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান ইঞ্জিনিয়ারের কাছে, ১৪.৯.৭৪ তারিখে একটি চিঠির সঙ্গে জমা দেওয়া হয়। আমরা ঐ স্মারকলিপি সমর্থন করেছিলাম এবং ব্যক্তিগতভাবে চিফ ইঞ্জিনিয়ারকে পরিস্থিতিটা বুঝিয়েছিলাম। এ বিষয়ে তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর
কাছেও স্মারকলিপি পাঠানো হয়েছিল। কোনও স্বীকৃতি বা উত্তর পাওয়া যায়নি।
ঙ. কর্মাটাঁড় রেলওয়ে স্টেশনের নাম পরিবর্তন করে বিদ্যাসাগর করা
I. ২৬.৯.৭৩ তারিখে পাটনায়
এক জনসভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত প্রস্তাব অনুসারে নাম পরিবর্তনের জন্য তৎকালীন
রেলমন্ত্রী প্রয়াত এল.এন. মিশ্রের কাছে ১৬.১১.৭৩ তারিখে স্মারকলিপি পাঠানো
হয়।
II. পূর্ব রেল এবং রেলওয়ে
বোর্ডের কাছে একই রকম অনুরোধ জানানো হয়।
III. উভয়েই উত্তর দেয় যে এই অনুরোধটি বিহার সরকার কর্তৃক সমর্থিত হতে হবে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তাতে
সম্মত হতে হবে।
IV. আমাদের প্রস্তাব সমর্থন
করার জন্য, ৯.৩.৭৪ তারিখে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে একটি আবেদন করা হয় এবং ৮.৪.৭৪ তারিখে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। বিহার সরকার পরিবর্তনের
সুপারিশ করে। ৬.১২.৭৪ তারিখে একটি অনুস্মারক পাঠানো হয়।
V. পূর্ব রেলের প্রধান বাণিজ্যিক সুপারিনটেনডেন্ট এবং রেলওয়ে বোর্ডের সচিবকে ১৪.১.৭৫
তারিখে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে নাম পরিবর্তন কার্যকর করা হয়নি।
VI. ২.৪.৭৫ তারিখে আবার
রেলওয়ে বোর্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।
VII. ৩১.৩.৭৫ তারিখে রেলওয়ে
বোর্ড লেখে যে তারা কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
থেকে কোনও প্রস্তাব পায়নি এবং তারা আমাদেরকে রাজ্য সরকারকে সক্রিয় করার পরামর্শ দেয়।
VIII. ২৫.৬.৭৫ তারিখে
মুখ্যমন্ত্রীর সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়, বর্তমান অবস্থা
ব্যাখ্যা করা হয় এবং কোনও উত্তর না পাওয়ায় ১৫.১.৭৬ তারিখে আবার
একটি অনুস্মারক পাঠানো হয়। IX.
পুরো পরিস্থিতি বিশদে বর্ণনা করে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আলাদাভাবে একটি
আবেদন করা হয়েছে।
চ. জামতারা ও কর্মাটাঁড়ের মধ্যেকার রাস্তাটার নির্মাণ এবং তার নাম রাখা ‘বিদ্যাসাগর পথ’
আমরা এখনও কোনও অনুরোধ করিনি যদিও ৮.৮.৭৫
তারিখে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আমাদের আবেদনে এ প্রস্তাবটি জানানো হয়েছিল। বর্তমান রাস্তাটি কেবল ভালো আবহাওয়ার দিনগুলোয়
ব্যবহার করা যায়। একটি সবরকম আবহাওয়ায়
ব্যবহার করা যায় এমন একটি রাস্তা ঐ পিছিয়ে
পড়া এলাকার অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতিতে যথেষ্ট সাহায্য করবে।
ছ. সাক্ষরতা কেন্দ্র
এখন বেশ কয়েকটি কেন্দ্র কাজ করছে কিন্তু
তহবিলের অভাব একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। কিছু সহায়তা পেলে আরও কার্যকরভাবে কাজ করা
