Monday, October 16, 2023

রুদ্রজী

এ শহর সেদিন সত্ত্বায়

অনেক বেশি উজ্জীবিত ছিল। 

কবিদের বাড়ি ছিল তীর্থের মতন –

এ গলি সে গলি পেরিয়ে,

কাঠচেরাই কিম্বা ট্রেডলের শব্দ চিনে চিনে,

জবাগাছের ডালটা সরিয়ে খোলা দরজার

কড়া নাড়া – আরে এস এস! …

পরে যাঁরা ইতিহাস হলেন সে কবিরা

লেখকেরা কিম্বা অনুবাদকেরা

সেদিন এ শহরের ভাষায় বসন্ত বাঁধছিলেন।


আপনিও তাঁদেরই মধ্যে ছিলেন – সর্বজনশ্রদ্ধেয়;

সবাই ছড়িয়ে পড়ল 

                         সময়ে কিম্বা সত্ত্বায়

আপনি রয়ে গেলেন।

ধীরে ধীরে

কষে বাঁধল আপনাকে পরিবারের

জটিলতা, রোজকার রুটির চাবুক।


                                           লড়ে চললেন;

সূর্যউপাসকের শরীর ছিল আপনার,

সাইকেল চালিয়ে যেতেন, প্রুফ দেখে ফিরতেন

অনেক রাতে …

কবিতার আসরে আপনি বিস্মৃতি হয়ে পড়ছিলেন।


কেন যেন সবসময় মনে হয় আমি দেখতে পাচ্ছি –

বৃষ্টির রাত এগারোটা, ফোঁটাগুলো চিকচিক করছে রাস্তার আলোয়,

ঈষৎ দূরে দীর্ঘদেহী আপনি 

ভেজা ঘিয়ে পাঞ্জাবির ভিতরে ন্যুব্জ কাঁধ, 

সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছেন, 

হঠাৎ কিছুতে জড়িয়ে পড়ে গেলেন,

দপ করে আগুন জ্বলল এক ঝলক – শেষ!

ক’দিন আগেই তো বেরিয়েছিল প্রায় তিন দশক পর 

একটি সংগ্রহ আপনার!


১৯.৩.১৯৯৫





মগধের সাহিত্য - ৫

মগধের সাহিত্য

১০০ বছর আগে, ১৯২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯২১এর এপ্রিল অব্দি মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছ’টি বক্তৃতা দিয়েছিলেন এবং ১৯২৩ সালে পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় সেই বক্তৃতা ক’টি পুস্তকাকারে প্রকাশ করেছিল।

‘মগধের সাহিত্য’ শীর্ষক এই বক্তৃতামালায় বক্তৃতা সংখ্যা ১ ছিল ‘মগধের মূল অধিবাসী’, বক্তৃতা সংখ্যা ২ ছিল ‘পাটলিপুত্র – ভারতের মেধাজগতের রাজধানী’, বক্তৃতা সংখ্যা ৩ ছিল

‘কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের ঐতিহাসিক শিক্ষা’, বক্তৃতা সংখ্যা ৪ ছিল ‘বাৎস্যায়নের কামসূত্র’, বক্তৃতা সংখ্যা  ৫ ছিল ‘বাৎস্যায়ন ভাষ্য’ এবং বক্তৃতা সংখ্যা ৬ ছিল ‘বাণভট্ট এবং আর্য্যভট্ট’।

 

বক্তৃতা সংখ্যা ৫

বাৎস্যায়ন ভাষ্য

 

আরেকজন বাৎস্যায়ন আছেন যিনি দর্শনসংক্রান্ত কাজের পারিভাষিক শব্দাবলী ও ভাষা নিরূপণ করে ভারতীয় সাহিত্যে বিশিষ্ট অবদান রেখেছেন। প্রথম যদি তিনি নাও হন, দার্শনিক বিষয়সমূহে তিনি প্রথম দিকের একজন রচনাকার। তাঁর আগে সমস্ত কিছুই সূত্রে এবং স্মৃতিসংক্রান্ত কাব্যে ছিল। তাঁর সময় থেকে গদ্য উচ্চতর চিন্তাভাবনার ভাষা হয়ে উঠল। তাঁর কাজ ভাষ্য শ্রেণীতে প্রথম, যাতে সূত্রগুলোকে সাধারণ ভাষায় নিয়ে এসে, লেখকদের মতের স্পষ্ট ব্যাখ্যা করে তারপর নিজের সমালোচনা পেশ করা হয়। তাঁর আগে ভাষ্য বলতে ছিল স্বতন্ত্র গ্রন্থ,  নিদর্শন হিসেবে নিঘণ্টুর ভাষ্য নিরুক্ত এবং পাণিনির ওপর পতঞ্জলির মহাভাষ্য দেখুন। কৌটিল্য অর্থশাস্ত্র-এর নিজেরই রচিত সূত্রগুলোর ওপর একটা ভাষ্য তৈরি করলেন, কাজেই সে ক্ষেত্রে সমালোচনার তত্ত্ব থাকা অসম্ভব।

বলা হয় যে ন্যায়সূত্র-এর ওপর বাৎস্যায়নের ভাষ্য বোঝা খুব কঠিন। যে লেখকের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল দর্শনকে সাধারণ মানুষের বোঝার মত করে লেখা এবং যার রচনাশৈলী এত সহজ ও সুন্দর, অদ্ভুত মনে হয় যে তাকে দুর্বোধ্য মনে করা হয়। সমস্যাটা ভাষ্যের নয়, সূত্রের। সূত্রগুলো জোড়াতালি মারা সংকলন। স্পষ্ট দেখা যায় যে অনেকগুলো হাত সেগুলো সংগ্রহ করছে এবং পরিমার্জন করছে। এই পরিমার্জন এবং প্রক্ষেপণের উদ্দেশ্য সবসময় বিজ্ঞানের প্রগতি নয়, দলগত স্বার্থ। আর বাৎস্যায়নের কাজটা ছিল কঠিন। বিভিন্নধর্মী বস্তুসমূহকে সমরূপ একটি প্রণালীর শৃংখলায় নিয়ে আসা। তাই আকছার তিনি দুর্বোধ্য হয়ে যান এবং জোর গলায় বলা যায় না যে তাঁর ভাষ্যটিকেও দলগত স্বার্থে বিকৃত করা হয় নি।

কিন্তু তাঁর অসুবিধেগুলো বুঝতে এবং তাঁর অবদানের সমাদর করতে সাধারণভাবে সূত্রসমূহ এবং বিশেষভাবে ন্যায় সূত্রসমূহ সঙ্কলিত করার ইতিহাসটা বলা জরুরি। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে বৈদিক সূত্র, শ্রৌত, গৃহ্য এবং ধর্মসূত্রের রচনাকাল শেষ হয়ে গিয়েছিল। পাণিনি, পিঙ্গল এবং তাঁদের অনুসারীদের সঙ্গে শিক্ষা, ব্যাকরণ এবং অঙ্গের অন্যান্য সূত্রের রচনাকাল শেষ হল। বাৎস্যায়নের কামসূত্রের সঙ্গে বোধহয় মানবজীবনসম্পর্কিত সাধারণ চিন্তাভাবনার বিষয় নিয়ে সূত্র রচনার কালও শেষ হল। তারপর এল দর্শনসংক্রান্ত সূত্র। তবে সূত্র থাক বা না থাক, দার্শনিক ভাবনাচিন্তা খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ, সপ্তম বা তারও আগে থেকে চলছিল।

ওই সময়টায়, মানে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ, সপ্তম বা তারও আগে, ভারতীয় চিত্তে একটি বিরাট উপপ্লব ঘটেছিল। ভারতের শান্তি বিঘ্নিত করতে পারে এমন কোনো আভ্যন্তরীণ বা বহির্গত যুদ্ধ হয়েছিল মনে হয় না। এবং উচ্চতর শ্রেণীসমূহ, বিশেষকরে ব্রাহ্মণেরা, নৈতিক, আধ্যাত্মিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি চিন্তাভাবনার উন্নতিতে তাদের পুরো শক্তি নিয়োজিত করেছিল। বস্তুতঃ একটা সর্বাত্মক উন্নতির বাতাবরণ ছিল। সবাই নতুন কিছু বলতে চাইছে, কোনো কঠিন সমস্যার সমাধান করতে চাইছে, মানবজ্ঞানের পরিধিতে নতুন কিছু যোগ করতে চাইছে, কোনো কষ্ট কম করতে এবং দূর করতে চাইছে, জীবনকে সহনীয় এবং সুখকর করতে কিছু করতে চাইছে। সবাই কিছু নতুন ভাবনা নিয়ে আসছে। ধর্মোপদেশ আর প্রচারকার্য্যে ভরা সময়। যদি বৈদিক যুগের সর্বশেষ ভাবনিঃসরণ, উপনিষদে, এবং প্রথম দিকের বৌদ্ধ ও জৈনদের রচনায় দেখি, একটা জিনিষ যা আমাদের চমৎকৃত করে তা হল বিপুল সংখ্যক লেখক ও শিক্ষকের নাম। সবার কিছু বলার ছিল – নতুন ভাবনা, ধর্মমত, কর্মবিধি, ধারণা – কিছু একটা যা আমাদের জ্ঞান বাড়াতে পারে, কিছু একটা যা আরো সুসংবদ্ধ, আরো স্পষ্ট, আরো পরিষ্কৃত হয়েছে। প্রথম দিকের উপনিষদগুলো (বৈদিক) পড়ে মনে হয়, এমনকি প্রত্যক্ষকরণের পাঁচটি ইন্দ্রিয় এবং কর্মের পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের কথাও সেসময় সবাই জানে না। কেননা ওই সব অভিব্যক্তিগুলি আমরা তৈত্তিরীয় এবং অন্যান্য প্রাচীনতর উপনিষদে এভাবে পাই - চক্ষুঃ, শ্রোত্রং, মনঃ, বাক, ত্বক এবং অন্নং, প্রাণঃ, চক্ষুঃ, শ্রোত্রং।

দার্শনিক সূত্রসমূহের এই সব আদিম প্রতীতি থেকেই আমরা পরিমার্জিত বর্গীকরণে এবং সূক্ষ্ম পার্থক্যে পৌঁছোই। প্রক্রিয়াটা দীর্ঘ, ক্লান্তিকর, বাধায় ভরা এবং বহু শতক ধরে চলেছিল। বিদ্বানরা যথার্থই বলেন যে দার্শনিক সূত্রের বীজগুলো উপপ্লবের সাহিত্যে পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু কথাটা বিভ্রান্তিকর। নিখুঁতভাবে বলতে গেলে বলতে হয় যে যে বিষয়গুলো নিয়ে সূত্রের কারবার, সে বিষয়গুলো ওই সময়কার সাহিত্যে, উন্মেষের প্রথম অবস্থায় আদিম রূপে পাওয়া যায়। এর মধ্যে কিছু বিষয় জাপানী বিদ্বান মিঃ উই বিলক্ষণ দক্ষতার সঙ্গে, দশপদার্থী সূত্র অনুসারে বৈশেষিক দর্শনের ভূমিকায় সন্ধান করেছেন। উপনিষদে বর্ণিত চারটি উপাদান ছিল মহাভূত, এবং সে অর্থে আণবিক নয়। বৌদ্ধদের ছয়জন ধর্মবিরোধী শিক্ষকদের একজন, পকুদ কাচ্চায়ন বলেন পৃথিবী, অগ্নি, জল এবং বায়ু [সে উপাদান]; আনন্দ, বেদনা এবং আত্মা সৃষ্ট নয়, সৃজন সম্ভব নয় এবং বন্ধ্যা। তখনও এই ভাবনা আণবিক নয়। তবে তিনি বলেন যে শরীরে এবং বস্তুতে সমপরিমাণ উপাদান রয়েছে যদিও দৃশ্যতঃ তারা এক নয়; এই নিশ্চিত দ্বন্দ্বের সামঞ্জস্যবিধানে, অন্য কিছুর থেকে একটি আণবিক সিদ্ধান্ত বেশি কাজে লাগতে পারে এবং সেটাই স্বাভাবিক পরিণতি মনে হয়। জৈনরা বলেন যে আত্মা এবং শুদ্ধ স্থান ব্যতীত সবকিছু জড় (পুদ্গল) [matter] থেকে উৎপন্ন এবং সমস্ত জড় অণু অথবাপরমাণু দিয়ে গঠিত। জড় অবশ্য স্থূল এবং সূক্ষ্ম, দুই অবস্থাতেই হতে পারে; একটি স্থূল অণুর স্থান অসংখ্য সূক্ষ্ম অণুতে পূর্ণ হয়ে থাকে। সারবস্তুর দিক থেকে অণু চিরন্তন, প্রত্যেকটি অণুর স্বাদ, গন্ধ এবং রং এক, এবং দু ধরণের স্পর্শ। যদিও বিভিন্ন অণুর গুণাবলী চিরস্থায়ী এবং স্থির নয়, কিন্তু সে গুণাবলী তাদের মধ্যে পরিবর্তিত ও বিকশিত করা যেতে পারে। অণুর বৈশেষিক প্রণালী এর থেকে বেশি উন্নত। জৈন প্রণালীতে অণুর একটাই প্রকার, যখন নাকি বৈশেষিকে চারটি উপাদানের অনুরূপ বিভিন্ন প্রকারের অণুর কথা বলা হয়েছে। মিঃ উই ভারতীয় এবং চীনা গ্রন্থসূত্র থেকে, উপনিষদ থেকে বৈশেষিক সূত্র অব্দি আণবিক তত্ত্বের অবস্থা এবং পরিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়গুলো যত্নসহকারে সংগ্রহ করেছেন। খুবই কৌতূহলোদ্দীপক অন্বেষণ তাঁর এবং অধ্যয়ন ফলদায়ী। একই ভাবে সবক’টি তত্ত্বের বিকাশপথ, খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকের উদ্ভব থেকে দার্শনিক সূত্রের যুগ অব্দি সন্ধান করা সম্ভব।

যেমন আগেই বলেছি, উপপ্লবের যুগে আমরা মিছিমিছিই সূত্রসমূহের উৎস খুঁজব। কিন্তু যদি আমরা সূত্রে আলোচিত বিভিন্ন বিষয়গুলোর উৎস খুঁজি, আমরা বেশি সফল হব। এইসব নানা বিষয়, শুরু হয়েছিল অনেক আগে। তারপর সমালোচিত, পুনর্নির্মিত এবং পরিমার্জিত হয়েছিল বার বার। প্রত্যেকটি দার্শনিক গোষ্ঠি, যেমন ইচ্ছে এবং যেমনরূপে চাইত, সেই বিষয়গুলো ওঠাত। বিভিন্ন দার্শনিক গোষ্ঠি তৈরি হয়েছিল; তাদের মধ্যে কয়েকটি, যেমন কালকারণিক, ঈশ্বরকারণিক, অর্থচিন্তক স্বল্পস্থায়ী। বাকিরা কয়েক শতাব্দীকাল ধরে ছিল, মানুষের ভাবনাচিন্তাকে প্রভাবিত করেছিল তারপর অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল যেমন আজীবক, চেলক, পরিব্রাজক ইত্যাদি। কয়েকটি আমাদের সময় অব্দি এল। পরম্পরা অনুসারে তাদের সংখ্যা ছয়। কিন্তু সেই ছয় বিভিন্ন ভাবে গোনা হয়ঃ বৌদ্ধ, আর্হত, বৈশেষিক, সাংখ্য, মীমাংসা এবং ন্যায়, গোনার একটি ধরণ। যদি আপনি লোকায়তকে ঢোকাতে চান, ন্যায়কে সরিয়ে দিন কেননা সেটা বৈশেষিকের সগোত্র। আধুনিক গণন অন্যভাবে ছয়ের সমষ্টি তৈরি করে, যথাঃ পূর্ব ও উত্তর মীমাংসা, সাংখ্য এবং যোগ, ন্যায় এবং বৈশেষিক। আরেকটি সমষ্টি আছে ছয়ের – ব্রহ্ম, ঈশ্বর, বৌদ্ধ, আর্হত, সাংখ্য এবং লোকায়ত। ফলে বলা যায় যে লেখকদের কাল ও রুচি অনুসারে বিভিন্ন সমষ্টি আছে।

অর্থাৎ, একটা সময় ছিল যখন এই সব চিন্তাভাবনাগুলো ভারতীয় সমাজে আলোচিত হত। সমালোচিত এবং পরিমার্জিত হত। দার্শনিক গোষ্ঠি তৈরি করার উদ্দেশ্যে এগুলোর ভিত্তিতে দল তৈরি হত এবং সেখানে চিন্তাসমূহ সুসম্বদ্ধ করা হত। সূত্র সঙ্কলিত হয়েছিল কিছুকাল অতিবাহিত হওয়ার পর। কাজেই, যদি এই সূত্রগুলোর উৎস সন্ধান করতে হয়, সেই সব বিভিন্ন অধিকরণ বা একক-বিষয় দিয়ে শুরু করতে হবে যা সূত্র গঠন করে।

