Wednesday, October 6, 2021

জন্মদাগ

আমার পানে দেখলে কিনা চেয়ে
আমিই জানি আর জানে সেই মেয়ে।
ঘন মেঘে আঁধার হয়ে আসা প্রান্তরে ওই দেখাটুকুর মধ্যে আপন্ন হয়ে পড়ছে আমার নশ্বরতায় চিরকাল।
রবিঠাকুরের সাথে আমার সম্পর্কের ব্যাপারটাও ওই রকমই। আমার পানে চেয়ে দেখলেন কিনা একটিবার তা তিনিই জানেন আর আমার জানাটাকে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় রেখে দেন।
১
প্রথম যখন এসেছিলেন তখন আমি রান্নাঘরের চৌকাঠে বসেছিলাম। চৌকাঠে বসা নাকি মানা, তাই মা ধ্যাঁতানি দিয়ে দরজার বাইরে বসালেন। রান্না করতে করতে বা হাতে বই ধরে পড়তে শুরু করলেন ‘আমি যদি হতেম কুকুরছানা’ আর আমি হাপুস চোখে কান্না জুড়ে দিলাম। চেষ্টা করে থাকলাম মায়ের কোলের কাছে ঘেঁষবার।
তিনি এসেছিলেন মানে ঝিরিঝিরি ছিলেন উঠোনের বাইরে জামগাছটির ছায়ার মত। তখন তো আর জানতাম না কবিতা মানুষে লেখে! জানতাম এগুলো মায়ের হাতে অস্ত্র, হাতপাখার ডাঁটির মত, যাতে আমি দুষ্টুমি না করি।
রাতে মায়ের বুকের কাছে গুটিসুটি আমি রাজপুত্র! মা শোনাতেন ‘মনে কর যেন বিদেশ ঘুরে’। রবিঠাকুর হারুদের মাঠটায় থাকতেন জ্যোৎস্না হয়ে।
২
তখন তাচ্ছিল্যের বয়স। তায় পাটনা শহরে। কলকাতা রেডিওকে ব্যঙ্গ করতে বলতাম ‘আকাশবাণী কলতলা’। রবীন্দ্রসঙ্গীতের ঘোষণা হলেই বলতাম ‘শুরু হল বেড়ালের ম্যাঁও ম্যাঁও।’ (এখনও অনেকের গান বেড়ালের ম্যাঁও ম্যাঁওই মনে হয়)। তবু, এই জোরদার মাথা ঝাঁকানির মধ্যেও বুড়ো একটুখানি জায়গা ধরে রেখেছিল পঙ্কজ মল্লিকের গলায় ভর দিয়ে। রোববার বেলা দশটায় ‘খর বায়ু বয় বেগে’র খরতা খারিজ করতে পারতাম না কিছুতেই।
এ সময়ে পাড়ায় এলেন কলকাতিয়া জামাইবাবু। বললেন পঁচিশে বৈশাখ হবে এবার – বাচ্চুদের ভিতর বারান্দায়। দুই ভাড়াটিয়া আর এক বাড়িওয়ালার হেঁসেল বন্ধ রেখে। যে কটার পেছনে লাইন দিতাম পাড়ায় সব সেজেগুজে পরি হয়ে গেল। জামাইবাবুর কাছে কেনা হয়ে গেলাম যে আমাকেও রিহার্সালে স্লট দিলেন। ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ’।
বুড়ো নিশ্চয়ই মিচকে হাসছিল।
৩
তারপর অনেকটা পথ খুব তাড়াতাড়ি চলা। সাইকেলে কন্যাকুমারী যাওয়া, ফিরে এসে চলে যাওয়া কোলিয়ারিতে কাজ করতে, প্রথম কবিতা লিখতে শুরু করা, কলেজ পাশ, চাকরি, পত্রিকা, কবিতার জগৎটি বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে ঘুরে ঘুরে দেখা – ‘হেঃ, কোথায় লাগেন রবীন্দ্রনাথ’ … এরকমই একটা জায়গায় ছিলাম। আদতে কেরানি, বড় সাহেবদের অশ্রদ্ধা করতে শিখিনি, কাজেই পেন্নামটা ঠুকে দিতাম। কিন্তু হৃদয়ের সম্রাট ছিলেন জীবনানন্দ; মানে বাংলা কবিতায়। ছিলেন সুকান্তও। সমর সেন, কিছু কবিতায় সুভাষ। আরো অনেকে। বাট নো রবীন্দ্রনাথ।
দীপনের বাড়িতে সন্ধ্যায় আড্ডা বসতো। একদিন ভিতর ঘর থেকে ভেসে এল ‘আমি চঞ্চল হে …’।
-      কার গলা?
-      দেবব্রত বিশ্বাস।
আমি হতবাক। এটা গান? না ভয়েজারের গায়ে লেখা, অন্য গ্যালাক্সির জন্য আত্মপরিচয়! ‘আমি সুদূরের পিয়াসী’ … ।
আর ওটা গলা? রবীন্দ্রসঙ্গীতের? নাকি পাহাড়ের বাঁকে বেজে ওঠা চেলো আর স্যাক্সোফোন!
যাই হোক, ওই একটি গান আমাকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের জগতে ঢুকিয়ে তবে ছাড়ল।
বুড়ো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।
৪
এভাবেই এর কিছুদিন পর বুড়োর কবিতার কাছে যেতে বাধ্য করল দীপন আর পূর্ণেন্দুদা। এক দুপুরে দীপন শোনাল ‘ঢালি মধুরে মধুর, বধুরে আমার হারাই বুঝি।’ ওই কবিতার হাত ধরে আমি ছন্দের বহিরঙ্গ থেকে অন্তরঙ্গে প্রবেশ করতে শিখলাম। এটা ওই কবিতার বিশেষ গুণ নাও হতে পারে। হয়ত আমার ওটাই টেম্‌ (Time) ছিল!
আরেক দুপুরে পাটনা কলেজের গঙ্গার ধারে পূর্ণেন্দুদা শোনালেন ‘খোলো, খোলো হে আকাশ, স্তব্ধ তব নীল যবনিকা’। এই কবিতাটির হাত ধরে আমি রবিঠাকুরের ছবিগুলোর দিকে ফিরে তাকালাম। সেটাও হয়ত ওই টেম্‌-এর ব্যাপার।
৫
আমার রবীন্দ্রচর্চা খুবই দুর্বল। তাই বিশেষ কথা বাড়াবো না। ওই যে শুরুতেই বললাম! উনি আমায় দেখলেন কিনা উনিই জানেন আর আমার জানাটাকে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় রেখে দেন।
রবিঠাকুরের গল্পে আজকের সমাজ, শ্রেণীদ্বন্দ্বের তীব্রতা ইত্যাদি কত বিলক্ষণভাবে আছে, তাঁর বিভিন্ন সংস্কার প্রকল্পনা, শিক্ষা-ভাবনা, বিজ্ঞান-ভাবনা, কৃষি-ভাবনা ইত্যাদি আজ কত ব্যাপক প্রয়োগে প্রতিফলিত এসব বিষয়ে কিছু বলার আমার ক্ষমতাই নেই।
আমি শুধু জানি ওঁকে বাদ দিয়ে প্রেয়সীকে (থুড়ি, বৌকে) আজও তেমন করে ভালোবাসা যায় না, ওঁকে বাদ দিয়ে ছেলেমেয়ের সাথে বসে একসাথে গান গাওয়া যায় না, ওনাকে বাদ দিয়ে দিদার চোখের জ্যোতি নিভে আসে। জীবন-সমুদ্রই হয়ে ওঠে দেবতার গ্রাস।
আমার বাঁ জঙ্ঘায় তুলসী পাতার মত একটা দাগ আছে। মা বলেছিলেন জন্মদাগ; সবার থাকে। ঈশ্বরে বিশ্বাসী হলে বলতাম, ছবির নিচে যেমন ছবিকারের, চিত্রকরের স্বাক্ষর – আমরা তো ঈশ্বরের সৃজন, তাই গায়ে ঈশ্বরের স্বাক্ষর ওই জন্মদাগ!
রবিঠাকুর আমাদের সাংস্কৃতিক জন্মদাগ। শুধু বাঙালি নয়, একদিন বিশ্বের এই অনন্য প্রজাতান্ত্রিক সঙ্ঘের নবতর উত্তরণের সাংস্কৃতিক জন্মদাগ হিসেবে চিহ্নিত হবেন রবিঠাকুর।
মনে হয় হাইপারবোল দিচ্ছি না। ভারতবর্ষ একভাষিক মহাদেশ নয়, বহুভাষিক দেশ। তবু* দিন বদলের প্রেক্ষিতে আমাদের পরম সাথী রবীন্দ্রনাথ।   

