Monday, February 16, 2026

বিহারে বাঙালি জীবন

বিহারে বাঙালি জীবন নিয়ে ভাবতে গেলেই একটা প্রেক্ষিত চলে আসে, ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির শাসনকাল এবং তাদের কর্মচারি হিসেবে বাঙালিদের বিহার অঞ্চলের বিভিন্ন শহরে বসবাস   যেন এটাই শুরু !

অবশ্যই কম্পানির এবং পরবর্তীতে সোজাসুজি ইংরেজ সরকারের শাসনকালে প্রচুর সংখ্যায় বাঙালিকে শুধু বিহার অঞ্চলে (অঞ্চল বলছি কেননা তখনও প্রদেশ হয় নি) পাঠানো হয় নি। উত্তর প্রদেশ (তখন যুক্ত প্রদেশ), লাহোর-সহ অবিভক্ত পাঞ্জাব, আজকের মধ্য প্রদেশ, ছত্তিসগড় এবং মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ অঞ্চল নিয়ে গঠিত কেন্দ্রীয় প্রদেশ, ওড়িশা, আসাম এবং আরো কিছু রাজ্যের শহরগুলোয় পাঠানো হয়েছিল।

পরে যখন বিহার এবং ওড়িশাকে ১৯১২ সালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে বিযুক্ত করা হল, সেক্রেটারিয়েট সহ সরকারি দপ্তরগুলো ভাগ হল, তখনও এক ঝাঁক বাঙালি কর্মচারি বিহারে এসে বসবাস শুরু করল।

খুব স্বাভাবিকভাবেই এই প্রক্রিয়ার আনুষঙ্গিক হয়ে দাঁড়ালো ভাগ্যান্বেষণে বিহারে পৌঁছোনো পাটনা হাইকোর্ট সহ বিভিন্ন জেলা আদালতে ওকালতি, গ্রামে শহরে ডাক্তারি, কলেজে-স্কুলে শিক্ষকতা, ব্যবসা, শিল্পকলা ইত্যাদি নানান কর্মসংস্থানের সুযোগ বাঙালিকে বিহারে টেনে আনল।

তারপর এলো স্বাধীনতা ও দেশভাগ। উদ্বাস্তুদের সবার পশ্চিমবঙ্গে জায়গা হল না। তারাও আবার সবাই দন্ডকারণ্য প্রজেক্টে ছত্তিসগড় বা মধ্যপ্রদেশে গেল না। কয়েক লক্ষ উদ্বাস্তু পরিবারকে বাস ও চাষের জমি দিয়ে পুনর্বাসিত করা হল বিহারে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সেই কলোনিগুলো আয়তনে এবং সংখ্যায় আরো বাড়ল।

ভৌগোলিক বাংলাও তো শুধু রাজনৈতিক বাংলায় সীমাবদ্ধ ছিল না। পূর্ববঙ্গ পাকিস্তান হওয়ার পর যে পশ্চিমবঙ্গ রূপ পেল, সেটাই যে সব নয় বুঝিয়ে দিল রাজ্য-পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া এবং পরিণামে পুরুলিয়ায় বাংলাভাষা আন্দোলন। পুরুলিয়া জেলা পশ্চিমবঙ্গে যুক্ত হল ঠিকই কিন্তু অনুসন্ধিৎসু সমাজবিজ্ঞানীরা দেখতে পেল, শুধু পুরুলিয়া নয়, পুরো মানভূম, ধলভূম এবং সিংভূমের গ্রামাঞ্চল বাঙালি চাষী অধ্যুষিত; কিন্তু তারা অন্যান্য ভাষাভাষীদের সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছে যে সেসব অঞ্চলগুলোকে বাংলার অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। ফলে সে অঞ্চলগুলো বিহার হয়েই রইল।  

বিহার ও ঝাড়খণ্ড আলাদা হওয়ার পর অবশ্য জামশেদপুর, রাঁচি, ধানবাদ, জসিডি, মধুপুর, পালামৌ ইত্যাদি বাঙালি অধ্যুষিত শহরগুলোর সঙ্গে সেসব গ্রামাঞ্চলও ঝাড়খন্ডের অংশ হয়ে গেছে। তাই তারা আর বিহারে বাঙালি জীবনএ বিচার্য নয়। এখনকার বিহারে মাত্র সাড়ে তের বা চোদ্দো লক্ষ বাঙালি যাদের মধ্যে মোটামুটি আদ্ধেক অধিবাসী এবং আদ্ধেক পুনর্বাসিত উদ্বাস্তু পরিবার ও তাদের পরবর্তী প্রজন্ম।

একই ভাষা-বংশ

তবে একটা কথা মনে রাখা দরকার। বিহারের ভাষা আর বাংলার ভাষা কিন্তু একই ভাষা-বংশজাত। মাগধী-প্রাকৃত নামটার সঙ্গে মগধ জড়িয়ে আছে কেননা প্রাচীনকালে মগধ বহু শতাব্দী যাবৎ একটি প্রতিপত্তিশালী সাম্রাজ্যের কেন্দ্র ছিল। নালন্দার জ্ঞানকেন্দ্রও তাই মগধ অঞ্চলেই পল্লবিত ও পুষ্পিত হয়। বাংলার পাল রাজত্বের প্রারম্ভিক রাজধানী ছিল মগধের পাটলিপুত্র। আর বাংলা (এবং তার সাথে মৈথিলী, অসমিয়া, ওড়িয়াও) যে গ্রন্থটিকে নিজেদের প্রাচীনতম গ্রন্থ বলে দাবি করে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে নিজেদেরকে ধ্রুপদী ভাষা হিসেবে স্বীকৃত করার আবেদন পেশ করে (এবং স্বীকৃত করায়), সেই চর্যাপদের বেশ কয়েকজন কবির জন্মস্থান হিসেবে কিন্তু মগধ বা বর্তমান বিহারের কিছু অঞ্চলের নাম উল্লিখিত (চুরাশি সিদ্ধের কাহিনী, অলকা চট্টোপাধ্যায়, প্যাপিরাস, ১৯৬০)।

এই ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ উল্লেখ করার উদ্দেশ্য একটাই এটা বোঝানো যে বাঙালিরা ইংরেজ আমল থেকে বিহারে আছে বা এসেছে কথাটা অসত্য। খুব গুরুতর অসত্য কেননা বিহার সরকারে যে নতুন জমানার আইএএস আধিকারিকেরা আছে তাদের অতিপণ্ডিত একাংশ, ইংরেজ গুরুদেবদের পদাঙ্ক অনুসরণে বিহারে বাংলাভাষীদের ভূমিপুত্রত্ব খারিজ করতে দুটো মিথ্যে ব্যবহার করে যার মধ্যে একটা এই। আরেকটা হল, বাঙালি আর বিহারে আছে কই, সব তো ঝাড়খন্ডে চলে গেছে