সম্ভব।
……………………
৩
২৭শে ফেব্রুয়ারী ২০১১ তারিখে ‘গুরুদক্ষিণা’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। বিহার এবং ঝাড়খণ্ডের বাঙালিরা, যারা জামতারা জেলার বিদ্যাসাগর রেলওয়ে স্টেশনের কাছে ‘নন্দন কানন’ নামে বিদ্যাসাগরের একটি
বাড়ি থাকার কথা জানেন, তারা এ কথাটাও ভালোভাবে জানেন যে, ‘গুরুদক্ষিণা’ হল ২৯শে মার্চ-এর দিনটি উদযাপনের একটি
বার্ষিক অনুষ্ঠান, যেদিন বিদ্যাসাগরের বাড়িটি তৎকালীন বিহার
বাঙালি সমিতি কিনে নিয়েছিল এবং বর্তমানে বিহার
বাঙালি সমিতি এবং ঝাড়খণ্ড বাঙালি সমিতি
যৌথভাবে বিদ্যাসাগর স্মৃতিরক্ষা সমিতির মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণ করে।
সেই পুস্তিকাটিতে বাংলায়, ঘটনাবলীর একটি খুবই সংক্ষিপ্ত
কালক্রম দেওয়া রয়েছে।
১৯৭৮ – ১৯৭৮-এর ২রা অক্টোবর মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী
(মাধ্যমিক) শ্রী গোলাম সারওয়ার, কর্মাটাঁড়ে বিহার সরকারের
প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষা কর্মসূচির উদ্বোধনকালে ঘোষণা করেন যে সরকার বিদ্যাসাগর
বালিকা মধ্য বিদ্যালয়কে বিত্তরহিত (নন-ফাইনান্সড) সংখ্যালঘু
বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি বিহার বাঙালি সমিতিকে ১২০টি প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র পরিচালন করার
অনুমোদন দেন।
১৯৭৮ – বিহার বাঙালি সমিতির প্রচেষ্টার ফলে, বিহার সরকারের সম্মতি পেয়ে রেল মন্ত্রণালয় কর্মাটাঁড় রেলস্টেশনের নাম পরিবর্তন করে ‘বিদ্যাসাগর’ করে।
১৯৯৩ – পাটনার বিখ্যাত আইনজীবী
শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি (আমাদের শ্রদ্ধেয় শ্যামাদা) নন্দন কাননে বিদ্যাসাগরের একটি মার্বেল মূর্তি স্থাপনের ব্যবস্থা
করেন। পাটনা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি শ্রী বিমল চন্দ্র বসাক এই মূর্তির আবরণ উন্মোচন করেন।
১৯৯৪ – এই বছরের সেপ্টেম্বর থেকে
২০০০ সালের মে পর্যন্ত, বিশ্বকোষ পরিষদ, কলকাতার আর্থিক সহায়তায় স্কুলটি [বিদ্যাসাগর বালিকা মধ্য বিদ্যালয়] চালানো সম্ভব হয়েছিল। ঐ সময়কালে, বিশ্বকোষ
পরিষদের পার্থ সেনগুপ্ত স্কুল কমিটির সম্পাদক ছিলেন। বিশ্বকোষ পরিষদ এবং পথের
পাঁচালী (কলকাতা) -র আর্থিক সহায়তায় ‘ভগবতী ভবন’ নির্মিত হয়। স্থানীয়
বিধায়ক শ্রী শশাঙ্ক শেখর ভোক্তার ‘বিধায়ক তহবিল’ থেকে স্কুলের জন্য একটি ভবন
আংশিকভাবে নির্মিত হয়।
১৯৯৪ – পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মাননীয়
ক্রীড়া ও পরিবহন মন্ত্রী শ্রী সুভাষ চক্রবর্তী ‘ফ্রেন্ডস অফ স্টেডিয়াম’-এর পক্ষ থেকে স্কুল
পরিচালনার জন্য সমিতিকে এক লক্ষ টাকা দান
করেন।
২০০০ – ঝাড়খণ্ড রাজ্য গঠনের পর, স্কুলটি মূলতঃ ঝাড়খণ্ড বাঙালি
সমিতি, জামশেদপুর শাখার সহায়তায় পরিচালিত হচ্ছে।
২০০৮ – জামশেদপুরের শ্রীমতী চামেলী
চ্যাটার্জী, বিদ্যাসাগর চ্যারিটেবল
হোমিওপ্যাথিক ডিসপেনসারির কক্ষ নির্মাণের জন্য চল্লিশ হাজার টাকা দান করেন। ডাঃ
