Monday, September 24, 2018

মেধাজগতের দুর্নীতি


ব্যাপারটা এভাবে শুরু করার চেষ্টা করি। ধরুন একটা সেতু – ঘটা করে উদ্বোধন হল, আর কয়েক বছরের মাথায় ভেঙে পড়ল। খবরের কাগজগুলোয় প্রচুর লেখালিখি হল যে নির্মাণকারী কম্পানি বা তার ঠিকেদারেরা সঠিক জিনিষ দেয়নি, অর্থাৎ কংক্রীটের মিশেলে খাদ ছিল, সঠিক গুণমানের ইস্পাত দেয়নি ভিতরে, মন্ত্রী ও আধিকারিকদের ঘুষ খাইয়েছে, এলাকার বড় দাদাদের তোলা জুগিয়েছে… বা তার থেকে আরেকটু এগিয়ে নির্মাণকৌশল বা সেতুটির ডিজাইন নিয়েও কিছু চর্চাটর্চা হল।
কিন্তু কোনো নদীর ওপর সেতু তৈরি করার আগে সেই নদীর দুই পাড়ের ও নদীতলের জমির ভূতাত্ত্বিক তথ্য এবং নদীতে বিভিন্ন মরশুমে জলপ্রবাহের পরিমাণ ও ধারার গতিবেগ সম্পর্কিত কিছু তথ্যের সংগ্রহ ও প্রয়োগভিত্তিক কিছু গবেষণা হওয়ার কথা থাকে, সেই সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন ডিজাইন ও নির্মাণকৌশল পর্যালোচিত হওয়ার কথা থাকে। এমনকি আবহাওয়া ও সেতুটির ওপর যানবাহনের সম্ভাবিত সর্বাধিক চাপটিও নির্ধারণ করার ব্যাপার থাকে।
সেগুলো যদি না হয়ে থাকে ঠিকমত? আর না হওয়ার কারণ যদি রাজনৈতিক চাপ বা অর্থকরী দুর্নীতি না হয়ে হয় আরো গভীর কোনো ক্ষয়? যদি তথ্য সংগ্রহের কোনো স্তরে বা সবকটি স্তরে এবং প্রয়োগভিত্তিক গবেষণার স্তরে কাজগুলো আংশিক হয়ে থাকে? তাৎক্ষণিক ও বাস্তবিক কাজের জায়গায় পুরোনো কিছু কাজের ওপর ভরসা করা হয়ে থাকে? সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন ডিজাইন ও নির্মাণকৌশল পর্যালোচিত হওয়ার জায়গায় সংশ্লিষ্ট কমিটির ইঞ্জিনিয়ারেরা যদি নামজাদা ও একাজে অভিজ্ঞ কিছু সংস্থার তরফ থেকে দেওয়া ‘ইনফর্মাল বা ফর্মাল ব্রীফিং’এর ওপর ভরসা করে থাকেন? এবং এসবকিছু কোনো রাজনৈতিক চাপে তাড়াহুড়োর কারণে নয় বরং একাজে জড়িত সরকারি ও বেসরকারি এক্সপার্টদের কাজের সাধারণ ধরণ হিসেবে হয়ে থাকে? তাহলে যে সামাজিক ক্ষয়টি চিহ্নিত হয় আমি তাকেই মেধাজগতের দুর্নীতি বলছি।
ইচ্ছে করে বলছি। জানি এক্ষেত্রে ‘ক্ষয়’ শব্দটিই সঠিক। তা সত্ত্বেও বলছি কেননা দুর্নীতি আজ একটা ইস্যু। অবশ্যই ইস্যু। হওয়াও উচিৎ, সবার জন্য। কিন্তু, ‘সুইস ব্যাঙ্কে রাখা টাকাগুলো দেশে ফিরে এলেই দেশটি সবার জন্য ধনধান্যে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে’ – এধরণের কথা একজন অর্থনীতিবিদ বললে কি বলব না, “মশাই, নিজের ভাষ্যে মেধার যে দুর্নীতি ঘটাচ্ছেন, তার সম্বন্ধেও সাধারণ মানুষকে একটু ওয়াকিবহাল করুন!”      