যাহোক, সেটা প্রসঙ্গান্তর। বরং গত বছর বিহারের রাজভবনের অনুষ্ঠানে বিহার বাঙালি সমিতির সভাপতি ডঃ (ক্যাপ্টেন) দিলীপ কুমার সিন্‌হা যে অভিভাষণটি পড়েছিলেন তার একাংশ উল্লেখ করা এখানে প্রাসঙ্গিক হবে। বিহারের সঙ্গে বাংলার সম্বন্ধ হাজার বছরের। একই মাগধি-প্রাকৃত থেকে যে ভাষাগুলোর জন্ম হলো, সে ভাষাগুলোর জনসমাজও যে আজকের বিহার-বাংলা-ওড়িশার (এবং বাংলাদেশ) বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বিচরণ করত, তা বলাই বাহুল্য। ভৌগোলিক পৃথকীকরণ ধীরে ধীরে হয়ে থাকবে। বিহার বাঙালিদের দ্বিতীয়-ঘর বা মাসির বাড়ির সমতুল্য ছিল

বিহার থ্রু দ এজেস একটি বিখ্যাত আকরগ্রন্থ। বিহার সরকার প্রকাশিত এবং আর আর দিবাকর সম্পাদিত। তাতে চর্যার কবি-সিদ্ধাচার্যদের সম্পর্কে তিনি লেখেন, সিদ্ধাচার্যরা কোনো একটি অঞ্চল থেকে নয়, বিহার, বাংলা, ওড়িশা এমনকি সুদূর পশ্চিমে অবস্থিত সৌরাষ্ট্র থেকেও এসেছিল। বাংলা এবং বিহারে গড়ে ওঠা তান্ত্রিক বৌদ্ধদের মহাবিহারগুলো (উদাহরণ স্বরূপ পাণ্ডুভূমি, জগদ্দল, সোমপুরা, বিক্রমশিলা, নালন্দা এবং ওদন্তপুরী) সব জায়গার বিদ্বান এবং সন্ন্যাসীদের জন্য খোলা থাকত।

সাধারণভাবে এটা স্বীকৃত যে নবম শতক পর্য্যন্ত বিহার, বাংলা, আসাম এবং ওড়িশার মত পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর ভাষায় এমন কোনো বিশিষ্ট লক্ষণ বিকশিত হয় নি যা দিয়ে তাদেরকে একে অন্যের থেকে ভিন্ন করা যেতে পারে।

শুধু ভাষা নয়, লিপিও এক ছিল।

এই সময়কালে সারা পূর্ব ভারতে, অর্থাৎ বারাণসী (এবং আরো পশ্চিম) থেকে আসাম অব্দি একই লিপি ব্যবহৃত হত। এটি কুটিলা বা পরবর্তী নাগরী লিপির পূর্বাঞ্চলীয় রূপ ছিল। [আর. আর. দিবাকর সম্পাদিত বিহার থ্রু দ্য এজেস, পৃ. ৩৫০-৩৫২]

উনিশ শতকের খ্যাতনামা ইংরেজ গবেষক জেমস প্রিন্সেপ, ব্রাহ্মী লিপির পাঠ সংক্রান্ত গবেষণার ক্রমে সংস্কৃত লিপির বিকাশের যে সারণি তৈরি করেছিলেন তার ছবিতে স্পষ্ট দেখা যায় যে বাংলা লিপির কিছু অক্ষর একাদশ শতকে রূপ নিতে শুরু করেছিল। নাগরী লিপি তার পরে বিকশিত হল।

ভাষিক জাতীয়তার নির্মাণ

বিহারে বাঙালিদের বসবাসের শিকড়গুলো খুঁজতে গেলে আরেকটি সময়কাল খতিয়ে দেখতে হবে। একই উৎসমুখ থেকে প্রবাহিত হয়ে ভাষাগুলো পরবর্তী সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ভাষিক সংস্কৃতি এবং ভাষিক-জাতীয়তা রূপে গঠিত হয়ে উঠল। তাই মোগল বাদশা আকবর প্রথম খেপেই যে ১২টি সুবা তৈরি করালেন তাতে সুবা-এ-বিহার আর সুবা-এ-বঙ্গাল আলাদা আলাদা চিহ্নিত হল। কিন্তু তারপর কি বিহারে আর বাঙালি রইল না?

রইল। বিহার আর বাংলা তো বারে বারে নিজেদের ভূগোল ভাগ করেছে একে অন্যের সঙ্গে। সরকার-এ-পূর্ণিয়া বা পূর্ণিয়া পরগনা নিজের সাতটি অংশ নিয়ে সুবা-এ-বঙ্গালে ছিল; নিজের মানুষ, ভাষা আর সংস্কৃতি সমেত ১৯৫৬ সালে বিহারের হল। সরকার-এ-রাজমহলও নিজের অংশগুলো নিয়ে বাংলা থেকে সেই বছরই বিহারে চলে এল। ২০০০ সালে আবার তার কিছু অংশ রয়ে গেল আর বাকিটা ঝারখন্ডে চলে গেল। মানভূমের ভাষা আন্দোলনে পুরুলিয়া অঞ্চল জেলা হয়ে বাংলায় গেল কিন্তু ধানবাদ, চন্দনকেয়ারী এবং আরো সব সংলগ্ন অঞ্চলগুলো? ২০০০ সাল অব্দি তো বিহারেই ছিল!

ওপরের ঘটনাগুলো বড়ো মাপের জনসাংখ্যিক গতিশীলতার ঘটনা। কিন্তু তৃণমূল স্তরে এই গতিশীলতা কখনো থামে নি। বিহারে বাঙালি এবং বাংলায় বিহারি সব সময় ছিল।