*পুরো ল্যাটিন এমেরিকায় যেমন হোসে মার্তি [মুদ্রিত লেখায় বাদ]
২০১১ সালে শব্দহরিণ পত্রিকায় প্রকাশিত

 


আশা জেগেছিল

আমার এক বন্ধু। অন্য শহরে থাকেন। বছরখানেক আগে অব্দি নাজেহাল হচ্ছিলেন মেয়ের জন্য যোগ্য পাত্রের খোঁজে। দিল্লী, কলকাতা, ভিলাই, মুম্বই। মেয়ে তখন মেডিক্যালে – শেষ বছর। স্বাভাবিক ভাবে পরিবারের মত যে পাত্র ডাক্তার হতে হবে। নিজের জাতের যে হবে সেটা তো বলার কোনো কথাই নয়। ডাক্তার পরিবার হলে আরো ভালো হয়। বন্ধু নাজেহাল হচ্ছিলেন বস্তুতঃ ভালো পাত্রের খোঁজে নয়, পণের খাঁই দেখে। সর্বস্ব বিকিয়েও যে পার পাওয়া যাচ্ছে না! …

মিটিং ছিল সেই শহরে। রাত বন্ধুর সাথেই কাটল। পুকুরধারে হাঁটছিলাম – বন্ধু বললেন, “মেয়েদেরই এগোতে হবে ভাই। নইলে বড় মুশকিল!” বন্ধুর মুখের দিকে তাকালাম। স্ট্রিট লাইটের আলোয় একটা তীব্র কষ্ট দেখলাম তার মুখে। পণের খাঁই মেটানোর নয়। গভীরতর। কেননা পরিবারের দিক থেকে বন্ধুও খুব গরীব নন। বরং শহরের প্রতিষ্ঠিত পরিবার। বড় চৌহদ্দিতে সাবেকি তিন তলা বাড়ি। গ্রামে খেতখামার।

হঠাৎ খেয়াল হল, বন্ধুর মানসিকতা যে ভিন্ন। ভুলেই গিয়েছিলাম। সমাজ-সংস্কারক। সক্রিয় কর্মী। কষ্টটা পণের খাঁই মেটানোর নয়, পণ ব্যাপারটাকে মানতে বাধ্য হওয়ার। মেয়ের বাপ কি বলতে পারে পণ দেব না? যদি মেয়ের কোনো আপত্তি না থাকে? আর মেয়ে তো জানে যে পণটাই একমাত্র প্যাঁচ, পৈত্রিক বা পারিবারিক সম্পত্তিতে তার ভাগ দিতে বাধ্য করার। পরে তো আর কিছু দাবি করার অবস্থাতেই থাকবে না। ছাড়ার বোকামি কেউ করে? ডাক্তারি করতেও, পূঁজি চাই না? আর বাবার ওই মূল্যবোধ-টোধ, ওসব বাবার ফ্যাকড়া!