এটাই ভারতে দার্শনিক চিন্তার বিকাশের সাধারণ ইতিহাস। বাৎস্যায়নের ভাষ্য নিয়ে আলোচনা করতে আমাদের পরস্পর বিরোধী চিন্তাপ্রণালীগুলোকে সঙ্গে রাখতে হবে। একদিকে বৌদ্ধ, অন্যদিকে জৈন, ওদিকে আবার শঙ্কর বৈশেষিক প্রণালীকে অর্দ্ধবৈনাশিক বা অর্দ্ধ-নাস্তিবাদী বলে কলঙ্কিত করেন, যখন নাকি বৌদ্ধরা বিশুদ্ধ এবং সাদাসিধে সার্বিক-নাস্তিবাদী, এবং অনেকে মনে করে এদের কোনো গোঁড়ামি ছিল না। যে মহাপন্ডিত ব্যক্তি সূত্রসমূহ রচনা করেছেন তিনি সমসাময়িক প্রচলিত চিন্তাভাবনা থেকে বেশ কয়েকটি অধিকরণ নিয়েছেন, সেগুলো নিজের মত করে ব্যাখ্যা করেছেন, এবং আহ্নিকে ও অধ্যায়ে সেগুলোকে মালায় গেঁথেছেন। ন্যায় বৈশেষিকদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে, শুধু পদার্থবিজ্ঞান ও অধিবিদ্যা থেকে তর্কশাস্ত্রের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। তাই, বাৎস্যায়নের কাজ বুঝতে এবং যথাযথ মূল্যায়ন করতে, চিন্তাপ্রণালীগুলোর কিছুটা ইতিহাস কাজে লাগবে।

উপনিষদ যে বেদান্ত প্রণালীর শিক্ষা দিত, ভারতে সেটিই প্রথম চিন্তাপ্রণালী যার অধ্যয়ন এবং তত্ত্বানুসন্ধান করা হয়েছিল। কিন্তু উপনিষদসমূহকে দীর্ঘকাল যাবৎ ব্রাহ্মণসমূহের অংশ মনে করা হত এবং কর্মকান্ডে ব্যবহার করা হত। তাই সে শিক্ষা ব্রাহ্মণদের মধ্যেই সীমিত ছিল। জ্ঞানকান্ড এবং কর্মকান্ডের মধ্যেকার পার্থক্য অনেক পরে এসেছে। তাই উপনিষদের দর্শন, বলতে গেলে মুলতুবি অবস্থায় ছিল এবং খ্রিষ্টাব্দ ষষ্ঠ শতকের আগে বিকশিত হয় নি। সপ্তম শতকে আমরা হর্ষচরিতে ঔপনিষদ১ নামে, অর্থাৎ যারা দর্শনের একটি চিন্তাধারা হিসেবে উপনিষদ অধ্যয়ন করে, একটি দার্শনিক গোষ্ঠির কথা জানতে পারি। এই গোষ্ঠি থেকেই পরবর্তী শতকগুলোয় বেদান্তীদের আবির্ভাব হয়। কাজেই ভারতের প্রাচীনতম চিন্তাধারা সবচেয়ে শেষে বিকাশ লাভ করে।

বেদান্তের পরে আসে সাংখ্য, গণনামূলক দর্শন, যাতে ভাবকে সংখ্যায় নিরূপিত করার চেষ্টা হয় এবং বস্তুতঃ কপিল সূত্রে, যার সংখ্যা ২২, প্রায় প্রতিটি সূত্রে একটি সংখ্যা আছে। এটা দর্শায় যে সাংখ্য শব্দটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই ২২টি সূত্রের বয়স নিশ্চিত নয়। এতে অনেক উন্নত ধারণা আছে, যেমন ত্রিপ্রমাণ, যেটা ন্যায়-এর ধারণাবলীর পরের হতে পারে। বিদ্বানরা সবাই মনে করেন যে সাংখ্য-এর প্রাচীনতম বিদ্যমান রচনা ঈশ্বরকৃষ্ণ-এর ৭০টি কারিকা। আরো তিনটি কারিকা আছে যাতে দার্শনিক চিন্তাধারাটি সম্পর্কে অন্যান্য ঐতিহাসিক তথ্য এবং শিক্ষকদের অনুক্রম দেওয়া আছে। এতে আছে যে ষষ্টিতন্ত্র নামে একটি বই ছিল যার একটি অধ্যায়ে ছিল অন্যান্য চিন্তাধারার মতসমূহ নিয়ে আলোচনা এবং আরেকটি অধ্যায়ে ছিল কাহিনীসমূহ নিয়ে আলোচনা। এখন ছয় অধ্যায় সম্বলিত একটি বই আছে ‘সাংখ্য প্রবচন’ যার একটি অধ্যায়ে সাংখ্য দৃষ্টিকোণ থেকে অন্যান্য চিন্তাধারার মতবাদের খণ্ডন এবং আরেকটি অধ্যায়ে সাংখ্য অনুশীলনে সহজে সিদ্ধি পাওয়া ভক্তদের কাহিনী নিয়ে আলোচনা আছে। কিন্তু সাংখ্য প্রবচনের সূত্রাদি যে প্রাচীনত্বের দাবী করে তা খারিজ করতে বিদ্বানেরা একমত। তাঁরা বলেন যে বইটা বেদান্ত চিন্তাভাবনায় ভরা এবং এর সূত্রকার বিজ্ঞান-ভিক্ষু, যিনি ভাষ্যের লেখক, শঙ্করের অনুযায়ী এবং এগারোশো অথবা বারোশো শতকের মানুষ। আমি গৌড়পদের ভাষ্যে, ৭০ কারিকার ওপর ষষ্টিতন্ত্রের একটি সূত্র পেয়েছি কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ সাংখ্য প্রবচন সূত্রসমূহে সেই সূত্রটি নেই। হতে পারে প্রবচন ষষ্টিতন্ত্রকে ভিত্তি করেই রচিত হয়েছিল কিন্তু পরবর্তী অদলবদলগুলোয় এতটাই বদলে গেছে যে আর চেনা যায় না।

কাজেই সাংখ্যের, অদ্যাপি বিদ্যমান প্রাচীনতম রচনা, খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতকে অথবা তার আগে ঈশ্বরকৃষ্ণ রচিত ৭০ কারিকা। কিন্তু সূত্রসংগ্রহ কিছু ছিল, যার একটির কথা খোদ কারিকাই বলে – তার নাম ষষ্টিতন্ত্র। ষষ্টিতন্ত্র শব্দটির অর্থ দুর্বোধ্য কিন্তু একজন আধুনিক টীকাকার নারায়ণ, সাহসের সঙ্গে জটিল ধাঁধাটার জবাবে বলেছেন যে রচনায় ষাটটি বিষয় ছিল। এবং সেই ষাটটি বিষয়ের নামও বলেছেন। কিন্তু আমরা অন্য একটি সাংখ্য দার্শনিক গোষ্ঠির কথা জানি যার ব্যাখ্যা করে ভগবত-গীতা এবং কঠোপনিষদ। এই গোষ্ঠি অব্যক্ত এবং বুদ্ধির মধ্যবর্তী মহাতত্ত্বে বিশ্বাস করে। অশ্বঘোষ তাঁর বুদ্ধচরিতে নির্বাণের বৌদ্ধ মতের কথা বলতে গিয়ে বলেন যে এটি সাংখ্য মতবাদগুলির অগ্রগতি, এবং তাঁর চিন্তাপ্রণালী ভগবত-গীতা এবং কঠোপনিষদের অনুরূপ। একটা নিশ্চিত ভিত্তিতে গিয়ে আমরা পাই যে খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে কৌটিল্য সাংখ্যের নাম নিচ্ছেন একটি দার্শনিক গোষ্ঠি হিসেবে। ঈশ্বরকৃষ্ণের আগে প্রাচীন সাংখ্য সাহিত্য বলতে এটুকুই জানা যায়। ভারতে সবচেয়ে আগের ভ্রমণকারী বা পর্যটক তপস্বী সম্প্রদায় ছিলেন পরিব্রাজকেরা; তাঁর বৌদ্ধ এবং জৈনদের থেকে অনেক আগের। হরিভদ্রের সদ্দর্শন সমুচ্চয়ের ভাষ্যে গুণরত্ন বলেন যে এরা সাংখ্যের অনুগামী ছিল। (P. 95, Bibl. Ind. Edition)

কোনো সন্দেহ নেই যে সাংখ্য প্রণালী নিজের নাম সংখ্যা থেকে নিয়েছে। এটি বৌদ্ধমত থেকেও প্রাচীন এবং বৌদ্ধমতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। কয়েকজন মনে করেন যে সাংখ্যের অব্যবহিত পরিণতি বৌদ্ধমত এবং প্রথম দিকের বৌদ্ধমত সংখ্যায় ভরা – চারটি মহৎ সত্য, বারোটি আয়তন, পাঁচ স্কন্ধ ইত্যাদি। বৌদ্ধমত দীর্ঘকাল পর্য্যন্ত গণনায় আটকে ছিল। এমনকি ছোট ছেলেদের তারা ধারণার মাধ্যমে সংখ্যা শেখাতো।

যেমন বলেছি, উচ্চতর চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রথম দিকের পদ্ধতি ছিল ধারণাকে সংখ্যা দিয়ে স্থির করা। চিন্তাগুলো ছিল ক্ষণস্থায়ী, বিলীয়মান, চিত্তে স্থির করা কঠিন, বিদিত করা আরো কঠিন; চিন্তার কারবার করার সবচেয়ে ভালো উপায় ছিল তাদেরকে সংখ্যায় বাঁধা। কিন্তু যখন চিন্তার সংখ্যা অত্যধিক হয়ে গেল, চিন্তার জগত ব্যাপ্ত হল তখন ভিন্ন পদ্ধতি আবিষ্কার করার প্রয়োজন হয়ে পড়ল। সে পদ্ধতি ছিল তুলনা – বর্গীকরণের উদ্দেশ্যে সংখ্যা দ্বারা স্থিরিকৃত ধারণাসমূহের মিল ও অমিলের তুলনা, এবং সে পদ্ধতি দিল বৈশেষিক সূত্র যাতে সাধর্ম্য এবং বৈধর্ম্য ছিল প্রধান সূর। পুরো রচনা জুড়ে মিল এবং অমিলের ভাবনা। প্রণালীটির চারিত্রিক বৈশিষ্ট হল সামান্য আর বিশেষ, সাধারণীকরণ ও বিশেষীকরণ অথবা পৃথকীকরণ। বৈশেষিক নামটাই পৃথকীকরণ থেকে এসেছে। কিছুসংখ্যক বস্তু নিন, তাদের মধ্যে মিল বা এমন সাধর্ম্য খুঁজতে থাকুন যেটাকে আপনি সবক’টি বস্তুর বিধেয় করতে পারেন। সেটা হবে সর্বোচ্চ মিল। তারপর আবার, অমিল খুঁজতে খুঁজতে একেকটি বস্তুর নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যের অন্তিম বিশ্লেষণে, নিম্নতম অমিলে পৌঁছোন। এইভাবে বিশ্বের সমস্ত স্বজ্ঞা ও ঘটমানের বর্গীকরণ ও বিশ্লেষণ করে কণাদ চূড়ান্ত সাধারণীকরণ পূর-সামান্য অর্থাৎ, অস্তিত্ব ‘সত্ত্ব’ এবং চূড়ান্ত পৃথকীকরণ বিশেষে পৌঁছোন। এই দুই চূড়ান্তের মাঝে আছে সমস্ত ঘটমান, মিল এবং অমিল দুইই যার বিধেয় হতে পারে।

বৈশেষিক সূত্রেরও ইতিহাস উত্থান-পতনে ভরা। লোকপরম্পরা নিশ্চিতভাবে বলে যে এর আঠেরোটি দার্শনিক গোষ্ঠি ছিল।৩ জানা যায় না এই লোকপরম্পরা কতটা ঠিক। কিন্তু সদ্য চীনে, বৈশেষিকের একটি দার্শনিক গোষ্ঠির অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে যার দশটি বিভাগ আছে। এটাও ভালোভাবেই সবাই জানে যে এরা যাকে প্রশস্ত ভাষ্য বলে সেটি একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ। অনেক বস্তুগত লক্ষণে সূত্র থেকে ভিন্ন। হতে পারে এই গ্রন্থটি পুরোনো ধরণের একটি ভাষ্য, যা মূল রচনাটির বিবর্দ্ধন ও সমালোচনা করেছিল। প্রশস্তপাদের সম্পাদক দেখান যে সব মিলিয়ে ৫৩টি সূত্র বাদ৪ দিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ভাষ্যকার বিষয়টির আলোচনায় যে ক্রম গ্রহণ করেছেন সেটি সূত্র থেকে একেবারেই ভিন্ন। সপ্তপদার্থী নামে আরেকটি দার্শনিক গোষ্ঠি আছে। যদিও তুলনামূলকভাবে আধুনিক, গোষ্ঠিটির ভিত্তি পুরোনো একটি গোষ্ঠিতে, কেননা পুরোনো কোনো গোষ্ঠিতে ভরসা করতে না পারলে আধুনিকদের নতুন দার্শনিক গোষ্ঠি শুরু করার সাহস হয় না।

শঙ্করাচার্য্য সাংখ্যকেও গোঁড়ামিমুক্ত বলেন। নেকনজর সত্ত্বেও সমালোচনা করেন কেননা মনুর মত কিছু গোঁড়া মানুষ এই দর্শন গ্রহণ করেছিল। সে তূলনায় তাঁর করা বৈশেষিকের আলোচনা কঠোর; তিনি এই দর্শনকে অর্দ্ধ-বৈনাশিক, অর্থে – অর্দ্ধ-শূন্যবাদী, বলেন। তিনি জানতেন যে এর উৎস প্রচলিত মতের বিরোধ, যদিও শাস্ত্রবিশ্বাসী মনে করা হয় কেননা কণাদের সূত্রগুলো আকছার বেদ ও আগমে সমর্থন চায়। চীন থেকে আসা সূত্র সেরকম কোনো সমর্থন চায় না। কণাদ নিজের রচনায় বেদের ওপর একটি অধ্যায় রেখেছেন এবং বৈদিক আচারপদ্ধতিকে সমর্থন করেন। এই সব কারণে আধুনিক সময়ে বৈশেষিককে শাস্ত্রবিশ্বাসী মনে করা হয়।

গণনা থেকে তুলনা অব্দি দার্শনিক পদ্ধতির প্রগতি বিবৃত করে সাংখ্য এবং বৈশেষিক। তারপরে আসে যুক্তিতর্ক ও আলোচনা, অর্থাৎ ন্যায়। আকছার এর ভুল অনুবাদ হয় তর্কশাস্ত্র। ন্যায়সূত্র শুরু হয় প্রমাণ দিয়ে এবং শেষ হয় যুক্তিতর্কে বিষয়নির্দিষ্ট পরাজয়সাধনে। সূত্রসমূহে অনেক কিছু আছে যেগুলো তর্কশাস্ত্রের ক্ষেত্রের বাইরে। আমাদের পিতৃপুরুষেরা ন্যায়সূত্রকে তর্কশাস্ত্র বলতেন। সেটাই এর সঠিক নাম হওয়া উচিৎ - আলোচনার শিল্প। ন্যায়ের ষোলোটা বিভাগ পরখ করে দেখুন! সবগুলো আলোচনা সম্পর্কিত। (১) প্রমাণ, সত্যকে বাছাই করার সাধন, (২) প্রমেয়, প্রকৃত জ্ঞানেই যাকে নিশ্চিত জানা যায়, (৩) সংশয়, সন্দেহ, (৪) প্রযোজন, বিষয়বস্তু, (৫) দৃষ্টান্ত, উদাহরণ, (৬) সিদ্ধান্ত, মতবাদ, (৭) অবয়ব, অনুমানবাক্য, (৮) তর্ক, যুক্তি দিয়ে অজানা বিষয়ে সত্য খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা, (৯) নির্ণয়, সত্যের সন্ধান, (১০) বাদ, দু’তরফের শুনে সত্য সন্ধানের সৎ প্রচেষ্টা, (১১) জল্প, প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করা, (১২) বিতণ্ডা, নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা না করে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা, (১৩) হেত্বাভাস, কুতর্ক [হেতুর ছদ্ম আভাস], (১৪) চল, কথার মারপ্যাঁচ, (১৫) জাতি, নিষ্ফলতা, (১৬) নিগ্রহস্থান, পরাজয়ের বিন্দু সকল। এসব কিছু একটাই বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত, আলোচনা। পুরো আর্য্য বিশ্বে, পর্ষদ ছড়িয়ে ছিল। স্থানীয় জ্ঞানী মানুষেরা পর্ষদ গঠন করতেন। দেওয়ানি এবং ফৌজদারি, সব রকমের মামলায় তাদেরকে মীমাংসায় আসতে হত। তাদেরকে শাস্ত্রের ব্যাখ্যা করতে হত। বিভিন্ন চিন্তাপদ্ধতির মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হত। তর্কশাস্ত্র পর্ষদগুলোর জন্য বস্তুতঃ একটি পথপঞ্জি ছিল। রাজার প্রিভি কাউন্সিলকে মন্ত্রী পরিষদ বলা হত। কাজেই যখনি মানুষে মানুষে বিবাদে নিষ্পত্তি করতে হত, হয় পরিষদ বা পর্ষদ বসত এবং কিছু নিয়ম ছিল। কৌটিল্যের শেষ অধ্যায়, তন্ত্রযুক্তি, সেই নিয়মের কয়েকটির উল্লেখ করে। ন্যায়সূত্র যদি সাদাসিধে, বিশুদ্ধ তর্কশাস্ত্র হত, তাহলে সেখানে পরাজয়ের বিন্দু, নিগ্রহস্থানের কোনো জায়গা থাকত না। একটি নিয়ম আছে, যদি পরিষদ কর্তৃক তিন বার আহ্বায়িত হওয়ার পরও পক্ষ নীরব থাকে, তাহলে সে পরাজিত হয়। এটা তর্কশাস্ত্রের অংশ নয়। কিন্তু আলোচনাকে নির্দেশিত করার কাজে নিয়মটা জরুরি। এই সূত্রগুলো রচিত হওয়ার আগে অন্যান্য পথপঞ্জি ছিল। কেননা, অশোকের সপ্তদশতম বছরে পাটলিপুত্রে আয়োজিত তৃতীয় বৌদ্ধ পর্ষদে রচিত কথাবত্থুতে, বিবাদ পরিচালন করার পদ্ধতি পূর্ণতঃ ভিন্ন ছিল। সেই রচনায় – ইংরেজি নামঃ পয়েন্টস অফ ডিফারেন্স – প্রথম বিন্দু পুরো বিস্তারে দেওয়া আছে। কিন্তু বিবাদের ঐ বিস্তারিত বর্ণনায় অনুমানবাক্যের বিষয়ে একটা শব্দও নেই। বিবাদ পরিচালনের মীমাংসা পদ্ধতিও ভিন্ন ছিল –