আর যদি দেশের সার্বিক লাভক্ষতির কথা ভাবি তাহলে, নিচের তলার ঘুষঘাসের কথা তো ছেড়েই দিই (টেবিলের দুপাশে একই জাতের কাক, কাক বলেই কাকের মাংস খাচ্ছে, যেমন যেমন কাক থাকবেনা, মাংসও খাবেনা), লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার পলিটিকো-কর্পোরেট আর্থিক দুর্নীতি দেশের যা ক্ষতি করছে (ওই দুর্নীতিটি না হলে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে বিশেষ কিছু ‘অতিরিক্ত’ লাভ হত কিনা সেটাও বিচারসাপেক্ষ) তার থেকে অনেক গভীরে ক্ষতি করছে মেধাজগতের দুর্নীতি।
                 *                                    *                                   *                                     *
লেখাটা মনের তাগিদে একবার প্রায় শেষ অব্দি খসড়া করে নেওয়ার পর অভ্যাসবশতঃ নেট খুলে দেখলাম কী পাওয়া যায়। যদি ঠিক আমি যা বলতে চাইছি সে কথাগুলো কোনো লেখায় পেয়ে যেতাম, ঝঞ্ঝাট কমে যেত – অনুবাদ করে নিতাম। তবু যা পেলাম তা কম নয়। আসলে সাধারণ মানুষ ভাবনাচিন্তায় সবচেয়ে সুরক্ষিত বোধ করে তখনই যখন দেখে যে সে একা নয় অনেকেই এটা নিয়ে ভাবছে। আর ভাবনাচিন্তারও সবচেয়ে সুন্দর দিক বোধহয় এটাই যে কোনো ভাবনা পুরোপুরি একজনের ভাবনা কখনই নয়। ভাবনার রেণুগুলো উড়তে থাকে সারা পৃথিবীতে। কোনো একজন সে ভাবনাটাকে নির্দ্দিষ্ট পারিভাষিক বাঁধনে বাঁধতে সক্ষম হয়। আর তখন সেটা আর ভাবনা থাকেনা। নির্দিষ্ট পারিভাষিক বাঁধনে পৌঁছোনো তো আর ভাষার কারিগরি নয়! ফর্মুলেশন – আবিষ্কার! সেটা ব্যক্তিমনীষার কৃতিত্ব।…
‘ইন্টেলেকচুয়াল কোরাপ্‌শন’ শব্দটা নেটে সার্চ মারতেই উঠে এল ভারত থেকে পাকিস্তান, নেপাল, আয়ারল্যান্ড, ক্যানাডা অব্দি বহু কন্ঠস্বর। প্রত্যেকেই ইন্টেলেকচুয়াল কোরাপ্‌শন নিয়ে উদ্বিগ্ন, তাঁরা সবাই মনে করেন যে আর্থিক দুর্নীতি থেকে মেধাজগতের দুর্নীতির দুষ্প্রভাব সমাজে অনেক বেশি সুগভীরপ্রসারী। এবং যারা ওই বলয়ে দুর্নীতি করছে, তাদের ধরা অনেক বেশি কঠিন। তাদের চারদিকের সামাজিক সম্মানের দেয়াল দুর্ভেদ্য।
তবে একটা জিনিষ দেখলাম যে মেধাজগতের দুর্নীতি হিসেবে তাঁরা দেখছেন, প্রথমতঃ স্বজনপোষন, দ্বিতীয়তঃ গতানুগতিক শিক্ষাপ্রণালী, তৃতীয়তঃ মধ্যমেধা বা রাজনৈতিক দাসত্বের মানসিকতা ইত্যাদি ইত্যাদি। যেমন সোনু বলে একটি ছেলে ব্লগে সামাজিকভাবে শক্তিশালী লোকেদের নৈতিক দুর্নীতির কথা লিখেছে। তবে ধারণাগুলো ভাসাভাসা। আরেকটি লেখা কানাডার একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত। ইউথেনেসিয়া এবং সাহায্যকৃত আত্মহত্যার সপক্ষে কানাডার রয়াল সোসাইটির রায়ের বিরুদ্ধে লেখা।  করাচির একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত আলচনাচক্রের খবরে বক্তা ইন্টেলেকচুয়াল কোরাপ্‌শনকে “Sifarish, nepotism and misuse of power” বলে পরিভাষিত করছেন। নেপালের এক ভদ্রলোক নেপালের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন “how lecturers are appointed and promoted, their methods of teaching, and the way they carry out their other duties এবং সেখানে ইন্টেলেকচুয়াল কোরাপ্‌শনের উপস্থিতি দেখিয়েছেন।
তার মানে আমারও কিছু বলার থেকে যায়। তাই লেখাটার প্রতি আবার থেকে মন দিলাম।
                 *                                    *                                   *                                      *
মেধাজগতের হাল্কামাপের ক্ষয় বা দুর্নীতিগুলো এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে গেছে। দুর্নীতিগ্রস্ত (অর্থাৎ, সাধারণ বাংলায় ‘ক্ষয়গ্রস্ত’) মেধাই এখন তৈরি করছে মধ্যমেধার শিক্ষাপ্রণালীর বিভিন্ন স্তরের পাঠ্যক্রম।…পনের বছর আগে, ক্লাসঘরে কম্পিউটারে শিক্ষা পাওয়া প্রথম প্রজন্মের কিছু শিক্ষক/শিক্ষিকা মেয়েদের একটি প্রতিষ্ঠিত উচ্চবিদ্যালয়ে যোগদান করেন। প্রাণীবিজ্ঞানের ক্লাসে যখন ব্যাং বা আরশোলা কেটে বোঝাবার পিরিয়ডটি আসে, নতুন শিক্ষক পুরোনোকে বলেন, “ওই ক্লাসটা আপনিই নিন না! আমরা তো বাস্তবে করিনি, কম্পিউটারে ডাইসেক্ট করেছি!” পাশে বসা তাঁরই মত নতুন আরেক শিক্ষক বলেন, “এসব কী এখনও বাঁচিয়ে রেখেছেন আপনারা, পুরোনো পাশবিক পদ্ধতি? জানেন না, পশুকীটপতঙ্গহত্যা নিষিদ্ধ?”