তাই হল। মেডিক্যালে পড়া মেয়ে অম্লানবদনে পণের ধনের সাথে পা দিল শ্বশুরবাড়ি। এখন ডাক্তার বর আর ডাক্তার বৌ নতুন নার্সিংহোমে পার্টনার।

 

গুপ্তাজির বড় ছেলে চান্স পেল খড়গপুর আই.আই.টি.তে। ইলেকট্রনিক। অথচ প্রথম সেমেস্টারে রেজাল্ট খারাপ হতেই চেলে গেল ডিপ্রেশনে। বাড়িতে হুলুস্থুলু। গুপ্তাজি ছেলেকে নিয়ে এলেন। গেলেন বিখ্যাত কয়েকজন নিউরোফিজিশিয়ান এবং অবশ্যই সাইকিয়াট্রিস্টের দরবারে। ওষুধ চলতে লাগল। ওদিকে আই.আই.টি.তে চিঠি লিখে সময় নেওয়ার, পরের সেমেস্টারের জন্য অনুমতি নিয়ে রাখার ব্যাপারটাও সামলাতে হচ্ছে। গুপ্তাজিরও ডিপ্রেশনে যাওয়ার মত অবস্থা। গুপ্তাজি ছেলেকে নিয়ে গেলেন নিজের গুরুদেবের কাছে। গুরুদেব কিছু মন্ত্র-টন্ত্র দিলেন। কিছু ধ্যান-ট্যান করতে বললেন। ওদিকে গুপ্তাজির স্ত্রী ছেলেকে নিয়ে গেলেন এক জ্যোতিষীর কাছে। তাঁর উপদেশ মত কিছু আংটি, তাবিজ গড়িয়ে দিলেন। … তারপর স্বামীকে বললেন, “আমি খড়গপুরে থাকব”। “কোথায়?” “বাইরে। আমি খোঁজখবর নিয়েছি। অনেক মায়েরা থাকে শহরে, ক্যাম্পাসের বাইরে। ছেলেরা ভরসা পায়”। …

ছেলে এখন ব্যাঙ্গালোরে চাকরি করে। আইটি ফার্ম। ভালো প্যাকেজ। তার মনে এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই যে সে কিসে ভালো হল। ওষুধে, মন্ত্রে, তাবিজে না কি মায়ের খড়গপুরে গয়ে থাকায়। …”ইউ কান্ট সে! কত রকমের এনার্জি যে আমাদের জীবনে কাজ করে!” ইদানিং আরো কয়েকটা আংটি বেড়েছে তার আঙুলে। কেন না তার রুমমেট দুম করে একটা বড় ওপেনিং পেয়ে গেল। সে পাচ্ছে না।

 

ঝাজি আমার দিকে তাকিয়ে মাথাটা নাড়লেন। “কী মুশকিলে যে পড়েছি, কী বলব। … পুরো ফ্যামিলি আমাকে তুলোধোনা করে ছেড়ে দিচ্ছে। আর আমাদের ফ্যামিলি বলতে বোঝেন তো! বলতে গেলে এ হোল ভিলেজ! পুরো কুনবা!”

ব্যাপারটা এই যে ঝাজির ছেলে আমেরিকায়, একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়। এখান থেকে ফিজিক্সে এম.এসসি. করে চলে গিয়েছিল। সেখানেই পছন্দ করেছে এক তামিল সহকর্মিনীকে। বাড়ির লোকের তীব্র বিরোধ যে এক তো মেয়েটি তামিল। তায় ব্রাহ্মণ নয়। দহেজ নাহয় বাদ দেওয়া যায় কেন না মেয়ে কমাউঁ!

ঝাজি পুরোনো কম্যুনিস্ট। আক্ষেপ করলেন, “এত বোঝাচ্ছি দাদা! আরে বাবা ব্রাহ্মণ নয় তো কী হয়েছে? কোনো ছোটো জাতের মেয়ে তো আর নয়? হ্যাঁ, তামিল। তা সে আর কী করা যাবে?...”

যা হোক, ঝাজির ‘ভাবধারাগত সংগ্রামে’ কাজ হল। কুনবা বুঝল যে তাদের জাত আর মেয়ের জাত ভিন্ন হলেও শূদ্রদমনে সমান অধিকারের উত্তরাধিকারী। ধূমধামে বিয়ে হল।

ঝাজির ছেলে আরেক ধাপ এগিয়ে। বলল, “চাচাজি, এমেরিকায় থাকি বলে কি সংস্কার ভুলে গেছি? ফাইন্যালি এটা একটা স্যাক্রেড রিলেশন বলে কথা। জাত-ধর্ম ভুলে তো আর ঝাঁপিয়ে পড়া যায় না?”

 

আমার এক পুরোনো ইয়ার কুন্তল চ্যাট্যার্জি। ম্যাট্রিকের পর বি.কম.টা করেছিল সেকেন্ড ক্লাসে। সারা জীবন ছোট ছোট চাকরি ধরতে আর ছাড়তে রয়ে গেল। গুছিয়ে বসতে পারল না কোনোদিন। বৌ, ছেলেমেয়ের ভোগান্তি।

ম্যাট্রিকের পর লম্বা ছুটিটায় আমরা নরক গুলজার করতাম খোকনের বাড়িতে। সদস্যতার শর্ত ছিল বামুন হলে পৈতে ছিঁড়ে ঢুকতে হবে। কুন্তল শুধু ছেঁড়েই নি, আরো কিছু করেছিল তা আর বলা যাবে না। … আর পরেনি পৈতে।

মাঝে মধ্যে শহরে আসে। রাস্তার ওপার থেকে ষাঁড়ের মত ডাকে। বদমায়েসির হাসি ছাড়ে একটা। দিলখোলা মানুষ।

 

আসলে এই ধারণাটাই ভুল যে বিজ্ঞান পড়লে বা বিজ্ঞান চর্চা করলে জীবনের প্রতি, সমাজের প্রতি মনোভাবে বৈজ্ঞানিক শুচিতা আসবে। জীবিকা ও বৃত্তি হিসেবে বিজ্ঞান আর কর্ম ও মননের ভিত্তি হিসেবে বিজ্ঞান হয়ত একে অন্যের থেকে এত তফাতে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে ছিল না। আর তাই আমরা গত দুই দশকে যখন বিশাল সংখ্যায় ভারতীয় যুবকে প্রযুক্তির দিকে যেতে দেখলাম, আশা জেগেছিল যে তাদের কর্মে ও মননেও বুঝি বা ভিত্তি দেবে বিজ্ঞান। জাগবে বিদ্রোহ। ভাঙবে অনেক অচলায়তন।

কিন্তু উল্টোটাই হচ্ছে।

তবে কি হতাশায় ডুবে আক্ষেপ করা ছাড়া কিছু করার নেই?