বিষয়ো বিষয়শ্চৈব পূর্বপক্ষস্তথোত্তরঃ। নির্ণয়শ্চেতি পঞ্চাঙ্গং শাস্ত্রেSধিকরণং স্মৃতং।

জৈনদের সপ্তভঙ্গী ন্যায় এবং বৌদ্ধদের চতুষ্কোটি – সৎ, অসৎ, সদাসৎ, এবং নাসৎ-না-সৎ - আলোচনার ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি। যেমন আগে বলেছি, এই সূত্র পর্ষদগুলোর পথপঞ্জি ছিল। দর্শনের স্থান এখানে গৌণ। বস্তুতঃ প্রথম সূত্রে যে বিবৃত আছে ওই গ্রন্থে কোন কোন প্রসঙ্গে আলোচনা হবে, সেখানে আধ্যাত্মিক, বা জ্ঞানতাত্ত্বিক বা নৈতিক গুরুত্বসূচক একটিও শব্দ নেই। সেগুলোর উপস্থাপন হয়েছে প্রমেয় শীর্ষকে। কিন্তু প্রমেয়, বিচারকদের পথপ্রদর্শন সম্পর্কিত কোনো বইয়ে একান্ত জরুরি। আধ্যাত্মিক এবং অন্যান্য প্রসঙ্গগুলো যদি সরিয়ে নেওয়া হয়, তর্কশাস্ত্রের ওপর একটি বই হিসেবে এর মূল্য একটুও কমবে না। বাস্তবে আমি মনে করি, ওই সব প্রসঙ্গগুলো প্রক্ষেপ, এবং আমি এখন দেখাবার চেষ্টা করব কীভাবে ওই প্রক্ষেপগুলো রচনায় প্রবেশ করেছিল।

মূলতঃ এই রচনাটিতে কোনোরকম গোঁড়ামি ছিল না। সব শ্রেণীর মানুষেরা, সে অর্থশাস্ত্রের লেখক হোক বা কামসূত্রের, বইটা ব্যবহার করতে পারত। কিন্তু খুব ছোটো বই ছিল, প্রথম বই যাতে এখন অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি সুত্র ছিল না। ভাষ্যকারেরা বলেন যে সব দার্শনিক সূত্রের তিনটে অংশ আছে – উদ্দেশ, লক্ষণ, এবং পরীক্ষা – (সংক্ষিপ্ত বর্ণনা, পরিভাষা এবং পরীক্ষা বা সমালোচনা)। প্রসঙ্গগুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রথম সূত্রে দেওয়া হয়, পরিভাষাগুলো প্রথম অধ্যায়ে ছড়িয়ে থাকে। কিন্তু পরীক্ষা প্রণালীবদ্ধও নয়, সম্পূর্ণও নয়। যদি প্রণালীবদ্ধ হয়, তাহলে প্রত্যাশিত যে সবচেয়ে আগে প্রমাণের পরীক্ষা হবে, কিন্তু না, প্রথম পরীক্ষিত প্রসঙ্গ সংশয়। তারপরে আসে প্রমাণ, যাদের সংখ্যা চার, এবং তারপর আসে প্রমেয়। শেষ দুটো শীর্ষক, জাতি এবং নিগ্রহস্থান পুরো পঞ্চম বইটা জুড়ে জায়গা করে নেয়।

পঞ্চম অধ্যায়ে দুটো আহ্নিক আছে, একটি জাতি বা যুক্তির অসারতাগুলোর নাম গোনায় এবং দ্বিতীয়টি গোনায় নিগ্রহস্থান, পরাজয়ের বিন্দু। তবুও মনে হয় না সূত্রগুলো একজন মানুষের লেখা। কেননা প্রথম আহ্নিকে মতানুজ্ঞা জাতির একটি উপবিভাগ হিসেবে পরিগণিত হয়, আবার সেই একই মতানুজ্ঞা পরাজয়ের একটি বিন্দু হিসেবেও পরিগণিত হয়। যদি একজনই দুটোই লিখে থাকত, তাহলে একটি দার্শনিক সূত্রে দুটো, প্রকৃতিতে এত ভিন্ন বিষয়বস্তুকে এক পারিভাষিক নাম দিত না। এই সূচীগুলো মনে হয় পুরোনো সূচী, প্রজন্মের পর প্রজন্ম উত্তরাধিকারে পেয়েছে এবং তাই পরম্পরাগতভাবে পূজিত হয়ে থাকে। এগুলো ন্যায়সূত্রের প্রথম অধ্যায়ের পরিশিষ্টের মত, কেননা জাতি ও নিগ্রহস্থান পরিভাষিত করার সময়, মনে হয় লেখক প্রথম অধ্যায়েই সেটা সেরে নিয়েছেন। কেননা গ্রন্থ-১এ তিনি হেত্বাভাস এবং চল-এর সবক’টি উপবিভাগ দেন কিন্তু জাতি এবং নিগ্রহস্থানের বেলায়, অনেক আছে বলে এগিয়ে যান। তার মানে সেগুলো নিয়ে আলোচনা তিনি আগেই পুরো করেছেন। যদি বলেন যে পঞ্চম অধ্যায়ে, লেখক নিছক ‘বহু’ শব্দটার অর্থবিস্তার করছেন তাহলে অন্য একটা গুরুতর অসুবিধার সৃষ্টি হবে। প্রকরণসম শব্দটি একটি হেত্বাভাস। সেই প্রকরণসম আবার জাতিরও একটি। যে লেখক একই দার্শনিক রচনায় দুটো জিনিষের জন্য একটি পারিভাষিক শব্দ ব্যবহার করে তার প্রশংসা করা যায় না। কিন্তু সে যদি ওই একই কাজ বার বার করে তাহলে সে আরো বেশি করে প্রশংসার অযোগ্য। তাই ন্যায়সূত্রের লেখকের খ্যাতি বাঁচাতে বলা ভালো যে পঞ্চম অধ্যায়ের দুটো আহ্নিক পরিশিষ্ট যাতে পুরোনো সূচী মেশানো হয়েছে।

অন্যান্য সব দার্শনিক সূত্রে আলোচ্য প্রসঙ্গাদির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা একটাই সূত্রে দেওয়া থাকে এবং সেখানেই পুরো রচনার উদ্দেশ্য বিবৃত হয়। কিন্তু ন্যায়-এ আমরা দ্বিতীয় একটি সূত্র পাই। সেখানে, সেই সূত্রে বর্ণিত প্রসঙ্গগুলোর, তর্কশাস্ত্রের সঙ্গে বা আলোচনার বিধিনিয়মের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। সেখানের সবকটি প্রসঙ্গ খুব বেশি রকম আধ্যাত্মিক। সেগুলো হল – দৈন্য, অবস্থান্তর, লালসা, দোষ, কৃত্রিম জ্ঞান এবং মুক্তি। তর্কশাস্ত্রের জন্য জরুরি সবকটি প্রসঙ্গের পূর্ণ গণনা ও সংক্ষিপ্ত বর্ণনার পর আধ্যাত্মিক প্রকৃতির একটি দ্বিতীয় সূত্র কেন আবশ্যক হবে, সেটা একটা ধাঁধা। আর বাৎস্যায়ন সেই ধাঁধার সমাধান করতে চান এই বলে যে প্রথম সূত্রে নিঃশ্রেয়স-এর অর্থ আত্ম-মুক্তি এবং দ্বিতীয় সূত্র সেই মুক্তি প্রাপ্তির ধাপগুলো লিপিবদ্ধ করার জন্য জরুরি। এই ব্যাখ্যা সন্তোষজনক নয়। তাঁর ভাষ্যকার উদ্যোতকর নিঃশ্রেয়স শব্দটাকে শুধু পারমার্থিক জ্ঞান অর্থে নয়, আরো প্রসারিত অর্থে গ্রহণ করেন। তিনি বলেন যে মন্ত্রী, সেনাধ্যক্ষ্য, বণিক এবং এমনকি সাধারণ মানুষেরাও এই তর্ক প্রসঙ্গগুলো পড়ে নিঃশ্রেয়স অর্জন করতে অর্থাৎ, নিজেদের ক্ষেত্রে সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছোতে পারেন। কাজেই তিনি নিজেকে পারমার্থিক অভিষ্ট লাভে সীমিত রাখেন না। আমার সন্দেহ হয় যে দ্বিতীয় সূত্র কেউ একজন, যে তর্ক বা তর্কশাস্ত্রের এই গোঁড়ামিমুক্ত বইটাকে গোঁড়া বা আধ্যাত্মিক চেহারা দিতে চেয়েছিল, বাৎস্যায়নের আগেই ঐ সূত্রসমূহে ঢোকায়। এবং সেসব দিনে অনেক সম্প্রদায় ছিল যারা আধ্যাত্মিক বিষয়সমূহে নানা প্রকারের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলত। যদি বাৎস্যায়ন নিজে সূত্রটা নাও ঢুকিয়ে থাকেন, তিনি সূত্রটি সমর্থন করার এবং পুরো রচনাটির আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা করার দায় নিজের ওপর নেন। এবং বস্তুতঃ তিনি আধ্যাত্মিক দর্শনের একটি চিন্তাধারার প্রতিষ্ঠাতা হয়ে ওঠেন; বর্তমানে তা অনেকগুলো সম্প্রদায়ের জন্ম দিয়েছে।

এখানে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে ন্যায়সূত্রের দ্বিতীয় সূত্রে বৌদ্ধ পতিচ্চসমুপ্পাদ-এর প্রভাব আছে। অবিজ্জাপ্পচ্চয়াসংখারা, সংখারপ্পচ্চয়াবিঞ্যানাঞি, বিঞ্যানপ্পচ্চয়োনামরূপং, নামরূপপ্পচ্চয়া ষড়ায়তনানি, ষড়ায়তনপ্পচ্চয়া ফংসো, ফংসপ্পচ্চয়া বেদনা, বেদনাপ্পচয়া তনহা, তনহাপ্পচ্চয়োভবো, ভবপ্পচ্চয়ো জাতি, জাতিপ্পচ্চয়া জরামরণশোক-পরিদেব-দুঃখ-দোমনস্যাপায়াদি ভবন্তি।

এবার আমি বোঝাবো যে ওই একটা সূত্র প্রবিষ্ট করায় পুরো গ্রন্থটার চেহারা কীভাবে পাল্টে গেছে। ওই সূত্রের প্রসঙ্গগুলো একমাত্র প্রমেয় ছাড়া প্রথম সূত্রের কোনো প্রসঙ্গের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে না এবং একদম শেষে, প্রমেয়-র লক্ষণে অথবা বর্ণনায় সেগুলো ঢোকানো হয়েছে। নবম সূত্র দেখুন –

“আত্ম-শরীর-ইন্দ্রিয়-বুদ্ধি-মনঃ-প্রবৃত্তি-দোষ-প্রেত্য-ফল-দুখঃ-পবর্গঃ প্রমেয়ং।”

প্রথম ছয়টিকে প্রমেয় বলে প্রায় সবক’টি সম্প্রদায় স্বীকার করে। শেষের ছয়টি দ্বিতীয় সূত্র থেকে, নামে একটু অদলবদল হয়ে, এসেছে। সূত্র সংখ্যা ১৭, ১৮, ১৯, ২০, ২১ এবং ২২ ওই সূত্রে উল্লিখিত বিষয়বস্তুগুলোকে পরিভাষিত করে।

এবার এই সূত্রগুলোর পরীক্ষায় আসা যাক। সংশয়, প্রমাণ এবং প্রমেয়-র প্রথম ছয়টি বস্তুর পরীক্ষা করে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অধ্যায়। বাকি ছয়টি বস্তুর পরীক্ষা হয় চতুর্থ অধ্যায়ের প্রথম আহ্নিকে’; আহ্নিকটি শেষ হয় আধ্যাত্মিক তত্ত্বজ্ঞানে এবং মুক্তিতে। অন্য আহ্নিক তত্ত্বজ্ঞানকে উন্নত করে। কাজেই, তর্কশাস্ত্রের বা আলোচনার পথপঞ্জির সঙ্গে এই পুরো অধ্যায়টার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে যদি দ্বিতীয় সূত্র এবং তার আনুসঙ্গিকগুলো সরিয়ে দেওয়া হয়, পুরো গ্রন্থটা হবে আলোচনার নিয়মাবলী। আমার মনে হয়, তর্কশাস্ত্রের বইটিকে অধ্যাত্মতত্ত্বের বইয়ে বদলে দেওয়ার এই কর্মটির জন্য আমরা এক বৌদ্ধ জ্ঞানীর কাছে ঋণী। তত্ত্বজ্ঞান একটি পারিভাষিক শব্দ নয়, ন্যায়ের ষোলটি বিভাগের একটি নয়, তাহলে এর পরীক্ষাই বা কেন হবে আর তাও এত বিস্তারে? যেমন আগে বলেছি, গোঁড়া, সনাতনপন্থী মানুষেরা তর্কশাস্ত্রের পক্ষে বিশেষ ছিলেন না। মনু হেতুশাস্ত্র ঘৃণা করেন। হেতুশাস্ত্র তর্কশাস্ত্রেরই আরেক নাম। এই ঘৃণা এক সময় নতুন ধর্মমতাবলম্বী, বৌদ্ধ এবং অন্যান্যদের বিশেষ গুণ ছিল।

নাগার্জুন চার প্রমাণে বিশ্বাস করতেন। এই শাস্ত্রও চার প্রমাণে বিশ্বাস করে। চার প্রমাণ চারটি সূত্রে – ৪, ৫, ৬, এবং ৭এ – পরিভাষিত। তারপর ওপর-পড়া হয়ে আসে আরেকটি সূত্র – ৮। “স(শব্দঃ) দ্বিবিধঃ দৃষ্টদৃষ্টার্থত্বাত। এই সূত্রটি প্রবিষ্ট করার উদ্দেশ্য, প্রমাণ-এর পরীক্ষায় বিস্তারে দৃষ্ট হয় যেখানে বেদসমূহের প্রামাণ্যতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা আছে। কিন্তু এই বিষয়ে প্রক্ষেপক, তিনি যে-ই হোন, মীমাংসকদের বিরোধ করেন যারা ধ্বনির নিত্যতায় বিশ্বাস করে। কাজেই, প্রক্ষেপের মাধ্যমে গ্রন্থটিকে শুধু আধ্যাত্মিকই নয়, ব্রাহ্মণ্যবাদী, এবং সে অর্থে সনাতনপন্থী করে তোলা হয়েছিল।

এই বক্তৃতার শুরুতে ন্যায়সূত্রকে আমি জোড়াতালি দেওয়া কাজ বলেছিলাম। এবং এখন আমি প্রমাণ করেছি যে পঞ্চম অধ্যায়ের দুটো আহ্নিক, দুজন লিখেছে এবং তারা প্রথম অধ্যায়ের রচয়িতা থেকে ভিন্ন, আর প্রথম অধ্যায়ে অন্যুন দুটো প্রক্ষেপ দুজন লেখক দুই পৃথক উদ্দেশ্যে এনেছেন। চতুর্থ অধ্যায়েরও দ্বিতীয় আহ্নিক অদ্ভুত মনে হয়, কেননা এতে তত্ত্বজ্ঞান নিয়ে আলোচনা হয় যখন নাকি তত্ত্বজ্ঞান পারিভাষিক শব্দ নয়; আরো অদ্ভুত যে আলোচনাটা হয় তত্ত্বজ্ঞানের উন্নতি নিয়ে। আমার মনে হয়, গ্রন্থটিকে ন্যায্যভাবেই আমি জোড়াতালি বলেছি। কিন্তু যদি সূত্রসমূহ জোড়াতালি হয়, সেই জোড়াতালিকে সমজাতিক পূর্ণতায় পেশ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। তাই এবার দেখা যাক বাৎস্যায়ন কীভাবে নিজের কাজটা করেছেন।

কী করতে তিনি প্রবৃত্ত হয়েছেন সে ব্যাপারে বাৎস্যায়ন সচেতন ছিলেন। তিনি জানছিলেন যে তিনি এমন একটি গ্রন্থের পারমার্থিক গুরুত্ব দেখাতে চলেছেন যেটি ঠিক পারমার্থিক নয়। কিন্তু তাঁর কোনো দ্বিধা নেই, কোনো অর্থবৈকল্য নেই, তিনি সোজাসুজি বলেন এটি একটি পারমার্থিক বিজ্ঞান কিন্তু বিশুদ্ধ পারমার্থিক নয়। তিনি বলেন – সেয়ং আন্বীক্ষিকী প্রমাণদিভিঃ পদার্থৈর বিভজ্যমানা – প্রদীপঃ সর্ব্ববিদ্যানামুপায়ঃ সর্বকর্মণাং । আশ্রয়ঃ সর্ব্বধর্মাণাং বিদ্যোদ্দেশে প্রকীর্ত্তিতাঃ ।। তদিদং তত্ত্বজ্ঞানং নিঃশ্রেয়সাধিগমার্থং যথাবিদ্যং বেদিতভ্যং। ইহ ত্বধ্যাত্মবিদ্যায়াং আত্মাদিতত্ত্বজ্ঞানং নিঃশ্রেয়সাধিগমোপবর্গ-প্রাপ্তিঃ।