সে যা হোক। আপাততঃ ওইদিকে যেতে চাই না। আমি শুধু সাদা চোখে মেধাজগতে দুর্নীতির বা ‘ক্ষয়ের’ যে কটি রূপ দেখতে পাই সংক্ষেপে শেয়ার করতে চাই। আপনাদেরও যদি মনে হয় যে হ্যাঁ, এগুলো সত্যিই দুর্নীতি (অর্থাৎ নীতিবিগর্হিত) বা হিন্দিতে যাকে বলে ভ্রষ্টাচার (আচার-ভ্রষ্ট কাজ) অথবা কোরাপশন (যা কোরাপ্ট করে, ক্ষয় ধরায়) এবং অনেক বেশি ক্ষতি করছে দেশের, তাহলেই যথেষ্ট।
তবে আসল দুর্নীতির জায়গাটায় পৌঁছোবার আগে দুটো পরিচিত জায়গায় একটু হাঁটাচলা করে নিই।

১- থিয়োরী ও প্র্যাক্টিস
মেধাজগতের বা মেধাগত বা বৌদ্ধিক/বুদ্ধিজীবীতার দুর্নীতির প্রথম রূপটিতে কিন্তু আমরা সবাই ধরা পড়ব। মিটিংএর পর চা-পানে এক স্বনামধন্য, ও আমাদের প্রিয়, নেতা টেবিল চাপড়ে বলে উঠলেন, “ওসব তাত্ত্বিক মার্ক্সবাদের কচকচি ছাড়ুন, প্র্যাক্টিসে আসুন, প্র্যাক্টিসে! বুঝলেন শিবনাথবাবু, গরীব বস্তিতে গিয়ে হাতজোড় করে ভোট চেয়ে কিস্যু পাবেন না। সবচে’ আগে আপনার নিজের জাতের ভালো ভালো লোকগুলোকে, ডাক্তার, প্রফেসর এদেরকে নিজের দলে টানুন! লালঝান্ডার কাছে আনুন।…কী পালবাবু, মার্ক্সবাবা বেঁচে থাকলে কী বলতেন, এ বিষয়ে?… আরে থিয়োরী দিয়ে সব জায়গায় কাজ হয় না!” শিবনাথবাবু সহজ কথাটা সহজ ভাবে বুঝতে চেষ্টা করছিলেন। তাই আমি এর মধ্যে লেনিনকে টেনে বোঝাবার চেষ্টা করলাম না যে স্থিতি নয় গতি (তাও দিকচিহ্নিত গতি, ভেক্টরে) তে পদার্থকে দেখা মার্ক্সবাদেরই থিয়োরী। এটাও বলার চেষ্টা করলাম না যে থিওরী ও প্র্যাক্টিসের পূর্ণ একতার কারণেই মার্ক্সবাদ অন্য সব দর্শন থেকে এগিয়ে ও সমাজবদলের দর্শন হতে সক্ষম। বরং ভাবতে বসলাম যে নেতার কথাটা আজ এই দেশে বুদ্ধিজীবিতার জগতে প্রায় সুবিখ্যাত ‘কমনসেন্স’, সাধারণবোধের পর্যায়! অথচ এটাই আবার মেধাগত দুর্নীতির প্রথম রূপ! তত্ত্বে আর অনুশীলনে তুমি দ্বিচারিতা আনছ নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধিতে, আনো, কিছু বলার নেই। দ্বিচারিতাটাকে সত্য মেনেই তুমি নিজের অভিষ্টের দিকে এগোতে চাইছ, তাতেও কিছু বলার নেই। কিন্তু তাহলে তুমি যে তত্ত্বটিকে ধরে আছ সেটি দুর্নীত! আর সেটি যদি তুমি অন্যকে বোঝাতে যাও, যে এটিই তত্ত্ব, তাহলে তুমি মেধাগত দুর্নীতিতে অংশীদার!
আমাদের অংশীদারীর ব্যাপারটা শুধু প্রথম রূপটির ব্যাপকতা বোঝাতে বললাম। শাসকশ্রেণী সৃষ্ট সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলেই আমরা বড় হয়েছি, তত্ত্ব ও অনুশীলনের সম্পূর্ণ একতায় পৌঁছোনো কঠিন তো হবেই। আর এটাও ঠিক যে পৌঁছোলে নেতাজীই আগে পৌঁছোতে পারবেন, কেন না তিনি অনুশীলনে আছেন। আমার মত তাত্ত্বিকেরা, যদি অনুশীলনে না নামি, সারা জীবনেও পৌঁছোতে পারব না। শুধু ওই, মাঝে মধ্যে খুঁত ধরব বসে বসে।
আমাদের ক্ষেত্রে মেধাগত দুর্নীতির এই প্রথম রূপটির আওতায় থাকা বস্তুতঃ আমাদের এগিয়ে চলার পথে অন্তরায়, অতিক্রম করতে হয়, যত সত্বর সম্ভব। শাসকশ্রেণীর ক্ষেত্রে কিন্তু এটি তাদের আবশ্যকতা অস্ত্র শাসন বজায় রাখার। তাদের মধ্যে বিরাজমান বিভিন্ন, বিচিত্র শ্রেণীগত দর্শন ও দার্শনিক তত্ত্বের মধ্যেকার একতার অক্ষ। ওই শ্রেণীর স্বার্থের শরিক থেকেও যে যত বেশি নিজের তত্ত্বটিকে ধরে রাখতে চাইবে, তাকে তত বেশি, হয় নিজের তত্ত্বটিকে মেধাগত দুর্নীতির দ্বিতীয় নয় তো তৃতীয় রূপের আওতায় নিয়ে যেতে হবে।   

২- মিডিওক্রিটি/মধ্যমেধা