………………………

আগে ছিল শিক্ষা, দীক্ষা। শিক্ষা দিত বস্তুচেতনা, জীবনচেতনা, সমাজচেতনা। এক্ষুনি জানি একজন গর্জে উঠবেন, ‘কেন? ধর্মচেতনা নয় কেন?’ … হ্যাঁ ভাই, ধর্মচেতনাও। ওই সমাজচেতনার মধ্যেই ছিল সংস্কৃতিচেতনা, ধর্মচেতনা। ঠিক আছে? …… আর দীক্ষা দিত কর্মচেতনা।

তখনকার যাঁরা শিক্ষাগুরু ছিলেন তাঁরা জানতেন, শিক্ষার পর দীক্ষারও পর প্রয়োজন। নইলে জীবন হয় নেতির দর্প, আত্মক্ষয়।

তখনকার যাঁরা দীক্ষাগুরু ছিলেন তাঁরাও জানতেন, দীক্ষার নিচে শিক্ষার ভিতটা জরুরি। নইলে জীবন হয় যন্ত্রবৎ।

মানুষের মানুষ হয়ে ওঠায় খামতিগুলো তাঁরা পুষিয়ে দিতেন। শিক্ষাগুরুও প্রয়োজনে দীক্ষা দিতেন। দীক্ষাগুরুও প্রয়োজনে শিক্ষা দিতেন।

পঁচিশ বছর আগে এল মানব সম্পদ বিকাশ/উন্নয়ন। কথাটা খুব সুন্দর। প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে যে মানবিক সম্পদ আছে, তার স্বীকৃতি এবং তার বিকাশসাধন। যেন বা ‘ওপর থেকে শিক্ষা’র ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার কাটিয়ে ‘নিচ থেকে, মানুষের প্রত্যন্ত জীবনধারণ থেকে জীবনমূল্যগুলির আবিষ্কার এবং তাদের সংহতিসাধন’।

কিন্তু হল একেবারেই ভিন্ন একটা ব্যাপার। মানুষ, জ্বলজ্যান্ত মানুষটাই পরিগণিত হল, ধনতন্ত্রের প্রয়োজনে, সম্পদ হিসেবে। যেমন খনিজ সম্পদ, কৃষিসম্পদ, তেমনই মানবসম্পদ। যেমন মেশিনারি, মেটিরিয়াল তেমনই লেবার। মুনাফার প্রয়োজনে ওই লেবারের অর্থাৎ লেবার-পাওয়ারের, শ্রমশক্তির উন্নতিসাধন, মেধাশ্রমশক্তির বিকাশ এসবই হয়ে গেল সরকারি বিভাগটির মূলমন্ত্র। এমনকি, চাহিদা না থাকলে যেমন খনিতে খনিজসম্পদ থাকলেও তা হয়ে ওঠে পরিত্যক্ত জঙ্গল, রোজগারের অভাবে মানবসম্পদও হয়ে উঠতে লাগল পরিত্যক্ত সামাজিক জঙ্গল।

বাচ্চাদের আর কী দোষ? তাদের মুনাফার যন্ত্রে আখ হিসেবে মাড়াই করার জন্য করানো হল ক্যাম্পাস, প্লেসমেন্ট, প্যাকেজের দৌড়। মানসিক চাপে, অবসাদে তারা খড়কুটো খোঁজে, চেপে ধরে। …

 

তথ্য বলছে, প্রযুক্তির বিপ্লবে জীবিকার পাঠ নিতে গিয়ে, অর্থাৎ ফলিত বিজ্ঞান পড়তে গিয়ে, এমনকি তত্ত্বগত প্রকৃতিবিজ্ঞানের পাঠটাও চুলোয় যেতে বসেছে। প্রকৃতিবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মৌলিক গবেষণায় বিশ্বমঞ্চে ভারতের যে স্থান ছিল তা গত পঁচিশ বছরে কমে এসেছে ক্রমাগত। লক্ষণীয় ভাবে বেড়েছে চৌর্যবৃত্তির, অন্যের গবেষণাকে নিজের বলে চালাবার প্রচেষ্টার সংখ্যা।

দোষটা প্রযুক্তি-বিপ্লবের নয়। দোষটা ধনতন্ত্রের। বিশেষকরে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে ওঠা তথাকথিত ‘অবাধ’ বাজারভিত্তিক অর্থনীতির। পূঁজির বিশ্বায়নের। … যেহেতু নতুন প্রযুক্তি এদেশে এই অর্থনীতির হাত ধরে এসেছে তাই মাথায় গুলিয়ে যায় ব্যাপারটা। দেখতে পাই না যে প্রযুক্তিকে বিজ্ঞান থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে এই বিশ্বায়ন। কেননা তাদের অর্থনীতির মানচিত্রে বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার জন্য কিছু দেশ চিহ্নিত। আর প্রযুক্তি নিয়ে কাজের জন্য অন্য কিছু দেশ চিহ্নিত। এই তফাৎটা না থাকলে তো মুনাফার মার্জিনটাই বিপন্ন হওয়ার ভয় থাকবে! আর মুনাফার দর বাড়াতে না পারলে বিশ্বায়নের কাজ কী? আর তাহলে, প্রযুক্তি আর বিজ্ঞানের মধ্যেকার অন্তর্নিহিত সম্পর্ক? সেটা কুক্ষিগত আছে বহুজাতিক কম্পানিগুলোর ‘আর এন্ড ডি’ চিহ্নিত ক্যাম্পাসগুলোর গবেষণাগারে।

 

বস্তুতঃ, এই ধনতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইটাই প্রযুক্তির কাছে নিয়ে আসবে বিজ্ঞানকে। আর জীবিকা হিসেবে বিজ্ঞানের কাছে নিয়ে আসবে কর্ম ও মননের ভিত্তি হিসেবে বিজ্ঞানকে। প্রকৃতিবিজ্ঞানের কাছে নিয়ে আসবে সমাজবিজ্ঞানকে। যে শিক্ষিত, সে দীক্ষিত হবে। যে দীক্ষিত, সে শিক্ষিত হবে।

মানছি তাতে দেরি আছে এখন অনেক। কিন্তু শিক্ষাগুরু এবং দীক্ষাগুরুরা মন দিয়ে দেখুন। আপনাদের নতুন প্রজন্ম নিজেদের কাজ ঠিকমত না করা সত্ত্বেও জীবন কিন্তু থেমে থাকে নি।

হয়ত বাঞ্ছনীয়ও নয় অনেক সময়, তবু নতুন নতুন অভাবিত পথে মানবসম্পদ বিকশিত হচ্ছে প্রতিদিন। তার ত্বরিত ধারাগুলি রোদ্দুরে ঝিলিক দিয়ে উঠছে মাঝে মধ্যেই।

এমনকি, এও দেখা যাচ্ছে যে যাদের বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির পাঠের সুযোগ পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই এ জীবনে, তাদেরই কর্মে ও মননে ভিত যোগাচ্ছে বিজ্ঞানচেতনা। বিস্ময়! নয় কি? 