“যেমন বিদ্যোদ্দেশ শীর্ষক অধ্যায়ে বলা হয়েছে, প্রমাণ এবং অন্যান্য পারিভাষিক শব্দে বিভাজিত এই বিজ্ঞান, আন্বীক্ষিকী, সমস্ত বিজ্ঞানের প্রদীপ হয়, সব আরব্ধ কর্মের সাধন হয়, এবং সমস্ত নিয়মের আশ্রয় হয়”। (অথবা কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বিদ্যাসমুদ্দেশ)। “সুতরাং, শাস্ত্র (তোমার অধ্যয়ন) অনুযায়ী প্রকৃত জ্ঞানের উদ্দেশ্য সর্বাধিক মঙ্গল। কিন্তু এই পারমার্থিক বিজ্ঞানে প্রকৃতজ্ঞান আত্মা ইত্যাদি, এবং সর্বাধিক মঙ্গল মুক্তি।”

তিনি সাহসের সঙ্গে ঘোষণা করেন যে শাস্ত্রটির একমাত্র উদ্দেশ্য পারমার্থিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন, কিন্তু তার সঙ্গে তিনি এটাও বলেন যে অন্যান্য বিজ্ঞানের আচার্য্যেরাও এর দ্বারা লাভবান হতে পারে (প্রথম সূত্রের ভাষ্য, শেষের দিকে)। অন্য এক জায়গায় তিনি বলেন, “সন্দেহ প্রভৃতিকে পারিভাষিক শব্দ হিসেবে গ্রহণ করে ন্যায়-বিদ্যা এক নতুন পথ আবিষ্কার করেছে। যদি আলাদা করে ওই পারিভাষিক শব্দাবলী নিয়ে চর্চা না করা হত, গ্রন্থটি উপনিষদসমূহের মত নিছক পারমার্থিক বিজ্ঞান হয়ে থেকে যেত” (পৃ. ৪, জীবানন্দের সংস্করণ)। সন্দেহ এবং বাকি পারিভাষিক শব্দগুলোর স্বতন্ত্র সংক্ষিপ্ত বর্ণনা না থাকলে, – যেমনটা হওয়া উচিৎ ছিল – দ্বিতীয় পারিভাষিক শব্দ প্রমেয়-র অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকলে, এই বিজ্ঞানটা নিছক অধ্যাত্ম-বিদ্যা হত।

তত্ত্বজ্ঞান, তিনি পরিভাষিত করেন – সৎ সৎ ইতি গৃহ্যমাণং যথভূতম অবিপরীতং তত্ত্বং ভবতি। অসৎ চ অসৎ ইতি গৃহ্যমাণং যথভূতম অবিপরীতং তত্ত্বং ভবতি।

“যখন কোনো সত্তাকে সত্তা রূপে, যেমন আছে তেমন গ্রহণ করা হয়, বিরোধিতা না করা হয়, সেটা ঐ, তত্ত্ব, এবং যখন অ-সত্তাকে (অবিদ্যমানকে) অ-সত্তা রূপে, যেমন আছে তেমন গ্রহণ করা হয়, সেটাও তত্ত্ব।” কথাটা এত বেশি রকম বৌদ্ধ তথতা-র মত। দ্বিতীয় উদ্ধৃতিতেও বৌদ্ধমতের গন্ধ আছে – হেয়ং তস্য নিবর্ত্তকং হানম আত্যয়িতিকং তস্যোপায়ো ধিগন্তব্যাঃ ইত্যেতানি চত্বারি অর্থপদানি। সম্যক বুদ্ধ্বা নিঃআরেয়সমধিগচ্ছতি।

এটা কি চার মহৎ সত্যের অনুরূপ নয়? –

“যে ধর্মা হেতুপ্রভবা হেতুং তেশাং তথাগতোহ্য বদৎ ; তেসাঞ্চ যো নিরোধো এবম বাদী মহাঞশ্রমণঃ,” এবং মহাযান এবং পালি বৌদ্ধমতের ‘দুক্‌খম’, ‘দুক্‌খ-সমুদয়ো’, ;দুক্‌খ-নিরোধো’ এবং ‘দুক্‌খনিরোধগৈমিনি পটিপত’? এমনকি বাৎস্যায়নও, যিনি ন্যায়শাস্ত্রকে ব্রাহ্মণবাদী এবং সনাতনপন্থী অধ্যাত্মবিদ্যা বানিয়েছেন, বৌদ্ধমতের কাছাকাছি চলে আসেন। ন্যায়শাস্ত্র প্রমাণ-এর, সাক্ষ্যের মাধ্যমে প্রমেয়-র, বিষয়ীগত এবং বিষয়গত জ্ঞানের বিষয়বস্তুর প্রতিপাদন চায়। বৌদ্ধরা বলে তোমরা নিজেদের প্রমাণগুলো প্রতিষ্ঠা করবে কীভাবে? ন্যায়সূত্র বলে বাতির মত, তারা নিজেরাই নিজেকে আলোকিত করে। নাগার্জুন তাঁর একটি রচনায় বলেন, “না, বাতি অন্ধকারে অন্যান্যদের আলোকিত করতে পারে, নিজেকে নয়।” (উই, ভূমিকা, পৃ ৫)। এই কথা দর্শায় যে নাগার্জুনের সময় ন্যায়সূত্রের পর। কিন্তু ন্যায়সূত্র নাগার্জুনের শূন্যবাদকে আক্রমণ করে এবং তাই, মি. উই নিষ্পত্তি করেন যে সূত্র এবং নাগার্জুন অবশ্যই সমসাময়িক হবেন তাই একে অন্যের খণ্ডন করেন। নিজের দিক থেকে মি. উই ঠিক। কিন্তু আমি প্রমাণ করেছি যে পুরো সূত্র-গ্রন্থটি একজনের রচনা নয়, ন্যূনপক্ষে, ভিন্ন ভিন্ন ছয় কালখণ্ডে ছয়জনের রচনা। নাগার্জুন প্রথম দিকের কোনো রচনার খণ্ডন করতে পারেন – যেমন, যে রচনায় প্রথম অধ্যায়টা ছিল কিন্তু প্রক্ষেপগুলো ছিল না, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধ্যায়ের অধিকাংশ ছিল। কিন্তু আমার আশঙ্কা যে চতুর্থ অধ্যায় যাতে শূন্যতা এবং বাহ্যার্থভঙ্গ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, একই লেখকের রচনা নয়। সে অধ্যায়টা নাগার্জুনের পরের হতে পারে, কেননা ঐ অধ্যায়ে ঈশ্বরকারণিক-এর মত পরবর্তী তত্ত্বেরও খণ্ডন রয়েছে। যেহেতু বিভিন্ন মানুষের কাজ তাই রচনাটির সালতারিখ স্থির করা নিরর্থক। এটুকু বলা যথেষ্ট যে পুরো গ্রন্থটি খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ থেকে খ্রিষ্টাব্দ ৩০০র মধ্যে সঙ্কলিত।

আর তাই এখন আমি ভারতের দার্শনিক সাহিত্যে বাৎস্যায়নের অবদানের কথা বলতে চাইব। বিশাল পরিমাণ ভাসমান দার্শনিক জল্পনা-কল্পনা থেকে আহরিত বিভিন্নধর্মী উপাদানে গঠিত সূত্রসমূহকে তিনি সমধর্মী পূর্ণতায় বাঁধলেন এবং প্রায় ১৬০০ বছর ধরে স্থায়ী একটা চারিত্রিক বৈশিষ্ট ও সঙ্গতি দিলেন। একদিকে তিনি প্রণালীটিকে, নাগার্জুন এবং দেব-এর মত চরম ভাববাদী মহাযান বৌদ্ধদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করলেন এবং অন্য দিকে ব্রাহ্মণদের চরম সনাতনপন্থী দার্শনিক চিন্তাধারার প্রবক্তাদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করলেন। শূন্য থেকে বিশ্ব জন্ম নিয়েছে আর যা কিছু আমরা বাইরে দেখি, চিত্তে থেকে যাওয়া ছাপ ছাড়া তাদের আর কোনো বাস্তবতা নেই, ধ্বনি চিরন্তন, বেদ চিরন্তন, এবং বিশ্ব চিরন্তনও নয় ক্ষণস্থায়ীও নয় ইত্যাদি – এধরণের তত্ত্বের বিরুদ্ধে তাঁর কান্ডজ্ঞান বিদ্রোহ করল। চরমপন্থীদের মাঝে তিনি পৌরুষের সঙ্গে দাঁড়ালেন, দুহাতে দু’তরফেরই চরমপন্থীদের পথ রুদ্ধ করলেন এবং কান্ডজ্ঞানকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। তিনি বেদের সত্যতা প্রমাণিত করলেন – ধ্বনি চিরন্তন ঘোষণা করে নয়, সাধারণভাবে, কেননা দ্রষ্টা এবং কথকেরা নির্ভরযোগ্য মানুষ ছিল। ঠিক যেমন আপনারা নিজেদের চিকিৎসক আর ডাক্তারদের ওপর ভরসা করেন তেমনই ঋষিদের ওপর ভরসা করুন। তাঁরা নিয়মনীতি দেখেছেন এবং কী করনীয় আর কী অকরনীয়, সে বিষয়ে পরামর্শ ও নির্দেশ দিতে তাঁরা সর্বাধিক উপযুক্ত। কিন্তু বাৎস্যায়নের সবচেয়ে বড় অবদান ব্যক্তিগত ঈশ্বর এবং নৈতিক নিয়ন্তা হিসেবে ঈশ্বরের প্রতিষ্ঠা। সে ঈশ্বর ক্রোধী নয়, হিতৈষীও নয়, কর্ম অনুসারে সে পুরস্কার দেয় এবং করুণা সহকারে ন্যায় প্রদান করে। এটা বাৎস্যায়নের নিজের কাজ, কেননা সূত্র ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না। যদি আলাদা করে পুরস্কার-সংক্রান্ত বিভাগটা পড়া হয়, মনে হবে ন্যায়সূত্র নিরীশ্বর, অর্থাৎ ঈশ্বরহীন। কিন্তু বাৎস্যায়ন সূত্রগুলোর ব্যাখ্যা অন্যভাবে করেন। পারিভাষিক শব্দগুলোতে কোথাও ঈশ্বর নেই। কিন্তু তিনি বলেন সেখানে আত্মা আছে, এবং এই আত্মাগুলোর একটি ঈশ্বর, আটটি অপার্থিব শক্তির অধিকারী; তিনি  ন্যায়পরায়ণতায় পূর্ণ, প্রকৃত জ্ঞানে পূর্ণ এবং চিত্তের একাগ্রতায় পূর্ণ। তিনি যা কিছু চান করতে পারেন, মানুষ এবং প্রকৃতির শক্তিসমূহের নিজস্ব ক্রিয়াকলাপের আভ্যন্তরীণ গঠনপ্রণালীগুলোকে তিনি সক্রিয় করে তোলেন। তিনি জীবের পিতা, তিনি দ্রষ্টা, সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ। তিনি সমস্ত জীবের অনুধাবনের অতীত। পরবর্তী সাহিত্যে তিনি শিব এবং তাই হরিভদ্র বলেন –

“অক্ষপাদনায়ে দেবো সৃষ্টি সংহারকৃত শিবঃ

বিভুর্নিতৈকসর্বজ্ঞো নিত্যবুদ্ধিসমাশ্রয়ঃ।”

এবং নৈয়ায়িকদের জন্য বর্তমানেও শিব পূজনীয়।

অধ্যাত্মবিদ্যায় এবং ধর্মে বাৎস্যায়নের অবদান অবশ্যই মহান। কিন্তু আলোচনা বা বিচার-এর নিয়মাবলীকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারেও তাঁর অবদান কম মূল্যবান নয়। তাঁর ভাষ্যে তিনি যে কার্যধারা স্থির করে দিয়ে গেছেন তা আজও সমস্ত হিন্দু আদালতে এবং বিবাদে অনুসৃত হয়। পর্ষদের জায়গায় মধ্যস্থ বসে এবং দুদিকের কথা শোনে, তার ধার্য্য নিয়ম অনুযায়ী দুপক্ষের যুক্তির তুলনা করে এবং সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। নিয়মগুলোও সেই এক। অনুমান-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিষ হল অনুমানবাক্য নির্দ্ধারণ এবং ন্যায়-সূত্র বলে তার দুটো অঙ্গ থাকা উচিৎ। যদিও কিছু মানুষ দুটো অঙ্গের কথাটা বাদ দিয়ে তিনটে অঙ্গের কথা বলে। ফলে অনেকে ভাবে যে হিন্দুরা তাদের অনুমানবাক্য নির্ধারণের ছাঁদটা এ্যারিস্টটল থেকে নিয়েছে যিনি খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে ছিলেন। কিন্তু এই ধারণা ভুল। কেননা অনুমানবাক্যের অঙ্গ বা অংশের সংখ্যা একসময় দশ ছিল। সেটা বাৎস্যায়নই বলেন, অবয়ব সূত্রের ওপর তাঁর ভাষ্যে (I, i, ৩২)। তিনি সেগুলোর নাম ও কাজও বলেন। এটাও বলেন যে পরবর্তীতে সেগুলো অনাবশ্যক প্রতিপন্ন হল। মি. উই তাঁর মুখবন্ধের পৃ. ৮৩তে একটি নোটে বলেছেন যে ভদ্রবাহু, যিনি খ্রিষ্টপূর্ব ২৯৩এ মারা গেছেন, এক ধরণের অনুমানবাক্যের কথা বিশদে জানিয়েছিলেন যার দশটি অঙ্গ ছিল। সেই দশটি পরবর্তী সমালোচনায় কমে পাঁচটি হয়েছিল। কাজেই ভারতীয়রা তাদের অনুমানবাক্য-নির্দ্ধারণ-পদ্ধতি গ্রীকদের থেকে স্বতন্ত্র বিকশিত করেছিল। বাৎস্যায়নের তীব্র সমালোচনা করেছেন দিঙনাগ, খ্রিষ্টাব্দ পঞ্চম শতকের মাঝামাঝি, অতএব নিশ্চয়ই তিনি দিঙনাগের কিছু আগে ছিলেন পৃথিবীতে।

তাই, হিন্দুদের তর্কশাস্ত্রে, অধ্যাত্মবিদ্যায় এবং ধর্মে বাৎস্যায়নের অবদান অমুল্য।          

……………………………………

১। Bom. Sans. ; Servics Harsacarita p. 316, l. 9.
২। তথচোক্তং ষষ্টিতন্ত্রে “পুরুষাধিষ্টিতং  প্রধানং প্রবর্ততে” Comm: Gaud: Karika 17  
৩। উই, মুখবন্ধ
৪। Last page, preface, Benares Ed.


 


Thursday, October 12, 2023

মগধের সাহিত্য - ৪

 মগধের সাহিত্য

১০০ বছর আগে, ১৯২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯২১এর এপ্রিল অব্দি মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছ’টি বক্তৃতা দিয়েছিলেন এবং ১৯২৩ সালে পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় সেই বক্তৃতা ক’টি পুস্তকাকারে প্রকাশ করেছিল।

‘মগধের সাহিত্য’ শীর্ষক এই বক্তৃতামালায় বক্তৃতা সংখ্যা ১ ছিল ‘মগধের মূল অধিবাসী’, বক্তৃতা সংখ্যা ২ ছিল ‘পাটলিপুত্র – ভারতের মেধাজগতের রাজধানী’, বক্তৃতা সংখ্যা ৩ ছিল

‘কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের ঐতিহাসিক শিক্ষা’, বক্তৃতা সংখ্যা ৪ ছিল ‘বাৎস্যায়নের কামসূত্র’, বক্তৃতা সঙ্খ্যা ৫ ছিল ‘বাৎস্যায়নের ভাষ্য’ এবং বক্তৃতা সংখ্যা ৬ ছিল ‘বাণভট্ট এবং আর্য্যভট্ট’।

 

বক্তৃতা সংখ্যা ৪

বাৎস্যায়নের কামসূত্র

 