আদৌ এটিকে দুর্নীতির দ্বিতীয় রূপ বলা যায় কিনা সন্দেহ আছে। তবু বলছি। মেধাগত দুর্নীতির উচ্চস্তরে আসীন ব্যক্তিগণ নিজেরা এটি তুলনামূলক ভাবে হয়ত কম এই দুর্নীতিটি করেছেন নিজের জীবনে, কিন্তু করান। তাঁরা করান বলে এটাকে দুর্নীতির পর্যায়ে ফেলছি। যে বেচারারা করে, তারা তো এটাই জানে যে এভাবেই করতে হয়। বেশ কয়েক বছর আগে সংবাদপত্রে একটি লেখায় একটি তথ্য দেখেছিলাম যে নব্য-উদার অর্থনীতির সূচনার পরবর্তী বছরগুলোতে, যে বছরগুলি আবার ভারতের ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি-বিপ্লবের স্বর্ণশস্য ফলানোর বছর - সারা ভারতের নতুন প্রজন্ম দৌড়োচ্ছে প্রযুক্তিশিক্ষার আধুনিক পীঠস্থানগুলিতে – বিশ্বের বিজ্ঞানজগতে ভারত থেকে পৌঁছোনো গবেষণাপত্রগুলোতে চর্বিতচর্বন, নকল, টুকলি, মধ্যমেধার সংখ্যা সর্বাধিক এবং উল্লেখজনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর সেদিন তো দেশের রাষ্ট্রপতিই শুনলাম আক্ষেপ করে বলছেন যে আমাদের ছাত্রদের মধ্যে স্বাধীন গবেষণার প্রবৃত্তি উৎসাহিত করা উচিৎ। আমি যতদূর জানি কোনো গবেষণাপত্র এমনি এমনি বিশ্বের দরবারে পৌঁছে যায় না, গবেষক ছাত্রটির মাস্টারমশাইকে সেটি দেখতে হয়। এমনকি ইউজিসি বা অন্য কোনো ডোনর সংস্থার রিসার্চ-গ্রান্ট পাওয়ার জন্য যে প্রজেক্ট জমা দিতে হয় সেটিও খতিয়ে দেখে কোনো না কোনো বিশেষজ্ঞ কমিটি।
আর এই ব্যাপারটা শুধু তাত্ত্বিক প্রকৃতি-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সীমিত নেই। ফলিতবিজ্ঞান বা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এর ব্যাপকতা তো আমরা সাধারণ জীবনে হাড়ে হাড়ে টের পাই। প্রায় আপ্তবাক্যে দাঁড়িয়ে গেছে যে গ্রামে প্রাইমারী হেলথ সেন্টারের এমবিবিএস ডাক্তার থেকে ‘কোয়াকেরা’ বেশি ভালো রোগনির্ণয় করে। আর ইঞ্জিনিয়ার থেকে অনেক বেশি ডিজাইন আর মশলা বোঝে ওস্তাদ মিস্ত্রি। বাংলার ম্যাঞ্চেস্টার হাওড়ার মিস্ত্রির কথা তো পুরোনো কিম্বদন্তী। এমনকি আজকের প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও কথাটি সত্য। বড় কম্পানিতে কার্যরত হার্ডওয়্যার আর সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের কথা জানি না। আমার এই ল্যাপটপ, যাতে আমি লিখছি, বা আমার সেল, যাতে আমি কথা বলছি, খারাপ হলে সার্ভিস সেন্টারে যাই না। গেলে শুনি একটাই কথা, ওয়ারেন্টি পিরিয়ডে বিনেপয়সায় রিপ্লেসমেন্ট, ওয়ারেন্টি পিরিয়ড পেরিয়ে গেলে পয়সা দিয়ে রিপ্লেসমেন্ট। অথচ পাড়ার যে ছেলেটি রিপ্লেসমেন্ট না করেই ঠিক করে দেয় বার বার, সে ম্যাট্রিক পাস করে দোকানে কাজ করতে করতে শিখেছে। সরকারি আইটিআইতে জায়গা পায়নি ঘুষ দিতে পারেনি বলে। অনেক বেসরকারি আইটিআই খুলেছে আজকাল, তারা পয়সা নিয়ে সোজাসুজি সার্টিফিকেট দেয়, তাদের দেওয়ার জন্য পয়সা জমাচ্ছে ছেলেটি।
সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এই মধ্যমেধার আরও বেশি ব্যাপকতা। কেন না, এখানে গবেষণার জায়গাটা অনেক বেশি গোলমেলে। তাত্ত্বিক প্রকৃতি-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তো অনেক বাধা পেরিয়ে তবে বিশ্বমানের জার্নাল অব্দি পৌঁছোনো যায়। আর না পৌঁছোতে পারলে ভালো চাকরি হয়ত জুটিয়ে নেওয়া যায় কিন্তু বৈজ্ঞানিক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া যায় না। আর বিজ্ঞানসাধনার পরিস্থিতিটাই বা কী? আমি একজন অতিউচ্চপদস্থ সরকারি আধিকারিককে ব্যক্তিগতভাবে জানি, যিনি বিজ্ঞানের কৃতি ছাত্র হয়েও একটি বিজ্ঞান সংস্থায় বৈজ্ঞানিকের পদ ছেড়ে এদিকে এসেছিলেন শুধুমাত্র উপরি আয়টার দিকে তাকিয়ে। আবার ওই একই সংস্থার এমন তরুণ বৈজ্ঞানিকের কথা আপনারাও জানেন যিনি আত্মহত্যা করেছেন কেননা সংস্থার হালচাল দেখে তাঁর বিজ্ঞানসাধনার স্বপ্ন চুরমার হয়ে গিয়েছিল।
সে যা হোক, সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তো স্বীকৃত বিশ্বমানটানের কোনো ব্যাপারই নেই। অমর্ত্য সেন আছেন তো আছেন! প্রভাত পট্টনায়েক আছেন তো আছেন! কোশাম্বি, ইরফান হাবিব আছেন তো আছেন। আম্মো আছি! খুব দরকার হলে নিজের দলকে বলে একটা পুরস্কারের ব্যবস্থা করেই নেব। নামের পরে এমএ, পিএচডি (গোল্ড মেডালিস্ট), সাড়ে বত্রিশটা রিসার্চপেপার বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত, পাঁচটি গ্রন্থ প্রকাশিত, উচ্চপ্রশংসিত… এসব লেখা আটকাচ্ছে কে?  