ভাগলপুরের উত্তররাঢ়ী কায়স্থ

এখানে ভাগলপুরের উত্তররাঢ়ী কায়স্থদের উল্লেখ থাকার প্রয়োজন আছে। তাঁদের পদবিগুলো বাংলা কিন্তু তাঁদের মধ্যে, বিশেষ করে গ্রামবাসীদের অধিকাংশ একবর্ণ বাংলা জানেন না। নগেন্দ্রনাথ বসু রচিত বঙ্গের জাতীয় ইতিহাসএর কায়স্থখন্ডএ উল্লেখ রয়েছে যে হিজরি ৮২১ অথবা ইংরেজি ১৪১৮-য় বাংলার বিখ্যাত দত্তপরিবারের এক বংশজ, থাকদত্ত (তাঁর আসল নাম জানা যায় নি) ফরমান পেলেন যে তাঁকে ভাগলপুর অঞ্চলের কানুনগো নিযুক্ত করা হল। লেখকের অনুমান যে যেহেতু সেসময় ঐ অঞ্চল দিল্লির বাদশার অধীন ছিল না, তাই গৌড়ের রাজা গণেশের মৃত্যুর পর তাঁর ধর্মান্তরিত পুত্র জালালুদ্দিন (হিন্দু নাম যদু) সম্ভবতঃ এই ফরমান জারি করেছিলেন। ফরমানটি পাওয়া যায় নি কিন্তু ভাগলপুরের মহাশয় বংশের পুরোনো কাগজপত্রে তাঁদের বিগত প্রজন্মের যে নামগুলো পাওয়া যায় তাতে লস্কর দত্ত ওরফে থাকদত্ত মজুমদার, জানকী দত্ত ওরফে থাকদত্ত মজুমদার এধরণের উল্লেখ দেখা গেছে। উক্ত গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে উপরোক্ত লস্কর দত্ত আকবরের সময় অব্দি কানুনগো ছিলেন। আকবরও তাঁকে কানুনগো হওয়ার ফরমান এবং সঙ্গে সঙ্গে মহাশয়এর উপাধি এবং মজুমদারএর পদবী দেন। কিন্তু লস্কর দত্ত তখন বৃদ্ধ, তাই ১৬০৫ সালে আকবর লস্কর দত্তের জামাই শ্রীরাম ঘোষকে কানুনগো নিযুক্ত করেন। মহাশয় উপাধিটিও পরবর্তী প্রজন্মে ব্যবহার করার অধিকার পেয়ে যান তিনি।

এই ইতিহাস উল্লিখিত হল কেন না, ভাগলপুর অঞ্চলে পরম্পরাগত শহুরে বাঙালি, উদ্বাস্তু কলোনির পুনর্বাসিত বাঙালি ছাড়াও একটি তৃতীয় জনসংখ্যা আছে। তাঁরা উত্তররাঢ়ী কায়স্থ, এসেছেন বাংলার মূলভূমি থেকে, পদবীও বাঙালির কিন্তু ভাষা, বহুলাংশে আর বাংলা নয়। এই তৃতীয় অংশটির এ অঞ্চলে বসবাসের ইতিহাস চম্পানগরে অবস্থিত মহাশয় ঘোষের দেউড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। নগেন্দ্রনাথ বসু রচিত উপরোক্ত গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে লস্কর দত্তের পরিবার শ্রীরাম ঘোষের পদমর্যাদা স্বীকার করে নি। লড়াইটা চলতে থাকে এবং ধীরে ধীরে আশেপাশের গ্রামগুলোতে দুই পক্ষেরই বংশজ ধীরে ধীরে ভরে যায়।

ভাষা শাসনের আধিপত্য বিস্তারেও কাজে আসে, শাসনের বিরুদ্ধাচরণ বিস্তারেও কাজে আসে। এটা গবেষণার বিষয় যে কানুনগোর পদমর্যাদায় থেকেও উত্তররাঢ়ী কায়স্থদের এই বিপুল জনসংখ্যা বাংলা কিভাবে এবং কেন ভুলে গেলেন। কী কারণে তাঁরা অঙ্গিকাকেই নিজেদের মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকার করে নিলেন। 

মারাঠা আক্রমণ

বাংলার ওপর মারাঠা সৈন্য-অভিযান বা বর্গী হামলা একটি আলোচিত ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ। সেসময় বাংলার অনেক মানুষ এদিকে পালিয়ে আসেন। অবশ্যই বেশির ভাগ বর্তমান ঝাড়খণ্ড অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন। কিছু অংশ লাগোয়া বর্তমান বিহার অঞ্চলগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েন।

প্রবাস অধিবাসঃ আধুনিক কাল

এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে বড়ো স্তরে বাংলার (আজকের ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ নিয়ে) বাঙালিদের ক্রমাগত বিহারে আগমন এবং জীবনের এক পর্বে বিহারবাসী হয়ে ওঠা কম্পানি-শাসনকালেই শুরু হয়েছিল। সোজাসুজি কম্পানির কর্মচারী হিসেবে যেমন, ছোটো জনপদগুলোর নগরায়নে বাড়তে থাকা বিভিন্ন কাজকর্মে অন্নসংস্থানের তালাশেও, বাংলার বাঙালি বিহারে আসতে থাকে; ঠিক যেমন কলকাতা শহরের বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে বিহার থেকে যাওয়া শ্রমিক। বিহারের প্রথম ইংরেজি সংবাদপত্র বিহার হেরাল্ডএর প্রতিষ্ঠাতা-মালিক ও সম্পাদক গুরুপ্রসাদ সেনের কথাই ভাবা যেতে পারে। পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুর পরগনায় জন্ম, লেখাপড়া, কলকাতায় উচ্চশিক্ষা, চাকরি, তারপর ওকালতির সূত্রে পাটনায় এসে ব্যস, এখানেই থেকে যাওয়া বাকিটা জীবন।

ওকালতি, শিক্ষকতা, ডাক্তারি, রেলকর্মচারী, কারখানায় প্রশিক্ষিত শ্রম বিশেষকরে কমবেশি শিক্ষিত মধ্যশ্রেণীর বর্ধিত চাহিদা পূরণ করতে বিহারে আসতে থাকে বাংলার বাঙালিরা।