বাৎস্যায়নেরা সুদূর প্রাচীনকাল থেকে মগধে স্থায়ী বসবাস করছিলেন। তাঁরা চ্যবনের বংশধর ছিলেন এবং মগধের পবিত্রতম স্থান, শোন নদীর পাঁচ মাইল পূর্বে, চ্যবনের আশ্রমে থাকতেন। চ্যবন ভৃগুর ছেলে ছিলেন। ভৃগু ব্রহ্মার ঔরসে, পুলোমা রাক্ষসের কন্যা পৌলমীর ছেলে ছিলেন। চ্যবন শার‍্যাতের মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন এবং সে মেয়ের গর্ভে তাঁর একটি ছেলে হয়েছিল, দাধীচ। দাধীচের জন্ম শার‍্যাতের রাজধানীতে হয়েছিল এবং সেখানেই তিনি বড় হয়েছিলেন। তিনি শার‍্যাতের এত প্রিয় ছিলেন যে শার‍্যাত তাঁকে কখনও আশ্রমে বাবার কাছে যেতে দেন নি। রাজধানীতেই তাঁর শিক্ষা পূর্ণ হয়েছিল এবং তাঁকে নিজের সময়ের সবচেয়ে সিদ্ধ ঋষি গণ্য করা হত। শিক্ষা পূর্ণ হওয়ার পর রাজা তাঁকে পিতার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। উপযুক্ত সহচর, রক্ষক ইত্যাদি নিয়ে তিনি শোন বা হিরণ্যবাহ নামে পরিচিত নদীটির পশ্চিম কূলে পৌঁছোলেন। তিনি শুনতে পেলেন যে দুজন স্বর্গীয় কন্যা কাছাকাছিই কোথাও সন্ন্যাসের অভ্যাস করছেন, এবং ভাবলেন যে তাঁদেরকে সম্মান জানান তাঁর কর্তব্য। তরূণতর কন্যাটি প্রথম দেখাতেই তাঁর প্রেমে পড়ে গেলেন; যুবক ঋষিও তাঁকে ভালোবাসলেন। স্বর্গীয় কন্যারা আর কেউ নন, সরস্বতী এবং সাবিত্রী ছিলেন। প্রথমজন ব্রহ্মার রাজসভায় দুর্বাসা কর্তৃক পৃথিবীতে জীবনযাপন করতে অভিশপ্ত হয়েছিলেন এবং দ্বিতীয়জন স্নেহপরবশ হয়ে তাঁর সঙ্গ নেন। সরস্বতী যেখানে ছিলেন সেখান থেকে আশ্রমটি মাত্র পাঁচ মাইল দূরে ছিল, কাজেই প্রেমিকযুগল দিব্যি নিজেদের মত রইল। পরিণামে একটি পুত্রসন্তান হল তাঁদের। সরস্বতীর কাছে যা জ্ঞান ছিল সব তিনি পুত্রকে দিলেন। কিন্তু যেহেতু পুত্রের জন্মের সঙ্গে অভিশাপ শেষ হয়ে গিয়েছিল, সরস্বতীকে স্বর্গে ফিরতে হল। পুত্রকে তিনি নিজের স্বামীর ভ্রাতৃবধু অক্ষমালিকার কাছে রেখে গেলেন। দাধীচ সংসার ত্যাগ করেছিলেন এবং তাঁর পুত্রও বয়ঃপ্রাপ্ত হলে সে পথেই গেলেন। কিন্তু তার আগে, নিজের মায়ের কাছ থেকে পাওয়া সমস্ত জ্ঞান খুড়তুতো ভাই বৎসকে দিয়ে গেলেন। এবং বৎস থেকেই বাৎস্যায়নদের, পান্ডিত্যের জন্য পরিচিত বিশিষ্ট পরিবার শুরু হল। তাঁরা আশ্রমের সীমার ভিতরেই প্রীতিকুটে স্থায়ী হলেন।

বাণভট্ট, নিজে একজন বাৎস্যায়ন, সপ্তম খ্রিষ্টাব্দে রচিত হর্ষচরিত-এর প্রথম অধ্যায়ে নিজেদের গোত্র ও পরিবারের এই উদ্ভব কাহিনী বয়ান করেন। কাহিনীটা যে খুবই প্রাচীন সেটা দুই দিক থেকে বোঝা যায়ঃ – (১) দুজন স্বর্গীয় সত্তার স্বর্গীয় রূপে পৃথিবীতে আসা এবং এক সন্তান রেখে যাওয়ার গল্পটা পুরুরবা ও উর্বশী, শকুন্তলা এবং নহুষের রাজত্বকালে স্বর্গীয় পরীদের পৃথিবীতে আসার গল্পগুলোর অনুরূপ। আরেকটু আধুনিক কালে তারা আর স্বর্গীয় রূপে আসে না, মনুষ্যরূপে জন্ম নেয় এবং অভিশাপ শেষ হওয়া অব্দি থাকে। (২) কাহিনীটি গোত্র-এর উদ্ভব লিপিবদ্ধ করে। এর আগে অব্দি কোথাও গোত্রের স্থানীয় উদ্ভবের কোনো গল্প পাওয়া যায় নি। তাই, বাৎস্যায়ন গোত্রের স্থানীয় উদ্ভবের বর্ণনা সর্বাধিক মূল্যবান একটি তথ্য। বাৎস্যায়নরা যে চ্যবনের আশ্রমে সুদূর প্রাচীনকাল থেকে ছিল সেটা প্রমাণ করেন পাতঞ্জলি। মহাভাষ্য রচনার সময় তিনি যে সুমহান প্রাচীন নগরীটির খুব কাছে থাকতেন, তাঁর রচনা যেমন সেই পাটলিপুত্রের উল্লেখে ভরা তেমনই বাৎস্যায়নদের উল্লেখে ভরা।

এটা অদ্ভুত লাগতে পারে যে বৈদিক আর্য্যরা যে মগধকে এত বিদ্বেষের চোখে দেখত সেই মগধ চ্যবন, দাধীচ এবং বৎসের মত ঋষিদের জন্মভূমি ও নিবাস। কারণটা বোঝা কঠিন নয়। এই ঋষিরা খুব সম্ভবত সেই রূপান্তরিত ব্রাত্যদের একজন ছিলেন, বৈদিক যুগের পরবর্তী পর্বের মগধের প্রতি যাদের বিশেষ আকর্ষণ ছিল।

তর্কের খাতিরে বলা যেতে পারে যে বাৎস্যায়ন নামে দুটি গোত্র ছিল। একটির উল্লেখ আছে ভৃগু, চ্যবন, আপ্নাবত, ঔর্ব এবং জামদগ্ন্যের বংশধর বলে, বৌধায়ন রচিত মহাপ্রবরাধ্যায়-এ। অন্যটির উল্লেখ আছে কশ্যপের বংশধর বলে মৎস্য পুরাণে। কিন্তু মিস্টার পি.চেন্টসাল রাও, সি.আই.ই., নিজের গোত্রপ্রবর-এর তালিকায় বলেন যে অন্যান্য ঋষিদের অনেক বংশধর ভৃগুর পরিবারের সঙ্গে সম্বদ্ধ ছিল, কাজেই ভৃগু থেকে অবতীর্ণ বাৎস্যায়ন এবং কশ্যপ থেকে অবতীর্ণ বংশধরেরা এক ও অভিন্ন পরিবার হতে পারে।

ওই মৎস্য পুরাণেই আবার আছে যে বাৎস্যায়নেরা কৌশিতকের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। তাণ্ড্য মহাব্রাহ্মণ থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে কৌশিতকরা নিঃসন্দেহে ব্রাত্য ছিল। কথাটির সাক্ষ্য দেয় এ তথ্যও যে মহাপ্রবরাধ্যায় বাৎস্যায়নদের সেই গোত্র-তালিকাভুক্ত করে যাদেরকে কেবল-ভৃগু গণ্য করা হয়। অর্থাৎ জমদগ্নি, ভারদ্বাজ, বিশ্বামিত্র, অত্রি, গোতম, কশ্যপ, বশিষ্ঠ এবং অগস্ত্য প্রভৃতি আটজন গোত্র-প্রবর্তক-এর সঙ্গে তারা যুক্ত নয়। এঁদের মধ্যে জমদগ্নি ভৃগুর বংশধর। অন্য বংশধরেরা কেবল-ভৃগু বলে পরিচিত। অন্যান্য ব্রাহ্মণদের সঙ্গে তাদের তফাৎ যে তারা সেই গোত্রগুলো বাদে যে কোনো গোত্রে বিয়ে করতে পারে, যে গোত্রগুলোর প্রবরদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তাদের গোত্রের সঙ্গে সম্মত। যখন নাকি অন্যান্য ব্রাহ্মণেরা, যদি একজনও প্রবর ঋষি দুপক্ষেরই হয়। তাই আমার যুক্তি যে এই কেবলরা ব্রাত্য আর্য্যদের মধ্যে থেকে বৈদিক যুগের শেষভাগে বৈদিক আর্য্যদের দলে এসেছে। এ বিষয়ে আমি আমার প্রথম বক্তৃতায় অনেক কিছু বলেছি।

বাৎস্যায়নদের একেবারে প্রথম দিকের কাজ বোধহয় কামসূত্র। টীকাকার বলেন যে লেখকের ব্যক্তিগত নাম ছিল মল্লনাগ এবং তার গোত্র-নাম ছিল বাৎস্যায়ন। গ্রন্থটি অর্থশাস্ত্রের লেখক কৌটিল্যের অনুকরণ করে। এতে সাতটি অধিকরণ বা পুস্তক আছে, ৩৬টি অধ্যায় এবং ৬৪টি প্রকরণ অথবা বিষয়। শ্লোকের সংখ্যা সোয়া হাজার। কিন্তু কৌটিল্য থেকে আলাদা, এই গ্রন্থ শাস্ত্রের পরম্পরা আগে দেয়, তারপর দেয় বিষয়বস্তু। কৌটিল্য পরম্পরা দেনই না। সেগুলো তাঁর উদ্ধৃতি থেকে অনুমান করতে হয়।

কামসূত্রের পরম্পরা অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক। তাতে বলা হয় যে সৃষ্টির পর প্রজাপতি, মানবজীবনের তিনটি উদ্দেশ্যের ওপর এক লক্ষ অধ্যায় সম্বলিত একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এই তিন উদ্দেশ্য হলঃ – ধর্ম, অর্থ এবং কাম (আইন, অর্থনীতি এবং প্রেমবিদ্যা)। মনু আইন-সম্পর্কিত অংশ “আলাদা” করেছেন, এবং বৃহস্পতি অর্থনীতি-সম্পর্কিত অংশ। মহাদেবের শিষ্য নন্দী এক হাজার অধ্যায়ে প্রেমবিদ্যাকে “আলাদা” করেছেন। ঔদ্দালকি শ্বেতকেতু প্রেমবিদ্যাকে পাঁচ শ’ অধ্যায়ে সংক্ষিপ্ত রূপ প্রদান করেন। পাঞ্চাল বভ্রভ্য শ্বেতকেতুর কাজটিকে সংক্ষেপ করে সাতটি অধিকরণে অথবা পুস্তকে বিভক্ত একশ পঞ্চাশ অধ্যায়ে নামিয়ে আনেন। সে সাতটি অধিকরণ হলঃ – (১) সাধারণ (প্রারম্ভিক), (২) সাম্প্রযোগিক (মিলন), (৩) কন্যাসম্প্রযুক্তক (মেয়েদের প্রবৃত্তকরণ), (৪) ভার্যাধিকরণিক (পত্নী বিষয়ে একটি ভাগ), (৫) পারদারিক (ব্যাভিচার), (৬) বৈশিক (গণিকা বিষয়ক), (৭) ঔপনিশদিক (গুপ্তকথা)।

পরে, পাটলিপুত্রের গণিকাদের অনুরোধে দত্তক, ষষ্ঠ, ‘বৈশিক’ বিষয়ে, অর্থাৎ গণিকাদের ওপর একটি স্বতন্ত্র এবং সম্যক গবেষণাগ্রন্থ রচনা করেন। টীকাকার লেখক দত্তকের বিষয়ে নিম্নরূপ কাহিনী-পরম্পরা জানিয়ে রাখেন। মথুরা থেকে একজন ব্রাহ্মণ দেশান্তরে পাটলিপুত্রে পৌঁছেছিল। বৃদ্ধ বয়সে তার একটি পুত্র জন্ম নেয়। পুত্রটির মা প্রসূতি শয্যায় মারা যায় এবং পিতা শিশুটিকে এক ব্রাহ্মণীর হাতে দিয়ে দেয়। সে ব্রাহ্মণী শিশুটির নাম রাখে দত্তক (কেননা শিশুটি তাকে দেওয়া হয়েছিল)। ছেলেটি বড় হয়, সমস্ত শাস্ত্র এবং শিল্পকলার জ্ঞান অর্জন করে। শাস্ত্রের ব্যাখ্যায় তার অসাধারণ দক্ষতার কারণে সে দত্তকাচার্য্য নামে খ্যাত হয়। বয়ঃপ্রাপ্ত হলে সে জগতের আচারব্যবহার জানতে উদ্গ্রীব হয় এবং তার মনে হয় যে গণিকাদের কাছেই সেসব সবচেয়ে ভালোভাবে জানা যেতে পারে। তাই সে তাদের পল্লীতে প্রতিদিন যাওয়া শুরু করে এবং তাদের আচারব্যবহার শেখে। এত গভীরভাবে সে শেখে যে শেষে গণিকারাই তার কাছে প্রেমবিষয়ে পরামর্শ নিতে আসতে শুরু করে। তখন বীরসেনা এবং পাটলিপুত্রের অন্যান্য বিশিষ্ট বারাঙ্গনারা তাকে, প্রেমিকদের হৃদয় জয় করার শিল্প নিয়ে একটি গবেষণাগ্রন্থ লিখতে অনুরোধ করে।

দত্তকের উদাহরণটা মানুষের মনে ধরে। বিদ্বান মানুষেরা প্রেমবিদ্যার অন্য ছয়টি বিষয়ে নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগাতে চাইছিল না। তাই চারায়ণ প্রারম্ভিক বিষয়ের ওপর, সুবর্ণনাভ মিলনের ওপর, ঘোটকমুখ কন্যাদের ওপর, গোনার্দীয় পত্নীদের ওপর, গনিকপুত্র ব্যাভিচারের ওপর এবং কুচুমার বিজ্ঞানটির গুপ্তকথার ওপর গ্রন্থ রচনা করে। এভাবে অনেক লেখক প্রেমবিদ্যার বিভিন্ন বিষয়ের ওপর স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করে। সেগুলো যোগাড় করা এবং পড়া কঠিন। অন্যদিকে বাভ্রব্যর কাজটা এত ব্যাপক যে পড়ে আয়ত্ত করা কঠিন। তাই বাৎস্যায়ন বাভ্রব্যের গ্রন্থটিকে সংক্ষিপ্ত করলেন। এভাবেই বর্তমান কাজটি অস্তিত্বে এল।

মহাভাষ্যের রচনাকার পতঞ্জলি গনিকার পুত্র ছিলেন এবং তাঁর জন্ম গোনার্দায় হয়েছিল। কিন্তু তাঁকে ভার্যাধিকরণিক এবং পারদারিক অংশের লেখকের সাথে এক করা যায় না কেননা, স্পষ্টত তাঁরা দুজন ভিন্ন ব্যক্তি ছিলেন। ঘোটকমুখের উল্লেখ শুধু কামসূত্রে নেই, অর্থশাস্ত্রেও আছে। সে দুজন এক ব্যক্তি মনে হয় না। কেননা ঘোটমুখ ব্যক্তি-নাম নয়, গোত্র-নাম। একই ব্যাপার চারায়ণ নিয়েও, সেটিও গোত্র-নাম।

প্রমাণ করার চেষ্টা হয়েছে যে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের, বাৎস্যায়নের কামসূত্রের এবং পালি সাহিত্যের চারায়ণ এবং ঘোটকমুখ অভিন্ন। কিন্তু সেটা অসম্ভব মনে হয়। কেননা দত্তকের পিতা মথুরা থেকে পাটলিপুত্রে এসেছিলেন। তিনি এবং তাঁর পুত্র দত্তক কৌটিল্যের সমসাময়িক হবেন। কেননা, উদয়ীর চতুর্থ বর্ষে পাটলিপুত্র রাজধানী হয়েছিল, এবং যে ব্রাহ্মণে সেখানে এসেছিল তার আকর্ষণের কারণই ছিল যে পাটলিপুত্র এক বড় রাজতন্ত্রের রাজধানী। রাজগৃহ থেকে রাজধানী পাটলিপুত্রে অপসারিত হয়েছে ৪৪০ খ্রিষ্টপূর্বে এবং কৌটিল্য সেখানে ৩২৫ খ্রিষ্টপূর্বে ছিলেন ধরে নিলে ব্রাহ্মণ এবং তাঁর ছেলে দত্তক, কৌটিল্যের বেশি বয়সে সমসাময়িক হয়ে হবেন। দীঘ-চারায়ণ এবং ঘোটমুখ দত্তকের পর প্রেমবিদ্যা বিষয়ে লেখেন। কাজেই কৌটিল্য তাদের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারেন না। তাই কৌটিল্য উদ্ধৃত আর বাৎস্যায়ন উদ্ধৃত চারায়ণ এবং ঘোটমুখ এক ও অভিন্ন হতে পারেন না। কৌটিল্য যাঁদের উদ্ধৃত করেন তাঁরা গল্প-বলিয়ে ছিলেন। পালি সাহিত্যে যাঁরা আছেন তাঁরা ধার্মিক মানুষ এবং রাজনীতিবিদ। বাৎস্যায়ন যাঁদের উদ্ধৃত করেন তাঁরা প্রেমবিদ্যার লেখক। এদেরকে এক ও অভিন্ন দেখান ধৃষ্টতা হবে। রাজশেখর তাঁর কাব্য-মীমাংসা-য় কাব্যতত্ত্বের লেখক হিসেবে একজন সুবর্ণনাভ-এর উল্লেখ করেন। তাঁকে আমাদের সুবর্ণনাভ-এর সঙ্গে এক করা দুঃসাহসিক হবে কেননা কাব্যতত্ত্ব অনেক পরের বিজ্ঞান।

বৈদিক সাহিত্যে শ্বেতকেতু বেশ পরিচিত চরিত্র। তিনি প্রবহন জৈবল এবং বিদেহের জনকের সমসাময়িক। তিনি বৈদিক যুগের শেষ দিকের। কিন্তু তিনি সেই ঋষি হিসেবে বেশি পরিচিত যিনি বিবাহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং সম্ভবত প্রেমবিদ্যার ওপর বিস্তারিত গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তাঁর কিছু ভাবনা খুব আদিম এবং স্থুল। কিন্তু অনুমান হয় যে তিনি ঐতিহাসিক ব্যক্তি ছিলেন এবং আমাদের ভাবতে কোনো বাধা নেই যে তিনিই এই বিজ্ঞানের আদি প্রতিপাদক ছিলেন, কেননা তিনিই বিবাহ প্রণালীর সংস্থাপক ছিলেন।

দ্বিতীয় লেখক হলেন পাঞ্চাল বাভ্রব্য। তাঁর বই বাৎস্যায়ন পড়েছিলেন। কেননা বাৎস্যায়ন স্পষ্টভাবে লেখেনঃ –