একটা হয় উচ্চমানের কিন্তু সুপরিকল্পিত, অভিসন্ধিপূর্ণ গবেষণা। দুর্নীতি আছে কিন্তু পরবর্তী, উচ্চতর স্তরের। আবার, এমনও হয়, সত্যিই উচ্চমানের গবেষণাধর্মী, প্রাইমারি রিসোর্সের ওপর কাজ, যথাযথ ফীল্ড সার্ভে কিন্তু বিশ্লেষণে কিম্বা সিদ্ধান্তনিরূপণে ভুল। এসমস্ত কাজের প্রয়োজনীয়তা আছে। কিছু না কিছু দিচ্ছে সমাজকে। নাহয় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দিচ্ছে, “খারিজ কর আমায়! দেখি কত বিদ্যে আছে পেটে!” এর পরবর্তী কাজটা এর থেকে বেশি ভালো হলে তবেই টিঁকবে। কিন্তু মধ্যমেধার কাজগুলো? পাঠ্যের মাধ্যমে অথবা বাইরে, প্রজন্মের পর প্রজন্মের মেধাশক্তিকে কুন্ঠিত করে রাখছে। দুর্নীতি হিসেবে দ্বিতীয় স্তরের হলেও এর সামাজিক ধ্বংসক্ষমতা অপরিসীম।
  
দুর্নীতির ঘাঁটি
বিদ্বানেরা বলেন যে গবেষণাকর্মকে সাধারণভাবে তিন পর্বে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্ব, তথ্যসংগ্রহ। দ্বিতীয় পর্ব, তথ্যের বিশ্লেষণ। তৃতীয় পর্ব, তত্ত্বনিরূপণ।
তথ্যসংগ্রহঃ
তথ্যসংগ্রহের জায়গাটাই হল দুর্নীতির বেস ক্যাম্প। সমাজবিজ্ঞান বা মানববিজ্ঞানের যে কটা ডিসিপ্লিনে কাজ চলছে, প্রত্যেকটি ডিসিপ্লিনে তথ্যসংগ্রহের ক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রমাণ আমরা পেয়েছি। প্রথমতঃ, রাজনৈতিক স্বার্থে। দ্বিতীয়তঃ, পূর্বনিরূপিত সিদ্ধান্তের প্রয়োজনে। তৃতীয়তঃ, মধ্যমেধাপ্রসূত।  
পুরাতাত্ত্বিক গবেষণা। অযোধ্যায় রামমন্দিরের অস্তিত্ত্ব প্রসঙ্গে সম্পর্কিত সার্ভের ভূমিকা সর্বজনবিদিত। “While the ASI videographed and photographed the graves on April 22, it has avoided further analysis of the important evidence. The skeletons found at the site have not been sent for carbon-dating, neither have the graves been measured.” [আউটলুক, ৩০শে এপ্রিল, ২০০৩]। কঙ্কালের কার্বনডেটিং তো ‘ইসলামী ভাবাবেগ’এর জন্য করা যায় নি। আবার আর্কিওলজিক্যাল সার্ভের নিজের রিপোর্ট বলছে “The centre of the central chamber of the disputed structure falls just over the central point of the length of the massive wall of the preceding period which could not be excavated due to presence of Ram Lala at the spot in the make-shift structure.” অর্থাৎ হিন্দু ভাবাবেগ আগেই জায়গাদখল করে নিয়েছে। পুরো খননকার্যটি সম্পর্কে এলাহাবাদ হাইকোর্ট নিযুক্ত পর্যবেক্ষক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড০ অমল রায় বলেছিলেন, “It's a very superficial investigation. They have trenches all around the temple and in none of the trenches have they hit virgin soil. It looks like a very haphazard sort of investigation.” আর সবচেয়ে মজার কথা, সেসময় থেকেই রাতারাতি প্রায় সমস্ত ইংরেজি মিডিয়া, হিন্দি মিডিয়া এবং পুরাতাত্ত্বিক সার্ভের ততকালীন ডিরেক্টরের কলমে, ‘বাবরি মসজিদ’ এর বদলে লেখা হতে শুরু করল ‘ডিস্প্যুটেড স্ট্রাকচার’!
ঐতিহাসিক গবেষণা। এদেশে মুসলমান শাসনের সময়টিকে বিধৃত করার প্রচেষ্টায় প্রথমদিকে একটা প্রবৃত্তি ছিল। মুসলমান শাসনের পুরো সময়টাকে ইওরোপীয় ইতিহাসের নবজাগরণ-পূর্ববর্ত্তী ‘অন্ধকার যুগ’এর সমপ্রকার হিসেবে দেখবার। সেটাকে দোষ দেওয়া যায়না। কিন্তু পরের দিকেও প্রবৃত্তিটা রয়ে গেল। শুধু সাম্প্রদায়িক ইতিহাস-রচনার সুপরিকল্পিত ছক হিসেবেই নয়, জনপ্রিয় স্কুলপাঠ্য ইতিহাস-রচনার ক্ষেত্রেও। সাধারণ মানুষের মনে বিতর্কটাকে এখনো দাঁড়িয়ে থাকে তিনটে বিষয়ের ওপর। (১) ধর্মান্তকরণে জবরদস্তি কতটা হয়েছিল; (২) কতলক্ষ হিন্দু মরেছিল; (৩) আকবর কতটা ধর্মনিরপেক্ষ ছিল আর আওরঙ্গজেব কতটা হিন্দুবিদ্বেষী ছিল। এসবকিছুর বিচারের পর আমরা কিছুটা জানতে পারতাম ইসলামের সাংস্কৃতিক প্রভাবে সূফী পরম্পরার প্রভাবের কথা, ভক্তি আন্দোলন ইত্যাদি ইত্যাদি। মুসলমান শাসনের কালখন্ডে দ্রুত নগরীকরণ, কারখানা তৈরি ইত্যাদি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবের কথা থাকলেও আসল কথাটা নেই যে যেটাকে, এমনকি ইওরোপের প্রসঙ্গেও মধ্যযুগ বলা হচ্ছে, সেই সময়টাতে জ্ঞানবিজ্ঞানের যে আলোকবর্তিকা আরবদুনিয়ায় জ্বলে উঠেছিল, সেই আলোকবর্তিকার আলোয় যেমন ভারত আলোকিত হয়েছে, ইয়োরোপও আলোকিত হয়েছে। (এমনকি চীন ইত্যাদি দেশের নানান নতুন জিনিষও আরবেরই মাধ্যমে এদেশে এসেছিল। জ্ঞানের সেই আলো, বিজ্ঞান, কারিগরীর কিছু নতুন বিদ্যা, জিনিষ আর মুসলমান ও পরবর্তী মোগল শাসনে করা বেশ কিছু কৃষি সংস্কারাদি বিপূল ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছিল বাণিজ্য। আবার সেই বাণিজ্যের ফলশ্রুতি শ্রমজীবী জাতগুলোর বড় সংখ্যায় নগরে আগমন। তাদেরই মধ্যে শুরু হয়েছিল প্রতিষ্ঠিত ধর্মমতের বিরুদ্ধে ভক্তি-সূফি আন্দোলন। ভারতের আধুনিক ভাষাগুলোও সেই সময় গড়ে উঠল। আকবরের সময় ভাষাভিত্তিক রাজ্য ‘সুবা’ গঠনেরও একটা প্রয়াস হয়েছিল।)
এসব সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য ও সামগ্রী আজ হাতের কাছে থাকা সত্ত্বেও যেমন ইরফান হাবিব বলেন, “That different views on medieval India should be influenced by the individual historian's subjective views of the contemporary world is only to be expected; these must, however, first meet the criterion of support from historical evidence. … historical evidence must always remain the touchstone.” ইতিহাস রচনায় ঐতিহাসিক প্রমাণ আজও টাচস্টোন নয়। এটাকে মেধাগত দুর্নীতি বলব না?