১৯১১ সালের জনগণনায় বিহারের জনসংখ্যা ছিল ২,৮৩,১৩,২৮১। ওড়িশার জনসংখ্যা ছিল ১,১৩,৭৮,৮৭৫। অর্থাৎ মোট ৩,৯৬,৯৩,১৫৬। মোট নিচ্ছি কেননা সেই জনগণনার অব্যবহিত পরেই বিহার ও ওড়িশা একসঙ্গে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে ছিন্ন হবে। এবং ১৯১১-য় করা ভাষাগত সার্ভে অনুসারে ঐ মোট জনসংখ্যায় বাংলাভাষীদের সংখ্যা ছিল ১৬,৯০,৩৬২ (কেননা ভাষাগত সার্ভের ক্ষেত্রে বিহার এবং ওড়িশাকে একটিই প্রশাসনিক একক মানা হয়েছিল)। দশকের পর দশক বিহার এবং ওড়িশার জনসংখ্যার যে অনুপাত, সেটা বাংলাভাষীদের ওপর প্রয়োগ করলে মোটামুটি সাড়ে এগারো-বারো লক্ষ বাংলাভাষী বিহারের হয়। এত বড়ো সংখ্যায় সবাই নিশ্চয়ই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, অধ্যাপক, প্রশাসক বা ব্যবসায়ী হবেন না। এখন যেটা ঝাড়খণ্ড, তার সিংভূম, ধলভূম, মানভূম অঞ্চলে বসবাসকারী বাঙালি চাষি বাদেও বর্তমান বিহারের বিভিন্ন শহরে অন্নসংস্থানের প্রয়োজনে বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত প্রচুর বাঙালির বসবাস করার কথা। ১৯০৮ সালের এপ্রিল মাসে যখন ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী কিংসফোর্ডকে হত্যা করতে মুজফ্‌ফরপুরে এসেছিলেন তখন দুটো বাঙালি ছদ্মনাম নিয়েছিলেন। যে ধর্মশালায় উঠেছিলেন তার মালিকও বাংলাভাষী ছিল, ৩০শে এপ্রিল রাতে এক ওষুধের দোকানের যে কর্মচারী তাঁদেরকে রাস্তা দিয়ে দ্রুত পালাতে দেখেছিলেন তিনিও বাংলাভাষী ছিলেন। মোকামা স্টেশনে প্রফুল্ল চাকীকে যে হত্যা করেছিল সে দারোগাও বাঙালি ছিল। আর সেই সময়কালেই, মুজফ্‌ফরপুর কোর্টের উকিল শরৎ চন্দ্র চক্রবর্তীর স্ত্রী অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড়ো মেয়ে মাধুরীলতা, ঔপন্যাসিক অনুরূপা দেবীর সঙ্গে একযোগে চ্যাপম্যান গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করছিলেন।

প্রেসিডেন্সী বিভাজন

এসবের পরে হলো প্রেসিডেন্সি থেকে বাংলা ও ওড়িশার ছিন্নকরণ এবং পরিণামে মহাকরণ এবং অন্যান্য সরকারি দপ্তরগুলোর বিভাজন এবং কর্মচারীবর্গের একটা অংশের, যেমন ওড়িশায় তেমনই বিহারে স্থানান্তরণ। ওই সময়কালেরই একটু আগে যেহেতু বিহারি-ভাষী (মূলতঃ মৈথিলী, মগহী, ভোজপুরী, অঙ্গিকা বা বজ্জিকাভাষী কিন্তু সমকালীন জাতীয়তাবাদের জোয়ারে সবাই হিন্দিভাষী) মানুষের মধ্যেও একটা শিক্ষিত সমাজ জেগে উঠেছে, তাই রোজগারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে একটা রেষারেষি শুরু হল এবং ইংরেজ সরকার সেটাকে বিদ্বেষের মনোভাবে পরিণত করার চেষ্টা চালালো। স্বাধীনতার পরেও, বেকারত্বের সংকট যখনই উগ্র প্রাদেশিকতার রাজনৈতিক জোয়ার আনার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, বিহারের বাংলাভাষীদের ভিন-প্রদেশী (অর্থান্তরে প্রবাসী, যে পরিচয়ে বিহারবাসী অনেক বাঙালিই নিজেকে অভিহিত করতে ভালোবাসে) দেখানোর চেষ্টা হয়েছে। সে কাহিনী এখানে অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু একটা উদ্ধৃতি অন্য দিক থেকে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। অন্য দিক বলতে, কথাগুলো গত শতকের ষাটের দশকে সরকারি চাকরিক্ষেত্রে বাঙালিদের আধিপত্যএর অভিযোগ খণ্ডনের জন্য ব্যবহৃত হলেও, বাঙালিরা সে সময় বাস্তবে কোথায় ছিল তা দেখাতে কাজে লাগতে পারে।

ডঃ বিমানবিহারী মজুমদার বাংলা সাহিত্য-আলোচনায় বৈষ্ণবসাহিত্যের পণ্ডিত হিসেবে একটি পরিচিত নাম। একই সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি বিষয়ে জনপ্রিয় পাঠ্যপুস্তক লেখক ছিলেন। পাটনার কদমকুঁয়া-নালারোড এলাকার বাসিন্দা এবং পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এই মানুষটি ১৯৬৮ সালে বিহার বাঙালি সমিতির সভাপতি ছিলেন। ২৫শে ফেব্রুয়ারি ১৯৬৮ তারিখে পাটনায় অনুষ্ঠিত সমিতির দশম অধিবেশনে পেশ করা তাঁর লিখিত অভিভাষণের একটি অংশের বাংলা অনুবাদ এখানে দেওয়া হলো।

গড় দরে প্রতি বছর ১৭৮ জন হিন্দি এবং উর্দুভাষী এবং ৩০ জন বাংলাভাষীরও কম, সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত হয়েছিল। আর তা নিয়ে এত আন্দোলন, এত বিতর্ক! সেন্সাসের পরিসংখ্যানগুলো এই তথ্যের সবচেয়ে বেশি প্রত্যয়যোগ্য প্রমাণ যে বাংলাভাষী বিহারিরা প্রাথমিকভাবে চাকরির ওপর নির্ভর করে না। যদি করত, তাহলে তাদের সংখ্যা ১৯১১-১৯৫১-র মধ্যবর্তী সময়ে [প্রেসিডেন্সি থেকে বিযুক্তির সময়কালে বর্তমান লেখক] ভালো রকম কমত। কিন্তু, ঐ সময়কালে পাটনায় তাদের জনসংখ্যা ২১৬২ থেকে বেড়ে ২১,৯৫১ হলো, গয়ায় ১৩৬৬ থেকে বেড়ে ৩৯৫৫ হলো, শাহাবাদে ১০০৮ থেকে ২৬৩০, সারনে ৪৬৩ থেকে ৩০০৮, দ্বারভাঙায় ৮৬৯ থেকে ২৭৬৮, মুঙ্গেরে ২৬৫৯ থেকে ২১,০৮১, ভাগলপুরে ৩৬২২ থেকে ২৯,৫৮৮, হাজারিবাগে ৭৬৩০ থেকে ২৭,৩৫২ এবং সিংভূমে ১,০৮,৫৮৪ থেকে বেড়ে ২,৬৮,৯৮৫ হলো। এটাকে প্রাকৃতিক কারণে বৃদ্ধি বলা যায় না।