চিন্ময় চক্রবর্তী প্রতি শুক্রবার সেখানে একজন চিকিৎসক হিসেবে বিনামূল্যে সেবা
প্রদান করা শুরু করেন।
২০০৯ – কলকাতার পথের পাঁচালীর পক্ষ
থেকে শ্রীমতী রমলা চক্রবর্তী স্কুল ডিপোজিট ফান্ডে পাঁচ লক্ষ টাকা দান করেন।
২০১০ – কলকাতার শ্রী পার্বতী কিঙ্কর রায় চ্যারিটেবল হোমিওপ্যাথিক
ডিসপেনসারির ওষুধ কেনার জন্য দশ হাজার টাকা দান করেন।
এই কালপঞ্জি কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করে। কেন এই কালপঞ্জিতে আশির
দশক সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত? কোন বছর
পর্যন্ত প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্রগুলি পরিচালিত হয়েছিল? ঐ বছরগুলিতে বালিকা বিদ্যালয় কীভাবে পরিচালিত হতো? তার
জন্য বিহার বাঙালি সমিতির কেন্দ্রীয় এবং
জামতারা শাখার সভা, সম্মেলনের কার্যবিবরণী ইত্যাদি পড়তে হবে। আপাততঃ সেগুলোর সন্ধান করতে যাচ্ছি না কেননা নন্দন কাননের
বিগত পঞ্চাশ বছরের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখা আমার একার কর্ম নয়। অরুণ
কুমার বসু, জামতাড়ার মানুষের প্রিয় ‘বীরুদা’ এখন আর আমাদের মধ্যে
নেই। আছেন জামতাড়ায় দেবাশীষ মিশ্র, কর্মাটাঁড়ে চন্দন মুখার্জি। বর্তমান ‘নন্দনকানন পরিচালন সমিতি’র সম্পাদক ও সভাপতি। অনুসন্ধিৎসু পাঠক তাঁদের
সঙ্গে বসে অন্তরঙ্গ অনেক কথা জানতে পারেন নন্দনকাননের বিষয়ে।
একটি বই আছে – সচ্চিদানন্দ, কে. কে. ভার্মা, মনোহর
লাল এবং রাজেশ্বর মিশ্র রচিত ‘ভলান্টারি এফর্ট ইন ন্যাশন্যাল এডুকেশন প্রোগ্রাম ইন বিহারঃ অ্যান
এপ্রেইজাল’।
পাটনার এ. এন. সিনহা ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল স্টাডিজের
গবেষণামূলক বইটি ১৯৮১ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতার অরুণিমা প্রিন্টিং ওয়ার্কসের
দেবেশ দত্ত দ্বারা প্রকাশিত হয়েছিল। ‘স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা’ তালিকাসম্বলিত অধ্যায়ে পাটনার বিহার বাঙালি সমিতির নাম
২০ নম্বরে রয়েছে। বিহার বাঙালি সমিতি কর্তৃক ন্যাশন্যাল
অ্যাডাল্ট এডুকেশন প্রোগ্রাম শুরু করার বছর
(এই কর্মসূচির অধীনেই বিহার সরকার অ্যাডাল্ট এডুকেশন সেন্টার খোলার উদ্যোগ নিয়েছিল) উল্লেখ করা হয়েছে ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি। যদিও ‘গুরুদক্ষিণা’ পুস্তিকা থেকে উদ্ধৃত
কালানুক্রমে উল্লেখ রয়েছে যে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী (মাধ্যমিক) শ্রী গোলাম সারওয়ার কর্তৃক
অনুমোদিত অ্যাডাল্ট এডুকেশন সেন্টার-এর সংখ্যা ১২০, এই বইটিতে বিহার বাঙালি সমিতিকে ৬০টি অ্যাডাল্ট এডুকেশন সেন্টার খোলার
অনুমোদন দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৭৯
সালের জুলাই পর্যন্ত কর্মরত অ্যাডাল্ট এডুকেশন সেন্টার-এর
সংখ্যা ৬১টি। যাতে
মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৮৩৫টি। ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকে আমি মনে করতে পারি যে,
৮০-র দশকে পাটনা, কলকাতা