ঠিক তেমনই এক দুরভিসন্ধিমূলক ভূল তথ্যপ্রচার অভিযান শুরু হয়েছে ১৯৯১এর পর। স্বাধীনতাপরবর্তী চল্লিশ বছরের আর্থিক ইতিহাসের পুনর্লিখনে। করছে কারা? একচেটিয়া শিল্পঘরানা আর সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদার বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়!
অর্থনৈতিক গবেষণা। পুরোপুরি তাত্ত্বিক গবেষণায় কোথায় কী গোলমাল চলছে সে বিষয়ে অর্থনীতির বিশেষজ্ঞরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে এটাও ঠিক যে তুলনামূলকভাবে অর্থনীতির বিদ্বানেরা বিভিন্ন সরকারি/বেসরকারি চিন্তন-সংস্থা বা ইংরেজিতে যাকে বলে ‘থিংক-ট্যাঙ্ক’এর শীর্ষপদে থাকেন। ‘১৯২৯’ নামে জে কে গ্যালব্রেথএর একটা বই একবার পড়েছিলাম। গ্যালব্রেথসাহেবকে কোনো ভাবেই কম্যুনিস্ট অপবাদ দেওয়া যায় না। ওই বইতে উনি দেখিয়েছিলেন কিভাবে এমেরিকান এবং সাধারণভাবে সমস্ত পূঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায়, বিশেষকরে শেয়ার ও বিনিয়োগ বাজারে ‘উন্নয়নের বেলুন’ ফোলাবার সময় সমস্ত শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদেরা খুবই সাধারণ ও প্রচলিত সাবধানবাণীগুলো মনে করাতে (উদ্দেশ্যমূলকভাবে) ভুলে যান। বেলুন ফোলে। একটা বিপূল পরিমাণ ধন সাধারণ মানুষের পকেট থেকে বিত্তশালী প্রভুদের পকেটে পৌঁছে যায়। তারপর যখন বেলুনটি ফাটে, সবাই জনদরদী সেজে সেই সব ভুলে যাওয়া আপ্তবাক্যগুলো আওড়াতে থাকেন, নানা রকম নিয়ন্ত্রক-সংস্থা ও উপকরণ তৈরি করার উপদেশ দিতে রত হয়ে পড়েন।
ভারতেও ঠিক তাই আমরা দেখেছি। বেলুন ফাটার পর যে উপদেশগুলো বর্ষণ করা হয় তার প্রতিটিই কি আগে থেকেই জানা থাকে না? শুভবোধসম্পন্ন মানুষেরা মনে করাতে থাকে না যে এক্ষুণি সাবধান হওয়া জরুরি?
আসুন, একটি পরিচিত তথ্যের গল্পে। কন্সিউমার প্রাইস ইন্ডেক্স। প্রাইস-কালেক্টরের ওপরে যে সুপারভাইজারেরা থাকে তারা সবাই অর্থনীতি/পরিসংখ্যান/গণিতের স্নাতক। স্বাভাবিক ভাবেই তাদের ওপর তলার লোকেরা, রিজিওনাল ডায়রেক্টর, ডায়রেক্টর জেনেরাল ইত্যাদি যথেষ্ট বিদ্বান ও অভিজ্ঞ মানুষ! তার ওপর আছেন মন্ত্রী, তাঁর বিভিন্ন যন্ত্রী এবং পুরো ব্যাপারটার মেকানিজম তৈরি করে সুপারিশ করার লোকজন। অথচ ১৯৩০ থেকে শুরু করে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ১৯৬০, ১৯৭১, ১৯৮২…হয়ে আজ অব্দি প্রতিবার প্রাইস ইন্ডেক্সে কারচুপি এবং কারচুপিটা সবসময় ইন্ডেক্স কমানোর জন্য! আর প্রতিবার শ্রমিকশ্রেণী হড়তাল করেই তার কিছুটা শোধরাতে পেরেছে। লেখালিখি, মন্ত্রীর সাথে দেখা ইত্যাদিতে কোনো কাজ হয়নি। বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় বুদ্ধির কথা বোঝে না! ১৯৮৭তে সিটুর তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এম কে পান্ধে লেখেন, “Surprisingly all the methods were statistically considered as justified and whenever workers and trade unions expressed doubts they were given a curt reply that these were all technical matters to be dealt with by the technical experts.” অথচ হড়তালের চাপে পড়লেই সব টেকনিক্যালিটি বেরিয়ে পড়ে! এটা কী? বিচ্যুতি? সরকারি ষড়যন্ত্র, অবশ্যই। কিন্তু বুদ্ধিজীবীতার? দুর্নীতি ছাড়া আর কিছু বলা যায়? 