বাংলাভাষী বিহারিদের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ কৃষি, বাণিজ্য, ছোটো শিল্প, খনন এবং ওকালতি, ডাক্তারি এবং ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মতো স্বাধীন পেশাসমূহের ওপর নির্ভর করে। তাদের মধ্যে অনেকেই সেধরণের ব্যবসায় বিশেষ যোগ্যতা দেখিয়েছে যাতে শিল্পবোধ এবং সংবেদনশীলতার প্রয়োজন হয়। মুদ্রণ, ফটোগ্রাফি, পুস্তক প্রকাশন, বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসা, গোলাপ ও অন্যান্য ফুলের চাষ করা নার্সারি গড়ে তোলা ইত্যাদি কাজ অনেক বাঙালি পরিবারে লক্ষণীয় সাফল্য এনেছে। অনেক তরুণ বাঙালি ব্যাঙ্ক ও বীমার কাজে, সেলসম্যানশিপের কাজে, সাংবাদিকতার কাজে বিশেষ যোগ্যতা দেখিয়েছে। বাঙালিরা সফলভাবে কয়েকটি মিল, কারখানা এবং কর্মশালাও শুরু করেছে এবং চালাচ্ছে। এভাবে, বহু ধরণের দক্ষতায় তারা বিহারের জীবনকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করছে।

বিহারের বাংলাভাষী জনতাকে ক্ষণিকের অতিথি ভাবা ভুল। তাদের অনেকে সপ্তদশ শতকের প্রারম্ভে বা হতে পারে তারও আগে আজকের বিহারের বিভিন্ন অংশে বসবাস শুরু করেছিল। ভাগলপুরের রাঢ়ীয় সমাজ এদেরই একাংশ। ১৬০৪ সালে সম্রাট আকবর বৃদ্ধ লস্কর দত্তের জায়গায় তার জামাতা শ্রীরাম ঘোষকে ভাগলপুরের কানুনগো-ই-সদর নিযুক্ত করেন। পদটা ঐ পরিবারের জন্য বংশগত হয়ে যায়। [এ তথ্য আগেই উল্লিখিত বর্তমান লেখক] তারা সম্মানসূচক মহাশয় পদবী পায় এবং ঐ অঞ্চলে বিস্তৃত এলাকায় তারা নিজেদের জমিদারি গড়ে তোলে। বিগত শতকে [অর্থাৎ উনবিংশ শতকে বর্তমান লেখক] মহাশয় শম্ভুনাথ ঘোষ, তার ছেলে উমানাথ ঘোষ এবং অবশ্যই মহাশয় তারকনাথ ঘোষ বিস্তৃত এলাকায়, রাজদৌর, নয়াদৌর ইত্যাদি নামে সেচ খাল নির্মাণ করান। বন্দোবস্ত অফিসের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে মিঃ মার্ফি তারকনাথকে জেলার শ্রেষ্ঠ জমিদারদের একজন বলে বর্ণনা করেন এবং বিশেষ করে সেচ খালগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে তার উদার অর্থব্যয়ের প্রশংসা করেন। 

 

বিহারে বাঙালি জীবন বহুমাত্রিক। আবার বাংলার জীবনেও বিহার বহুমাত্রিক। বাংলার জীবনে বিহার অবশ্য এই আলোচনায় অপ্রাসঙ্গিক, তাই বরং বিগত শতকের ঘটনাবহুল বিশ্বের প্রেক্ষিতে বিহারে বাঙালি জীবনের ছবিটার দিকে আগে চোখ ফেরাই। উল্লেখ্য যে মোটামুটি সেই সময়কালটাই বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে বিযুক্তি থেকে শুরু করে ঝাড়খণ্ড বিচ্ছিন্ন হওয়া অব্দিকার পর্ব (১৯১২-২০০০)  

বাঙালি জীবনের বা যে কোনো ভাষিক-সমাজের জীবনের মাত্রাগুলোকে পরিভাষিত করার কিছু স্বীকৃত পরিমাপক আছে। যদিও সে পরিমাপকগুলো মধ্যবিত্ত-কেন্দ্রিক। যেমন সাহিত্য, ক্রীড়া, সঙ্গীত, বাণিজ্য, রাজনীতি এবং কিছুটা শিক্ষা, চিকিৎসা, আইন ইত্যাদি ক্ষেত্রে সেই সমাজের বিশিষ্ট অবদান। এগুলো দিয়ে পুরো সমাজটাকে কখনোই দেখা যায় না। তবু এগুলোই বিচার্য হয়ে ওঠে।

গত শতকের সত্তরের দশকে বিহার বাঙালি সমিতির অধিবেশনের খোলা অধিবেশন (যাকে বঙ্গভাষী সম্মেলন বলা হয়) উপলক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মরণিকা প্রকাশিত হয় পাটলশ্রী। তাতে বিহারের বাঙালি সমাজের কিছু বিশিষ্ট মানুষকে দিয়ে বিশেষ প্রবন্ধ লেখানো হয়। বিহারে বাংলা সাহিত্যের শতবর্ষ, লেখেন ডঃ নন্দদুলাল রায়; বিহারের নাট্য আন্দোলনে বাঙালির অবদান, লেখেন অনিল কুমার মুখোপাধ্যায়; পাটনায় বাংলা ভাষাভাষীদের নাট্যপ্রচেষ্টা, লেখেন অনিল দে; ক্রীড়াক্ষেত্রে বিহারের বাঙালি, সমীর সেনগুপ্ত; সঙ্গীতে বিহারের বাঙালি, প্রফুল্ল সেনগুপ্ত ইত্যাদি। কেউ চাইলে সেসব প্রবন্ধ পড়ে দেখতে পারেন।

তবে অতটা বিশদে না গিয়ে এবং নামের তালিকা না রেখেও বিহারের বাঙালিদের নাঃ শুধু বাঙালিদের নয়, বাঙালিয়ানার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কৃতিত্ব উল্লেখ করাই যায়।

সাহিত্য

সাহিত্যই ধরা যাক। বিহারের বাংলা সাহিত্য সামগ্রিক বাংলা সাহিত্যে শুধু উল্লেখযোগ্য অবদানই যোগ করে নি, গতিপ্রকৃতিকেও প্রভাবিত করেছে বাড়িয়েছে নান্দনিক উপলব্ধির পরিসর। এবং তা করার পথে একই সঙ্গে হিন্দি সাহিত্যকেও উন্নত করেছে।