এবং অন্যান্য স্থানের বিশিষ্ট নাগরিকদের একটি তালিকা ছিল যারা নন্দনকাননে অবস্থিত বিদ্যাসাগর বালিকা মধ্য বিদ্যালয়ের নিয়মিত দাতা ছিলেন। কিন্তু পরিসরটির উন্নয়নে আর কোনও কর্মসূচি গ্রহণ করা যায়নি। একদিকে নন্দনকানন প্রকল্পে
সরকারের পক্ষ থেকে আর কোনও সহায়তা বা উদ্যোগ ছিল না, অন্যদিকে,
সেই সময়কালে পাটনায় আরেকটি প্রকল্পের উত্থান ঘটে। বিহার বাঙালি
সমিতির মতো সংগঠনগুলোয় নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর
সংখ্যা থাকে হাতে গোনা। গত শতকের আশির
দশকে বিহারে একটি বাংলা অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠা করার সম্ভাবনা দেখা দেয়। প্রথমে, সরকারের উপর চাপ
সৃষ্টি করার জন্য, সমিতি নিজেই একটি বাংলা একাডেমি গঠন করে। ফলে, ১৯৮৩ সালের ১২ই মে,
বিহার সরকার নিজেই উদ্যোগ নিয়ে বিহার বাংলা
একাডেমি প্রতিষ্ঠা করে। প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন বিভূতিভূষণ
মুখোপাধ্যায়, যিনি এদিকে আবার
বিদ্যাসাগর মেমোরিয়াল কমিটিরও সভাপতি
ছিলেন। বিহার বাঙালি সমিতির সাধারণ সম্পাদক, দীপেন্দ্রনাথ সরকার ১৯৮১ সালের ডিসেম্বরে মারা যান। তাঁর পরবর্তী
ব্যক্তি, অর্থাৎ ডানহাত, অধ্যাপক গুরুচরণ সামন্ত একাডেমির
উপ-নির্দেশক নিযুক্ত হন। সেই সময়টি ছিল প্রতিষ্ঠানের একটি
গৌরবময় সময়। প্রথমে বিশিষ্ট লেখক গোপাল হালদার এবং তারপর ভারতীয়
প্রশাসনিক সেবায় নিযুক্ত বিশিষ্ট আধিকারিক আভাস চ্যাটার্জির মত
নির্দেশকদের দক্ষ নির্দেশনায়, একাডেমি অনেক
গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশ করে এবং আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজিত
করে। যদিও প্রভুদত্ত মুখার্জির মতো একজন দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্ব সেই সময় বিহার
বাঙালি সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন,
তবুও মনে হচ্ছে, নেতৃত্বের প্রধান মুখগুলো আকাডেমির কাজে ব্যস্ত
হয়ে পড়ায় নন্দন কাননের উন্নয়নে বেশি কিছু করা সম্ভব হয়নি।
জামতাড়াতেও, নন্দন কানন প্রকল্পে সবচেয়ে সক্রিয় স্থানীয়
ব্যক্তি, অরুণ কুমার বসু
অন্যান্য বিষয়ে ব্যস্ত ছিলেন। একটি রাজনৈতিক দল তাঁকে
জামতাড়া থেকে বিধায়ক প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেছিল এবং তিনি নির্বাচিতও হয়েছিলেন; কিন্তু আইনি লড়াইয়ের পর সেই দল আসনটি হেরে যায়। এই
সমস্ত ঘটনা নন্দন কাননের দুর্দশা বাড়িয়ে তোলে।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিহার বাংলা একাডেমির নেতৃত্বে বদল ঘটে। এদিকে
১৯৯১ সালে অধ্যাপক গুরুচরণ সামন্ত বিহার বাঙালি সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। নন্দন কাননে উন্নয়নমূলক কার্যকলাপে গতি আসে, যার পরিণামে, আমরা উপরে উদ্ধৃত কালানুক্রমে দেখতে পাই যে ১৯৯৩
সালে নন্দন কাননে বিদ্যাসাগরের একটি আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করা হয়। ১৯৯৩ সালের ৩রা
অক্টোবর পাটনার হিন্দুস্তান টাইম্সে পূর্ণেন্দু মুখার্জির