দারিদ্র দূরীকরণ। যদিও ব্যাপারটা সর্বজনবিদিত তবু ২০০৮ সালের ২রা সেপ্টেম্বর দৈনিক ‘হিন্দু’ সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় ‘দারিদ্রের ধারণার পুনর্নির্মাণ’ প্রসঙ্গে উৎসা পটনায়েকের যে চিঠিটি ৩রা সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়েছিল তার একটি অংশ আমি, ‘উৎসার বক্তব্য বেদবাক্য’ হিসেবে নয়, ভিতরের ব্যাপারটার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করতে উদ্ধৃত করছি, যে “though the robust nutrition norm method was given up in practice long ago by the Planning Commission, the real reason it is being criticized anew on incorrect grounds is because independent scholars applying it find a substantial rise in under-nutrition and hence in true poverty in countries undergoing economic reforms. This is not palatable outcome to admit for authorities anywhere including in the U.N. system who would like to maintain the fiction that poverty percentages are declining.” এ কি শুধু দুটো ধারণার লড়াই? পুষ্টির ভিত্তিতে দারিদ্র নির্দ্ধারণ বনাম ১৯৭৩-৭৪এর দৈনিক খরচটাকে দ্রব্যমূল্যসূচকের ভিত্তিতে আজকের মত করে দারিদ্র নির্দ্ধারণ? না কি মেধাজগতে সুনীতি বনাম দুর্নীতির লড়াই? এমনকি প্ল্যানিং কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান সাহেবও মিষ্টি হেসে পক্ষ নিয়ে দাঁড়িয়ে যান! বেহায়াপনার একশেষ!
সমাজতাত্ত্বিক বা নৃতাত্ত্বিক গবেষণা। আমি জানি আমি বাংলার বাইরে বসে বাংলাভাষায় লিখছি। সেই বাংলাভাষা যা গড়ে তুলেছে জনতার নিরবচ্ছিন্ন গণতান্ত্রিক সংগ্রাম। সেই ভাষায় সমাজতাত্ত্বিক বা নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় দুর্নীতির বিষয়টিকে আর উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে হবে না। দুর্নীতি বলতে আমি কী বোঝাতে চাইছি, তা এতক্ষণে নিশ্চয়ই পাঠকের চোখে স্পষ্ট। আর পাঠক জানেন যে ফ্যাসিবাদের পুরো প্রজেক্টটার ভিত্তিতে রয়েছে সমাজতাত্ত্বিক বা নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় দুর্নীতি। সে শুধু হিটলারের সময়কার নয়, আজকের ফ্যাসিবাদী প্রবৃত্তিগুলো, তাদের কুখ্যাত সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং সহিত, এই দুর্নীতির ভিত্তিতে ক্রিয়াশীল।
তথ্যের বিশ্লেষণ ও তত্ত্বনিরূপণঃ
তথ্যসংগ্রহ পর্ব সাঙ্গ হলে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্বে বিশ্লেষণ। বিশ্লেষণ সর্বদাই কিছু উপকরণের সাহায্য নেয়। প্রথম, অর্থাৎ তথ্যসংগ্রহের পর্বের উদ্দেশ্যমূলক ত্রুটিবিচ্যুতিকে যদিও বা দুর্নীতি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, এই পর্বে তা করা বেশ কঠিন। পুর্ববর্তী বিশ্লেষণের পদ্ধতি, তথ্যের বর্গীকরণ, তর্কশাস্ত্রের বিভিন্ন নিয়ম, মডেল সবই কাজে লাগে বিশ্লেষণে এবং প্রতিটি উপকরণ কাজে লাগানোর পিছনে যুক্তি খাড়া করা যায়। তবু কিছু কিছু ব্যাপার যখন চোখে বেশ খটকায় তখন সন্দেহ হয় যে একটা দুরভিসন্ধি কাজ করছে। তবু এই বিশ্লেষণকে তত্ত্বনিরূপণের সাথে একযোগে দেখলে কিছু ব্যাপার স্পষ্ট দেখা যায়।
যেমন, ১৯৯১এর পর একটা শব্দজোট উঠে এসেছে ‘ওনারশিপ নিউট্র্যালিটি’, মালিকানা নিরপেক্ষতা। মজার ব্যাপার যে ধারণাটা তখনই ব্যবহৃত হয় যখন লক্ষ্যটা হয় সরকারি বা সার্বজনিক ক্ষেত্রের শিল্প ও পরিষেবার ডানা ছাঁটা। ওই সব শিল্প বা পরিষেবার ওপর ন্যস্ত সামাজিক দায়িত্বটাকে শুধু উপেক্ষা করে নয়, বরং ওই দায়িত্ব থেকে তাদের সরিয়ে নিয়ে আসার উদ্দেশে এবং ওই সামাজিক দায়িত্ব পালিত হওয়াতে জনতার যে পিছিয়ে থাকা বা দরিদ্র অংশ কিছু সুবিধা পাচ্ছে তা থেকে তাদের বঞ্চিত করার উদ্দেশে করের প্রশ্নে, লাভজনকতার প্রশ্নে, পূঁজিগত রিজার্ভের প্রশ্নে, ভর্তুকির প্রশ্নে এবং আরো নানা রকম প্রশ্নে ধারণাটা ব্যবহৃত হয়। অথচ, রাইট টু ইনফর্মেশন এ্যাক্টএর আওতায় আসার প্রশ্নে, প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্নে ধারণাটা হাপিশ হয়ে যায়। (আবার বেসরকারি শিল্পের জন্য করছাড় দেওয়ার প্রশ্নে, নানারকমের সুবিধা দেওয়ার প্রশ্নে পুরোনো দাগী ভাম ঘরাণাগুলোও, পঞ্চাশ বছরের সরকারি সম্পত্তি লুন্ঠনের ইতিহাস লুকিয়ে ‘নতুন উদ্যমী’ হয়ে ওঠে; যা হোক সেটা আলাদা প্রসঙ্গ।)