সংক্ষিপ্ত চিন্তনে পূনর্বার ভেবে নিই কয়েকজন লেখক এবং তাঁদের রচনার কথা। পূর্ণিয়ার সতীনাথ ভাদুড়ি এবং তাঁর অন্ততঃ উপন্যাস জাগরী (চারটি রাজনৈতিক জবানবন্দী) এবং ঢোঁড়াই চরিত মানস (প্রান্তিক জনতা ও পৌরাণিক আখ্যানের মিথস্ক্রিয়া)। দ্বারভাঙার বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় এবং তাঁর অনেক লেখার মধ্যে বিশেষ করে কুশী প্রাঙ্গণের চিঠি এবং মিথিলার আবহে রচিত আরো কয়েকটি লেখা (বিহারের জনজীবনে বাঙালি)। রাণুর প্রথম-দ্বিতীয় ভাগ ইত্যাদি ছেড়েই দিলাম। ভাগলপুরের বনফুলের লিখনসম্ভারে বিশেষকরে তাঁর অণুগল্পগুলো (এখন অণুগল্প একটি জনপ্রিয় ধারা)। মুজফ্‌ফরপুরের অনুরূপা দেবীর রচনায় এবং সামাজিক কাজে নারীমুক্তির দীপ্ত এক পার্টিজানের উপস্থিতি। মনে রাখতে হবে, কারো পছন্দ হোক বা না হোক, ক্ষুধিত প্রজন্ম নামে সাহিত্যধারাটির অন্যতম প্রবর্তক, পাটনার মলয় রায়চৌধুরির প্রথম দিকের কবিকর্ম, সর্বাধিক আলোচিত কবিতা প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার এবং হাংরি ঘোষণাপত্রটিও পাটনায় বসে লেখা হয়েছিল। এবং এসবের অনেক আগে, শরতচন্দ্র ছিলেন ভাগলপুরে। অনেক গল্প ও উপন্যাস ভাগলপুরে বসে লেখা হলেও তাঁর শ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক জনপ্রিয় শ্রীকান্ত অবশ্য অন্যত্র রচিত হয়েছিল। কিন্তু শ্রীকান্তএর শুধু অনেকটা জায়গা নয়, ভাব-পরিমন্ডল জুড়ে রয়েছে বিহার এবং তার মানুষেরা। আরো অনেক নাম নেওয়া যায়। দানাপুর-খগৌলবাসী কবি বলদেব পালিত বঙ্গদর্শনএ বঙ্কিমচন্দ্র কর্তৃক, অনেক স্থানে নবীনত্বের অভাব সত্ত্বেও প্রশংসিত হয়েছিলেন।

বিশ শতকের উত্তরার্ধে সাহিত্যক্ষেত্রে বিহারের বাঙালিদের একটি বড়ো কৃতিত্ব ভারতের প্রথম বাংলা আকাডেমি প্রতিষ্ঠা। বিহার সরকার কর্তৃক ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বিহার বাংলা আকাডেমি এক সময় বিহারে বাংলা সাহিত্যচর্চায় প্রভূত সমৃদ্ধি ঘটিয়েছে। পূর্ণিয়ার বিখ্যাত দাদামশায় কেদারনাথ বন্দোপাধ্যায়ের রচনাবলী, ভাগলপুরের মেয়ে, বিস্মৃতপ্রায় লেখিকা আশালতা সিংহের রচনাবলী, এবং আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ করেছে আকাডেমি।  

উপরোক্ত বিহারে বঙ্গসাহিত্য সাধনার শতবর্ষ-এ লেখক নন্দদুলাল রায়, কবি, গীতিকার ও নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের বিহার-বাস প্রসঙ্গে লিখছেন, দ্বিজেন্দ্রলাল প্রথমে মজঃফরপুরে, পরে ভাগলপুর, মুঙ্গের ও পূর্ণিয়ায় স্থানান্তরিত হন। বেলুয়াবাজারে অবস্থিতিকালে তিনি অনেক বৎসর পরে আবার বাংলা কবিতা রচনায় প্রবৃত্ত হন। মুঙ্গেরে ফিরিয়া গিয়া তিনি সর্বপ্রথমে 'হাসির গান' লিখিতে আরম্ভ করেন। গয়াতে লোকেন্দ্রনাথ পালিতের সঙ্গে রবীন্দ্র-সাহিত্য লইয়া তর্ক বিতর্ক আরম্ভ হয় এবং রবীন্দ্র-কাব্যের অস্পষ্টতার বিরুদ্ধে দ্বিজেন্দ্রলাল এই প্রথম প্রকাশ্যভাবে লেখনী ধারণ করেন। তাঁহার 'কাব্যের অভিব্যক্তি' ও 'কাব্যের উপভোগ' প্রবন্ধ দুইটি এইখানেই রচিত হয়। গয়ায় থকিতে দ্বিজেন্দ্রলাল 'মেবার পতন' নাটকের সংক্ষিপ্তসারও প্রস্তুত করিতেছিলেন এবং জগদীশচন্দ্রের অমূল্য উপদেশে 'বঙ্গ আমার জননী আমার' গানটি রচনা করিবার প্রেরণা পান।

ক্রীড়া এবং শরীরচর্চা ক্ষেত্রে

উপরোক্ত ক্রীড়াক্ষেত্রে বিহারের বাঙালিতে লেখক সমীর সেনগুপ্ত দেখান যে ক্রীড়া ও শরীরচর্চা ক্ষেত্রে বিহারের বাঙালিদের সবচেয়ে বড়ো অবদান আধুনিক ব্যায়াম ও শরীরচর্চা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা (উদাহরণঃ পাটনার শূরোদ্যান, ১৮৭৪ সাল), এবং বিভিন্ন শহরে ফুটবল ক্লাব নির্মাণ। তিনি লেখেন, বিহার থেকে যে সব বাঙালী খেলোয়াড়রা কলকাতায় ফুটবলে নাম করেছিলেন তাঁদের মধ্যে, সেই সময়ের বিচারে, অনেকেই ভারতের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় ছিলেন। সকলের নাম উল্লেখ করা সম্ভব নয় কিন্তু তাঁদের মধ্যে কিষণগঞ্জের উমাপতি কুমার (মোহনবাগান), ভাগলপুরের নরেন ব্যানার্জি (মোহনবাগান), পূর্ণিয়ার বিমল মুখার্জি, অমল মজুমদার ও অনিল দে (মোহনবাগান), পুর্ণিয়া ও পাটনার হীরেন সেন (ইষ্টবেঙ্গল), পাটনার প্রাণবন্ধু ভৌমিক (এরিয়ান ও কাষ্টমস), ধানবাদের নন্দ চৌধুরী (মোহনবাগান) অবশ্যই সুনাম অর্জন করেছিলেন। আজও যাঁকে ফুটবলের যাদুকর বলা হয় সেই সামাদ ছিলেন পূর্ণিয়ার অধিবাসী। এঁদের মধ্যে অনিল দে সর্বভারতীয় দলে স্থান পেয়েছিলেন। এঁদের ছাড়াও মাঝারি অনেক বাঙালী খেলোয়াড় হাথুয়া, দেওঘর, মজঃফরপুর প্রভৃতি সহর থেকে কলকাতার দলে খেলেছেন।