[দশ বারো বছর আগে বিহার এস.সি.ই.আর.টি.র ত্রিভাষী পত্রিকায় প্রকাশিত]   

 


     

   

Tuesday, October 5, 2021

সঁপেছি হৃদয় তোর গলিপথে স্বদেশ - ফয়েজ আহমদ ফয়েজ

সঁপেছি হৃদয় তোর গলিপথে স্বদেশ, যেখানে
শুরু হয়েছে রেওয়াজ, না চলার মাথা তুলে কারো
বেরোয়, ঘোরার ইচ্ছে নিয়ে যদি কেউ
নজর এড়িয়ে, শরীর ও প্রাণ হাতে নিয়ে চলে
 
হৃদপ্রদেশের মুক্তি ও বন্ধন শেখে যুক্তি
ইঁটপাথর কয়েদি আর কুকুর স্বাধীন
 
অত্যাচার পেয়ে যায় অজুহাত হরেকরকম
যে কজন তবু তোর নাম নেওয়া ভাবুক রয়েছে
লোভে পড়ে আজ সাজে ফরিয়াদি; হাকিমও নিজেই
কাকে বা করব উকিল, কোথায় চাইব বিচার
 
তবু যাদের গুজরান করতে হবে দিন, করে
তোর সাথে বিচ্ছেদের সকাল-সন্ধ্যাগুলো এভাবে –

বন্দীশালার ঘুলঘুলি নিভলে মন ঠা’র করে
তারায় তারায় ভরে গিয়ে হবে তোর সিঁথি
শিকল যখন চকচক করে জেনে যাই
ছড়িয়ে পড়েছে তোর মুখমন্ডলে প্রভাত
 
বাঁচার গরজে থাকি সাঁঝসকালের এই কল্পনায়
চারদেয়ালের বন্দীত্বে বাঁচি বস্তুতঃ

অত্যাচার নিত্য এভাবেই রুখে এসেছে জনগণ
না ওদের রেওয়াজ না আমাদের চলন নতুন
এভাবেই ফুটিয়েছি ফুল আগুনে নিয়ত
না জয় আমাদের না পরাজয় ওদের নতুন

তাই তো পরিস্থিতির নালিশ করি না
তোর ভাবনায় মনটাকে খারাপ করি না
আজ রয়েছি বটে বিচ্ছিন্ন কাল মিলিত হব দুজনে
রাতটুকুর এই বিরহ কোনো ব্যাপারই নয়

আজ না হয় ভাগ্য প্রতিদ্বন্দ্বীর আছে তুঙ্গে
চারটে দিনের এই খোদাগিরি কোনো ব্যাপারই নয়

তোর ভরসা রাখার সঙ্কল্পটা কঠোর যাদের
রাত ও দিনের গতির চিকিৎসা তারা জানে

১০.৪.২১



করে যাও যেটা তোমার করার - ফয়েজ আহমদ ফয়েজ

এখন কেন সে দিনের চর্চা যখন হৃদয় হবে খানখান
এবং মিটবে সমস্ত দুখ যা কিছু পেয়েছি, যাবে
যা কিছু পাইনি, পাব
এদিন তো সেই প্রথম দিনটি কামনার ছিল প্রথম যেদিন
যেদিন আমরা চেয়েছি আসুক, ভয়ও আবার পেয়েছি নিয়ত
কতবার এল এই একদিন শ’খানেক ভিটে দিলাম, ভাঙল
লুট হল, ফের ভরল ভাঁড়ার
 
এখন কেন সে দিনের চিন্তা যখন হৃদয় হবে খানখান
এবং মিটবে সমস্ত দুখ্‌
ভয় আতঙ্ক কর উপেক্ষা যা হবার তা তো হবে
যদি হাসি জোটে পথে হাসবে
যদি কান্না জোটে তো কাঁদবে
করে যাও যেটা তোমার করার যা হবে দেখা যাবে

৯.৪.২০১০



কী করি বলো তুমিই - ফয়েজ আহমদ ফয়েজ

দুখের নদীতে আমরা যখন
জীবন-নৌকো নামিয়েছি
কত না শক্তি ছিল দুই হাতে
কত না রক্ত লাল ছিল
মনে হত এই একটু বাইব
নৌকো পৌঁছে যাবে তীরে
হল না তেমন, প্রতি স্রোতের
ভেতরেই চোরাস্রোত ছিল
মাঝিরাও ছিল আনাড়ি কয়েক
যাচাই না হওয়া বৈঠাও
এখন করো বা অনুসন্ধান
যত চাও যার ধরো দোষ
নদীটাও এক, নৌকোও এক
কী করি বলো তুমিই
তীরে কিভাবে নামি বলো

নিজেদের বুকে আমরা যখন
দেশের জখম দেখেছিলাম
বেদের লিখনে ছিল বিশ্বাস
টোটকাও বেশ জানা ছিল
মনে হত ব্যাস কয়েক দিনেই
সব বিপত্তি কেটে যাবে
জখমগুলো সেরে যাবে
হল না তেমন, আমাদের রোগ
পুরোনো কে জানে ক’শতক
বেদও পেল না তার থই
টোটকাও সব বৃথা গেল
এখন করো বা অনুসন্ধান
যত চাও যার ধরো দোষ
বুকটাও এক ক্ষতটাও এক
কী করি বলো তুমিই
কিভাবে সারাই ক্ষত বলো