বাভ্রব্যীয়াংশ্চ সূত্রার্থান আগম্য বিমৃষ্য চ

বাৎস্যায়নশ্চকারেদং কামসূত্রং যথাবিধি ।।

অর্থাৎ বাৎস্যায়ন তাঁর গুরুর সঙ্গে বাভ্রব্যের বইটি অধ্যয়ন করেছিলেন। জয়সওয়াল সাহেব ভাবেন যে যত্ন নিয়ে খোঁজ করলে সে বই পাওয়া যেতে পারে, কেননা পঞ্চশায়ক-এর মত এত এদিককার কাজে বইটি থেকে উদ্ধৃতি নেওয়া হয়েছে। ঔদ্দালকির কাজে ৫০০ অধ্যায়ের বিন্যাস জানা যায় না। এ কাজ সাতটি অধিকরণে বিভাজিত ছিল না। কেননা সেই বিভাজন করার কৃতিত্ব বাৎস্যায়ন বাভ্রব্য পাঞ্চালকে দিয়েছেন। খুব সম্ভবত ঔদ্দালকি অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় মিলন অথবা সম্প্রযোগের ওপর বেশি লিখেছেন। তিনি সে বিষয়কে দশটি প্রধান শীর্ষকে ভাগ করেছিলেন। তাই তাঁর কাজকে দশাতয়ী বলা হয়। বিবাহ প্রণালীর প্রবর্তনের সময় এটাই স্বাভাবিক তিনি সতী স্ত্রী, বালিকাবধু এবং গণিকাদের কর্তব্য বিষয়ে, এবং ব্যভিচার বিষয়ে কিছু লেখা থেকে বিরত থাকবেন, কেননা তাঁর সময়ে বা তার আগে বিবাহ বলে কিছু ছিল না। বস্তুতঃ সেই সমাজে যেখানে বিবাহকে একটি প্রাচীন এবং পবিত্র সংস্থা গণ্য করা হয়, সাত অধিকরণ সম্বলিত বাভ্রব্যের গ্রন্থ সম্ভব। বাভ্রব্য মিলনের দশটি প্রধান শীর্ষককে চৌষট্টি অংশে বা কলায় ভাগ করেন। প্রত্যেকটি শীর্ষককে আটভাগেই ভাগ করেছেন এমন নয়, কিন্তু উপ-বিভক্তির মোট সংখ্যা চৌষট্টি।

ঋগ্বেদ প্রথমত দশটি মণ্ডলে বিভক্ত ছিল। তাই তাকে দশাতয়ী বলা হত। কিন্তু পাঞ্চাল দেশে অষ্টকে বিভক্ত করা হয় এবং প্রতিটি অষ্টককে আটটি অধ্যায়ে বিভক্ত করা হয়। তাই বলা হতে লাগল চতুঃষষ্টি। শুধু মিলন সম্বলিত পুরো কামশাস্ত্রও, প্রথমে দশ ভাগে বিভক্ত ছিল। বাভ্রব্য পাঞ্চাল তাকে চৌষট্টি প্রকরণে অথবা বিষয়ে কমিয়ে আনেন। মিলন বিষয়টিকেও, যেটি দ্বিতীয় অধিকরণে বিবেচিত, তিনি আটটি আটটি অনুচ্ছেদে এবং চৌষট্টিটি উপচ্ছেদে কমিয়ে আনেন। তাই বাহবৃচ অথবা ঋগ্বেদী ব্রাহ্মণেরা খেলাচ্ছলে এবং শয়তানি করে কামশাস্ত্রকে বলত ‘চৌষট্টি’। বাৎস্যায়ন বলেন, কামশাস্ত্র বোঝাতে চৌষট্টি শব্দটির ব্যবহার উপযুক্ত, কেননা ঋগ্বেদের মত এটিরও দশ এবং চৌষট্টি, দুধরণের ভাগই আছে। এবং দুই ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের রচয়িতা ছিলেন একজন পাঞ্চাল – ‘পাঞ্চাল-সম্বন্ধাচ্চ’ ।

এ কথাটা আরো সংশোধিত করে টীকাকার বলেন, “পাঞ্চালেন মহর্ষিণা ঋগ্বেদে চতুঃষষ্টির-নিগদিতা বাভ্রব্যেনাপি পাঞ্চালেন স্বকৃতে সাম্প্রযোগিকে অধিকরণে আলিঙ্গনাদয় উক্তাঃ, ততশ্চ দ্বয়োরেকগোত্রনিমিত্তসমাখ্যেন পাঞ্চালেন নিগদনাত সম্বন্ধোSস্তেব”।

পাঞ্চাল শব্দটা দেশ নয়, গোত্র বোঝাতে ব্যবহৃত মনে হয়। এবং কশ্যপের বংশধরদের মধ্যে একটি পাঞ্চাল গোত্র আছে। হতে পারে গোত্র-নামটি তার মূল নিবাস পাঞ্চাল দেশের নাম থেকেই আহরিত, কিন্তু এমন কোনো নিশ্চিত লক্ষণ নেই যে রচনাগুলোর পুনর্বিন্যাস পাঞ্চাল দেশে হয়েছিল। অবশ্য এই তথ্যগুলোর বিরাট গুরুত্ব যে পাঞ্চাল গোত্রের ঋষি ঋগ্বেদকে পুনর্বিন্যস্ত করেছিলেন, গোত্রটি পরবর্তী বৈদিক যুগের ছিল এবং পাঞ্চাল দেশের সাথে গোত্রটির একটি সম্পর্ক ছিল। এখনো অব্দি মণ্ডল থেকে অষ্টকে ঋগ্বেদের পুনর্বিন্যাসকর্তা সম্পর্কে সন্দেহাতীত ভাবে কিছু জানা ছিল না। পাঞ্চাল যে দেশ নয় গোত্র সেটা ওপরে উদ্ধৃত টীকায় স্পষ্টভাবে বলা আছে। কাজেই বাভ্রব্য এখানে নিছক বংশনাম, গোত্র নয়, যদিও বিশ্বামিত্রের বংশধরদের মধ্যে বাভ্রব্য গোত্র তালিকাভুক্ত আছে।

শাস্ত্রের শ্রেণীভুক্তকরণ

কৌটিল্য সব বিজ্ঞানকে চার শিরোনামে শ্রেণীভুক্ত করেন – আন্বীক্ষিকী, ত্রয়ী, বার্তা এবং[bp1]  দণ্ডনীতি অর্থাৎ দর্শন, ধর্ম, অর্থনীতি এবং রাজনীতি। কিন্তু তিনি শুধু রাজবিদ্যা বা রাজকীয় বিদ্যাভ্যাস নিয়ে চিন্তিত। বস্তুতঃ ওই শ্রেণীভুক্তকরণ তাঁর সময়ে জ্ঞাত সবকটি বিজ্ঞানের নয়। বাৎস্যায়ন অধিক সুব্যক্ত এবং সামগ্রিক। তিনি সমস্ত মানব-বিদ্যাভ্যাসকে ত্রিবর্গে শ্রেণীভুক্ত করেন – ধর্ম, অর্থ এবং কাম। নিজের একটি সূত্রে তিনি মোক্ষ-এর উল্লেখ করেন, কিন্তু তারপর সেটা তিনি একেবারেই বাদ দেন। তিনি বলেন যে ধর্ম হয় শ্রুতি (স্মৃতি অন্তর্ভুক্ত) থেকে শিখতে হবে নয় বিদ্বানদের কাছে। অর্থ অথবা অর্থনীতি রাজকীয় আধিকারিকদের আচরণ থেকে অথবা বিশেষজ্ঞদের কাছে শিখতে হবে। কাম-এর পরিভাষা সাধারণভাবে তিনি করেন সবকটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর উপভোগ। কিন্তু তারপর তাকে তিনি প্রচলিত অর্থে সীমিত করেন। এটি কামসূত্র থেকে অথবা নাগরকদের কাছে শিখতে হবে। বাৎস্যায়ন বলেন, অর্থ কামের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং ধর্ম অর্থের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

শাস্ত্রের, কৌটিল্য এবং বাৎস্যায়ন কৃত বর্গীকরণের তুলনা করলে দেখা যায় যে ধর্ম ত্রয়ীর চেয়ে বেশি সামগ্রিক শব্দ এবং আন্বীক্ষিকীকেও অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। অর্থ বার্তার চেয়ে বেশি সামগ্রিক। কামশাস্ত্রকে কৌটিল্য অন্তর্ভুক্তই করেন নি, সাধারণ অর্থেও নয়, সীমিত অর্থেও নয়। তাই বাৎস্যায়ন কৌটিল্য থেকে বেশি উন্নত চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করেন। বাৎস্যায়নের সময় সেসব মানুষেরাও ছিল যারা এই বিদ্যাভ্যাসের উপযোগিতায় বিশ্বাস করত না এবং তাই কঠোরভাবে বিরোধ করত। বাৎস্যায়ন তাদের যুক্তিগুলোর দাবি মেটাতে অনেক চেষ্টা করেন। ধর্ম অধ্যয়নের ব্যাপারে তাঁর মুখ্য বিরোধী ছিল লোকায়তিকেরা। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র একটি দার্শনিক চিন্তাধারা হিসেবে তাদের উল্লেখ করে। পতঞ্জলি বলেন তাদের প্রধান লেখকদের একজন ছিলেন ভাগুরি। কিন্তু বাৎস্যায়ন তাদের দর্শন থেকে একটি সূত্র উদ্ধৃত করেন –

(১) বরং সাংশয়িকাত নীষ্কাত অসাংচায়িকঃ কার্ষাপণঃ ।

এটিই তাদের মূল সূত্রাদি থেকে পাওয়া প্রথম সন্দেহাতীত উদ্ধৃতি। কিন্তু আমি মনে করি যে কামশাস্ত্রের, ধর্ম-অধ্যয়নের উপযোগিতার বিরোধকারী, পাঁচ সূত্র সম্বলিত একটি পুরো পরিচ্ছেদ লোকায়তিকদের সূত্রগুলোর বিরুদ্ধে উদ্দিষ্ট। সেগুলো হলঃ –

(১) ন ধর্মাংশ্চরেত – এষ্যাতফলত্বাত সাংশায়িকত্বাত চ । (২) কোব্যবালিসো হস্তগতম পরাগতং কুর্‍্য্যাত । (৩) বরমদ্য কপোতঃ শ্বো ময়ূরাত ।

এ প্রসঙ্গে বলা যায় যে বর্তমানে চার্বাক অথবা লোকায়তিক চিন্তাধারার তত্ত্ব সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান দুটো উদ্ধৃতিতে সীমিত। একটি নৈষধ-চরিতংএর সপ্তদশ সর্গ থেকে আর অন্যটি সর্বদর্শনসংগ্রহ-এর প্রথম অধ্যায় থেকে। দুটোই পদ্যে, গদ্যে বা সূত্র রূপে নয়। এক জায়গায় সূত্রকারের নাম বৃহস্পতি দেওয়া আছেঃ –

অগ্নিহোত্রং ত্রয়ো বেদাঃ ত্রিদণ্ডং ভস্মপুণ্ড্রকং প্রজ্ঞাপৌরুষহীনানাম জিবিকেতি বৃহস্পতিঃ ।

এক জায়গায় চতুর্থ পাদে আছে ‘জিবিকা ধাতৃনির্মিতা’।

তাদের সূত্রের আরেকটি উল্লেখ পাওয়া গেছে হরিভদ্রের সদ্দর্শন-সমুচ্চয়-এ, যিনি ৫৮৫ সম্বতে মারা গিয়েছিলেন। সেখানে লেখক অনেকগুলো কারিকা লোকায়ত তত্ত্বসমূহ স্পষ্ট করতে নিয়োজিত করেন। টীকাকার গুণরত্ন বাচস্পতি (বৃহস্পতিরই অন্য নাম) থেকে একটি পদ্য উদ্ধৃত করেনঃ –

পৃথিব্যাপ্তেজোবায়ুরিতি তত্ত্বানি তত সমুদায়ে। ষরীরেন্দ্রিয়সংজ্ঞা তেভ্যশ্চৈতন্যং।

(সদ্দর্শন-সমুচ্চয়, পৃ. ৩০৭, বিব্লিওথেকা ইন্ডিকা সম্পাদিত)

এটি সম্পূর্ণভাবে মিলে যায় ‘ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য বৈশেষিক ফিলজফি’তে ইউয়াই সাহেব কর্তৃক উদ্ধৃত অজিতকেশকম্বলের মতের সঙ্গে (পৃ. ১৯-২০)। বইয়ের সেই অংশটাই পুরো এখানে উদ্ধৃত করছি। “অজিতকেশকম্বল যুক্তি রাখেন যে মানবশরীর চারটি উপাদানে তৈরি (চতুর্মহাভূতিক)। যখন সে মরে তার ভিতরের পৃথিবী পৃথিবীতে ফিরে যায়, তরলগুলো জলে ফিরে যায়, তাপ আগুনে, বায়ু বাতাসে এবং তার মৌলিক মানসিক শক্তিগুলো (ইন্দ্রিয়ানি, পাঁচটি অনুভূতি এবং ষষ্ঠ, চিত্ত) দেশে (আকাশ) ফিরে যায়।” এর ওপর ইউয়াই সাহেব মন্তব্য করেন, “এ অভিমত বাস্তবিক এবং সহজাত বস্তুবাদ। আত্মা নেই, কোনো অন্য মানসিক কারক নেই শুধু পাঁচ প্রকারের পদার্থ। শরীর পাঁচটি উপাদানের সমষ্টি এবং আত্মা শরীর ছাড়া আর কিছুই নয়। অজিতকেশকম্বল সম্ভবত একজন চার্বাক।”

কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে বলেন যে বৃহস্পতি এবং তাঁর অনুগামীরা বলত রাজকীয় বিদ্যাভ্যাস অর্থনীতি এবং রাজনীতিতে সীমিত থাকা উচিৎ, দর্শন এবং বেদ পুরোপুরি বাদ দেওয়া উচিৎ। একটি ভারতীয় পরম্পরা আছে যে বৃহস্পতি একজন নাস্তিক ছিলেন, এবং চার্বাক চিন্তাধারার বৃহস্পতি সূত্রের সন্ধান করতে আমাকে বহুবার বলা হয়েছে। এখানে উদ্ধৃত সূত্রগুলো কি বৃহস্পতিরই রচনার অংশ হতে পারে না?

লোকায়তিকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত দুটো আরো চিন্তাধারা থেকে উদ্ধৃতি দেন বাৎস্যায়ন। তাদেরকে বলা হয় কালকারণিক এবং অর্থচিন্তক। টীকাকার আরেকটি চিন্তাধারার কথা বলেন, ঈশ্বরকারণিক। অর্থচিন্তক চিন্তাধারা থেকে তিনটে সূত্র উদ্ধৃত আছে। সেগুলো হল –

বহবাশ্চ কামবশগাঃ সগণা এব বিনষ্টাঃ শ্রুয়ন্তে। তথা দাণ্ডক্যো নাম ভোজঃ কামাত ব্রাহ্মণ-কন্যাং অভিমন্যমানাঃ সবন্ধুরাষ্ট্রো বিননাশ। দেবরাজশ্চাহল্যামতিবলশ্চ কীচকো দ্রৌপদীং রাবণশ্চ সীতাং অপারে চান্যে চ বহবো দৃশ্যন্তে কামবশাগা বিনষ্টা ইত্যর্থচিন্তকাঃ।

এই তিনটের মধ্যে দ্বিতীয় সূত্রটি কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে শব্দে শব্দে এবং অক্ষরে অক্ষরে বসান পাওয়া যায়। অন্য দুটো সূত্রও সম্ভবত অর্থচিন্তকদের কাছ থেকে এসেছে। কৌটিল্যে আরো অনেক উদাহরণ রয়েছে, কেননা তাঁর পুরো ছয় ছয়টা ভিন্ন আবেগার্তির কুপরিণতি দেখাবার ছিল। যখন নাকি বর্তমান লেখকের শুধু কামলালসার পরিণাম দেখাবার আছে।