লেখা "ফিটিং ট্রিবিউট" শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণরূপে উদ্ধৃত করা হচ্ছে:
“উপযুক্ত শ্রদ্ধাজ্ঞাপন
“সম্প্রতি কর্মাটাঁড়ে, প্রখ্যাত সমাজসংস্কারক
বিদ্যাসাগরের ১৭৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর মূর্তির আবরণ
উন্মোচন অনুষ্ঠানে
“২৬শে
সেপ্টেম্বর সকাল। আকাশ মেঘলা এবং ভোর থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিল। বেলা ৯টার দিকে বৃষ্টি থেমে গেছে। জনসমাগম ক্রমশ বাড়ছে। নন্দনকাননে, বিস্তীর্ণ মাঠে ঘেরা একশো বছর পুরোনো বাড়িটি দেখা যাচ্ছে। বাড়ির বাম দিকে একটি
সুসজ্জিত মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে যেখানে একটি মার্বেল মূর্তি
লাল কাপড় দিয়ে ঢাকা। মঞ্চের পিছনের পর্দায় ব্যানার টাঙানো, ‘বিদ্যাসাগর
জন্মোৎসব, বিহার বাঙালি সমিতি’।
“বিদ্যাসাগর, যিনি ছিলেন নবজাগরণের চেতনার প্রতীক, ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদের প্রতীক এবং আধুনিক শিক্ষার পথিকৃৎ, কলকাতার কোলাহলপূর্ণ নগর জীবন থেকে দূরে সরে এসে ছোট শহর কর্মাটাঁড়ের এই বাড়িতে তাঁর শেষ দিনগুলি কাটান। উনিশ শতকের অন্যতম সক্রিয় সংস্কারক, এই প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র, সরল ও নিরক্ষর
আদিবাসীদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো আপন করে নিয়েছিলেন। তিনি হোমিওপ্যাথিক ওষুধের বাক্স
নিয়ে বাড়ি বাড়ি যেতেন, বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান করতেন।
আদিবাসী পুরুষ ও মহিলারা প্রতিদিন তাঁর বাড়িতে আসতেন এবং তাঁর উঠোন তাদের গান ও
নৃত্যে প্রতিধ্বনিত হত।
“আজ পাটনা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি শ্রী বিমল চন্দ্র বসাক এই কিংবদন্তি
ব্যক্তিত্বের মূর্তি উন্মোচিত করবেন। পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের
বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতা অনুষ্ঠানে উপস্থিত। কলকাতা থেকে আনা
মার্বেল মূর্তিটি অ্যাডভোকেটস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং পাটনা হাইকোর্টের
সিনিয়র আইনজীবী শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি দান করেছেন।
“বাংলা ও
বিহারের মানুষ বিদ্যাসাগরের কাছে অনেকভাবে ঋণী। ১৯১২ সালে বাংলা ও বিহার দুটি পৃথক রাজ্যে পরিণত হয়, কিন্তু আজ দুটি রাজ্যের শিশুরা একই মঞ্চে একত্রিত
হয়েছে। অবশ্যই, বিদ্যাসাগরের তৈরি
করা যোগসূত্র তাদেরকে একত্রিত করেছে।
“বিচারপতি
বিমল চন্দ্র বসাক আধুনিক জীবনের ধারণায় ন্যায়বিচারের ধারণার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে
আলোচনা করেন এবং বলেন যে বিদ্যাসাগর বুঝতে পেরেছিলেন, একমাত্র গণশিক্ষাই জীবনকে
সামাজিক ন্যায়বিচারের দিকে পরিচালিত করতে পারে।
“জামতারার শিল্পীরা একটি
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপস্থাপন করেন যার পর,
আদিবাসী পুরুষ ও মহিলাদের ভিড় তাদের সেরা পোশাকে সজ্জিত হয়ে এসে মূর্তিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে – দৃশ্যটি শিহরিত করে এবং চোখে জল এনে দেয়। বিদ্যাসাগর