৮.৪.২০১০



নিদো তানিয়ার প্রসঙ্গক্রমে - উদয় প্রকাশ*

মাত্র উনিশ বছরের রোগাপাতলা ছেলে ছিল নিদো তানিয়া। বেসরকারী একটি পেশা সম্পর্কিত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র – ওর সামনে ছিল বৃত্তিগত উন্নতির দীর্ঘ পথ এবং বহু বছরের ভবিষ্যৎ, যা ২৯শে জানুয়ারিতে হঠাৎ পিটিয়ে পিটিয়ে শেষ করে দিল দিল্লীর বাণিজ্যিক বাজার অঞ্চল লাজপতনগরের আটজন দোকানদার। তার হত্যাকারীদের মধ্যে দুজন ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক, ঠিক যেমন ‘নির্ভয়া’ বাস-ধর্ষণের ঘটনায় সবচেয়ে জঘন্য ধর্ষণকারীটি অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিল। এটা স্পষ্ট যে যতদিন না বর্তমান আইনে সংশোধন করা যাচ্ছে ততদিন ওই ছেলেটিকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া যাবেনা। ‘নির্ভয়া’ ঘটনার ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক’ দোষীকেও মাত্র তিন বছরের জন্য শিশু-সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে। এখনো আমাদের বিচারব্যবস্থা এই নতুন, পরিবর্তিত সমাজ-বাস্তবটা বুঝতে পারছেনা যাতে বাচ্চারা আর অপ্রাপ্তবয়স্ক নয়, বয়স্ক। তারা ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, লুট আর হত্যা করা শুরু করেছে। কিছুদিন আগে ঘটিত, দিল্লীর সবচেয়ে বড় লুটের (সাত কোটি টাকা) মাস্টারমাইন্ডও একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিল। 

নিদো তানিয়া পাঁচটি ভুল করেছিল। প্রথম ভূল যে সে আজকালকার যুবদের মত চুলে রঙ লাগিয়ে রেখেছিল। দ্বিতীয় ভূল যে সে দিল্লীর একটি পনীরের দোকানে, পনীর বা মাখন ক্রীম ইত্যাদি কিনতে নয়, নিজের এক বন্ধুর ঠিকানা জিজ্ঞেস করতে গিয়েছিল। অর্থাৎ সে ‘কাস্টমার’ ছিল না। মির্জা গালিবের কথায়, যাচ্ছিল সে বাজারের পথেই, কিন্তু খদ্দের ছিল না। আজকাল আমাদের মহানগরগুলো এমনই হয়ে পড়েছে যেখানে প্রত্যেকেই, হয় কিছু বেচে অথবা কেনে, অর্থাৎ পুরো শহরটাই এক বড়সড় শপিং মল। নিদো তানিয়ার তৃতীয় ভূল ছিল যে সে অরুণাচল প্রদেশ থেকে এসেছিল। সেই অরুণাচল প্রদেশ যেখানকার মানুষজনের চেহারাগুলো দিল্লী বা উত্তরভারতের মানুষের থেকে ভিন্ন। সেই অরুণাচল প্রদেশ, যেটাকে চীন বেশ কিছু বছর ধরে নিজের মানচিত্রে শামিল করছে, কিন্তু প্রদেশটি আজও ভারতের অংশ কেননা সেখানকার জনতা নিজেদের ভারতীয় গণতন্ত্রের অংশ মনে করে।

নিদো তানিয়ার চতুর্থ ভূল ছিল যে সে তার দিকে ছোঁড়া মন্তব্যে ক্রুদ্ধ হয়ে দোকানটির কাঁচ ভেঙে দিয়েছিল। সে হোক না কেন যে সে কাঁচ ভাঙার অপরাধে দশ হাজার টাকার জরিমানা দিয়ে দিয়েছিল এবং নিজের হত্যাকারীদের সাথে ‘সমঝোতা’ করে নিয়েছিল। তার পঞ্চম ভূল ছিল যে সে মেনে নিয়েছিল যে দেশের রাজধানী দিল্লী একটি বিকশিত আধুনিক মহানগর এবং এখানে যেকোনো ভারতবাসী নির্ভয়ে স্বাতন্ত্র্য এবং বৈধ নাগরিক অধিকারে বসবাস করতে পারে।

হতে পারে ছেলেটি ভেবেছিল যে তার পিতা নিদো পবিত্র সেই রাজনৈতিক দলের বিধায়ক এবং পরিবার তথা স্বাস্থ্যকল্যাণ বিভাগের সংসদীয় সচিব যে রাজনৈতিক দলের সরকার এখনো কেন্দ্রে শাসন করছে। হতে পারে তার ভিতরে ভ্রান্তি তৈরি করেছিল এই তথ্য যে দেশের প্রধানমন্ত্রীকেও সেই উত্তর-পূর্বের, অর্থাৎ আসামের জনগণ সংসদে নির্বাচিত করে পাঠিয়েছে যে উত্তর-পূর্বের সে নিজেও একজন বাসিন্দা। আসাম উত্তর-পূর্বের সাত বোনের এক বোন, যেমন সাতটি নদীর মিলনে তৈরি হয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদ।

নিদো তানিয়া ভেবেছিল হয়ত যে যদি সাতটি আলাদা আলাদা নদীর মিলনে এক ব্রহ্মপুত্রের জন্ম হতে পারে, তাহলে অসংখ্য বর্ণ, ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা আর সমুদায়ের মিলনে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রেরও জন্ম হয়ে গিয়ে হবে। মাত্র চার দিন আগেই তো এই দিল্লীর রাজপথে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং রাজধানীর সব ভিআইপি গণ্যমান্যদের উপস্থিতিতে প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন করা হয়েছিল, যাতে ভারতের বিবিধতার মন্ত্রমুগ্ধকারী ট্যাবলো পেশ করা হয়েছিল। নিদো তানিয়ার হত্যার চার দিন আগের তারিখ ২৬শে জানুয়ারির এই প্রজাতন্ত্র দিবস ১৯৫০ সালে জারি হওয়া সেই সংবিধানের স্মৃতিতে উদযাপিত হয় যেটি এই প্রজাতন্ত্রে বসবাসকারী প্রত্যেকটি নাগরিককে সমান অধিকার এবং স্বাতন্ত্র্যের গ্যারান্টি দেয়। কিন্তু সেটা তানিয়ার ভ্রান্তি ছিল। অবাস্তব ছিল তার চিন্তাভাবনা, একটা স্বপ্নে বাঁচছিল সে, যে স্বপ্নে আমরা সবাই, বারবার নিরাশ হয়েও একটা জেদবশতঃ বেঁচে থাকি। 