বাৎস্যায়নের সময়

বাৎস্যায়নের সময় নির্ধারণ সেই রচয়িতাদের বয়স দিয়ে হতে পারে যাদের তিনি উদ্ধৃত করেন এবং সেই রচয়িতাদের বয়স দিয়ে হতে পারে যারা তাঁকে উদ্ধৃত করে অথবা তাঁর বইয়ে লিপিভুক্ত ঘটনাবলীর বয়স দিয়ে হতে পারে। ঔদ্দালকি, বাভ্রব্য-পাঞ্চাল, দত্তক, চারায়ণ, ঘোটমুখ, সুবর্ণনাভ, কুচুমার, গোনার্দীয় গনিকাপুত্র প্রভৃতি রচয়িতাকে তিনি উদ্ধৃত করেন। কিন্তু এই রচয়িতাদের সঠিক সালতারিখ আমরা জানিনা তাই বাৎস্যায়নের সালতারিখের কোনো সন্ধানসূত্র এরা দিতে পারবে না। একটাই ব্যাপার নিশ্চিত জানা আছে যে দত্তক পাটলিপুত্রের বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর যুগের উচ্চসীমায় তিনি কৌটিল্যের সমসাময়িক হতে পারেন। কিন্তু তাঁর যুগের নিম্নসীমা জানা যায় না। বাৎস্যায়ন একটি ঘটনার উল্লেখ করেন, কুন্তল সাতকর্ণী সাতবাহনের প্রাসাদের একটি মর্মান্তিক কেলেঙ্কারির কথা। তিনি অন্ধ্র রাজবংশের ত্রয়োদশ রাজা ছিলেন এবং তাঁকে খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকে রাখা যায়। এবং বাৎস্যায়ন সেই সময়টায় উন্নতি লাভ করেন যখন সেই কেলেঙ্কারির স্মৃতি টাটকা ছিল। কাজেই তাঁকে প্রথম খ্রিষ্টাব্দে রাখা যেতে পারে। কেননা জনতার স্মৃতি খুব ছোট এবং এক বা দুই প্রজন্মে মানুষ এসব কেলেঙ্কারি ভুলে যায়। কামসূত্রে অন্যান্য ঘটনাও লিপিবদ্ধ করা আছে। নরদেব, যাকে টীকাকার পাণ্ড্য রাজাদের সেনাপতি বলেন, এক নর্ত্তকীকে হত্যা করেছিল এবং চোলরাজ চিত্রসেনা নামে এক গণিকাকে হত্যা করেছিল। কিন্তু পাণ্ড্য এবং চোল রাজাদের নাম দেওয়া নেই এবং তাদের কালপঞ্জি জানার ব্যাপারে আমরা অগাধ সমুদ্রে। বাৎস্যায়ন আভীর কোট্টরাজের কথা বলেন যাকে এক ধোপা খুন করেছিল। সে ধোপাকে কাজে রেখেছিল রাজার ভাই। খুনটা হয়েছিল যখন রাজা নিজের ভালোবাসার জনকে খুঁজতে অন্য এক মানুষের বাড়িতে ঢুকেছিল। কোট্ট যে গুজরাটের একটি জায়গা, এটুকু তথ্য দিয়ে টীকাকার আমাদের আলোকিত করেছেন। কিন্তু আমরা কোট্টর বিষয়ে কিছুই জানি না, এবং গুজরাট অনেক পরের একটি নাম, বাৎস্যায়নের মত পুরোনো নয়। গুর্জরদের আগমনের পর সে দেশটির নাম গুজরাট হয়েছিল। টীকাকার আমাদের এটাও বলেন যে আভীর এক রাজার নাম, জনগোষ্ঠির নয়। বাৎস্যায়ন আরো বলেন যে কাশীর রাজা জয়তসেনাকে তার অশ্বপাল হত্যা করেছিল। সেটাও আমাদের লেখকের সালতারিখের সন্ধানসূত্র দিতে কোনো সাহায্য করে না। ভারতীয় ইতিহাসের এখন অব্দি জ্ঞাত যৎসামান্য তথ্যাদি থেকে আমি বাৎস্যায়নের সালতারিখ আন্দাজ করার দুঃসাহস করব না। এটুকু জোর দিয়ে বলতে পারি যে তিনি কুন্তল সাতকর্ণীর দুই বা তিন প্রজন্ম পরে এসেছিলেন।

বাৎস্যায়নের সময় নির্দ্ধারণ করার আরেকটি পথ আছে। তাঁর উল্লেখ করা সবকটি দেশের নাম নিয়ে দেখুন যে কোন শতকে তারা সামাজিক একক রূপে অস্তিত্বে ছিল। কেননা রাজনৈতিক একক নিয়ে লেখকের কোনো কারবার নেই। তাঁর কাছে কুন্তল সাতকর্ণী, নরদেব, পাণ্ড্য সেনাপতি, চোল রাজা সব এক স্তরের। তাঁর উল্লিখিত জনগোষ্ঠি এবং জনগোষ্ঠিগত দেশ হল অন্ধ্র, বৎসগুল্মক, বৈদর্ভ, অপরান্তক, সৌরাষ্ট্রিক, অভীরক, স্ত্রৈরাজ্যক, গৌড়, সৈন্ধব, হৈমবত, প্রাচ্য, বঙ্গ, অঙ্গ, কলিঙ্গ, নাগরক, মধ্যদেশক, বালহীক, অবন্তিক, মালব, অভীর, ছয় নদী পরিবেষ্টিত ভূমি (যাতে ষষ্ঠ নদী সিন্ধু), লাট, কোশল, সাকেত, অহিচ্ছত্র, সৌরসেন মহারাষ্ট্র, দ্রবিড়, বানবাসিক এবং চোল। টীকাকার এই দেশগুলো অথবা এই জনগোষ্ঠিগুলোর বসতির কিছু নিখুঁত নির্দেশিকা দেন। যেমন তিনি বলেন –

প্রাচ্যা অঙ্গাৎ পূর্বেণ (বম্বে সংস্করণ পৃ. ১৭১)। সাকেতা অযোধ্যকাঃ (ঐ পৃ. ১৭২)। নগরকাঃ পাটলিপুত্রকাঃ (পৃ. ১৭২)। শৌরসেনাঃ কৌশাম্ব্যঃ, কালিন্দ্যঃ দক্ষিণতঃ কুলে যে নিবসন্তি (ঐ পৃ. ১৭২)। স্ত্রীরাজ্যাস-ত্রিপুরী তত্র ভবানাম (ঐ পৃ. ৩২২)। গৌড়াঃ কামরূপকাঃ প্রাচ্যবিশেষাঃ (ঐ পৃ. ৩০২)। সৈন্ধবানাং সিন্ধুনামা নদস্তস্য পশ্চিমেন সিন্ধুদেষস-তত্র ভবানাং (ঐ পৃ. ৩০২)। হৈমবতানাং হিমবদ-দ্রোনী-ভবানাং (ঐ পৃ. ৩০২)। অঙ্গাঃ রোমরাহিত্যাৎ (?) পূর্বেণ অঙ্গাঃ (ঐ পৃ. ৩০২)। কলিঙ্গাঃ মহানন্দ্যাঃ পূর্বেণ কলিঙ্গাঃ (ঐ পৃ. ৩০২)। বঙ্গাঃ গৌড়বিষয়াদ্‌ দক্ষিণেন বঙ্গাঃ (ঐ পৃ. ৩০২)।

অঙ্গ, বঙ্গ আর কলিঙ্গের বর্ণনা দেওয়া অংশটা অপ্রতিকার্যরূপে বিকৃত। বেনারস সংস্করণ অনুসারে –

বঙ্গাঃ লৌহিত্যাৎ পূর্বেণ, অঙ্গাঃ মহানন্দ্যাঃ পূর্বেণ, কলিঙ্গাঃ গৌড়বিষয়াদ্দক্ষিণেন (পৃ. ২৯৫ বেনারস সংস্করণ)

আমি মনে করি না বেনারস সংস্করণ অবস্থাটা বিশেষ কিছু শোধরায়।

বৎসগুল্মকাঃ দক্ষিণাপথে সদরয়্যৌ রাজপুত্রৌ বৎসগুল্মৌ তাভ্যামধ্যবাসিতো দেশো বৎসগুল্মক ইতি প্রতীতঃ (পৃ. ২৯৫ বম্বে সংস্করণ)। বৈদর্ভাঃ কালাঞ্জরাদ্দক্ষিণেন বিদর্ভো নাম দেশস-তত্র ভবানাং (পৃ. ২৮৮ বেনারস সংস্করণ)। পশ্চিমসমুদ্র-সমীপে অপরান্তদেশঃ (পৃ. ১৩০ বম্বে সংস্করণ)। লাটঃ অপর-মালবাৎপশ্চিমেন লাটবিষয়ঃ (পৃ. ১৩০ ঐ)। বজ্রবান্তদেশাৎ পশ্চিমেন স্ত্রীরাজ্যং (পৃ. ১৩০ ঐ)। বেনারস সংস্করণে বজ্রবন্ত-র বদলে বঙ্গরক্ত লেখা আছে (পৃ. ১২৬ বেনারস সংস্করণ)। অন্ধ্র ইতি নর্মদায়া দক্ষিণেন দেশো দক্ষিণাপথঃ তত্র কর্ণাট-বিষয়াৎ পূর্বেণ অন্ধ্র বিষয়ঃ (পৃ. ১৩০ বম্বে সংস্করণ)। মহারাষ্ট্রকা ইতি নর্মদা কর্ণাটবিষয়য়োর্মধ্যে মহারাষ্ট্রবিষয়ঃ (পৃ. ১৩১ ঐ)। নাগরিকা ইতি পাটলিপুত্রকাঃ (পৃ. ১৩১ ঐ)। দ্রবিড় ইতি কর্ণাটিবিষয়াদ্দক্ষিণেন দ্রবিড়বিষয়ঃ (পৃ. ১৩১ ঐ)। বনবাসঃ কুঙ্কনবিষয়াৎ পূর্বেণ বনবাসবিষয়ঃ (পৃ. ১৩১ ঐ)। আভীরদেশঃ শ্রীকন্ঠ-কুরুক্ষেত্রাদিভূমিঃ (পৃ. ১৩০ ঐ)। মালব্যা ইতি পূর্বেণ মালবভবাঃ। আবন্তিকাঃ উজ্জয়িনীদেশভবাঃ তা এব অপর-মালব্যাঃ।

এর মধ্যে অধিকাংশ দেশ ব্রাহ্মণ, সূত্র, কৌটিল্যর অর্থশাস্ত্র, মহাভারতের মত প্রাচীন রচনায় এবং অশোকের শিলালিপিতে পরিচিত। বনবাসী বেশ আধুনিক মনে হয়। মৈসুরের শিমোগা জেলার প্রাচীন নাম ছিল জয়ন্তী বা বৈজয়ন্তী। ত্রিনেত্ররা রাজসিংহাসনে আরূঢ় হওয়ার এক বা দু শতক আগে জায়গাটা বনবাসী নামে পরিচিত হল। চার বা পাঁচ প্রজন্ম পরে ত্রিনেত্রদের অপসারিত করল কদম্বরা, যারা ব্রাহ্মণ থেকে ক্ষত্রিয় হয়েছিল এবং যারা, অনুমান হয়, খ্রিষ্টাব্দ তৃতীয় শতকের শুরুতে ক্ষমতায় এসেছিল। রাজবংশের পঞ্চম রাজা, কাকুৎস্থবর্মা ঘোষণা করে যে সে দক্ষিণের গুপ্তদের বন্ধু। “মাইসোর অ্যান্ড কুর্গ ফ্রম ইনস্ক্রিপশন্স” বইটিতে লেখক লিউইস রাইস ভাবেন যে কাকুৎস্থবর্মা কর্তৃক উল্লিখিত গুপ্ত রাজা আর কেউ নন, সমুদ্রগুপ্ত যিনি তাঁর দিগ্বিজয়ে দক্ষিণে এসেছিলেন খ্রিষ্টাব্দ চতুর্থ শতকে (দেখুন রাইস, কদম্ব সংক্রান্ত অধ্যায়)। অতএব, বৈজয়ন্তী বনবাসী হয়েছে খ্রিষ্ট অব্দের শুরুতে।

সৌরাষ্ট্র নামে দেশটি কৌটিল্যের পরিচিত। পুরো সৌরাষ্ট্র অথবা অপর-মালবের পশ্চিম অব্দি তার একটা অংশ লারিয়া নামে খ্রিষ্টাব্দ দ্বিতীয় শতকের মধ্যবর্তী সময়ে টলেমির পরিচিত। দেশটার লারিয়া নাম হয়েছিল সম্ভবত টলেমির মোটামুটি এক শতক আগে। লারিয়া সংস্কৃতে হবে লাট, এবং লাট বাৎস্যায়নের চেনা। অতএব, বাৎস্যায়নকে সহজে খ্রিষ্টাব্দ প্রথম শতকে রাখা যায়।

অহিচ্ছত্রে শিলালিপির অবশেষগুলো খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে খ্রিষ্টাব্দ তৃতীয় শতক অব্দিকার। কাজেই খ্রিষ্টাব্দ প্রথম শতকে অহিচ্ছত্র একটি অতি-পরিচিত স্থান ছিল এবং বাৎস্যায়ন বলেন যে গণিকাদের প্রতি আচরণে অহিচ্ছত্রের মানুষেরা বেশ গোঁড়া ছিল। এসব বিবেচনা করে, বাৎস্যায়নকে আমি খ্রিষ্টাব্দ প্রথম শতকে রাখি। যেমন আগে বলেছি, পুরোনো সময়ের কোনো সংস্কৃত গ্রন্থের রচনার সালতারিখ নিশ্চিত নির্দ্ধারণে ছাত্ররা সক্ষম হবে তেমন উন্নত ভারতীয় কালপঞ্জীর জ্ঞান এখনো হয় নি। মোটামুটি এক শতকের মধ্যে সময়টাকে আনতে পারলে যথেষ্ট।

যাহোক, ওপরের আলোচনাগুলো কামশাস্ত্র থেকে বেছে বেছে বার করতে পারা ঐতিহাসিক তথ্যাদির শুকনো এবং ক্লান্তিকর বর্ণনা মাত্র। গ্রন্থটির আরেকটি দিক আছে যেটি অনেক বেশি আকর্ষক এবং চিত্তগ্রাহী; আমি সে সময়কার সমাজের ছবিগুলোর কথা বলছি। একটি জীবিত সমাজের ছবি, যেমন লেখক নিজের চারদিকে দেখেছেন এবং নিজের অভিজ্ঞতায় পেয়েছেন। এখন আমি সে ছবিগুলোর কয়েকটি আপনাদের সামনে মেলে ধরার চেষ্টা করব। প্রথম বইয়েই বাৎস্যায়ন  নাগরকের ছবি পেশ করেন। আমি বুঝতে পারছি না শব্দটাকে ইংরেজিতে কিভাবে অনুবাদ করব। আক্ষরিকভাবে শব্দটির অর্থ ‘নাগরিক’। কিন্তু ‘নাগরিক’ নাগরকের সব কটি অর্থ বোঝাবে না। ‘ফুলবাবু’ শব্দটায় খারাপ ধরণের গন্ধ আছে। ‘নাগর’ আবার নাগরকের সামাজিক দিকগুলো ব্যক্ত করে না। আমি তাই, আমার ইংরেজির দারিদ্র্যে শব্দটির অনুবাদ করব ‘কেতাদুরস্ত মানুষ’। তার প্রথম বৈশিষ্ট যে তাকে সুপন্ডিত হতে হবে। তার দ্বিতীয় বৈশিষ্ট যে তাকে বিবাহিত হতে হবে। তার তৃতীয় বৈশিষ্ট যে তার আর্থিক ক্ষমতা থাকবে, সে পূর্বপুরুষদের সম্পদ উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়ে হোক বা নিজে চেষ্টা করে হোক। সে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র যা কিছু হতে পারে। সে হয় বড় নগরে থাকবে, নয় ছোটো শহরে, অথবা মফস্বলে বা ভালো মানুষজন পরিবৃত কোনো জায়গায়। তার একটি বাড়ি থাকতে হবে, তার সামর্থ্য অনুযায়ী বড় বা ছোট, কিন্তু কেতাদুরস্ত মানুষ হিসেবে তার বাড়ির দুটো অংশ থাকবে, অন্দর এবং সদর, অন্দর তার পরিবারের জন্য এবং সদর তার বন্ধুদের জন্য। সদরটি জলের পর্দার কাছাকাছি থাকবে এবং সংলগ্ন একটি বাগান থাকবে। দুই অংশেই অনেক ঘর থাকবে।  সদরে বসার ঘরে একটি খাট ও একটি সোফা থাকবে, একটি শোভন বিছানা থাকবে যাতে দুটো বালিশের একটি মাথার দিকে ও একটি পায়ের দিকে থাকবে। বাঙালিদের পাশবালিশের ব্যবহার প্রাচীন সময়ে ছিল না। বিছানাটি মাঝে অবতল হবে এবং পরিষ্কার সাদা চাদর দিয়ে ঢাকা থাকবে। খাটের পাশে আরেকটি খাট থাকবে, একটু নিচু, একই ভাবে সাজান। ঠিক মাথার ওপর, সম্ভবত একটি কুলুঙ্গিতে একটি চাদর পাতা থাকবে, নাগরকর দেবতার জয় আসন; এবং একটি উন্নত সমতল স্থান, দেয়াল থেকে বেরিয়ে আসা তাকের মত, যেখানে রাখতে হবে রাত্রে ব্যবহৃত প্রলেপের অবশেষ, মালা, মোম রাখা এবং সুগন্ধী রাখা দুটো ছোট ডিবে, লেবুর খোসা এবং পান। মেঝেতে একটি পিকদান থাকবে। দেয়ালে বন্ধনী থেকে একটি বীণা ঝুলে থাকবে, একটি ছবির পট, রঙের বাক্স, কিছু প্রিয় বই এবং পারিজাতের (ঝিন্টি) মালা। মেঝেতে, খাট থেকে অদূরে চাদর ও তাকিয়া বেছান থাকবে। দেয়ালে ভর দিয়ে দাবার ছক এবং পাশা রাখা থাকবে। ঘরের বাইরে থাকতে হবে পাখির খাঁচা। এক কোণায় খেলনা হিসেবে চরকা এবং ছুতোরের যন্ত্রপাতি থাকবে। গাছের ছায়াদার কুঞ্জে একটি সাধারণ দোলনা থাকবে এবং একটি বৃত্তাকার দোলনা, ফুলে ঢাকা বসার আসন।

নাগরকের প্রাত্যহিক কর্তব্য

সে সকালে উঠবে, প্রাতঃকৃত্য সারবে, দাঁত মাজবে, সারা শরীরে মিহি করে প্রলেপ লাগাবে, ধুপ জ্বালিয়ে তাকে সুগন্ধিত করবে, মালা পরবে, মোম এবং লাল রঙ দিয়ে ঠোঁট রাঙাবে, সুগন্ধিত পান চিবোবে, আয়নার সামনে দাঁড়াবে, তারপর নিজের কাজে যাবে।