হলেন কর্মের দেবতা – তাদের কাছে “করম-দেওতা”। তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম
বিদ্যাসাগরের প্রতিদিনকার বসার স্থানটি চিহ্নিত করে সিমেন্টের তৈরি নিচু বেদীটার পূজা করে
আসছে।”
এর পরে আমরা দেখতে পাই যে তহবিল আসতে শুরু করে। কলকাতা এবং জামশেদপুরের কিছু প্রতিষ্ঠান স্কুল পরিচালনায় আগ্রহী হতে শুরু করে এবং ভবন নির্মাণ শুরু
হয়। নতুন শতাব্দীর শুরু এবং বিহার ও ঝাড়খণ্ডের বিভাজনের ফলে বিহার বাঙালি সমিতি নন্দনকানন প্রকল্পের একটি
নতুন পর্যায় শুরু করার পথে চালিত হয়।
৪
১৫ নভেম্বর ২০০০ সালে নতুন ঝাড়খণ্ড রাজ্য গঠিত হয়। ২০০৯ সাল পর্যন্ত,
বাঙালি সমিতি, জামশেদপুর শাখা এবং কলকাতার কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অনুদানের একটি বড়
অংশের যোগান দেয়। ২০১১ সালের
পুস্তিকাটিতে "বর্তমান অবস্থা" শিরোনামে (অর্থাৎ,
২০১১ সালে) একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে:
• “বিদ্যাসাগর বালিকা মধ্য
বিদ্যালয়ে প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। আটজন শিক্ষক (একজন প্রশিক্ষিত)
দীর্ঘদিন ধরে স্বল্প বেতনে স্কুলে কাজ করছেন।
• “কেবলমাত্র কঠোর পরিশ্রমের
মাধ্যমে স্কুলটি পরিচালনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
• “স্কুলটিকে বিত্তপ্রদত্ত (ফাইনান্সড) সংখ্যালঘু স্কুল হিসেবে
স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ঝাড়খণ্ড সরকারের কাছে আবেদন (ফর্ম ইত্যাদি সহ) জমা দেওয়া
হয়েছে।
• “যথাযথ নিরাপত্তার অভাবে, নন্দন কানন পরিসরের পাঁচিলের ইট চুরি হচ্ছে; পরিসরটি অসুরক্ষিত হয়ে পড়েছে।
• “ঝাড়খণ্ডের সাংসদ শ্রী শিবু
সোরেনের সাংসদ তহবিল থেকে ভবন নির্মাণের জন্য চার লক্ষ টাকা মঞ্জুর করা হয়েছে।
• “শ্রী মৃণ্ময় দাস বোস
(চুনসুরা, হুগলি, পশ্চিমবঙ্গ) শৌচাগার নির্মাণ করাচ্ছেন।
• “বিশ্বকোষ পরিষদ এবং আল-হেলাল
মিশন, কদম্বগাছি, বারাসত (পশ্চিমবঙ্গ), বিদ্যাসাগরের বাড়ির মেরামতের জন্য
পঁচিশ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছে। তারা জানিয়েছে যে তারা আরও অর্থ দান করার চেষ্টা করছে।”
পুস্তিকাটিতে তিন দফা ভবিষ্যৎ কর্মসূচিও দেওয়া আছে:
• “যেভাবেই হোক, দখল বন্ধ করার জন্য নন্দন কাননের চারপাশে ইট ও
পাকা পাথরের স্থায়ী প্রাচীর নির্মাণ করা।
• “স্কুল পরিচালনার জন্য অনুদান-নির্ভরতার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে বিশ লক্ষ
টাকার একটি ‘আমানত তহবিল’ তৈরির জন্য অনুদান সংগ্রহ করা।
• “বিদ্যাসাগরকে গুরুদক্ষিণা
দেওয়ার আহ্বানে মানুষকে অনুপ্রেরিত করে
নন্দনকাননকে জাতীয় তীর্থের মতো করে তোলা।
পাঁচিল নির্মাণের জন্য আন্তরিকতার সাথে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং একটু