নিদো তানিয়ার হত্যা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন খাড়া করে। এটি কোনো সাধারণ অপরাধের ঘটনা নয়, এক প্রজাতন্ত্রের অসফল হয়ে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সংকেত – একটি ‘এমার্জেন্সি এলার্ম’। কিছুদিন আগেই এমেরিকার নামকরা খবরের কাগজ ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’এর একটি সার্ভে দুনিয়ার সেই প্রধানতম দেশগুলোর মধ্যে ভারতকে শীর্ষস্থানে পেয়েছে যেখানে বর্ণভিত্তিক, লিঙ্গভিত্তিক, সামুদায়িক এবং জাতিগত অসহিষ্ণুতা সবচেয়ে বেশি। এশিয়ার অর্থনৈতিক ‘সুপার পাওয়ার’, চাঁদে আর মঙ্গলে উপগ্রহ পাঠানো, পরমাণু ক্লাবের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, মিসাইল টেকনোলজিতে বিশ্বকে আশ্চর্যচকিত করা এই দেশটি নিজের মূলগত চরিত্রে কী করে এত পশ্চাৎপদ, প্রাক-আধুনিক, মধ্যযুগীন সমাজের একটি গোঁড়া হিংসাপরায়ণ দেশ হয়ে চলেছে? ভাববার প্রশ্ন।

কোনো শহরের ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ বদলে সেটিকে ইওরোপের বড় শহরগুলোর মত বানিয়ে দিলে, আধুনিকতম ভোগ্যপণ্যের টেকনোলজি বাজারে ভরে দিলে, প্রত্যেকের হাতে স্মার্ট ফোন আর ল্যাপটপ দিয়ে দিলে, সব জায়গায় সবক’টি সফটড্রিংক আর জাংকফুডের দোকান খুলে দিলে, ইওরোপকেও ম্লান করে দেওয়া বড় বড় মল তৈরি করে দিলে, মেট্রো রেল, মনোরেল চালিয়ে দিলে আর ছয়-আট লেনওয়ালা চওড়া সড়ক তৈরি করে দিলে অথবা কমনওয়েলথ গেমস আর এশিয়ান গেমসের দারুণ সমারোহ সফল করে এবার অলিম্পিক করানোর দাবী করলে কি কোনো মহানগর এবং তাতে বসবাসকারী সমাজ ‘আধুনিক’ হয়ে যায়? সংবিধান, লোকসভা আর বিধানসভার প্রতিষ্ঠা করে দিলে এবং ভোট করিয়ে দিলেই কি সত্যিই আধুনিক ও সভ্য গণতন্ত্রের নির্মাণ সম্পন্ন হয়? বিল্ডার আর কর্পোরেট ঘরানার ঠিকেদারেরাই কি আধুনিক গণতন্ত্রের নির্মাতা? যারা মল-মেট্রো আর আকাশচুম্বী অট্টালিকা বানিয়েছে তারা গণতন্ত্রও বানাতে পারে? গণতান্ত্রিক সমাজ হওয়ার প্রাথমিক ও মৌলিক শর্ত কী কী? এমন অনেক প্রশ্ন আছে, যেগুলো হঠাৎ উঠতে শুরু করেছে।

নিদো তানিয়ার হত্যার কিছুদিন আগে দক্ষিণ-দিল্লীর ওই অঞ্চলেই, বেড়াতে বেরুনো দুই মণিপুরী মেয়ের জুতোয় দুই যুবক নিজেদের পোষা কুকুরের বেল্ট বেঁধে দিয়েছিল আর যখন ভয় পেয়ে মেয়েরা চেঁচাতে শুরু করল, যুবকেরা হাসতে লাগল। যখন একটি মেয়ে কুকুরটাকে দূরে সরাতে পা দিয়ে ঠেলা দিল তখন যুবকেরা মেয়েটির চুল ধরে টানতে টানতে তাকে ‘চিংকি’, ‘ঝিংগা লা লা’, চাউমিন’ বলে গালিগালাজ করল। মেয়েদের বাঁচাতে এগিয়ে আসা উত্তর-পূর্বের দুই যুবককে ওরা মারধর করল। নালিশ করা সত্ত্বেও পুলিস এফআইআর নিলনা।

কিছুকাল আগে দিল্লীর জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় মহিলা আয়োগের যুক্তভাবে করা সার্ভেতে এই তথ্য সামনে এসেছে যে দেশের মহানগরগুলোয় উত্তর-পূর্ব থেকে আসা নারীদের ৬০% বর্ণগত ভেদাভেদ, অপমান এবং উৎপীড়নের শিকার। এই মহানগরগুলোর শীর্ষস্থানে আছে দেশের রাজধানী দিল্লী, যেখানে ৮১% নারীরা এই ভেদাভেদ এবং অপমানের দংশন সহ্য করে চলেছেন। চিংকি, নেপালী, চিনে, চাউমিন সম্বোধন তো চলেই, তার সাথে এটাও জিজ্ঞেস করা হয় আকছার, “তোমরা কি কুকুর আর সাপ খাও?” গুরুত্বপূর্ণ এটাও যে পুলিস এবং প্রশাসনিক কর্তাদের মনেও এসব ধারণা বদ্ধমূল। পাঠকদের মনে আছে হয়ত যে এবারের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান সম্মানীয় অতিথি ছিলেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিঞ্জো আবে। সেদিনের এই গল্পটি কম চিত্তাকর্ষক নয় যে সুরক্ষার সাথে জড়িত এবং অন্যান্য সরকারী আধিকারিকেরা মণিপুর আর মিজোরামের কিছু দর্শকের কাছে এসে বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন, “আপনারা কি জাপানী ডেলিগেশনের সদস্য?” আগ্রায় তাজমহল দেখার টিকিট কিনতে পৌঁছনো উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষদের কাছে পাসপোর্ট চাওয়া তো প্রতিদিনকার ব্যাপার।

এটা স্পষ্ট যে আমাদের শিক্ষাসংস্থাগুলোয় নিজেদের দেশটার বিষয়ে যে শিক্ষা ছাত্রদের দেওয়া হয়েছে তাতে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাব রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৯০এর পর যে নতুন শিক্ষা যেভাবে তিন প্রজন্মকে শিক্ষিত করেছে, তার ফলশ্রুতি এই যে তারা সে দেশ আর সমাজটাকেই জানে না যাতে তারা থাকে। তারা বাণিজ্যিক কম্পানিগুলোর পরিচালন ও মার্কেটিংএর জন্য উপযোগী হতে পারে, কলসেন্টারে কাজ করতে পারে, হাইটেক মজুর হয়ে বিদেশ যেতে পারে এবং রোজগার করতে পারে কিন্তু তারা নিজেদের ভূমি থেকে কর্তিত, নিজেদের পরিবারের জন্য পর আর সমাজের জন্য অনুপযোগী।