দ্বিতীয় যুদ্ধের পর যে কয়েকজন বিহারের বাঙালী ফুটবলে নাম করেন তাঁদের মধ্যে অবশ্যই প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম শীর্ষে। জামসেদপুরে স্কুলের ছাত্র অবস্থাতেই তিনি সন্তোষ ট্রফীতে খেলার জন্য বিহার দলে স্থান পান। প্রথম খেলাতেই তখনকার কলকাতার ফুটবলের কর্মকর্তাদের নজরে পড়ে কলকাতায় পাড়ি দেন। তার পরের সাফল্যের কথা এতই জানা সকলের যে এ ভারতের এই অন্যতম শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়ের বেশি পরিচয় দরকার নেই। পাটনায় মেডিক্যাল কলেজের দুই খেলোয়াড় সর্বভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবলে যথেষ্ঠ সুনাম অর্জন করেন। সুবোধ কাঞ্জিলাল সর্বভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দলে স্থান পেয়ে আফগানিস্থান সফরে যান; অশোক ব্যানার্জিও সুনাম অর্জন করেন।

সঙ্গীত

আধুনিক যুগের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ক্ষেত্রে, গায়নে ও বাদনে বিহারের অনেক শিল্পীর সুনাম ছিল এক সময়। তবে বিহারের গুরুত্বপূর্ণ অবদান নিঃসন্দেহে বাংলা টপ্পার ঘরাণা। ভাগ্যিস, রামনিধি গুপ্ত মশাই ১৭৭৬ খ্রীষ্টাব্দে ২৫ বছর বয়সে বিহারের ছাপরা অঞ্চলে চাকরি করতে আসেন। সঙ্গীতপ্রেমী ছিলেন তাই এক পশ্চিমা শিল্পীকে গুরু করে এই পাঞ্জাবের এই টপ্পা গায়নধারাটি যত্ন নিয়ে শেখেন। তারপর বাংলায় ফিরে নিজের মতো করে গান লিখে বাংলা টপ্পার ঘরাণা তৈরি করেন। আর তাই গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের টপ্পা অঙ্গের গানগুলোর এক বিশেষ জনপ্রিয়তা আজও অম্লান। স্টার জলসা চ্যানেলে চিরসখা সিরিয়ালের যে থীম-সঙে যে গানটি ব্যবহৃত হয়, নিধুবাবু বিহারে না গেলে সে গান রবীন্দ্রনাথ লিখতেন কিনা জানি না।

নাট্য

নাট্য ব্যাপারটাই সমষ্টিগত একটা উৎসাহী দল চাই। নাট্যকার একজন হলেও, নির্দেশক একজন হলেও, অন্তিমে সেটাকে একটা পুরো দলের সক্রিয়তার মাধ্যমে প্রদর্শিত হতে হয়, নইলে প্রাক-সিনেমা যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং জনপ্রিয়তম এই দৃশ্য-শ্রাব্য শিল্পরূপটির নান্দনিক সার্থকতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আধুনিক পর্বে, এই প্রদর্শনে যুক্ত হল প্রযুক্তি, বর্ধিত ব্যয় যা এই শিল্পরূপটির প্রগতি নগরকেন্দ্রিক করে তুলল (পথনাটিকা বা থার্ড থিয়েটারের প্রসঙ্গে যাওয়ার দরকার নেই)। বলার উদ্দেশ্য এই যে বাংলার সমৃদ্ধ নাট্য-ঐতিহ্যে বিহারের অবদান বলতে গেলে কিছুই বলা যাবে না। কিন্তু এটাই গৌরবের কথা যে বিহারের বাঙালিয়ানা কখনোই এ কাজে পিছিয়ে থাকে নি। যে শহরেই বাঙালি গেছে, দল বেঁধেছে এবং কালীপুজো, দুর্গাপুজো, হরিসভা গড়ে তোলার সঙ্গে সমান প্রাথমিক তাগিদে নাট্যপ্রয়াস শুরু করেছে। আয়োজন করেছে নাট্য-প্রতিযোগিতা। গড়েছে নামকরা সব থিয়েটার-গ্রুপ। বস্তুতঃ চারদিনের পুজোমন্ডপের একপাশে নাট্য-গীতি-নৃত্য ইত্যাদির মঞ্চও থাকতে হবে, বিহারে এই কনসেপ্টটা বাঙালিরাই এনেছে বিভিন্ন শহরে। বিহারের প্রথম দ্বিভাষী পেশাদারী থিয়েটারও ১৯৬১ সালে শ্রদ্ধেয় অনিল মুখোপাধ্যায়, অর্থাৎ এক বাঙালিই পাটনায় প্রতিষ্ঠা করেছেন। অনিল বাবুর উপরোক্ত প্রবন্ধে তিনি যে তিনটে প্রবন্ধের উল্লেখ করেছেনঃ ) A trend of Development of Amateur Bengalee Theatre in Behar Behar Herald, Centenary Number, 1975; ২) বিহারবাসী বাঙালীদের প্রাথমিক নাট্যপ্রচেষ্টা (সঞ্চিতা, ৪র্থ সংখ্যা, মাঘ-চৈত্র ১৩৭৪); ৩) পাটনার বাংলা ভাষাভাষীদের নাট্যপ্রচেষ্টা (পাটলশ্রী ২৮/২ ১/৩, ১৯৭৫) আগ্রহী পাঠকেরা সেই প্রবন্ধগুলো খুঁজে পড়ে দেখতে পারেন। অনিলবাবুর প্রবন্ধটি এবং এই তিনটের মধ্যে শেষ প্রবন্ধটি, সদ্যপ্রকাশিত সঞ্চিতা, কলকাতা পুস্তকমেলা সংখ্যা ২০২৪ ও ২০২৫-এ পুনর্মুদ্রিত হয়েছে।

 

বাণিজ্য

বাণিজ্যে বিহারের বাঙালি বিষয়ে কোনো লেখার সন্ধান পাই নি। তবে যদ্দুর জানি, বিহার চেম্বার অফ কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ-এর সভাপতিদের মধ্যে ১৯৮৯-৯১ সালে একজন বাঙালি ছিলেন প্রভুদত্ত মুখার্জি। তিনি এক সময়ে বিহার বাঙালি সমিতিরও সভাপতি ছিলেন। এখনকার বিহারে এক প্রতিশত জনসংখ্যা নিয়ে থাকা বাঙালিদের মধ্যেও অনেক বাঙালি ব্যবসায়ী আছেন। একসময় পাটনাতেই তিনটে পেট্রল পাম্পের মালিক বাঙালি ছিলেন। ছোটো, বড়ো দোকান, হোটেল বা কর্মশালার মালিকও আছেন।