একটু করে, পুরো নন্দন কানন পরিসরটি এখন পাঁচিল ঘেরা এবং সুরক্ষিত। কিন্তু স্কুলটি সংরক্ষণ করা যায়নি, কারণ স্থানীয় ছাত্রীদের পরিবার আগ্রহী ছিল না। টাকার অভাবই একমাত্র কারণ নয়। মূল কারণঃ স্কুলটি ইংরেজি মাধ্যম ছিল না আর সময় বদলে গেছে; কর্মাটাঁড় এবং কাছাকাছি গ্রামে এখন যথেষ্ট সংখ্যায় ইংরেজি মাধ্যম বেসরকারি স্কুল বিদ্যমান। নন্দন কাননে একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল খোলার বিষয়টিও আলোচিত হয়েছিল, কিন্তু
ফলপ্রসূ হয়নি।
তবে নিয়মিত যাওয়া-আসা এবং অনুষ্ঠান, বিশেষ করে ২৯শে মার্চ বা কাছাকাছি কোনো দিনে ‘গুরুদক্ষিণা’, ২৯শে জুলাই বিদ্যাসাগরের
মৃত্যুবার্ষিকী এবং ২৬শে সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মবার্ষিকী উদযাপন, গত এক দশকে কর্মাটাঁড়ের
পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে। স্কুলের শিশুদের নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা, প্রভাত-ফেরি, চারা রোপণ, সেমিনার,
চিকিৎসা ও চক্ষু পরীক্ষা শিবির ইত্যাদি বছরের পর বছর ধরে জনসাধারণের
আকর্ষণ বৃদ্ধি করেছে। সেই কারণেই, যখন বিদ্যাসাগরের ২০০তম
জন্মবার্ষিকী উদযাপনের কর্মসূচিটি অনানুষ্ঠানিক আলোচনার স্তরেও ব্যাপকভাবে শুরু
হয়, তখন অনেক আমূল পরিবর্তন আসতে শুরু করে।
Ø প্রথমত, বিদ্যাসাগর স্মৃতি রক্ষা
সমিতিকে ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন এ্যাক্ট ১৮৬০-এর অধীনে নিবন্ধিত করানো হয়, যাতে দুই
রাজ্যের অংশীদারিতে পরিসরটির উন্নয়ন এবং প্রতি বছর গৃহীত কর্মসূচিগুলোর কাঠামো সুশৃঙ্খলভাবে করা যায়।
Ø একই সঙ্গে, আগে স্থানীয় মানুষদের নিয়ে যে
বিদ্যাসাগর বালিকা বিদ্যালয় সমিতি বা পরিচালন সমিতি ছিল, বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার
পর সেটির পরিবর্তিত নামকরণ হয়েছিল ‘নন্দনকানন পরিচালন সমিতি’। সমস্ত রকম কর্মসূচিতে স্থানীয় মানুষজন এবং বিদ্যালয়গুলির শিক্ষক-শিক্ষিকা
ও ছাত্র-ছাত্রীদের অংশীদারি সুনিশ্চিত করতে ওই পরিচালন সমিতিই উদ্যোগ নিত। তারাই স্থানীয়
প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। বিদ্যাসাগর স্মৃতি রক্ষা
সমিতির নিবন্ধিত নিয়মাবলীতে এই সমিতির নামকরণ হয় ‘নন্দনকানন কার্যকারিণী সমিতি’ এবং ঐ লেখা হয় যে ঐ সমিতির সভাপতি এবং সম্পাদক পদাধিকার বলে
বিদ্যাসাগর স্মৃতি রক্ষা সমিতির সদস্য হবেন।
Ø পরের কয়েক মাসের মধ্যেই একটি অভাবনীয়, ঐতিহাসিক
কাজ হয়। নন্দনকাননে ঢোকার মূল রাস্তা এবং ফটকটা এত সরু ছিল যে স্কুটার, বাইক ছাড়া কিছু
ঢুকতে পারত না। এটা তো উনিশ শতকের ভারত নয়! স্টেশন থেকে বেরিয়ে কোথাও এমন কোনো জায়গা
ছিল না যেখানে দু-পাঁচটা গাড়ি দাঁড় করানো যেতে পারে। আরেকটি রাস্তা ছিল পরিসরের পাঁচিলের
একটা ভাঙা অংশ অব্দি পৌঁছোনোর, কিন্তু ভাঙা পাঁচিল, কাদা, আবর্জনার স্তূপ পেরিয়ে ঢোকা
রীতিমত কষ্টকর এবং সময়ে সময়ে আগত সম্মানিত অতিথি বা সরকারি আধিকারিকদের জন্য অবমাননাকর
ছিল। ভাঙা পাঁচিলের একটু আগে একটি বাড়ি দেখা যেত যার সঙ্গে জমি ছিল একফালি।
এই প্রসঙ্গে কয়েকজন ব্যক্তির নাম না নিলেই
নয়। বস্তুতঃ নন্দনকাননের চরম দুরবস্থার সময়েও এমন সব বিদ্যাসাগরপ্রেমী, নিবেদিত প্রাণ