এই কারণেই নিদো তানিয়ার হত্যার প্রতিবাদে আসা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাজার হাজার ছাত্র ও যুবদের একটা দাবী এও ছিল যে এনসিইআরটি স্কুলের জন্য এমন পাঠ্যক্রম তৈরি করুক যার মাধ্যমে ছাত্ররা এই দেশের বিবিধতার পূর্ণ তথ্য পেতে পারে। মনে পড়ে যে কখনো রামাস্বামী পেরিয়ার বলেছিলেন, হিন্দী-হিন্দু-হিন্দুস্তানওয়ালা জাতিবাদের সবচেয়ে বড় সংকীর্ণতা যে তারা পুরো দক্ষিণ ভারতটাকে ভুলে যায়। জেনে অবাক হতে হয়না যে আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীও বিন্ধ্য পর্বতের উপরের অংশটিকেই ভারত বলে মানতেন। তাঁর জাতীয় কল্পনির্মাণে দক্ষিণ ভারতই ছিলনা, উত্তর-পূর্বাঞ্চল থাকার তো কথাই ওঠেনা।

শিক্ষা বাদ দিয়ে কোনো সমাজ বা জাতিরাষ্ট্রের নাগরিক তৈরি করা যেতে পারেনা। যদিও মনোবৈজ্ঞানিকেরা বলেন যে শিশুদের আসল ও প্রথম প্রাথমিক বিদ্যালয় হয় তাদের পরিবার। যদি আমাদের পরিবারগুলো নাগরিক নয়, কম্পানির কর্মচারি তৈরি করা কিন্ডারগার্টেন হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে নাগরিক কোথা থেকে আসবে; ভীড়ই জন্ম নেবে আর সে ভীড় নিজের থেকে ভিন্ন কাউকে দেখে তেমনই হিংসাপরায়ণ আচরণ করবে যেমন তানিয়ার সাথে করল।

দিল্লী যদি দেশের সবচেয়ে আধুনিক আর বিকশিত মহানগর হওয়ার বদলে ধর্ষণ, জাতগত গোঁড়ামি আর বর্ণহিংসার রাজধানী হয়ে চলেছে, তাহলে তার কারণগুলো গভীরে গিয়ে খুঁজতে হবে। ভোলা উচিৎ নয় যে ১৯৪৮ সালের ৩০শে জানুয়ারি এই দিল্লীতেই মহাত্মা গান্ধীর হত্যা করেছিল এক সাম্প্রদায়িক উন্মাদ আর ২০১৪ সালের ৩০শে জানুয়ারিতে নিদো তানিয়ার হত্যা করল সেই দিল্লীর সমাজে বাড়তে থাকা বর্ণভিত্তিক হিংসা। কিছু মানুষ এখনও ঘটনাটিকে খুব হাল্কা ভাবে, সাধারণ অঘটনের মত করে দেখছেন। এটা তাঁদের ‘উটপাখিবাদ’, যা ভবিষ্যতে ঘনিয়ে আসা ঝড়ের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজের মাথা বালিতে গুঁজে নেয়।

*উদয় প্রকাশ হিন্দীর লব্ধপ্রতিষ্ঠ সাহিত্যিক
হিন্দী থেকে বাংলায় অনুবাদঃ বিদ্যুৎ পাল
[ছবি ও মূল রচনাটির জন্য কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ প্রভাত খবর (দৈনিক), পাটনা এডিশন, ৯ই ফেব্রুয়ারী ২০১৪]



Monday, October 4, 2021

কুকুর

সময়ের বাঁকটা পেরিয়ে আমরা সকলেই
অজ্ঞাতপরিচয়। সময়ের বাঁকটা পেরিয়ে,
যদি বেঁচে থাকি, কারোর স্পর্শে জ্ঞানে ফিরে
নতুন পৃথিবী গড়ে নিতে হয় - কার স্পর্শ?
একটি কুকুরও হতে পারে
ভাবার কোনো কারণ নেই যে সে ছদ্মবেশে
কোনো ভগবান। বস্তুতঃ কুকুরের বুদ্ধিদীপ্ত চোখ
কোনো তুলনা ছাড়াই সুন্দর, বা ধর গরুর মুখটা –
মন্দিরের মত; জাবোলটস্কি লিখেছিলেন

সময়ের সেই বাঁকটা পেরিয়ে বস্তুতঃ
সবই এক থাকে, শুধু নিজেকেই
ভাঙতে হয় নিজের অপরিচয়, ভাঙতে হয়
উল্টে থাকা লোহার ঠেলার পাশে পাথরকুচিতে
মুখ থুবড়ে থাকা মৃত্যু নিজের, চেয়ে চেয়ে দেখি
গাছপালা, দেয়াল, জানালা, দোকান, মানুষজন
কেউ ঠিক প্রতীক্ষায় নেই, তবু
ভালোবাসা বন্ধ করেছে মনে হয় না,
কেউ হাসছেওনা মুচকি, আবার তিরস্কারও নেই

সনাক্ত যে করবে সে আসেনি,  কোথায় সে?
এখনও খবর পায়নি পুলিস? তাকে দেয় নি?
নাকি এক পথচারি পেয়েছে শীতের
কাঁকরপথে লাশটা? কোথায় আপনজন আমার?
ঘরে? বেরুচ্ছে কোন কাজে, বেখবর? নাকি রাস্তায়,
পুলিস জিপে, আশঙ্কাবিধ্বস্ত মুখে আসছে?
বা হয়ত আগামিকাল পাবে খবর!
কারো আসার আগেই উঠে পড়া যাক বরং!
নিজের কন্ঠস্বরটা আছে তো?
ফিরে যায়নি তো নদীতে?
কোনদিকে যেন সেই মাতৃধারা এই নতুন
বা পুরোনো যাই ভাবি
পৃথিবীতে?

কিরে, নিয়ে যাবি নাকি দোস্ত?
কুকুরটার দিকেই তাকালাম।


২.১০.২১