রাজনীতি

রাজনীতি ক্ষেত্রে বিহারের এখনকার ভৌগোলিক এলাকায় সবচেয়ে আগে একসময়কার বিধায়কদের নাম নেওয়া যায়। কম্যুনিস্ট পার্টির ডঃ এ কে সেন পাটনা থেকে তিনবার বিধায়ক হয়েছিলেন। মার্কসবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির শ্রী অজিত সরকার পূর্ণিয়া থেকে তিনবার বিধায়ক হয়েছিলেন। মাফিয়াসর্দারদের হামলায় অসময়ে নিহত না হলে তিনি আবার বিধায়ক হতেন, সাংসদও হতে পারতেন। তাঁর আগে ঐ পূর্ণিয়া থেকে চারবার সাংসদ হয়েছিলেন কংগ্রেসের নেতা শ্রী ফণীগোপাল সেনগুপ্ত। অজিতবাবুর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী শ্রীমতী মাধবী সরকারও পূর্ণিয়া থেকে ঐ একই দলের বিধায়ক হয়েছিলেন। বিহারে কম্যুনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা নেতা ও সম্পাদক শ্রী সুনীল মুখার্জি একসময় বর্তমান ঝাড়খণ্ডের জামশেদপুর থেকে বিধায়ক হলেও তাঁর পিতা শ্রী নিরাপদ মুখার্জি বর্তমান বিহারের মুঙ্গের থেকে দুবার বিধায়ক হয়েছিলেন। কাটিহার থেকে জনসঙ্ঘের জগবন্ধু অধিকারী বিধায়ক হয়েছিলেন ১৯৬৭ সালে। কাটিহারেরই কদওয়া বিধানসভা থেকে বিজেপির শ্রী ভোলা রায় বিধায়ক হন দুবার। বক্সার সদর থেকে এক সময় বিধায়ক হয়েছিলেন বিখ্যাত সমাজবাদী নেতা শ্রী প্রণব চ্যাটার্জি। ঠাকুরগঞ্জ বিধানসভা থেকে বিধায়ক হয়েছিলেন শ্রী অনাথ কান্ত বসু। ভাগলপুর থেকে পাঁচবার বিধায়ক হন শ্রী বিজয় কুমার মিত্র; জনসঙ্ঘ থেকে তিনবার, লোকদল আর বিজেপি থেকে এক-এক বার।

যদিও এখনকার বিহারে আর বাংলাভাষী বিধায়ক আর সাংসদ কেউ নেই। বিহারের বিধানসভা বাইক্যামেরাল, অর্থাৎ বিধান পরিষদও আছে। কিন্তু বিধান পরিষদেও কেউ নেই। তবে হ্যাঁ, শহরগুলোর পৌরসভার ওয়ার্ডে কাউন্সিলর, এবং তেমনি পশ্চিম বা পূর্ব চম্পারণের গ্রামাঞ্চলে পঞ্চায়েত প্রতিনিধিদের মধ্যে কিছুসংখ্যক এখনও বাংলাভাষী।

বাকি রইলেন ডাক্তার, উকিল এবং শিক্ষক/অধ্যাপক। আগেই বিমানবিহারিবাবুর লেখা থেকে নেওয়া উদ্ধৃতিতে উল্লিখিত হয়েছে যে বিহারের বাঙালিরা প্রচুর সংখ্যায় এসব পেশায় প্রথম থেকেই ছিলেন এবং বিশ শতকের শেষ অব্দিও ছিলেন। প্রত্যেক শহরে স্বনামধন্য এক বাঙালি এলোপ্যাথ যেমন, বাঙালি হোমিওপ্যাথ, এমনকি আয়ুর্বেদাচার্যও পাওয়া যেতে পারত। বিখ্যাত বাঙালি উকিল আগেও ছিলেন, নিম্ন ও উচ্চ আদালতে, এবং কয়েক বছর আগে অব্দিও ছিলেন। আর শিক্ষক? বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থশাস্ত্রের অধ্যাপক থেকে পাড়ার গিটারশিক্ষক, অঙ্কনশিক্ষক, সঙ্গীত ও নৃত্য শিক্ষকতায় ভরে ছিলেন বাঙালিরা।

উপসংহার

উপরে বর্ণিত ইতিহাসকে আজকের প্রেক্ষিতে যোগ করতে গেলে দুটো তথ্য এবং তাদের দ্বান্দ্বিকতা মাথায় রাখতে হবে। এক, বর্তমান শতকের আগে অব্দিকার বিহারের বাঙালিয়ানার জোর অনেকটাই সেইসব অঞ্চল-নির্ভর ছিল যা আজকের ঝাড়খণ্ড। তাই বিহার ও ঝাড়খণ্ড বিযুক্তিকৃত হওয়ার পর আজ ঝাড়খণ্ডে বাঙালি জনসংখ্যা প্রায় ৪০%; যখন নাকি বিহারে আজ মাত্র ১% (+)।

দুই অথচ গত শতকের ঐ বিস্তৃত বাঙালিয়ানার রাজনৈতিক কেন্দ্র কিন্তু ছিল পাটনা। তাই ঝাড়খণ্ডের বাঙালিয়ানা বিপুল সংখ্যাবল নিয়েও এখনো রাজ্যস্তরে কোনো সাংগঠনিক ঐক্য গড়ে তুলতে পারে নি। আগের ইতিহাসের সঙ্গে কোনো ধারাবাহিকতা গড়ে তুলতে পারার চেষ্টা করে চলেছে। অথচ ১% নিয়েও বিহারের বাঙালিয়ানা অস্তিত্বের সর্বাত্মক সংকটের বিরুদ্ধে মোটামুটি ঐক্যবদ্ধ ভাবে যুঝবার চেষ্টা করছে। একটি ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে ইতিহাসের সঙ্গে।

কিন্তু, অস্তিত্বের এই সর্বাত্মক সংকটের মুখে আজকের বিহারের বাঙালিজীবন, যার সাংস্কৃতিক ও ভাষিক আত্মপরিচয় বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে, সাড়ে তের লক্ষ জনসংখ্যার আদ্ধেকের একটু বেশি বিভিন্ন শহরের অধিবাসী বাঙালি আর আদ্ধেকের একটুই কম, বিভিন্ন জেলার গ্রামে গ্রামে উদ্বাস্তু কলোনিতে পুনর্বাসিত বাঙালি তাদের প্রতিদিনকার যুদ্ধ অথবা পরাজয় অথবা পলায়নে চিহ্নিত হয়ে চলেছে, একটি ভিন্ন প্রবন্ধেরই বিষয় হতে পারে। কেননা এই শতকের প্রথম পঁচিশ বছরের পৃথিবীটা সব দিক থেকেই অন্য রকম।       

No comments:

Post a Comment