ঠিক তেমনই, যদিও ঠিক সেভাবে কথাটা উঠে আসেনি, মানে ‘শাসন নিরপেক্ষতা’, কিন্তু ওই ধরণেরই একটা চিন্তা থেকে চীনের মডেল ভারতের সমস্যায় কাজে লাগানো হয়। বোধ হয়, ‘অর্থনৈতিক ভুগোল নিরপেক্ষতা’ বলেও একটা ধারণা কাজ করে যখন পিছিয়ে থাকা কৃষিপ্রধান রাজ্যে বড় শিল্প ছাড়াই মাঝারি ও ছোটো শিল্পের বাড়বাড়ন্ত দেখার প্রচেষ্টা হয়। আবার কৃষিতে উন্নয়নের প্রশ্নে যেমন, (ভূমিসংস্কারের কথা বাদ দিচ্ছি), যে সাবসিস্টেন্স ‘ক্ষুনিবৃত্তি’ কৃষির স্তরে প্রদেশটি এতদিন পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য উৎপাদন করে নিচ্ছিল, তাকে সেই ভিত্তি থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় সম্পূর্ণ বাজার-নির্ভর এক কৃষির দিকে।
এই প্রসঙ্গেই আরেকটি ব্যাপার উল্লেখযোগ্য। বিহারের একটি অংশ ঝারখন্ড রাজ্য হিসেবে আলাদা করা হয়েছিল আদিবাসী অস্মিতার প্রশ্নে। যখন রাজ্য তৈরি হল, দেখা গেল আদিবাসী ভাষাসমূহ, শিডিউল্ড ও ননশিডিউল্ড মিলিয়ে দাঁড়াচ্ছে ২৭%। হিন্দি যথারীতি, অনেকগুলো ভাষাকে নিজের উপভাষা হিসেবে দাবী করে সংখ্যাগরিষ্ঠ হল। যদি তাও হয়, আদিবাসী অস্মিতার ভিত্তিতে তৈরী রাজ্যের প্রধান বা প্রথম সরকারি ভাষা কেন আদিবাসী হবে না? শুধুমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতাকেই কেন পরিমাপ করা হবে? যদি আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ঐক্যমত্য না থাকে, কেন তাদের একসাথে বসিয়ে ঐক্যমত্য করার চেষ্টা করা হবে না? পৃথিবীতে, একের বেশি ভাষা একসাথে প্রথম সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃত এমন দেশ কি নেই? না থাকলেও, দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যেতে পারে না কি? হিন্দিকে প্রথম ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া আর বারোটা ভাষাকে দ্বিতীয় স্থানে রেখে নিজেদের মধ্যে কলহ করতে প্ররোচিত করা কি নিছক সরকারি বেসরকারি লুন্ঠন থেকে জনতার দৃষ্টি সরানোর জন্য করা হয়নি? জানি না কোনো ভাষাতাত্ত্বিক এই ভাষানীতি আউড়েছেন কিনা যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাষাকেই একমাত্র প্রথম সরকারি ভাষা করা উচিৎ। যদি বলে থাকেন, তাহলে সেটাকে কি দুর্নীতি বলা হবে না?  
সব শেষে ট্রিক্‌ল ডাউন থিয়োরী। সত্তর বছর পুরোনো তত্ত্ব। ধিকৃত ও উপহসিত তত্ত্ব, তবু চলছে। দেশের মাননীয় রাষ্ট্রপতি দেশের মানুষের দুর্দশায় পীড়িত হয়ে বলছেন যে আমাদের (মানে সরকারকে) ট্রিকল ডাউন থিয়োরীতে আটকে থাকলে চলবে না। কিন্তু কথা হল যে এটা থিয়োরী কী করে হয়? পাত্র ভরে উঠলে উপচে পড়বে! পড়তে পারতো। প্র্যাক্টিক্যালী না হোক, থিয়োরিটিক্যালী। যদি পাত্রটি কোনো স্থিতিশীল পদার্থ দিয়ে তৈরি হত! কিন্তু পাত্রটি তো নিজেই থিয়োরিটিক্যাল! কন্সেপচুয়্যাল! ক্রমবর্ধমান সম্পত্তি (ওয়েল্‌থ) ধারকের ধারণা দিয়ে তৈরি, অর্থাৎ সমভাবে ক্রমবর্ধমান! কী করে ভরবে?

এরকম আরো অনেক ধারণা আছে। চলছে। রোজ চালানো হচ্ছে আজকের দুনিয়ায়। সরকারি/বেসরকারি বুদ্ধিজীবীরা চালাচ্ছে, মিডিয়া আমাদের খাওয়াচ্ছে, আমরা খাচ্ছি। ওপরে উল্লিখিত কানাডার লেখাটিতেই ম্যাক্স ওয়েবারের একটি উক্তি পেয়েছিলাম, “not simply situational acceptance of wrongdoing but its pervasive normalization into the very structures of society such that social and political life comes to seem impossible in its absence”, আর্থিক দুর্নীতির ক্ষেত্রে যেমন, মেধাগত দুর্নীতির ক্ষেত্রেও শাসকশ্রেণী আমাদের বোধজগৎটিকে ওই জায়গাটতেই পৌঁছে দিতে চাইছে।

আমি জানি, লেখাটি প্রাসঙ্গিক বিষয়ের বিস্তৃতিটাকে ঠিক মত ধরতে পারল না। আমার সীমিত জ্ঞানে সেটা সম্ভবও ছিল না। আমার লেখাটা পড়ে যদি কেউ মনে করেন যে বিষয়টি জরুরি, যদি ভাবেন যে এ বিষয়ে আরো অনেক ভালো লেখা হতে পারে এবং যদি তিনি লিখতে উদ্যোগী হন সেটাই হবে আমার লেখার সার্থকতা।



No comments:

Post a Comment