মানুষদের দেখা গেছে যাঁরা নিজেদের সাধ্যমতো পরিসরটাকে বাঁচিয়ে রাখতে ঐ বনজঙ্গলের মধ্যে
থেকেছেন, খেটেছেন দিনের পর দিন। এবারের কাজটির প্রধান হোতা ছিলেন বিহার বাঙালি সমিতির
সভাপতি এবং বিদ্যাসাগর স্মৃতিরক্ষা সমিতির উপাধ্যক্ষ ডঃ (ক্যাপ্টেন) দিলীপ কুমার সিনহা।
তাঁর অন্যতম প্রধান সহযোগী ছিলেন নন্দনকানন পরিচালন সমিতির সভাপতি শ্রী দেবাশীষ মিশ্র।
আইনি সহযোগিতায় ছিলেন স্মৃতিরক্ষা সমিতির অধ্যক্ষ শ্রী অরুণ কুমার বসু, আর্থিক ব্যবস্থাপনার
সহযোগিতায় ছিলেন স্মৃতিরক্ষা সমিতির আর্থিক উপদেষ্টা শ্রী সচ্চিদানন্দ সিনহা। সঙ্গে
ছিলেন স্মৃতিরক্ষা সমিতির আরো কয়েকজন, যেমন বিহার বাঙালি সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুনির্মল
দাশ, নন্দনকানন পরিচালন সমিতির সম্পাদক চন্দন মুখার্জি প্রভৃতিরাও সারাক্ষণ সাহায্য
করেছেন।
ক্যাম্পাসের দক্ষিণ দিকে যাঁর বাড়ি ছিল সেই
গুটগুটিয়া সাহেবের সঙ্গে, তাঁর পরিবারের সঙ্গে বহুবার কথা বলে অবশেষে ২০১৭ সালের ১৫ই
মে, আদালতে জমি বিনিময়ের চুক্তি হয়। গুটগুটিয়া
সাহেবের বাড়ির সংলগ্ন জমিটা পাওয়ার পর ভিতরে মোটর প্রবেশের পথ তৈরি
হয়। পুরাতন ছোট গেটটি এখন, উৎসবের দিনগুলো বাদে স্থায়ীভাবে বন্ধ থাকে। নতুন প্রবেশপথে একটি সুদৃশ্য দ্বার তৈরি করা হয়েছে।
২০০তম জন্মবার্ষিকীর
প্রস্তুতির সময়:
Ø নন্দন কানন পরিচালন সমিতির অনুরোধে জেলা প্রশাসন, পরিসরের ভিতরের লেনগুলির
মেরামত করিয়ে, টালি বসানোর ব্যবস্থা করে, আশেপাশের জমির
ধারে কিছু সুদৃশ্য কালো মার্বেলের বেঞ্চ তৈরি করে দেয়। আলোর ব্যবস্থা করে।
Ø ছয়টি গ্রাম নিয়ে কর্মাটাঁড় ব্লকের নামকরণ করা হয় বিদ্যাসাগর ব্লক/
Ø রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পূর্বে প্ল্যাটফর্মে বিদ্যাসাগরের একটি
প্রতিকৃতি স্থাপন করেছিল। এখন তারা স্টেশন চত্বরের বাইরে একটি বিদ্যাসাগর পার্ক
তৈরি করেছে এবং সেখানে বিদ্যাসাগরের একটি আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করেছে। রেলওয়ে
স্টেশনের দেয়াল বিদ্যাসাগরের জীবনের বিভিন্ন পর্ব এবং তাঁর বাণীর ছবি দিয়ে
সজ্জিত করা হয়েছে। স্টেশন গেটটি নন্দন কাননের নামে জনগণকে স্বাগত জানায়।
Ø ক্যাম্পাসের ভেতরে, বিদ্যাসাগরের বাড়ির প্রথম বড়ো ঘরটায় এখন
বিদ্যাসাগরের জীবনের উপর একটি প্রদর্শনী রয়েছে। পরিসরে দর্শনার্থীদের
জন্য রাতের বিশ্রাম এবং খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। পর্যটকদের নিয়মিত ভ্রমণে,
বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ থেকে, নন্দনকাননের
জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। নন্দন কানন এখন একটি পরিচিত পর্যটন কেন্দ্র।
Ø জেলা পর্যায়ের সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থাগুলি এখন প্রায়
নিয়মিতভাবে কর্মশালার স্থান হিসেবে নন্দন কানন ব্যবহার করে।
আশা করা যায় যে নন্দন কানন প্রকল্পটি ভবিষ্যতে আরও বিকশিত হবে।
২০.২.২৬
.jpeg)
.jpeg)
.jpeg)
.jpeg)