তার অন্যান্য কর্তব্য হল, প্রতিদিন চান করা, প্রতি দ্বিতীয় দিন সুগন্ধী দিয়ে নিজের শরীরকে পরিষ্কার করা, ফেনক (সাবানের মত কিছু) দিয়ে পা দুটোকে নরম করা, প্রত্যেক চতুর্থ দিন শরীরের উপরিভাগ কামান এবং প্রত্যেক পঞ্চম বা দশম দিন নিম্নভাগ। এসব প্রতিটি কাজ নিপুণভাবে করতে হবে। সে এমন আচরণ করবে যাতে তার বগল না ঘামে। সে দুবার ভোজন করবে, একবার পূর্বাহ্নে এবং একবার অপরাহ্নে। কিন্তু ‘সামান্যাধিকরণ’এর লেখক চারায়ণ বলেন, অপরাহ্নে নয়, একটি ভোজন সে রাত্রে করবে। ;মৃচ্ছকটিক’এ আমরা দেখি যে সাতসকালে একটি উপাহার হয়, কল্যবর্ত। এটা চারায়ণও লেখেন নি, বাৎস্যায়নও লেখেন নি। এবং চারায়ণ শুধু একটি সামান্যাধিকরণ লিখেছেন। একটা যুক্তি হতে পারে যে মৃচ্ছকটিক চারায়ণেরও লেখার আগে রচিত হয়েছে। আহারের পর সে নিজের টিয়েগুলোকে কথা বলাবে। তারপর সে মোরগের লড়াই দেখে, ভেড়াদের ঢুঁ-মারা খেলা দেখে এবং চারুকলার সূচিতে বর্ণিত অন্যান্য আমোদপ্রমোদে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। তারপর আসে তার প্রণয়-দূতেরা [কোটনা] এবং তার অভিসারের সাঙ্গোপাঙ্গরা। তাদেরকে বিদায় জানিয়ে সে একটা ছোট্ট ঘুম দেয়। ঘুমিয়ে উঠে জামাকাপড় পরে এবং সঙ্গীদের কাছে যায়। তারপর গোধূলিতে আসে সঙ্গীত। একটু পরে সে নিজের সুসজ্জিত, জ্বলন্ত ধূপের সুগন্ধে ভরা ঘরে নিজের প্রণয়িনীদের প্রতীক্ষা করে অথবা তাদের ডেকে আনতে বার্তাবাহকদের পাঠায়; অথবা নিজেই তাদের সঙ্গে দেখা করতে যায়। যখন রমণীরা আসেন, হাসিখুশি এবং খোশামুদে কথা বলে সে তাদের আপ্যায়ন করে। যদি তাদের পোষাক বৃষ্টিতে ভিজে গিয়ে থাকে, সে নিজের হাতে তাদের পোষাক বদলে দেয়।

অনিয়মিত কর্তব্য

নাগরক সারা বছর সবকটি বিভিন্ন ঋতুতে সবধরণের উৎসব সংগঠিত করে। হিন্দু নির্ঘন্টে বিশেষ বিশেষ দেবদেবীর জন্য উৎসবের দিনের ব্যবস্থা আছে। কেতাদুরস্ত মানুষদের কর্তব্য মন্দিরে যাওয়া এবং সেখানে উৎসব আয়োজিত করা। যদি ভ্রাম্যমান নাট্যদল আসে, তাহলে সে শুধু তাদের আরামের প্রতিই নজর দেবে না, খেয়াল রাখবে তারা যেন কোনরকম অসুবিধের মধ্যে না পড়ে; তাদের অসুখেবিসুখে সাহায্য করবে এবং দেখবে তারা যেন নিজেদের শিল্পে দক্ষতার জন্য পুরস্কৃত হয়। সচরাচর শহরের বসতি এলাকা থেকে সুবিধাজনক দূরত্বে অবস্থিত সরস্বতীর মন্দির, মাঘ মাসের শুক্লপঞ্চমীতে সাধারণত কেতাদুরস্ত মানুষদের ঠাঁই হত। সেই দিনটি এখনও সারা ভারতে বসন্ত-পঞ্চমী রূপে এবং বঙ্গে সরস্বতী-পুজা রূপে উদযাপিত হয়। এই সমস্ত এবং অন্যান্য আনন্দ আসরগুলোকে ঘটা বলা হত।

মাঝে মাঝে সাহিত্যসভা হত যাতে এক বয়সের এবং এক পেশার মানুষেরা কেতাদুরস্ত নারীদের সঙ্গে বসে শিল্প, কবিতা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলতেন। এই সব সাহিত্যসভা তাঁদের নিজেদের বাড়িতে হত, অথবা সভা-গৃহে; এমনকি সেই কেতাদুরস্ত নারীদের বাড়িতেও হত।

পানভোজনের উৎসব হত মাঝে মাঝে যাতে সব ধরণের পানীয় এবং সব রকমের ক্ষুধাবর্দ্ধক পরিবেশন করা হত। এই উৎসব সাধারণতঃ কেতাদুরস্ত পুরুষদের বাড়িগুলোয় ঘুরেফিরে হত, নারীরা পান করত এবং অন্যান্যদের পান করাত।

বনভোজনঃ অনেক নাগরক সকালে জমকালো বেশভূষায়, নারীদের সঙ্গে ঘোড়ায় চেপে বাগানে যেত। সেখানে তারা পানভোজনে মত্ত হত; মোরগের লড়াই, জুয়া, অভিনয় এবং অন্যান্য সুখকর কাজে আনন্দযাপন করত, পারিতোষিক নিয়ে বাড়ি ফিরত। গরমকালে, বিপজ্জনক জলীয় পশুগুলোকে তাড়িয়ে জলক্রীড়ায় ব্যপৃত হত।

ক্রীড়াঃ প্রতি বছর তিনটে উপলক্ষ আসত ক্রীড়া অনুষ্ঠিত করার – কার্তিক অমাবস্যা, কার্তিক পূর্ণিমা, আশ্বিন পূর্ণিমা। বসন্তের আগমনকেও একটি উপলক্ষ মনে করা হত। এই তিনটে সময়ে লোকে পাগলের মত উৎসবমুখী হয়ে উঠত। মন ভরে নাচত, গাইত, দোলনায় দুলত, জুয়া খেলত, বাজনা বাজাত, খেলাধুলায় আনন্দমুখর হয়ে উঠত। গ্রামীণ খেলাগুলোও ছিল, আম কিলোনো, ভুট্টা পুড়িয়ে খাওয়া, পদ্মলতা খাওয়া, বৃষ্টি এলে নরম ঘাসে দৌড়োনো, পাঞ্চাল দেশের ধরণে মিছিল করা, শিমূল গাছের নিচে ফুল নিয়ে খেলা, বৃষ্টি এলে কদম ফুল ছুঁড়ে লড়াই করা। আরো অসংখ্য খেলা, গোনানো অসম্ভব।

এটাই খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকে ভারতের সব অংশে কেতাদুরস্ত পুরুষের জীবনের ছবি; বিশেষ করে মগধে, যেখানে বইটা লেখা হয়েছিল। সময় এখনকার মত কঠিন ছিল না। যার শক্তিসামর্থ্য আছে সে, কয়েক বছর পরিশ্রম করে ক্ষমতা অর্জন করে, মনের সুখে দুনিয়ার ভালো জিনিষগুলো উপভোগ করতে পারত। তাদের দিন কাটত সুখকর দৈনন্দিনে আর বছরগুলো কাটত নানা উৎসবে। কাজেই আশ্চর্য্যের কিছু নেই যে তারা শারীরিক ও মানসিক উপভোগের ওপর, কামসূত্র-এর মত একটি বই লেখার কাজ হাতে নেবে।

আরেকটা ছবি দেব, যে একজন পত্নীর কেমন হওয়া উচিৎ। চতুর্থ বই থেকে, যাতে বাৎস্যায়ন গোনার্দীয়র বইয়ের সারসংক্ষেপ করেছেন। পতির প্রতি পত্নীর একনিষ্ঠ ভক্তি থাকবে, পতির গোপন ব্যাপারগুলো নিজের ভিতরে চাপা রেখে তিনি পতিকে পরমেশ্বর ভেবে তার সেবা করবেন। পতির অনুমত্যানুসারে গৃহস্থালির ব্যবস্থাপনা নিজের হাতে নেবেন। তিনি ঘরদোর দেখাশোনা করবেন, ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করে, ফুল দিয়ে সাজিয়ে, দেখে ভালো লাগে তেমন ঝকঝকে তকতকে করে রাখবেন যাতে দেবতাদের মন্দিরটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে আর সকাল, দুপুর, সাঁঝের তিনবার বলির নৈবেদ্য থাকে সেখানে। গোনর্দ বলেন, গৃহস্বামীর জন্য এর চেয়ে বেশি আনন্দদায়ক কিছু নেই। বরিষ্ঠদের সঙ্গে, ভৃত্যদের সঙ্গে, পতির বোন এবং তাদের পতিদের সঙ্গে তিনি, নিজের এবং তাদের জন্য মানানসই ভাবে ব্যবহার করবেন। পরিষ্কার মাটিতে তিনি সব্জির বাগান, আখ, জিরে, সর্ষে আর যোয়ান চাষের জায়গা তৈরি করাবেন। পুজোয় লাগে এমন সমস্ত ফুলগাছ, এমন গাছ যা সারা বছর ফুল দেয় আর সুগন্ধী ঘাস [উশীর, খসখস] বাগানে লাগাবার ব্যবস্থা করবেন। এদিকে ওদিকে সুন্দর বসার জায়গা তৈরি করাবেন। কুঁয়ো খোঁড়াবেন, জলাশয় আর পুকুর কাটাবেন। ভিখিরি স্ত্রী, বৌদ্ধ ও জৈন ভিক্ষুণী, উদাসীন প্রকৃতির স্ত্রী, স্ত্রী বাজীকর, স্ত্রী জ্যোতিষী এবং ডাইনিদের সঙ্গ তিনি এড়িয়ে চলবেন। তাঁকে জানতে হবে যে কোন আহার্য তাঁর পতির ভালো লাগে এবং কোনটা ভালো লাগেনা; কোনটা তাঁর স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো এবং কোনটা ভালো না। যখন পতির আসার সময় হবে তখন, বাইরে থেকে তাঁর কণ্ঠস্বর শুনে তিনি ঘরে, কী কী করার ছিল ভাবতে ভাবতে তৈরি থাকবেন। দাসীকে সরিয়ে নিজে তিনি পতির পা ধুইয়ে দেবেন। অসংবৃত এবং অনলংকৃত অবস্থায় তিনি কখনো পতির সামনে যাবেন না। যদি তাঁর পতি মন্দ উদ্দেশ্যে  দেদার খরচ করেন তাহলে গোপনে আপত্তি জানাবেন। যদি বান্ধবীদের সঙ্গে বিয়ের অনুষ্ঠানে, বলিদানে, বনভোজনে যাওয়ার থাকে বা মন্দিরে যাওয়ার থাকে, পতির অনুমতি নিয়ে যাবেন। সবরকম ক্রীড়া ও বিনোদনে তিনি পতির প্রবণতা অনুসরণ করবেন। পতির ঘুমিয়ে পড়ার পর তিনি ঘুমোবেন, পতি ঘুমিয়ে থাকলে তাঁকে জাগাবেন না। রান্নাঘরটাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং যথেষ্ট সুরক্ষিত রাখবেন। পতি তাঁকে অপমান করলে তিনি একটু বিচলিত হতে পারেন কিন্তু সরবে প্রতিবাদ করবেন না। প্রয়োজনে তিনি একান্তে বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মাঝে পতিকে কড়া কথা বলতে পারেন, কিন্তু কখনই তাঁকে মোহিত করার চেষ্টা করবেন না। কেননা গোনর্দ বলেন, অবিশ্বাসের এর থেকে বড় কারণ নেই। ক্রুদ্ধ কথা, ক্রুদ্ধ দৃষ্টি এবং কথা বলার সময় মুখ ঘুরিয়ে রাখা তিনি পরিহার করে চলবেন। তিনি বেশিক্ষণ দরজার কাছে থাকবেন না, বেশীক্ষণ দরজার বাইরে দেখবেনও না। বাড়ির বাইরের অন্যান্যদের সঙ্গে কথাবার্তা এড়িয়ে চলবেন। কোনো নির্জন জায়গায় বেশিক্ষণ থাকবেন না। তাঁকে বুঝতে হবে যে ঘাম, নোংরা এবং দুর্গন্ধে বিরক্তি হয়। পতির কাছে যাওয়ার সময় তিনি সুসজ্জিত, সুগন্ধিতদেহ এবং সুবেশিত হয়ে যাবেন। বাইরে যাওয়ার সময় মাত্র কয়েকটি গয়না, যৎসামান্য অনুলেপন, সাধারণ অনাড়ম্বর রেশমের পোষাক আর সাদা ফুল ব্যবহার করবেন। পতির সবকটি উপবাসে এবং ব্রতে তিনি সঙ্গে থাকবেন। যদি বিরত থাকতে বলা হয়, তিনি বলবেন, “এ ব্যাপারে জোর কোরো না”। মাটির, বেত বা কঞ্চির, কাঠের, চামড়ার এবং ধাতুর তৈরি সব রকম পাত্র তিনি উপযুক্ত ঋতুতে এবং উপযুক্ত দামে ক্রয় করবেন। যেসব জিনিষ যোগাড় করা কঠিন, যেমন নুন, তেল, সুগন্ধি, ভালো পাত্র এবং ঔষধি তিনি বাড়িতে লুকিয়ে রাখতে জানবেন। তিনি বীজ সঞ্চয় করে রাখবেন এবং উপযুক্ত সময়ে রোপণ করবেন। পরিচ্ছেদটা এভাবে লেখা – মূলকা-লুক-পালঙ্কী দমনকাম্রা-তকৈর্বারুকত্রপুস-বার্তাক-কূষ্মাণ্ডালাবু-সূরণ-শুকনাসাঃ স্বয়ংগুপ্তা তিলপর্ণিকাগ্নিমন্থ-লশুন-পলাণ্ডুপ্রভৃতীনাং সর্বৌষধীনাং চ বীজগ্রহণং কালে বাপশ্চ।*

তিনি পতির ধনসম্পদ নিয়ে কথা বলবেন না, পতির গোপন কথাও অন্য কাউকে বলবেন না। তাঁর সমকক্ষদের মাঝে তিনি চারুকলায়, উন্নত-মানসিকতায়, পতির একান্তপ্রাণ সেবায় এবং রন্ধনে শ্রেষ্ঠ হবেন। তিনি স্বামীর আয়ের অনুমান রাখবেন এবং সেইমত খরচ করবেন। বেঁচে থাকা দুধ দিয়ে ঘি তৈরি করবেন। সর্ষে এবং আখ দিয়ে তেল আর গুড় বানাবেন। তাঁকে সুতো কাটা এবং কাপড় বোনা শিখে নিতে হবে। বিভিন্ন ধরণের দড়ি পাকানোর জন্য তিনি ছাল সংগ্রহ করবেন। তিনি ভুষি ছাড়াতে, পরিষ্কার করতে এবং কাজের দেখাশোনা করতে জানবেন। মণ্ড, ভুষি, চালের কণা এবং ময়লা আর কাঠকয়লা তিনি উপযোগে আনবেন। দাসদাসীদের মজুরি জানবেন এবং আহারের কথা মনে রাখবেন। চাষবাস ও গবাদি পশুর প্রজননের সমস্ত কাজ তিনি জানবেন এবং ঘোড়া ও অন্যান্য পরিবহণের খেয়াল রাখবেন। ভেড়া, মোরগ, লড়িয়ে-পাখি, মাদি-টিয়ে, বুলবুল, ময়ুর, বাঁদর ও হরিণের পরিচর্যা করবেন। প্রতিদিনকার আয় ও ব্যয়ের দিকে চোখ রাখবেন। সমস্ত পুরোনো ও নতুন জামাকাপড় একসাথে রাখবেন, বিভিন্ন রঙে সেগুলোকে রঙ করাবেন এবং দাসদাসীদের, ভালো কাজের পুরস্কার হিসেবে আর অন্যান্যদের উপহার হিসেবে দেবেন। মদ এবং অন্যান্য পানীয়ের বোতল লুকিয়ে রাখবেন, সময়মত ব্যবহার করবেন, কেনাবেচার দিকে, আয়ব্যয়ের দিকে নজর রাখবেন।

তিনি তাঁর পতির বন্ধুদের, তাঁদের সামাজিক পদমর্য্যাদা অনুসারে, পান, মালা এবং  অনুলেপ সহকারে সম্মান জানাবেন এবং আপ্যায়ন করবেন। পতির পিতামাতার যত্ন নেওয়া, তাঁদের ওপর পুরোপুরি ভরসা করা, তাঁদের সঙ্গে তর্ক না করা, নিচুগলায় এবং খুব কম কথা বলা, জোরে না হাসা, তাদের বন্ধু ও শত্রুদের নিজের বন্ধু ও শত্রু মনে করে আচরণ করা, সম্পত্তির গর্বে স্ফীত না হওয়া, অধস্তনদের প্রতি উদারমনস্কতা – এই সব গুণ একজন স্ত্রীকে তার বাড়ির ভূষণ করে তোলে। পতির অজান্তে তিনি কাউকে কিছু দেবেন না। তিনি ভৃত্যদেরকে তাদের কাজে নিয়োগ করবেন এবং উৎসবের সময় তাদেরকে পুরস্কৃত করবেন।          

____________________

 

 

[*পঞ্চানন তর্করত্নকৃত অনুবাদঃ

মূলক, আলু, পালংশাক, দোনা {Artemesia Pallens}, আম্রাতক {আমড়া}, এব্বারুক {কাঁকুড়}, ত্রপুষ {শশা}, বার্ত্তাকু, কুষ্মাণ্ড, অলাবু, সূরণ {ওল}, শুকনাসা {সোণাগাছ}, স্বয়ংগুপ্তা {শকশিম্বী}, তিলপর্ণিকা {তিল এবং গাছপাণ}, অগ্নিমন্থ {গণিকারিকা}, লশুন, পলাণ্ডু প্রভৃতির বীজ যথাসময়ে সংগ্রহ করিয়া রাখিবে এবং উপযুক্ত সময়ে বপন করিবে।] 

  


 [bp1]